অপারেশন বালোচ – ৫

কোয়েটার আই এস আই এর বেস পয়েন্ট।

আই এস আই চিফ রফিক আহমেদ চিন্তিত মুখে পায়চারি করছেন।

কিছুক্ষণ আগে প্রতিরক্ষা দপ্তর থেকে ফোন এসেছিল। বালুচিস্তানে পাকিস্তানের দমন নীতির বিরুদ্ধে ভারত রাষ্ট্রপুঞ্জে মুখ খুলেছে। এখানে বিদেশী মিডিয়া প্রবেশের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করার কথা বলা হয়েছে। তবে রফিক আহমেদ অন্য বিষয়ে চিন্তা করছেন। লস্করের এক কমান্ডার রুমান আলীর আসার কথা কোয়েটায়। রুমান আলীকে সেফ প্যাসেজ দিয়ে একদিন পরে কান্দাহারে পাঠানোর আদেশ এসেছে। রফিক সে ব্যাপারটা নিয়েই চিন্তিত। গোটা রাস্তাতে বেশ কয়েকটা গ্রাম পড়ে। পাক সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেলের গাড়ির সঙ্গে রুমান আলীর যাওয়ার কথা। সে রাস্তায় যেন কোন রকম বিক্ষোভ না হয় সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। রফিকের সশরীরে কোয়েটায় যাওয়ার নির্দেশ এসেছিল। এত বড় গোপন কাজের কোন কিছু বাইরে এসে যাওয়া মানেই গোটা পৃথিবীতে হইচই পড়ে যাবে। খুব সন্তর্পণে এই অপারেশনটা করতে হবে। আহমেদ সে ব্যাপারেই সব প্যাসেজের ব্যাপারে বার বার খোঁজ নিয়ে যাচ্ছেন।

কোয়েটা বিমানবন্দরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যাবস্থা করা হয়েছে। প্রথমে ঠিক হয়েছিল রুমান আলীর নকল আইডেন্টিটি বানিয়ে তাকে কান্দাহারের বিমানে তুলে দেওয়া হবে, পরে প্ল্যান চেঞ্জ করা হয়। স্থল পথে ঝুঁকি কম। আমেরিকানদের এই অঞ্চলের লোকেরা বিশ্বাস করে না। সব জায়গায় এদের গোয়েন্দারা তৎপর হয়ে থাকে। বিমানবন্দরে আমেরিকান গোয়েন্দাদের গতিবিধি স্থল পথের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। কোয়েটা থেকে কান্দাহারের স্থলপথই শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হয় এ কারণে।

লস্করের অস্ত্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র চাই তাদের। তালিবান এ কাজে তাদের সাহায্য করবে। রুমান আফগানিস্তান থেকে অস্ত্র আনার ব্যবস্থা করবে গোপন পথে। তাও সি আই এর চোখে ধুলো দিয়ে। তালিবানরা তৈরী হচ্ছে আফগানিস্তানে। আমেরিকা সৈন্য তোলার কাজ শুরু করেছে। এই সুযোগে তালিবানরা আফগানিস্তানে আবার বিভিন্ন জায়গায় জড়ো হতে শুরু করেছে।

রফিক কোয়েটায় তার এজেন্ট সাহিলকে ফোন করলেন। সাহিলকে তিনি বালোচ লিবারেশনের গতিবিধি জানার ব্যাপারে খোঁজ নিতে পাঠিয়েছিলেন। অনেকক্ষণ হয়ে গেল কোন রিপোর্ট না আসায় শেষমেশ অধৈর্য হয়ে ফোন করতে বাধ্য হলেন। রিং হতেই সাহিল ফোন ধরল, “জি জনাব।”

রফিক কড়া গলায় বললেন, “তুমি এখন কোথায়? তোমার কখন আমাকে রিপোর্ট করার কথা ছিল?”

সাহিল থতমত খেয়ে বলল, “জি জনাব, আমি কোয়েটা বাজারে আছি। এখনই আপনাকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম।”

রফিক বললেন, “এত দেরী করে? যাক গে, কি খবর সেটা বল।”

সাহিল বলল, “জনাব কোন পরেশানি নেই। রাস্তা অল ক্লিয়ার আছে। মেহমানদের কান্দাহার পৌঁছতে কোন সমস্যা হবে না।”

রফিক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, “একদম কনফার্ম?”

সাহিল বলল, “হান্ড্রেড পারসেন্ট জনাব। আমার লাইফ বাজি রেখে বলতে পারি। এখানে দুশমনরা দাঁতও ফোঁটাতে পারবে না।”

রফিক স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন, “মাশাল্লাহ। তাহলে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি?”

সাহিল বলল, “হ্যাঁ জনাব। কোন চিন্তা নেই।”

রফিক বললেন, “তুমি চলে এসো। আমার তোমাকে বেশ কিছু ইন্সট্রাকশান দেওয়ার আছে। কোয়েটার পুলিশ কমিশনারকে বল আমাকে ফোন করতে। ওকেও আমার কিছু কথা বলার আছে। ক্লিয়ার?”

সাহিল বলল, “ক্লিয়ার জনাব। আর জনাব আপনার পানির কোন প্রব্লেম হচ্ছে না তো? কোয়েটাতে পানির সমস্যা হচ্ছে। আপনি চাইলে আমি বেশ কয়েকটা ড্রাম পাঠিয়ে দিতে পারি।”

রফিক বললেন, “সেসব দেখার জন্য অন্য লোক আছে। তোমাকে এগুলো দেখার জন্য এখানে অ্যাপয়েন্ট করা হয় নি। যা বলছি কর।”

সাহিল বলল, “জি জনাব।”

ফোন রেখে রফিক সাহেব চিন্তায় মাথা নাড়লেন। সাহিলকে তিনি পুরোপুরি ভরসা করে উঠতে পারছেন না। থাম্ব রুল বলছে এসব কাজে কখনো একজনের উপরে ভরসা করতে নেই। সাহিলের সঙ্গে আরেকজনের রিপোর্টের দরকার আছে। স্থানীয় তালিবান নেতাদের কাউকে ফোন করবেন? কিন্তু সেটা কি ঠিক হবে? রফিক চিন্তাক্লিষ্ট মুখে বসে পড়লেন। সব কিছু পারফেক্ট থাকা মোটেও সুস্থতার লক্ষণ হয় না। অভিজ্ঞতা তাই শিখিয়েছে তাকে।

কোন কিছু একটা সমস্যা তৈরি করবে।

কিন্তু সেটা কোনটা?

ওড়াঙ্গি টাউন বস্তি অঞ্চল। করাচী।

দুপুরবেলা।

গুমটিতে শুয়ে সিগারেট খাচ্ছে সৈকত। কিছুক্ষণ আগে ঘুম থেকে উঠেছে। পাশের গুমটি থেকে শোয়েব ডেকে গেছে তাকে। দুজনে করাচী বন্দরে কাজ করে। শিফট ডিউটি থাকে। নাইট ডিউটি করে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিল। শোয়েব খেতে ডেকে গেছে। শোয়েবের সঙ্গে এখানে এসেই আলাপ সৈকতের। শোয়েব জানে সে লাহোর থেকে এসেছে। গরীব ঘরের ছেলে। বাড়িতে ঝামেলা করে করাচী চলে এসেছে।

এখানে সস্তা শ্রমিক দরকার প্রচুর ভারি কাজ করার জন্য। বন্দরের কাজে ঢুকতে সৈকতের কোন সমস্যা হয় নি। সিগারেট খেতে খেতে সৈকত গান করছিল বাংলায়। আবার শোয়েব এসে ঢুকল, “কি বিড় বিড় করছো মিয়াঁ? আজ তো অফ ডে আছে। কোথাও ঘুরে আসবে নাকি?”

সৈকত হাই তুলে বলল, “কোথায় আর যাব? আমার তো মনে হয় সারাদিন ঘুমিয়েই থাকি।”

শোয়েব হাসল, “এই জন্য তোমার আব্বা আর আম্মি তোমাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তুমি একটা অকম্মার ধাড়ি। কোন কাজের না।”

সৈকত সিগারেটে টান দিয়ে বলল, “তোমার কি প্ল্যান আছে দোস্ত? তুমি কি খুব বড় তীর মারতে যাচ্ছো নাকি?”

শোয়েব বলল, “আমি আজ ভাবছি কোন মুভি দেখে আসি। কতদিন কিছু দেখা হয় না। চল না।”

সৈকত বলল, “ধুস। আমার ওসব ভাল্লাগে না।”

শোয়েব বলল, “ঠিক আছে মানলাম তোমার চয়েজ অনেক ভাল, কিন্তু একটা দিন ছুটি পাই, এদিন যদি সারাদিন শুয়ে বসেই কাটিয়ে দিই, তাহলে কি করে হবে?”

সৈকত ফিক ফিক করে হেসে বলল, “তুমি একটা দিলরুবা জোটাও মিয়াঁ। আমি বুঝতে পারছি তোমার এখন সিনেমা দেখার না, প্রেম করার সময়। ওসব করতে পারছ না বলেই তোমার মাথায় এসব কাজ করছে।”

শোয়েব বলল, “গ্রামের বাড়িতে গেলেই তো বিয়ের কথা বলছে। কিন্তু তুমিই বল মিয়াঁ, এই কাজ করে কি বিয়ে করা যায়? বিবিকে খাওয়াব কী?”

সৈকত বলল, “ও ঠিক খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তুমি বেশি দেরী না করে বিয়েটা নামিয়ে দাও। তারপর নিজেই একটা সিনেমা বানিয়ে ফেলবে না হয়। শোয়েব কি শাদি।”

শোয়েব হাসতে হাসতে বলল, “সে যাই বল। আমি ওসব কিছু শুনতে চাই না। তুমি আমার সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবে আজ। আমি কিছু জানি না।”

সৈকত সিগারেট ফেলে দিয়ে বলল, “ঠিক আছে। জো হুকুম মেরে আকা। তুমি যখন বলছ তখন তো যেতেই হবে। এখন তাহলে আরেকটা সিগারেট দাও।”

শোয়েব বলল, “ঘুম থেকে উঠে সিগারেট খেতে শুরু কর, তোমার এই অভ্যাসগুলো কোত্থেকে হয়েছে বল তো?”

সৈকত হাসল, “দাও মিয়াঁ, নইলে আমি সিনেমা দেখতে যাবো না কিন্তু।”

শোয়েব পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট ব্যাড় করে সৈকতের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “নাও। সব ফুঁকে শেষ করে ফেলো। তোমার মত সিগারেট খোর আমি কখনো দেখি নি। কী করে যে পারো তুমিই জানো।” সৈকত প্যাকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে বলল, “তোমার মত সিনেমাপ্রেমী আমি খুব কম দেখেছি।”

শোয়েব বলল, “তাও যদি এখন ইন্ডিয়ান সিনেমাগুলো হলে চলত তাহলে তোমাকেও টানতে টানতে নিয়ে যেতাম না। শাহরুখ, সলমনের সব সিনেমা আমি ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো দেখতাম ছুটি নিয়ে। কেন যে দুই মুলকে এত ঝামেলা হল।”

শোয়েব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

সৈকত বলল, “সে পাইরেটেড সিডি তো পাওয়া যায়। সেগুলোই না হয় দেখে নেবে।”

শোয়েব বলল, “ধুস। ওসব দিয়ে কিছু হয় নাকি? হলের মজা কোথাও পাওয়া যায় না। ওই যে হিরোর এন্ট্রিতে সিটি পড়তে শুরু করবে, ওর মজাই তো আলাদা। আচ্ছা মিয়াঁ, শাহরুখ খানকে শুনেছি ইন্ডিয়াতে অনেক গালি গালাজ শুনতে হয়। উনি এদেশে চলে আসতে পারে তো।”

সৈকত হাসল, “তোমার ইচ্ছে তো কম না।”

শোয়েব বলল, “আমার আরো ইচ্ছা আছে।”

সৈকত বলল, “কী রকম?”

শোয়েব বলল, “বোম্বেতে গিয়ে একবার শাহরুখ খানের বাড়ির সামনে যাব। শুনেছি শাহরুখ বেরিয়ে এসে ভক্তদের দিকে চুমু ছোঁড়ে।”

সৈকত বলল, “দেখো মিয়াঁ তোমার অবস্থা, দিলরুবার চুমুর জায়গায় এখন শাহরুখ খানের ফ্লাইং কিস খেতে ইচ্ছা করছে। আমাকে তোমার বাবার মার সঙ্গে এখনই কথা বলাবে। এখনই তোমার বিয়ে করা দরকার।”

শোয়েব হাসতে হাসতে বলল, “ঠিক আছে। এখন তৈরি হও। চল সিনেমাটা দেখে আসি।”

সৈকত শ্বাস ছেড়ে বলল, “সেই। তুমি কি আর না নিয়ে গিয়ে আমায় ছাড়বে? চল, আর কী করার আছে!”

পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন।

ইসলামাবাদ।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ফিল্ড মার্শাল ইমতিয়াজ হুসেন এসেছেন প্রধানমন্ত্রী বশির আলীর কাছে।

চিন্তিত মুখে বশির আলী বললেন, “মেজর জেনারেলকে পাঠানোর কী দরকার ছিল হুসেন সাহাব?”

হুসেন বললেন, “ওদের এটাই দাবী ছিল। ওরা ভাবছে আমরা আমেরিকান সেনাকে খবর দিয়ে দিতে পারি। ওসামার মৃত্যুর পর ওরা খুব সহজে আমাদের বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না।”

বশির বললেন, “আর কীভাবে ওদের বিশ্বাস করাতে হবে বলুন তো? এত বড় মাঠ দিয়ে রেখেছি খেলার জন্য। ফান্ডিং থেকে শুরু করে আর্মস, কোন কিছুই তো আটকাই না। এখনো যদি বলে আমাদের বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না, তাহলে কী করে হবে?”

হুসেন বললেন, “হতে পারে ওরা আমেরিকান ইন্টেলিজেন্সকে ভয় পাচ্ছে।”

বশির সিগারেট ধরালেন।

বশির আলী অত্যন্ত সুদর্শন একজন পুরুষ। কেউ কেউ বলে বশির আলীর পরিবারের সঙ্গে জিন্নার দূর সম্পর্কের কোন সম্পর্ক আছে। বশির ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ, তবে নিজেদের সেনাবাহিনীর ভয়েই ভীত হয়ে থাকেন। খুব ভাল করে জানেন তার দেশের সেনাবাহিনী আর ভারতের সেনাবাহিনীর মধ্যে অনেকখানি তফাৎ আছে। পাকিস্তানের সেনা ক্ষমতালোভী। যে কোন সময় নির্বাচিত সরকারের গদি উল্টে দিতে পারে। বশির কোন কথা না বলে চুপচাপ সিগারেট টেনে যাচ্ছেন দেখে অধৈর্য হয়ে হুসেন বললেন, “জনাব কি কিছু ভাবছেন?”

বশির বললেন, “যদি সত্যিই আমেরিকান ইন্টেলিজেন্স জেনে যায় রুমান মেজর জেনারেলের সঙ্গে যাচ্ছে, তাহলে আমাদের ব্যাক আপ প্ল্যান কী হবে?”

হুসেন বললেন, “আমরা অস্বীকার করব। বলব একই রকম দেখতে কেউ যাচ্ছে। ইনফ্যাক্ট মেজরের ভাইয়ের ছেলে বলে দেওয়া যেতে পারে।”

বশির বললেন, “আমাকে একটা কথা বলুন আপনি হুসেন সাহাব।”

হুসেন বললেন, “জি জনাব।”

বশির বললেন, “আপনারা এত বড় প্ল্যান করে ফেললেন, প্ল্যান একজিকিউটও করে ফেললেন, আই এস আই চিফকে কোয়েটা পাঠিয়ে দিলেন, আমার সঙ্গে একবার কথা বলার প্রয়োজনই বোধ করলেন না?” হুসেন সামলাবার চেষ্টা করলেন, “জি জনাব, আমরা এত ছোট ব্যাপারে আপনাকে চিন্তায় ফেলতে চাই নি।” বশির বললেন, “এটা ছোট ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে আপনার হুসেন সাহাব? আমাদের টপ র‍্যাঙ্কের অফিসাররা এত বড় একটা অপারেশনে চলে গেল, কোন মিসহ্যাপ হলে কে দায় নেবে? ইন্ডিয়া রাষ্ট্রপুঞ্জে বালোচিস্তান নিয়ে বলা শুরু করে দিয়েছে, ঘটনা হল এই খবর বাইরে গেলে সমস্যা তৈরি হবে।” ইমিতিয়াজ বললেন, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন জনাব, এই ব্যাপার বাইরে যাবে না। ওই জন্যই তো আমরা টপ প্রায়োরিটি নিয়ে ব্যাপারটা দেখছি। কোন সমস্যা হবে না ইনশা আল্লাহ।”

বশির বললেন, “দেখুন। আর যদি কোন সমস্যা হয়, তাহলে মেজর জেনারেলের উপর সব দোষ ফেলে দেবেন না আশা করি।”

ইমিতিয়াজ মাথা নাড়লেন, “না জনাব। সেসব কিছু করব না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”

বশির মাথা নাড়লেন, “ঠিক আছে। দেখুন কী করবেন।”

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে ইমতিয়াজ রফিক আহমেদকে ফোন করলেন। রফিক ফোন ধরে বললেন, “জি জনাব।”

ইমতিয়াজ বললেন, “অল ক্লিয়ার রফিক সাহাব?”

রফিক বললেন, “জি জনাব।”

ইমতিয়াজ বললেন, “আমি পি এম এর সঙ্গে দেখা করে বেরচ্ছি। হি ইজ ভেরি মাচ টেনসড। বার বার বলে যাচ্ছেন ইন্ডিয়া বা ওয়ার্ল্ড মিডিয়া জানলে কী হবে, আমেরিকানরা জানলে কী হবে এটসেট্রা। আপনি কি

ওকে একবার ফোন করে নিশ্চিত করতে পারেন?”

একটু থমকে গিয়ে রফিক বললেন, “ঠিক আছে জনাব। আমি ফোন করে নিচ্ছি।”

ইমতিয়াজ বললেন, “এখানে তো সমস্যা হবার কথা না রফিক সাহেব। ওয়েস্ট পাকিস্তান নিয়ে যদি আমাদের টেনশন করতে হয়, তাহলে চিন্তার ব্যাপার। তাই না?”

রফিক বললেন, “আমি কথা বলে নিচ্ছি পি এম এর সঙ্গে জনাব। আপনি চিন্তা করবেন না।”

ইমতিয়াজ বললেন, “মেক ইঁট স্মুথ। প্লিজ।”

রফিক বললেন, “শিশুর জনাব।”

ফোন কেটে দিলেন ইমতিয়াজ।

হল থেকে বেরিয়ে শোয়েব বিরক্ত গলায় বলল, “দূর মিয়াঁ, আমার একদম ভাল লাগল না। পুরো সময় নষ্ট হয়ে গেল। এসব সিনেমা যে কেন বানায় বুঝি না সত্যি।”

সৈকত চারদিকে তাকাল। হলের উল্টোদিকের সাদ্দার বাজারে বেশ ভিড়। এই বাজার সব সময়েই ভিড় থাকে। একটার পর একটা মোবাইলের দোকানে ভর্তি এ অঞ্চল। সে বলল, “চল শোয়েব, সাদ্দার বাজারে ঘুরি। তুমি আমায় ঘুমোতে না দিয়ে টানতে টানতে সিনেমা দেখাতে নিয়ে এসেছো। এখন আমার কথা তোমাকে শুনতেই হবে।”

শোয়েব কাঁধ ঝাঁকাল, “তা বটে। তোমার কথা শুনলেই ভাল হত। চল ঘুরি।”

সৈকত বাজারের ভিতর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। করাচী বেশ বড় শহর। মোবাইলের দোকানগুলো কোনটাই ফাঁকা নেই। চিন থেকে আসা কমদামী ফোন থেকে দামী ব্র্যান্ডেড ফোন, সবই পাওয়া যায় এখানে। শোয়েব বলল, “কী কেস বল তো মিয়াঁ, তুমি কি তোমার গোপন কোন প্রেমিকার জন্য ফোন কিনবে নাকি?”

সৈকত হাসল, “টাকা কোথায় আমাদের ফোন কেনার? নিজের ফোন কিনতেই কত টাকা চলে গেল!” শোয়েব বলল, “তোমার কত লাগবে? আমার কাছে জমানো কিছু আছে। নেবে?”

সৈকত শোয়েবের কাঁধে হাত রেখে বলল, “না না। ও তুমি রাখো। আমি এমনিই ঘুরতে এসেছি।” শোয়েব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সত্যিই ভাইজান, কবে যে আমরা রইসি দেখতে পাবো। আর কবে যে আমি আমার জন্নত মন্নতের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারব, তা আল্লাহতালাই জানেন। নসীবে নেই সব। স্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।”

সৈকত মনে মনে বলল, “আমাদের উপমহাদেশের সব গরীবের হালই তাই ভাই। আমাদের স্বপ্ন দেখায় অনেক বাধা নিষেধ আছে।”

এ দোকান সে দোকান ঘুরে তারা আলী মোবাইল স্টোরের সামনে গিয়ে হাজির হল। দোকানের শাটার অর্ধেক নামানো।

সৈকত ভ্রূ কুঁচকে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে শাটারের নিচ দিয়েই দোকানে প্রবেশ করল। ঘটনার আকস্মিকতায় শোয়েব হকচকিয়ে গেছিল। সৈকতকে দেখে “আরে ও মিয়াঁ কর কী” বলে ডাকতে গিয়ে দেখল সৈকত দোকানের ভিতর ঢুকে গেছে।

অগত্যা সেও দোকানে ঢুকতে বাধ্য হল।

সৈকতকে দেখে দোকানদার বলল, “দোকান বন্ধ আছে ভাইজান। এখন কাজ চলছে।”

শোয়েব সৈকতের জামা ধরে টানল, “এই তুমি আচ্ছা লোক তো। এখানে কেন ঢুকতে গেলে।”

সৈকত দোকানদারের দিকে তাকিয়ে জিভ কেটে বলল, “খুব ভুল হয়ে গেছে জনাব। আমি অত বুঝিনি। আমি শুনেছিলাম তোমার দোকানে ভাল কোরিয়ান ফোন পাওয়া যায়। আচ্ছা, নওয়াজ ভাই আসেন নি আজ?”

দোকানদার সৈকতের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, “নওয়াজ ভাই অনেক দিন হল আসছেন না। কোরিয়ান ফোন আমি আর বিক্রি করি না। ওসবে অনেক ঝামেলা।”

সৈকত মাথা নাড়ল, “ঠিক আছে মিয়াঁ। যেমন তোমার মর্জি। তবে কোন স্টক এলে আমি কি জানতে পারব?”

দোকানদার বলল, “না। আমি আর কোন স্টক আনব না। আপনি যান। দোকান বন্ধ আছে।”

সৈকত বলল, “ঠিক আছে। গলতি হয়ে গেল।”

দোকান থেকে বেরোতে শোয়েব সৈকতকে বিদ্রুপে ভরিয়ে দিল, “তুমি দিল্লাগি করতে ঢুকেছিলে ওই দোকানে? কোরিয়ান ফোন নাকি? যা ইচ্ছে একটা বলে দিলেই হল?”

হাসতে লাগল শোয়েব। সৈকতও হাসল। হঠাৎই তাদের সামনে একজন লম্বা লোক দাঁড়িয়ে পড়ল, “আইডি দেখি। কোথাকার লোক তোমরা?”

শোয়েব অবাক হয়ে বলল, “আরে মিয়াঁ, আমরা কী করলাম?”

লোকটা বলল, “আমরা পুলিশের লোক। একজন ফেরার আসামীকে খুঁজছি। আইভি দেখাও।”

শোয়েব বলল, “আরে, আমরা কি আইডি নিয়ে ঘুরে বেড়াবো নাকি? অদ্ভুত লোক তো।”

লোকটা শোয়েবের কাঁধে একটা জোরে ঠেলা দিয়ে বলল, “দূর হটো।”

আকস্মিক ধাক্কাটা খেয়ে শোয়েব নিজেকে সামলাতে না পেরে পড়ে গেল। সৈকত শোয়েবের দিকে একবার দেখে লোকটাকে বলল, “দেখাচ্ছি আইডি। তার আগে আপনি আপনার আইডি দেখান।” লোকটা পকেট থেকে রিভলভার বের করে বলল, “আর দেখবি আইডি?”

সৈকত এক মুহূর্ত থমকাল। পরক্ষণে লোকটার মুখ তাক করে প্রবল এক ঘুষি মারল। লোকটা ছিটকে পড়ল। আরেকবার উঠে আসতেই সৈকত লোকটাকে লাথি কষিয়ে শোয়েবকে বলল, “চল। ভাগ।” দুজনে দৌড়তে শুরু করল। সাদ্দার বাজারের ভিড় এড়িয়ে এলোমেলো বেশ খানিকটা পথ দৌড়নোর পর সৈকত শোয়েবকে নিয়ে একটা বাসে উঠে পড়ল। শোয়েব সভয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে সৈকতকে ফিসফিস করে বলল, “কী ব্যাপার হল মিয়াঁ? লোকটা ওরকম করছিল কেন? সত্যিই পুলিশ না তো?” পিছনের দিকে সিট ফাঁকা ছিল। সৈকত বলল, “চল বসি। দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে গেলাম।”

দুজনে বসল। শোয়েব সভয়ে বাসের জানলা দিয়ে দেখল কেউ তাড়া করছে কি না। কাউকে না দেখে বলল, “এবার বল। লোকটা কেন তাড়া করল?”

সৈকত বলল, “জানি না তো। করাচীর আমি বেশি কিছু চিনি না তো। তুমি কিছু চেনো?”

শোয়েব বলল, “এভাবে রাস্তা ঘাটে কোন দিন পুলিশ আমাকে দাঁড় করিয়ে আই ডি চায় নি। কেন এরকম হল, বুঝতে পারলাম না।”

সৈকত বলল, “আদৌ পুলিশ নাকি দেখো।”

শোয়েব হাঁফ ধরা গলায় বলল, “ঠিকই বলেছো। আমারো মনে হয় না পুলিশ। নিশ্চয়ই পুলিশ সেজে ছিনতাইয়ের তালে ছিল। বাঁচা গেছে! তোমার তো হেবি সাহস মিয়াঁ?”

সৈকত হাসল, “তোমাকে মারল দেখে রেগে গেলাম। সাহসের কিছু নেই। দোস্তকে মারলে দোস্ত কি ছেড়ে দেবে?”

শোয়েব খুশি হল, “তা ঠিক। অনেক শুক্রিয়া।”

সৈকত বলল, “চল আজ এই আনন্দে বিরিয়ানি খাই। যা সিনেমা দেখালে, এরপর বিরিয়ানি তুমিই খাওয়াবে।”

শোয়েব বলল, “তাই খাওয়াব। চল চল।”

কোয়েটা।
দুপুর বারোটা।

শহরের একটু বাইরের একটা পরিত্যক্ত মসজিদে চারটে গাড়ি এসে দাঁড়াল। চারপাশ দেখে গাড়ি থেকে রুমান আলীকে নামানো হল। মসজিদের ভেতরের হলঘরকে পরিষ্কার করে ধোপদুরস্ত করা হয়েছে। রুমান মসজিদের ভিতরে ঢুকে পেতে রাখা চেয়ারে গিয়ে বসল।

দেহরক্ষীরা বাইরে দেখে এসে বলল, “সব ঠিক আছে জনাব।”

রুমান একজনকে বলল, “ওদের ফোন করে বলে দে, আমি এসে গেছি এখানে।”

জানানো হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর একটা গাড়িতে সাহিল এসে হাজির হল। মসজিদের ভেতর ঢুকে রুমানকে দেখে বলল, “সালাম মিয়াঁ।”

রুমান বলল, “আহমেদ স্যার কোথায়? ওকে আসতে বল।”

সাহল বলল, “উনি আপনাকে জানাতে বললেন সন্ধ্যেয় আসবেন। এখন আমাকে জিজ্ঞেস করতে বললেন আপনার কোন সমস্যা হচ্ছে কি না।”

রুমান বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল, “পাকিস্তানের সব থেকে বড় সেবক আমরা। আর আমাদের এভাবে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। সমস্যা তো হওয়াই উচিত, তাই না মিয়াঁ?”

সাহিল মাথা নাড়ল, “জি জনাব। এটা তো ঠিকই। তবু স্যাটেলাইটগুলো তো আর আমাদের কথা শুনবে না। কোথায় আমেরিকান স্পাই আছে, তাও তো জানি না।”

রুমান বলল, “পাকিস্তান সারাক্ষণ ভয়েই মরে যাচ্ছে। সত্যি। বড়ই লজ্জার ব্যাপার। মাথা উঁচু করে থাকা উচিত আমাদের। কীসের এত ভয় মিয়াঁ?”

সাহিলকে বসার জায়গা দেওয়া হয় নি। সে দাঁড়িয়ে আছে।

রুমানের একজন দেহরক্ষী বলল, “রোড ক্লিয়ার আছে? কাল কটায় যাওয়া হবে?”

সাহিল বলল, “সকাল সাতটা। এখান থেকে জনাবকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাবার প্ল্যান হয়েছে। রাস্তা একদম ঠিক আছে। কোথাও কোন অসুবিধা হবার কথা না।”

রুমান বলল, “বালোচ কুত্তাগুলো কিছু করবে না তো?”

সাহিল বলল, “এখানে ওরা কী করবে জনাব? ওদের কিছু করার ক্ষমতা নেই এখানে। এমনিতেই আফতাব বালোচের খোঁজ চলছে। ওরা আগে আত্মরক্ষা করুক, তারপর না হয় যা করার করবে।”

রুমান ভ্রূ কুঁচকে বলল, “এখানে ওদের কিছু নেই? তুমি কিছুই জানো না তাহলে। কোয়েটার আশে পাশে বালোচদের বড় আড্ডা তৈরি হয়েছে। যে কোন সময় ওরা হামলা চালাতে পারে তোমাদের ক্যান্টনমেন্টে। তখন ওদের দমন করতে তো সেই আমাদেরই ডাকতে হবে। নিজেদের তো আওকাদ নেই তোমাদের।”

সাহিলের চোয়াল একটু শক্ত হয়ে স্বাভাবিক হয়ে গেল, “জি জনাব, সেই খোঁজটা আমরা রাখছি। চিন্তার কিছু নেই।”

রুমান উঠে দাঁড়াল। সাহিলের কাছে এসে সাহিলের গা থেকে গন্ধ শোকার অভিনয় করে বলল, “তোমার গা থেকে বালোচের গন্ধ আসছে। তুমি বালোচ, তাই না?”

সাহিল বলল, “জি জনাব। কিন্তু আমি দেশদ্রোহী নই। আমি পাকিস্তানকে ভালোবাসি। পাকিস্তানের জন্য নিজের জান কুরবান করতে পারি।”

রুমান বলল, “তোদের কোন বিশ্বাস নেই রে বালোচ কুত্তার দল। তোরা কারো না।”

সাহিল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

রুমান বলল, “আহমেদ সাব তোর উপর ভরসা করেছে? আমি তোকে ভরসা করি না।”

সাহিল বলল, “আপাতত আমাকে বিশ্বাস করা ছাড়া কোন উপায় নেই জনাব। কালকেই আপনাদের কান্দাহার রওনা হতে হবে। এই অল্প সময়ের মধ্যে কি নতুন এজেন্ট পাওয়া যাবে?”

রুমান হো হো করে হেসে উঠে বলল, “বাহ। তুই ভাল কথা বলতে পারিস দেখছি। আমি জানতাম তোর বুদ্ধিশুদ্ধি কম। নাহ, তোর বুদ্ধি আছে। শোন, আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা কর। এখানে কী খাব আমরা?” সাহিল বলল, “আমার গাড়িতে সব নিয়ে এসেছি জনাব।”

রুমান বলল, “সব এনেছিস? জেনানা এনেছিস?”

সাহিল থতমত খেয়ে গেল। রুমান হেসে উঠে বলল, “যা কুত্তা, তুই বেরিয়ে যা। তোর বাপকে পাঠা। বল রুমান আলী চাকরদের সঙ্গে কথা বলে না। মালিক কথা বলবে মালিকের সঙ্গে। ঠিক আছে?”

সাহিল মাথা নাড়ল। রুমান বলল, “যা। তোর সাবকে পাঠা। যা যা।”

সাহিল বেরিয়ে গেল।

রুমান আবার চেয়ারে গিয়ে বসে তার এক সাগরেদকে বলল, “বিলালকে এখানে আসতে বল। এদের আমি বিশ্বাস করি না। বালোচ মানেই কুত্তার বাচ্চা।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *