আংশিক মেঘলা আকাশ ও মৃত্যুর সম্ভাবনা – অরূপ রতন সমাজদার
আংশিক মেঘলা আকাশ ও মৃত্যুর সম্ভাবনা – অরূপ রতন সমাজদার
লেখকের কথা
২০২০—তে করোনার প্রকোপে যখন লকডাউন ঘোষণা করা হল, তখন আমার রিটায়ার্ড, ভ্রমণপিপাসু বাবা খানিক বাধ্য হয়েই আশ্রয় নিলেন গোয়েন্দাকাহিনির কাছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অবশ্য সেই আশ্রয় পরিণত হল নেশায় এবং বাংলা, ইংরেজি ও সারা পৃথিবীর অনুবাদসাহিত্য মিলিয়ে ভদ্রলোক গত চার বছরে দুশো’র বেশি ডিটেকটিভ বই পড়ে শেষ করেছেন। একবিন্দু বাড়িয়ে বলছি না। বাবার কাছে তারিখ দিয়ে তালিকা করা আছে।
নিজের লেখার ভূমিকায় এই প্রসঙ্গ উত্থাপনের কারণ আছে। আমি চিরকালই ক্রাইম ফিকশনের ভক্ত। বিভিন্ন সময়ের, বিভিন্ন দেশের ও বিভিন্ন স্বাদের ক্রাইম কাহিনির প্রতি সবসময়েই আমার সাংঘাতিক টান। গত দশ বছরে এই টান সম্ভবত আরও দৃঢ় হয়েছে এবং উৎসাহলাভ করেছে বিশেষ কিছু মানুষের সংস্পর্শে এসে। ক্রাইম ফিকশন অনুরাগী বন্ধুমানুষের তৈরি সামাজিক গণ্ডি আমার নিজের গোয়েন্দাকাহিনি চর্চার ব্যাপারে নিঃসন্দেহে বিরাট অবদান রেখেছে, রেখে চলেছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও নিজে থেকে লেখার কথা ভাবিনি। কিছু প্লটের আইডিয়া, চরিত্র বা পরিস্থিতির আবছা রূপরেখা মাঝেমধ্যে মনের কোনায় উঁকি দিলেও, সেসব বাস্তবায়িত করার দিকে আদৌ এগোনো হয়নি।
করোনাকালে পৃথিবীর মুখের উপর দোর দেওয়ায় অবস্থার খানিক পরিবর্তন হল। গৃহবন্দি পরিস্থিতিতে বাবার দৌলতে বাড়িতেও যখন অষ্টপ্রহর বিভিন্ন গোয়েন্দা গল্প নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হল, তখন ধীরে ধীরে মাথার ভিতর সেইসব আইডিয়ার বীজ, চরিত্রের ছায়া ও পটভূমিকার মানচিত্র একটু একটু করে অবয়ব ধারণ করা শুরু করল।
পটভূমিকার ব্যাপারে একটু আলাদা করে বলতে চাই। এই বছর মে মাসে আমার কর্মস্থলের নিকট বন্ধুদের সঙ্গে অল্প কিছুদিনের জন্য উত্তরবঙ্গে বেড়াতে যাই। কোলাখামে পা রেখেই মনে হয়েছিল মাথার ভিতর প্লটের কিছু অংশ আর-একটু জীবন্ত হয়ে উঠল। জায়গাটির সঙ্গে যত পরিচিতি বাড়ে, ততই সেখানকার রাস্তাঘাটে, বাড়িতে, বারান্দায়, পাহাড়ি বাঁকের মুখে আমার চরিত্রদের দেখতে পাই। লিখতে শুরু করার ব্যাপারে সেই অর্থে কোলাখাম আমাকে প্রয়োজনীয় শেষ ধাক্কাটুকু দেয়। কলকাতায় ফিরে না-লেখার আর বিশেষ অজুহাত থাকে না। সুপ্রতীক, পূজা ও বিদিশার সঙ্গে এই বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতি আলাদা করেও আমার কাছে খুবই আনন্দের। ধরে নিচ্ছি উপন্যাসটি পরোক্ষভাবে হলেও, অন্তত আমাদের কাছে সেই স্মৃতি অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখবে।
আমার মতো আনকোরা লোকের জন্য লিখতে বসার সিদ্ধান্ত একরকম, আর টানা লিখে সেই লেখা শেষ করা সম্পূর্ণ এক ভিন্ন ব্যাপার। এইখানে কিছু মানুষের অবদানের কথা বলতেই হয়। হয়তো সেই অবদানের কথা বলার জন্যই এই লম্বা উপক্রমণিকা ফেঁদে বসেছি। সেঁজুতি শুধু আমার বন্ধু নয়, আমার সবথেকে নিকট মানুষ। সেইসঙ্গে গোয়েন্দা গল্পের পাঠিকা হিসাবে তুলনাহীন। “এরপর কী হল? পরের চ্যাপ্টার কবে পাঠাবি?” এই প্রশ্নের বিরামহীন তাড়না দিয়ে এই উপন্যাসে সেঁজুতির অবদান শুরু। ওর উৎসাহ এবং টানা ফিডব্যাক ছাড়া এই উপন্যাস প্রথম অধ্যায় শেষ করে দ্বিতীয়তে পা রাখত কিনা সন্দেহ আছে। আখ্যানের কাঠামো ও ভাষা সংক্রান্ত মতামত দেওয়া বাদেও সেঁজুতি বিরাট সাহায্য করেছে প্রাথমিক এডিটিং ও প্রুফ রিডিং—এর ক্ষেত্রে। প্রতিটি বাক্য খুঁটিয়ে দেখে যাবতীয় খুঁটিনাটি ভুল সংশোধন করে না দিলে আমার এই এলোমেলো আঁকিবুকি কখনোই একটি পাণ্ডুলিপির আকার নিত না। প্রথম শব্দ থেকে শেষ, উপন্যাসের গোটা পথ চলায় সেঁজুতিও টানা হেঁটেছে।
এই প্রসঙ্গে অবশ্যই উল্লেখ করব আমার বাবা, অনিন্দ্যদা ও প্রদীপদার কথা। সকলেই আমার লেখা যত্ন ও ধৈর্য সহকারে পড়ে মূল্যবান মতামত দিয়েছেন, যার ফলে নিঃসন্দেহে এই উপন্যাসের মানবৃদ্ধি হয়েছে। বিশেষত চরিত্রায়নের ব্যাপারে অনিন্দ্যদা ও প্লটের মারপ্যাঁচের বিষয়ে প্রদীপদার মতামত না পেলে কাহিনিতে বেশ কিছু খুঁত থেকে যেত বলেই মনে করি। এর বাইরে আর-একজনের কথা আলাদা করে উল্লেখ না করলেই নয়। অনির্বাণদার সঙ্গে আমার পরিচয় দশ বছরের বেশি সময় ধরে। মানুষটিকে বেশিরভাগ লোক তত্ত্ব ও দর্শনচর্চার জন্য চিনলেও তাঁর গোয়েন্দা কাহিনির প্রতি অনুরাগের কথা না বললে সেই পরিচয় অসম্পূর্ণ। অনির্বাণদার সংস্পর্শে এসে আমার ক্রাইম ফিকশন পাঠের অভিজ্ঞতা এবং সেই বিষয়ে ভাবনা ও চর্চার বিস্তারের মাধ্যমে গোয়েন্দাসাহিত্যের দিগন্ত ক্রমে নতুনভাবে উন্মুক্ত।
গোয়েন্দাসাহিত্যের দিগন্ত। আমার অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। মাথার উপর উজ্জ্বল সব নক্ষত্র সেখানে পাঠককে পথ দেখায়। গত তিরিশ বছরে সেই পথে বহু আনাগোনায় অনেক তারার নাম জেনেছি, তাঁদের চিনেছি, সেই নক্ষত্রমণ্ডলের সঙ্গে পরিচয় নিবিড় হয়েছে। কিন্তু মহাকাশের মতোই চেনা ছায়াপথের থেকে অচেনা ও অজানার পরিসর আরও বৃহৎ, আরও বিস্তৃত। যখন এই আকাশের নীচে লিখতে বসেছি, নিশ্চয়ই সেই চেনা—অচেনা, পরিচিত—অপরিচিত সকল নক্ষত্রই আলো দিয়েছেন। কিন্তু সচেতনভাবে যাঁদের দীপ্তি অনুভব করেছি, তার মধ্যে আগাথা ক্রিস্টি, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ও কিইগো হিগাশিনোর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও প্রতিটি বাক্যে, প্রতি অনুচ্ছেদ ও অধ্যায়ে নিশ্চয় আরও অনেকের আলো মিলেমিশে আছে। নিবিষ্ট পাঠক হয়তো তা আমার থেকে ভালো শনাক্ত করবেন।
সাহিত্য কথাটির মধ্যে ‘সহিত’ শব্দটির উপস্থিতি লক্ষণীয়। অপরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন সম্ভবত সাহিত্যের অন্যতম মূল শর্ত। সেই কারণে লেখালিখির চর্চা যতই মূল্যবান হোক, গ্রন্থিত ও প্রকাশিত না হলে সেই উদ্দেশ্য কিঞ্চিৎ কক্ষচ্যুত তো বটেই। এই নতুন, অনভিজ্ঞ লেখকের উপন্যাসকে প্রথম থেকে তার অভীষ্ট ও নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রায় হাত ধরে নিয়ে এগিয়েছে বৈভাষিক। মাধবী মজুমদার ও অদ্বয় চৌধুরীর উৎসাহ ও পরিশ্রমের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। এঁদের উদ্যম, পরামর্শ ও পাঠপ্রতিক্রিয়ার ফলে এই উপন্যাস আজকে বই হিসাবে প্রকাশিত। এখানে আরও একজনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অধ্যাপক পিনাকী দে নিঃসন্দেহে আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রাফিক ডিজাইনার ও প্রচ্ছদশিল্পী। শত ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর মূল্যবান সময় ও দক্ষতা ব্যয় করে তিনি এই বইটির প্রচ্ছদ তৈরি করেছেন। তাঁকে অজস্র ধন্যবাদ।
সাহিত্যরচনা যেমন বৌদ্ধিক চর্চা, তেমন একটি কায়িক শ্রমের কাজও বটে। তিন—চার মাস ধরে প্রতিনিয়ত নিয়ম করে চেয়ার—টেবিলে বসে লিখে যাওয়ার অনুশীলন দিনের শেষে কবজি বা শিরদাঁড়াতেও টের পাওয়া যায়। ফলে উপরোক্ত সকল মানুষের নানাবিধ সাহায্যের বাইরে আছে আর—একটি মানুষের শ্রম, যার প্রতি আমি অনেক বেশি পরিমাণে কৃতজ্ঞ। আমার মায়ের তৎপরতায় চারবেলা আমার সময়মতো খাওয়ার ব্যবস্থা, আমার জামাকাপড় গুছিয়ে রাখা, এমনকি যেই ঘরে বসে আমি সাহিত্যসাধনা করে চলেছি, সেই ঘর পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন করে কাজের যোগ্য করে রাখা—এইসব প্রাথমিক শর্ত পূরণ না হলে উপন্যাস এক লাইনও এগোত না। মায়ের এই শ্রম যেহেতু বিনামূল্যে মেলে, তাই এর অবদান মূল্যাতীত। আপাতত এইখানে ইতি। এখান থেকে লেখকের অন্তর্ধান। এখান থেকে পাঠকের আবির্ভাব।
অরূপ রতন সমাজদার
কলকাতা, ডিসেম্বর ২০২৪


Leave a Reply