ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা – ৭১

৭১.

 শিশিরকুমারের সেদিনকার সেই ফুলহাউস থেকে বেরিয়ে তার পরে আর ওনার হাউস ফুল বা ফুল্লতর করার দায় নিয়ে যাইনি কখনো ওপথে।

রঙ্গমঞ্চের দিকে টানও কমে গেছল অনেকটাই–প্রেক্ষাগৃহগুলির প্রতি উপেক্ষায় নয়, সম্পাদকীটা বেহাত হয়ে অযাচিত আমন্ত্রণ আসত না, আর, সেখানে গিয়ে পাশ চাইবার উৎসাহও লোপ পেয়েছিল। এবং আত্মশক্তি গিয়ে টাকা দিয়ে টিকিট কিনে থিয়েটার দেখার মতন আত্মসামর্থ্যও ছিল না আমার।

তাছাড়া, সেইকালে সিনেমার আকর্ষণ ছিলো আরো জোরালো। তখনই তো চার্লি চ্যাপলিন, জ্যাকি কুগান, ডালাস ফেয়ার ব্যান্স, মেরি পিকফোর্ড, গ্রেটা গার্বে, রুডলফ ভ্যালেনটিনো, লরেল হার্ডি প্রভৃতিকে নিয়ে ছায়াছবির আসর জমজমাট।

এদিকে কানন দেবী, দুর্গাদাস, ডি-জির পালাপার্বণ। আর, সিনেমার আকর্ষণ আমার চিরকালের। চার আনার টিকিটে সেই টানেই ভেসে গেলাম।

তাই বলে সেকালের থিয়েটারের নাটক আর নটনায়কদের আমি খাটো করতে চাইনে। শিশিরকুমার অবশ্যই অসাধারণ অভিনেতা ছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই; সেকালের প্রেক্ষিতে বিচার করলে অনেক দিক থেকেই তাঁকে অনন্য মনে হবে। প্রেক্ষামঞ্চেরও তিনি বহুৎ পরিবর্তন এনেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন শিল্পকলায়, সঙ্গীতকলায়, চিত্রকলায়, সাহিত্যে ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অগ্রগণ্যদের তাঁর বন্ধু এবং সহায়করূপে পেয়েও সবরকমের আনুকূল্য সত্বেও তাঁর কাছে তাঁর যুগের যে দাবী ছিল তা তিনি মেটাতে পারেননি। হতে পারে সে সম্পর্কে হয়ত তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না, কিংবা সেকালে তিনি যা দিয়েছিলেন, দিতে পেরেছেন, তার বেশি দেওয়া তখন সম্ভবও ছিল না বোধ হয়।

গিরিশচন্দ্র আমাদের নাট্যজগতে যে রচনা আরম্ভ করে গিয়েছিলেন সেই ধারাটাই বজায় রেখে তারই অনুসরণ করে কিছু বাড়িয়ে-টাড়িয়ে সেই বাক্যই কমা-সেমিকোলন, কোলন এবং কোথাও কিঞ্চিৎ জ্ঞাশের পর তিনি দাড়ি টেনে সমাপ্ত করে গেলেন। সেইখানেই তিনি দাঁড়িয়ে গেছেন, এগোতে পারেননি আর।

গৈরিশী যুগের উফল পরিসমাপ্তি বলেই তাকে আমার মনে হয়। নাট্যমঞ্চের ও অভিনয়ের নিজস্ব কিছু কিছু ধারণা নিয়েও এবং তাঁর যথাসম্ভব মঞ্চরূপ দিয়েও, ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও আসলে তিনি গৈরিশী ধারারই সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

গৈরিশী প্রয়োগকল্পনা বা অভিনয়রীতির কিছু অবশ্যি আমি দেখিনি, দেখার সুযোগও পাইনি তা সত্যি, কিন্তু তাঁর আদর্শ বংশধর–বাবার আদর্শ আর বংশ দুইই যাঁর ধর্তব্য ছিল–সেই দানীবাবুর অভিনয়ে তার প্রতিচ্ছবি কিছু দেখেছি তো, তার থেকে শিশিরবাবুর বৈশিষ্ট্য ততখানি পৃথক নয়। দুই ধারাই তো ব্যক্তিমুখ্য আর অভিব্যক্তি-সর্বস্ব। অন্তত আমার সেই রকম মনে হয়েছে।

শিশির নাটমঞ্চে যেমন পুরনো ভাবনারই নবরূপদানে প্ৰচেষ্টিত ছিলেন, সেটাকেই ভেবেছিলেন নাটকীয় রূপান্তর, তেমনি তাঁর কালের নাট্যসাহিত্যেরও কোনো যুগান্তর সাধন করতে পারেননি। সেরূপ উদ্ভাবনায় তাঁর দিক থেকে কোনো প্রেরণাই ছিল না। সেকালের সপ্রতিভ লেখকরা প্রবুদ্ধ হলে তাদের গল্প কবিতার রচনার ন্যায় নতুন নাটক সৃষ্টিতেও আত্মনিয়োগ করতে পারতেন, কিন্তু সে বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে কোনো উৎসাহ পাননি মনে হয়। বুদ্ধদেব রাবণকে নিয়ে একটি আধুনিক নাটক লিখেছিলেন, সেটি শিশিরকুমার ঘোষণা করেও কানাঘুষার পরেও, মঞ্চস্থ করতে আদৌ উদ্যোগী হননি।

এমনকি, যে ষোড়শী নিয়ে তখন এত হৈচৈ, প্রথমে তার মধ্যেও তিনি কোনো নাট্য সম্ভাবনা দেখতে পাননি। ঘোড় নিশ্চয়ই নাটক হিসেবে কিছু যুগান্তরসাধক নয়, নাটকই নয়, উপন্যাসের নাট্যরূপ মাত্র, আগের কালে বঙ্কিমবাবুর উপন্যাসগুলিও নাট্যরূপায়িত করা হয়েছিল, কিন্তু একালের অন্তর্গত এত নাটকীয়তা এবং বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও, রঙ্গমঞ্চের কোনো দিকপালের নজৰু শরৎচন্দ্রের দিকে পড়েনি কেন, তাই বিস্ময়। পরে অবিশ্যি শরৎচন্দ্রের বহু উপন্যাসেরই ট্যরূপ ফিমি রূপ ইত্যাদি পেয়েছে, কিন্তু তাঁর দেনা-পাওনা বইয়ের নাট্যরূপটাই সর্বপ্রথম-এ যুগের ভালো উপন্যাসগুলির নাট্যরূপান্তরণের সেইটাই। মুক্তধারা। সেই ধারা এখন আরো বিস্তার, আরো ব্যাপকতা, আরো সাফল্য লাভ করেছে সমরেশের অমৃতকুম্ভের সন্ধানে, আর শঙ্করের চৌরঙ্গীর (রাসবিহারী সরকার কৃত) সল নাট্যরূপায়ণে।

কিন্তু শিশিরকুমারের কালে নতুন নাটক কই? নাট্যরূপান্তর কিছু নাটক নয় নাট্যসাহিত্যের উদ্বোধক না। সেই ব্যর্থতার জন্য প্রত্যক্ষভাবে তৎকালের নিরুৎসাহিত লেখকরা দায়ী হলেও শিশিরকুমারের পরোক্ষ দায়িত্ব অস্বীকার করা যায় না। মঞ্চরাপ লাভের সম্ভনা না থাকলে নাট্য সাহিত্য দাঁড়াতে পারে নামহীরুহ হওয়া দূরে থাক, তা অঙ্কুরিতই হতে চায় না।

শিশিরকুমার নাটকের জগতে কোনো নবযুগ না আনলেও অভিনয় বা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কি এমন কিছু যুগান্তর সাধন করেছিলেন? একালের নাটক অভিনয়রীতি ও প্রযোজনার প্রেক্ষিতে তাঁর বিচার করতে চাইনে, সেভাবে তাঁর তুলনা করাটা হয়ত সঠিক হবে না, কেননা সেদিক দিয়ে দেখলে তাঁকে বেজায় খাটো দেখাবে-তাছাড়া যেহেতু একাল সময়ের বিচারে সব দিক দিয়েই তার কাল থেকে এগিয়ে-স্বভাবতই অগ্রসর হতে বাধ্য, তা না হলে একালের সার্থকতাটা কোন্‌খানে? কিন্তু সেই মানদন্ডের প্রমাণ পাল্লা দিয়েই কি বলা যায় না যে, শিশিরবাবুরও তেমনটাই ছিল না কি, গিরিশের কাল থেকে স্বভাবতই আর ন্যায্যতই আরো অনেক এগিয়ে আসা? সেটা তিনি পারেননি।

তাহলেও তিনি স্বকীয় ভঙ্গীর নাট-নৈপুণ্যে অনন্য, অভিনয় শক্তিতে অদ্বিতীয়, প্রয়োগ ক্ষমতায় চমকপ্রদ, ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে অসাধারণ–একথা অনস্বীকার্য। বাচ্চাতুর্যে চারপাশের শ্রোতাদের আর অভিব্যক্তির বৈশিষ্ট্যে প্রেক্ষাগৃহের দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করার ক্ষমতা ছিল তাঁর। বাল্পটুতা ছিল প্রায় রবীন্দ্রনাথের মতই, যা বলতেন তাই যেন সাহিত্য হয়ে যেত।

কিন্তু এত বিদ্যা, এত বুদ্ধি নিয়েও তিনি আমাদের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে পারেননি, মিটিয়ে যেতে পারেননি তাঁর নিজের আকাঙকাও। শেষটায় তিনি চেয়েছিলেন বিরাট এক জাতীয় রঙ্গশালা–সে কি যুগোপযোগী নব নাটকীয় পালার পার্বণের জন্যেই? না কি তাঁর শ্রীরঙ্গমক্ষেত্রে যে রঙ্গটা ঘটেছিল, সেই কলকাতার নাগরিকদের মতই তাঁর পাশ-এ চারপাশের সারা ভারতের সবাইকে ঘুরপাক খাওয়াবার মতলবেই? কে জানে।

নাট্যজগতে যুগান্তর করা দূরে থাক, আশ্চর্য, রবীন্দ্রনাথকে বাংলার রঙ্গমঞ্চে আনার প্রথম কৃতিত্বও তাঁর নয়। সে কীর্তি স্টারের অধ্যক্ষ প্রবোধচন্দ্র গুহের। এই এক ভদ্রলোক (অবিস্মরণীয় বলেই এখন বোধকরি বিস্মৃত) ঢক্কানিনাদের নেপথ্যে থেকে সেকালের রঙ্গমঞ্চে সম্ভাবিত এবং সম্ভবপর তাবৎ পরিবর্তন সাধন করে গেছেন।

গোড়ায় তিনি বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের ঐতিহ্য অনুসরণে কর্ণাজুন আর ইরানের রানী নিয়ে পত্তন করলেও (সেগুলিও কিছু কম চমকপ্রদ উপস্থাপনা ছিল না বলতে হয়), রবীন্দ্রনাথের চিরকুমারসভাকে সবার সামনে অপরূপ রূপে উপস্থিত করেছিলেন তিনিই। এবং সেইখানেই না থেমে, তার পরেও তাঁর শোধবোধ ইত্যাদি ধরে আরো বই করেও শেষ পর্যন্ত তার গৃহপ্রবেশ অবধি এগিয়ে গেছেন, এটা কম কথা নয়। পরমাশ্চর্য প্রযোজনা হয়েছিল তাঁর গৃহপ্রবেশ।

তারপরে শিশিরকুমারও রবীন্দ্রনাথকে নিজের মঞ্চে নিয়ে এসেছেন–ঐ চিরকুমারসভা দিয়েই।

স্টারের পরে হলেও তা ঠিক সেই রকমটি হয়নি নিশ্চয়ই। শিশিরবাবুর চিরকুমারসভা তাঁর স্বকীয় প্রযোজনারীতির সমূহ বৈশিষ্ট্য নিয়েই সার্থক সৃষ্টি হয়েছিল। প্ৰবোধবাবুর পদাঙ্ক অনুসরণে হলেও তার পদক্ষেপ অবশ্যই স্বতন্ত্র আর সার্থক। এবং তাই হবার কথাই।

তবুও শিশিরকুমার আর স্টার দুজায়গায় অভিনয় দেখে আমি সে যুগের দুই দিল অভিনেতার তুলনা করার সুযোগ পেয়েছিলাম। শিশির আর অহীন্দ্রর। শিশিরকুমারের চন্দ্র যেকালে তার ব্যক্তিগত অভিনয়ের ঔজ্জ্বল্যে ষোলকলায় বিকশিত, প্রায় চাঁদপানাই, অহীন চৌধুরীর চন্দ্র সেখানে চরিত্রগত অভিনয়ে, অভিনেয় চরিত্রের মধ্যে আপন ব্যক্তিত্বের সম্পূর্ণ নিমজ্জনে নিখুঁত। শিশিরকুমারের যে-কোনো অভিনয়েই তাঁকে কখনো ভোলা যায়, ভুলবার উপায় নেই, তারই চিত্তচমৎকারী কারুকান্ড দেখছি মনে হয় সর্বদাই–কিন্তু অহীন্দ্রের অভিনয়ে, অহীনবাবুকে মনেই পড়ে না একদম–কিন্তু অহীন্দ্রের। এখন, কারটা বেশী বাহাদুরী তা আমি বলতে পারব না, তবে দুজনের অভিনয়ধারার এইখানেই পার্থক্য। আমার নিজের ধারনায় অহীন্দ্রকেই মহত্তর মনে হয়েছে। ( এ বিষয়ে আমার সঙ্গে অপরে একমত না হতেও পারেন এবং তা হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষ করে যাঁরা শিশিরবাবুর ব্যক্তিগত বন্ধু, ব্যক্তিত্বে বিমোহিত, তাঁর অভিনয়ের অভিব্যক্তিত্ব স্বভাবতই তাঁদের অভিভূত করবে, বলাই বাহুল্য )।

তবে রবীন্দ্রনাথকে না আনলেও শরৎচন্দ্রকে রঙ্গমঞ্চে প্রথম আহরণের মাহাত্ম তাঁর। যদিও সেটা অনেক গড়িমসির পরেই। এবং এক রকম, ঐ প্রবোধবাবুকে টেক্কা দিতে গিয়েই।

আমি যখন গোড়ায় দেনা-পাওনার নাট্যরূপের খসড়া নিয়ে তাঁর কাছে যাই, তিনি দেখেশুনে ভেরি ক্লেভারলি ডান্ বলে আমাকে তা ফেরত দিয়েছিলেন। আমি তখন কী করি, টাকার দরকার, আমার বন্ধু জগৎ ভট্টাচার্যকে তা ছাপতে দিই। সরলা দেবী সম্পাদিত ভারতী মাসিকপত্রের তিনি তখন সহযোগী সম্পাদক, শরৎচন্দ্রের অনুমতি নিয়ে তাঁর নামেই সেটা তিনি ভারতীর শারদীয় আর সর্বশেষ সংখ্যায় বার করেন–দক্ষিণার সিংহভাগ স্বভাবতই শরৎবাবুকে দিয়ে নামমাত্র কিছু নাট্যরূপ দাতারূপে নিজের নাম হারানো সত্ত্বেও ) পেয়েই আমি বর্তে যাই, বলাই বাহুল্য। এবং ভারতীতে প্রকাশ লাভের পরই প্রবোধবাবু সে বই মঞ্চস্থ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। খবরটা পাবামাত্রই শিশিরকুমার পাণিত্রাসে তাঁর কাছে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে বইয়ের অভিনয় স্বত্ব আগেভাগেই হাতিয়ে নিয়ে আসেন। তাহলেও, কাজটা এমন কিছু নিন্দনীয় হয়েছে আমার মনে হয় না। নাথিং আনফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার… ইত্যাদি ইত্যাদি বলে না?

এবং লাভের কথাটা ধরতে গেলে, এরকম কাজ করতেই হয়। আর সেদিকটা খতিয়ে দেখে বলা যায়, ষোড়শীই তাঁর প্রযোজনা-কৃতিত্বের ইতিহাসে সবচেয়ে লাভজনক অধ্যায়। তাঁর অভিনয়কীর্তিতে সবচেয়ে কীর্তিত।

 রবিতীর্থের পরিক্রমায় প্রবোধ গুহর অনুগমন করলেও শিশিরকুমারের নিজের পরাক্রম কিছু কম ছিল না। প্রবোধচন্দ্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করলেও তাঁর পদক্ষেপ ছিল স্বভাবতই অন্য রকমের। প্রয়োগ প্রযোজনা আর অভিনয়রীতির স্বকীয়তায় তিনি অদ্বিতীয় ছিলেন, তা অস্বীকার করা যায় না।

তা ছাড়া, তিনি সর্বদাই ছিলেন পাদপ্রদীপের সম্মুখে, আর প্রবোধবাবু নেপথ্যে। তাই প্রবোধবাবুর কৃতিত্ব তাঁর অন্তরঙ্গদেরই জানা কেবল, যেকালে শিশিরকুমারের কীর্তি সর্বজনপরিদৃষ্ট।

বিখ্যাত নাট্যতাত্ত্বিক ও সমালোচক চন্দ্রশেখর ওরফে মনুজেন্দ্র ভঞ্জ মশাইয়ের সঙ্গে সেদিনকার অকস্মাৎ সাক্ষাৎকারে টের পেলাম যে, সেকালের আমার নাট্যকাহিনী রচনার ভেতর বিস্তর গলদ-বহুং ইতরবিশেষ ঘটে গেছে। এই বিশেষ ইতরতার জন্য নিজের দায় মেনে নিয়েও আমি বলতে চাই যে, আমার অগাধ বিস্মৃতিশক্তিই এহেতু দায়ী। মেমারি বর্ধমানের হলেও আমার মেমারিরা কোন কালেই বর্ধমান নয়, বরং দিনকের দিন ক্ষীয়মান, ম্রিয়মাণ। তার প্রমাণ এই রচনায় যত্রতত্র।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, মনুজবাবু চন্দ্রশেখর ছদ্মনামে তাঁর সাপ্তাহিক নাট্য আলোচনা আমার সম্পাদিত আত্মশক্তিতেই শুরু করেছিলেন, আমি ভুলে গেছলাম, তিনি আমায় মনে করিয়ে দিলেন সেদিন। তারপরে আমি সে-পত্রিকা ছেড়ে এলেও তিনি তাঁর ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন শেষপর্যন্ত। এখন তিনি হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় ঐ বিভাগীয় সম্পাদক। তিনি আত্মশক্তিতে শুরু করেছিলেন, সে খবর ভুললেও তিনি যে বাংলা নাট্যালোচনায় যুগ-প্রবর্তনার মূল, সে কথা তো ভুলবার নয়। তাঁর রচনাগুলি ক্লাসিক পর্যায়ের ছিল সে কথা বলইে হয়।

তাঁর কাছ থেকে জানতে পারলাম, জানবার পর মনে পড়ল যে, শিশিরবাবুর নাট্যমন্দির গোড়ায় ছিল মনোমোহন থিয়েটারে–যার ওপর দিয়ে এখন চিত্তরঞ্জন এভিনিউ বেরিয়ে গেছে। চিত্তরঞ্জন এভিনিউ আর বিডন স্ট্রীটের ত্রিবেণীসঙ্গম থেকে তিনি চলে আসেন শ্যামবাজারে–যেখানে এখন উত্তরা আর শ্রী সিনেমা। শহরের উত্তরাঞ্চলে এই শ্ৰী-ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর শ্রীরঙ্গম। ষোড়শীর অভিনয় হয়েছিল এখানেই।

এখন যেখানে বিশ্বরূপা, সেখানে এসেছিলেন প্রবোধ গুহই স্টার মঞ্চের থেকে বিযুক্ত হবার পর। বিশ্বরূপার স্থলে তেলের কল না কী যেন ছিল তখন, জায়গাটা নিয়ে ভেঙে গড়ে প্রবোধবাবু তাঁর নাট্যনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন। সময়টার সমস্তটা না হলেও কিছু কিঞ্চিৎ মনে পড়ছে এখন আমার খুব ক্ষীণভাবে যদিও–এমন কি, নাট্যনিকেতনের গ্রীনরুম পর্যন্ত–যেখানে একদা প্রসিদ্ধ নাট্যকার আমাদের শচীনদাকে একান্তভাবে নীহারবালার পদসেবায় নিযুক্ত দেখেছিলাম।

একান্তভাবে হলেও কোনো কান্তভাবে নয়, গোড়াতেই বলে রাখি। শচীনদা নিষ্কলুষ দেবতুল্য চরিত্রের, সেদিক দিয়ে কটাক্ষপাত করার কিছু নেই, তবে কিনা একটুখানি স্নেহপ্রবণ, এই যা। নীহারদেবী শয্যাশায়ী হলেও তিনি তাঁর পাশে বসে, দেবী চৌধুরাণীর ব্রজেশ্বর সেকালে যে কর্মে উদ্যোগী হয়েছিল (বঙ্কিম দৃষ্টিতে তাকালে) শচীনদাও তাতেই ব্যাপৃত-হয়ত কিছু অপত্যস্নেহ থাকলেও, অকথ্য কিছু অপকর্ম নয়।

আচমকা আমায় দেখে শচীনদা অপ্রতিভের মত বললেন, নীহারের পা কামড়াচ্ছে কি না…!

নীহারবালা একটুখানি মুচকি হাসলেন মাত্র। কিছু বললেন না।

কৈফিয়ত, দেবার কিছু ছিল না, চিরকুমার সভার সঙ্গীতবন্যায় সারা দেশ ভাসিয়ে (তিনিই বোধ হয় প্রথম রবীন্দ্র-গায়িকা) কবিগুরুর স্নেহধন্যা সুরকন্যা তন্বী নীহারবালা তখন অপার্থিব মহিমায় লোকচক্ষে অলোকসামান্যা। এমন কি, আমার নিজেরই ইচ্ছে হচ্ছিল তাঁর অপর পা-টা হাতাবার।

কিন্তু বুকের পাটা ছিল না তেমন, কানাঘুষায় জানা ছিল যে, নীহার দেবীর শুধু পা-ই না, আপাদমস্তক সবটাই প্রবোধবাবুর কপিরাইট যেখানে, অনধিকার হস্তক্ষেপ করতে গিয়ে কপিরাইট তছরূপের দায়ে পড়তে হয় পাছে, তাই সামনে অমন সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্তের অনুপ্রেরণা সত্ত্বেও প্রলোভন সংবরণ করেছিলাম।

ভালো করেছি কি না জানি না। কেননা, নীহার দেবীর সর্বস্বত্ব প্রবোধবাবুর সংরক্ষিত হলেও প্রবোধবাবু স্বয়ং ছিলেন নাকি তাঁর তাঁবেই।

অবশ্যই সেই তাঁবেদারির জন্যই নয়, শচীন্দ্রনাথের অনন্য নাট্যকৃতিত্বের কারণেই দেশাত্মবোধক গৈরিক পতাকা (সরকারে বাজেয়াপ্ত) থেকে ঝড়ের রাতে (সতু সেনের আলোক-সম্পাতে যে প্রযোজনা নাট্যজগতে নতুন দিক্-নির্দেশ করেছিল) তাঁর অনেক বই প্রবোধ গুহর রঙ্গমঞ্চে হয়েছিল। কাজেই, কান টানলে যেমন মাথা আসে, পা টানলেও হয়ত তেমনি ঘাড়ের ওপর চেপে বসা যায়–নাই ধরে মাথায় ওঠা যায় যেমন কিনা।

সেই নাই ধরেই প্রবোধবাবুর হৃদয়ে একটুখানি ঠাই পেয়েছিলাম বুঝি। দুটো না-ই মিলে যেমন একটা হা-ই হয়ে যায়, তেমনি ষোড়শীলাভে বঞ্চিত তাঁর ষোড়শীর লাভে প্রবঞ্চিত আমার প্রতি হয়ত একটু সহানুভূতি জেগে থাকবে, তিনি ডেকে আগাম দক্ষিণা দিয়ে নিরুপমা দেবীর দিদি বইয়ের নাট্যরূপান্তরের বরাত দেন আমায়। বরাত দেখুন! এক জায়গায় টাকার ভাগে ভাগীদার না হয়েও আরেক জায়গায় টাকার ভাগ্য খুলে যায় কেমন করে।

টাকার ভাগ্য খুলেছিল আমারও। দিদির জন্য আগাম সেই মোটা দাদন পাওয়ার পরেও পেয়েছিলাম আমি আরো। নাট্যকারের প্রাপ্য একটা সম্মানরজনীর সম্পূর্ণ বেনিফিট তিনি দিয়েছিলেন আমাকে–যদিও দিদি তেমনটা মঞ্চসফল হয়নি। তাহলেও তিনি সান্ত্বনাচ্ছলে বলেছিলেন যে, রিভলভিং স্টেজ হলে এ-বই নাকি জমানো যেত ভালোই।

ঘূর্ণায়মান মঞ্চের সাফল্য লাভ না হলেও আমার কপালটা ঘুরে গেল আরো। তিনি আমাকে আরো বেশ কিছু পাইয়ে দেবার নিমিত্ত হলেন, তাঁর নাট্যনিকেতনের দুতিন লাখের অগ্নিবীমাটা আমাকে দিয়েই করালেন। আমাদের হেমন্তদা (স্বরাজ্য দলের অন্যতম নেতা হেমন্তকুমার সরকার ) নরউই ইনস্যুরেন্সের একজন কর্তাব্যক্তি ছিলেন, তাঁর কাছে গিয়ে প্রবোধবাবুর প্রস্তাবটা পাড়লাম। কমিশনবাবদে কয়েক হাজার টাকার প্রাপ্তিযোগ ঘটে গেল কয়েক দিনেই।

পৃথিবীর এটাই ধারা–এই রকমটাই ঘটে থাকে। কোথাও অবশ্যপ্রাপ্য না পাওয়া, কোথাও বা অভাবিত পাওনা অযাচিত পেয়ে যাওয়া। এইভাবে দিতে দিতে পাওয়া আর পেতে পেতে যাওয়া–এই দুনিয়ার এই ধারারই লেনদেন অবিরাম। সেই রহস্যময় সূত্র ধরেই সেদিনের বীমান্তকারী সেই আমার অসামান্য লাভের সীমান্ত ছোঁয়া!

.

৭২.

 ষোড়শী নিয়ে লড়ালড়ি চিরদিনের সেই সুন্দ-উপসুন্দর আমল থেকেই। আর দেনাপাওনার জেরও কখনই মেটে না। আর সেই সব মিলিয়ে সমস্ত ব্যাপারটাই কেমন যেন অসুন্দর।

জানি; কিন্তু জানলেও মন মানতে চায় না। এমন কি, কোনো ভাবমূর্তি নিছক মনগড়া হলেও তা ভাঙলে মনে লাগে, না লেগে পারে না। নিতান্ত পৌত্তলিকতা যদিও, অন্তর্গত সেই পুতুল (বা প্রতিমাই) ভেঙে পড়লে মনের খানিকটা নিয়েই পড়ে বুঝি।

আমার মর্মের পীঠস্থান থেকে শরৎচন্দ্রের মর্মর মূর্তির ঋলন সেদিন আমার মনে বেশি লেগেছিল–লাভালাভের নীট হিসেবের থেকেও। তাঁর সেই ভঙ্গুর দশাই তখন আমার কাছে মর্মান্তিক।

ভাবমূর্তি উপে গিয়ে কী ভাবমূর্তিই না দেখেছিলাম তাঁর সেদিন!

ষোড়শীর বেনিফিট নাইটে আমারও কিছু প্রাপ্যগন্ডা থাকবে আশ্বাস পেয়েছিলাম শিশিরবাবুর।

অভিনয় শেষে গ্রীনরুমে গিয়ে জানলাম, (শিশিরবাবু স্বমুখেই) সেদিনকার বিক্রির সব। টাকা একটা থলেয় ভরে রাখা হয়েছিল, সেই থলিটা নিয়ে শরৎচন্দ্র চলে গেছেন খানিক আগেই।

শিশিরবাবু আমার অংশত দাবীর কথাটা তাঁকে জানিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি নাকি তা দাবিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন-শিবরাম টাকা নিয়ে কী করবে? বিয়ে করেনি কিছু না। তার ছেলে নেই পুলে নেই, ঘর নেই সংসার নেই–টাকার তার কীসের দরকার।

এই বলে থলে নিয়ে ট্যাকসি ডাকিয়ে এতক্ষণে হয়ত হাওড়া স্টেশনে।

তবুও শিশিরকুমার বলতে গেছলেন–ক্ষমাঘেন্না করেও কিছু অন্তত দিন ওকে শরৎদা!

তার জবাবে তিনি এই বলেছেন, আমার বেনিফিট নাইটের বখরা ওকে দিতে যাব কেন? এ রাত্তিরে টিকিট বিক্রি হয়েছে আমার নামে, আমার জন্য টাকা দিয়ে দেখতে এসেছে সবাই। এর ভেতর সে আসছে কোথা থেকে?

আমি আর কিছু কইতে পারি না। সত্যি! আমার টাকার দরকার কী! মেসের টাকা বাকী, এর ওর তার কাছে ধার, এটা ওটা সেটার দরকার–কিন্তু তা নিয়ে উচ্চবাচ্যর কী প্রয়োজন! আমার অভাবের চাকী এখানে ঘুরিয়ে কী লাভ? তা শুধু আমাকে পিষ্ট করার জন্যই, অপরের পৃষ্ঠপোষকতা লাভের নিমিত্ত নয়। আমার নিজের চরকায় আর কেউ তেল দিতে আসবে কিসের গরজে?

আমি চুপ করে থাকি। শিশিরবাবু তাঁর এক ভাইকে বলেন–দ্যাখ তো কিছু পড়ে আছে কিনা কোথাও।

ক্যাশবাক্সে যা ছিলো, সবই তো দেওয়া হয়ে গেছে শরৎদাকে। টিকিটঘরে একটা পয়সাও পড়ে নেই আর।

আমার চেক বইটা আন।

চেক বই এলে আমাকে শুধান, ক্রস চেক দেবো?

ভাঙাবো কোথায়? আমার কি কোনো অ্যাকাউন্ট আছে কোথাও!

একটা পে টু সেলফ লিখে দাওনা দাদা, তাঁর ভাই বাতলায়।

একশকুড়ি টাকার একখানা সেল চেক কেটে দেন তিনি তৎক্ষণাৎ। আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে এই টাকাটাই পড়ে আছে দেখছি।

এর বেশি আর কিছু বললেন না। যা পাই যথা লাভ জ্ঞান করে আমিও বাক্যব্যয় বাহুল্য বোধ করি।

সেই একশকুড়িই আমার কাছে এক কাঁড়ি। তখনকার মতন দুঃখ প্রশমনের পক্ষে অনেক টাকা। এই সেলফ হেলপেই চলে যাবে এখন দিনকতক।

কিন্তু সত্যি বলতে, শিশিরবাবুর দিক থেকে ততটা নয়, শরৎচন্দ্রের ব্যবহারে আমার আঁতে লেগেছিল যেমনটা। উপন্যাসের দরদী শরৎচন্দ্র জীবনের বাস্তববিন্যাসে এক নিমেষে কোথায় যে হারিয়ে গেলেন।

মনে পড়ল কবির কথা, কাব্য পড়ে যেমন ভাবো, কবি তেমন নয় গো! কিন্তু তাহলেও একী! যাঁর লেখার পত্রে, ছত্রে ছত্রে এত দরদ, টাকার দিক দিয়ে ধরতে গেলে তার এই দস্তুর!

টাকার কষ্টিপাথরে আর কষ্টের অকূল পাথারেই মানুষের যথার্থ পরিচয় বলে যে, তা মিথ্যে নয়।

কিন্তু এটাই স্বাভাবিক–আজ আমি তা বুঝতে পারি। সাধারণ মানুষ অসাধারণদের চেয়ে মানুষ হিসেবে অনেক বড় সত্যিই। এবং সবার উপরে মানুষ সত্য যে মানুষ, সে হচ্ছে এই জনসাধারণ। উপরওয়ালা মানুষরা না। যেহেতু যে মানুষ যত উচোয় উঠেছে, আরেক দিকে সে ততটা নিচেই নেমে গেছে। যে প্রাসাদ যত উদ্ধলোকে স্থিত, নিশ্চিতরূপেই তার ভিত নেমেছে তত নিচেয়-যত নিভৃতই হোক না। সমস্তরে সাধারণ মানুষ সমান স্তরের সকলের সঙ্গে সমতুল্য ব্যবহার করে মানুষের মতই, কিন্তু উচ্চলোকে অভিব্যক্তিরা (তাঁদের শিল্পে, সাহিত্যসৃষ্টিতে, যেরূপেই দেখা দিন না) সাধারণদের তুচ্ছ জ্ঞান করে থাকেন। অতি-মনুষ্যরা অবশ্যই অবমনুষ্য হতে বাধ্য। না হয়ে যায় না।

প্রতিভার এটা অভিসম্পাত কিনা জানি না, তবে সপ্রতিভদের এই উৎপাত। বিশ্বাত্মবোধে বিশ্বকে আত্মসাৎ করার ভগবদ্দও ন্যায্য অধিকার তাঁদের। অন্তত তাঁরা তাই মনে করেন। এবং সেই কর্মের হেতু কোনো দুঃখ দরদ দূরে থাক, সঙ্কোচমাত্র বোধ করেন না। এইহেতু প্রতিভাধরদের থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ।

প্রতিভার অবদানই শ্রেয়, তাই আমাদের গ্রহণীয় হওয়া উচিত। কিন্তু সেই সঙ্গে প্রতিভার প্রতিভুকেও নিতে গেলে তাঁর খাঁই মেটাতে নিজের লেশমাত্রও অবশেষ থাকে না, অবশেষে নিজেও যেতে হয়। প্রতিভা সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। পতঞ্জলির অষ্টাঙ্গযোগে নিয়মের পর যমের স্থান-প্রতিভা সেই যম। আশপাশের সব কিছু, সবাইকেই তিনি হজম করেন। তাই করেই বেঁচেবর্তে থাকেন, বাড়বাড়ন্ত হয় তাঁর।

গোরর চেয়ে গোরুর দুধ ভালো, তাই খেয়েই খুশি থাকতে হয়, তার ওপরেও যে গোসেবায় এগোয়, সে-হতভাগা কখনো না কখনো গোরর গুঁতো খায়ই-যদি তার নিজেরও সমান গোরুত্ব না থাকে। দুঃখের কথা, এই জ্ঞান আগের থেকে কারু হয় না। হলে পর হাড়ে হাড়ে সেই শিক্ষালাভের পর তা আর যাবার নয়। সেই শিক্ষা কখনই সে হারায় না আবার। তাবৎ প্রতিভার থেকে তার পর থেকে সে সুদূরপরাহত হয়ে থাকে। অবশ্য দূরের একটা নমস্কার রাখেই।

পৃথিবীতে চিরদিনই দুধরনের মানুষ আছে, থাকবেও। এক দল দিয়ে ফতুর–বিদ্যাসাগর, দেশবন্ধুগোত্রীয়; আরেক দল নিতে চতুর। তাদেরই হরণ পূরণে অদানে প্রদানে লতি দুনিয়া। এর খেলা চালু রাখতে সবারই দরকার। এটা শুধু জীবনযাপনেরই মূল কথা নয়, এর ভেতর দিয়েই অন্তরালের খেলোয়াড় চিরদিনের সেই লীলাময়ের মোলাকাত।

সেই যিনি বহু বাসনার প্রাণপণ চাওয়ার থেকে বঞ্চিত করে সারা জীবন বাঁচান আমাদের বঞ্চনার ছাইয়ের গাদা থেকে পরম সোনার সঞ্চয় উদ্ধার করেন বারংবার। থাবড়া মেরে ব্যথা দিয়ে ভুল পথের থেকে মুখ ঘুরিয়ে ঠিকপথে নিয়ে আসেন শেষত। নিজের বৃত্তিপথের অমৃত উত্তরণে আনেন। ভগবান যা করেন ভালোর জন্যই, মিথ্যে নয়। শেষ পর্যন্ত বেশই হয়।

রঙ্গলোকের নেপথ্য থেকে অমন মার খেয়ে বার হতে না পারলে কী দশা যে হতো আজ আমার! ঠিক পথে এসেছি কিনা জানিনে, তবে বিপথগতি বিপদমতির ফাড়াকাটিয়ে বেঁচে গেছি। নীহারিকালোকে বিপদগ্রস্ত আর মহানায়কদের কবলে পর্যদস্ত হতে হয়নি আমায়।

তাহলেও বেশ কিছুদিন খুব টানাটানিতেই কেটেছিল আমার। মরুভূমির বুকে সেই শিশির সম্পাত কবেই উবে গেছে, কোনো প্রবোধলাভও করিনি আর তারপর। আত্মশক্তির চাকরিটাও ছিল না–টানাটানি হবার কথাই। লম্বা লম্বা কবিতা লিখি, গল্পও ফাঁদি, সেসব ভারতবর্ষ, কল্লোল, উত্তরা ইত্যাদি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশও পায়, কিন্তু তার ফাঁদে টাকাটা সিকেটাও ধরা পড়ে না।

কোথায় যাই? কার কাছে গিয়ে প্রার্থনা জানাই? দেশবন্ধুও বেঁচে নেই তখন। আমার জানাশোনার মধ্যে কেউই নেই বলতে গেলে। ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম, বিধান রায়ের কাছেই যাই না কেন? কিন্তু কী ছুতোয় যাব? বয়েস হয়েছে, কর্মক্ষমতা স্বাভাবিক, বেকার থাকার কোনো অর্থ হয় না-বেকার থাকাতেও অর্থ নেই তা বুঝি। ছোট ছেলেটি আর নই তো, কারো কাছে অমনি কিছু চাইতে গেলে সঙ্কোচ হয়।

বিধান রায়ের অনেক প্রতিপত্তি প্রভাব শুনেছি। ইচ্ছে করলে তিনি যে-কোনো একটা কাজ পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। অনেককে দিয়েছেন বলে শোনা ছিল।

ভাবলাম, অসুখের ছুতো করে তো অনায়াসেই ডাক্তারের কাছে যাওয়া যায়। সেইভাবেই যাই না হয়, গিয়ে আলাপ জমাইগে। তারপর ভাব একটু জমলে চাকরিবাকরির কথা পাড়া যাবে। কোন্ অসুখের ছুতো করে যাব, ভাবি তাই।

তিনি নাকি চেহারা দেখেই রোগের মালুম পানশোনা ছিল। রোগীরও মালুম পান তবে নিশ্চয়। বোগের স্থলে যদি আমাকেই একটি বোগ বলে ঠাওরান তাহলে?

এমন একটা রোগ বানিয়ে যেতে হবে, যেটা কোনো ডাক্তারেরই ধরার সাধ্য নেই। তেমন। একটা ছুতো নিয়েই যেতে হবে। তবে, ঐ মাথা ধরার মত কিছু নয়–যা নাকি একটা সারিডনেই সারবার। ক্রনিক ধরনের কিছু বানিয়ে যেতে হবে।

গেলাম। আমাকে দেখেই চিনতে পেরেছেন–কংগ্রেস মন্ডপে তোমাকে দেখেছি যেন মনে হচ্ছে?

কলকাতায় কংগ্রেস হয়েছিল বছর কয়েক আগে, পলকের সেই ক্ষণিক দর্শন তাঁর রয়ে গেছে।

হ্যাঁ। তখন ভলান্টিয়ারি করতাম তো।

বেজায় চেঁচাচ্ছিলে তোমরা। মনে আছে তাই।

আমাদের ভলান্টিয়ারদের কাজই ছিল তাই। প্যান্ডেলের গেটে দাঁড়িয়ে আগমন নির্গমনের পথে নেতাদের–গান্ধী, জহরলাল, সুভাষচন্দ্র থেকে শুরু করে বড় মেজ ছোট সবাইকার জয়ধ্বনি দেবার। বিধানচন্দ্র কি জয় বলে চেঁচিয়েছি নিশ্চয়।

কী হয়েছে তোমার?

কোষ্ঠবদ্ধতা। কিছুতেই কোষ্ঠ পরিষ্কার…..।

বুঝেছি। যা খাচ্ছ তা হজম হচ্ছে না। পরিষ্কার হচ্ছে না তাই। আচ্ছা, এই ওষুধটা নিয়ে খাওগে বলে পাশের দেরাজ থেকে একটা ওষুধ বের করে দিলেন-রাত্রে শোবার আগে গরম দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খাবে, বুঝেছ?

কিন্তু দুধ পাবো কোথায়?

তবে জল মিশিয়ে খেয়ো। তাতেও কাজ দেবে।

কদিন বাদে গেলাম ফের। কী হলো? সেরে গেছে তো?

না সার, ঠিক তেমনিই…

আশ্চর্য! এমন হবার তো কথা নয়। আচ্ছা, এটা খেয়ে দ্যাখো দেখি। এটা আরো জব্বর দাবাই। আরেক বোতল দিলেন তিনি আমায়-এর জন্য দাম লাগে না স্যাম্পল ফাইল দেয় এরা ডাক্তারদের। অমনি পাই আমরা। নিয়ে যাও।

নিয়ে এলাম। যথাবিধি খেলাম। কিন্তু বাথরুমে গিয়ে ফলের সাক্ষাৎ নেই।

আবার যেতে হলো তাঁর কাছে–ঐ ছুতো ধরেই…..

এখনো সারলো না? আশ্চর্য! এমন তো হয় না। তুমি করো কী শুনি?

কী করব?

কাজ-টাজ কিছু করো না?

 লেখাটেখার কাজ করি।…

কী লেখো? হিসেবের খাতা?

এই গল্প কবিতা প্রবন্ধ ইত্যাদি……

আমার বেহিসেবি দপ্তর বার করি।

 টাকা পাও?

ছাপতেই চায় না কেউ, টাকা দেবে তার ওপর? ছাপালেই বর্তে যাই মশাই!

এবার ধরেছি তোমার ব্যায়রাম। এই তার ওষুধ। ধরো। বলে ড্রয়ার থেকে খান কয়েক নোট বার করে দিলেন দশ টাকার–পেট ভরে খাওগে। খেলে পরে তবে তো বেরুবে। আহারের পরেই না বাহার!

.

৭৩.

 ডাক্তার রায়ের দাক্ষিণ্য ডান হাতের মুঠোয় পাবার সঙ্গে সঙ্গে ভাবলাম, কোনো ভালো রেস্তোরাঁয় যাওয়া যাক, পেটভরে খাওয়া যাক আজ। আমিনিয়াতেই যাই না কেন!

অবশ্যি, ক্ষুৎপীড়িতের পক্ষে ডালমুটও কিছু খুঁতখুঁত করায় মত নয়, তাই মুঠো মুঠো খাওয়া যায় মুফত পাওয়া যায় যদি-সেখানে আমিনিয়ার বিরিয়ানি তো রূপে-গুণে নিখুঁত। তবে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের থেকে আমিনিয়া অনেকখানি, পায়দল আধঘণ্টার পাল্লা, আর ট্রাম ভাড়ায় দশ টাকার নোট ভাঙবে না–এদিকে সবুর সইছে না আমার। বিধানবাবুর বাড়ির কাছাকাছি সাবীর-এই চলে গেলাম সটান। তার চপ-এর জন্য চাপল্য দেখালেও দুষ্য হবে না, উপাদেয়তায় ও কিছু তুচ্ছ নয়।

ভরপেট খেয়ে ভরদুপুরে সিনেমা দেখে সন্ধ্যের পর বাসায় ফিরে দেখি, আমার অনুপস্থিতির সুযোগে কে বা কারা এসে আমার সারা ঘর তছনছ করে গেছে। তোরঙ্গ সুটকেস ওলটপালট, বিছানা-টিছানা ওলটানো, বইটই যত গড়াগড়ি, লেখা-পত্তর ছড়াছড়ি-দস্তুরমতন রাহাজানি। হানি তেমন কিছু না হলেও এক লণ্ডভণ্ড কাণ্ডই!

কে এসেছিল মশাই, আমার ঘরে? পাশের ঘরে গিয়ে শুধাই।

তা তো জানিনে। ধূপকাঠি বেচতে এসেছিল একজন, আমরা তখন আপিসে বেরুচ্ছি। কে কিনবে ধূপকাঠি, ধূপকাঠি নিয়ে কী করব আমরা? আপনার ঘরটা ভোলা পেয়ে সে বললে, আমার আত্মীয় হন ইনি, এখনই তো আসবেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা যাক না হয়। তারপর আমরা তো সব বেরিয়ে গেছি মশাই, কিছুই জানিনে। কেন, কী হয়েছে?

না কিছু হয়নি। জানতে চাইছিলাম এমনি।

 বাসার ভৃত্য দাতারাম জানাল, সারা দুপুর আমার বিছানায় গড়িয়েছে লোকটা, তারপর কখন উঠে চলে গেছে সে তার খবর রাখে না।

কিছু নিয়ে গেছে নাকি লোকটা?

কী নেবে! কিছু থাকলে তো নেবে। কিছুই নেই আমার ঘরে। কখনই থাকে না! সেই কারণেই তালা লাগাইনে আমি। ভোলাই পড়ে থাকে আমার দরজা।

লোকটা কি আপনার কোনো আত্মীয়-টাত্মীয় নয় তা হলে? কোনো চোর ছ্যাঁচোর নাকি!

না না, চোর ছাঁচোর কেন হবে। আত্মীয়ই বটে আমার। আমি জানাই আমার সগোত্রই।

না, খোয়া কিছু যায়নি আমার, খোয়াবার কিছু ছিলও না। তবে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে লোকটার খোয়র হয়েছে যৎপরোনাস্তি। সেটা আমি বুঝতে পারি।

নিরুদ্দিষ্ট বন্ধু আমাকে এক বাণ্ডিল ধূপকাঠি উপহার দিয়ে গেছেন দেখলাম। মাথার বালিশের উপরে সযত্নে সুরক্ষিত সেই গোছাটা, তার সঙ্গে একখানা চিরকুট এবং তাতে জড়ানো একটা দশ টাকার নোট।

চিরকুটে লেখা-সারা ঘর হাঁটকে পাঁটকে হয়রান, কোথাও কিছু নেইকো, একটা পয়সাও না। বাক্স-তোরঙ্গ, সুটকেস-ফুটকেস, বিছানার তলাটা সব হাতড়ালাম–কিছুই বাদ দিইনি, নোট-ফোট দূরে থাক, কানাকড়িটাও পাওয়া গেল না। তোমার অবস্থা দেখছি আমার চেয়েও শোচনীয়। বাসার ঠাকুর পরশুরাম পাড়হির কাছে খবর নিয়ে জানা গেল, টাকা দিতে পারেনি বলে ম্যানেজারের মানায় তোমার মিল বন্ধ যাচ্ছে কদিন থেকে। খাবার জন্য বাসায় না ফিরতেও পারো এখন, শুনে দুঃখিত। খাচ্চো কী হে? কোথায় খাচ্চো? রাজেন্দ্র মল্লিকে নাকি? চলছে কি করে তোমার? তোমার লেখাপত্তর ঘেঁটেঘুঁটে জানা গেল তুমি এক লেখক, কবিও আবার তার ওপর। লম্বা লম্বা কবিতা দেখলাম–কী সর্বনাশ। এইসব ছাইপাঁশ লেখো নাকি তুমি? ছি ছি! অবশেষে তোমার একটা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি নিয়ে তোমার বিছানায় শুয়ে পড়া গেল খানিকক্ষণ, তার ভেতরই খানিক ঘুমিয়েও নিয়েছি আবার। আমিও তোমার মতই এইসব, এমনি সব রাবিশ লিখতাম এককালে। এখন আর লিখি না, এই ধূপকাঠি বেচি এখন। যা হোক, তা হলেও দিনান্তে দুপয়সার মুখ দেখতে পাই, তুমি বোধ হয় তাও পাও না। আমার অন্ন জোটে অন্তত, তোমার কি জোটে? আমি বলি কি, এইসব আগডুম বাগড়ম ছেড়ে দিয়ে সোজা বটতলায় চলে যাও, সেখানে গিয়ে দশ বারো আনা দামের একখানা অল্প মূলধনে সহজ শিল্পকর্ম শিক্ষা বইটা কিনে আনোগে। তারপর আমার মতন এই ধূপকাঠি বেচার ব্যবসা শুরু করো-আড়াই টাকার মূলধনেই ফলাও কারবার। কোনো দুঃখু থাকবে না আর। সেইজন্যেই এই দশ টাকা দিয়ে গেলাম তোমাকে। তুমি দাঁড়াতে পারলে আমি খুশি হবো। ইতি

পুনশ্চ, ঘর জোড়া এত সব জঞ্জাল জুটিয়েছ কেন? এই এতো এতো কাগজপত্তর বইপত্তর–লেখাপত্তরজমা করে ঘর নোঙরা করা কেবল? কী হবে এসবে? পড়ে-উড়ে কিসু হয় না। লিখেটিখেও নয়। আমি এককালে লেখক হতে চেয়েছিলাম, সকলেই চায়, গোঁফ গজাবার সাথে সাথেই কবিতা গজায় সবাইকার, তারপর গল্প, তারপর উপন্যাস, তারপর নাটক-ফাটক যাত্রাভিনয়ের পালা আরো কত কী! সে সখ মিটে গেছে আমার। এখন এই ধূপকাঠি বেচি। তোমার সঙ্গে দেখা হল না। তবে যদি তুমি পথে আসো, আমার পথে আসো যদি, এই ধূপকাঠি ধরে দুপয়সা উপায়ের পথ দেখলে–একদিন না একদিন সেই পথেই দেখা হবে আমাদের।

পুন, পুনশ্চ! এই সব জড়ো করা জঞ্জালেরও দাম আছে ভাই। নেহাত ফ্যালনা নয়, তা আমি মানি। রাস্তায় ফেলে দিলে পড়তে পায় না, তাও আমার জানা আছে। থলেওয়ালারা তাদের থলেয় ভড়ে কুড়িয়ে নিয়ে যায় দেখতে না দেখতেই। সেইরকম এক থোলোধরা বন্ধু আছে আমার। এক বস্তিতেই পাশাপাশি বাস করি। তাকে বলব, সে একদিন এসে, তোমার বর্তমানে বা অবর্তমানে তোমার ঘর ঝেটিয়ে সবকিছু কুড়িয়ে-বাড়িয়ে নিয়ে যাবে এক সময়।

নিখরচায় তোমার ঘর পরিষ্কার হবে, তারও জঞ্জাল বেচে দুপয়সা জুটবে এখন।…

আমার নিজের ঠিক তেমনটা না হলেও আমি দেখেছি, আমার প্রতি সর্বজীবের সমদৃষ্টি। সর্বদাই। মহাজীবন বিধানচন্দ্রের থেকে সামান্যজীবী ধূপকাঠিওয়ালার সমান দরদ দেখা গেছে আমার ওপর। মনে হয়েছে যেন এইভাবেই বিধাতা আমায় বারংবার দর্শন দিয়েছেন। এবং দর্শনীও দিয়েছেন–দিয়ে গেছেন–আমাকেই।

তারই নিদর্শন, এই দশ টাকার নোটখানা, বিধানচন্দ্রের মুক্ত হস্তের বরাদ্দর চেয়েও বেশি যেন আমায় অভিভূত করে।…নোটখানাকে বুকে জড়িয়ে ঘুম লাগাই।

সকালে ঘুম ভাঙতেই লোকটার সদুপদেশের কথা মনে পড়ল। কিন্তু ঠিক মনে ধরল না। ভেবেছিলাম একবার যে, বটতলায় গিয়ে ধূপকাঠি নির্মাণ শিক্ষাটা নিয়ে আসি, কিন্তু খটকা বাধলো। ধূপকাঠির ধুমধারাক্কায়, দুষ্ট বা শিষ্ট যাই হোক, এই সাহিত্যসরস্বতী ঘাড় থেকে নামবেন আমার? মনের মধ্যে সাকিম, তাঁকে তো মা মনসার সগোত্র বলেই ধারণা হয়, তাঁর বিষও কিছু কম নয়, ছোবলে জীবনভোর জর্জর করে রাখে। ধুনোর গন্ধে যদি তিনি প্রমিত হয়ে ওঠেন আরো?

বিধানবাবু কদিন বাদে যেতে বলেছিলেন আবার। যেতেই বললেন, বোসো। তোমার জন্যে আমি ভেবেছি। দ্যাখো, এই উঞ্ছবৃত্তি করে কোনো লাভ হবে না। কাজকর্ম করতে হবে তোমাকে। লিখেটিখে কিসু হয় না।

তাঁর মুখে সেই ধূপকাঠিওয়ালার প্রতিধ্বনিই শুনতে পাই আবার।

কেন হবে না? কারো কারো বেশ হয়, আমি দেখেছি।

দেখেছো তুমি? কোথায় দেখলে শুনি?

আমার সামনেই। এই তো আপনি, একটু আগেই একজনকে এক লাইন লিখে দিয়ে পঞ্চাশ টাকা কুড়িয়ে নিলেন এক্ষুনি।

সে তো প্রেসকৃপসন লিখে হে! আমার কথায় তিনি হাসলেন-এটা কি আবার লেখা নাকি? সত্যিকার লেখা লিখলে কতো পাওয়া যায় বলো?

তা আমি জানিনে। বলতে পারব না। আমি পাঁচ শো লাইন লিখেও এক টাকা পাইনে। সত্যিকার লেখা লিখতে পারিনে বলেই বোধ হয়।

তা হতে পারে। লেখাটেখার আমিও কিছু জানিনে। বঙ্কিমবাবু অনেক টাকা কামিয়ে গেছেন তাঁর উপন্যাসগুলোর থেকে। শরৎচন্দ্রও বিস্তর টাকা পান শুনেছি। কিন্তু তাঁদের মতন লেখা কজন পারে লিখতে? এ দেশের বেশির ভাগ লেখকই তো খেতে পায় না, না খেয়ে মারা যায়, যাচ্ছেও এখন… তুমি কবি গোবিন্দদাসের নাম শুনেছ?

কেন শুনব না? পড়েছিও তো কত! বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস…

আহা, সে গোবিন্দদাস নয়। তাঁরা তো কবেই গত হয়েছেন। একালের কবি গোবিন্দদাস, তাঁর কথাই বলছি আমি–যিনি লিখে গেছেন-ও ভাই বঙ্গবাসী, আমি মলে তোমরা আমার চিতায় দেবে মঠ। কিন্তু আজ যে আমি খিদেয় করি ছটফট…

জানি জানি। তাঁর কতো স্বদেশী গান তত শোভাযাত্রা করে গেয়ে গেয়ে ঘুরেছি আমরা।–স্বদেশ স্বদেশ করিস কারে এ দেশ তোদের নয়/এই যমুনা গঙ্গানদী/এদেশ তোদের হোত যদি/পরের পণ্যে গোরা সৈন্যে জাহাজ কেন বয়…।

তা হবে। তবে দেশবন্ধুর মুখে শুনেছিলাম, পূর্ববঙ্গে কোথায় যেন কোন কর্ম উপলক্ষে গিয়ে সকালে উঠে দাড়ি কামাবার সময় ক্ষুর মোছর কাগজটায় গোবিন্দদাসের খবর তিনি দেখতে পান-আকস্মিক ঘটনাই। কবি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী, অত্যন্ত দৈন্যদশায়, দেখাশোনার কেউ নেই–এইসব লেখা ছিল সেই কাগজের টুকরোটায়। দেখে দাড়ি কামিয়ে উঠেই তিনি ছুটে গেলেন কবির শয্যাপাশে, তাঁর বিধিমত চিকিৎসার, খাওয়া-থাকায় বন্দোবস্ত করে দিলেন সব। কিন্তু দেশবন্ধুর মতন মানুষ কজন হয়? দেশের কজনাই বা তার নজরে পড়ে, কজনকেই বা তিনি দেখতে পান? দেখতে পারেন?

তা বটে। আমাকেও তিনি দেখেছিলেন একসময়-যদিও আমি কবি-টবি কিছুই নই…

সে কথা যাক। তোমাকে কিছু কাজটাজ করতে হবে এখন। ঐ লেখাটের লাইনেই না হয়?… নাকি তুমি আমার মতন এক লাইন লিখে পঞ্চাশ টাকা রোজগার করতে চাও? ডাক্তার হতে চাও নাকি? তা যদি চাও তো বলল, তোমাকে আমি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করে দেব, পড়াটড়ার খরচ সব আমার। কেমন, পড়বে? হবে ডাক্তার?

আমার এক বোন…বোন না বলে বন্ধু বলা উচিত…সেও চেয়েছিল আমি ডাক্তার হই। ডাক্তারের মেয়েছিলো কিনা সে। কিন্তু তা আর হয় না স্যার, সেই এক লাইনের লাইন কবেই আমি ছেড়ে এসেছি। অন্য লাইনে চলে এসেছি এখন… আমার দীর্ঘ নিঃশ্বাস পড়ে বুঝি।–সে লাইনে যাওয়া যায় না আর। ডিরেলমেন্ট হয়ে গেছে আমার।

তা হলে, এই লেখার লাইনেরই অন্য কোনো কাজ নাও। সহকারী সম্পাদক-টম্পাদক হতে পারো না? প্রুফ দেখার কাজ জানো? প্রবাসীর সম্পাদক রামানন্দবাবুকে আমি বলে দিতে পারি…

সেখানে আমার এক কাজিন কাজ করেন। চারুদা। চারু বন্দ্যোপাধ্যায়।

চিনি তাঁকে। আমাদের ব্রাহ্ম সমাজেরই গণ্যমান্য একজন। তা হলে তুমিই গিয়ে তাঁকে ধরো না কেন? সহজেই তো ধরতে পারো।

না চারুদার কাছে যেতে আমার ভয় করে। কী দারুণ গম্ভীর যে…

তা হলে কোনো জায়গায় প্রচার-সচিবের কাজ নাও না হয়। পাবলিসিটি অফিসার বা তার সহকারীর কাজ–পারবে না করতে? তোমার এই লেখাটেখার লাইনেই তো। বিজ্ঞাপন ইত্যাদি লেখার কাজ হবে বোধ হয়। পারবে না?

পারতে পারি। চেষ্টা করে দেখতে হয়।

বেশ, আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি-ক্যাপটেন দত্তকে। বেঙ্গল ইমিউনিটির ক্যাপটেন নরেন দত্ত। এই পাশেই তো তাঁদের আপিস। আর, হিন্দুস্থানের নলিনী সরকারকেও লিখছি। দুজনের কাছেই যাও–দ্যাখো গিয়ে কী হয়। লেগে যাবে আমার বিশ্বাস। ফোন করেও পরে বলব আমি তাঁদের।

সেদিন কোনো অর্থসাহায্য না করে দুখানি শুষ্ক পত্র দিয়েই তিনি আমায় বিদায় করলেন।

 বাসায় ফিরে আমার মুখ শুকনো হলো আরো। দরজায় তালা লাগিয়ে গেছলাম, তবে চাবিটা পকেটে নেই। হারিয়েছে কখন।

কী সর্বনাশ! অনভ্যাসের তিলক, কপাল চড়চড় করে। অনভ্যাসীর লক তার চাবিকাঠি হারায়।

সেদিনকার সেই ঘরোয়া উপদ্রবের পরেই দরজায় তালা মেরেছিলাম। কোনো চোর ছ্যাঁচোরের পরোয়ায় নয়। সেই ধূপকাঠিওয়ালা যে শাসিয়ে গেছে আমায়, তার থোলাবরদার কাকে যেন পাঠিয়ে দেবে আমার ঘরদোর সব সাফ করার জন্য। সেই ভয়েই আমার এই তালা দেওয়া।

দরজায় তালা লাগাতে গিয়ে আজ ঘরটাকেই তালাক দিতে হল দেখছি।

ঘরের জঞ্জাল গেলে আমার ঘরের আর থাকবে কী! এইসব জঞ্জালের মধ্যেই তো আমার মনের মাধুরী মিশায়ে করেছি যা আমি রচনা…সেইসব।

জীবনের জঞ্জাল সব মিটে গেলে তার আওতায় যত কাঁকড়াবিছে, নেংটি ইঁদুর জড়ো বলেই তো এই ঘরে অন্য কারো আসার উৎসাহ হয় না। নিশ্চন্ত নির্ধান্দায় একলাটি থাকতে পাই–খেয়ে না খেয়ে স্বচ্ছন্দ আরামেই।

এক একটি সুন্দর মেয়েও যেমন দেখা যায়, দাঁত মাজতে চায় না–তেমনি আমার ঘরের এই আবর্জনা আমাকে সব সময় রক্ষা করে, বাঁচিয়ে চলে।

আমার জানা এক অম্লান কিশোরীকে জানি, অবাঞ্ছিত আক্রমণের দায় এড়াতে কখনই সে নিজের দাঁত মাজতো না। শুধালে বলতো, তোমাদের জ্বালাতেই, আবার কেন?

আমি বলেছিলাম, দাঁত মাজ তুই। আমি তোর ত্রিসীমানায় আসব না, কথা দিচ্ছি, তোকে চুমু দিতে হবে না। দাঁত মাজলে ঝকঝকে দাঁতে তোকে আরো ঢের ভালো দেখাবে। দূর থেকেই খুশি থাকব না-হয়।

শুধু তুমিই নাকি গো? দাদার আর বন্ধুরা নেই? বলেছিল সে।

এইভাবে হাতে হাতে নিজেকে বাঁচিয়ে, অপরকে সামান্য সুখদানে কার্পণ্য করে বিয়ের আগে দাঁত ফ্রেম্প করতে গিয়ে এমন দুঃখ পেয়েছিল বেচারা! ভাবলে দুঃখ হয়।

দাঁতকুঠির চেয়ারে বসে অঝোর ধারায় ভেসে যাচ্ছিল সে।

আমার এই অমার্জিত ঘর সেই রূপসী কিশোরীকেই মনে করিয়ে দেয়। তার কোনো ছবি আমার ঘরে নেই, আমার এই ঘরটাই যেন তার প্রতিচ্ছবি।

.

৭৪.

 বিধানবাবুর নির্দেশমত প্রথম আমি নলিনী সরকারের কাছে গেলাম।

হিন্দুস্থান ইনস্যুরেন্স কোম্পানির মুখ্য অফিস ছিল এখনকার সুরেন বাঁড়ুজ্যে স্ট্রীটে, রাস্তাটার তখন অন্য কী এক নাম ছিল যেন। এখনকার এলিট সিনেমার মুখোমুখি, আমিনিয়া হোটেলের পাশাপাশি বাড়িটা।

রবিবারে গেছি, সেদিন তাঁকে অবকাশের মধ্যে পাবার আশায়। সকালের দিকটায়। লিফটম্যানকে বলতে সে আমায় সোজা তিনতলায় নিয়ে গেল। একটা ঘরে ডিভানে শুয়ে তিনি বিশ্রাম করছিলেন, নার্স-জাতীয় একটি মেয়ে ফলমূল কেটে ছাড়িয়ে প্লেটে সাজিয়ে রাখছিল তাঁর সামনে।

খেতে খেতেই তিনি চোখ তুলে তাকালেন, তোমাকে আমি দাশমশায়ের বাড়িতে দেখেছি না?

আমি ঘাড় নেড়ে বিধানবাবুর চিঠিটা তাঁর হাতে দিলাম, চোখ বুলিয়ে তিনি বললেন ফোনেও তিনি বলেছেন আমাকে। কিন্তু আমাদের তো পাবলিসিটি অফিসার রয়েছে। ভালো লোকই আছেন। সাবিত্রীপ্রসন্ন চ্যাটার্জি। বেশ নামকরা লেখক।

কবি সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়। জানি আমি তাঁকে।…আমাদের সাবিত্রীদা।

তুমি কেমন লেখো আমি জানি না। তোমার লেখাটেখা কিছু পড়িনি। প্রবন্ধ লিখতে পারো?

পারব।

পারতে পারো। সুভাষের সাপ্তাহিকপত্রটা তুমি সম্পাদনা করতে শুনেছি। অর্থনীতি বিষয়ক প্রবন্ধ লিখতে হবে। অর্থনীতির জানো কিছু?

আমি কোনো জবাব দিতে পারি না।

পাউণ্ডের সঙ্গে টাকার বিনিময় হার নিয়ে দারুণ বিতর্ক চলছে এখন তা জানো?

খবরের কাগজে দেখেছি বটে–কিন্তু একটু কিন্তু কিন্তু করে বলি-ওসব কিন্তু আমার মগজে ঢোকে না।

সমস্ত জিনিসটা তোমাকে আমি বুঝিয়ে দেব। পয়েন্টগুলোও বাতলে দেব। তাই নিয়ে তুমি একটা প্রবন্ধ লিখে আনবে। পারবে না?

আপনি পয়েন্টগুলো বলে দিন।

জলের মত সরল করে জিনিসটা তিনি বুঝিয়ে দিলেন আমায়। কোন্ কোন্ পয়েন্টে জোর দিয়ে লিখতে হবে, তাও।

তাঁর কথার ধাঁচে গোড়ায় আমার ধারণা হয়েছিল যে, তাঁর অর্থনীতিবিষয়ক একটা রচনার ভাষাটাষা শুধরে বানান-টানানগুলো ঠিকঠাক করে দিতে হবে আমায়, এখন আঁচ পেলাম এতক্ষণে যে না, তা নয়, বানানের দায় নয় কেবল লেখাটা বানাতেও হবে আমাকেই।

পারবে তো?

খুব পারব। এমন কিছু শক্ত কাজ না। বলেন তো কোনো মাসিকপত্রে ছাপাবার ব্যবস্থাও করতে পারি।

কোন্ কাগজে? প্রবাসী, ভারতবর্ষে?

আমি ভেবে দেখি। প্রবাসী কার্যালয়ে এগুতেই আমি সাহস করব না। সেখানে গুরুগম্ভীর চারুদা বিরাজিত। আর ভারতবর্ষে আমি পাত্তাই পাব না বলতে কি! কেননা জলধরবাবুর কাছে প্রস্তাবটা পাড়ব কি, সেটা তাঁর কানে তোলাই এক শক্ত ব্যাপার। আমার কোনো কথাই তাঁর কাছে খাটবে না, তিনি কানে খাটো।

যদি বিচিত্রায় ছাপানো যায়? আমাদের উপেনদার কাগজ। উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। ভালো হয় তাহলে। বিচিত্রা বেশ কাগজ। আমি দেখেছি। তাতে হিন্দুস্থানের বিজ্ঞাপন বেরয়, ভেতরের পৃষ্ঠায়। বিজ্ঞাপনটা আমি ভেতরের পাতার থেকে কভারের চতুর্থ পৃষ্ঠায় আনার ব্যবস্থা করব–অনেক বেশি চার্জ দিয়ে।

তাহলে তো ভালোই হয়। উপেনদাকে বলব সেকথা।

বলতে পারো। লেখাটা ঠিক রবীন্দ্রনাথের স্টাইলে হওয়া চাই, সেই ভাষায়, বুঝেছ? পড়ে যেন লোকে মনে করে লেখাটা আমায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখে দিয়েছেন।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আপনার নামে লিখেছেন একথা কি কেউ বিশ্বাস করবে মনে করেন?

না করুক। আমি যে আসলে লিখতে পারি, একথাই কি কেউ বিশ্বাস করবে? তাহলেও কতক কতক লোকের ঐ সন্দেহ জাগতে পারে তো! রবীন্দ্রনাথ টাকার জন্য লিখবেন তা কেউ ভাবতে পারবে না, কিন্তু তিনি আমায় স্নেহ করে লিখে দিয়েছেন এটাও তত ভাবতে : পারে কেউ কেউ। ঐ বেনিফিট অব ডাউট-টাই আমার লাভ।

বুঝেছি। আপনার বিতর্কিত অর্থনীতির ব্যাপারে কবিগুরুর সমর্থনীতির সায় আছে এটাই আপনি পরোক্ষে জানাতে চান সবাইকে?

প্রায়। সেটা বোধহয় মন্দ হবে না, কী বলো?—

 আমি চুপ করে ভাবি। আমার লেখা কতদূর অর্থনীতিসম্মত হবে তা নিয়ে নয়, কতটা সাহিত্যনীতিসঙ্গত তাই নিয়ে। তারপরে সবদিক খতিয়ে আমার মত এক অদ্যভ্য ধনুগুণের পক্ষে নৈতিক মানের উচ্চ নিরিখ আঁকড়ে থাকা কতটা গুণের হবে, তার ঠাহর না পেয়ে ভাবি যে, এই অর্থনীতির বিতর্ক আমার দ্ব্যর্থনীতির স্টাইলে পড়লে বিষয়টা হয়ত জগাখিচুড়ির মতন ব্যর্থ হয়ে সব দিক বজায় থাকবে শেষ পর্যন্ত।

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে তিনি শুধান–কেন, রবিবাবুর ধরনে লেখাটা কি তোমার পক্ষে খুব শক্ত হবে?

না, শক্ত কিসের। ছোটবেলার থেকে রবীন্দ্রনাথ পড়ছি আমরা, হজম করছি। আর, তাঁর লেখা পড়ার বিপদ কী জানেন? অজান্তে প্রায় তাঁর মতই হয়ে যেতে হয়। রবীন্দ্রনাথকে যে যতটা হজম করে, বুঝেছেন, রবীন্দ্রনাথও তাঁকে ততটাই হজম করে থামে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের অস্থিমজ্জায়, তাঁকে হাতের কজ্জায় নিয়ে আসা শক্তটা কী! তাঁর স্টাইল কাটিয়ে লিখতে পারাটাই কঠিন ব্যাপার। কবিতা লেখায় অন্তত।

বেশ। লিখে এনো তাহলে।…আমাদের পাবলিসিটির যা কিছু কাজ সাবিত্রীবাবুই করেন, সেখানে তো কোনো ভ্যাকান্সি নেই। তুমি বরং মাঝে মাঝে আমার এই প্রবন্ধ-ট্রবন্ধ লিখে ছাপিয়োনা হয়, দুচারশো টাকা পেয়ে যাবে সঙ্গে সঙ্গে।

সেই ভালো বলে আমি হাঁপ ছেড়ে চলে এলাম। চাকরির খর্পরে পড়তে হলে না দেখে বেঁচে গেলাম যেন।

আমার সেই একমাত্র অর্থনীতিমূলক প্রবন্ধ নলিনীরঞ্জন সরকারের নামে যথাসময়ে বিচিত্রায় বেরিয়েছিল, তাতে অর্থনীতির কতদূর শাস্তি হয়েছিল জানিনে, কিন্তু মূলক যে বেশ হয়েছিল তাতে সন্দেহ নাস্তি।

সেই প্রথম আর সেই শেষ। তারপরে অর্থনীতির কোনো মূলোৎপাটন করতে হয়নি অনায়…তাঁর কাছ থেকেও কোনো ডাক আসেনি আর, আমিও নিজের থেকে গরজ করে যাইনি তাঁর কাছে কখনো আবার। স্বরাজ্যদলের এই ভদ্রলোকটিকে কেন জানি না, আমার ভাল লাগত না কেমন যেন। তাঁর সম্পর্কে বিশেষ উৎসাহ বোধ করতাম না। কেমন যেন বৈষয়িক মানুষ বলে বোধ হোতো।

অবশ্যি, তার পরেও এই ধরনের প্রচারমূলক লেখা আরেকবার লিখতে হয়েছে,–ঘিয়ের কারবার নিয়ে লিখেছিলাম সেটা, শ্রীঘূতের বিষয়ে। সেটা আমার নামেই প্ৰকাশলাভ করেছিল–ওই বিচিত্রাতেই। তার জন্য টাকা পেয়েছিলাম মোটারকম অশোক রক্ষিত মশায়ের কাছ থেকে।

বিধানবাবুর কথাটা রাখতে তারপর ক্যাপটেন দত্তর কাছেও গেলাম একদিন।

চিঠিটা পড়ে তিনি বললেন, বেশ। আমাদের পাবলিসিটি অফিসার কাজে ইস্তফা দিয়ে চলে গেছেন দিনকতক আগে। সেই পদেই আপনি বহাল হবেন। ডাঃ রায় যখন রেকমেন্ড করে পাঠিয়েছেন, তার ওপরে আর কথা নেই। আমাদের পে-স্কেল ভালোই। পয়লা তারিখে আসবেন আপনি, আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার রেডি থাকবে।

কখন আসব?

অফিসটাইমে। কাঁটায় কাঁটায় দশটায়। দশটা পাঁচটা কাজ, তার বেশি নয়। মাঝখানে টিফিন আছে।…এর আগে কোনো আপিসে কাজ করেছেন? আর কোনো প্রচার দপ্তরে?

কোথাও না। এই প্রথম। তবে করতে করতে হয়ে যাবে।

তা হবে। বিশেষ আপনি লেখক যখন, এই লেখালেখিরই কাজ তো! তবে একটা কথা, লেখকরা একটু ঢিলেঢালা টাইপের হয়, আপিসে কাজ করতে গেলে তা চলবে না। আপিসের একটা রীতিনীতি নিয়ম-শৃঙ্খলা রয়েছে…বুঝেছেন? সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ এসব দরকার।

জানি, বলে বেরিয়ে আসি। তার পরে সোজা প্রেমেনের কাছে চলে যাই। চাকরির কশ্যটাও বলি গিয়ে।

বেশ ভালো কাজ, মোটা মাইনের পাবলিসিটি অফিসারের কাজ। করো না তুমি। তাকে সাধি।

ভালোই তো বোধ হচ্ছে। তা, তুমি করছে না কেন? অফারটা তত তোমাকেই দিয়েছে। এমন কিছু ভারী কাজ নয়, বাধা কিসের?

মনের বাধা। মন সায় দিচ্ছে না। তবে এমন কাজটা ফসকে যাক, আমি চাইনে। তুমি করলে খুশি হব। পয়লা তারিখে যেতে হবে। কাঁটায় কাঁটায় দশটায় তোমাকে নিয়ে যাব আমি। তুমি রাজী হলে এর ভেতরে সব ঠিকঠাক করে রাখব আমি বলেকয়ে।

কিন্তু তুমি করছে না কেন? তোমার অসুবিধেটা কী হচ্ছে?

মনের সায় নেই। কোনো ধরাবাঁধার মধ্যে আমার মন যেতে চায় না, সময় বাধা রেখে, স্বাধীনতা খুইয়ে টাকা কামানো আমার কর্ম না।

সেভাবে দেখলে, কেবল দুঃখ পাওয়া ছাড়া আর কিছুতেই কারো স্বাধীনতা নেই কোথাও! সবাইইে সময় বাঁধা রাখতে হয়। বাধ্য থাকতে হয় এক সময়—-মনিবের কাছে, পরিবারের কাছে, কারো না কারো কাছে। এড়াবার জো নেই, জানো?

সংসারের ভেতরে থাকলে নেই বটে, কিন্তু যে তার বাইরে থাকে, থাকতে চায়? সত্যি বলতে, জানো দশটা পাঁচটা অফিসের চেয়ারে টান হয়ে বসে থাকা কাজ থাক না থাক, একটানা ঐ এক দশায়, সে-অধ্যাবসায় আমার নেই। টেবিলের সামনে বসলেই আমার পিঠটান দিতে ইচ্ছে করে।

অদ্ভুত তো!

অত কী! সেটাই স্বাভাবিক। শৃঙ্খলাবোধ বাল্যকাল থেকে শিখতে হয়-রেগুলার ইস্কুল কলেজ করে। পড়াশুনা তো নিজের বিছানায় শুয়েও হতে পারে কিন্তু ঐ রেগুলারিটি আর ডিসিপ্লিনের শিক্ষা সেই ইস্কুল কলেজেই হয়ে থাকে। সেখানে সে পাঠ যে নেয়নি এগারোটা-চারটে ইস্কুল করেনি, সে দশটা পাঁচটা অফিস করতে কখনই পারবে না, কিছুতেই না। সর্বদাই আইঢাই করবে। পালাই পালাই করবে সব সময়। ইস্কুলের বেঞ্চে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে মন উড়ু উড়ু করত যেমন।

কিন্তু কাজ তো সবাইকে করতেই হয়। কাজ না করে কি কারো চলে?

তা তো চলে না জানি। আমিও কাজ করতে চাই–মনের কাজ হয় যদি।

 সে আবার কোথায় মেলে হে? কাজের মত কাজ হলেই হয়।

আমার হয় না ভাই। মনের মতন কাজ হওয়া চাই আমার। হয়েওছিল একবার। এই লেখালেখিরই কাজ। তবে নিজের বিছানায় শুয়ে বসে গড়িয়ে আরামে অবকাশের মধ্যে করা যেত। আত্মশক্তির সম্পাদকতা করতাম যখন–ডবল ক্রাউনের এক ফর্মা ঘরে বসে লিখে দিলেই চুকে যেত–তারপর মাস গেলেই একশটাকা। বেশ কাজ ছিল সেটা, কিন্তু টিকল না শেষ পর্যন্ত। মনের মতন কিছুই কখনই বেশি দিন থাকে না, আমি দেখছি। মনের মতন মানুষ যারা তারাও চলে যায় শেষটায়।

মনের মতন না হল তো কী! টাকার জন্যই তো কাজ করা। আর, তোমারও যখন টাকার দরকার–এ কাজটা তুমি করবে না কেন?…সব কাজই ইচ্ছে করলে করা যায়, মানিয়ে নিতে হয় কেবল।

তোমার কথাটা মানি। আর মানি ফ্যালনা নয়, তাও মানতে হয়, সে কথাও বটে। কিন্তু আমার ঘটে যদি ক্ষমতা না থাকে, তাহলে তুমিই তার কী করবে, আমিই বা কী করব! কারো নিয়তি কেউ খড়াতে পারে?

পয়লা তারিখের আগের দিন ক্যাপটেন দত্তকে গিয়ে জানালাম-আপনার কাজটার জন্য আমার চেয়েও ভালোলোক ঠিক করেছি। প্রেমেন মিত্তির। নাম শুনেছেন নিশ্চয়? আমার চেয়ে ঢের ঢের বড় লেখক–এমনকি, একালের আমাদের সবার অগ্রগণ্য বলেই তাঁকে আমার মনে হয়। তাঁকেই আমি নিয়ে আসব কালকে।

তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে গেলেন। প্রেমেন পরদিন থেকেই লেগে গেল কাজটায়।

আত্মশক্তি কাগজটা সে সময় নবশক্তির রূপ ধরে ক্যাপটেন দত্তের তত্ত্বাবধানে ছিল, তিতাস একটি নদীর নাম-এর বিখ্যাত লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণের সম্পাদনায়। প্রতি সপ্তাহে কাগজের শেষের দিকে প্রেমেনের এক পাতা করে লেখা থাকত-বেংগল ইমিউনিটির তৈরি ওষুধগুলির প্রচার বিজ্ঞাপনী হয়ে। একাধারে বৈজ্ঞানিক আর বৈজ্ঞাপনিক কলাসম্মত প্রচারনার সেই রম্যরচনাগুলি–তার সংক্ষিপ্তসার কুড়িয়ে বাড়িয়ে বার করতে পারলে একটা আদর্শ স্বাস্থ্যশিক্ষার বই হতে পারত, আমার ধারণা। প্রেমেনের এখনকার যতো বিজ্ঞাননির্ভর গল্পকাহিনীর গোড়ার কথা বলে আমার মনে হয়।

মনের মত ঠিক না হলেও, কাজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। কাজটা না করলেও প্রেমেনের এই কথাটা আমি মেনেছিলাম।

মনের মতন কাজের আশায় যে বসে থাকে, তার তেমন কিছু কোনদিনই হয় না।

মনের মত কাজ নয়, কাজের মতন মন করতে হয়। যারা তা পারে, যাদের তা হয়, তারাই কাজের লোক হয়। সেই কেজো লোকরাই কালে কৃতী, স্বীয় কৃতিত্বে স্বকীয় কীর্তি রেখে যায়। তারাই কমবীর; আর সবাই তাঁদের মতন না হয়ে আমোহ দাশ-এর বদলে আলাভোলা হয়ে বাউন্ডুলে জীবন কাটায়। উঞ্ছবৃত্তির জীবদ্দশায় দিন কাটে তাদের।

বাবা বলতেন, উঞ্ছবৃত্তি কিছু খারাপ নয়। একদা ব্রাহ্মণদের-যারা নাকি আদর্শ ব্রাহ্মণ, তাদের কাজ ছিল তাই করা। কারো দাস্যবৃত্তি না, বৈশ্য বৃত্তি নয়, ক্ষাত্রবৃত্তি তো নয়ই–ঐ উঞ্ছবৃত্তি।

মা বলতেন, উঞ্ছবৃত্তি আর ভিক্ষাবৃত্তি এক। দুটোই দৈন্যদশার।

মোটেই তা নয় বাবা বলতেন আমায়, আমরা যাদের বংশধর-উর্ব সবন ভার্গব জামদগ্ন্য আগবৎ-এই পঞ্চ প্রবর আমাদের পূর্বপুরুষ-ঐ উবৃত্তিই ছিল তাঁদের কাজ। শাস্ত্রচর্চা, ধ্যান-ধারণা এসব নিয়েই তাঁরা থাকতেন, কিন্তু জীবিকা নির্বাহ হত তাঁদের ঐ উঞ্ছবৃত্তিতেই। উঞ্ছবৃত্তি কাকে বলে জানিস? কৃষকরা মাঠের থেকে তাদের ফসল কেটে বাড়ি নিয়ে যাবার কালে তাদের বোঝার থেকে যে সব শস্যশা মাটিতে পড়ত, সেই সব কুড়িয়ে এনে সেদ্ধ করে খেতেন তাঁরা। বাকী সময়টা কাটাতেন ব্রহ্মচিন্তায়। বুঝেছিস? :

বুঝতে পেরেছিলাম ভালোই, আমার ধারণায় সেই থেকেই প্রাতঃস্মরণীয় পঞ্চ প্রবরের ঐ কাজ বরণীয় হয়ে আমার মনের কোথায় গেঁথে গেছল যেন। উর্ব চ্যবন ইত্যাদির উর্বর ক্ষেত্রে পরের ফসল থেকে কুড়িয়ে-বাড়িয়ে নিজের কারবার ফলাও করতে লেগেছিলাম সেই থেকেই নিজের অবচেতনাতেই যদিও।

আমার এই প্রবণীয় পেশায় পরের উর্বর ক্ষেত্রে ফলাও ফসলের ঝরতি-পড়তিতে ভাগ। বসাবার এই আপ্লবৎ আদৌ আমার জন্মকোঠি-বিরুদ্ধ ছিল না।

সেটা বুঝতে পেরে মা তখনই বাধা দিয়েছিলেন আমায় : না, খবরদার না। উবৃত্তির পথে যাসনে। তোর মন যে দিকে টানবে সে দিকে যাবি, মাকে মনে রেখে প্রবৃত্তির পথে এগুবি তুই। যা তার পাবার, যা তার প্রার্থনীয়, সবই তার মিলে যাবে দেখিস।

বাবা প্রতিবাদ করেছিলেন মার কথার। বলেছিলেন, না, প্রবৃত্তি নয় নিবৃত্তি। বলে লম্বা এক শাস্ত্রবাক্যও আউড়ে ছিলেন তিনি-মাংস ভক্ষণে দোষ ন মদ্য/ ন মৈথুনে প্রবৃত্তিরে ডুকনাম নিবৃত্তে মহাফলম

মোদ্দা কথাটা বাবার এই, প্রবৃত্তির পথে সকলেই যায়, যাবেই, কিন্তু যে নাকি নিবৃত্ত হবে মহাফল তারই প্রাপ্য।

মার কথা আমি বাবার কথা-র ওপরে মানতাম, কিন্তু এখন দেখা গেল, তাঁর কথাও নেহাত মিছে নয়। বাবার কথাটাই অভাবিত ভাবে কেমন করে ফলে গেল যেন।

বেঙ্গল ইমিউনিটির পথে নিবৃত্ত হবার পরেই একদিন হঠাৎ সুধীরবাবুর মৌচাক কার্যালয়ে যেতেই তিনি কথাটা তুললেন–মৌচাকের জন্যে লিখুন না! অনেকদিন ধরেই ভাবছি বলব আপনাকে…ছোটখাট একটা গল্প লিখে আনুন!

টাকা দেবেন? বলে ফেলি হঠাৎ।

নিশ্চয়ই। সবাইকেই দিই। সব লেখার জন্যেই দিয়ে থাকি। গল্প কবিতা প্রবন্ধ সবের। তবে গল্পই দিন আপনি। গল্পেরই দরকার।

কতে দেবেন?

যা চাইবেন। তিন-চার পাতার মত লেখা, তার জন্য যা উপযুক্ত মনে করেন।

যদি পনের টাকা চাই?

নিশ্চয়। ইচ্ছে করলে নিতে পারেন এক্ষুনি।

তক্ষুনি তিনি দশ-পাঁচ টাকার দুখানা নোট আমার হাতে ধরে দিলেন। আগাম। ঘোড়ার আগেই লাগাম পেয়ে গেলাম।

পেতেই আমার কেমন হাসি পেল যেন-কেন যে! এতদিন ইয়া বড় বড় গল্প কবিতা প্রবন্ধ, এমন কি নাটক পর্যন্ত লিখেও তেমন কিছু পাইনি, আর এ যে গাছে না উঠতেই এক কাঁদি।

হাসব না কাঁদব? হাসিই পেল আমার।

আর সেই যে আমার হাসি পেল, সেই হাসিই বুঝি পেয়ে বসল আমার সব লেখা তারপর থেকেই।

বাবার প্রণোদিত নিবৃত্তির পথ ধরে মার প্ররোচিত আমার প্রবৃত্তির পথ খুঁজে পেলাম। দুটো পথ আমার জীবনে মিললো এসে এক জায়গায়। দরাজ হাসির রাজপথে।

এক ধারায় এসে মিলে গেল একই মোহনায়, সাগরসঙ্গমের মতই। সেদিন আমার সাগর থেকে ফেরা নয়, সাগরের দিকেই ফেরা-ফেরার হওয়ার দিন।

.

৭৫.

 অদ্ভুত লোক ছিলেন মৌচাকের মক্ষিরাজ এই সুধীর সরকার। মধু আর মধুলুব্ধদের জন্যে তাঁর মৌ-ভান্ডার সর্বদা উন্মুক্ত থাকত। দরাজ হাতে নির্বিচারে তিনি বিলিয়ে দিতেন সবাইকে।

মহারাজ বিক্রমাদিত্যের মতন তারও ছিল নবরত্ন সভা। সেকালের সাহিত্য জগতের দিপালেরা তাঁকে ঘিরে মৌচাকের আসরে এসে জমত। কবি সত্যেন দত্ত, মণীন্দ্রলাল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, হেমেন্দ্রকুমার রায়, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, নরেন দেব, প্রভাত গাঙ্গুলি, কেদার চাটুজ্যে (ইনি জগন্নাথ পন্ডিতের ছন্মনামে অনেক চমৎকার গল্প লিখেছেন মৌচাকে ১, হিতেন বসু শিল্পী চারু রায় প্রভৃতি তো ছিলেনই, (সকলের নাম মনে আসছে না এখন) নবরত্নের পরেও তিনি নব নব রত্নদের নিয়ে এসেছেন। আমাদের কালে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ, অন্নদাশঙ্কর, অচিন্ত্যকুমার, মোহলাল, প্রেমেন্দ্র মিত্র, ধীরেন ধর, খগেন মিত্র, কামাক্ষীপ্রসাদ, সুকুমার দে সরকার, মানিক বন্দ্যো, বিমল দত্ত, শৈলজানন্দ, বিভূতি বন্দ্যোকেও এনেছিলেন মৌচাকে, এমনকি রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, সুবোধ ঘোষকে পর্যন্ত টেনেছিলেন।

বিক্রমাদিত্যের চেয়েও পরাক্রমে তিনি বড় ছিলেন, পরকেও তিনি ক্রমে ক্রমে আপনার করে নিতে জানতেন। তাঁর মৌচাক-রাজ্যে রথী-মহারথীর থেকে আমার ন্যায় সামান্য পদাতিক পর্যন্ত এসে জুটেছে, আর সবার সাহায্যে শিশু সাহিত্য বড় হয়ে উঠেছে। বয়সে বেড়েছে না কেবল, দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশভঙ্গীও বদলে গেছে, রূপ বৈচিত্র্যে অপরূপ হয়েছে দিনের পর দিন। শিশু সাহিত্যের রাজ্য বিস্তারে মহারথদের নিয়ে নিজের সারথ্যে বার বার তিনি সীমান্ত পার হয়েছেন, চার ধারে ছড়িয়ে সীমানা ছাড়িয়ে গেছে কবেই, আজ আর তার সীমা পরিসীমা নেই।

সন্দেশের থেকে কোন্ দেশে আমরা এসে গেলাম! সন্দেশের অবশ্য জোড়া তুলনা হয় না, উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার রায় জন্মাবেন না আর, যোগীন সরকার, কুলদারঞ্জনের মতন কাউকে আর পাব না আমরা, দক্ষিণারঞ্জনের অপরূপ রূপকথার জগতও চিরদিনের মত হারিয়ে গেছে। বাঙালীর শৈশব থেকে হারায়নি যদিও, কোনোকালেই হারাবার নয়, কেননা প্রথম অক্ষর পরিচয়ের পর এঁদের বই আমাদের পড়তে হবেই, সাহিত্য রসাস্বাদনের গোড়াপত্তন ওসবের থেকেই কিন্তু বাংলার কিশোরদের কৌতূহলের স্বাদ এনে দিলেন হেমেন্দ্রকুমার–তাঁর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী যখের ধন-এই সব প্রথম। মৌচাক আর সুধীর সরকার নইলে কি তা সম্ভব হত? সুধীরবাবুই তাঁর সমকালীন লেখকবন্ধুদের সাহায্যে শৈশবের রাজ্যে কৈশোর নিয়ে এসেছেন–শিশুসাহিত্যে নয়া জোয়ানির বান ডাকিয়েছেন! যেন যাদুকাঠির ছোঁয়ায় নিমেষের মধ্যে শিশুকে তারুণ্যে পৌঁছে দিয়েছেন–যেখানে দুনিয়ার দিগ্বিদিক তার সামনে খোলা, বিশ্বের বহুবিচিত্র বিস্ময় নিয়ে। হেমেন্দ্রকুমারের যখের ধন আর মণীন্দ্রলালের কায়াহীনের কাহিনীর লাটুর ঘূর্ণীতে শুরু হয়ে কল্লোলিনী সুরধুনীর ন্যায় বাঁক ঘুরে বহুৎ ঘুরপাক খেয়ে সুবোধ ঘোষের পুতুলের চিঠি পেরিয়ে, আজকের সত্যজিৎ আর প্রেমেন মিত্তিরের বিজ্ঞাননির্ভর রহস্য-কাহিনীর কিনারায় এসে সৌছানো–ভাবলে অবাক হতে হয় বই কি। দক্ষিণারঞ্জনের রূপকথার কল্পনোক থেকে এখনকার বস্তুনিষ্ঠ গল্পলোকে এই-পরমাশ্চর্য উত্তরণ!

কয়েক দশকেই এই যুগান্তকর কান্ড–ধারণাই করা যায় না। এর গোড়ায় সুধীর সরকার। ধুরন্ধর লেখকরা এর জন্যে কলম ধরেছিলেন সে ঠিক, কিন্তু একালের যুগন্ধর ঐ সুধীরচন্দ্রই। তিনি না এলে তাঁরা আসতেন কিনা, অদ্ভুত এভাবে এই শিশু সাহিত্যে নামতেন কি না সন্দেহ আছে। তিনিই এদের–বড়দের এই বিখ্যাত লিখিয়েদের কিশোর সাহিত্য রচনায় নামিয়েছেন তাঁর মৌচাকে। আর বড় লেখকরা এসেছিলেন বলেই শিশুসাহিত্য বড় হল-বড় দরের হয়ে দাঁড়াল।

প্রতিভা স্বতঃস্ফূর্ত স্বতঃপ্রকাশ সত্যই। চন্দ্র সূর্য জ্যোতিষ্করা স্বপ্ৰকাশ, নিজের আলোতেই প্রকাশিত, সন্দেহ নেই। কিন্তু জ্যোতির্ময় সূর্যকেও আকাশের অপেক্ষা রাখতে হয়– আত্মপ্রকাশের জন্য। তাই আকাশের ভূমিকা সূর্যের চেয়ে বড়ো, আকাশ না থাকলে সূর্যরা ঠাঁই পায় কোথায়? তাদের প্রকাশ করে কে? লেখকের চেয়ে প্রকাশক অনেক বড়ো–এই কারণেই। আকাশ নহিলে তোমারে ধরিবে কে বা? লেখক শুধু নিজেকেই প্রকাশ করেন, প্রকাশক করেন অনেককে।

সুধীর সরকারের ছিল সেই আকাশী ভূমিকা। যে ভূমিকা কম নয়।

এমনকি, শরৎচন্দ্রের প্রথম প্রকাশক সুধীরবাবুই। তাঁর মননশীল প্রবন্ধগুচ্ছ নারীর মূল্য তিনিই বার করেন। তাঁর দুঃসাহসিক বই-পথের দাবী, (প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে রাজদ্রোহ প্রচারের দায়ে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত) কয়েক হাজার টাকা দিয়ে নিয়ে রেখেছিলেন কিন্তু পরে শরৎচন্দ্র সেটি উমাপ্রসাদবাবুকে ছাপতে দেবার জন্য চাইতেই, অমনিই তাঁকে ফিরিয়ে দেন তক্ষুনি–কিছু না নিয়েই। এই ঔদার্য তাঁর ছিল।

সব লেখকের বেলাতেই এটা দেখেছি। কোনো লেখক দরকারে পড়ে এসে চাইলেই তিনি অকৃপণ ভাবে দিনে, লেখকের লেখা দিয়েই যা পরিশোেধ হয়ে যাবার। কিন্তু লেখকেরও ঐ লেখা দেবার কথা মনে থাকত না, আর তিনিও চাইতে ভুলে যেতেন-না লেখা না টাকা।

নাট্যকার শচীন সেনগুপ্ত একখানা উপন্যাস লিখে বেকায়দায় পড়েছিলেন একবার। তাঁর বইয়ের কোনো প্রকাশক পাচ্ছিলেন না। নাট্যকারের উপন্যাসের প্রকাশক পাওয়া সেকালে মুশকিল ছিল। অথচ, তাঁর টাকার বিশেষ দরকার তখন। রাস্তায় দেখা হতে বললেন আমাকে, বইটা কাকে দেওয়া যায় বল তো হে? এক্ষুনি টাকা দিয়ে কে নিতে পারে আমার উপন্যাস?

কে আবার? ঐ সুধীর সরকার। আমি নির্দ্বিধায় জবাব দিয়েছি।

সুধীরবাবুর কাছে তাঁকে নিয়ে যেতে, শোনা মাত্রই পাণ্ডুলিপিটা ড্রয়ারের মধ্যে রেখে কয়েক শটাকা তাঁকে দিলেন তিনি তক্ষুনি-কোনো লেখাপড়া চুক্তিপত্রাদি না করেই। আবার কিছুদিন বাদে, সেই বইটি অপর কোনো প্রকাশককে দেবার জন্য শচীনদা এসে চাইতেই সেই ড্রয়ারের ভেতর থেকেই পান্ডুলিপিটা বার করে তাঁর হাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন তৎক্ষণাৎ। বিনা বাক্যব্যয়ে–তাঁকে দেওয়া টাকাকড়ির নামগন্ধ না করেই।

লেখকদের প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে তিনি অকৃপণ হাতে দিয়ে গেছেন। বিনিময় প্রাপ্তির আশা না করে–ফিরে পাওয়ার দাবী না রেখেই এই আমিই কি তাঁকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আমার সময়ে অসময়ে কম নিয়েছি তাঁর কাছ থেকে? কিন্তু তাঁকে ভোলাবার বুঝি কোনো দরকার ছিল না। নিজ গুণেই তিনি ভুলে যেতেন। দেয়ার পরেই দানের কথাটা তাঁর আর মনে থাকত না। দেওয়া আর ভুলে যাওয়া যেন তাঁর মজ্জাগত বদভ্যাস ছিল।

এমনি অমায়িক ছিলেন সুধীর সরকার–কেবল ব্যবহারেই নয়, টাকার দিক দিয়েও। টাকায় তাঁর কোনো মায়া ছিল না যেন। একবার বুদ্ধদেব মৌচাকের দরজায় ঝাঁটানোনা জঞ্জলের মধ্যে একটা একশ টাকার নোট দেখে কুড়িয়ে নিয়ে সুধীরবাবুকে দিতেও তাঁর কোনো বৈলক্ষণ্য দেখা যায়নি। তাই নাকি? পড়েছিল ওখানে? বলে নির্লিপ্তভাবে তুলে রেখেছিলেন ড্রয়ারের ভেতর। বুদ্ধদেব তাঁর এক বিখ্যাত কবিতায় ঘটনাটা অবিস্মরণীয় করে রেখেছেন।

পরের দুরবস্থায় মুক্তহস্ত হওয়া এটা বোধ করি সরকারদের স্বভাবসিদ্ধ। সার এন এন. থেকে সুধীরবাবু পর্যন্ত এই ধারাটা আমি লক্ষ্য করেছি। এমনকি তার পরে…তারও পরে…তার পরেও আরো।

এমন কি পলিটিক্যালি বুনো, (ঝানু লোক বলতে পারি না তাঁকে) আমাদের হেমন্তদা, হেমন্তকুমার সরকার পর্যন্ত, নাট্যনিকেতনের ফায়ার ইনস্যুরেন্স-এর কমিশনের বাবদে তাঁর পাওনার পুরো টাকাটাই অম্লানবদনে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। টাকাটা নেহাত কম ছিল না। এক হাজারেরও ওপর বটেই।

ঘোষ বংশ বড় বংশ, বোস বংশ দাতা-প্রবাদে কয়। কথাটা মিথ্যে নয়। শরৎ বোস, সুভাষ বোস থেকে যতীন বোস পর্যন্ত তার পরিচয় আমার এই সামান্য জীবনেই প্রচুর বোসদের সৌজন্যেই আমি দাঁড়িয়েছি বলতে বাধা নেই। কিন্তু তাহলেও বলব, বদান্যতায় সরকার বংশও তার অন্যথা নয়।

সুধীরবাবু জীবদ্দশায় কারণে অকারণে আমায় অনেক তত দিয়েছিলেন, এমনকি, দেহরক্ষার পরেও দেবার তাঁর কোনো কসুর হয়নি। তাঁর স্মারক বইয়ের জন্য আমি একটা কবিত লিখেছিলাম, উদ্ধৃত করছি এখানে

রূপকাহিনীর রূপপার কাঠির ছোঁয়া ঘুম ঘুম দেশটাকে…ছিলো যতো শিশু স্বপ্নমায়ায় কল্পপুরীর মই ধরে…/শিশুসাহিত্য হতবিহ্বল শৈশবসুখে সেই অকে/জাগিয়েছ তুমি/ডেকেছ যে তুমি/নিয়ে এসেছ যে ঐ ভোরে/সেই সাথে যততা শিশু সাহিত্য-মহারথীদের হাত ধরে/সুধীরচন্দ্র! তোমার মিষ্টি মৌচাকে। শিশুসাহিত্য এবং শিশু রাতারাতি বুঝি সেই ডাকে/শৈশবমায়া পেরিয়ে সহসা পা দিয়েছে এসে কৈশোরে…। সাহিত্য রাজপথেই এসেছে সেইদিকে হৈ হৈ করে! সুধীরচন্দ্র! তোমার মিষ্টি মৌচাকে।

শিশুসাহিত্য-সারথি তুমি হে!
হে সুধীর সরকার!
হে-সুরধুনীর ভগীরথ তুমি, তোমারে নমস্কার।

কবিতাটা লিখেই কিন্তু আমার মন খারাপ হয়ে গেল–সুধীরবাবুর জন্য ততটা নয়। যতট ঐ কবিতাটার জন্য। সুধীরবাবু তো গেছেনই, তাঁর কাছে আর আমার কোনো প্রাপ্তিযোগ নেই, কিন্তু সেই সঙ্গে আমার কবিতাটাও গেল।

ওটার থেকে কোনো দক্ষিণা পাওয়ার আশা নেই, চাওয়া যায় না। যদিও তাঁর ছেলে সুপ্রিয় সরকার তাঁরই ঐতিহ্যধারায়, তাহলেও এহেতু কিছু দাবী করতে সঙ্কোচ কেমন বাধে না? যেখানে অন্নদাশঙ্কর, প্রেমেন্দ্র প্রমুখ তা-বড়ো তা-বড়ো লেখক অমনি তাঁদের লেখ দিয়েছেন ঐ স্মারকে, সেখানে এই লেখকেরও চক্ষুলজ্জা বলে একটা কিছু থাকতে পারে থাকা উচিত।

তাহলে আমার কয়েক ঘন্টার এই পরিশ্রম পুস্তিকার মাঠে মারা গেল অমনি? ভাবতে মনটা খচ খচ করে কেমন।

যাঁর কাছ থেকে অত পেয়েছি তাঁকে সামান্য একটু শ্ৰদ্ধা, নো হয় পদ্যাকারেই হোলো দিতে আমার কী কার্পণ্য! এতেই আমি কীরূপ স্বার্থপর মন্দমতি নীচাশয় তা টের পাবেন। আমিও তা টের পাইনি যে তা নয়, কিন্তু স্বভাব কি পালটায়? এই আমিই আবার শিশিরকুমার, শরৎচন্দ্রকে অর্থপর বলে দুষেছি, অথচ আমি নিজে কিরকম অর্থগৃধু ত দেখুন!

তবে ভেবে দেখলে অর্থলোলুপ কে নয়? শরৎ, শিশির তো মাথার ঠাকুর, এমনবি বিগ্রহরূপী নারায়ণ থেকে বিড়লা পর্যন্ত সকলেই পরার্থপর। কেউ কিছু কম যান না। সামনে পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা দেখলে প্রায় সবারই হাত বাড়াবার সম্ভাবনা।

 কিন্তু ব্যতিক্রম কিছু থাকেই-সুধীরবাবু সেই ব্যতিক্রম। সুধীরবাবু আমার মনের কথ (কিংবা ব্যথাই বলা যায়) কি করে যেন টের পেয়েছিলেন, দেহরক্ষার পর ঈশ্বর লাভের হে; ঈশ্বরের ন্যায় অন্তর্যামী হওয়া যায় বোধ হয়, ( যায় কি যায় না তা দেবযানের মহানস্রষ্টা আমার বন্ধু বিভূতিভুষণই বলতে পারতেন!) এক্ষেত্রেও দেখা গেল প্রায় সেই রকমটাই।

পরের সপ্তাহে দেখলাম, আমার সেই কবিতাটা আনন্দবাজার পত্রিকার আনন্দমেলায় পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। দক্ষিণাবাবদে আমি পনের টাকা পেয়ে গেলুম। মরার পরেও খাঁড়া ঘা বসিয়ে গেলেন তিনি আমায়-যদিও তো রূপোর খাঁড়াই। দেহ রেখেও তিনি দিয়ে গেলেন, তারপরেও সামান্য কিছু স্নেহ রেখে গেলেন এই অধমের জন্যে।

পরে শুনেছিলাম, ওটা কানাই সরকার মশায়ের সৌজন্যেই আনন্দমেলায় ছাপা হয়েছিল। তাহলেও দেখুন-সেই সরকার। এখানেও! আমার টাকা-নাই দশা জানতেন বলেই কানাইবাবু আমার এই প্রাপ্তিযোগটা ঘটিয়েছিলেন মনে হয়।

অসামান্য প্রাপ্তিযোগও ঘটেছে আমার তাঁর দৌলতেই। আনন্দবাজারের সূত্রে এখন আমার যে অল্পবিস্তর আমদানি, তার গোড়াতেও তিনিই। তিনি এবং অশোক সরকার মশাই। আর সেটাও ঘটেছিল সুধীরবাবুঘটিত এক মৌচাকখানার আসরেই। সেখানেও উপলক্ষ সুধীরচন্দ্র সরকার, পরোক্ষভাবেই যদিও।

কানাইবাবু সেকালে মৌচাকের বৈঠকে কখনো কখনো আসতেন। এবং প্রায়ই বলতেন আমায় আনন্দবাজারের সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় লেখা দিতে। কী ধরনের লেখা? আউট অব নাথিং–যা কিছু। আমার লেখাটাই তো নাথিং তার মধ্যে। কিছুই থাকে না বলতে গেলে, তাই বোধ হয় ঐ সহজ বায়নাটাই দিয়েছিলেন তিনি আমাকে।

কিন্তু আউট অব নাথিং কিছু লিখতে যাওয়াটাই তো সামথিং। সম্পাদকীয় পৃষ্ঠার তৃতীয় লীডারে যে লঘু রচনাটি থাকে তা মোটেই সামান্য নয়, অসাধারণ এক লেখকের অসামান্যতার পরিচয় তার মধ্যেও-তেমনটা লেখা কি আমার পক্ষে সম্ভব? তাছাড়া, আমার ভাষার ত্রুটি। কথ্য ভাষার আমার গদ্যভঙ্গী ঐ পৃষ্ঠার অকথ্য ভাষার রচনাবলীর সঙ্গে খাপ খাবে কি? যদিও কথ্য ভাষার ক্রিয়াপদগুলি অকথ্যতায় (বস্তুত বেশির ভাগ ক্রিয়াই তো অকথ্য!) বদলে দিলেই নিছক সাধুতায় দাঁড়িয়ে যায়, তাহলেও স্বভাবতই আমি ইতস্তত করেছি। লেখা নিয়ে দেখা দিইনি তাঁর কাছে।

কিন্তু একদিন অভাবিত মাহেন্দ্রযোগ ঘটে গেল অকস্মাৎ। বছরে একবার করে সুধীরবাবুর হেফাজতে আনন্দবাজার, অমৃতবাজার, উল্টোরথ, মৌচাকের সাহিত্য পুরস্কার বিতরণী সাহিত্যিক বৈঠকে বসে–তেমনি এক সাহিত্যবাসরে যোগাযোগটা ঘটল।

উক্ত বাসরে কোনো বক্তৃতাবাজি থাকে না, কিন্তু গলাবাজি বেশ। বাজি ধরে গলাধঃকরণের মতন খাদ্যরাজি উত্তম। চপ কাটলেট থেকে শুরু করে আইসক্রিম অব্দি-যথেষ্ট খাও!

সেবার ল্যান্সডাউন রোডের একটা হিন্দী স্কুলে বৈঠকটা বসেছিল। তিনজনের করে ছোট ছোট টেবিল সাজানো, সব টেবিলই ভর্তি-ঠাই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে ঘরে। আমি তো দিশেহারা, টেবিলে টেবিলে খানা, দেখছি, কিন্তু নিজেকে কোনোখানেই দেখছি না।

একটা টেবিলে একটা আসন খালি কেবল। সেখানে অশোকবাবু আর কানাইবাবু বসে সেখানে গিয়ে সাহস করে তৃতীয় জন কেউ বসেনি তখনো। আমি দুঃসাহস ভরে এগিয়ে যেতেই কানাইবাবু আমায় ডাকলেন, পরিচয় করিয়ে দিলেন অশোকবাবুর সঙ্গে।

সাহস পেয়ে এগিয়ে টেবিলের শূন্যস্থল তৃতীয় স্থান অধিকার করলাম গিয়ে। অশোকবাবু কথায় কথায় বললেন, বসুমতীতে আপনার বাঁকা চোখে কলমে যেমনটা আপনি লিখে থাকেন, সেই ধরনের একটা হিউমারস কলম আনন্দবাজারে লিখতে আপনার আপত্তি আছে?

আপত্তি কিসের! আমি বললাম, তেমন সুযোগ পেলে তো আমি বর্তে যাব, সেটা ভাগ্য বলেই মনে করব আমার।

যথার্থই তাই। সেরকম অল্প কথার চুটকি লেখায় সামান্য খাটুনির সুযোগ পাওয়া আমার পক্ষে সৌভাগ্যই বটে।

এর আগে একাধিকবার কানাইবাবুর কাছ থেকেও আমি আনন্দবাজারে লঘু গুরু নিবন্ধ রচনার আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম, কিন্তু ততটা প্রণোদিত হইনি। যে কাজে বেশ পড়াশোনা আর অধ্যবসায় লাগে তাতে স্বতঃই আমার তেমন উৎসাহ জাগে না। সে কাজটা আমার মনের মত মনে হয়নি, কিন্তু এটা আমার মনের মতন কাজ।

অবশ্যি প্রেমেন একবার বলেছিল বটে আমায় যে, কাজ মনের মত না হোলো তো কী! কাজের মতন মন হলেই হয় কাজে লেগেই মনকে কাজের মত করে নেয়া যায়। যে কোনো কাজে লাগলেই হয়। কাজে লেগেই, লেগে থাকতে থাকতেই মন এসে যায়। প্ৰেমেন বুঝিয়েছিল আমায়। এমন কি এ তত্ত্বও সে শুনিয়েছে, বিশেষ করে আমাদের এই বয়সের তরুণ মন, জলের মতই তরল, যে-আধারে থাকে সেই আকারই পেয়ে যায়। পেয়ে যায়, সব কিছু খাপ খেয়ে যায়, কিছুই বেখাপ্পা লাগে না। দিনকতক থাকলে এমন কি জেলখানাতেও মন বসে যায় তার।

যা বলেছো ভাই! নিজের মন খতিয়ে সায় দিই আমি তার কথায় : আমি আগে কী বোগাই না ছিলাম যে আমার সে চেহারা তুমি দ্যাখোনি। সেই দিব্যকান্তি দেখলে মানুষ মূৰ্ছা যেতো! মেয়েরা বিশেষত। এমন হৃষ্টপুষ্ট হয়ে এলাম কোথা থেকে? সেই জেলখানা থেকে-জেলের খানা থেকেই। এমন মন বসে গেছল যে, চলে আসতে চাইছিল না, কিন্তু এমনি তাদের কানুন ভাই, টার্ম ফুরিয়ে গেলে তার একদিনও বেশি তারা রাখে না, রাখতেই চায় না কিছুতে, হাজার সাধলেও নয়।

অমনিই হয় ভাই! সে বলে : বেংগল ইমিউনিটির কাজটা তোমাকেই নিতে বলছিলাম তাই। দেখো মন বসে যাবে ঠিক। এই বয়সে এমন অযাচিত সুযোগ ছাড়তে নেই। টাকার কতো দরকার তা জানো?

জানি। তবে মন লাগছে না যে, কী করব? দশটা পাঁচটা এক জায়গায় আটকা থাকা, স্বাধীনতা আর সময় বাঁধা রেখে…সে টাকার-কী দাম!

মনে তোমার কাজ লাগেনি, তাই কাজে মন লাগাতে পারছে না! দুনিয়া জুড়ে এত এত লোক কাজ করছে তাহলে কী করে? ছোট বড়ো কতো রকমের কাজ করছে! করছে কী করে তারা? এ যদি না পারো তো কোনোদিনই তুমি কোনো কাজে লাগবে না, না নিজের না পরের। কোনো কাজই হবে না তোমার দ্বারা। কোনোদিন কিছুই তুমি করতে পারবে না।

পারলাম না। সত্যিই নাহক নট কিছু থেকে গেলাম ছেলেদের সেই মার্বেল গুলির মই অনড়–নট নটচড় নট্‌ কিচ্ছুই। ছেলেবেলা আর কাটল না আমার জীবনে।

জানি যে, কেজো লোক হলেই কাজের কাজী হওয়া যায় একদিন। কিন্তু তা আমি হতে পারলাম কই? প্রেমেনদের মতো কাজের কাজীও হলাম না, নজরুলের মতন কাজীর কাজও হল না আমার দ্বারা।

কিছুই হল না, তবে কোনো খেদও নেই। মনের গর্ভে বা জীবনের পর্বে অশান্তিও নেই কোনো। দুর্দশা হয়ত কদাচ একটু থাকলেও দুরাকাঙ্ক্ষীর দুরত্ত দশাও পায়নি কখনো আমাকে।

কাজ করতে করতেই কর্মবীর হয় কে না জানে! নিতান্ত আলামোহ্ন দাশ হতে না পারলেও একাতই তাকে আলালের ঘরের দুলাল হয়ে কিংবা আলাভোলা বাউন্ডুলে হয়ে জীবন কাটাতে হয় না। না হলেও, তার বাড়ি গাড়ি ফ্রিজ সোফাসেট রেডিয়ো রেকর্ড-প্লেয়ার বৌ-টো-সেই সঙ্গে ছেলেপুলেও তো হয় অন্তত। এয়ারকন্ডিশন্ডু সব, ইয়ার্কি নয়!

সবই তার হয়, আর যেটা যায় সেটা তার সময়। আকাশের মতন ফাঁকা অখন্ড অবকাশ। মুক্ত পাখায় মনের সঞ্চরণের অনন্ত বিস্তার।

কবি বলেছিলেন, অবকাশটাই জীবনের আসল। পেয়ালার ফাঁকটাই রসে ভরে ওঠে। বিজ্ঞানী আর যন্ত্রবিাও বলছেন, শেষ পর্যন্ত সব মানুষকে চূড়ান্ত অবকাশ দেওয়াটাই তাঁদের কাম্য, তার জন্যই নাকি তাদের সাধনা।

সেই এনতার অবকাশ আমি হারাতে যাব?

কবি গেয়েছিলেন, দুয়ার মোর পথ পাশে/ সদাই তারে খুলে রাখি/ কখন কার রথ আসে/ ব্যাকুল হয়ে জাগে আঁখি!

জীবনের আনন্দমেলায় রথ দেখার সঙ্গে কলা বেচার সৌভাগ্য হয় না তার। রাজার দুলাল ঘরের সুমুখ দিয়ে চলে গেলেও, নিজের মন দেওয়া দূরে থাক, চোখের পলক দেখারও ফাঁক পায় না বেচারা। মুখমিষ্টির বিনিময়ে মিষ্টি মুখ, চোখে এবং চেখে, দেখে দেখে যাবার সুযোগ সে হারায়। দিন রাত কাজের গাদায় আর প্রয়োজনের তাগাদায় জড়িয়ে প্রিয়জন মিলনের ফুরসত তার হয় না। জীবনম হলাহল পান করে যায়, তার অমৃত আস্বাদের সময় সে পায় না। জগতের আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রিত হয়েও নিজের যজ্ঞভাগে বঞ্চিত থাকে। হয়ে ওঠা, হয়ে যাওয়া, হতে হতে যাওয়া তার হয় না।

তবে পরমান্নের ভাগীদার হয়েই বা কী, তাও বলা যায় বটে। শেষ পর্যন্ত সবই তো হারাতে হয় সবাইকে। সব কিছুই অরিয়ে যায়। সমস্তই খোয়া যায়, খোয়ার থাকেই আখেরে। বিলকুল হারায়, মহাভিক্ষু আর পথের ভিখারী সবারই একই দশা দাঁড়ায়। খতম হয় সব, সবাই। কবিকেও দুঃখ করে বলতে হয়, হায়রে হৃদয়/তোমার সঞ্চয়/দিনাতে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

তাহলেও সেই পথভ্রষ্ট জীবনেও মুহুর্মুহু হৃদয় হারানোর প্রতিমুহূর্তের প্রাপ্তিযোগ রয়েছেই, যা নাকি হারাবার নয়। তার শেষ অঙ্কে, অঙ্কের শেষ ফল শূন্য হলেও, চরম ক্ষতির সঙ্গে পরম প্রাপ্তি বুঝি ওতপোত থাকে, সেই শূন্যস্থলই বারে বারে অমৃত রসে পূর্ণ হয়ে ওঠে, ক্ষণে ক্ষণে জনে জনে ভরে দিয়ে যায়।  সেদিনের বৈঠকখানায় নোকি, খানার বৈঠকে) সেই পরম ক্ষণই এল বুঝি আমার আবার আনন্দবাজারের সেই আমন্ত্রণ।

অবশ্যি, কানাইবাবুর কাছ থেকে এ আমন্ত্রণ আগেই আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু তখন আমি রবিবারে বসুমতীর কলম-রাইটার। হাতে আম থাকতে আর গাছের আম হবার গরজ ছিল না আমার।

কিছু হলেই হলো, সামান্য নিয়েই আমি সুখী, পরমাণু কশাতেই পরিতৃপ্ত, বেশি কিছু, আরো কিছু চাহিদা আমার নেই। নিজের সীমিত সময় আর শক্তির সীমানা তো জানি।

কানাইবাবুর (বোধকরি সরকার মাত্ররই) পরদুঃখকাতরণ। আমার টাকা-নাই-দশা দেখেই বাড়তি উপায়ের সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। সেটা ছিল তার আমাকে পুনর্বাসনের প্রয়াস। কেবল আমাকেই নয়, অনেক লেখকেরই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন। ছোট মাপের হলেও এদিক দিয়ে তিনি বিদ্যাসাগরের সগোত্রই বলা যায়। বিদ্যাসাগরের বরাদ্দ যেকালে কেবল এক মাইকেলের জন্যই ছিল, সেখানে তাঁর সৌজন্যে, মাইকেল তুল্য না হলেও একাধিক লেখকের ব্যবস্থা হয়েছে। আমাকেও তার একজন ধরা যায়।

আমার বেলায় তা শুধু পুনর্বাসনই নয়, পূর্ণ বাসন। অশনবসন ওষুধপত্রের সম্পূর্ণ বন্দোবস্ত।

কিন্তু কাজের কাজী ছিলাম না বলেই তখন আমি রাজী হতে পারিনি, কেননা কাজটা ছিল শ্রমসাধ্য, সময়বাধ্য। আর আমি, সময়ভিক্ষু শ্রমবিমুখ চিরকাল। কিন্তু এবারকার প্রস্তাবটা আমার স্বধর্মোচিত কাজের মতই, মনের মতন বলে সঙ্গে সঙ্গে উৎসাহিত হয়েছি। সাগ্রহে গ্রহণ করেছি।

বসুমতীর বাঁকা চোখের মত চুটকি লেখার কাজই আমার পোয়। চটুল এবং চটারি। সময়সাধ্য শ্রমসাধ্য নয়, চট করে হয়, চটজলদি কাম–মাথা খাটিয়ে মাথার ঘাম ফেলবার টায়ারিং কাজ না। মাথায় খাটাবার টায়রা নয়, বঙ্গবাণীর অঙ্গাভরণের জড়োয়া গয়না নয় কিছু, পদতলের চটকি মাত্র।

এমন কাজই আমি চেয়েছিলাম।

বসুমতীর কাজটা ছাড়লেন কেন? অশোকবাবু শুধালেন আমায়।

আমি ঠিক ছাড়িনি, বললাম আমি : সত্যি বললে, ছাড়িত হয়েছি বলাটাই সঠিক।

এবং সত্যিই তাই। আমার মত মায়াবদ্ধ জীব কখনই সহজে কিছু বা কাউকে ছাড়তে পারে না। আপনার থেকেই মায়ায় জড়িয়ে পড়ি কেমন! অপর পক্ষই আমাকে ছেড়ে যায়, ছাড়িয়ে যায়। বার বার আমার জীবনের সব ক্ষেত্রেই এইটেই ঘটেছে, আমি দেখেছি।

বসুমতী আমি ছাড়িনি, ছাড়তেও চাইনি। কিন্তু কি কারণে যে, দৈনিকের সম্পাদক এবং সর্বাধ্যক্ষ হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ মশাই আমার প্রতি বিরূপ হলেন, জানি না, আমি তাঁর ত্রিসীমানার থেকে নিজেই সুদূরপরাহত হয়ে গেলাম।

প্রাণতোষ ঘটকের আমলে বসুমতী নবপর্যায়ে নবীনরূপে দেখা দিয়েছিল। তারই আমন্ত্রণে সেখানে গিয়ে রবিবারের কাগজে ঐ এক কলমের চুটকি লেখায় লাগি।

যতদূর মনে পড়ে, হেমেনবাবু ভালভাবেই নিয়েছিলেন আমায়। বসুমতীর পৃষ্ঠায় বহু বিজ্ঞাপিত পঞ্চম জর্জের কমর্দনকারী, প্রায় পঞ্চম জর্জেরই ন্যায় ফ্রেঞ্চকাট দাড়িতে শোভমান সৌম্যদর্শন বহুশ্রুত এই ভদ্রলোককে প্রথম পরিচয়ে আমার ভালোই লেগেছিল সত্যি। তিনিও আমার ঐ চুটকি লেখার প্রশংসাই করেছিলেন।

বলেছিলেন, বিলেতের পানচ্ কাগজের গোড়াতেই এই ধরনের লেখা থাকে। চারভারিয়া। পানচ্ আপনি দেখেছেন নিশ্চয়?

দেখেছি, পড়েওছি। এখনও পড়ি হাতে এলে। তবে যথার্থ বলতে, পাঞ্চের চারভারিয়ার চুটকির রসে আমাদের ঠিক মন ভরে না। ওদের হিউমার ঠিক বুঝতে পারি না বলেই হবে হয়ত।

পাঞ্চের ঐ পৃষ্ঠাটি যিনি লেখেন, বিস্তর টাকা পান আমি জানি। তিনি অন্তত পাঁচশো পাউন্ড পান। সে হিসেবে আমরা আপনাকে তেমন কিছু দিতে পারব না। বসুমতীর হরে মাপে আমরা দেব, আপনার মুঠো ভরবার মত তা হবে না হয়ত।

মাসিক একশ টাকা আমি পেতাম, আর তাইতেই আমি খুশি ছিলাম।

তাই, অশোকবাবু যখন জানতে চাইলেন আনন্দবাজারের থেকে কতো আমি পেতে চাই, তখন আমি হেমেন্দ্রপ্রসাদের কথাটাই বললাম–তার মন্তব্যেরই পুনরুক্তি করলাম : আপনারা আমার মুঠোর মত দেবেন কেন, আপনাদের হাতের মাপেই দেবেন আমায়।

কত পেতেন আপনি বসুমতীতে!

একশ টাকা করে।

কিন্তু সত্য কথা বলা হল না। একশ টাকায় শুরু হলেও এবং বহুদিন ধরে তা পেলেও, টাকাটা আশীতে এসে দাঁড়িয়েছিল শেষটায়। এবং শেষ পর্যন্ত তাও দাঁড়াল না।

হঠাৎ একদিন গিয়ে শুনলাম, তিনি সেই মাসের আমার বিলটা পাশ করেননি। পরের মাসান্তেও ঠিক তাই হল। এবং তৃতীয় মাসেও ঘটল তাই। সেবারেও পাশ না করে তিনি বিলের পাশ কাটিয়েছেন। বার বার তিনবার। তৃতীয়বারেও আশী টাকার আশা না দেখে বাধ্য হয়ে তখন আমাকেও বসুমতীর মায়াপাশ কাটাতে হল।

বাবা বলতেন, জ্বর আর পর খেতে না দিলেই পালাবে। পর তো আর ঘরের বউ নয় যে, খেতে না পেলেও পড়ে থাকবে। কিচ্ছুটি আজ খাসনে, জ্বর তোর সেরে যাবে তাহলেই। দেখিস।

আমার মনে হয়েছিল, পরের মেয়ে হলেও বৌরা হয়ত পর নয়, পরীই হয় বোধ হয়–সেই কারণেই তাদের বেলায় এই অন্যথাটা হয়ে থাকে।

আমার ধারণা, হেমেন্দ্রপ্রসাদের বাবাও হয়ত তাঁকে এই প্রবাদ বচনটা বলে থাকবেন।

হেমেন্দ্রপ্রসাদ স্বাভাবিক সৌন্যবশেই সম্ভবতঃ কাউকে ঘাড় ধরে আপিসের বার করে দিতেন না। পত্রপাঠ বিদায় দেওয়াও হয়ত তাঁর বাঞ্ছনীয় ছিল না। কাউকে গলা ধরে অধঃকরণ না করে কেবল তার গলাধকরণের পথ বন্ধ করে দিতেন। খাদ্যের বরাদ্দ বন্ধ হলেই, বাধ্য হয়ে, বসুমতী কেন তুমি এই কৃপণা–বলে তাকে পথ দেখতে হত তখন।

তিনি ভদ্রলোক ছিলেন বাস্তবিক।

.

৭৬.

 হেমেন্দ্রপ্রসাদের কৃপায় মাস বরাদ্দ মজুরিটা মজে গিয়ে আমি প্রায় মোক্ষাভের পথেই এগিয়েছিলাম বলা যায়।

হ্যাঁ, মজুরিই বলব। লেখার মোট ফেলে সেই মোটের ওপর কিছু পাওয়া–আমাকে লেখক হিসেবে এক মেহনতি মজদুর ছাড়া আর কিছুই মনে করিনে। বাহুবল অভাবে রিক্শা টানতে পারিনে বলেই অঙ্গুলিসম্বল এই কলম টানি–চিরকালই নিজেকে মজুর বলে জানি। মাথার মোট গেলে আর মজুরি না পেলে বেকার দশায় নিজেকে কেমন মুমুক্ষু বা মুমূর্ষ বলেই মনে হতে থাকে।

বরাদ্দের শতকরা বিশভাগ মোচন হতেই নির্বিষ ঢোঁড়াসাপের পর্যায়ে পৌঁছেছিলাম। পাঁচ দশ টাকার লেখায় উঞ্ছবৃত্তির ফসল কোথায় মেলে তার জন্য ঢোঁড়াছুঁড়ি লাগিয়েছিলাম, তার ওপর বাকী আশীভাগটাও বাদ গিয়ে…কী বলব? শেষপর্যন্ত বুঝি আশীর্বাদই দাঁড়াল। মায়ার গ্রন্থিমুক্ত হয়ে হাতে হাতেই মোক্ষলাভ হল আমার।

সেদিনকার সাহিত্যের বৈঠকখানায় খানা আর বৈঠক দুই-ই উপাদেয় ছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই সঙ্গে আরও উপাদেয় আর একখানা জুটল আমার–অশোকবাবুদের ঐ প্রস্তাব।

শাপে বর হয়ে গেল আমার। বারে বারে আমার বরাতে এইটেই ঘটেছে, দেখেছি আমি।

অল্প লইয়া থাকি/তাই মোর/যাহা যায় তাহা যায়! তা সত্যি; কিন্তু ওই তাহা-টুকুও গেলে যাহা-র পরেও যাহা আছে আরও যে তাহা-তাহা থাকে, তার খবর পাই না। ভাগ্যের বরখাস্ত না হলে বুঝি বিধাতার বরহও আমার নাগালে আসে না। মহাপ্রসাদের পরমায় নিজের গালে পাইনে। চাঁচলরাজবাড়ির পিলখানায় রাজহস্তী মোহনপ্রসাদের সম্মুখে যেমনটা দেখেছিলাম একদা, তেমনি করে উসিতরসের মতই আপনার থেকে মুখে উঠে আসে না খাবার।

ষোলো আনা গেলেই–সেই পর্বের পরেই আমার পড়ে পাওয়া সেই আঠারো আনা গেলার পার্বণ!

হেমেন্দ্রবাবুর অভিসম্পাতের মত এককালের সেই শিশির-সম্পাতও আমার জীবনে মাহেন্দ্রযোগ হয়ে দেখা দিয়েছিল।

খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, কেউ কারো কোনো ক্ষতি করতে পারে না কখনোই। ওপরওয়ালার যেন তাতে সায় দেওয়া দস্তখতি নেই। তাই সব ক্ষতি বিক্ষতি পুষিয়ে গিয়ে নেপথ্যের থেকে পরম উচ্চাতি হতে দেখা যায়। যেমন নাকি কবে চক্ৰবাহননে মুহ্যমান মহর্ষি বাল্মীকির কণ্ঠ থেকে অন্তরের শোক প্রথম শ্লোক বাক্যের স্বচ্ছন্দ উচ্চারণে উদগীত হয়েছিল একদা…সেই-মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং তমগমঃ শাশ্বতীসমা…সেই রকম শিশির-সম্পর্কিত সভাপজনিত সেইকালের একটি কথাই শেষকালে কিনা প্রতিষ্ঠা দিল আমাকে।

মনের দুঃখে আমি বলেছিলাম, কার কাছে মনে পড়ে না ঠিক, হয়ত বা কল্লোলের আড্ডাতেই, শিশির ভাদুড়ি নহ, বোতলের তুমি! নিঃসন্দেহ বিদ্বেষবশেই। কিন্তু আমার সেই কথাটিই লাখ কথার এক কথা হয়ে দাবানলের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ল দিগ্বিদিকে। আমার বড়ো বড়ো কবিতা, ছোট ছোট গল্প, ইয়া ইয়া প্রবন্ধ, তাবৎ রচনা ছাপিয়ে…কী করে কে জানে দেশময় ছড়িয়ে পড়ল শেষটায়!

লিখে বার করিনি, ছাপা হয়নি কোথাও, তবু চাপা রইলো না। পা-মোড়া আমার সেই প্রথম বি-রসের ভিয়েন পান্তুয়ার মতই যেন লোকের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। নিষাদযোগে পাওয়া বাল্মীকির পরম উপলব্ধির মতন বিষাদযোগে পাওয়া আমার সেই প্রথম দুর্বাক্যই আমার মোক্ষম প্রাপ্তিযোগের কারণ।

কারণ প্রাণতোষ ঘটক যখন (তার অনেক পরে ) বসুমতীর মালিকানা উত্তরাধিকার করে তাদের কাগজে লিখতে ডাকলেন আমায়, তখন সেই কথাটিরই পুনরুল্লেখ করলেন আমার কাছে…

আপনি ওই শিশির ভাদুড়ি নহ-র মতই টপিক্যাল খবরের ওপর দুচার লাইনের ওই ধারার টিপ্পনি দিয়ে এক-কলম করে লিখুন না রবিবারের বসুমতীতে…লিখবেন?

আমি যেন হাতে স্বর্গ পেলাম, বলতে কী!

তার আগে আমি দু-পাঁচ টাকার উঞ্ছবৃত্তি করেছি, চয়নিকা ইত্যাদি অধুনালুপ্ত নানান পত্রিকায় লেখা দিয়ে, তার মধ্যে মৌচাক থেকেই পেয়েছি আমি ম্যাসিমা। রামধনুর থেকেও প্রায় তাই। আর মিনিমাম্ এসেছে যতো খুদে খুদে ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে। সারা কলকাতা ঝেটিয়ে তারা এসেছিল, তাদের পাড়ার কিংবা ইস্কুলের হাতে-লেখা পত্রিকায় আমার লেখা নিতে, কিন্তু আমি একেবারে অমনি লিখব না, লিখতে পারব না জেনে সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের পকেট হাতড়ে যা পেয়েছে বার করে দিয়েছে…পাঁচ আনা, সাত আনা, এমনকি চোদ্দ আনা পর্যন্ত খসিয়ে আমার একটা অত্যন্ত ছোট গল্প কিংবা অতিশয় খাটো কবিতা নিয়ে গেছে তাদের পরিচালিত পত্রিকায় প্রকাশের জন্য। এবং তার পরে, তারাই ইস্কুলের টিফিনের পয়সা জমিয়ে আমার গল্পের বই কিনে-সেকালে তার দাম ছিল চার আনা, ছআনা মাত্র–আমার বাজার গরম করেছিল–দেশে প্রদেশে চারিয়ে দিয়েছিল তারাই, আমি স্থির নিশ্চিত। লাইব্রেরি থেকে পাঠছলে বাড়ি নিয়ে ছিঁড়েখুঁড়ে মলাট উড়িয়ে শেষপর্যন্ত লোপাট করে লাইব্রেরিয়ানকে আবার কিনতে বাধ্য করেছিল–তারা ছাড়া আর কেউ না, আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

সেকালে এমনি করেই আমায় বেঁচেবর্তে রেখে একালে এনে পৌঁছে দিয়েছে সেই বালখিল্যের দল। আমার জীবনে আমি কোন ছেলেমেয়েকে মানুষ করতে পারিনি, পাছে সেই দায় পোহাতে হয়, সেই ভয়ে বিয়েই করলাম না একদম, কিন্তু অবশ্যই আমি বল যে, বাংলার ছেলেমেয়েরা আমাকে মানুষ করার জন্য হদ্দমু চেষ্টা করেছিল।

যদিও শেষ পর্যন্ত পারেনি, হার মেনেছে। তাই রক্ষে।

মানুষ বুঝি কাউকেই করা যায় না, যে হয় সে আপনিই হয়। কারো প্রচেষ্টায় কেউ হবার নয়।

অশোকবাবুর কাছ থেকেও সেই প্রাণতোষিণী প্রস্তাব এল আবার। আমার সেই এক লাইনের মার। ওস্তাদি মার নয় যদিও। তথাপি তিনিও তাই চাইলেন।

কিসের থেকে কী গড়ায় দেখুন! এককালের অভিশাপ, আরেক কালের অভিবাদনে দাঁড়ায়।

মানুষের বরাতে শাপই বর হয়ে দেখা দেয় বারে বারে–তাই বোধহয় তার বরাদ্দ! যেটাকে আমরা একদা বঞ্চনা বলে জ্ঞান করি, পরে দেখা যায়, সেটাই আমাদের বেঁচে যাওয়া। সবার অভিজ্ঞতাই তাই বলে বোধ হয়, এমন কি কবির অভিজ্ঞানেও তার পরিচয় রয়েছে। বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই/বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে/এ কৃপা কঠোরসঞ্চিত মোর/জীবন ভরে /…সেই কথাই কয় নাকি? সবার মতন আমার জীবনেও কিছু তার অন্যথা হতে পারে না। হয়ওনি।

এবং সেইজন্যই এ জীবনে মানুষ হতে না পারলেও আমি যে আমি হতে পেরেছি এই আমার ঢের। কিছু না হয়েও কিছু হয়ে ওঠা–কবিকথিত অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলোর মতন সকল ভালো-মন্দর মধ্যে বিরাজিত ভালোর মতন তাবৎ দ্বিধা দন্দ্বের অতিক্রম না-করার মধ্যে এই আকার নেওয়াটাই বুঝি চরম। এর জন্য যাঁর কাছে পেয়েছি এবং যাঁদের কাছে পাইনি, সবার প্রতিই আমি কৃতজ্ঞ।

হেমেন্দ্রপ্রসাদের আশীর্বাদের ন্যায় শিশিরবাবুর অবদানের জন্যও আমি কৃতার্থ। কিছু না হারালে কিছু মেলে না দুনিয়ায়। এবং যে-হারটা মানতে হয় তার ভেতরেই জয় যেন প্রচ্ছন্ন থাকে–ইংরেজি বাংলা দুই বানানেই।

শিশিরকুমার মহানুভব ছিলেন সন্দেহ নেই। সবার প্রতিই তাঁর সহানুভূতি ছিল। ইচ্ছে করে কাউকে তিনি বঞ্চনা করতেন না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কিন্তু কার্যক্রমে কখনো কখনো তা হয়ে যেত যে, সেটা তাঁর দোষ নয়। থাকলে পরে, থাকা পর্যন্ত তিনি ঝেড়ে কুড়ে দিয়ে দিতেন। সেদিন যে ব্যাঙ্কের পাশবই দেখে তাঁর সেভিংস অ্যাকাউন্টে মাত্র ১২০ টাকা পেয়ে, তার সবটাই–সেদিনকার মতন তার যথাসর্বস্বই, আমায় দিয়েছিলেন, তা। আমি বিশ্বাস করি।

বরং বলা যায়, তাঁকেই অনেকে নানাভাবে বঞ্চনা করেছিল, তাঁর প্রাপ্য তাঁকে দেয়নি। কিন্তু তাঁর এই বঞ্চিত হওয়াটা অপর কারো প্রবঞ্চনায় নয়, বরং তাঁর নিজগুণেই। এবং কিছুটা আত্মজনের, আর কিছুটা-বা পরের গুণফলে।

তিনি কারো ধার করে তারপর আর শোধ করতেন না, সেলুনে দাড়ি কামিয়ে পয়সা দিতেন না পর্যন্ত, বা মুদীর দোকানের দেনা মেটাননি বা যে দোকান থেকে মদ কিনতেন, তারও দাম দিতেন না কোনদিন, বলে সে নানা গুজব শোনা যেত তার সবটাই হয়ত সত্যি নয়।

উলটে, তিনি কারো বিশেষ ধার ধারতেন না, এই কথাই বলা যায় বরঞ্চ।

এমনি করেই মনে হয় ঘটনাগুলো ঘটে যেত–যার ফলে নাকি ওই ধারার রটনা।

কখনই পকেটে টাকাপয়সা নিয়ে বাড়ির বার হতেন না মনে হয়, যেটা নাকি বিস্মরণশীল সম্ভ্রান্ত প্রতিভার সহজাত।

সেলুনে দাড়ি কামিয়েছেন, পয়সা দিতে গিয়ে দেখেন নেই। সেলুনওয়ালা তাঁকে আশ্বস্ত করেছে-তাতে কী হয়েছে! আপনি আমাদের দেশের গৌরব! আপনাকে কামাতে পেরে আমরা কৃতার্থতারপরও আরও কিছু না-ই কামালাম।

মুদীও তাই করেছে, মদওয়ালাও তাই।

আপনাকে কিছু দিতে পেরে আমরা ধন্যতার জন্য দাম আবার কী নেব? বলেছে সবাই।

কিন্তু কেউই তারা মুদিত হবার পাত্র ছিল না, স্বার্থচেতন ছিল সকলেই, যথাকালে পরম্পরায় তারা দেখা দিয়েছে-পয়সার জন্য নয়, পাশের জন্য। প্রমোদিত হবার জন্যই।

এবং শিশিরকুমারও তা না দিয়ে পারেননি।

আর, এই করেই এত এত পাশ কাটার সাথে সাথে থিয়েটারী ব্যবসাও তাঁর পাশ কাটিয়েছে–তাঁর পাশ থেকে কেটে পড়েছে কখন। নইলে যে-ব্যবসায় সেই কালেরই মনোমোহন পাঁড়ে অগাধ টাকা উপায় করেছেন, সেই কালেই নব নাট্যযুগের পাণ্ডা (নাকি আরেক পাঁড়ে? বা পাঁড় ) হয়েও অসংখ্য লোকের মন মোহিত করেও সেই পথেই শেষপর্যন্ত তিনি সর্বস্বান্ত!

দুঃখ হয় নাকি? তাঁর জন্যই হয়।

আমার নিজের জন্য তেমনটা নয়। কেননা তাঁদের এই প্রতিকূলতার আনুকূল্য না পেলে কখনই আমি আমার কূলে এসে ভিড়তে পারতাম না। তাঁদের সেই নামমাত্র অনুদানের সাহায্যও কিছু কম নয়।

জীবনে সব কিছুরই প্রয়োজন আছে। যেমন প্রিয়জনের তেমনি বিরূপজনের। সৌহার্দ্য ভালোবাসা বাধাবিপত্তি সব কিছুই জীবনে সত্যি–সব জড়িয়ে মোট মূল্যেই সার্থক।

সবই আমাদের এগিয়ে দেয়–যাত্রাপথের পাথেয় যোগায় সকলেই।

কালক্রমেই সেটা জানা যায়। তখনই বোঝা যায় যে, সুবিস্তৃত মহাকালের বুকে নৃত্যপরা মহাকালীর লীলা খেলায় একদিকে যেমন তাঁর মস্ত খঙ্গ, অন্যদিকে তেমনই তাঁর অভয়হস্ত। এক হাতে ধৃত যেমন আমার ছিন্নমস্তক, তার কাছাকাছিই অপর হাতে ধরা আমার জন্য তাঁর বরমাল্য!

তাঁর এই কালীয়দমনকাণ্ডে সময়-মন তাবৎ হলাহল–জীবনে যা হল আর যা হল না–সবকিছুরই পরম অমৃতায়ন-যথাকালেই জানা যায়। কালক্রমে হতে থাকে। সকলের জীবনেই-কোনো তার ইতরবিশেষ হয় না কখনো।

জীবনের আঁক কষতে গিয়ে, শেষপর্যন্ত দেখি, যা নাকি কিছুতেই মেলেনি, যত না গরমিল আর অমিল ছিল, সমস্তই মহাকালের কোলে এসে কেমন করে যেন মিলে গেছে। মাতৃঅঙ্কে এসে মিলে যায় সমস্ত জীবনের যত আঁকিবুকি সব মিলিয়ে চমৎকার ছবি হয়ে দাঁড়ায়। সেই অঞ্চন আর কারো নয়, মার আপন হাতের।

কালোত্তীর্ণ এই অমৃতের সন্ধান পেতেই দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার দরকার। নইলে এই বাঁচার–এমন করে বেঁচে থাকার কোনই মানে হয় না জীবনের নানা বৃত্তে, বিভিন্ন বৃত্তিতে, সুখদুঃখের নানান দশায় দশমহাবিদ্যার বিদ্যমানতা দেখে জন্ম সার্থক করার জন্যই আমাদের জীবন।

এক কালের দুঃখ অপর কালে কেমন করে যে মুক্তির কারণ হয়! এক সময়ের তাবৎ বাধা আরেক সময়ে সর্বাত্মক মুক্তি হয়ে ওঠে-অঙ্ক কষার যত ভুল কেমন করে মিলে যায় শেষটায়! সকল অসংগতি মহাকালের সঙ্গমে সঙ্গত হয়ে যায় যেন।

তখনই টের পেতে বাকী থাকে না, সেকালের সেই ক্ষণিকের খেদোক্তি-শিশির ভাদুড়ি নহ, বোতলের তুমি-কালোত্তীর্ণ হয়ে এই শেষ অঙ্কে এসে বাঁচালো আমাকে।

বুঝতে পারি, যার পেটে যেমন ধরে, যতটা হজম হতে পারে, অন্নপূর্ণার ভাঁড়ারে তার তেমন ভর ব্যবস্থাই। মহাকাব্যের কবি, মহানাট্যকার হবার জন্য সবাই নয়, মহাকাশের গ্রহ-উপগ্রহ সবাই হয় না, কিন্তু বৃহৎ বিপুল পরিক্রমার দারুণ পরাক্রম না থাকলেও হয়, কোন ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। ছোট্ট বৃত্তের সামান্য বৃত্তিতেও সমান সার্থক হওয়া যায়। একই আনন্দ মেলে। কবির কথায়, যেমন লাগে সোনার বাটির পায়েস/ সেই মিষ্টান্ন ভাঁড়ে হলেও দিয়ে থাকে তেমনিতরই আয়েস। কিছু মাটি হয় না, যেহেতু পরমান্নটাই খাঁটি। সেইটাই আসল। আসলে ভূমাতেই সুখ-আর কিছুতেই নয়কো। স্বভূমি পেলেই সেটা মেলে। নিজের ভূঁইয়ে দাঁড়িয়ে মার সঙ্গে যুক্ত থাকা, সেই যোগাযোগই ভূমাতাতেই পরমানন্দ।

মহাজ্যোতিষ্কের গগনবিদার উদার অভ্যুদয় যেমন সার্থক, সেই সার্থকতা ক্ষণদীপ্তির জোনাকিরও।

মহাকাশের বিরাট জ্যোতির্লিঙ্গ নাই হওয়া গেল, দুঃখ কিসের! ক্ষণকালের জোনাকির স্ফুলিঙ্গ হয়েও সুখ আছে।

সময়ের অঙ্কে যেমন সব মিলে যায়, তেমনি মিলিয়েও যায় সব যথাসময়েই। যেমনটা ওই জোনাকিরা, তেমনি সূর্যতারাও কালের ফুৎকারে ফুক্ত হয়ে যাবার। সব আঁকের সমস্ত আঁকুপাঁকুরই শেষ ফল শূন্য-এড়াবার যো নেই।

মহা মহা ঐরাবৎ ডাইনোসেরাসও কালের গর্ভে কবে মিলিয়ে গেছে, কিন্তু সেকালের সেই ছোট্ট চড়াইটি মহাকালের পারাবার পেরিয়ে একালেও হাজির।

আমার গল্প নয়, কবিতা নয়, উপন্যাস নয়, শিশির ভাদুড়ির দৌলতে পাওয়া আমার সেই এককথার চুটকিটাই আমায় উতরে দিয়েছে!

চুটকি লেখার এই চটক।

.

৭৭.

 বিশ্বামিত্র তিনটি ছত্রে/ লিখিলা গায়ত্রী/ চুটকী বলিয়া পাইলা না ঋষি ফলারের পাত্রী/ হোথা শ্লোক তিনটন/ লিখি মিলটন/ অমর হইলা ভবে/ লোকে পড়ে কি না পড়ে জানেন বিধাতা/ হরি হরি বল সবে। কবে লিখে গেছেন কবি সত্যেন দত্ত।

সেই চুটকি লিখেই আমার এই ফলাও কারবার আবার! সাহিত্যলোকের কোনো এলাকায় একছত্র আধিপত্য না করেও এক ছত্রের এই ছত্রপতিত্ব!

মূকং করোতি বাঁচালম/পঙ্গুং লঙয়তে গিরিং-জাতীয় একটা মিরাক বলেই মনে হচ্ছে আমার। ফুটপাথের কেয়ার অফ যে-যার নাকি কবেই সেখানে পর্যবসিত হবার কথা, চড়াই পাখির মতন চুটকির পাখায় ভর করে ফুরুৎ ফুরুৎ তারই আবার মস্ত বাধার পাহাড় ওতরাবার ব্যাপার? এমন কাণ্ড কার? যে নাকি করে শহীদ হয়ে যাবার, তাকে যে এতদিন ধরে এতজনের এমন স্নেহ ভালোবাসা সইতে হল–এসব তো তার পাবার কথা ছিল না!

তিনটনী বোঝা নামিয়ে মিলটনী অমরত্ব লাভের কামনা কোনদিনই আমার ছিল না, তেমন ক্ষতাও নাস্তি, বিরাট বড়ো কিছু না হয়ে কেবলমাত্র শুধু আমি-হতেই আমি চেয়েছিলাম। আমার মাও বলেছিলেন সেই কথাই।

বলেছিলেন, কোনো কাজই বড় নয়, ছোট কাজ বলেও নেই কিছু-জগন্মাতাকে মনে রেখে যে কোনো কাজে প্রবৃত্ত হওয়াটাই আসল কথা। আসল কাজ।

প্রাণপণে চাওয়া বহু বাসনার সমাধির পরে–তারই ছাই উড়িয়ে এই সোনা পাওয়া যায়–সত্য হওয়া যায়–সুন্দর হওয়া যায় স্বচ্ছন্দে। মনোবৃত্তির পথ ধরে এগুলেই হয়। সহজেই হওয়া যায়। মায়ের সাহায্য মেলে। পদে পদে হাতে হাতে তাঁর মোলাকাত পাই।

মাতৃভূমির মূল থেকে বৃত্তপথের জন্মভূমিতে মুহুর্মুহু জন্মজন্মান্তরের আমূল বৃত্তান্ত! জীবনভোর মিলিয়ে দেখা যায়।

সেই কৈশোর কালে যে পত্রিকার হকারি থেকে শুরু করেছিলাম, এই অন্তিম দশায় সেই পত্রিকাতেই কলমদারি–আশ্চর্য যোগাযোগ না?

প্রাণপণে চাওয়া বহু বাসনার সমাধির পরে–তবেই ছাই উড়িয়ে এই সোনা পাওয়া, হারে ধুলো মুঠি সোনা মুঠি হয়ে যাওয়ার মতই এসব কার কেরামতি?

সেই মারই তো!

 যাঁর হঠকারিতায় হঠাৎ হঠাৎই মিলে যায় সব, তাঁর হস্তগত (কিংবা শরণাগতই বলুন!) লেই সব হয়।

এই বোধি লাভই জীবনের সত্যিকার পাওয়া। এর হেতুই আমাদের জন্মানো, জীবন-পন, সুখ-দুঃখে দীর্ঘদিন ধরে কষ্টেসৃষ্টে বেঁচে থাকা।

নিজের ভুঁয়ে দাঁড়িয়ে মায়ের সঙ্গে যে যোগাযোগ তাই ভূমাতাতেই সুখ-সুখের সঙ্গে শান্তি সোয়াস্তি স্বাচ্ছন্দ্য। সেই স্বভূমিতেই, বলেছিলেন মা, তার বৃত্ত ( বা বৃত্তি) বড় হোক ছোট হোক–সেই স্বরাজ্যে সবাই সার্বভৌম। বৃত্তই আসল, কেন্দ্রমূলের সমমূল্য, মূলকেন্দ্রের সমতুল্য। এবং সদা-সর্বদা এই প্রবৃত্ত থাকাটাই আমাদের জীবনবৃত্তান্ত!

এই বোধিই সত্য। জন্ম-জন্মান্তরে এই বোধিই আমাদের পেতে হয়। সেই বোধিসত্ত্ব হওয়াটাই লক্ষ্য আমাদের-তাই সবার নিয়তি।

এই বোধধাদয়ের পরই তো উপক্রমণিকা, আরেক জীবনের ভূমিকা। এই জন্মেই পুনর্জন্মের দ্বিজত্বলাভ। নতুন করে হওয়া আবার নয়া ব্যাকরণে–সংস্কৃত জীবনায়নে। জননী পুনর্ণবার আশীর্বাদে বার বার পুনৰ্ণায়ণ।

.

কল্লোল-গোষ্ঠীর নৃপেনকে আমার কেমন যেন অলৌকিক বলে মনে হোতো। অবশ্যি অলৌকিকত্ব ছিল ওদের প্রায় সবারই-অচিন্ত্য, প্রেমেন, বুদ্ধদেব। আর বিশেষ করে ওই কাজীর তো বটেই। অলৌকিকতার প্রাচুর্যে সে ছিল যৎপরোনাস্তি!

অবশ্যি লেখক শিল্পী মাত্রেরই অলৌকিকতার সহিত কিছু না কিছু সম্পর্ক থাকেই-যে সূত্র থেকে তারা প্রেরণা পায়, রচনার মালমশলার যোগান আসে-সৃষ্টি করে। দৈনন্দিন। জীবনে যে ভাগাড়েই ঘুরে মরুক না, যাতে করে লেখার বা আঁকার কালে, নিমেষের ম তারা এক রীয় লোকে উঠে যেতে পারে-স্রষ্টার একাত্ম হয়ে যায়। সেই রহস্যের রহস্যময়তার কোনো ব্যাখ্যা আমি দিতে পারব না।

সেই অলৌকিকতা তো নৃপেনের ছিলই, তার অল্পদিনের জীবনেই কী আশ্চর্য শিশুসাহিত্য—যা নাকি দক্ষিণারঞ্জন, উপেন্দ্রকিশোরের রচনার মই অপরূপ–দিয়ে গেছে আমাদের। কিন্তু শুধু সেইজন্যেই আমি বলছি না, অন্য অর্থেও সে অলৌকিক।

সে কোনো লৌকিকতা বা বাস্তবতার ধার ধারত না। এদিক দিয়ে সে খানিকটা নজরুলের সগোত্রই ছিল। পাক্কা বোকেমিয়ান।

সেদিনের মৌচাকের প্রথম প্রাপ্তিযোগের পর কলেজ স্ট্রীট ধরে আসছিলাম, পথের মোড়ে নৃপেনের সঙ্গে দেখা।

ভারী মুশকিলে পড়েছি ভাই! তোমার কাছে টাকাকড়ি কিছু আছে নাকি? দিতে পারো আমায়? অবশ্যিই ধার হিসেবে।

উসকোখুসকো চুল, উসখুস ভাব, অদ্ভুত চেহারা নৃপেনের।

বললাম, আছে কিছু যৎসামান্যই। এই মাত্তর মৌচাকের থেকে একটা গল্প লেখার দরুন পেয়েছি–এই পনের টাকা।

হঠাৎ বরাতের এই-খোলতাই খোলসা না করে পারা গেল না।

 দেখি। বলেই সে টাকাটা আমার হাত থেকে যেন ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিল।

আরে, আরে! আমারো যে টাকার দরকার হে। কিছুই নেই আর, আমার কাছে।

বলতেই সে পাঁচ টাকার নোটখানা ফিরিয়ে দিয়েছে আমাকে। আর, পকেটের ভেতর থেকে এক গোছা নোট বার করে তার ওপরে আমার দশটাকিয়াটাকে গচ্ছিত করেছে।

এত টাকা তোমার। তার ওপরেও ফের তুমি টাকা চাইছো? আশ্চর্য! আমি অবাক হই সত্যিই।

কালকে আমার অনেক টাকার দরকার তা জানো? অনেকের কাছ থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে এই মাত্র যোগাড় করতে পেরেছি। কাল শনিবার, তুমি জানো না?

শনিবার তো কী!

শনিবার মাঠে রেস হয় জানো না? রেসকোর্সে যাওনি বুঝি কখনো? ঘোড়দৌড় দ্যাখোনি নাকি?

দেখব না কেন? সে আর মাঠে গিয়ে দেখতে হয় না। সিনেমার হলে বসে পর্দাতেই বেশ দেখা যায়।

রেসের ব্যাপারটা জানো তাহলে মোটামুটি?

 জানব না কেন? পৃথিবীতে দুটি মাত্র রেস, হিউম্যান রেস আর হর্সরে। আমার জানা আছে বেশ। আর এও জানি যে, এই দুই রেসের মধ্যে দারুণ রেষারেষি। মানুষরা যায় ঘোড়াদের নিজেদের পথে আনতে, আর ঘোড়ারা তাদের পথে বসিয়ে দেয়। কে না জানে?

তা যদি জানা থাকে তাহলে ভালোই জানো যে, এত টাকার একটাও কাল মাঠ থেকে ফিরে আসছে না। অতএব…অতএব… সে একটু ঢোঁক গিলে কয়, তোমার এ টাকা কোনোদিনই শোধ হবার নয়। সে অকপট হয়।

সেটা আমি ভালই জানতাম। ঋণ স্বভাবতই অপরিশোধ্য–সবার ঋণই–সব সময়েই। এমন কি আমিও যদি ওর কাছ থেকে দশটা টাকা নিতাম কোনোদিন, তা আর শুধতে পারতাম না ঠিকই। সেই কপ্পা বলে ওকে সান্ত্বনা দিতে চাই।

এবং তার পরেও বলতে যাই, সদুপদেশছলেই–টাকাটা জমিয়ে রাখলে কাজ দিত ভাই। নিদেন, মাঠে ফেলে অবে উড়িয়ে না দিয়ে ঐ টাকার রাবড়ি খেতে যদি-।

বাজে বোকো না… কে দেয় সে-ই আমায় টাকা কি রাখা যায় নাকি? রাখতে পারে কেউ? টাকা উড়বার, ওড়াবার, উড়ে যাবার-কখনই থাকবার নয়। জানো ভাই?

টাকার এ রহস্য আমার অজানা ছিল না। সকলেই জানে। ট্যাঁকে খুঁজে রাখলেও তারা থাকে না, উপে যায় কি করে যে! মাথায় করে রাখলেও থাকবার নয়। হাওয়া হয়। হাতে থাকতে থাকতেই বেহাত হয়ে যায় কেমন করে কখন! এমনি করে হাতাহাতি হয়ে বেহাত হতে হতে তার যাতায়াত।

যাক্, এই দশ টাকার জন্য তুমি দুঃখ কোরো না। এ টাকাটা ফেরত না পেলেও তোমাকে অন্য ব্লকমে আমি পুষিয়ে দেব। সে আশ্বাস দেয় আমাকে।

তা, পুষিয়ে দিয়েছিল সে সত্যি। দশ টাকার দশগুণ বললে কমিয়ে বলা হয়, একশ গুণ। বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না-হয়তো পাঁচশ গুণ হতে পারে সাত-পাঁচ জড়িয়ে।

তার কাছ থেকেই রেডিয়োর প্রথম আমন্ত্রণ আসে আমার–তার নিজের গল্প দাদুর আসরে গল্পপাঠের। এবং তার পর থেকে আসতেই থাকে। এবং এক খাসি পাঁচবার জবাই করে–যেটা করা নাকি আমার স্বভাব–সেই একদা রেডিওপঠিত গল্পই (কজন কান দিয়ে শোনে আর? আর শুনলেও মনে করে রাখতে পারে? ভূ-ভারতে এমন শ্রুতিধর কে আছে?) পরে পত্রিকায় ছেপে বই-এ বার করে পাঁচ গুণ লাভ কি আর হয়নি আমার?  এইভাবে এনতার কামিয়েছি। সেদিক দিয়ে ধরলে প্রায় পুষ্যিপুত্ত্বরের মতই আমার নিয়মিত খোরপোষের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল সে।

যদিও আমার এমনি বরাত, ভাগ্যের অনুগ্রহ লাভের সাথে সাথে বিড়ম্বনাও থাকে বুঝি তার হাত ধরে।

বেতারের আসরে প্রথম পদক্ষেপেই বিপর্যয় ঘটলো আমার।

নৃপেনের জরুরি চিঠি পেলাম হঠাৎ-বেতারের কার্যালয়ে তার সঙ্গে মোলাকাত করতে বলছে তৎক্ষণাৎ।

গার্সটিন প্লেসে ক্লাইভের আমলের পুরনো এক বাড়িতে বেতারের আসর বসত সেকালে। খুঁজেপেতে সেখনে গিয়ে হাজির হলাম একদিন।

যেতেই সে একটা চুক্তিপত্র আমার হাতে তুলে দিল। তার সেই আসরে কয়েক মিনিটের গল্পপাঠের আমন্ত্রণী।

এবং তার দক্ষিণা–ত্রিশ টাকা, গল্প পাঠ, নগদ। সেটাও সেই চুক্তির সঙ্গে উল্লিখিত। চুক্তিনামাটা দেখি, নানান নিয়মকানুনে বিড়ম্বিত, তার মুখ্য স্থলে আমার পাঠতব্য গল্পটার নামটাও নির্দেশ করা রয়েছে-সর্বমত্যন্ত অত্যন্ত-এর পরে মোক্ষ এক ড্যাশ!

গল্পটার নাম। তুমি যেটা পড়বে- তারই শিরোনাম লিখে দেওয়া হয়েছে। এই নামের সঙ্গে খাপ খায় এমন একটা গল্প তোমাকে লিখতে হবে এখন।

ও বাবা! শুনেই আমি চমকাই।

ঘাবড়াবার কী আছে? আমরা আগে গল্প লিখে তার পরে তার নাম লাগাই, এখানে আগেই নাম বসিয়ে তার পর গল্পটা বাগানোএই তোর লাগাম তো পেয়েই গেলে, এখন জুতসই একটা গল্পের ঘোড়া এনে তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া কেবল। সেটাই তোমার দায়। এ আর তুমি পারবে না?

পারব কি না ভাবি। এতকাল গল্প লিখে তার পরে নামকরণ করেছি, এখন আগে নাম ফেদে পরে তার গল্পটা ফাঁদা, এ আবার কেমনতর ফাঁদ–কী ফ্যাসাদ…কে জানে! ঘোড়ার লাগামটা তো আগাম বাগালাম, এখন তার ল্যাজামুড়ো মেলাতে পারলে হয়! পারব কি না খোদাই জানেন।

কিন্তু এতগুলো টাকাও তো ফ্যালনা নয়! সই দিয়ে চুক্তি নিয়ে বাসায় ফিরলাম–শেষ পর্যন্ত শহীদ হবার জন্যই বুঝি বা!

নির্দিষ্ট তারিখে যথাসময়ে আসবে, তার কোনো অন্যথা না হয় যেন। বরং আধঘন্টাটাক আগেই এসো তুমি। গল্পটা পড়ে দেখব তো, তোমার একটু রিহার্সাল দেওয়ারও দরকার হতে পারে। বেশ করে মনে করিয়ে দেয় নৃপেন : বেতারে এর আগে পড়োনি তো কখনো।

বাসায় ফিরে ভাবতে বসলাম। কী লেখা যায়? ভাবনায় কাতর হয়ে কাত হলাম অবশেষে কিন্তু যে গল্পরা এতদিন অকাতরে এসে আমাকে দেখা দিয়েছে, তাদের কারো একটার টিকিরও নাগাল পাওয়া গেল না।

নামটা তো বেশ ফলাও করা। এখন কলাকৌশলে কোনোরকমে নামসই একটা গল্প ফলানো বইতো নয়। সর্বমত্যতম নামখানি তো হয়েই রয়েছে, এর সঙ্গে জুতমতো মজবুত মতো একটা কাহিনী আমদানি করা কেবল। খাপ পাওয়া গেছে। তার সঙ্গে তলোয়ারের খাপ খাওয়ানোটা বাকী। একটা বেখাপ্পা ঠেকলেও এইটুকুই দায় আমার।

কিন্তু নিতান্ত সহজ দায় না। দায় সারা সহজ নয়। মগজ থেকে কিছুতেই কোনো গল্প আদায় করা যায় না! যতই কলা ফলাই, কৌশল খাটাই, আদায়-কাঁচকলায় হয়ে যায় শেষটায়।

লাগাম আগাম মিললেও ঘোড়া আমার কিছুতেই আগায় না। কিন্তু ঘোড়া না দেখে কেবল লাগাম দেখেই খোঁড়া হওয়া সাজে কি? তীরে এসে তরী ডুববে আমার? তীর্থে এসেও সৌভাগ্যলক্ষীর দর্শন পাব না!

ভাবনার কূল পাইনে সত্যিই! গল্প তো লিখেছি, কিন্তু এ ধরনের গল্প কখনো লিখিনি। ছোট্ট একটুখানি বীজের থেকে বড় বড় মহীরূহ গজিয়ে ওঠে, লোকে বলে থাকে, আমি নিজের চোখে কখনো দেখিনি বটে, তবে লোকের কথায় অবিশ্বাস করতে চাইনে। তবুও একথা আমি বলব যে গাছের বেলা হয়ত তা সত্যি হলেও, গল্পের বেলায় অ করতে যাওয়া দারুণ দুর্ধর্ষ ব্যাপার। নামমাত্র বীজের থেকে গোটা রামায়ণ বার করে আনা, বাল্মীকিসুলভ আর যার হোক, আমার না।

বলব কি মশাই, যই প্লট ফাঁদি আর গল্পই বাঁধি না, আর যত রকম করেই ছকতে যাই, ছা হয় না কিছুতেই! কোনো মতেই গভীর জলের থেকে মৃগেলকে টেনে তুলে নিজের পথে আনতে পারি না। কোন্ বনের হরিণের মত সে পালিয়ে বেড়ায়, আমার মায়াজালে সেই মায়ামৃগ ধরাই দিতে চায় না। মরীচিকা হয়ে থাকে, মৃগয়া হতে আসে না মোটেই।

ওই সর্বমত্যন্তম– এর সঙ্গে কিছুতেই কিছু খাপ খাওয়ানো যায় না। একটা গল্প লিখতে গিয়ে ভাবতে একশটা গল্প এসে যায়, এমন মুশকিল! মনের মধ্যে গল্পের একশা আর মনের মত আর প্রত্যেকটাই, কিন্তু নামের মতন একটাও না!

ভাবতে ভাবতে সাত রাত্তির ঘুম নেই, এমন কি দিনের বেলাও দুচোখ বুজতে পারি না। চোখের কোলে কালি পড়ল, মাথার চুল সাদা হতে শুরু করল। আদ্ধেক চুল টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেললাম, টাকার চিন্তায় এই করেই বুঝি টাক পড়ে সকলের? যাদৃশী ভাবনার্যস্য…এমনি করে পড়া টাকের পরেই অর্থসিদ্ধিটা আসে তারপর–ভাবনা মাফিক। যাই হোক, আমার বরাতে চুলও গেল কিন্তু চুলচেরা এত খতিয়েও সেই গল্প এল না-ত্রিশ টাকার মওকা তেমনি সুদুরপরাহত রয়ে গেল! কামড়ে কামড়ে ফাউন্টেন পেনের আধখানা ভুড়ির গর্ভে গেল আমার। কত গল্পই এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে এল আর গেল কিন্তু কোনোটাই ওই নামের সঙ্গে খাটল না।

তখন আমি নিজেই খাটলাম–আমাকেই খাঁটিয়া নিতে হোলো শেষটায়।

শুয়ে শুয়ে আমার খাতার শুভ্র অঙ্ক কলঙ্কিত করতে লাগলাম। আমার অনাগত গল্পের আষ্টেপৃষ্টে ললাটে কতো কী যে আঁকলাম আমি! অঙ্কনের আলপনায় গল্পের কল্পনারা ধরা দিতে লাগল। রেখায় রেখায় দেখা দিল–কখনো একক, কখনো বা জোড়ায় জোড়ায়। কী না আঁকলাম খোস মেজাজে–কাকের সঙ্গে বক জুড়ে, বাঘের সঙ্গে কুমীরের কোলাকুলি বাধিয়ে, হনুমানের সঙ্গে জাম্বুবানকে জর্জরিত করে, বকের সঙ্গে কচ্ছপের মচ্ছবে সে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার! বিতিকিচ্ছিরি!

সব জড়িয়ে ইলাহী কান্ড এক! কী যে ওই সব ছবি–তার কিছু বুঝবার যো নেই, অথচ বুঝতে গেলে অনেক কিছুই বোঝা যায়। গুহামানবরা একদা যেসব ছবি আঁকতো, এবং মানুষের মনের গুহায় মনশ্চক্ষুর অগোচরে, অন্তরের অন্তরালে তার অবচেতনায় এখনো যেসব ছবি অনুক্ষণ অঙ্কিত হচ্ছে, মনের সেই সব আঁকুপাঁকুনিদারুণ এক গুহ্য ব্যাপার। মনের গর্ভপাত সেই সব দৃশ্য আমার দুঃস্বপ্নের মধ্যেও এসে হানা দিতে লাগল ক্ষণে ক্ষণে–আরেক উৎপাত!

মানুষ পাগল হয়ে গেলে যেসব ছবি আঁকে অথবা যে সব ছবি আঁকবার পরেই পাগল হয়ে যায়। বনমানুষরা যে ধারায় সভ্যতার পাড়ায় এসে পৌঁছেছে-যার ধারণায় মহৎ লেখকরা মহত্তর শিল্পী বনে যান শেষে সেই সব হেস্তনেস্ত কাত! তারই হিস্ট্রি জিয়োগ্রাফি–তাবৎ হদিশ!

অবশ্যি, নির্দিষ্ট দিনক্ষণের আগেই আমার সেই চিত্ৰকাহিনী শেষ করতে পেরেছিলাম। আর, সেই বিচিত্রিত গল্পটার–সর্বত্যন্ত–ড্যাশ-উইদিন ইনভার্টেড কমার শিরোনামার ঠিক নীচের থেকে শুরু করে গল্পের অন্তিম পৃষ্ঠায় আমার নাম স্বাক্ষরের ওপর অবধি কেবল ওই সব ছবি ই পাগল-করা ছবি সব! পাতার দুধারেই-মার্জিনও বাদ নেই তারমার্জনা নেই কোনোখানেই।

অবশেষে যথাসময়ে নৃপেনের কাছে গিয়ে হাজির।

এনেছে গল্পটা? যাক্, বাঁচালে বাবা! যা ভাবনায় ফেলেছিলে না! দেখি, দাও। সে। হাত বাড়ায়।

গল্পটা হাতে নিয়ে সে চমকে উঠেছে তক্ষুনি–এ কী হে! এসব কী তোমার। এতসব আঁকিবুকি কিসের?

আমি কী জানি! কী যে এসব আমি কি নিজেই তার কিছু জানি নাকি! আমি জানাই, মনের উৎস থেকে উৎসারিত ভয়ঙ্কর মহামহিম কিছু হবে হয়ত.নতুন ধরনের কোনো অঙ্কনরীতির নয়া ধারার শিল্পশৈলী এই রকম কিছু একটা হবে বোধহয়…এখন কিচ্ছু টের পাওয়া যাচ্ছে না, পরে এককালে এই নিয়ে দারশ হইচই পড়তে পারে! পড়বে হয়তো, দেখো তুমি।

ধুত্তোর! গল্পটা কোথায়? তোমার গল্পটা কই হে?

কেন, ঐ যে পাতার মাথায়–তোমার দেওয়া শিরোনামার পাশটাতেই গল্পটা গোটা গোটা অক্ষরে উজ্জ্বল করে দাগা। দেখতে পাচ্ছ না?

তখন সে দেখতে পায়। দাগাও পায় বোধ হয়। সর্বমত্যতম-এর পাশে ড্যাশের ফাঁকা জায়গাটায় মোটা মোটা আখরে গাঢ় করে দেগে দেওয়া কথাটা…একমাত্র কথাই একটা কথাই- মাত্রা ছাড়িয়ে চোখের ওপর জ্বলজ্বল করছিল!

ধ্যাৎ! বেশি আর কিছু না বলে ঐ এক কথাতেই সে নিজের ধিক্কার জানায়।

হ্যাঁ, ঐ গর্হিতম! ওটাই–আমার গল্প। ঐ কথাটা দিয়েই তোমার দেওয়া নামটার আমি ফিল আপ দি গ্যা করে দিয়েছি। তোমার সর্বমত্যতম্-এর পরে আমার ঐ গহিতম! সত্যি ভাই, ভেবে দেখলে গহিত ছাড়া কী আর? ছোট দরের–ছোটদের লেখক-পাঁচ সাত টাকার গল্প লিখে খাই, প্রাংশুলভ্য ফললোভী বানরের ন্যায় তোমার ঐ ত্রিশ টাকার দক্ষিণার জন্য উদ্বাহু হওয়া আমার পক্ষে গহিত ছাড়া আর কী? তাই ওই কথাটাই ভালো করে খোদাই করে আমার এই দারুণ খোদকারি শেষ করেছি।

.

৭৮.

নৃপেন তার পরেও আবার প্রোগ্রাম দিয়েছিল আমাকে। কিন্তু প্রথমটার মতন লেখার নাম আগের থেকে দেগে দেয়নি ফের অমন। নতুন করে দাগা আর দেয়নি সে আমায়। এর পরে তার চুক্তিপত্রগুলোয় এ হিউমারাস স্টোরি বলেই উল্লেখ থাকত মাত্র। আমারও লেখার কোনো অসুবিধা হত না।

একটা গল্প লিখে তার দুটো কপি করে (হারাবার ভয়ে নয়, আরো একটু বেশী জেতবার মতলবেই এক গল্পের দুটো কপি করা) একটা কপি মৌচাকে নগদ বেচে অন্য কপিটা বেতারে পড়ে দিয়ে চেক নিয়ে আসতাম।

আসতাম সেই মৌচাকেই আবার। কেননা, ক্রস চেক ভাঙাবার কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল না আমার, কোনো কালেই নেই, সে কারণে আমার বরাতে কখনো ঐরূপ ঘটলে সুধীরবাবুর কাছেই আসতে হত আবার। তিনি অম্লানবদনে চেকটা ভাঙিয়ে দিতেন–শুধু চেকের পিঠে আমার সই করিয়ে নিয়েই তাঁর এই পৃষ্ঠপোষকতা!

আবার একদিন নৃপেনের সঙ্গে দেখা হল আমার–ওই পথেই। সেই রকম উসকোখুসকো চেহারা, ভাবগর্ভ মুখচোখ-উদাস উদাসীন! মৌচাকের থেকে আসছিলাম, থোকথাক ছিলও কিছু পকেটে, কিন্তু ওকে মুখোমুখি দেখেও আমার সন্ত্রস্ত হবার কিছু ছিল না। বরং ওর উপকারের ঋণ যৎসামান্য উদ্ধারলাভ হয়, কে তাতে পেছোয়?

কিন্তু সে, সুযোগ হয়নি আর আমার। নৃপেন তারপর কোনোদিনই আমার কাছে কিছু ধার চায়নি কখনো।

কোত্থেকে আসছ হে? সে শুধোলো।

কোত্থেকে আর? সেই মৌচাক।

 মধু সংগ্রহ হল?

 হল বইকি কিঞ্চিৎ।

 গল্প বেচে? এ মাসে যেটা আমার আসরে পড়তে যাচ্ছে, সেইটেই বেচে দিয়ে এলে আগাম?

ধরছো ঠিক। সেই পাঠাই বটে-একবার মাথার দিকে কাটো আরেকবার লেজের দিকে। রেডিও পাঠ্যই হোক আর যাই হোক, কোনো বস্তুকে নানা অর্থে না পেলে আমার পাঠকৃষ্ণ মেটে না। পাঠওয়ালার প্রিভিলেজ।

ওটা কিন্তু নিয়ম নয়, তা জানো? চুক্তিপত্রের পেছন দিকটা পড়ে দেখেছো?

দেখেছি বই কি। সেই জন্যে গল্পটার নাম বদলে দিতে হয় আমায়। গোড়ার দিকটা পালটে দিই। কলেবরও বদলে দিতে হয় একআধটু। আর দেহান্তর ঘটলেই নামান্তরে কোনো দোষ হয় না। যেমন, যিনিই রাম তিনিই কৃষ্ণ, তিনিই আবার শ্রীরামকৃষ্ণ–একই প্রভু ভিন্ন দেহে নামান্তরে–তাই না? আমারটাও প্রায় সে-রকম আর কি!

তা তো বুঝলাম, কিন্তু আমার কথায় তবুও ওর কিন্তু কিন্তু থাকে। কিন্তু আবার কী? অবতারভেদে যেমন একই ভগবত্তা, আমার বেলাও প্রায় তাই একই গল্প বিভিন্ন অবতারণায়। তা ছাড়া, মৌচাকে ছাপানোটাই তো আমি রেডিয়োয় পড়তে যাচ্ছিনা, আগে বেতারে পড়ছি, তার পরে মৌচাকে বেরুচ্ছে। এ মাসেই যে বেরুবে তার কোনো ঠিক নেই, কবে যে বার হবে কে জানে। সে সুধীরবাবুর মর্জি।

কিন্তু আমার আসরের ছেলেমেয়েরা যদি ধরতে পারে. আর তার পরে জানিয়ে দেয় রেডিয়ো আপিসে…ওপরওলাদের কাছে কমপ্লেন গেলে।

কোনো ভয় নেই, তেমন শ্রুতিধর স্মৃতির বালক বাংলাদেশে জন্মায়নি এখনো। পড়া শোনায় সমান টান এমন কেউ অতি বিরল। পড়ার পরে মনে থাকে, শুনলেও মনে রাখে এমন কাউকে আমি তো ভাই দেখিনে আজকাল।

তা হলেও তোমাকে বলা আমার কর্তব্য, জানিয়ে দিচ্ছি তাই, ধরা পড়লে কিন্তু তোমাকে আর কোনো প্রোগ্রাম দেওয়া যাবে না। বেতারের কাক লিস্টে নাম উঠে যাবে তোমার, মনে রেখো।

ওঠে উঠুক, প্রোগ্রাম না পাই তো কী আর করব? কিন্তু এটা তোমার রেডিয়োওলাদের ঠিক নয় ভাই। না না, আমি প্রোগ্রাম দেওয়া না দেওয়ার কথা বলছি না, আমি বলছিলাম, ওই ত্রিশ টাকা মাত্র দিয়ে বস্তুত লেখাটার সর্বস্বত্ব দখল করে রাখার কথাটাই। একটা লেখার সঙ্গে কত রকমের রাইট জড়ানো থাকে জানো? তার অনুবাদ স্বত্ব, গ্রামোফোন স্বত্ব, ড্রামাটিক স্বত্ব, প্লে-রাইট, ফ্লিম-রাইট, কখনো যদি এদেশ টেলিভিসন হয় তা হলে সেই টেলিরাইটও। কেবল রেডিওরাইটের নামমাত্র দক্ষিণা দিয়ে ওই সব অন্য রাইটগুলো ব্যবহার না করলেও ঐভাবে আটকে রাখাটা ঠিক কি?

ঠিকঠাক করার মালিক আমি নই। আমার তোমাকে বলা-কর্তব্য তাই বললাম, তোমার যা দরকার করবে। যাক্ গে, সুধীরবাবুর দোকানে আর কে কে আছেন এখন? কাকে কাকে দেখলে ওখানে?

খেয়াল করে দেখিনি। তবে সুধীরবাবু রয়েছেন। বসিওনি, আড়াও দিইনি, এক মিনিটের কাজ আমার। গেলাম, লেখাটা দিলাম, তারপরে শ্বেতপত্রের প্যাডটা খুঁজে বার করলাম, গল্পের নাম, দক্ষিণার পরিমাণ যথাস্থানে বসিয়ে সই করে তাঁকে দিতেই তিনি ড্রয়ার থেকে টাকাটা বার করে দিলেন। আমারও পত্রপাঠ বিদায়।…অবাক হচ্ছ কি? আমার ভাউচার লেখার কষ্টটুকুও তাঁকে আমি করতে দিইনি। অনেক কষ্টে টাকা পেতে হয় ভাই, তাই এ কষ্টটুকুও আমিই স্বীকার করি।

বেশ করো। আমার করিৎকর্মের কুশলতায় তাকে একটু খুশি মনে হয়।

তুমি যাচ্ছো নাকি মৌচাকে? যাও না, সুধীরবাবু এখন কোনেই তো। একটুখানি বসলে পরে আরো অনেককে পাবে ওখানেই। অচিন্ত্য প্রেমেন প্রবোধ…ওরাও আসতে পারে।

নৃপেনের তেমন উৎসাহ দেখা গেল না–এখন গেলে আমার হবে না, টাকার দরকার আমার। অন্য কারো সামনে সেটা হবার নয়।

তবে এখনই যাও না! তেমন কেউ আসেনি এখন…।

আমার তো তোমার ওই পাঁচ-দশ টাকার গরজ নয় ভাই। আমার চাহিদা অনেক, আমার খিদে ওতে মিটবে না। আরো চাই আমার।

চাইলেই পাবে-যাও না। আমার মতন এখনই লেখা দিয়ে নিতে হবে যে তাও না, সুধীরবাবু তোমাকে স্নেহই করেন। পরে লিখে দেব বললেও হবে।

না, যাব আমি। তবে এখন নয়। ওঁর বাড়িতে যেতে হবে আমাকে। রাত্তিরে। রাত বারোটার পরে।

বারোটা বাজাতে যাবার কী প্রয়োজন? আমি ঠিক বুঝতে পারি না।

আমার বৌয়ের শক্ত অসুখ যে! এখন-তখন অবস্থা। হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে না? কেবিনে নিতে হতে পারে।

ওমা, তাই নাকি! তা হলে খুব জরুরি দরকার বলতে হয়–জরু-র দরকার যেকালে। এখনি তুমি যাও তবে, ওঁকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে বলবে এখন।… আহা, সেই জন্যেই তোমার এই চেহারা, উসকোখুসকো চুল, চান কররানি, তেল দাওনি মাথায়, এমনতরো মুখচোখ! আগে আমি বুঝতে পারিনি ভাই।

না, এখন গেলে হবে না। যথাসময়ে যেতে হয়। বিপদের কি সময় অসময় আছে? বিপন্ন মানুষের অযথা সময়ই হচ্ছে যথাসময়। সুধীরবাবুর কাছে যেতে হবে আমাকে ওই বারোটার পরেই…।

তখন তো খেয়েদেয়ে ঘুমোচ্ছেন উনি।

সেইটেই হবে ঠিক সময়। বিপদগ্রস্ত লোকের কি মাথার ঠিক থাকে নাকি? আমার মাথা ঠিক থাকলেও, চুলের ঠিকঠাক থাকবে না–আরো উসকোখুসকো করতে হবে এগুলোকে। তারপর বেছে বেছে ওই সময়ে, বারোটায় কি তারও পরে গিয়ে হানা দেব তাঁর বাড়ি…ঘুম থেকে উঠে ঢুলতে ঢুলতে নিচে নেমে এলেই বেশি আমায় বলতে হবে না আর, আপনার থেকেই আমার বিপদটা হৃদয়ঙ্গম হবে। ওই আআর্থলি টাইমটাই আমার বিপন্নতার সাক্ষ্য দেবে-বেশি চিন্তা বিবেচনার সময় তিনি পাবেন না, সেফ খুলে হাতের কাছে যা পান, দুশো পাঁচশো, দিয়ে দেবেন তৎক্ষণাৎ।

তৎক্ষণাৎ?

নিশ্চয়। অমনি করে অমন সময়ে গিয়েই চাইতে হয়। তা হলেই হয়ে যায়। খুব সহজেই হয়। আর কিছু না হোক, অসময়ের এই আপদ বিদেয় করার জন্যেও, নিজের ঘুমের গরজেই, বিনাবাক্যব্যয়ে টাকাটা দিয়েই বিছানায় গিয়ে তিনি কাত হতে চাইবেন তক্ষুনি। একটু থেমে সে বলে, মোটামুটি পেতে হলে এমনি অসময় বেছে বেছে যেতে হয়।

তাই নাকি? তা তুমি এভাবে আরো নিয়েছে নাকি ওঁর কাছে?

কতোবার! আর খালি ওঁর কাছেই কি! আরো কি আমার প্রকাশক নেই নাকি? সবাইকে এইভাবেই বন্ধ করতে হয়!

লেখক আর প্রকাশকের সম্পর্কটা খাদ্য-খাদকের, এমনধারা একটা কথা কোথায় যেন শুনেছিলাম! পরস্পরকে খেয়ে ওরা বেঁচে থাকে। কথাটা মিথ্যে নয় দেখছি। প্রকাশকরা যেকালে লেখককে তিলে তিলে মারেন, প্রকাশককে মারতে হলে লেখককে যেখানে তালে তালে থাকতে হয়। যেমন নৃপেনের এই তালটা।

তোমার বৌয়ের কোনো অসুখবিসুখ হয়নি তা হলে? বাঁচলাম। আমি হাঁফ ছাড়ি।

হয়নি, তবে হবে। হতেই থাকবে। হাসপাতালে তো ভর্তি করি এখন। ফ্রি বেড পাব না, জানা কথাই। কেবিন নিতে হবে। কেবিনের খরচা বহুৎ। ওষুধপত্র কেনার, নার্স রাখার অনেক দায়। সে সব দায় আমার সামলাবে কে? ওই সুধীরবাবুরাই। তারপর তার অপারেশন রয়েছে। কতো কী আরো। তারপর সে মারাই যাবে হয়তো বা–তার খরচা নেইকো? কদ্দিন আর ধরেবেঁধে তাকে বাঁচানো যাবে? বার কয়েক হাসপাতাল কেবিন করার পর বাধ্য হয়েই তাকে মারতে হবে আমাকে। তখন ঘাটখরচা, গটগচ্ছা আরো আরো। আমার কী! ওই প্রকাশকের, মানে, সুধীরবাবু প্রমুখদের। তবে ওই উনিই মুখ্য।

কিন্তু বৌ মরলেই তো ফুরিয়ে গেল ভাই। আমার আশঙ্কা জানাই।–তখন?

বৌ কি ফুরোয় কখনো? মরলেই কি ফুরিয়ে যায় সব? বৌরা অফুরন্ত। সে সব দিক ভেবেই আমি দু-দুটো বিয়ে করে রেখেছি। একবার এটার, একবার ওটার দায়ধাক্কা সামলাই…।

আর ধারাবাহিক তোমার যততা বায়নাক্কা সেই সঙ্গে! আমি কই, কিন্তু বার বার তোমার পালে বাঘ পড়লে কথামালার সেই রাখালের দশা–সেই দুর্দশা না দাঁড়ায় আবার! তার না হয় গরুর পাল ছিল, কিন্তু তোমার তো আর জরুর পাল নেই। দুটি মাত্র সম্বল। দুটো গেলেই খতম! তোমার নটের গাছটিও মুড়োলো-সব গল্পই ফুরোলো।

না, তা হয় না। তা হবার নয়। বিবাহিত লোকদের প্রতি বিবাহিত ব্যক্তির সহানুভূতি থাকেই, অনিবার্যই থাকে, না থেকে যায় না। বৌকে নিয়ে ভুগতে হয় সবাইকে, সবার বৌয়েরই অসুখ-বিসুখ লেগে রয়েছে–তাই নিয়ে ভোগান্তি সবাইকার। সকলেই হমুদ ভুক্তভোগী। তাই শুধু সহানুভূতি হয় কেমন একটা ফেলোফিলিং রয়ে গেছে তাদের ভেতর। ফন্তু স্রোতের মত অন্তরে অন্তরে ওতপ্রোত-সক্কলের। পরের দুঃখে কাতর হয়ে নয়, নিজের দুঃখের কাতরতা অনুভব করেই পরস্পরকে তারা সাহায্য করে। নিজের বৌয়ের কথা ভেবেই আমার বৌয়ের দুঃখটা তাঁরা ফীল করতে পারেন।

আর তোমায় ফুলফিল করেন?

এটাও এক রকমের স্ত্রৈণতা বলেই আমার বোধ হয়। হয়ত বা পরস্ত্রীকাতরতাও বলা যায়। তবে সদ্ভাবের সাত্ত্বিকতায় এখানে ব্যক্ত, হয়ত এর আবার রাজসিক তামসিক দিকও থাকতে পারে-সেটা তামাশার কিছু না। তবে তা নিয়ে কিছু বলছি না…!

তুমি স্ত্রীভাগ্যে ধনী হে নৃপেন। তুমি ভাগ্যবান!

বলতে গিয়েই আমার খটকা লাগে। খট করে লাগে যেন কোথায়। গ্রীনরুমের নেপথ্যে বলা শরৎচন্দ্রের সেই কথাটা মনে পড়ে যায়…শিবরামের ফের টাকার দরকারটা কিসের? ছেলেপুলে নেই, বৌ নেই, সংসার নেই-টাকার আবার কী দরকার তার!

সেই অফেলো-ফিলিংসুলভ তাঁর কথাটার মূল তত্ত্ব তাহলে এখানেই। অবিবাহিতরা দুনিয়ার সবার বিলকুল সহানুভূতি-বর্জিত।

স্ত্রীভাগ্যে ধন! বলেই দিয়েছে–তুমি জানতে না? নৃপেন আমাকে প্রায়।

শোনা ছিল বটে কথাটা, কিন্তু তার মানে যে এই তা আমার জানা ছিল না ঠিক। আমি স্ত্রীভাগ্য বলতে ভেবেছি অন্যরকম…মানে, কুমারী অবস্থায় মেয়েরা তো নেহাত গরীব থাকে। একটা পয়সাও পায় না কখনো কোথাও। ছেলেরাই মার সবটা আদর পায়, কেড়ে-কুড়ে খায়, জোর করে আদায় করে সব কিছু-টাকাপয়সার দরকার পড়লে ইচ্ছেমতন বাপ-কাকার পকেট মারে। মেয়েরা তো তা পারে না। পারতেও চায় না। তারা গোধূলি লগ্নের অপেক্ষায় ওত পেতে থাকে। সেই ছাঁদনাতলায় গিয়ে ওতরালে, কোনোরকমে কারো কণ্ঠলগ্ন হতে পারলে একবার-কে পায় তাকে আর? চিরদিনের মতই তার দুঃখ-নিশি পোহায়। স্ত্রী হলেই সে ধনী হয়ে যায়-তার ভাগ্য ফিরে যায় এক নিমেষে-বরাত খুলে যায় হঠাৎ! হস্তগত বরের রোজগারের সব টাকাটা মাসকাবারে তার আঁচলের খুঁটে এসে রাঁধা পড়ে, অন্য খুঁটে বাঁধা থাকেন স্বামীরত্নটি! খুঁটোর জোরে গরু লাফায়, আর ওই খুঁটোর জোরে জরুরা। তাদের মতন ধনী আর কে তখন! স্ত্রীভাগ্যে ধন, তার মানে আমি এই ভেবেছিলাম-স্ত্রীর ভাগ্যেই। ভাগ্যে কারো স্ত্রী হতে পারলেই ধনী তখন।।

এই কারণেই মেয়েরা বুঝি ধনি-রূপে সমোধিত হয়ে থাকে। পদাবলীর কথাটাও আমার মনে পড়ে…য গোধূলি লগন বেলি/ধনি মন্দির বার ভেলিনিবজলধরে বিজুরি চমক/দ্বন্দ্ব পসারি গেলি আমার মনে প্রতিধ্বনিত হয়।

তোমার কথা যেমন উল্টোপাল্টা, তোমার মাথাও তেমনি উল্টোরকম… বলে সে হাসতে থাকে–যাক গো, এবার তাহলে তোমার নিজের ভাগ্যও ফিরিয়ে নাও না! মাথা খাটিয়ে আমার অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগিয়ে দাও।

কী করে লাগাবো? বৌ কোথায় আমার? বিয়েই করিনি যে

 বিয়েই করোনি! একটাও না? তাহলে আর কী হবে!

আমার স্ত্রীবিয়োগে সে যেন ব্যথিতই বোধ হলো।

কিছুই হবে না। আমার ভাগ্যে অর্থযোগ নেই, জানি আমি। আমার জীবন নিরর্থক। কী করবো?

কী করবে! একটা বিয়ে করে ফ্যালো। আবার কী?- সত্যি সত্যি না হলেও, মিথ্যে মিথ্যে, নইলে তোমার বরাত খুলবে না। দশ পাঁচ টাকার এই উঞ্ছবৃত্তি করেই কাটাতে হবে সারাজীবন।

এখন আমার মনে হয়, নৃপেনের কথাই ঠিক। স্বভাবতই সপত্নীকদের প্রতি দরদ সবার। আমি যদি পত্নীবান হতাম তাহলে সুভাষচন্দ্র কি হেমেন্দ্রপ্রসাদ অমন করে এক কথায় বা বিনা বাক্যব্যয়ে আমায় বিদায় দিতে পারতেন কি কখনো? আমার প্রতি মমতা না থাকলেও অন্তত এই টাকাটা গেলে আমার বৌ-ছেলের কী হবে, তা ভেবেও ওঁরা একটু ইতস্তত করতেন বইকি।

নৃপেনের যেকালে নিজের বৌ ভাঙিয়ে ষোলো আনার ওপর আঠারো আনার প্রাপ্তিযোগ, সেখানে আমার এই ব্যাঙের আধুলি কোনো ব্যাংকেই ভাঙানো যাচ্ছে না, সর্বত্রই আমার জন্য অর্ধচন্দ্র!

.

৭৯.

 চোরবাগানের চৌহদ্দিতে মুক্তায়াম বাবু স্ট্রীটের মোড়টাইে ছিল রমেশবাবুর (কবিরাজ রমেশচন্দ্র সেন) কবিরাজখানা। সেখানেই ছিল তাঁর স্থাপিত একদাবিখ্যাত সাহিত্যসেবক সমিতি। সাহিত্যছত্রের পদাতিক কবি থেকে রাজতুল্য লেখকরাও এসে জমতেন–তাঁর সেই কবিরাজী আড্ডায়। নিয়মিত ভাবেই ঐ সমিতির বৈঠক বসত; সাহিত্যিকদের ওঠা-বসা যাওয়া-আসা গল্পগুজব চলত প্রায় সব সময়। আমিও মাঝে মাঝে ওখানে গিয়ে ওঁদের সাহিত্যভোজে খাদ্যাখাদ্যের অংশ নিয়েছি-সাহিত্যের সেই কবিরাজী কাটলেট-উইথ এ পিষ্ট অব ভাস্কর লবণ।

কবিরাজখানার উলটো দিকের বাড়িতে ছিল রমেশবাবুর পারিবারিক আস্তানা, আর রাস্তার এক কিনারে ছিল ছ্যাকরা গাড়িদের আস্তাবল। সেখানকার ঘোড়াদের গোবরের গন্ধামোদিত বৈঠকে বসে কবিরাজী মোদকের সঙ্গে লেখকরা সাহিত্যরসে আমোদিত হতেন। একরকম অশ্বগন্ধা রসায়নের মতই সঞ্জীবনী বলা যায়।

রমেশবাবু যেমন ভালো কবিরাজ ছিলেন তেমনি ছিলেন ভালো লেখক। কুরপালা ইত্যাদি কয়েকখানা উপন্যাস আর চমৎকার কতকগুলি ছোট গল্প লিখে গেছেন–কিন্তু বই আকারে সেগুলি এখন আর পাওয়া যায় না বোধহয়। সাহিত্যসংসদ বা বসুমতী সাহিত্যমন্দিরের মতন কোনো প্রতিষ্ঠান তাঁর রচনাগুলি একত্রে গ্রন্থাবলী আকারে বার করলে ভালো হয়। তাঁর সাহিত্য স্থায়িত্বলাভের অপেক্ষা রাখে।

সাহিত্য ক্ষেত্রের নবাগত অনেক লেখককে তাঁর সমিতির সহায়তায় প্রতিষ্ঠালাভে সাহায্য করলেও তিনি নিজে কখনো সামনে এগিয়ে এসে নিজেকে জাহির করতে চাইতেন না। খ্যাতির মোহ কোনদিন তাঁর দেখিনি। সাহিত্যিকসুলভ কোনও অহংকারও ছিল না তাঁর। তাই তাঁর মোহনায় নদ-নদীরা সহজ স্বচ্ছন্দে এসে মিশতে পারতেন।

সেকালে আরো দুটি নামজাদা সাহিত্যিক আসর ছিল-কল্লোল আর শনিবারের চিঠির। ঐ দুই মুখপত্রকে কেন্দ্র করে দুটি সাহিত্যগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। সাহিত্যসেবক সমিতির কোনো মুখপত্র ছিল না, ছিলেন মাত্র এক মুখপাত্র-ঐ রমেশবাবুই। মুখ্যত তাঁর ব্যক্তিত্বের আকর্ষণেই গোষ্ঠী নির্বিভেদে তাবৎ লেখকই তাঁর ঐ কৃষ্টিক্ষেত্রে এসে জমতেন।

প্রেমেনের প্রথম দর্শন পাই এক সিনেমা হলে (তার একটি রচনায় সেই বিবরণী রয়েছে), অচিন্ত্যর সঙ্গে আলাপ জমে ফুটবলের মাঠে, আর কবি নজরুলের সঙ্গে বহরমপুর জেলেই আমার জমজমাট, কিন্তু বিভূতি বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, সতীকান্ত গুহ প্রভৃতির সঙ্গে মোলাকাত আমার ঐখানেই। দরাজ ঐ কবিরাজখানার সঙ্গমস্থলেই বিভিন্ন দলের সাহিত্যিকরা এসে মিলিত হয়েছেন। পবিত্র গাঙ্গুলিও আসতেন ওখানে। শৈলজানন্দ, অচিন্ত্য, এমনকি প্রেমেনেরও কখনো কখনো পাত্তা পেয়েছি আমি সেখানেই এবং আরো কতোজনার!

আমার যাতায়াতের পথেই ঐ জংশনটা-না জমলেও সেটাই ছিল আমার হল্টিং স্টেশন। কদাচ বা ওয়েটিং রুম।

ঐ বাড়ির দোতলাতেই থাকত আমার বিখ্যাত বোন বিনিরা আর তার কাজিন কমল। ওদের জন্যে আমি অপেক্ষা করতুম সেখানে। কমলরা স্কুল থেকে ফিরলেই কেটে পড়তাম সেখান থেকে, বেড়াতে বেরুতাম তাদের নিয়ে, কিংবা পাশেই তাদের সদর দরজার চৌকাঠে বসে আগডুম বাগড়ম আলাপ চালাতাম আমাদের। পাশের সাহিত্য আলোচনায় জলাঞ্জলি দিয়ে।

সাহিত্যিক বা সাহিত্য আসরের আকর্ষণ চিরদিনই আমার কম। সাহিত্য বা সাহিত্যিক আমার কাছে কখনই আলোচ্য বস্তু নয়, তাদের আলোচনায় গেলে, বীরবলী ভাষায়–আলোর চেয়ে চোনাই বেরয় বেশি। আমার ধারণায় সাহিত্য হচ্ছে, সৌন্দর্যের মতই উপভোগের বস্তু-আস্বাদের জিনিস। এবং সে কাজ একান্তেই হতে পারে–একান্তভাবে করতে হয় যদি।

তাহলেও ঐ সমিতিটি সেই কালে আমার খুব কাজে লেগেছিল। আমার কাছে সাহিত্য আলোচনার জন্য উৎসুক কেউ এলে, হবু সাহিত্যিকরাই বেশির ভাগ, আমি তাঁদের রমেশবাবুর ঐ আড়তে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিতাম। রমেশবাবু সানন্দে নিজের সমিতির সভ্য হিসেবে তাদের লুফে নিতেন। আর তারাও মাসিক চার আনা মাত্র চাঁদার বিনিময়ে ঢালাও আড্ডা আর আলোচনার সুযোগ পেত–সেই সঙ্গে চা কচুরি সিঙ্গারা তো মিলতই। সেদিক দিয়ে ওটা ছিল আমার ডাপিং গ্রাউন্ড।

রমেশবাবুর মত তাঁর ওষুধেরও আমি গুণগ্রাহী ছিলাম। আমার মতই ছিলেন হয়ত আরো অনেকে, কেননা তাঁর বহুমূল্য দাবাই তিনি বিনামূল্যে লেখক-বন্ধুদের দিতে সর্বদাই মুক্তহস্ত। তাঁর ওষুধ খেয়ে কতোবার যে বেঁচে গেছি বলা যায় না। একবার এমন মারাত্মক রক্তামাশায় ধরেছিল যে, সারছিল না কিছুতেই। আঁর চিকিৎসাতেই রক্ষা পাই। তিনি কী বটিকা আর পাঁচনের ব্যবস্থা করেছিলেন, আর আমার মামাতো ভাই কমল করেছিল বাঁচনের ব্যবস্থাটা। বিনির সাহায্যে বাড়িতে পাঁচন বানিয়ে (কত সের জলে ঐ পাঁচদি দিয়ে কিরকম জ্বালের আঁচে কতক্ষণ ধরে ফুটিয়ে জলটা মেরে কতটা থাকতে তা নামাতে হয় যেন-সে এক দারুণ দুষ্কর মহামারি ব্যাপার!) তার সাথে গাঁদাল পাতার ঝোল আর ভাত নিয়ে তার স্কুলের টিফিনের সময় রোজ এসে খাইয়ে যেত আমাকে–মাসখানেক ধরে প্রায়। কিন্তু চিকিৎসাটা অব্যর্থ বলতে হবে, কেননা তার পরে আমার জীবনে ঐ ব্যারাম আর ধরেনি আমায়।

ফোটোগ্রাফিতে আশ্চর্য নৈপুণ্য ছিল কমলের-ঐটুকুন বয়সেই। সেই কালেই সে কোডাকের বাক্স ক্যামেরায় জে, এল, বাঁড়ুজ্যের (কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটে কাছাকাছি বাড়িতে তিনি থাকতেন তখন ) এমন চমৎকার এক ছবি তুলেছিল যে, বাঁড়ুজ্যেমশাই, তাঁর অসংখ্য ফোটোর ভেতর সেটিকেই সবচেয়ে পছন্দ করতেন। তাঁর টেবিলের ওপর সুদৃশ্য ফ্রেমে সাজানো থাকত ফোটোটা। তাঁর বিখ্যাত নোটবইগুলির প্রকাশক সেনরায় কোম্পানির একেবারের ক্যালেন্ডারে কমলের তোলা জিতেনবাবুর সেই ছবিটিই ছাপা হবার মর্যাদা লাভ করেছিল।

শৈলজানন্দ তখন সাহিত্য বাদে চিত্রজগতে বাদশাহীত্ব করছিলেন। সব্যসাচীর মতন তিনি তখন নিজের কয়েকটি অপরূপ উপন্যাসের পরমাশ্চর্য চিত্ররূপ দিয়েছিলেন–প্রায় সবগুলিই তার হিট ছবি হয়েছিল। পরিচালকরূপে তাঁর খুব নামডাক তখন। তাঁর কাছেই নিয়ে গেলাম কমলকে।

আমার কথায় তক্ষুনি তিনি কমলকে নিজের সহকারী করে নিলেন–একশ টাকার মাস মাইনেয়। সেই কিশোর বয়সেই নিজের নৈপুণ্যে কমল চিত্রকর্মের বিভিন্ন বিভাগে এমন দক্ষতা অর্জন করেছিল যে, তারপরে শৈলজার থেকে স্বতন্ত্র হয়েও সে কয়েকটি ছবি তুলেছিল নিজের পরিচালনায়। তার একটির সঙ্গে আমি একটু বিজড়িত ছিলাম। তার রক্তের টান বইটির, তারই নির্দেশ মতন, সংলাপংশটা লিখে দিয়েছিলাম আমি।

বইটার থেকে মোটামুটি বেশ মুনাফা হয়েছিল আমার। আপনজন বলে অযথা সুবিধা নেয়ার চেষ্টা না করে বেশ টাকাই দিয়েছিল আমাকে। তারপর ওটা বই হয়ে বেরুলেও ফের আমার অর্থাগম হয়েছে।

বইটার প্রথম সংস্করণ সে-ই নিজের খরচে ছাপায়, সঙ্গতভাবেই নিজের নামে, যদিও সংলাপাংশ যে আমার সে উল্লেখও ছিল তার ভূমিকায়। কিন্তু বইটা তেমন বেচতে পারেনি, বই কোথায় কীভাবে বিক্রি হয় তার কোনো ধারণাই ছিল না বেচারার। নিজের ছবির প্রদর্শনকালে সিনেমা হলেই বইটা চালাবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমার ধারণা, বইয়ের দোকানে সিনেমা দেখানোর মত, সিনেমা হলে বই চালু করা এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। স্বাভাবিকভাবেই সফল হবার নয়।

কষ্টেসৃষ্টে দু একশ কাটানোর পর সংস্করণটার বাকি কপিগুলি সে দিয়ে দিল আমাকেই অমনিই। দিয়ে যেন হাঁক ছেড়ে বাঁচল। আমি করলাম কি-টাইটেল পেজে লেখকের স্থলে তার বদলে আমার নামটা বসিয়ে পাতাটা নতুন করে ছাপিয়ে নিলাম আর ভূমিকার উল্লেখ থাকল- মূল কাহিনীটি কমলের। সংলাপ রচনাটুকুই শুধু আমার আর তাও যে তারই নির্দেশ মতই–তাও জানিয়ে একটু বেশি কমিশন দিয়ে ঐ বই-ই ছেড়ে দিলাম বাজারে।

দেখতে দেখতে কেটে গেল পুরো এডিশন। তার পরেও তার কিশোর, বয়স্ক বিভিন্ন সংস্করণে নানা নামে নামান্তরে বইটার কাটতি হয়ে রীতিমতই মোটা উপায় হয়েছিল আমার।

 অথচ, ঐ বই সম্পর্কে আগ্রহ ছিল না আদপেই। পরের নির্দেশ মত সংলাপ রচনায় উৎসাহ পাইনি বলতে কি! ঠিক অর্থ লালসাতেই ঐ কর্ম ছিল না আমার, কমলের প্রতি প্রাণের টানেই করেছিলাম, তাহলেও বলতে হয়, রক্তের টানের সুবাদে তখনকার মতন অর্থের টানাটানি থেকে বেঁচে গিয়েছি।

কিন্তু রক্তের টান থেকে মোটামুটি আমার লাভ হলেও কমলের মোটমাট লোকসানই দাঁড়াল। কেবল প্রকাশিত ঐ বইটার থেকেই নয়, প্রদর্শিত ছবিটার থেকেও সিনেমা। লাইনের ঘাঁৎঘোঁৎ আর কারবারীদের আচার-আচরণ ভালো মত জানা ছিল না বলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে ছবির প্রদর্শনীর থেকে নিজের প্রাপ্য রয়ালটি আদায় করতে পারো, প্রায় সকলেই ওকে ঠকিয়েছে, অনভিজ্ঞ আর ভালো মানুষ হলে যা হয়। তাছাড়া নেহত ছেলেমানুষও ছিল তো! তারপরে বাংলাদেশে (তখনকার পাকিস্তানে) তার ছবিটা খুব চললেও আর জনপ্রিয় হলেও মোটা লাভটাই তাকে গচ্ছা দিতে হয়েছিল নাকি, কি কারণে জানি না, এক পয়সাও তার উদ্ধার করা যায়নি।

কমলের বেলাও দেখেছি, আর শৈলজা, গৌরাঙ্গ, প্রেমেনের বেলাতেও দেখলাম (এমনকি, উদয়ের পথে-র বিখ্যাত ধুরন্ধর লেখক জ্যোতির্ময় রায়ের বেলাও তার কোনো অন্যথা হয়নি) ফিৰ্ম-কর্মে গোড়ার দিকে দুপয়সা হলেও মূলে হা-ভাত হয়ে সব উপায়ই কেমন করে যেন উপে যায় হঠাৎ।, লাখ লাখ টাকা আমদানির পরেও লোকসানই দাঁড়ায় শেষপর্যন্ত। লাভের কড়ির কিছুই আর হাতে না থাকলেও প্রায় হাতকড়ির মতই অবস্থা হয় হয়ত বা। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ এর থেকে ফয়দা তুলতে পারলেও অব্যবসায়ী স্বপ্ন-দেখা লেখক ও শিল্পীদের ভাগ্যে পরধর্মের মতই ভয়াবহ হয়ে ওঠে অচিরেই।

এবং তারপরে এই চোট সামলে উঠতে তাদের সময় লাগে বেশ। বিপথে গিয়ে হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খাবার পর খাড়া হয়ে পা-র তলায় নিজের ঠাই-আগেকার ঠাইটি খুঁজে আর পায় না বোধহয়। যথাযথ ভাবে দাঁড়িয়ে যথোচিত ভাবে নিজের মাথা তুলে দাঁড়ানো বুঝি যায় না আর। কোথায় যেন কী হয়ে যায়!

অনেকটা যেন ডুব সাঁতারে অনেকখানি পেরিয়ে আসার মতই। ডুবে ডুবে অনেককাল। কাটিয়ে মাথা তুলে হঠাৎ দেখা যায়, কোথায় এলাম রে! এর মধ্যে বিস্তর সময়ের জলাঞ্জলি হয়েছে–কোথায় যেন যাবার ছিল, কোনখানে যেতে এ কোথায় এসে গেলাম! দেখতে পাই, ঠিক পথের থেকে বহুৎ পিছিয়ে পড়েছি। যারা ছিল অনুগামী, অনেক আগেই তাদের অনেকে উতরে গিয়েছে কখন!

অনন্য প্রতিভাধর কেউ কেউ হয়ত এমন ফাড়াকাটিয়ে উঠতে পারেন, কিন্তু সবার পক্ষে সেটা সম্ভব হয় না। অসামান্য শক্তিমান হয়েও আমাদের জ্যোতির্ময় রায় তা পারেননি, এই পথে পা বাড়িয়ে বিপাকে জড়িয়ে বিনত হয়ে নিতান্ত হতাশায় কেবল স্বক্ষেত্র থেকেই নয়, অকালে আকস্মিকভাবে ইহলোক হতেও বিগত হয়েছিলেন–এটা একটা ট্রাজেডিই। কেবল তাঁর নিজের দিক থেকেই নয়, বাংলা সাহিত্যেরও বলতে হয়।

আমাদের কালের এবং কল্লোলের বন্ধুদের মধ্যে কেবল নারাণ গাঙ্গুলিইখানিকটা গিয়েও ফিরে আসেত পেরেছিলেন যথাসময়ে। ফিলম জগতের সঙ্গে অংশত জড়িত হয়েও বিশেষ বিপর্যয়ে পড়তে হয়নি তাঁকে। চিত্রনাট্য আর সংলাপ-অংশ লিখেই তিনি নিরস্ত হয়েছেন, ফিলমি লাইনের হলেও যেটা হয়ত খানিকটা তাঁর নিজের লাইনেও বলা যায়, একেবারে স্বধর্মবিচ্যুতি নয় বোধ হয়, কিন্তু আরো এগিয়ে এই অক্টোপাশের ফাঁদে পা দিয়ে চিত্র পরিচালনা বা প্রযোজনায় দায় ঘাড়ে নিয়ে ল্যাজে-গোবরে ওতপ্রোত হয় যায়-যায় দশায় গিয়ে তাঁকে দাঁড়াতে হয়নি কখনই। তাই শেষ অব্দি তাঁর সাহিত্যের নবনবোন্মেষ আমরা লক্ষ্য করেছি-সুনন্দর জার্নাল পর্যন্ত। কোনোখানে কিছু বাধা পায়নি কখনো। এবং বেঁচে গেছেন অচিন্ত্য আর বুদ্ধদেব–ঐ মোহিনী মায়ার বাহুপাশ থেকে।

অচিন্ত্য মুনসেফ তখন। সেই মুনসেফির সেফটি ভালব, স্বভাবসুলভ বিচারবুদ্ধিই তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

আর বুদ্ধদেব বেঁচেছেন নিজের সহজাত প্রতিভায়। এঁদের সকলেই সপ্রতিভ হলেও বুদ্ধদেবের প্রতিভা আবার ডবল তো। নিজের প্রতিভা এবং আরো নিজের। প্রতিভার স্কোয়ার রুট স্বভাবতই প্রবল। সেই চৌকস প্রতিভাই তাঁকে বাঁচিয়েছিল বলে আমার ধারণা। বুদ্ধদেব যদি প্রতিভাবলে বেঁচে থাকেন তো অচিন্ত্য বেঁচেছেন দৈব বলে–তার পরম পৌরুষে। সেটা নিজের পুরুষকারও হতে পারে, আবার পরম পুরুষের দৈবী কৃপা হওয়াও অসম্ভব নয়।

পরমহংসদেব কোথায় যেন বলেছিলেন না যে, বাঘ যাকে ধরে তাকে অন্য কারো ধরবার মতন কিছু আর বাকী রাখে না, তাকে একেবারেই অপরের ধর্তব্যের বাইরে নিয়ে যায় সে।

বিবেকানন্দ আর শ্রী-মর পর যাঁকে তিনি নিজের প্রচারবাহনরূপে চিহ্নিত করে রেখেছেন, তাঁর সেই দাগা দেওয়ার ওপর আর কেউ এসে দাগা বোলায় এমন সাধ্য কার?

তাই তাঁর ওপর দাগাবাজি করাটা একটু অচিন্তনীয়ই নয় কি?

.

৮০.

 কবিরাজ রমেশচন্দ্র সেনের আখড়ায় পবিত্রবাবুই ছিলেন সবচেয়ে পালোয়ান, আখেরই একদিন টের পেলাম।

আমাদের গোটা গ্যাং-এর ভেতর উনিই ছিলেন গুলির মত জোরালো আর জবরদস্ত, জেনেছিলাম অচিরেই। ওঁর বাহুর মাস্তুলগুলি বুলেটের মতন ডাক দিয়ে সেই কথাই বলত। তার বেয়ারিং ধাক্কা কোনোদিন পোহাতে হলে যে ডবল চার্জ দিতে আমায়, সেটাও বুঝতে দেরি হয়নি। ডবল মাশুলে উসুল দিয়ে সেটা সমঝেছিলাম একদিন।

পবিত্র গাঙ্গুলি আর রমেশ সেন সগোত্র ছিলেন একদিক দিয়ে। যেমন সাহিত্যসেবী তেমনি সাহিত্যিক-সেবক দুজনেই। নিজের দিকে না তাকিয়ে আগ বাড়িয়ে বাণীর সাধকদের সাহায্যে লাগা–বিশেষ করে সতীর্থদের মধ্যে যারা নবাগত-এই যেন কাজ ছিল দুজনের। একাধিক লেখকদের প্রতিষ্ঠ করতে নানাদিক থেকে তাঁরা সহায়তা করেছেন।

প্রবাসী থেকে শুরু করে নানান পত্র-পত্রিকায়, নজরল যখন কারারুদ্ধ, তার কবিতা / প্রকাশের সাথে নগদ দক্ষিনার উপায় করে সেই টাকা জেলখানায় কাজীকে পৌঁছে দিয়ে আসার পবিত্র কাহিনী তো অনেকেরই জানা। তিনি কেবল নজরুলেরই কাজের কাজী ছিলেন না, কাজীর মত অনেকেরই কাজে লেগেছিলেন।

আমার কোনো কাজে না লাগলেও আমাকেই ধরে লাগাবার কাজটা তাঁর নিজের হাতে নিলেন একদিন-সাহিত্য-কসরতের সেন মশায়ের সেই পালোয়ানি আখড়ায় হাতাহাতি হয়ে প্রায় হতাহত হবার সম্মুখীন হয়েছিলাম আমরা একদিন। আখেরে কী হত কে জানে, নেহাত আমার পলায়নী মনোবৃত্তির দরুনই তার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছি সে যাত্রায়।

 আবার রাতারাতি কিছু প্রাপ্তিযোগের নগদ নারায়ণ লাভের দাঁওয়ের মওকাও আমি সেইখানেই পাই।

সতীকাত গুহর সহিত সাক্ষাৎলাভ আমার সেখানেই। পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি। বলেছিলেন-আপনিই শিবরাম চক্রবর্তী বটে? আমার ভাগনে গোরা তত মশাই আপনার নামেই অজ্ঞান!

নামেই অজ্ঞান? যতই অজ্ঞানী বালক হোক না, একজন নামমাত্র লেখকের পক্ষে এমন খবরটা হতজ্ঞান দ্বার মতই।

আমি তো মশাই আপনার কোনো লেখাই পড়িনি এখনো, কিন্তু সে বলে যে, আপনার নতুন লৈখক নাকি হয় না। আপনিই নাকি বাংলা সাহিত্যের একমাত্র লেখক এখন।

একটুখানি বাড়িয়ে বলেছে। একমাত্র না হলেও একমাত্রায় নয়, তাতে ভুল নেই। লজ্জিত হয়ে আমি বলি।

সম্প্রতি আমি একটা পাবলিশিং হাউস করেছি গ্রস্থবিহার নামে কর্নওয়ালিশ স্ট্রীটে, ডি, এম, লাইব্রেরীর ঠিক পাশেই। দেবার মতো আপনার কোনো বই থাকলে দিতে পারেন আমাকে। গোরার খুব ইচ্ছে আপনার একটা বই আমরা বার করি। আছে কি কোনো বই আনার?

রামধনু-তে আমার একটা উপন্যাস শেষ হয়েছে সেদিন। ছোটদের উপন্যাস-বাড়ি থেকে পালিয়ে।

হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই বইটার কথাই বলছিল বটে। বলছিল যে, অমন বই নাকি…যা সে-কথা, ওটার ফাইল কপিগুলো নিয়ে একদিন আসুন না আমাদের বাড়ি, এই সম্পর্কে কথা হবে।

বলে নিজের বাড়ির ঠিকানা জানালেন। ইন্দ্র রায় রোডের দশ নম্বর বাড়িতে তখন ওঁরা থাকতেন।

কবে যাব বলুন? আমি জিজ্ঞেস করি : কখন গেলে আপনার সুবিধে?

যে কোনদিন সকালে। সকালেই সুবিধে। তখন গেলে গোরার সঙ্গেও আলাপ হবে আপনার। সামনের বাড়িতেই থাকে ওরা। যেদিন আনার সুবিধা হয়, আপনার সুবিধামতই যাবেন।

আমার সুবিধে মত? কথাটায় আমার হাসি পায়। হায়, আমার সুবিধে মতন কিছুই যে আমার হয় না। এমন কি, আমার লেখাটেখাও হবার নয়।

সব কিছুই আমার অসুবিধা মতন হয়ে থাকে। এমন কি ঐ লেখাটেখাও। কোনো প্রেরণার দায়ে নয়, খুব অসুবিধায় পড়লেই লেখারা পায় আমায়। সৃজনৈষণার বশে নয়, নিতান্ত দায়ে ঠেকলেই লিখতে বসি। লেখা বেরয় আমার।

টাকার দরকার না পড়লে লেখার মর্জি হয় না। গরজই হয় না আমার। টাকার জন্যই লিখি, লিখে থাকি, লিখছি চিরটা কাল।

আর অসুবিধা আমার সব সময়। অসুবিধায় পড়লেই আমার সব হয়। লেখা হয়, টাকা হয়, সব কিছুই। আমি জোটাই আবার আপনার থেকেও জুটে যায়। কী করে যে এই জট পাকায় কি জানি। মহাকালের জটাজুট হতে সুরধুনী ধারার মতই আকাশ ফেটে আপনার থেকেই ঝরে পড়ে কিনা কে জানে!

পকেটে টাকা থাকইে টাকার ধান্দায় বেরোও না কেন দাদা? বিনি বলত আমায়,  তাহলে আর এই অসুবিধায় পড়তে হয় না। এই দুর্ভোগ ভুগতে হত না তোমাকে।

অসুবিধায় না পড়লে আমার হত কী? দায়ে পড়লেই তো লিখি। টাকার ধান্দায় বেরেই। টাকা পাই–টাকা পেলেই গিলে বসি, সে টাকা আর ওগরাতে পারব না জেনেই বাধ্য হয়ে লিখতে হয় তখন। নইলে টাকা থাকতে আমায় লেখায় কে? স্বভাবের বশে নয় ভাই, নেহাত অভাবে পড়েই লেখাটেখা আমার-বুঝেছিস?

এই জন্যেই কোনোদিন তোমার কিছু হয় না। লেখারও উচিত দাম তুমি পাও না কোনোদিন। যে যা দেয়, দায়ে পড়ে তাই নিতে হয় তোমায়। সম্পাদক প্রকাশকরা মওকা পেয়ে যায়। তোমার পকেট যে গড়ের মাঠ, সেটা টের পেতে দেরি হয় না কারো। তোমার মুখেই তার লক্ষণ প্রকট হয়ে পড়ে।

গড়ের মাঠের মল ঘাস গজায় বুঝি? মনের দুঃখে দাড়ি কামাইনে বলে বলছিস তাই?

খাঁকতির মাথায় যাও বলেই যার যা খুশি দেয়, হাসিমুখে তাই নিয়ে আসতে হয় তোমায়। যে টাকায় অন্যরা সব এডিশন দেয়, তাই পেয়ে তুমি কপি রাইট বেচে নাচতে নাচতে আসো। নিজের মাথা নিজেই খাচ্ছে। একটা সংস্করণ স্বত্ব বেচেই প্রেমেনদা কতো বেশি পান তোমার চেয়ে, তা জানো? তার একটা বইয়ের দাম তিন টাকা চার টাকা, আর তোমার চার আনা ছ আনা। দিনকের দিন বাজারদর কমে যাচ্ছে তোমার।

ঘরে ঘরে আদর বাড়ছে তেমনি। কপি রাইট বেচে দি বলেই না আমার বইয়ের দাম অতো সস্তা? ছেলেমেয়েরা কিনতে পারে কত সহজে?

বাজারদরের সঙ্গে ছোটদের আদর মিলিয়ে লাভ-ক্ষতিটা আমার কতখানি দাঁড়ায় খতিয়ে দেখি, দেখাতে চাই।

আদর আমার মাথায় থাক। আদর নিয়ে কি ধুয়ে খাব? আদর খেয়ে কি বাঁচবে তুমি? সে ঝামটা দেয় : আর পাঁচ দশ টাকার গল্প বেচে আসো যে পত্রিকায়, তার কী? সেটা ওই টানাটানির মুখে যাও বলেই না? আগের থেকে লিখে রাখলে তারা এসে টাকা দিয়ে তোমার লেখা নিয়ে যেতে পারে–ভালো দামও পাও তাহলে। তা করো না বলেই তাই আগাম ওই নামমাত্র দাদন দিয়ে তারা লিখিয়ে নেয় তোমাকে দিয়ে।–বিনি কয়-কেন, তোমার আগে থাকতে অবসর মতন লিখে রাখতে কী হয়?

কী হয় কে জানে। মোটের ওপর খুব ভালো হয় না। সেই পঞ্জীভূত লেখা তখন দায় হয়ে দাঁড়ায়। মাথা খারাপ করে দেয়। মন ভারি হয়ে থাকে। অবিবাহিতা মেয়েকে যেমন পাত্রস্থ করতেই হয়, অপ্রকাশিত লেখাদেরও তেমনি পাত্রস্থ না করে রেহাই নেই–মনের ভেতর তারা আঁকুপাঁকু করতে থাকে কেমন! না ছাপানো পর্যন্ত ভাই, আমার ভালোলাগে না, স্বস্তি পাই না। কন্যাদায়ের মতই সে এক নিদারুণ দায়। ছোটাছুটি করো তখন, সম্পাদকদের বাড়ি বাড়ি-সে এক বেজায় ঝকমারি। আমার পোযায় না।

আর সব লিখিয়েরা তবে কাঁড়ি কাঁড়ি লিখে জমায় কি করে? এক সাথে বাজারে চার-পাঁচখানা করে বই ছাড়ে যে…?

আমার কাছে সেটা রহস্যই সত্যি! অভাবে পড়ে লেখে না, স্বভাবের তোড়ে লিখে যায়-সরস্বতীর বরপুত্র তারা নিশ্চয়। লিখে তারা আনন্দ পায়, লেখে তাই। লেখার জন্য তাদের কোনো প্রাণের দায় নেই–কেবল ঐ প্রেরণার ঘাঁই! চুনোপুটির মৎস্য অবতাররণা তাঁদের জালে পড়ে বরাহ হয়ে ওঠেন, একটা ছোট্ট গল্পের মতন এতটুকু প্রাণীকে কী করে তাঁরা রাঘব বোয়ালের ন্যায় উপন্যাসে বাড়িয়ে ছাড়েন। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করার মতই।

যাকে তন্নিষ্ঠ লেখক বলে, এঁরা বোধ হয় তাই। সর্বদাই তাঁরা লেখেন, না লিখে যেন নিস্তার নেই–কিছু না কিছু লিখছেনই সব সময়। সকালে উঠেই খেয়ে না খেয়ে লিখতে বসেন–খেয়েদেয়েও তা শেষ হবার নামটি নেই–লিখেই যাচ্ছেন। লেখাটাই তাঁদের খোরাক, লেখার খাই কখনই তাঁদের মেটে না। মিটবার নয়।

কিন্তু এই তন্নিষ্ঠ লেখকদের মত লেখার সঙ্গে অমন ঘনিষ্ঠ হওয়া আমার পোয় না। অতটা পরিশ্রম-লেখার জন্য কখনই নয়, পারলে পরে পরীদের জন্যই হয়ত করা যায়। সেই শ্রমস্বীকারের পারিতোষিক আছে। পরিতুষ্ট হওয়া যায়। কিন্তু লেখার জন্য বদ্ধপরির হওয়া আমার কর্ম নয়।

পরমহংসদেব বলেছিলেন না, যার পেটে যেমনটা সয়? তার জন্য মার সেই রকরে ব্যবস্থাই? মা সরস্বতীরও তাই। তাঁর বড় পুত্রের জন্যই যত তাঁর বাড় বাড়ন্ত! এক অন্ন আর একান্ন ব্যঞ্জন। মেজ সেজ ছোটদের জন্যও তেমনি বিধি, বরাদ্দ–বিরিয়ানির থেকে কোপ্তা কাবাব কালিয়া পোলাও শিককাবাব-যার যেটি চাই। কারো কারো পিঠে পায়েস-খান না তাঁরা আয়েস করে। কিন্তু তারও পরে তাঁর আরো পুত্র থাকে তো; তাঁর ন-রাঙ্গা–নানান। আমি তাঁর সেই ন-পুত্ৰই, কিংবা হয়ত ঐ ত্যজ্যপুত্রই হব বোধ হয়। আমার বরাতে তাই ওই কাঁচকলাই।

তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই। পেটরোগা আমি তাই খেয়েই বেশ মোটা।

 রিনিকে আমি সেই কথাই বালাই।

আর বেশি ব্যাখ্যানায় কাজ নেই। তুমি যে একটি কুড়ের বাদশা, জানি আমি।

 রাজবাড়ির গোলাম প্রায় রাজতুল্যই জানি, কিন্তু তা হওয়ার চেয়ে কুঁড়েঘরের বাদশা হওয়া ঢের ভালো, আমি বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু সে বাইরে একটা মোটরের হর্ন শুনেই না, ওর কোনো সহপাঠিনীর ঘন্টাধ্বনি হবে হয়ত, নিজের ভ্যানিটি দেখিয়ে ব্যগ্রভাবে বন্ধুর পথযাত্রায় বেরিয়ে পড়ে–আমার জবাবের কোনো অপেক্ষা না করেই।

আমার অসুবিধা মতন পরদিন সকালেই সতীকান্তবাবুর বাড়ি গেলাম-রামধনুর ফাইল কপিগুলি সমেত।

ফাইলটা তাঁর হাতে দিয়ে বললাম, পড়ে দেখুন আগে, নেবার মতন কি না।

পড়বার দরকার করে না। ছেলেদের লেখার, বুঝেছেন, ছেলেরাই বেস্ট জাজ। গোরার যখন ভালো লেগেছে, তখন আর সব ছেলেরই ভালো লাগবে ধরে নেওয়া যায়।

তাহলেও একবার পড়ে দেখার দরকার বোধ হয়। আপনি অব ঠাকুর প্রভৃতির বই ছেপেছেন বলছিলেন না…আমার লেখাটা সেই দরের হয়েছে কিনা দেখুন আগে…

সেই দরের কী করে হবে? তা কী হয়? তাঁর মন কি কেউ লিখতে পারে কখনো? বলে একটু হাসলেন, আমার প্রগভতায় হয়ত বা–তবে আপনার বইটা কাল রাত্রিরেই পড়ে আমি শেষ করেছি, বলতেই গোরা তার রামধনুর কপিগুলো দিয়েছিল আমাকে। খুব উঁচুদরের না হলেও, বেশ বই, বলব আমি।

তার পরে আর আমি কী বলতে পারি? চুপ করে থাকি।

 তিনি বললেন, দেখুন, মোটমাট শ পাঁচেক টাকা দেব আমি আপনাকে। আপনি রাজী?

 নিশ্চয়। কপি রাইটের জন্য আমি যথেষ্ট মনে করি।

মুখে বলি, আর মনে লাফিয়ে উঠি। আমার লেখকদশার সেই প্রাক্কালে পঞ্চাশ থেকে একশো টাকায় কপিরাইট বেচি তখন, সেই সময়ে অতগুলো টাকা আমার কাছে প্রায় যেন ছপ্পর ফেটে পড়বার মতই।

এটা আপনার প্রথম সংস্করণের জন্যই। তিনি জানালেন তারপর।

কপিরাইট নেবেন না আপনি? আমিওতেই আপনি কপিরাইট পেয়ে যেতেন কিন্তু।

না, কপিরাইট কিসের! কপিরাইট আপনারই রইলো। পরের সংস্করণে আবার আপনি পাঁচশো টাকাই পাবেন আমার কাছে। বুঝেচেন? বু

ঝতে আমার সময় লাগে। বিস্ময় জাগে।

 কিন্তু বিস্মিত হবার কিছু ছিল না। উচ্চশিক্ষিত, উঁচু ঘরের ছেলে, উঁচুদরের লিখিয়ে নিজেও–তখনই প্রেমেন্দ্র মিত্র ও অধ্যাপক খগেন্দ্রনাথ সেন সম্পাদিত কিশোর পত্রিকা রমশালে খেয়ার মাঝি লক্ষ্মীনাথ বলে তাঁর একটি অবিস্মরণীয় লেখা বেরিয়ে সাহিত্যিকমহলে সোরগোল তুলেছিল (সেই গল্পটা আরো নানা গল্পের সঙ্গে বই হয়ে বেরিয়েছে এতদিন বাদে–এম. সি. সরকার থেকেই সম্প্রতি-মৌচাকের বিজ্ঞাপন পাঠে জানলাম ) সুতরাং লেখার মান তিনি ভালোই জানেন, আর লেখকের উপযুক্ত মর্যাদা দিতেও তাঁর কুণ্ঠা হবার কথা নয়। একটি উচ্চমনা অভিজাতবংশের তরুণের কাছে সেইটাই আশা করা যায়।

কিন্তু আভিজাত্য আর ব্যবসা-বুদ্ধি বোধহয় হাত ধরাধরি করে চলে না। জ্যোতিঠাকুরের জাহাজী কারবার থেকে শুরু করে সুরেনঠাকুরের বীমা ব্যবসায় জেরবার হওয়া পর্যন্ত এইটেই দেখা গেছে, সতীকান্তবাবুর বেলাও তার অন্যথা হবার কথা নয়।

লেখার এবং লেখকের মানছত্র বাড়াতে গিয়ে তাঁর প্রকাশনা-মন্দিরের দানছত্র উঠে গেল দুদিনেই–গ্রন্থবিহার চলল না বেশিদিন। ভেঙে পড়ল দেখতে না দেখতে।

বিহারের সেই দারুণ ভূমিকম্প তার জন্য দায়ী কিনা আমি বলতে পারব না।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *