২
কার্তিক মাসের আঠারো তারিখ সকালে নিউ বেঙ্গল সার্কাস পার্টি নয়াপাড়া উপস্থিত হলো। সার্কাসের দুটো হাতির একটা খায়রুন্নেসা আদর্শ হাইস্কুলের পাশের খাদে পড়ে গেল। ছাত্ররা স্কুল ফেলে মজা দেখতে চলে এল। বিরাট মজা। হাতি খাদ থেকে উঠতে চেষ্টা করছে। পা পিছলে বারবার পড়ে যাচ্ছে। হাতির গলার ঘণ্টা বেজেই যাচ্ছে। হাতি যতবারই পা পিছলে পড়ছে ততবারই দর্শকদের হাততালি পড়ছে। অসহায় ক্রুদ্ধ পশুর কর্মকাণ্ডে তারা বড়ই মজা পাচ্ছে।
মোফাজ্জল করিম সাহেব থমথমে মুখে তার ঘরে বসে আছেন। ছাত্রদের ব্যবহারে তিনি মর্মাহত। ক্লাস ফেলে তারা দৌড়ে হাতি দেখতে চলে গেল, এটা কেমন কথা? শুধু ছাত্ররা ছুটে চলে গেলে একটা কথা ছিল। ছাত্রদের পেছনে পেছনে দুজন শিক্ষকও গেছেন।
ছাত্রদের অবশ্যই শাস্তি হবে। সবাই অ্যাসেম্বলি মাঠে লাইন করে দাঁড়াবে। সবাই কানে ধরে থাকবে। এক ঘণ্টা কানে ধরে থাকার পর তারা একসঙ্গে বলবে, ‘অপরাধ করেছি। ক্ষমা চাই।’ ছাত্রদের ক্ষমা প্রার্থনার পর তিনি বিবেচনা করবেন ক্ষমা করা যায় কি না। যদি মনে করেন ক্ষমা করা যায় না, তাহলে আরো এক ঘণ্টা। ছাত্রদের শাস্তি না হয় দেয়া গেল; কিন্তু শিক্ষকদের কী হবে? যে দুজন শিক্ষক ছাত্রদের পেছনে পেছনে গেছেন মোফাজ্জল করিম তাদের নাম লিখছেন। নাম লাল কালি দিয়ে লেখা। তার হাতে ক্ষমতা থাকলে দুজন শিক্ষককে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করতেন। সেই ক্ষমতা তাঁর হাতে নেই। তিনি যা পারেন তা হলো স্কুল কমিটির কাছে অভিযোগ। কঠিন অভিযোগ। অভিযোগের মুসাবিদা এখনই করে ফেলা দরকার। মোফাজ্জল করিম না কাল দিয়েই মুসাবিদা শুরু করলেন-
(মুসাবিদা)
স্কুল কমিটি
খায়রুন্নেসা আদর্শ উচ্চবিদ্যলয়
নেত্রকোনা।
বিষয়: শিক্ষকের কর্মে অবহেলা।
জনাব,
যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক নিবেদন। অদ্য…
এ পর্যন্ত লেখার পরই তাকে থামতে হলো। আরবি শিক্ষক মাওলানা আবুল বাসার ঢুকলেন। তার মুখ ভর্তি হাসি। এবং মুখ ভর্তি পান। পানের রস গড়িয়ে পাঞ্জাবীতে পড়েছে। সেদিকেও খেয়াল নেই। মাওলানা হেডমাস্টার সাহেবের সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, স্যার, হাতি উঠেছে।
মোফাজ্জল করিম বললেন, হাতি উঠেছে মানে কী?
একটা হাতি খাদে পড়ে গিয়েছিল, কিছুক্ষণ আগে উঠেছে। মহিষ দিয়ে টেনে তুলতে হয়েছে। হাতির মতো বিশাল জানোয়ারকে টেনে তুলেছে মহিষ। দেখার মতো দৃশ্য।
আপনি সেখানে ছিলেন নাকি?
জি, ছিলাম। দড়ির টানে হাতির পা দিয়ে রক্ত পড়ছে। বেচারা জখম হয়েছে।
মোফাজ্জল করিম চাপা নিঃশ্বাস ফেললেন। কর্মে অবহেলার অভিযোগনামায় মাওলানা আবুল বাসারের নামও ঢুকবে। এই মানুষটিকে তিনি অত্যন্ত পছন্দ করেন। একজনকে পছন্দ করা মানে তার অপরাধ ক্ষমা করা নয়। অপরাধ ব্যক্তিগত পছন্দের ধার ধারে না।
মাওলানা পাঞ্জাবির পকেট থেকে পানের কৌটা বের করতে করতে বললেন, একটা পান খাবেন নাকি, স্যার?
আমি স্কুল চলাকালীন সময়ে পান খাই না।
স্কুল তো আর চলছে না। ছুটি।
ছুটি কে দিয়েছে?
কেউ দেয় নাই। আপনা-আপনি ছুটি। ছাত্ররা সব সার্কাস দলের সাথে আছে। ওদের পিছনে পিছনে ঘুরছে। মহানন্দ।
মোফাজ্জল করিম হাত বাড়িয়ে পান নিলেন। তাঁর মন খুবই খারাপ হলো। মাওলানা বললেন, সার্কাস পার্টির ম্যানেজার সাহেবের সঙ্গে কথা হলো। নাম ইয়াকুব। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় বাড়ি। মনে হলো বিশিষ্ট ভদ্রলোক। স্কুলের সব শিক্ষকের জন্য পাস পাঠাবেন বলেছেন।
মোফাজ্জল করিম বললেন, সার্কাসের আলাপ শুনতে আর ভালো লাগছে না।
মাওলানা বললেন, তারা চেষ্টা করবে আজই প্রথম শো করতে। তাদের জন্য একদিন বসে থাকাও লোকসান।
মোফাজ্জল করিম বললেন, তাদের যেমন একদিন বসে থাকা লোকসান, আমাদেরও সে রকম একদিন ক্লাস না হওয়া লোকসান। তাদের চেয়েও বড় লোকসান।
তা ঠিক। স্যার, যদি আজ শো হয় যাবেন নাকি? অনেক দিন সার্কাস দেখি না। এদের দলটাও ভালো। চিতাবাঘ আছে, উট আছে, একটা অজগর সাপও আাছে।
সাপের কথায় মোফাজ্জল করিম শিউরে উঠলেন। এই প্রাণীটার নাম শুনলেও তার কপাল ঘামে। মোফাজ্জল করিম বললেন, সাপ দিয়ে সার্কাসওয়ালারা কী করবে?
মাওলানা বললেন, আছে নিশ্চয়ই তাদের কোনো খেলা। স্যার, আজ যদি শো হয়, তাহলে ইয়াকুব সাহেব এসে আপনার হাতে পাস দিয়ে যাবে।
ইয়াকুব সাহেবটা কে?
একটু আগে বললাম না? ম্যানেজার। বিশিষ্ট ভদ্রলোক। নম্র ভদ্র।
.
নিউ বেঙ্গল সার্কাস পার্টির ম্যানেজার মোহাম্মদ ইয়াকুব আসলে সার্কাসের মালিক। মালিক পরিচয় গোপন রেখে তিনি ম্যানেজার পরিচয় দেন। এতে অনেক সুবিধা। সময়ে অসময়ে বলতে পারেন—‘মানিকের নিষেধ আছে। মানিকের অনুমতি ছাড়া কাজটা করতে পারব না।’ মালিককে আড়ালে রাখা অনেক ভালো। আড়ালের মানুষকে নানানভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব।
মোহাম্মাদ ইয়াকুবের বয়স পঞ্চাশ। শক্ত-সমর্থ চেহারা। নাক চাপা, চোখ ছোট ছোট বলে তাকে উপজাতীয় মনে হয়। ভদ্রলোকের চুলে এখনো পাক ধরেনি চেহারায় ভালোমানুষি আছে। কথাবার্তা অত্যন্ত গোছালো। বিএ পাস করেছেন, কিন্তু কথা উঠলেই বলেন, ‘আমি মূর্খ, আমার পড়াশোনা ক্লাস সেভেন। মূর্খের কথা বিবেচনা করার কিছু নাই।’
ঝাঁকড়া বটগাছের ছায়ার নিচে প্লাস্টিকের চেয়ারে মোহাম্মদ ইয়াকুব বসে আছেন। তার সামনে আরেকটা চেয়ার, সেই চেয়ারে পা তোলা। ইয়াকুবের হাতে বড় কাচের গ্লাস। গ্লাসে করে তিনি ডাবের পানি খাচ্ছেন। ডাবের পানির সঙ্গে অন্য জিনিস মিশ্রিত আছে (কেরু কোম্পানির ভদকা)। এমনিতে তিনি দুপুরে কোনো মদ্যপান করেন না। তিনি মদ্যপান করেন শো শেষ হওয়ার পর রাত ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত। এ সময় তার তাঁবুতে কুহুরানী ছাড়া কেউ ঢুকতে পারে না।
.
কুহুরানী সার্কাস দলের সঙ্গে তেরো বছর ধরে আছে। সে এগারো বছর বয়সে সার্কাসে এসেছিল, এখন বয়স চব্বিশ। মেয়েটি কৃষ্ণকালো। অতি সুগঠিত শরীর। মুখ মায়াময়। বড় বড় চোখ। চুল লম্বা এবং লালচে। টকটকে লাল পোশাকে সে যখন দড়ির ওপর চোখ বন্ধ করে হেঁটে যাওয়ার খেলা দেখায়, তখন দর্শকরা আধাপাগলের মতো হাততালি দেয়। দড়ির খেলা ছাড়াও সে স্ট্রাপিজের খেলা দেখায়। ম্যাজিশিয়ান প্রফেসর বাবুলের ম্যাজিকেও অংশ নেয়।
ইয়াকুবের সার্কাসে কুহুরানী ছাড়াও আরো তিনজন রূপবতী আছে। একজন আছে মীনা কুমারী (আসল নাম সালমা খাতুন)। অতি রূপবতী। তার দিকে দর্শকদের চোখ তেমন যায় না। কেন যায় না, এই রহস্য ইয়াকুব এখনো বের করতে পারেন নি। মীনা কুমারীর আগুনের বারবেলের খেলা চমৎকার। দর্শকদের দম বন্ধ করে দেখতে হয়। সে কয়েক দফা এসে খেলা দেখায়। খেলার শেষে তালি ঠিকই পায়। কিন্তু কুহুরানীর মতো পায় না। কুহুরানী স্টেজে ঢোকার পর থেকে তালি পড়তে থাকে। ছন্দা বলে একটা মেয়ে আর এবং বলের খেলা দেখায়। মেয়েটার একটাই সমস্যা–সে বেঁটে। অতিরিক্তি বেঁটে। অনেক জায়গায় দেখা গেছে ছন্দা রিং-এর ভেতর ঢুকতেই দর্শকরা চেঁচিয়ে উঠেছে, বাঁটু আসছে! বাটু!
কমলারাণী বলে তৃতীয় মেয়েটি বাঘের এবং অজগরের খেলার সময় উপস্থিত থাকে তবে সে তেমন কিছু জানে না। কমলারাণী অতিরিক্ত লম্বা। এই মেয়েটিও সুন্দর তবে তার দাঁত খারাপ। যে কারণে সে কখনো হাসে না। ঠোঁট বন্ধ করে থাকে।
ডাবের পানিভর্তি (!) প্লাস শেষ পর্যায়ে। মনজু জগ থেকে আরো খানিকটা ঢালল। ইয়াকুব বললেন, মজা পাচ্ছি না।
মনজু (ইয়াকুবের সার্বক্ষণিক অ্যাসিস্ট্যান্ট। সার্কাস দলের জোকার) বলল, মাথা মালিশ করে দেই?
ইয়াকুব না-সূচক মাথা নাড়লেন। মনজু বলল, ছয়জন এক্সট্রা লেবার লাগিয়ে দিয়েছি।
ইয়াকুব বললেন, ভালো করেছ। অঞ্চলের বিশিষ্ট লোক কারা আছে নাম সংগ্রহ করো।
নাম সংগ্রহ করা আছে—সেক্রেটারি, চেয়ারম্যান, হাজি মফিজ ব্যাপারি, দুই স্কুলের হেডমাস্টার, এমদাদ খন্দকার। স্যার, আজ রাতে শো হবে?
অবশ্যই হবে।
হাতির অবস্থা কিন্তু ভালো না। পা জখম হয়েছে।
সন্ধ্যার মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। জন্তু-জানোয়ারের জখম দ্রুত সারে।
কুহুরানীরও শরীর ভালো না।
তার কী হয়েছে?
জ্বর।
সন্ধ্যা পর্যন্ত শুয়ে থাকুক। সন্ধ্যার পর প্যারাসিটামল চারটা খাওয়ায়ে দেবে। সামান্য জ্বর জ্বারি দেখলে চলে না। বুঝতে পেরেছ?
জি।
কুহুকে ডেকে আনো।
মনজু চলে গেল। ইয়াকুব কাজকর্ম দেখতে লাগলেন। বড় তাঁবুর খুঁটি গাড়া হয়ে গেছে। খুঁটির ওপর তাঁবু চড়িয়ে দেওয়া ঘণ্টাদুয়েকের কাজ। এক্সপার্ট লোকজন আছে। এরা সন্ধ্যার মধ্যে সব ঠিক করে ফেলবে। হ্যাজাক বাতি সময়মতোই জ্বলবে। নিউ বেঙ্গল সার্কাস পার্টির সঙ্গে বিশ কেভির জেনারেটর আছে। প্রয়োজনে জেনারেটর দিয়ে আলো করা যায়। ইয়াকুর তা করেন না। হ্যাজাক বাতির মজাই আলাদা। শোঁ শোঁ শব্দ হয়। শব্দের মধ্যেই রহস্য। ইলেকট্রিক বাতিতে কোনো রহস্য নেই।
মেয়েদের ঘর উঠে গেছে। ওপরে টিন। চারপাশে বাঁশের বেড়া। দরজা আছে। কিন্তু জানালা নেই। সার্কাসের মেয়েরা যেসব ঘরে থাকে তার জানালা থাকে না। থাকলেও জানালা বন্ধ করে নেওয়া হয়। মানুষ জন বড়ই বিরক্ত করেন। জানালা দিয়ে সারাক্ষণ উকিঝুঁকি দেয়।
ঘর উঠে যাওয়ার পরই চারপাশে তারকাঁটার বেড়া দিয়ে দেওয়া হবে। এ কাজটায় সময় লাগে। তবে খুঁটি পোঁতা শুরু হয়েছে। কাজের গতি দেখে মনে হচ্ছে রাত ৯টার মধ্যে খুঁটি পোঁতার কাজও শেষ হয়ে যাবে। কাজের অগ্রগতিতে ইয়াকুব খুশি। শুধু একটা বিষয়ে মেজাজ খারাপ হয়ে আছে নয়াপাড়া থানার ওসিকে এক হাজার টাকা নজরানা পাঠানো হয়েছিল। তিনি টাকা ফেরত পাঠিয়েছেন। ঘটনা বোঝা যাচ্ছে না। সৎ মানুষ, নজরানা দেবেন না, এটা হয় না। অন্য কোনো বিষয় আছে। বিষয়টা বোঝা প্রয়োজন। হয় তিনি নজরানা অনেক বেশি চাচ্ছেন, কিংবা শো হিসেবে টাকা চাচ্ছেন। সব রোগের ওষুধ আছে, এ রোগেরও আছে। তবে রোগটা আগে ধরতে হবে। ঠিকমতো নাড়ি দেখতে হবে।
স্যার, আমাকে ডেকেছেন?
কুহুরানী সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটার জ্বর যে বেশি, দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ঠোঁট ফ্যাকাশে, চোখ লাল। ইয়াকুর বললেন, তোমার নাকি জ্বর?
কুহু বলল, হুঁ।
ইয়াকুব বললেন, কাছে আসো, কপালে হাত দিয়ে দেখি।
দেখতে হবে না।
দেখতে হবে না কেন?
কুহু জবাব দিল না। চোখ-মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।
ইয়াকুব বললেন, প্রশ্ন করেছি, জবাব দাও।
কুহু জবাব দিল না।
ইয়াকুব বললেন, কী হল কথা বলো না কেন?
কুহু বলল, জ্বর দেখতে হবে না, জ্বর থাকুক না থাকুক আমি যথাসময়ে শো করব।
বসো।
কোথায় বসব? মাটিতে?
ইয়াকুব অনেক কষ্টে কুহুর গালে চড় দেওয়ার ইচ্ছা সামলালেন। তার সামনের প্লাস্টিকের চেয়ার থেকে পা নামাতে নামাতে বললেন, চেয়ারে বসো।
কুহু বসল। ইয়াকুব বললেন, আমার সঙ্গে বেয়াদবি করবে না। আমি বেয়াদবি পছন্দ করি না। যারা বেয়াদবি পছন্দ করে তাদের সঙ্গে বেয়াদবি করবে, আমার সঙ্গে না।
কুহু কিছু বলল না। সে ঘনঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
ইয়াকুব বললেন, ডাবের পানি খাবে?
না।
ইয়াকুব বললেন, একজনের দেখাদেখি অন্যজন বেয়াদবি শেখে। আজ তুমি বেয়াদবি করছ। কাল মীনা কুমারী বেয়াদবি করবে। পরশু ছন্দা বেয়াদবি করবে। তখন আর নিউ বেঙ্গল সার্কাস পার্টি থাকবে না। তখন হয়ে যাবে নিউ বেঙ্গল বেরাদব পার্টি। সবাই বেয়াদব, বুঝেছি।
বুঝেছি।
তুমি নাকি মীনা কুমারীকে বলেছ, তুমি সার্কাসে আর থাকবে না, চলে যাবে?
তামাশা করেছি।
তামাশা করা ভালো। সব তামাশা ভালো না। সার্কাস ছেড়ে তুমি যাবে কই? সার্কাসের মেয়েদের কেউ বিয়ে করে না। সার্কাসের মেয়েদের নিয়ে ফূর্তি করা যায়, বিয়ে করা যায় না।
কুহু বলল, বিয়ে করা যায় না কেন?
ইয়াকুব হাতের গ্লাস নামায়ে রাখতে রাখতে বললেন, তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে। তোমাকে বুঝিয়ে বলার কিছু নেই। কেউ সার্কাসের মেয়ে কেন বিয়ে করতে চায় না, সেটা আমার চেয়ে ভালো তুমি জানো।
আমি জানি না।
ইয়াকুব সিগারেট ধরালেন। কুহুর ত্যাঁদড়ামি তার অসহ্য লাগছে। অসহ্য লাগলেও কিছু করার নেই। সার্কাসের দল চালাতে গেলে মাথা গাঙের পানির মতো ঠাণ্ডা রাখতে হয়। ইয়াকুব তার মাথা ঠাণ্ডা করতে না পারলেও গলা নামিয়ে বুঝ দেয়ার মতো করেই বললেন, তোমার নিজের কথাই ধরো। তুমি সুন্দর মেয়ে। কালো, কিন্তু রূপ আছে। তোমাকে কি কেউ বিয়ে করবে? সার্কাসে তুমি মানুষকে শরীর দেখিয়ে বেড়াও। বেড়াও না?
আমি খেলা দেখাই।
খেলার সঙ্গে শরীরও দেখাও। দশ আনা খেলা, ছয় আনা শরীর। ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে ষোল আনা শরীরও দেখাতে হয়। হয় কি না, বলো?
কুহু চোখ-মুখ শক্ত করে বসে রইল। ইয়াকুর বললেন, মানুষ বিয়ে করে কী জন্য? সংসারের জন্য। সংসার মানে স্বামী-পুত্র-কন্যা তোমার কি পুত্র-কন্যা হবে?
না।
এটা খুবই আফসোসের ব্যাপার। দুঃখজনক। তোমার জরায়ু ফেলে দেওয়া হয়েছে। ডাক্তাররা ইচ্ছে করে যে ফেলেছে, তাও না। উপার না দেখে ফেলেছে। কেউ জেনেশুনে কেউ তোমাকে বিয়ে করবে? বলো, করবে?
কুহু শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছল। খুঁটির ওপর তাঁবু তোলা হচ্ছে। বিরাট হইচই। কুহু তাকাল সেই দিকে। ইয়াকুব গ্লাসে লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, সব কিছু জেনেশুনে কেউ যদি তোমাকে বিয়ে করতে চায়, আমাকে বলবে। আমি নিজে কাজি ডাকায়ে বিবাহ করিয়ে দেব। নিজে সাক্ষী হব। আমার এই কথার নড়চড় হবে না। এখন যাও, শুয়ে থাকো। জ্বর যদি না কমে, শো করতে হবে না। আগে শরীর, তারপর শো। মনজুকে পাঠায়ে দাও, বিশিষ্ট লোকজনদের সঙ্গে দেখা করব। পাস দিব।
কুহু চলে যাচ্ছে। ইয়াকুব লক্ষ করলেন, মেয়েটা ঠিকমতো পা ফেলতে পারছে না। এলোমেলো ভঙ্গিতে হাঁটছে। মনে হয় না আজ রাতের শো সে করতে পারবে।
সার্কাস পার্টির ম্যাজিশিয়ান প্রফেসর বাবুলকে দেখা যচ্ছে। মাথায় কালো হ্যাট, হাতে ছড়ি। অভ্যাস মতো ভ্রমণে বের হয়েছে। ইয়াকুবের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। কোন একটা ঝামেলা সে করবেই। প্রফেসর বাবলু এখন পর্যন্ত ঝামেলা ছাড়া কোন অঞ্চল থেকে বের হতে পারেনি।
ইয়াকুব হাত ইশারায় ডাকল। প্রফেসর বাবুল হাসি মুখে এগিয়ে আসছে। কোট টাই পরা বিরাট বাবু। দূর থেকেই সেন্টের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে।
প্রফেসর কই যাও?
কোন জায়গায় আসলাম, জায়গার ধারাটা কী একটু বুঝে যাই। টোকা দিয়ে আসি।
টোকা দিতে হবে না। তুমি বের হবে না। তুমি পাড়া ঘুরতে বের হওয়া মানেই ঝামেলা।
প্রফেসর হাসি মুখে বলল, ভুল কথা বললেন। আমি বের হওয়া মানে বিজ্ঞাপন। সার্কাস পার্টির বিজ্ঞাপন। পথে যেতে যেতে ম্যাজিকের দু’একটা খেলা দেখাব-লোকে বুঝবে কী জিনিস।
ইয়াকুব বিরক্ত মুখে বললেন, কোনো দরকার নেই। অবশ্যই তুমি বের হবে না।
আমি নিজের বিবেচনায় চলি। অন্যের বিবেচনায় চলি না।
তাই না-কি?
জি তাই। আমাকে পছন্দ না হলে বিদায় করে দেন। আমি হাসি মুখে চলে যাব। ম্যাজিকের আলাদা দল খুলব। প্রফেসর বাবুলের ম্যাজিক। কুড়ি টাকা করে টিকেট। আপনার জন্যে ফিফটি পারসেন্ট কনসেশন।
ইয়াকুব গ্লাস হাতে তুলে নিলেন। এই লোকের সঙ্গে বাহাসে যাওয়া অর্থহীন। মহা বদ লোক। একে বিদায় করে দেয়া ভালো। সমস্যা একটাই, সার্কাসে জোকার যেমন লাগে ম্যাজিশিয়ানও লাগে। মানুষ উত্তেজনা বেশিক্ষণ নিতে পারে না। উত্তেজনার ফাঁকে ফাঁকে তাকে নিঃশ্বাস ফেলতে হয়–জোকার, ম্যাজিশিয়ানরা নিঃশ্বাস ফেলার কারিগর। তবে প্রফেসর বাবলুকে রাখা যাবে না। অন্য লোক খুঁজতে হবে। ভালো ম্যাজিশিয়ান পাওয়া মুশকিল। এই ব্যাটা ম্যাজিকের ক্ষেত্রে ওস্তাদ। এতে সন্দেহ নেই।
ম্যাজিশিয়ান প্রফেসর বাবুল এক পানবিড়ির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এক প্যাকেট সিগারেট কিনেছে। এখন দোকানিকে টাকা দেয়ার পালা।
ভাই নাও-একশ টেকার একটা নোট দিলাম। তোমার পাওনা রেখে বাকিটা ফিরত দাও।
দোকানি বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছে কারণ প্রফেসর বাবুলের হাতে টাকা নেই। হাতে এক টুকরা সাদা কাগজ।
কী টাকা নাও। দেখ কী?
এইটা টাকা?
টাকা না? কী বলো তুমি ভালো করে দেখ। হাতে নিয়ে দেখ।
দোকানি টাকা হাতে নিল না তবে বিরাট চমক খেল। ম্যাজিশিয়ানের হাতে এখন আর কাগজ নেই। হাতে সত্যি সত্যি একশ’ টাকার নোট।
প্রফেসর বাবুল বলল, নোট হাতে নিয়ে দেখ। পরে বলবে আমাকে এক টুকরা কাগজ দিয়ে সিগারেট নিয়ে গেছে।
দোকানী বলল, আপনের কাছে সিগারেট বেচুম না। সিগারেট ফেরত দেন।
সিগারেট কেন বেচবা না? আমি আসল টাকা দিয়েছি, তুমি সিগারেট কেন দিবা না?
আমার ইচ্ছা।
আমি নিউ বেঙ্গল সার্কাস পার্টির ম্যাজিশিয়ান প্রফেসর বাবুল। আমার সঙ্গে তেড়িবেড়ি করলে অসুবিধা আছে।
কী অসুবিধা?
তিন চারটা পাস দিব ম্যাসমেরাইজড হয়ে যাবে। হাত পা শক্ত হয়ে যাবে নড়চড়া করতে পারবে না।
দোকানি কড়া গলায় বলল, আমার সাথে ফাইজলামি কইরেন না কইলাম। অসুবিধা আছে।
অসুবিধা আমার না। অসুবিধা তার।
বলতে বলতে প্রফেসর বাবুল দোকানে ঝুলানো কলার কাদী থেকে একটা কলা ছিঁড়ে নিল। সে এখন কলার খোসা ছড়াচ্ছে। কলার খোসা ছড়ানোর সময় কলার ভেতর থেকে বাজনার মতো শব্দ আসছে।
একী তোমার কলা কথা বলে না-কি? পোঁ পোঁ করে কেন? এইগুলা কী কলা? শব্দ করে কেন?
ভদ্রলোক অপনি যান জো।
নগদ পয়সায় মাল কিনব আমি কেন?
এতক্ষণ প্রফেসর বাবুল একাই ছিল। এখন কিছু লোকজন জড় হয়েছে। তারা চোখ বড় বড় করে ঘটনা দেখছে। প্রফেসর বাবুল দর্শকদের দিকে এগিয়ে বক্তৃতার ভঙ্গিতে কথা শুরু করল-
আপনারা দশজন সাক্ষি। আমি নগদ টাকায় এই কলা খরিদ করেছি। কলার ভিতর গণ্ডগোল, খোসা ছড়াতে পেলে কান্দে। দেখেন অবস্থা।
দর্শকদের চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। এক বৃদ্ধ বিড়বিড় করে বলল, সব চোখের ধান্ধা। ধান্দা ছাড়া কিছু না।
এখন বলেন এই কলা কি আমার কিনা উচিত?
দর্শকদের একজন বলল, জ্বে না।
আচ্ছা ঠিক আছে কিনলাম না। দেখি আমার টাকা ফিরত দেন। ভাইসাহেব আপনারা বিবেচনা করেন–এই একশ’ টাকার নোটটা আমি দিয়েছি। সে নিবে না, বলে টাকায় গণ্ডগোল। আপনারা বলেন টাকায় কোনো গণ্ডগোল আছে?
জ্বে না।
ভালো করে দুই পিঠ দেখে বলেন। আছে কোনো গণ্ডগোল?
জ্বে না।
প্রফেসর বাবুল একশ’ টাকার নোটটাকে নিমিষে শাদা কাগজ বানিয়ে দিল।
দর্শক মুগ্ধ। প্রফেসর বাবুল হাঁটা শুরু করেছে। তার পেছনে মুগ্ধ দর্শকদের দল। প্রফেসর বাবুলের পকেটে নতুন কেনা এক প্যাকেট গোল্ডলিফ সিগারেট। সে সিগারেটের দাম দেয় নি। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে সিগারেটের দাম চাওয়া চাওয়ির ঝামেলায় যাওয়া যাবে না।
প্রথম দিন শো না হওয়া অলক্ষণ। মোহম্মদ ইয়াকুবকে অলক্ষণ স্বীকার করে নিতে হল। অলক্ষণ শুরু হয়েছে হাতি খাদে পড়ার পর থেকে। সৌভাগ্য পর পর তিনবার আসে, অলুক্ষণে ঘটনাও পর পর তিনবার ঘটে। প্রথম ঘটনা হাতি খাদে পড়া। দ্বিতীয় ঘটনা শো বন্ধ। তৃতীয় ঘটনা কী জানে। মাদ্রাসাওয়ালারা কি কিছু করবে? কওমি মাদ্রাসার এক প্রিন্সিপাল সাহেব মাগরেবের নামাজের পর থেকে এসে বসে আছেন। মাদ্রাসাওয়ালারা সহজ পাত্র না। সার্কাস-যাত্রা পার্টি নিয়ে এরা কিছু না কিছু ঝামেলা করবেই। বেশির ভাগ সময়ই টাকা-পয়সা দিয়ে পার পাওয়া যায়। তবে সব ক্ষেত্রে পার পাওয়া যায় না। সিরাজগঞ্জে এই কারণে দু’টা শো করেই চলে আসতে হয়েছে। মাদ্রাসার তালেবুন এলেমরা লাঠি সোটা নিয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছিল।
নওয়াপাড়া নিউ কওমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল মোহম্মদ শরিয়তুল্লাহ নখসবন্দি ছোটখাট মানুষ। বয়স অল্প। তবে মুখভর্তি দাড়ি। মাথা সম্পূর্ণ কামানো। তাঁর চোখে সুরমা। তাঁর পরনের লুঙ্গি, পাঞ্জাবি এবং গায়ের চাদর সবই ধবধবে শাদা। আতর মেখেছেন বলে চারদিক কড়া আতরের গন্ধে তুরভুর করছে। মানুষটা ধৈর্যশীল। দীর্ঘ সময় বসে আছেন তার চোখে মুখে সেই ছাপ নেই। তিনি চেয়ারে ঋজু ভঙ্গিতে বসে আছেন। ডান হাতে রাখা পাথরের তসবি টেনে যাচ্ছেন। ইয়াকুবকে ঢুকতে দেখে তিনি তসবি টানা বন্ধ করলেন।
ইয়াকুব ধুপ করে তাঁর সামনে বসে তাকে কদমবুচি করে হকচকিয়ে দিল।
শরিয়তুল্লা নখসবন্দি বললেন, কী করেন? কী করেন?
ইয়াকুর বললেন, হুজুরের দোয়া নেই।
শরিয়তুল্লাহ বললেন, কদমবুসি করা শরিয়ত বিরোধী। কদমবুসির সময় মাথা নিচু করতে হয়। আল্লাপাক ছাড়া অন্য কারো কাছে মাথা নিচু করা যায় না।
ইয়াকুর বললেন, শরিয়ত যা বলার বলুক আমি আল্লাহওয়ালা মানুষের দেখা পেলে কদমবুসি করি। তাদের দোয়া চাই। হুজুর আপনি অনেকক্ষণ বসে আছেন খবর পেয়েছি। আমার উচিত ছিল সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসা। সেটা করি নাই। অপরাধ ক্ষমা করবেন। মনটা অত্যধিক খারাপ ছিল। নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে চোখের পানি ফেলতাছিলাম।
কেন?
হাতি একটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বাঁচবে কি-না কে জানে! তাছাড়া এখানে শো করাও সম্ভব না। এত টাকা পয়সা খরচ করে এসেছি-এখন চলে যেতে হবে।
শো করা সম্ভব না কেন?
আছে নানান ঝামেলা। আপনাকে বলা যাবে না। আল্লাহওয়ালা মানুষকে এই সব বলাও বেয়াদবি। এখন হুজুর বলেন হুজুর আমার মতো দোজখের পোকার কাছে কেন এসেছেন? আপনার কোনো খেদমতটা করতে পারি? আপনি হুকুম করবেন আমি তামিল করব। যদি না করি আমি মানুষের বাচ্চা না—আমি কুত্তার ঔরষের।
এই জাতীয় কথা বলা ঠিক না।
হুজুর যেটা সত্য সেইটাই বললাম। হুজুর এখন আপনি হুকুম করেন।
শরিয়তুল্লাহ আমতা আমতা করে বললেন, আমি সার্কাস বিষয়ে কিছু কথা বলতে এসেছিলাম।
হুজুর বলেন।
সার্কাসে জন্তু জানোয়ারের খেলায় কোনো অসুবিধা নাই কিন্তু মেয়েছেলের খেলায় অসুবিধা আছে। পুরুষের সামনে মেয়েছেলে নাচানাচি করবে এটা কেমন কথা!
ইয়াকুর গলা নামিয়ে বললেন, অতি সত্য কথা। অতি সত্য কথা। হুজুর কি সার্কাস বন্ধ করে দিতে বলতেছেন?
শরিয়তুল্লাহ্ ইতস্তত করে বললেন, ঠিক তা না। অনেক মানুষের রুটি রুজির ব্যাপার আছে। সার্কাস চলুক তবে কোনো মেয়েছেলে খেলা দেখাতে পারবে না।
ইয়াকুব দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, হুজুর যেটা বলেছেন সেটাই হবে। আপনার সামনে ওয়াদা করলাম, যদি কোনো মেয়ে রিং এর ভিতরে আসে আপনি আপনার পায়ের দিয়ে দশজনের মোকাবিলায় আমার দুই গালে দুইটা চড় দিবেন।
.
ইয়াকুব শরিয়তুল্লাহকে অনেকদূর এগিয়ে দিলেন। খামে ভরে হুজুরের পকেটে পঞ্চাশটা একশ’ টাকার নোটও ঢুকিয়ে দেয়া হলো মাদ্রাসায় কিতাব কেনার জন্য সামান্য সাহায্য। শরিয়তুল্লাহ সার্কাস পার্টির ম্যানেজারের ভদ্রতায় মুগ্ধ হলেন। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন ম্যানেজারের সঙ্গে দীর্ঘ বাহাসে যেতে হবে। সবকিছুর এত সুন্দর সমাধান হবে তিনি চিন্তাই করেন নি। সবই আল্লাহপাকের ইচ্ছা।
.
হেডমাস্টার সাহেবের কাজের লোক বজলু সার্কাসের দলে এগারো বালতি পানি এনে দিয়েছে। তার জীবনের উপর দিয়ে তুফান বয়ে গেছে। শীতের দিনেও গা নিয়ে ভাপ বেরুচ্ছে। কিন্তু সে আনন্দে আত্মহারা। পানি আনা-নেয়ার মাধ্যমে অনেকের সঙ্গে খাতির হয়ে গেছে। বিশেষ খাতির হয়েছে মীনা কুমারীর সঙ্গে।
মীনা কুমারী এখন গোসল করছে। সারা গায়ে সাবান ডলে গোসল। গোসলের পানির বালতি বজলু এই মুহূর্তে সামনে এনে বজলু বলল, পানি কি আরো লাগব?
মীনা কুমারী বলল, লাগতে পারে।
লাগলে আইনা দিব। কোনো অসুবিধা নাই।
আইচ্ছা।
বজলু পাশেই দাঁড়িয়ে। স্নানের দৃশ্য থেকে সে চোখ ফেরাতে পারছে না। গামছা হাতে আরেকটি মেয়ে এসে যুক্ত হল। এই মেয়েটার নাম কমলারাণী। তার পরনে ব্লাউজ এবং পেটিকোট। আর কিছু নেই।
কমলারাণী বজলুর দিকে তাকিয়ে বলল, ঐ ব্যাটা তুই এইখানে খাড়ায়ে আছস ক্যান?
মীনা কুমারী বলল, আমি খাড়ায়ে থাকতে বলেছি। মাথাত পানি ঢালব। এ আমার পানি বরদার। পানি আইন্যা দেয়।
কমলা রাণী সঙ্গে সঙ্গে বলল, তাইলে থাক। মেয়েছেলের সিনান দেখ। মেয়েছেলের সিনান দেখনের মধ্যে মজা আছে।
বজলু হকচকিয়ে গেল।
কমলারাণী বলল, পিঠে সাবান ডইল্যা দিতে পারবি? পিঠে সাবান ডলার প্রয়োজন হইতে পারে। তার আগে আরো পানি লাগব। দুই বালতি পানি আন। যাবি আর আসবি। দেরি করলে সিনান শেষ কইরা ফেলব। পিঠে সাবান ঘষার মজা পাইবি না।
বজলু বালতি হাতে ছুটে গেল। দৌড়ে যেতে গিয়ে চষা ক্ষেতের চ্যাঙড়ে বাড়ি লেগে বাম পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ উঠে গেল। আচরিক্ত উত্তেজনায় সে ব্যথা টের পেল না।
পিঠে সাবান ডলাটা শেষ পর্যন্ত হল না। কমলারাণী বলল, আরেকদিন দিবি। আইজ না। তুইও আছস, আমার পিঠও আছে। আছে না?
বজলু বলল, জ্বি আছে।
মীনা কুমারী বলল, তুমি এখন থাইক্যা আমরার দুইজনের পেরাইভেট লোক। আমরার পেরাইভেট কাজ কইরা দিবা। পারবা না?
বজলু বলল, জি পারব।
পান সুপারি জর্দা আর খয়ের আইন্যা দিবা। কাঁচা সুপারি। আনতে পারবা না?
জি পারব।
পান সুপারির টেকা পরে দিয়া দিব।
বজলু বলল, টেকা লাগব না।
সে পান সুপারি আনতে আবার দৌড়ে গেল। তার বড়ই আনন্দ হচ্ছে। মানুষ বেঁচে থাকে কেন? আনন্দের জন্য বাঁচে। অন্য কোনো কিছুর জন্যে না। বজলুর মনে এই ধরনের উচ্চশ্রেণীর ভাবও তৈরি হল।
.
মোফাজ্জল করিম অনেক রাত পর্যন্ত বজলুর জন্য অপেক্ষা করলেন। শরীর ভালো লাগছিল না। জ্বর আসার আগে আগে যেমন লাগে তেমন লাগছিল। মাথার ভেতর ভোতা যন্ত্রণা। গায়ে চাদর থাকার পরেও শীত শীত ভাব। এই অবস্থায় রান্না করা অসম্ভব। তারপরেও চুলা জ্বালালেন। ভাত বসিয়ে দিল। গরম ভাতে এক চামচ ঘি দিয়ে খেয়ে নেবেন। কয়েক দানা লবণ ছিটিয়ে দিতে হবে। ঘরে আলু থাকলে ভালো হতো। ভাতের হাঁড়িতে একটা আলু দুটা কাঁচামরিচ দিয়ে দেয়া। ভাতের সঙ্গে আলু কাঁচামরিচ সিদ্ধ হয়ে যাবে। চটকে নিলেই আলু ভর্তা। ভাতের ভাপে সিদ্ধ হওয়া আলুভর্তা অতি সুখাদ্য।
ভাতের ভাপে তৈরি খাবারের ওস্তাদ ছিল জোছনা। মাড় গালা ভাতে সে নানান জিনিস ঢুকিয়ে দিত। কখনো কলাপাতায় মোড়া কই মাছ, কখনো রসুন আদাকুচি। প্রতিবারই অতি সুখাদ্য তৈরি হতো।
মোফাজ্জল করিম নিজের উপর সামানা বিরক্ত হলেন। জোছনার কথা মনে হলেই নানান খাদ্য-দ্রব্যের কথা মনে আসে। এটা ঠিক না। সে ভালো রাঁধতে পারত এটা তার কোনো পরিচয় না। ভাতের ভাপে তৈরি আলু ভর্তা, ইলিশ মাছের পাতুরি জোছনার সাইনবোর্ড না। জোছনার সাইনবোর্ড তাহলে কী? মোফাজ্জল করিম ভুরু কুঁচকে ভাবলেন। তেমন কিছু মনে আসছে না। এটাও বিস্ময়কর ব্যাপার। কত দিনের কত স্মৃতি কিছুই মনে আসছে না! ও আচ্ছা একটা মনে এসেছে, জোছনার রঙ তামাশা বড়ই পছন্দের ছিল। একবার রাতে ঘুমুতে গিয়ে দেখেন বালিশের পাশে কুণ্ডলি পাকিয়ে একটা সাপ বসে আছে। তিনি চিৎকার করে লাফিয়ে উঠলেন। রান্নাঘর থেকে ভেসে এল জোছনার দম ফাটানো হাসি। দড়ি সাপের মতো করে পাকিয়ে সে-ই বালিসের কাছে রেখে দিয়েছিল। সেবার তিনি জোছনাকে কঠিন ধমক দিয়েছিলেন। জোছনা হাত জোড় করে বলেছে, সে জীবনে আর এই ধরনের তামাশা করবে না।
চুলায় আগুন ভালোমতো জ্বলছে না। প্রচুর ধোঁয়া হচ্ছে। কেরোসিনের চুলাগুলোর এই এক সমস্যা। ঠিকমতো না বসলে ধোঁয়া হয়। ভাতের মধ্যে ধোঁয়ার গন্ধ ঢুকে যায়। মোফাজ্জল করিমের ইচ্ছা করছে চুলা বন্ধ করে শুয়ে পড়তে। সামান্য ক্ষুধা আছে। এই ক্ষুধা নিয়ে ঘুমানো যায়। তবে রাতের কাজ সবই বাকি। এশার নামাজ পড়া হয় নি। তিনটা নতুন ইংরেজি শব্দ শেখা হয় নি। গতকাল রাতের শেখা শব্দ তিনটা কি মনে আছে? একটা হলো Fiat. ফিয়াট মানে কী?
বন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চাদর গায়ে কে যেন আসছে। নিশ্চয়ই বজলু। এতক্ষণে তার বাড়ি ফেরার কথা মনে হয়েছে। লাট সাহেবের ব্যাপারে একটা ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। আজই হেস্তনেস্ত হবে। হেস্তনেস্ত শব্দটার উৎপত্তি হল হ্যাঁ না থেকে। হেস্ত মানে হ্যাঁ নেস্ত মানে না। বজলু নামক লাট সাহেবের ব্যাপারে আজ হ্যাঁ না হয়ে যাবে।
মোফাজ্জল করিম মুখের চামড়া শক্ত করে আগুনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রথম কথাটা বজলু উচ্চারণ করুক। তিনি করবেন না।
হেডমাস্টার সাহেব স্লামালিকুম।
মোফাজ্জল করিম চমকে উঠলেন। তাঁর সামনে আরবির শিক্ষক মওলানা আবুল বাসার। বজলু না।
মোফাজ্জল করিম বললেন, ওয়ালাইকুম সালাম। এত রাতে কী ব্যাপার?
রাত বেশি হয় নাই। আটটা দশ।
আটটা দশা
জি।
আমার কাছে মনে হচ্ছিল নিশুতি রাত। বৃদ্ধ বয়সে শরীরের ঘড়ি স্লো হয়ে যায়। স্লো হতে হতে এক সময় বন্ধ।
মওলানা উঠান থেকে মোড়া এনে মোফাজ্জল করিম সাহেবের মুখোমুখি বসলেন। মোফাজ্জল করিম বললেন, কানো কারণে এসেছেন না, এম্নি?
ভাবলাম আজ আপনার মনটা খারাপ। গল্প গুজব করলে একটু যদি হালকা লাগে।
মোফাজ্জল করিম বিস্মিত হয়ে বললেন, মন খারাপ থাকবে কেন? আজ কী?
মওলানা জবাব দিলেন না।
মোফাজ্জল করিম বললেন, আজ তারিখটা কত বলুনতো?
মওলানা এই প্রশ্নেরও জবাব দিলেন না। বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। মোফাজ্জল করিমের হঠাৎ মনে পড়ল আজ একটি বিশেষ দিন। এই দিনেই জোছনা মারা গিয়েছিল।
মোফাজ্জল করিম এবং মওলানা আবুল বাসার মুখোমুখি বসে আছেন। কেরোসিনের চুলার আলো পড়েছে তাদের মুখে। মাথার উপর দশমির চাঁদের আলো। দু’জনের কেউ কোনো কথা বলছেন না।
নীরবতা ভঙ্গ করে মওলানা বললেন, বজলু কোথায়?
মোফাজ্জল করিম জবাব দিলেন না।
আপনার শরীরটা কি খারাপ?
সামান্য।
দেখি জ্বর আছে কি-না।
জ্বর দেখতে হবে না।
মোফাজ্জল করিম হাঁড়ির ঢাকনা তুললেন। ভাত সিদ্ধ হয়েছে কি-না দেখা দরকার। এখন বেশ ক্ষুধা হয়েছে। রোগ, শোক, দুঃখ কষ্টের চেয়েও ক্ষুধা অনেক বড়। মৃত্যু শোকে কাতর মানুষও খাওয়া বন্ধ করে না। ক্ষুধার কাছেই মানুষের সবচেয়ে বড় পরাজয়।
মওলানা বললেন, সার্কাস দলের ম্যানেজারের সঙ্গে কী আপনার দেখা হয়েছে? স্কুলে এসে আপনাকে খুঁজছিল। সবার জন্য পাশ দিয়ে গেছে।
যান সার্কাস দেখে আসেন।
আপনি যাবেন না?
না। আমি যাত্রা-সার্কাস এইসব পছন্দ করি না।
যাত্রা সার্কাস কোনোদিনই দেখেন নাই?
মোফাজ্জল করিম কিছু বললেন না।
মওলানা বললেন, মাঝে মধ্যে একটু আধটু রঙ-তামাশার প্রয়োজন আছে। আমাদের নবিজীও হাসি তামাশা পছন্দ করতেন। আপনি সার্কাস দেখতে না গেলে আমিও যাব।
আপনি যাবেন না কেন? আমার সঙ্গে আপনার কী?
মওলানা বাসার বললেন, আপনার সঙ্গে আমার কিছু না। কিন্তু আপনি না গেলে আমিও যাব না।
মোফাজ্জল করিম বললেন, সার্কাসের কথাবার্তা কিছুক্ষণের জন্যে বন্ধ রাখা যায়?
মওলানা বললেন, অবশ্যই অবশ্যই। আমার আলোচনা তোলাই ভুল হয়েছে। গোস্তাকি মাফ করে দিন।
মওলানা খেয়ে এসেছিলেন তারপরও মোফাজ্জল করিম সাহেবের সঙ্গে খেতে বসলেন। একজন মানুষ একা একা যাবে এটা কেমন কথা!
খাওয়া-দাওয়া নিঃশব্দে করতে হয়। এটা নবিজীর সুন্নত। এই সুন্নত বেশির ভাগ সময়ই পালন করা হয় না। অতি অন্তরঙ্গ কথাবার্তা মানুষ খাবার সময়ই বলে। মোফাজ্জল করিম বললেন, আজ জোছনা এবং আমার পুত্রের মৃত্যু দিবস এটা আমার মনে ছিল না। আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
মওলানা বললেন, বয়স কালে এটা হয়। এটা কিছু না।
মোফাজ্জল করিম বললেন, আগে মনে থাকলে আজকের দিনটা রোজা রাখতাম।
আগামীকাল রাখবেন। কোনদিন রোজা রাখছেন এটা বড় না। কোন উদ্দেশ্যে রোজা রাখছেন এটাই বড়। নবিজীর একটা হাদিস বলব স্যার?
বলুন।
নবিজী বলেছেন, কর্ম দিয়ে তোমাকে বিচার করা হবে না। তোমাকে বিচার করা হবে কর্মের পেছনে তোমার কী উদ্দেশ্য আছে তা দিয়ে।
মোফাজ্জল করিম ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন। হঠাৎ করেই তাঁর মনে হল জোছনা আশেপাশেই আছে। দূর থেকে তাঁকে দেখছে। জোছনার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে মারুফুল করিম।
জোছনা ইশারায় তাঁকে দেখিয়ে বলল, ঐ দেখ তোমার বাবা। ভাত খাচ্ছে। তোমার বাবার সামনে দাড়িওয়ালা মানুষটা তোমার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সুফি মানুষ। উনাকে সালাম দাও।
মারুফুল করিম আধো আধো গলায় বলল, আসসালামু আলায়কুম।
জোছনা বলল, বাবারে একটা ভুল হয়ে গেল। খাওয়ার সময় সালাম দিতে হয় না। খাওয়া হল ইবাদত। খাওয়ার সময় সালাম দিয়ে ইবাদত নষ্ট করা যায় না।
মারুফুল করিম বলল, যা এখন তাহলে কী করব?
কী আর করবে। ভুল যখন হয়ে গেছে তখন কী আর করার। এখন যাও বাবার পিছনে গিয়ে দাঁড়াও। তার কাঁধে হাত রাখ।
খাওয়ার সময় কি কারো কাঁধে হাত রাখা যায়?
জোছনা চিন্তিত পলায় বলল, এটাও তো বুঝতে পারছি না।
মারুফুল করিম বলল, ইবাদতের সময় কাঁধে হাত রাখলে তো ইবাদত নষ্ট হবে।
জোছনা বলল, তোমার বাবা এখন খাওয়া বন্ধ করে বসে আছে। এখন যাও বাবার কাঁধে হাত রাখ।
হাত রেখে কিছু বলব?
বল, বাবা তুমি কেমন আছ?
তুমি করে বলব?
বাবা মাকে তুমি করে বলা যায়। এতে দোষ হয় না।
মারুফুল ইসলাম পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে।
মওলানা বললেন, স্যার কিছু চিন্তা করছেন?
মোফাজ্জল করিম বললেন, না। তার চোখে পানি এসে গেছে। শরীর কেমন যেন করছে। তাঁর কাছে মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি মারুফুল করিম তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। যে কোনো সময় তাঁর কাঁধে হাত রাখবে।
