৩৫
অন্ধকারে পাহাড়ি রাস্তার বুক চিরে কোয়েটা কান্দাহার হাইওয়ে দিয়ে পাকিস্তান আর্মির একটা ছোট কনভয় যাচ্ছে। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ির গতিবেগ চল্লিশ পেরোতে পারছে না। কনভয়কে অত্যন্ত সাবধানী হয়ে যেতে হচ্ছে। কাদিরের গাড়িতে কাদির আর কাউকে উঠতে দেন নি। রুমান আলী এভাবেই তাকে যেতে বলেছিল। কাদির ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করলেন, “আর কতক্ষণ লাগবে?”
ড্রাইভার বলল, “আরো দু ঘণ্টা জনাব।”
কাদির বিরক্ত হয়ে বসে রইলেন।
কিছুক্ষণ পর বললেন, “আমরা যেদিন বর্ডারে গেছিলাম, তুমিই ছিলে না?”
ড্রাইভার বলল, “জি না জনাব। ইবাদত ছিল।”
কাদির বললেন, “তুমি কোন পোস্টে আছো?”
ড্রাইভার বলল, “জি আমি সুবেদার আনিস আলী জনাব।”
কাদির বললেন, “ওকে। তুমি কি স্থানীয়?”
আনিস বলল, “জি না জনাব। আমি রাওয়ালপিণ্ডি থেকে এসেছি।”
কাদির বললেন, “তাও ভাল। এখানে তো যেদিকেই তাকাই, বালোচ ছাড়া কিছু দেখতে পারি না।”
আনিস বলল, “জি জনাব। তবে কোয়েটায় বালোচ ছাড়াও অনেকেই থাকে। এরা একা না।”
কাদির অন্যমনস্ক গলায় বললেন, “হু। ঠিক আছে, আমি আর কথা বলব না। তুমি রাস্তায় কনসেন্ট্রেট কর।” আনিস বলল, “জি জনাব।”
খানিকটা পথ যাবার পর কনভয় দাঁড়িয়ে পড়ল।
কাদির বিরক্ত হয়ে বললেন, “কী হল? আবার।” আনিস বলল, “দেখছি জনাব..”
তার কথা শেষ হল না পর পর গুলির আওয়াজে চারদিক গম গম করে উঠল। এলোপাথাড়ি গুলি চলতে শুরু করল কনভয়ের উপড়ে।
এক ঝাঁক বালোচ বিপ্লবী কনভয় আক্রমণ করেছে। কাদির ঝুঁকে বসলেন। গাড়ির কাঁচে গুলি এসে লাগল। আনিস গাড়ি স্টার্ট করে দিয়ে বলল, “বসে থাকুন জনাব। আমি জায়গাটা থেকে আপনাকে বের করে নিয়ে যাচ্ছি।”
কাদির বললেন, “ঠিক আছে।”
কাদির বুঝতে পারলেন চারদিকে গুলির বর্ষণের মধ্যেই প্রবল গতিতে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে আনিস। তিনি সভয়ে বললেন, “দেখে চালাও। গাড়ি যেন কোনভাবেই খাদে গিয়ে না পড়ে।”
আনিস বলল, “চিন্তা করবেন না জনাব। আমি ঠিক নিয়ে যাচ্ছি।”
কাদির ফোন করার চেষ্টা করলেন। ফোনে কোন টাওয়ার নেই। স্যাটেলাইট ফোনের জন্য পকেট হাতড়ে হতভম্ব হয়ে বুঝলেন যাত্রার তাড়াহুড়োয় তিনি স্যাটেলাইট ফোনটা কোয়েটাতেই ফেলে এসেছেন।
কিছুটা যাবার পর আনিস বলল, “এবার উঠে বসতে পারেন জনাব। ওরা আর নেই।”
কাদির হাঁফ ছেড়ে উঠে বসলেন। বললেন, “আমরা কোন দিকে যাচ্ছি এবার? অন্ধকারে কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”
আনিস বলল, “নিশ্চিন্ত থাকুন জনাব। আমরা ঠিক রাস্তাতেই আছি।”
কাদির চোখ বুজলেন। তার আর মাথা কাজ করছে না। এমনিতেই এত তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে তিনি বুঝতে পারেন নি, ভেবেছিলেন আজ রাতটা বিশ্রাম নিলেই হয়ে যাবে। বেরোতে হল তাড়াতাড়ি, তার উপর ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি এখন সম্পূর্ণ বিহ্বল হয়ে গেছেন।
আধঘণ্টা চলার পর গাড়িটা একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে গেল।
কাদির বললেন, “কোথায় এটা?”
আনিস তার দিকে ফিরে বলল, “আব্বাসাবাদ জনাব। আসুন। সবাই আপনার জন্যই অপেক্ষা করছে।” কাদির চমকে উঠে বললেন, “কে তুমি?”
আনিস বলল, “তাতে কিছু যায় আসে না জনাব। আপনি আসুন। আমাকে আবার আজকেই অনেক দূরে চলে যেতে হবে। প্রচুর কাজ আমার। আপনার জন্য এরা সেই কখন থেকে বসে আছে।”
গাড়ির জানলার কাঁচে নক হল। কাদির দেখলেন মশাল হাতে একজন সে দরজা খুলতে বলছে। তিনি আনিসকে বললেন, “এরা বোধ হয় আমাকে মেরে ফেলবে, তাই না?”
আনিস বলল, “জানি না জনাব। কোয়েটা জেলে এদের স্ত্রী বাচ্চাদের আপনারা যে হালে রেখেছেন দেখলাম,
তাতে এটুকু বুঝতে পারছি, এরা খুব রেগে আছে। আপনি নামুন। আমাকে আবার অন্য জায়গায় যেতে হবে। প্রচুর কাজ, বুঝলেন না?”
আনিস গাড়ির লক খুলে দিল।
কাদির গাড়ি থেকে নামলেন।
বালোচ বিপ্লবীরা হৈ হৈ করে উঠল।
৩৬
বালোচ রেজিমেন্টের মেজর নিজে বালোচ নন। তিনি লাহোরের মানুষ। ইমতিয়াজ হুসেনের পিছু ছাড়ছেন না।
সিঙ্গল মল্টের গ্লাস হাতে নিয়ে পার্টির মধ্যমণি হয়ে ঘুরছিলেন ইমতিয়াজ হুসেন। এখানকার শেফের রান্না লা জবাব। মাঝে মাঝেই কাবাব নিচ্ছেন। আসাদ দূরে দাঁড়িয়ে ফোন করছিল।
ইমতিয়াজ হাত নেড়ে আসাদকে ডাকলেন। আসাদ তার কাছে এসে বলল, “কনভয়ের সঙ্গে কোন রকম কন্ট্যাক্ট করতে পারছি না জনাব। কোন সমস্যা হল নাকি বুঝতে পারছি না। স্যাটেলাইট ফোনেও পাচ্ছি না কাদির সাবের কনভয়ের কাউকে।”
ইমতিয়াজের ভাল নেশা ছড়েছিল। বললেন, “ও সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা কোর না। এই কাবাবটা নাও। হেই বয়!”
ইমতিয়াজ হাত নেড়ে বেয়ারাকে ডাকলেন। বেয়ারা এলে ইমতিয়াজ বললেন, “ওকে কাবাব খাওয়াও।” অনিচ্ছা সত্ত্বেও আসাদ কাবাব নিল। সাহিলকে ফোনে পাচ্ছে না। কনভয়ও কন্ট্যাক্ট করছে না। একমাত্র পাওয়া গেছে কোয়েটা ট্রাফিক কন্ট্রোলকে। মাঝরাতে শহরের ট্রাফিক কম থাকবে, তবু যাতে কোন অসুবিধা না হয়, তার ব্যবস্থা করেছে। ইমতিয়াজ জোর করে আসাদের হাতে স্কচের গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে বলল, “টেক ইট ইয়ং ম্যান।”
আসাদ গ্লাসটা ধরল। কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে। কোথাও সমস্যা হচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড ভাবতে চেষ্টা করল। কী সমস্যা হচ্ছে?
ইমতিয়াজ বালোচ রেজিমেন্টের মেজরকে ডেকে আসাদের সঙ্গে পরিচয় করালেন, “মিট দিস ইয়ং ম্যান। হি ইজ আওয়ার হিরো।”
মেজর বললেন, “জি। আমি আসাদকে খুব ভাল করে চিনি জনাব। হি ইজ রিয়েলি গ্রেট। ইনফ্যাক্ট এই সময় কোয়েটায় আসাদ না থাকলে আমাদের খুব সমস্যা হয়ে যেত।”
আসাদ মেজরকে বলল, “জনাব, একটা কথা বলবেন?”
মেজর বললেন, “বলুন।”
আসাদ বলল, “কান্দাহার হাইওয়েতে ফোনের নেটওয়ার্ক কেমন?”
মেজর বললেন, “নেই বলেই চলে। কেন বলুন তো?”
ইমতিয়াজ বললেন, “একটা সিক্রেট মিশনের ব্যাপারে। আপনাকে বলব। তবে কিছুক্ষণ পরে।”
মেজর হাসলেন, “কোন সমস্যা নেই জনাব। আপনার যখন সুবিধে হবে, আপনি আমায় বলবেন।”
ইমতিয়াজের সম্মানে গানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। একজন অফিসার বেসুরো গান গাইতে শুরু করল। ইমতিয়াজ তা দেখে উৎসাহিত হয়ে নিজেও স্টেজে উঠে মহম্মদ রফির গান গাইতে শুরু করলেন।
আসাদের ফোন বাজছিল। আসাদ দেখল সাহিল ফোন করছে। সে তাড়াতাড়ি ফোন ধরল, “আরে তোমার ফোন পাওয়া যাচ্ছিল না কেন? কোথায় ছিলে?”
সাহিল বলল, “নেটওয়ার্কের খুব ট্রাবল হচ্ছে, কিচ্ছু পাওয়া যাচ্ছে না।”
আসাদ বলল, “শোন না, আমি কিছুতেই কাদির সাহেবের ফোন পাচ্ছি না। ওই কনভয়ের কাউকেও পাচ্ছি না। কী করা যায় বল তো?”
সাহিল বলল, “আপনি কি এখনও পার্টিতে?”
আসাদ বিরক্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ। মদ পেটে পড়লে হুসেন সাহাব সব ভুলে জান দেখছি। এখানে কন্ট্রোল রুম খোলার কথা ছিল। সেসব কিচ্ছু হয় নি। দেদার মদ গিলে যাচ্ছেন। এখন স্টেজে গান করছেন।”
সাহিল বলল, “ওখানে যত থাকবেন, তত সমস্যা।”
আসাদ বলল, “তাহলে কী করব? বেরিয়ে যাব?”
সাহিল বলল, “হ্যাঁ। পারলে বেরিয়ে জান।”
আসাদ বলল, “বেশ। তুমি চলে এসো তবে। আমি চুপচাপ বেরিয়ে যাচ্ছি।”
সাহিল বলল, “ওকে। আমি এসে ফোন করছি।”
মিনিট পাঁচেক এদিক সেদিক ঘুরে আসাদ গেটের বাইরে চলে গেল।
সাহিল বাইক নিয়ে চলে এল।
আসাদ হাঁফ ছেড়ে বলল, “বাঁচা গেল।”
সাহিল বলল, “বাঁচার কিছু নেই। বাইকে উঠুন। একটা ঘটনা ঘটেছে।”
আসাদের ভ্রূ কুচকাল, “কী হয়েছে?”
সাহিল বলল, “চলুন বলছি।”
কিছুক্ষণ পর তারা তাদের অফিস ঘরের সামনে এসে পৌঁছল। রাত গভীর হয়েছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে গেছে।
সাহিল অফিস ঘরের দরজা খুলে বলল, “টিভি দেখুন।”
আসাদ টিভি অন করল। প্রধানমন্ত্রী বশির আলি এত রাতে প্রেস কনফারেন্স করে জানাচ্ছেন ফিল্ড মার্শাল ইমতিয়াজ হুসেন তাকে কিছু না জানিয়ে আব্বাসাবাদের বাসিন্দাদের অকথ্য অত্যাচার করছেন। সেসব ছবি তার কাছে এসে পৌঁছেছে। তিনি এই মুহূর্তে ইমতিয়াজ হুসেনকে বরখাস্ত করে তার পরিবর্তে ইসমাইল খানকে পাকিস্তান আর্মির ফিল্ড মার্শাল ঘোষণা করছেন। ইমতিয়াজ হুসেন কিছুই জানান নি তাকে। বরং দেশদ্রোহীতার কাজ করেছেন। ইসমাইল খানের উপর তার পূর্ণ ভরসা আছে। তিনি সবরকম শত্রুর হাত থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করতে পারবেন, সে বিশ্বাস তিনি ইসমাইল খানের উপর করেন। আসাদ অবাক হয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে রইল।
সাহিল বলল, “আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছে।”
আসাদ অবাক হয়ে বলল, “কে?”
দরজা দিয়ে আফতাব ঢুকল। তার হাতে উদ্যত অটোমেটিক মেশিন গান। আসাদ সাহিলের দিকে চমকে তাকাল। সাহিল বলল, “আমি তো আপনার দিকেই ছিলাম জনাব। কিন্তু আমাদের মা বোনদের নিয়ে টানাটানি করলে তো আমার আর কিছু করার নেই। আপনি নিজেই বলেছিলেন, এভ্রিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার। আমি আপনার কথাই মেনে চললাম।”
আসাদ পকেট থেকে রিভলভার বের করতে গেল। তার আগেই আফতাবের মেশিনগান গর্জে উঠল। আফতাব বালোচ তাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিল।
সাহিল আসাদের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সিগারেট নিয়ে ধরাল। আফতাব বলল, “আমার বিবিকে নিয়ে যেতে এসেছি। আর এই লাশটাও নিয়ে যাচ্ছি। ক্যান্টনমেন্টের সামনে টাঙিয়ে দেব। বালোচদের বউ মেয়েদের সঙ্গে ঝামেলা করার শাস্তি কী হয়, পাকিস্তান দেখুক।”
সাহিল কিছু বলল না। চুপ করে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বলল, “নিয়ে যান। কাল থেকে আসাদ খুনের তদন্তভার আশা করি আমার কাছেই আসবে। খুব ভাল করে তদন্ত করব।”
দুজনেই হো হো করে হেসে উঠল এ কথার পর
#
ইমতিয়াজ হুসেন সোফায় বসেছিলেন। সিঙ্গল মল্টের সমস্যা হল নেশাটা যত সময় যায়, তত জাঁকিয়ে আসে। স্টেজে কেউ একজন গান করছে। ইমতিয়াজ সেটাই শোনার চেষ্টা করছিলেন।
কোয়েটার মেজর জেনারেল এসে তার সামনে এসে দাঁড়াল, “জনাব। আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।”
ইমতিয়াজ বললেন, “কোথায় যেতে হবে?”
“আপনার নামে অ্যারেস্ট ওয়্যারেন্ট এসেছে ইসলামাবাদ থেকে। আপনাকে আটক করার অর্ডার এসেছে।” ইমতিয়াজ চোখ ছোট ছোট করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলেন। ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছে না তো ঠিক করে। ব্যাটা বলে কী? এই তো পেছন পেছন ঘুরছিল কুকুরের মত। বললেন, “জাস্ট গেট লস্ট। তুমি জানো, তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ?”
“এখন আপনি নো বড়ি জনাব। আপনাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। চলুন।” তাকে গ্রেফতার করার সময়েও ইমতিয়াজ কিছুই বিশ্বাস করে উঠতে পারছিলেন না। দেশের নবনিযুক্ত ফিল্ড মার্শাল তাকে বালোচ যোদ্ধাদের জন্য রাখা জেলের কুঠুরিতে বন্দী করার নির্দেশ পাঠিয়েছেন। নেশার ঘোরেই ইমতিয়াজ অবাক হয়ে দেখলেন যারা তার সঙ্গে গোটা সন্ধ্যে মদ খেল, তার গান শুনে ধন্য ধন্য করল, তারাই তাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল। ক্ষমতা থাকা আর না থাকার মধ্যে যে এত বড় পার্থক্য হতে পারে, ইমতিয়াজের বুঝতে বেশিক্ষণ লাগল না…
৩৭
রাত একটা।
স্পিন বুলদাক শহর। কান্দাহার সীমান্ত।
গোপন আস্তানায় ছট ফট করছে রুমান আলী। কাদির সাহেবের রাত এগারোটার সময় চলে আসার কথা ছিল। এখনও পৌঁছলেন না। রুমান ঠিক করেছিল কাউকে কোন প্রস্তুতির সময় না দিয়ে আজকে রাতেই পাকিস্তানে ঢুকে বালুচিস্তান পেরিয়ে যাবে। এর থেকে ভাল সুযোগ আর কিছুতেই হত না। তার সাগরেদ বলল, “জনাব। মৌলানাকে ফোন করুন।”
রুমান বলল, “হ্যাঁ জানি জানি। তোকে শেখাতে হবে না। মৌলানা এখন ঘুমোচ্ছে। বেশি ঝামেলা করার দরকার নেই।”
আরো কিছুক্ষণ পায়চারি করল সে। তবু কোন খবর এল না।
অবশেষে অধৈর্য হয়ে মৌলানাকে ফোন করল রুমান। ঘুমের ঘুরে মৌলানা ফোন ধরে বললেন, “মেজর জেনারেল পৌঁছেছেন?”
“না জনাব। কোন খবর এল না এখনও। সেই থেকে অপেক্ষা করে আছি। এখনও না এলে আমাদের প্ল্যানটাই নষ্ট হয়ে যাবে।”
“আমি কথা বলছি। তুমি অপেক্ষা কর।”
“জি হুজুর।”
ফোন কেটে গেল। দ্বিতীয়বার ফোন বাজার আগেই রুমানের এক সাগরেদ দৌড়ে এল, “জনাব। বর্ডারে আফগান সৈন্যরা আমাদের ট্রাক আটকে দিয়েছে। ওরা এদিকেই আসছে। আমাদের আস্তানার খবর পেয়েছে খুব সম্ভবত।”
রুমান অবাক গলায় বলল, “আফগান সরকারের সেনা? এখানে তো কারো আসার কথা ছিল না! যতক্ষণ না কাদির আসবে, ততক্ষণ পাকিস্তান আর্মিকে বলা হয়েছিল বর্ডার খালি করে দেওয়ার জন্য। আমি যাব ওই আফগানদের সঙ্গে কথা বলতে। ওদের এত সাহস হয় কী করে? চল দেখি।”
“একবারেই যাওয়া ঠিক হবে না জনাব। পুরো ব্যাটেলিয়ন এসে গেছে। আমাদের সঙ্গে গদ্দারি হয়েছে জনাব। কেউ খবর দিয়ে দিয়েছে। পালাতে হবে, ওরা আমাদের পেলে আটক করবে। এখানে সি আই এর বেস ক্যাম্পের লোকেরা যদি জেনে যায়, তাহলে ধরা পড়ে যাব। চলুন জনাব।”
গাড়িতে উঠে ফুঁসছিল রুমান। মৌলানাকে ফোন করে বলল, “জনাব, পাকিস্তান আর্মি আমাদের ধোঁকা দিয়েছে। ওরা খবর করে দিয়েছে।”
মৌলানা ক্লান্ত গলায় বললেন, “ধোঁকা দেয় নি। বশির আলি, হুসেন সাহাবকে গ্রেফতার করিয়েছেন। এখন ইমতিয়াজ হুসেনের হাতে আর কোন ক্ষমতা নেই।”
রুমান বলল, “আমরা তাহলে কি করব?”
মৌলানা বলল, “কান্দাহারের ডেরায় লুকিয়ে থাকো কিছুদিন। সময় হলে ফিরবে।”
রুমান ফোন রেখে রেগেমেগে ফোনটা গাড়ির অন্য কোণে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, “যে গদ্দার খবর দিয়েছে, তাকে যখন সামনে পাব, ছাড়ব না। কথা দিলাম।”
রুমানের গাড়িটা একটা টয়োটা গাড়ির পাশ দিয়ে চলে গেল।
গাড়ির চালক তাদের যেতে দেখে গাড়ি থামিয়ে হেসে ফোন বের করে দিল্লিতে ফোন করল। চিফ জেগে ছিলেন। তার ফোন পেয়ে ধরলেন, “বল সায়ক।”
“স্যার, রুমান পাকিস্তানে ঢুকতে পারল না। পালাতে বাধ্য হয়েছে। আফগান সেনা ওদের সব ট্রাক বাজেয়াপ্ত করেছে। প্রায় এগারোটা ট্রাক আছে।”
“কী আছে টাকে?”
“আর্মস। বারুদ। গাদা গাদা একে ফরটি সেভেন। সব কাশ্মীরে যেত যা বুঝতে পারছি।”
চিফ স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন, “গুড গড। এটা একটা বিরাট অ্যাচিভমেন্ট। এগারোটা ট্রাক মানে, ওরা নিশ্চয়ই এক্সপ্লোসিভ নিয়ে আসছিল। ভাগ্যিস তোমাকে ওখানে পাঠাবার কথা মাথায় এসেছিল। সৈকত পৌঁছেছে?”
সায়ক বলল, “না স্যার। এখনও আসে নি। তবে ফোন করে জানিয়েছে এসে গেছে।”
চিফ বললেন, “ঠিক আছে। তুমি সৈকতকে নিয়ে যাবে তো? দেখো রাস্তায় যেন কোন বেগড়বাই শুরু না করে। ওকে ভরসা নেই। ওর ওভার এম্বুসিয়াসজম ওর খুব বড় ক্ষতি করে দেবে একদিন, এটাই ভয়ের।” সায়ক বলল, “না স্যার, আমি সৈকতের সঙ্গে ফিরব না। তুষার স্যার আমাকে মুজফফরাবাদ যেতে বললেন। একটা অ্যাসাইনমেন্ট এসেছে। আর আই থিংক আমাদের সৈকতের মতই আরো বেশি অফিসার দরকার।
আপনার চিন্তার কোন কারণ নেই।”
চিফ বললেন, “চিন্তা হয়। কারণ মাঝে মাঝে একবারে হারিয়ে যায় ও। এগুলো আর তোমাকে কী করে বোঝাবো? তোমাকে নিয়ে তুষারও কি কম ভুগছে?”
সায়ক হেসে ফেলল। চিফ বললেন, “যাই হোক, শোন বড়াল, তুমি এনশিওর করবে সৈকত যেন দেশে ফেরে। ওকে পাকিস্তানে রাখার রিস্ক আপাতত নিতে পারছি না।”
সায়ক বলল, “ওকে স্যার।”
চিফ বললেন, “গুড নাইট, এন্ড বেস্ট অফ লাক। সাবধানে যেও।”
“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।”
ফোন রেখে সায়ক সীমান্তের চেক পোস্টের কাছে এসে দাঁড়াল। আফগান সেনা গোটা এলাকা ঘিরে দিয়েছে। পাক সীমান্তের কাছে একটা পাকিস্তান সেনা বাহিনীর গাড়ি এসে দাঁড়াল। আফগানদের বলা ছিল। সৈকতের আফগানিস্তানে প্রবেশ করতে কোন সমস্যা হল না।
সায়ক সৈকতকে জড়িয়ে ধরে বলল, “এলি তবে শেষ মেশ। চিফ কিন্তু হেবি খচে আছে। ঠিক কী করেছিস তুই?”
সৈকত বলল, “তেমন কিছু না। আপাতত কোয়েটা আর করাচীর পুলিশ আমার নামে লুক আউট জারি করেছে। কোয়েটার আর্মি জেলে মেথর সেজে ঢুকে ওরা যে কাজগুলো করছিল, সেগুলোর ছবি তুলেছি। ওদের মেজর জেনারেলকে কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছি। এগুলো কী এমন আর কঠিন ব্যাপার, এতে কি এত চাপ নেওয়া উচিত বল?”
সায়ক হো হো করে হেসে ফেলে বলল, “একবারেই না। সাবাস মেরে শের।”
সৈকত ক্লান্ত গলায় বলল, “তাহলে শেষ মেশ এখন কি বলা যায়, আমরা জিতলাম না হারলাম?”
সায়ক বলল, “এ খেলা কি আর একদিনের, যে জেতা হারার হিসেব হবে? কাবুলে হাসান আলী আছে। ও তোকে পাসপোর্ট দিয়ে দেবে। সাবধানে যাস।”
সৈকত বলল, “আর তুমি?”
সায়ক বলল, “আমার হল শুরু, আর তোমার হল সারা। যা ভাই। দেখা হবে যদি বেঁচে থাকি।” সৈকত বলল, “গাড়িতে মেজর জেনারেল কাদিরকে বসিয়ে রেখে এসেছি। একদম চূড়ান্ত নিরাপদভাবে তুমি ওর সঙ্গে যেতে পারবে। ব্যাটার জীবন বাঁচিয়েছি। আমি না থাকলে বালোচ যোদ্ধারা ওকে মেরেই দিতো। আপাতত হেল্প করবে। তবে সাপের জাত। ফোন করতে দেবে না। কোয়েটা পৌঁছে ব্যাটাকে মুখ হাত পা বেঁধে কোথাও ফেলে দিও। চাইলে খাদে ফেলেও দিতে পারো, বেঁচে যাবে তবে হাত পা ভাঙবে।” সায়ক হাসতে হাসতে বলল, “তোর ভয় টয় নেই, নারে?”
সৈকত বলল, “বাংলা সিরিয়াল ছাড়া দুনিয়ার কোন কিছুতে আমি ভয় পাই না। তুমি কোথায় যাবে?” সায়ক বলল, “আজাদ কাশ্মীর।”
সৈকত লাফিয়ে উঠে বলল, “আমিও যাব। আমি বাড়ি গিয়ে কী করব? সেই মা সিরিয়াল দেখবে আর আমার মাথা খেয়ে যাবে বিয়ে কর বিয়ে কর বলে। প্লিজ সায়কদা। আমি যাব।”
সায়ক হাসতে হাসতে বলল, “কেটে পড়। চিফ জানলে রক্ষা নেই। আসি। ফোনটা রাখ, হাসানের কাছে দিয়ে দিস।”
অন্ধকারের মধ্যে সায়ক বালুচিস্তানে প্রবেশ করে কাদিরের গাড়িতে উঠল। গাড়ির আলো জ্বলে উঠল। সৈকত হাত নাড়ল। গাড়িটা ব্যাক করে নিয়ে সায়ক কোয়েটার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
যতক্ষণ গাড়িটা দেখা যায়, সৈকত দাঁড়িয়ে রইল। গাড়িটা অদৃশ্য হয়ে গেলে সে চিফকে ফোন করল। চিফ ঘুম জড়ানো গলায় বললেন, “হ্যাঁ সায়ক, সব ঠিক আছে?”
সৈকত বলল, “স্যার, প্লিজ স্যার, আমি বাড়ি যাব না। আমাকে সায়কদার সঙ্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।”
চিফ রেগে গেলেন, “ভোর রাতে ফোন করে ইয়ার্কি হচ্ছে? কাল বিকেলের মধ্যে দিল্লিতে আমার অফিসে রিপোর্ট করবে। নইলে দেখবে কী করি।”
সৈকত তাড়াতাড়ি ফোন কেটে দিয়ে ঘাম মুছে বলল, “বাপরে… কী খচে গেছে! পুরো বাংলা সিরিয়ালের ভিলেন। যাক গে, যা আছে ভাগ্যে।”
হাই তুলতে তুলতে সৈকত সায়কের রেখে যাওয়া গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিল।
এবার ঘরে ফেরার পালা…
***
