৫
কর্ণাট প্রদেশের রাজা নিজে খুব বিদ্বান্ ছিলেন, তেমনি বিদ্বানদের খুব আদর করতেন। তিনি কারো পাণ্ডিত্যের পরিচয় পেলে তাঁকে উপযুক্ত মর্যাদা এবং পুরস্কার দিতে কখনও দ্বিধা বোধ করতেন না।
বল্লন ছিলেন কর্ণাটরাজের সভাকবি। তিনি যত বড় কবি ছিলেন, তার চেয়ে বেশি ছিল তাঁর ভড়ং। তিনি ভাবতেন : তাঁর চেয়ে বড় কবি বুঝি আর কেউ নেই। আর যে সব কবি তোষামোদ ক’রে বল্লনকে তুষ্ট করতে না পারতেন, তাঁরা রাজার সঙ্গে দেখা করতে পারতেন না। আর রাজার দেখা না পেলে তাঁর হাত থেকে কোন পুরস্কার লাভও সম্ভব নয়!
কাজেই রাজার সঙ্গে যাঁরা দেখা করতে চাইতেন তাঁরা নানাভাবে বল্লনকে তোষামোদ করতেন। এই সমস্ত কারণেও বল্লনের মনে খুব অহংকার হয়েছিলো।
ছোট ছোট কবিরা যখন রাজসভায় আসতে চাইতেন, তখন বল্লন কিন্তু অনায়াসে তাঁদের রাজসভায় প্রবেশ করবার সুযোগ দিতেন। আর সেখানে রাজার সামনে তাঁদের পরাজিত ক’রে বাহবা পেতেন বল্লন। আবার সেই কবিদেরও অল্পস্বল্প পুরস্কার দিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করতেন।
যদি কোন বড় কবি রাজার দর্শন কামনা করতেন, তখনই বল্লনের মনে ঢুকতো ভয়। তিনি নানা প্রকারে চাতুরী ক’রে তাঁকে তাড়িয়ে দিতেন—রাজসভা পর্যন্ত আর ঢুকতে দিতেন না। কারণ, তাঁর মনে তখন ভয় হ’তো, পাছে রাজার সামনে সেই কবি বলনকে পরাজিত ক’রে বসেন!
কর্ণাটরাজের দান করার কথা এবং তাঁর সভাকবি বল্লনের চাতুরীর কথা ক্রমে উজ্জয়িনীর রাজসভায় এসে পৌঁছলো! কালিদাস ভাবলেন : কর্ণাটের রাজসভা থেকে ভালোমত একটা পুরস্কার লাভ করতে হবে—আর বল্লনের চাতুরীও ভাঙতে হবে।
কালিদাস কিছুদিনের জন্যে ছুটি চাইলেন। উজ্জয়িনীর রাজা তাতে রাজী হলেন। কারণ, কালিদাস যদি কর্ণাটরাজের সভাকবিকে পরাজিত করতে পারেন, তাহ’লে তা’ উজ্জয়িনীরাজেরও আনন্দের কারণ হবে।
বররুচি বললেন, তিনিও যাবেন কালিদাসের সঙ্গে। শেষে কালিদাস আর বররুচি দু’জনেই চললেন কর্ণাটরাজ্যের দিকে।
কালিদাস হলেন কবি আর বররুচি সাজলের তাঁর ভৃত্য। যথাকালে কালিদাস আর বররুচি গিয়ে পৌঁছলেন কর্ণাটরাজ্যে। গিয়ে দেখা দিলেন তাঁরা রাজকবি বল্লনের সামনে।
এখন বল্লন তো পরীক্ষা না ক’রে তাঁকে রাজার সামনে উপস্থিত করতে পারেন না। কি জানি এঁর কবিত্ব-প্রতিভা যদি বল্লনের চেয়ে বেশি হ’য়ে যায়।
তাই এখানেও বল্লন চাইলেন কবির প্রতিভার পরিচয়।
কালিদাস কবিশ্রেষ্ঠই শুধু নন, তিনি চতুরচূড়ামণিও বটেন। তাই চাতুরীতেই তিনি বল্লনকে পরাস্ত করবেন, ঠিক করলেন।
কালিদাস আবৃত্তি করলেন একটা কবিতা। সেই কবিতার অর্থ হ’লো :
‘রাজা সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মুখ ধোন, আর নগরে কুক্কুটগুলি চবৈ তুহি চবৈ তুহি করছে।’
অত্যন্ত সাধারণ এবং নিম্নস্তরের কবিতা। আবার এর মধ্যে ভুলও আছে। শব্দেও ভুল এবং মিলও ঠিক নেই।
কবিতা শুনে বলন ভাবলেন : এ ব্যাটা একেবারে নিরেট মূর্খ; কাজেই একে রাজার কাছে নিয়ে গিয়ে নিজের বাহাদুরি বেশ আচ্ছা করেই জাহির করা যাবে!
এই ভেবে তিনি কালিদাস আর তাঁর ভৃত্যকে নিয়ে চললেন রাজদর্শনে।
যেতে যেতে পথে তাঁরা দেখলেন একটা বৃষ। কালিদাসের সঙ্গে একটু রগড় করবার উদ্দেশ্যেই বল্লন তাঁকে বৃষের সম্বন্ধে একটা কবিতা রচনা করতে বললেন।
এবারও কালিদাস চাতুরী অবলম্বন করলেন! তিনি অত্যন্ত সাধারণ একটা কবিতা রচনা করলেন। কবিতার অর্থ হ’লো :
‘গোরুর বাচ্চা বৃষ। মুখে সে ঘাস খায়; তার লেজ আছে এবং শিং-ও আছে।’
এমন একটি বাজে কবিতা শুনে বলনের মুখে হাসি আর ধরে না। ভাবলেন : এই নিরেট মূর্খকে রাজার কাছে নিয়ে হাজির করলে বেশ রগড় হবে।
কালিদাসের কবিতা দু’খানা টুকে রাখলেন কবি বল্লন!
তারপর তাঁরা এগিয়ে চললেন রাজসভার দিকে। রাজসভায় উপনীত হ’য়ে তিনি রাজার কাছে কবির পরিচয় দিয়ে বললেন :
‘এই কবির লেখা দু’খানা উৎকৃষ্ট কবিতা আছে এই ভূর্জপত্রে। মহারাজ নিজে বিচার করুন।’
এই ব’লে যে ভূর্জপাতায় কালিদাসের কবিতা দু’খানা লিখে রেখেছিলেন, তা এগিয়ে দিলেন কর্ণাটরাজের হাতে।
রাজা বল্লনকে কবিতা দু’টো পাঠ করতে বললেন। বল্লন যেমন কবিতা পড়তে উদ্যত হয়েছেন, অমনি কালিদাস তাঁকে থামিয়ে দিয়ে আবৃত্তি করতে লাগলেন অন্য কবিতা। সেই কবিতার অর্থ হ’লো :
‘হে রাজন, স্বয়ং বাণী নৃত্য করছেন আপনার মুখে; তা দেখে কমলা চঞ্চলা হ’য়ে উঠলেও আপনার গুণে আবদ্ধ হ’য়ে রয়েছেন। লক্ষ্মীকে আবদ্ধ দেখে চন্দ্রতুল্য শুভ্র কীর্তি ভয় পেয়ে ছুটে চলেছেন সমুদ্র পার হ’য়ে—আজও তার গতি থামেনি।’
রাজা বিস্মিত হলেন এর পাণ্ডিত্য আর কবিত্বশক্তি দেখে। বল ন কবির মুখ ভয়ে চুন হ’য়ে গেলো।
খুব খুশি হ’য়ে রাজা কালিদাসকে আর একখানা কবিতা রচনা করতে অনুরোধ করলেন।
মুখে মুখে কালিদাস রচনা করলেন আর একখানা কবিতা। কিন্তু শেষ চরণ রাখলেন তিনি অপূর্ণ। ভৃত্যবেশী বররুচি তখন সেই অপূর্ণ শ্লোক পূর্ণ করলেন।
সভাশুদ্ধ সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগলেন। কালিদাসের ভৃত্যও বল্লন কবির চেয়ে বেশি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।
বল্লনের মুখে আর কথা সরে না; তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে এইভাবে রাজসভার মধ্যে অপদস্থ হবেন। যদি বুঝতে পারতেন, তবে কি আর কালিদাসকে সেধে নিয়ে আসতেন রাজসভায়!
যাহোক্ কর্ণাটরাজ কালিদাসের এবং বররুচির কবিত্বশক্তির পরিচয় পেয়ে অতিশয় খুশি হ’য়ে অনেক পুরস্কার দিলেন। কালিদাস এবং বররুচি মহানন্দে ফিরে এলেন উজ্জয়িনীতে।
