কুহুরানী – ৫

ফজরের আযান হচ্ছে।

মোফাজ্জল করিম নামাজের অজু করার আগে চা বানিয়ে এক কাপ চা খেলেন। ফজর ওয়াক্ত মাগরেবের ওয়াক্তের মতো না। এসেই হুট করে চলে যায় না। কিছু সময় পাওয়া যায়।

কুহুরানী মেয়েটা ঘুমুচ্ছে। এটা ভালো লক্ষণ। ঘুম ভালো হলে শরীর হুকুমের মধ্যে চলে আসবে। আল্লাহপাক ব্যবস্থা করে রেখেছেন ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষের শরীরের কলকব্জা ঠিক হতে থাকে।

মোফাজ্জল করিম ফজরের নামাজ পড়লেন। কোরান মজিদ পাঠ করলেন। সূরা আর রাহমান। ফাবিয়ায়ে আলা রাব্বিকুমা তুকাজজিবান। হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা আমার কোন কোন নিয়াত অস্বীকার করিবে?

ঘরের ভেতর খচমচ শব্দ হচ্ছে। মোফাজ্জল করিম কোরান পাঠ করলেন। সূরার মাঝখানে হঠাৎ পড়া বন্ধ। কাজটা ভুল হল। বেয়াদবি হল। তিনি ঠিক করলেন জোহরের ওয়াক্তেই আলাদা দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন।

মোফাজ্জল করিম যা ভেবেছেন তাই হয়েছে। কুহুর জ্বর কমেছে। সে উঠে বসেছে। চৌকি থেকে পা ঝুলিয়ে দিয়ে বসেছে। অবাক হয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। মোফাজ্জল করিম বললেন, কিছু খাবে? লেগেছে। পাউরুটি খাবে? পাউরুটি এনে দিই? চায়ে ভিজিয়ে খাও।

কুহু বলল, আমি পাউরুটি খাই না। আপনি কে?

আমি খায়রুন্নেসা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার।

আমাকে আপনার এখানে কে এনেছে?

তুমি নিজেই এসেছ। তোমার খুব জ্বর ছিল।

আপনার বাড়িতে আর লোকজন কোথায়? আপনার স্ত্রী কোথায়?

মোফাজ্জল করিম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। মেয়েটা কেমন ফড়ফড় করে কথা বলছে। ভাষাও খারাপ না। মোটামুটি শুদ্ধ ভাষা। অচেনা অজানা জায়গায় ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে। এতে সে যে ঘাবড়ে গেছে তা-না।

কুহুরানী বলল, আপনিতো বললেন না আপনার বাড়ির আর লোকজন কোথায়? আপনার স্ত্রী কোথায়?

আমার স্ত্রী মারা গেছে। এখানে আমি একাই থাকি। বজলু বলে একজন থাকে, সে ছুটিতে গেছে। তোমার শরীরটা কি এখন একটু ভালো লাগছে?

হুঁ। আপনি কি আমাকে রেলস্টেশনে পৌঁছে দেবেন?

কোথায় যাবে?

কুছ জবাব দিল না। তাকে দেখে মনে হল সে চিন্তা করে বের করার চেষ্টা করছে–কোথায় যাবে।

মোফাজ্জল করিম বললেন, কাল রাতে বলেছিলে তুমি পালিয়ে এসেছ। সত্যি পালিয়ে এসেছ?

কুহু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল একটু যেন হাসল।

কেন পালিয়েছ?

কুহু জবাব দিল না। আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল।

বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। টিনের চালায় বৃষ্টির শব্দ। কাত্যায়নীর বৃষ্টি। টানা তিনদিন চলবে। জানালা দিয়ে বাতাস আসছে। মেয়েটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। মোনাজ্জল করিম বললেন, তোমার কি আবার জ্বর আসছে?

কুহু বলল, জানি না। আসলে আসুক।

তুমি সিদ্ধান্ত যা-ই নাও, ভালোমতো চিন্তাভাবনা করে নাও।

আমি চিন্তাভাবনা করতে পারব না।

তোমার দেশের বাড়ি কোথায়?

পূর্বধলা। নেত্রকোনা জেলা।

সেখানে তোমার কে আছে?

কেউ নেই।

তোমার আত্মীয়স্বজন কে কোথায় আছে?

আমার কোনো আরীয়স্বজন নেই। এক ভাই ছিল, আট বছর বয়সে হারিয়ে গেছে। কোথায় আছে আমি জানি না।

কাল রাতে জয়নাল বলে একজনের নাম বলছিলে, সে কে?

আমার ওস্তাদ। তার কাছে আমি খেলা শিখেছি।

উনি কোথায়?

মারা গেছেন।

করে মারা গেছেন?

কুহু চাদর দিয়ে মাথা ঢেকে ফেলে চাদরের ভেতর থেকে বলল, আমি আর কথা বলতে পারব না।

মোফাজ্জল করিম বললেন, ঠিক আছে, তুমি শুয়ে থাক। বিশ্রাম নাও। আমি স্কুল থেকে ফিরে এসে চিন্তাভাবনা করে একটা সিদ্ধান্ত নেব।

কুহু বলল, আপনি কেন সিদ্ধান্ত নিবেন? আপনি সিদ্ধান্ত নেবার কে?

আচ্ছা ঠিক আছে তুমি ঘর থেকে বের হয়ো না।

আপনি বাইরে থেকে তালা দিয়ে যান।

কিছু খাবে? ঘরে চিড়া-মুড়ি আছে। এনে দিই?

না।

আমি স্কুলে বেশিক্ষণ থাকব না, হাজিরা দিয়ে চলে আসব।

কুহু জবাব দিল না। মনে হচ্ছে সে ঘুমিয়ে পড়েছে।

মোফাজ্জল করিম বললেন, এক কাপ লেবু চা খাবে? লেবু চা বলকারক। লেবুর মধ্যে আছে ভিটামিন সি। অসুখ বিসুখে ভিটামিন সি ভালো কাজ করে। এক কাপ লেবু চা বানায়ে দেব?

কুহু মুখের উপর থেকে চাদর ফেলে দিয়ে উঠে বসল। বিরক্ত গলায় বলল, আপনি এত কথা বলেন কেন?

মোফাজ্জল করিম হকচকিয়ে গেলেন। কুহু বলল, আপনার স্কুলে যাওয়ার কথা স্কুলে যান।

স্কুলতো এখন না। স্কুল শুরু হবে সকাল দশটায়।

আজ আগে আগে চলে যান।

মোফাজ্জল করিম বললেন, আমার মনে হয় তোমার জ্বর আবার আসছে। জ্বরটা দেখি।

তিনি কপালে হাত দেবার জন্য হাত বাড়ালেন। কুহু চট করে কপাল সরিয়ে নিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, মেয়েছেলের গায়ে হাত দিতে মজা লাগে? জ্বর দেখার নাম করে কপালে হাত। তারপর গলায় হাত। তারপরে বুকে হাত।

মোফাজ্জল পুরোপুরি হকচকিয়ে গেলেন। এই মেয়ে কী বলে? জ্বরের ঘোরে বলছে বলাই বাহুল্য। অসুস্থ একজন মানুষের উপর রাগ করা যায় না। মেয়েটার জ্বর যে খুব বেড়েছে এটা বোঝা যাচ্ছে। চোখ টকটকে লাল।

কুহু বলল, এখনো দাঁড়ায়ে আছেন কেন? বুকে হাত দিতে চান? ব্লাউজ খুলব?

হতভম্ব মোফাজ্জল করিম বানান্দার চলে গেলেন। দ্রুত ঘর থেকে বের হতে  গিয়ে দরজার চৌকাঠে ধাক্কা লেগে কপাল ফুলে গেল।

কুহু শুয়ে পড়ল। চাদর টেনে চাদরের ভেতর ঢুকে গেল।

বৃষ্টি বাড়ছে। বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসও দিচ্ছে। মোফাজ্জল করিম কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। আজ কি স্কুলে যাওয়াটা বাদ দেবেন? না-কি পাঁচ মিনিটের জন্য হাজিরা দিয়ে চলে আসবেন? ‘জোছনাকে’ এই অবস্থায় রেখে স্কুলে যাওয়া কি ঠিক হবে? মোফাজ্জল করিম হঠাৎ চমকে উঠলেন। জোছনাতো না। কুহুরানী। সার্কাসের মেয়ে।

টিনের চালায় ঠিকই শব্দ। শিলাবৃষ্টি না-কি!

