অমর প্রেম – ৫

পাঁচ

ইউসুফ এ বছর ক্লাস টেনে পড়ছে। ফার্স্ট বয় হিসাবে ও তার ভালো স্বভাব চরিত্রের কারণে ক্লাস সেভেন থেকে সে মনিটার। একই কারণে শিক্ষকরা তাকে স্নেহ করেন। ইকবাল নামে এক বড়লোকের ছেলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতি বছর ফার্স্ট হওয়ার জন্য খুব চেষ্টা করে; কিন্তু সেকেন্ড ছাড়া কোনো বছর ফার্স্ট হতে পারে নি। তাই মনে মনে ইউসুফকে হিংসা করে। তার কোনো ভাই নেই। শুধু চার বছরের ছোট এক বোন। মা-বাবার আদরের ছেলে। তাই বেশ একটু অহঙ্কারী। ক্লাসের মুষ্টিমেয় কয়েকটা ছেলে তার বন্ধু। তাদের পিছনে টাকা পয়সা খরচ করে। তাই তারা ইকবালকে যেমন পছন্দ করে, তেমনি ইউসুফকে অপছন্দ করে। তারা চায় ইকবাল মনিটার হোক, কিন্তু ক্লাসের অন্যান্য সব ছেলেরা চায় ইউসুফ মনিটার হোক। নতুন ক্লাসে নতুন বছরে ক্লাস টিচার যখন মনিটার নির্বাচন করার কথা বলেন তখন ঐ মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া সবাই ইউসুফকে নির্বাচন করে। এ বছরও সে মনিটার হয়েছে।

ইকবালের বন্ধুদের মধ্যে রায়হান নামে এক ষণ্ডামতো ছেলে আছে। তার বাবার অবস্থাও ভালো। সে লেখাপড়ায় তেমন ভালো না। কিন্তু প্রতি বছর স্কুলে খেলাধূলায় মেডেল পায়।

একদিন টিফিনের সময় স্কুল মাঠে রায়হান বন্ধুদের সাথে গল্প করছিল। ইউসুফকে তাদের সামনে দিয়ে যেতে দেখে ইকবালকে উদ্দেশ্য করে বলল, তুই তো কোনো বছর ইউসুফকে টপকাতে পারলি না। সামনে টেস্ট পরীক্ষা। তারপর ফেয়ারওয়েল হয়ে গেলে কারো সাথে দেখা সাক্ষাৎ তেমন আর হবে না। তুই যদি চাস, ওকে কিছু শিক্ষা দিয়ে দিই।

তার কথা শুনে ইকবাল ছাড়া সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, আমরাও তাই চাই। কত অহঙ্কার দেখলি না, সামনে দিয়ে গেল, অথচ একটা কথাও বলল না?

রায়হান বলল, কিরে ইকবাল, তুই কিছু বললি না যে?

ইকবাল বলল, আগে বল কি শিক্ষা দিতে চাস?

তাও বুঝলি না? আরে যাকে বলে উত্তম মধ্যম।

কথাটা মন্দ বলিস নি; কিন্তু কিভাবে কী করবি বলবি তো।

যা করব, কাল সবাই দেখতে পাবি।

এমন সময় ঘন্টা বেজে উঠতে ইকবাল বলল, চল ক্লাসে যাই।

পরের দিন রায়হান স্কুলে এসে ক্লাসে ঢোকার আগে বন্ধু জামালের কানে কানে কিছু বলল। তারপর ক্লাসে ঢুকে ইউসুফের পাশে বসল।  

টিফিনের সময় দু’চারজন ছেলে ছাড়া যখন সবাই বেরিয়ে গেল তখন রায়হান নিজের হোমটাস্কের ইংরেজি খাতাটা ইউসুফের ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল। তারপর ক্লাস থেকে বেরিয়ে এল।

টিফিনের পর প্রথম ক্লাসটা ইংরেজির। হেড স্যার জালাল এই ক্লাসটা নেন। তিনি খুব কড়া টিচার। কেউ পড়া করে না এলে অথবা হোমটাস্ক করে নিয়ে না এলে যা তা বলে ভর্ৎসনা করে বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে রাখেন।

আজ ক্লাসে এসে এক একজনকে ডেকে হোমটাস্কের খাতা দেখতে লাগলেন।

ইউসুফ খাতা দেখিয়ে এসে বসার পর রায়হান দাঁড়িয়ে বলল, স্যার, ব্যাগে খাতা ছিল পাচ্ছি না।

জলিল স্যার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, মিথ্যে বলার পরিণাম নিশ্চয় জান?

জানি স্যার।

তা হলে এরকম কথা বলছ কেন?

খাতা বাসায় ফেলে আসতে পার?

স্যার, টিফিনের আগেও ব্যাগে খাতা দেখেছি। জলিল স্যার সব ছাত্রদের উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের কেউ নিয়ে। থাকলে দিয়ে দাও, নচেৎ প্রত্যেকের ব্যাগ চেক করা হবে। যদি কারো ব্যাগে পাওয়া যায়, তা হলে কঠিন শাস্তি পেতে হবে।

সব ছাত্ররা এক সঙ্গে বলে উঠল, আমরা কেউ নিইনি স্যার। আপনি ব্যাগ চেক করাতে পারেন।

জলিল স্যার রায়হানকে বললেন, সবার ব্যাগ চেক কর।

রায়হান প্রথমে তার বাম পাশের দুটো ছেলের ব্যাগ চেক করল। তারপর ডানপাশে ইউসুফের ব্যাগ চেক করে খাতাটা পেয়ে বলল, এই তো স্যার পেয়েছি।

ভালো ছাত্র হিসাবে অন্যান্য টিচারদের মতো জলিল স্যারও ইউসুফকে সুনজরে দেখেন। খুব স্নেহও করেন। সে যে এমন কাজ করবে বিশ্বাস করতে পারলেন না। যেমন অবাক হলেন, তেমনি দুঃখও পেলেন। কয়েক সেকেন্ড ইউসুফের দিকে তাকিয়ে থেকে কাছে আসতে বললেন।

তার ব্যাগ থেকে রায়হানের খাতা বের হতে ইউসুফও খুব অবাক হয়েছে। ভাবল, আমার ব্যাগে ওর খাতা এল কি করে? তার দৃঢ় ধারণা হল, কিছুদিন আগে রায়হান ইংরেজির নোট চেয়েছিল, সে দেয় নি। তাই সবার কাছে অপমান করার জন্য খাতাটা আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছে। স্যার ডাকতে তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।  

জলিল স্যার বললেন, ছি ছি ইউসুফ, তুমি ক্লাসের ফার্স্ট বয় ও মনিটার। এমন কাজ করবে ভাবতেই পারছি না।

ইউসুফ বলল, আমি ওর খাতা নিই নি স্যার। ভেবে পাচ্ছি না খাতাটা আমার ব্যাগে এল কি করে?

পরের বেঞ্চের শেষ মাথায় জামাল বসে ছিল। দাঁড়িয়ে বলল, স্যার, টিফিনের সময় আমি ইউসুফকে রায়হানের ব্যাগ খুলতে দেখেছি। তবে খাতা নিতে দেখি নি।

জলিল স্যার রাগে লাল হয়ে ইউসুফকে বললেন, এরপরও কী তুমি অস্বীকার করবে?

ইউসুফ দৃঢ়কণ্ঠে বলল, জামাল মিথ্যে বলছে। আমি রায়হানের ব্যাগ ছুঁয়েও দেখি নি।  

কোনো ছাত্র গুরুতর অন্যায় করলে জলিল স্যার তার দু’হাতে পাঁচটা করে দশটা চাবুক মারেন। তারপর বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে দেন। ইউসুফের কথা শুনে বললেন, জামাল মিথ্যে বলছে, আর তুমি সত্য বলছ? হাত পাত।

রাগে ও অপমানে ইউসুফের চোখে পানি এসে গেল। মাথা নিচু করে হাত বাড়াল।

জামাল স্যার তার দু’হাতে দশটা চাবুক মেরে বললেন, যাও, বেঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে থাক।

ইউসুফ যে একাজ করতে পারে না, তা ক্লাসের সব ছেলেরাও জানে। তাদেরও ধারণা হল, এটা রায়হানেরই কাজ। ক্লাস শেষে স্যার বেরিয়ে যাওয়ার পর অনেকে ইউসুফকে বলল, আমরা ঘটনাটা বিশ্বাস করি না। নিশ্চয় অন্য কেউ করেছে। আমরা হেড স্যারের কাছে তদন্ত করার দাবি জানাব।

ইউসুফ চোখ মুছে বলল, সেটা তোদের ইচ্ছা, আমি এর মধ্যে নেই। আল্লাহ ন্যায় বিচারক। তাঁর অগোচরে কিছুই নেই। বিনাদোষে কাউকে শাস্তি দেওয়ালে তিনি তার প্রতিফল দেখাবেন। আমি তার উপর ভরসা করে সবর করব।  

তার কথা শুনে একজন সাথিদের বলল, তা হলে এটা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামান ঠিক হবে না।

ছুটির পর বাসায় ফেরার পথে রায়হান ইকবালকে বলল, কীরে, খুশী হয়েছিস তো?

ইকবাল বলল, তুই যে এভাবে ইউসুফকে জব্দ করবি ভাবতেই পারি নি। তারপর জামালকে বলল, তুই ও যা দেখালি না?

জামাল বলল, আমি কি আর দেখালাম, দেখাল রায়হান। আমি শুধু ওর শেখান কথা বলেছি।

.

জুলায়খাদের বাসার কাছে রায়হানদের বাসা। ইউসুফ যে প্রতিদিন জুলায়খার সঙ্গে খেলাধূলা করে ও তাকে তাদের গাড়ি স্কুল থেকে নিয়ে যায়, তা রায়হান জানে। একদিন ইউসুফ যখন জুলায়খাদের বাসা থেকে ফিরছিল তখন রায়হান তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, জুলায়খা আশ-পাশের কোনো ছেলেমেয়ের সঙ্গে মেশে না, খেলাধূলাও করে না। তার বাবা কাউকেই গেটের ভিতর ঢুকতে দেয় না, তুই চান্স পেলি কী করে? ইউসুফ বলেছিল, সে কথা বলা যাবে না। সেই থেকে তার উপর রায়হানের রাগ ছিল। তারপর একদিন ইংরেজির নোট চেয়ে না পেয়ে আরো রেগে গিয়ে ভেবেছিল, যেমন করে হোক ওকে সবার সামনে অপমান করবে। আজ তাকে ক্লাসে অপমান করতে পেরে খুব খুশী হল।

কয়েকদিন পর কি কারণে যেন দু’পিরিয়ড আগে ছুটি হয়ে গেল। ইউসুফ ক্লাস থেকে বেরিয়ে চিন্তা করল, জুলায়খাদের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করবে? না হেঁটে যাবে? দেড় ঘন্টা অপেক্ষা করার চেয়ে বাসায় গিয়ে নাস্তা খেয়ে তাদের বাসায় যাওয়াই ভালো ভেবে হাঁটতে শুরু করল। কলোনী ছেড়ে বড় রাস্তায় এসে দেখল, ইকবাল, রায়হান ও জামাল দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছে। ইউসুফ তাদেরকে না দেখার ভান করে নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে লাগল।

তাকে দেখে রায়হান বলল, দেখ দেখ, ইউসুফ চোরের মতো কেমন মাথা নিচু করে যাচ্ছে।

জামাল বলল, চোরেরা কি আর মাথা উঁচু করে যেতে পারে?

সেদিনের ঘটনায় ইউসুফ ওদের দুজনের উপর খুব রেগে ছিল। এখন তাদের কথা শুনে আরো রেগে গিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, সত্য কোনোদিন গোপন থাকে না। অন্যায়ভাবে কাউকে অপমান করলে আল্লাহ তাকে একদিন না একদিন অপমান করাবেন।

রায়হান বলল, যা-যা বেশি ফ্যাচ ফ্যাচ করবি না। সাধে কি আর লোকে বলে “চোরের মায়ের গলা বড়।”

ইউসুফ বলল, রায়হান, আমি সিওর, তুই আমার ব্যাগে তোর খাতাটা ঢুকিয়ে দিয়েছিলি। আমাকে চোর বলতে তোর লজ্জা করছে না? আর জামাল, তুইও কেমন জলজ্যান্ত মিথ্যে বললি। জানিস না মিথ্যা বলা হারাম?

জামাল বলল, ওরে আমার সাধু রে, যা ভাগ বলছি। নচেৎ চোরকে কি করতে হয় বুঝিয়ে দেব।

কী করবি শুনি? শুনে রাখ, “অন্যায় কোনোদিন গোপন থাকে না। একদিন একদিন প্রকাশ পাবেই। একটা কথা তোরা বোধ হয় জানিস না, “ইট ছুঁড়লে পাটকেল খেতে হয়।”

তবে রে তোর পাটকেল বের করছি বলে রায়হান এগিয়ে এসে ইউসুফকে মারতে লাগল।

তাই দেখে জামাল রায়হানের সঙ্গে যোগ দিল।

দু’জনের সঙ্গে ইউসুফ পেরে উঠল না। একসময় তারা তাকে মাটিতে ফেলে মারতে লাগল।

ইকবাল এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। বলল, এবার ছেড়ে দে।

রায়হান বলল, আরো কিছু দিয়ে দিই, যেন ভবিষ্যতে আমাদের সাথে না লাগে।  

জুলায়খা মার্কেটিং করে ইউসুফকে নিতে আসছিল। দু’জন ছেলে ইউসুফকে মাটিতে ফেলে মারছে দেখে আঁৎকে উঠে ড্রাইভারকে ব্যাপারটা জানিয়ে গাড়ি থামাতে বলল। থামার পর গাড়ি থেকে নেমে বলল, আপনারা ওকে মারছেন কেন?

ততক্ষণে ড্রাইভার নেমে এসে রায়হান ও জামালের জামার কলার ধরে তুলে। দাঁড় করিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বলল, তোমরা ওকে মারছ কেন?

রায়হান জুলায়খা ও ড্রাইভারকে চিনতে পেরে ভড়কে গেল। ভাবল, কথাটা

যদি জুলায়খা তার আব্বাকে বলে দেয়, তা হলে …?

ড্রাইভার আবার কর্কশ কণ্ঠে বলল, চুপ করে আছ কেন? কেন মারছিলে কল।

ভয়ে রায়হান কিছু বলতে পারল না। জামালের দিকে তাকাল।

জামাল বলল, ছেড়ে দিন বলছি।

ড্রাইভার তাদেরকে ছেড়ে দিতে জামাল রায়হানকে দেখিয়ে বলল, কয়েকদিন আগে স্কুলে ওর খাতা চুরি করেছিল। সেজন্য স্যারের হাতে খুব মার খেয়েছে। আজ আমরা খাতা কেন চুরি করেছিল জিজ্ঞেস করতে মারতে এসেছিল। তাই আমরা উত্তম মধ্যম দিয়ে দিলাম। তারপর ইকবাল ও রায়হানের দিকে তাকিয়ে চল যাই বলে হাঁটতে শুরু করল।  

মার খেয়ে ইউসুফের তখন বেহাল অবস্থা। তাদের মিথ্যে কথার প্রতিবাদ করারও ক্ষমতা নেই।

তার অবস্থা দেখে জুলায়খার চোখে পানি এসে গেল। তাদের কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারল না। সামলে নিয়ে চোখ মুছে ড্রাইভারকে বলল, ওকে নিয়ে

মেডিকেলে চলুন।

মেডিকেলে এসে জুলায়খা বাসায় ফোন করল।

হামিদা বেগম ফোন ধরে বললেন, কে বলছেন?

আম্মু, আমি জুলায়খা। আব্বকে দাও।

সে তো বাসায় নেই। একটু আগে বেরিয়ে গেল। তাকে চাচ্ছিস কেন?

আমি মেডিকেল থেকে ফোন করেছি। আব্ব বাসায় ফিরলেই এখানে আসতে বলবে।

কেন কী হয়েছে? তুই মেডিকেলে কেন?

ইউসুফ ভাই আহত হয়েছিল, তাকে নিয়ে এসেছি। তুমি আব্বুকে তাড়াতাড়ি আসতে বলবে বলে জুলায়খা লাইন কেটে দিল।

.

জাফর সাহেব যেখানেই থাকেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে জামাতের সঙ্গে পড়েন। ধনী ব্যবসায়ী হলেও প্রচুর ধর্মীয় বই পুস্তক পড়েন এবং ধর্মের সবকিছু নিষ্ঠার সঙ্গে মেনেও চলেন। নিজেদের মহল্লার মসজিদ কমিটির মেম্বার। মসজিদের সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য মোটা টাকা দান করেন। কিন্তু মহল্লার লোকজনদের সঙ্গে তেমন একটা মেলামেশা করেন না। তবু সবাই তাকে চেনে এবং শ্ৰেণীমতো ভক্তি শ্রদ্ধা করে। মসজিদের ইমাম সাহেবের সঙ্গে বেশ ভালো। সম্পর্ক।

ইদানিং বেশ কিছুদিন থেকে তিনি মসজিদে ফরয নামায জামাতের সঙ্গে পড়েন। কিন্তু সালাম ফিরাবার পর মোনাজাত না করে চলে যান। সে কথা ইমাম সাহেব জেনে কারণটা জিজ্ঞেস করবেন ভাবলেও সুযোগ পাচ্ছিলেন না। আজ বেলা তিনটের দিকে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারী সাহেবের সঙ্গে দেখা করে ফিরছিলেন। পথে জাফর সাহেবের সঙ্গে দেখা। সালাম বিনিময় করে ইমাম সাহেব বললেন, একটা কথা জিজ্ঞেস করব, কিছু মনে করবেন না। শুনলাম, আপনি নাকী প্রত্যেক ওয়াক্তে ফরয নামাযের শেষ হওয়ার সাথে সাথে মোনাজাত না করে বাসায় চলে যান?

জি, ঠিকই শুনেছেন।

বাসায় নিশ্চয় বাকি নামায পড়েন।

তা তো অবশ্যই।

সেটা অবশ্য ভালো; কিন্তু মোনাজাত না করে চলে যান কেন?

সে কথা পরে বলছি। তার আগে বলুন, মুনাজাতের সঙ্গে নামাযের সম্পর্ক কি?

কোনো সম্পর্ক নেই।

মোনাজাত না করলে কী নামায অসম্পূর্ণ থেকে যায়?

না।

তা হলে করেন কেন?

এই কথায় ইমাম সাহেব থতমত খেয়ে গেলেন। আমতা আমতা করে বললেন, না মানে, মোনাজাত করা তো ভালো।  

দেখুন, ভালোমন্দের কথা নয়। ফরয নামায জামাতে পড়ার পর মোনাজাত করার কোনো দলিল আছে কী? রাসুলুল্লাহ (দঃ), সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন ও সালফে সালেহীনদের যুগ পর্যন্ত মুনাজাতের প্রচলন ছিল কী? আমি যতটুকু পড়াশোনা করেছি, কোথাও এর প্রমাণ পাই নি। মোনাজাত হল নফল ইবাদত। আর নফল ইবাদত জামাতে হয় না। একা একা যতক্ষণ ইচ্ছা করা যায় এবং আগের যুগের আল্লাহর প্রিয় বান্দারা তাই করেছেন। তা ছাড়া উচ্চস্বরে অথবা মাইকে মোনাজাত করলে মুক্তাদিদের মধ্যে যারা মসবুক, তাদের অবশিষ্ট নামাযে ব্যাঘাত ঘটে। তাই এটা করা নিশ্চয় উচিত নয়। আর একটা কথা না বলে পারছি না, প্রায় প্রত্যেক মসজিদে নামাযের পর প্রায় সময়ই মিলাদ পড়ান হয়। প্রতিদিন ফজরের ফরজ নামাযের পর সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত ইমাম সাহেব মুক্তাদীদের নিয়ে জোরে জোরে পড়েন, এতেও নামাযীদের নামাযে ব্যাঘাত ঘটে। রাসুলুল্লাহ (দঃ) এর যুগ থেকে সালফে সালেহীনদের যুগ প্রায় ছয়শ বছর। এই ছয়শ বছরের মধ্যে মিলাদ পড়ান, কুলখানি, কুরআন খানি, জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যু বার্ষিকীর কোনো প্রচলন ছিল না। আলেম হিসাবে আপনি একথা নিশ্চয় জানেন, সওয়াবের আশায় ধর্মের নামে নতুন কিছু সংযোজন ও প্রচলন করা বেদায়াত। আর একথাও নিশ্চয় জানেন, রাসুলুল্লাহ (দঃ) বলিয়াছেন, “সব রকমের বেদায়াত গুমরাহী এবং গুমরাহী জাহান্নামের পথ।”

ইমাম সাহেব রেগে উঠে বললেন, ফরয নামাযের পর মোনাজাত করা ও মিলাদ পড়াকে আপনি বেদায়াত মনে করেন?

জাফর সাহেব বললেন, আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? আমি কি মনে করি না করি সেটা বড় কথা নয়। যা জেনেছি তাই বললাম। ঐ সব জিনিস বেদায়াত কিনা আমার চেয়ে আপনারাই ভালো জানেন। নামাযের পর মোনাজাত, ফজরের নামাযের পর সম্মিলিতস্বরে ইমাম ও মুক্তাদীরা সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পড়া, মিলাদ পড়া, দলবদ্ধভাবে দরুদ ও সালাম পাঠ করা ও উচ্চস্বরে জিকীর করা, সবিনাখতম, কুলখানি, কুরআন খানি, জন্মবার্ষিকী, মৃত্যু বার্ষিকী, খতমে বুখারী, খতমে খাজেগীন ও খতমে দোয়া ইউনূস প্রভৃতি বর্তমানে আমাদের যুগে বহুল প্রচলিত এবং এতে বড় বড় ওলামায়ে কেরাম অংশগ্রহণ করেন। সাধারণ মুসলমানরা সওয়াবের কাজ, আবার অনেকে এগুলো শরীয়তের হুকুম মনে করে খুব ধুম-ধাম করে করার ব্যবস্থা করে। কিন্তু আমার কথা হল, রাসুলুল্লাহ (দঃ) এর যুগ থেকে সালফে সালেহীনদের যুগ পর্যন্ত এগুলোর যে প্রচলন ছিল, তার কোনো দলিল বা প্রমাণ নেই। তা হলে এগুলো কী শরীয়তে নতুন সংযোজন বা প্রচলন নয়?

ইমাম সাহেব রাগের সঙ্গে বললেন, আপনি এতকিছু জানেন, আর একথা জানেন না, যুগ যুগ ধরে পীর, অলি, আওলিয়া ও বড় বড় ওলামায়ে কেরামগণ এই সমস্ত করে এসেছেন এবং এখনও করছেন। যদি এইসব বেদায়াত হত, তা হলে তারা কেন করছেন?

দেখুন, এসব ব্যাপার নিয়ে তর্ক করা মোটেই উচিত নয়। আপনি মুফতী ইবরাহীম খান রচিত “শরীয়ত ও প্রচলিত কুসংস্কার” বইটি পড়ন। তা হলে এসব ব্যাপারে অনেক কিছু জানতে পারবেন। উনি এখনো বেঁচে আছেন। প্রয়োজনে ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। এবার আসি বলে জাফর সাহেব সালাম বিনিময় করে বাসায় ফিরে এলেন।

স্বামীকে দেখে হামিদা বেগম বললেন, কোথায় গিয়েছিলে? ফিরতে এত দেরি করলে কেন?

জাফর সাহেব জানেন, জুলায়খা গাড়ি নিয়ে মার্কেটে গেছে, ফেরার সময় ইউসুফকে নিয়ে ফিরবে। তাই আতঙ্কিতস্বরে বললেন, কেন? কী হয়েছে? ইমাম সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেল। জুলায়খা কী ইউসুফকে নিয়ে এখনও ফেরে নি?  

তুমি বেরিয়ে যাওয়ার পরপর জুলায়খা ফোন করেছিল। বলল “ইউসুফকে নিয়ে মেডিকেলে আছে। আব্ব যেন এক্ষুনি চলে আসে।”

ইউসুফকে নিয়ে মেডিকেলে কেন গেছে, জিজ্ঞেস কর নি।

করেছি। বলল, “ইউসুফ আহত হয়েছিল, তাকে নিয়ে এসেছি। তারপর লাইন কেটে দিল।

এমন সময় ফোন বেজে উঠতে হামিদা বেগম বললেন, জুলায়খা বোধ হয় আবার ফোন করেছে।

জাফর সাহেব ফোন ধরে বললেন, কে জুলায়খা?

হ্যাঁ আব্বু। শোন, তোমাকে আর আসতে হবে না। আমি ইউসুফ ভাইকে তাদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে ফিরছি।

ইউসুফের কি হয়েছিল? তাকে মেডিকেলে নিয়ে গেলি কেন?

এত কথা ফোনে বলা যাবে না, বাসায় গিয়ে বলব।

ঠিক আছে, রাখি তা হলে?

রাখ বলে জুলায়খা লাইন কেটে দিল।

.

মেডিকেলে ইউসুফকে ফার্স্ট এড করে ছেড়ে দেওয়ার পর তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পথে গাড়িতে জুলায়খা ঘটনাটা ইউসুফের কাছে শুনল। তারপর বাসায় ফিরে মা-বাবা ও দাদির কাছে সে সব বলে বলল, ছেলে দুটোর একজনকে আমি চিনি। নাম রায়হান। আমাদের বাসার উত্তর দিকের বাড়িওয়ালার ছেলে।

জাফর সাহেব কপাল কুঁচকে বললেন, তাই নাকী? পাশের বাড়িওয়ালা তো আব্দুল জাব্বার সাহেব। ওঁকে আমি চিনি। খুব ধার্মিক লোক। প্রতিদিন মসজিদে দেখা হয়। গত বছর হজ্ব করে এসেছেন। তার ছেলে এরকম করবে ভাবতেই পারছি না।

হামিদা বেগম বললেন, তুমি ওঁর সঙ্গে দেখা করে এর একটা বিহিত কর। শুধু শুধু চোর অপবাদ দিয়ে মাস্টারের হাতে মার খাইয়েছে। আজ আবার মেরে আহত করেছে। পরে আরো কিছু করতে পারে।

জাফর সাহেব বললেন, তুমি ঠিক কথা বলেছ। আমি আজই আব্দুল জাব্বারের সঙ্গে দেখা করব।

মাগরিবের নামাযের পর জাফর সাহেব দেখা করার জন্য আব্দুল জাব্বারের সাহেবের বাসার গেটে গিয়ে দারোয়ানকে পরিচয় দিয়ে বললেন, আমি আব্দুল জাব্বার সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।  

দারোয়ান বলল, একটু অপেক্ষা করুন আসছি। তারপর ভিতরে গিয়ে সাহেবকে খবরটা দিল।

আব্দুল জাব্বার সাহেব শুনে নিজে এসে সালাম ও কুশল বিনিময় করে বললেন, আসুন ভিতরে আসুন। তারপর ড্রইংরুমে নিয়ে এসে বসতে বলে ভিতরে চলে গেলেন।

একটু পরে ফিরে এসে বসে বললেন, হঠাৎ আজ কী মনে করে এলেন?

জাফর সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, রায়হান কী আপনার ছেলে?

হ্যাঁ, কেন বলুন তো?

জাফর সাহেব স্কুলের ও আজকের ঘটনা বলে বললেন, ইউসুফ প্রায় দু’বছর হল আমাদের বাসায় যাতায়াত করছে। আমার যতদূর বিশ্বাস, সে কখনও এরকম কাজ করতে পারে না। আর আপনার ছেলেও শুধু শুধু তাকে চোর। বানিয়ে শাস্তি দিতে পারে না। নিশ্চয় এর মধ্যে কোনো কারণ আছে, আমি সেই কারণটা জানতে চাই। আপনার ছেলেকে ডাকুন। আপনি তাকে কিছু বলবেন না। যা বলার আমিই বলব। আর একটা কথা, ও যদি সত্যি দোষীও হয়, তবু আমি চলে যাওয়ার পর ওকে রাগারাগি করবেন না। বরং সৎ উপদেশ দিয়ে বোঝাবেন।

এমন সময় কাজের বুয়া চা-নাস্তা নিয়ে এলে আব্দুল জাব্বার সাহেব তাকে। বললেন, রায়হানকে একটু পরে এখানে আসতে বল।

রায়হান পড়ছিল। কাজের বুয়ার মুখে আব্বা ডাকছে শুনে ড্রইংরুমে এসে জাফর সাহেবকে দেখে ভড়কে গেল। ভাবল, নিশ্চয় জুলায়খা সবকিছু বলেছে। তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে সালাম দিয়ে বলল, আমাকে ডেকেছেন আব্বা?

আব্দুল জাব্বার সাহেব বলার আগে জাফর সাহেব সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, বস বাবা বস। কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করব বলে আমি ডাকতে বলেছি।

রায়হান আরো ভয় পেয়ে আব্বার দিকে তাকাল।

আব্দুল জাব্বার সাহেব ছেলেকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকাতে দেখে বুঝতে পারলেন, নিশ্চয় সে দোষী। বললেন, উনি যা-যা জিজ্ঞেস করবেন, সব সত্য বলবে।

রায়হান যে ভয় পেয়েছে, তা জাফর সাহেবও বুঝতে পারলেন। খুব মোলায়েম স্বরে বললেন, তুমি নিশ্চয় নামায পড়।

রায়হান জুম্মার নামায নিয়মিত পড়লেও ওয়াক্তিয়া নামায ঠিক মতো পড়ে না। আব্বার তাগিদে দু’একদিন পড়ে। তারপর আবার যেইকে সেই। তাই হ্যাঁ-না কোনোটাই বলতে না পেরে মাথা নিচু করে রইল।

জাফর সাহেব ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললেন, জুম্মার দিন মসজিদে তোমাকে দেখলেও অন্যান্য দিন মাঝে মধ্যে দেখি। যাই হোক, বলতো বাবা, ইউসুফ কি সত্যিই তোমার খাতা চুরি করেছিল? না অন্য কেউ তার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছিল? আর আজই বা তাকে মেরে আধমরা করলে কেন?

রায়হান বন্ধু-বান্ধবদের কাছে মিথ্যে বললেও মা-বাবার কাছে কোনোদিন বলে নি। তাই সত্য মিথ্যা কোনোটাই বলতে না পেরে চুপ করে রইল।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে জাফর সাহেব আবার বললেন, বল বাবা, চুপ করে থেক না। তুমি নিশ্চয় জান, মিথ্যা বলা হারাম। আর এটাও বোধ হয় জান, ইউসুফ প্রায় দু’বছর হতে চলল, আমাদের বাসায় যাতায়াত করছে। সে যদি সত্যিই তোমার খাতা চুরি করে থাকে, তা হলে তাকে আমাদের বাসায় আসতে নিষেধ করে দেব। আর হেড স্যারের সঙ্গে দেখা করে বলব, স্কুল থেকে তাকে যেন বের করে দেন।

রায়হানের তখন ইউসুফের কথাগুলো মনে পড়ল, “সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না। একদিন না একদিন প্রকাশ পাবেই।” চিন্তা করল, জুলায়খার বাবা যা বললেন, তা যদি করেন, তা হলে সত্য প্রকাশ হয়ে পড়বে। তখন জুলায়খার বাবা। আব্বাকে জানালে, মেরে তুলোধূনা করে ফেলবে। হেড স্যারও ছেড়ে কথা বলবেন না। এমন কি তাকেই হয়তো স্কুল থেকে বের করে দেবেন।

ছেলেকে চুপ করে থাকতে দেখে আব্দুল জাব্বার সাহেব যা বোঝার বুঝে গেলেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, তুমি কিছু বলছ না কেন? যা সত্য বলে ফেল।

ভয়ে রায়হানের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। আব ঘীটে কোনো রকমে বলল, ইউসুফ আমার খাতা চুরি করে নি।

আব্দুল জাব্বার সাহেব গর্জে উঠে বললেন, তা হলে শুধু শুধু তাকে চোর সাবস্ত করে হেড স্যারের কাছে মার খাওয়ালে কেন? আজ আবার তাকে মেরেছ কেন?

জাফর সাহেব তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাই সাহেব বোধ হয় ভুলেই গেছেন, একটু আগে ওকে রাগারাগী করতে নিষেধ করেছিলাম। থাক, যা বলার আমিই বলছি। তারপর উঠে গিয়ে রায়হানের একটা হাত ধরে এনে পাশে বসিয়ে বললেন, তুমি সত্য বলায় আমি অত্যন্ত খুশী হয়েছি। দোয়া করি, “আল্লাহ যেন সব সময় তোমাকে সত্য বলার তওফিক দেন।” আমি মনে করি, তুমি যে কাজ করেছ, সেজন্য এখন অনুতপ্ত। কি কারণে তুমি ইউসুফের সঙ্গে এমন অন্যায় ব্যবহার করলে তা আর জানতে চাইলাম না। তুমি যে অন্যায় করেছ, তা বুঝতে পেরেছ, এটাই বড় কথা। আশা করব, ভবিষ্যতে আর কখনও এরকম অন্যায় কাজ করবে না। তোমার এখন উচিত, হেড স্যারের কাছে সত্য প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া এবং ইউসুফের কাছেও ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। ঠিক আছে এবার তুমি যাও।

রায়হান ছলছল চোখে বলল, চাচা, আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। হেড ক্ষমা চেয়ে নেব। ও খুব ভালো ছেলে। আপনি হেড স্যারকে কিছু বলবেন না।

জাফর সাহেব মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বললেন, তুমি ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইবে বলছ, এতে আমি আরো খুশী হয়েছি। হেড স্যারকে বলার প্রশ্নই আসে না। এবার যাও পড়তে বস।

রায়হান চোখ মুছতে মুছতে মাথা নিচু করে চলে গেল।

রায়হান চলে যাওয়ার পর জাফর সাহেব বললেন, ভাই সাহেব, একটা কথা মনে রাখবেন, ছেলেমেয়েকে শাসন করার আগে তারা যে অন্যায় করেছে, সেটা বুদ্ধি খরচ করে তাদের বিবেকে পৌঁছে দিতে হবে। তা যদি পারেন, তা হলে শাসনের চেয়ে বেশি কাজ হবে। তাতে কাজ না হলে অবশ্য শাসন করতে হবে। তবে একটা বিষয় সব সময় খেয়াল রাখতে হবে, বেশি শাসনে অনেক ছেলেমেয়ে নষ্ট হয়ে যায়। আমার ধারণায় স্নেহ ও ভালো ব্যবহারের শাসনই ছেলেমেয়েদের অন্যায় পথ থেকে ফেরাবার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে শাসন দরকার। উঠতি বয়সের সময়, মানে চৌদ্দ পনের বছর থেকে বিশ বাইশ বছর পর্যন্ত তাদের প্রতি যথেষ্ট খেয়াল রাখা এবং তাদেরকে সঙ্গ দেওয়া গার্জেনদের উচিত। এ সময় তারা যৌবন প্রাপ্ত হয় এবং অজানা এক নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে থাকে। স্কুল কলেজে বিভিন্ন ধরনের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশে। ভালোদের সঙ্গে মিশলে কোনো চিন্তার কারণ থাকে না। কিন্তু এমন কিছু এঁচোড়েপাকা ছেলেমেয়ে থাকে, তাদের সঙ্গে মিশলে ক্রমশঃ অন্যায়ের পথে পা বাড়াতে থাকে। এইজন্যেই বললাম, এই পিরিয়র্ডটার দিকে মা-বাবার দৃষ্টি রাখা ও তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো ব্যবহার করা উচিত। যাই হোক, অনেক কিছু বললাম, মনে কিছু নেবেন না।

আব্দুল জাব্বার সাহেব বললেন, কিছু মনে করার কথা কী বলছেন? বরং আপনার মূল্যবান কথা শুনে খুব আনন্দিত হলাম। বেশিরভাগ মা-বাবা এই সময় ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে ভেবে তাদের দিকে লক্ষ্য রাখে না। তাই তারা অন্যায় পথে পা বাড়াবার সুযোগ পাচ্ছে।

হ্যাঁ, আমি সেটাই বোঝাতে চেয়েছি। এবার আসি বলে জাফর সাহেব বিদায়

নিয়ে চলে এলেন।

রায়হানের মা সফুরা বেগম স্বামীর মুখে পাশের বাসার জাফর সাহেব এসেছেন শুনে অবাক হয়েছিলেন। ভেবেছেন, এত বছর পাশাপাশি বাস করলেও পড়শী হিসাবে একবারও আসেন নি। হঠাৎ আজ আসার নিশ্চয় কারণ আছে। জাফর সাহেব চলে যাওয়ার পর ড্রইংরুমে আসছিলেন। স্বামীকে আসতে দেখে বললেন, কী ব্যাপার? হঠাৎ আজ জাফর সাহেব এসেছিলেন কেন?

আব্দুল জাব্বার সাহেব বললেন, সে কথা পরে শোন, রায়হান কোথায়?

ওর রুমে পড়ছে।

এস আমার সঙ্গে।

রায়হান বই এর দিকে তাকিয়ে নিজের অপকর্মের কথা চিন্তা করে অনুশোচনা করছিল আর ভাবছিল, ইউসুফ কি তাকে ক্ষমা করবে? আবার ভাবল, সে ক্ষমা করলেও হেড স্যার কি ক্ষমা করবেন? আর ক্লাসের সব ছেলেরাও কি আমাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবে? তবু ইউসুফ ও হেড স্যারের কাছে ক্ষমা চাইবে সিদ্ধান্ত নিয়ে চিন্তা করতে লাগল, কিভাবে তাদের কাছে ক্ষমা চাইবে। কতক্ষণ এইসব চিন্তা করছিল তার খেয়াল ছিল না, “রায়হান, বই-এর দিকে তাকিয়ে চুপ করে কী এত ভাবছ?” আব্বার গলা পেয়ে চমকে উঠে দরজার দিকে তাকাল। দেখল, মাও সঙ্গে রয়েছে। কোনো কথা বলতে না পেরে তাদের দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।  

আব্দুল জাব্বার সাহেব এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তুমি ইউসুফকে অন্যায়ভাবে হেড স্যারের হাতে মার খাইয়েছ, আজ আবার তাকে মেরে আহত করেছ জেনে প্রথমে তোমার উপর প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলাম। কি শাস্তি তোমাকে দিতাম, তা আল্লাহকে মালুম। তারপর তুমি যখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে অন্যায় স্বীকার করলে ও ক্ষমা চাইবে বললে তখন রাগের পরিবর্তে আনন্দে বুকটা ভরে গেল। কারণ যারা নিজের ভুল বুঝতে পারে ও ক্ষমা চায়, তাদের আল্লাহ ভালবাসেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ জীবন উজ্জ্বল করে দেন। দোয়া করি, “আল্লাহ তোমাকে সর্বদা সৎ পথে পরিচালনা করুন, অসৎ পথ থেকে হেফাজত করুন।” শোন, ইউসুফ যদি কাল স্কুলে আসে, তা হলে কালকেই ক্লাসে সবার সামনে হেড স্যার ও ইউসুফের কাছে মাফ চেয়ে নেবে। হয়তো হেড স্যার তোমাকে শাসন করতে পারেন, তবু তুমি কাজটা করবে। মনে রেখ, কারো নামে মিথ্যে অপবাদ দেওয়া ও কারো উপর অন্যায়ভাবে জুলুম করা কবীরা গুনাহ। যারা এরকম কাজ করে, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়াতে মানুষের কাছে। অপমানিত ও লাঞ্ছিত করবেন, তার উপর আখিরাতেও কঠিন শাস্তি দেবেন। হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ (দঃ) বলিয়াছেন, “যে তোমাদের মধ্যে স্বভাব-চরিত্রে সর্বোত্তম, আমার নিকট তোমাদের মধ্যে অধিক প্রিয়।” [বর্ণনায় : আব্বুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) বুখারী।]

আমি লক্ষ করেছি। তুমি ঠিকমতো নামায পড় না। আজ এশার নামায পড়বে এবং ভবিষ্যতে এক ওয়াক্ত নামাযও কাযা করবে না।

রায়হান ছলছল চোখে বলল, আপনি যা বললেন তাই করব আব্বা।

শোকর আল হামদুলিল্লাহ বলে আব্দুল জাব্বার সাহেব স্ত্রীকে আসতে বলে সেখান থেকে চলে এলেন।

রুমে এসে সফুরা বেগম স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেন, রায়হান কি করেছে বলবে তো?

আব্দুল জাব্বার সাহেব ছেলের কূকীর্তির কথা বলে বললেন, এ ব্যাপারে ওকে কিছু জিজ্ঞেস করো না।

.

বাসায় ফিরে জাফর সাহেব স্ত্রী, মা ও মেয়েকে রায়হানদের বাসায় যাওয়ার কথা বললেন। আরো বললেন, ইউসুফের মতো ছেলে কখনও কোনো অন্যায় করতে পারে না। রায়হান দোষ স্বীকার করে হেড স্যার ও ইউসুফের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে বলেছে।

আসিয়া বিবি বললেন, জ্বলেখার মুখে শুনেই আমি বলেছি, ইউসুফ এরকম কাজ করতে পারে না।

হামিদা বেগম বললেন, আমারও তাই বিশ্বাস ছিল। তাই তো আপনার ছেলেকে রায়হানের বাবার সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলাম।

পরের দিন স্কুল থেকে ফেরার পথে জুলায়খা ড্রাইভারকে বলল, চাচা, ইউসুফ ভাইয়ের বাসায় চলুন।

ইউসুফ আজ অনেকটা সুস্থ। স্কুলে যেতে চাইলে শাকেরা বেগম নিষেধ করে বললেন, আজ তোর আব্বা ছুটি নিয়ে আসবে। কাল হেড স্যারের সঙ্গে দেখা করে ঘটনাটা তদন্ত করে বিচার করতে বলবে। বিচার না হওয়া পর্যন্ত তুই স্কুলে যাবি না।

জুলায়খা ইউসুফদের বাসায় পৌঁছে কলিংবেল বাজাল।

নূরজাহান বেগম দরজা খুলে জুলায়খাকে দেখে হাসি মুখে বললেন, ওমা তুমি? এস, ভিতরে এস।

জুলায়খা সালাম দিল।

নূরজাহান বেগম সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, নিশ্চয় স্কুল থেকে আসছ?

জুলায়খা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে স্বীকার করল।

তুমি ইউসুফের রুমে গিয়ে বস, আমি নাস্তা পাঠিয়ে দিচ্ছি।

ইউসুফের রুমের দরজার কাছে এসে জুলায়খা দেখল, সে পড়ছে। ভিতরে ঢুকে সালাম দিয়ে বলল, ইউসুফ ভাই, কেমন আছ?

ইউসুফ সালামের উত্তর দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, এস, বস। তারপর বলল, আজ সালাম দিলে যে?

কেন? অন্যায় হয়েছে না কি?

না, বরং এটাই ইসলামের রীতি। এতদিন দাও নি, আজ দিলে। তাই বললাম। তবে আমি ভীষণ খুশী হয়েছি।

সালাম কি জিনিস এতদিন জানতাম না। কাল রাত্রে আব্বা একটা হাদিস পড়ে সালামের গুরুত্ব শোনালেন। আমার তো মনে হয়, তুমি তা জান?

হ্যাঁ জানি।

তা হলে এতদিন তুমি আমাকে সালাম দাও নি কেন?

ভেবেছিলাম, তোমাদের ফ্যামিলী খুব মডার্ণ। সালামের প্রচলন নেই। তাই দিই নি।

মডার্ণ কি জিনিস জানি না। তবে আমাদের ফ্যামিলীর সবাই নামায রোযা করে। এমন কি চাকর-চাকরানী ও দারোয়ান সবাই। এতদিনেও কী তুমি জানতে পার নি?

কী করে জানব? তোমাদের বাসায় বিকেলে যাই, সন্ধ্যের আগে ফিরে আসি। তারপর বলল, তুমিও তা হলে নামায রোযা কর?

জুলায়খা মৃদু হেসে বলল, আগে মাঝে মধ্যে নামায পড়তাম। আট দশটা রোযা ও রাখতাম। এ বছর ক্লাস এইটে উঠার পর দাদিআম্মা পাক-নাপাকের ব্যাপারে অনেক কিছু শিক্ষা দিলেন। তারপর বললেন, ছেলেমেয়েরা বালেগ হওয়ার পর তাদের উপর আল্লাহর হুকুম মেনে চলা ফরয হয়ে যায়। নামায রোযা ঠিকমতো করতে হয়। নচেৎ পরকালে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। আরো বললেন, হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ (দঃ) বলিয়াছেন, “জানাইয়া দাও (সকলকে) যে, তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তির ঘরের নিকট নদী থাকে এবং দৈনিক যদি সে পাঁচবার উহাতে গোসল করে, তাহার শরীরে কি ময়লা থাকে? তাহারা বলিল, না, থাকিতে পারে না। তিনি বলিলেন, পাঁচবার নামাযের উপমাও এইরূপ। আল্লাহ তাহার সকল গুণাহ মুছিয়া ফেলেন।” [বর্ণনায় : আবু হোরাইরা (রাঃ) বুখারী, মুসলীম।] তারপর থেকে এক ওয়াক্ত নামায ছাড়ি নাই। ভাবছি, ইনশাআল্লাহ এ বছর ত্রিশ রোযা রাখব।

ইউসুফ বলল, শুনে খুব খুশী হলাম। জান, আগে আমিও তোমার মতো নামায ঠিকমতো পড়তাম না, রমযানের রোযাও সব রাখতাম না। ক্লাস এইটে উঠার পর আব্বা একদিন একটা হাদিস পড়ে শোনালেন, রাসুলুল্লাহ (দঃ) বলিয়াছেন, “তাহাদের মধ্যে এবং আমাদের মধ্যে নামাযই পার্থক্যের বিষয়। যে ইহা ত্যাগ করে, সে কাফির।” [বর্ণনায় : হযরত বুরাইদা (রাঃ) তিরমিজী, নেসায়ী।] তারপর থেকে এক ওয়াক্ত নামায কাযা করি নি এবং রমযানের সব রোযাও রাখি।

এমন সময় নূরজাহান বেগম নাস্তা নিয়ে এসে জুলায়খাকে বললেন, বেসিনে হাত মুখ ধুয়ে এসে এগুলো খেয়ে নাও। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী চা খাবে?

জুলায়খা বলল, আপনি আবার এসব আনতে গেলেন কেন? বাসায় গিয়ে গোসল করে ভাত খাব।

তা হোক, কখন সেই সকালে নাস্তা খেয়ে স্কুলে গিয়েছিলে। তারপর কাজের বুয়াকে ডেকে এক কাপ চা দিতে বললেন।

নাস্তা খেতে খেতে জুলায়খা বলল, জানেন খালাআম্মা, কাল আমার মুখে ইউসুফ ভাইয়ের সব কথা শুনে আব্বা রায়হানদের বাসায় গিয়ে তার বাবার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। রায়হান নিজের দোষ স্বীকার করে হেড স্যারের কাছে ও ইউসুফ ভাইয়ের কাছে মাফ চেয়ে নেবে বলেছে।

নূরজাহান বেগম বললেন, ওমা তাই নাকি? আমিও আজ তোমার খালুকে কাল ছুটি নিয়ে আসতে বলেছি, হেড স্যারের সঙ্গে দেখা করে তদন্ত করে বিচার করার জন্য। তোমার আব্বা যখন ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলেছেন তখন তাকে হেড স্যারের সঙ্গে দেখা করতে নিষেধ করে দেব।

চা খাওয়ার পর জুলায়খা বলল, এবার আসি খালাআম্মা।

আবার এস বলে নুরজাহান বেগম চলে গেলেন।

জুলায়খা জিজ্ঞেস করল, কাল নিশ্চয় স্কুলে যাবে?

ইউসুফ বলল, হ্যাঁ যাব।

গাড়ি পাঠাব, আসবে তো?

ইউসুফ দুষ্টুমী করে বলল, যদি না আসি?

তা হলে রাগ করব।

রাগ করলে আমি আর কোনোদিন তোমাদের বাসায় যাব না।

ঠিক আছে, রাগ করব না, আসবে তো?

আসব।

এবার আসি! আরো দেরি করলে বাসায় সবাই চিন্তা করবে। তারপর সালাম বিনিময় করে জ্বলেখা বেরিয়ে নিচে এসে গাড়িতে উঠল।

.

মেয়ের ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে হামিদা বেগম অনুমান করেছিলেন, ফেরার পথে বোধ হয় ইউসুফদের বাসায় গেছে। তাই জুলায়খা বাসায় এলে বললেন, ইউসুফদের বাসায় গিয়েছিলি বুঝি?

তুমি ঠিক বলেছ আম্মু।

ইউসুফ কেমন আছে?

ভালো আছে। কাল থেকে স্কুলে যাবে বলল। জান আম্মু, খালাম্মা বললেন, খালুজান হেড স্যারের কাছে তদন্ত করে বিচার করার জন্য কাল স্কুলে যেতেন। আমার মুখে আব্বুর রায়হানদের বাসায় যাওয়ার ও তার মাফ চাওয়ার কথা শুনে বললেন, “তা হলে তোমার খালুকে হেড স্যারের কাছে যেতে নিষেধ করে দেব।”

উনি ঠিক কথা বলেছেন। অপরাধী দোষ স্বীকার করে মাফ চাইলে, আর কিছু করার দরকার হয় না। তা হ্যাঁরে, কাল ওকে আসতে বলিস নি?

হ্যাঁ বলেছি। গাড়ি পাঠাবার কথাও বলেছি।

ভালো করেছিস, কাল এলে স্কুলে কি হল না হল জানা যাবে।

.

জামালদের বাসা রায়হানদের বাসা থেকে স্কুলে যাওয়ার পথে কিছুটা দূরে। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় রায়হান তাকে ডেকে নিয়ে যায়। আজ যেতে যেতে গত রাতের ঘটনা বলে বলল, কাজটা সত্যিই ভালো করি নি। আব্বা হেড স্যার ও ইউসুফের কাছে মাফ চেয়ে নিতে বলেছে। ভাবছি, আজই মাফ চেয়ে নেব। তুইও চেয়ে নিস।

জামাল বলল আমিও চিন্তা করে দেখেছি, তোকে সাহায্য করা উচিত হয় নি। আর একটা কথা ভেবেছিস? যার জন্য আমরা ইউসুফকে হেড স্যারের হাতে মার খাওয়ালাম, ক্লাসের সব ছেলেদের কাছে অপমান করলাম, আবার কাল ধোলাই দিলাম, সেই ইকবাল কিন্তু আমাদেরকে এতটুকু সাহায্য করে নি। এখন মনে হচ্ছে, ইকবাল মাঝে মধ্যে আমাদেরকে এটা সেটা খাওয়ায় বলে ইউসুফের মতো ভালো ছেলের প্রতি যা করেছি, তা খুব অন্যায়।

রায়হান বলল, তুই ঠিক কথা বলেছিস। আমারও তাই মনে হয়েছে। তাইতো জাফর সাহেব ও আব্বাকে কথা দিয়েছি মাফ চেয়ে নেব।

জামাল বলল, আমিও মাফ চেয়ে নেব। কিন্তু হেড স্যার যা কড়া, শাস্তি না দিয়ে ছাড়বেন না।

রায়হান বলল, কি আর করা যাবে, অন্যায় যখন করেছি তখন শাস্তি তো পেতেই হবে।

তুই কিন্তু আগে হেড স্যারের কাছে মাফ চাইবি, তারপর আমি।

ঘটনাটা যখন আমি ঘটিয়েছি তখন আমিই আগে মাফ চাইব।

স্কুলে এসে দেখল, ইউসুফ আসে নি। রায়হান বলল, মনে হয় মার খেয়ে ওর শরীর খারাপ করেছে। যেদিন আসবে, সেদিন মাফ চাইব।

তা না হয় হল; কিন্তু ইকবাল আসে নি কেন?

না আসার কোনো কারণ থাকতে পারে। কাল হয়তো আসবে।

.

পরের দিন ইউসুফ ও ইকবাল এসেছে দেখে, জামালের কানে কানে রায়হান নিজে কি করবে না করবে বলল।

টিফিনের পর হেড স্যার ক্লাসে এসে বসার পর সব ছেলেরা যখন বসল তখন রায়হান স্যারের কাছে এসে বলল, স্যার, সেদিন ইউসুফ আমার খাতা চুরি করে নি। টিফিনের সময় আমিই তার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। আমি খুব অন্যায় করেছি, আমাকে মাফ করে দিন স্যার। আর কখনও এমন কাজ করব না। কথা শেষ করে মাথা নিচু করে নিল।

জলিল স্যার ফর্সা মানুষ। রেগে গেলে মুখটা লাল হয়ে যায়। এখনও তাই হল। বড় বড় চোখে কঠিন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ক্লাসের ছেলেরা রায়হানের কথা শুনে খুব অবাক হল। ভাবল, আজ আর রায়হানের রক্ষা নেই। শাস্তি দেওয়ার পর হয়তো নাম কেটে স্কুল থেকে বের করে দেবেন।

বেশ কিছুক্ষণ সারা ক্লাসে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করতে লাগল।

এই সুযোগে জামাল ধীরে ধীরে রায়হানের পাশে এসে বলল, আমিও সেদিন মিথ্যে সাক্ষী দিয়ে খুব অন্যায় করেছি, আমাকেও মাফ করে দিন স্যার।

এবার জলিল স্যারের অগ্নি দৃষ্টি জামালের উপর পড়ল। অনেকক্ষণ পর সব ছাত্রদের উপর একবার চোখ বুলিয়ে ইউসুফের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার। কিছু বলার আছে?

ইউসুফ দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বলল, আব্বার। কাছে শুনেছি, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ) এর তরবারির উপর লেখা ছিল “যে তোমার প্রতি অন্যায় করে, তাহাকে ক্ষমা কর। শক্তিশালী হইয়াও যে ক্ষমা করে, সে আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তি।” ওরা যখন ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইছে তখন ওদেরকে ক্ষমা করে দিন স্যার।

ইউসুফের কথা শুনে জলিল স্যারের রাগ পড়ে গেল। মারহাবা মারহাবা বলে বললেন, এটাই তোমার কাছে আশা করেছিলাম। তোমার পিতার মতো সব পিতারা যদি সন্তানদের এভাবে শিক্ষা দিতেন, তা হলে সমাজের এত অবক্ষয় হত না। তারপর তাকে কাছে আসতে বললেন।

ইউসুফ এসে তাদের পাশে দাঁড়াল।

জলিল স্যার কিছু বলার আগেই রায়হান ইউসুফকে জড়িয়ে ধরে ভিজে গলায় বলল, তোমাকে চিনতে আমি ভুল করেছি। তাই হিংসার বশবর্তী হয়ে এত বড় অন্যায় করে ফেলেছি। আমাকে মাফ করে দাও। আর জামালকেও মাফ করে দাও। ও যা কিছু করেছে, আমার যুক্তিতেই করেছে।

রায়হান থেমে যেতে জামাল কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল, তোমাকে চিনতে আমিও ভুল করেছি। রায়হানের যুক্তিতে যা কিছু করেছি, সেজন্য আমিও মাফ চাইছি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও।

ইউসুফ আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলল, তোমরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছ জেনে খুশী হয়েছি। আমি তোমাদেরকে মাফ করে দিলাম। আল্লাহ আমাদের সবাইকে মাফ করুক। সর্বদা সৎপথে পরিচালিত করুক।

জলিল স্যার ইউসুফের যত কথা শুনছেন, তত তার প্রতি স্নেহ আরো বেড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে বিনা অপরাধে ইউসুফকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নিজের কাছে ছোট হয়ে গেলেন। ভাবলেন, শাস্তি দেওয়ার আগে ভালভাবে অনুসন্ধান করা উচিত ছিল। আরো ভাবলেন, এই জন্যই যে কোনো ব্যাপারে ইসলামে দু’জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিতে বলা হয়েছে। ইউসুফের উন্নত চরিত্রের পরিচয় পেয়ে লজ্জিত হলেন। তাকে কাছে ডেকে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, সেদিন ব্যাপারটা ঠিকমতো অনুসন্ধান না করে তোমাকে শাস্তি দিয়ে আমিও ভুল করছি। তুমি কিছু মনে করো না বাবা।  

ইউসুফ স্যারের পায়ে হাত ছুঁয়ে সালাম করে বলল, আপনি আপনার কর্তব্য করেছেন। এতে আমি কিছু মনে করি নি। তবে রায়হান ও জামালের উপর প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল। এখন অবশ্য তা নেই।  

জলিল স্যার তাদেরকে বসতে বললেন। বসার পর রায়হানকে জিজ্ঞেস করলেন, ইউসুফকে অপমান করার ও শাস্তি দেওয়ার পিছনে নিশ্চয় কোনো কারণ ছিল। সেই কারণটা বল।

রায়হান দাঁড়িয়ে বলল, একদিন ওর কাছে একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম, উত্তর দেয় নি। আর একদিন ইংলিশের নোট চেয়েছিলাম, দেয় নি। তাই রাগের বশবর্তী হয়ে … কথাটা শেষ না করে থেমে গেল।

জলিল স্যার বললেন, এই সামান্য কারণে এত বড় অন্যায় করা তোমার উচিত হয় নি। যা হওয়ার হয়েছে। ভবিষ্যতে এরকম মনোবৃত্তি আর যেন না হয়। তারপর সব ছাত্রদের উদ্দেশ্য করে বললেন, আশা করব, তোমাদের মধ্যে আর কেউ যেন এরকম অন্যায় না করে। আর একটা কথা সবাই জেনে রাখ, ইউসুফ যদি ওদেরকে ক্ষমা না করত, তা হলে কঠোর শাস্তি দিয়ে দুজনকেই স্কুল থেকে বের করে দিতাম। আজ আর পড়াব না, ইউসুফ ক্ষমার যে আদর্শ দেখাল, সেই ক্ষমা সম্পর্কে তোমাদেরকে কিছু শোনাব। ক্ষমা একটা মহৎ গুণ। মুমীন ব্যক্তিরা। একে অপরকে ক্ষমা করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। কেন না, তিনি নিজেই ক্ষমাশীল। আল্লাহ কুরআন পাকে বলিয়াছেন, “তুমি ক্ষমার অভ্যাস কর, সৎ কাজের আদেশ দাও এবং অজ্ঞদের উপেক্ষা কর।” [সূরা আরাফ আয়াত ১৯৯-পারা ৯।] হাদিসে আছে রাসুলুল্লাহ (দঃ) বলিয়াছেন, “ইমরানের পুত্র মুসা (আঃ) জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, হে প্রভূ। তোমার নিকট সর্বাপেক্ষা সম্মানিত বান্দা কে? আল্লাহ বলিলেন, ক্ষমতাশালী হইয়াও যে ক্ষমা করে।” [বর্ণনায় : হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) –বাইহাক্বী] মনে রাখবে কখনও কারো প্রতি মনে হিংসা পোষণ করবে না। হিংসা বিদ্বেষ এমন জিনিস, যাহা মানুষের গুণাবলী ও পূণ্য নষ্ট করে ফেলে। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ) বলিয়াছেন, “তোমরা হিংসা ত্যাগ কর, কেন না অগ্নি যেমন জ্বালানী কাষ্ঠকে ধংস করে, তেমনি হিংসা সদগুণাবলীকে ধংস করে।” [বর্ণনায় : আবু হোরায়রা (রাঃ)–আবু দাউদ।]

এমন সময় ঘন্টা বেজে উঠতে বললেন, যা কিছু বললাম, সেসব যদি তোমরা মেনে চল, তা হলে দুনিয়াতে যেমন সুফল পাবে, তেমনি পরকালেও পাবে। তারপর ক্লাস থেকে চলে গেলেন।

রায়হান ও জামালকে দোষ স্বীকার করে মাফ চাইতে দেখে ইকবাল যতটা না অবাক হয়েছিল, তাকেও না জড়িয়ে ফেলে, এই ভেবে তার থেকে অনেক বেশি ভয় পেয়েছিল। যখন তারা তার নাম বলল না তখন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবল, কি এমন হল? আমাকে না জানিয়ে এরকম করল।

ছুটির পর রাস্তায় এসে ইকবাল তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার বলতো? হঠাৎ তোদের সুমতি হল কেন?

রায়হান বলল, তার আগে তুই বলতো? ইউসুফ ও হেড স্যারের কথা শুনে তোর মনের পরিবর্তন হয়েছে কি না।

তা আর হয় নি। এখন আর ইউসুফের প্রতি আমার কোনো হিংসা নেই।

তা হলে শোন, যেদিন ইউসুফকে মারি, সেদিন যে মেয়েটা গাড়ি করে এসেছিল, তাদের বাসা আমাদের বাসার পাশে। তার বাবা ঐদিন রাতে আমাদের বাসায় এসেছিলেন। তিনি ও আমার আব্বা এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যা শুনে আমার সুমতি হয়েছে। আর সেসব কথা জামালকে বলতে, তারও সুমতি হয়েছে।

ইকবাল বলল, সত্যি, ইউসুফের মতো ভালো ছেলে হয় না। তোদরকে বাধা না দিয়ে আমিও ভুল করেছি। তবে একথা ঠিক, তোরা যা কিছু করেছিস, তা যদি আগে আমাকে জানাতিস, তা হলে নিষেধ করতাম।

জামাল বলল, ওসব কথা বলে আর লাভ নেই। তারপর যে যার পথে হাঁটতে লাগল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *