কালিদাস কাহিনী – ২

মহাসমারোহে কালিদাসের সঙ্গে বিদ্যোত্তমার বিবাহ সম্পন্ন হল। বাসরে বসে আছেন দুজনে। বিদ্যোত্তমা জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখনও কি আপনি মৌনী রইবেন? কালিদাস তো নিজে থেকে আদৌ মৌনী থাকতে চান না, কথা বলতে পারলেই তো বেঁচে যান। কিন্তু হঠাৎ মৌনভঙ্গও তো করতে পারেন না। তিনি তাই বিমূঢ় দৃষ্টিতে চাইলেন বিদ্যোত্তমার দিকে? বিদ্যোত্তমা সেই দৃষ্টির একটা অর্থ মনে মনে আঁচ করলেন। বললেন, বুঝেছি। আপনি নিজে থেকে কিছু বলতে চান না, কিন্তু আমি যদি কিছু জিজ্ঞেস করি তার জবাব দেবেন এই তো?’ কালিদাস মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।

হঠাৎ কী একটা ডেকে উঠল বাইরে। বিদ্যোত্তমা চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ডাকল বলুন তো?’ কালিদাস জবাব দিলেন, ‘উষ্ট’। স্বামীর প্রথম কথা কানে গেল বিদ্যোত্তমার, কিন্তু তা মধুবর্ষণ না করে বিষবর্ষণ করল তার কানে। বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবার বলুন তো কী ডাকছে?’

কালিদাস হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, ‘উট্র’।

এবারে বিদ্যোত্তমা বুঝতে পারলেন পণ্ডিত বলে যিনি প্রতিপন্ন হয়েছিলেন আসলে তিনি মহামূর্খ।

কপালে করাঘাত করলেন বিদ্যোত্তমা—উষ্ট্র বলতে একবার যে ‘র’ লোপ করলেন, আর-একবার করলেন ‘ষ’ লোপ, তাকেই কিনা ঘটনাচক্রে আমি পতিরূপে বরণ করেছি?’

বিদ্যোত্তমার দুঃখ ক্রোধে পরিণত হল। কালিদাসকে ধিক্কার দিয়ে বললেন, ‘ধূর্ত আমি তোমার কী ক্ষতি করেছিলাম যে আমাকে প্রবঞ্চিত করলে। মূর্খ, আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও।’

কালিদাস ভাবলেন, তার পত্নী সঙ্গত কারণেই ক্রুদ্ধ হয়েছেন। বিদূষী পত্নী মূর্খ স্বামীকে সহ্য করবেন কেন? পত্নীর ধিক্কার সহ্য করার চেয়ে মৃত্যুই আমার শ্রেয়ঃ।

এই ভেবে তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লেন। লজ্জায়, ক্ষোভে, দুঃখে তিনি আত্মহারা। কোথায় চলেছেন কিছুই খেয়াল নেই। চলতে চলতে এক গভীর বনে প্রবেশ করলেন।

সেখানে গিয়ে দেখলেন নিবিড় অন্ধকারে এক মহা সিদ্ধপুরুষ নীলসরস্বতীর মন্ত্র জপ করছেন। কালিদাস দাঁড়ালেন সেখানে। সেই সিদ্ধ মন্ত্র কানে যেতেই তিনি দিব্যজ্ঞান লাভ করলেন। তারপর এক শ্মশানে শবের উপর বসে তিনি নীলসরস্বতীর আরাধনা করতে লাগলেন। কত রকম বিভীষিকা দেখা দিলো তাঁর সামনে—কিন্তু তিনি ভয় না করে সারারাত সাধনা ক’রে চললেন। অবশেষে নিশাবসানে নীলসরস্বতী তাঁর সামনে আবির্ভূ তা হলেন। বললেন :

‘সারস্বতকুণ্ড থেকে স্নান ক’রে এসো।’

কালিদাস সারস্বতকুণ্ড থেকে স্নান ক’রে দুটি পদ্মফুল তুলে এনে দেবীর অঞ্জলি দান করলেন। অকস্মাৎ তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো অপূর্ব ছন্দোবদ্ধ এক শ্লোক।

সুপ্রসন্ন হ’য়ে নীলসরস্বতী বললেন ‘বর প্রার্থনা কর।’

কালিদাস বর চাইলেন, ‘মহাবিদ্যা!’ নীলসরস্বতী তখন কালিদাসকে মহাবিদ্যা দান ক’রে বললেন :

‘এখন থেকে আমি সর্বক্ষণ তোমার রসনায় বাস করবো। যখনি তুমি ইচ্ছা করবে, তখনি আমার এ রূপ তুমি দেখতে পাবে।’

তারপর কালিদাসের সর্বপ্রকার জড়তা দূর করবার উদ্দেশ্যে দেবী কালিদাসকে সারস্বতকুণ্ডের জল আনতে বললেন। পাতার ঠোঙায় ক’রে কালিদাস কুণ্ডের জল নিয়ে এলে দেবী তা’ প্রসাদ ক’রে দিলেন। কালিদাস দেবীর প্রসাদ গ্রহণ করে একটু অবশিষ্ট রেখে দিলেন পত্নীর জন্যে।

দেবীর প্রসাদ সবটুকু গ্রহণ না করার অপরাধে একবার কালিদাস দিগ্বিজয়ী হয়েও কর্ণাট-সম্রাট্-বনিতার নিকট অপমানিত হয়েছিলেন।

যাহোক্, কালিদাস দেবীকে প্রণাম ক’রে ফিরে এলেন। ফিরবার পথে প্রসাদের অবশিষ্ট অংশ ঘটকর্পর নামক এক কুমোরের ঘরে রেখে এলেন। তাকে এই বলে কালিদাস ভয় দেখালেন যে এতে বিষ আছে—কেউ যেন এটা না খায়।

এই বলে কালিদাস গেলেন রাজবাড়িতে তাঁর স্ত্রীর নিকটে।

বিদ্যোত্তমা স্বামীকে ভৎসনা করবার পর থেকেই মনোদুঃখে ঘরে খিল দিয়ে বসেছিলেন। কালিদাস দরজায় ধাক্কা দিয়ে বললেন : ‘অস্তি কশ্চিদ্বাগ্বিশেষঃ (বিশেষ কথা আছে)। দরজা খোল। দরজা খোল।

বিদ্যোত্তমা মূর্খ স্বামীর মুখে শুদ্ধ সংস্কৃত ভাষা শুনে বিস্মিত হলেন। তবু মনের সন্দেহ ঘুচাবার জন্য বললেন : ‘ যে চারটি শব্দের সাহায্যে এই বাক্য রচনা করেছেন, এদের প্রত্যেকটি শব্দের সাহায্যে এক একটি বাক্য রচনা করুন—তবেই দরজা খুলবো।

তখন কালিদাস ‘অস্তি’, ‘কশ্চিৎ’, ‘বাক্’ এবং ‘বিশেষঃ’—এই চারটি শব্দ আদিতে রেখে চারটি বাক্য রচনা করে ফেললেন। তারপর বললেন : ‘এই নিয়ে আমি চারখানা কাব্য রচনা করবো।’

কাব্য? এই তো মনে প্রাণে চেয়েছিলেন বিদ্যোত্তমা, শুধু পণ্ডিত নয়, তাঁর স্বামী হবেন কবি। আনন্দে অধীর হয়ে দুয়োর খুলে দিলেন বিদ্যোত্তমা। তাঁর সৌভাগ্যের দুয়োরই যেন খুলে গেল। ভিতরে এলেন কালিদাস। স্বামীর চরণে লুটিয়ে পড়লেন বিদ্যোত্তমা।

কালিদাস তাঁর প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন। ‘অস্তি’ ‘কশ্চিৎ’ আর ‘বাক্’ এই তিনটি শব্দ তিনটি উৎকৃষ্ট কাব্যের প্রথম শ্লোকের প্রথম শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেন! ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যের প্রথম শব্দ ‘অস্তি’—

অস্ত্যত্তরস্যাং দিশি দেবতাত্মা
হিমালয়ো নাম নগাধিরাজ;

শ্লোকের প্রথম চরণের প্রথম শব্দটি ‘অস্তি’।

‘কশ্চিৎ’ শব্দটি তিনি ‘মেঘদূত’ কাব্যের প্রথম শব্দ হিসেবে

ব্যবহার করেন—

কশ্চিৎ কান্তবিরহগুণা স্বাধিকারাপ্রমত্তঃ।
‘বাক্’ কথাটি আছে রঘুবংশ কাব্যের প্রথম শ্লোকে—

বাগর্থাবিব সম্পৃক্তৌ বাগর্থ প্রতিপত্তয়ে
জগতঃ পিতরং বন্দে পার্বতপরমেশ্বরৌ

‘বিশেষঃ’ দিয়ে শুরু এমন কোনো কাব্য অবশ্য কালিদাসের নামে পাওয়া যায় নি। আসলে বাগ, বিশেষঃ কথাটির মধ্যে ‘বাক্ কথাটিই প্রধান। প্রয়োগের দিক্ দেখে ‘বাক্’ বা বাক্‌বিশেষঃ প্রায় একই।

আমরা কল্পনা করতে পারি কালিদাস এইসব কাব্য রচনার সময় পড়ে পড়ে শোনাতেন বিদ্যোত্তমাকে।

ওদিকে কালিদাস ঘটকর্পরের ঘরে যে সরস্বতীর প্রসাদী জলের অংশ রেখেছিলেন, সেটা ও-ভাবেই ছিল! একদিন আত্মীয়দের সঙ্গে কলহ ক’রে বিষপানে আত্মহত্যা করবার জন্য ঘটকর্পর বিষ মনে ক’রে সেই জল খেয়ে ফেললেন। তার ফল হ’লো বিপরীত। ঘটকর্পর মরলেন না। তিনিও পরে কালিদাসের মতই পণ্ডিত এবং কবি হ’য়ে উঠেছিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *