১৫
শোয়েবকে একটা ঘরে বন্দী করে একটা ছেঁড়া বস্তার উপরে বসিয়ে রাখা হয়েছে। অফিসার ঘরটায় ঢুকে শোয়েবের সামনে চেয়ার নিয়ে বসে সিগারেট ধরিয়ে বলল, “শোয়েব বালোচ। তুই যা বলেছিস, ঠিকই বলেছিস। আমাদের তোর দেওয়া তথ্য নিয়ে তোর কোন সমস্যা নেই। শুধু আমাকে বল তোর বন্ধু ফারুক সম্পর্কে তুই কী কী জানিস?”
শোয়েব কাতর গলায় বলল, “জনাব আমি ওর সম্পর্কে যা যা জানি, তার সবই তো আপনার আরো যদি কিছু জানার থাকে, তাহলে আপনি ডকে খোঁজ নিন। ও কী কী ডকুমেন্ট জমা দিয়েছিল কাজে জয়েন করার সময়, সেগুলো দেখুন। আমি এর বেশি আর কী জানতে পারি বলুন?”
অফিসার বলল, “ডক অফিসে জমা দেওয়া ওর সব কাগজপত্রই জাল। ও লাহোরের যে ঠিকানা দিয়েছে, সেখানে কেউ থাকেই না। এবার বল, এগুলো নিয়ে আমি কী করব? তোকে কোথায় কোথায় নিয়ে যেত ও? কে কে ওর সঙ্গে দেখা করতে যেত?”
শোয়েব বলল, “আমরা সারাদিন ডকে কাজ করতাম জনাব। ডকের সবাই দেখেছে। ঘরে ফিরে কিছু করার জায়গাতেই থাকতাম না। আমি যেমন ঘুমিয়ে পড়তাম, তেমন ফারুকও ঘুমত। অফ ডে গুলোতেও ও ঘুমিয়ে থাকতে চাইত। কাউকে ওর সঙ্গে দেখা করতে আসতে দেখি নি। বরং আমিই ওকে জোর করে নিতে যেতাম কোন অফ ডে পেলে।”
অফিসার বলল, “কোথায় নিয়ে যেতিস?”
শোয়েব বলল, “সিনেমা দেখতে কিংবা বিচে। একটা দিন ছুটি পেতাম। ওদিন যতটা হয়।”
অফিসার বলল, “সাদ্দার বাজারের ওই দোকানটায় ও কেন গেছিল তোকে কিছু বলেছিল?”
শোয়েব বলল, “ও বলেছিল দোকানের শাটার অর্ধেক খোলা দেখে ওর অদ্ভুত লেগেছিল তাই ও মজা করতে ওটার ভিতরে ঢুকে গেছিল।”
অফিসার পকেট থেকে কয়েকটা ছবি বের করে শোয়েবের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “এই তোর বন্ধু, তাই তো?”
শোয়েব ছবিগুলো দেখে বলল, “জি জনাব।”
অফিসার বলল, “এ তো আফতাব বালোচ না। তাহলে কে?”
শোয়েব বলল, “আপনাদের কোন ভুল হচ্ছে জনাব। ফারুক এসব করার ছেলেই না। ও খুব ভাল ছেলে। দেখবেন ও কাল পরশুর মধ্যেই ফিরে আসবে গুমটিতে।”
অফিসার বলল, “তুই গাধা বলে কি আমাদেরও গাধা মনে করিস? নকল আইডেন্টিটি কার্ড, নকল ঠিকানা দিয়ে যে কাজ করে, তাকে বিশ্বাস করব? তোকে আমরা এখন ছেড়ে দেব। কিন্তু মনে রাখবি, এই হারামখোরের কোন রকম খবর পেলেই আমাদের খবর দিবি। নইলে শুধু তুই না, তোর বাড়ির লোকের জীবনও ঘোর সংকটে পড়বে। বুঝেছিস?”
শোয়েব ঘাড় নাড়ল, “জি জনাব। আমি কোন ঝামেলায় নেই জনাব, আমাকে বিশ্বাস করুন।”
অফিসার এগিয়ে এসে শোয়েবের কাঁধে হাত রেখে বললাম, “আমি তোকে বিশ্বাস করছি বলেই এখন ছেড়ে দিচ্ছি তোকে। কিন্তু যা বলেছি, ভুলিস না। মাথায় রাখবি। ঠিক আছে?”
শোয়েব বলল, “জি জনাব।”
অফিসার বলল, “তুই তো কিছু খেয়ে আসিস নি, কী খাবি?”
শোয়েব বলল, “কিছু খাবো না জনাব। আমাকে ছেড়ে দিন। আজকের দিনের মজুরিটাও তো পাব না। আমি গরীব মানুষ, বাড়ির দায় দায়িত্ব আছে। আমাকে ছেড়ে দিন জনাব।”
অফিসার নরম হল। বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু তুই আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবি, ঠিক আছে? ওই ইবলিশের বাচ্চা যদি ডকে ঢোকার জন্য এত কাণ্ড করে থাকে, তাহলে ও এত সহজে পিছু হটবে না। ও আবার ডকে ঢোকার চেষ্টা করবে। তোর সঙ্গে যোগাযোগ করলেই তুই আমাকে খবর দিবি। ঠিক আছে?” শোয়েব বলল, “ঠিক আছে জনাব।”
রাতের দিকে বস্তির কাছে শোয়েবকে নামিয়ে দেওয়া হল। ক্লান্ত এবং বিধ্বস্ত অবস্থায় শোয়েব তার গুমটিতে ঢুকে বসে রইল। তার মাথা কাজ করছিল না। যার সঙ্গে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াত, নিজের ভাইয়ের মত যাকে ভালবেসে ফেলেছিল, তার এ হেন আচরণ কিছুই তার মাথায় ঢুকছিল না।
কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে, মাঝরাতে ঘুম ভাঙল দরজার ঠক ঠক শব্দে। সে উঠে বসে দরজা খুলল। সৈকত তার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, “কী বলল পুলিশ?”
শোয়েব রেগে গেল, “তুমি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো। তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাও। আমি তোমার সঙ্গে কোন কথা বলতে চাই না। তুমি জানো, তোমার জন্য আমার আব্বু আম্মির জীবন পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে গেছে? তুমি যাও, তোমার সঙ্গে কোন কথা নেই আমার।”
সৈকত হাই তুলে জলের বোতল থেকে অনেক খানি জল খেয়ে নিয়ে বলল, “এই কালকে তুমি আমায় বালোচদের নিয়ে কত জ্ঞান দিলে আর আজ পুলিশ আর আর্মি মিলে একটু ভয় দেখাল, তাতেই হালত খারাপ হয়ে গেল মিয়াঁ?”
শোয়েব ভ্রূ কুঁচকে বলল, “মানে? বালোচ এল কোত্থেকে?”
সৈকত বলল, “বস। আমি বেশিক্ষণ থাকব না। তোমার ঘরের উপর এমনিতেও নজর আছে ওদের। আমি অনেক ঝুঁকি নিয়ে এসেছি শুধুমাত্র তোমাকে এটুকু বুঝিয়ে যেতে যে তোমার কোন ক্ষতি আমি করতে চাই নি। আমি বালোচদের সাহায্য করার জন্যই এখানে আত্মগোপন করে ছিলাম।”
শোয়েব বলল, “আমি বিশ্বাস করি না।”
সৈকত তার ফোন বের করে গ্যালারি থেকে একটা ছবি শোয়েবকে দেখিয়ে বলল, “এই যে তোমাদের নেতা আফতাব আর আমি। দেখলে? এবার বিশ্বাস করবে?”
শোয়েব থ হয়ে কয়েক সেকেন্ড ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু তুমি বালোচের ভাষা জানো না। তুমি বালোচ না। তুমি কে তবে?”
সৈকত হাসল, “জানি। বলে শোনাব? শোন, আমি তোমার বন্ধু। আমাকে ভুল বুঝো না দোস্ত। এটুকু জেনে রাখো, আমি তোমার কোন ক্ষতি করতে এখানে আসি নি। ক্ষতি হতে দেবোও না কোন তোমার।”
শোয়েব বলল, “তোমাকে কিন্তু ওরা খুঁজে বেড়াচ্ছে। তুমি করাচী ছেড়ে পালাও।”
সৈকত বলল, “পালাবো তো, আজকেই পালাবো। কিন্তু পালানোর আগে তোমার সঙ্গে দেখা না করে কী করে যেতাম?”
শোয়েব বলল, “আর যদি আমাকে ওরা আটকে রাখত?”
সৈকত বলল, “ঠিক ছাড়িয়ে আনতাম।”
শোয়েব অবাক হয়ে বলল, “এত ক্ষমতা তোমার? কে তুমি?”
সৈকত বলল, “ওই যে বললাম, আমি তোমার বন্ধু। এখন আমি যাই দোস্ত, আশা করি আমার উপর এখন আর কোন রাগ নেই তোমার।”
শোয়েব বলল, “আমি জানি না কেন আমি তোমার উপর রাগ করতে পারছি না। অথচ রাগ করা উচিত ছিল। যাই হোক, তুমি সাবধানে থেকো। ওরা তোমাকে পেলে সহজে ছেড়ে দেবে না, এটুকু আমি বুঝেছি।” সৈকত বলল, “পাবে না। চিন্তা কোর না। আমি আসি। তুমি ভাল থাকো। কোনদিন যদি দেখা হয় তাহলে দেখা হবে।”
শোয়েব বলল, “দাঁড়াও দাঁড়াও। অফিসার বলছিল তুমি ডকে এতদিন যখন নাম ভাঁড়িয়ে কাজ করেছো, তাহলে আবার ওখানে তোমাকে ফিরতেই হবে। তুমি ওদিকে যেও না এখন। তাহলে ধরা পড়ে যাবে।” সৈকত বলল, “শুক্রিয়া দোস্ত। যাবো না ওদিকে। আপাতত ওদিকে যাবার দরকার পড়বে না। ভাল থাকো।” সৈকত শোয়েবকে জড়িয়ে ধরল। শোয়েব বলল, “তোমার কাছে রুপী আছে তো? না আমার থেকে নেবে? এখানে তো রূপীর দরকার পড়বে সে তুমি যেখানেই যাও।”
সৈকত বলল, “আছে, আছে। সেসব নিয়ে তুমি ভেবো না। ভাল থাকো। তোমার বিবি বাচ্চার সঙ্গে একদিন ঠিক দেখা হবে ইনশাল্লাহ।”
শোয়েব হেসে ফেলল। সৈকত শোয়েবের কাঁধে কয়েক সেকেন্ড হাত রেখে বেরিয়ে গেল।
শোয়েব দরজা বন্ধ করে চুপ করে বসে রইল অনেকক্ষণ।
তার দু চোখ জলে ভরে উঠল এতদিন ধরে চেনা ভেবে আসা অচেনা বন্ধুর জন্য।
১৬
“তারপর? তোমরা কতটা এগোলে?
তিনজন সামনে বসে আছেন।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে চিফ প্রশ্ন করলেন।
রাণা বললেন, “স্যার এই মুহূর্তে কোয়েটায় আই এস আই চিফ আছে। মেজর জেনারাল কাদির কান্দাহার বর্ডার ভিজিট করে আবার কোয়েটায় ব্যাক করেছে। এটা কোয়েটার নিউজ। হঠাৎ করে কান্দাহার বর্ডার ভিজিট করার কী হল, সেটা বুঝতে পারলাম না। ওই বর্ডার এমনিতেই ওদের কাছে সেফ জোন। তবু ওরা ওই সাইডে কেন গেল?”
চিফ বললেন, “অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। আই এস আই এর সঙ্গে তালিবানের রিলেশন তো খুব একটা খারাপ নয়। ওরা ওদের সেফ প্যাসেজ দিতে ওখানে যেতে পারে। তবে আর্মির হায়ার লেভেল অফিসাররা ওখানে গেলে বরং এক্সপোজ হবার চান্সটাই বেশি থাকে। তাহলে কী কারণ থাকোতে পারে?” চিফ পেপারওয়েট নিয়ে খেলতে শুরু করলেন চিন্তিত মুখে।
সিরাজ বললেন, “গদার পোর্টের কাজ আর চিনের হাইওয়ে তৈরির কাজ বেশ দ্রুত গতিতে চলছে। পাকিস্তানের মাঝ বরাবর এই হাইওয়ে যাবে। এই কাজ আটকাতে বালোচরা যা যা প্রোটেস্ট মুভমেন্ট করেছে, তা সবই কড়া হাতে দমন করেছে পাকিস্তান। বালোচিস্তানকে সেকেন্ড বাংলাদেশ ওরা কিছুতেই হতে দেবে না।”
চিফ বললেন, “সেটা জিওগ্রাফিকাল পজিশনের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানকে অ্যাডভান্টেজ দেবে। ইস্ট পাকিস্তান কন্ট্রোল করা ওদের কাছে কঠিন ছিল। বালোচদের কন্ট্রোল করা ওদের পক্ষে সহজ। তালিবানও ওদের পক্ষে আছে।”
সিরাজ বললেন, “সঙ্গে বেশ কয়েকটা টেরোরিস্ট অর্গানাইজেশনও। বালোচদের লড়াইটা খুবই কঠিন। একবার করে আন্দোলন দানা বাঁধে, কিন্তু কোন লক্ষ্যে পৌঁছবার আগে সেটা নষ্ট হয়ে যায়।”
রাণা বললেন, “আর আফতাব বালোচকেও আমরা ট্রেস করতে পারছি না। একজনই পারত কিন্তু…” রাণা চিফের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেলেন। চিফ বললেন, “যাই হোক, আমরা শুধু এজাম্পসান করে কোন কথা বলতে পারি না। পি এম ও থেকে ডাক পড়েছিল। ওখানেও পি এম সাব একই কথা বললেন। আমরা শুধুমাত্র কোন রকম আন্দাজের উপর ভর করে বালুচিস্তান নিয়ে কিছু বলতে পারি না। উই ওয়ান্ট কনক্রিট এভিডেন্স। রাণা, তোমার কোয়েটার অ্যাসেটকে যতটা পারো কাজে লাগাতে হবে। আমি ইসলামাবাদেও খবর পাঠাচ্ছি। বালুচিস্তানকে পি এম ফিফটিস্থ অগাস্টের স্পিচে ইনক্লুড করতে চাইছেন। কোন রকম এভিডেন্স ইজ ওয়েলকাম।”
ভেঙ্কট এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন। এবার নড়ে চড়ে বসে বললেন, “স্যার, বালুচিস্তান যদি ইন্ডিয়ান পি এম এর স্পিচে এড হয়, সেক্ষেত্রে পাকিস্তান আবার কাশ্মীর নিয়ে পড়বে না?”
চিফ বললেন, “পাকিস্তান কবে কাশ্মীর নিয়ে পড়ে না? ওদের কাজই তো কাশ্মীর নিয়ে হাওয়া গরম করে যাওয়া। এদিকে ওদের এল ও সির ওদিকটায় ওরা সযত্নে সব রকম অর্গানাইজেশনের আখড়া বানিয়ে রেখে দিয়েছে। ডলার পাঠানো চলছে। লোহাকে লোহা দিয়েই কাটতে হবে। পাকিস্তান কাশ্মীর তাস তুললে আমাদের বালুচিস্তান তাস দেখাতে হবে। এছাড়া কোন উপায় নেই।”
চিফের ফোন বেজে উঠল। চিফ ফোনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে ফোনটা ধরলেন, “হ্যালো।”
“স্যার কেমন আছেন? আরথ্রাইটিসের ব্যথাটা কমেছে?”
গলাটা শুনে চিফ রেগে গিয়ে বললেন, “আমাকে ফোন করার সাহস পেলে কোত্থেকে?”
“স্যার অনেক কষ্ট করে সাহস জোগাড় করেছি।”
চিফ কপালে হাত দিয়ে বললেন, “বল। তোমার কথা শোনার প্রবৃত্তি আমার হয় না, তবু বল। এতদিন তুমি কী করছিলে?”
“লেবারের কাজ করছিলাম স্যার। করাচী পোর্টে। দারুণ কাজ। জিমে যেতে হয় না। এমনিতেই বডি তৈরি হয়ে যায়।”
“পোর্টে? গদর পোর্টে না করে করাচী পোর্টে করছিলে? ভাল। কাজ না থাকলে যা হয় আর কী।”
“স্যার, গদর পোর্টের ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন অনেক কড়া ভাবে হয়। ওখানে ঢোকা অতো সোজা না। চেষ্টাও করি নি। করাচী ডক থেকেই গদরের সব খবর পাওয়া যায়। খামোখা অতো ঝামেলায় যাবো কেন?” “হু। তো, তারপর? এতদিন তো কন্ট্যাক্ট করার কথা মনেই হয় নি, এখন কেন মনে হল?”
“স্যার অকারণ কন্ট্যাক্ট করে হবেই বা কী? কোন লাভ আছে কি? সেভাবে কোন খবরও ছিল না। তবে এবার খবর আছে।”
চিফ বললেন, “বল। কী খবর আছে।”
“আফতাব বালোচ ওদের মাথা ব্যথায় পরিণত হয়েছে। করাচী থেকে শুরু করে সবখানেই ওরা আফতাবকে খুঁজে যাচ্ছে। সাদ্দার বাজারের একটা দোকানে আফতাব এসেছিল। সে খবর পাওয়ার পর আই এস আই পাগলের মত খুঁজছে ওকে।”
“তুমি জানো আফতাব কোথায় আছে?”
“আমি খুব কাছে চলে এসেছি। একটা লিড পেয়েছি। সমস্যা হল সাদ্দার বাজারে একটা ছোট ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলাম, আমাকে আবার কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। আমি একটা ছোট চান্স নিয়েছিলাম। দুঃখের বিষয়, ব্যাপারটা কাজে এল না। আপাতত ওরা আমাকে খুঁজছে। পাবে না, সেটা আলাদা কথা।”
চিফ বিরক্ত গলায় বললেন, “এই জন্য তোমার উপর আমার রাগ হয়। এত ওভার কনফিডেন্স নিয়ে কী করে থাকো তুমি? আর তুমি এখন এক্সপোজের ভয়টা পেয়েছ বলেই আমাকে ফোন করলে, তাই না?” “না স্যার, ওসব ভয় পাবো কেন? আপনার কি মনে হয় আমি ওসব ভয় পাই কোন কালে?”
“তাহলে কী চাও তুমি?”
“আমি না। আমি কেন চাইব স্যার? কাজটা কি আমি আমার জন্য করছি?”
“ঠিক আছে। তুমিই ঠিক। এখন আমরা কী চাইছি?”
“স্যার আমরা চাইছি বালোচিস্তানে পাকিস্তান ফৌজের দমন পীড়নের কিছু ছবি। সেগুলো আমি পেয়ে গেছি। আপনার কাছে পাঠাচ্ছি। আপনি মিডিয়ায় দিয়ে দিন। বাকিটা আপনি জানেন কী করতে হবে। আর রইল বাকি আফতাব বালোচ। আমি আমার মত করে চেষ্টা করছি। ভাল থাকবেন।”
“এর পরে ক বছর পরে আবার ফোন করবে তুমি? এত খামখেয়ালী হলে কী করে হয়?” “স্যার যেখানে থাকি, সেখান থেকে স্যাটেলাইট ফোন অ্যাক্সেস করার কোন চেষ্টা আমি করি নি। আপনিই তো শিখিয়েছিলেন, যে কাজ করব যেন নিষ্ঠার সঙ্গে করি, তাহলে আমি কেন অতো সহজে নিজেকে এক্সপোজ করতাম? ওরা আমার ছবি সাদ্দার বাজারের সিসিটিভি থেকে পেলেও আমাকে আইডেন্টিফাই করতে পারবে না। বালোচ মুভমেন্ট আবার মাথাচাড়া দেওয়া শুরু করলেই ওরা আমার ব্যাপারে ভুলে যাবে। তাই সময় আর সুযোগের অপেক্ষাতে আছি। আপনাকে হতাশ করব না স্যার, এটুকু কথা দিতে পারি।”
ফোনটা কেটে গেল।
চিফ কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে ফোনটা রেখে দেখলেন তিনজন তার দিকে অতি আগ্রহ সহকারে তাকিয়ে আছেন। চিফ বললেন, “এদ্দিন পরে তোমাদের চাহনেওয়ালা ফোন করেছিল। দেখি, বলল ইমেলে কী সব ছবি পাঠিয়েছে। দেখা যাক কী আছে, তোমরা আমার দিকে এসো। দেখি কী আছে।” সবাই চেয়ার ছেড়ে উঠে চিফের পিছনে এসে দাঁড়ালেন। চিফ মেইল বক্স খুললেন।
কুড়িটা ছবি পাঠিয়েছে সৈকত। কোন ছবিতে পাক আর্মি বালোচ লিবারেশনের আন্দোলনে আক্রমণ করছে, কোনটায় লিবারেশনের আন্দোলনের পতাকা পুড়িয়ে দিয়েছে, একটা ছবিতে গ্রামের রাস্তায় এক মহিলাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানী আর্মি। রাণা বললেন, “মাই গড। এই ছবিগুলো দিয়ে আমাদের অনেক কাজ হবে স্যার।”
চিফ খুশি না হয়ে বললেন, “এগুলো তো এমনিই পাঠানো যেত। এভাবে আমাকে চিন্তায় রেখে কোন যোগাযোগ না করে এতদিন পরে না পাঠালেও হত। আমি এই ছেলেটার সমস্যা বুঝি না। এত নিজের মর্জিতে কাজ করে, ভারি বিরক্তিকর।”
সিরাজ বললেন, “কিন্তু স্যার এটা বিরাট কাজ। এই ছবি পাকিস্তানী মিডিয়া কিছুতেই দেখাতো না। সব আটকে যেতো। প্রতিটা ছবি সোনার চেয়ে মূল্যবান।”
চিফ বললেন, “হু। আমি মিনিস্ট্রির সঙ্গে কথা বলে ছবিগুলো প্রেসে দিয়ে দিচ্ছি। দিস ইজ দ্য টাইম টু বিগিন আওয়ার মিডিয়া ক্যাম্পেইন। পাকিস্তান এই ছবিগুলো ইগনোর করতে পারবে না। ওরা বলবে এগুলো ডক্টরড। তার জবাবও তৈরি রাখতে হবে। সিরাজ, তুমি আমার সঙ্গে চল তো। দেখি মিনিস্টার সাহেব কোথায় আছেন।”
সিরাজ মাথা নাড়লেন, “শিওর স্যার। চলুন।”
১৭
ইসলামাবাদ ক্যান্টনমেন্ট।
মেজর জেনারেল কাদিরের বাংলোর সামনে ফিল্ড মার্শাল ইমতিয়াজ হুসেনের কনভয় এসে দাঁড়াল। মেজর জেনারেল কিছুক্ষণ আগে পৌঁছেছেন। ইমতিয়াজ হুসেন এসেছেন শুনে জেনারেল কাদির ড্রইঙ রুমে বেরিয়ে এলেন।
ইমতিয়াজ বললেন, “আপনি এখনই এলেন। আমি ভাবলাম একবার দেখা করে যাই।”
কাদির বললেন, “আমি ফ্রেশ হয়ে আপনার কাছেই তো যাচ্ছিলাম।”
কাদিরের ঘরে ইমতিয়াজের দেহরক্ষীরা ছিল। ইমতিয়াজ সবাইকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে বসলেন, “পি এম সাহাব এখনও ব্যাপারটা নিয়ে যথেষ্ট রেগে আছেন। বার বার বলেছেন আপনার যাওয়ার কোন দরকার ছিল না। আপনি ঠিক আছেন তো?”
কাদির বললেন, “আছি। তবে বালোচ লিবারেশন আর্মি যেভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, তাতে সমস্যা বাড়বে। আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন ওখানে আই এস আই এরও ইন্টেলিজেন্স ফেইলিওর ছিল। লস্করের ওখানে বেটার নেটওয়ার্ক আছে। ইভেন তালিবানেরও। আই অ্যাম সরি টু সে দ্যাট জনাব।”
ইমতিয়াজ বললেন, “আমাদের বালোচ অফিসাররা সব লয়াল তো? আপনি শিওর?”
কাদির বললেন, “সেটা জনাব আমরা ইসলামাবাদ থেকে কী করে জানব? তবে আমার মনে হয় বাহিনীর ভেতরেও ইন্টেলিজেন্সকে অনেক বেশি সক্রিয় হতে হবে। এই ব্যাপারটা তো আমিও ইগনোর করতে পারছি না। আমারও মাথায় এসেছে।”
ইমতিয়াজ বললেন, “ওই যে ছেলেটা, কোয়েটায় আমাদের এজেন্ট, সাহিল, ওর সঙ্গে কথা বলেছেন?” কাদির বললেন, “শো কজ করা হয়েছে। তবে হি ইজ ইনএফিসিয়েন্ট। আমাদের কোয়েটা সেক্টরে আই এস আইকে স্ট্রং করতে হবে। অন্যের উপর ভরসা করাটা অর্গানাইজেশনের পক্ষে সুস্থ ব্যাপার না।” ইমতিয়াজ মাথা নাড়লেন, “রাইট। এমনিতেও এরকম মিশনে আমাদের রাজি হওয়াটাই উচিত হয় নি। কিন্তু আমাদের কিছু করার ছিল না। পি এম সাহাব তো বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না আমরা এটা করতে যাচ্ছি। বার বার বলছিলেন সি আই এ জানতে পারলে সমস্যার পাহাড় তৈরি হবে। কিন্তু আমার হাত পা বাঁধা ছিল। আপনি না থাকলে হয়ত এত বড় ঝুঁকি নিতেই যেতাম না আমি। আপনাকে অনেক শুক্রিয়া। একটা বড় কাজ হল।”
কাদির বললেন, “আমি আমাদের ফিউচার প্রোজেক্টের কথা ভেবেই রাজি হয়েছিলাম জনাব। লস্করকে আমাদের কাশ্মীরে প্রয়োজন আছে। ইন্ডিয়া যেভাবে কাশ্মীরে সেনা বাড়িয়ে চলেছে, আমাদের একার পক্ষে সব কিছু সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।”
ইমতিয়াজ বললেন, “তা তো ঠিকই। উই নিড ডেম ইন কাশ্মীর। বাই দ্য ওয়ে, বেজিং থেকে আমাকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হয়েছে। ওরা গদার পোর্টের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। বালোচ মুভমেন্ট সামাল দিতে আমাদের কোন সাহায্য দরকার নাকি জানতে চাইছে। গদার পোর্টের বাইরেও ওরা হাইওয়ে সিকিউরিটির দায়িত্ব নিতে চাইছে বাই ইউজিং ড্রোন্স এটসেট্রা।”
কাদির বললেন, “চীনের সেনাবাহিনীকে আমাদের দেশের মধ্যে এভাবে সবকিছুতে এন্ট্রি নিতে দেওয়াটা তো মেনে নেওয়া যাবে না জনাব, সে বেজিং আমাদের নেতাদের যেভাবেই কিনে নিক। এই জায়াগায় আমার মনে হয় না চীনের প্রস্তাব মেনে নেওয়া উচিত। আমরা সরাসরি এই ব্যাপারে বিরোধ করব।” ইমতিয়াজ বললেন, “হ্যাঁ। আমারও সেটা মনে হয়। আমরা গদার পোর্ট সংযোগকারী হাইওয়ের নিরাপত্তা আরো বাড়িয়ে দিতে পারি, এ ছাড়া বেজিং এর কোন কথা শোনার দরকার নেই। আচ্ছা, রফিক ফিরেছেন, নাকি এখন কোয়েটাতেই আছেন?”
কাদির বললেন, “আমার সঙ্গে ফিরেছেন।”
ইমতিয়াজ বললেন, “বেটার। রাতে একটা মিটিং কল করছি তাহলে। আমরা ঠিক করে নি কোয়েটায় আই এস আই কোন পথে এগোবে, একই সঙ্গে গদার পোর্ট নিয়ে রফিক সাহেবের বক্তব্যটাও শোনা দরকার। আই এস আই যদি কোন ইনপুট দিতে পারে তাহলে দ্যাট উইল বি গুড়। এমনিতেই গদার পোর্টের ভেতরে চাইনিজ আর্মি যথেষ্ট সক্রিয়। তার বাইরে কোন রকম মুভমেন্টের বিরোধিতা করব আমরা।”
কাদির বললেন, “গদার পোর্টের ভিতর চাইনিজ এজেন্সি পাঁচশোর বেশি ক্যামেরা ইউজ করছে। ওদের আর্মি ওখানে সক্রিয়। সি আই এও কিন্তু এটা ভাল চোখে দেখবে না।”
ইমতিয়াজ বললেন, “সি আই এ গদার নিয়ে মোটেও খুশি নয়। আমরা পাকিস্তানকে আরেকটা ইরাক বা আফগানিস্তান বানাতে দিতে পারি না। মিটিংটা এই জন্যই ইম্পরট্যান্ট। এন্ড বাই দ্য ওয়ে, মিটিং এ বালোচ অফিসিয়ালদের সম্পর্কে রফিকের রিপোর্টটার কথা আমাকে মনে করিয়ে দেবেন। আমার রফিক সাহাবের ভিউটাও নেওয়া দরকার। বালুচিস্তান চিন্তায় ফেলছে কাদির সাহাব।”
কাদির মাথা নাড়লেন, “ঠিক আছে জনাব।”
১৮
আব্বাসাবাদ। রাত দশটা।
শোকের আবহে জমায়েত ডাকা হয়েছে।
আমির বালোচ বলতে উঠল, “আমরা আমাদের ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ দুই সদস্যকে হারিয়েছি। কিন্তু হে সহযোদ্ধাগণ, আমাদের চোখের জল ফেলারও সময় নেই। আমাদের দুই সাথীর রক্তের মূল্য ওদের দিতে হবে। আজ রাতেই ওরা বুঝতে পারবে আমরা কী! এই সশস্ত্র প্রতিবাদ কোয়েটা ক্যান্টনমেন্টে হবে, কিন্তু এর শব্দ ইসলামাবাদ ছাড়িয়ে গোটা পৃথিবীর কাছে পৌঁছবে।”
ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলল, “দুজন না। তিনজন। ওরা ইব্রাহিমকেও মেরে ফেলেছে।”
আমির মাথা নিচু করল। অশ্রু সজল গলায় বলল, “মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা এই যুদ্ধটা হেরে গেছি। কিন্তু আমরা এত সহজে হেরে যাব না। লড়াইটা হবে। লস্কর ছাড় পাবে না। পাকিস্তান আর্মিও না। যারা ভাবে বালোচদের চোখের জলের কোন দাম নেই, তাদের দেখানোর সময় এসেছে আমরা দুর্বল নই।” শপথগ্রহণ শুরু হল। আমির শপথবাক্য পাঠ করাল।
কিছুক্ষণ পরে একটা জিপ এসে দাঁড়াল। আমির বলল, “আপনারা দোয়া করুন, আমাদের এই মিশন যেন ব্যর্থ না হয়।”
চারজন সামনে এসে দাঁড়াল। আমির প্রত্যেককে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর গাড়িতে উঠে চারজন কোয়েটার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
গোটা আব্বাসাবাদ জেগে রইল তাদের চারজন যোদ্ধার মিশনের জন্য।
#
মাঝরাতে কোয়েটা ক্যান্টনমেন্টের সামনে বিরাট এক আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ হল। চারজনকে নিয়ে জিপটা কোয়েটা সেনা শিবিরে ঢুকে পড়েছিল। পাকিস্তান আর্মি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিস্ফোরণটা হল। ইমতিয়াজ হুসেনের ঘুম ভাঙিয়ে খবরটা জানালেন জেনারেল কাদির
ইমতিয়াজ বললেন, “পি এম সাবকে জানিয়ে ফোন করছি।”
কাদির বললেন, “জি জনাব।”
পাক প্রধানমন্ত্রী বশির আলীকে জাগানো হল। খবরটা শোনার পরে বললেন, “কত ক্যাজুয়ান্টি?”
ইমতিয়াজ বললেন, “স্টিল নট আপডেটেড জনাব। তবে মোর দ্যান টেন। লাক ভাল যে ওরা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে ঢুকতে পারে নি।”
বশির আলী বললেন, “তাতে কিছু হয় না। একজন ক্যাজুয়াল্টি হলেও দেয়ার মিশন ইজ সাকসেসফুল। প্লিজ ডু দ্য নিডফুল ফ্রম ইয়োর এন্ড। জেনারেল কাদির ফেরার পরেই ঘটনাটা হল। এবার যদি আপনাদের সিক্রেট মিশনের পর্দা ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে কী হবে?”
ইমতিয়াজ বললেন, “আমি দেখছি জনাব। আমি আজ রাতেই কোয়েটা রওনা দিচ্ছি।”
বশির আলী বললেন, “দিস ইজ নট ডান মিস্টার হুসেন। দিস ইজ ফেইলিওর। আমি মেনে নিতে পারছি না। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।”
ইমতিয়াজ বললেন, “ঠিক জনাব। আপনি যা বলছেন আমি মেনে নিচ্ছি। এবার সবটা আমিই সামলাব।” বশির আলী বললেন, “ওকে। দেখুন কী করতে পারেন।”
ফোন কেটে দিলেন পাক প্রধানমন্ত্রী।
অনেক কষ্টে নিজের রাগ চেপে কাদিরকে ফোন করলেন ইমতিয়াজ। কাদির অপেক্ষায় ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরে বললেন, “জি জনাব।”
ইমতিয়াজ বললেন, “আমি কোয়েটা রওনা হচ্ছি। আপনি রফিক সাহেবকে নিয়ে আমার সঙ্গে চলুন। সিচুয়েশন আউট অফ কন্ট্রোল হবার আগে আমাদের সামাল দিতে হবে। আর হ্যাঁ, পি এম সাহাব ভয় পাচ্ছেন রুমান আলীর ব্যাপারটা আবার ঝোলা থেকে বেরিয়ে আসবে না তো?”
কাদির বললেন, “আমরা এখান থেকে কিছু প্রেডিক্ট করতে পারব না জনাব। আমি তৈরি হচ্ছি। রফিক সাহাবকেও ফোন করে দিয়েছি। বলে দিচ্ছি আর্মি এরোড্রামে পৌঁছতে।”
ইমতিয়াজ বললেন, “পাকিস্তানী মিডিয়াকে এই নিউজটা ব্ল্যাক আউট করার কথা বলে দিন। কোন রকম নিউজ যেন না হয়, এটা এনশিওর করা যাবে?”
কাদির একটু থমকে গিয়ে বললেন, “স্যার এটা আটকানো যাবে না। নিউজ এতক্ষণে লিক হয়ে গেছে। ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়াকে আটকানো যাবে না। পাকিস্তান মিডিয়া আর কী দোষ করল? বরং এটাকে আমরা র এর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখাতে পারি।”
ইমতিয়াজ বললেন, “তাহলে তাই করুন। যা যা করার করুন। আধঘণ্টার মধ্যে আর্মি এরোড্রামে চলে আসুন।”
কাদির বললেন, “জি জনাব। তাই হবে।”
১৯
ইসলামাবাদ।
সকাল সাতটা।
মিডিয়ার প্রতিনিধিরা এসে ভিড় করেছে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের মিডিয়া সেন্টারে। বশির আলী এসে দাঁড়াতেই একটার পর একটা প্রশ্ন আসা শুরু করল, “জনাব, কোয়েটা ব্লাস্ট সম্পর্কে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?”
বশির আলী বললেন, “দেখুন, বালুচিস্তানে এই মুহূর্তে একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর পিছনে অবশ্যই র- এর হাত আছে। আমাদের কাছে প্রমাণ আছে যে ইন্ডিয়া বালুচিস্তানের বিদ্রোহীদের ফান্ডিং করছে। এবার আশা করি আপনারা বুঝতে পারছেন কাল রাতের ঘটনায় কাদের হাত আছে?”
“জনাব, ওরা হঠাৎ করে কোয়েটা বেসেই কেন হামলা করতে যাবে?”
“আমাদের সেনারা আমাদের রক্ষা করে চলেছে সব সময়। এখন যদি দেখা যায় ওদের ওপর হামলা করে আমাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া সম্ভব, প্রতিপক্ষ সে সুযোগটা নিতে চেয়েছে।”
“তালিবান হামলা হতে পারে এটা?”
“আমার মনে হয় না। তালিবান নিজেদের অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে এখন। আলাদা করে ওরা আর কোন ঝামেলায় জড়াতে যাবে না।”
“কিন্তু জনাব, কোয়েটায় যদি র অপারেশন চালায়, সেটা পাকিস্তানের পক্ষে লজ্জাজনক ব্যাপার হবে না?” বশির আলী প্রশ্নকর্তার দিকে তাকালেন। স্থানীয় মিডিয়া। রাগী চোখে সাংবাদিকের দিকে এক পলক তাকিয়ে বললেন, “আমি কখনই বলি নি র এখানে সরাসরি ইনভলভ আছে। আমি বলতে চাইছি, বালোচের বিপথগামী কিছু মানুষকে ফান্ডিং করে র পাকিস্তানের মধ্যে সমস্যা তৈরি করতে চাইছে। আমাদের সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে সরকারি অফিসের অনেক পোস্টেই অনেক দেশপ্রেমী বালোচরা কাজ করে চলেছেন। তারা যথেষ্ট দক্ষ। আমার তাদের কাবিলিয়ত নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তারা আমাদের গর্ব। কিন্তু যে সব বালোচ পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়েছে, দেশের মধ্যে সমস্যা তৈরি করতে চাইছে বিদেশী ফান্ডিং এর সাহায্য নিয়ে, পাকিস্তান তাদের উপর বিন্দুমাত্র ক্ষমা প্রদর্শন করবে না। তাদের উপযুক্ত শাস্তি হবে এই কথা আমি দিতে পারি। জনাব ইমতিয়াজ হাসান রাতেই কোয়েটা পৌঁছে গেছেন। এই বিস্ফোরণের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আইডেন্টিফাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, পাকিস্তানের আওয়ামকে এই নিশ্চয়তা আমি দিচ্ছি।”
“জনাব, বালোচিস্তান নিয়ে চীন থেকে কি কোন রকম প্রেশার আসছে? আজকের পরে চীন গদার পোর্ট নিয়ে পাকিস্তানকে আরো প্রশ্ন করতে পারে। শোনা যাচ্ছে, গদার পোর্ট হাইওয়েতে চীন তাদের সেনাবাহিনী মোতায়েন করার প্রস্তাব দিয়েছে?”
“একবারেই বাজে কথা। সংবাদমাধ্যমের কাছে পাকিস্তান সরকার অনেক আশা করে থাকে। আপনারা দয়া করে এমন কোন গুজব রটাবেন না যেটা দেশের ক্ষতি করে। চীন আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র হলেও পাকিস্তান তাদের এ দেশে অবশ্যই নিরাপত্তা দিতে সক্ষম। আলাদা করে আমাদের দেশে চীনের সেনাবাহিনী ঢুকবে, এসব গুজব। এ সংবাদের কোন ভিত্তি নেই।”
“গদার পোর্টের নিরাপত্তা নিয়ে চীন এমনিতেই বার বার পাকিস্তানকে বার্তা দিয়ে আসছে। আজকে কোয়েটার ঘটনার পর কি কোন রকম সমস্যা তৈরি হতে পারে চীন পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে?”
বশির আলী হেসে উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গী করে বললেন, “দেশের ভূগোল সম্পর্কে আপনাদের জ্ঞান এত সীমিত কেন জানি না। গদার পোর্টের থেকে কোয়েটার দূরত্ব প্রায় সাড়ে ন শো কিলোমিটার। গদারে কী হবে, তার জন্য চীনের তো কোন সমস্যা হবার কথাই না।”
“কিন্তু জনাব যদি টেরোরিস্টরা এই একই ভাবে গদারে অ্যাটাক করে, তাহলে তো সমস্যা হতেই পারতো, তাই না?”
বশির বললেন, “ওসব অ্যাসাম্পসান নিয়ে ভাবতে যাবই বা কেন? গদার বন্দরের রাস্তার নিরাপত্তা আমরা আজকের পরে এমনিতেই বাড়িয়ে দেব। এর পরে দুশমনেরা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না ওখানে কোন রকম সমস্যা তৈরি করা সম্ভব। আশা করছি, আমি আমাদের অবস্থানটা আপনাদের বুঝিয়ে দিতে পেরেছি। আমাকে ইজাজত দিন, আমি জনাব ইমতিয়াজ হুসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোয়েটার পরিস্তিতি পর্যালোচনা করতে যাবো। শুক্রিয়া।”
কারো অপেক্ষা না করে প্রেস কনফারেন্স শেষ করে তার বাসভবনের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন বশির আলী।
