১০
“এই মুহূর্তে গদার (Gwadar) বন্দরের পুরো দখল বেজিং নিয়ে নিয়েছে। ইসলামাবাদের সঙ্গে বেজিঙের চুক্তি অনুযায়ী গদার পোর্ট ডেভেলপমেন্টে বেজিং কয়েকশো কোটি টাকা ইনভেস্ট করবে। পরিবর্তে ওই বন্দর পাকিস্তান তার বন্ধু রাষ্ট্র চিনকে ব্যবহার করতে দেবে। আফতাব বালোচকে নিয়ে পাকিস্তানের ভয় হল আফতাব যদি ওখানে কোন রকম সমস্যা তৈরি করে, তাহলে চিনের সঙ্গে একটা সমস্যা তৈরি হবে। ওরা যে করেই হোক আফতাবকে খুঁজবে এবং গুম খুন করবে।”
সিরাজ কথাটা বলে বাকি দুজনের দিকে তাকালেন।
রাণা, সিরাজ এবং ভেঙ্কট রাণার ঘরে মিটিং করছেন।
রাণা বললেন, “বাজ কখন আমাদের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করবে? ওকে কি এজেন্সি ডিজ-ওন করেছে?”
সিরাজ বললেন, “বাজ বিষয়ে কোন কথা বলতে চিফ যখন বারণ করেছেন, তখন থাক। আমরা অন্য দিক থেকে ব্যাপারটা এসেস করার চেষ্টা করি।”
ভেঙ্কট বললেন, “কিন্তু এই মুহূর্তে বাজকে পেলে আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর চলে আসত, সেটা কী করে উড়িয়ে দেব?”
সিরাজ বললেন, “লিভ হিম। উই ডোন্ট হ্যাভ এক্সেস টু বাজ। সো লিভ হিম। এবার অন্য কথায় আসি। গদারের ব্যাপারে পরে আসছি, তার আগে বলি, আমাদের একজন অ্যাসেট আছে কোয়েটায়। সে একটা মেসেজ করেছে যে গত তিন চার দিনে কোয়েটার নিরাপত্তা অনেকটা বেড়ে গেছে। মেজর জেনারেল লেভেলের কেউ একজন কোয়েটায় যাচ্ছে। এবার কোয়েটায় একটা ক্যান্টনমেন্ট বেস আছে। সেখানে যদি মেজর জেনারেল যায়ও, তাহলে আলাদা করে নিরাপত্তার দরকার থাকার কথা নেই। অ্যাসেটের হিসেব বলছে কোয়েটায় আরো বড় কিছু হতে পারে। সেটা বালোচ মুভমেন্ট দমন করতে পাকিস্তান আর্মির কোন মুভমেন্ট হতে পারে বা এরকম কিছু।”
রাণা অধৈর্য গলায় বললেন, “কী ইন্টারেস্টিং ব্যাপার বল তো! আর আমরা কী করছি? অফিসে বসে আলোচনা করছি। ইচ্ছে হচ্ছে এখনই চলে যাই।”
সিরাজ ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “এখানে আবেগকে না নিয়ে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমরা এখান থেকে যতটুকু করতে পারি, ততটুকুই করব। তার বেশি কিছু করব না।”
রাণা বললেন, “কী করতে পারি এখানে বসে আমরা? আখরোট খেতে পারি, আর কী করতে পারি?” ভেঙ্কট বললেন, “তোমরা প্লিজ নিজেদের মধ্যে ঝামেলা কোর না। কাজের কথায় এসো। কোয়েটার ব্যাপারে আমাদের নজর তো রাখতেই হবে। আচ্ছা, ওরা আবার এরকম কোন খোঁজ পায় নি তো যে, আফতাব কোয়েটার কাছাকাছি আছে? কিংবা আফতাবকে ওরা কোন প্রলোভন দিয়ে কিনে নিয়ে মেজর জেনারেলের সঙ্গে মিটিং এ বসাচ্ছে না তো?”
সিরাজ মাথা নাড়লেন, “বালোচ যোদ্ধাদের পৃথিবীর সব সম্পদ এনে দিলেও ওরা বিক্রি হবে না। মিটিং এর কোন গল্প নেই। তাই তোমার দ্বিতীয় সন্দেহটা নাল এন্ড ভয়েড। প্রথম সন্দেহটা যদি সত্যি হয়, তাহলে চিন্তার ব্যাপার। কিন্তু আফতাব কোয়েটায় যাবেই বা কেন?”
রাণা বললেন, “আমার মাথা কাজ করছে না। সব কেমন তাল গোল পাকিয়ে যাচ্ছে। তিনটে জিনিসে এসো। এক, গদার পোর্ট। এখানে কিছু হলে চিন পাকিস্তানের সমস্যা তৈরি হবে। তাই বলতে চাইছ ওখানে আফতাব যাতে না যায়, তার জন্য পাকিস্তান একটা মরিয়া চেষ্টা করছে আফতাবকে ধরার জন্য। দুই, কোয়েটায় পাকিস্তানের হঠাৎ নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেওয়া। আর তিন, আমাদের এজেন্ট বাজের সঙ্গে আমাদের সব রকম যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাওয়া। বাজ আমাদের সঙ্গে কোন যোগাযোগ করছে না। তার মানে আমাদের হাতে রইল কী? আমরা কার থেকে খবর পাব? কারো থেকে না, এখান থেকে দেখা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই।”
ভেঙ্কট বললেন, “যদি না চিফ আমাদের ওখানে আণ্ডার কভার হিসেবে পাঠান। আমরা চিফকে একটা প্রপোজাল দিতেই পারি। মিশন বালোচ। আমি যেতে রাজি আছি।”
রাণা বললেন, “আমিও। সিরাজ কী বলছ?”
সিরাজ বললেন, “আমার কোন অসুবিধে নেই। কিন্তু প্রথম থেকেই চিফ তার ভিউ ক্লিয়ার করে দিয়েছেন। আমার মনে হয় না এটায় উনি রাজি হবেন।”
রাণা বললেন, “তাহলে কী করা যায়?”
সিরাজ বললেন, “অপেক্ষা। এবং আরো ইনফরমেশন অ্যাকিউমুলেট করা। আর কিছু করার নেই এখন।” বাকি দুজন ফ্যাকাসে মুখে সিরাজের কথা মেনে নিলেন।
১১
বস্তিতে নিজের গুমটিতে ফিরে সৈকত খাটিয়ায় বসল চুপ করে। শোয়েব বলল, “বিরিয়ানি ভাল খেলে তো?”
সৈকত বলল, “সে ভাল খেলাম কিন্তু সাদ্দার বাজারের ঘটনাটা কেমন কেমন লাগল। এখানে কবে থেকে রাস্তাঘাটে লোকজন দাঁড় করিয়ে আইডি চেক করতে শুরু করল?”
শোয়েব বলল, “আমাদের গ্রামে এসব অভ্যাস আছে। বালোচ মুভমেন্ট শুরু হলেই পাকিস্তান সরকার ধরপাকড় করতে শুরু করে। তুমি লাহোরী লোক, আমাদের কষ্ট কী করে বুঝবে?”
সৈকত শোয়েবের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেমন কষ্ট?”
শোয়েব বলল, “বালোচেরা খুব স্বাধীনতা প্রেমী জাতি। মাঝে মাঝেই সরকারের সঙ্গে বালোচদের কিছু না কিছু নিয়ে ঝামেলা লেগে যায়। এখন যেমন আফতাব বালোচ একটা সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করেছে, তাতেই পাকিস্তান সরকারের মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেছে।”
সৈকত বলল, “তা তো করবেই। আমাদের সরকার কেনই বা বিদ্রোহ চুপ করে সহ্য করবে?”
শোয়েব রেগে গেল, “তুমি এসব অন্তত বোল না দোস্ত। তুমি জানো না বালোচদের কত কিছু সহ্য করতে হয়। বিদ্রোহ করবে না কেন? কাশ্মীরিদের কি ইন্ডিয়ানরা কম অত্যাচার করে? সেরকম বালুচিস্তানেও
পাকিস্তান সরকার বালোচদের উপর অত্যাচার করছে। তুমি নিশ্চয়ই কাশ্মীরিদের আজাদিকে সমর্থন কর। তাহলে বালোচদেরও তোমার সাপোর্ট করা উচিত।”
সৈকত বলল, “যদি এভাবে রাস্তা ঘাটে দাঁড় করিয়ে খোঁজ খবর নিতে শুরু করে, তাহলে অনেক কিছুই নতুন করে ভাবতে হয়, সেটা তুমি ঠিকই বলেছ। আচ্ছা, বালোচদের উপর এরা কী ধরণের অত্যাচার করে?”
শোয়েব বলল, “সব ধরণের। সব থেকে বাজে ব্যাপার হল পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে তালিবানের অলিখিত ব্যাপার স্যাপার আছে। আফগানিস্তান থেকে খেদানি খেয়ে আসা তালিবানরা পাকিস্তানের বালোচদের উপর অত্যাচার করলে পাকিস্তান সরকার চুপ করে থাকে। তাদের কোন নিরাপত্তা দেয় না। কোন বালোচ যদি প্রতিবাদী হতে যায়, তখন পাকিস্তানী সেনা সেসব বালোচ ফ্যামিলির মেয়েদের তুলে নিয়ে যায়। অত্যাচার কম হয় না।”
শোয়েব রীতিমত ফুঁসতে শুরু করল।
সৈকত শোয়েবের কাঁধে হাত রাখল, “আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি মাথা ঠাণ্ডা কর। এত রেগে যেতে হবে না।” শোয়েব বলল, “আমাদের সমস্যা কী জানো তো, আমাদের কথা কেউ বলে না। বলতে গেলেই আমাদের দেশদ্রোহী দাগিয়ে দেওয়া হয়। মানুষ নিজের সমস্যার কথা বললে কীভাবে দেশদ্রোহী হয়ে যায়? তুমিই বল।”
সৈকত বলল, “ঠিক আছে। তুমি উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছ।”
শোয়েব বলল, “হচ্ছি না। বরং আমার মাঝে মাঝে মনে হয় এসব কাজ ছেড়ে টেড়ে দিয়ে লিবারেশন আর্মিতে জয়েন করে যাই। শুধু আব্বু, আম্মির মুখ চেয়ে করতে পারি না।”
সৈকত বলল, “বেশ কর। তুমি মন দিয়ে সেটাই কর।”
শোয়েব বলল, “আচ্ছা মিয়াঁ, তুমি ওই দোকানে হঠাৎ করে কোরিয়ান ফোন খুঁজতে গেলে কেন? কী মনে করে তুমি কোরিয়ান ফোনের কথা বললে?”
সৈকত হাসল, “আরে, আধ খোলা দোকান, আমার কী মনে হল ঢুকে গেলাম। তারপর যখন প্রশ্ন করতে শুরু করল, আমার মাথায় যা এল, তাই বলে দিলাম। অতো ভেবে তো কিছু করি নি।”
শোয়েব বলল, “ওই অর্ধেক বন্ধ হওয়া দোকানে কি কিছু থাকতে পারে বলে তোমার মনে হয়, যার জন্য ওভাবে লোকটা তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিল?”
সৈকত মনে মনে শোয়েবের বুদ্ধির তারিফ করে বলল, “হতে পারে। ওই দোকানে কিছু ব্যাপার আছে যার জন্য আমরা ওই দোকানে ঢুকেছিলাম বলেই হঠাৎ করে আইডি চেক করার জন্য লোক চলে এল। কী ব্যাপার হতে পারে?”
শোয়েব বলল, “অনেক কিছু হতে পারে। আমি কানা ঘুষোয় শুনছিলাম আফতাব বালোচ করাচীর আশেপাশেই আছে। এরকম ব্যাপার হতে পারে হয়ত যে ওই দোকানের সঙ্গে আফতাবের কোন লিংক আছে বা পুলিশ ওখানে পাহারাদারি করছে।”
সৈকত না বোঝার ভান করল, “ছাড়ো। অতো কিছু বুঝতে যেও না। আমরা তো আর ঝামেলায় পড়ি নি, তাহলে এসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই।”
শোয়েব বলল, “পড়ি নি কিন্তু পড়তে কতক্ষণ? আল্লাহ যেন আফতাবকে সহি সালামাত রাখেন। ওর খেয়াল রাখুন উনি এই দুয়াই করি।”
সৈকত বলল, “নিশ্চয়ই ভাল রাখবেন। তুমি ভেবো না। আমিও আফতাবের ভাল থাকার জন্য দুয়া করব।” শোয়েব বলল, “সুক্রিয়া দোস্ত।”
সৈকত বলল, “কাল হয়ত আমি ডিউটি যাবো না। আমাকে একটা কাজে বেরোতে হবে। তুমি ডিউটি অফিসারকে বলে ম্যানেজ করে নিও। ঠিক আছে?”
শোয়েব অবাক হল, “কোথায় যাবে তুমি?”
সৈকত বলল, “আমার এক ফুফা থাকেন কাছে। কাল ডেকেছেন। কেন জানি না। গিয়ে দেখি।”
শোয়েব বলল, “আগে বল নি তো”!
সৈকত বলল, “আগে কি আমারও মনে ছিল, ওই বিরিয়ানি খাচ্ছিলাম যখন, তখন একটা ফোন এল না? ওই ফুফাই ফোন করেছিল। গিয়ে দেখে আসি।”
শোয়েব বলল, “ঠিক আছে। আমি বলে দেব। তুমি তো ছুটিই নাও না। মনে হয় না কোন অসুবিধা হবে।” সৈকত বলল, “সেই তো। আমার অগাধ ছুটি। ম্যানেজ করে নিও তাহলে।”
শোয়েব বলল, “বেশক।”
১২
রাত সাড়ে এগারোটা।
একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল রুমান আলীর গোপন আস্তানার বাইরে। মাত্র একজন দেহরক্ষী নিয়ে রফিক আহমেদ গাড়ি থেকে নেমে টর্চ জ্বালিয়ে সিগনাল দিলেন। মসজিদের দিক থেকে টর্চ জ্বলে উঠল। রফিক দেহরক্ষীকে বললেন, “তুমি এখানেই থাকো।
দেহরক্ষী বলল, “কিন্তু জনাব…”
রফিক বললেন, “এখানেই থাকো।”
দেহরক্ষী আর কিছু বলল না। টর্চের আলো দেখে মসজিদের দরজার কাছে রফিক পৌঁছে দরজায় ঠেলা দিতে দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে আওয়াজ – এল, “চলে আসুন জনাব।”
রফিক হলের ভেতর প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আলো জ্বলে উঠল ঘরের। জোরালো আলো না। মৃদু বাল্ব।
রুমান মেঝেতে কার্পেট পেতে বসে আছে। রফিক কার্পেটে বসলেন। রুমান বলল, “ মেজর সাব এসে গেছেন?”
রফিক বললেন, “হ্যাঁ। হোটেলে আছেন।”
রুমান বলল, “আমারও হোটেলেই থাকা উচিত ছিল, তাই না জনাব? কেন আর এভাবে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে? আপনিই এন ও সি দিলেন না।”
রফিক বললেন, “আমি চাইলে কালকের ব্যাপারটাকেও এন ও সি দিতাম না। সব কিছু তো আমার হাতে নেই।”
রুমান বলল, “অথচ প্রতিবার ইন্ডিয়ায় বড় বড় অপারেশনগুলো করার সময় আমাদের কাছেই আপনাকে আসতে হয়। বলুন?”
রফিক বললেন, “সেটাও আমরা যতটা পারি দূর থেকেই করার চেষ্টা করি। কালকের ব্যাপারে আপনি এমন জেদ করতে শুরু করলেন, আমি তো বুঝতেই পারলাম না কেন এত জোরাজুরি করলেন।”
রুমান বলল, “বালোচ কুত্তাগুলোর ভয়ে কত আর লুকিয়ে থাকবেন জনাব? কী ভয় পাচ্ছেন? এখনো বালোচরা কিছু করতে পারে?”
রফিক বললেন, “পি এম সব শুনে খুব রাগারাগি করছেন।”
রুমান বিদ্রূপের হাসি হাসল, “পাকিস্তানের পি এম? আপনি বলুন, আমরা কালকেই পাল্টে দিচ্ছি। সেটা কোন ব্যাপার হল নাকি? ওরা তো আমাদের কথাতেই উঠবে বসবে। ওদের অতো গুরুত্ব দেওয়ার কোন দরকার নেই।”
রফিক শ্বাস ছাড়লেন, “ঠিক আছে। গুরুত্ব দেব না। এবার বলুন আপনি কাল কী প্ল্যান করছেন।”
রুমান বলল, “প্ল্যান খুবই মামুলি। বাইরের সবাই জানবে মেজর সাব বর্ডার দেখতে যাবেন। সব ঠিক আছে নাকি দেখতে যাবেন। কান্দাহার বর্ডারে এমনিতেই ঝামেলা কম। আমরা ওই সুযোগে আফগানিস্তান চলে যাব। এর পর আরেকদিন কষ্ট করে মেজর সাব আসবেন না হয়।”
রফিক বললেন, “কোন সামান (মালপত্র) যাবে না তো?”
রুমান হালকা গলায় বলল, “ওই দুটো বড় ট্রাঙ্ক যাবে। ও তো যেতেই পারে। তাই না? অসুবিধে হবে নাকি?”
রফিক চিন্তান্বিত ভঙ্গীতে ভ্রূ চুলকে নিয়ে বললেন, “ঠিক আছে।”
রুমান বলল, “এবার আপনি বলুন। রাস্তার রিপোর্ট কী? ঠিক আছে?”
রফিক বললেন, “অল ক্লিয়ার। কোন অসুবিধা হবার কথা না।”
রুমান বলল, “তাহলেই ভাল। মেজর জেনারেল সাবের কোন অসুবিধা না হলেই হল। আমার তো দুর্গম পথে যেতে অসুবিধা হয় না। খুব ভাল করেই জানেন আজাদ কাশ্মীরে আনাগোনা করা অভ্যাস আছে আমার। আপনার মেজর সাবের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনাদের।”
রফিক বললেন, “ঠিক আছে। কনভয় থাকবে। সমস্যা হবে না ইনশা আল্লাহ।”
রুমান বলল, “বালোচ কুত্তারা ঘেউ ঘেউ করবে না তো, বলুন?”
রফিক বললেন, “না। ওদের এত লোকবল নেই।”
রুমান বলল, “আপনার উপর ভরসা করছি। পাকিস্তান আর্মি নিশ্চয়ই খুব ভাল করে জানে আমরা তাদের কতভাবে সাহায্য করি।”
রফিক বিরক্ত গলায় বললেন, “আপনি বার বার আমাকে এগুলো মনে করিয়ে দিতে চাইছেন কেন? আমরা সবাই আছি যখন, স্বয়ং মেজর জেনারেল সার এসেছেন যখন, আপনার তো অসুবিধা হবার কথা না। তারপরেও আমাদের বন্ধুত্ব সম্পর্কে আপনি কেন সন্দেহ প্রকাশ করছেন?”
রুমান ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করল। রফিক বললেন, “কী হল?”
রুমান হাত তালি দিল।
একজন আধমরা মানুষকে ঠেলতে ঠেলতে হলের মধ্যে নিয়ে এসে রফিক সাহেবের সামনে ফেলল রুমানের লোকেরা। রুমান লোকটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বল, কাল কী হবে?”
লোকটা যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে রফিকের দিকে তাকিয়ে বলল, “হামলা করবে আব্বাসাবাদের রাস্তায়। প্ল্যান হয়েছে।”
রফিক আহমেদের মুখ ফ্যাকাসে হয় গেল।
রুমান বলল, “দেখেছেন জনাব? আপনাদের ইন্টেলিজেন্সের উপর ভরসা করে থাকলে কী হত আমার? বুঝতে পারলেন?
রফিক আমতা আমতা করে বললেন, “আমি দেখছি কী করা যায়।”
রুমান ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, “আপনি আর কী করবেন? যা করার আমাকেই করতে হবে।”
১৩
ভোর সাড়ে পাঁচটা। ডিউটি বাসে করে বন্দরে প্রবেশ করল শোয়েব। চেক পোস্ট সেনাদের দখলে চলে গেছে। এত সেনা দেখে অবাক হল না সে। মাঝে মাঝেই সেনার সংখ্যা বেড়ে যায়। আই কার্ড দেখিয়ে গেটের ভিতরে ঢুকতে যেতেই একজন সেনা অফিসার আটকাল তাকে, “শোয়ের বালোচ। এদিকে এসো। কাল তুমি সাদ্দার বাজারে গেছিলে না?”
শোয়েব অবাক হয়ে অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ। কেন?”
অফিসার বলল, “তোমার সঙ্গে আরেকজন ছিল। সে কোথায়?”
শোয়েব বলল, “ছুটি নিয়েছে। ওর ব্যক্তিগত কাজ আছে। কেন জনাব?”
অফিসার শোয়েবের আপাদমস্তক দেখে বলল, “গাড়িতে ওঠো।”
শোয়েব বলল, “আমার ডিউটি আছে, মর্নিং শিফট।”
অফিসার শোয়েবের ঘাড় ধরে জোর করে জিপে তুলে দিয়ে বলল, “চল। অনেক শিফট করার বাকি আছে তোর।”
এই অতর্কিত হামলায় শোয়েব হকচকিয়ে গেল। জিপের দরজায় ধাক্কা খেয়ে তার ঠোঁটের কোণ থেকে রক্ত বেরিয়ে গেল। তাকে জোর করে জিপে তুলে জিপে অফিসারও উঠে বলল, “কোথায় থাকিস? এই ব্যাটা কোথায় থাকে? নিয়ে চল।”
শোয়েব বলল, “ওড়াঙ্গি টাউন বস্তিতে।”
অফিসার বলল, “সেখানেই তো থাকবি। আর ওই ব্যাটার নাম কী?”
শোয়েব বলল, “ফারুক।”
অফিসার বলল, “কাল তোদের যখন আই ডি দেখতে চাওয়া হল, তখন দেখাস নি কেন?
শোয়েব বলল, “জনাব, আমরা তো বুঝতেই পারি নি কী হচ্ছিল। কেউ তো এরকম করে আই ডি দেখতে চায়ও না। তাছাড়া ফারুক লাহোরের ছেলে। ও আরো জানে না যে এখানে এরকম ধরপাকড় চলে।”
অফিসারের ভ্রূ কুঁচকাল, “লাহোরের ছেলে? কবে এসেছে এখানে?”
শোয়ের বলল, “আমার সঙ্গে ছ’মাস হল কাজ করছে।”
অফিসার বলল, “তুই ওর বাড়ি গেছিস কোনদিন?”
শোয়েব বলল, “কী করে যাবো জনাব? কন্ট্রাক্টার সাব ছুটি দিলে তবে তো যাবো। আমাদের জান কয়লা হয়ে যায় কাজ করতে করতে।”
অফিসার বলল, “ওর চেনা জানা কেউ এসেছিল এর মধ্যে?”
শোয়েব বলল, “না।”
অফিসার বলল, “তোর কথা বল। তুই বালোচ। কোথায় বাড়ি?”
শোয়েব বলল, “গ্রামে। শেখাবাদের কাছে আমার গ্রাম জনাব।”
অফিসার বলল, “খোঁজ নিলে জানা যাবে তো? নাকি তুই মুভমেন্টে আছিস?”
শোয়েব বলল, “জনাব আপনি খোঁজ নিয়ে দেখুন। আমি ওসব করি না। আর ফারুকও খুব ভাল ছেলে। এখনও ঘুমোচ্ছে দেখবেন গিয়ে। ওর এক ফুফার বাড়ি যাবে আজ। আমরা সাধারণ মানুষ, পেটের দায়ে খেটে খাই জনাব।”
অফিসার পকেট থেকে রুমাল বের করে শোয়েবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ঠিক আছে, রক্ত মুছে নে। ঠোঁটের কাছ থেকে রক্ত বেরোচ্ছে।”
শোয়েব রুমালটা নিয়ে বলল, “শুক্রিয়া জনাব।”
ওড়াঙ্গি বাজারে পৌঁছে গাড়ি থামিয়ে গুমটির দিকে হাঁটতে শুরু করল শোয়েব। অফিসার তিনজন সুবেদারকে নিয়ে রওনা হল শোয়েবের সঙ্গে। বস্তির লোকজন কেউ সবে ঘুম থেকে উঠে গুমটির বাইরে গিয়ে বসেছে, কেউ বা জল নিতে লাইন দিয়েছে। সেনা দেখে ঘাবড়ে গেল অনেকেই। কেউ সেলাম ঠুকল। অফিসার কাউকেই পাত্তা না দিয়ে শোয়েবের পিছন পিছন হাঁটতে থাকল। শোয়েব তার গুমটির কাছে গিয়ে বলল, “জনাব এটা আমার গুমটি, আর পাশের গুমটিটাই ফারুকের। আপনারা দাঁড়ান। আমি ওকে ডেকে দিচ্ছি।” শোয়েব সৈকতের গুমটির দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দরজায় তালা দেওয়া। অফিসার সেটা দেখে বলল, “তালা কেন? তুই যে বললি ফারুক ঘুমোচ্ছে এখন?”
শোয়েব তড়িঘড়ি তার ফোন বের করে সৈকতের নাম্বার ডায়াল করল। ফোন নাম্বার আউট অফ রিচ বলছে। শোয়েবের মুখ দেখে অফিসার কিছু একটা আঁচ করল। বলল, “কী হয়েছে?”
শোয়েব বলল, “ফোনে কোন প্রব্লেম হয়েছে মনে হচ্ছে জনাব। আউট অফ রিচ বলছে।”
অফিসার একজন সুবেদারের দিকে তাকিয়ে বলল, “তালা ভাঙো। এখনই।”
সুবেদার রাইফেলের বাট দিয়ে তালায় জোরে মারল। তালা একবারেই ভেঙে গেল। দরজা ঠেলে খুলে ঘরের ভিতরে ঢুকে দেখা গেল ঘর পুরো খালি। একদম সাফসুতরো। খাটিয়াটা দাঁড় করিয়ে রাখা। অফিসার বলল, “বাহ। পাখি পালিয়ে গেছে। এই এদিকে আয়।”
শোয়েবকে টেনে নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে অফিসার বলল, “দেখা, কোথায় তোর ফারুক ঘুমোচ্ছে। দেখা দেখা।”
শোয়েব হাঁ করে ঘরের চারদিক দেখতে থাকল। তার মাথা ঘুরাতে শুরু করল। সে মেঝেতে বসে পড়ল।
অফিসার বলল, “চল চল, আমার সঙ্গে চল। তোকে এখন অনেক দরকার আমাদের।”
শোয়েবকে টানতে টানতে বস্তির সবার সামনে দিয়ে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তোলা হল।
১৪
সকাল সাড়ে সাতটা। কোয়েটা কান্দাহার হাইওয়ে। পাহাড়ি রুক্ষ রাস্তার এক দিক দিয়ে গ্রামের রাস্তা চলে গেছে। সে রাস্তা এসে মিশেছে হাইওয়েতে। পাথরের আড়ালে জাহির এবং আসগর চুপ করে বসে আছে। আকাশ ঘোলাটে হয়ে আছে। এ অঞ্চলে বৃষ্টি একেবারেই হয় না। তবু আকাশ দেখলে বৃষ্টি হবার আগের পরিস্থিতি বলে মনে হতে পারে।
গাড়ির শব্দ শুনে সচকিত হল দুজন। তৈরি হল। এই সেই মুহূর্ত, যার জন্য তারা অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু না, কোন কনভয় এল না তো! একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল গ্রামের রাস্তার মুখে। আসগর এবং জাহির পরস্পরের দিকে তাকাল। গাড়িটা থেকে কেউ নামল না। দুজনে দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। অদ্ভুত তো! গাড়িটা এখানেই দাঁড়াল কেন? এখন যদি কনভয়টা যায়, তাহলে তো কিছু করাও যাবে না।
জাহির এবং আসগর চুপ করে বসে রইল।
সময় কাটছে। অদ্ভুত ব্যাপার! কনভয়ের আসার সময় হয়ে গেছে তবু এল না! গাড়িটাও নড়ছে না। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে ভুগতে দুজনেই পাথরের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এল। গাড়িটার ভিতরে কারা আছে দেখার অদম্য ইচ্ছে হচ্ছিল তাদের। রাইফেল উঁচিয়ে এগিয়ে গিয়ে গাড়ির কাছে অবধি আর যেতে পারল না তারা। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির দরজা খুলে অটোমেটিক মেশিনগান থেকে তাদের দুজনকে আক্রমণ করল জনা চারেক লস্কর জঙ্গী।
সামলে ওঠার সময়ই পেল না তারা। মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ল দুটো রক্তাক্ত মৃতদেহ। চারজন হাসতে হাসতে গাড়িতে উঠে উপরমহলে খবর দিল। গাড়িটা চলে যাওয়ার অনেকক্ষণ অবধি লাশদুটো পড়ে রইল। কনভয় ততক্ষণে অন্য রুট ধরে কান্দাহারের পথে রওনা দিয়েছে। মেজর জেনারেলের পাশে বসে রুমান আলি খবরটা পেয়ে জেনারেল কাদিরকে বলল, “দুটো বালোচ কুত্তা খতম করা গেল সকাল সকাল। এরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। জনাব রফিক সাব ওই রুটটাকেই এন ও সি দিয়ে দিয়েছিলেন। আপনার আই এস আইয়ের হালত খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে জনাব। কিছু করুন।”
জেনারেল কাদির বললেন, “এ অঞ্চলে আই এস আই এর থেকে আপনার নেটওয়ার্ক বেটার থাকবে, সেটা তো জানা কথা ছিল। এটা নিয়ে আপনার আলাদা করে গর্ব করার কিছু আছে কি?”
রুমান জোরে হেসে উঠে বলল, “এটাই তো রফিক সাহেবদের দিয়ে স্বীকার করানো যায় না জনাব। আপনি বললেন, এটাই একটা বড় সার্টিফিকেট হয়ে রইল আমার কাছে।”
কাদির বাইরের দিকে তাকালেন। রাস্তার আশে পাশে বেশিরভাগ জনপদই পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। এক দিকে তালিবান, অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতা, তার উপর জলের আকাল, সব মিলিয়ে এ অঞ্চলগুলো একবারেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। সেনার নজরদারি এড়িয়ে অনেক জায়গাতেই বালোচ লিবারেশন বাহিনীর আড্ডাও তৈরি হয়েছে। রুমানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কাশ্মীরে ইন্ডিয়া প্রচুর সেনা মোতায়েন করেছে। বাড়ি বাড়ি চিরুনি তল্লাশি করছে। বালুচিস্তানের কিছু জায়গায় আমি আরো অনেক বেশি করে সেনা মোতায়েন করার সুপারিশ করব ঠিক করেছি।”
রুমান বলল, “অতো তকলিফ করতে যাবেন কেন জনাব? আমরা আছি তো, সব ঠিক করে দেব। যেভাবে আব্বাসাবাদের দুটো কুকুরকে মারলাম, সেভাবেই সব বালোচ বিপ্লবী মেরে দেব একদিন। এদের অতো শক্তি কোথায়?”
কাদির বিরক্ত হলেন। রুমানের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বিরক্ত করছিল তাকে। এই লোকটার সঙ্গে এক গাড়িতে যাবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না তার। প্রয়োজনে এদের মত মানুষদের সঙ্গে তাকে যেতে হচ্ছে, নইলে কোন দিন এদের এত মাথায় তোলার পক্ষপাতী তিনি নন। রুমান যেভাবে বালোচদের কুকুর বলছে, তিনিও রুমানদের এরকম কুকুর বলেই মনে করেন। পাকিস্তানের পালন করা রাস্তার কুকুর এই সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো। পাকিস্তান না থাকলে এরা কোথায় যেত? কে পাত্তা দিত এদের? অথচ এদের ঔদ্ধত্য এখন এতটাই সীমাহীন হয়ে গেছে যে তার মত পদস্থ অফিসারকে পর্যন্ত এত বড় ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। এমন একটা দিন আসবে, যেদিন এই কুকুরগুলোকে ব্যবহার করে ছিবড়ে করে দিয়ে রাস্তার পাশে গুলি করে ফেলে রাখা হবে। সেই দিনটায় সব থেকে বেশি খুশি হবেন তিনি।
এখন দু ঘণ্টা এর সঙ্গে যেতে হবে। শ্বাস ছাড়লেন মেজর জেনারেল কাদির। কী বাজে কপাল তার! এসব মানুষের সঙ্গেও সময় কাটাতে হচ্ছে তাকে। এই সময় ইসলামাবাদ ক্যান্টনমেন্টে তার স্ত্রীর সঙ্গে কোয়ালিটি সময় কাটানোর কথা তার। তা না করে তিনি কী করছেন? রুমানের মত খুনির পাশে বসে কান্দাহার যাচ্ছেন। থুতু চলে আসছিল মুখে।
সেটাকে গিলে নিলেন মেজর জেনারেল।
