১
সাদ্দার বাজার। করাচী।
আলী মোবাইল স্টোরের মালিক নওয়াজ আলী দোকানে ব্যস্ত হয়ে কাজ করছে। মাঝে মাঝেই বিড় বিড় করে গালাগাল দিয়ে যাচ্ছে। দোকানের দুজন কর্মচারীই আজকে ডুব মেরেছে। এদিকে দোকানে ক্রেতার ঢল নেমেছে যেন। সিসিটিভি থাকলেও নওয়াজ জানে কিছু মানুষ থাকবেই কিছু না কিছু সরিয়ে দেওয়ার জন্য। একার পক্ষে সব কিছু সামলানো সম্ভব না।
একজন বয়স্ক মানুষকে একটা দামী মোবাইল বিক্রি করেছিল কিছুদিন আগে। তিনি এসে হয়রান মুখে বললেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। তাকে বোঝাতে বোঝাতেই আরেকজন চলে এসেছে। “কী প্যাড ওয়ালা ফোন দেখাও মিয়াঁ।”
নওয়াজ সে লোককে রেগে গিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় তাকে অবাক করে দোকানে চারজন স্যুট পরা লম্বা চওড়া লোক প্রবেশ করল।
আলী তাদের দিকে অবাক হয়ে তাকাল। এদের এই এলাকায় আগে দেখে নি সে। চারজনের মধ্যে একজন তার দিকে একটা আই কার্ড এগিয়ে দিয়ে বলল, “ইসলামাবাদ থেকে এসেছি। তোমার সঙ্গে কিছু কথা ছিল জনাব। দোকান খালি করে দাও।”
আলীর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে বলল, “এখন ব্যবসার সময় জনাব। এখন কী করে দোকান….”
কথা শেষ হল না, বাকি তিন জন দোকানে থাকা সবাইকে দোকান থেকে বের করে দিয়ে শাটার নামিয়ে দিল।
আলী ঘামতে শুরু করল।
একজন হাসি মুখে বলল, “অনেক দূর থেকে এসেছি মিয়াঁ। আমাদের সময় বেশি নেই। দেশের হাল একবারেই ভাল না। জানো তো?”
আলী বলল, “আমি কী করে জানব জনাব? সারাদিন এই দোকানেই কেটে যাচ্ছে। কত টাকা দেনা করে ব্যবসা শুরু করেছি, এখন যদি লোকসান হয়ে যায়, তাহলে বিবি বাচ্চা নিয়ে পথে বসতে হবে।”
“এই ছবিটা দেখো মিয়াঁ। একে চেনো?”
একটা ছবি এগিয়ে দিল একজন আলীর দিকে। ছবিটা দেখে আলী বলল, “না। একে কোন দিন দেখি নি জনাব।”
তৃতীয় জন এগিয়ে এসে আলীকে সপাটে চড় কষাল। আলী ছিটকে পড়ল। প্রথম জন হাসি হাসি মুখ করে আলীর দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার মনে হয় সব মনে পড়ে যাবে, তাই না? চেনো তো এবার?”
আলীর গাল কেটে রক্ত পড়ছিল। সে মেঝেতে কোন ক্রমে উঠে বসে বলল, “আমার গ্রামে থাকত।”
“নাম?”
“আফতাব।”
“সার নেম বল। আফতাব কী?”
আলী চারজনের দিকে তাকিয়ে নিয়ে মাথা নিচু করে বলল, “আফতাব বালোচ।”
একে অপরের দিকে তাকাল চারজন। প্রথমজন বলল, “কাল আফতাব দোকানে এসেছিল। রাত দশটার দিকে। দোকান বন্ধ হচ্ছিল তখন। তাই তো?”
আলী “হ্যাঁ” সূচক মাথা নাড়ল।
প্রথমজন বলল, “কী নিতে এসেছিল?”
আলী বলল, “আমার কাছে আশ্রয় চাইতে এসেছিল। বলেছিল দোকানে থাকতে চায়। আমি বারণ করে দিয়েছি।”
প্রথম জন বলল, “তারপর কোথায় গেছে সে?”
আলী বলল, “জানি না। বিশ্বাস করুন জনাব, আল্লাহর দিব্বি বলছি, আমি কিছু জানি না।”
দ্বিতীয় জন প্রথম জনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার মনে হচ্ছে ও ঠিক বলছে। কী করবেন জনাব? নিয়ে যাবেন ওকে?”
আলী হাউ মাউ করে কান্না জুড়ল, “জনাব, আমাকে রেহেম করুন জনাব, আমার বাড়িতে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে আছে। আমি কারো কোন কিছুতে নেই। অনেক কষ্টে এই দোকান দাঁড় করিয়েছি। এখন যদি আমার কিছু হয়, আমার পরিবার পথে বসবে।”
প্রথম জন আলীর দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে বলল, “রেহেম করতে পারি। শর্ত আছে।”
আলী বলল, “আমি আপনাদের সব শর্ত মেনে চলার জন্য তৈরি জনাব।”
প্রথম জন বলল, “আফতার এর পরে এলে এই দোকানেই ওকে থাকতে দিবি। আর তারপর আমাদের ফোন করবি। ঠিক আছে?”
আলী তড়িঘড়ি মাথা নাড়ল, “যেমন বলবেন জনাব।”
প্রথম জন পকেট থেকে একটা পেন বের করে দোকানে রাখা বিল বইটা টেনে নিয়ে বিলের উপরে একটা নাম্বার লিখে দিয়ে বলল, “পাকিস্তানের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে এর মধ্যে। কোন রকম বেগড়বাই করলে তোর কপালে দুঃখ আছে। আশা করি বুঝতে পারছিস আমরা কারা?”
আলী বলল, “জি জনাব। আপনারা যা বলবেন, আমি তাই করব।”
প্রথম জন বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলল, “শাটার খোল।”
একজন গিয়ে শাটার খুলে দিল। দোকানের বাইরে ভিড় জমে গেছে। চারজন দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। আলীর মুখ থেকে রক্ত বেরচ্ছিল। পাশের দোকান থেকে একজন এসে আলীকে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে রে আলী?”
আলী সভয়ে নিজের মুখে আড়াল করে বলল, “কিছু হয় নি। আমি এখন দোকান বন্ধ করে দেব।”
“আহ বল না কী হয়েছে?”
আলী রেগে গিয়ে গালাগাল দিয়ে প্রতিবেশী দোকানদারকে একপ্রকার ঠেলে দোকান থেকে বের করে দোকান বন্ধ করে দোকানের ভিতর বসে ভয়ে কাঁপতে লাগল।
২
রুক্ষ পাহাড়ের গায়ে লেপটে আছে একটা ছোট গ্রাম। পশ্চিম পাকিস্তানের বালোচিস্তান প্রদেশের এই অঞ্চলে জলের অভাব প্রবল। গ্রামে যে ক’জন ছিল, তার মধ্যে অনেকেই গ্রাম ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে বেশ কয়েকটি বাড়ি।
এক গ্রীষ্মের ভোরে গ্রামের ঘুম ভাঙল সেনা কনভয়ের শব্দে। একটার পর একটা গাড়ি প্রবেশ করল গাড়ির ভেতর। মাইকিং শুরু হল।
“গ্রামের সবাইকে আদেশ করা হচ্ছে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াতে। এখনই।”
যে ক’জন বাসিন্দা ছিল, সভয়ে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে সেনারা নেমে এল। যে মাইকিং করছিল, সে চিৎকার করল, “আর কেউ বাকি আছে?”
গ্রামবাসীরা একে অপরের দিকে তাকাল। একজন বলল, “আর কেউ নেই জনাব।”
সেনারা প্রত্যেকটা বাড়ির ভিতর ঢুকে তল্লাশি শুরু করল। খুঁজতে শুরু করল তন্ন তন্ন করে। গ্রামবাসীদের উপর হুকুম হল বাড়ির বাইরে চুপ করে বসে থাকতে হবে। একটার পর একটা বাড়ি তল্লাশি হল। ঘণ্টাখানেক পরে সেনারা এসে গাড়িতে বসে থাকা উপরওয়ালাকে রিপোর্ট করল, “কিছু নেই জনাব। অল ক্লিয়ার।”
সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আমন খান এসেছে সেনাদের নিয়ে। মূল ক্যাম্পে ফোন করে রিপোর্ট করল সে। ওপ্রান্ত থেকে শোনা গেল, “আরেকবার তল্লাশি কর। ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট অন্য কথা বলছে। নিজে দেখো।”
আমন বলল, “ওকে স্যার।”
আমন গাড়ি থেকে নামল। গ্রামটা অস্বাভাবিক শান্ত। রুক্ষ পাহাড়ি মরুভূমির মধ্যে পথে বসিয়ে রাখা বালোচদের দিকে এগিয়ে গেল সে। বলল, “আমার কাছে খবর আছে তোদের এই গ্রামে একজনকে লুকিয়ে রেখেছিস তোরা। কোথায় লুকিয়েছিস বললে বেশি সমস্যায় পড়বি না। নইলে তোদের কপালে অশেষ দুঃখ আছে।”
একজন বৃদ্ধ হাত জোড় করে বলল, “বিশ্বাস করুন জনাব, আমরা কাউকে লুকিয়ে রাখি নি।”
আমন শ্বাস ছাড়ল। তার নিজেরও বিশ্বাস হচ্ছিল না এরা মিথ্যে বলতে পারে। একজন সেনা তার কানে কানে বলল, “জনাব আমরা ভাল করে খুঁজেছি। এখানে তেমন কেউ নেই।”
আমন পকেট থেকে রিভলভার বের করে সে বৃদ্ধের মাথায় ঠেকিয়ে জোরে চিৎকার করে বলল, “আফতাব, কোথায় লুকিয়ে আছিস বেরিয়ে আয়। নইলে এই বুড়োকে দিয়ে শুরু করে এই গ্রামের সব ক’টাকে এক এক করে মেরে ফেলব।”
এবার গ্রামবাসীদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল। মহিলারা কান্নাকাটি শুরু করে দিল। আমন বলল, “আমি দশ গুণব। যদি না আসিস, তাহলে আমি আমার মত করে অপারেশন শুরু করব। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়, দশ।”
দশ গোণা সম্পূর্ণ হল। কেউ এল না। আমন অপ্রস্তুত হল। সে গ্রামবাসীদের দিকে তাকিয়ে বলল, “মারতে শুরু করি এবার।”
বুড়ো বলল, “জনাব, আপনারা তো দেখলেন, আমি বলছি, কেউ নেই এখানে।”
আমান ঠোঁট কামড়াল। বুড়ো মিথ্যে বলছে না। সে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে জিপে গিয়ে বসল।
কনভয় গ্রাম ছাড়ল কিছুক্ষণের মধ্যে। গ্রামবাসীরা যেখানে বসে ছিল সেখানেই বসে রইল।
৩
“বালোচ লিবারেশনের আফতাব বালোচ একজন শীর্ষ নেতা। আই এস আই ওকে পাগলের মত খুঁজে বেড়াচ্ছে।”
চিফ কম্পিউটারে বসে দাবা খেলছিলেন। রাণা সিং চিফের সামনে বসে কথাগুলো বললেন।
চিফ বললেন, “সে ঠিক কী করেছে?”
রাণা বলল, “পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর একটা কনভয়ে বম্ব ব্লাস্ট করার অভিযোগ এসেছে তার বিরুদ্ধে। ও নিজে নেতৃত্ব দিয়েছিল। তারপর যেন ভোজবাজির মত লুকিয়ে পড়েছে। কেউ ট্রেস করতে পারছে না। বালোচ লিবারেশন আর্মির হৃৎপিণ্ড বলা যেতে পারে আফতাবকে।”
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চিফ বললেন, “আফতাব কী? ঘোড়া না হাতি? নাকি পদাতিক?”
রাণা বুঝলেন চিফ আফতাবকে দাবার চরিত্রের সঙ্গে মেলাতে চাইছেন। বললেন, “সেমি রাণী স্যার। রাণীর কাছাকাছি। আফতাবকে আই এস আই পেয়ে গেলে বালোচ মুভমেন্ট খুব বেশি পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। পাক আর্মি গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে দিচ্ছে। বালোচদের উপর অমানুষিক অত্যাচার শুরু করেছে আফতাবকে পাওয়ার জন্য।”
চিফ মুচকি হেসে বললেন, “আর ওরা আমাদের কাশ্মীর নিয়ে বড় বড় বাতেলা ঝাড়ে। পাকিস্তান আর্মির বালোচিস্তানে দমন নীতি নিয়ে কেউ কিছু বলে না।”
রাণা বললেন, “দমন তো করতেই হবে স্যার। একটা দেশের অর্ধেক চলে যাবে যদি বালোচিস্তান পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে যায় তো। অথচ পাকিস্তানের সব থেকে বেশি খনিজ সম্পদও ওখানেই আছে।”
চিফ স্ক্রিন ছেড়ে রাণার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা এখানে আমাদের ভূমিকাটা কী?”
রাণা কাঁধ ঝাঁকালেন, “পাকিস্তানী আর্মির ডার্ক সাইডটা এক্সপোজ করা। এটাই কাজ।”
চিফ বললেন, “ঠিক আছে, জানা রইল। তুমি আর কোন খবর পেলে জানিও।”
রাণা উঠে দাঁড়ালেন, “ওকে স্যার।”
চিফ বললেন, “তুমি হতাশ মনে হচ্ছে? কোন ইন্সট্রাকশানের আশা করছিলে?”
রাণা বললেন, “হ্যাঁ স্যার। আপনি কি ব্যাপারটাতে ইন্টারেস্টেড না?”
চিফ বললেন, “আধ ঘণ্টার মধ্যে তুমি, সিরাজ আর ভেঙ্কট বোর্ড রুমে এসো। বাকিদের বলে দাও আমি ডেকেছি।”
রাণার মুখে হাসি ফুটল, “ওকে স্যার।”
রাণা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চিফ দাবার স্ক্রিনটা থেকে বেরিয়ে গিয়ে এজেন্সির মেইল বক্স খুললেন। তিনি একজনের মেইল পাবার আশা করছিলেন। সেটা আসে নি দেখে ফিস ফিস করে বললেন, “শিট। আর কত অপেক্ষা করতে হবে কে জানে?”
#
বোর্ড রুমের এসি ঘরটাকে অস্বাভাবিক রকম ঠাণ্ডা করে রেখেছে। চিফ বোর্ড রুমে ঢুকেই এসির তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিলেন। রাণা, সিরাজ এবং ভেঙ্কট তিনজনই চিফকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। চিফ ইশারায় তাদের বসতে বলে নিজের চেয়ারে বসে বললেন, “রাণার ব্রিফিং পেয়েছি। আফতাব বালোচ ইজ এ হিরো। এবার বল তোমরা কে কী ভাবছ ব্যাপারটা নিয়ে? অপিনিয়ন দাও।”
ভেঙ্কট রাণার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, “ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া ব্যাপারটাকে নিয়ে যেন আরো বেশি করে প্রচার করে, তাতে পাকিস্তানের ফেস লস হবে। আফতাবকে পেলেও কিছু করতে পারবে না।” রাণা বললেন, “আমার তা মনে হয় না। পাকিস্তান দেখাতে যাবেই বা কেন ওরা আফতাবকে অ্যারেস্ট করেছে? সিম্পলি গুম খুন করে দেবে।”
চিফ ভেঙ্কটের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সাউন্ডস গুড। আই এস আই এটাই করবে। যে কোন এজেন্সি তাই করবে। এবার?”
ভেঙ্কট বললেন, “তাহলে আমি আর কোন অপশন দেখতে পারছি না স্যার। দিল্লিতে বসে আমরা কীই বা করতে পারি?”
সিরাজ বললেন, “স্যার, বাজ এখন কোথায়?”
চিফ বললেন, “জানি না। অনেক দিন খোঁজ নেওয়া হয় না।”
সিরাজ বললেন, “ওকে আপনি মিস করছেন না এখন?”
চিফ বললেন, “তোমাদের সবাইকে আমি মিস করব। সামনেই রিটায়ারমেন্ট। বাড়িতে বসে বসে অবশ্যই মিস করব।”
সিরাজ হেসে বললেন, “স্যার সব কথা ঘুরিয়ে দেন। আপনি কিছুতেই বাজের কথা বলতে চান না। এত রেগে থাকেন ওর ওপর কেন কে জানে।”
চিফ এবার গম্ভীর হয়ে বললেন, “মিটিঙটা বাজকে নিয়ে হচ্ছে না। হচ্ছে আফতাবকে নিয়ে।”
সিরাজ অপ্রতিভ হয়ে বললেন, “সরি স্যার। আমি ওর কথাই ভাবছিলাম অ্যাকচুয়ালি।”
চিফ বললেন, “লিভ হিম। এই নিয়ে আর কোন কথা আমরা বলব না এখন।”
সিরাজ বললেন, “ওকে স্যার।”
চিফের ফোন বেজে উঠল। চিফ বললেন, “এক্সকিউজ মি। মিটিঙটা এখনই শেষ করতে হচ্ছে। জরুরি ফোন এসেছে একটা।”
কারো উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে চিফ বোর্ড রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
৪
পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটা থেকে ষাট কিলোমিটার দূরের একটি ছোট গ্রাম আব্বাসাবাদ। এখান থেকে কান্দাহার বেশি দূর নয়। মাঝে মাঝেই তালিবান বাহিনীর অতর্কিত হামলা ঘটে।
বালোচ লিবারেশন বাহিনী এই গ্রামে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছে। তালিবানদের তারা গ্রামে ঢুকতে দেয় না। পাকিস্তানী সেনা বাহিনী এই গ্রামে তল্লাশি করতে এলে লিবারেশনের লোকজন যেন হাওয়ার মত মিলিয়ে যায়। তারা কোথায় গেছে জিজ্ঞেস করলে গ্রামের লোকেরা শত অত্যাচারেও মুখ খোলে না। বালোচেরা জানে, তাদের প্রতিরোধ এভাবেই করতে হবে। যেদিন এই প্রতিরোধ শেষ হবে, তারা যুদ্ধটা হেরে যাবে।
আমির বালোচ সহ বেশ কয়েকজন যুবক গ্রামের মসজিদের কাছে জড়ো হয়েছে। আমির এখানকার বালোচদের নেতা। গ্রামের বাইরে কড়া পাহারা বসেছে। পাক বাহিনী আসার কোন রকম খবর পেলেই আমিরদের আত্মগোপন করতে হবে। সব রকম প্রস্তুতি নিয়েই এই জমায়েত হয়েছে।
আমির তার সহযোদ্ধাদের প্রতি গলা তুলে বলল, “আমার বন্ধুরা, তোমরা জানো এই দেশের সরকার কীভাবে প্রতি মুহূর্তে আমাদের কণ্ঠস্বর দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা জানে, বালোচরা যদি একত্রিত হয়, তাহলে তাদের এই সমস্ত অত্যাচারের জবাব তারা ঠিক পাবে। আই এস আই একা নয়, তারা তালিবানদেরও আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। আমার ভাই, আমার বন্ধু, আমাদের নেতা আফতাব বালোচ যে বীরত্বের কাজ করেছে, তা আমাদের প্রত্যেককে উদ্বুদ্ধ করে। এভাবেই আমাদের পাকিস্তান সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিতে হবে। আগামী কাল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল কাদির আমাদের গ্রামের পাশের রাস্তা দিয়ে বর্ডারে যাবে। আমরা অনেক দেখেছি। অনেক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে গিয়ে দেখেছি সেনা বাহিনী আমাদের ব্রিগেডিয়ারের কাছে পৌঁছতেই দেবে না, আমাদের দাবি দাওয়া পেশ করা তো দূরের কথা। আগামীকাল, আমরা এই দেশ এবং পৃথিবীর কাছে খুব কড়া একটা বার্তা পাঠাতে পারি। আমরা তাদের বলতে পারি, আমরা দুর্বল নই। কিন্তু হে প্রিয় যোদ্ধাগণ, এই লড়াইতে যারা যাবে, তাদের হয়ত দুশমনেরা মেরে ফেলে দেবে, আমরা তাদের চিরতরে হারাবো। আমি তোমাদের কাছে জানতে চাই, কালকের যুদ্ধটা কি আমরা লড়ব না পিছিয়ে যাব?”
সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, “লড়াই হবে। পিছিয়ে যাবো না ইনশাল্লাহ। তুমি হুকুম কর শুধু, একবার বল কাকে যেতে হবে, আমরা জান কুরবান করার জন্য প্রস্তুত।”
আমিরের দু চোখ জলে ভরে এল। বলল, “আমার দুজন সাহসী যোদ্ধা দরকার। যে কোন দুজন। মেজর জেনারেলের কালকের দিনটাই জীবনের শেষ দিন হবে। গোটা পৃথিবী জানবে বালোচেরা দুর্বল নয়।” সবাই হই হই করে উঠল। প্রত্যেকে যেতে চায়। এক বৃদ্ধ মানুষ চুপ করে বসে ছিলেন। আমির তার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, “আপনি বলুন, আপনি আমার মুরুব্বি। আমি এদের মধ্যে কাকে পাঠাবো। আপনি বুঝতেই পারছেন সবাই যেতে চাইছে।”
মুরুব্বি ঘোলাটে চোখে আমিরের দিকে একবার তাকিয়ে ভিড়ের মধ্যে এক মাঝবয়সী মানুষের দিকে তর্জনী তুললেন। আমির বলল, “জাহির?”
মুরুব্বি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন,।
আমির বলল, “আর?”
মুরুব্বি বললেন, “আর আসগর যাবে।”
আমির চমকে উঠে বলল, “আসগর আপনার ছেলে জনাব। তার চেয়ে আপনি হুকুম করুন, আমি যাই। আমি যেতে চাই। এই লড়াইতে শহীদ হবার সুযোগ দিন আমাকে।”
মুরুব্বি স্থির চোখে আমিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাকে আমাদের দরকার। আরো অনেক লড়াই বাকি। তুমি থাকবে। কোথাও যাবে না। আসগরের জন্নত নসীব হবে ইনশাল্লাহ।”
সবাই হই হই করে উঠল। আমির মুরুব্বির দোয়া নিয়ে বলল, “আপনি যেমন বলবেন জনাব। আপনার আদেশ শিরোধার্য। কাল মেজর জেনারেলের জীবনের শেষ দিন হবে।”
সবাই আবার চিৎকার করে উঠল।
আসগর এগিয়ে এসে তার বাবার পায়ের কাছে বসল। মুরুব্বি আসগরের মাথায় হাত রেখে বললেন, “ভুলো না, এই বাহিনী তোমার মাকে তুলে নিয়ে গেছিল। কোন রকম দয়ার কথাও যেন তোমার মাথায় না আসে।” আসগরের চোয়াল শক্ত হল। সে বলল, “জিত আমাদের হবেই। আমরাই জিতব। আমরা স্বাধীন হবই। স্বাধীনতা আমাদের অধিকার। যে করেই হোক, আমরা আমাদের প্রাপ্য ছিনিয়ে আনব।”
আমির এগিয়ে এসে আসগরকে জড়িয়ে ধরল। এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল বালোচ যোদ্ধারা।