.

মোহম্মদ ইয়াকুব সারা রাত জেগে কাটিয়েছে। এখন সকাল দশটা। ভোর থেকে চলছে বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি। ভালো বাতাসও দিচ্ছে। বাতাসে বড় তাঁবু হেলে পড়েছে। তাঁবু ঠিক করা যাচ্ছে না। আমগাছের একটা ডাল ভেঙে তাঁবুর ওপর পড়ে দড়িটড়ি ছিড়েছে।

ঝামেলা যখন আসে, একসঙ্গে আসে। হাতির বাচ্চা অসুস্থ। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করেছে। যেহেতু বাচ্চা অসুস্থ, মা-হাতি মাথাখারাপের মতো আচরণ করছে। কাউকে কাছে ভিড়তে দিচ্ছে না। মা-হাতির পা শিকল দিয়ে বাঁধা। সে পায়ের শিকল ছিঁড়তে চেষ্টা করছে। হাতির মাহুত চিন্তিত। দুর্বল শিকল। হাতি যদি মনস্থির করে শিকল ছিঁড়বে, তাহলে ছিঁড়বেই। বাচ্চার চিন্তায় অস্থির হাতি কী করে তার ঠিক নেই। বছর দুই আগে এই হাতিই খেপে গিয়ে একটা আট বছরের মেয়ে মেরে ফেলেছিল। বিরাট ঝামেলা হয়েছিল। ঝামেলা মেটাতে সত্তর-পঁচাত্তর হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। থানার স্টাফকেই দিতে হয়েছে পঁয়তাল্লিশ হাজার।

ইয়াকুবের ধারণা ছিল, কুহুর খোঁজ রাতের মধ্যেই বের করে ফেলবে। গায়ে জ্বর নিয়ে এই মেয়ের বেশি দূর যেতে পারার কথা না। তবে আগের বার যখন পালিয়েছিল, তখন গায়ে জ্বর নিয়েই পালিয়েছিল। দুই মাইল হেঁটে রেলস্টেশনে চলে গিয়েছিল। তাকে সেখান থেকে ধরে আনা হয়েছিল।

এখানকার ট্রেনস্টেশন ছয় কিলোমিটার দূরে। সেখানে লোক পাঠানো হয়েছে, তাকে পাওয়া যায়নি। বাসস্ট্যান্ড অবশ্য কাছে। এক কিলোমিটার। রাত ১২টার পর এখান থেকে বাস যায় না। সেখানেও খোঁজ করা হয়েছে। বাজারে তিনটা হোটেল আছে। এর মধ্যে একটাই চালু। হোটেলে সে ওঠে নি। খাল পার হলে শালবন। বনে-জঙ্গলে লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তারপরও লোক পাঠানো হয়েছে।

কুহুর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। এটাও বড় একটা সমস্যা। যার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তাকে খুঁজে বেড়ানো কাঠন। সে যে-কোনো জায়গায় যেতে পারে। পালিয়ে যাওয়ার কাজটা কুহু পরিকল্পনা করে করেছে বলেও মনে হচ্ছে না। কুহুর স্যুটকেস এবং ট্রাঙ্ক খোলা হয়েছে। ট্রাকে একজোড়া সোনার দুল এবং একটা চেইন পাওয়া গেছে। যে পালিয়ে যাবে সে দুল এবং চেইন ফেলে রেখে যাবে না। কোনো মেয়ে এই কাজ করবে না।

ইয়াকুব সকালে নাশতা খায় নি। কয়েক কাপ চা শুধু খেয়েছে। তবে একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছে। খালি পেটে অতিরিক্ত চা-সিগারেট খাওয়ায় বমি ভাব হচ্ছে।

যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে, রাতের শো বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই। একটা শো নষ্ট হওয়া মানে চার-পাঁচ হাজার টাকা নষ্ট। হাতির বাচ্চার জন্য পশু ডাক্তারকে খবর দেওয়া হয়েছে। সে কত টাকা চাইবে কে জানে!

ইয়াকুব হাতির বাচ্চার অবস্থা দেখার জন্য যখন উঠল, তখনই মনজু এসে দুইটা খবর দিল। প্রথম কবর নয়াপাড়া থানার ওসি সাহেব এসেছেন। দ্বিতীয় খবর-ফজর ওয়াক্তে একটা বোরকাপরা মেয়েকে মাছঘাটা থেকে নৌকায় উঠতে দেখা গেছে। মেয়েটার হাতে ছিল কাপড়ের পুঁটলি। মেয়েটার চেহারার বর্ণনা থেকে মনে হয় কুহু।

ইয়াকুব বলল, ওসি সাহেব, কেন এসেছেন? আমরা তো থানায় খবর দেই নাই। ওসি সাহেব আগেই উপস্থিত?

মজনু বলল, হাজি মফিজ ব্যাপারি খবর দিয়েছেন।

তাকে খবর দিতে কে বলেছে? উনার কী সমস্যা?

ইয়াকুব বিরক্ত মুখে ওসি সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গেল। থানা-পুলিশ ভালো জিনিস না। ট্রাকের পেছন থেকে একশ হাত দূরে থাকতে হয়। থানা পুলিশের কাছ থেকে কয়েক হাজার হাত দূরে থাকতে হয়।

আপনার নাম ইয়াকুব?

জি স্যার।

সার্কাস পার্টির ম্যানেজার?

জি।

আপনাদের একটা মেয়ে হারিয়ে গেছে, আপনি থানায় রিপোর্ট করেন নাই কেন? জেনারেল ডায়েরি করাবেন না?

জি, করার। অবশ্যই করাব। আপনারা তিন দিন না পার হলে মিসিং ধরেন না। মাত্র বারো ঘন্টা পার হয়েছে।

ওসি সাহেব বললেন, প্রায়ই রিপোর্ট হয় সার্কাস দলের এই মেয়ে মিসিং। যাত্রাদলে ওই মেয়ে মিসিং। কিছুদিন পর তাদের লাশ ভেসে ওঠে।

ইয়াকুব বলল, এইসব কী বলছেন স্যার?

যেটা সত্য সেটাই সত্য। আপনি আমার সঙ্গে থানায় চলুন।

কী জন্যে?

আপনার স্টেটমেন্ট নেব। আপনার সার্কাস দলের সবার স্টেটমেন্ট লাগবে। আচ্ছা, ভালো কথা, কালকের শোতে এমদাদ খন্দকার সাহেব ছিলেন?

স্যার, আমি নামে কাউকে চিনি না। এই অঞ্চলে প্রথম এসেছি। কে ছিলেন কে ছিলেন না সেটাতো আমার জানার কথা না। আমিতো রোল কল করি নাই।

ওসি সাহেব বললেন, অতিরিক্ত চালাক হবার চেষ্টা করবেন না। আমাদের কাছে পাকা খবর আছে অনেক রাত পর্যন্ত এমদাদ খন্দকার এবং তার ট্যান্ডল বরকত আপনার তাঁবুতে ছিল।

ও আচ্ছা, এখন মনে পড়েছে। দুইজন ছিলেন। তাদের নাম অবশ্য জানি না।

তারা যাওয়ার সময় কুহুরানী মেয়েটাকে বোরকা পরিয়ে সঙ্গে নিয়ে গেছে এটা কি সত্য?

জি না, এটা সত্য না।

ভালো করে মনে করেন। অনেক সময় দুশ্চিন্তায় স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়।

উনারা কাউকে সাথে করে নেন নাই। সার্কাসের মেয়ে উনারা নিবেন কেন?

আপনার মেয়েরা ভাড়া ঘাটে না?

এইসব কী বলেন?

যেটা সত্য সেটাই বলি। আপনিও দয়া করে সত্য বলবেন। এমদাদ খন্দকার টাকাওয়ালা লোক বলে ভয় পাবেন না। এমদাদ খন্দকারের নামে যদি জিডি এন্ট্রি করেন, তাহলে আপনার পিছনেও শক্ত লোক থাকবে। হাজি মফিজের নাম শুনেছেন?

জি না।

আপনি তো মনে হয় দুগ্ধপোষ্য শিশু। চলেন থানায় চলেন। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবেন। হাজার দশেক টাকা সঙ্গে দেন। থানার খরচ আছে।

ওসি সাহেব, চা খান, নাশতা খান।

নাশতা খাব না। চা খেতে পারি।

চা খেতে খেতেই ওসি সাহেব খন্দকার সাহেবের ট্যান্ডল বরকতকে অ্যারেস্ট করার জন্য কনস্টেবল পাঠালেন। খন্দকার সাহেবকে বাইরে রেখে তার ট্যান্ডল শায়েস্তা করা। ওসি সাহেবকে খুবই আনন্দিত মনে হলো।

.

আহারে কি বৃষ্টি কি বৃষ্টি। মাঝখানে বৃষ্টি কিছুক্ষণের জন্য থেমেছিল। আবার আকাশ মেঘে মেঘে ঢেকে গেছে। বৃষ্টি শুরু হয়েছে, ঝড়ো বাতাস দিচ্ছে। ভালো দুর্যোগ।

মোফাজ্জল করিম দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে উঁকি দিলেন, কুহু মেয়েটা ঘুমাচ্ছে। খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট আসছে। চাদরের নিচ থেকে মেয়েটার একটা পা বের হয়ে আছে। পায়ে আলতা দেয়া। এই ঘটনাও আশ্চর্যজনক। জোছনাও পায়ে আলতা দিত। আলতা দিলে না-কি পা ভালো থাকে।

একদিনের ঘটনা। তিনি উঠানে বসে পরীক্ষার খাতা দেখছেন। জোছনা এসে এসেছে পায়ের কাছে। হঠাৎ মনে হল জোছনা তার পায়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, কী কর? জোছনা বলল, কিছু করি না।

পায়ে সুড়সুড়ি দিও না।

জোছনা বলল, সুড়সুড়ি দেই না। আলতা দেই।

তিনি চমকে উঠে তাকিয়ে দেখলেন তাঁর বাম পায়ে জোছনা সুন্দর করে আলতা দিয়ে একটা টান দিয়ে দিয়েছে। তিনি প্রচণ্ড ধমক দিলেন, এইসব কী? এটা কেমন ফাজলামি?

সাবান দিয়ে অনেক ডলাডলির পরেও আলতা গেল না। তিনি কয়েক দিন স্কুলে গেলেন পায়ে মোজা পরে। মাওলানা বাসার জিজ্ঞেসও করলেন, গরমের মধ্যে পায়ে মোজা কেন?

আহারে কী সব দিন গিয়েছে। সেইসব দিন আবার ফিরে আসছে। অবিকল জোছনার মতো একটা মেয়ে আলতা পরা পা বের করে বিছানায় শুয়ে আছে।

মোফাজ্জল করিম কয়েকবার কাশলেন। কুহুরানী জেগে উঠল না। আলতা পরা পা একটুও নড়ল না। মেয়েটার জ্বর খুব কি বেড়েছে? মোফাজ্জল করিম সাবধানে ঘরে ঢুকলেন। জানালা বন্ধ করলেন। ঘর থেকে বের হয়ে দরজা ভিজিয়ে দিলেন। স্কুলের সময় হয়েছে। কিছুক্ষণের জন্যে হলেও তাঁর স্কুলে যাওয়া দরকার।

এই কিছু সময়ে কেউ নিশ্চয়ই তাঁর বাড়িতে আসবে না। বজলু আসতে পারে। সেই সম্ভাবনাও কম। আর যদি আসে আসবে। সার্কাসের ম্যানেজারকে এম্নিতেই খবর দেয়া দরকার। গুরুতর অসুস্থ একটা মেয়েকে তিনি নিশ্চয়ই একা একা পালিয়ে যেতে দেবেন না।

স্কুলে পা দিয়েই মোফাজ্জল করিম দপ্তরি নিয়ামতকে পাঠালেন স্টেশনে। সে স্টেশনঘরের টি স্টল থেকে পাউরুটি কিনবে, বাজার থেকে দুধ কিনবে, ফার্মেসী থেকে থার্মোমিটার কিনবে। জ্বর কমানোর অসুধ কিনবে। নিয়ামত সাইকেল নিয়ে গেছে, এখন ফিরছে না। মোফাজ্জল করিম অপেক্ষা করছেন। নিয়ামত ফিরলেই তিনি বাড়িতে যাবেন। মেয়েটা এতক্ষণ একা আছে। কী অবস্থায় আছে কে জানে? গিয়ে হয়তো দেখবেন মেয়েটা যে ভাবে এসেছিল সেই ভাবে চলে গেছে। ঘর শূন্য। এটা এক দিক দিয়ে ভালো।

মেয়েটার বিষয়ে কারো সঙ্গে আলাপ করতে পারলে হতো। হাসান আলী ছেলেটা বুদ্ধিমান, তার সঙ্গে কথা বলতে পারলে হতো। সে আজ স্কুলেই আসে নাই। সামান্য ঝড় বৃষ্টিতেই যদি শিক্ষকরা স্কুল কামাই শুরু করে তাহলে কীভাবে হবে।

মওলানা আবুল বাসার উঁকি দিলেন। সালাম দিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, খবর শুনেছেন?

কী খবর?

সার্কাসের মেয়েটার খবর। কুহুরানী নাম। এই যে দড়ির ওপর চোখ বন্ধ করে হাঁটে।

মোফাজ্জল করিম চমকে উঠে বললেন, তার কী খবর!

মেয়েটা মিসিং হয়ে গেছে।

ও আচ্ছা।

শুধু মিসিং না। ভেতরে ঘটনাও আছে।

কী ঘটনা?

যাওলানা গলা নানিয়ে বললেন, এমদাদ খন্দকার কাল রাতে মেয়েটাকে তার নতুন ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। বাজারের কাছে যে ঘর তুলেছে সেইখানে।

কেন?

বুঝতেই পারেন না কেন? আবার জিজ্ঞেস করেন! এরা ভাড়া খাটা মেয়ে। আপনি নিজেই তো দরখাস্তে লিখেছেন। লেখেন নাই?

ও আচ্ছা।

এমদাদ খন্দকারের ঘর থেকেই মেয়েটা মিসিং। পুলিশ তার জুতা পেয়েছে এমদাদ খন্দকারের ঘরের সামনে। বরকতকে পুলিশ আরেস্ট করেছে। কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে গেছে। থানায় নিয়ে হেভি মার দিবে। আসল কথা এখন বের হবে।

এমদাদ খন্দকার কোথায়?

সে বাড়িতেই আছে। পুলিশ এখন তাকে ধরবে না। সাক্ষি-সাবুদ জোগাড় করে ধরবে।

এইসব আলোচনা থাক। ভালো লাগা।

আপনার শরীর কি খারাপ।

সামান্য খারাপ। রাতে ঘুম হয় নাই।

আজ দুপুরে আমার সঙ্গে খানা খান।

না।

না কেন? বজলু চলে গেছে, রাঁধবে কে?

আমি দুপুরে কিছু খাই না আপনি জানেন।

তাহলে রাতে খান। বেগম সাহেবকে বলব খিচুড়ি করতে।

আমি রাতেও কিছু খাব না। নেয়ামতকে দুধ-পাউরুটি আনতে পাঠিয়েছি। আচ্ছা মাওলানা সাহেব, যে মেয়েটার কথা বললেন, কী যেন নাম?

কুহুরানী।

কুহুরানী মেয়েটার সঙ্গে আমার স্ত্রী জোছনার চেহারার মিল আছে না?

না তো। ভাবির মুখটা ছিল গোল। এই মেয়ের মুখ লম্বা। ভাবির নাক ছিল খাড়া। আর এই মেয়ের নাক চাপা।

ও আচ্ছা, ঠিকই। হুঁ, ঠিক।

মাওলানা আবুল বাসার বললেন, ভাবির মতো সতি-সাধ্বী মহিলার সঙ্গে এই ধরনের মেয়ের তুলনা করাও ঠিক না। আল্লাহ নারাজ হবেন।

হুঁ, ঠিক বলেছেন।

আধা নেংটা হয়ে দড়ির ওপর নাচানাচি। রাতে ভাড়া খাটা। চিন্তা করেছেন অবস্থা! ভয়াবহ না?

হুঁ।

সবই কেয়ামতের আলামত।

অবশ্যই, অবশ্যই।

মোফাজ্জল করিম ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন। নিয়ামতকে দেখা যাচ্ছে সাইকেলে করে আসছে। এক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল, আরেক হাতে ছাতা। এ ছাড়া হাতে কিছু নেই। পাউরুটি-দুধ কি পাওয়া যায় নি? এখন উপায়। মেয়েটা কি না খেয়ে থাকবে?

.

কুহুরানী কম্বল গায়ে জড়িয়ে চৌকিতে বসে আছে। সে হেলান দিয়ে আছে চৌকির পেছনে টিনের বেড়ায়। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ বলেই ঘর অন্ধকার। টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টি। কুহুরানীর কাছে মনে হচ্ছে সার্কাস পার্টির ব্যান্ড বাজছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খেলা শুরু হবে। হাতির বাচ্চা নিয়ে ‘জোকার’ ঢুকবে। জোকারের মাথায় লম্বা লাল টুপি। জোকার বলল, আপনারা কি আমার নাম জানতে চান? সবাই তালি দিচ্ছে। তুমুল শব্দ।

তালির শব্দ এবং টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ একাকার হয়ে যাচ্ছে।

কুহু দুধটা খাও। গরম দুধ। শরীরে বল পাবে।

বুড়ো একজন মানুষ দুধের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটাকে লাগছে জোকারের মতো। একটু আগে সে পাউরুটি-চা দিয়েছে। চিনামাটির বাটি ভর্তি চা এবং একটা পাউরুটি। ভীত গলায় বলেছে–চায়ে ভিজিয়ে পাউরুটিটা খাও, ভালো লাগবে। শরীরে বল পাবে।

চায়ে ভিজিয়ে পাউরুটির খানিকটা কুহু খেয়েছে। জোকারটাকে খুশি করার জন্যই খেয়েছে। এখন বমি বমি লাগছে। যে-কোনো মুহূর্তে সে বমি করে দেবে। যে বিছানায় সে শুয়ে ছিল সেই বিছানা নোংরা। বিড়ি-সিগারেটের তীব্র গন্ধ। সেই গন্ধ কুহুর সারা শরীরে লেগে আছে। গায়ের শাড়িটাতেও নোংরা কাদামাটি লেগে আছে। কুহুর শরীর ঘিনঘিন করছে। ঘামে ভেজা পুরুষদের সঙ্গে রাত কাটালে শরীর যেভাবে ঘিনঘিন করে সে রকম। কুহু বলল, আমি গোসল করব। শাড়িটা বদলাব। আপনি আমাকে একটা শাড়ি দিতে পারবেন?

জোকারটা মাথা নাড়ছে। এই মাথা নাড়ার অর্থ হ্যাঁ নাকি না, কুহু বুঝতে পারছে না।

আপনার কাছে সাবান আছে? সাবান দিয়ে গোসল করব।

আছে, সাবান আছে।

নতুন সাবান। আমি আগের সাবান ব্যবহার করি না।

নতুন সাবান আছে।

গরম পানি করে দেন। আমি গরম পানি দিয়ে গোসল করব।

জ্বরটা একটু দেখি। থার্মোমিটার আছে।

কুহু থার্মোমিটার মুখে দিয়ে বসে আছে। বুড়ো জোকার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। জোকারটাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে হতভম্ব হয়ে কুহুর দড়ি খেলা দেখছে। খেলা দেখে সে অবাক, বিস্মিত ও মুগ্ধ।

জ্বর এখনো আছে। একশ এক পয়েন্ট ফাইভ।

পানি গরম করেন।

আচ্ছা, আচ্ছা।

আমি এই বিছানায় শোব না। অন্য একটা বিছানা দেন। ধোয়া চাদর।

ঠিক আছে। ঠিক আছে। ব্যবস্থা করব।

লোকটার সঙ্গে অর্ডার দিয়ে কথা বলতে কুহুর মজা লাগছে। কুহুর মনে হচ্ছে, সে এটা সার্কাস দলের মালেকাইন। এই লোকটা তার ম্যানেজার। সে যা বলবে ম্যানেজার তা-ই শুনবে। মাথা নিচু করে ধমক খাবে।

আপনার নাম কী?

মোফাজ্জল করিম

এত বড় নাম। ছোট নাম নাই?

আমার ডাক নাম মধু। এই নামে কেউ এখন ডাকে না।

কেন ডাকে না? মধু নামটা তো সুন্দর।

লোকটাকে খুবই বিব্রত মনে হচ্ছে। বিব্রত, লজ্জিত এবং অসহায়। কুহুর মজা লাগছে। তার সার্কাস দলের জন্য এ রকম একজন ম্যানেজারই দরকার। সার্কাস দলের নাম হবে-কুহুরানী সার্কাস পার্টি। মধু ম্যানেজার। ম্যানেজারের ভয়ে সবাই অস্থির থাকবে। শুধু তার কাছে ম্যানেজার থাকবে কাঁচুমাচু অবস্থায়। সে ম্যানেজারকে ডাকবে মধু বাবু।

জোছনা, গোসল এখন করবে?

কুহু অবাক হয়ে তাকাল। ম্যানেজার মধু বাবু তাকে জোছনা ডাকছে কেন? বহু বলল, জোছনা কে? আমাকে জোছনা ডাকলেন কেন?

ভুলক্রমে ডেকেছি। কিছু মনে নিয়ো না।

জোছনা কে?

আমার স্ত্রীর নাম জোছনা। সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা গেছে। তার একটা ছেলে হয়েছিল। ছেলের নাম মারুফুল করিম। বাড়ির পেছনে তাদের কবর আছে। তুমি তাদের কবরের কাছে বসে ছিলে।

গোসল কোথায় করব? গোসলখানা আছে?

না।

সাবান আর শাড়ি আনেন। শাড়ি আপনার স্ত্রীর?

হ্যাঁ। ধোয়া শাড়ি। ধুয়ে আলমারিতে তোলা আছে।

কুহু ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার জ্বরটা একটু দেখে দিন। থার্মোমিটার দিয়ে না। কপালে হাত দিয়ে।

মোফাজ্জল করিম কপালে হাত দিলেন। ক্ষীণ গলার বললেন, জ্বর সামান্য বেড়েছে। গোসল করা ঠিক হবে না।

কুহু বলল, ঠিক হোক না হোক আমি গোসল করব। আপনি শাড়ি নিয়ে আসুন। আপনার স্ত্রীর কয়টা শাড়ি?

সাত-আটটা আছে।

সব কয়টা নিয়ে আসুন। আমি পছন্দ করে পরব।

আচ্ছা।

আপনার স্ত্রী কি আপনাকে মধু বাবু ডাকাত!

না।

সে কী ডাকত?

লীলার বাবা ডাকত।

লীলাটা কে?

কেউ না। তার ধারণা ছিল প্রথম সন্তানটা হবে মেয়ে। সে তার নাম রাখবে লীলা। এ জন্যই আমাকে লীলার বাবা ডাকত।

ঘরে কি আপনার স্ত্রীর কোনো ছবি আছে?

আছে। সে যখন ক্লাস নাইনে পড়ত তখন স্টুডিওতে ছবি তুলেছিল।

ছবি নিয়ে আসুন। আমি ছবি দেখব।

মোফাজ্জল করিম ফ্রেমে বাঁধা ছবি নিয়ে এলেন।

কুহু আগ্রহ করে ছবি দেখছে। চুলে বেণি বাঁধা বাচ্চা একটা মেয়ে চেয়ারে বসে আছে। পাশে লম্বা টুলের ওপর ফুলদানি। ফুলদানি ভর্তি গোলাপ ফুল।

কুহু বলল, আপনার স্ত্রী খুব সুন্দর।

মোফাজ্জল করিম আগ্রহের সঙ্গে বললেন, তোমার সঙ্গে মিল আছে না?

কুহু বলল, মিল নাই। মিলটা আপনার চোখে। আপনার স্ত্রীর পাউরুটি খুব পছন্দ ছিল। ঠিক না?

হ্যাঁ, ঠিক।

দেখেছেন আমার কত বুদ্ধি। আপনার স্ত্রীর কি খুব বুদ্ধি ছিল?

হ্যাঁ। সে পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। এসএসসিতে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিল। দুইটা লেটার ছিল, জেনারেল অঙ্ক আর কেমিস্ট্রি। ইংরেজি খারাপ করেছিল। ফার্স্ট পেপারে ৪৮ সেকেন্ড পেপারে আরো কম ৪৩, বিবাহের পর পড়াশোনা হয় নাই। পেটে সন্তান এসে গেল। সংসারের চাপ। তবে ইংরেজির চর্চাটা বজায় রেখেছিল। আমি বলে দিয়েছিলাম প্রতিদিন যেন দুইটা নতুন ইংরেজি শব্দ শিখে। যেদিন সে মারা গিয়েছিল সেদিনও সে দুইটা নতুন শব্দ শিখেছে। একটা হলো Murphy, গোল আলু। Noun। আরেকটা শব্দ হলো Musk, এটাও Noun। এর অর্থ মৃগনাভি। মৃগনাভি চেন?

কুহু না সূচক মাথা নাড়ল। সে এখন অবাক হয়ে ম্যানেজার মধু বাবুর দিকে তাকিয়ে আছে।

লোকটা আপন মনে কথা বলেই যাচ্ছে।

সম্রাট হুমায়ুনের প্রথম সন্তানের নাম আকবর। আকবরের জন্মের সময় সম্রাট পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। একদিকে তার পেছনে ধাওয়া করছে শের শাহ। আরেক দিকে তার নিজের ছোট ভাই মীর্জা কামরান। এ অবস্থায় তিনি সংবাদ পেলেন তার সন্তান হয়েছে। তখন তার সঙ্গে কিছুই নেই। শুধু একটা মৃগনাভি। তিনি তখন একটা চিনামাটির পাত্রে মৃগনাভিটা রেখে চাকু দিয়ে অনেকগুলো ভাগ করলেন। সবাইকে এক টুকরা করে দিয়ে বললেন, আপনার দোয়া করবেন যেন মৃগনাভির সুবাসের মতো আমার পুত্রের যশের সুবাস সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। তাই হয়েছিল। এখন বলো তো, মৃগনাভির ইংরেজি কী? একটু আগে বলেছিলাম।

কুহুরানী বলল, বলতে পারব না।

Musk। মৃগনাভির ইংরেজি Musk। আর গোল আলুর ইংরেজি Murphy । এক সময় Murphy রেডিও নামের একটা রেডিও ছিল। সুন্দর সাউন্ড…

লোকটা কথা বলেই যাচ্ছে। কুহুর মায়া লাগছে। তার কাছে মনে হচ্ছে অনেক দিন পর এই বেচারা কথা বলার একজন মানুষ পেয়েছে। আহারে আহারে!

.

বৃষ্টিতে ছোটাছুটি করার কারণে বজলুর জামা-কাপড় সব ভেজা। সে বাড়িতে এসেছে শুকনা কাপড় নিতে। সে ঠিক করে রেখেছিল নিঃশব্দে আসবে, নিঃশব্দে চলে যাবে। কাকপক্ষীও বুঝতে পারবে না। হেড স্যার দেখে ফেললে বিরাট সমস্যা হবে। থেকে যেতে হবে। সার্কাসের দলে এখন যে কাণ্ডকারখানা হচ্ছে তার মজা ফেলে বাড়িতে বসে থাকার কোনো মানে হয় না।

মীনা কুমারীর সঙ্গে তার আলাদা খাতিরও হয়েছে। বলার মতো কিছু না তারপরেও হয়েছে। মীনাকুমারী এখন তাকে ডাকে ‘বদবু’। বজলুর বদলে বদবু। খাতির করে বলেই ডাকে। খাতির আরেকটু বাড়লেই সে মীনাকুমারীর পিঠে সাবান ডলতে পারবে। যে-কোনোদিন এই ঘটনা ঘটে যাবে। কে জানে আজই ঘটতে পারে। আজ সোমবার। তার জীবনে ভালো ভালো ঘটনা সোমবারে ঘটেছে।

সার্কাস দলের ম্যাজিশিয়ান প্রফেসর বাবুলের সঙ্গে শুরুতে তার কিছু গণ্ডগোল ছিল। সেই গণ্ডগোলেরও সমাধান হয়েছে। এখন বজলুর ধারণা প্রফেসর বাবুল একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক। মেজাজ চড়া তবে বিশিষ্ট ভদ্রলোক। বিশিষ্ট ভদ্রলোকদের চড়া মেজাজ হয় এটা পরীক্ষিত। হেডমাস্টার সাহেবের মেজাজ যেমন চড়া। উনি যে বিশিষ্ট ভদ্রলোক এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই।

হেডমাস্টার সাহেবকে ছেড়ে সার্কাসদলের সঙ্গে চলে যেতে বজলুর খুবই খারাপ লাগবে। কিন্তু উপায় কী? সব মানুষের নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে হয়। বজলুর ভবিষ্যৎ সার্কাসের দলের সঙ্গে। ম্যাজিশিয়ান প্রফেসর বাবুল আশা দিয়েছেন একটা ব্যবস্থা করবেন। তবে এটাও বলেছেন সব কিছু ম্যানেজার ইয়াকুবের হাতে। উনি যদি বলেন, ‘না’। তাহলে আর কিছু করার নাই।

এখন সমস্যা একটাই- ম্যানেজার মোহম্মদ ইয়াকুব। নানান চেষ্টা চরিত্র করেও বজলু ম্যানেজার সাহেবের মন ভিজাতে পারছে না। এই লোকটা তাকে দেখলেই কোনো কারণ ছাড়া রাগ করে।

গতরাতে এই মানুষটাকে খুশি করার জন্য সে দৌড়ে কুহুরানীর খবর দিল। লোকটা খুশিও হল। কুহুরানীকে শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল না এই দোষতো তার না। সে তার চেষ্টা করেছে। চেষ্টায় ফল হয় নাই। তার জন্যে এত লোকের মাঝখানে তাকে দশবার কানে ধরে উঠবোস করাবেন। কানে ধরে দশবার উঠবোস তার জন্যে কোনো ব্যাপার না। সে একশবার উঠবোস করতে পারবে। তার কিছুই হবে না। অপমানটা বড়। উঠবোস বড় না। তবে দুঃখের ব্যাপার হল, সে যখন উঠবোস করছিল তখন মীনাকুমারী মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ছিল। বজলুর মনটা খুবই খারাপ হয়েছে। সে নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিয়েছে যে মেয়েদেরকে আল্লাহপাক এইভাবেই তৈরি করেছেন। যেখানে মজা পাওয়ার কিছু নাই সেখানে তারা মজা বেশি পায়। মেয়েদের এইসব দুর্বলত পুরুষ মানুষদের ধরতে নাই। সব ধরলে সংসার চলে না।

বজলু দাঁড়িয়ে আছে কাঁঠাল গাছের নিচে। হেডমাস্টার সাহেবের ঘরের দরজা খোলা। হেডমাস্টার সাহেবের ঘরের দরজা বন্ধ। এই সুযোগ। সে যাবে। হাতের কাছে শুকনা কাপড় যা পায় নিয়ে চলে আসবে। এক মিনিটের মামলা। বজলু সাবধানে এগুলো। বৃষ্টির কারণে সব পিছল হয়ে আছে। আছাড় খেয়ে পড়লে হেডমাস্টার সাহেব কে কে বলে বের হয়ে আসবেন। সে পড়বে মহা বিপদে।

বজলু ঘরে ঢুকলো। কাপড় নিল। বারান্দায় হেডমাস্টার সাহেবের ছাতা ঝুলছিল। ছাতাটা নিল। এক সময় ফিরত দিয়ে গেলেই হবে। চলে যাবার মুহূর্তে সে কি মনে করে হেডমাস্টার সাহেব কী করছেন দেখার জন্যে বেড়ার ফুটায় চোখ রাখল।

কুহুরানী হেডমাস্টার সাহেবের খাটের এক কোনায় নতুন বউদের মতো বসা। কুহুরানীর সামনে কাঠের চেয়ারে হেডমাস্টার সাহেব। হেডমাস্টার সাহেবের মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কুহুরানীকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

বজলু নিঃশব্দে উঠানে নামল। কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে থেকে সার্কাসের দিকে দৌড় দিল। রাস্তা অসম্ভব পিছল, তাতে কী?

.

কুহুরানীর গায়ে হালকা সবুজ রঙের একটা শাড়ি। এই শাড়িটাই তার পছন্দ হয়েছে। মোফাজ্জল করিম কুহুরানীর কাঁধে তার কাশ্মীরি শালটা ভাঁজ করে দিয়ে রেখেছেন। তারপরও কুহুরানী শীতে কাঁপছে। কিছুক্ষণ আগেই গোসল করার কারণে কুছর গায়ের জ্বর এখন কম। একটু আগে থার্মোমিটারে জ্বর মাপা হয়েছে।

একশ’ পয়েন্ট ফাইভ।

মোফাজ্জল করিম তাকে দুধ-পাউরুটি খেতে দিয়েছেন। কুহুরানী দুধে পাউরুটি ভিজিয়ে খেয়েছে।

মোফাজ্জল করিমের মনে হলো, গোসল করার পরপর মেয়েটার বয়স অনেকখানি কমে গেছে। তাকে লাগছে বালিকার মতো। জোছনা যে বয়সে বিয়ে করে এই বাড়িতে উঠল-সেই বয়স।

মোফাজ্জল করিম বললেন, ম্যাজিক দেখবে?

কুহুরানী বিস্মিত হয়ে বলল, কী ম্যাজিক?

আমি একটা ম্যাজিক জানি, হাসান আলীর কাছে শিখেছি। হাসান আলী আমাদের স্কুলের বিএসসি শিক্ষক। রুমাল দিয়ে পয়সার একটা ম্যাজিক দেখবে?

দেখব।

সব সময় পারি না। মাঝে মাঝে গণ্ডগোল হয়ে যায়। পামিং এর খেলাতো। জটিল খেলা।

এবারে গণ্ডগোল হলো না। মোফাজ্জল করিস সুন্দর করে ম্যাজিকটা দেখালেন।

কুহুরানী বলল, বাহ্!

মোফাজ্জল করিম বললেন, জোছনাকে দেখালে সে খুব খুশি হতো। এসব জিনিস সে খুব পছন্দ করত। তখন ম্যাজিক জানতাম না। দেখি, হাসানের কাছ থেকে আরো দুয়েকটা খেলা শেখা যায় কি না। সে নিশ্চয়ই আরো খেলা জানে।

কুহুরানী বলল, কাঁদছেন কেন?

জানি না কেন? মাঝে মাঝে মনটা বড়ই উদাস হয়, তখন আপনা-আপনি চোখ দিয়ে পানি পড়ে। একবার অনাদের স্কুলে ইন্সপেকশনে এসেছেন ডিস্ট্রিক এডুকেশন অফিসার। তার নাম সুলতান। খুব পড়াশোনা জানা মানুষ। তিনি একেকটা ক্লাসে ঢুকছেন। ছাত্রদের প্রশ্ন করছেন। আমি তার সঙ্গে আছি, হঠাৎ মনটা উদাস হলো। চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করল। সুলতান সাহেব বললেন, কী হলো মাস্টার সাব চোখে পানি কেন?

আপনি কী বললেন?

আমি একটা মিথ্যা কথা বললাম। পরে অবশ্য ওনার কাছে সতাটা স্বীকার করেছি।

আপনি মিথ্যা কথা বলেন না?

না। তারপরও দু-একটা মিথ্যা বলা হয়ে যায়। আল্লাহপাকের কাছে তখন ক্ষমা চাই।

আমি কোনো প্রশ্ন করলে আপনি কি সত্য কথা বলবেন?

অবশ্যই বলব।

কুহু বলল, আমাকে আপনার খুবই মনে ধরেছে, তাই না? আপনার কাছে মনে হচ্ছে আমি আপনার বউ। আমার নাম জোছনা রানী। ঠিক না।

মোফাজ্জল করিম বিব্রত গলায় বললেন, তার নামের পেছনে রানী ছিল না। না থাকলেও আপনি নিশ্চয়ই কখনো না কখনো তাকে জোছনা রানী ডেকেছেন। ঠিক না?

হ্যাঁ, ঠিক।

আমার কিন্তু আপনার স্ত্রীর মতোই বুদ্ধি। ইংরেজিও মনে আছে। মৃগনাভির ইংরেজি মার্ফি। হয়েছে না?

হয় নাই। মৃগনাভির ইংরেজি musk. m, u, s, k… আর মার্ফি হলো গোল আলু।

এখন থেকে ভুলব না। সারাজীবন মনে থাকবে। আচ্ছা শুনুন, সত্যি কথা বলবেন কিন্তু। আপনার আমাকে বিয়ে করতে ইচ্ছে করছে?

মোফাজ্জল করিম চুপ রইলেন। কুহুরানী বলল, হ্যাঁ বা না বলুন। মোফাজ্জল করিম কিছুই বললেন না।

কুহু বলল, আপনার সাহস থাকলে আমি কিন্তু রাজি আছি। আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নাই। আমার যাওয়ার জায়গা দরকার। লোকে অবশ্য আপনাকে মন্দ বলবে। আপনার গায়ে থুতু দেবে। থুতু দেবে না?

মোফাজ্জল করিম মাথা নিচু করে বাস থাকলেন। এখন সব কিছুই তাঁর কাছে অন্য রকম লাগছে। মনে হচ্ছে যে মেয়েটা কথা বলছে সে কুহুরানী না, জোছনা। অনেকদিন বাপের বাড়িতে ছিল, আজ বেড়াতে এসেছে। কুহু বলল, চলুন অনেক দূরে কোনোখানে চলে যাই। আমরা একটা দল করব। সার্কাসের দল। কুহুরানী সার্কাস পার্টি। আপনি হবেন দলের ম্যানেজার। মধু বাবু। মধু বাবু দেখুন তো জ্বর বাড়ছে কি না।

মোফাজ্জল করিম জ্বর দেখলেন। জ্বর বাড়ছে। হুহু করে বাড়ছে। মোফাজ্জল করিম বললেন, শুয়ে থাকে।

কুহুরানী বাধ্য মেয়ের মতো শুয়ে পড়ল। মোফাজ্জল করিম তার গায়ে লেপ দিয়ে দিলেন। কুহুরানী সঙ্গে সঙ্গেই চোখ বন্ধ করল। সে চোখ মেলল সন্ধ্যায়। ঘর অন্ধকার। টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টি হচ্ছে। মোফাজ্জল করিম আগের জায়গাতেই বসে আছেন।

.

বজলু একটা বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধানে ব্যস্ত। গোপন কথা কোথায় থাকে? পেটে না বুকে? লোকে প্রায়ই বলে ‘পেটে কথা থাকে না।’ তাদের বলাবলিতে মনে হয় গোপন কথা থাকে পেটে। কিন্তু এখন বজলুর ধারণা গোপন কথা থাকে বুকে। কারণ তার বুক ফুলে ফুলে উঠছে। এবং সামান্য ব্যথাও করছে।

সে যে-কোনো মুহূর্তে সার্কাসের ম্যানেজার মোহম্মদ ইয়াকুবকে কুহুরানীর সংবাদ দিয়ে নিজের অবস্থান ঠিকঠাক করে ফেলতে পারে। কিন্তু এখন ইচ্ছা করছে না। খবরতো তার কাছে আছেই। এক সময় দেয়া হবে। কুহুরানীকে নিয়ে যে হৈচৈ হচ্ছে এটা দেখতেও মজা লাগছে। বজলু উদাস ভঙ্গিতে হাঁটাহাঁটি করছে। কিছুক্ষণ হাতি দেখল, তারপর উঁকি ছিল মীনাকুমারীর ঘরে। মীনা কুমারী মাথায় জবজবে তেল দিয়ে বসে আছে। আজ রাতে শো হবে না। কাজেই আরাম করা হচ্ছে। তাদের দলের একটা মেয়ে পাওয়া যাচ্ছে না এই নিয়ে কোনো রকম দুঃশ্চিন্তা নেই। বজলুকে দেখে মীনাকুমারী বলল, এই বদবু কী চাস?

বজলু বলল, কিছু চাই না।

কুহুরানীর কোনো সন্ধান কেউ পাইছে?

জানি না।

তাইলে জানস কী রে বোধাই চন্দ্র!

বজলুর মনটা খারাপ হচ্ছে। প্রথম দিকে এরা সবাই তাকে তুমি তুমি করে বলতো এখন তুই তোকারি করছে। একদিক দিয়ে অবশ্যি এটাও খারাপ না। অতি আপনা লোকটা সাথে তুই তুই করে।

মীনাকুমারী গলা নিচু করে বলল, যে দিন শো হয় না সেদিন শইল ছাইড়া দেয়। আমার শ‍ইল দিছে ছাইড়া। পায়ে তেল মালিশ করা প্রয়োজন। তুই পায়ে তেল দিতে পারবি?

বজলু চাপা গলায় বলল, পারব।

শরম লাগব না? মেয়েছেলের ঠ্যাং-এ হাত দিবি?

বজলু চুপ করে রইল। মীনাকুমারী বলল, কিরে কথা কস না ক্যান? যা তেল গরম কইরা আন। রসুন দিয়া তেল গরম করবি। ঠিক আছে?

জ্বে ঠিক আছে।

বজলু রসুন দিয়ে তেল গরম করল এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল তেল ডলাডলির সময়ই সে গোপন কথাটা মীনা কুমারীকে জানাবে। এত বড় একটা সংবাদ আগে দিতে হয় আপনা লোককে।

বজলু তেলের বাটি নিয়ে এসে দেখে মীনাকুমারী দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে। বজলু চাপা গলায় কয়েকবার ডাকল। মীনা কুমারী বলল, যা ভাগ বদের বাচ্চা। সাহস কত শ‍ইল্যে তেল মাখাইতে চায়।

তেলের বাটি হাতে মীনা কুমারীর ঘরের সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না। কে কী ভেবে বসবে। বজলু যেতেও পারছে না। কিছুই বলা যায় না মীনাকুমারী হয়তো ডেকে বসবে বদবু। বদবু! তখন যদি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না পায় রেগে যেতে পারে। সার্কাসের মেয়েদের মেজাজ সব সময় দড়ির উপর লাফালাফি করে। মেজাজ এই ঠিক এই বেঠিক।

হ্যালো বজলু মিয়া!

বজলু চমকে তাকালো। প্রফেসর বাবুল।

কী কর?

কিছু করি না স্যার।

হাতে কী?

তেলের বাটি।

রসুনের গন্ধ পাচ্ছি। রসুন মিশ্রিত তেল?

জি স্যার।

নিয়ে আস। আমার পিঠে মালিশ করে দাও। ঠাণ্ডা লেগেছে। রসুন-তেল ঠাণ্ডার মহৌষধ।

প্রফেসর বাবুল ডাকে তুই তুই করে বলছেন না এতেই বজলু খুশি। সে বাটি নিয়ে প্রফেসর বাবুলের পেছনে রওনা হল। সার্কাস দলের কাউকে সে বেজার করতে পারবে না। সবাইকে খুশি রাখতে হবে।

প্রফেসর বাবুল খালি গায়ে বেতের মোড়ায় বসে আছেন। বজলু মহানন্দে তাঁর পিঠে তেল ঘষছে। আরামে প্রফেসর বাবুলের চোখ বন্ধ হয়ে আসে। বজলু গলা নামিয়ে বলল, আমার কাছে একটা খবর আছে স্যার।

প্রফেসর বাবুল বললেন, মাত্র একটা খবর? আমার কাছে আছে দশটা।

খবরটা জটিল।

দুনিয়ার সব খবরই জটিল। কথা বন্ধ। কাজ করে যাও। তোমার উপর আমি সন্তুষ্ট। যখন চলে যাব তোমাকে দড়ি কাটার একটা খেলা শিখিয়ে দিয়ে যাব। এক খেলা দেখিয়ে জীবন পার করে দিতে পারবে।

বজলু লজ্জিত গলায় বলল, আমিও স্যার আপনাদের সাথে যাব। আগে একবার আপনারে বলেছি।

আগে বলেছিলে?

ভুলে গেছি। এখন মনে পড়েছে। অবশ্যই আমাদের সাথে যাবে। সার্কাস দলের সঙ্গে থাকার মজাই আলাদা। সময়মতো সার্কাসের কোনো এক মেয়েকে বিয়ে করে ফেলবে। সার্কাসের মেয়ে বিয়ে করতে আপত্তি আছে?

আপত্তি নাই স্যার।

শুভ ভেরি গুড। মাথা মালিশ করতে জান?

জানি।

বলো কী। তুমিতো দেখি ওস্তাদ লোক। গায়ে তেল মাখা শেষ হলে আমি বিছানায় শুয়ে পড়ব, তুমি মাথা মালিশ করে দিবে। ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত মালিশ চলবে।

জি আচ্ছা।

কথা একেবারেই বলবে না। নিজের কথা ছাড়া অন্যের কথা শুনতে আমার ভালো লাগে না। যারা জাদু দেখায় তাদের এই এক সমস্যা। বুঝেছ?

জি স্যার বুঝেছি।

এইতো আবার কথা বললা। যদি বুঝে থাক তাহলে মাথা নাড়বা। মুখে বলার প্রয়োজন নাই।

একটা জটিল খবর ছিল স্যার।

আবার কথা বলে?

বজলু চুপ করে গেলে। বুঝাই যাচ্ছে প্রফেসর সাহেবকে কিছু বলে লাভ নেই। তাকে সরাসরি ম্যানেজার ইয়াকুব সাহেবের সঙ্গেই কথা বলতে হবে। আল্লাহপাকের ইচ্ছাও মনে হয় তাই। সে দুইবার দুইজনকে বলার চেষ্টা করেছে। কেউ শুনে নাই। ইয়াকুব সাহেব অবশ্যই শুনবেন।

মোহম্মদ ইয়াকুব শান্ত মুখে বসে আছেন। মনজু তাকে এক কাপ চা এনে দিয়েছে। তিনি চায়ে একবার মাত্র চুমুক দিয়েছেন। তাঁর হাতে সিগারেট আছে, তিনি সিগারেট ধরাচ্ছেন না। তাঁর সামনে বাসস্ট্যান্ডের সামনে যে চায়ের দোকান সেই দোকানের এক ছেলে কুহুরানীর খবর নিয়ে এসেছে। পাকা খবর। বখশিস ছাড়া এই খবর সে দিবে না।

ইয়াকুব ঠাণ্ডা গলায় বললেন, তোমার নাম কী?

কালাম।

কালাম! তুমি বখশিস কত চাও?

এক হাজার টাকা চাই স্যার।

ঠিকই আছে। এক হাজার টাকা তেমন বেশি কিছু না। দিব তোমাকে এক হাজার টাকা, এখন খবর বলো।

আগে টেকা তারপরে খবর।

এইটাও মন্দ না। ফেল কড়ি মাথ তেল। তুমি জান কুহু কোথায়?

জি।

কোনো এক বাড়িতে সে লুকায়ে আছে?

সেইটা আমি এখন বলব না।

ঠিক আছে তুমি অপেক্ষা কর। চা বিসকুট খাও। ওসি সাহেব সকালবেলা একবার এসেছিলেন। এখন আবার এসেছেন। কুহুরানীকে নিয়ে তদন্ত চলতেছে। তুমি যা জান উনাকে বলবা। কুহুরানীকে যদি পাওয়া যায়, তোমাকে এক হাজার টাকা দিব।

ওসি সাহেবরে আমি কিছু বলব না।

ওসি সাহেব যদি কিছু জানতে চান আর তুমি যদি না বলো তার ফলতো ভালো হবে না। হাজতে এক দুই রাত থেকেছ? মনে হয় থাক নাই। থেকে দেখ কেমন লাগে।

কালাম হড়বড় করে বলল, স্যার আমি কুহুরানীরে দেখেছি বাসে উঠতে। বাসে উঠার আগে আমারার স্টলে এক কাপ চা খেয়েছেন।

তুমি তাকে আগে কখনো দেখেছ?

জি না স্যার।

তাহলে চিনেছ কীভাবে সে কুহুরানী?

অনুমানে চিনেছি।

শোন কালাম বদমায়েশি করতে বুদ্ধি লাগে। সহজ বুদ্ধি না, জটিল বুদ্ধি। তুমি দুনিয়ার বেকুব। তুমি আসছ আমার সাথে বদমায়েশি করতে?

কালাম বিড়বিড় করে বলল, স্যার ভুল হয়েছে। মাফ করে দেন।

ইয়াকুর সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, ঠিক আছে নিয়ম মতো মাফ চাও। ঘরের বাইরে যাও। মাগরের ওয়াক্ত না হওয়া পর্যন্ত কানে ধরে উঠবোস করবা। মাগরেবের আজান হবে, তুমি অজু করে নামাজ পড়বে। আল্লাহর কাছে মাফ চাইবা। এ ছাড়া তোমাকে ছাড়ব না। হাতি দেখেছ না? হাতির পারা খাইছ? তোমারে হাতি দিয়ে পারা দেওয়ার।

বজলু প্রফেসর বাবুলকে মাথা মালিশ করে ঘুম পাড়িয়ে বাইরের এসে দেখে একজন কানে ধরে উঠবোস করছে। তার অপরাধ সে রানী কোথায় আছে সেই গোপন খবর নিয়ে এসেছিল। বজলু হকচকিয়ে গেল।

.

নয়াপাড়া থানার ওসি মুনীর আহমেদ নিজেও হকচকিয়ে গেছেন। সার্কাস পার্টির একটা মেয়ে পাওয়া যাচ্ছে না এটা এমন কোনো ঘটনা না। ষোল কোটি মানুষের দেশে এক লাখ মানুষ সব সময় মিসিং থাকবে। এটা কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু বিষয়টা নিয়ে একটু বেশি চাপচাপি হয়ে গেছে। কাজটা ভুল হয়েছে। কত বড় ভুল তা এখনো ধরতে পারেন নি। এই থানায় তিনি নতুন এসেছেন। অঞ্চলের ভাব ধরতে পারেন নি। থানার অন্য অফিসাররাও অঞ্চলের ভাব বুঝতে তাঁকে সাহায্য করে নি। কাকের মাংস কাকে খায় না। পুলিশের মাংস পুলিশে শুধু যে যায় তা-না, আরাম করে খায়।

বরকত নামের মানুষটাকে অ্যারেস্ট করে আনা বিরাট বড় বোকামি হয়েছে। টেলিফোনের পর টেলিফোন আসা শুরু হয়েছে। টাকা খন্দকার নামের একটা হাড়গিলা টাইপ লোকের এত ক্ষমতা তাঁর ধারণাতেও ছিল না।

কিছুক্ষণ আগে বরকতকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বরকত বলেছে, স্যার আমিতো হেঁটে যেতে পারব না। বৃষ্টি হয়েছে রাস্তাঘাট পিছল। হেঁটে গেলে আমার মান থাকে না।

ওসি সাহেব বললেন, কীভাবে যেতে চাও?

বরকত উদাস গলায় বলল, স্যার আমার জন্যে পালকির ব্যবস্থা করেন। পুলিশ প্রথমে ভুল করে ধরেছে তারপর পালকি করে ফেরত পাঠিয়েছে। এই ঘটনা ঘটলে আমার ইজ্জত থাকে। খোন্দকার সাহেবের ইজ্জত থাকে।

এইসব কী বলেন?

বরকত বলল, আমরা মূর্খ। মূর্খের মত কথা বলি। আপনারা থানাওয়ালা আপনারা কাজ করবেন জ্ঞানীর মতো।

ওসি সাহেব নরম গলায় বললেন, আমাদের সামান্য ভুল হয়েছে, তাই বলে এমন কথা বলবেন? বিবেচনা করে কথা বলেন।

বরকত বলল, আচ্ছা ঠিক আছে বিবেচনা করে কথা বলি, সার্কাসের দলের সাথে হাতি আছে। হাতি নিয়ে আসেন। হাতিতে চড়ে যাই।

হাতিতে চড়ে যাবেন?

ওসি সাহেব! ইজ্জতের একটা ব্যাপার আছে না? মানুষ থাকে না, তার ইজ্জত থাকে। মাগরেবের ওয়াক্ত হয়েছে কি-না দেখেন। নামাজ পড়তে হবে। জায়নামাজ দিতে বলেন।

.

মোফাজ্জল করিম সাহেবের ঘর অন্ধকার। তিনি বারান্দায় নামাজের জলচৌকিতে নামাজ শেষ করে ঘরে ঢুকতেই কুহু বলল, বাতি জ্বালাবেন না, ঘর অন্ধকার।

মোফাজ্জল করিম বললেন, বাতি না থাকাই ভালো। কে না কে দেখে ফেলবে।

আপনার ঘরে পান আছে?

পান নাই।

আপনার স্ত্রী পান খেত না?

মাঝে মধ্যে খেত।

আমিও মাঝে মধ্যে খাই। বাতি জ্বালান। অন্ধকার ভালো লাগছে না। কুহুরানী শোয়া থেকে উঠে বসল। মোফাজ্জল করিম হারিকেন জ্বালালেন। হারিকেনের লালাত আলো মেয়েটার মুখে পড়েছে। তাকে কী সুন্দরই না লাগছে! মেয়েটার গলাটা শুধু খালি। গলায় একটা হার থাকলে ভালো হতো। জোছনার দেড় ভরি স্বর্ণের একটা পদ্মহার আছে। জোছনার বাবা দিয়েছিলেন। হারটা গলায় পরলে জোছনাকে কী সুন্দরই না লাগত!

মোফাজ্জল করিম ইতস্তত করে বললেন, কুহুরানী আলমিরায় জোছনার একটা হার আছে। পদ্মহার। পরবে!

আপনি বললে পরব।

কুহুরানী আগ্রহ নিয়ে হার গলায় দিল। আয়নায় নিজেকে দেখল। মুগ্ধ গলায় বলজ, হারটা সুন্দর।

মোফাজ্জল করিম বললেন, দেখি, জ্বর দেখি। তিনি কুহুরানীর কপালে হাত দিলেন।

জ্বর একেবারেই নাই। আলহামদুলিল্লাহ।

কুহুরানী বলল, এখন এক ঘুম দিয়েছি জ্বর শেষ। খুব পান খেতে ইচ্ছা করছে। পান খাওয়াবেন? খয়ের দিয়ে পান। যেন ঠোঁট টকটকে লাল হয়।

মোফাজ্জল করিম বললেন, স্কুলের আরবি শিক্ষক মাওলানা আবুল বাসার খয়ের দিয়ে পান খান। তার কাছ থেকে নিয়ে আসি?

ওনার বাসা কি অনেক দূর?

বেশি দূর না।

তাহলে যান। দুই খিলি পান আনবেন।

তুমি হারিকেন নিভায়ে রেখো। আলো দেখলে কেউ আমার খোঁজে চলে আসতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *