৩০
আসাদ সিগারেট ফুঁকছিল টেবিলের উপর পা তুলে। সাহিল তার চেম্বারে এসে বলল, “দুটো ছেলেকে ধরে আনা গেছে। এরাই আফতাবকে লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল। কী করব। সেনা ছাউনিতে পাঠিয়ে দেব”
আসাদ বলল, “নিয়ে এসো।”
সাহিল বাইরে গেল। কিছুক্ষণ পর পুলিশ দুজন এসে দুজন যুবককে নিয়ে এল। দুজনের হাত পা বাঁধা। মুখে কালো কাপড় দিয়ে মুখোশের মত করে পরানো। আসাদ সাহিলকে বলল, “পুলিশকে চলে যেতে বল।” সাহিল বলল, “অপেক্ষা করবে না চলে যাবে?”
আসাদ বলল, “চলে যেতে বল।”
সাহিল বলে দিল।
পুলিশ চলে গেলে আসাদ বলল, “দরজা বন্ধ কর। এদের মুখের কালো কাপড় সরিয়ে দাও।”
সাহিল তাই করল।
আসাদ ছেলেদুটোকে দেখে বলল, “কী নাম তোদের?”
ছেলেদুটো উত্তর দিল না।
আসাদ বলল, “কী ব্যাপার সাহিল। এরা কি বোবা নাকি?”
সাহিল বলল, “না না।”
আসাদ ঝুঁকে এসে একটা ছেলের গালে সিগারেটের ছ্যাকা দিল। ছেলেটা এবার চিৎকার করে উঠল। সিগারেটের গোটাটাই ছেলেটার কপালে ডেবে দিল সে। ছেলেটা কেঁদে ফেলল।
আসাদ বলল, “সেদিনের ছেলেটাও এদের বয়সীই ছিল। এরাই আফতাবকে লুকিয়ে রাখছে। মানে এই বয়সীদের মধ্যে আফতাবের বেশ ক্রেজ আছে, বোঝা যাচ্ছে। বুঝলে সাহিল, এই বয়সটাই খারাপ। অ্যাডভেঞ্চারের দিকে ঝোঁক থাকে সবার। ঠিক সময়ে ঠিক পথে না নিয়ে এলে এদের বয়সী ছেলেগুলো সব বিপথগামী হয়ে যায়। আমার রিভলভারটা দাও তো। এই দুটোকে মেরে দিলে বাকিগুলো পথে চলে আসবে।”
ছেলেদুটো এবার তারস্বরে চিৎকার করতে শুরু করল। সাহিল দাঁড়িয়ে রইল।
আসাদ আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল, “সাহিল, যা বলেছি কর। দেরী কোর না। আজ একটা সিনেমা দেখতে যাবো। আমার হাতে সময় কম আছে।”
সাহিল বলল, “জনাব, এদের মারলে আরো ঝামেলা বাড়বে। এখানকার লোকাল লোকজনের বিদ্রোহ যেটুকু ধামাচাপা দেওয়া আছে, সেটা আর থাকবে না। সব মাথাচাড়া দেবে। সমস্যা তৈরি হবে। আপনি একবার হুসেন সাহেবের সঙ্গে কথা বলে নিয়ে…”
আসাদ বলল, “কে হুসেন সাহাব? আমিই এখানে চার্জে আছি। আমিই পাকিস্তান সরকার এখানে। অনেক ক্ষমা দেখানো হয়েছে এদের উপর। এবার অ্যাকশানের পালা। সেক্টর থার্টি এইটের মসজিদের সামনের ল্যাম্প পোস্টে লাশ দুটো ঝুলিয়ে দেবে। বিদ্রোহ করার যত রকম ইচ্ছে আছে, সব বেরিয়ে যাবে। স্বপ্ন দেখা ভাল জিনিস, বাস্তবটাও বুঝতে হবে। এরা বোঝে নি, এদের পরেড় জেনারেশন বুঝে যাবে।”
সাহিল আর কথা বলল না। আসাদকে রিভলভারটা এনে দিল।
আসাদ সিগারেটে টান দিয়ে একটা ছেলের কপালে রিভলভার ধরল।
সাহিল বলল, “জনাব, এখানেই…? আর এদের কাছ থেকে কিছু জানার নেই?”
আসাদ বলল, “আছে জানার? কিরে? তোদের কিছু জানাবার আছে?”
একটা ছেলে বলল, “বলছি জনাব। বলছি। আফতাব এখানে এসে আমাদের মসজিদে ছিল। ইমাম সাহেবই ওকে মসজিদে রাতে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। আমরা ওকে পাহারা দিতাম। আমাদের মারবেন না জনাব। আর হবে না। ভুল হয়ে গেছে।”
আসাদ হাসতে হাসতে বলল, “ব্যস, বিপ্লব খতম? এ কেমন বিপ্লব? যাই হোক, একজন ধর্মের ধারক হয়ে ইমাম সাহেব দেশবিরোধী কাজ করে ফেললেন, এটা তো ঠিক হল না সাহিল। ওকেও নিয়ে আসা হোক।” সাহিল বলল, “আর যদি…”
আসাদ চিৎকার করে উঠল, “কোন যদি কিন্তু নয়। নিয়ে এসো এখানে। বাকিটা আমি বুঝে নেব।”
সাহিল বলল, “এদের নিয়ে যাব জনাব? এদের তো আর কোন কাজে লাগবে না। কী করব? জেলে পাঠিয়ে দেব?”
আসাদ বলল, “টস কর। একটাকে মেরে ঝুলিয়ে দাও, আরেকটাকে ছেড়ে দাও। কিরে বিপ্লবী, তোরা বল কাকে মারব আর কাকে ছাড়ব?”
ছেলেদুটোর মুখ সাদা হয়ে গেল। দুজনেই বলতে থাকল, “আমাকে ছেড়ে দিন জনাব।”
আসাদ বলল, “উহু, একজনকে মারব। সেটা কাকে?”
এবার দুজনেই বলল অন্যজনের কথা। আসাদ হাসতে হাসতে বলল, “দেখো সাহিল, এই হল এদের বিপ্লব। দু ঘা পড়তেই বিপ্লবের প্যান্ট ভিজে যায়। যাও, দুটোকে ছেড়ে দাও। ফিরে যাক এরা।”
সাহিল দেরী করল না। ছেলেদুটোকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলে গেল। আসাদের উপর তার একেবারেই ভরসা হচ্ছিল না। সত্যিই গুলি চালিয়ে দিতে পারে আসাদ।
কিছুক্ষণ পর ছেলেদুটোকে কোয়েটা বাজারে নামিয়ে দিয়ে গেল পুলিশ।
#
সাহিল ফিরে এসে দেখল আসাদ কম্পিউটারে কাজ করছে। তাকে দেখে বলল, “চীনাদের থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে সাহিল।”
সাহিল বলল, “কোন ব্যাপারে জনাব?”
আসাদ বলল, “চীনারা গদার পোর্টে পাঁচশো সিসিটিভি ইন্সটল করেছে। ওরা অন্য দেশে কাজ করেও নিজের দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে চিন্তা করে। আমরা এই দেশে থেকেও আমাদের দেশের মানুষদের কোন রকম নিরাপত্তা দিতে পারছি না। এটা অত্যন্ত হতাশাজনক যাই বল।”
সাহিল বলল, “এই নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারটা মনে হয় একটা জিনিসের উপর নির্ভরশীল জনাব।” আসাদ ভ্রূ কুঁচকাল, “সেটা কী?”
সাহিল বলল, “আদৌ আমরা কোন অঞ্চলের মানুষকে এ দেশের নাগরিক বলে মনে করছি, সেটা ঠিক করাও অত্যন্ত জরুরি।”
আসাদ বলল, “মানে? তুমি কি বলতে চাইছ আমি তোমাকে পাকিস্তানী ভাবি না?”
সাহিল বলল, “আমার কথা না জনাব। কিন্তু আপনি ছেলে দুটোর যে হালত করলেন, সেটা লাহোরে করতে পারতেন কোন লাহোরের বাসিন্দার সঙ্গে?”
আসাদ কয়েক সেকেন্ড সাহিলের দিকে তাকিয়ে বলল, “পারতাম। তুমি কি আমাকে এখনও চেনো নি? আমার কাছে ন্যাশনাল সিকিউরটির চেয়ে আর কোন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়।”
সাহিল মাথা নাড়ল, “না জনাব। আপনারা বায়াসড। ভীষণভাবে বায়াস “
আসাদ উঠে দাঁড়িয়ে সাহিলের কাঁধে হাত রেখে বলল, “বায়াসড হলে ছেলেদুটোকে ছাড়তাম না সাহিল। এখানেই লাশ ফেলে রাখতাম। বিশ্বাস কর।”
সাহিল ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হেসে বলল, “আপনিও খুব ভাল করে জানেন জনাব, ফিরে গিয়ে ওরা আগের মত আর জীবন কাটাতে পারবে না। ওদের বালোচ বন্ধুরা আর বিশ্বাসও করবে না। জানেন না? “ আসাদ বলল, “তুমি মাঝে মাঝে ভীষণ বিদ্রোহী হয়ে যাও সাহিল। দ্যাটস ফাইন। তুমি অনেস্ট। পিছন থেকে ছুরি মারো না অন্তত। এই বিপ্লবী সত্ত্বাটার দরকার আছে। এটা বজায় রেখো।”
সাহিল বলল, “জনাব, রুমান আলীর ফেরার সময় হল। আপনার যদি ঠিক আমার মত সিচুয়েশন হয়, রুমান আলী হুসেন সাহাবের সামনে প্রমাণ করে দেয়, আপনি একজন অপদার্থ স্পাই, আপনি কী করবেন?” আসাদ সাহিলের দিকে তাকিয়ে সিগারেট ধরাল। দুজনেই চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর আসাদ নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, “সেম রুট?”
সাহিল মাথা নাড়ল, “জি জনাব। সেম রুট রিটার্ন হবে। ওদের জানাতে হবে সব ঠিক আছে। আমরা যাচাই করার পর রুমান আবার নিজের মত করে রুট যাচাই করাবে। কোন রকম ফাঁক ফোকর থাকলে হুসেন সাহাব সবার সামনে আমাকে অ্যাবিউজ করবেন। আমাকে সেগুলো শুনে চলতে হবে। তবে আপনাকে হয়ত করবেন না। আপনি বালোচ নন। আপনাকে উনি বিশ্বাস করেন। দুর্ভাগ্যবশত আমাকে করবেন না।” আসাদ চুপ করে সিগারেট টেনে যেতে লাগল। সাহিলের দিকে চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। সাহিলের অস্বস্তি হচ্ছিল। সে বলল, “কিছু বলবেন?”
আসাদ বলল, “আফতাব বালোচের স্ত্রী কোয়েটাতেই থাকে। জানো?”
সাহিল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “হ্যাঁ, জানি।”
আসাদ বলল, “বল নি কেন?”
সাহিল বলল, “সেটা আমাদের কি কোন কাজে আসবে?”
আসাদ বলল, “যুদ্ধটা শুরু হয়ে গেছে সাহিল। আর সে যুদ্ধে এগুলোই ট্রাম্প কার্ড। পাশের ঘরে রেখে বন্দী করে রাখা আছে। দেখে এসো।” সাহিল উঠে ভিতরের ঘরে গিয়ে দেখল একজন কুড়ি থেকে বাইশ বছরের মেয়েকে মুখে কাপড় বেঁধে মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে।
সে আসাদের সামনে এসে বলল, “আফতাব পাগল হয়ে যাবে জনাব।”
আসাদ ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, “আমি তো সেটাই চাই। রুমান আলী চলে যাক। ছেড়ে দেব। কোন রকম সমস্যা হলে ওকে লাহোরের কুখ্যাত বাজারে বিক্রি করে দেব’।
পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে আসাদ সিগারেট বের করে ধরাল। সাহিল বলল, “এটা ঠিক হল?”
আসাদ বলল, “এভ্রিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার মাই ফ্রেন্ড।”
সাহিল আর কিছু বলল না।
৩১
“আমাদের আর কোন উপায় নেই। এবার আমাদের সারেন্ডার করতেই হবে। এভাবে আর কত দিন আমরা লুকিয়ে থাকব? কোন মানে হয় না।”
মোসাদ্দেক আমিরের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলল। কান্দাহার সীমান্তের কাছে একটা পরিত্যক্ত গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে আব্বাসাবাদের বালোচ বিদ্রোহীরা।
মোসাদ্দেকের কথা শুনে আমির বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলল, “সারেন্ডার করব? বাকিরা কী মনে করছ?” কেউ কিছু বলল না।
মোসাদ্দেক বলল, “ওরা আমাদের বিবি বাচ্চা, বাবা মায়ের সঙ্গে কী করছে আমরা জানি না, আমি তো সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে আছি। হয়ত আর কোন দিন ওদের দেখতে পাবো না। হয়ত বাজারে বেচে দেবে আমাদের বউ মেয়েদের। কী করব তখন?”
আমির মাথা নিচু করে বসে রইল।
একজন বলল, “সারেন্ডার করার পরে তুমি বউ বাচ্চাদের দেখতে পারবে, তার নিশ্চয়তা আছে তো?”
মোসাদ্দেক বলল, “তার জন্য আমাদের নেতাকে ফোন করা হোক। নেতা সব মিডিয়াকে জানাক। তাহলে তো কিছু হবে। সরকার বাধ্য হবে আমাদের বউ বাচ্চাদের মুক্তি দিতে। দরকার হলে সারাজীবন জেলে থাকব না হয়, কিন্তু ওরা অন্তত ভাল থাকবে।”
আমির বলল, “কী ভাল ছিলাম আমরা? পাকিস্তান সরকার আমাদের কোন ভালটা করেছে বলবে?”
মোসাদ্দেক বলল, “কিছু করে নি। কিন্তু এভাবে পালিয়ে পালিয়ে আর কত দিন থাকব? কেউ খোঁজ নেয় না। নেতারা সেই বিদেশে বসে আছে।”
আমির বলল, “সব নেতা বিদেশে বসে নেই। আফতাব কিন্তু তার প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে নিজের মত করে লড়াই করছে।”
মোসাদ্দেক বলল, “আফতাব একজনই হয়। সবাই হতে পারে না। তোমার যদি আফতাব হতে ইচ্ছে হয়, তুমি হও। আমি হব না।”
আমির বলল, “ঠিক আছে। মেনে নিলাম। তোমাদের যাদের যাদের সারেন্ডার করতে ইচ্ছে করে, তাহলে তোমরা চলে যাও। কাউকে আমি বাধা দেব না। কিন্তু আমি যাব না। আমি সব কিছুর বদলা নিয়ে ছাড়ব। শুধু একটাই অনুরোধ করব, ধরা পড়ার পর আমাদের গোপন ডেরাগুলো কোথায়, সেটা পাকিস্তান সরকারকে জানিও না। তাহলেই হবে।”
মোসাদ্দেক বসে ছিল। এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “তাই হবে। আমি কাউকে কিছু জানাবো না। বন্ধুরা, তোমরা যারা আমার সঙ্গে আত্মসমর্পণ করতে চাও, চলে এসো। আমরা তাহলে কোয়েটা রওনা দিই।” বালোচ যোদ্ধারা কেউ উঠে দাঁড়াল না। মোসাদ্দেক অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেউ যাবে?”
গ্রামের মুরুব্বি বলল, “আমার ছেলেকে ওরা ছলে বলে কৌশলে খুন করেছে। আমার এই হাত যতদিন না ওর খুনিদের রক্তে লাল হবে, ততদিন আমি শান্ত হব না। আত্মসমর্পণ করার আগে আমার মৃত্যু হওয়া ভাল। আমরা তো ঠিকই করেছিলাম, আমাদের জীবনটা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে উৎসর্গ করব। এখন আর অন্য কিছু ভাবার প্রশ্নই আসে না। আমি যাবো না। আমি আমিরের সঙ্গে থাকব। বাকিরা যারা যেতে চাও, যেতে পারো।”
মুরুব্বি আমিরের কাঁধে হাত রেখে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
আরেকজন যোদ্ধা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমিও স্বেচ্ছায় এই পথ বেছে নিয়েছিলাম। দরকার হলে মরে যাব, কিন্তু পাকিস্তানের হাতে বিক্রি হব না।”
তার কথায় সবাই হই হই করে উঠল।
মোসাদ্দেক সবাইকে দেখে আমিরের হাত ধরে বলল, “সবাই যদি আত্মত্যাগ করার এত বড় সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আমিও সবার সঙ্গে আছি। তুমি বল, আমাদের কী করতে হবে।”
আমিরের চোখ অশ্রু সজল হয়ে উঠল। সে বলল, “তোমাদের এই ঋণ আমি কোন দিন শোধ করতে পারব নাত।
মুরুব্বি বলল, “আমাদের স্বাধীনতা একদিনে হবে না। কিন্তু আমাদের এই লড়াই বৃথা হবে না। তোমার এটা একার লড়াই না আমির। আমি আমার ছেলেকে হারিয়েছি। আমার স্ত্রী ওদের কবলে আছে। কিন্তু এই লড়াই আমরা ছাড়ব না। আমরা লড়ব।”
রিয়াজ বাইরে গেছিল। সে ফিরে এসে বলল, “বর্ডারের কাছে অনেকগুলো ট্রাক এসে দাঁড়িয়েছে। স্পিন বলদাক (কান্দাহার-পাকিস্তান সীমান্তের শহর) শহরের তিনটে বাড়ি দখল করেছে রুমান আলীর লোক। আমার মনে হচ্ছে এই ট্রাক ওদেরই।”
আমির চমকে উঠল। সে তার ফোন বের করে বলল, “কান্দাহারে এখন তারেক আলী আছে?”
রিয়াজ বলল, “হ্যাঁ। আছে।”
আমির বলল, “যা হয় হোক, যদি রুমান আলী এই পথ দিয়ে পাকিস্তানে ঢোকে, তাহলে ওকে আমরা ছাড়ব না। এবার একজন দুজন না, আমরা সবাই মিলে ওর পাকিস্তানে ঢোকা বন্ধ করব। এখানেই ওর কবর হবে ইনশাল্লাহ।”
সবাই হৈ হৈ করে উঠল।
আমিরের চোয়াল শক্ত হল। সে বলল, “ঠিক আছে। আমি তারেককে ফোন করে রুমানের খবর নি। ট্রাক নিয়ে এসেছে মানে ওর মধ্যে ওদের খোরাক আছে। তৈরি হয়ে যাও সবাই। এবার যেন আমরা কিছুতেই আর ব্যর্থ না হই।”
#
জামশেদ তার ঘরে ফিরল রাত নটা নাগাদ। দরজা খুলে চমকে উঠে দেখল সৈকত তার খাটে শুয়ে আছে। জামশেদ বলল, “চিফ জানলে…
সৈকত বলল, “আমি এখনই চলে যাবো। আমার কিছু জিনিসের দরকার। সব জোগাড় করে একটা প্যাকেটে করে কাল সকাল দশটায় সাজ্জাদ টি স্টলের সামনে রেখে দেবে। আমি নিয়ে নেব।”
জামশেদ অবাক হয়ে বলল, “কী করবে সেসব নিয়ে?”
সৈকত ফিক করে হেসে বলল, “অপারেশন রাসবিহারী বোস। নাম শুনেছ ওর?”
জামশেদ বলল, “উনি বিপ্লবী ছিলেন।”
সৈকত বলল, “এমন একজন বিপ্লবী ছিলেন যাকে ব্রিটিশরা কোনদিন ধরতে পারে নি। একবার মেথর সেজে ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়েছিলেন।”
জামশেদ বলল, “তুমি কী সাজবে?”
সৈকত হাই তুলে বলল, “ওই মেথরই। খুব দরকারি। কাল সকাল দশটা। ভুলো না। এলাম। এখানে থাকলেই তো চিফ দাঁত খিঁচোতে শুরু করে দেবে। কোন দরকার নেই। বিদায় বন্ধু, আবার দেখা হবে।” জামশেদকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সৈকত বেরিয়ে গেল ঝড়ের মত।
জামশেদ অবাক হয়ে সৈকতের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
৩২
ইসলামাবাদ থেকে পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের বিশেষ বিমান যখন কোয়েটার মাটি ছুঁল, তখন বিকেল পাঁচটা। কোয়েটার বালি মাটি তখনও রৌদ্রের তাপে উত্তপ্ত।
ইমতিয়াজ হুসেন এবং কাদির প্লেন থেকে নেমে দেখলেন আসাদ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দেখে এগিয়ে এসে আসাদ সালাম জানিয়ে বলল, “রুমান আলী যোগাযোগ করেছে জনাব?”
ইমতিয়াজ বললেন, “হ্যাঁ। হোয়াটস ইওর আপডেট আসাদ?”
আসাদ বলল, “কোয়েটার সর্বত্র তল্লাশি চলছে। আফতাব নিজেকে বাঁচাতেই পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হবে। কনভয় গার্ড থাকলে রুমানের কোয়েটা থেকে বেরোনো কোনও সমস্যা হবার কথা না।”
ইমতিয়াজের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছিল। ইমতিয়াজ বললেন, “তুমি আমাদের সঙ্গে চল।”
গাড়িতে উঠল ইমতিয়াজ, আসাদ এবং কাদির। তারা কোয়েটা ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছে ইমতিয়াজের বাংলোয় প্রবেশ করলে ইমতিয়াজ বাংলোর সবাইকে বের করে দিলেন। শুধু তারা তিনজন বসলেন ড্রইংরুমে। ইমতিয়াজ বললেন, “আমাদের প্যাকেজ আসার সময় হয়ে এসেছে। কাদির সাব বর্ডার থেকে আমাদের প্যাকেজ আনতে যাবেন। আশা করব, ওর কোন সমস্যা হবে না আসাদ?”
আসাদ বলল, “একবারেই সমস্যা হবে না জনাব।”
ইমতিয়াজ বললেন, “তোমার আপডেট বল। কী কী করেছো তুমি এখানে এসে?”
আসাদ বলল, “জি জনাব, সাহিলের লিড পেয়ে আমরা আফতাব বালোচকে ধরতে গেছিলাম। ও পালাতে পারলেও যারা ওকে আশ্রয় দিয়েছিল, তাদের প্রতি যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শহরে বেশ কয়েকটা স্বাধীন বালুচিস্তানের দাবিতে মিছিল শুরু হয়েছিল, সব কটাকেই দমন করা সম্ভব হয়েছে।”
ইমতিয়াজ বললেন, “আমার ট্রাফিক ক্লিয়ার লাগবে সেদিন। মিছিল করুক না পরে। যা ইচ্ছা করুক।” আসাদ বলল, “জি জনাব। ট্রাফিক নিয়ে কোন অসুবিধা হবে না। আমি দেখব।”
ইমতিয়াজ আশ্বস্ত হয়ে বললেন, “তুমি দেখলে আমার চিন্তা অনেকটাই কমবে। ইউ ডু হ্যাভ এ ব্রাইট ফিউচার ইয়ং ম্যান। দেশে সেনা অভ্যুত্থান ঘটলে তোমার নাম আমি স্পেশালি কন্সিডার করব।”
আসাদ চমকে তাকাল ইমতিয়াজের দিকে। কাদির অবাক হলেন না। তার সন্দেহ সত্যি হয়েছে আগের দিনই। ইমতিয়াজই তাকে আলাদা করে ডেকে বলেছেন দেশে সেনা অভ্যুত্থানের সময় হয়েছে। এই দেশে বশির আলীর মত দুর্বল শাসকের কোন দরকার নেই। বেশিরভাগ মেজর জেনারেলরাই তার পক্ষে আছে। কাদির বলেছেন তিনিও হুসেন সাহেবের সঙ্গেই থাকবেন।
আসাদ বুদ্ধিমান। ইমতিয়াজের ইঙ্গিতটা বুঝল। বলল, “আমি আপনাকে হতাশ করব না জনাব। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”
ইমতিয়াজ বললেন, “গেট দ্যাট আফতাব বাস্টার্ড অ্যাজ আরলি অ্যাজ পসিবল। এন্ড রিমেম্বার, কোন মার্সি নয়।”
আসাদ মাথা নাড়ল। ইমতিয়াজ বলল, “আশা করব তোমার সাহিল বালোচ কোন রকম ইনফরমেশন লিক করবে না।”
আসাদ মাথা নাড়ল, “জি না জনাব। কিচ্ছু করবে না। হি ইজ এ জেনুইন ম্যান।”
ইমতিয়াজ বললেন, “বাট ইনএফসিয়েন্ট।”
আসাদ কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল।
ইমতিয়াজ বললেন, “নতুন পাকিস্তান গড়তে হবে আসাদ। আমার চাই ইয়ং আর্মি। আমার তোমার মত নওজোয়ানেরাই ভরসা। ব্রিং দোজ বালোচ রেবেলস টু আওয়ার ফিট। এদের এমন হাল কর যে এরা যেন আমাদের পায়ের তলায় পড়ে থাকে। কোন দিন যেন আর মাথা তুলতে না পারে।”
আসাদ বলল, “জি জনাব। তাই হবে।”
ইমতিয়াজ বললেন, “আমি আজ কোয়েটার আর্মি অফিসারদের ডিনারে ডেকেছি। তুমিও থাকবে।” আসাদ বলল, “ঠিক আছে জনাব। আমি থাকব।”
ইমতিয়াজ বললেন, “তাহলে রাতে দেখা হচ্ছে।”
আসাদ বুঝল তাকে বেরোতে বলা হচ্ছে। সে ইমতিয়াজ হুসেনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে গেল।
আসাদ বেরনোর পর ইমতিয়াজ বললেন, “কাদির সাব, আশা করব আমরা পাকিস্তানের দায়িত্ব নেওয়ার
পরে আর এসব ছোট খাটো অঞ্চলের বিদ্রোহীরা মাথা উঁচু করতে পারবে না?”
কাদির বললেন, “সেটা আশা করা যায়।”
ইমতিয়াজ বললেন, “আপনার জন্য কন্ট্রোল রুমে আমি নিজে থাকব। আপনার কোন অসুবিধা হবে না। কাদির কৃতজ্ঞ গলায় বললেন, “শুক্রিয়া জনাব।”
কাদির সাহেবের ফোন বেজে উঠল। কাদির অবাক হয়ে ইমতিয়াজের দিকে তাকিয়ে বললেন, “জনাব। মৌলানা ফোন করছেন।”
ইমতিয়াজ বললেন, “স্পিকারে দিন। আমিও শুনব কী চাইছে।”
কাদির বললেন, “জি জনাব।”
কাদির ফোন রিসিভ করে স্পিকারে দিলেন। ও প্রান্ত থেকে মৌলানার কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “চাঁদ দেখা গেছে মিয়াঁ। আপনাকে এখনই বেরোতে হবে।”
কাদির বললেন, “এখনই?”
“কেন? আপনারা তৈরি নন? পাকিস্তান আর্মি কি এতটাই অদক্ষ যে এখন বললে পারবেন না?”
ইমতিয়াজ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, “সালাম ওয়ালাইকুম জনাব। আমি ইমতিয়াজ হুসেন বলছি।”
“বাহ, হুসেন সাহাব। আপনিও আছেন? সুবহানাল্লাহ।”
ইমতিয়াজ বললেন, “প্রোগ্রামটা এত তাড়াতাড়ি ঠিক হল জনাব?”
“হল। আল্লাহর তাই ইচ্ছা। আপনার কী ইচ্ছা হুসেন সাহাব?”
“জি জনাব, আমরা তৈরি।”
ইমতিয়াজ কাদিরের দিকে তাকিয়ে ফোনের কাছে গলা নিয়ে গিয়ে বললেন, “কিন্তু এত তাড়াতাড়ি হুকুম আসবে, প্রস্তুত ছিলাম না জনাব।”
“সেটাই তো দরকার ছিল। কেউ খবর বের করতে পারবে না আর। আল্লাহর তাই ইচ্ছে যখন। আমরা তো তারই বান্দা। আপনারা কনভয় পাঠান। রাতেই অপারেশন কমপ্লিট করুন।”
“জি জনাব।”
ফোন কেটে গেল। ইমতিয়াজ বললেন, “নট আ ব্যাড প্ল্যান। আপনি চিন্তা করবেন না কাদির সাব। দরকার হলে পার্টি ক্যান্সেল করে আমি কন্ট্রোল রুমে থাকব।”
কাদির শ্বাস ছাড়লেন। নিজেকে কেমন ইমতিয়াজ হুসেনের কুকুর বলে মনে হচ্ছিল তার।
৩৩
রাত আটটা। দিল্লি।
চিফ তার চেম্বারে বসে কাজ করছিলেন, তার ফোন বেজে উঠল। চিফ নাম্বারটা দেখা মাত্রই ধরলেন, “হ্যাঁ।”
“স্যার। মেইল চেক করুন।”
“ওকে, হোল্ড কর।”
“ওকে স্যার।”
চিফ মেল খুললেন। কয়েকটা ছবি এসেছে। সেগুলো দেখে হতভম্ব হয়ে বললেন, “এগুলো কী? কোয়েটা জেলের ছবি?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“তুমি পেলে কী করে?”
“জেল থেকেই তুলে আনলাম।”
“মানে?” চিফ হতভম্ব হয়ে গেলেন, “ঢুকলে কী করে?”
“স্যার, আপনি নিশ্চয়ই মহান বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর নাম শুনেছেন?”
“হ্যাঁ। শুনেছি।”
“কোয়েটা জেলে আজ বাথরুম পরিষ্কারের দিন ছিল স্যার। মেথর সেজে ঢুকে পড়েছিলাম ওর মতই।” হাসতে হাসতে বলল সৈকত।
কোন কথা না বলে কয়েক সেকেন্ড ফোন ধরে থাকলেন চিফ। সৈকত বলল, “হ্যালো স্যার। লাইন কেটে গেল?”
“আছি। লাইন কেটে যায় নি। তুমি যে কাজটা করেছো, তার এগেইন্সটে কী কী ডিসিপ্লিনারি চার্জ আসতে পারে তোমার কোন ধারণা আছে?” অত্যন্ত রেগে গিয়ে বললেন চিফ।
সৈকত বলল, “স্যার, এত বড় একটা এভিডেন্সের লিড পেয়েছিলাম, আমি কী করতাম? আমার পক্ষে তো আর কিছু করার ছিল না। এই ছবিগুলো বালোচদের উপর পাকিস্তান সরকার ঠিক কতটা অত্যাচার করছে, তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আপনার আর কী চাই?”
চিফ বললেন, “এনাফ ইজ এনাফ। অনেক হয়েছে। তুমি আজকেই পাকিস্তান ছাড়বে। আমি বড়ালকে স্ট্যান্ডবাইতে রেখেছি কান্দাহারে। কন্ট্যাক্ট হিম। বেরিয়ে যাও তুমি। যত রাতই হোক, তুমি বেরিয়ে যাবে। ইটস অ্যান অর্ডার।”
“সেটা হয় না স্যার। সম্ভব না।”
“সব সম্ভব। কালকের মধ্যে তুমি কাবুল পৌঁছবে, নইলে তোমার কপালে দুঃখ আছে।”
“কিন্তু স্যার…”
“নো ইফস অ্যান্ড ব্যাটস। জাস্ট গেট আউট।”
ফোনটা কেটে দিয়ে চিফ কিছুক্ষণ মাথা টিপে বসে রইলেন। বিশ্বাসই হচ্ছিল না তার। মিনিট পাঁচেক পরে সামলে নিয়ে রাণাকে ফোন করলেন ইন্টারকমে।
রাণা তার চেম্বারে কাজ করছিলেন। ফোন ধরতে চিফ ও প্রান্ত থেকে বললেন, “সিরাজ আর ভেঙ্কটকে নিয়ে আমার রুমে এসো। কুইক।”
ফোন রেখে বাকি দুজনকে ডেকে নিয়ে চিফের রুমে দৌড় লাগালেন তিনি। চিফের ঘরে নক না করেই ঢুকে পড়লেন। চিফ বললেন, “আমার মেইলে এই মাত্র এই ছবিগুলো এল। হ্যাভ এ লুক।”
তার মনিটরটা রাণার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন চিফ। দশটা ছবি এসেছে। কোয়েটার জেলে আব্বাসাবাদ গ্রামের বাসিন্দাদের দুর্দশার ছবি। দশটা ভয়াবহ ছবি। একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে কতগুলো বাচ্চা জলের মেঝেতে শুয়ে আছে। তাদের বেত মেরে রক্তাক্ত করে দেওয়া হয়েছে। মহিলাদের ছবিগুলো চোখে দেখা যাচ্ছে না। রাণা দেখেই বাথরুমে ছুটে গিয়ে বমি করলেন। ভেঙ্কট এসে ছবিগুলো দেখে চোখ বন্ধ করে বললেন, “দেখা যাচ্ছে না স্যার। এরা মানুষ না।”
সিরাজ একটু পরে ঢুকলেন। তার অবস্থাও রাণার মত হল।
চিফ শ্বাস ছেড়ে বললেন, “বাজ পাঠিয়েছে। প্রতিটা ছবি টাইম স্ট্যাম্প দেওয়া। আরেকটা ভিডিও আছে। টেক নেসেসারি অ্যাকশান। ভয়াবহ বললেও কম বলা হয়।”
ভেঙ্কট বললেন, “পাকিস্তান এটাও অস্বীকার করবে।”
চিফ বললেন, “করুক। কিন্তু এটা ওদের ভয়াবহ প্রেশারে ফেলবে। অস্বীকার করতে পারবে না। এই বন্দীরা পাকিস্তানের গলার কাঁটা হয়ে যাবে। ঝেড়ে ফেলতে পারবে না।”
রাণা নিজেকে সামলালেন কিছুক্ষণ ধরে। বললেন, “এরা মানুষ না। জানোয়ার।”
চিফ বললেন, “তা নিয়ে সন্দেহ নেই। এ ছবি বালুচিস্তানে আগুন জ্বালাবে।”
রাণা বললেন, “বাজ কোথায় স্যার?”
চিফ কয়েক সেকেন্ড রাণার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওকে কোয়েটা ছাড়তে বলেছি আজ রাতেই। সায়ক ওকে কান্দাহার থেকে কাবুলে নিয়ে যাবে। ও ফিরুক এবার।”
রাণা অবাক হলেন, “কেন স্যার?”
চিফ বললেন, “আমি রিস্ক নিতে পারছি না ওকে নিয়ে। অতি উৎসাহী ছেলে। করাচীতে ওর ছবি দিয়ে লুক আউট নোটিস জারি হয়েছে। এই যুগে সে ছবি এতক্ষণে কোয়েটা চলে গেছে। এর মধ্যেই আজ কোয়েটা জেলে চলে গেছিল। ওখানের সিসিটিভি ফুটেজেও তার মানে ওর ছবি থাকবে। মানে সিরিয়াসলি? ধরা পড়লে কী হত?”
রাণা বললেন, “কিন্তু কাবুল থেকে সায়ক এত তাড়াতাড়ি কান্দাহার পৌঁছবে কী করে? আপনি কি আগেই বাজকে ফেরত আনতে চেয়েছিলেন?”
চিফ বললেন, “আমাকে ইভাকুয়েশন প্ল্যান তৈরি রাখতে হয়েছিল। কিন্তু সেটা যে এত তাড়াতাড়ি একজিকিউট করতে হবে, বুঝি নি। সায়ক আগেই কান্দাহার চলে গেছিল। ওকে স্ট্যান্ডবাই থাকতে বলেছিলাম। কিন্তু আজকে যেটা করেছে, সেটার পরে ওর ওখানে থাকার দরকার নেই। ফিরে আসুক।”
রাণা বললেন, “ক্ষতি হয়ে যাবে স্যার আমাদের। অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।”
চিফ বললেন, “বেয়াড়া এবং ত্যাঁদড় ছেলেদের এভাবেই শাস্তি দিতে হয়। ফিরে আসুক, আমি ওকে ছ মাসের ছুটিতে পাঠিয়ে দেব। আমার টেনশন বাড়িয়ে দেয় প্রতিমুহূর্তে।”
রাণা বললেন, “আর আফতাব বালোচ?”
চিফ বললেন, “পাকিস্তানের ইন্টারনাল ম্যাটার। আমাদের মাথা ঘামানোর দরকার নেই। ওরা বুঝুক। আমার এজেন্টের সেফটির কথা আমাকে ভাবতে হবে। আমার কাছে এই ছবিগুলো এনাফ এভিডেন্স। আমাদের কাজ হয়ে যাবে। জামশেদ বাকি কাজটা করবে। আপাতত বাজ ফিরুক।”
রাণা বললেন, “ওকে স্যার।”
চিফের ঘর থেকে বেরিয়ে রাণা বললেন, “কী বিচ্ছিরি রকমের অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স হল ভাবতে পারছি না।” ভেঙ্কট বললেন, “করাচীতে লুক আউট নোটিস জারি হওয়া ইজ নট গুড। চিফ আর রিস্ক নিতে চাইছেন না।”
রাণা বললেন, “হ্যাঁ। তাহলে তো আর কিছু করার নেই। ইটস টু রিস্কি। আমি ভাবছি, কী সেজে গেছিল লোকটা কোয়েটা জেলে? গড নোজ।”
সিরাজ বললেন, “রিয়েলি। কোনদিন দেখা হলে জিজ্ঞেস করব। আপাতত ওর সেফ রিটার্নের জন্য প্রার্থনা করি।”
রাণা বললেন, “যা বলেছ।”
৩৪
রাত দশটা।
বশির আলী তার বাসভবনে গুলাম আলীর গজল শুনছিলেন। এই সময়টা তার একান্ত সময়। বলা থাকে, কেউ যেন তাকে ডিস্টার্ব না করে।
দরজায় নক হল। বিরক্ত হলেন বশির আলী। বললেন, “কাম ইন।”
তার খাস খানসামা দরজা খুলে বলল, “জনাব রফিক আহমেদ সাহেব এসেছেন। বলছেন এখনই আপনাকে ডেকে দিতে। খুব ইম্পরট্যান্ট কিছু।”
বশির আলী বিরক্ত গলায় বললেন, “ওকে নিয়ে এসো এখানেই।”
খানসামা বিস্মিত হয়ে বলল, “এখানে?”
বশির বললেন, “হ্যাঁ। এখানেই নিয়ে এসো।”
খানসামা বেরিয়েয়ে গেল। বশির গান বন্ধ করে বিছানা থেকে উঠে পায়চারি করতে শুরু করলেন।
রফিক আহমেদ তার ঘরের বাইরে এসে নক করলেন।
বশির বললেন, “আসুন। দরজা খোলা আছে।”
রফিক ঘরে প্রবেশ করে বললেন, “জনাব, কিছু খবর আছে। এখনই না বললে অনেক দেরী হয়ে যাবে।” বশির বললেন, “বসুন।”
রফিক বসলেন।
বশির তার সামনের সোফায় বসে বললেন, “বলুন।”
রফিক বললেন, “এই ছবিগুলো বেরিয়েছে ইন্ডিয়ান কয়েকটা নিউজ পোর্টালে। দেখুন জনাব।”
রফিক তার ফোনটা বশির আলীর দিকে এগিয়ে দিলেন। বশির আলী ফোনের স্ক্রিনে প্রথম ছবিটা দেখেই মুখ বিকৃত করে রফিককে তার ফোনটা ফেরত দিয়ে বললেন, “দরকার নেই দেখার। এগুলো কোয়েটারই ছবি তো? আমাকে শুধু সেটা কনফার্ম করুন।”
“জি কনফার্ম জনাব।”
বশির আলী কয়েক সেকেন্ড রফিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই ছবি বাইরে গেল কী করে রফিক সাহাব?”
রফিক বললেন, “জানি না জনাব। তবে আসাদ ফোন ধরছে না। সম্ভবত ও জনাব ইমতিয়াজ হুসেনের পার্টিতে আছে।”
বশির আলী রফিকের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বললেন, “দেখুন রফিক সাহাব, আমিও এ দেশেরই মানুষ। এখানে কোথায় কী হয়, তা আমার পার্টির লোক আমাকে ঠিকই খবর দেয়। আপনারা যদি ভেবে থাকেন, আমার কাজ হল শুধু ঘরে বসে আরাম করা, তাহলে ভুল করবেন। আমাকে আপনি একটা কথা বলুন, হুসেন সাহাব কবে প্ল্যান করছেন?”
রফিকের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। তিনি বললেন, “জনাব, যে কোন দিন।”
বশির বললেন, “আপনি কোন দিকে আছেন?”
রফিক বললেন, “আমি পাকিস্তানের শান্তির পক্ষে আছি জনাব।”
বশির জোরে হেসে ফেললেন, “ওহ কাম অন রফিক সাহাব। আপনি খুব ভাল করে জানেন ইমতিয়াজ হুসেনের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান হলে আপনার পদত্যাগ করাটা বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে।”
রফিক উত্তর দিলেন না। বশির বললেন, “ঠিক আছে। আপনি বসুন। আমি হুসেন সাহেবকে ফোন করি।” রিং হয়ে গেল প্রথমে। হুসেন ধরলেন না। আরেকবার ফোন করলে ধরলেন। বললেন, “জি জনাব।”
বশির আলী বললেন, “কোয়েটা জেলের ছবি গোটা পৃথিবীর কাছে পৌঁছে গেছে হুসেন সাহাব। খবরটা পেয়েছেন।”
ইমতিয়াজ বললেন, “ওহ। না পাই নি জনাব এখনও। খুব খারাপ ব্যাপার। আপনি আপাতত প্রেসের কোন রকম ফোন ধরা ছেড়ে দিন। আমি দেখে নিচ্ছি।”
বশির বললেন, “আর কী কী হুকুম দেওয়ার আছে আপনার হুসেন সাহাব?’
ইমতিয়াজ বললেন, “ছি ছি জনাব। কী যে বলেন! আমি হুকুম দেওয়ার কেউ না।”
বশির আলী বললেন, “তাহলে এক কাজ করে ফেলুন। আপনি বরং প্রেস ডাকুন। ওদের জানান যা জানাতে চান।”
ইমতিয়াজ বললেন, “জি জনাব। আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
বশির ফোন কেটে দিলেন। সাংবাদিকদের ফোন আসা শুরু হল।
তিনি ফোন অফ করে রফিককে বললেন, “ইমতিয়াজ হুসেন কিচ্ছু করবে না রফিক সাহাব। উনি ইসলামাবাদ আসার আগে যা করার আপনাকেই করতে হবে। পারবেন তো?”
রফিক চিন্তিত গলায় বললেন, “আমি চেষ্টা করব জনাব।”
বশির বললেন, “কোয়েটা জেল সরাসরি আর্মির আণ্ডারে তো?”
রফিক মাথা নাড়লেন, “জি জনাব।”
বশির বললেন, “ইমতিয়াজ হুসেনের অপোজিট লবিতে কে আছেন এখন? ইসমাইল খান তো?” রফিক বললেন, “জি জনাব।”
বশির বললেন, “খোঁজ নিন উনি ইসলামাবাদেই আছেন নাকি। এখানে চলে আসতে বলুন। ওকে আমার কিছু কথা বলার আছে।”
রফিক বললেন, “জি।”
বশির পায়াচারি শুরু করলেন। হেরে যাবার আগে একটা শেষ লড়াই করতে হবে।
যে করেই হোক। নইলে আজ রাতেই তাকে দেশ ছাড়তে হবে। এখন এ দেশে থাকাটাই তার কাছে ঝুঁকির ব্যাপার হয়ে যাবে। গণরোষের নামে হয় তাকে খুন করা হবে, নয়ত জেলে ঢুকিয়ে দেবে। কোনটাই হতে দেওয়া যাবে না।
