কুহুরানী – ৩

মোফাজ্জল করিম সার্কাস দলের ম্যানেজারের ভদ্রতায় মুগ্ধ হলেন। আজকালকার দিনে এমন ভদ্রতা চোখে পড়ে না। ম্যানেজার সকালবেলায় বাড়িতে এসে উপস্থিত। সঙ্গে এক ঝুড়ি কমলা। সে পা ছুঁয়ে তাকে কদমবুসি করে বলেছে, আমার নাম ইয়াকুব। আমি সার্কাস দলের ম্যানেজার। আপনার পায়ে হাত দিতে পেরেছি, এটাই আমার পরম সৌভাগ্য। আমি কিছুক্ষণ আপনার পায়ের কাছে বসে থাকব। যদি অনুমতি দেন।

মাফাজ্জল করিম বললেন, পায়ের সামনে বসে থাকবে কেন?

ইয়াকুব বলল, আমার ইচ্ছা।

মোফাজ্জল করিম হাত ধরে ইয়াকুবকে টেনে তুললেন। ইয়াকুব বলল, স্যার, আমি শুনেছি সার্কাস পার্টি যেন নয়াপাড়া না আসতে পারে আপনি সেই তদবির করেছিলেন। আপনার মতো মানুষ যদি গরিবের পেটে লাথি মারে তাহলে গরিব যাবে কই? আপনি সমাধান দেবেন। আপনার সমাধান না নিয়ে আমি যাব না।

মোফাজ্জল করিম বড়ই বিব্রত বোধ করলেন। ইয়াকুব বলল, স্যার, আজ আমার প্রথম শো। আপনার দোয়া ছাড়া প্রথম শো আমি করব না।

যাত্রা-সার্কাস এইসব আমি পছন্দ করি না।

ইয়াকুব বললেন, আপনি পছন্দ করেন বা না করেন আপনাকে যেতে হবে। আমি আপনার পুত্রের মতো। এটা পুত্রের আবদার।  

মোফাজ্জল করিম বললেন, তুমিতো ভালো যন্ত্রণায় ফেললে।

ইয়াকুব বলল, পুত্রের কাজ যন্ত্রণা দেওয়া। আমি যন্ত্রণা দিবই। এখন আমি একটা কমলা ছিলে দিব। আপনি খাবেন। এটাও পুত্রের আবদার।

মোফাজ্জল করিম বললেন, বাবারে এখন আমি কমলা খেতে পারব না। আমি রোজা আছি।

কিসের রোজা?

এম্নি রাখলাম।

ইয়াকুব বলল, ইফতারের দায়িত্ব আমার। আমি নিজে ইফতার নিয়ে আসব। ইফতার শেষ করে আমার সঙ্গে সার্কাস দেখতে যাবেন। স্কুলের সব শিক্ষকরাও যাবেন।

মোফাজ্জল করিম কী বলবেন ভেবে পেলেন না। ইয়াকুব নামের এই লোক তাকে ছাড়বে না এটা বোঝাই যাচ্ছে।

স্যার, আরেকটা কথা বলি?

আরো কথা আছে?

জি। আমি খবর পেয়েছি আপনি ঔষধি গাছের ভক্ত। আপনার ওষুধি গাছের বাগান আমি দেখে এসেছি। আপনার অনেক গাছ আছে আবার অনেক ইম্পর্টেন্ট গাছ নাই।

মোফাজ্জল করিম উৎসাহিত গলায় বললেন, কোন গাছ নাই-বলোতো?

বকফুলের গাছ নাই, গন্ধভাদালি নাই, ওলট কম্বল নাই।

এইসব গাছ তুমি চেন?

কেন চিনব না! সার্কাসের ম্যানেজার হয়েছি বলে কিছুই চিনব না? কিছুই জানব না? আমি আপনাকে গাছ আনায়ে দিব।

সত্যি?

ইয়াকুব কঠিন গলায় বলল, আজই আসার লোক চলে যাবে দুই থেকে তিনদিনের ভিতর আপনি পাছ পাবেন। এটা হল পিতার কাছে পুত্রের ওয়াদা।

মোফাজ্জল করিম বললেন, তোমার ব্যবহার এবং কথাবার্তায় আমি মুগ্ধ হয়েছি। আমি সার্কাস দেখতে যাব ইনশাল্লাহ।

ইয়াকুব বললেন, আপনার যদি সার্কাস পছন্দ না হয় আমার পাছায় একটা পাখি দিবেন। আমি কিছুই বলব না।

মোফাজ্জল করিম বললেন, কিছু কিছু শব্দ আছে অশালীন। এইসব শব্দ উচ্চারণ করা ঠিক না।

ইয়াকুব কানে হাত দিয়ে বলল, এই শেষ আর বলব না!

.

মোফাজ্জল করিম সার্কাসের তাঁবুর ভেতর বসে আছেন। তাঁকে কেন জানি চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে।

তিনি কিছুতেই মনে করতে পারছেন না তিনি তার জীবনে কখনো সার্কাস দেখেছেন কি না। নিশ্চয়ই দেখেছেন। একটা মানুষ তাঁর দীর্ঘ জীবনে সার্কাস দেখবে না তা হয় না। নিশ্চয়ই দেখেছেন। তাহলে মনে পড়ছে না কেন? তার কি স্মৃতি নষ্ট হওয়া রোগ শুরু হয়েছে। প্রতি রাতে তিনটা করে ইংরেজি শব্দ শেখেন। দু’দিন পরে আর মনে থাকে না। কয়েকদিন আগে শিখলেন, Fidget শব্দটা মনে আছে। শব্দের মানে মনে নেই। Fidget মানে কি শাসক কর্তৃক প্রদত্ত হুকুম? ডিকশনারিটা সঙ্গে থাকলে ভালো হতো। চট করে দেখে নিতেন। তবে সেটা শোভন হতো না। সার্কাস দেখতে কেউ ডিকশনারি নিয়ে আসে না।

মোফাজ্জল করিম সাহেবের একপাশে বসেছেন আরবি শিক্ষক মাওলানা আবুল বাসার। অন্যপাশে বিএসসি শিক্ষক হাসান আলী। স্কুলের সব শিক্ষকই এসেছেন। তারা বসেছেন একসঙ্গে। তাঁদেরকে প্রথম সারিতে চেয়ারে বসানো হয়েছে। এই অঞ্চলের বিশিষ্টজন সবাই এসেছেন। শুধু হাজি মফিজ ব্যাপারি আসেননি। ওনার না আসার একটি কারণ হয়তো এমদাদ খন্দকার। এমদাদ খন্দকার যেখানে থাকেন হাজি মফিজ ব্যাপারি সেখানে থাকেন না।

মাওলানা বাসার বললেন, দেখেছেন স্যার, একদিনে কী করে ফেলেছে? তাঁবুটা কত উঁচু দেখেছেন? একটা হ্যাজাক লাইট যদি ছিড়ে পড়ে তাহলে আর দেখতে হবে।

মোফাজ্জল করিম বললেন, বিরাট কর্মযজ্ঞ। বলার পরই মনে হলো, কর্মযজ্ঞের ইংরেজি তিনি জানেন না। এক সময় জানতেন এখন ভুলে গেছেন।

বাজনা শুরু হয়েছে। কানে তালা লাগানোর মতো বিকট বাজনা। বাজনার তালে সঙের পোশাক পরা একজন ঢুকল। সে একটা হাতির বাচ্চার পিঠে উল্টো করে চেপে ঢুকেছে। তাবু ভর্তি মানুষের চিৎকার, হাততালি, শিস।

মোফাজ্জল করিম হাসান আলীর দিকে তাকিয়ে বললেন, এই হাতির বাচ্চাটাই কি খাদে পড়েছিল?

হাসান আলি বলল, জি না, স্যার। এর মা পড়েছিল।

তুমি কি সেখানে ছিলে?

জি।

কাজটা ঠিক করো নাই। এই বিষয়ে পরে কথা বলব।

খেলা শুরু হয়েছে। প্রথম আইটেম হাতির বাচ্চা নিয়ে জোকারদের রঙতামাশা। জোকারের হাতে একটা লাঠি। মাথায় লম্বা লাল টুপি। টুপির মাথায় ঝুনঝুনি। জোকার বলছে, ভদ্রসমাজ আমার নাম জানতে চান? নাম জানতে চাইলে আওয়াজ দেন।

চাই। চাই। নাম জানতে চাই।

ভদ্রসমাজের কাছে নাম বলতে লজ্জা পাই। কারণ নামটা অভদ্র।

নাম জানতে চাই।। নাম জানতে চাই।

আমার নাম পাদকুমার। আমি ঘনঘন পাদ দেই, এই জন্য আর নাম পাদকুমার। কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাদের মতো তবে অতি বিকট শব্দ হলো। তাঁবুর সব মানুষ আনন্দে ফেটে পড়ল। হাসি চিৎকার। হইচই।

মোফাজ্জল করিম বললেন, এটা কী ধরনের অসভ্যতা!

