কালিদাস কাহিনী – ৪

রাজকুমারকে নীরোগ ক’রে দেবার পর রাজা কালিদাসকে আদর আপ্যায়ন ক’রে কথামত লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দান করলেন।

কালিদাস মহাজ্ঞানী ব্রাহ্মণ—অর্থে তাঁর কোন লোভ নেই। তাই উপহার পাওয়া সব অর্থই তিনি দানে ব্যয় করতে লাগলেন। আগে দান নেবার জন্য রাজবাড়িতে খুব লোকের ভিড় হ’তো। এখন তিনি এইভাবে দান করছেন ব’লে কয়দিন ধ’রে সেরূপ ভিড় হয় না।

রাজা প্রতিদিন যে শত সুবর্ণমুদ্রা দান করতেন, প্রার্থীর অভাবে তাও রাজা দান করবার সুযোগ পেলেন না। তাতে রাজা বিরক্ত হ’য়ে বললেন :

‘এখন থেকে তাহ’লে কালিদাসই দান-ধর্মাদি করুন, দরিদ্র-ভিক্ষুকের দুঃখদুর্দশা মোচন করুন!’

রাজার বিরক্তির কথা কালিদাসও শুনতে পেলেন! তিনি বুঝলেন—রুষ্ট নৃপতির কাছাকাছি থাকা সংগত নয়, অতএব কিছুদিনের জন্যে গা-ঢাকা দেওয়া উচিত।

এই ভেবে কালিদাস রাজার কাছে জানালেন :

‘মহারাজ! পুরুষ যদি দীর্ঘদিন একস্থানে থাকে, তবে সে কুয়োর ব্যাঙ-এর মতো স্বল্পজ্ঞানী হয়। এই কারণে দেশভ্রমণ পুরুষের পক্ষে একান্ত কর্তব্য। অতএব আমিও ভেবেছি, কিছুদিনের জন্য বাইরে যাবো।

রাজা বললেন :

‘বেশ, অল্পকাল আপনি ঘুরে ফিরে আসুন!’

কালিদাস, কোথায় যাবেন, ভাবতে গিয়ে ঠিক করলেন যে, রানী ভানুমতীর পিত্রালয়ে যাবেন।

ভানুমতীর পিতা ভোজরাজ বড় খেয়ালী মানুষ। তিনি ঘোষণা করেছেন, যে কেউ তাঁকে নতুন কবিতা শোনাতে পারবে, তাকেই তিনি চারি লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেবেন। ভোজরাজার সভায় আছেন কয়েকজন শ্রুতিধর পণ্ডিত। তাঁরা একবার কোন কিছু শুনলেই তা মুখস্থ ক’রে রাখতে পারতেন।

পুরস্কারের লোভে অনেক কবিই রাজসভায় এসে নতুন কবিতা পাঠ করেন। কিন্তু শ্রুতিধর পণ্ডিতগণ পরমুহূর্তেই আবার সেই কবিতা আবৃত্তি ক’রে বলেন যে, ঐ কবিতা বহু পুরোনো আর তা’ অনেক কাল তাঁদের মুখস্থ আছে।

তার ফলে সকল কবিই এখান থেকে ব্যর্থ হ’য়ে ফিরে যান।

কালিদাস ভাবলেন : ভোজরাজের সভায় গিয়ে তিনি পণ্ডিতদের জব্দ ক’রে দান করবার জন্য অনেক অর্থ নিয়ে আসবেন।

এই ভেবে কালিদাস ভোজদেশে যাত্রা করলেন।

যথাসময়ে কালিদাস ভোজরাজের সভায় উপনীত হ’য়ে একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন। কবিতাটির অর্থ হ’লো : ‘ভোজরাজের পিতা যজ্ঞদত্ত কালিদাসের কাছ থেকে অমুক সালের দশই বৈশাখ তারিখে আঠার লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ধার নিয়েছেন। তাঁর পুত্র বড় হয়ে এই ধার শোধ করবেন। তাঁর সভায় অমুক অমুক পণ্ডিত এর সাক্ষী।’

রাজা এবং রাজসভার শ্রুতিধর পণ্ডিতগণ তো এ কবিতা শুনে একেবারে থ’। তাঁদের আক্কেল গুড়ুম হ’য়ে গেলো। যদি কবিতাটি ঘুরোনো ব’লে স্বীকার করেন, তবে রাজাকে আঠার লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ধার শোধ করতে হয়। আর যদি কবিতাটি নতুন ব’লে স্বীকার করেন, তাহ’লেও কথামত চার লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দিতে হয়। তাঁরা পড়লেন উভয় সংকটে।

কালিদাস তাগিদ দিতে লাগলেন : ‘কোথায় মহারাজ, বলুন,—এ কবিতা কি নতুন, না পুরোনো!’

পণ্ডিতেরা কানাকানি করতে লাগলেন। রাজাও খানিকক্ষণ চুপ ক’রে থেকে পরে বললেন :

‘আজ আপনি বিশ্রাম করুন, পরে বিবেচনা ক’রে আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবো।’

কালিদাস জানতে চাইলেন—এই বিবেচনার মেয়াদ কত দিন।

রাজা বললেন :

‘মাত্র আজ রাত্রি।’

তখন কালিদাস রহস্য ক’রে বললেন :

‘বেশ, তাই হোক্‌! তবে এই সাক্ষীদের আটক ক’রে রাখুন, —কি জানি আবার রাত্রে যদি পালিয়ে যায়।’

এই ব’লে কালিদাস বিশ্রাম করবার জন্য চ’লে গেলেন।

কালিদাস চলে গেলে পর, রাজা শ্রুতিধর পণ্ডিতদের নিয়ে সভা করতে বসলেন। রাজা অবাক্ হ’য়ে বললেন :

‘আমি ভোজবাজির রাজা ব’লে জগদ্বিখ্যাত, আর এই ব্যক্তি এসে আমার উপর ভোজবাজি দেখিয়ে গেল! কি জানি, হয়তো আমার জামাতা বাবাজিরও এ ব্যাপারে কিছুটা যোগাযোগ থাকতে পারে। যাহোক্, এ বিষয়ে আমার কি কর্তব্য আপনারা আমাকে উপদেশ দিন।’

সভাবিচক্ষণ নামে এক পণ্ডিত তখন রাজাকে এক গল্প শোনালেন :

“এক বনে ছিল ধূর্তশিরোমণি নামে এক শেয়াল। সেই বনে ছিল এক বাঘ আর বাঘিনী। বাঘ আর বাঘিনীর এঁটো কাঁটা যা কিছু প’ড়ে থাকে, শেয়াল তাই খেয়েই দিন কাটায়।

শেয়ালের মনে বড় লোভ—ওদের কাছ থেকে টাকা তাজা মাংস কিছু খেতে পেলে হ’তো। তখন সে এক মতলব ঠিক করল। একদিন বাঘ শিকারের জন্যে গুহা থেকে বেরিয়ে গেছে—এমন সময় চারদিকে তাকাতে তাকাতে চুপি চুপি শেয়াল গেল বাঘিনীর কাছে।

মাটিতে চেপে ব’সে শেয়াল লেজ নাড়াতে নাড়াতে বাঘিনীকে ধকে ধকে বলতে লাগলো :

‘ব্যাটা বেল্লিক বাঘ গেল কোথায়? আমার কাছ থেকে মাংস ধার নিয়েছিল, সে ধার কবে শোধ করবে সে। দেখি তোর ঘরে কি মাংস আছে, আজ সব নিয়ে যাবো তবে ছাড়বো।’

শেয়ালের ধমকে বাঘিনী গেল বেজায় ঘাবড়ে। সে আঁকুপাঁকু ক’রে বললো :

‘আপনি একটু অপেক্ষা করুন : আমি তো এসব কিছু জানিনে— কর্তা আসুক, তখন যা হবার হবে।’

এখন, বাঘের আসা পর্যন্ত শেয়াল যদি অপেক্ষা করে, তবে তার প্রাণ যাবে। কাজেই তাড়াহুড়ো করে বিদায় হবার জন্যে সে আবার বললো :

‘স্বামী ঘরে না থাকলে গিন্নীকেই সব কিছু দেখাসাক্ষাৎ করতে হয়। যাহোক আমার আর আজ অপেক্ষা করবার সময় নেই। ঘরে যা কিছু মাংস আছে, নিয়ে আয়। আজ এই নিয়েই চ’লে যাই। হিসেবপত্র পরে যথাসময়ে করা যাবে’খন!’

বাঘিনীও ভাবলো : ভাই ভালো; যত শীঘ্র আপদ দূর করা যায়, ততই মঙ্গল!—এই ভেবে, ঘরে অল্পস্বল্প যা মাংস ছিল, তাই দিয়ে দিলো শেয়ালকে। শেয়ালও টাট্‌কা তাজা মাংস পেয়ে খুব খুশি হ’য়ে চ’লে গেলো।

বাঘ তার গুহায় ফিরে এলো রাত্তিরে। বাঘিনী তাকে সারাদিনের খবর জানালো, কিন্তু ভুলে গেলো শেয়ালের কথা বলতে!

পরদিন আবার বাঘ বেরিয়ে গেলে পরে শেয়াল এসে তম্বি করতে লাগলো। এদিনও বাঘিনী শেয়ালকে কিছু মাংস দিয়ে বিদায় করলো।

এই ভাবে দিনের পর দিন যায়—শেয়াল রোজই এসে মিথ্যে দেনার কথা ব’লে বাঘিনীর কাছ থেকে মাংস নিয়ে যায়। বাঘের আর মনে কাছে শেয়ালের কথা বলতে বাঘিনীর কোনদিনই আর থাকে না।

হঠাৎ বাঘিনীর একদিন মনে হ’লো শেয়ালের কথা। তখন সে শুনে তো বাঘ চটে অস্থির। সে বাঘকে শেয়ালের কথা জানালো।

বাঘিনীকে বললো :

‘তুমি একবার চোখ পাকালেই দেখতে শেয়াল কোথায় পালিয়ে যায়। তা’ না ক’রে ভয়েই অস্থির। এত ভীতু হ’লে কি সংসার চলে!’

বাঘের কথায় বাঘিনীর অভিমান হ’লো। তার চোখ থেকে জলের ধারা বইতে লাগলো।

বাঘ এবার তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো :

‘ঠিক আছে! তুমি আমাকে দেখিয়ে দেবে ঐ ব্যাটাকে—আমি ওকে শায়েস্তা করবো।’

বাঘিনী শান্ত হ’য়ে এবার বললো :

‘আচ্ছা! কাল তুমি বনে না গিয়ে ঐ বড় গাছটার আড়ালে থেকো! তারপর যখন শেয়াল আসবে, তখন যা করবার তাই করো।’

পরদিন বাঘ আর বনে গেলো না—সে তার গুহার কাছে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইলো।

তারপর যথাসময়ে অন্য দিনের মতই শেয়াল এলো চারদিকে তাকাতে তাকাতে। যখন বাঘকে ধারে কাছে সে দেখতে পেলো না, তখনই সে গুহার কাছে এসে মাটিতে লেজ আছড়াতে আছড়াতে হাঁক ছেড়ে জিজ্ঞেস করলো :

‘ব্যাটা বেল্লিক বাঘ কোথায় গেলো, ও কি আমার ধার শোধ করবে না?

বাঘ শুনতে পেলো শেয়ালের ঐ আস্ফালন। সে বেরিয়ে এলো গাছের আড়াল থেকে।

বাঘিনী শেয়ালকে ডেকে বললো :

‘ওগো মহাজন, এই যে তোমার খাতক আসছে ঋণ শোধ করতে।’

বাঘের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়েই শেয়াল লেজ গুটিয়ে পড়ি তো মরি ক’রে দিল এক ছুট্‌।

বাঘ বললো :

‘ওরে ব্যাটা, আমার এঁটো কাঁটা খেয়ে তোর দিন চলে, আর তুই কিনা আমায় ভাঁড়িয়ে মহাজন সেজে বসেছিস। দাঁড়া, বার করছি তোর মহাজনি!’

এই না ব’লে, বাঘও শেয়ালের পিছু পিছু ধাওয়া করলো।

শেয়াল দৌড়তে দৌড়তে তার গর্তের কাছে এসে পড়লো। বাঘ ও তাকে ধরে ফেললো আর কি।

এখন, একটা বটগাছের নীচেই ছিল শেয়ালের গর্ত। আর গর্তের মুখের কাছেই ছিল পাশাপাশি দু’টো বটের শিকড়। শেয়ালের ছোট্ট দেহখানা শিকড় দু’টোর মাঝখান দিয়ে অনায়াসে গ’লে বেরিয়ে যেতো।

শেয়াল দৌড়তে দৌড়তে শিকড়ের মাঝখান দিয়ে একেবারে গর্তে ঢুকে গেলো।

পিছু পিছু ছুটে আসছে বাঘ। শেয়ালকে গর্তে ঢুকতে দেখে সেও শিকড়ের মাঝখান দিয়ে গর্তে ঢুকতে চাইলো।

কিন্তু বাঘের এই বিরাট দেহ শিকড়ের মাঝখান দিয়ে গলবে কেন? কোনরকমে মাথাটা ঢুকে গলা আটকে গেলো শিকড়ের মাঝে।

বাঘ আর এগুতেও পারছে না আবার পিছনেও হতে পারছে না। তার গলায় ফাঁস লেগে গেলো। গলা দিয়ে কতক্ষণ ঘর্ ঘর্ করে আওয়াজ বেরুলো। বাঘের গর্জন শুনে শেয়াল ভয়ে দু’চোখ বন্ধ ক’রে প’ড়ে রইলো মড়ার মত।

খানিক বাদে বাঘের গর্জন গেলো থেমে—শিকড়ের ফাঁসেই বাঘের মরণ ঘটলো।

অনেকক্ষণ আর বাঘের গর্জন শুনতে না পেয়ে শেয়াল ভাবলো, বাঘ ব্যাটা কি তবে চ’লে গেছে!

সে আস্তে আস্তে এসে গর্তের বাইরে ঊকি দিলো। দেখলো, গর্তের মুখেই প’ড়ে আছে বাঘ। সে ভাবলো, বাঘটা বুঝি ওখানে ঘুমিয়ে আছে। ভয়ে শেয়াল আবার গর্তে ঢুকলো।

কিন্তু বাঘের তবু আর কোন সাড়াশব্দ নেই। শেয়ালের মনে সন্দেহ জাগলো, সে ভাবলো : বাঘ যদি ঘুমিয়ে থাকে তবে তো নাকি ডাকবে, কিন্তু তাও তো শুনতে পাচ্ছিনে। আবার একটু এগিয়ে এলো শেয়াল। এবার সমস্ত লক্ষণ দেখে বুঝলো যে শিকড়ের ফাঁসে ব্যাটা বাঘ অক্কা পেয়েছে।

শেয়ালের মুখে হাসি আর ধরে না। সে দৌড়ে গেলো বাঘিনীর কাছে—তারপর তাকে ডেকে বললো :

‘কেমন রে, তোর কর্তাকে তো পাঠিয়েছিলি আমার পেছনে। এখন আয়, দেখে যা, ব্যাটা বেল্লিকের অবস্থা। ঘাড় মটকে একেবারে খতম করে রেখে দিয়েছি আমার দরজায়।’

দৌড়ে এলো বাঘিনী। শেয়ালের গর্তের সামনে ম’রে প’ড়ে আছে বাঘ—দেখেই তো বাঘিনী হাউমাউ করে কান্না শুরু ক’রে দিলো।

শেয়াল তখন তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো :

‘আর কেঁদে কেটে কী হবে! যা তোর কপালে ছিল তাই হয়েছে। এখন আয়, আমার সঙ্গেই ঘরকন্না করবি, আমিই তোর দেখাশোনা করবো।’

বাঘিনী ভয়ে আর আপত্তি করতে পারলো না। তারপর থেকে সে শিয়ালের সঙ্গেই বাস করতে লাগলো। বাঘিনী শিকার ক’রে আনে, আর শিয়াল পরমানন্দে দিন কাটায়।’

এ অবধি ব’লে সভাবিচক্ষণ রাজাকে বললেন :

‘তাহ’লে দেখুন মহারাজ, মিথ্যা ঋণের অপবাদেও কী সাংঘাতিক ফল হ’তে পারে! কাজেই ঋণের অপবাদ রাখবেন না। ঐ ধূর্তশিরোমণির ঋণ স্বীকার করুন।

রাজা মন-মরা হ’য়ে বললেন :

‘তাহ’লে কি ঐ কবিই ধূর্তামো ক’রে আমার ওপর ভোজবাজি দেখিয়ে যাবে!’

পণ্ডিত বললেন :

‘না মহারাজ, তারও উপায় করতে হবে। ঐ নতুন কবি মিথ্যাচরণ করেছেন, কাজেই তাঁর সঙ্গে যদি মিথ্যাচরণ করা যায়, তাহ’লেও দোষ হবে না।—কালিদাস আপনার জন্যে যে ফাঁদ পেতেছেন তাঁকেই ঐ ফাঁদে ফেলবো।’

তখন পরামর্শ করে স্থির হ’লো যে রাজা কালিদাসের নিকট পিতার ঋণের কথাই স্বীকার করবেন।’

তারপর কি ভাবে কালিদাসকে ফাঁকি দিতে হবে—সেই সম্বন্ধে সমস্ত আলোচনা হ’লো।

পরদিন প্রাতঃকালে রাজা এবং পণ্ডিতগণ যথাসময়ে তৈরী হ’য়ে রাজসভায় আসন গ্রহণ করলেন।

খানিক পরেই কালিদাস এলেন রাজসভায়। তারপর তিনি পূর্বদিনের কবিতাটি আবার আবৃত্তি করলেন।

শ্রুতিধর পণ্ডিতেরাও সঙ্গে সঙ্গেই কবিতা পুনরায় আবৃত্তি ক’রে বললেন যে—এই কবিতা কোনক্রমেই নতুন নয়। এ কবিতা অনেক পুরোনো। কালিদাস অপরের লেখা কবিতা নিজের নামে চালিয়ে কবিত্বখ্যাতি লাভ করতে চাইছেন।

তখন কালিদাস বললেন :

‘আপনারা যখন এ কবিতার সাক্ষী তখন মহারাজ তাঁর পিতৃঋণ শোধ করবার জন্যে আমাকে আঠার লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দিতে ধর্মতঃ বাধ্য।’

শ্রুতিধর পণ্ডিতেরাও কালিদাসের কথা সমর্থন ক’রে বললেন :

‘হ্যাঁ মহারাজ! উপযুক্ত পুত্র অবশ্যই পিতৃঋণ শোধ করবেন! মহারাজ, আপনি ঋণ শোধের ব্যবস্থা করুন।’

রাজা তখন তাঁর স্বর্গীয় পিতৃদেবের লেখা একখানি পত্র এনে কালিদাসের হাতে দিলেন। পত্রখানি প্রকৃতই ভোজরাজের পিতা যজ্ঞদত্তের লেখা ছিল। এতে লেখা ছিল :

‘অয়নাংশমতে আষাঢ় সংক্রান্তির মধ্যাহ্নকালে এই নারিকেল গাছের উপর আমি অনেক স্বর্ণ রাখলুম। আমার পুত্র প্রাপ্তবয়স্ক হলেই এই অর্থ গ্রহণ করবে—নইলে দিব্য রইলো।’

এই পত্রের মর্ম-অনুযায়ী ভোজরাজা অনেক পূর্বেই নারিকেল গাছের উপর অর্থ অনুসন্ধান করেছেন—কিন্তু কোন অর্থ সেখানে পাওয়া যায়নি। রাজা সেই কথা গোপন রাখলেন। পণ্ডিতদের পরামর্শে কালিদাসকে ঠকানোর জন্যে তাঁর হাতে এই পত্রখানি তুলে দেওয়া হ’লো।

রাজা বললেন : ‘আপনি এই অর্থ উদ্ধার ক’রে আপনার পাওনা নিয়ে নিন।’

কালিদাস পত্রখানি প’ড়ে তার মূল অর্থ বুঝে নিলেন। তারপর রাজাকে বললেন :

‘আপনি পিতার সৎপুত্র, কুলপ্রদীপ। আপনি আপনার উপযুক্ত কাজই করেছেন। আমি আপনার স্বর্গীয় পিতার নির্দেশমতই অর্থ গ্রহণ করবো। কিন্তু চিঠিতে অর্থের কোন পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। এতে ঋণের সব অর্থ আদায় হবে কিনা বুঝে উঠতে পারছিনে।’

রাজাও রহস্য ক’রে বললেন :

‘অর্থের পরিমাণ যদি আপনার ঋণ-অপেক্ষা বেশি হয় তবে আপনি সেই অতিরিক্ত অর্থ আমাকে ফিরিয়ে দেবেন।’

কালিদাস বললেন :

‘সাধু সাধু? অবশ্য‍ই তাই তবে। কিন্তু যদি সেখানে আমার প্রাপ্য সমুদয় অর্থ পাওয়া না যায়, তবে নিশ্চয়ই বাকী টাকা দিতে আপনি বাধ্য থাকবেন।

রাজা তাই স্বীকার করলেন।

কালিদাস চিন্তা করতে লাগলেন—অয়নাংশমতে আষাঢ়-সংক্রান্তির মধ্যাহ্নকালে নারিকেল বৃক্ষের ছায়া ঠিক তার গোড়ায় থাকে। ছায়ারূপে গাছের অগ্রভাগ তার মূলে থাকে—কাজেই গাছের গোড়াই খুঁড়ে দেখা দরকার।

এই ভেবে তিনি গাছের গোড়া খুঁড়ে গাছ উপড়ে ফেলে দিলেন। নীচে পাওয়া গেলো পাঁচটি তামার ঘড়া-বোঝাই স্বর্ণমুদ্রা।

কালিদাসের বুদ্ধি দেখে সকলেই অবাক হলেন, অপ্রস্তুত হলেন! তাঁরা কল্পনাই করতে পারেননি— গাছের নীচে প্রকৃতই ধন পোঁতা আছে, এবং কালিদাস সেই ধন পেয়ে যাবেন। কিন্তু এখন আর কিছুই করবার নেই। কালিদাসকে ফাঁকি দিতে গিয়ে রাজা ভোজ নিজেই ফাঁকে পড়লেন!

পাঁচটি ঘড়ায় স্বর্ণমুদ্রা ছিল সব শুদ্ধ পাঁচ লক্ষ। আঠার লক্ষ স্বর্ণমুদ্রার এখন অনেক বাকী।

কালিদাস ভোজরাজকে লক্ষ্য ক’রে বললেন :

‘মহারাজ! এখনও অনেক অর্থ আপনার ঋণ রয়ে গেলো। তা’ শোধ করবার উপায় কি বলুন!’

রাজা এবং তাঁর সভাপণ্ডিতগণ নীরব হ’য়ে রইলেন।

তখন কালিদাস আবার বললেন :

‘এতদিন ধ’রে বহু কবিকে ঠকিয়েছেন; তার প্রায়শ্চিত্ত-স্বরূপ আপনার এই পাঁচ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা গেলো। আমি আর অর্থ চাইনে। কিন্তু প্রতিজ্ঞা করুন যে, ভবিষ্যতে আর কখনও কাউকে ঠকাবেন না। যদি কোন কবি প্রকৃতই আপনাকে নূতন কবিতা শোনাতে পারেন, তবে তাঁকে কথামত অর্থ দান করলেই আপনি ঋণমুক্ত হ’তে পারবেন। নতুবা পাপের ফলভাগী হ’তে হবে।’

রাজা লজ্জায় আর মুখ তুলতে পারলেন না। মাথা নীচু করেই কালিদাসের কথায় সায় দিলেন।

এই ভাবে ভোজরাজকে উপযুক্ত শিক্ষা দান করে কালিদাস আবার নিজের দেশে ফিরে এলেন।

অল্পকালের জন্য কালিদাস রাজসভা ত্যাগ করলেও রাজা বিক্রমাদিত্য কালিদাসের প্রতি আবার প্রসন্ন হ’য়ে উঠেছিলেন। কাজেই কালিদাস যখন ভোজরাজ্য থেকে ফিরে এলেন, তখন রাজা তাঁকে খুব সমাদরে গ্রহণ করলেন।

তারপর রাজা যখন শুনলেন যে, কালিদাস ভোজরাজকেও ঠকিয়ে এসেছেন, তখন তিনি খুব পুলকিত হলেন। তিনি খুঁটে খুঁটে সমস্ত ঘটনা শুনলেন; তারপর কালিদাসের অসাধারণ বুদ্ধি ও চাতুরীর কাহিনী শুনে তাঁকে আলিঙ্গন করলেন।

কালিদাস নির্লোভ ব্রাহ্মণ। তিনি যে ভোজরাজকে ঠকিয়ে পাঁচ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা এনেছিলেন, তা’ কেবল তাঁকে শাস্তি দেবার জন্যেই, নিজের ব্যবহারের জন্যে নয়। ভাই, তিনি এই স্বর্ণমুদ্রা নিজে ভোগ করলেন না। তিনি রাজার অনুমতি চাইলেন, এই ধন ব্রাহ্মণদের দান করবেন। রাজা খুব খুশী হলেন। পত্রদ্বারা ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণ ক’রে আনলেন রাজসভায়। কালিদাস তখন সমস্ত ধন ব্রাহ্মণদের দান ক’রে দিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *