৪
ম্যানেজার মোহাম্মদ ইয়াকুব প্রচণ্ড রাগ নিয়ে হাসিমুখে বসে আছে। সে রাগ দেখাতে পারছে না, কারণ তার সামনে নয়াপাড়ার অতি বিশিষ্ট এক মানুষ বসে আছেন। মানুষটার নাম এমদাদ খন্দকার। উনি বিরাট পয়সাওয়ালা মানুষ। নিজের টাকায় একটা মসজিদ করেছেন। হাফিজিয়া মাদ্রাসা করেছেন। তিনি তার মায়ের নামে একটা মেয়েদের স্কুল করবেন, এ রকম শোনা যাচ্ছে।
অঞ্চলে এমদাদ খন্দকারের নাম টাকা খন্দকার। তাঁর বড় মেয়ের বিয়েতে হাতি এনেছিলেন সুসং দুর্গাপুর থেকে। বিয়েতে বরযাত্রী যারা এসেছিল তাদের প্রত্যেককে একটা করে হাতঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন। ঘড়ি দেবার ঘটনার পর কিছুদিন তাঁকে ঘড়ি খন্দকার ডাকা হতো, এখন আগের নামে ডাকা হচ্ছে। টাকা খন্দকার। তাঁর প্রধান পরিচয় টাকায়, ঘড়িতে না।
টাকা খন্দকার রুগ্ন মানুষ। তিনি কুঁজো হয়ে বসে আছেন। মাঝে মাঝে কাশছেন। তার পরনে লুঙ্গি। লুঙ্গির ওপর সিল্কের ফতুয়া। লুঙ্গি ফতুয়া সিল্কের হলেও কাঁধে সাধারণ হাটুরেদের গামছা। তার পোশাক-আশাক দেখে বিরাট টাকাওয়ালা মানুষ, এ রকম মনে হচ্ছে না। তিনি একের পর এক পান খেয়ে যাচ্ছেন। মুখ বেয়ে পানের রস পড়ছে। টাকা খন্দকার তার কাঁধে রাখা গামছা দিয়ে পানের রস মুছছেন।
এ জাতীয় মানুষ কখনো একা চলাফেরা করে না। সঙ্গে চরণদার রাখে। বেশির ভাগ কথা চরণদাররাই বলে। টাকা খন্দকারের চরণদারের নাম বরকত। বরকত মধ্যবয়স্ক মানুষ। অতি বিনয়ী এবং অতি ঘোড়েল। বরকতের কথাবার্তায় কোনো অস্পষ্টতা নাই। বরং অতিরিক্ত স্পষ্ট।
ইয়াকুব বলল, আমি অপারগ। আমার মানিকের নিষেধ আছে, সার্কাসের কোনো মেয়ে সার্কাসের এরিয়ার বাইরে যাবে না। মালিক যখন শুনবেন একটা মেয়ে তাঁবুর বাইরে রাত কাটিয়েছে, আমার চাকরি চলে যাবে। আমি বালবাচ্চা নিয়ে না খেয়ে মরব। দলতো আমার না। দল মালিকের। আমি হুজুরের গোলাম।
বরকত মাথা দোলাতে দোলাতে বলল, খন্দকার সাব থাকতে আপনি না খেয়ে মরবেন এটা কেমন কথা? উনার সামনে এ রকম কথা বলাও বেয়াদবি। উনি বেয়াদবি পছন্দ করেন না।
আমি কোনো বেয়াদবি করছি না। সত্যি কথা বলছি।
বরকত বলল, যুদ্ধের বাজারে সত্য কথা বলা ঠিক না।
ইয়াকুব বলল, যুদ্ধের বাজার মানে? কিসের যুদ্ধ?
বরকত বলল, এই যে আপনার সঙ্গে আমার যুদ্ধ। কথার যুদ্ধ। সব যুদ্ধের বড় যুদ্ধ কপার যুদ্ধ। যুদ্ধ বন্ধ করেন। কী বলতেছি মন দিয়া শুনেন। খন্দকার সাব আপনার সার্কাস দেখে খুশি হয়েছেন। উনি সার্কাসের সবেরে মিষ্টি খাওয়ার জন্য তিন হাজার টাকা দিয়েছেন। টাকা পান নাই?
জি, টাকা পেয়েছি। শুকরিয়া।
সার্কাসের কালো মেয়েটা তার নাম যেন কী?
কুহুরানী।
হুঁ, কুহুরানী। কুহুরানীর খেলা খন্দকার সাবের মনে ধরেছে। উনি কুহুরানীরে নিজের বাড়িতে নিয়া গল্পগুজব করতে চান। খন্দকার সাবের পান খাওয়ার অভ্যাস। অন্যকেও পান খাওয়াতে তিনি পছন্দ করেন। তাঁর খায়েশ কুহুরানীরে নিজের হাতে বানায়ে এক খিলি মিষ্টি পান খাওয়াবেন। এইটাতে আপনার অসুবিধা কী?
কুহুরানীর শরীর খারাপ, তার প্রচণ্ড জ্বর।
বরকত হতাশ গলায় বলল, এই তো উল্টাপাল্টা কথা শুরু করলেন। একটু আগে বলেছেন মালিকের নিষেধ, কোনো মেয়ে তাঁবুর বাইরে যাবে না। এখন বলতেছেন কুহুরানীর জ্বর। জ্বর না থাকলে তারে বাইরে যাইতে দিতেন?
ইয়াকুব উত্তর দিল না। এই মুহূর্তে তার মুখে কোনো জবাব আসছে না। বরকতের সঙ্গে কথায় পারা সম্ভব হবে এ রকম মনে হচ্ছে না। এ গভীর পানির মাছ না, অতলের মাছ।
টাকা খন্দকার মুখ থেকে পানের পিক মুছতে মুছতে বলল, বরকত, অনেক বাহাস হয়েছে, আর ভালো লাগতেছে না। চল, উঠি।
বরকত বলল, এতক্ষণ যখন বসেছি, আরো একটু বসি। মেয়েটার জ্বর। না দেখে যাওয়া ঠিক না। জ্বর বেশি হলে চিকিৎসাপাতির ব্যবস্থা নিতে হবে। ইনারা আমাদের মেহমান। ইনাদের বিপদ মানে আমাদেরও বিপদ।
টাকা খন্দকার সঙ্গে বললেন, তাহলে বসি জ্বরটা দেখেই যাই।
ইয়াকুব উঠে দাঁড়াল। শুকনা মুখে বলল, আপনারা বসুন। কু-হুকে নিয়ে আসি। সঙ্গে থার্মোমিটারও আনব। জ্বর মাপবেন।
বরকত বলল, থার্মোমিটার লাগবে না, খন্দকার সাবের হাতই থার্মোমিটার। বেশি দেরি করবেন না। খন্দকার সাব অধিক রাত্রিজাগরণ করেন না। ডাক্তারের নিষেধ আছে।
দেরি হবে না।
ইয়াকুবের ফিরতে দেরি হলো। বেশ দেরি। এতে টাকা খন্দকার কিংবা তার সঙ্গী দুজনের কারোরই ধৈর্যচ্যুতি হলো না। টাকাওয়ালা মানুষদের সহজেই ধৈর্যচ্যুতি হয়। খন্দকার সাহেবের কখনো হয় না। তার বিপুল বৈভবের একটি কারণ হয়তো বা তার অসীম ধৈর্য।
ইয়াকুব ফিরল একা। তার মুখে স্পষ্ট ভীতির ছাপ। তার কাছ থেকে জানা গেল কুহুকে পাওয়া যাচ্ছে না। সে কলপাড়ে একা গিয়েছিল চোখে-মুখে পানি দিতে। কলপাড় থেকে ফেরে নি। কুহুর সন্ধানে সার্কাসের লোকজন নানান দিকে গেছে।
ইয়াকুব বলল, আপনারা মনে হয় আমার কথা বিশ্বাস করছেন না। আপনারা হয়তো ভাবছেন, আমি তাকে লুকায়ে রেখেছি।
টাকা খন্দকার উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, আপনি সত্য কথাই বলেছেন। কে মিথ্যা বলছে, কে সত্য বলছে–সেটা আমি মুখ দেখে বলতে পারি।
ইয়াকুব বলল, কুহুর পালানোর অভ্যাস আছে। গৌরীপুর থেকে একবার পালায়েছিল। পরে তাকে শ্যামগঞ্জ থেকে ধরে আনি। মেয়েটার মাথায় গণ্ডগোল আছে।
বরকত বলল, এই অঞ্চল কি সে চিনে?
ইয়াকুব বলল, জি না।
বরকত বলল, পালায়ে বেশি দূর যাওয়া সম্ভব না। সার্কাসের মেয়েকে কেউ যে লুকায়ে রাখবে, তাও না। রেলস্টেশনের দিকে লোক পাঠান। আমরাও খোঁজখবর নিব।
ইয়াকুব বলল, মীনা কুমারী বলে একটা মেয়ে আছে আমাদের দলে। গান জানে। নাচ জানে তাকে কি দিব আপনাদের সঙ্গে? গলা মোটা কিন্তু সুরে গায়।
মীনা কুমারী কোন জন?
সাপ নিয়ে যে খেলা দেখায়।
টাকা খন্দকার না সূচক মাথা নাড়লেন। ইয়াকুবের দিকে ফিরে বললেন, কুহু মেটোকে নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নাই। তাকে খুঁজে বের করা কয়েক ঘণ্টার মামলা।
বিষয়টা দেখতেছি।
.
কুছরানী একটা পুকুরপাড়ে বসে আছে। পুকুরপাড়ে লম্বা লম্বা ঘাস। পানিতে ঘাসের কিরিকিরি ছায়া পড়েছে। তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে। কুহুর মাথার ওপর নারিকেল গাছ। নারিকেল গাছটা খুব উঁচু না। তারপরও গাছভর্তি নারিকেল কুহু পুকুরের পানিতে ডান পা-টা ডুবিয়েই ঝট করে তুলে ফেলল। পানি বরফের চেয়েও ঠাণ্ডা। সে বুঝতে পারছে তার গায়ে জ্বর। জ্বর খুব বেশি কি না, এটা বুঝতে পারছে না। বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। জ্বর বেশি হলে পানি ঠাণ্ডা লাগে। উত্তর দিক থেকে বাতাস আসছে। বাতাসও ঠাণ্ডা। সার্কাসের দলে ফিরে গিয়ে গায়ের একটা চাদর নিয়ে এলে হতো। সে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে তারা ঝিকমিক করছে। চাঁদ নেই। আশ্চর্য ব্যাপার চাঁদ ছাড়াই চারদিক আলো হয়ে আছে। কুহু উঠে দাঁড়াল। সে কোনদিকে যাবে বুঝতে পারছে না। সে পালিয়ে যাচ্ছে কি না, এটাও বুঝতে পারছে না। পালিয়ে সে যাবে কোথায়? তার শাড়ির আঁচলে একটা পাঁচশ’ টাকার নোট আর কয়েকটা একশ’ টাকার নোট আছে। এই টাকায় ট্রেনের টিকিট হবে। ট্রেনের টিকিট কেটে উঠে পড়া। ট্রেন চলছে তো চলছেই। আর থামাথামি নেই। বাকি জীবন পার হয়ে যাবে ট্রেনে।
তার ছোটবেলাটা কেটেছে ট্রেনে। সে আর তার বাবা। বাবা ট্রেনে থালা বাজিয়ে ভিক্ষা করতেন। তার থালার বাজনা ছিল অসাধারণ। আঙুল দিয়ে ঝড়ের মতো তুলতে পারতেন। তার বাজনা শুনে লোকজন যখন মুগ্ধ, তখন তিনি শুরু করতেন তার ভিক্ষার বক্তৃতা। বাজনা যত সুন্দর, বক্তৃতা ততই কুৎসিত।
‘চলন্ত ট্রেনের যাত্রীগণ। আসসালাম। আমি একজন অসহায় নাদান মানুষ। আমি আমার এই ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়া আপনাদের পাকদরবারে হাজির হয়েছি। মাতৃহারা এই শিশু ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর। আজ সারাদিনে বাপ-বেটির কোনো খাওয়া জুটে নাই। রিজিকের মালিক আল্লাপাক, আপনারা উনার উছিলা।’
যে থালার এতক্ষণ বাজনা বেড়েছে সেটা এখন হয়েছে ভিক্ষাপত্র। বাজনা সবাই শুনেছে কিন্তু ভিক্ষা কেউ দিচ্ছে না। এক কামরা থেকে আরেক কামরা। আাবার থালার বাজনা। আবার সেই বক্তৃতা। একটা শব্দ এদিক-ওদিক না।
‘চলন্ত ট্রেনের যাত্রীগণ। আসসালাম। আমি একজন অসহায় নাদান মানুষ। আমি আমার এই ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়া আপনাদের পাকদরবারে…’
কুহুরানী পুকুরপাড় থেকে উঠে দাঁড়াল। তার মাথায় তার বাবার বক্তৃতা বাজছে। নাকে ফুলের গন্ধ আসছে। সে হাঁটতে শুরু করেছে যেদিক থেকে ফুলের গন্ধ আসছে, সেদিকে। কচুবনের ভেতর দিয়া রাস্তা সামনে বাঁশঝোপ। কোথাও কোনো জনমানুষ্যি নেই। রাত এমন কিছু বেশি না। লোকজন কোথায় গেল? শিয়াল ডাকছে। অনেকদিন পর শিয়ালের ডাক শোনা গেল। কুহুরানী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শিয়ালের ডাক শুনল। এদিক ওদিক তাকিয়ে দুই হাত মুখের কাছে ধরে শিয়ালের মতো শব্দ করল। বাহ্ মজাতো। তার ডাক শুনেই হয়তো শিয়ালরা ডাক থামিয়ে দিয়েছে। সে আবার হাঁটা শুরু করল। সে হাঁটছে এলোমেলো ভঙ্গিতে। তাকে সার্কাসের তাঁবু থেকে দূরে যেতে হবে, এই বোধটা তার আছে। কাউকে পেলে সে স্টেশনে যাওয়ার পথ জিজ্ঞেস করে নিতে পারত। যাকে জিজ্ঞেস করত সে নিশ্চয়ই বলত-এত রাইতে ইস্টিশনে কী? কই যাবেন?
সে বলত, কোনোখানে যাব না। ট্রেনে উঠে বসে থাকব। ভিক্ষা করব-
‘চলন্ত ট্রেনের যাত্রীগণ। আসসালাম। আমি একজন অসহায় নাদান মানুষ…’
.
কুহুরানীর ভিক্ষা করা শেষ হলো জয়নাল চাচার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর। তিনি সার্কাসের খেলা দেখাতেন। একটা লোহার রিঙের ভেতর শরীরটা ঢুকিয়ে পেঁচিয়ে ফেলা। তার খেলা দেখলে মনে হতো তার শরীরে হাড্ডি বলে কিছু নেই। শরীরটা রাবারের শরীর। এই শরীর তিনি যেকোনোভাবে বাঁকাতে পারতেন।
কুহু খেলা শিখেছিল তাঁর কাছে। তিনি তার প্রথম ওস্তাদ এবং শেষ ওস্তাদ। প্রথমদিন লোহার রিঙের ওপর কুহুকে এক পায়ে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন, শরীর নিয়া চিন্তা করবি না। মনে মনে চিন্তা কর, তোর শরীর বইলা কিছু নাই। তোর শরীরটা বাতাস। যখন সত্যই চিন্তা করবি তোর শরীর বাতাস, তখন খেলা শিখবি। তার আগে না।
শরীর হইল শরীর। শরীর কি বাতাস হয়?
চিন্তা করলেই হয়। তুই যখন চিন্তা করবি তোর শইল লোহা ইসটিল। তখন শরীল হইব ইসটিল।
কুহু দ্রুত খেলা শিখেছিল। বাবার মৃত্যুর পর (তিনি ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গিয়েছিলেন। চলন্ত ট্রেনের এক কামরা থেকে আরেক কামরায় যাওয়ার সময় পা ফসকে পড়ে যান)। কুহু থাকত জয়নাল চাচার সঙ্গে। দুজনে মিলে ট্রেনের কামরায় কামরায় খেলা দেখত। ভালো পয়সা পাওয়া যেত। শ্যামগঞ্জ বাজারে জয়নাল ঘর ভাড়াও করেছিল। ঘরের আসবাবপত্রের মধ্যে ছিল বিরাট একটা চৌকি। একটা কাঠের চেয়ার এবং একটা আলনা। আলনাটা বাহারি। আলনায় জুতা রাখার ব্যবস্থা ছিল। ভাড়া করা ঘরে থাকার সুযোগ খুব বেশি হতো না। যখনই সুযোগ হতো, তখনই জানাল চাচার আনন্দের সীমা থাকত না। গম্ভীর গলার বলত, শিল্পের ঘরে থাক আর রাজবাড়িতে থাকা একই। আমার ঘরের আমিই রাজা।
কুহু বলত, আপনে রাজা। আমি কী?
তুই হইলি রাজার ভাতিজি।
তাদের সময়টা সুখেই কাটছিল। সুখ স্থায়ী হলো না। কুহুর শরীর বদলাতে শুরু করল। সে ভয়ে অস্থির। একদিন সে বলল, আমি আর এক বিছানায় শোব না চাচা। আমারে মাটিতে বিছানা কইরা দেন।
জয়নাল বলল, ও কুহু তুই আমারে শাদি করবি?
হতভম্ব কুহু বলল, আপনেরে শাদি করব কী? আপনে আমার চাচা।
আমি তোর আপন চাচা না। গেরাম সম্পর্কের চাচাও না। আমি হইলাম চলন্ত ট্রেনের চলন্ত চাচা।
কুহু বলল, ছিঃ, চাচা, ছিঃ।
জয়নাল চাচা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। প্রায়ই ঘুম ভেঙে কুহু দেখত জয়নাল চাচা কুপি জ্বালিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। সে ধড়মড় করে উঠে বসে বলত, চাচা কী হইছে?
জয়নাল উদাস গলায় বলত, কিছু হয় নাই। কুহু, তুই আমারে শাদি করবি?
কুহু ধমক দিয়ে বলত, চুপ কইরা ঘুমান তো চাচা। আপনের মশকরা ভালো লাগে না।
আচ্ছা, ঠিক আছে, ঘুমাইলাম।
গ্রামের অন্ধকার পথে হাঁটতে হাঁটতে কুহুর মনে হলো, জয়নাল চাচাকে বিয়ে না করে সে বিরাট ভুল করেছে। বিয়ে করলে তার স্বামী-সংসার হতো। এখন আর কিছুই হবে না। তিনবার পেটের সন্তান নষ্ট করতে হয়েছে। চতুর্থবারের সময় ডাক্তার বলল, জরায়ু ফেলে দিতে হবে। সমস্যা আছে।
সমস্যা। সমস্যা। চারদিকে শুধু সমস্যা। এমন কোনো দুনিয়া কি আছে, যে দুনিয়ায় কোনো সমস্যা নাই? যে দুনিয়ার মনেও সুখ, শরীরেও সুখ? যে দুনিয়ায় ট্রেন চলে, কিন্তু চলন্ত ট্রেনের নিচে কেউ কাটা পড়ে না? যে দুনিয়ায় জয়নাল চাচার সঙ্গে তার বিবাহ হয়। তাদের সন্তান হয়।
জয়নাল চাচা যখন খুব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো, তখন সে নিউ বেঙ্গল সার্কাস পার্টিতে কাজ করে। ছুটি নিয়ে সে তাকে দেখতে গেল। জয়নাল অবাক হয়ে বললেন, তোর তো বিরাট নামডাক হয়েছে রে। ছিলি কুহু। এখন হইছস কুহুরানী।
চাচা, আপনি কেমন আছেন?
ভালো আছি। আজরাইল দিনের মধ্যে অনেকবার আমারে দেখতে আসে।
আপনার জন্য ফল আনছি।
লাভ নাই, কিছু খাইতে পারি না। একজন মাওলানা ডাকায়ে তওবা করায়েছি। এখন আমি নিষ্পাপ শিশু। এক জীবনে যত পাপ করেছিলাম, সব কাটা গেছে। মৃত্যুর পরে বেহেশতে চলে যাব। আল্লাহপাক বলবেন, বান্দা তুমি কী চাও? আমি বলব, আমার হুরপরীর দরকার নাই। তুমি কুহুরে আইনা দেও। হা হা হা। তুই কিন্তু ধরা খাইছস। তওবা সময়মতো করতে পারছি বইল্যা ধরা খাইছস। হা হা হা। বেহেশতে আমি যদি দাখিল হই, তুইও হবি।
জয়নাল আনন্দ নিয়েই মারা গেছে। খুব অল্প সংখ্যক মানুষের আনন্দময় মৃত্যু হয়। জয়নাল সেই অতি অল্প সংখার মানুষদের একজন।
কুহু কপালে হাত দিল। নিজের গায়ে হাত দিয়ে কি নিজের জ্বর বোঝা যায়? একজন কেউ যদি থাকত, যে কপালে হাত দিয়ে জ্বর দেখত। তার মাথায় বাবার বক্তৃতা ঘুরছে—‘চলন্ত ট্রেনের যাত্রীগণ। আসসালাম…’ নিজেকে কুহুর চলন্ত ট্রেনের মতোই লাগছে। ট্রেন যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে? ট্রেনের দুই দিকে ঘন ঝোপঝাড়। বাঁশবনে জোনাকি পোকা। আকাশ পরিষ্কার। চাঁদ নেই, তারপরও চাঁদের আলোর মতো আলো। কুহুর মাথা দুলছে। আচ্ছা সে কি এখন দড়ির খেলা দেখাচ্ছে? তার আশপাশে ঝোপঝাড় না। চোখ বড় বড় করে মানুষজন বসে আছে। সে নিজে দড়ির ওপর দিয়ে চোখ বন্ধ করে হাঁটছে। সহজ হাঁটা না, নাচের মতো করে হাঁটা। হাঁটা শেষ হওয়ামাত্র সে চোখ খুলবে। দর্শকদের হাততালি। কুর্নিশের ভঙ্গিতে এখন তাকে মাথা নিচু করতে হবে। তার গায়ের পোশাকটা এমন যে, মাথা নিচু করামাত্র তার শরীরের অনেকখানি দেখা যাবে। আবার হাততালি। তবে এবারের হাততালি এলোমেলো। দুয়েকজন শিস বাজাবে। দর্শকদের মধ্যে অতি বিশিষ্টদের কেউ কেউ চঞ্চল হয়ে উঠবেন। তাদের চঞ্চলতা অন্য ধরনের। তারা কুহুর সঙ্গে প্রাইভেটে পান খেতে চাইবেন। আলাপ-বিলাপ করতে চাইবেন। আলাপের শুরুটা সুন্দর–তোমার নাম কী?
কুহু। কুহুরানী।
ভালো খেলা শিখেছ। দড়ি থেকে কোনোদিন পড়ে যাওনি?
জি পড়েছি। খেলা যতক্ষণ চলে তখন পড়ি না। খেলা শেষ হইলে পড়ি। আপনার মতো বিশিষ্টজনরা যখন ডাকেন তখন পড়তে হয়।
সার্কাসের মেয়ে কতক্ষণ দড়িতে থাকবে? তাকে তো পড়তেই হবে।
.
কুহু থমলে দাঁড়াল। তার শাড়িতে কয়েকটা জোনাকি বসেছে। গায়ে জোনাকি বসা ভাল না। গায়ে প্রজাপতি বসা ভালো। বিয়ের পয়গাম আসে। জোনাকি বসলে বিয়ে ভাঙে। সব প্রজাপতিতে বিয়ের পয়গাম অবশ্য আসে না। যেসব প্রজাপতির ডানায় রঙ নেই, ডানা ধবধবে শাদা, সেসব প্রজাপতি মৃত্যুর খবর আনে।
জোনাকিগুলো গা থেকে সরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে না। জ্বলছে নিভছে জ্বলছে নিভছে। গয়নার মতো লাগছে। জোনাকির জ্বলা-নেভার মধ্যে তাল আছে। ব্যান্ডমাস্টার এই তালে বাজনা বাজালে ভালো হতো-দ্রিম দ্রিম। দা দিয় দিম। দ্রিমা দ্রিমা…কুহু বসে পড়ল। ব্যান্ডমাস্টারের বাজনা মাথার ভেতর বাজছে। মাথা তুলে রাখা যাচ্ছে না। কে যেন এই দিকে আসছে। লোকটাকে আগে দেখা যায় নি। হুট করে উদয় হয়েছে। কুহু কী করবে? লুকিয়ে যাবে? না-কি আগ বাড়িয়ে কথাবার্তা বলবে? যা করতে হয় এখনি করা দরকার। কুই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। জ্বরে মাথা ভারি হয়ে গেছে।
এইখানে কে? কে এইখানে?
পুরুষ মূর্তি এগিয়ে আসছে। হাতের হারিকেন বাড়িয়ে ধরেছে। হারিকেন নাড়িয়ে দূরের জিনিস দেখা যায় না। দূরের জিনিশ দেখতে টর্চ লাগে। লোকটা গাধা।
আমার নাম বজলু। আপনে কে?
আমি আসমানের পরী। হিহিহি।
বজলুর দৌড়ে কাছে চলে এল। আনন্দ এবং উত্তেজনায় সে কাঁপছে।
কুহুরানী না?
হুঁ। আমি কুহু। আমার খুঁজে বাইর হইছ?
সবেই বাইর হইছে। আপনে এত দূর চইল্যা আসছেন। মাশাল্লাহ।
বজলু তুমি ফেরত যাও। ম্যানেজাররে বলবা আমারে খুঁইজ্যা পাও নাই। আমি পালাইতেছি। বলতে পারবা না?
আপনে বললে পারব।
কুহু বজলুর হাত ধরল। আনন্দে বজলুর দম বন্ধ হবার মতো হল।
বজলু শোন, তোমার সাথে আমি ধর্ম ভাই পাতাইলাম। ভাই ভইনেরে দেখবে না?
অবশ্যই দেখবো।
এখন তুমি আমারে বলো এই রাস্তা বরাবর যদি আমি হাঁটা দেই কোনখানে যাব?
পাকা সড়কে গিয়া উঠবেন।
সড়ক কত দূর?
দূর আছে।
সড়কে গিয়া যদি উঠি বাস পাব না? হাত তুললে বাস খামব। থামব না?
জি থামব।
আমি রওনা দিলাম সড়ক বরাবর। দোয়া রাখবা।
আমি সাথে আসি?
কোনো প্রয়োজন নাই। তুমি ম্যানেজার সাবরে বলবা আমার কোনো সন্ধান পাও নাই। বলতে পারবা না?
পারব।
আচ্ছা তাইলে হাঁটা দেও। ভাই আগে যাবে তারপর ভইন। এই নেও একশটা টেকা নেও।
টেকা লাগব না।
আরে নেও নেও। ভইন ভাইরে দিতেছে।
বজলু টাকা নিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। কুহুরানী কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যে রাস্তায় তার খাবার কথা তার উল্টোদিকে হাঁটা দিল। সে নিশ্চিত বজলু ম্যানেজারকে নিয়ে আসতে গেছে।
কুহু হাঁটছে। তাকে অতি দ্রুত যেতে হবে। রাতের অন্ধকারে যতদূর যাওয়া যায়। মানুষ অন্ধকার ভয় পায়। আবার এই অন্ধকারই মানুষকে রক্ষা করে। কী আশ্চর্য!
.
বজলু ম্যানেজার ইয়াকুবকে নিয়ে এসেছে। ইয়াকুবের হাতে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ। ইয়াকুব থমথমে গলায় বলল, তোমার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছে এইখানে?
বজলু বলল, জি স্যার। ছাতিম গাছটা দেখতেছেন না? ছাতিম গাছের নিচে দাঁড়ায়েছিল।
সে কোনদিকে যাবে বলেছে?
এইদিকে স্যার পাকা সড়কের দিকে। চলেন হাঁটা দেই। দেরি কইরা লাভ নাই।
ইয়াকুব বলল, কুহুরে তুমি চিন না। আমি চিনি। কুহু যেই দিকে যাবে বলেছে সেই দিকে সে যাবে না। সে যাবে উল্টা দিকে। তোমার সঙ্গে সে ধর্ম ভাই পাতায়েছে না?
বজলু অবাক হয়ে বলল, জি।
কুহু সুযোগ পেলেই পালানোর চেষ্টা করে। একজনকে সে ধর্ম ভাই বানার। তার সাহায্য নেয়। শেষ পর্যন্ত পালাতে পারে না। তোমাকে নিশ্চয়ই টাকা পয়সাও কিছু দিছে?
বজলু শুকনা গলায় বলল, জি না স্যার।
তাহলে সম্ভবত তার সাথে টাকা নাই। টাকা থাকলে দিত। চল এখন সন্ধানে বাইর হই।
মোফাজ্জল করিম শোবার আয়োজন করছেন। তিনি জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। শেষবারের মতো তাকালেন জোছনার কবরের দিকে। টগর ফুলের গন্ধ আসছে। সব রাতে গন্ধ পান না। বাতাসের কারণে এটা হয়। আজ বাতাস আছে। শক্ত উত্তুরে বাতাস। উত্তুরে বাতাসের ভালো বাংলা উত্তরায়ণ। এর ইংরেজিটা কী? প্রতি রাতে তিনি তিনটা ইংরেজি শব্দ শেখেন। আজ বাদ পড়েছে। এশার নামাজও কাজা হয়েছে। মোফাজ্জেল করিম হঠাৎ লক্ষ করলেন, জোছনার কবরের পশ্চিম পাশের ফাঁকা জায়গাটায় কে যেন বসে আছে। শাড়িপরা একটা মেয়ে। মাটিতে হাত রেখে মাথা দোলাচ্ছে। মেয়েটা কে? জোছনা না তো? বজলু যেমন দেখা পায়, সে রকম? বাচ্চা একটা ছেলের হাত ধরে ঘোমটা মাথার একটা মেয়ে কবরের চারপাশে হাঁটে। এই কি সেই মেয়ে?
মোফাজ্জল করিম বজলুকে ডাকলেন। বজলু সাড়া দিল না। তাকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। সকালবেলা তার বাড়ি চলে যাওয়ার কথা। সে হয়তো রাতেই চল গেছে।
বজলু। বজলু। বজলু। আছ?
বজলু জবাব দিল না। বসে থাকা মেয়েটা উঠে দাঁড়াল। মোফাজ্জল করিম বললেন, তুমি কে? এই, তুমি কে?
মোফাজ্জল করিমের বুক ধকধক করছে। তিনি কি চোখে ভুল দেখছেন? যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে সে অবশ্যই জোছনা। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
এক্ষুণি সে হয়তো বাতাসে মিলিয়ে যাবে। বজলু তাই বলত। ঘোমটা পরা বউমতো একজন বাচ্চা একটা ছেলের হাত ধরে হাঁটে। ‘কে, কে’ বলে চিৎকার করলেই মিলিয়ে যায়।
জোছনা এগিয়ে আসছে তার জানালার দিকে। কার্তিক মাসের কুয়াশার ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে নারীমূর্তি। কাছেই কোথাও পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। টগর ফুলের গন্ধও তীব্র হয়েছে।
মোফাজ্জল করিম বললেন, শে?
নারীমূর্তি থাকে দাঁড়িয়ে বলল, পানি খাব।
তুমি কে?
পিয়াস লাগছে, পানি খাব।
তুমি সার্কাসের মেয়ে না?
হুঁ।
এখানে কী করো।
পানি খাব।
তোমার নাম কুহুরানী?
হুঁ।
আসো, ঘরে আসো। পানি খাও।
না।
মেয়েটা আবার বসে পড়েছে। ঘাসের ওপর হাত বোলাচ্ছে। তার মাথাত সামান্য দুলছে। মনে হচ্ছে, সে মাটিতে শুয়ে পড়বে। মোফজ্জল করিম গলা উঁচিয়ে ডাকলেন, বজলু, বজলু।
বজলু বাড়িতে নেই। সে রাতেই রওনা দিয়েছে। তার ঘর খালি। তোশক সুন্দর করে গোটানো।
.
মোফাজ্জল করিম কুহুকে বজলুর বিছানায় শুইয়েছেন। পরে কম্বল টেনে দিয়েছেন। মেয়েটা তারপরও শীতে কাঁপছে। জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। সে বারবার পানি খেতে চাচ্ছিল। পানিভর্তি গ্লাস দেওয়ার পর কিছুই খেতে পারল না। দু’চুমুক দিয়েই নেতিয়ে পড়ল।
মেয়েটার মাথায় পানি ঢালা দরকার। ডাক্তারকে খবর দেওয়া দরকার। সার্কাসের লোকজন কি জানে, মেয়েটা কোথায়? তাদেরও খবর দেওয়া দরকার। মেয়েটা খুব সম্ভব একা বেড়াতে বের হয়েছিল। পথ হারিয়ে এখানে চলে এসেছে।
কুহুরানী বিড়বিড় করে বলল, জয়নাল চাচা। আপনার ঠাণ্ডা হাত আমার কপালে রাখে।
মেয়েটা জ্বরের ঘোরে ভুল বকতে শুরু করেছে। জ্বর আর বাড়তে দেওয়া যাবে না। মাথায় পানি ঢালতে হবে। বজলু কি ঘরে পানি এনে রেখেছে? বজলুর কাজে কোনো শৃঙ্খলা নেই। এখন দেখা যাবে কলসি খালি।
জয়নাল চাচা, আমি সার্কাস থেকে পালিয়ে আসছি। এখন আমি আপনার সঙ্গে থাকব। আপনাকে বিয়ে করব। এক লাখ এক টাকা কাবিনে বিয়ে। অর্ধেক উসুল। ট্রেনে করে আমি আপনার সঙ্গে চলে যাব। চলন্ত ট্রেনের যাত্রীগণ! আসসালাম। আমি একজন অসহায় নাদান মানুষ। আমি আমার এই ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে আপনাদের পাকদরবারে…
টেবিলের ওপর এক জগ খাবার পানি ছাড়া ঘরে কোনো পানি নেই। মোফাজ্জল করিম বালতি হাতে কলের দিকে ছুটলেন। টিউবওয়েল বেশ দূরে। জুমাঘরের পাশে। ভরা বালতি নিয়ে এই বয়সে ফিরতে তার কষ্ট হবে। জোয়ান বয়সেই কষ্ট হয়েছে, আর এখন তো শেষ বয়স। জোছনার একবার হঠাৎ করে আকাশ-পাতাল জ্বর উঠল। মাথায় পানি ঢালবেন, ঘরে নেই একফোঁটা পানি। তাকে জুমা ঘরের চাপকল থেকে পানি আনতে হয়েছিল। বুকে হাঁপ ধরে গিয়েছিল। তিনি সারা রাত মাথায় পানি ঢাললেন। শেষ রাতে পাখপাখালি যখन ডাকতে শুরু করল তখন জোছনার জ্বর ধুম করে ছেড়ে গেল। সে বিছানায় উঠে বসে বলল, চায়ের মধ্যে পাউরুটি ভিজিয়ে খাব। ক্ষুধা লেগেছে। তিনি ইস্টিশনের টি-স্টল থেকে নিজেই পাউরুটি এনেছিলেন। সাইকেলে যেতে-আসতে এক ঘণ্টা লেগেছে।
আচ্ছা, এই মেয়েটার জ্বর যখন ছেড়ে যাবে তখন সে পাউরুটি খেতে চাবে না তো? মানুষের জীবনে অতীতে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাই আবার ফিরে আসে। মোফাজ্জল করিম মোটামুটি নিশ্চিত, এই মেয়েটার গা থেকে খুব নেমে গেলেই সে বিছানায় উঠে বসবে। গভীর গলায় বলবে, চায়ে ভিজিয়ে পাউরুটি খাব।
দুনিয়ায় কত রকম খাবার, সব ফেলে জোছনার পছন্দ ছিল চায়ে ভিজিয়ে পাউরুটি। আল্লাহপাক অবশ্যই তাকে বেহেশতে নসিব করেছেন। সে বেহেশতের বাগানে তার পুত্র মারুফুল করিমকে নিয়ে কত আনন্দেই না আছে। সেখানেও কি হঠাৎ তার চায়ে ভিজিয়ে পাউরুটি খেতে ইচ্ছা করে? ইচ্ছা করলে সে ব্যবস্থা আল্লাহপাক অবশ্যই করবেন। দুনিয়া হলো চেয়ে না পাওয়ার জায়গা। আর বেহেশত হলো না চেয়েও পাওয়ার জায়গা।
.
মোফাজ্জল করিম কুহুর মাথায় পানি ঢালছেন। পানি ঢালতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছে। কুহু দু’হাতে তার বাঁ হাত শক্ত করে ধরে আছে। কিছুতেই ছাড়ছে না। এক হাতে ঠিকমতো পানি ঢালা মুশকিল। পানির ধারা ঠিকমতো ফেলা যাচ্ছে না। কখনো বালিশে পড়ছে, কখনো মেয়েটার চোখে-মুখে পড়ছে। ঘরে থার্মোমিটার নেই। থার্মোমিটার থাকলে জ্বরটা দেখা যেত। কাল সকালেই পার্মোমিটার কিনে আনতে হবে। ঘরে কিছু ওষুধ-বিষুদও থাকা সরকার। কখন দরকার পড়ে, তার নেই ঠিক। মোফাজ্জল করিম একমনে দরুদে শেফা পড়ছেন। মাঝেমধ্যে কুহুর কপালে ফুঁ দিচ্ছেন।
বালতি দিয়ে পানি আনার সময় লক্ষ করেছেন, আকাশে মেঘ জমছে। কার্তিক মাসে কয়েকদিন ঝড়-বৃষ্টি হয়। এ ঝড়-বৃষ্টির নাম কাত্যায়নী। আজ থেকেই কি কাত্যায়নী শুরু হলো? কাত্যায়নীর বৃষ্টিতে ভিজে গোসল করলে সারা শীতকালে জ্বরজারি হয় না। কাত্যায়নীর বৃষ্টি শুরু হলে মেয়েটাকে বৃষ্টিতে গোসল করতে বলবেন। জোছনা প্রতি কাত্যায়নীতে বৃষ্টিতে গোসল করত। তারপরও অবশ্য তার জ্বর-সর্দি-কাশি লেগে থাকত।