মাওলানা বললেন, জোকারেরা এইসব করে। দেখেন সবাই কত মজা পাচ্ছে।

মজার জন্য অসভ্যতা করতে হবে।

হাসান আলী বললেন, স্যার, দেখুন নতুন খেলা শুরু হয়েছে। মোফাজ্জল করিম স্টেজের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন। যে কালো মেয়েটা দড়ির উপর হাটছে তাকে তিনি চেনেন। তার নাম জোছনা। এই মেয়ে অবশ্যই জোছনা। সেই চেহারা। সেই চোখ মুখ। চিবুক নিচু করে তাকানো। চাপা হাসি।

মোফাজ্জল করিম বুকে চাপ ব্যথা অনুভব করলেন। শরীর কেমন যেন করছে। তার কাছে মনে হচ্ছে, এখনি তিনি মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন। জোছনা দড়ির ওপর হাঁটছে। দড়ির ওপর সে কেন হাটবে? আর এইসব কী পোশাক সে পরেছে। ছিঃ ছিঃ। জোছনা তাকিয়েছে, আহারে, কী সুন্দর চোখ! চোখে কি কাজল দিয়েছে?

কাজল দেয়ার অভ্যাস জোছনার আছে। কাঁঠাল পাতায় সরিষার তেল মাখিয়ে রেপির আগুনে সে কাজল বানাতো। একদিন কাজল নিয়ে কত কাণ্ড। তিনি কী নিয়ে যেন জোছনার সঙ্গে রাগারাগি করলেন। জোছনা কেঁদে কেটে অস্থির। যখন কান্না থামল তখন তার সারামুখে কাজল। চেহারা হয়েছে ভূতের মতো। তিনি হাসতে শুরু করলেন। জোছনা বলল, হাস কেন? তিনি বললেন, তোমাকে দেখে হাসি।

আমাকে দেখে কেন হাস?

তোমাকে এখন যেই দেখবে সেই হাসবে।

তাঁর কথা শেষ না হতেই মওলানা এসে উপস্থিত। মওলানাও শুরু করলেন হাসি।

মোফাজ্জল করিম চোখ বন্ধ করলেন। কাজলের কালি মাখা অবস্থায় জোছনাকে তিনি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। চোখ মেললেই দেখছে সার্কাসের মেয়েটাকে। দু’জন কি আলাদা?

হাসান আলি বলল, স্যার আপনার কি শরীর খারাপ?

মোফাজ্জল করিম বললেন, একটু খারাপ।

চলেন চলে যাই। বিছানায় শুয়ে থাকবেন।

মোফাজ্জল করিম শিশুদের মতো গলায় বললেন, আরেকটু থাকি?

দড়ির খেলা শেষ হয়েছে, এখন শুরু হয়েছে ম্যাজিক। এক লোক খুব কায়দা কানুন করে ম্যাজিক দেখাচ্ছে। দর্শকরা মুগ্ধ। ঘনঘন হাততালি পড়ছে।

দড়ি কেটে তিন টুকরা করল। নিমিষের মধ্যেই জোড়া দিয়ে দিল।

পকেট থেকে ডিম বের করে আঙুলের চাপ দিয়ে ভাঙল। ডিমের ভেতর থেকে বের হল একটা জবা ফুল। টকটকে লাল রঙের জবা। একটা ফুল দিল, জবা ফুলের রঙ হয়ে গেল কুচকুচে কালো।

একটা খালি বাক্স দেখানো হল। সেই বাক্স থেকে বের হল কবুতর। তাও একটা না চারটা। বাক্সটা খুবই ছোট, কোনোমতে একটু কবুতরের জায়গা হয়। সেখানে চারটা কবুতর কীভাবে আছে?

মোফাজ্জল করিম হাসানের দিকে তাকিয়ে বললেন, মেয়েটা আসবে না?

হাসান বলল, কোন মেয়ে স্যার?

মোফাজ্জল করিম বিড়বিড় করে বললেন, কিছু না। কিছু না। কী বলতে কী বলছি নিজেই জানি না।

.

রাত অনেক।

মোফাজ্জল করিম উঠানে ইজিচেয়ার পেতে শুয়ে আছেন। বারান্দায় হারিকেন রাখা। হারিকেনে তেল নেই। দপদপ করছে। যে-কোনো মুহূর্তে নিভে যাবে।

মোফাজ্জল করিমের গায়ে চাদর। কুয়াশা পড়ে চাদর ভেজা ভেজা হয়ে আছে। তিনি তাকিয়ে আছেন পুকুরপাড়ের গাছগুলোর দিকে। গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে পুকুরের পানি দেখা যায়। চাঁদের মানোয় পুকুরের পানি চকচক করছে। জোছনা মাঝে-মাঝেই বলত, মনে হয় এটা পুকুর না, অন্য কিছু।

মোফাজ্জল করিম বলতেন, অন্য কিছুটা কী?

মাটির নিচে কেউ ঘর করেছে, সেই ঘরের চালা টিনের চালা। টিনের চালার চকমকামি।

গর্ভাবস্থার শেষদিকে জোছনা উল্টাপাল্টা কথা বলত। মাটির নিচে কেউ ঘর করবে কেন? চকমকামিই বা কেমন শব্দ!

অনেক রাত পর্যন্ত এই ইজিচেয়ারেই সে শুয়ে থাকত। বিছানায় ঘুমুতে নাকি তার কষ্ট হতো। মোফাজ্জল করিম কতবার দেখেছেন, জোছনা ইজিচেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়েছে। মৃত মানুষের ফিরে আসার ক্ষমতা থাকলে জোছনা এই ইজিচেয়ারটার কাছেই ফিরে ফিরে আসত। মোফাজ্জল করিমের অনেকবার ইচ্ছা হয়েছে ইজিচেয়ারটা উঠানে পেতে রাখেন। দূর থেকে দেখেন কেউ এসে এখানে বসে কি না। কাজটা করা হয় নি। মৃত মানুষ ফিরে আসে না।

স্যার, ঘুম যাবেন?

বারান্দায় বজলু দাঁড়িয়ে আছে। সে সার্কাস থেকে কিছুক্ষণ আগে ফিরেছে। ভয়ে ভয়ে ফিরেছে। গত রাতে সে সার্কাসের দলের সঙ্গেই ছিল। হাতিঘরের পাশে বালির বস্তার উপর শুয়ে রাত কাটিয়ে দিয়েছে। আজ রাতেও সেখানে থাকার ইচ্ছা ছিল। সার্কাসের হারামজাদা ম্যাজিশিয়ান তাকে ধমক দিয়ে বের করে দিয়েছে। তার মন অসম্ভব খারাপ ছিল। এখন মন সামান্য ভালো। কারণ হেড স্যার গত রাতে সে কোথায় ছিল এই নিয়ে বাহাস শুরু করেন নাই।

মোফাজ্জল করিম বললেন, আমার একটু দেরি হবে, তুই শুয়ে পড়।

বজলু বলল, আফনের কি শ‍ইল খারাপ?

না।

মাথাব্যথা?

সামান্য।

মাথা বানায়া দিমু?

হাত ধোয়া আছে? হাত ধোয়া থাকলে দে।

বজলু ইজিচেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে মোফাজ্জল করিম সাহেবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বজলু বলশালী মানুষ, কিন্তু তার হাত মেয়েদের হাতের মতো কোমল।

বজলু বলল, সার্কাসের খেলা কেমন দেখলেন স্যার?

ভালো।

আফনের কাছে কোন আইটেম সবচেয়ে মজা লাগছে?

সবই ভালো তবে সাপের খেলাটা জঘন্য। একটা মেয়ে সাপ জড়িয়ে ধরে চুমু যাচ্ছে। এটা কেমন কথা?

মেয়েটার নাম মীনা কুমারী।

তুই ওদের চিনিস নাকি?

অল্প-বিস্তর চিনি। গোসলের পানি দিয়া আসলাম। মীনা কুমারী কত সুন্দর দেখছেন না স্যার, কিন্তুক তার গলা মোটা। পুরুষ মানুষের গলা।

একটা কালো মেয়ে যে ছিল, দড়ির খেলা দেখাল, এই মেয়েটা কেমন?

জানি না। হে কোনো কথা কয় নাই। তার শ‍ইল্যে জ্বর। জ্বর নিয়া সে খেলা দেখাইছে।

বলিস কী?

হুঁ। সত্য। তার নাম কুহুরানী।

কুহুরানী।

একটা মেয়ের জ্বর, তাকে নিয়ে খেলা দেখানোর দরকার কী?

কী করব, কন? পাবলিকে চায়। স্যার, ম্যাজিক যে দেখাইছে প্রফেসর বাবুল, উনার খেলা কেমন লাগছে?

ভালো।

বাবুল সাব মানুষ কিন্তু খারাপ। সবেরে তুই তুকারি করে। আমি নিজের ইচ্ছায় বিনা টেকায় দশ বালতি পানি দিয়া আসছি-আমারে বলে, এই কুত্তা! পানি ফেলস কেন? ম্যাজিকের লোক না হইলে দিতাম বালতি দিয়া বাড়ি।

মোফাজ্জল করিম বললেন, কুহুরানী জ্বর নিয়ে খেলা দেখিয়েছে।

জি, স্যার।

মেয়েটাকে ডাক্তার দেখিয়েছে?

জানি না, স্যার।

ডাক্তার দেখানো দরকার ছিল।

স্যার, ঘরে যান। মাথায় উষ পড়তেছে।

বসি আর কিছুক্ষণ। একটু চা খাওয়া তো।

স্যার, আমার দুইটা দিনের ছুটি দরকার। মা মৃত্যুশয্যায়।

তোর মা মৃত্যুশয্যায়?

জি, স্যার। এখন যায় তখন যায়। কবিরাজ ওষুধ দিয়েছে সেই ওষুধ সে মুখে নিতে পারে না। গন্ধে বমি আসে।

বজলু, তোর ছুটির দরকার তুই ছুটি নে। মিথ্যা কথা বলার দরকার কী? তোর মা মৃত্যুশয্যায় না। যে ছেলের মা মৃত্যুশয্যায় সেই ছেলে বুকে ফুঁ দিয়ে বেড়ায় না।

কাইল সকালে চইলা যাই স্যার। দুই দিন পরেই চইল্যা আসব। আল্লা-নবীর কীরা।

মোফাজ্জল করিম জবাব দিলেন না। কুহু নামের মেয়েটা গায়ে প্রবল জ্বর নিয়ে খেলা দেখিয়েছে, এটা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। একজন অসুস্থ মানুষ বিশ্রাম করবে। দড়ির ওপর ঝাঁপাঝাঁপি করবে না।

বজলু চা বানাচ্ছে। আড়ে আড়ে তাকাচ্ছে। দেশে যাবার জন্যে তার ছুটির দরকার না। তার ছুটির দরকার মীনা কুমারীর জন্যে। মীনা কুমারী চিঠি দিয়ে তাকে কোথায় যেন পাঠাবে। বজলু চায়ের কাপ মোফাজ্জল করিমের হাতে দিতে দিতে বলল, স্যার আপনের বিবেচনায় সবচে ‘ডেনচারাস’ খেলা কোনটা?

শব্দটা ডেনচারাস না, ডেনজারাস।

জি স্যার বুঝেছি। আগুনের বিবেচনায় কোনটা?

সেই ভাবে চিন্তা করিনি।

আমার বিবেচনায় আগুন খাওনের খেলা।

আগুন খাওয়ার খেলা আছে না-কি?

প্রথমেই ছিল আগুন খাওনের খেলা। প্রফেসার বাবুল আগুন খাইল দেখেন নাই?

মোফাজ্জল করিম প্রশ্নের জবাব না দিয়ে হঠাৎ করেই বললেন, কাল একবার খুঁজ নিয়ে আসিসতো মেয়েটার জ্বর কমল কি-না। কুহুরানী।

বজলু বলল, এখন যাই খবর নিয়া আসি।

এখন যাবি রাত হয়ে গেছে না?

বজলু বলল, কী বলেন রাইত হইছে। এরা কেউ দুইটা তিনটার আগে ঘুমায় না। আমি যাব আর খবর নিয়া চইল্যা আসব।

বজলু হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে গেল। রাতে আর ফিরল না। মোফাজ্জল করিম বারান্দায় রাখা ইজিচেয়ারে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। অপেক্ষা করতে করতেই ফজরের আজান শুনলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *