৬
প্রখর গ্রীষ্ম। আকাশ যেন অগ্নিবৃষ্টি করছে। রাজা চলছে পালকিতে। ছয় বেহারা পালকি টানছে। তাদের শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে। একজন বেহারা ভালো করে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। অসুস্থ হয়ে পড়েছে সে। রাজা বললেন, ‘আর একজন বেহারা জোগাড় করো।
কিন্তু গ্রামের নির্জন পথে বেহারা পাওয়া যাবে কী করে? মহা মুশকিল।’ শেষে আশার আলো দেখা গেল। দূরে গাছতলায় একটা লোক বসে আছে। লোকটার যা চেহারা তাতে মনে হয় এসব কাজ করার অভ্যাস হয়তো তার আছে।
বেহারাদের একজন লোকটার কাছে গিয়ে বলল, ‘চট্পট্ উঠে পড়, তো, পালকিতে একটু কাঁধ দিবি।’
লোকটা অম্লানবদনে উঠে এসে নির্দেশমতো কাঁধ লাগালো।
কিন্তু পালকিটা ঠিক সমান তালে চলছিল না। রাজা বুঝলেন লোকটার এ অভ্যাস নেই। তিনি সংস্কৃতে ঐ লোকটার উদ্দেশ্যে বললেন—
ক্ষণং বিশ্রাম্যতাং জাল্ম স্কন্ধন্ত যদি বাধতি।
এটি ছন্দে-গাঁথা শ্লোকের প্রথম চরণ। রাজা বলতে চাইলেন, ‘ওরে মূর্খ তোর কাঁধে যদি বেদনা বোধ করে থাকিস তা হলে একটু জিরিয়ে নে না।’
সঙ্গে সঙ্গে একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটে গেল। লোকটা পরিষ্কার সংস্কৃত ভাষায় উত্তর দিল—
ন বাধতে তথা স্কন্ধো যথা বাধতি বাধতে।
অর্থাৎ, আমার কাঁধে ততটা বেদনা বোধ করছি না যতটা করছি আপনার ঐ ‘বাধতি’ পদটির জন্যে।
ব্যাপারটা হল কি ‘বাধতি’ পদটায় ব্যাকরণের ভুল আছে, শুদ্ধ পদটি হবে ‘বাধতে’। লোকটি রাজার ভুল ধরিয়ে দিলো। শুধু ভুল ধরানো নয়, যে ছন্দে রাজা শ্লোকার্ধ রচনা করেছিলেন সেই ছন্দেই লোকটি তিলার্ধ দেরি না করে দ্বিতীয় চরণ রচনা করল। এতে প্রমাণিত হল সাধারণ শ্রমিক মনে করে যাকে পালকি বইবার কাজে নিয়োগ করা হয়েছিল, সে আসলে কবি।
রাজা অত্যন্ত লজ্জিত হলেন। পালকি থেকে নেমে তিনি সবিনয়ে লোকটিকে বললেন, ‘আপনি বিদ্বজ্জন। না জেনে আপনাকে পালকি বইবার কাজে নিয়োগ করেছি, আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি আপনার পরিচয় জানতে ইচ্ছুক।’
লোকটি উত্তর দিল, ‘আমি কবি, নাম কালিদাস।
রাজা সসম্ভ্রমে কালিদাসকে প্রণাম নিবেদন করলেন।
– সমাপ্ত –
