কালিদাস কাহিনী – ১

অনেকদিন আগেকার কথা। শারদানন্দ নামে এক রাজা ছিলেন। বিদ্যোত্তমা নামে তাঁর এক কন্যা ছিল। কন্যা ছিলেন খুব রূপবতী, তার উপর বিদ্যায় ও বুদ্ধিতে তাঁর তুলনা ছিল না।

বিদ্যোত্তমার পণ ছিল, যিনি পাণ্ডিত্যে তাঁকে পরাজিত করতে পারবেন, তাঁরি গলায় তিনি বরমাল্য দেবেন।

এ খবর পেয়ে বহু যুবক এবং বৃদ্ধ পণ্ডিত বিদ্যোত্তমার পাণিপ্রার্থী হ’য়ে আসতেন; কিন্তু তাঁর কাছে তর্কে পরাজিত হ’য়ে লজ্জায়, অপমানে পালিয়ে যেতেন।

একবার একদল পণ্ডিত এইভাবে অপমানিত হ’য়ে সবাই মিলে যুক্তি করলেন—কোন মহামূর্খের সঙ্গে এই মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। এই ভেবে তাঁরা এক মূর্খ লোক খুঁজতে বেরিয়ে পড়লেন।

একদিন তাঁরা দেখেন, এক যুবক একটি গাছের উঁচু ডালে বসে সেই ডালেরই গোড়া কাটছে। তাই দেখে পণ্ডিতেরা ভাবলেন—এর চেয়ে মূর্খ আর কেউ হ’তে পারে না! এই ভেবে তাঁরা তাকে ডেকে নামালেন।

যুবকটির চেহারা ছিল বেশ ভালো। পণ্ডিতরা ভাবলেন, একে সাজিয়ে-গুজিয়ে নিলে ভালোই দেখাবে। তাই জিজ্ঞেস করলেন— বিয়ে করবে?

বিয়ের নাম শুনে যুবক ভারী খুশী। সে জবাব দিল-হ্যাঁ করব।

পণ্ডিতরা বললেন—বেশ তাহ’লে চলো আমাদের সঙ্গে।

মূর্খ আনন্দে মাতোয়ারা হ’য়ে চললো পণ্ডিতদের সঙ্গে। পণ্ডিতেরা তাকে নতুন কাপড় পরিয়ে, গলায় নতুন পৈতে দিয়ে, গঙ্গামাটি দিয়ে কপালে ফোঁটা তিলক এঁকে, হাতে এক নস্যের কৌটা দিয়ে নিয়ে চললেন রাজসভায়।

পথে তাকে শিখিয়ে দেওয়া হ’লো—রাজসভায় সে যেন কোন কথা না বলে। কেবল মাত্র আকার-ইঙ্গিতে যা খুশি দেখাতে পারবে। তবেই রাজকন্যার সঙ্গে তার বিয়ে হ’তে পারে।

সকলে রাজসভায় গিয়ে পৌঁছলেন। নবীন যুবকটিকে দেখে সকলে এর পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। পণ্ডিতেরা বললেন : ‘ইনি একজন মহামহোপাধ্যায় বিদ্যাসাগর। নির্জনে বসে শুধুই শাস্ত্র-চিন্তা করেন। ইনি মৌনী এবং ব্রহ্মচারী—আকারে-ইঙ্গিতে প্রশ্নের জবাব দেবেন।’

যুবকটি এতবড় পণ্ডিত, বিদ্যোত্তমা তা বিশ্বাস করতে পারলেন না তিনি নানারূপ সন্দেহ প্রকাশ করতে লাগলেন। তখন সেই মূর্খ প্রথম আটটি আঙুল দেখালো, তারপর আঙুলগুলি বাঁকালো। তারপর একবার পণ্ডিতদের দিকে এবং পরে বিদ্যোত্তমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো।

রাজকন্যা এর অর্থ বুঝতে না পেরে পণ্ডিতদের বললেন : ‘এ সংকেতে তো কিছুই বোঝা গেলো না।’

পরাজিত পণ্ডিতেরা তখন বললেন :

‘আপনি তাহ’লে পরাজিত হলেন। বিদ্যার মধ্যে অভিনয় অন্যতম বিদ্যা—আপনি সে বিদ্যা জানেন কারণ সকল প্রকার না। দ্বিতীয়তঃ, তিনি যে সংকেত করেছেন, তার অর্থ হলো— জ্ঞানোপদেশের জন্যে পণ্ডিতগণ যেন আপনাকে অষ্টাবক্র-বন্দি-সংবাদ বলেন।’

বিদ্যোত্তমা তখন নিতান্ত অপ্রস্তুত হ’য়ে অষ্টাবক্র-বন্দি-সংবাদ জানতে চাইলেন।

একজন পণ্ডিত তখন বললেন :

পূর্বে উদ্দালক নামে এক মুনি ছিলেন। কহোড় নামে এক ব্রাহ্মণ তাঁর কাছে বেদাদি অধ্যয়ন করতেন। কালক্রমে কহোড় অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করলে উদ্দালক তাঁর কন্যা সুজাতাকে কহোড়ের হস্তে অর্পণ করলেন।

যথাকালে সুজাতা গর্ভবতী হলেন। ঈশ্বরের অনুগ্রহে তাঁর সন্তান গর্ভে থেকেই প্রচুর জ্ঞান আহরণ করলো। কহোড় স্বীয় শিষ্যদের যে সব শাস্ত্রব্যাখ্যা শোনাতেন, মাতৃগর্ভে থেকেই তাঁর সন্তান সেই শাস্ত্রও শিখে ফেললেন।

কহোড়মুনি সারারাত জেগে বেদ অধ্যয়ন করতেন। একদিন তিনি সকালবেলা শিষ্যদের পাঠ দিচ্ছেন, এমন সময় তাঁর উচ্চারণে এক জায়গায় ভুল হ’য়ে গেলো।

মাতৃগর্ভে থেকেই তাঁর সন্তান পিতাকে লক্ষ্য ক’রে বললেন :

‘আপনি রাত জেগে পড়াশোনা করেন বলে আলস্য, তন্দ্রা এবং জড়তা আপনাকে আক্রমণ করেছে—আপনি তাই ভুল উচ্চারণ করলেন।

নিজের অজাত সন্তানের কাছে শিষ্যদের সামনে এই ভাবে অপদস্থ হ’য়ে কহোড়মুনি পুত্রকে অভিশাপ দিলেন :

এই সংবাদ শুনে অষ্টাবক্র তাঁর প্রতিশোধ নেবার জন্য আকুল হয়ে উঠলেন।

সেই উদ্দেশ্যে মাতুল শ্বেতকেতুকে সঙ্গে নিয়ে মিথিলা-অভিমুখে যাত্রা করলেন।

যথাসময়ে তাঁরা মিথিলায় গিয়ে উপস্থিত হলেন। বিরাট রাজপ্রাসাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দ্বারী এসে পথ রোধ করে দাঁড়াল। বললো :

‘শিশুদের এই সভায় প্রবেশ নিষেধ। একমাত্র জ্ঞানী, বিচক্ষণ, প্রবীণ পণ্ডিতেরাই সভায় প্রবেশ লাভ করতে পারেন।’

অষ্টাবক্র উত্তর করলেন :

‘বয়সেই মানুষ শুধু বৃদ্ধ হয় না, জ্ঞানেই প্রকৃত বৃদ্ধ হয়। আমি জ্ঞানবৃদ্ধ—আমাকে পথ ছেড়ে দাও।’

এই বলে তিনি অদ্ভুত নিপুণতার সঙ্গে রাজার প্রশস্তিবাচক শ্লোক পাঠ করলেন। রাজসভা থেকে রাজা সেই শ্লোক শুনতে পেয়ে বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি এগিয়ে এসে অষ্টাবক্রকে সভায় নিয়ে গেলেন।

অষ্টাবক্র জানতে চাইলেন, বন্দী কে? তাঁকে তিনি পরাজিত ক’রে জলমগ্ন করবেন। তখন রাজা তাঁকে বললেন :

‘আমার তিনটি প্রশ্নের উত্তর করতে পারলেই তোমাকে বন্দীর সামনে হাজির করবো।’

তারপর রাজা পরপর তিনটি প্রশ্ন করলেন, অষ্টাবক্র তিনটি প্রশ্নেরই অতি সন্তোষজনক উত্তর দিলেন। তখন রাজা তাঁকে বন্দীর সামনে উপস্থিত করলেন।

অষ্টাবক্রকে সম্মানের সহিত সোনার সিংহাসনে বসতে দেওয়া হ’লো। তিনি তাতে বসেই চোখ পাকিয়ে বন্দীকে বললেন :

‘বহু ব্রাহ্মণকে জলমগ্ন ক’রে যে পাপ করেছেন, আজ আপনাকে সেই পাপের প্রতিফল ভোগ করতে হবে। বলুন—কী প্রশ্ন আছে আপনার?’

বারো বছরের এক কিশোর বালককে পণ্ডিতশ্রেষ্ঠ বন্দীর সঙ্গে এরূপভাবে কথা কথা বলতে দেখে সভাশুদ্ধ লোক ভয়ানক বিস্মিত হলেন।

অষ্টাবক্র ও বন্দীতে প্রশ্নোত্তর হ’তে লাগলো। দর্শকেরা পরম কৌতুকের সঙ্গে উপভোগ করতে লাগলেন। হ’তে হ’তে শেষ পর্যন্ত বন্দী ঠেকে গেলেন। বালক অষ্টাবক্রের জয় ঘোষিত হ’লো।

এবার অষ্টাবক্র বললেন :

‘বন্দী এবার জলশায়ী হোন্—আমার পূর্বপুরুষগণ তৃপ্তি লাভ করুন।’

হেসে বললেন বন্দী :

‘জল থেকে আমার ভয় নেই, কারণ আমি জলাধিপতি বরুণের পুত্ৰ। আর আমি যে সমস্ত মুনিঋষিদের জলমগ্ন করেছি, তাঁরা কেউ মৃত্যুবরণ করেননি। আমার পিতা যজ্ঞ করছেন, আমি ছল ক’রে তাঁদের সেই যজ্ঞশালায় পাঠিয়েছি। আজই সেই যজ্ঞ শেষ হবে,—তোমার পিতাকে সঙ্গে নিয়ে অপর সব মুনিরাও আজ ফিরে আসবেন।’

বন্দীর কথায় অষ্টাবক্র বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন, তাকে বালক পেয়ে বন্দী ছলনা ক’রে ভুলাচ্ছেন। তাই অষ্টাবক্র জনক রাজাকে অনুরোধ ক’রে বললেন :

‘মহারাজ, বন্দী বালক পেয়ে আমাকে ভুলাচ্ছেন, আপনি ন্যায়ধর্মের অনুরোধে ওঁকে দড়িতে বেঁধে জলে ডুবিয়ে দিন।

কথা শুনে বন্দী হেসে উঠলেন :

‘কষ্ট ক’রে আর আমাকে জলে ডুবিয়ে দিতে হবে না—আমি নিজের ইচ্ছাতেই জলের ভিতর যাচ্ছি।’

এই বলে বন্দী জলমগ্ন হলেন। মুহূর্তকাল পরেই আবার উঠে এলেন জল থেকে—তাঁর সঙ্গে এলেন কহোড় এবং অন্যান্য মুনিগণ।

কহোড় পুত্রের পরিচয় পেয়ে সানন্দে তাকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর রাজার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চললেন নিজের বাড়ির দিকে। পথে কহোড় পুত্রকে নদীতে স্নান করতে বললেন। স্নান করবার পর অষ্টাবক্রের দেহের বক্রতা দূর হয়ে গেলো।

* * *

পণ্ডিত অষ্টাবক্র-বন্দি-সংবাদ শেষ করলেন। তারপর সেই পণ্ডিত বিদ্যোত্তমাকে বললেন :

‘আপনি এই মৌনী পণ্ডিতকে বয়সে অল্প দেখেই এর পাণ্ডিত্য-সম্বন্ধে সন্দিহান হয়েছিলেন। তাই অষ্টাবক্রের কাহিনী দ্বারা ইনি ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন যে, বৃদ্ধ হলেই বুদ্ধিমান্ হয় না—সাধনাদ্বারা বালকও বিচক্ষণ পণ্ডিত হতে পারেন।’

বিদ্যোত্তমা এবার ভাবলেন, তিনিও সংকেতে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবেন। তখন রাজকন্যা মূর্খকে একটি আঙুল দেখালেন।

মূর্খ ভাবলো—কন্যা বুঝি তার এক চোখ কানা ক’রে দেবার জন্যে এক আঙুল দেখালেন। ভয়ে সেই মূর্খ তখন কন্যাকে দেখালো দুই আঙুল—কন্যার দুই চোখই সে কানা ক’রে দেবে।

পণ্ডিতেরা তখন জয়োল্লাস ক’রে উঠলেন। তাঁরা বললেন : ‘বিদ্যোত্তমা একটি আঙুল দেখিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন, এই জগতের স্রষ্টা এক—অর্থাৎ পুরুষ। গুরুদেব তার জবাবে বলেছেন, না, জগতের স্রষ্টা হলেন দুই—পুরুষ ও প্রকৃতি। তাই গুরুদেব দুটি আঙুল দেখিয়েছেন।

এইভাবে নানাজনের চক্রান্তে বিদ্যোত্তমা পরাজয় স্বীকার করলেন! তখন সেই মূর্খের সঙ্গেই তাঁর বিয়ে হ’লো।

এই মূর্খই পরবর্তীকালে জগৎপ্রসিদ্ধ মহাকবি কালিদাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *