আমি সিরাজের বেগম – ৫

সিরাজ শরাব ছেড়ে দিয়েছে, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিন্ত। অবশ্য নিশ্চিন্ত হবার জন্যে কোনো খোঁজ নিইনি। লুকিয়ে কিছু করতে আমার মন চায় না, বিশেষ করে সিরাজের ব্যাপারে। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কে লুকোচুরির নয়।

ওর মন বড় দুর্বল। শরাব ছাড়ার পরে পানপাত্রগুলোকে দেখে হয়তো দুর্বলতা উঁকি দিয়েছিল, তাই অতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগে নিজের হাতেই সে সেগুলোকে একটার পর একটা ভেঙে চুরমার করেছে। শুনলাম, শরাবপায়ী বন্ধুদেরকেও হীরাঝিলে আসতে মানা করে দিয়েছে। শরাব-বাহীদের কাজ গিয়েছে।

তবু সে আর আগের সিরাজ নেই। আমার কাছে আসে না। ভুলে কখনও এলেও তেমন করে আর কথা বলে না। আমি আর তার ‘প্রাণের আধখানা’ নই, তার প্রাণ এখন আমি ছাড়াই পরিপূর্ণ। আমি সেখান থেকে নির্বাসিত।

একদিন তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই।

‘কী লুৎফা?’

কথা খুঁজে পাই না। কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে যাই। তাড়াতাড়ি বলি, ‘কিছু না, নবাবজাদা।’

‘তোমার শরীর ভালো তো?’

‘হ্যাঁ, নবাবজাদা।’

ব্যস্, কথা ফুরিয়ে যায় আমার আর সিরাজ, দু’জনারই। তবু দাঁড়িয়ে থাকি।

‘কিছু বলবে?’

বলব বলেই তো এসেছি, কিন্তু বলতে গিয়ে যে ঠোঁট ফুলে ওঠে, চোখ জ্বালা করে। শেষে বলে ফেলি, ‘জেবউন্নেসা বেগমকে হীরাঝিলে নিয়ে আসুন।’ সিরাজকে, ‘তুমি’ বলতে বাধো বাধো লাগে আজকাল।

‘কেন?’ কথাটা সে একটু বেশি জোর দিয়ে বলে।

‘আমার তো এই অবস্থা।’

‘আমার জন্যে আমার চেয়েও তোমার ভাবনা বেশি দেখছি।’ তার কথায় এতটুকু মিষ্টতা নেই, এতটুকু দয়া নেই। তার জন্যে আমার ভাবনা না হলে কার হবে? কারও সে-ভাবনা হতো না বলেই তো একদিন আমাকে জারিয়ার আসন থেকে তুলে বুকে টেনে নিয়ে বেগমের আসনে বসিয়েছিল। আজ সে-কথা কে বলবে ওকে?

সিরাজ আবার বলে, ‘কী বলতে চাও তুমি?’

‘কিছু না নবাবজাদা, কিছু না। দয়া করে আমাকে রেখেছেন, দু’টো খেতে পাচ্ছি। তাই ভেবেছিলাম, আপনার অসুবিধের দিকে আমার তাকানো উচিত।’

‘এটা কি অভিমান? ‘

‘না-না, অভিমান নয়। আমি সত্যি ভেবেই বলছি।’ ছুটে পালাতে যাই।

সিরাজ আমার হাত ধরে ফেলে বলে, ‘শোনো লুৎফা। শরাব ছেড়েছি, কোনোদিন ছোঁবো না আর। কিন্তু শুধু ছাড়লেই তো হল না। এতদিনের অভ্যাস ছাড়তে কষ্ট হয়। তাই শরাবের বদলে আর কিছুর প্রয়োজন। তুমি ঠিকই ধরেছ, কিন্তু জেবউন্নেসা নয়। সে শরাবের নেশা ছাড়াতে পারবে না। সে সুন্দরী, কিন্তু তার স্বভাব আর কথাবার্তা আমাকে মাতিয়ে তুলবে না, বরং বিরক্তির সৃষ্টি করবে। আর তোমার কথা তুমি নিজেই জানো। তাই একটা কাউকে চাই তো!’

‘এত বেগম রয়েছে আপনার, আর কাউকে নিয়ে আসুন।’

‘কেউ না, কেউ পারবে না। তারা সব পুতুল। সেজে-গুজে ঘরের মধ্যে বসে থাকতে পারে, তাদের মধ্যে প্রাণ নেই।’

‘তবে…’

‘তবে কি করব সেজন্যে তোমাকে ভাবতে হবে না, আমিই ব্যবস্থা করেছি।’

তার কথায় আমার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। আবার কোন আগুনের খেলায় মাততে চাইছে সে কে জানে? তার মতলব জানবার জন্যে মন ছটফট করে। কিন্তু প্রশ্ন করতে সাহস হয় না। আগের লুৎফা আর আমি নেই। আমার শারীরিক গঠন আর সৌন্দর্য কিছুদিনের জন্যে বিলুপ্ত হতে বসেছে। এখন আমি ভ্রূণবাহী-জীব মাত্র। আমার কটাক্ষে আগে যদিও বা কিছু চঞ্চলতা ছিল, এখন তা অদৃশ্য হয়েছে। এখন সে-কটাক্ষ ভারী, গভীর, আর মমতাময়

‘তোমার বোধহয় মন খারাপ হল।’ সিরাজের মুখে হাসি।

ঠাট্টা করছে নাকি?

‘না নবাবজাদা, আপনি যা বলেছেন তা ঠিক। আপনার সুখের জন্য যদি আমি কোনো রকম সাহায্য করতে পারি তাহলে নিজেকে ভাগ্যবতী বলে মনে করব।’

তুমি কিছুটা সাহায্য করতে পারো।’

‘আদেশ করুন।’

‘আমার বন্ধু মোহনলালকে নিশ্চয়ই চেনো?

‘এখানে তাকে আসতে দেখেছি।’

‘তার এক বোন রয়েছে দিল্লিতে। অপূর্ব সুন্দরী—স্বর্গের অপ্সরী বললেও চলে। সেখানে সে নর্তকী। সে নাচ-গান আর ভালোবাসায় আমাকে মাতিয়ে তুলবে। শরাবের নেশার কথা আমার আর মনে থাকবে না। প্রতিদিন নতুন উৎসাহ নিয়ে আমি কাজ করতে পারব! তুমি আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করো।’

আমার মাথা ঘুরছিল। নর্তকী হবে বাংলার বেগম! সিরাজের কি মাথা খারাপ হল? পড়েই যেতাম, কিন্তু আত্মহত্যা করার এক অবিচল প্রতিজ্ঞা আমাকে পড়তে দিল না। সিরাজের কথার জবাবে দৃঢ়ভাবে বললাম, ‘কী সাহায্য আমার কাছে আপনি চান, নবাবজাদা?‘

‘সাহায্য এমন কিছু নয়। শুধু তুমি কেঁদে ভাসিও না। আর দাদিরা যেন কিছু শুনতে না পায়। তোমাকে আমি সব চেয়ে বেশি ভয় করি। কারণ, তোমারই সব চাইতে বেশি হিংসে হবে।’

হীরাঝিলের মহলের কোন নির্জন জায়গায় গলায় দড়ি দিতে সুবিধে হবে, অথবা ছাদের কোন জায়গা থেকে নীচে লাফিয়ে পড়লে সহসা কারও চোখে পড়বে না, এই কথা ভাবতে ভাবতে আমার ভীষণ হাসি পেয়ে যায়। শত চেষ্টাতেও না চাপতে পেরে হেসে উঠলাম।

হাসিটা নিশ্চয়ই জোরে হয়েছিল। কারণ, সিরাজ দু’পা পেছিয়ে গেল।

আমি বলি, ‘আমার হিংসে হচ্ছে না, নবাবজাদা, আনন্দ হচ্ছে। আপনি সুখী হবেন, একি কম কথা? আপনার সুখ নবাব আলিবর্দি থেকে শুরু করে বাংলার সবাই চায়। আমি কেন হিংসে করব? অমন সুন্দরী নর্তকী আসছেন বেগম হয়ে, তাঁকে দেখবার সুযোগ মেলা কতখানি ভাগ্যের কথা। আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন, নবাবজাদা। একটা কুকুর পুষলেও তার ধরন-ধারণ চেনা যায়। আমাকে এতদিন দেখেও চিনলেন না?’

‘না-না, তা নয়। আচ্ছা, চলি।’

শরাব না খেলেও, শরাব খাওয়ার মতো টলতে টলতে সে চলে যায়। মোহনলালের বোনের রূপের কথা শুনেই তার নেশা ধরেছে—চোখে দেখলে হয়তো ঢলে পড়বে।

.

ঘটা করে একদিন নিয়ে আসা হল মোহনলালের বোনকে। হীরাঝিলের মাথায় উঠে লুকিয়ে দেখলাম সব। দুর থেকে মনে হচ্ছিল আট-দশ বছরের এক বালিকা। তেমনি রোগা আর ছোট। তবে গায়ের রং যেন ফেটে পড়ছিল। সকালের রোদ্দুর পড়ে অপূর্ব দেখাচ্ছিল মেয়েটিকে। নেশা ধরাবার মতোই রূপ বটে। সিরাজের কল্পনা নিশ্চয় আহত হয়নি মেয়েটিকে দেখে। ঝিলের ধারে তার হাসি-হাসি মুখের দিকে চেয়ে স্পষ্টই বুঝতে পারলাম সে-কথা।

কাল সন্ধ্যার সময় মেয়েটির আগমনবার্তা যখন আগে পৌঁছে দিয়ে গেল একজন ঘোড়সওয়ার, তখন থেকেই সিরাজ ছটফট করছিল। তার মনে হয়তো হয়েছিল, ঘোড়ার পিঠেই কেন এল না সুন্দরী, তাহলে তো একদিন আগে এসে পৌঁছতে পারত।

ভোরবেলা থেকে উঠে সিরাজ বাগিচার মধ্যে বসে রয়েছে। রাতে ভালোভাবে ঘুমোতেও পারেনি। আহা, বেচারা! এখন থেকে শুধু দিনেই ঘুমোতে হবে তাকে, রাতে আর সময় পাবে না। ঝিলের ধারে মেয়েটি সিরাজকে কুর্নিশ করে দাঁড়াতেই, সে তাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে, ঠিক প্রথম দিন আমাকে যেভাবে জড়িয়ে ধরেছিল। সিরাজের সুগঠিত দুই বাহুর মধ্যে মোহনলালের বোন অদৃশ্য হয়। এত ছোট কেন সে? ছোট বলেই বোধহয় এত সুন্দর!

এখনই আত্মহত্যা করব কি? ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ব? না থাক্, দু’দিন যাক্। নয়নভরে একটু দেখে নিই, সিরাজ কী রকম মেতে ওঠে। আমাকে নিয়েও সে মেতেছিল কিছুদিন। কিন্তু আমি তো তার নেশা ধরাতে পারলাম না।

আমি নাচতে জানি না, গাইতে জানি না। ভালোভাবে কথা বলতেও জানি না আমি। আমি যা জানি, সেটা অপরাধ। আমি শুধু ভালোবাসতে জানি। ভালোবাসলে যে ভালোবাসার পাত্রকে উচ্ছৃঙ্খল হতে দেওয়া যায় না। আমার কাছে সিরাজ প্রতি পদে বাধা পেত। যদিও জোর করে বাধা দিইনি কখনও, কিন্তু আভাসে-ইঙ্গিতে, কথায়-বার্তায় তাকে সংযত রাখতাম।

সে হাঁপিয়ে উঠেছিল। তাই মনে মনে মুক্তি চেয়েছিল। মুক্তির আশাতেই তার হীরাঝিল তৈরির পরিকল্পনা। তখন অতটা বুঝিনি। বোকার মতো তাই আমিই নামকরণ করে দিয়েছিলাম। সিরাজ মনে মনে কত হেসেছিল।

.

ছাদ থেকে ধীরে ধীরে নেমে আসি। আজকাল ওঠা-নামা করতে কষ্ট হয়। শরীরটা বড় ভারী। নিজের ঘরে গিয়ে শয্যায় শুয়ে পড়ি। একজন বাঁদি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে সামনে দাঁড়ায়। তাকে চলে যেতে ইঙ্গিত করি। কথা বলতে ইচ্ছে হয় না। এইভাবে চুপচাপ শুয়ে থাকতে থাকতে যদি মৃত্যু আসে কত আরামের হয়। ঘুমোতে গিয়ে সে ঘুম আর ভাঙে না, এমন তো কত হয়। আমার বেলাতেও কি তা হতে পারে না? হলে হীরাঝিলকে আর দেখতে হত না। গঙ্গার জলের স্রোত আর দেখতাম না। দূরে ওই পাড়ে মুর্শিদাবাদের রাস্তার ধুলো আর কখনও দেখতে হত না। বিষ, সব বিষ; জলে স্থলে বাতাসে সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে এই বিষ। আমার গর্ভেও বিষ

ভারী পায়ের শব্দে চেয়ে দেখি, সিরাজ আমার দরজায় দাঁড়িয়ে। বিস্মিত হই। এমন দিনে সে আমার ঘরে। মোহনলালের বোনকে ছেড়ে আকারবিহীন এক স্ত্রীলোকের ঘরে বাংলার নবাবের আদুরে নাতি!

উঠে বসতে কষ্ট হয়। তবু যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব উঠে বসি। মুখে হাসি আনি। হাসতে হবে যে—আমার যে আনন্দ সিরাজের মুখ দেখে। সে-মুখ পার্থিব, চরম পাওয়ার আনন্দে ভরপুর।

সে বলে, ‘সে এসেছে লুৎফা। বেহেস্তের পরি। দেখবে?’

‘নিশ্চয়ই দেখব, নবাবজাদা। কিন্তু এখন তো পারব না। পরে দেখলে অপরাধ নেবেন কি?’

‘তাকেই এখানে নিয়ে আসি। কী বলো?’

রাগে আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে ওঠে। হতে পারে সিরাজ বাংলার ভবিষ্যৎ নবাব, কিন্তু মানুষের মধ্যে যে সম্মানবোধ রয়েছে, সে-সম্মানও কি দেবার প্রয়োজন বোধ করে না এরা? ক্ষমতা কি মানুষকে এত উন্মত্ত করে?

ধীরে ধীরে বলি, তোকে কেন আনবেন, নবাবজাদা? আর কেনই-বা সে আসবে? তার সম্মান নেই? এতে সে হয়তো অপমানিত বোধ করবে।’

‘কিছু মনে করবে না। আমি নিয়ে আসি।’ সিরাজ চলে যেতে চায় আর কি।

‘না না না, আনবেন না। আমিই যাচ্ছি।’

তুমি তো উঠতেই পারছ না। কী করে যাবে?

‘আমি বেশ উঠতে পারছি, আপনি চলুন।

সিরাজের পেছনে গিয়ে হাজির বই বড় ঘরটার মধ্যে। গা এলিয়ে অর্ধশায়িত অবস্থায় বসেছিল বেহেস্তের পরি। পরিই বটে! এত কাছ থেকে দেখেও আমার চোখের পলকে পড়ে না।

আমাকে দেখে হেসে ওঠে সে-খিলখিল করে হাসে। সে-হাসি আর থামতে চায় না। সিরাজ বলে, ‘অতো হাসছ, কেন ফৈজী?’

ফৈজী আমাকে দেখিয়ে আবার হেসে গড়াগড়ি যায়। আমি অসহায়ভাবে সিরাজের দিকে চেয়ে থাকি।

‘ওকে দেখে অত হাসির কী হল তোমার?’ সিরাজ প্রশ্ন করে।

‘কে এ?’ এতক্ষণে ফৈজী কথা বলে।

‘লুৎফা।’ সিরাজ আমতা আমতা করে।

‘লুৎফা? বাঃ, নামখানা তো সুন্দর! এ দশা কে করল? আপনিই বুঝি?’ সে আবার হেসে ওঠে।

আমার কান গরম হয়ে ওঠে। ইচ্ছে হয়, ছুটে বার হয়ে যাই, কিন্তু পারি না। শরীর আরও ভারী হয়ে যায়। বুঝলাম, বেশিক্ষণ আর দাঁড়াতে পারব না।

সিরাজকে বলি, ‘আমাকে যেতে আদেশ করুন, নবাবজাদা।’

‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, তুমি যাও।’

ফৈজী বলে, ‘সে কী! এত তাড়াতাড়ি? আলাপই যে হল না। আর আপনি তো আমার কথার জবাব দিলেন না।’

‘আমারই সন্তান রয়েছে লুৎফার গর্ভে।’ সিরাজ স্পষ্ট বলে।

‘ভালো। তা, এখন আর কেন রেখেছেন? কাজ তো মিটেছে, এবার বিদায় করুন। নাকি, ওই সন্তান বাংলার নবাব হবে?’

আমি চিৎকার করে উঠি, ‘নবাবজাদা, আমাকে একটু ধরবেন?

সিরাজ ছুটে এসে আমাকে ধরে বলে, ‘কী হয়েছে?’

আমি বোধহয় পড়ে যাব। দয়া করে এই ঘরের বাইরে দিয়ে আসবেন?’

সিরাজ আমাকে বাইরে নিয়ে আসে। ফৈজীর কথা শুনে সে যে আমাকে থাকতে বলেনি, এজন্যে মৃত্যুর আগে কয়দিন তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ থাকব।

এখানেই বসি, নবাবজাদা, আপনি যান।’

‘সে কী! এখানে বসার জায়গা কই?’

‘মেঝেতেই বসব। আপনি যান নবাবজাদা। উনি অপেক্ষা করছেন।’

‘তা কী করে হয়? কেউ এসে আগে তোমাকে নিয়ে যাক্।’

‘না-না, এতেই হবে। আপনি কিছু ভাববেন না।’

সিরাজ আমাকে বসিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

‘আপনি যান, নবাবজাদা।’

সে চলে যায়।

.

ফৈজীর ওজন নাকি মাত্র বাইশ শের!

একজন বাঁদি এসে খবর দিল, ফৈজীকে ওজন করা হয়েছে। সিরাজ খুব হাসাহাসি করেছে শুনলাম। হাসাহাসি সে সব সময়ই করছে। হীরাঝিলের গাছে, ছাদে, ঘরে তাদের হাসির তরঙ্গ সামান্য সময়ের জন্যেও থামছে না। ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকলে এসব শুনতে পেতাম না। কিন্তু তা সম্ভব নয়। ওদের দাপাদাপি আর লুকোচুরি খেলার জন্য আমি নির্জনতা খুঁজে পাই না। নির্জনতা আমার খুবই প্রয়োজন। অন্তত ছাদটুকু নিরিবিলি হওয়া দরকার। অথচ নিশ্চিন্ত মনে সেখানে যাবারও উপায় নেই। কখন ওরা দু’জনে ছুটতে ছুটতে এসে পড়ে তার স্থিরতা নেই। বাঁদিদের সরিয়ে দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু ওদের তো তাড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং ওরাই এখন আমাকে তাড়িয়ে দিতে পারে।

এরই মধ্যে একসময় ছুটে গিয়ে ওপর থেকে লাফিয়ে পড়া যায়। সে চেষ্টাও করেছি, কিন্তু পারিনি। ভয় করে। মনকে শক্ত করার জন্যে সময়ের প্রয়োজন। সেই জন্যেই চাই নিৰ্জনতা।

কাল একবার ছুটে গিয়েছিলাম ছাদে। ভেবেছিলাম, কোনোরকম চিন্তা না করেই ঝাঁপিয়ে পড়ব। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে গর্ভের ‘শত্রুটা নড়েচড়ে উঠল। এক অনাস্বাদিত মায়ায় আচ্ছন্ন হল আমার মন। মরা হল না।

.

শরাব ছাড়ার পর সিরাজ তার বন্ধুবান্ধবদের বিদায় দিলেও মোহনলাল নিয়মিতই আসতেন। ফৈজী আসার পর থেকে তাঁকেও আসতে দেখি না আর! ব্যাপারটা একটু বিসদৃশ বলে মনে হল। তাঁর বোন সিরাজের বেগম। এখন তাঁর আরও বেশি আসা উচিত। কিন্তু এভাবে হীরাঝিলের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক কেন যে তিনি উঠিয়ে দিয়েছেন বুঝলাম না। এখন তো বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হওয়াই উচিত।

কৌতূহল মেটাবার কোনো পথ নেই। সিরাজকে প্রশ্ন করলে সব জানা যায়, কিন্তু তাকে প্রশ্ন করার মতো মনের অবস্থা আমার নেই। তার দেখা পাওয়াও ভার।

মোহনলালকে বীর যোদ্ধা বলে জানি। বেগমসায়েবার মুখে তাঁর নাম প্রথম শুনি। বেগমসায়েবা সাধারণত কারও সুখ্যাতি করেন না। রাজা জানকীরামের মতো লোক সম্বন্ধে নবাব সুখ্যাতি করলেও, তাঁর মন্তব্য কোনোদিন শুনিনি। সেই বেগমসায়েবা যখন মোহনলালের সুখ্যাতি করলেন, তখন থেকেই তাঁর প্রতি একটা শ্রদ্ধাভাব গড়ে উঠেছিল আমার মনে।

হীরাঝিলে সিরাজের বন্ধুবান্ধব অনেকেই আসত। তারা পাল্লা দিয়ে শরাব খেত, ফুর্তি করত। ঝিল থেকে বিদায় নেবার সময় তাদের পা টলত। কিন্তু মোহনলালকে কোনোদিন শরাব স্পর্শ করতে দেখেনি কেউ। তিনি যখন এখান থেকে চলে যেতেন, তখন স্বাভাবিক মানুষের মতো দৃঢ় পদক্ষেপে যেতেন। এ সমস্ত দেখেশুনে তাঁর সম্বন্ধে আরও উঁচু ধারণা হয়েছিল আমার মনে।

কিন্তু যখন শুনলাম, নিজের বোনকে নবাবের বেগম করবার জন্যে তিনি দিল্লি থেকে নিয়ে আসছেন, তখন আমার এতদিনের শ্রদ্ধায় ফাটল ধরল। শুধু ফাটল নয়, একটা ঘৃণাভাব জন্মাল তাঁর প্রতি। বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে সামান্য একজন নর্তকীকে তিনি হারেমে পাঠালেন। হোক না কেন সে সুন্দরী, তবু একদিন কত লোকের মন জুগিয়েছে, দেহ বিক্রি করেছে।

মোহনলাল এখন আমার শত্রু। তবু জানতে হবে, তিনি কেন হীরাঝিলে আসেন না। ব্যাপারটা অদ্ভুত।

.

একেই বলে বোধহয় নারী-মন। আত্মহত্যার জন্যে পাগল হয়েও সামান্য একটা কৌতূহল মনের মধ্যে দানা বেঁধে উঠল ধীরে ধীরে। যতক্ষণ এ কৌতূহলের নিরসন না হয়, ততক্ষণ যেন শান্তি নেই।

অথচ কোনো প্রয়োজনও নেই। মরে গেলে তো সব কিছুর বাইরে চলে যাব। সেই ভেবে নিজেকে কত বোঝালাম, কিন্তু সব বৃথা।

কৌতূহলের নিবৃত্তি হল শেষে। সিরাজের মুখেই শুনলাম। তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে অবশ্য একটু কৌশল অবলম্বন করতে হল। স্নানের সময় তার গোছলখানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানেই দেখা হল।

‘তুমি এখানে লুৎফা?’

‘আমার যেন মনে হল আপনি কাউকে ডাকছেন। কেউ এল না দেখে আমি নিজেই এলাম। কোনো দরকার আছে কি, নবাবজাদা?’

‘না, আমি তো কাউকে ডাকিনি।’

‘ও, তবে আমারই ভুল।’ নিরাশ হয়ে চলে আসতে চাইলাম।

‘শোনো।’ পেছন থেকে সিরাজ ডাকে।

ফিরে এসে তার সামনে দাঁড়াই।

‘তুমি কী বলতে এসেছিলে, বলো?’

‘আমি? কিছু না তো। ওই যে বললাম…’

‘ও কথা থাক। কেন এসেছিলে?’

চুপ করে থাকি। ধরা পড়ে গিয়েছি। এতদিনের পরিচয়ের পরও সিরাজকে আমার জানা ।উচিত ছিল। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের দিনই তো ধরা পড়ি। তবে কেন বোকার মতো একই কৌশল অবলম্বন করলাম?

ভয় নেই, লুৎফা। বলো, কী জানতে চাও?’

‘নবাবজাদা, অপরাধ নেবেন না তো?’

‘না।’

‘ফৈজী বেগম আসার পর থেকে মোহনলালকে হীরাঝিলে দেখি না। তিনি তো আপনার একজন হিতৈষী?’

আমার কথায় সিরাজ বিচলিত হয়। সে দু’বার পায়চারি করে। একবার হীরাঝিলের সীমান্তে গঙ্গায় দৃষ্টিনিক্ষেপ করে। তারপর আমার খুব কাছে এসে আমার মুখের দিকে তাকায়

তার হাবভাবে সঙ্কুচিত হই। বলি, ‘না বুঝে অন্যায় করে ফেলেছি, নবাবজাদা। মাফ করুন। ‘অন্যায় করোনি। আমি ভাবছি, এমন একটা কিছু তুমি লক্ষ করেছ যা ধারালো বুদ্ধি ছাড়া নজরে পড়ার কথা নয়। তুমি বুদ্ধিমতী জানি, কিন্তু সে-বুদ্ধি এতটা তীক্ষ্ণ জানতাম না। মোহনলালের জন্যে আমারও বড় অশান্তি।’

‘কেন নবাবজাদা?’

‘ফৈজী এখানে আছে বলে সে আর আসে না।’

বিস্মিত হয়ে বলি, ‘কিন্তু তিনিই তো তার বোনকে আনিয়েছেন!

‘হ্যাঁ, সে আনিয়েছে, তবে চাপে পড়ে। তার আনার আদৌ ইচ্ছে ছিল না।’

‘সেকী নবাবজাদা! নিজের বোন বেগম হল, এ তো তাঁর সৌভাগ্য। তবে কি তিনি ফৈজীর ধর্মান্তরের জন্যে বিরক্ত?’

‘ফৈজী বহুদিন আগেই মুসলমান হয়েছে।’

‘তবে?’

‘মোহনলাল বলেছিল, ফৈজী তার বোন হলেও সে নর্তকী। নর্তকীকে আমি বেগম হিসেবে নিই, এ ইচ্ছে তার ছিল না। কিন্তু তুমি তো জানো লুৎফা, লোকের মুখে তার রূপের খ্যাতি শুনে আমি পাগল হয়েছিলাম। তাই মোহনলালের আপত্তি সত্ত্বেও তাকে নিয়ে আসি। এখন তো দেখছ আমি ঠকিনি। ভারতের কোনো হারেমে ফৈজীর মতো সুন্দরী নেই।’

আমি অভিভূত হই। মোহনলালের প্রতি কিছুদিনের জন্যেও বিরক্ত হয়েছিলাম ভেবে নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয়। এত বড় হিতৈষীকে সিরাজ চিনল না।

তবু মরার আগে একটা সান্ত্বনা পেয়ে গেলাম। বুঝলাম, সিরাজের কাছ থেকে শত আঘাত পেলেও তার বিপদের দিনে মোহনলাল দূরে সরে থাকতে পারবে না। বুক দিয়ে রক্ষা করবে সে সিরাজকে। তাকে ভালোবাসে বলেই মোহনলাল আজ এত দূরে।

সিরাজ হেসে বলে, ‘বুঝলে লুৎফা, মোহনলালের রাগ রয়েছে। সে এখানে আর আসে না। না আসুক, ফৈজী থাকলে পৃথিবীতে আর কাউকে আমি চাই না।

তাই বটে। বাংলার ভাবী উত্তরাধিকারীর উপযুক্ত কথাই বটে। দুঃখ হয়, কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারি না। প্রতিবাদ করার মতো মনের জোরও নেই, সে অধিকারও নেই।

‘নবাবজাদা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?’

‘কী কথা?’

মোহনলাল যে রাগ করে হীরাঝিলে আসেন না, একথা কি ফৈজীকে বলেছেন?’

‘না, সময় পাইনি। তার সঙ্গে এসব কথা বলার অবসর কই? ‘

‘না বলে থাকলে আর বলবেন না।’

‘কেন বলো তো?’

‘এমন কিছু নয়। তবে একটা কথা বলে যাই নবাবজাদা, মোহনলাল আপনার সুখের দিনে দূরে সরে গিয়েছেন বলেই বিপদের দিনে সবচেয়ে আগে এগিয়ে আসবেন।’ কথাটা বলেই তাড়াতাড়ি চলে যাই। ছুটতে আর পারি না। তবু যতটা সম্ভব ছুটি—সিরাজের দৃষ্টির বাইরে।

.

নবাব আলিবর্দির মৃত্যু হল। আকস্মিক মৃত্যু নয়, তবু শোকের ছায়া নামল সারা মুর্শিদাবাদ জুড়ে। নিদারুণ গ্রীষ্মের মধ্যেও নবাব মহল থেকে খোশবাগ পর্যন্ত অগণিত জনতা রাস্তার দু’পাশে ভিড় করল। দু’পাশের বাড়ি থেকে নবাবের শবাধারের ওপর পুষ্পবৃষ্টি হল। ফুলে-ফুলে ছেয়ে গেল রাস্তার রাঙা মাটি।

ছায়াশীতল খোশবাগে যখন নবাবের মৃতদেহ এসে পৌঁছল তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। ঘন বৃক্ষরাজির অসংখ্য শাখা-প্রশাখার আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়েছে।

বেগম মহলের সবাই এসে জড়ো হল একটা আড়াল দেওয়া জায়গায়। সেখান থেকে বৃদ্ধ নবাবের মৃতদেহকে সমাধিস্থ হতে দেখা যাবে

বেগমসায়েবাকে এই প্রথম কাঁদতে দেখলাম। নবাবের মৃত্যুর সময় তিনি কাঁদলেন না। তাঁকে নিয়ে এতটা পথ আসার সময়ও তাঁর চোখে জল দেখিনি। কিন্তু নবাবের দেহ যখন মাটির নীচে অন্তর্হিত হল, তখন তিনি আর সামলাতে পারলেন না নিজেকে। যেন পাহাড় ভেঙে পড়ল। জীবনে তাঁর বোধহয় এই প্রথম আর শেষ ক্রন্দন। আজীবন স্বামীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জীবনপথে এতদূর এগিয়ে এসে আজ তিনি সঙ্গীহারা হয়ে পড়লেন। পাটনার এক সামান্য কর্মচারীর জীবনের সঙ্গে যে-জীবন একদিন জড়িত হয়েছিল, সুখে-সৌভাগ্যে নানান উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে সে-জীবন আজ বিচ্ছিন্ন হল। নবাবকে দুঃসময়ে পরামর্শ দিয়ে, শোকে সান্ত্বনা দিয়ে, সুসময়ে পবিত্র প্রেমের মধ্যে দিয়ে, শেষ দিন পর্যন্ত ঢেকে রেখেছিলেন বেগমসায়েবা। আজ আর কাকে ঢেকে রাখবেন তিনি? তাঁর কাজ ফুরিয়েছে। সব শূন্য হয়ে গেল, মনের ভেতরও খাঁ-খাঁ করছে, তাই তিনি কাঁদছেন।

তাঁর দিকে চেয়ে আমিও কেঁদে ফেলি।

হঠাৎ সিরাজের উচ্চ কণ্ঠস্বরে সবাই সচকিত হয়ে ওঠে। এ সময়ে সে এত উত্তেজিত কেন?

সমাধি ঢেকে দেবার জন্যে একটা স্বর্ণখচিত কৃষ্ণবস্ত্র আনা হয়েছিল। সেই বস্ত্র সমাধির কাছে বয়ে নিয়ে যাবার সময় সিরাজ ছুটে এসে বাধা দেয়।

সিরাজ বলে, ‘এই কালো কাপড় কখনই দেওয়া হবে না দাদুর কবরে। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব আলিবর্দির সমাধির ওপর কৃষ্ণবস্ত্র? কে এনেছে এটা? কে?

সবাই চুপ করে থাকে। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবের প্রশ্নের জবাব দেবার সাহস কারও নেই। হামিদার কাছে শুনলাম, জগৎশেঠ এনেছে ওটা। জগৎশেঠের মুখের দিকে চেয়ে স্পষ্টই বুঝলাম, সে প্রমাদ গুণছে।

বেগমসায়েবা সোজা এগিয়ে যান সিরাজের সামনে। বলেন, ‘এখন আর গোলমাল করিসনে, সিরাজ। ওঁকে ঘুমোতে দে। ঘুম ভেঙে যাবে তোর চিৎকারে।’

তাঁকে জড়িয়ে ধরে সিরাজ শিশুর মতো কেঁদে বলে, ‘না দাদি, তুমি অমন কোরো না। ও কাপড় আমি কিছুতেই দিতে দেব না। দাদুর কবরের ওপর থাকবে লাল কাপড়—টকটকে লাল।’

‘ও কাপড় এখন কোথায় পাবি?’

‘পাওয়া যাবে না? নিশ্চয় পাওয়া যাবে। কেউ আছে এখানে, এনে দিতে পারো লাল কাপড়? টকটকে লাল।’

.

অনেকক্ষণ চুপচাপ। সমস্ত ভিড় স্তব্ধ। তারপর একটা আলোড়ন দেখা যায় একদিকে। একজন ধীরে ধীরে বার হয়ে আসে সামনে। সিরাজকে কুর্নিশ করে সে বলে, ‘আমি দিতে পারি, নবাব। টকটকে লাল।’

সিরাজ তার হাত চেপে ধরে, তুমি পারো? সত্যি বলছ?’

‘হ্যাঁ, নবাব।’

‘এখনই নিয়ে এসো, প্রচুর ছওয়াব মিলবে।’

‘ছওয়াব আমি চাই না, নবাব। এ আমার সৌভাগ্য। আমার সৌভাগ্যই আমার ছওয়াব।’

জগৎশেঠ এতক্ষণে এগিয়ে আসেন। তাঁর সম্মানে ঘা লেগেছে। ভ্রুকুটি করে বলেন, ‘তুমি অত বড় কাপড় কেন তৈরি করেছিলে? লাল রঙই বা করেছিলে কেন?’

‘নবাব আলিবর্দির জন্যই পাঁচ বছর ধরে বুনেছি আমি। কিন্তু তাঁর সমাধির ওপর দেব বলে তো বুনিনি। বড় আশা ছিল, চেহেল-সেতুনে তাঁর মসনদের ওপর বিছিয়ে দেব। বর্গির হাতে যখন পরিবার সমেত মারা পড়ছিলাম, তখন তিনি গিয়ে বাঁচান আমাদের। সেটা কি ভুলতে পারি? নবাবের সে-চেহারা চিরদিন আমার চোখে ভাসবে।’

‘হুঁ।’ জগৎশেঠ চিন্তান্বিত হলেন যেন।

লোকটা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে, ‘আজ সবচেয়ে বড় মসনদের ওপর পেতে দেব সে-কাপড়।’

লোকটা ছুটে চলে যায়। তার ভয়, তার আগেই অন্য কেউ লালবস্ত্র নিয়ে এসে দেয়।

লাল কাপড়ের সমস্যা মিটলেও সকলের সেটা মনঃপুত হল না। বিশেষ করে জগৎশেঠের। লোকটা যে কাপড় আনতে ছুটল, তা যত বড় শ্রদ্ধার সামগ্রীই হোক না কেন, তাতে সোনারূপার কাজ থাকবে না। নবাবের কবরের ওপর যেন সাক্ষাৎ উপহাসের মতো দেখাবে।

রাজবল্লভকে জগৎশেঠ সে-কথা বলল। সিরাজ শুনে ফেলে বলে, ‘ওই কাপড়েই নবাব বোধহয় সবচেয়ে শান্তিতে থাকবেন, শেঠজি। সাধারণ কাপড় হলে কি হবে, মনের দরদ দিয়ে বোনা হয়েছে যে! তাছাড়া কারুকার্য ওতে পরেও করে নেওয়া যেতে পারে।’

বেগমসায়েবা সিরাজের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকেন।

একজন মৌলানা বলেন, ‘কিন্তু এই কৃষ্ণবস্ত্রটির কী হবে?’

‘ওটা খোশবাগে ওই ঘরে থাকবে। নবাব-বংশ এখনও নির্বংশ হয়নি, পরে কাজে লাগবে।’ মৌলানা সিরাজের কথা শুনে থতমত খেয়ে চুপ করে যান।

একটা কাঠের পেটিকা মাথায় করে লোকটা হাজির হয়। জগৎশেঠ তাচ্ছিল্যভরে সেদিকে এগিয়ে যান। তাঁর সঙ্গে যান রাজবল্লভ ও আরও অনেকে। যেন বিরাট এক তামাশা দেখবে সবাই।

কিন্তু ঢাকনা খুলতে যে জিনিস চোখে পড়ে তা দেখে কারও কথা সরে না। গভীর বিস্ময়ে নির্বাক দৃষ্টিতে সবাই চেয়ে থাকে সেদিকে। মসলিন আর রেশমের অপূর্ব শিল্প—সর্বাঙ্গে সোনার কাজ। কৃষ্ণবস্ত্রটির জন্যে মনে মনে জগৎশেঠের একটা গর্ব ছিল। কিন্তু পেটিকা থেকে রক্তবস্ত্রটি বার করে যখন মেলে ধরা হল, তখন পাশের ম্রিয়মাণ কালো কাপড়ের চেয়েও জগৎশেঠের মুখ আরও অন্ধকার হয়ে গেল। সকলের অজ্ঞাতে কালো কাপড়ের একাংশ দুমুঠো দিয়ে চেপে ধরলেন, যেন সবটা মুঠোর মধ্যে নিতে পারলেই তিনি বেঁচে যেতেন। তারপর আস্তে আস্তে একটা আমগাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালেন।

বেগমসায়েবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সেই সঙ্গে উপস্থিত সকলের।

সিরাজ লোকটির দু’হাত চেপে ধরে বলে, ‘কীভাবে তৈরি করলে এই জিনিস? তোমাকে দেখে তো ধনী বলে মনে হয় না। ‘

‘আমি সত্যিই গরিব, নবাব। আধপেটা খেয়ে জমিজমা বিক্রি করে আমি আর আমার ছেলে এটা বুনেছি।’

তুমি ছওয়াব চাও না, কিন্তু তোমার একটা ব্যবস্থা না করলে যে আমার শান্তি হবে না। নবাব হয়ে তোমার কাছে অনুরোধ করছি, চেহেল-সেতুনে একদিন যেও।’

লোকটা আভূমি নত হয়ে বলে, ‘আপনার আদেশ মনে থাকবে, নবাব। প্রয়োজন হলে আপনার কাছে নিশ্চয়ই যাব।’

মন আমার সব সময় ভীতিবিহ্বল। কেন এমন হয় জানি না। সর্বদাই মনে হয়, একটা নিষ্ঠুর হাত এগিয়ে আসছে মুর্শিদাবাদের টুটি চেপে ধরতে। ঘুমের ঘোরেও কেঁপে উঠি—চমকে ঘুম ভেঙে যায়।

বর্গিদের অমানুষিক অত্যাচারের মধ্যেও এমন ভয় কখনও পাইনি। তখন উন্মুক্ত আকাশের দিকে চেয়ে থাকলেও মন ভরত। যদি দৃষ্টিনিক্ষেপ করতাম গঙ্গার অগাধ জলরাশির দিকে, তাহলে শান্তি পেতাম। মনে রং ধরত বাগিচার সৌন্দর্য দেখে। ফলে-নত গাছের অবস্থা দেখে রক্তিম হয়ে উঠতাম।

এখন সবই রয়েছে, অথচ মনে সাড়া জাগে না। প্রথমে ভাবতাম হয়তো সিরাজের ব্যবহারে এমন হয়েছে। কিন্তু তাতে বাগিচার সৌন্দর্য উপলব্ধি না করলেও উদ্দাম আকাশের দিকে চেয়ে মুহূর্তের জন্যেও অন্যমনস্ক হব না কেন? গঙ্গার জল যেন টগবগ করে ফুটছে। তাতে সামান্য শীতলতার কথাও ভাবতে পারি না এখন।

আত্মহত্যা করা হয়ে ওঠেনি। দু’মাসের শিশুকন্যার মুখের দিকে চেয়ে সবকিছু ভুলতে চেষ্টা করি। হুবহু সিরাজের মুখের আদল। দেখতে দেখতে মাঝে মাঝে তন্ময় যায় যাই। সিরাজকে যেন নতুন করে পেয়েছি।

তবু মাঝে মাঝে সে-মুখের দিকে চেয়ে ভয় পাই—ভীষণ ভয় পাই। শিশু যদি কথা বলে ওঠে, কে তুমি? তোমাকে তো চাই না। ফৈজীকে ডাকো।

তাড়াতাড়ি বুকের মধ্যে চেপে ধরি তাকে। নিজেকে বোঝাই, এ তো সিরাজ নয়, এ পুরুষ ও নয়, পুরুষ না হলে কি নিষ্ঠুর হওয়া যায়? কই, আমি তো সিরাজকে ভুলতে পারলাম না। কার জন্যে আমি আত্মহত্যা করিনি? নিজের সন্তানের জন্যে, কখনওই নয়। সন্তানের মধ্যে সিরাজকে পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষাতেই জীবনের ওপর ছেদ টানতে পারিনি। পৃথিবীতে কেউ একথা কি বিশ্বাস করবে?

শিশু কাঁদলে ভাবি, সিরাজই কাঁদছে। নির্দয় পৃথিবীর কাছে অবুঝ নবাব আঘাতের পর আঘাত পেয়ে শিশুর মতো চোখের জল ফেলছে যেন।

সত্যিই কি সিরাজ কাঁদছে না? ফৈজীর সঙ্গে হই-হুল্লোড়ের মধ্যেও তার মুখখানা অমন শুকনো বলে মনে হয় কেন দূর থেকে? তার হাসিতে আগেকার স্বচ্ছতা দেখি না। ভয় হয়, বাংলার কোটি-কোটি মানুষের বিপদের ছায়া বাংলার নবাবের মুখে ফুটে উঠেছে।

বাইরের খবর রাখি না। শত চেষ্টাতেও হীরাঝিলের বাইরের জগতের কোনো সংবাদই সঠিকভাবে আমার কানে এসে পৌঁছয় না। যা শুনি হয়তো তা অতিশয়োক্তি কিংবা বিকৃত, অথবা একেবারে মিথ্যে।

তবু সোফিয়ার ক্রূর হাসির মধ্যে সেদিন বড় বেশি অর্থ খুঁজে পেয়েছিলাম। বহুদিন সে মুর্শিদাবাদে ছিল না। মহম্মদের সঙ্গে ঢাকা গিয়েছিল। তার মহম্মদের আজকাল পদোন্নতি হয়েছে। আলিবর্দির বেগমের সেই করুণাশ্রিত লোকটির সঙ্গে নিজেকে তুলনা করলাম। মহম্মদের পদোন্নতি হলেও সে লুৎফার পায়ের কাছেও কোনোদিন পৌঁছতে পারবে না। হতে পারি আমি নবাবের পরিত্যক্তা এক নারী—তবু আমি বেগম। হীরাঝিলের বেগম মহলে আমার বাস, যেখানে নবাবের প্রিয়তমা ফৈজী অবধি দ্বিধাবোধ করে প্রবেশ করতে।

বেগম ফৈজীর মহল হীরাঝিলের একপাশে। সেটা বেগমদের বসবাসের জন্যে তৈরি হয়নি। আমার প্রতি সিরাজের কেন যে এই অনুকম্পা, শত ভেবেও বুঝতে পারিনি। শুধু বুঝতে পারি, তার মন থেকে আমি একেবারে সরে গেলেও সম্মানের আসনে আগের মতোই প্রতিষ্ঠিত। সে-সম্মান কেড়ে নিতে সম্ভবত তার বিবেকে বাধে। তার প্রথম সন্তান যে আমারই গর্ভের। তবে এটুকুই জানি, সে মেয়ে না হয়ে যদি ছেলেও হতো, তবু বাংলার মসনদে কখনও বসতে পারত না। বাংলার মসনদ ফৈজীর গর্ভের এক অনাবিষ্কৃত অঙ্কুরের জন্য স্থির হয়ে রয়েছে।

সোফিয়াকে হাসতে দেখার পর থেকে আমি চঞ্চল হয়ে উঠি। তার কথাবার্তা আদব-কায়দার মধ্যে কোনো অভদ্রতা খুঁজে না পেলেও একটা বিদ্রুপ প্রকাশ পাচ্ছিল, যা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তাকে কিছু বলতে পারিনি সেজন্যে।

একসময় যখন অসহ্য হয়ে উঠেছিল তার উপস্থিতি, বলেছিলাম, ‘ভবিষ্যতের কথা ভেবেই কি সোফিয়া বিবির এত আনন্দ?’

‘ঠিক বলেছেন, বেগমসায়েবা। দিন মানুষের সমান যায় না, কত ওঠানামা হয়।’

‘তুমি তো ওঠার দলে?’

‘হ্যাঁ, নবাবের অনুগ্রহে।’

‘আর নবাব নিজে কোন্ দলে?’ সোফিয়ার চোখের দিকে তীব্রভাবে তাকাই কিছু খুঁজে পাবার আশায়। আমার দৃষ্টির সম্মুখে সে ম্লান হয়ে যায়। কোনো কথা বলে না।

‘জবাব দিলে না যে?’

নবাবের কথা এর মধ্যে কেন, বেগমসায়েবা?’ তার গলা কেঁপে ওঠে।

‘নবাবও মানুষ, সোফিয়া।’

‘ঠিকই বলেছেন, বেগমসায়েবা। নবাবও মানুষ। আমি এখন যাই।

সোফিয়া চলে যাবার উপক্রম করতে আমি চিৎকার করে উঠি, ‘দাঁড়াও।’

সে থমকে দাঁড়ায়। তার ধৃষ্টতা দেখে আমার শরীর রাগে রি-রি করে।

কী বলতে চাইছ তুমি, সোফিয়া?’

‘কিছুই না তো, বেগমসায়েবা।’ সে অবাক হবার ভান করে। কথা বার করা অসম্ভব।

‘বেগমের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় কুর্নিশ করে যেতে হয়, সে-কথা ভুলে গিয়েছ?’

‘অপরাধ মাপ করবেন, বেগমসায়েরা।’ বিকৃত মুখে কুর্নিশ করে সে বিদায় নেয়। এরপর থেকেই মনের মধ্যে সব সময় আনচান করে। সঙ্গী সাথী কেউ নেই, যাকে দিয়ে বাইরের খবর আনাতে পারি। ঘরের মধ্যে বসে ছটফট করা ছাড়া উপায় নেই।

.

নবাব-পরিবারের যত কিছু অনাচার, ব্যভিচার আর কুৎসিত দৃশ্য সর কি শুধু আমারই চোখে পড়ে? এ পোড়া চোখকে উপড়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়। আমার মতো নারীকে হিন্দুরা কি একটা বলে যেন, ঠিক জানি না। তবে সেটা প্রশংসার নয়। ঘসেটির ঘটনা দেখেছিলাম, আমিনা বিবির পদস্খলনও নিজের চোখে দেখেছি। কিন্তু এবার যা চোখে পড়ল তা আগের সবকিছুকে ছাড়িয়ে নারীর ঘোরতর কলঙ্কের এক ইতিহাস রচনা করল। নিজের চোখকেও প্রথমটা বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু একদিন নয়, দু’দিন নয়, তিনদিন একই রকম ভুল দেখা কখনও সম্ভব নয়।

নিজে নারী বলে আমারই মরে যেতে ইচ্ছে হল। পুরুষের একান্ত নির্ভরশীল প্রেমের এমন জঘন্যতম প্রতিদান কেউ কখনও দিতে পারে? কুৎসিততম পুরুষের প্রেমেও যদি খাদ না থাকে, তাতে শ্রেষ্ঠা সুন্দরী নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করে বলেই এতদিন জানতাম, কিন্তু সে ধারণা ধূলিসাৎ হল। নিদারুণভাবে তা ভেঙে গেল, যখন দেখলাম, শয়তানীর পাল্লায় পড়লে শ্রেষ্ঠ পুরুষের প্রেমও কেমন বৃথা হয়। পুরুষের নিষ্ঠুরতা এর চাইতে শতগুণে শ্রেয়। তাতে লুকোচুরি নেই, পেছন থেকে ছুরিমারা নেই। সে-নিষ্ঠুরতা সকলের চোখের সামনে সোজাভাবে লক্ষ্যস্থলের দিকে এগিয়ে যায়।

সিরাজের মুখখানার কথা ভেবে অসহনীয় ব্যথায় বুকের ভেতর টনটন করে। তার সন্তানকে বুকের মধ্যে নিয়ে কাঁদি-শুধু কাঁদি। কেঁদেও যেন শান্তি পাইনে। শান্তি পেতে হলে এখনই সিরাজকে গিয়ে সব বলতে হয়। কিন্তু তার মনের মধ্যে তিল-তিল করে গড়ে ওঠা সৌধকে আমি ভেঙে চুরমার করে দিতে পারব না—কিছুতেই নয়।

অথচ এতে আমার একটা হিংস্র আনন্দ হওয়াই উচিত ছিল। সিরাজও একসময় আমার সম্বন্ধে সেরকম একটা কিছু ভেবেছিল। এখনও নিশ্চয়ই তার সেই ধারণাটাই অটুট রয়েছে। অনেক বেগম ঘাঁটাঘাঁটি করে সে মেয়েদের মন সম্বন্ধে একটা ছক কেটে নিয়েছে। আমাকে সে সেই ছকের মধ্যেই ফেলে।

বেচারা সিরাজ! এই তিনদিনের ঘটনা এখন তাকে বলতে গেলে সে বিশ্বাসই করবে না। উল্টে আমাকে হয়তো হত্যা করার আদেশ দিয়ে বসবে।

কিন্তু, তবু বলাই যে উচিত। সারাদিনের পরিশ্রমের পর যখন সে ফৈজীকে নিয়ে মত্ত হবে, তখন আমি কি তা সইতে পারব? ফৈজীর হাসির মুখোশ আর আহ্লাদে গলে-যাওয়া-ভাব দেখে কি স্থির থাকতে পারব আমি? স্থির না থেকে উপায়ও নেই, সিরাজ দারুণ আঘাত পাবে। দীর্ঘদেহ, আগুনের মতো গায়ের রং সেই পুরুষের। নবাবের একান্ত বিশ্বাসী আর প্রিয়পাত্র। হবে নাই বা কেন? সৈয়দ মহম্মদ খাঁ তো পর নয়। সিরাজের ভগ্নীপতি সে।

যত কিছু সর্বনাশ সবই দেখছি এই আত্মীয় আর বন্ধুর রূপের মধ্যে দিয়েই আসে। সৈয়দ মহম্মদ খাঁকে দেখে কয়েক বছর আগে আর-এক বীরপুরুষের কথা মনে পড়ে। হোসেন কুলিখার জন্যে এখনও দীর্ঘশ্বাস ফেলি। তাঁকে কখনও অপরাধী বলে মনে হয় না। ঘসেটি যেদিন আমাকে পদাঘাত করেছিল, সেদিন তিনি যেভাবে আমাকে রক্ষা করেছিলেন, তা আজও আমার মনের মধ্যে গেঁথে রয়েছে। তাঁর সেই সহানুভূতিপূর্ণ সম্বোধন এখনও কানে বাজে। দুর্ভাগ্য যে, তিনি আমিনা বেগম আর ঘসেটির লালায় বোনা জালের মধ্যে এসে আটকে পড়েছিলেন। গবাক্ষের ধারে তাঁর চোখ-মুখের অসহায় আর বিরক্তির ভাব আর কেউ না দেখুক, আমি দেখেছিলাম। নারীদেহের সংস্পর্শে এসে সাময়িকভাবে তিনি উত্তেজিত হয়েছিলেন সত্য, কিন্তু সেটা তাঁর ধীরবুদ্ধি আর বিবেচনাপ্রসূত কার্য নয়। জালের মধ্যে পড়ে অন্য কিছু করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

ফৈজীর সঙ্গে সৈয়দ মহম্মদ খাঁকে দেখে আমার হোসেন কুলিখার কথাই মনে হয়েছিল। সেও হয়তো এমন পরিণতির কথা কখনও কল্পনা করেনি। কিন্তু তার দীর্ঘ ঋজু গৌরবর্ণ দেহখানা ফৈজীর নেশা ধরিয়েছে। শিকারকে বশে আনার জন্যে কথার ভঙ্গি আর কটাক্ষের ফাঁদ পেতে সে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছে। এই তিনদিনে তারই পরিণতি দেখলাম।

পুরুষ মানুষ ইচ্ছে করেই ফাঁদে পা দেয় অনেক সময়। অন্তত সিরাজের স্বভাব দেখে আমার সেই ধারণাই হয়েছে। কারণ ব্যভিচারের ফলাফল তাকে ভোগ করতে হয় না বড় একটা। ফাঁদে পা দিতে হলে বিপদের ঝুঁকি পুরুষকে আরও উৎসাহিত করে। সাদামাটা একঘেয়েমির মধ্যে সে ঠিক তৃপ্তি পায় না।

ফৈজী নারী, কিন্তু তার মন নিশ্চয়ই পুরুষোচিত। নইলে সে কি কল্পনা করতে পারছে না, নিজের কতবড় সর্বনাশ সে ডেকে আনছে?

প্রথমে হয়তো সে এতটা ভেবে দেখেনি। কিন্তু সৈয়দ মহম্মদ যখন তাকে পাগল করল, তখন সব ভেবেও আর পিছিয়ে আসতে পারছে না। ফৈজী মহামূর্খ। সিরাজকে সে চিনতে পারেনি।

.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *