২০
করাচী বাহরিয়া টাউন অঞ্চল।
নওয়াজ আলী বাজার করে ফিরছিল। হঠাৎ এক বৃদ্ধ তার পথ আটকে দাঁড়াল, “সালাম ওয়াইয়ালিকুম, মিয়াঁ, কোথায় যাচ্ছ?”
নওয়াজ বলল, “ওয়ালাইকুম আসসালাম। এই তো বাজার করে ফিরছি।”
বৃদ্ধ বলল, “আমি অনেক দূর থেকে এসেছি মিয়াঁ। এই শহরে কাউকে চিনি না। দেখো তো এই ঠিকানাটা কোথাকার?”
বৃদ্ধ একটা কাগজ এগিয়ে দিল।
নওয়াজ কাগজটা দেখামাত্র চমকে উঠে বলল, “কে আপনি?”
বৃদ্ধ গলা নামিয়ে বলল, “এক্সপ্রেশন ঠিক কর। তোমার উপর নজর রাখা হচ্ছে।”
নওয়াজ সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু আপনি কে?”
বৃদ্ধ বলল, “বন্ধু। তোমার দোকান কত দিন দখল করে রাখবে আই এস আই? কিছু বলেছে?”
নওয়াজ বলল, “না। কিছু বলে নি।”
বৃদ্ধ বলল, “মনে হয় না শিগগিরি কোন চান্স আছে বলে। তোমাকে শুধু একটা কাজ করতে হবে।” নওয়াজ বলল, “কী কাজ?”
বৃদ্ধ বলল, “জাহাজের মালিককে জানাবে তার বন্ধু বাজ কোয়েটায় অপেক্ষা করবে।”
নওয়াজ তীক্ষ্ণ চোখে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, “বলে দেব। জাহাজ বাজের খোঁজ করছিল। আমি কিছু বলতে পারি নি সেদিন।”
বৃদ্ধ বলল, “তোমার ফোন ট্যাপ হচ্ছে। জাহাজ সেটা জানে। এখন ফোন করবে না। ও ঠিক সময়ে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তুমি জানিয়ে দেবে। খুদা হাফিজ।”
বৃদ্ধ হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ পর বাস ধরে স্টেশনে পৌঁছে টিকেট কেটে বোলান মেইলে উঠে বসল। বোলান মেইল প্যাসেঞ্জার ট্রেন। ট্রেনে লোক গিজগিজ করছে। জনতা বেশ উত্তেজিত হয়ে আছে কোয়েটায় গত রাতের বোমা বিস্ফোরণ নিয়ে। বৃদ্ধ জুবুথুবু হয়ে বসে রইল। এক প্যাসেঞ্জার বলল, “দেশে আর থাকা যাবে না মিয়াঁ। যেখানেই দেখি, সেখানেই ঝামেলা। কোয়েটায় পর পর ব্লাস্ট হচ্ছে। করাচীতেও সেদিন মসজিদে একটা বিস্ফোরণ হল। আমাদের জানের কোন ঠিক ঠিকানা নেই।”
“সব ইন্ডিয়া করাচ্ছে। এগুলো সব কাশ্মীরের বদলা নিচ্ছে।”
“তুমি থামো মিয়াঁ। তুমি কিছু না জেনে আজে বাজে কথা বোল না। সব দোষ ইন্ডিয়ার কেন হবে? এদেশের বালোচরা কম নিমকহারাম না। এদের দেশে রাখো, খাওয়াও পরাও, তার পর এরা দেশের আর্মির উপরেই আক্রমণ করে দিল। ছি ছি ছি।”
এই কথায় কামরার বালোচরা ক্ষেপে গেল। একজন বলল, “কে নিমকহারাম মিয়াঁ? খাওয়াও পরাও মানেই বা কী? কে খাওয়াচ্ছে আমাদের? কেউ খাওয়ায় না। বালোচিস্তানের অনেক জায়গায় ঠিক করে রেশনের খাবার পর্যন্ত যায় না। উল্টে চাইনিজদের হাতে আমাদের কতটা জায়গা তুলে দিয়েছে এই সরকার। আমাদের
মাটিতে বিদেশিরা কেন আমাদের ঘরে ঢুকতে বাধা দেবে? কে ওদের এত সাহস দিয়েছে? আজে বাজে কথা বলবে না তুমি।”
“আমি বলব না মানে? কে হে তুমি আমি কী বলব ঠিক করে দেবে? তুমি বালোচ তো? মানে তুমি দেশদ্রোহী। তোমার সঙ্গে ট্রেনে যাওয়া মানে আমাদের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া।”
ঝামেলা লাগার উপক্রম হল। চেকার এসে টিকেট দেখতে শুরু করলে ঝামেলা খানিকটা কমল। ঘণ্টা খানেক বাদে ট্রেন মারশালিং ইয়ার্ড স্টেশনে দাঁড়ালে কামরায় কয়েকজন সেনা উঠে যাত্রীদের আই কার্ড চেক করতে শুরু করল। দুজন বালোচকে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু হল। সেটা দেখা ট্রেনের বাকিরা বিদ্রূপ করতে শুরু করল।
বালোচরা সেনাদের সঙ্গে তর্ক করতে শুরু করলে। কিছুক্ষণের মধ্যে আশে পাশের কামরা থেকে বালোচরা খবর পেয়ে চলে এসে ঝামেলা করতে শুরু করল।
এর মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিল। সব কিছুর মধ্যে বৃদ্ধ একটুও উত্তেজিত না হয়ে চুপ করে বসে রইল। ঘন্টাখানেক বাদে সব ঝামেলা থিতিয়ে এল। ট্রেন সিন্ধ ইউনিভারসিটি স্টেশনে দাঁড়ালে আবার একদল বালোচ উঠল ট্রেনে। ট্রেনের বালোচ বিরোধীরা একবারেই চুপ করে গেল।
২১
কোয়েটা ক্যান্টনমেন্টের চারপাশে পাকিস্তানী সেনা বাহিনী গিজগিজ করছে। ঘটনাস্থল দেখে এসে ইমিওয়াজ হুসেন জরুরি মিটিং ডাকলেন। রফিক চিন্তিত মুখে বসে ছিলেন। ইমতিয়াজ বললেন, “আপনাদের কোয়েটা এজেন্টকে ডেকে পাঠান। এখনই।” রফিক সাহিলকে ফোন করে মিটিঙে আসতে বললেন। সাহিল এসে দাঁড়াতেই ইমতিয়াজ বললেন, “তুমি সাহিল বালোচ?”
সাহিল মাথা নাড়ল, “জি জনাব।”
ইমতিয়াজ বললেন, “কী কাজ কর তুমি এখানে?”
সাহিল বলল, “জনাব আমি কোয়েটা আই এস আইয়ের চার্জে আছি।”
ইমতিয়াজ সিগার ধরালেন, “লাস্ট ছ মাসে তুমি অর্গানাইজেশনের জন্য কী কী উল্লেখযোগ্য কাজ করেছো?” সাহিল বলল, “জি জনাব এদিকের লোকালয়ে পাকিস্তান বিরোধী যে ক’টা মুভমেন্ট হচ্ছে, সেগুলোর এগেইন্সটে স্টেপ নিয়েছি।”
ইমতিয়াজ রফিকের দিকে একবার তাকিয়ে সাহিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী ধরণের স্টেপ?”
সাহিল বলল, “যারা এই ধরণের আন্দোলন করছে, তাদের মাথাগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের আটক করা হচ্ছে।”
ইমতিয়াজ বললেন, “আটক করা হচ্ছে? ক’জনকে আটক করা হয়েছে?”
সাহিল বলল, “সাত জন।”
ইমতিয়াজ বললেন, “সাতজন? বাহ। ছ’মাসে তুমি সাতজনকে আটক করেছো? এদের মধ্যে বড় মাছ কেউ নেই নিশ্চয়ই?”
সাহিল আমতা আমতা করতে লাগল।
ইমতিয়াজ রফিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কাদির সাহাবের কান্দাহার রুটকেও এই গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছিল না?”
সাহিল বলল, “স্যার এই জায়গাগুলো অত্যন্ত দুর্গম। কোন গ্রামের লোক যদি এরকম কোন প্ল্যান করে থাকে…”
ইমতিয়াজ চিৎকার করে উঠলেন, “শাট আপ ইউ ব্লাডি বালোচ। এখানে বসে বসে পাকিস্তানের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় খেয়ে তুমি কী করছ? কিচ্ছু করছ না। কালকের ঘটনা নিয়ে তোমার নিশ্চয়ই কিছু বলার নেই?”
সাহিল বলল, “জনাব, আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করি। কিন্তু আপনার কাছে একটাই অনুরোধ, আমার জাত বা আমার সদিচ্ছা নিয়ে কিছু বলবেন না।”
ইমতিয়াজ উঠে দাঁড়িয়ে সাহিলের কাছে এসে বললেন, “নইলে কী করবে তুমি? একবার কেন, বার বার বলব। তুমি কেবল অযোগ্যই না, তুমি সাবোতাজেরও অংশ। তোমাকে এই মুহূর্তে বরখাস্ত করা হল। জাস্ট গেট লস্ট।”
সাহিল মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল।
ইমতিয়াজ হুসেন অত্যন্ত রেগে গেছিলেন। চেয়ারে বসে আধ খাওয়া সিগার অ্যাসট্রেতে গুঁজে দিয়ে বললেন, “আশে পাশের সব গ্রামে চিরুনি তল্লাশি শুরু করতে বলুন রফিক সাহাব। আমরা ছাড়ব না। যারাই এটা করে থাকুক, যে গুহাতে লুকিয়ে বসে থাকুক, টেনে কুকুরের মত গুলি করে মারা হবে।”
রফিক বললেন, “জনাব এই মুহূর্তে সাহিলের রিপ্লেসমেন্ট আমি কাউকে পাবো না।”
ইমতিয়াজ বললেন, “সেটা আপনার ব্যর্থতা। এতদিন ধরে বালুচিস্তানকে এত ইগনোর করা হচ্ছিলই বা কেন? ব্রিং ইয়োর বেষ্ট অফিসারস ফ্রম ইসলামাবাদ। যা এফোর্ট দিতে হয় দিন। আর্মি আপনাদের সব রকম হেল্প করবে। ব্রিং দোজ বালোচ ডগস এন্ড বিচেস আউট অফ দেওয়ার সেফ হোম এন্ড বার্ন দেম অ্যালাইভ। অনেক হয়েছে। আমি এর শেষ দেখতে চাই।”
ইমতিয়াজ হুসেন রীতিমত ফুঁসছিলেন।
মেজর জেনারেল কাদির রফিককে বললেন, “আপনি এখানে আসাদকে নিয়ে আসতে পারেন। আসাদ একসময় বালুচিস্তানে ছিল। এখন আপনাদের অফিস সামলাচ্ছে। আসাদকে অফিসে বসিয়ে রাখাটা কি ঠিক হচ্ছে?”
রফিক বললেন, “জনাব, আসাদকে অফিসে পানিশমেন্ট পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল। ও হাইকম্যান্ডের কথা শোনে না বলে সমস্যা তৈরি হয়ে যায়।”
কাদির বললেন, “এখন আসাদের মত কড়া অফিসারই দরকার। আপনি ওকে এখানে নিয়ে আসুন। কোয়েটা নিয়ে নিশ্চিন্ত হবার জায়গা নেই। এই মুভমেন্ট যদি এখানে এই লেভেলে সফল হয়ে যায়, তাহলে ধীরে ধীরে এরা কোয়েটা থেকে করাচীর পথ ধরবে। গদার পোর্ট হাইওয়েতে বেজিং ওদের সেনাবাহিনীর নজরদারিতে আনার জন্য অত্যন্ত তৎপর হয়ে পড়েছে। চিনকে বিশ্বাস করাতে হবে যে উই আর টেকিং ড্রাস্টিক স্টেপস। ঠিক আছে?”
রফিক বললেন, “জি জনাব। আসাদের সঙ্গে আমি নিজে কথা বলব।”
ইমতিয়াজ বললেন, “কথা বলা বলির কিছু নেই। ওকে এখনই কোয়েটার ফ্লাইট ধরার অর্ডার করুন।” রফিক বললেন, “জি জনাব। তাই করছি।”
ইমতিয়াজ বললেন, “উই কান্ট অ্যাফোরড দিস টাইপ অফ ইন্টেলিজেন্স ফেইলিওর। সুইসাইড বোম্বিং না আটকানো গেলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যাবে। যারা মরার ভয় পায় না, তাদের থেকে ভয়ংকর কেউ হয় না। বালোচ রেবেলস আর ডেঞ্জারাস। ফাইন্ড দেম এন্ড বারি দেম।”
কাদির বললেন, “তল্লাশি শুরু হয়েছে কাছের গ্রামগুলোতে। তবে আন্দাজ করা হচ্ছে আব্বাসাবাদ থেকেই এই প্ল্যানটা হয়েছে। ওদের আগের প্ল্যানটা ফেইল করায় ওরা রিভেঞ্জ নিতেই হয়ত এ কাজটা করেছে।” ইমতিয়াজ বললেন, “আব্বাসাবাদের বালোচদের ক্ষোভের কারণ কী?”
রফিক বললেন, “দে আর স্যান্ডুইচড বিটুইন তালিবান এন্ড আওয়ার আর্মি। দে অলসো ওয়ান্ট ইন্ডিপেন্ডেন্স।”
ইমতিয়াজ বললেন, “ইন্ডিপেন্ডেন্স সবাই চায়। তাদের এমন অবস্থা করা উচিত যাতে দ্বিতীয়বার সেটা করার সাহস না পায়। আব্বাসাবাদে আজ রাতে অতর্কিতে অ্যাটাক করা হোক। যে কজন পাওয়া যায়, তাদের ধরে আর্মি বেসে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।”
কাদির বললেন, “জি জনাব।”
ইমতিয়াজ বললেন, “আর একটা কথা। এই অ্যাটাকের কথা আগে থেকে কাউকে বলার দরকার নেই। কোন বালোচ যেন আগে থেকে জানতে না পারে আমরা কী করতে যাচ্ছি।”
কাদির মাথা নাড়লেন, “তাই হবে জনাব।”
ইমতিয়াজ চোয়াল শক্ত করলেন, “আই ওয়ান্ট দোজ বাস্টার্ডস ডেড অর অ্যালাইভ। যদি বেঁচেও থাকে, ওদের এমন হাল করতে হবে, যেন দ্বিতীয়বার এই হামলার কথা ভাবতে না পারে।”
কাদিরের ফোনে একটা মেসেজ এল। কাদির মেসেজ দেখে ইমতিয়াজকে বললেন, “জনাব, বেজিং আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে পাচ্ছে না। কী বলব?”
ইমতিয়াজ বিরক্ত গলায় বললেন, “নিন। এবার শুরু হয়ে গেল জবাবদিহির পালা। যেন আমরাই করিয়েছি এই কাজ। ঠিক আছে, ওদের ভিডিও কনফারেন্সিং এর ব্যবস্থা করতে বলুন। আমি কথা বলব।”
ইমতিয়াজ উঠে কনফারেন্স রুমের দিকে রওনা দিলেন। কাদির রফিকের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে তাকিয়ে বললেন, “হি ইজ ভেরি অ্যাংরি টুডে।”
রফিক বললেন, “সব তো বুঝলাম জনাব, কিন্তু আসাদ কিন্তু প্রচণ্ড অ্যাগ্রেসিভ অফিসার। ও এলে বালোচদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে চলে যাবে। তারপর পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে গেলে আমাদের হাতে আর কিছু থাকবে না।”
কাদির বললেন, “এই মুহূর্তে এখানে ওকেই দরকার। সংঘাত ছাড়া উপায় নেই। এত কিছুর পরেও কোয়েটাতে বালোচদের শান্তি মিছিল বেরিয়ে গেছে। আমরা কী করতে পারলাম? দে আর সেলিব্রেটিং। এই মুহূর্তে ওদের দমন করা দরকার, আর এখানে আসাদই পারবে। আপনি ওকে ডাকুন।”
রফিক ম্লান মুখে বললেন, “ওকে জনাব।”
২২
বেনজির ভুট্টো এয়ারপোর্টে কোয়েটাগামী বিমানের সিকিউরিটি চেকিং চলছে। এক যাত্রীকে চেক করতেই আগ্নেয়াস্ত্র ধরা পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল। যাত্রীটি পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি লম্বা। গড়পড়তা পাঠানদের থেকে উচ্চতায় সামান্য কম। গায়ের রং ফরসা। ক্লিন শেভড। চোখ দুটি তীক্ষ্ণ। বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই।
এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি চিফ এসে যাত্রীটিকে জিজ্ঞেস করল, “কে তুই? তুই জানিস না এয়ারপোর্টে আর্মস নিয়ে ঢোকা বারণ? ঢুকলি কী করে?”
যাত্রীটি বিনা বাক্য ব্যয়ে বুক পকেট থেকে একটা ছোট কয়েনের মত জিনিস সিকিউরিটি চিফের কাছে দিয়ে বলল, “আমি আর্মস নিয়ে এত ভিতরে ঢুকলাম কী করে সেটা ভাবুন। গেটের সিকিউরিটিগুলো কোন কাজের না।”
সিকিউরিটি চিফ চাকতিটা দেখা মাত্র তড়িঘড়ি স্যালুট ঠুকে বলল, “সরি জনাব। ভুল হয়ে গেছে। আপনার ফ্লাইট তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেড়ে দিত। আমি আটকে দিচ্ছি। আপনি যান। আগে বলবেন তো।” যাত্রীটি মৃদু হেসে বলল, “ভালো হত। না যেতে পারলে বলতাম আপনারা আটকে দিয়েছেন। আজ বিবির জন্মদিন। ভাল দিনে ডাক পড়েছে বুঝালেন মিয়াঁ? আমার মনে হয় তালাক হয়েই যাবে।”
সিকিউরিটি চিফ ভয়েই অস্থির। যাত্রীটি আই কার্ড বের করে বলল, “দেখে নিন। আসাদ শেখ। কোয়েটা যাব। আর কিছু জানতে চান?”
সিকিউরিটি চিফ বললেন, “না না জনাব। এটা না দেখালেও হত। প্লিজ আপনি রওনা দিন জনাব। আপনার যাত্রা শুভ হোক।”
আসাদ শিস দিতে দিতে হাঁটতে শুরু করল। প্লেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেছিল। তার জন্য আবার খোলা হল। যাত্রীরা সবাই তার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকাল।
আসাদ কাউকে পাত্তা না দিয়ে সিটে বসে পড়ল।
যে কোন জার্নিতেই তার চোখ বুজে আসে। বসা মাত্র চোখ ঘুমে ঢুলে এল। কোয়েটায় নামার আগে বিমান মারাত্মক টার্বুলেন্সের ভেতরে পড়ল। আসাদের চোখ একবারও খুলল না। ল্যান্ড করার পর হাই তুলে হাঁটতে শুরু করল। কোন লাগেজ নেই তার।
এয়ারপোর্টের বাইরে এসে আসাদ ট্যাক্সি নিয়ে বলল, “জিন্না রোড চল।”
ট্যাক্সি ড্রাইভার বলল, “জিন্না রোডে কোথায় জনাব?”
আসাদ বলল, “ওই রোডের কাছে গিয়েই ছেড়ে দিও। তারপর আমি দেখছি কোথায় যাব।”
ট্যাক্সি চালক অবাক হলেও কিছু বলল না। আসাদ ট্যাক্সির জানলার বাইরের দিকে তাকিয়ে রাস্তা ঘাট দেখতে দেখতে পকেট থেকে ফোন বের করে ফোন করল।
রফিক আহমেদ ফোন ধরে বললেন, “এসে গেছো?”
আসাদ বলল, “এই কিছুক্ষণ আগে। তবে এখনই দেখা হবে না জনাব। কিছু কাজ আছে, শেষ করে রাতে দেখা করব।”
রফিক কয়েক সেকেন্ড থমকে গিয়ে বললেন, “হুসেন সাহাব এখানেই ছিলেন। চলে যাবেন। যাবার আগে একবার দেখা করে নিতে।”
আসাদ বলল, “আমি কথা বলে নেব। এখনই বাজার না করলে রান্না হবে না যে। খাবার বাসী হয়ে গেলেও কি আর খেতে ভাল লাগে, বলুন?”
রফিক ইশারাটা বুঝে বললেন, “তা ঠিক। ঠিক আছে, তুমি তোমার সময় মতই এসো।”
ফোন রেখে আসাদ বলল, “কী হয়েছে মিয়াঁ, ক্যান্টনমেন্টে মাঝরাতে এমন ঘটনা ঘটল গোটা পাকিস্তান ঘাবড়ে গেছে। দেখেছো নাকি কী হয়েছে?”
ট্যাক্সি ড্রাইভার বলল, “সে আর কী বলব জনাব, আমি ওই এলাকা দিয়ে কাল রাতে ওই ধরুন আধ ঘণ্টা আগে বেরিয়েছি। আল্লাহকে লাখ লাখ শুক্রিয়া যে আমার জানটা কাল বেঁচে গেছে। এ এলাকা দিন দিন খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে, দু দিন পর পর ব্লাস্ট। এত আর্মি থাকে এখানে, কোন লাভ হচ্ছে না। পি এস এলের ক্রিকেট ম্যাচ অবধি ক্যান্সেল করতে হয়েছে এদের জ্বালায়। আমার ভাইপো টিকেট কেটেছিল, সব গেলো। সে টিকিটের রূপী আর ফেরও দেবে না বলছে। আমাদের গরীবের পেটের দিকেই সবার নজর বুঝলেন না?”
আসাদ বলল, “তা বটে। এত টেরোরিষ্ট আসছে কোত্থেকে মিয়াঁ?”
ট্যাক্সি ড্রাইভার বলল, “কে জানে জনাব। সাধারণ মানুষ খুব ভয় পেয়ে গেছে। রঈস লোকদের তো কোন ব্যাপার না, তারা দেশ ছেড়ে বাইরে চলে যাবে। আমাদের মত গরীব মানুষেরা কোথায় যাবে বলুন?” রাস্তাঘাট দেখে বিন্দুমাত্র মনে হচ্ছে না আগের রাতেই এত বড় ঘটনা ঘটে গেছে। বাজারঘাটে গিজগিজে ভিড়, সব দোকান পাট খোলা। মানুষ যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে এখানে এরকম হয়েই যাবে। একদিন না একদিন সবাই মরবেই, অতো চিন্তা করে কোন লাভ নেই।
জিন্নাহ স্ট্রীট পৌঁছে আসাদ ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে রাস্তা দিয়ে চুপ চাপ হাঁটতে লাগল। শহরের ব্যস্ততম রাস্তা। খানিক পর পর কোন না কোন দোকানে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। কোথাও শ্যাম্পুর স্যাশে কিনল, কোন দোকান থেকে মোবাইল রিচার্জ করল, কোথাও জমায়েত দেখলে দাঁড়িয়ে পড়ে কে কী বলছে শুনতে শুরু করল। কিছুক্ষণ হেঁটে আসাদ সাহিলকে ফোন করল। সাহিল ফোন ধরল না প্রথমে। আসাদ হতাশ না হয়ে আবার ফোন করল।
এবার ফোন ধরে বলল, “বলুন মিয়াঁ, আমাকে কেন ফোন করলেন? আমাকে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছে। একজন বালোচ হিসেবে খুব বাজেভাবে অপমান করা হয়েছে। আমাকে কি আপনি বিশ্বাস করে ফোন করলেন, না আপনিও আবার আমাকে অপমান করতে চান?”
আসাদ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ফোন ধরে রইল। সাহিলকে আরো কিছুক্ষণ তার মনের রাগ বের করার সুযোগ দিয়ে বলল, “জিন্না রোডে আছি। এসো। তোমার সঙ্গে আমি অনেকদিন কাজ করেছি। আমার একটুও সন্দেহ নেই তোমার কাবিলিয়ত সম্পর্কে। উপরমহলের কে কী বলল, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। ও সব সাসপেনশন আমি আজকেই রফিক সাবকে বলে তুলিয়ে নেব।”
“আমি কাজ করব না জনাব। আমি কানাডা চলে যাব আমার ভাইয়ের কাছে। দেশকে ভালোবেসে দেখলাম, কিছুই ফেরত পাওয়া যায় না। এত অপমান সহ্য করতে হবে ভাবি নি।”
আসাদ বলল, “তুমি পুরনো আড্ডায় এসো তো। সামনে কথা হবে। দেরী কোর না। খিদে পেয়েছে। খেতে খেতে কথা হবে।”
সাহিল বলল, “আসছি।”
একটা সরু গলির মধ্যে ছোট একটা রেস্তোরায় ঢুকে আসাদ খাবার অর্ডার করল। কিছুক্ষণ পর সাহিল এসে তার সামনে বসে বলল, “বলুন, কী হুকুম। আপনি বলেই আমি এলাম। নইলে কোন দিন আসতাম না।” আসাদ বলল, “ব্রিফ কর। কী হয়েছিল?”
সাহিল চারদিকে তাকিয়ে বলল, “এখানে?”
আসাদ বলল, “কোন অসুবিধে নেই। বল।”
সাহিল বলল, “এখানে বলাটা সমস্যাজনক হবে। আপনি খেয়ে নিন।”
আসাদ ভ্রূ কুঁচকে বলল, “ঠিক আছে।”
তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল সে। কিছুক্ষণ পর সাহিলের বাইকের পিছনে উঠে শহরের বাইরে এক ফাঁকা জায়গায় গিয়ে পৌঁছল তারা। আসাদ বলল, “বল এবার।”
সাহিল বলল, “টপ সিক্রেট মিশন ছিল। কাদির সাবের কান্দাহার বর্ডার যাবার কথা ছিল। আমায় বলা হল রাস্তা ঠিক আছে নাকি জানাতে। আমি আমাদের নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে বেশ কয়েকবার খুঁটিয়ে দেখে যেটা জানাবার সেটা জানালাম। পরে দেখা গেল আমার দেওয়া গ্রিন সিগনালে ভুল ছিল। আব্বাসাবাদের বালোচ গ্রুপের দুজন মারা গেছিল। তাদের প্রতিশোধ নিতেই ব্লাস্টটা হয়েছে। এবার এখানে আমার কী করার ছিল? কোন টেররিস্ট এখন যদি ঠিক করে কোয়েটা বাজারে সুইসাইড বোম্বিং করবে, কে আটকাতে পারবে? সুইসাইড বোম্বিং হল আমাদের কাছে সব থেকে টাফ চ্যালেঞ্জ। হুসেন সাহাব আমাকে বলে দিলেন আমি বালোচ বলেই নাকি ইচ্ছা করে এটা করতে দিয়েছি। সব সময় এত অপমান সহ্য করতে হবে কেন বলুন তো জনাব?”
আসাদ সাহিলের কাঁধে হাত রাখল, “ঠিক আছে। আমি বুঝতে পারছি। চিন্তা কোর না। আমি দেখছি। তোমার কাজের মাধ্যমেই এই অপমানের জবাব তুমি দেবে ইনশাল্লাহ।”
সাহিল বলল, “শুক্রিয়া জনাব।”
আসাদ বলল, “রাগ কমাও। ঠাণ্ডা মাথায় কিছু হিসেব করতে হবে। আব্বাসাবাদে আর্মির তল্লাশি বাহিনী গেছে?”
সাহিল বলল, “হ্যাঁ গেছে। কিছু পায় নি। ওরা পালিয়ে যায়।”
আসাদ হাসল, “স্বাভাবিক। ওভাবে কি ধরা যায়? চল এবার রফিক সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আসি। তোমার সাসপেনশনটা তোলাতে হবে।”
সাহিল বলল, “আমি যাব?”
আসাদ বলল, “হ্যাঁ। চল।”
ভোর পাঁচটায় কোয়েটা স্টেশনে ট্রেন থেকে নামলেন বৃদ্ধ। তার পাশে বসে থাকা এক যুবক তাকে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাবেন চাচাজি?”
বৃদ্ধ বলল, “আমি চলে যাব। চিন্তা কোর না।”
ছেলেটা তাও তাকে স্টেশনের বাইরে অটোয় তুলে দিল। বৃদ্ধ অটোয় উঠে বলল, “শাহবাজ টাউনে চল।” অটো শাহবাজ টাউনের দিকে রওনা দিল। ভোরবেলা হাওয়া দিচ্ছে। বৃদ্ধ বিড়বিড় করে বাংলায় বলল, “বাপরে, হাড় মাস সব কালি করে দিলে। কী হাওয়া”!
অটোচালক বলল, “কিছু বললেন চাচা?”
বৃদ্ধ বলল, “না বাবা, তুমি চল।”
ভোরের আলো ফোটে নি। রাত তখনো লেপটে আছে কোয়েটার আকাশে। ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলের কাছে আসতেই অটো আটক হল। পুলিশ অটোর ভেতর উঁকি মেরে বলল, “কোথায় যাবেন?”
বৃদ্ধ বলল, “শাহবাজ টাউন যাবো বাবা।”
পুলিশ ভ্রূ কুঁচকে বলল, “এত ভোরে? মসজিদ থেকে যাচ্ছেন নাকি?”
বৃদ্ধ বলল, “না বেটা। মেয়ের বাড়ি থেকে আসছি। করাচী থেকে।”
পুলিশটা কিছুক্ষণ চিন্তা করে অটোচালককে বলল, “যা।”
চেক পোষ্ট পেরিয়ে হাঁফ ছেড়ে অটো চালক বলল, “বুঝলেন চাচা, এখানে এখান ব্লাস্ট হবার পর সব লোকের বুদ্ধি খুলেছে। তার আগে অবধি কারো দেখা ছিল না।”
বৃদ্ধ বলল, “তা তো হবেই বেটা। কত মানুষের জীবন।”
অটোচালক বলল, “শুধু আমাদের জানের কোন কদর নেই।” বৃদ্ধ বলল, “তা বটে।”
শাহবাজ টাউনের একটা বাড়ির কাছে নেমে গেল বৃদ্ধ। অটো চলে যেতে সে বাড়ির দরজায় তিনবার টোকা মারল।
দরজা খুলে গেল। বৃদ্ধ ঘরের ভিতর ঢুকে স্বাভাবিক গলায় বলল, “দরজা বন্ধ করে দাও জামশেদ। এবার মেক আপটা নামাই। এতক্ষণ এসব পরে থাকা যায় নাকি?”
জামশেদ দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, “তুমি আর জায়গা পেলে না আসার? এখানেই আসতে হল?”
সৈকত বাথরুমে ঢুকে গেল উত্তর না দিয়ে। কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এসে বলল, “তামাশা হবে। আমরা গ্যালারিতে বসে দেখব। মজা লাগবে না?”
জামশেদ বলল, “মজা লাগার কিছু নেই। আমি নিজেই তো ভাবছিলাম কোয়েটা থেকে অন্য কোথাও গিয়ে গা ঢাকা দেব। আসাদ মিয়াঁ চলে এসেছে এখানে।”
সৈকত গ্যাসে চা বসিয়ে দিয়ে বলল, “বেশ করেছে। আসবে না কেন? ওই সাহিলটা কোন কাজের নাকি? খালি গেলার ধান্দায় থাকে। তবে ছেলে ভাল, ব্যাটাকে ভাঙা অতো সোজা না।”
জামশেদ রাগী গলায় বলল, “ও মিয়াঁ, তুমি এখানে আই এস আই এর হয়ে কাজ করছ না। তোমাকে এত সাহিলের তরফদারি না করলেও হবে।”
সৈকত বলল, “কেন? গুণীর কদর তো করতেই হবে মিয়াঁ। এই দেখো না, এই বেওকুফ আই এস আই যেদিন বাজকে ধরতে পারবে, সেদিন আমিই ওদের প্রশংসা করব। নাকের সামনে দিয়ে চলা ফেরা করি, তাও ধরতে পারে না, এদের আর কিছু হবে না।”
জামশেদ বলল, “এত হালকা ভাবে নিও না এদের মিয়াঁ। ধরতে পারলে এরা কোন রকম রেহেম করে না। আগে গলা নামাবে, তারপরে লাশকে পুছতাছ করবে। আর শোন, ওদিকে দিল্লি থেকে আমার সঙ্গে এখন যোগাযোগ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। রোজই জানতে চাইছে এখানে আর্মির হেডরা এত ঘন ঘন আসছে কেন?”
সৈকত বলল, “আমিও তো সেটা জানতেই এখানে এলাম। তোমার অনেকদিন হয়ে গেল এখানে। বল দেখি, আর্মি হেডরা কেন এত ঘন ঘন আসছে?”
জামশেদ বলল, “কেন আবার? বালোচরা এখন খুব বাড়াবাড়ি শুরু করে দিয়েছে। যে কোন সময় গৃহযুদ্ধ লাগবে। আর্মি লোক বাড়াচ্ছে।”
সৈকত গ্যাস থেকে চা নামিয়ে গাদা গাদা চিনি চায়ে দিয়ে চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে বলল, “তুমি ঘণ্টা জানো।”
জামশেদ রেগে গেল, “ঘণ্টা জানি? তা তুমি কী জানো শুনি?”
সৈকত বলল, “আমিও ঘণ্টা জানি।”
জামশেদ বলল, “এসব ব্যাপারে ইয়ার্কি মেরো না তো মিয়াঁ। এমনিতেই খুব টেনশনে থাকি। এই যে তুমি এলে, একদম ঘরের থেকে বেরোবে না। বাড়িওয়ালা দেখলেই আমাকে অনেক জবাবদিহি করতে হবে। করাচীতে কী কাণ্ড করে এসেছ? ওখানে তোমার আইডেন্টিটি রিভিল হয়ে গেছে। নেহাত ওরা কোয়েটা নিয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছে, নইলে তোমার কপালে দুঃখ ছিল।”
সৈকত বলল, “ইন্ডিয়ার মত না হলেও পাকিস্তান অনেক বড় দেশ জামশেদ মিয়াঁ। তোমাকে চিন্তা করতে হবে না, এই পাকিস্তানি বুদ্ধুরা অতো সহজে কিছু পাবে না। তুমি আসাদের খবর পেলে কোথায়?” জামশেদ বলল, “আজকেই জিন্না রোডে দেখলাম। তার মানে সাহিলের পাত্তা কেটে গেছে। এখন মাঠে আসাদ নেমে গেছে।”
জামশেদের ফোন বাজল। জামশেদ তাড়াতাড়ি ফোন ধরে কথা বলল। কিছুক্ষণ কথা বলার পর ফোন কেটে বলল, “নাও। অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। আমি আব্বাসাবাদে হামলা করেছিল। বিদ্রোহীদের কাউকে পায় নি। গ্রামের সব বুড়ো, মহিলা আর শিশুদের তুলে নিয়ে এসেছে। শুরু হয়ে গেল।”
সৈকত বলল, “নিউটনের থার্ড ল। এ তো হবারই ছিল। তোমার বাড়িওয়ালাকে আমার ইসলামাবাদওয়ালা আইডেন্টিটি দিয়ে দাও জামশেদ। আমি ঘরে বসে থাকলে হবে না। আজ অনেকগুলো কাজ আছে।”
জামশেদ বলল, “যদি সন্দেহ করে?”
সৈকত বলল, “তাহলে তুমি আমি দুজনেই এখান থেকে কেটে পড়ব। তবে তিনটে দিন আমাকে কোয়েটায় থাকতেই হবে।
জামশেদ বলল, “হয়ে গেল। তার মানে আমার এখানকার বাসও আমাকে তোমার জন্য তুলতে হবে? তুমি ভাই এক কাজ কর, তুমি চিফের পারমিশন নাও আগে। এগুলো নিজে থেকে আমরা করতে পারব না। তুমি আমাকে এখান থেকে সরিয়ে নেবে, তারপর চিফ আমাকে ঝেড়ে লাল করে দেবে, তা হবে না। তোমার কথায় কেন আমি এদিক ওদিক দৌড়ে মরব?”
সৈকত চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “কারণ ফিল্ডে আমি আছি। দিল্লির কেউ নেই। এখন আমার কথাই তোমাকে শুনতে হবে। কোয়েটায় তোমার পোস্টিং কে করিয়েছিল? আমিই তো! এখন তুমি আমাকে চিফ দেখাতে এসো না।”
জামশেদ কয়েক সেকেন্ড থম মেরে বসে সৈকতকে বলল, “তোমার সঙ্গে তর্ক করাই বৃথা। তুমি একটা বদ্ধ পাগল। কখন কী ঠিক করবে নিজেই জানো না। মাঝখান থেকে আমায় আবার মুজফফরাবাদে পাঠিয়ে দেবে। ওখানের থেকে কোয়েটা অনেক ভাল জায়গা। এখানে তাও মাঝে মাঝে ব্লাস্ট হয়। ওখানে থাকা মানে তো
মাইনসুইপার খেলা। কখনও আর্মির নেক নজরে পড়ার ভয় থাকে, কখনো লস্কর আবার কখনো হিজবুলের।”
সৈকত বলল, “কাজ না ভাল লাগলে কেটে পড়। তোমার আসামে বাড়ি না? এখানে গিয়ে তাম্বুল বিক্রি কর।”
জামশেদ বলল, “তবু মিয়াঁ, এই ব্যাপারটার জন্য একবার চিফের পারমিশন নিয়ে নাও।”
সৈকত ভেবে নিয়ে বলল, “বেশ। ফোন কর। কথা বলে নি।”
জামশেদ স্যাটেলাইট ফোন থেকে চিফকে ফোন করল। চিফ ঘুম জড়ানো গলায় ফোন ধরে বললেন, “বল জামশেদ।” সৈকত ফোনটা জামশেদের থেকে নিয়ে কানে ধরে বলল, “স্যার আমি কোয়েটায় এসেছি। প্রয়োজন পড়লে জামশেদকে এখান থেকে সরিয়ে নিতে হতে পারে। আপনাকে জানিয়ে রাখলাম।”
চিফ হতভম্ব গলায় বললেন, “মানে? তুমি এসব করতে যাচ্ছ কেন? তুমি যে বললে আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকবে? কোয়েটায় আর কে আছে আমাদের?”
সৈকত বলল, “কেউ নেই স্যার। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি এক্সপোজ হলে জামশেদও হবে। এখানে চিরুনি তল্লাশি শুরু হয়েছে। দরকার পড়লে আমি ওকে নিয়েই বেরোব।”
চিফ বললেন, “তাতে লাভ কী হবে? কোন বড় অপারেশন তো এই মুহূর্তে হচ্ছে না। মাঝখান থেকে কোয়েটার ইনফরমেশন আসা বন্ধ হয়ে যাবে।”
সৈকত বলল, “স্যার, আমি শুধু সম্ভাবনাটুকু আপনাকে বললাম। হয়ত এসবের কিছুই হল না। আপাতত আমার মনে হল এটা হতে পারে। জামশেদকে বললাম, ও বলল আপনার থেকে পারমিশন নিয়ে নিতে। তাই আপনাকে জানিয়ে রাখলাম।”
চিফ একটু চিন্তা করে বললেন, “ঠিক আছে। তুমি কখন পৌঁছলে?”
সৈকত বলল, “একটু আগে। আব্বাসাবাদ গ্রামের মেয়ে, বৃদ্ধ আর বাচ্চাদের তুলে নিয়ে এসেছে পাক আর্মি। ওদের সন্দেহ আব্বাসাবাদের যোদ্ধারাই ব্লাস্টটা করিয়েছে। এই নিউজটা জামসেদের ইনফরমার দিয়েছে। এবার এটাও মিডিয়ায় এক্সপোজ করলে মন্দ হয় না।”
চিফ বললেন, “সেটা আমি দেখছি। তুমি আমাকে বল তোমার এখন প্ল্যান কী?”
সৈকত বলল, “আমি নিজেই জানি না স্যার। আপাতত চারপাশ দেখে যাচ্ছি। পরে প্ল্যান ঠিক করা যাবে।” চিফ বললেন, “যাই করবে আমাকে জানিয়ে করবে। আর হ্যাঁ”… চিফ একটু থমকে গিয়ে বললেন, “টেক কেয়ার।”
সৈকত বলল, “স্যার, এই যে বললেন, কী যে ভাল লাগল। আমি প্রেম করলে আমার প্রেমিকাও এভাবে কথা বলত না।”
চিফ হেসে ফেললেন, “বাকোয়াশ বন্ধ কর সৈকত। আর জামশেদের খেয়াল রেখো। তোমার খামখেয়ালিপনায় ছেলেটার যেন কোন ক্ষতি না হয়।”
সৈকত জামশেদের দিকে তাকিয়ে বলল, “হবে না স্যার। ভাল থাকুন।”
ফোন কেটে দিয়ে সৈকত চা শেষ করে বলল, “ঘুমোতে যাচ্ছি মিয়াঁ। তুমি দোকানে কখন যাবে?”
জামশেদ বলল, “আজ ডুব মারব নাকি ভাবছি। তোমাকে দেখার পর থেকে এমনিতেই টেনশনে পড়ে গেলাম।”
সৈকত বলল, “টেনশনের কিছু নেই। ঘরের চাবি দিয়ে যাও। আমি ম্যানেজ করে নেব।”
জামশেদ বলল, “তুমি কখন বেরোবে?”
সৈকত হাই তুলল, “বেরোব না। আজ সারাদিনটা ঘুমিয়েই কাটাব। তুমি ফেরো, তারপর দেখছি। ঘরে খাবার দাবার আছে কিছু?”
জামশেদ হাঁফ ছাড়ল, “ও তুমি বেরোবে না? তাহলে ঠিক আছে। খাবার যা আছে তোমার হয়ে যাবে।”
সৈকত বলল, “বাইরে থেকে তালা দিয়ে কেটে পড়বে। আর একটা ফোন দিয়ে যাও। লোকাল নাম্বার। স্যাটেলাইটটাও থাকুক। আমি ঘুমোলাম।”
জামশেদ বলল, “ঠিক আছে।”
২৩
সকাল এগারোটা।
ইসলামাবাদ প্রাইম মিনিস্টার সেক্রেটারিয়েট। বশির আলী নিজের চেম্বারে প্রবেশ করা মাত্র তার প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি এসে বলল, “জনাব, ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস সোসাইটি থেকে একের পর একটার পর এক ফোন এসে যাচ্ছে।”
বশির আলী ভ্রূ কুঁচকে বললেন, “কেন?”
“জানি না, জনাব। আপনাকেই জানাবেন বলেছেন। এই যে জনাব, আবার ফোন বাজছে।”
বশির আলী বললেন, “ঠিক আছে। আমি ধরছি।”
প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি বলল, “আমি কি অপেক্ষা করব, না চলে যাব জনাব?”
বশির আলী বললেন, “আপনি যান। কোন প্রয়োজন হলে আমি আপনাকে ডেকে নেব।”
প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বশির আলী ফোনটা না ধরে চুপ করে তার চেয়ারে বসলেন। পার্লামেন্ট শুরু হয়ে গেলে একরকম, নইলে অফিসে এসে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে করে।
ফোনটা থেমে গিয়ে আবার বাজতে শুরু করল।
বশির আলী এবার ধরলেন, “হ্যালো।”
“মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার বলছেন?”
“হ্যাঁ। বলুন।”
“আমি জুলিয়ানা বলছি। ভাল আছেন?”
হিউম্যান রাইটস! বশির আলী বিরক্ত হলেও সেটা প্রকাশ না করে বললেন, “হ্যাঁ ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন?”
“ভাল আছি। আপনাকে একটা বিশেষ দরকার ফোন করেছি। এখন কি আপনি ব্যস্ত আছেন?”
“আপনি বলুন। আমি শুনছি।”
“বালোচ লিবারেশন বাহিনীর কিছু সদস্যকে না পেয়ে পাকিস্তান সেনা বাহিনী আব্বাসাবাদ থেকে তাদের বৃদ্ধ বাবা মা এবং স্ত্রী সন্তানদের আটক করেছে কোয়েটায়। এই ব্যাপারে আপনি কোন স্টেপ নেবেন?”
বশির আলী উত্তর না দিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
“হ্যালো। হ্যালো মিস্টার পি এম। আপনি কি শুনছেন?”
“হ্যাঁ বলুন।”
“বলছি, আমি কী বলেছি, আপনি কি শুনতে পেয়েছেন?”
“হ্যাঁ আপনার কথা আমি শুনেছি। কিন্তু কোয়েটায় কী ঘটেছে, সেটা সম্পর্কে আমি এখনও কিছু জানি না। আমি দেখছি কী করা যায়।”
“দেখুন জনাব, আপনি খুব ভাল করে জানেন বালোচ বাহিনীর বর্তমান ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট মিস্টার মারি এখন ব্রিটেনে আছেন। উনি নিজে আমাদের ব্যাপারটা জানিয়েছেন। এতক্ষণে হয়ত আমেরিকান প্রেসিডেন্টের কাছেও খবর চলে গেছে। আপনাকে আমরা অনুরোধ করছি, আপনি ইমিডিয়েট স্টেপ নিয়ে ব্যাপারটাকে সামাল দিন, নইলে পাকিস্তানের খুব বড় ফেস লস হয়ে যাবে।” বশির আলীর ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে উঠে বলেন আর ফেস লস হবার বাকি কী আছে, কিন্তু কিছু না বলে বললেন, “আমি দেখছি।”
ফোনটা কেটে তিনি ইমতিয়াজ হুসেনকে ফোন করলেন। তার ফোন পাওয়া মাত্র ইমতিয়াজ ফোন ধরে বললেন, “জি জনাব। বলুন।”
বশির বললেন, “আব্বাসাবাদে কী হয়েছে?
ইমতিয়াজ থমকে গিয়ে বললেন, “কী হয়েছে জনাব?”
বশির বললেন, “আমাকে সেক্রেটারিয়েটে এসে ফরেন থেকে আসা ফোনে জানতে হচ্ছে আর্মি কাল আব্বাসাবাদ থেকে জেনানাদের আটক করেছে?”
ইমতিয়াজ বললেন, “জি জনাব, আমিও পরেই জানতে পারলাম। এখানে তো আমার কিছু বলারও নেই জনাব, কোয়েটার জওয়ানেরা খুব রেগে আছে, ওদের কিছু বললে ওরা আমার কথা শুনবেও না। এভাবে ক্যান্টনমেন্টে আক্রমণ ওরা মেনেই নিতে পারছে না। যতক্ষণ না আব্বাসাবাদের দোষীরা সারেন্ডার না করছে, মনে হয় না ততক্ষণ আমাদের আর্মি কাউকে ছাড়ার কথা ভাববে “।
বশির আলী বললেন, “হিউম্যান রাইটস কমিশন থেকে ফোন এসেছিল। আমেরিকান প্রেসিডেন্টও এই ব্যাপারে আমাকে ফোন করতে পারে। এখন আমি কার কথা শুনব আপনি বলুন।”
ইমতিয়াজ বললেন, “দেখুন জনাব, আমরা যদি এখন কোয়েটার জওয়ানদের বলি ওদের ছেড়ে দিতে, তাহলে একটা রিভোল্ট হতে পারে ওদের মধ্যে। ইট উইল বি হিউজ রিস্ক।”
বশির বললেন, “আপনি কি কিছুই করতে পারবেন না? এই ব্যাপারটা অত সোজা হবে না। এর অ্যাডভার্স এফেক্ট পড়তে পারে। বালোচদের মাথা বসে আছে ব্রিটেনে। তাদের কাছে সব খবর চলে গেছে। এখন আমরা যদি এ ব্যাপারে কোন কিছু না করি তাহলে পলিটিকালি সমস্যার সম্মুখীন হব। সব থেকে বড় কথা আমরা আমেরিকাকে কী জবাব দেব?”
ইমতিয়াজ বললেন, “জনাব, আমাদের কেনই বা আমেরিকাকে এত জবাব দিতে হবে? এই বালোচ লিবারেশনকেও সি আই এ ফান্ড করে। এগুলো সব ওপেন সিক্রেট। আমেরিকা কী বলবে ভেবে আমরা বসে থাকব? আব্বাসাবাদ থেকে যদি সরাসরি আপনি বিদ্রোহীদের গ্রেফতার করতে চান, কোন দিন সফল হবেন না। এটাই একমাত্র উপায়। ওদের বিবি, বাচ্চা, বাবা, মাকে আটক করা হলে ওরা ঠিকই আত্মসমর্পণ করবে। একমাত্র এভাবেই আমরা এই বিদ্রোহ দমন করতে পারব। নইলে খুব বড় ফেইলিওর হয়ে যাবে।” বশির বললেন, “আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, আপনি ওদের মুক্তির ব্যবস্থা করুন। যদি ব্যাপারটা গোপনীয়তার সঙ্গে হত, তাহলে আমি কিছু বলতাম না। কিন্তু এই মুহূর্তে ব্যাপারটা গোটা পৃথিবী জেনে গেছে। আপনি অন্য কোন প্ল্যান ভাবুন।”
ইমতিয়াজ বললেন, “ঠিক আছে। আমি তাহলে ওদের অফিসিয়ালি ছেড়ে দিতে বলছি। আজ বিকেলে ওদের মুক্তির ব্যবস্থা করছি। গ্রামের দিকে যাওয়া কোন বাসে ওদের তুলে দেওয়া হবে। তারপর আমাদের বাহিনী ওদের আবার গোপনে আটক করে গোপন কোন জায়গায় নিয়ে যাবে। এটা করলে আশা করি আমেরিকা আর কোন খবর পাবে না?”
বশির কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে বললেন, “আপনি ওদের ছেড়ে দিন। ওদের কিছু হলে বালোচ যোদ্ধারা আরো রেগে যাবে। শুধু যোদ্ধা কেন, গোটা দেশে ছড়িয়ে থাকা অনেক বালোচই রেগে যাবে। যে গৃহযুদ্ধ লাগবে, সেটা সামলানো যাবে না। ইন্টারন্যাশনাল প্রেশারকে এড়িয়ে যাওয়া এক্ষেত্রে একেবারেই অসম্ভব।” ইমরিয়াজ বিস্মিত হয়ে বললেন, “আপনি ওদের ছেড়ে দিতে বলছেন?”
বশির বললেন, “আপনাকে আমি অনুরোধ করছি। বাকিটা আপনার উপর।”
ইমতিয়াজ বললেন, “ঠিক আছে। আমি কোয়েটায় যোগাযোগ করে দেখি কিছু করা সম্ভব নাকি। যদি না পারি, গুস্তাখি মাফ করবেন জনাব।”
ফোন কেটে এল। বশির বুঝলেন ইমতিয়াজ বেশ রেগে গেছেন।
শ্বাস ছাড়লেন তিনি। এমন দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, যে দেশের সেনাবাহিনীই প্রধানমন্ত্রীর কথা শোনে না।
২৪
“এরা কান্দাহারের রাস্তা দিয়ে পালাতে পারে, কিংবা আরেকটা ব্যাপার হতে পারে, এদের কোন আন্ডারগ্রাউন্ড চেম্বার বা গুহা আছে। যেখানে এরা লুকিয়ে থাকে। যখনই আর্মি ওদের ধরতে যাচ্ছে, ওরা লুকিয়ে পড়ছে।”
আসাদ ম্যাপের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলল।
তার কোয়েটা বাজার সংলগ্ন এলাকায় আছে। সাহিলের অফিসে। দেওয়ালে বালোচিস্তানের ম্যাপ টাঙিয়েছে আসাদ। বার বার সেটাকেই দেখে যাচ্ছে আসার পর থেকে। রফিক আহমেদকে বলে সাহিলের সাসপেনশন উইথড্র করানো গেছে। অফিস খুললেও সাহিলের মনে বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই। মাঝে মাঝেই অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। আসাদ তবু বার বার সাহিলের সঙ্গে কথা বলে তাকে উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইমতিয়াজ হুসেনের অপমান যে সাহিল ভুলতে পারে নি, সেটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল।
আসাদের কথার উত্তরে সাহিল বলল, “এই এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ড চেম্বার কোত্থেকে পাওয়া যাবে জনাব?” আসাদ বলল, “আমরা আমাদের দেশকে এখনও কি ভাল করে চিনি? আব্বাসাবাদ পাহাড়ের মধ্যে যথেষ্ট দুর্গম পথ। এই রুটে কীভাবে চেকিং হচ্ছে?”
সাহিল বলল, “হঠাৎ করে আর্মির তল্লাশি চলছে। যখনই যাচ্ছে, তখনই খবর পেয়ে যাচ্ছে।”
আসাদ বলল, “ঠিক আছে, মানলাম তোমার কথা। তাহলে আমাকে বল, তুমি যে খবর জানলে না, সেটা রুমান কী করে জানল?”
সাহিল বলল, “সেটা একবারেই নসীবের ব্যাপার ছিল। আব্বাসাবাদের এক লোক কোয়েটা বাজারে কাজ করতে আসত। আর্মির বাড়াবাড়ি নিয়ে বাজারে কথা হচ্ছিল, লোকটা বড়াই করে বলে ফেলেছিল। ব্যস, আর যায় কোথায়? লস্করের লোক খবর দিয়ে দিল। আমার বদ নসীব হল আমার লোকেরা লোকটাকে লোকেট করতে পারে নি।”
আসাদ মৃদু হেসে বলল, “কিংবা মিয়াঁ, তোমার লোকেরা রুমানের লোকের থেকে কম এফিসিয়েন্ট”! সাহিল দুঃখিত মুখে বলল, “কী জনাব, আপনিও আমার টাং খিচাই শুরু করে দিলেন।”
আসাদ ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, “না সাহিল। সবাই তোমার মতই দেশ প্রেমিক হবে, এ আশা করাটাই তোমার অন্যায় হয়েছে। আমার মনে হয় তোমার লোকদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। তবে অন্যভাবে। উই নিড টু রান এ লয়াল্টি টেস্ট।”
সাহিল বলল, “দেখুন জনাব, আজাদির আশা সব বালোচের মধ্যেই আছে। আপনি এভাবে কি কিছু করতে পারবেন? সবাই শিক্ষিত হয় না। বুঝতেও চায় না যে একটা সিস্টেমের মধ্যে থাকার দরকার আছে। এই মুভমেন্টের নেতাগুলো এত ফান্ড নিয়ে নয় ছয় করে, এরা ক্ষমতায় এলেই বা কী হবে? কোন লাভ হবে না। অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে লয়্যাল্টি টেস্ট করে জোর করে তাদের জেলে ঢুকিয়ে তাদের আরো বেশি করে শত্রু বানিয়ে দেবেন না।”
আসাদ সাহিলের কাঁধে হাত রেখে বলল, “তাহলে তুমি আমাকে পরামর্শ দাও, আব্বাসাবাদের বিদ্রোহীদের কীভাবে ধ্রুব?”
সাহিল উত্তর দিল না।
আসাদ বলল, “দেখো সাহিল, বুঝতে চেষ্টা কর। এই আর্মি কারো কথা শুনবে না। এর মধ্যেই ওই মেয়ে বাচ্চাদের উপরে অত্যাচার করতে শুরু করে দিয়েছে। আমি…”
সাহিল বলল, “আমাকে কেন এসব বলছেন? আপনার কি মনে হচ্ছে আমি ওদের কথা ভাবছি? আই স্টিল লাভ মাই কান্ট্রি।”
আসাদ ভ্রু কুঁচকে বলল, “তাহলে?”
সাহিল বলল, “কিছুক্ষণ আগে একটা খবর পেয়েছি। খবরটা সত্যি হলে…
আসাদ বলল, “সুখবর না দুঃসংবাদ।”
সাহিল আসাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার এক সোর্স বলছে আফতাব বালোচ সেক্টর থার্টি এইটের মসজিদে লুকিয়ে আছে।”
আসাদ বলল, “কতটা কনফার্ম? এত দেরী করে বলছো কেন?”
সাহিল রেগে গেল, “আমার বলাটাই তো ঠিক হয় নি জনাব? কেন বললাম সেটাই ভাবছি। পাকিস্তান আর্মির চিফ এসে আমাকে বলে গেলেন আমি ব্লাডি বালোচ, আমার দেশকে ভালোবাসি না। যা নয় তাই বলে গালি গালাজ করলেন। এর পরেও আমি কেন বলতে যাব?”
আসাদ ড্রয়ার থেকে তার রিভলভার নিয়ে কোমরে গুঁজে বলল, “চল।”
সাহিল অবাক হয়ে বলল, “একা যাবেন?”
আসাদ বলল, “কাউকে নিয়ে গেলেই খবর হয়ে যাবে। চল। তোমার বাইকে যাব। তুমি যেতে না চাইলে আমি একাই যাব।”
সাহিল বলল, “যদি সত্যিই আফতাবকে মারতে পারেন?”
আসাদ বলল, “তোমাকে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান দেওয়ার সুপারিশ করব। কথা দিলাম।”
সাহিল বলল, “চাই না জনাব। আমার শুধু সম্মান চাই। উপরমহল বিশ্বাস করুক, আমিও একজন সাচ্চা পাকিস্তানী। চলুন।”
সাহিল অফিস থেকে বেরিয়ে বাইক স্টার্ট দিল। দুজনেই হেলমেট পরে নিল। বাজারের ভিড় এড়িয়ে সাহিল সরু গলির রাস্তা ধরল। কিছুক্ষণ পরেই তারা সেক্টর থার্টি এইটের কাছে পৌঁছে গেল। সাহিল বাইক দাঁড় করিয়ে বলল, “এই মসজিদেই আছে।”
আসাদ বলল, “চল। বাইক স্ট্যান্ড কর।”
সাহিল বলল, “ব্যাক আপ বলে রাখবেন না জনাব?”
আসাদ বলল, “না। ভেতরে ওদের লোক থাকে। আফতাব ঠিক খবর পেয়ে যাবে। লেটস গো।”
পাঁচ ছ’টা বাচ্চা ক্রিকেট খেলছে। এ অঞ্চলে রাস্তা পিচের নয়। ড্রেনের থেকে পচা গন্ধ উঠছে। মসজিদের ভিতর ঢুকে পড়ল দুজনে। মসজিদ ফাঁকা। ইমাম সাহেব ছাড়া কোথাও কেউ নেই।
তাদের ঢুকতে দেখে ইমাম সাহেব বলল, “মাগরেবের নমাজের দেরী আছে…”
আসাদ মসজিদের চারদিকে দেখতে শুরু করল। সাহিল ইমাম সাহেবের সামনে বসে বলল, “জনাব এখানে কি কেউ এসেছে? আমি জানি আপনি মিথ্যে কথা বলবেন না।”
ইমাম সাহেব সাহিলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আল্লাহর দরবারে সবাই আসতে পারে। আমি জানি না আপনি কার কথা বলছেন।”
আসাদ কাউকে না দেখতে পেরে বসে পড়ল। সাহিল তার ফোন বের করে একটা ছবি বের করে ইমাম সাহেবকে দেখিয়ে বলল, “এ কোথায় জনাব?”
ইমাম সাহেব কিছু বলার আগেই রাস্তার বাচ্চাগুলো অদ্ভুতভাবে চিৎকার করে উঠল। আসাদ সেটা শোনা মাত্র কোন দিকে না তাকিয়ে মসজিদের বাইরে দৌড়ে গেল। বাইরে এসে দেখল এক যুবক মসজিদের পাশের গলি দিয়ে দৌড়তে শুরু করেছে। আসাদকে বাইরে বেরোতে দেখে সাহিলও বেরিয়ে গেছিল। দুজনে পালিয়ে যাওয়া যুবকটির পিছু নিল।
এ অঞ্চল কোয়েটার বস্তি অঞ্চল। ছোট ছোট বাড়ি। এ বাড়ির সঙ্গে লেগে আছে আরেক বাড়ি। ছোট ছোট গলি। রাস্তা সমতল নয়। উঁচু নিচু। যুবকটি প্রাণপণে দৌড়তে দৌড়তে প্রায় এক কিলোমিটার গিয়ে হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়ে তাদের দিকে তাকিয়ে হাসল। আসাদ ছুটে এসে ছেলেটার কলার ধরে বলল, “কে তুই?”
ছেলেটা বলল, “এই তো জনাব, সামনে স্পোর্টস আছে। দৌড় প্র্যাকটিস করছিলাম।”
আসাদ ছেলেটার পেটে জোরে এক লাথি কষাল। ছেলেটা কাশতে কাশতে মাটিতে বসে পড়ে আবার হাসতে শুরু করল।
সাহিল খানিকটা পিছনে ছিল। আসাদের কাছে এসে বলল, “কী হল জনাব?”
আসাদ শ্বাস নিয়ে বলল, “আমরা ট্র্যাপড হয়ে গেলাম। আফতাব ওখানেই ছিল। ইনফরমেশন ঠিক ছিল।” সাহিল ছেলেটাকে মাটিতে ফেলে মারতে শুরু করল। আফতাব কয়েক সেকেন্ড ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হেসে পকেট থেকে রিভলভার বের করে ছেলেটার কপালে ধরল। ছেলেটা এতক্ষণ হাসছিল। এবার যুগপৎ বিস্মিত এবং ভীত হয়ে আসাদের পা জড়িয়ে ধরল, “জনাব, আমি কিছু জানি না। আমাকে ছেড়ে দিন।” আসাদ কিচ্ছু না ভেবে ছেলেটার কপাল তাক করে গুলি চালাল। আশে পাশে যারা ছিল তারা গুলির শব্দে পালাতে শুরু করল।
আসাদ হাঁটু গেড়ে বসে ছেলেটার লাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “খুব হাসি পাচ্ছিল তোর তাই না? আরো হাস। হাস।”
সাহিল কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভাবতেই পারছিল না আসাদ এভাবে গুলি চালিয়ে দিতে পারে। ছেলেটাকে গুলি করার কোন দরকার ছিল না। তুলে নিয়ে গিয়ে জেরা করলেই হত। আসাদ সেটা না করে সরাসরি গুলি চালিয়ে দিল। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না সাহিল।
