চতুর্থ দিন
“ছুটির ব্যবস্থা হয়েছে, টিকিটও কেটে ফেলেছি। পরশুদিন বেলার দিকে পৌঁছোচ্ছি।” ফারুকের ঘুমের ঘোর এখনও ঠিক করে কাটেনি। শেষের দিকে একটা স্বপ্নও দেখছিল বোধহয়। একটা পাহাড়ি রাস্তা ধরে সে হাঁটছে। এখানকারই হবে হয়তো, কারণ আশেপাশে আর পিছনে বেশ বড়ো একটা কুকুরের দলও যাচ্ছিল। এরপর ব্যাপারটা ঝাপসা এবং কোনোভাবেই ঘটনাগুলো জোড়া দেওয়া যাচ্ছে না। একবার মনে হল তার বাবা বসে একটা দোকানে চা খেতে খেতে cigarette ধরালেন। সন্ধ্যার মুখে মাগ্রিবের আজান না দিয়ে দোলা মসজিদের ইমামের বসে থাকাটা নিঃসন্দেহে cigarette ধরানোর থেকেও আশ্চর্য ব্যাপার। ফারুক ছোটোবেলায় শুনেছিল যে ঐতিহাসিকরা বলেন আদতে মসজিদটির নাম নাকি দৌলা, যেমন সুজা—উদ্—দৌলা বা সিরাজ—উদ্—দৌলা। কিন্তু শয়ে শয়ে বছর ধরে লোকের মুখে ঘুরতে ঘুরতে নাম হয়ে গেছে দোলা মসজিদ। একবার মনে হল ফারুককে দেখতে পেয়ে তার বাবাই তার উদ্দেশ্যে কিছু একটা বললেন। কিন্তু কানে তো আসছে তার স্ত্রী রোকসানার কণ্ঠস্বর “কী হল? তুমি কি এখনও ঘুম থেকে ওঠোনি?” কণ্ঠে এবার কিঞ্চিৎ অধৈর্যের ছাপ।
ফারুকের খেয়ালও নেই যে ইতিমধ্যে তার ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙেছে এবং সে ফোনটা ধরেও ফেলেছে। এবার ব্যাপারটা খানিক আঁচ করে সে একটা গলা খাঁকানি দিয়ে উত্তর দিল। “না, না। বলো, সবই শুনতে পাচ্ছি। একটু আগে ঘুম থেকে উঠেছি।” “যা বলার তো বললামই। গতকাল ছুটি মঞ্জুর হয়েছে। আমাদের ব্যাংকের যে এজেন্ট, তাকেই বলেছিলাম। সে একটা পদাতিক এক্সপ্রেসের টিকিটের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আজ আর কাল একটা অডিট আছে। সেটা হয়ে গেলে, মেয়েকে কাল দাদার ওখানে দিয়ে আসব। তারপর রাতে ট্রেন।” “স্টেশনে তোমাকে নেওয়ার জন্য একটা গাড়ির বন্দোবস্ত করব?” “করতে পারো, যদি অসুবিধা না হয়। তবে না হলেও হবে, কারণ এনজেপিতে তো গাড়ির কোনো অভাব নেই।” “তা নেই। তাও দেখি যদি একটা ব্যবস্থা হয়ে যায়, তাহলে জানিয়ে দেব। তোমাকে পিক আপ করে, আমাকে এখান থেকে তুলে নিয়ে একবারে তোমার বন্ধুর ওখানে পৌঁছে দেবে।” “তোমার গলায় এখনও ঘুম আছে। এত দেরি করে উঠছ কেন? রাতে ঠিকঠাক ঘুম হয়নি?” “সেরকম কিছু না। ওই দু—একটা ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করছিলাম। তাই ঘুমোতে যেতে একটু দেরি হয়েছে।”
অপরপ্রান্তে ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা। রোকসানার গলা যখন আবার শোনা গেল, তাতে সমান পরিমাণে সহানুভূতি আর সতর্কতা। “আমি এই ক’দিন ধরে একটা কথা ভেবে যাচ্ছি। বলব কি বলব না, বুঝতে পারছিলাম না। বা বললেও কীভাবে বলব সেটাও ভেবে উঠতে পারছিলাম না।” “আমি খানিকটা আন্দাজ করতে পারছি হয়তো। কিন্তু তাও তুমি কী বলতে চাও সেটা আগে শুনি।” “দেখ, গত দু’দিন যতবার ফোন করেছি বা তুমিও করেছ, তখনই ওই হোমস্টের ঘটনা নিয়েই কথা হয়েছে। একটা ব্যাপার তুমি নিজের মুখে না বললেও আমার কাছে পরিষ্কার। কোনোভাবে, এই ঘটনার তদন্তে পুলিশের পাশাপাশি তোমার ভূমিকাও যথেষ্ট সক্রিয়। মাথায় রেখো, আমি কিন্তু কমপ্লেন করছি না। বরং তুমি যে এটা এনজয় করছ, বা তুমি এটা নিয়ে ভালোমতো এক্সাইটেড, সেটা আমার ভালোই লাগছে। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাইছি, আসলে সেটা হয়তো একটা প্রশ্ন— সেটা হল, তুমি কি শিওর হয়ে এটা করছ? মানে, ভাবনাচিন্তা বিচার—বিবেচনা করে, নাকি ঘটনার স্রোতের সঙ্গে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছ? আশা করি বুঝতে পারছ কেন এটা বলছি।”
ফারুক সম্ভবত আর—একটু কড়া কোনো প্রতিক্রিয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছিল। সে একটু চুপ করে থেকে উত্তর দিল, “এটা হয়তো হলপ করে আমিও বলতে পারব না। তুমি স্রোতের কথা বললে। আমি এই মুহূর্তে শুধু এটুকু বুঝতে পারছি যে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমার জীবন একটা অন্য খাতে চলে গেছে। এইসব থেকে অনেক দূরে। তারপর গত দু’দিনে কীভাবে যেন আবার একটা স্রোতের ধাক্কায় ওখানে না হলেও কাছাকাছি কোনো পারে এসে পড়েছি। তুমি বলছ এনজয় করার কথা। আমার আসলে খুব স্বাভাবিক লাগছে। মনে হচ্ছে আমার মাথা, আমার মন, আমার স্নায়ু ঠিক যেভাবে কাজ করার কথা সেভাবেই করছে। এগুলোই মাঝে আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছিল। আবারও যাবে কিনা জানি না। তাই শিওর হওয়ার কথা তো বলতে পারব না। আপাতত, শুধু বলতে পারি যে ভালো আছি। তোমাকে অনেকদিন হল দেখি না, মাহিকেও দেখি না। কিন্তু তাছাড়া ভালো আছি।”
“বেশ। আবারও বলছি, তোমাকে একদমই ডিসকারেজ করার জন্য এই প্রসঙ্গ তুলিনি। বা অযথা চিন্তা করে তোমার কাজে বাধাও দিতে চাই না। বরং এই ক’দিন তোমার সঙ্গে কথা বলে আমারও মনে হচ্ছিল যেন সেই আগের বয়সে ফিরে গেছি। সেটা মোটেই খারাপ লাগছে না। তবে এটুকু বলি যে সামান্য কোথাও কোনো অসুবিধা বুঝলেই আমাকে জানিও। আগেরবারের মতো অতটা টেনে নিয়ে যেও না। আপাতত রাখি। অফিসে দেরি হয়ে যাবে। পরশুদিন দেখা হচ্ছে।”
লাইন কেটে যাওয়ার পর ফারুক যখন কান থেকে ফোন নামিয়ে রাখছে তখন সে আর কোলাখামে নেই। সময়টাও পিছিয়ে গেছে এক দশকেরও বেশি। প্রায় পনেরো বছর আগে। সদ্য প্রোমোশন হওয়া কলকাতা পুলিশের অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার ফারুক সিদ্দিকি গাড়ি করে টালিগঞ্জ থেকে ফিরছিল বেক বাগানে, তার কড়েয়া রোডের বাড়িতে। এক সহকর্মীর ফ্ল্যাটে রাতে নেমন্তন্ন সেরে বেরোতে বেরোতে বেশ দেরিই হয়ে গেছে। সঙ্গে আছে দু’জন জুনিয়ার অফিসার। দু’জনেই ডিউটি থেকে সোজা ডিনারে এসেছে। তাদের দু’জনকেই হাজরার কাছে নামিয়ে দিয়ে ফারুকের বাড়ি পৌঁছতে সাড়ে বারোটা বাজবে। এবং ঢোকা মাত্রই কপালে অশেষ দুঃখ আছে।
ক’দিন পরেই মাহিরার জন্মদিন। এবার সাত হবে। তাই একটু বড়ো করে, লোকজন ডেকে, ঘরদোর সাজিয়ে বার্থডে পার্টি করার পরিকল্পনা হয়েছে। তাতে প্রথম থেকেই ফারুকের যথেষ্ট মৌখিক উৎসাহ দেখা গেছে। কিন্তু এখন অবধি ছোটাছুটি, কাজকর্ম সব রোকসানাই করেছে। আজ ফারুক সকালে বেরোবার আগে কথা দিয়েছিল যে ফিরে এসে সে বাকি কাজ যা আছে, একাই গোটাটা করে দেবে। তার কিছুই যে হল না, সেটা সে বিলক্ষণ বুঝতে পারছে এবং এবার তার স্ত্রী আর তাকে রেয়াত করবে বলে মনে হয় না। ফারুককে একটা মোক্ষম কিছু অজুহাত তৈরি করে রাখতে হবে এবং সেটা মোটামুটি আগামী কুড়ি মিনিটের মধ্যে।
ফারুক পিছনের সিটের ডানদিকের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে চুপ করে আছে। ফলে তার পাশে বসা রণজয়ও মুখে কুলুপ এঁটে তার সদ্য কেনা সোনি এরিকসন ফোনের বিভিন্ন ফিচারগুলো ঘেঁটেঘুটে দেখছে। সামনের সিটে কিন্তু তুষার একটানা কথা বলে চলেছে। সেই বাক্যস্রোত উপেক্ষা করতে না পেরে কানাইও থেকে থেকে উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। কানাই লালবাজারের দীর্ঘদিনের ড্রাইভার এবং একইসঙ্গে মাথা ঠান্ডা আর পাকানো হাত। কানাইয়ের একটা আসল নাম আছে, কিন্তু সেটা জানতে গেলে মাইনেপত্তরের খাতা খুলে দেখতে হবে। ওর নাম কীকরে কানাই হল, নিয়ে সবাই বলে একটা গল্প আছে। কিন্তু গল্পটা কেউই সঠিক জানে না।
এহেন লোকের হাতে গাড়ি যখন আচমকা ঝাঁকুনি দিয়ে ব্রেক কষে থামল, স্বাভাবিকভাবেই সকলে বেশ চমকে উঠল তখন গাড়ি মুদিয়ালি ছাড়িয়ে খানিকটা এগিয়ে এসেছে। আর—একটু সামনেই টালিগঞ্জ থানা আর তার উলটোদিকে সাদার্ন অ্যাভিনিউ শুরু। এই মাঝরাতে রাস্তাঘাট একদম শুনশান। যানচলাচলও খুব কম। শুধু সামনে একটা লাল গাড়ি একটু তেরছা করে রাস্তার অনেকটা আটকে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারের দিকের দরজা হাট করে খোলা এবং গাড়িটার সামনে খোলা রাস্তায় দুটি লোক একে অপরের সঙ্গে হাতাহাতি করে চলেছে। ধরে নেওয়া যেতে পারে, এদের মধ্যে একজন লাল গাড়ির চালক। কানাই দু’বার হর্ন দেওয়া সত্ত্বেও দুজনের কারওরই কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
দ্বিতীয়বার হর্নের আওয়াজে এবার ফারুকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। একবার পিছনে তাকিয়ে সে গাড়ির দরজা খুলে দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে গেল। আরও দরজা খোলার শব্দে সে বুঝল যে তার পিছন পিছন বাকিরাও গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে আসছে। যেখানে হাতাহাতিটা হচ্ছে, সেদিকে আর কয়েক পা ফেলতেই উগ্র মদের গন্ধটা নাকে এল। ডানদিকের লোকটাই সম্ভবত লাল গাড়ি থেকে নেমেছে। বছর পঁচিশেক বয়স। মাথার চুলে প্রচুর পরিমাণ জেল দিয়ে ব্যাকব্রাশ করা আর গায়ে একটা নীলসবুজ রং—বেরঙের হাওয়াই শার্ট। অন্য লোকটার চেহারা আর—একটু ভারী, বয়সও অন্তত দশ বছর বেশি। তার জামাকাপড়ের বাহারও কম। সে মূলত গালাগাল দিতে দিতে হাওয়াই শার্টকে আটকে তাকে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু হাওয়াই শার্ট ক্রমাগত তাকে উদ্দেশ্য করে হাত চালিয়ে যাচ্ছে।
মদের গন্ধ অগ্রাহ্য করে ফারুক এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে তাদের মারামারি থামাতে গেল। তারপর আচমকাই একসঙ্গে অনেকরকম অনুভূতির অভিজ্ঞতা। পরে অনেক ভেবেও ঘটনাক্রম ঠিকঠাক সাজাতে পারেনি। ফারুক সম্ভবত কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলেছিল। আদৌ কোনো শব্দ উচ্চারিত হয়েছিল কিনা, অথবা তার বাড়ানো ডান হাত হাওয়াই শার্টের কাঁধ স্পর্শও করেছিল কিনা ফারুকের মনে নেই। তার সঙ্গীরাও এই ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে কিছু বলতে পারেনি। হাওয়াই শার্ট এক ঝটকায় পিছন ফিরতেই ফারুকের একবার যেন একটা ছোটো চকচকে জিনিস চোখে পড়ল। পরক্ষণেই ছেলেটির ডানহাত ফারুকের শরীরের খুব কাছ ঘেঁষে চলে গেল। ফারুক দ্বিতীয়বার মুখ খুলতে গিয়ে পেটের বাঁদিকে একটা টান অনুভব করল। তারপরেই একটা কেমন যেন ভেজা ভাব। সেদিকে সবে চোখ দিতে যাবে, এর মধ্যে ছেলেটি আবার তার শরীরের খুব কাছে চলে এসেছে। ফারুক কোন দিকে চোখ দেবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবার পেটের ওই একই জায়গায় ধারালো ধাতুর ঠান্ডা স্পর্শ। খুব দ্রুত। একাধিকবার। এবং সেইসঙ্গে চামড়া এবং মাংস ভেদ হওয়ার যন্ত্রণা। ফারুকের হাঁটু রাস্তার পিচের সংস্পর্শে আসার মুহূর্তে মাথার মধ্যে বিস্ফোরণ হল। নাকি বাইরেই? বিকট শব্দটা আবার শোনা গেল। কেউ গুলি চালাচ্ছে?
চোখ খোলার পর ফারুক ভেবেছিল সে চিকিৎসার জন্য নির্ঘাত বিদেশে কোথাও এসেছে। লন্ডন বা নিউ ইয়র্ক। নিদেনপক্ষে দুবাই। পিজি হাসপাতালের কোনো এক অন্দরমহলে, লোকচক্ষুর আড়ালে যে এমন অত্যাধুনিক ব্যবস্থা আছে, সেকথা ফারুকের মর্ফিয়াপুষ্ট মস্তিষ্কও কল্পনা করে উঠতে পারেনি। সার্জারি, টেস্ট, স্যালাইন, পেনকিলার ইত্যাদির ঠেলা সামলে উঠতে না উঠতে শুরু হল মানুষের আনাগোনা। নেতা, মন্ত্রী, সহকর্মী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, আমলা, সাংবাদিক, কে নেই সেই ভিড়ে? খবরের কাগজ বা টিভিতেও এই নিয়ে চর্চা আর জল্পনা তুঙ্গে। সেই আবার আইন—কানুন, পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন। টালিগঞ্জ থানার দেড়শো মিটারের মধ্যে এরকম ঘটনা কীকরে ঘটে? ওদিকে বিরোধীপক্ষের নেতারা সারাক্ষণ ফারুকের কেবিনের বাইরে ঘুরঘুর করছে আর সুযোগ পেলেই টিভি ক্যামেরার সামনে অপরাধ দমনে সরকারের দুর্বল নীতির তুলোধনা করে যাচ্ছে।
ইতিমধ্যে রণজয়, তুষার আর কানাইয়ের সঙ্গে কথা বলে ফারুক এটুকুই জেনেছে যে সে গাড়ি থেকে নেমে ওই লোকগুলোর দিকে এগোতেই, রঙিন জামা পরা লোকটা অতর্কিতে তাকে আক্রমণ করে। লোকটার হাতে যে ছোরা আছে, সেটা বুঝতেই কয়েক সেকেন্ড লেগে যায়। ততক্ষণে ফারুক মারাত্মক জখম হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছে। লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছিল নেশাগ্রস্ত। তার হাতে ছোরা আছে বোঝামাত্রই তুষার তার সার্ভিস রিভলভার বের করে লোকটার দিকে তাক করে ওয়ার্নিং দেয়। লোকটা তাও এক পা এক পা করে এগোতে থাকলে, তুষার গুলি চালায়। দু’বার। প্রথমটা আক্ষরিক অর্থেই তার কান ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। দ্বিতীয় গুলিটা লাগে পাঁজরার নীচে।
টালিগঞ্জ থানার তৎপরতার কারণেই অবিলম্বে দু’জনকে হাসপাতালে ভরতি করা হয়। রাতের মধ্যেই গাড়ির নম্বর চেক করে জানা যায় যে আহত আততায়ীর নাম বিশাল গুপ্তা। ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে। আনোয়ার শাহ রোডে এক বন্ধুর বাড়িতে মদ, চরস, কোকেন সহ আরও নানারকম নেশা করে সে রওনা দিয়েছিল ভবানীপুরে আর—এক বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশ্যে। অন্য লোকটি একজন পথচারী। রাস্তা পার হতে গিয়ে দু’জনের বচসা বাধে, সেখান থেকে হাতাহাতি। আপাতত বিশাল গুপ্তার নামে পুলিশ একখানা প্রমাণ সাইজের চার্জশিট তৈরি করেছে। কিন্তু তার অবস্থা এখনও বেশ আশঙ্কাজনক।
আশেপাশের সবাই একই কথা বলছে। ঘটনাটা ভয়াবহ এবং অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, সেই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বড়োলোকের উচ্ছৃঙ্খল ছেলে নেশা করে গাড়ি চালিয়ে এমন কাণ্ড ঘটাবে, এ আর এমন কী আশ্চর্যের? পৃথিবীর এমন কোনো শহর নেই যেখানে এই ধরনের ঘটনা ঘটে না। কেবিনের নিভু নিভু আলোয়, আধাঘুম অবস্থায়, অবশ শরীরের ফারুক তাও ভেবে যায়। না, কোনোটাই অভূতপূর্ব ঘটনা নয়। কিন্তু একটা ব্যাপার তার কাছে অর্থহীন আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এই ছেলেটাকে সে চেনে না, জানে না। জীবনে কোনোদিন কোথাও দু’জনের কোনো ব্যক্তিগত পরিচয় বা শত্রুতা নেই। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সে ছোরা চালাতেই পারে। কিন্তু প্রথমবার ফারুককে আহত করার পরেও সে যেন জেনেশুনে আবার এগিয়ে এসে তাকে বারবার আঘাত করতে থাকে। যেন আঘাত করাটাই তার উদ্দেশ্য। ফারুকের মৃত্যু না হওয়া অবধি সে থামবে না। এই অদ্ভুত হিংসাত্মক আচরণের পিছনে যে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে, তা হাজার ভেবেও ফারুক কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি।
আরও দু’দিন পরে যখন বেশ কয়েকটা নল খুলে দেওয়া হল, তখন ফারুক খেয়াল করল যে রোকসানা বা মাহিরা কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না। ইতিমধ্যে মাহিরা সাতে পা দিয়ে ফেলেছে। কেমন হল তার জন্মদিন? অনেক কষ্টে রোকসানার দাদাকে সেই কথা বোঝাতে, রিয়াজ জানাল যে তার বোন অপারেশনের সময় ঠায় বসেছিল, কিন্তু ছোটো মেয়েকে সামলে তার পক্ষে বোধহয় রোজ আসা সম্ভব হচ্ছে না। তবে তাও সে বোনকে খবর দেবে। ফারুক দেখতে চেয়েছে জানলে সে নিশ্চয়ই আসবে।
পরদিন দুপুরের দিকে রোকসানা যখন প্রায় পা টিপে টিপে কেবিনের ভিতর ঢুকল, তখন ফারুকের চোখ বোজা। টিভিতে ভারত বনাম শ্রীলঙ্কা টেস্ট ম্যাচ চলছে, ভলিউম মিউট করা। ঘরের ভিতর একজন নার্স একটা ম্যাগাজিন হাতে ঝিমোচ্ছে। বাইরে চারজন পুলিশকর্মী বন্দুক হাতে ঝিমোচ্ছে। এই নিস্তব্ধতার মধ্যেই রোকসানা খাটের পাশে দাঁড়িয়ে, তার ডানহাতটা ফারুকের চুলে ঠেকাল। তারপর একবার ঝুঁকে ফারুকের কপালে একটা চুমু খেল।
“কেমন আছ তুমি? সব ঠিকঠাক?” চোখ খোলার পর ফারুকের প্রশ্ন শুনে রোকসানার একইসঙ্গে হাসি আর কান্না পেয়ে গেল। “সবাই খুব হেল্প করছে, খোঁজখবর নিচ্ছে। কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। কিন্তু আমরা কেউ ভালো নেই।” নিজের হাতে ফারুকের হাত চেপে ধরে রাখা অবস্থায় রোকসানার পক্ষে সাধারণ ভদ্রতার খাতিরেও মিথ্যা বলাটা সম্ভব হল না।
নিজের স্ত্রীর মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে ফারুক ইশারা করে বলল নার্সকে খানিকক্ষণের জন্য একটু বাইরে যাওয়ার অনুরোধ করতে। তাঁকে সেকথা বলাতে তিনি বিনা বাক্যব্যয়ে উঠে ঘরের বাইরে গিয়ে দরজা টেনে দিলেন। রোকসানা এদিক—ওদিক দেখে রিমোটটা খুঁজে পেয়ে, টিভিটা বন্ধ করল। তারপর নার্স যে চেয়ারে বসেছিলেন, সেটাকেই একদম খাটের কাছে টেনে এনে ফারুকের একদম মাথার কাছে বসল।
“মাহির জন্মদিন কেমন হল? গতকাল ছিল, নাকি পরশু? দিনগুলো একটু গুলিয়ে যাচ্ছে।” ফারুকের কথাগুলো নিচু গলায় আর ধীর গতিতে। “পরশু।” রোকসানাও নিচু গলায় উত্তর দিল। তারপর, একটু চুপ করে থেকে বলল, “ওর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে। এই অবস্থায় তোমাকেও বলে ঠিক করছি কিনা জানি না। কিন্তু আমার আর মাথা কাজ করছে না। কাকে বলব বুঝতে পারছি না। দাদার বাচ্চাটার সবে তিন সপ্তাহ হয়েছে। তাও ওরা তোমার এখানে দৌড়াদৌড়ি করে যাচ্ছে। এর ওপরে আবার নতুন করে কোনো সমস্যা চাপাতে চাই না। কিন্তু আমি একা একাও পেরে উঠছি না।” “আমাকে বলো, অসুবিধা নেই। বরং না জানালেই আমি দুশ্চিন্তা করব। তাতে শরীর আরও খারাপ হবে।” কথা বলতে বলতে ফারুক আবারও তার নিজের হাতটা স্ত্রীর দিকে সামান্য বাড়িয়ে দিয়েছে। “সেদিন বাড়িতে খবর এসেছে গভীর রাতে। ততক্ষণে মাহি ঘুমিয়ে পড়েছে। ওই অবস্থায় ওকে তুলে কোথাও নিয়ে যাব কিনা বুঝতে পারিনি। এখানে নিয়ে আসার কথা ভাবিওনি। তার মধ্যে ফোনে বলেওনি যে তোমার ঠিক কী অবস্থা। ওই সময়টা যে কীকরে কেটেছে! যাই হোক, আমি পাশের বাড়িতে ফাতিমা ভাবিকে ফোন করে ডেকে ঘটনাটা বললাম। উনি বাড়ি এসে মাহিকে পাহারা দিলেন। সেই অবস্থায় আমি এসেছিলাম। যাই হোক, বাড়ি ফিরে শুনি আর—এক কাণ্ড। ভোরের দিকে মাহি ঘুম ভেঙে আমাদের দেখতে না পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করেছিল। তখন ভাবি বলে দিয়েছে যে তোমার শরীর খারাপ আর আমি তোমাকে দেখতে এসেছি। তখন উলটে আরও কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে তোমার কাছে যাবে বলে। আমি বাড়ি ফিরেছি সকাল সাতটা। তখন শুনলাম, কাঁদতে কাঁদতে আধ ঘণ্টা আগে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে।” “তাহলে এক কাজ করি। কথা বলে রাখি যাতে একদিন ওকে সঙ্গে করে তুমি দেখা করতে আসতে পারো। আমাকে দেখলে হয়তো একটু ঠিক হবে।” “সে অলরেডি হয়ে গেছে। তাতে ফল আরও খারাপ হয়েছে।” “মানে?” “তোমার দুটো অপারেশন হয়ে যাওয়ার পর যখন ডাক্তার বলল যে ইমিডিয়েট আর কোনো ডেঞ্জার নেই, তখন আমি ঠিক করেছিলাম মাহিকে নিয়ে আসব। ও প্রথমে খুব খুশি হল। একটা কার্ড বানাল, বেলুন কিনল। আমরা বিকেলের দিকে এসেছিলাম। এটা ওর জন্মদিনের আগের দিন। আমরা সবে কেবিনে ঢুকেছি। তোমার তখনও অনেক যন্ত্রপাতি লাগানো, নানারকম শব্দ হচ্ছে বিভিন্ন মেশিনে। ব্যাস, সেই দেখে মাহি চিৎকার করতে শুরু করল। কান্নাও না। স্রেফ চিৎকার! খালি বলছে যে বাবা মরে গেছে, বাবা আর আসবে না। আমি যে কী অবস্থায় ওকে বাড়ি নিয়ে গেছি, বলে বোঝাতে পারব না। সেদিন বাড়ি ফিরে ডাক্তার ডেকে ইঞ্জেকশন দিতে হয়েছে, তারপর চিৎকার থেমেছে। সবাই আমার ওপর খুব চেঁচাল যে ওকে কেন নিয়ে গেছি, কিন্তু আমি কী করতাম? ওই যে ইঞ্জেকশন নিয়ে ঘুমাল, ব্যাস! ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে একদম চুপ করে গেছে। কোনো কথা নেই, খাওয়া পুরো বন্ধ। বাড়িতে আর—একটা কেউ আছে বলেই বোঝা যাচ্ছে না।” “জন্মদিনে কী করল?” “আমি একটু নিয়ে বেরোব ভেবেছিলাম, কিন্তু হাত নেড়ে জানিয়ে দিল যে বেরোবে না। তো ফাতিমা ভাবির ছেলে আর ওর বউ, আর এদিকে দিশা, মানে সূরযের ছোটো বোন; ওরা অনেক গিফট—টিফট নিয়ে এসে মাহিকে সঙ্গে করে বেরোল। দু’ঘণ্টা বাদে যখন ফিরে এল, একই অবস্থা। পিৎজা, কেএফসি, বাইপাসে ম্যাকডোনাল্ড, সব নিয়ে ঘুরেছে। কোথাও একটা দানাও মুখে দেয়নি। আমি কী করব কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”
খানিকক্ষণ দু’জনেই চুপ করে রইল। ঘর একদম নিস্তব্ধ। এটা বোধহয় সাধারণ ওয়ার্ড বা কেবিনের থেকে যথেষ্ট দূরে। কান পাতলে জেনারেটর জাতীয় কোনো যন্ত্রের একটানা শব্দ খুবই ক্ষীণভাবে আসছে। ফারুক একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে রোকসানার দিকে। আপাতত সে মাথা নিচু করে বসে আছে। যতটা দুশ্চিন্তায়, হয়তো ততটাই ক্লান্তিতে। এই ক’দিনের মানসিক ও শারীরিক ধকলের ছাপ তার চেহারাতেও স্পষ্ট।
“আমার কার্ডটা?” ফারুক জানতে চাইল। “কার্ড? আমি তো সোজা চলে এলাম, কেউ কার্ড দেখতে চায়নি।” হঠাৎ কার্ডের প্রসঙ্গে একটু থতমত খেয়ে রোকসানা বলল। “সেই কার্ড না। তুমি বললে না, মাহি আমার জন্য একটা কার্ড বানিয়ে এনেছিল? সেটা আছে?” এবার রোকসানা কয়েক সেকেন্ড চুপ। “এটা তোমাকে দেখাব কিনা বুঝতে পারছিলাম না। দেখলে তোমার ভালো লাগবে না। কিন্তু এটা কারওর সঙ্গে শেয়ার না করতে পারলে আমারও মনে হচ্ছে মাথা ফেটে যাবে।”
রোকসানা কেবিনে ঢুকে তার কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে সোফার উপর রেখেছিল। এবার সে উঠে গিয়ে ব্যাগ খুলে, তার ভিতর থেকে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট বের করে নিয়ে এল। আবার নিজের চেয়ারে বসে, প্যাকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে ফারুকের চোখের সামনে ধরল। ফারুকের বুকটা একবার ধরাস করে উঠল।
ভাঁজ করা কাগজটা সযত্নে চার্ট পেপার কেটে তৈরি করা একটা গ্রিটিংস কার্ড। তার উপরে গোটা গোটা অক্ষরে ইংরেজিতে লেখা আছে ‘গেট ওয়েল সুন’। তার নীচে কিছু বেলুনের নকশা, আর তার তলায় কাঁচা হাতে আঁকা একটি পরিবারের ছবি। দুইদিকে একজন পুরুষ আর একজন মহিলা, আর তাদের হাত ধরে মাঝে দাঁড়িয়ে আছে একটি বাচ্চা মেয়ে। প্রত্যেকের গায়ের উপর রং পেনসিল দিয়ে যথাক্রমে লেখা আছে বাবা, মা আর আমি। কিন্তু এখন ছবিতে পুরুষটির মুখের উপর দিয়ে জোরে জোরে কালো রং দিয়ে আঁকিবুকি কাটা হয়েছে। তারপর নীল পেন দিয়ে একটা তীরচিহ্ন দিয়ে লেখা আছে ‘ডেড’।
“এটা জন্মদিনের রাতে খুঁজে পাই। দলা পাকিয়ে টেবিলের তলায় পড়ে ছিল। তারপর ঘরে গিয়ে দেখি আজ অবধি যত ছবি এঁকেছে, সবকটা এভাবে নষ্ট করেছে।” রোকসানা এবার প্যাকেট থেকে একতাড়া কাগজ বের করল। কিছু পুরানো, কিছু তুলনামূলক নতুন। কিন্তু সবকটার উপর দিয়েই যেন ঝড় বয়ে গেছে। সমুদ্র দেখার ছবি, পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার ছবি, ইদের ছবি, দুর্গাপুজোর ছবি, ক্রিসমাসের ছবি, যেখানেই গোটা পরিবার উপস্থিত, সেখানেই ওরকম কালো রং দিয়ে আঁকিবুকি কাটা আর তীরচিহ্ন দিয়ে লেখা ‘ডেড’। কোনো কোনো ছবি থেকে বাবাকে ছিঁড়েও ফেলার চেষ্টা হয়েছে। রোকসানা আবার সেসব ছেঁড়া টুকরোগুলো জোগাড় করে একত্রিত করে রেখেছে।
ফারুক মাথা নেড়ে ছবিগুলো সরিয়ে রাখতে বলল। নিজের মেয়ের শৈশবের শবদেহের দিকে তাকিয়ে থাকতে তার ভালো লাগছে না। ওই রাতে আহত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ার সময় মনে হয়েছিল এটাই তার জীবনের সবথেকে অসহায় মুহূর্ত। কিন্তু এগুলো দেখে তার ভিতরটা যেন খালি হয়ে গেছে, শরীর যেন শূন্যে ভাসছে। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাওয়া বোধহয় একেই বলে।
তাকে সুস্থ হয়ে উঠতেই হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরতেই হবে। তার নিজের জীবনকে স্বাভাবিক স্রোতে ফিরিয়ে আনতে হবে। মাহিরাকে তার সুস্থ স্বাভাবিক শৈশব ফিরিয়ে দিতে হবে। মাথার ভিতর চিন্তা আর শরীরের ভিতর পেনকিলার নিয়ে ফারুকের সেই রাতের ঘুম ভালো হয়নি।
ফারুক যখন ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়াল, তখন প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে। এ যাত্রায় এই প্রথম কোলাখামের আকাশ শুকনো। মেঘের একটা আস্তরণ আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা রোদের আলো আটকাবার মতো পুরু নয়। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের প্রভাব ভালোই টের পাওয়া যাচ্ছে। সামনের রাস্তায় লোক চলাচল আর গাড়ির সংখ্যা, দুইই বেড়েছে। সেইসঙ্গে থেকে থেকেই কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক শোনা যাচ্ছে। একদল হয়তো উপরের কোনো জায়গা থেকে ডেকে উঠল, ওমনি নীচের আর—এক এলাকা থেকে তার উত্তর ভেসে আসছে। দূরে কোথাও কোনো বাড়ি থেকে হিন্দি ভজনের শব্দ আসছে; অনুপ জালোটা বা অনুরাধা পাড়োয়াল গোত্রের কোনো রেকর্ডিং। এই রাস্তার উপরেই আরও যে দু—তিনটে হোমস্টে আছে, সেখান থেকেও মানুষের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন একটা লম্বা ঘুম দিয়ে এবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
নীচে পায়ের শব্দ পেয়ে সেদিকে দৃষ্টি দিতে ফারুক দেখল কলকাতার দলের অবশিষ্ট তিনজন চুপচাপ ঢালু পথটা বেয়ে রাস্তার দিকে নেমে গেল। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল কেশবের ঘরেও তালা ঝুলছে; সেও হয়তো আশেপাশে কোথাও বেরিয়েছে। আজ ফারুকও ঠিক করে রেখেছে বেরিয়ে পাশের নেওরা ভ্যালি জঙ্গলের ভিতরে একটু ঘুরে আসবে। গতকাল প্রধান বলেছিল যে রাস্তা থেকে দেড়শো—দুশো মিটার মতো ঢুকলেই নাকি একটা চমৎকার রিসর্ট আছে। ম্যানেজার নাকি বাঙালি। বয়স্ক লোক, খুবই অমায়িক। ফারুকের ইচ্ছে আছে জায়গাটায় একটু ঢুঁ মেরে আসার।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে ডাইনিং হলের দিকে যাওয়ার আগেই দেখা হল দত্তবাবুর সঙ্গে। ভদ্রলোক নিজের ঘরের সামনে একটা চেয়ার নিয়ে বসে ফোনে ইউটিউব চালিয়ে তাতে বাংলা খবর দেখছেন। ফারুকের দিকে একবার তাকিয়ে একটু মাথা নেড়ে হেসে, আবার ফোনের দিকে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। ফারুক মনে মনে প্রথমে ঈশ্বর আর তারপর বাংলা সংবাদমাধ্যমকে ধন্যবাদ জানাতে জানাতে খাওয়ার টেবিলে, জানালার দিকে একটা চেয়ারে বসে পড়ল।
খাওয়ার জায়গা আপাতত ফাঁকা। আজও সম্ভবত ফারুক সবার শেষে ব্রেকফাস্ট খেতে চলেছে। ঢোকার সময় সে দেখেছিল রান্নাঘরে ডলি কাজ নিয়ে ব্যস্ত। এখন ভিতরে জল পড়ার সঙ্গে ঠুংঠাং শব্দ আসছে; কিছু বাসনকোসন মাজছে মনে হয়। দু—একবার গলা খাঁকরানি বা এক্সকিউজ মি—তে যখন কাজ হল না, ফারুক উঠে গিয়ে, মুখ বাড়িয়ে তার উপস্থিতি জানান দিয়ে এল। খানিকক্ষণের জন্য শব্দ থামল। মিনিটখানেক পরে, ফারুক যখন সামনে একপ্লেট ধোঁয়া ওঠা চাউমিন নিয়ে বসে আছে, রান্নাঘরের শব্দ আবার শুরু হল।
ফারুক সবে ধার থেকে একটু একটু করে খেতে শুরু করেছে, এমন সময় নীচের পথ দিয়ে উঠে এল কেশব কোঠারি। ঢালু রাস্তা ধরে উঠতে হাঁপ ধরে গেছে। সামান্য নিচু হয়ে, দু’হাত হাঁটুর উপর দিয়ে কয়েকটা বড়ো বড়ো শ্বাস নিল। তারপর ধীরপায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল। তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নেমে এল প্রতিভা, হাতে একটা মাঝারি সাইজের বালতি। সিঁড়ি দিয়ে নেমেই বাঁদিক ঘুরে সে চলে গেল একদম কোনার তালাবন্ধ ঘরটার দিকে। দত্তবাবু এখনও ফোনের স্ক্রিনে চোখ লাগিয়ে বসে আছেন। ইতিমধ্যে ডলির কাজ শেষ হয়েছে। সে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে জানতে চাইল ফারুকের আর কিছু লাগবে কিনা। ফারুক না বলায় সে একটা ঝুড়ি ভরতি আনাজপাতি নিয়ে বাইরে একটা খবরের কাগজ বিছিয়ে, সেগুলো কাটতে বসল। ফারুক খাওয়া শেষ করে উঠে বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু আবার ফিরে এসে নিজের প্লেটটা তুলে নিয়ে রান্নাঘরের সিঙ্কে নামিয়ে দিয়ে এল।
বাইরে এসে হাত ধুতে গিয়ে ফারুক লক্ষ করল যে প্রতিভা সামনের খোলা জায়গাটার এক ধারে, যেদিকে ফুলের টব আর বেঞ্চ আছে, সেখানে হাঁটু মুড়ে বসে কিছু একটা করছে। সেই বালতিটা এখনও পাশে রাখা। কিঞ্চিৎ কৌতূহলী হয়ে ফারুক এবার ওদিকে এগিয়ে গেল। কাছে গিয়ে দাঁড়াতে ব্যাপারটা বোঝা গেল। বালতি প্রায় অর্ধেক ভরতি করে রাখা আছে বেশ বড়ো বড়ো নুড়ি পাথর। আয়তনে মোটামুটি একটা ক্রিকেট বলের মতো, যদিও ওরকম নিখুঁত গোলাকার নয়। সেগুলোর গায়ে আবার রং—তুলি দিয়ে বর্ডার দেওয়ার মতো দাগ টানা আছে, নীল রঙের। প্রতিভা এগুলোকে সযত্নে পাশাপাশি গায়ে গায়ে ঠেকিয়ে জায়গাটার একটা সীমানা তৈরি করছে। নুড়ি পাথরের ওপারে টব আর বসার জায়গা। পাথরগুলো সম্ভবত জমানো আছে ওই কোণের ছোটো ঘরটায়।
“বাঃ! এই আইডিয়া কার?” ফারুক জিজ্ঞাসা করল। “ওরকম একজন কারওর বোধহয় না। বেশ কিছুদিন আগে আমি আর মা দু’জনেই এক জায়গায় বেড়াতে গিয়ে এরকম দেখেছিলাম। তখনই ভাবা হয়েছিল আমাদের বাড়িতেও আমরা করব। সেই সাপ্লায়ারের কনট্যাক্ট নিয়ে কয়েকদিনের মধ্যে পাথর আনিয়েও নেওয়া হল। গায়ে পেন্ট করাটা আমার আইডিয়া। সেসব করে, রং শুকিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বসানো আর হয়নি।”
প্রতিভাকে কাজ থামিয়ে, মুখ তুলে কথা বলতে হচ্ছে। ফারুক নিজের জিনসের প্যান্টটা একটু টেনে এবার হাঁটু মুড়ে তার পাশে বসে পড়ল। “তুমি বসাতে থাকো, আমি বালতি থেকে তুলে তুলে দিচ্ছি। তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।” “এ বাবা! আপনি আবার এসব করতে যাচ্ছেন কেন? আমি নিজেই করে নিতাম। বেশি টাইম লাগত না।” “এখন আরও কম সময় লাগবে! তোমার আপত্তি নেই তো?” “না না, আপত্তি কীসের? মা এগুলো দেখলে সাংঘাতিক ঝামেলা করে, কিন্তু এখন যা অবস্থা—” প্রতিভা বাক্য শেষ করল না। “কিছু হয়েছে? আমারও যেন মনে হল একটু বেশিই চুপচাপ। তবে এমনিতেও উনি যে খুব গল্প করেন, এমনটা নয়। আর তাছাড়া এই ক’দিনের ঘটনার একটা স্ট্রেস তো আছেই।” “সেটাই। আমার ধারণা আমরা সবাই কম—বেশি স্ট্রেসড। কিন্তু গোটা ব্যাপারটা মাকে হিট করেছে বেশ বাজেভাবে। বিশেষ করে ঋজুর ইনসিডেন্টটা। এখন আমার বেশ দুশ্চিন্তাই হচ্ছে। এমনিতে আমাকে নিয়ে চিন্তা করাটা তো আছেই। সেই সঙ্গে গতকাল থেকে দেখছি পাগলের মতো কাজ করে যাচ্ছে। মানে জোর করে খুঁজে পেতে কাজ বের করে করছে।” “নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন?” “ওরকমই মনে হচ্ছে। তবে একদম বাড়াবাড়ি পর্যায়। মা—বাবা দু’জনেই এমনিতে বেশ টিপটপ আর পরিষ্কার। কিন্তু কাল থেকে মনে হচ্ছে ঘরের সব জিনিস পরিষ্কার করে ফেলবে, গুছিয়ে রাখবে, জামাকাপড় কাচবে। একদম সুন্দর সাজানো ড্রয়িং রুমের আলমারি থেকে শো পিস বের করে এনে ব্রাসো দিয়ে পরিষ্কার করা দিয়ে শুরু হয়েছে। তারপর গোটা আলমারির সব কিছু নামিয়ে, আবার করে গুছিয়ে রাখল। তারপর রাতে শোয়ার ঘরে দেয়ালে বা টেবিলের উপর ছোটোখাটো যত জিনিস, সেগুলো সকালে নিয়ে নেমেছে। এই রান্নাঘরের সিঙ্ক আমাদের বাড়ির ভেতরেরটা থেকে বড়ো। তাই এখানে এনে এতক্ষণ সেইসব ধোয়া হচ্ছিল। এখনও যে সবজি কাটছে, সেটা এখনই করার কোনো দরকার ছিল না। বাবা আরও এক ঘণ্টা পরে এসে আরামসে করে নিতে পারত। তার মধ্যে আর—একটা ব্যাপার হয়েছে।”
“তোমার মায়ের ব্যাপারে?” “না, আমার নিজের। আমি কলকাতায় একটা অর্গানাইজেশনে ইন্টার্নশিপের জন্য অ্যাপ্লাই করেছিলাম। সেটার রিপ্লাই এসেছে কাল রাতে। সমস্যা হচ্ছে ওরা নেক্সট মাসে জয়েন করতে বলেছে, আর অন্তত ছ’মাস কাজ করতে হবে। মেন অফিস কলকাতায়, কিন্তু কাজের জন্য বাইরের টাউনেও যেতে হতে পারে। এটা আমার জন্য খুবই ভালো একটা অপরচুনিটি। বিশেষ করে আমি যদি পিওর সোশিওলজি না পড়ে সোশ্যাল ওয়ার্কে মাস্টার্স করি। কিন্তু মায়ের এই অবস্থায় কথাটা তুলতেই পারছি না। এটা নাহয় ছেড়েও দিলাম। সমস্যাটা তো থেকেই যাচ্ছে, বা বলা ভালো যে বেড়েই যাচ্ছে। এভাবে চললে মা তো সাইকোলজিক্যালি পুরো কোলাপ্স করে যাবে। বাবাও কিছু বলছে না। আমি সত্যিই লস্ট!”
ফারুক যখন নিজের ঘরে ফিরল, তখন তার মনটা একটু ভারীই হয়ে আছে। এমনিতেই সকালে রোকসানার সঙ্গে কথোপকথনের পর অনেক পুরানো ঘটনা মনের মধ্যে ঘুরছে। সেইসব স্মৃতি এমনিতে ফারুক সচেতনভাবেই তালা—চাবি দিয়ে রাখে। তাছাড়া রোকসানার প্রশ্ন এবং তার না—বলা উদ্বেগও ফারুকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই ক’দিনের ঘটনার জেরে আবার যে তার সামনে অতীত হাতছানি দিচ্ছে, ফারুক সত্যিই জানে না যে এর গতিমুখ বা পরিণাম কোনদিকে। সজ্ঞানে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে আসা জীবনে কি আবার ফিরে যাওয়া যায়? সে কি ঝোঁকের বশে ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে, নাকি এটা তার রোগ নিরাময়, বা মুক্তির সুযোগ?
একটা মেসেজ আসার শব্দে ফারুক সামনের টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিল। মেসেজটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু ফোন হাতে নিয়ে সে দেখল গত আধ ঘণ্টার মধ্যে কলকাতা থেকে অর্ণব তিনবার ফোন করার চেষ্টা করেছিল। ফারুক তক্ষুনি কলব্যাক করল। কিন্তু পরপর দু’বার ফোন একটানা বেজে গেল। অর্ণব হয়তো এর মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আবার ঘণ্টাখানেক বাদে চেষ্টা করে দেখবে।
ফোন নামিয়ে রেখে ফারুক প্রতিভার কথাগুলো নিয়ে ভাবছিল। ডলির অবস্থা হয়তো সত্যিই ভালো নয়। এবং সেই কারণে তার মেয়ের ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে। বাবা—মার ভালোমন্দের চিন্তা বা দুশ্চিন্তা সন্তানের উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, ফারুক খুব ভালোভাবে জানে।
***
হোমস্টে থেকে বেরিয়ে, ঢালু পথটা বেয়ে মেন রোডে নেমে বাঁদিকে গেলে, লাভা যাওয়ার রাস্তা। সেদিকে প্রথম দু—তিন কিলোমিটার হাঁটলে, ডানদিকে খাদ আর বাঁদিকে জঙ্গল; তারপর অবশ্য দু’দিকেই গাছের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই রাস্তাতেই আধ ঘণ্টা মতো গেলে, বাঁ হাতে একটা বড়ো গেট চোখে পড়ে। তার মাথায় একটা সাইন বোর্ডে বড়ো করে ইংরেজিতে লেখা ‘নেওরা ভ্যালি ফরেস্ট রিসর্ট অ্যান্ড ক্যাম্প’। ফারুক আপাতত এই গেটের কোনাকুনি উলটোদিকে একটা কালভার্টের পাশে, একটা বড়ো পাথরের চাঁইয়ের উপর বসে সিগারেটে টান দিচ্ছে।
বেরোনোর আগে ডলিকে দুপুরের খাওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিল। জানা গেছে যে দেড়টার আগে লাঞ্চের কোনো সম্ভাবনাই নেই। ফারুক মনে মনে হিসাব করে দেখেছিল যে অন্তত আড়াই ঘণ্টা সময় অনায়াসে পাওয়া যাচ্ছে। সে আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে পৌনে এগারোটা নাগাদ বেরিয়ে গেছিল। হাতে যথেষ্ট সময় থাকায় তাকে বিশেষ তাড়াহুড়ো করতে হয়নি ঠিকই, কিন্তু সমস্যা হয়েছে জুতো নিয়ে। কলকাতা থেকে গোছগাছ করে যখন বেরিয়েছিল, তখন সে মোটেই পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করার উপযুক্ত জুতো সঙ্গে নিয়ে আসেনি। ফলে একটু বেশি হাঁটতে হলেই গোড়ালিতে চাপ পড়ছে। এটা দু’দিন আগে সন্ধ্যার দিকে বেরিয়েও সে টের পেয়েছিল। আজকেও মাত্র কুড়ি মিনিট মতো হেঁটেই পা বেশ টনটন করছে।
সিগারেট শেষ করে ফারুক উঠে দাঁড়িয়ে চারপাশটা মন দিয়ে দেখল। থাকার পক্ষে খুবই মনোরম স্পট তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গেটের জায়গাটা আপাতত ফাঁকাই; কে ঢুকছে—বেরোচ্ছে, সেসব নজর রাখার জন্য কেউ নেই। ফারুক ঢুকল। ঝোপঝাড়, জংলা ঘাস কেটে একটা সরু কিন্তু সমতল পথ মোটামুটি সোজা চলে গেছে। সেটা গিয়ে ওঠে একটা ফাঁকা, রেলিং দিয়ে ঘেরা জায়গায়। ওটা সম্ভবত গাড়ি পার্ক করার জন্য ব্যবহার করা হয়। আপাতত একটাই গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়া দুটো ছাউনি দেওয়া বেঞ্চ রাখা আছে, খাদের দিকে মুখ করে। এখানে দাঁড়ালে সামনের দৃশ্য অনেকদূর অবধি বিস্তৃত। খাদের উলটোদিকে পাহাড়ের গায়ে একটা শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা আছে, এখানকার উচ্চতা ৬২০০ ফিট।
এই জায়গাটা পেরোলে আর—একটা মাঝারি হাইটের বাঁশ দিয়ে তৈরি গেট। সেটা দিয়ে ঢুকলে সম্ভবত মূল রিসর্ট বা ক্যাম্প শুরু হয়। ফারুক এদিক—ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পাওয়া তো দূরের কথা, আশেপাশে মানুষের কোনো চিহ্ন টের পেল না। সামনে একটা সুদৃশ্য কটেজ, সেটার দরজায় তালা ঝুলছে। তার পাশ দিয়ে পাহাড়ের গায়েই সিঁড়ির ধাপ করা আছে। সেটা উঠে গেছে আর—একটা লম্বাটে ঘরের দিকে। এছাড়াও উপরে এদিক—ওদিক তাকালে আরও কিছু কটেজ চোখে পড়ছে কিন্তু গোটা জায়গাটাই নিস্তব্ধ, নিষ্প্রাণ।
হঠাৎ খসখস শব্দ শুনে পিছন ফিরে ফারুক দেখল একটি অল্পবয়সি ছেলে পিঠে বস্তা বোঝাই করে এদিকেই হেঁটে আসছে। তার চলার গতিতে একটা নির্দিষ্ট ছন্দ আছে, পিছনে একটা কুকুর। ফারুক তাকে কোনো প্রশ্ন করার আগেই, সে আঙুল তুলে উপরের দিকে দেখিয়ে একইরকম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ধাপগুলো বেয়ে উঠে গেল। কুকুরটা অবশ্য একবার থমকে দাঁড়িয়ে, লেজ নাড়তে নাড়তে এসে সামনের কটেজের সিঁড়িতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
ফারুক ঘড়ির দিকে তাকাল: প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। অর্থাৎ সে এখানে এসে পৌঁছেছে তাও মোটামুটি দশ মিনিটের বেশি হয়ে গেছে। এবার সেও ওই ছেলেটির পথে ধাপ বেয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করল। সেই লম্বাটে মতো ঘরটার কাছাকাছি যেতে কিছু ক্ষীণ শব্দ কানে এল। হাঁটাচলা, জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করা, বা টুকরো টুকরো গলার আওয়াজ। শেষ ধাপ উঠে বাঁদিকে মোচড় দিয়ে ডানে ঘুরতেই ওই ঘরটার দরজা। এটা এখানকার ডাইনিং হল এবং সামনের দিকটা সম্ভবত অফিস। একটা রিসেপশন কাউন্টার করা আছে, যদিও সেখানে কেউ নেই। ঘরের অন্য প্রান্তে সাদা কভারে ঢাকা টেবিল আর কাঠের চেয়ার। তার একধারে তাকের উপর ধপধপে সাদা চিনামাটির বাসনকোসন। ওইখানে দাঁড়িয়ে কাজ করছিল বছর তিরিশেক বয়সি এক মহিলা। ফারুকের পায়ের শব্দ পেয়ে সে এগিয়ে এল।
“কাউকে খুঁজছেন?” প্রশ্নটা এল ইংরেজিতেই। উচ্চারণ খানিক গোলগোল হলেও বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। “আপনাদের এখানকার ম্যানেজার। নাম বোধহয় মিস্টার মুখার্জি।” “ওহ, উনি তো এখন নেই। মানে ছুটিতে আছেন। সবে দু’দিন হল গেছেন। এখন আরও অন্তত এক সপ্তাহের আগে ফিরবেন না। আপনার কোনোকিছু প্রয়োজন ছিল? প্রাইভেট কিছু না হলে বলতে পারেন, আমরা জানিয়ে দেব।” “সেরকম কিছু না। আমি ক’দিন হল কোলাখামে এসেছি। নীচে একটা হোমস্টেতে আছি। একটা কারণে আপনাদের লাভা থানার ওসি বিপুল প্রধানের সঙ্গে আলাপ হল। উনি এখানকার কথা বললেন। আমি একটু জায়গাটা ঘুরে দেখতাম, খোঁজখবর নিতাম। মানে পরে যদি কখনও ফ্যামিলি নিয়ে আসি, তখন থাকার প্ল্যান করতে পারি।”
প্রধানের নাম উল্লেখ করার জন্যও হতে পারে, আবার সাধারণ ভদ্রতার খাতিরেও হতে পারে, আতিথেয়তার মাত্রা এবার যেন একটু বৃদ্ধি পেল। মহিলা একপাশে সরে গিয়ে সামান্য ঝুঁকে ডান হাতটা ঘরের ভিতর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। “আপনি প্লিজ এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে ভিতরে এসে বসুন।” রিসেপশন কাউন্টারের পিছনদিকে একটা ছোটো অফিসঘর বা অ্যান্টি চেম্বার আছে। কাঠের মেঝে বাঁশের দেয়াল এবং আসবাবপত্রও একই উপকরণ দিয়ে তৈরি। একটা ছোটো গোল কফি টেবিলের দু’পাশে মুখোমুখি বসে কথাবার্তা চলতে লাগল।
“আমাদের এখানে আটটা কটেজ আছে, সেগুলো ডবল বেড। তিনজন থাকতে পারে, এক্সট্রা চার্জ দিয়ে। এছাড়া দুটো স্যুইট আছে, সেগুলোতে চারজন থাকতে পারে। ট্যারিফের মধ্যে ব্রেকফাস্ট ধরা আছে। লাঞ্চ আর ডিনারের জন্য আমাদের আ লা কার্ট মেনু আছে। এসব আমাদের ব্রশিওরে ডিটেলে দেওয়া আছে। তাছাড়া ওয়েবসাইটেও আছে। আপনি চেক করে নিতে পারবেন, বুকিংও অনলাইনেই হয়।” “ঘরগুলো একটু দেখতে পারি?” “অফকোর্স। তার আগে বলুন আপনি কী নেবেন? গরম না ঠান্ডা? আমরা কিন্তু বিয়ারও অফার করতে পারি।” “না না, এসবের প্রয়োজন নেই। আমি ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়েছি। এসব নিয়ে ব্যস্ত হবেন না।”
মহিলা আলগাভাবে হাত নেড়ে বলে গেলেন যে এতে ব্যস্ততার কিছু নেই, তিনি এখুনি লোক পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সে ফারুককে গোটা জায়গাটা ভালো করে ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে। ততক্ষণে তিনি ব্রশিওর এবং ম্যানেজারের ভিজিটিং কার্ড রেডি করে রাখছেন। আক্ষরিক অর্থেই দু’মিনিটের মধ্যে একটি মাঝবয়সি লোক এসে ফারুকের সামনে দাঁড়াল। লোকটির পরনের পোশাক বেশ পরিপাটি। ঘিয়ে রঙের সুতির প্যান্টে গুঁজে পরা মেরুন শার্ট। পায়ে জুতো এবং হাতে একগোছা চাবির রিং। লোকটির ইশারায় ফারুক সোফা ছেড়ে উঠে তার পিছন পিছন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
জায়গাটা সত্যিই ছড়ানো ছেটানো। কোথাও পাশাপাশি দুটো ঘর নেই। পাহাড়ের গা দিয়ে সরু রাস্তা ধরে এঁকেবেঁকে লোকটির পিছন পিছন ফারুক সাবধানে হাঁটছে। এক জায়গায় পাহাড়ের গায়ে এত গভীর একটা খাঁজ যে ওখানটা টপকে যাওয়ার জন্য একটা ছোট্ট রেলিং দেওয়া বাঁশের সাঁকো তৈরি করা। সেটা পেরিয়ে ডানদিকে একটু উঠতেই একটা কটেজ। লোকটি সেটার তালা খুলে ফারুককে ভিতরে ঢোকার আহ্বান জানাল।
সুন্দর সাজানো—গোছানো কটেজ। বেশ বড়ো কিং সাইজ বিছানা। ড্রেসিং টেবিল, কফিটেবিল, একটা বড়ো দেরাজ, শেলফ ইত্যাদি থাকলেও ঘরটা ছোটো হয়ে যায়নি। দু’দিকের জানালা দিয়েই পর্যাপ্ত আলোবাতাসের ব্যবস্থা আছে। ঘরে পা দিয়েই ফারুকের নিজের হোমস্টেতে নীলাদ্রির কটেজের কথা মনে পড়ল। যদিও একই ধাঁচের, তবে এটা আয়তনে বড়ো, ঘরের আসবাবপত্র আর—একটু দামি এবং বিছানায় কোনো মৃতদেহ পড়ে নেই। ড্রেসিং টেবিলের পাশে একটা ফ্লোর ল্যাম্প। ফারুক এগিয়ে গিয়ে সেটার থেকে বেরিয়ে আসা তারের গায়ে ছোট্ট সুইচটা টিপল, কিন্তু আলো জ্বলল না। একটু ঝুঁকে উঁকি দিয়ে দেখা গেল, ভিতরে বাল্ব নেই।
এই কটেজ থেকে বেরিয়ে আবার একই পথে খানিক ফেরত এসে আর—একটা উত্তরমুখী রাস্তা ধরে দু’মিনিট এগোতেই দেখা গেল একটা তুলনামূলক বড়ো কটেজ। আয়তনে আগেরটার দ্বিগুণ বা আরও বেশি হবে। এই জায়গাটা একদমই নিঝুম। সভ্যতার কোনো শব্দই কানে আসে না। তাই চাবির সামান্য ঝনঝন আর দরজা খোলার ক্যাঁচ শব্দটাও অস্বাভাবিক জোরে শোনাল। মাটি থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি উঠে দরজা, আর তার বাঁদিক দিয়ে একটা বারান্দা যেটা গোটা বাড়িটাকে ঘিরে, বাঁক খেয়ে পিছন দিক অবধি চলে গেছে। দরজার গায়ে কাঠের ফলকে ইংরেজিতে বড়ো করে লেখা ‘উইন্টার’, নীচে আর—একটু ছোটো করে লেখা আছে ‘স্যুইট টু’। এক নম্বর স্যুইটের নাম জিজ্ঞাসা করাতে বলল ‘মনসুন’। আগের কটেজটায় ঢোকার সময় নামটা খেয়াল করা হয়নি। আবার প্রশ্ন করায় উত্তর এল ‘লিলি’। কটেজগুলোর নাম ফুলের নামে— জারবেরা, ডালিয়া, রডোডেনড্রন ইত্যাদি।
স্যুইট ব্যাপারটা এখানে সত্যিই রাজকীয়। দরজা দিয়ে ঢুকেই প্রায় হলঘরের মতো একটা প্রশস্ত জায়গা। একদিকে সোফা, চেয়ার, টেবিল দিয়ে বসার বন্দোবস্ত, আর সেখান থেকে এগিয়ে একটা ওয়াকিং ক্লোজেট। ঘরের ডানদিকে একটা স্টাডি টেবিল, তার পাশে পেল্লায় বিছানা যেখানে এমনিতেই হেসেখেলে চারজন শুয়ে পড়তে পারে। ঘরে ঢোকার মূল দরজার উলটোদিকের দেয়ালে পাশাপাশি দুটো দরজা। ডানদিকের দরজা খুললে বাথরুম যেটার উপরে কাচের স্কাইলাইট। বাঁদিকের দরজা দিয়ে বারান্দায় যাওয়া যায়, যেটা সামনে থেকে ঘুরপাক খেয়ে পিছন অবধি এসেছে। দুটো পাশাপাশি দরজার পাশ দিয়ে আবার একটা সিঁড়ি উঠে গেছে মেজানাইন ফ্লোরে। সেখানেও একটা ডবল বেড আর একজোড়া ছোটো টেবিল—চেয়ার।
ফারুক বারান্দাটায় এসে দাঁড়াল। এটা বোধহয় সত্যিই কোলাখামের সবচেয়ে উঁচু পয়েন্ট। সামনে তাকালে দৃষ্টি যেন অনন্তে গিয়ে ধাক্কা খায়। আকাশে এখনও মেঘ আছে, তাই পাহাড়ের চূড়া দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু একটু নীচে তাকালেই গোটা কোলাখাম এবং আশেপাশের অঞ্চলের সবকিছুই সম্পূর্ণ নতুনভাবে দেখা যাচ্ছে— অনেকটা স্যাটেলাইট ম্যাপের মতো। একবার এদিক—ওদিক তাকিয়ে একটু দিক নির্ণয় করে আবার তাকাতেই হিলটপ হেভেন হোমস্টে ভালোভাবেই চেনা গেল। ডাইনিং আর সামনের খোলা জায়গা, তার দু’পাশ দিয়ে ঘরগুলো, পিছনের দিকে কটেজ এবং ডলিদের নিজের বাড়ি— সবকিছুই ছবির মতো বোঝা যাচ্ছে। ডলিদের বাড়ির দোতলার পিছন দিকে, ফারুক ঠিকই আন্দাজ করেছিল যে, একটা খোলা ছাদ গোছের বারান্দা আছে। এখন সেখানে কেউ একটা নড়াচড়াও করছে। কিন্তু সেটা দেখতে লাগছে একদম পিঁপড়ের মতো— কোনোমতেই চেনা সম্ভব নয়।
আচমকা ফারুকের পকেটে তারস্বরে ফোন বেজে উঠল। অর্ণব কলব্যাক করছে। ফারুক তড়িঘড়ি ফোনটা ধরল। “শোনো, তোমাকে যদি ঘণ্টাখানেক পরে ফোন করি তখন কথা বলা যাবে?” “সরি ফারুকদা, সকাল থেকে সাংঘাতিক চাপ! পরশুদিন কলকাতায় বিরোধীদের একটা সর্বদলীয় বৈঠক আছে। সব ভিআইপি এসে জড়ো হবে এখানে। আর আমি সিকিউরিটি ডিটেলের একটা অংশের দায়িত্বে। মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে! একের পর এক মিটিং চলছে। আপনাকে তো এতক্ষণ কলব্যাকও করতে পারিনি।” “বুঝলাম। বেশ, তাহলে এখুনি কথা বলে নিচ্ছি। এক মিনিট ধরো।” ফারুক মুখ বাড়িয়ে সঙ্গের লোকটিকে জিজ্ঞাসা করল যে এখানে বসে সে খানিকক্ষণ কথা বলে নিতে পারে কিনা। “আপনি সময় নিয়ে ঘুরে দেখুন। হয়ে গেলে, ফেরার সময় অফিসে বলে দেবেন। আমি পরে এসে তালা দিয়ে যাব।” কথাগুলো বলে লোকটি চাবি পকেটে নিয়ে হাঁটা দিল। তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পর ফারুক ঘরের ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে, সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে আবার ফোন কানে দিল।
“সরি, আমি আসলে একটা রিসর্ট ঘুরে দেখছিলাম। সঙ্গে লোক ছিল। যাই হোক, তুমি বলা শুরু করার আগে আমি একটা নাম বলি। লিখে রাখো। ঐশানী দেব। সেন্ট পলস কলেজের ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের পার্ট টাইম অধ্যাপিকা। বয়স ২৬—২৭ বছর হবে। আগামী মাসে পিএইচডি করতে স্কটল্যান্ড চলে যাচ্ছে। এর ব্যাকগ্রাউন্ডটা একটু জানতে চাই। বিশেষ করে যদি ঋজু সেনগুপ্তর প্রসঙ্গে কিছু হয়। সামাজিকভাবে দু’জনের বেশ কিছু বছরের পরিচয়। কিন্তু বুঝতেই পারছ যে আমি সেটার বাইরের জিনিস জানতে চাইছি। ভালো কথা, ঐশানীর দাবি সে লেসবিয়ান। এটাও ভেরিফাই করা যায় কিনা দেখ।”
“এই রে, আরও এনকোয়্যারি? এর মধ্যে যা অবস্থা, দু—তিনদিনের আগে তো কিছু করতে পারব বলে মনে হয় না।”
“শোনো, আমি কিছু বললেই তোমাকে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেটা কেন করতে হবে বলো তো? আমাদের ডিপার্টমেন্টের চেইন অফ কমান্ড কি উঠে গেছে? এই ইনফো গ্যাদার করা কি এমনিতেও জয়েন্ট কমিশনারের কাজ? তুমি কাউকে একটা ডেলিগেট করবে। সে ঠিকঠাক বিশ্বস্ত লোক হলেই হল, কথাটা যাতে রাষ্ট্র করে না বেড়ায়।”
“ঠিক আছে, আমাদের সাইবার ক্রাইমে একটা নতুন ছেলে জয়েন করেছে। নাম কণিষ্ক রায়। ওর কাকা আবার আমার খুবই ভালো বন্ধু। এই ছেলেটা এইসব কাজে বেশ তৎপর, মানে একটা ন্যাচারাল এবিলিটি আছে। আর খুব মেথডিকাল। আমি তাহলে এই কাজটা ওকেই দিচ্ছি।”
“আমি কিন্তু আগেরগুলোও তোমাকে নিজে হাতে করতে বলিনি। আমি ধরেই নিয়েছিলাম তুমি অন্য কাউকে ভার দেবে। যাইহোক, যখন বলছ এই ছেলেটা এইসব ব্যাপারে এক্সপার্ট, তাহলে ধরে নিচ্ছি আজ রাত বা ম্যাক্সিমাম কাল সকালের মধ্যে একটা বেসিক রিপোর্ট পেয়ে যাব। তোমার যা ব্যস্ততা, এর মধ্যে আর ডিস্টার্ব করতে চাই না। আর কোনো আপডেট আছে?”
“কিছু আছে। কোনটা কাজের, কোনটা অকাজের আপনিই বলতে পারবেন। ফার্স্ট থিংস ফার্স্ট। ফারুকদা, এই ডঃ চক্রবর্তীর মৃত্যু নিয়ে কি সত্যিই কোনো সন্দেহ আছে? মানে এটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা কি নিতান্তই দরকার?”
“কী ব্যাপার? কিছু হয়েছে?”
“দেখুন, আমি তো আগের দিন এইটুকু খবর পেয়েছিলাম যে ডাক্তার গ্যাংটক যাচ্ছিল হসপিটালের ব্যাবসা রিলেটেড কোনো কাজে। এর থেকে বিশদে আর কিছু জানা সম্ভব হয়নি। আমিও নাছোড়বান্দা। নানাদিক থেকে খোঁজখবর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কাল আমার পার্সোনাল নাম্বারে ফোন এল। স্বয়ং দামোদর সিংঘানিয়া! বিএমএসটি গ্রুপের সিইও এবং গভীর জলের রাঘব বোয়াল। ফোনে অবশ্য একেবারে দায়িত্বপরায়ণ নাগরিক এবং বিনয়ের অবতার।”
“এর নাম শুনেছি। কিন্তু আমি যখন ডিপার্টমেন্ট ছেড়েছি তখনও এর ঠিক এতটা রমরমা হয়নি। তা বক্তব্যটা কী? হুমকি দিচ্ছে? শাসাচ্ছে?”
“এরা কি আর ওভাবে কথা বলে? খুবই কনসার্ন নিয়ে জানতে চাইল যে আমি ডঃ চক্রবর্তীর ব্যাপারে কী জানতে চাইছি, উনি সবরকম সাহায্যের জন্য সবসময় প্রস্তুত ইত্যাদি। একইসঙ্গে এটাও বুঝিয়ে দিল যে ওর ব্যাবসায় অযথা নাক গলালে কমিশনার বা আইজি সাহেব থেকে শুরু করে একদম সোজা চিফ মিনিস্টারের কাছেও নেক্সট ফোনটা যেতে পারে। ফলে কংক্রিট প্রমাণ এবং ওয়ারেন্ট ছাড়া আমি যেন বেশি বাড়াবাড়ি না করি।”
“খুবই মোলায়েম। তা কিছু সাহায্য করল?”
“গভীর বিশ্বাস নিয়ে আমাকে একান্তে জানাল যে ওদের হসপিটালের নেটওয়ার্ক এবার উত্তর পূর্ব ভারতে এক্সপ্যান্ড করবে। সিকিম, মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা আপাতত প্ৰথম টার্গেট। বৈষয়িক কথাবার্তা অনেকটাই এগিয়েছে। এবার মেডিক্যাল আর প্যারা মেডিক্যাল স্টাফ এবং অন্যান্য স্পেশালাইজড জিনিসপত্রের ব্যাপারে পাকা কথাবার্তা বলতে ডঃ চক্রবর্তী গ্যাংটক রওনা দিয়েছিল। গোটাটা আপাতত ইন্ডাস্ট্রির টপ সিক্রেট এবং বিশাল টাকার ব্যাপার।”
“যাক, এটা তো একটা বড়ো পাকা খবর পাওয়া গেল। তোমাকে আর এই নিয়ে বিপদে ফেলব না। যদি এই সূত্র ধরে কিছু এগোনোর থাকে সেটা কালিম্পং পুলিশ কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ করে বুঝে নেবে। এনিথিং এলস?”
“বাকিটা ডঃ চক্রবর্তীর ব্যাকগ্রাউন্ড ডিটেলস। ওর বাবা, মানে ডঃ সমীরণ পালের বিষয়ে আর—একটু জেনেছি।” “শুনি শুনি। আত্মহত্যার ব্যাপারটা জানতে পারলে?” “বোধহয়। মানে কিছুটা তো আন্দাজই করতে হবে, অনেকদিন আগের ঘটনা। তবে জেনুইন কারণ হিসাবে কিছু ঘটনাকে ধরা যেতেই পারে।” “ভদ্রলোক অ্যালকোহলিক ছিলেন?” “ছিলেন। সেইসঙ্গে সম্ভবত ডিপ্রেশনেও ভুগেছেন। তাছাড়া ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি আছে। আমি আপাতত আপনাকে একটা সামারি বলি। কাল সকালের মধ্যে একটা লিখিত ডিটেলড রিপোর্টও নাহয় পাঠিয়ে দেব। আমার প্রচুর তথ্য নোট করা আছে।” “বেশ, সামারিটাই বলো।”
“প্রথমত, ডঃ সমীরণ পাল এবং অরুণেন্দু চক্রবর্তী, মানে নীলাদ্রি চক্রবর্তীর বায়োলজিকাল ফাদার, এঁরা একে—অপরকে চিনতেন। একদম ছাত্রাবস্থা থেকে, রাজনীতি করার সূত্রে। যদিও সুপ্রিয়া মানে নীলাদ্রির মার সঙ্গে সমীরণের আলাপ হয়েছে অরুণেন্দুর মৃত্যুর পরেই। সমীরণ কিন্তু সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করে গেছেন, প্রায় আশির দশকের গোড়া অবধি। সংগঠনের পলিটিক্যাল এবং কালচারাল, দুটো উইংয়েরই বেশ শীর্ষস্থানীয় ছিলেন। ওঁদের দলের পত্রিকার এডিটর ছিলেন, এছাড়া অন্যান্য পত্রপত্রিকাতেও নিয়মিত লেখালেখি করতেন। কখনও কবিতা, কখনও আবার প্রবন্ধ— তার মধ্যে অনেকগুলো বেশ প্রোভোকেটিভ টাইপের! আমি কিছু পুরানো সংখ্যা জোগাড় করেছি। ডিটেল নোটগুলো যখন পাঠাব, সেই সঙ্গে ওগুলোও নাহয় স্ক্যান করে পাঠিয়ে দেব। লোকটার সম্পর্কে একটা বেশ সম্যক ধারণা হবে। আপনি তো সেটাই চাইছিলেন।”
“তা তো বটেই। তবে ভদ্রলোকের বাড়াবাড়ি মদ খাওয়ার অভ্যাসটা কি তখন থেকেই?” “না, ওই সময় নাকি একদম কড়া টিটোটিলার গোছের। ছুঁয়েও দেখতেন না। সমস্যা শুরু হয় ওই ১৯৮২—৮৩ সাল নাগাদ। ওঁর স্ত্রী, মানে আমাদের নীলাদ্রির মা সেই সময় থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। রেগুলার ভুগতে থাকেন। খানিকটা সেই কারণেই ওঁর সক্রিয় রাজনীতির জায়গাটা কমে আসে। ডাক্তারি জীবনের ব্যস্ততা আর স্ত্রীর প্রতি অ্যাটেনশন— এই দুই সামলে উঠে আর অন্য কিছু করা সম্ভব হয় না। যা বোঝা যাচ্ছে, ৮৫ সালের পর থেকে স্ত্রীর অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়—” “রোগটা কী ছিল?”
“এই রে! এখন আমাকে মেরে ফেললেও মনে করে বলতে পারব না। অফিসের ডায়ারিতে লিখে রেখেছিলাম। বেশ দূরারোগ্য ব্যাধি। শরীরের মাসলগুলো ভাঙতে শুরু করে, ফলে অর্গ্যানগুলো ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদি এবং যন্ত্রণাদায়ক, একদম বাজে অসুখ। ফলে, সুপ্রিয়ার যখন অবস্থা একেবারেই শেষের দিকে, তখন থেকেই সমীরণের মদ এবং ডিপ্রেশনের অধ্যায় শুরু। ১৯৮৮—তে স্ত্রী মারা গেলে সেটা একদম চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে। ডাক্তার হিসাবে সুনাম নষ্ট হতে থাকে। এই সময় নীলাদ্রি সবে ডাক্তারি শুরু করেছে। যাইহোক, ডঃ সমীরণ পালের মৃতদেহ উদ্ধার হয় হাসপাতালে তার নিজের অফিস থেকেই। ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৩। এটা কনফার্ম করা মুশকিল, কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নাকি ওঁকে বরখাস্ত করার দিকে এগোচ্ছিল। খুবই দুঃখজনক পরিণতি।”
“সে তো বুঝলাম। কিন্তু নীলাদ্রির মারা যাওয়ার সঙ্গে তার বাবার আত্মহত্যার কোনো যোগাযোগ আছে কিনা, সেটা খুব একটা ক্লিয়ার হল না। এনিওয়ে, আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ। তুমি কিন্তু খুবই থরো ইনফরমেশন জোগাড় করেছ। ঐশানীর ব্যাপারটা মাথায় রেখো।”
“একদম! আমি রাতের দিকে বা কাল একদম সকালে আমার গোটা নোট আর ওই পত্রিকার স্ক্যান কপি মেল করে দেব। আপতত যাই, নেক্সট দু’দিন বিস্তর সেলাম ঠুকতে হবে। রাখলাম ফারুকদা।”
স্যুইটের দরজা বন্ধ করে ফারুক যখন রিসেপশনে বলতে এল, ততক্ষণে তার জন্য একটা লেমোনেডের গ্লাস রেডি। ফারুক সেই মহিলাকে আবারও অনেক ধন্যবাদ দিয়ে, কার্ড আর ব্রশিওর পকেটে নিয়ে, গ্লাস হাতে ওখান থেকে নেমে এল। কথাবার্তা বলার সময়েই কিছু গাড়ি থামার শব্দ কানে এসেছিল। এখন নীচে নেমে দেখল যে ওই ঘেরা জায়গাটায় দুটো গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। আর সম্ভবত সেগুলো থেকেই নেমে এসেছে জনা চারেক লোক। তাদের পোশাক প্রায় পেশাদার শিকারিদের মতো— বুট, হ্যাট, সানগ্লাস। তবে হাতে বন্দুকের বদলে রয়েছে ক্যামেরা। তাতে বিশাল লম্বা লম্বা টেলিফটো লেন্স লাগানো। লোকগুলো সবাই আপাতত সেই ক্যামেরা তাক করে বসে আছে সামনে খাদ এবং জঙ্গলের দিকে মুখ করে। তাদের শরীর সোজা ও স্থির, মনোযোগ ও একাগ্রতা অটুট— আবারও, শিকারিদের মতোই। অথবা, গোয়েন্দাদের মতো।
নীচের প্রথম কটেজের সামনে একটা ছাউনি দেওয়া বেঞ্চে বসে লেমোনেড খেতে খেতে ফারুক একদৃষ্টে লোকগুলোর দিকে চেয়ে আছে। এই ক’দিন সে সবার সঙ্গে মিশেছে, খোশগল্প করেছে, সময় কাটিয়েছে ঠিকই। কিন্তু আসলে হয়তো এই নির্বাক, অচেনা মানুষগুলোর সঙ্গে এখানে চুপচাপ বসে থাকতেই সে সবথেকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। ডঃ সমীরণ পালের ব্যাপারে শোনা তথ্যগুলো একবার মাথার ভিতর চাড়া দিয়ে উঠল। একবার প্রধানের সঙ্গে বিশদে আলোচনা করে ফারুক হয়তো তার উপরেই দায়িত্ব ছেড়ে দেবে যে নীলাদ্রির অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্ত সে করে যেতে চায় কিনা। পরক্ষণেই মনে হল যে আশেপাশের এই নিস্তব্ধতা এতই আদিম ও পরিচ্ছন্ন, যে মাথার ভিতর চিন্তাভাবনা বেশি ঘুরপাক খেলেও হয়তো এই শান্তি বিঘ্নিত হবে।
***
হোমস্টেতে ফেরার সময় ফারুক খুবই সতর্ক হয়ে রীতিমতো মেপে মেপে পা ফেলে হাঁটল। ঠিকঠাক জুতো না—আনা খুবই বোকামো হয়েছে। যতই গাড়ির ব্যবস্থা আর কালিম্পঙের এসপি—র আতিথেয়তার প্রতিশ্রুতি থাক, এরকম বিনা প্রস্তুতিতে ফারুক কখনোই বাড়ির বাইরে পা রাখে না। এবার যে মাথায় কী ভূত চেপেছিল কে জানে!
গোটা রাস্তা গোড়ালি বাঁচিয়ে, ছোটো ছোটো পা ফেলে কুড়ি মিনিটের পথ পঁয়তাল্লিশ মিনিটে অতিক্রম করে ফারুক যখন আবার হোমস্টের ডাইনিং হলের সামনে এসে দাঁড়াল, ততক্ষণে দুপুরের খাওয়াদাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। কেশব কোঠারি হাত ধুয়ে খাবার জায়গায় ঢুকতে গিয়ে ফারুকের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যাওয়ায় একটু হাসল। হোমস্টের বাকি অতিথিরা ততক্ষণে সবাই ভিতরে বসে পড়েছে। ফারুকও একটু ভেবে, নিজের ঘরে না গিয়ে হাত ধুয়ে খেতে ঢুকে গেল।
জায়গাটা এই ক’দিনে খুবই পরিচিত। কিন্তু আজ ভিতরে পা দিয়েই একটা অস্বস্তি বোধ হল। কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে ফারুক বুঝল যে সেই প্রথম দিন পৌঁছে দুপুরবেলা খাওয়ার পর, এই প্রথম আবার সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে। মাঝে ক’দিন নানা কারণে ঘটনাচক্রে সবাই যে—যার মতো আলাদা আলাদা সময়ে খেয়েছে। শুধু তাই নয়, সবাই বসেও আছে ঠিক সেদিনের নির্দিষ্ট চেয়ার—টেবিলেই। কিন্তু এর মধ্যে কত কিছু ঘটে গেছে! দুটি মানুষ এই গোষ্ঠী থেকে চিরবিদায় নিয়েছে। তাদের ফাঁকা চেয়ারগুলো আজকে আরও বেশি চোখে পড়ছে। কেমন যেন মনে হচ্ছে কেউ একটা বিখ্যাত পেন্টিং দেখে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে হুবহু নকল করার, কিন্তু অপরিহার্য কিছু উপাদান বাদ পড়ে যাওয়ায় দ্বিতীয় ছবিটা একটা ভূতুড়ে প্রতিবিম্ব ছাড়া কিছুই হয়নি।
খাওয়ার টেবিলে আজ কথাবার্তা আছে ঠিকই, কিন্তু আওয়াজের মাত্রা ও তার পরিমাপের কিছু তারতম্যের কারণে কোলাহলটা নেই। ওদিকের টেবিলে জয়দীপ, ঐশানী আর দেবলীনা নিজেদের মধ্যে খাবার নিয়ে কথাবার্তা বলছে; সেটাও এই দুপুরের খাবার নিয়েই। ফারুকের উলটোদিকের চেয়ারগুলো দখল করে আছে দত্ত পরিবার। সেখানে যথারীতি দত্তবাবুই একা স্ত্রী ও কন্যার উদ্দেশ্যে কথা বলে যাচ্ছেন। তাঁরও বিষয় আজকের আবহাওয়ার সামান্য উন্নতি এবং এই সুযোগে আশপাশটা আর—একবার ঘুরে নেওয়া যায় কিনা। কৃতিকা আজকে নিজের বাবা—মার সঙ্গেই বসে খাচ্ছে। ফারুকের পিছনে রান্নাঘর ঘেঁষা টেবিলে একা লাঞ্চ করছে কেশব কোঠারি। তার থালার পাশে মোবাইল অন করা এবং তার চোখ ও মনোযোগ মূলত সেদিকেই। ডলি এসে তার সামনে খাবার বেড়ে দেওয়ায় ফারুক খেতে শুরু করল। সকালে এই কয়েক কিলোমিটার হেঁটেই তার বেশ ভালো খিদে পেয়ে গেছে। ডাল, তরকারি প্রায় চোখের নিমেষে শেষ করে সে ডিমের ডালনার বাটির দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে পিছনে একটা শব্দ শুনে ঘাড় ঘোরাল। ঘরে ঢুকল পৃথ্বী রাই, তার সামনে বছর ছয়েক বয়সের একটি ছেলে। ফারুককে দেখতে পেয়ে পৃথ্বী হাসিমুখে তার দিকে এগিয়ে এল। বাচ্চা ছেলেটি ততক্ষণে প্রতিভার জিম্মায়।
“আপনি পরশুদিন বিকেলে ওদের দোকানে এগুলো ফেলে এসেছিলেন।” ফারুকের সামনে দুটো সিগারেটের প্যাকেট। “ওহ, তাই ভাবি! কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তারপর ভাবলাম হয়তো কিনতেই ভুলে গেছি।” “না না, আপনি যে বেঞ্চিতে বসেছিলেন, তার নীচে পড়ে গেছিল। এর মধ্যে ওরা গোটা পরিবার আবার এক আত্মীয়র বাড়ি গেছিল, দোকান বন্ধ ছিল। আজ সকালে দোকান খোলার পর এক খদ্দের খুঁজে পেয়েছে। সাহসের মা অনেক ভেবে বের করেছে যে আপনিই লাস্ট দু’প্যাকেট কিনেছিলেন।” “ওর নাম সাহস? সুন্দর নাম তো!” “নাম যেমন, কামও তেমন। দরকারের থেকে একটু বেশিই। খুব ডানপিটে ছেলে। তবে সবার খুব আদরের।” “ডানপিটে ছেলে? একেবারে দেবদূতের মতো দেখতে তো!” “ওসব দেখে ভুলবেন না যেন! এর কাজই খালি পাহাড় চড়া, খাদে নেমে যাওয়া, জঙ্গলে চলে যাওয়া, উলটো—পালটা জিনিস মুখে দেওয়া। পুরো গাঁয়ের কাজ এর পিছনে চৌকিদারি করে বেড়ানো। আমরা সবাই হাঁ করে বসে আছি, কবে এই ছেলে বড়ো হয়ে আর—একটু ঠান্ডা হবে।” “পুলিশের চাকরিতে ঢুকে প্রথমেই যে শিক্ষা হয়, সেটা হল খবরদার যেন শুধু চেহারা দেখে কোনোরকম সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়। কিন্তু এরকম মুখ দেখলে তো কোর্টও ওয়ারেন্ট ইস্যু করবে না!”
পৃথ্বী আর ফারুক দু’জনেই সশব্দে হেসে উঠল। দত্ত পরিবার গোটা কথোপকথনটাই শুনেছে। তাদেরও মুখে হাসি। দুঃসাহসী সাহসের অবশ্য এইসবে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে আপাতত রিসেপশন কাউন্টারের টেবিলটার উপরে উঠে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। তাকে একটা চকোলেটের প্যাকেট দেওয়া হয়েছে, আর সামনে একটা বড়ো বাটিতে সম্ভবত থুকপা। সে চামচ দিয়ে তুলে একটু করে থুকপা মুখে দিচ্ছে আর এক কামড় করে চকোলেট খাচ্ছে। চোখে—মুখে নির্বাণলাভের পরিতৃপ্তি।
হঠাৎ এই বাচ্চা ছেলের উপস্থিতি আর হাসির শব্দ মিলে ক্ষণিকের জন্য ডাইনিং হলটা যেন দু’দিন পিছিয়ে গেছিল। হাসি থামতেই আবার তাপমাত্রা খানিক নেমে গেল। বাইরে তখন মেঘ আরও পাতলা হয়ে দিনের আলো যথেষ্টই ঝলমল করছে।
***
অনেক চেষ্টা করেও দুপুরের ঘুম কিছুতেই আটকানো গেল না। খেয়েদেয়ে উঠে নিজের ঘরে ফিরে এসে ফারুক জামা জুতো ছেড়ে পা টানটান করে চেয়ারে বেশ খানিকক্ষণ বসেছিল। তারপর রোকসানার আসার কথা মনে পড়ায় ফোনটা তুলে সেটার কললিস্টে গিয়ে একটা নম্বর খুঁজে পেয়ে ফোন করল। ফোন বেজে বেজে প্রায় কেটে যাওয়ার মুহূর্তে ওপাশ থেকে উত্তর এল।
“বলুন স্যার, কী ব্যাপার? ক্রাইম তো কিছুতেই আপনার পিছু ছাড়ছে না!” জিতুর গলা শুনে মনে হল সে বেশ ফুরফুরে মেজাজেই আছে। “তুমি কি গাড়ি চালাচ্ছ? আমি পরে ফোন করব?” “আরে না না। মানে গাড়ি চালাচ্ছি। কিন্তু প্যাসেঞ্জার নেই। একাই একটা কাজে গেছিলাম। এখন বাড়ি ফিরছি। আসলে গান শুনছিলাম, ফোনটা সিটে রাখা ছিল। আপনার নাম দেখে তুললাম।” “বেশ, আমার একটা কথা জিজ্ঞাসা করার ছিল। তুমি কি পরশুদিন সকালে ফ্রি? সকাল মানে বলছি সোয়া ন’টার মধ্যে এনজেপি পৌঁছোতে হবে, পিক আপ আছে।” “ধরে নিন হয়েই যাবে। তাও আপনাকে আমি আধ ঘণ্টা পরে কনফার্ম করছি। আমার ১১টা নাগাদ একটা কাজ ছিল। ওটা পিছিয়ে দেব। কে আসছে স্যার? বড়ো অফিসার কেউ? কলকাতা থেকে এই ইনভেস্টিগেশনে হেল্প করতে?” “না রে ভাই। আমার বউ আসছে। আমি এখান থেকে উঠব। তারপর একসঙ্গে রিশপ যাব। মানে অরিজিনালি যেখানে যাব ভেবে তোমার গাড়িতে উঠেছিলাম।” “আরে আপনার ওয়াইফ আসছে? আগে বলবেন তো স্যার! আমি এখনই কনফার্ম করে দিলাম। কোনো চিন্তা করবেন না। আমি ন’টার আগে এনজেপিতে গাড়ি লাগিয়ে দেব।” “বেশ, তাহলে এই কথাই হয়ে রইল। রাখছি তাহলে?” “একদম! আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।”
ফোন রাখার পর ফারুক ভাবল যে একবার কলকাতায় তার স্ত্রীকে ব্যাপারটা জানিয়ে রাখবে কিনা। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল এখন তো অফিসের চূড়ান্ত ব্যস্ততার সময়। তার থেকে রাতে ফোন করাই ভালো। জিতুর ফোন, গাড়ি এগুলোর নম্বর দিয়ে রাখবে। সেইসঙ্গে এটাও বলে রাখবে যে ছোঁড়া সারা রাস্তা বিচিত্র সব গান চালিয়ে আসবে। সেটা রোকসানাকে সহ্য করতে হবে।
বোতল থেকে বেশ খানিকটা জল ঢকঢক করে খেয়ে, একটা সিগারেট ধরিয়ে, ফারুক বেশ আয়েশ করে বিছানায় বসল। পিঠের দিকে দুটো বালিশের ঠেকনা, হাতে স্টিফেন কিং। এত কাণ্ড ঘটার পরেও উপন্যাসটা প্রায় শেষ করে এনেছে। আপাতত এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় কেন্দ্রীয় চরিত্রের পা প্রায় অকেজো। সে তাও ভেবে যাচ্ছে কীভাবে তার বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাবে। এটা মনে পড়তেই ফারুক নিজের পায়ের দিকে নজর দিল। একটা হালকা টনটনে ব্যথা হচ্ছে বটে, কিন্তু ফুলেছে বলে মনে হয় না। সে আবার বইয়ের পাতায় মনোনিবেশ করল। মিনিট তিনেকের মাথায় পেপারব্যাক বইটা প্রায় নিঃশব্দে হাত থেকে খসে বিছানায় পড়ে গেল। ফারুকের দু’চোখের পাতাও তখন বন্ধ। নিশ্বাসের তালে তালে শরীরের উপরের অংশ উঠছে নামছে।
ঘুম ভাঙল বিকেল পাঁচটার একটু আগে। একটানা অ্যালার্ম বেজে চলেছে। কিন্তু সে তো অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, অ্যালার্ম দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে ফোনই বাজছে। ফারুক জোর করে চোখ খুলে একটা বড়ো নিশ্বাস নিল। তারপর দু’হাত কপালের দু’প্রান্তে রেখে মাথাটা আলতো করে ঝাঁকাল। এবার একটু ধাতস্ত লাগছে। ফোনের রিং বন্ধ হয়েছে। এপাশ ওপাশ হাতড়ে ফোনটা বালিশের নীচ থেকে পাওয়া গেল। তিনটে মিসড কল। গত চার মিনিটের মধ্যে। সবকটাই বিপুল প্রধান। ফারুক কলব্যাক করল। একবার রিং হতেই ওপাশ থেকে উত্তর এল।
“সরি, এভাবে টানা ফোন করে যাচ্ছিলাম। খবর আছে। মনে হল আপনি হয়তো ইমিডিয়েটলি জানতে চাইবেন।” “অবশ্যই অবশ্যই। আমিই আসলে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বলুন কী ব্যাপার।” “প্রথমে ম্যাটার ইন হ্যান্ড। ঋজু দাশগুপ্তর ফ্যামিলির ব্যাপারে বেশ কিছু ইনফরমেশন পেয়েছি।” “ইন্টারেস্টিং কিছু জানা গেল?” “দেখুন এইসব বড়োলোক ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট ফ্যামিলি। একটু ঘাঁটলেই নানারকম ইন্টারেস্টিং ব্যাপার বেরিয়ে আসে। কিন্তু সেগুলো খুব একটা আনএক্সপেক্টেড তো নয়। এখন কথা হচ্ছে সেগুলো কতটা রেলিভ্যান্ট সেটা দেখতে হবে। প্রথমত, ঋজুর বাবার অসুস্থতার ব্যাপারটা জেনুইন। আর খবরটা এখন অবধি সাকসেসফুলি চেপেও রাখা হয়েছে। বিজনেস পার্টনার বা কম্পিটিটররা কেউ জানে না। ওই ম্যানেজার, মিস্টার লোহিয়া আপাতত আগলে রেখেছেন। ফ্যামিলিতেই কেউ কেউ আছে, জানতে পারলে অ্যাডভান্টেজ নেবে। ব্যাবসা লাটে উঠবে।” “টাকা—পয়সার সিচুয়েশন?” “এদের পারিবারিক ব্যাবসা। ঋজুর বাবারা চার ভাইবোন। তবে বেশিরভাগ শেয়ার ঋজুর বাবার নামেই। বাজারে যা খবর, আর কয়েক বছরের মধ্যে গোটাটাই উনি কিনে নিজের নামে করে নেবেন। তার কারণ ওঁর দাদা নিজের মেয়ের অসুস্থতার পর এসব থেকে একেবারেই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। আর ছোটো ভাই একেবারেই অপদার্থ। তার এক ছেলে আছে। ঋজুর কাজিন, বয়সে একটু ছোটো। সে কলকাতার টপ লেভেল গ্যাম্বলারদের মধ্যে একজন। প্রচুর দেনা। বাপ—ছেলে কারওরই সে দেনা মেটানোর ক্ষমতা নেই। লোহিয়া এর ব্যাপারেই সবথেকে ভয় পাচ্ছে। আপাতত ভাইয়ের সামনে ঋজুর বাবাই অফার দিয়ে রেখেছেন। ব্যাবসার শেয়ার ছেড়ে দিলে ধার মিটিয়ে দেবেন। আজ নাহয় কাল অফার অ্যাকসেপ্টেড হয়েই যাবে বলে মনে হয়। কিন্তু এর মধ্যে ডিমেনশিয়ার ব্যাপারটা আঁচ পেলে এরা ঝাঁপিয়ে পড়ে পুরো বিজনেস লুটে নেবে।” “আর বোন? নাকি দিদি?” “বোন। অ্যাকচুয়ালি ছোটো ভাইয়ের যমজ। একদম ব্ল্যাকশিপ অফ দ্য ফ্যামিলি! লোরেটোতে পড়ত, সেখানকার চ্যাপেল থেকে চুরি করে ওয়াইন খেয়ে স্কুল থেকে নাম কাটা যায়। তারপর বিদেশ। প্রথমে লন্ডন, তারপরে ক্যালিফোর্নিয়া। ওখানেই কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় একটি স্প্যানিশ ছেলেকে বিয়ে করে লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে মেক্সিকো। সেখানেই ছেলেটি নিজের বাগানে আফিম এবং গাঁজা চাষ করতে গিয়ে ধরা পড়ে এবং তার জেল হয়। জেল হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ডিভোর্স এবং মেয়ে আবার ফেরত চলে আসে ক্যালিফোর্নিয়ায়।” “এ তো পুরো হলিউড সিনেমা! তা এঁর বাড়ি বা পরিবারের সঙ্গে কনট্যাক্ট আছে?” “খুবই একটা না। ইন্টারেস্টিংলি, এত কিছুর মধ্যেও সে কখনোই বাড়ি থেকে টাকাপয়সা বা অন্য কোনো হেল্প চায়নি। লাস্ট দশ—পনেরো বছরে যোগাযোগও একদম কমে এসেছে। একজন সদস্যের সঙ্গেই তাও কনট্যাক্ট ছিল।” “আপাত মৃত ভাইপো?” “ইয়েস। এবং তার ভাগের বিজনেস এবং প্রপার্টির শেয়ারের ওয়ারিশও ঋজু।” “এবার ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার হচ্ছে। ধরে নিচ্ছি বাপের সম্পত্তিও ঋজুই ইনহেরিট করত?” “একদমই। আর কোনো ভাইবোন নেই। পরের জেনারেশনে এক দিদি বেডরিডেন এবং আর—এক ভাই পাক্কা জুয়াড়ি।” “এখন ঋজুর অবর্তমানে তাহলে সম্পত্তির মালিক কে হবে? জুয়াড়ি ভাই?” “না, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। পিসির সম্পত্তি চলে যাবে সান ফ্রান্সিসকোর কাছে একটি হিপি কমিউনে। আর বাবার ভাগের বিজনেস এবং টাকা—পয়সার একটা কমপ্লিকেটেড ভাগাভাগির হিসেব আছে। তার মধ্যে বোর্ড, ট্রাস্ট, পুরানো কর্মচারি, বেশ কিছু চ্যারিটি, খেলাধুলার অ্যাকাডেমি, এরকম অনেক কিছুই আছে। নিজের স্ত্রী বাদে পরিবারের কেউ নেই।” “তার মানে তো মোটিভ এস্ট্যাবলিশ করা গেল না।” “আপাতত না। তবে আরও খোঁজ চালাচ্ছি। এদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, জমানো টাকা, লুকোনো খরচার হিসেব, সব খতিয়ে দেখব।” “বেশ। ওই চ্যারিটি বা বোর্ড মেম্বারদের সঙ্গে এদের অন্য কোনো রিলেশন বেরোয় কিনা একটু জানাবেন। তবে অনেকটাই তো কাজ হয়েছে। আপনার এফিশিয়েন্সি সত্যিই ইম্প্রেসিভ!” “আরে দাঁড়ান, আরও ব্যাপার আছে।” “বলেন কী?” “ইয়েস সার। কেশব কোঠারি। একদম ডাইসি ক্যারেকটার!” “মিথ্যে কথা বলেছে?” “প্রচুর! ওর আসার ব্যাপারে, ওর ডঃ চক্রবর্তীর সঙ্গে দেখা হওয়ার ব্যাপারে, ওর গোটা মুভমেন্টই সাসপিশাস। তারপর সেটা লুকিয়ে রাখা তো আরও গণ্ডগোলের।” “তার মানে লাভাতে আচমকা দু’জনের দেখা হয়নি?” “লাভাতে হয়েছে, কিন্তু আচমকা হয়নি। ও মোস্ট প্রোব্যাবলি ডক্টরকে কলকাতা থেকে ফলো করে এসেছে।” “সে কী! এটা জানলেন কী করে?” “সবই বলব। ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে আরও ঘোলাটে ব্যাপার আছে। বা ইন্টারেস্টিংও বলতে পারেন। ওকে এবার ভালোমতো জেরা করতে হবে।” “গ্রেপ্তার করবেন?” “প্রথমে থানায় এসে কোঅপারেট করতে বলব। ঝামেলা করলে অ্যারেস্ট করতেই হবে। তবে তার আগে একবার চেপে ধরে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করব।” “আজকেই?” “হ্যাঁ, তবে একটু দেরি হবে। আমি একটা অন্য কাজে কালিম্পং এসেছি। ফিরে একবার বাড়ি যাব। তারপর ভাবছি রাতের দিকে আপনাদের ওখানে হাজির হব।” “সবার সামনে করতে চাইছেন না?” “না, চাইছি না। ইন কেস এটার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িয়ে থাকে, সে অ্যালার্ট হয়ে যাবে। আমি রাতের দিকে গাড়ি নিয়ে যাব। ওখানে ডিনারের ব্যাপার ঢুকে গেলে, সবাই ঘরে ফেরত চলে যাওয়ার পর। ইন ফ্যাক্ট, আমি ভাবছি কাছাকাছি গিয়ে একবার আপনাকেই ফোন করে নেব। আপনি ওখানকার এগজ্যাক্ট সিচুয়েশনও বলতে পারবেন। আর আপনি নিজে একটু নেমে এসে আমার সঙ্গে আগে দেখা করে নিলে আমিও আপনাকে একটু ডিটেলে জানিয়ে দেব আমি যা যা জানতে পেরেছি।” “বেশ, এ তো ভালোই প্ল্যান। ধরে নিচ্ছি তাহলে সাড়ে ন’টার আগে আপনি ফোন করছেন না।” “হ্যাঁ, ওরকমই। আপাতত ছাড়ছি। রাতে দেখা হচ্ছে।”
ফোন রেখে ফারুক খাটেই বসে রইল। মাথার ভিতর ভাবনাগুলো আবার বেশ গা—ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। কেশব কোঠারি! লোকটা ঝানু ব্যবসায়ী, এই এলাকায় বহুদিনের যাতায়াত, আবার সেইসঙ্গে কলকাতার চিকৎসক মহলেও যথেষ্ট পরিচিতি। আবার ব্যবসায়ী হিসাবে ঋজুদের পরিবারের সঙ্গেও যদি যোগাযোগ থেকে থাকে? ইশ, এই কথাটা প্রধানকে বললে হত! তবে লোকটি খুবই কাজের এবং মাথাও বেশ পরিষ্কার। হয়তো নিজে থেকে এই ব্যাপারে খোঁজ নেবে। এখন দেখতে হবে কেশবের কোন কোন কীর্তি ফাঁস হয় এবং এখানে কোন ব্যাপারে তার ভূমিকা প্রমাণ করা সম্ভব হয় নীলাদ্রির মৃত্যু, নাকি ঋজুর খুন। প্রথমদিন রাতে তাস খেলতে খেলতে ঋজু সম্ভবত সামনের জানালা দিয়ে কিছু একটা দেখে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। কেশবের ঘর সামনের দিকেই এবং সে তার কিছুক্ষণ আগেই খাওয়া শেষ করেছিল। ফলে ঋজু হয়তো কেশবকে কিছু একটা করতে দেখে ফেলেছিল। আজ রাতে হয়তো অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মিলবে।
খাট থেকে নামতে গিয়েই ফারুক টের পেল পায়ের ব্যথাটা বেশ বেড়েছে। এখন মনে হচ্ছে সামান্য ফোলাও আছে। ঠিকমতো জুতো প্যাক না করার জন্য নিজেই নিজেকে খানিকক্ষণ গালাগালি দিল। তারপর একটু চুপ করে বসে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। তারপর ধীর পায়ে হেঁটে, ঘর থেকে বেরিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে তিন নম্বর ঘরে টোকা দিল।
“আরে! আসুন আসুন। মা, দেখ তো বাবা কি ঘুমোচ্ছে? ডেকে দাও না!” কৃতিকা দরজা খুলে ক্ষণিকের জন্য একটু হকচকিয়ে গেলেও, সেটা দ্রুত সামলে নিয়েছে। এই ঘরটা ফারুকের ঘরের থেকে অনেকটাই বড়ো। অন্তত দেড়গুণ তো হবেই। একটা বড়ো ডবল বেড ছাড়াও একটা ছোটো চৌকি আছে। আপাতত বাসবী দত্ত একটা ম্যাগাজিন হাতে সেটার উপরেই বসেছিলেন। ঘরের অন্যদিকে একটা আলমারি আর তার পাশে একটা টেবিল—চেয়ার। তাছাড়াও দুটো গদি মোড়া টুল জাতীয় বসার জায়গা আছে। এবং এত কিছু থাকা সত্ত্বেও ঘরটা মোটেই দমবন্ধ করা ঘুপচি গোছের মনে হচ্ছে না।
“আপনি বসুন না! দাঁড়িয়ে আছেন কেন?” এক হাতে নিজের বাবাকে ঠেলা দিতে দিতে কৃতিকা বলল। “থ্যাংক ইউ। আমি আসলে একটা প্রয়োজনেই এসেছি।” একটা টুলের উপর বসতে বসতে ফারুক বলল। “বলুন বলুন।” বাসবীও ম্যাগাজিন নামিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসেছেন। “সেরকম কিছুই না। আজ সকালে একটু বেশি হাঁটাহাঁটি হয়েছে। কিন্তু সঙ্গে উপযুক্ত জুতো ছিল না। ফলে এখন দেখছি, বেশ একটা ব্যথা হচ্ছে। একটু ফুলেওছে বোধহয়। ওহ, থ্যাংক ইউ।”
কৃতিকা ফারুকের কথা শেষ হওয়ার আগেই দুটো ওষুধের পাতা নিয়ে এসে তার সামনে ধরেছে। মেয়েটি বেশ চৌকশ আর চটপটে। তাছাড়া বাবার হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে হয়তো এতবার সমস্যায় পড়তে হয়েছে, যে এখন এইসব ব্যাপারে অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা প্রায় ডাক্তারদের সমান। “এগুলো আপাতত রেখেই দিন। এটা বেশ কড়া পেনকিলার। দিনে কোনোমতেই দুটোর বেশি খাবেন না। এবং অবশ্যই সঙ্গে অ্যান্টাসিডটা খাবেন। এখনও বাড়াবাড়ি হয়নি। আমার মনে হয় একটা খেলেই অনেকটা রিলিফ হবে। তারপর রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে।” “আবারও অনেক অনেক ধন্যবাদ। এবং সরি এভাবে বিশ্রামের সময় এসে বিরক্ত করার জন্য।” “আরে এসে ভালোই করেছেন। এখন বেশি বিশ্রাম নিলে, রাতের ঘুমটা পুরো নষ্ট হয়ে যায়!” মিস্টার দত্ত কোন ফাঁকে ঘুম থেকে উঠে বসেছেন, কেউ খেয়াল করেনি। “আচ্ছা, কিছু মনে করবেন না। একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। ঋজুর বাড়ির লোক কি ওর বডি পেয়েছে?” বাসবী একটু কিন্তু কিন্তু ভাব করেও প্রশ্নটা করেই ফেললেন। “দেখুন, এই ব্যাপারে আমার কোনো মন্তব্য করা ঠিক না। আপাতত এটুকুই বলতে পারব, যে ওর বাবা—মা কালিম্পং এসে পৌঁছেছে। হয়তো কাল সকালের মধ্যে বডি রিলিজ করে দেওয়া হবে।” “পুলিশের কাজ কি এগিয়েছে? মানে আমাদের সত্যিই এখানে কতদিন থেকে যেতে হতে পারে? আমি অধৈর্য হচ্ছি না। জাস্ট আপনার অভিজ্ঞতা আছে বলে জানতে চাইছি।” “আবারও, কিছু হলপ করে বলাটা ঠিক হবে না। তার একটা বড়ো কারণ আমি নিজেই জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি যে প্রাথমিক কিছু তথ্য জোগাড় হলে, এখানকার সবার বয়ানের সঙ্গে সেইসব মিলিয়ে দেখে, হয়তো বাড়ি ফিরতে অ্যালাও করবে। তবে হতে পারে রাজ্য বা দেশ ছাড়তে হলে পুলিশকে জানিয়ে যেতে হবে। আবারও বলছি, এগুলো আমার অনুমান। অযথা এখন চিন্তা করবেন না। এবং সত্যিই ইনডেফিনিটলি এখানে নিশ্চয়ই কাউকে বসে থাকতে হবে না। আচ্ছা, এখন চলি। হয়তো অলরেডি চা নিয়ে চলে আসবে।”
বোঝা গেল যে ওঁদের সবারই ইচ্ছে ছিল ফারুকের সঙ্গে বসে আর—একটু সময় কথা বলার। তদন্ত কেমন এগোচ্ছে, সন্দেহের তালিকায় কেউ আছে কিনা, এরকম কিছু খবর যদি পাওয়া যায়। ফারুকও ব্যাপারটা সম্পর্কে সচেতন হয়ে তড়িঘড়ি ওই ঘর থেকে বিদায় নেওয়ায়, সবাই স্পষ্টতই নিরাশ। ফারুক একটা ব্যাপার বুঝতে পারছে— যতদিন না এই তদন্তের কোনো সুরাহা হচ্ছে, তার পক্ষে সবাইকে একটু এড়িয়ে চলাই ভালো। নাহলেই বিস্তর প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। পরশুদিনটা তাড়াতাড়ি চলে এলে ভালো হয়!
দত্তবাবুদের ঘর থেকে বেরোতেই ফারুক দেখল গোপাল একটা ট্রেতে দু’কাপ চা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রায় দোতলা পৌঁছে গেছে। ফারুকও তার পিছন পিছন এসে, একটা চায়ের কাপ নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। প্রায় একই সঙ্গে ফোনে একটা মেসেজ আসার শব্দ হল। চায়ের কাপ নামিয়ে ফোনটা তুলে দেখা গেল মেসেজ নয়, ইমেল। কণিষ্ক রায়ের থেকে এসেছে। অর্ণবের পরিচিত সেই সাইবার ক্রাইম সেলে সদ্য জয়েন করা তরুণ তৎপর অফিসার। ছ’ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই মেল করেছে; তৎপরতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তথ্যগুলো কাজের কিনা সেটা অবশ্য সময়ই বলবে।
ফারুক ইমেল বা ওয়েবসাইটের কোনো লেখা পড়তে হলে কম্পিউটার স্ক্রিনে পড়াই পছন্দ করে; নিদেনপক্ষে ল্যাপটপ বা ট্যাব। ফোনের ছয় ইঞ্চি স্ক্রিন কাত করে ধরলেও একটা গোটা বাক্য বা উপর নীচে একটা গোটা প্যারাগ্রাফ আঁটে না। এইভাবে রসাস্বাদন তো দূর, প্রয়োজনীয় জিনিসের মর্মোদ্ধার করতেই যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। আপাতত নিরুপায় হয়ে ফোনেই মেলে পাঠানো ওয়ার্ড ফাইলটা পড়তে শুরু করল।
কণিষ্ক শুধু ঐশানীর ব্যাপারে তথ্য জোগাড় করে পাঠায়নি, সেগুলোকে একটা সুন্দর রিপোর্টের মতো করে লিখে পাঠিয়েছে। প্রথম সারির ইংরেজি খবরের কাগজের সাংবাদিকতার মতো ঝরঝরে ভাষা। তার মধ্যে প্রসঙ্গ ও বিষয় অনুযায়ী আবার আলাদা হেডিং দেওয়া আছে— ছোটোবেলা, পারিবারিক জীবন, ছাত্রজীবন, বন্ধুবান্ধব, উল্লেখযোগ্য ঘটনা ইত্যাদি। গোটা রিপোর্টটা পড়তে ফারুকের প্রায় আধ ঘণ্টা সময় লাগল। ঐশানীর বিষয়ে ফারুক এখন অবধি যা যা জেনেছে তার প্রায় সবকিছুরই উল্লেখ আছে। এমনকি মাঝেমধ্যে গাঁজা খাওয়ার অভ্যাসের কথাও বলা আছে। তার কারণ একবার হাইস্কুলে তার ব্যাগ থেকে গাঁজা খাওয়ার যাবতীয় সরঞ্জাম পাওয়া গেছিল এবং ফলস্বরূপ একমাস সাসপেন্ড থাকতে হয়েছিল।
রিপোর্টে উল্লিখিত দুটো ব্যাপার ফারুকের অজানা ছিল। এক, কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় সে এক সহপাঠীর নাক ঘুষি মেরে ফাটিয়ে দেয়। ছেলেটি নাকি তাদেরই ক্লাসের আর—এক ছাত্রীকে নানাভাবে উত্যক্ত ও হেনস্থা করছিল। ব্যাপারটা পুলিশ অবধি গড়ালেও একটা জিডিতেই থেমে যায়। এফআইআর হওয়ার আগেই কলেজের ইউনিয়ন ব্যাপারটা মিটমাট করে ফেলে। ছেলেটি মুচলেকা দেয় যে সে আর এরকম করবে না। ঐশানী তাকে ডাক্তারের ভিজিট আর পেনকিলার কেনার টাকা দিয়ে দেয়। পরের বছর ঐশানী গোটা কলেজের মেয়েদের সমর্থনে বিপুল ভোটে জিতে ইউনিয়নের সেক্রেটারি পদে নিযুক্ত হয়।
দ্বিতীয় ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত ঠেকলেও, আপাতদৃষ্টিতে নেহাতই সাধারণ। ঐশানীর পরিবার বলতে শুধু তার বাবা—মা। আপাতত তারা থাকে কসবার কাছে একটি ভাড়া বাড়িতে। কিন্তু রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে এই পরিবারটি গত কুড়ি বছরে অন্তত ছ’বার বাড়ি বদলিয়েছে। হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে মোটামুটি প্রত্যেক তিন বছরের মাথায় একবার করে এই পরিবারটির ঠিকানা বদল হয়েছে। কলকাতার হেন কোনো অঞ্চল নেই যেখানে ঐশানীরা থাকেনি— সিঁথি, বেহালা, গড়িয়া, শিয়ালদা, হাজরা, কসবা ইত্যাদি। কিন্তু এই গোটা সময় জুড়ে ঐশানীর বাবা, যার আয়ে এই সংসার চলে, তাঁর চাকরি বা অফিসের কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেই কারণেই কণিষ্কর কাছে বিষয়টি খানিক ব্যাখ্যাহীন মনে হয়েছে।
চোখের সামনে থেকে ফোন সরাতে পেরে ফারুক একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বাইরে আলো কমে এসেছে। সে হাত বাড়িয়ে দেয়াল অবধি পৌঁছতে না পেরে বাধ্য হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সুইচ টিপে ঘরের আলো জ্বালাল। রিপোর্টে সাংঘাতিক কোনো নতুন তথ্য না থাকলেও, ঐশানী সম্পর্কে বেশ কিছু ধারণার উপর নতুন করে আলো ফেলে ঠিকই। যেমন এই মারামারির ব্যাপারটা। মেয়েটির সঙ্গে কথা বললেই তার চারিত্রিক দৃঢ়তা খানিক টের পাওয়া যায়, কিন্তু এখন বোঝাই যাচ্ছে সে দরকার পড়লে সরাসরি মারমুখী বা আক্রমণাত্মকও হয়ে ওঠে। কিন্তু রাগের মাথায় ঘুষি আর ঠান্ডা মাথায় ডেকে নিয়ে ছুরি মারার মধ্যে অনেক ডিগ্রির তফাত। একটা মানুষকে কতটা ঠেললে এই সীমারেখা অতিক্রান্ত হয়?
ঠিকানা বদলানোর ব্যাপারটা নিয়েও তার যথেষ্ট কৌতূহল হচ্ছে। হয়তো অত্যন্ত মামুলি কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে, কিন্তু তাও এটা যে সাধারণ দৈনন্দিনতার মধ্যে পড়ে না, সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর এই মুহূর্তে ফারুকের কাছে নিজের কৌতূহলেরও অনেক দাম। হাজার হলেও সে নিজে তো আর সরকারের তরফ থেকে এই তদন্তের দায়িত্বে নেই। গোটা ব্যাপারটায় অংশগ্রহণ করার একমাত্র কারণ তার কৌতূহল, কিছু খটকা ও প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার প্রচেষ্টা। এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ফারুকের মনে পড়ল যে ডলি বলেছিল এখানে প্রথম যোগাযোগ, বুকিং, এগুলো ঐশানীই করেছিল। তাহলে হিসাবমতো চেক ইন করার সময় রেজিস্টারে তার নাম—ঠিকানাই থাকার কথা। এখানে যদি রিপোর্টে উল্লিখিত ঠিকানার বাইরে আবার অন্য কোনো ঠিকানা দেওয়া থাকে, তাহলে বুঝতে হবে ব্যাপারটা নেহাত মামুলি নয়। সেই ক্ষেত্রে এই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
ফারুক যখন ঘরের বাইরে বেরোল, তখন সূর্যাস্ত হয়ে গেছে। তার বারান্দা থেকে সামনের দিকে তাকালে পাহাড়ের গায়ে লাভা শহর। সেখানে আলো জ্বলতে শুরু করেছে। এই চেনা দৃশ্যটিই গত ক’দিন চোখে পড়েনি। নীচে খোলা জায়গাটায় দত্তবাবুদের গাড়িটার একটা দরজা খোলা। ভিতরে ড্রাইভার সম্ভবত আধ শোয়া হয়ে গান শুনছে। আধুনিক নেপালি গান; তালবাদ্যের মধ্যে একটা কথাও বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু এই পাহাড়ি সন্ধ্যার পরিবেশে শুনতে মন্দ লাগছে না।
ফারুক যখন ডাইনিং হলে ঢুকল, তখন দরজার বাইরে একটা বাল্ব ছাড়া একদম রান্নাঘরের ভিতরে একটাই আলো জ্বলছে। সেখানে পৃথ্বী রাই নিচু হয়ে ঝুঁকে একটা বড়ো কড়াইতে পকোড়া জাতীয় কিছু ভেজে চলেছে। তেলে ভাজার শব্দ আর গন্ধে গোটা জায়গাটা ভরে আছে। রিসেপশন কাউন্টারের উপরের আলোটা তখনও কেউ জ্বালায়নি। ফারুক রেজিস্টারটা খুলল। চারদিন আগের তারিখের পাতায় দুটো এন্ট্রি আছে, কিন্তু এত কম আলোয় কিছুই ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। ফারুক এটা অনুমান করেই ফোন সঙ্গে নিয়ে নীচে নেমেছে। সে ফোন বের করে টর্চ জ্বালাল। প্রথম এন্ট্রিটাই ‘ঐশানী প্লাস থ্রি’। তারিখের জায়গায় তারিখ, সময়ের জায়গায় সময়। সেইসঙ্গে ফোন নম্বর, কোথা থেকে আসছে, কোথায় যাবে, সব কিছুই লেখা আছে। ঠিকানার জায়গায় কসবার ঠিকানাই লেখা। কিন্তু ফারুক সেদিকে ঠায় তাকিয়ে আছে অনেকক্ষণ।
রান্নাঘরের কাজ বোধহয় শেষ হল। তেলের ছ্যাঁকছোঁক শব্দ থামল। আর তাতেই ফারুকের যেন ঘোর কাটল। সে আর—একবার ঐশানীর ফোন নম্বরটা দেখে নিয়ে, টর্চ নিভিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এল। মাথায় অনেক চিন্তা, অনেক তথ্য এখন একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। কিন্তু তাতে কিছু জিনিস হয়তো পরিষ্কারও হচ্ছে। মেঘ প্রথমে জড়ো হলে সবকিছু কালো করে ঢেকে দেয়, তারপর যখন মেঘে মেঘে ধাক্কা লাগে তখন কান ফাটানো শব্দে অন্য কিছু শোনাও যায় না। কিন্তু সেই সঙ্গে বিদ্যুতের ঝলকানিতে ক্ষণিকের জন্য কিছু কিছু দৃশ্য চোখের সামনে ফুটে উঠেই আবার হারিয়ে যায়। অবশেষে অঝোরে বৃষ্টি হয়ে আকাশ আবার পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। ফারুকের মানসিক পরিস্থিতি আপাতত এই শেষ পর্যায়ের কাছাকাছি। সে ঐশানীর নম্বরে ফোন করল। দু’বার রিং হতেই তার গলা পাওয়া গেল।
“হ্যালো?” “ঐশানী, আমি ফারুক কথা বলছি। তুমি কিছু বলার আগে, বা কোনো রিঅ্যাক্ট করার আগে খুব মন দিয়ে আমার কথাগুলো শোনো।” “হুম, শুনছি।” “বেশ, কাউকে জানতে দেওয়ার দরকার নেই আমি ফোন করেছি। বন্ধুরা জানতে চাইলে বলো যে কাজের জায়গা থেকে একটা অদরকারি ফোন ছিল।” “হ্যাঁ, বুঝতে পারছি।” “আমার ইমিডিয়েটলি তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলা দরকার। সেটা সবার সামনে করতে চাইছি না। আমাদের হোমস্টে থেকে বেরিয়ে, ঢালু পথটা ধরে নেমে, মেন রোডে পড়েই যদি বাঁদিকে যাও, একটা বাঁক আছে, দেখেছ?” “হ্যাঁ।” “বেশ, ওটা পেরিয়ে কয়েক পা হাঁটলেই দেখবে ডানদিকে, মানে খাদের দিকটায় একটা পাথরের বেঞ্চ মতো করা আছে। পাশে একটা ছোটো পাহাড়ি নালা বয়ে গেছে। চিনতে পারবে?” “হ্যাঁ, পারব।” “ফোন রাখার পর পনেরো মিনিট কাটতে দাও। তারপর ওখানে এসে আমার সঙ্গে দেখা করো। এটাকে ইগনোর কোরো না। এখন রাখছি।” “হ্যাঁ, ওকে। আমি রাতের দিকে মেল করে দেব। আর বাকিটা আমি অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে গিয়ে কথা বলে নেব।” ফোন রাখার আগে ঐশানী গলা স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, কান পাতলে চাপা উত্তেজনা ঠিকই টের পাওয়া যায়।
ফারুক একবার ঘরে ফিরল। টেবিলের উপর থেকে সিগারেট আর দেশলাইয়ের বাক্সটা নিয়ে পকেটে পুরল। বারেবারে সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করায় পায়ে একটু চাপ পড়ছে। মনে রেখে পেনকিলারটা খেতে হবে। এই সময় বাইরে থেকে কেউ দরজায় টোকা দিল। ছিটকিনি খুলতে দেখা গেল পেমা; হাতে পকোড়ার প্লেট, মুখে হাসি। প্লেটটা বিছানার উপরেই রেখে একটা পকোড়া মুখে তুলতেই বোঝা গেল আগুনের মতো গরম। ফারুক এদিক—ওদিক তাকিয়ে তার লাগেজের ভিতর থেকে একটা পিচবোর্ডের গিফট বাক্স বের করল। তারপর সেখান থেকে ছোটো লামাদের অন্য জায়গায় সরিয়ে, একটা পরিষ্কার রুমাল পেতে, পকোড়াগুলো ওটাতে চালান করে দিল। তারপর বাক্সটা ভালো করে বন্ধ করে, ঘরের আলো নিভিয়ে, বেরিয়ে গেল।
নির্দিষ্ট জায়গাটা বাঁক পেরিয়ে ঠিক উনিশ পা। এটা অবশ্য ফারুকের পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি শরীরের পায়ের মাপে। ঐশানীর আর—একটু বেশি লাগবে। কিন্তু মোটেই খুব একটা দূর নয়। বেঞ্চটায় বসে বাঁদিকে ঘাড় ঘোরালেই বাঁকটা, আর বাঁকের মুখে দোকানটা চোখে পড়ে। এই জায়গাটায় রাস্তার আলো বলতে কিছু নেই। সামনের পাহাড়ে বেশ উপরের দিকে একটা বাড়ি আছে; তার বারান্দার আলোটাই গাছের ফাঁকে কেটেকুটে দু—এক পশলা এই রাস্তায় এসে পড়ে। সাড়ে ছ’টা বেজে গেছে। লোকচলাচল এখন নেই বললেই চলে। লাভার দিক থেকে একটা বড়ো গাড়ি ফারুকের সামনে দিয়ে চলে গেল। গাড়িটা বাঁকের আড়ালে ঘুরে অদৃশ্য হতেই, ঐশানীকে দেখা গেল।
আগাগোড়াই প্রায় ডানদিকে নজর রাখতে রাখতে ঐশানী হাঁটছিল। একদম কাছাকাছি এসে ফারুককে দেখতে পেয়ে সে ব্রেক কষার মতো হাঁটা থামাল। ফারুক আলতো করে তার বাঁহাত তুলল। ঐশানী সেদিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে, আরও কয়েকবার বড়ো বড়ো নিশ্বাস ফেলে বেঞ্চে এসে বসল।
“বলুন, এভাবে ডেকে পাঠালেন কেন?” “বসো, বলছি। পকোড়া খাবে? এখনও বেশ গরম আছে, নেতিয়ে যায়নি।” ফারুক বেঞ্চের উপর পিচবোর্ডের বাক্সটা খুলে ফেলেছে। “নাহ, থ্যাংক ইউ। আমরা বরং কাজের কথায় আসি।” “বেশ, এক মিনিট দাঁড়াও।” ফারুক ডান হাতে একটা কামড় দেওয়া পকোড়া ধরে, বাঁ হাতে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। তারপর অনেক কসরত করে সেটাকে এক হাতে খুলে, ফোনের ছবির গ্যালারিতে গিয়ে তিনটে তারিখ পিছিয়ে গিয়ে একটা বিশেষ ছবি খুলে ফোনটা ঐশানীর দিকে ঘুরিয়ে ধরল। “এই চিঠিটা তুমি কাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলে? আশা করি সত্যি কথা বলবে।” ঐশানী যে কতটা চমকে উঠেছে, সেটা এই অল্প আলোতে তার শরীর নড়ে ওঠা থেকেই বোঝা গেল। মুখে ছায়া পড়ায়, অভিব্যক্তির পরিবর্তন হল কিনা সেটা টের পাওয়া গেল না।
“এটা— এটা আপনি কোথা থেকে পেলেন?” “যাক!” ফারুক ফোনটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে আর—একটা পকোড়া তুলে নিল। “এটা অন্তত স্বীকার করে নিচ্ছ যে চিঠিটা তোমারই লেখা। এবার বলো কাকে লিখেছিলে এবং সেটা তারপর সবার অলক্ষে ফেলেই বা দিয়েছিলে কেন?”
ঐশানীকে দেখে মনে হচ্ছে তার ব্যক্তিত্বে একটা বড়ো পরিবর্তন ঘটে গেছে। তার আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা, সবকিছুই যেন একটা অপ্রত্যাশিত আঘাত পেয়ে একটু শিথিল হয়ে পড়েছে। ঘড়ির কাঁটা ধরে চলা মানুষের জীবন থেকে আচমকা ঘড়ি কেড়ে নিলে তারও হয়তো এরকম অবস্থাই হবে। সে খানিক নিজের অজান্তেই এক হাতের তালুতে অন্য হাত ঘষে যাচ্ছে, কিন্তু কীভাবে কথা শুরু করবে, তার সূত্র এখন তার কাছে অধরা। ফারুকও আর নিজের প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি না করে চুপ করে আছে। এবার ঐশানী হাত বাড়িয়ে সামনের বাক্স থেকে একটা পকোড়া তুলে একটু কামড় দিল। তারপর মুখ তুলে ফারুকের দিকে তাকাল।
“চিঠিটা ঋজুকে লিখতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু কয়েক লাইন লিখে মনে হল, কী লাভ ওকে লিখে? নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া ওর ধাতে নেই। ও জানেই না, হয়তো শিখেই ওঠেনি। তখন ঠিক করি কলকাতায় ফিরে গিয়ে একদম অফিশিয়াল কমপ্লেন করব। দেবীর সঙ্গে বন্ধুত্বটা হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে, এই গ্রুপটাও আর থাকবে না। বাট রাইট ইজ রাইট। এমনিতেও বহু দূরে চলে যাচ্ছি। অবধারিতভাবে অন্যরকম হয়ে যেতই সম্পর্কগুলো। এটা অন্তত একটা জরুরি কাজের কাজ করে যাব।”
“আমি একটু আন্দাজ করতে পারছি। দেবলীনাও বলেছিল যে এবারের বেড়ানোটা প্রথম থেকেই মাটি হয়ে গেছে। কিন্তু তাও একটু তোমার মুখ থেকে শুনি।”
“আমাদের এবার বেড়ানোর প্রথম স্টপ ছিল ঋষিখোলা। সেদিন সকালে আমাদের ট্রেন লেট ছিল, তারপর এনজেপি—তে নেমে গাড়ি বুক করতে আরও দেরি হয়। সব গাড়িই প্রায় ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে। যাইহোক, গাড়ি বুক করে ঋষিখোলা যখন পৌঁছোই, তখন লাঞ্চটাইম পেরিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে সেদিন প্রচুর ঝক্কি যায়। সন্ধের দিকে একটু এদিক—ওদিক হেঁটেই সবাই টায়ার্ড হয়ে রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ে। পরদিন একদম সকাল সকাল আমাদের দিন স্টার্ট হয়। সারাদিন প্রচুর ঘোরাঘুরি করি, অনেক ছবি ওঠে। দুপুরে আমরা খাবার নিয়ে বাইরে পিকনিক মতোও করেছিলাম। ওটাই লাস্ট দিন ছিল, আমরা সবাই সত্যিই খুব মজা করেছিলাম। সবাই খুশি ছিল।”
“সন্ধ্যাবেলায় কী হল?”
“সন্ধ্যায় না, রাত্রে। সেদিন সাড়ে আটটার মধ্যে ডিনার করে আমরা ঘরে ফিরে আসি। প্রথমে খানিকক্ষণ তাস খেলা হচ্ছিল। আমাদের হুইস্কির বোতলটা খোলা হয় সাড়ে ন’টা, পৌনে দশটা নাগাদ। আমার অনারেই কেনা হয়েছিল, দামি সিঙ্গল মল্ট। দেবলীনা আর জয়দীপ একটু বেশিই তাড়াতাড়ি খাচ্ছিল। ঋজু সময় নিয়ে এনজয় করছিল, আর আমারও এই ফ্লেভারটা নতুন দেখে একটু সময় লাগছিল। লাভের মধ্যে সারাদিন ঘোরাঘুরি, পেটভরতি খাবার আর ফাইনালি ঘনঘন দু’তিন পেগ হুইস্কি। সাড়ে এগারোটা বাজতে না বাজতেই ওরা দু’জন পুরো মরার মতো ঘুমিয়ে পড়ল।”
“দেবলীনা আর জয়দীপ?”
“হ্যাঁ। আমরা বেশ কয়েকবার ডাকাডাকি করে দেখলাম, একদম অসাড় অবস্থা। পরদিন সকালের আগে ঘুম ভাঙার কোনো চান্স নেই। তখন ওদেরকে আর—একটু ঠিকঠাক করে শুইয়ে দিয়ে, একটা পাতলা চাদর চাপা দিয়ে, ঘরের লাইট নিভিয়ে, আমরা অন্য ঘরটায় এসে বসলাম। খানিকক্ষণ গল্প করছিলাম, তারপর ঋজু আমাকে বলল একটা জয়েন্ট বানাতে। আমি একটা কাগজ পেতে নিয়ে বসলাম। ঋজু পাশে একটা চেয়ারে বসে কথা বলে যাচ্ছিল।”
“কী নিয়ে কথা হচ্ছিল?”
“প্রথমদিকে এমনিই এটা—ওটা নিয়ে। তারপর আমার যাওয়া নিয়ে কথা হচ্ছিল। ওখানকার কোর্সওয়ার্ক, কারিক্যুলাম, এইসব। একসময় দেখলাম ও আমার খুব প্রশংসা শুরু করেছে। আমি নাকি বিউটি উইথ ব্রেন, নাকি আমার ব্রেনটাই আমার বিউটি। এটা বুঝতে গেলে সত্যি সেরকম চোখ আর মনের মানুষ দরকার। এমনি লোকে আমাকে যথেষ্ট অ্যাপ্রিশিয়েট করে না। আমি, তখনও মনে আছে, ঘাড় গুঁজে পাতা থেকে বীজ আলাদা করে যাচ্ছি। আমি খেয়ালও করিনি ও কখন চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমার পিছনে দাঁড়িয়েছে। কথা বলতে বলতেই আচমকা আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। আমি এতটাই চমকে উঠি যে আমার হাত থেকে সব কিছু পড়ে যায়, এমনকি কাগজটাও খানিক উলটে সবকিছু গোটা বিছানাজুড়ে ছড়িয়ে যায়। ততক্ষণে বুঝতে পারি ঋজুর হাত আমার জামার ভিতরে। আমি সম্ভবত দু’হাত দিয়ে সেটা ধরে ছাড়াতে গিয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে বিছানায় পড়ে যাই। সেই সুযোগে ঋজু একদম আমার উপর উঠে বসে। ওর একটা হাঁটু আমার বুক আর পেটের মাঝামাঝি চেপে বসেছিল, দম নিতে পারছিলাম না। ওই অবস্থায় আমাকে ঠেসে ধরে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করে। আমি মুখ সরাতে গিয়ে বিছানায় পড়ে থাকা আমার তামাক কাটার কাঁচিটা দেখতে পাই। কোনো মতে সেটা তুলে আমি ঋজুর থুতনির নীচে গলার কাছে ঠেকাই। ওই খোঁচাতে চমকে গিয়ে ওর হাতের মুঠো একটু আলগা হয়। আমি সেই সুযোগে ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বিছানা থেকে প্রায় লাফ দিয়ে উঠি।”
“ঋজু তারপর আর কিছু করেনি?”
“না, ও খুবই নিরুত্তাপ ছিল। আমাকে বলল, এত ভায়োলেন্ট হওয়ার কী আছে? বললেই হত, আমি ইন্টারেস্টেড নই। আমি ওই ঘর থেকে বেরিয়ে অন্য ঘরে দেবী আর জয়দীপের মাঝখানে ঢুকে শুয়ে পড়ি। ঋজু রাতে অন্য ঘরটাতেই ছিল।”
“পরদিন কী হল? তুমি কাউকে জানিয়েছিলে?”
“নাহ, সবাই জিজ্ঞাসা করল কী হয়েছে, কিন্তু আমি বলে উঠতে পারলাম না। ওরা বন্ধু ঠিকই, কিন্তু দেবলীনা ঋজুর এতদিনের স্টেডি বান্ধবী। আর জয়দীপের নানারকম সমস্যা আছে, আগেই বলেছি। ও উলটে আমাকে দোষারোপ করত যে আমার কী দরকার ঋজুর সঙ্গে একঘরে বসে মদ—গাঁজা খাওয়ার। বিশেষ করে যেখানে আগেও এরকম ঘটেছে।”
“আগে ঘটেছে মানে? ঋজু আগেও মলেস্ট করেছে?”
“হ্যাঁ, বছর পাঁচেক আগে। কোভিডের আগ দিয়ে। ওটা অ্যাকচুয়ালি ছিল আমার কলেজে চাকরি পাওয়ার পার্টি। আমার বাড়ি ফাঁকা ছিল। সব মিলিয়ে জনা দশেক লোক। তখন বয়স আরও কম, ফলে আয়োজনটাও আর—একটু বেপরোয়া। সেবার আমিও খুবই মাতাল অবস্থায় ছিলাম। তখনও রাতে ঋজু আমার সঙ্গে এই এক অসভ্যতা শুরু করেছিল। থ্যাংকফুলি নিজেও এতটা মাতাল ছিল যে মাঝপথেই ঢলে ঘুমিয়ে পড়ে। আমি সকালে যখন চেপে ধরি, ও গোটাটা অস্বীকার করে মাতলামোর অজুহাত দিয়ে। বলে যে আগের রাতের কিছুই ওর মনে নেই।”
“বুঝেছি। কিন্তু কাউকে না বললেও তোমার পক্ষে তো আর স্বাভাবিক আচরণ করা সম্ভব ছিল না।”
“অবভিয়াসলি না। লাকিলি পরদিন গাড়ি নিয়ে সারাদিন সাইটসিয়িংয়ের প্ল্যান ছিল আমাদের। আমি আগাগোড়া সামনের সিটে বসেছিলাম, আর সব জায়গায় নেমে নিজের মতো ছবি তুলে সময় কাটাচ্ছিলাম। দেবলীনা ডেফিনিটলি বুঝেছিল সামথিং রং, কিন্তু একবারও জানতে চায়নি। হয়তো উত্তরটা জানে, কিন্তু শুনতে চায় না। সেদিন রাতে ফিরে গিয়ে আমি শরীর খারাপের কথা বলে সবার আগে আলাদা ঘরে শুতে চলে যাই। তার পরের দিন একদম সকাল সকাল চেকআউট করে কোলাখাম। এখানে আসার পথে আমি ঠিক করি একটা গুছিয়ে চিঠি লিখে ওকে ক্ষমা চাইতে বলব। এটার একটা ক্লোজার না হলে আমার পক্ষে লাইফের নেক্সট চ্যাপ্টারটা শুরু করা খুব মুশকিল। এখানে এসেও প্রথম দিনটা হইহুল্লোড়, ছাঙ্গে ফল্স, এসব করে কেটে যায়। কৃতিকার সঙ্গে আলাপ হয়, ওর সঙ্গে আমি কিছুটা সময় কাটাই। মাথাটা আর—একটু পরিষ্কার হয়। পরদিন, মানে যেদিন আপনি এসে পৌঁছোলেন, আমি দুপুর বেলা চিঠিটা লিখতে বসি। লিখতে বসে বুঝি, ব্যাপারটা আমার পক্ষে সহজ নয়। তিন ঘণ্টার চেষ্টায় চার—পাঁচ লাইন লিখে, গোটা সন্ধেটা পকেটে নিয়ে বসে থাকি। ফাইনালি সিদ্ধান্ত নিই যে ঋজুকে ক্ষমা চাওয়ার চান্স দেওয়ারও কোনো মানে নেই। ওর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। তখন অনেক রাত। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি। চিঠিটা ঘরের ডাস্টবিনে ফেললে সেটা অন্য কারওর চোখে পড়তেই পারে। তারপর আবার যে কথাবার্তা, প্রশ্ন ইত্যাদি উঠবে, সেগুলোর জন্য আমি একদম রেডি নই। ফলে বাইরে বেরিয়ে টবের পাশের বড়ো বিনটায় ফেলে দিয়ে আসি। ধরে নিয়েছিলাম ব্যাপারটা চুকে গেল। পরদিন থেকে যে সমস্যা দশগুণ হয়ে ফিরে আসবে সে তো কল্পনাও করেনি।”
কিছুক্ষণের জন্য দু’জনের কেউই কথা বলল না। পকোড়ার বাক্সটা খালি হয়ে গেছে। ফারুক ঘড়ি দেখল। সাতটা কুড়ি। এবার আস্তে আস্তে উঠতে হবে। সে বাক্স থেকে নিজের রুমালটা তুলে হাত—মুখ মুছে, সেটা পকেটে রাখল। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে, কয়েকটা টান দিয়ে আবার ঐশানীর দিকে ফিরল।
“দেখ, এই গোটাটা তোমাকে কিন্তু পুলিশের সামনে অফিশিয়াল স্টেটমেন্ট হিসাবে বলতে হবে। কারণ অরিজিনাল চিঠিটা কিন্তু লাভা থানার জিম্মায়।”
“বলব। তাতে আমার কোনো লাভ—লোকসান কিছুই হবে না। ঋজুর যে শাস্তিটা পাওনা ছিল, সেটা ঠিকই কাটিয়ে দিল। আচ্ছা, চিঠিটা যে আমারই লেখা সেটা বুঝলেন কীকরে? আমাকে দেখতে পেয়েছিলেন?”
“পেয়েছিলাম, কিন্তু চিনতে পারিনি। তাহলে কী আর এতদিন ওয়েট করে থাকতাম? এখানে চেক ইন রেজিস্টারে তোমার হাতের লেখা ছিল। একটা অন্য কারণে ঘাঁটতে গিয়ে চোখে পড়ে গেল। আচ্ছা একটা অন্য প্রশ্ন করি। হয়তো অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু তাও। যেহেতু এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সবার ব্যাপারেই পুলিশ খোঁজ খবর নিচ্ছে, সেখান থেকে জানা গেল যে তোমার পরিবার খুবই ঘন ঘন বাড়ি বদলায়। এর পিছনে কারণ কী? আমরা চেক করে দেখেছি, তোমার বাবার চাকরি তো একই আছে, এমনকি অফিসও একই জায়গায়। তাহলে?”
আবার একটুক্ষণ চুপ। তারপর গলা একদম নামিয়ে ঐশানী প্রায় ফিসফিস করে কথা বলল।
“আচ্ছা, যদি এই ইনভেস্টিগেশনের সঙ্গে কোনো কানেকশন না থাকে, তাহলে এই ব্যাপারটা আপনি গোপন রাখবেন? এটা আমার মাকে নিয়ে।”
“অবশ্যই রাখব। এমনকি ইনভেস্টিগেশনের সব কথাও পাবলিক করা হয় না। কী হয়েছে তোমার মায়ের?”
“আমার মায়ের চুরির স্বভাব আছে। একদম টেক্সটবুক ক্লেপ্টোম্যানিয়াক। চিকিৎসার চেষ্টা হয়েছে, ফল হয়নি। আমি যখন খুব ছোটো, তখন দু’বার দুটো আলাদা পাড়ায় ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে আমাদের খুবই অপমানিত হতে হয়েছিল। তারপর থেকে আমাদের এই বিচিত্র রুটিনে জীবন চলছে। আমরা এক পাড়ায় বাড়ি ভাড়া নিই। সেখানে আস্তে আস্তে চেনাজানা হয়, প্রতিবেশীদের বাড়ি যাতায়াত শুরু হয় এবং মাও এর—ওর বাড়ি থেকে এটা—ওটা তুলে নিয়ে চলে আসে। গোটাটা নজরে আসতে এবং মায়ের উপর সন্দেহ হতে প্রায় বছর তিনেক লাগে। তখন আমরা আবার কলকাতার অন্য প্রান্তে নতুন ঠিকানায় শিফ্ট করে যাই। আমার স্কটল্যান্ড যাওয়াটা আসলে অনেক কিছু থেকে আমার মুক্তি। মা—বাবার কী হবে জানি না। এরকম চলতে চলতে একদিন শহরটা ওদের জন্য শেষ হয়ে যাবে।”
ঠান্ডা হাওয়া ঐশানী উঠে চলে যাওয়ার পর, ফারুক আরও কিছুক্ষণ বেঞ্চে বসেছিল। এখন তাপমাত্রার তফাত টের পাওয়া যাচ্ছে। উত্তর দিক থেকে একটা মৃদু হাওয়া আসছে। মনে হচ্ছে গায়ে একটা পাতলা জ্যাকেট জাতীয় কিছু থাকলে ভালো হত। সেইসঙ্গে এক কাপ ভালো চা বা কফি। মাথাটা খেলত আরও ভালো। আপাতত কিছু অঙ্ক মিলল ঠিকই, আবার কিছু হিসাব নতুন করে করতে হবে। ঋজু আর নীলাদ্রির ঘটনা হয়তো সত্যিই পৃথক। তাতে দারুণ অবাক হওয়ারও কিছু নেই। এর থেকেও ঢের অদ্ভুত, ঢের কাকতালীয় ঘটনা দুনিয়ায় ঘটেছে। লিংকন আর কেনেডি নিয়ে আজও সারা পৃথিবীর লোক নানারকম থিয়োরি খাড়া করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
নীলাদ্রি ঋজু ও তার পরিবারের প্রতি অন্যায় করেছিল। ঋজু চেয়েছিল তার আইন মোতাবেক সাজা হোক। কিন্তু এক অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণে নীলাদ্রি সেই সম্ভাব্য শাস্তির হাত থেকে বেঁচে গেল। অন্যদিকে ঋজু অন্যায় করেছে ঐশানীর প্রতি, একাধিকবার। ঐশানীও অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করেছিল আইনি পথেই এগোবে। কিন্তু আগের ঘটনার চব্বিশ ঘণ্টার মাথায় ঋজুরও ভয়ংকর মৃত্যু হল, আর ঘটনাচক্রে সেও তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে গেল। এই তদন্তের সমাধান সূত্র কী এই সাদৃশ্যের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে? এখানে উদ্দেশ্য কী ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা, নাকি কেউ আছে যে আইন ও বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা মেনে নিতে রাজি নয়? নাকি ঋজু আর নীলাদ্রির এখানে উপস্থিতি সমাপতন মাত্র? উদ্দেশ্য, সুযোগ আর প্রমাণের কাঠামো ধরে এগোলেই সমাধান সূত্র মিলবে? ফারুক উঠে দাঁড়িয়ে শরীরটা টানটান করে নিল। আজকে রাতে কেশব কোঠারির সঙ্গে বোঝাপড়া আছে। সেখান থেকে বেশ কিছু নতুন তথ্য উঠে আসার সম্ভাবনা আছে। তারপর বরং প্রধানের সঙ্গে বসে এই প্রশ্নগুলোতে আর—একবার ফিরে যাওয়া যাবে। ফারুকের মন বলছে, খুব শিগগিরই একটা হেস্তনেস্ত হতে চলেছে। অপরাধী ধরা পড়ে যাবে কিনা, সে জানে না। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই মিলবে।
***
আজকে ফারুক ইচ্ছে করেই রাতের খাওয়াটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলল। আটটা দশ নাগাদ গোপাল এসে জানিয়ে গেল ডিনার তৈরি। ফারুকও কালবিলম্ব না করে নীচে নেমে সোয়া আটটার মধ্যে টেবিলে বসে পড়েছিল। এমনিতেও একগাদা পকোড়া খেয়ে খিদে একটু মরেই গেছে, আর তাছাড়া আজকে রাতে ঘটনা কোনদিকে এবং কত দেরি অবধি গড়ায় তারও কোনো ঠিক নেই। ফলে অল্প কিছু খেয়ে নেওয়াই ভালো। এতটা আগে আগে খেয়ে নেওয়ার আর—একটাও কারণ আছে। এই ক’দিনে সে দেখেছে বাকি সবাই ন’টা নাগাদ খায়। ফলে এইবেলা খেয়ে উঠে গেলে বাকিদের সঙ্গে দেখা—সাক্ষাতের সম্ভাবনা কম, প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
খেতে আসার আগে রোকসানাকে ফোন করে জিতুর গাড়ির ব্যাপারটা জানিয়ে দিয়েছে। ফারুক নিজে কিছু বলার আগে রোকসানাই তাকে স্টেশন অবধি আসতে বারণ করে দিল। বলল, ওই পথেই যখন যাওয়া হবে, অযথা এত হাঙ্গামা করে সাতসকালে উঠে আর নীচে নামতে হবে না। এটা নিয়ে ফারুকের মনে একটু খুঁতখুঁতানি রয়ে গেছে। তার নিজে থেকে স্টেশনে যাওয়ার কথাটা মাথাতেও আসেনি; এটা কী স্বার্থপরতা, নাকি অতিরিক্ত যুক্তিসম্মত আচরণ? দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে একটা দৈনন্দিনের রুটিন নিয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু ফারুক কি সেটাকে অজুহাতের মতো ব্যবহার করে?
ফারুক যখন খেয়ে উঠে হাত ধোয়াও সেরে ফেলেছে, তখন দত্ত পরিবারের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। কপাল ভালো যে দত্তবাবু নিজে হাত ধুতে চলে গেলেন, তাই তার প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি। বাসবী জানতে চাইলেন তার পায়ের কী অবস্থা; বিকেলের পর ঘটনা এমন মোড় নিয়েছে যে ফারুকের পায়ের সমস্যার কথা সে নিজেই ভুলে গেছিল। এখন একটা ভদ্রতাসুলভ হাসি হেসে জানাল যে ঠিকই আছে। ডাইনিং হলে ঢোকার আগে কৃতিকা ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিল। আবারও সুবোধ বালকের মতো মাথা নেড়ে আর—একটু এগিয়ে খোলা জায়গাটায় এসে দাঁড়িয়ে ফারুক সিগারেট ধরাতে গিয়ে বুঝল প্যাকেটটা নিয়ে নামা হয়নি।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফারুক ফুলের টবগুলোর পাশে বেঞ্চটায় গিয়ে বসল। পাথর দিয়ে ঘিরে দেওয়ায় ছোটো বাগানটা দেখতে আরও ভালো লাগছে। মাথার উপরে আকাশ আজকে পরিষ্কার, অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করছে। তার ছোটোবেলায় শেখা তারামণ্ডলগুলো চেনার চেষ্টা করল ফারুক। নাহ, তার দৌড় এখন ওই সপ্তর্ষি আর কালপুরুষ অবধি। অথচ ছোটোবেলায় গ্রামের মাঠেঘাটে একবার চোখ তুলেই সে তর্জনি দিয়ে রাতের আকাশের গায়ে সবকটা এঁকে ফেলতে পারত। এইসব সে আস্তে আস্তে ভুলেছে, গোয়েন্দা হিসাবে নতুন দক্ষতা অর্জন করার জন্য। অন্য কারওর চোখে ধরা পড়ে না এমন জিনিস সে অনায়াসে দেখতে পায়, শনাক্ত করতে পারে; কিন্তু যুগ যুগ ধরে মানুষের যে সহজাত প্রাকৃতিক জ্ঞান অর্জন, সেসব কিছুই তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই। কথাটা ভেবেই ফারুকের মনে হল আবার সে একটা অজুহাত খাড়া করছে। তার গোটা অস্তিত্ব সে বেঁধে ফেলছে নিজের পুলিশি গোয়েন্দা সত্তার ভিতর। কিন্তু এর বাইরেও সে নিশ্চয়ই আরও অনেক কিছু; সে গ্রামের ছেলে, সে রোকসানার জীবনসঙ্গী। এগুলোকে উপেক্ষা করে বারবার সে একটা পরিচয়ের দিকে ফিরে যায়; সেটা কি দৈবাৎ? নাকি এর মধ্যে কোথাও তার সচেতন অভিপ্ৰায়ও আছে? সিগারেট ধরানোর ইচ্ছেটা সে যত সহজে উপেক্ষা করবে ভেবেছিল, তত সহজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। ফারুক উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত কিছু একটা ভেবে সটান ডানদিকে হেঁটে গিয়ে এক নম্বর ঘরের দরজায় টোকা দিল। ভিতরে আলো জ্বলছে, স্পষ্টতই কেউ না কেউ আছে; গলার আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছে। দরজা খুলল জয়দীপ। ফারুককে দেখতে পেয়ে কিঞ্চিৎ অবাকই হল মনে হয়।
“সরি, বিরক্ত করলাম। একটা ফেভার চাইতে এসেছি।”
“না না, বিরক্ত করার কী আছে? বলুন না!” ঐশানী একটা চাদরের নীচে পা ঢুকিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে বসেছিল। এবার সে একটু সোজা হয়ে বসেছে। ঘণ্টা খানেক আগে হয়ে যাওয়া তাদের মধ্যে যে কথোপকথন, তার চোখেমুখে কোথাও সেসবের কোনো চিহ্ন নেই।
“আমি আসলে খেয়ে উঠে আবিষ্কার করলাম যে আমার সিগারেটের প্যাকেটটা ঘরে ফেলে এসেছি। তোমাদের কারওর কাছে এক পিস পাওয়া যাবে? তাহলে আর—একটু নীচে পায়চারি করে একবারে উঠতাম।”
“আরে এটার জন্য এত কিন্তু কিন্তু করছেন কেন? অফকোর্স পাওয়া যাবে। গোল্ডফ্লেক চলবে তো? লাইট কিছু দরকার হলে এক মিনিট দাঁড়ান। দেবলীনার কাছে থাকবে। ও একটু বাথরুমে গেছে।”
“না না, লাইটের দরকার নেই। গোল্ডফ্লেকটাই আমার ব্র্যান্ড।”
ঐশানী বিছানার উপরেই একটু হামাগুড়ি দিয়ে পাশের বেডসাইড টেবিলে নিজের প্যাকেট থেকে একটা বড়ো গোল্ডফ্লেক বের করে ফারুককে দিল। জয়দীপ ততক্ষণে আবার নিজের ফোনের দিকে মনোনিবেশ করেছে। সেখানে আন্তর্জাতিক একটি টেনিস খেলা চলছে।
“ফ্রেঞ্চ ওপেন?” মেয়ের কল্যাণে টেনিস সম্পর্কে ফারুক একটু খোঁজখবর রাখে।
“হ্যাঁ, সেমিফাইনাল। আপনি টেনিস ফলো করেন?”
“আমার মেয়ে করে। ওই কালো চুল ছেলেটি আলকারাজ তো?”
“হ্যাঁ, আমার ধারণা ওই জিতবে। এখন যদিও দু’জনেরই একটা করে সেট।” এর মধ্যে দেবলীনাও বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে। ফারুককে দেখে অল্প হাসল।
“ভিতর থেকে কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিল আপনারই গলা। কিছু কি জানা গেল?” ঠিক এই প্রশ্নটাই ফারুকের যে—কোনো সামাজিক পরিস্থিতি থেকে বিদায় নেওয়ার সংকেত। সে দেবলীনাকে ঘাড় নেড়ে না বলে বাকিদের থেকে বিদায় নিল।
“থ্যাংক ইউ। এবং আবারও ডিস্টার্ব করার জন্য দুঃখিত।”
“আরে ডিস্টার্বের কী আছে? আমরাও এবার খেতেই যাব।”
“ওহ, এতটা আগে? তোমরা আর—একটু দেরিতে খাও না?”
“হ্যাঁ, কিন্তু আজ একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ার প্ল্যান আছে। যেহেতু আপাতত এখানেই থাকছি, তাই ঠিক করেছি কাল একদম ভোরবেলায় উঠে একটু জঙ্গলে যাব। ওই সময় শুনেছি রেয়ার বার্ড সাইটিং হয়। আজ কথা বলে গাইডও ঠিক করেছি। দেখা যাক কপালে কী থাকে!”
ঐশানীদের ঘর থেকে বেরিয়ে ফারুক হাঁটতে হাঁটতে কটেজের দিকটায় চলে এসেছে। এবার সে আয়েশ করে সিগারেটটা ধরাল। হোমস্টের ঘরগুলোর থেকে এই জায়গাটার দূরত্ব মাত্র কয়েক পা, কিন্তু কোনো একটা কারণে এর মধ্যেই আওয়াজ অনেক কমে এসেছে। হয়তো কটেজগুলো এখানে তৈরি করার পিছনে এটাও একটা কারণ হয়ে থাকতে পারে। আপাতত কানে মৃদু ঝিঁঝি পোকার ডাকটাই জোরে আসছে। সোজা তাকালে ডাইনিং হলের জানালা দিয়ে ভিতরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, কিন্তু গলার আওয়াজ বা অন্যান্য শব্দ নেই বললেই চলে। নেহাত জানালার ফ্রেমটা চওড়ার থেকে লম্বা বেশি, নাহলে নির্বাক যুগের সিনেমা মনে হত।
ফারুক যখন নিজের ঘরে ঢুকে ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ল, তখন ন’টাও বাজেনি। প্রধানের ফোন কখন আসবে কে জানে। দশ মিনিটের মধ্যে তৃতীয়বার ফোনটা হাতে নেওয়ায় তার নিজেরই মনে হল যে ছেলেমানুষি করছে, সদ্য প্রেমে পড়া বাচ্চা ছেলেদের মতো। সে ইচ্ছে করেই ফোনটা হাতের নাগালের বাইরে টেবিলের উপর রেখে, বিছানায় পা তুলে বসল। সন্ধ্যাবেলায় ঐশানীর সঙ্গে কথা বলার পর থেকে ঋজুর মৃত্যুর ব্যাপারটা নতুন করে ভাবাচ্ছে। আপাতত যতক্ষণ না বয়ানে কোনো অসংগতি ধরা পড়ছে, ঐশানীর চিঠির ব্যাপারটা একটা আলাদা ঘটনা ধরেই এগোতে হবে। আসলে ক্ষতস্থানের ধরনটার উপর ভিত্তি করে আততায়ীর কথা ভাবলে, ঐশানীর কথাই সবার আগে মনে আসে। তবে তার ঊর্ধ্বেও থেকে যায় আরও জরুরি প্রশ্ন— কেন এবং কীভাবে।
বিপুল প্রধানের ফোন এল প্রায় দশটার সময়।
দু’মিনিট পর নিজের ঘরে তালা লাগিয়ে ফারুক যখন বাইরে বেরোল, চারিদিক বেশ নিঝুম। এতদিন এখানে এই নিস্তব্ধতার বদলে একটা অবিরাম বৃষ্টির শব্দ পাওয়া গেলেও, গাঢ় মেঘের কারণে চোখে ঠুলি পড়ানোর মতো অন্ধকার ছেয়ে থাকত। আজ আলোর হদিশ আছে। সামনে তাকালে সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ না হলেও, আকাশের গায়ে পাহাড়ের অবয়ব বা নীচে লোকবসতির উপস্থিতি ভালোই বোঝা যাচ্ছে।
হোমস্টে থেকে নেমে মেন রোড ধরে সে বাঁদিকে হাঁটছে। ঘটনাচক্রে তার গন্তব্য সেই নালার ধারের পাথরের বেঞ্চ। প্রধান ওখানেই গাড়ি দাঁড় করিয়েছে। ওখানেই নিরিবিলিতে প্রাথমিক কথাবার্তা সেরে দু’জনে একসঙ্গে যাবে কেশবের মুখোমুখি হতে।
দিনের বেলার তুলনায় তাপমাত্রা কমলেও এখন খুব একটা ঠান্ডা নেই। ফারুক নিজের শরীরে যে শিহরণ অনুভব করছে তা হয়তো আবহাওয়ার কারণে নয়। অনেক, অনেকদিন পর সে আবার রাস্তায় নেমেছে। কালিম্পঙের এক কোনায় পড়ে থাকা এই অচেনা গ্রামের রাস্তাও আসলে তার অতি পরিচিত রাস্তা। এরকম অনেক রাস্তা ধরে এক সময় সে মাইলের পর মাইল হেঁটে গেছে, এরকম অনেক রাত সেইসবের সাক্ষী। আপাতত বাঁদিকের রাস্তা ধরে আবারও সে সন্ধেবেলার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সময়ের হিসাবে আরও অনেক লম্বা এক রাস্তা তাকে পিছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
ছোটো ছোটো পা ফেলে ফারুক অতি সন্তর্পণে এগোচ্ছে। নির্দিষ্ট দূরত্বে বসানো সোডিয়াম ল্যাম্পের হলদে ফ্যাকাশে আলোয় আশপাশটা আলোকিত হওয়ার থেকে বরং অন্ধকারই হয়ে আছে। ফারুকের দু’পাশে দিগন্তজুড়ে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে বিরাট বিরাট গুদামঘর আর মালবাহী ট্রাক, তাদের মাঝে এক ফালি রাস্তা। তার সঙ্গীসাথিরাও আছে, কিন্তু তারা ছায়ার সঙ্গে মিশে। পকেটে গোঁজা আর কলারে লাগানো যন্ত্রের সাহায্যে কথোপকথন সম্ভব, কিন্তু নিতান্ত প্রয়োজন না পড়লে সেসব ব্যবহারের হুকুম নেই।
ঘটনার সূত্রপাত হয় মাসখানেক আগে যখন কলকাতা পুলিশের তরফে একটি জাল টাকা সংক্রান্ত কেসের ফাইল ফারুকের টেবিলে এসে পৌঁছোয়। সে তার উপর হামলার আঘাত, অপারেশন, পরীক্ষা—নিরীক্ষা ইত্যাদি কাটিয়ে দুমাসের উপর হল আবার কাজে যোগ দিয়েছে। তার কর্মক্ষমতা বা দক্ষতা আগের মতোই আছে। শুধু ছোটো—বড়ো একাধিক সহকর্মীর অনুরোধ উপেক্ষা করে সে কিছুতেই তার আততায়ীর সঙ্গে দেখা করতে যায়নি। বিশাল গুপ্তা এখনও পুলিশ কাস্টডিতেই আছে; তার নামে হাইকোর্টে মামলা শুরু হয়েছে।
জাল নোট কেসের ক্ষেত্রেও ফারুকের দক্ষতার ফল অচিরেই হাতেনাতে পাওয়া গেল। মূলত তার সিদ্ধান্ত ও তৎপরতার কারণেই তদন্তের জাল আর—একটু বিস্তারে ফেলা হয়েছিল। প্রথমে আশেপাশের জেলা, তারপরে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতেও নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া শুরু হল। তাতেই দেখা গেল একই যন্ত্রে ছাপা, একই সিরিজের নোট কলকাতার বাইরে বর্ধমান, বহরমপুর, মালদা, বা মুর্শিদাবাদ জেলায় এবং বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যাচ্ছে। এরপর দু’সপ্তাহের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বোঝা গেল কেঁচো খুঁড়তে একদম পেল্লায় ময়াল সাপ বেরিয়ে পড়েছে। জাল টাকার কারবারিদের পিছনে মূল যে চক্র, তাদের আসল ব্যাবসা নেপাল এবং বাংলাদেশ বর্ডার পার করে শিশু ও নারী পাচার।
এহেন অবস্থায় লালবাজার থেকে মুখ্যমন্ত্রীর অফিস, সবাই বেশ নড়েচড়ে বসল। বাজেট, লোকবল, যন্ত্রপাতি, সবরকম সাহায্যের আশ্বাসও যেমন এল, সেইসঙ্গে ফারুকের দায়িত্বও বহুগুণ বেড়ে গেল। গত পাঁচ দিনে সে সব মিলিয়ে পাঁচ ঘণ্টা ও বাড়িতে কাটিয়ে দিয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। এরই মধ্যে খবর এল এই চক্রের একটা বড়ো অংশ রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য চিৎপুর আর কাশিপুরের মাঝামাঝি পুরানো রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় ঘাঁটি গেড়ে থাকবে। তাদের জিম্মায় বিভিন্ন রাজ্য থেকে অপহৃত বেশ কিছু বাচ্চা মেয়েও থাকার সম্ভাবনা আছে। ভোরের দিকে একাধিক ট্রাক নিয়ে তারা ভিন্ন ভিন্ন রুটে ছড়িয়ে পড়বে।
খবর আসা মাত্র ঝড়ের বেগে প্ল্যান তৈরি হয়েছে। বাছাই করা অফিসারদের নিয়ে একটি বিশেষ সশস্ত্র দলও গঠিত হয়েছে। দলের নেতৃত্বে থাকছে ফারুক। ঠিক রাত বারোটার সময় চিৎপুর রোডের মুখে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বেশ কিছু গাড়ি এসে থামল। সেখান থেকে সব মিলিয়ে প্রায় জনা দশেক সশস্ত্র অফিসার নেমে বাকি পথ হেঁটে যাবে। ফারুকের কানের যন্ত্রে দুটো চ্যানেল খোলা আছে। একটা এখানে উপস্থিত সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার জন্য; অন্য চ্যানেলে হেডকোয়ার্টারে একটি বিশেষ দল তাদের তথ্য সরবরাহ করবে। তারা মূলত শোভাবাজার থেকে বরানগর অবধি যত সরকারি—বেসরকারি সিসিটিভি ক্যামেরা আছে, আর সেইসঙ্গে আবহাওয়া দপ্তর, সামরিক বাহিনী এবং টিভি চ্যানেলের স্যাটেলাইট ইমেজ, সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে সরাসরি সেই খবর ফারুকের কানে পৌঁছে দেবে।
আপাতত সেই চ্যানেলে পাওয়া খবর অনুযায়ীই তাদের দলটা একটি নির্দিষ্ট গুদামঘরের দিকে এগোচ্ছে। আর কয়েক পা এগিয়েই রাস্তার ডানদিকে সেটা চোখে পড়ল। ফারুক হাত তুলে সবাইকে থামতে বলে ইশারায় চারপাশটা একবার চক্কর কেটে দেখে নিতে বলল। গোটা দলটা নিঃশব্দে ভাগ হয়ে চারিদিকের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড পরে ফারুকের কানে এল, অল ক্লিয়ার। তার মানে দুষ্কৃতীদের কেউ বাইরে পাহারায় নেই।
এবারে সবাই ঘরটার আরও কাছে ঘনিয়ে এল। চারদিক চক্কর দিয়ে যা বোঝা গেছে, এই মূল দরজা ছাড়াও সব মিলিয়ে আরও ছ’টা দরজা আছে। সেগুলো আপাতত সবকটাই শাটার নামানো। কিন্তু সব দরজায় পাহাড়া বসানোর মতো লোকবল ফারুকের এই মুহূর্তে নেই। সে ইচ্ছে করেই একটা বিরাট দল নিয়ে আসেনি, কারণ তাতে শিকার ফসকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এদিকে সবাই তার মুখের দিকে তাকিয়ে নির্দেশের অপেক্ষা করছে। ফারুক অবশেষে প্রতি দুই দরজা পিছু একজন অফিসার মোতায়েন করে, বাকিদের নিয়ে তৈরি হল মেন গেট ভেঙে ভিতরে ঢোকার জন্য।
এক্সপ্লোসিভ বিষ্ফোরণের একটা বিকট শব্দ এবং ক্ষণিকের জন্য একটা ধোঁয়ার দেয়াল। সেই ধোঁয়া ভেদ করে পুলিশ যখন ভিতরে পা রাখল, তখন চতুর্দিকের বিশৃঙ্খলা এমন আকার ধারণ করেছে যে কিছু ঠাওর করাই মুশকিল। শুধু শব্দের একটা কর্কশ কোলাজ কানে আসছে— মানুষের চিৎকার, পায়ের শব্দ, ধস্তাধস্তি, কাচ ভাঙার শব্দ, আর সবের মধ্যে ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট— বাচ্চাদের অবরুদ্ধ কণ্ঠস্বর। চিৎকার করার মুহূর্তে মুখ চেপে ধরলে যেমনটা হয়। ফারুকের স্নায়ু সজাগ হয়ে উঠল। তাহলে ঠিক জায়গাতেই এসে পড়েছে।
ধোঁয়া একটু কেটেছে; ফলে গুদামঘরের ভিতরটা এখন দেখা যাচ্ছে। আয়তনে অন্তত পনেরো হাজার বর্গ ফুট তো হবেই— একটা ছোটোখাটো পাড়ার মতো। দেয়ালের দিক জুড়ে প্রচুর বড়ো বড়ো লোহার কন্টেনার আর কাঠের বাক্সপ্যাঁটরা ডাঁই করে রাখা আছে। মাঝামাঝি একটা বড়ো জায়গা খালি করে রাখা, আর সেখানেই কয়েকটা চাটাই পেতে দুষ্কৃতিদের দলটা আড্ডা বসিয়েছিল। এই দৌড়াদৌড়ির মধ্যেও সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে জনা দশেক লোক— সবই পুরুষমানুষ। দলে বেশি হলেও ওদের কাছে খুব অত্যাধুনিক অস্ত্র হয়তো নেই, তাই একটু বেকায়দায় পড়েছে। আপাতত তিনজনের কাছে তিনটে পিস্তল আছে, যদিও বোঝা যাচ্ছে সেগুলো অটোমেটিক নয়। তা সম্বল করেই কয়েকজন কন্টেনারের পিছনে গা ঢাকা দিয়েছে। বাকিরা ছড়িয়ে—ছিটিয়ে দেয়াল, থাম বা বাক্সের স্তূপের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে।
ফারুকের ডানে ও বাঁয়ে চার—পাঁচ হাত দূরে দুই সহকর্মী বন্দুক উঁচিয়ে প্রস্তুত। বাঁদিকের অফিসারের সঙ্গে ফারুকের চোখাচোখি হতে, সে দু’বার মাথা নাড়ল। অফিসারটি বন্দুক বিন্দুমাত্র না সরিয়ে গলার আওয়াজ তুলে এক হুংকার ছাড়ল।
“লাস্ট ওয়ার্নিং! প্রত্যেকে অস্ত্র ফেলে দু’হাত মাথার উপর তুলে একদম আস্তে আস্তে বাইরে বেরিয়ে এসো। কোনোরকম কায়দাবাজি কিছু দেখলেই কিন্তু গুলি চালাব। ভিতরে আলোর যা অবস্থা, চোখে ভালো দেখতে না পেলে কিন্তু নিশানা ঠিক জায়গায় নাও লাগতে পারে! আমি দশ অবধি গুনছি। তারপর এমনিই ঘোড়া দৌড়োবে। এক! দুই! তিন!”
আপাতত বিরাট নিস্তব্ধ গুদামঘরে সংখ্যাগুলো যেন দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে এল। পাঁচ গোনার মাথায়, একটা খুট শব্দ শুনে ফারুক ডানদিকে মাথা ঘোরাল। এইদিকের দেয়ালে একটা শাটার ফেলা দরজা। এক দুষ্কৃতি সম্ভবত পিছনে দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে এতক্ষণ গুঁড়ি মেরে বসেছিল। সবার নজর যখন কাউন্টডাউনের দিকে, সেই সুযোগে সে ভিতর থেকে শাটারটা একটু ফাঁক করে ফেলেছে; সেখান দিয়ে শরীরটা একদম গুটিয়ে নিলে হয়তো মাটিতে গড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব। এই লোকটারও অভিপ্রায় সেরকমই।
ফারুক মাথা ঘোরাতেই লোকটার সঙ্গে চোখাচোখি হল। ফারুকের হাতে অটোমেটিক ৯ মিলিমিটার পিস্তল। এই দূরত্বে চালালে লোকটার মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। লোকটাও সেটা আন্দাজ করে একটু বোধহয় থমকে গেছে। ফারুক বন্দুকটা তাক করার জন্য তুলল। লোকটাও ডান হাত বাড়িয়েছে। বন্দুক যখন ফারুকের কোমর ছাড়িয়ে উপরে উঠছে, তখন গুদামঘরের অল্প আলোয় লোকটার ডানহাতে ধরা জিনিসটা চকচক করে উঠল। ধারালো কিছু একটা জিনিস যার ফলাটা ছুঁচলো হয়ে উঠেছে। ইস্পাতের কি? ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ফারুকের কি দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে? নিশ্বাসেরও কেমন যেন অসুবিধা হচ্ছে, সেইসঙ্গে জিভেও একটা তেতো ভাব! কানেও তালা পড়ে গেছে, প্লেন ল্যান্ড করার সময় যেমন হয়। হাতের বন্দুকটা স্থির; উঠছেও না, নামছেও না। লোকটার হাতের জিনিসটা কি ধাতব, নাকি কাচের?
হয়তো সব মিলিয়ে দু—তিন সেকেন্ড। লোকটা এক ঝটকায় হাত এবং শরীর গুটিয়ে নিয়ে শাটারের নীচের ফাঁক দিয়ে গলে অদৃশ্য হয়ে গেল। ফারুকের ডানদিকে যে সহকর্মী উদ্যত পিস্তল হাতে একাগ্রচিত্তে সামনের দিকে ঝুঁকে রয়েছে, সে কিছুই টের পেল না। অকেজো ইন্দ্রিয়র কাছে বন্দি ফারুকের মনে হল শাটারের বাইরে ক্ষণিকের ধাক্কাধাক্কি এবং একটা মৃদু আর্তনাদ। কিন্তু ততক্ষণে ভিতরে দশ অবধি গোনা শেষে একসঙ্গে অন্তত পাঁচটা বন্দুকের গর্জন। ফারুকের কান একটু একটু করে খুলেছে, দৃষ্টিও পরিষ্কার হচ্ছে— শাটারের ফাঁক দিয়েই বোধহয় একটু ঠান্ডা বাতাস ঢুকল।
ফারুকের শরীর নিজের অজান্তেই একবার ঈষৎ কেঁপে উঠল।
বাঁকটা পেরোতেই অন্ধকারের মধ্যেও বিপুল প্রধানের গাড়ি আর তার পাশে দু’তিনটে ছায়ামূর্তি চোখে পড়ল। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দশ সেকেন্ডের মধ্যে সে পৌঁছে গেল। নিঝুম রাত আর মেঘবিহীন আকাশে এক ফালি চাঁদের মৃদু আলোয় পরিবেশ খুবই মনোরম। ফারুকের এখন আর বিশেষ ঠান্ডা লাগছে না।
প্রধান বেঞ্চে বসে একটা কাগজের কাপে কফি খাচ্ছিল। ফারুককে দেখে উঠে দাঁড়াল। একজন কনস্টেবল গাড়ি থেকে একটা ফ্লাস্ক এনে, সেখান থেকে আর—একটা কাগজের কাপে কফি ঢালল। ফারুক মাথা নেড়ে সেটা তার হাত থেকে নিয়ে নিজে বেঞ্চটায় বসে পড়ল।
“লং ডে?” প্রধান প্রশ্ন করল।
“ভেরি লং! লিটারেলি। এখনও শেষ হচ্ছে না।”
“কলকাতা থেকে কোনো আপডেট পেলেন?”
“তা তো পেলামই। তারপর এখান থেকেও সন্ধ্যাবেলা অনেক কিছু জানলাম। দেখা হওয়ার কথাই আছে, তাই আর আলাদা করে ফোন করিনি।”
“নীলাদ্রি চক্রবর্তীর ব্যাপারে আর কিছু জানা গেল?” প্রধান আবার বেঞ্চে ফারুকের পাশের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে।
“নীলাদ্রি প্লাস অন্য খবর। সব বলছি। তারপর আপনারগুলোও শুনতে হবে।”
ফারুক যথাসম্ভব গুছিয়ে সব কথা এক এক করে প্রধানকে জানাল। নীলাদ্রির বাবার ডাক্তারি জীবনের উন্নতি, তার ব্যক্তিগত জীবনের অবনতি এবং অবশেষে একটি উজ্জ্বল বর্ণময় জীবনের ধূসর, মলিন সমাপ্তির কথা। তারপর বর্তমান প্রসঙ্গে নীলাদ্রির গ্যাংটক আসার কারণ যা কিনা আখেরে তার হাসপাতালের ব্যাবসাবৃদ্ধির উদ্দেশ্য। এটা শুনে প্রধান খানিক নড়েচড়ে বসল। তারপর খোদ হাসপাতালের মালিকের শাসানির কথা শুনে তো লাফিয়ে উঠল।
“কী নাম বললেন?”
“দামোদর সিংঘানিয়া। এই মুহূর্তে কলকাতার একদম প্রথম সারির শিল্পপতিদের একজন। আপনার সঙ্গে কি অন্য কোনো কানেকশন আছে নাকি?”
“একদম ডিরেক্ট! আপনি শেষ করে নিন, তারপর বলছি। দিস ইজ গেটিং রিয়েলি ইন্টারেস্টিং!”
ফারুক নীলাদ্রির প্রসঙ্গে ইতি টেনে এবার ঐশানীর ব্যাপারে বলতে শুরু করল। প্রধান এই ব্যাপারগুলোর মধ্যে বেশ কিছুটা জানলেও, রাতে নীলাদ্রির কটেজের পাশ দিয়ে আসার সময় শুনে ফেলা কথার ব্যাপারটা জানত না। ফারুক কেন তাকে এই বিষয়ে কিছু বলেনি, সেই নিয়ে তার মনে প্রশ্ন বা অভিযোগ থাকলেও সে মুখে কিছু প্রকাশ করল না। ঐশানীর পরিবারের ঘন ঘন ঠিকানা বদল এবং সেটা খোঁজ করতে গিয়ে রেজিস্টার থেকে চিঠির হাতের লেখা মিলে যাওয়ার কথা শুনে প্রধান একটা শিস দেওয়ার মতো শব্দ করে উঠল।
“ইশ! হাতের সামনেই সারাক্ষণ পড়েছিল কিন্তু ওটা চেক করার কথা একবারও মাথায় আসেনি।”
“এটা কিন্তু হতেই পারে। আমরা তো এখনও শিওর হয়ে উঠতে পারছিলাম না যে মৃত্যুগুলোর সঙ্গে চিঠিটার আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কিনা। এবং সত্যিই তো দেখা গেল নেই। মানে অন্তত সরাসরি নেই। অবশ্য যদি না মনে করেন যে ঐশানী মিথ্যে কথা বলছে।”
“নাহ, যতক্ষণ না অন্য কিছু জানতে পারছি, এটাকে মিথ্যে বয়ান মনে করার তো কোনো কারণ নেই। তবে ঐশানীকে সন্দেহ তালিকা থেকে বাদ দিলে, আমাদের ছোটো হাইটের আততায়ীর থিয়োরিটা বোধহয় আর দাঁড়াবে না। ওই অদ্ভুত ফ্যাটাল উন্ড কীকরে হল, সেটার একটা সুরাহা করতে হবে।”
“উইন সাম, লুজ সাম। এবার আপনি বলুন। সারাদিন অনেক কৌতূহল চেপে রেখেছি।”
“প্রথমটা একদম লাকি ব্রেক! আমি বিভিন্ন কনট্যাক্ট মারফত কেশব কোঠারির ব্যাপারে খোঁজ খবর করছিলাম। ইন ফ্যাক্ট সবার ব্যাপারেই করছিলাম, টু বি অনেস্ট।”
“সে তো স্বাভাবিক।”
“ও যেহেতু বলেছে সেদিন সকালে ডেলো থেকে এসেছিল, আমি ডেলোতে খোঁজখবর করি। ইন্সিডেন্টালি একজন ড্রাইভার কেশবকে আইডেন্টিফাই করে। কিন্তু সে বলে যে কয়েকদিন আগে এই লোককে সে বাগডোগরা থেকে গরুবাথান নিয়ে এসেছিল। এদিকে নীলাদ্রি তো এখানে আসার আগে ওখানকার এক টি এস্টেটে ফ্যামিলি নিয়ে ছুটি কাটাচ্ছিল। আমার সন্দেহ হয়। আমি এয়ারলাইন্সে কনট্যাক্ট করি— দ্য ব্লাডি লায়ার! ও নীলাদ্রির ফ্যামিলির সঙ্গে এক ফ্লাইটে কলকাতা থেকে এসেছে!”
“সে কী! এ তো প্রায় ইমপস্টার!”
“সেরকমই। নামটাই খালি ঠিক বলেছে। বাকি অলমোস্ট সবকিছুতে জল মেশানো। চলুন বাকিটা ওদিকে যেতে যেতে আপনাকে ছোটো করে বলি। রাত অনেকটাই হল। হোমস্টের কী সিচুয়েশন?”
“আমি যখন বেরোলাম, তখনই প্রায় সবাই ঘরে দরজা দিয়ে দিয়েছে। ফলে আমাদের প্ল্যান ঠিকই আছে।”
অল্প পথ দু’জনে খুবই ধীর পায়ে হেঁটে এল। ঘরের ভিতর মানুষজন, রাস্তায় কুকুর, সবাই কমবেশি ঘুমে আচ্ছন্ন। এখনও বাঁদিকে তাকালে পাহাড়ের গায়ে তুলি ছিটিয়ে জলরং ফেলার মতো টুকরো টুকরো আলো ছড়িয়ে—ছিটিয়ে পড়ে আছে। ফারুকের এক কানে পাহাড়ি রাতের নিস্তব্ধতা, অন্য কানে প্রধানের পাহাড়ি টানের ইংরেজিতে তার সারাদিনের তদন্তের ফলাফল। আপাতভাবে সুরের ঠোকাঠুকি মনে হলেও ফারুকের অভিজ্ঞতায় ব্যাপারটা হারমোনির মতোই শ্রুতিমধুর। হোমস্টের একদম মুখে এসে দু’জনে দাঁড়িয়ে পড়ল। সেখানে ফারুক বাকি অংশটুকু শুনে, আন্তরিকভাবে প্রধানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
“আমি সত্যিই ইমপ্রেসড! আপনি আজ সারাদিন দারুণ কাজ করেছেন। ব্রিলিয়ান্ট জব!”
হ্যান্ডশেক করার সময় প্রধানের লালচে গাল আরও লাল হয়ে উঠল কিনা সেটা অন্ধকারে ভালো করে বোঝা গেল না।
***
কেশবের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে প্রধান তিনবার ঠকঠক করল। আওয়াজ খুব জোরে নয়, কিন্তু প্রত্যেকটা টোকায় একটা পেশাদারিত্ব আছে, যেটা কীভাবে যেন পুলিশে চাকরি করলে অচিরেই রপ্ত হয়ে যায়। অন্য কোনো পেশার লোক ডাক্তার, উকিল, ক্যুরিয়ার সার্ভিস, কেউই ঠিক এভাবে দরজা নক করতে পারে না। প্রায় দশ সেকেন্ড কেটে যাওয়ার পর কেশবের গলা পাওয়া গেল।
“কৌন হ্যায়?”
“পুলিশ। খুলুন।” প্রধানের গলার আওয়াজেও সেই এক পেশাদারিত্বের ছাপ। খুট করে একটা ছিটকানি খোলার শব্দ আর তারপর দরজা ফাঁক হল। ঘরের ভিতর একটা টিমটিমে আলো জ্বলছে। মৃদু পাওয়ারের একটা এলইডি নাইট ল্যাম্প টেবিলের উপর রাখা। এটা বোধহয় ব্যক্তিগত সম্পত্তি, হোমস্টের নয়। আয়তনে একটা বিয়ারের ক্যানের মতো হবে, ফলে যেকোনো ব্যাগে নিয়েই ঘুরে বেড়ানো সম্ভব। কেশব বোধহয় শুয়ে পড়ার তোড়জোড় করছিল। তার পরনে একটা নামাবলির মতো গেরুয়া রঙের নাইটস্যুট, তাতে আগাগোড়া ময়ূরের পালক আর বাঁশির ডিজাইন করা। আপাতত সে দু’জনকে দেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। আলোটা পিছনে থাকায় তার মুখের অভিব্যক্তি বোঝা যাচ্ছে না।
“ভিতরে বসি? কিছু কথা আছে।” প্রধান নিজেই নিজেকে আমন্ত্রণ জানিয়ে কেশবকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে গেল। ফারুকও বারান্দা থেকে শেষ একবার এদিকওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে, প্রধানকে অনুসরণ করল।
কেশব তখনও দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে। ঘরের ভিতর থেকে নিভু নিভু আলোতেও তার হতভম্ব মুখটা দেখা যাচ্ছে। প্রধান ফারুকের দিকে চেয়ারটা এগিয়ে দিচ্ছিল। ফারুক হাত তুলে না করে টেবলের পাশে দেয়ালে আলতো হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
“আরে, মিস্টার কোঠারি! দরজাটা বন্ধ করে এসে বসুন। এভাবে কথা হয় নাকি?” প্রধান নিজে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে।
পুলিশের কথায় কাজ হল। কলের পুতুলের মতো দরজা বন্ধ করে ঘরের ভিতর এসে বসেই আবার উঠে দাঁড়িয়ে টেবিল থেকে জলের বোতলটা নিতে গেল। কিন্তু প্রধানের চেয়ারটা মাঝে থাকায় কেশব যেন ভেবে উঠতে পারছে না তার কী করা উচিত। ফারুক বোতলটা নিয়ে তার দিকে এগিয়ে দিতে, সে কৃতজ্ঞতাভরে সেটা নিয়ে সেখান থেকে এক নিশ্বাসে প্রায় আধ লিটার জল খেয়ে ফেলল। তারপর বোতল নামিয়ে রেখে ফারুকের দিকে তাকিয়ে বলল, “থ্যাংক ইউ!” এবার প্রধানের দিকে ফিরে বলল, “কী ব্যাপার বলুন তো? এত রাতে! কোনো এমার্জেন্সি কিছু?”
“সেরকমই বলতে পারেন। আসলে মার্ডার ইনভেস্টিগেশন তো, পিনাল কোডের প্রায় টপ প্রায়োরিটি। তাই এইসব ক্ষেত্রে সবকিছুই এমার্জেন্সি।”
“ট্রু ট্রু, ভেরি ট্রু। তা আমি কী করতে পারি?” কেশব এখনও আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার।
“কিছু সিম্পল ব্যাপার। আবার সিম্পল নাও হতে পারে। সেটা ডিপেন্ড করবে আপনার উত্তরের উপর। কয়েকটা ইনফরমেশন একটু আপনার কাছ থেকে কনফার্ম করার ছিল। তাহলে আজকে রাতের মধ্যেই এগুলোর রিপোর্ট ফাইল করে দেব। চিন্তা নেই, বেশি সময় নেব না, আপনার ঘুম নষ্ট হবে না। আশা করি।”
“শিওর শিওর। বলুন কী ইনফো।”
“আপনার সঙ্গে লাভায় যখন ডঃ চক্রবর্তীর দেখা হল, আপনি কোলাখামে থাকার কথা সাজেস্ট করলেন। তখন আপনি ভেবেছিলেন যে একটা রিসর্টের ব্যাপারে এখানে ফরেস্ট অথরিটির সঙ্গে মিটিং করবেন। এই মিটিং কী নিয়ে হওয়ার কথা ছিল?”
“মিটিং? ওই একদম বেসিক কথাবার্তা। লিজ নেওয়ার টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস, কোন এরিয়া প্রেফারেবল হবে, খরচ আর প্রফিটের হিসাব কেমন হবে, এইসব একটু জেনে নিলে, তারপর একদম ফুল প্রেজেনটেশন বানিয়ে কাজ ফাইনাল করে নেব। কিন্তু প্রথমে এই মিটিং তো লাগবে।”
“ঠিকই। আপনি পাকা ব্যবসায়ী, তায় বুঝদার লোক। তাহলে যেই মিটিংটা অলরেডি ফেব্রুয়ারিতে করে ফেলেছেন এবং ফরেস্ট থেকে আপনাকে রিফিউজ করা হয়েছে, সেটা আবার করার প্ল্যান কেন করেছিলেন? এখানকার যিনি হেড, মিস্টার বড়ুয়া, উনি আপনার সঙ্গে এই বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি মিটিং করেন এবং নাকচ করেন আপনার প্রোপোজাল। আপনি তারপর ফোন করে কথা বলার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু উনি জানিয়ে দিয়েছেন যে ডিসিশান ফাইনাল। তাহলে ওই মিটিংয়ের গল্প আবার কেন বলছেন?”
কেশব কোঠারি বেশ ফরসা মানুষ। কিন্তু এখন মুখের অবস্থা হয়েছে সদ্য কেনা কাগজের মতো। শরীরটাও যেন একটু কুঁকড়ে গিয়ে অস্বাভাবিক ছোটোখাটো লাগছে।
“কিছু বলবেন না? আচ্ছা যেতে দিন। কিন্তু একটা ব্যাপার তাহলে পরিষ্কার হচ্ছে না। আপনি লাভা পৌঁছে ডাক্তারবাবুকে দেখে এখানকার কথা কেন বললেন? আপনি সেদিন সকালেই পৌঁছোলেন তো? কোথা থেকে যেন এলেন? ডেলো, রাইট?”
“অ্যাঁ? হ্যাঁ হ্যাঁ, মানে একজ্যাক্টলি ডেলো নয়। তবে ওর কাছেই একটা জায়গা থেকে আসছিলাম।”
“এই দেখুন! এখন আবার বলছেন একজ্যাক্টলি না। পুলিশের স্টেটমেন্টে বলে দিলেন ডেলো! এগুলো একটু কেয়ারফুল থাকবেন তো! সবাই তো আর আমার মতো পেশেন্ট আর আন্ডারস্ট্যান্ডিং হবে না। ফালতু বিপদে পড়ে যাবেন। যাই হোক, আপনি ডেলোর কাছে একটা জায়গা থেকে সেদিন সকালে স্টার্ট করেছিলেন, তাই তো?”
সম্মতিসূচকভাবে মাথা উপর—নীচ হল।
“কিন্তু ডেলোতে আপনাকে কেউ আইডেন্টিফাই করতে পারছে না। লজ, হোটেল, খাবারের দোকান, ট্যাক্সি স্ট্যান্ড, কেউ না। সেটা খুব একটা প্রবলেম না। কত মানুষ আসেযায়, লোকে খেয়াল নাই করতে পারে। কিন্তু প্রবলেম হল, ডেলো থেকে অনেক দূরে, অন্য এক জায়গায় লোকে আইডেন্টিফাই করছে। কোথায় বলুন তো?”
কেশব নির্বাক। কাগজের রং এবার চুনের দিকে এগোচ্ছে।
“আরে আপনি এত কোঅপারেট করার কথা বলে এরকম চুপ করে গেলে কীকরে হবে? এবারটাও নাহয় আমিই বলি। জায়গাটা গরুবাথান। সেখানে জোশি বলে একজনের বাড়ির একতলার ঘরে তিনদিন ছিলেন। তাঁর বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বলেছেন, বর্মন বলে ওঁদের এক প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে রিয়েল এস্টেটের খোঁজখবর নিয়েছেন, এমনকি যেই দোকান থেকে পান কিনে খেতেন, সেও আপনাকে মনে রেখে দিয়েছে। বাংলা পাতা, সঙ্গে বিশ জরদা, একশো ঠিক তো?”
কেশবের মাথা নিচু। মুখের রং পরিবর্তন হলেও বোঝার উপায় নেই। ফারুক একবারও মুখ খোলেনি। সে বেশ তারিয়ে তারিয়ে প্রধানের পারফরমেন্স উপভোগ করছে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফুটবলাররা এক—একদিন তাঁদের সেরা খেলাটা উপহার দেন। সেইদিনগুলো তাঁরা চোখ বুজেও গোটা মাঠে বাকি সকলের উপস্থিতি নিখুঁতভাবে বুঝতে পারেন। ফলে তাঁদের প্রতিটি চলন, দৌড়, বা শটের সিদ্ধান্ত যেন আগে থেকে লক্ষ্যভেদ করেই বসে আছে। আজকে প্রধান প্রায় সেরকম ফর্মে আছে; যেন ‘৭৪—এর ক্রুয়েফ, ‘৮৬—র মারাদোনা, বা ‘৯৮—এর জিদান। সে আবার মুখ খুলল।
“আপনি এভাবে চুপ করে থাকতে পারেন আর আমি একের পর এক এরকম লিস্ট বাড়িয়েই যেতে পারি। তাতে রাত বাড়বে, আপনার ঘুম নষ্ট হবে। তার থেকে এই ঘরে সবাই যেটা জানে, সেটা আমি একবার বলেই দিই। আপনি কলকাতা থেকে ইন্ডিগোর ৭৫১৪ ফ্লাইট ধরে গত মঙ্গলবার বাগডোগরায় নামেন। সেখান থেকে একটা মারুতি সুইফট ধরে গরুবাথান আসেন, নম্বর ৩১১৯। সেখানে তিনদিন কাটিয়ে শনিবার আর—একটা গাড়ি করে, এটাও সুইফট যার নম্বর ৭০৫৪ আর ড্রাইভারের নাম অরুণ, সেটা নিয়ে লাভাতে আসেন। তারপরের ঘটনা আমরা সবাই জানি।”
কেশব এখনও মাথা তোলেনি, একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। প্রধান তার চেয়ারটা টেনে একদম কেশবের মুখের কাছে নিয়ে গেল। তার পরের কথাগুলো ফিসফিসের মতো হলেও বন্ধ ঘরে স্পষ্ট শোনা গেল।
“মিস্টার কেশব কোঠারি, প্লে টাইম ইজ ওভার! আপনি সোজাসুজি বলুন গত এক সপ্তাহ ধরে সেই কলকাতা থেকে কেন ডঃ নীলাদ্রি চক্রবর্তীর পিছু নিয়ে যাচ্ছিলেন?”
কেশবের শরীর একবার একটু কেঁপে উঠল। একটা চাপা গোঙানির শব্দও পাওয়া গেল। কিন্তু প্রধান এখনও কঠিন ও নির্মম।
“আপনি যদি চুপ করে থাকাই প্রেফার করেন, আপনাকে গ্রেপ্তার করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই তাহলে। আমি গাড়ি আর লোক নিয়েই এসেছি। শেষবারের মতো জিজ্ঞাসা করছি। নীলাদ্রি চক্রবর্তীকে টানা ফলো করে যাচ্ছিলেন কেন?”
“আমি বলছি! আমি বলছি!” কেশবের গলা প্রায় আর্তনাদের মতো শোনাল। সে উদভ্রান্তের মতো এদিক—ওদিক তাকিয়ে, পায়ের কাছ থেকে জলের বোতলটা তুলে প্রায় এক নিশ্বাসে সেটা খালি করে দিল। তারপর এক ঝলক ফারুককে দেখে নিয়ে, প্রধানের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করল।
“আমি কলকাতা থেকে ডঃ চক্রবর্তীকে ফলো করে আসছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমি ওনার কোনো ক্ষতি করতে চাইনি। আমি বরং আখেরে ওনাকে হেল্প করতেই চাইছিলাম, একটা অপরচুনিটি দিতে চাইছিলাম। ওনার আরও উন্নতি হত, আরও নাম হত, আরও পয়সা হত!”
“বিজনেস অপরচুনিটি?”
“ইয়েস, ইয়েস! আর আমি বাত কা বাত করছি না। এই ব্যাপারে আমি অনেকদূর এগিয়েছি। ইনভেস্টরও রেডি আছে। কাজ সাকসেসফুলি হলে মানুষের উপকারও হত, সবার প্রফিটও হত। আমার জাস্ট একটা চান্স দরকার ছিল যাতে আমি ওনার সঙ্গে বসে একটু নিরিবিলিতে কথা বলে নিতে পারি।”
“যেহেতু এভাবে ডঃ চক্রবর্তীর পিছনে লেগে গেছিলেন, ধরেই নিচ্ছি এটা হেলথ কেয়ার রিলেটেড কোনো বিজনেস, তাই তো?”
“ইয়েস স্যার। পুরা নর্থ ইস্টে চেন অফ হসপিটালস, আর সেইসঙ্গে চারটে স্টেটে মোবাইল সার্জিক্যাল ইউনিট— সিকিম, মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা। পরে প্ল্যান আছে আরও এক্সপ্যানশনের। ইন্টেরিয়র সব জায়গায় কমপ্লিকেটেড সমস্ত অপারেশন, চিকিৎসা হয়ে যাবে। ইনশিওরেন্স আর ব্যাংকের সঙ্গে টাই আপ থাকবে। লোন, ইএমআই, এভরিথিং উইল বি ডান ইন আ মিনিট। আর ডঃ চক্রবর্তী থাকতেন পুরো মেডিক্যাল অপারেশনসের দায়িত্বে।”
“কিন্তু কলকাতায় বসে ওঁর সঙ্গে এই মিটিং করা সম্ভব ছিল না। কারণটা বলবেন?”
“উনি এত বিজি থাকেন, পেশেন্টরাই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পায় না! তাছাড়া ওনার কাজের জায়গায় গিয়ে আর—একটা কাজের অফার দেওয়াটা আমার ঠিক লাগেনি। তাই যখন দেখলাম উনি ছুটিতে আসছেন, আই টুক আ চান্স। প্রথম ক’দিন ফ্যামিলির সঙ্গে ছিলেন, তাই ডিস্টার্ব করিনি। তারপর তো— ”
“আমি যদি বলি আর—একটা কারণ ছিল? ইন ফ্যাক্ট কলকাতায় ওঁকে অ্যাপ্রোচ না করার পিছনে সেটাই সবথেকে বড়ো কারণ।”
“আর কী কারণ হবে? কী বলছেন আপনি, আমি তো —”
“বুঝতেই পারছেন না তো? আমি একটু ধরিয়ে দিই। কলকাতায় বসে আপনার পক্ষে অ্যাপ্রোচ করা সম্ভবই নয়, কারণ সেখানে সবথেকে বড়ো বাধা ডঃ চক্রবর্তীর বস বা সিনিয়ার পার্টনার, যিনি সম্পর্কে আপনার নিজের মামা— মিস্টার দামোদর সিংঘানিয়া! এবার আমি আন্দাজে কিছু কথা বলছি। ভুল হলে রেকটিফাই করে দেবেন। নর্থ ইস্টার্ন ইন্ডিয়াতে হসপিটালের এক্সপ্যানশনের প্ল্যান নিয়ে আপনার মামা বা বৃজ মোহন সেবা ট্রাস্ট কোভিডের পর থেকেই এগোচ্ছে। আপনি সম্ভবত সেখান থেকেই এটা আঁচ করেন এবং নিজের আইডিয়াটা পান। তারপর কিছুদিন ঘোরাঘুরি করে ইনভেস্টরও জুটিয়ে ফেলেন, আর চেষ্টা করতে থাকেন ডঃ চক্রবর্তীকে কীভাবে ওখান থেকে ভাঙিয়ে আনা যায়। এই কাজে যেহেতু ওঁরা অনেকটাই এগিয়েছে, আমি ধরে নিচ্ছি ডঃ চক্রবর্তীরও এখানে অলরেডি একটা ভালো নেটওয়ার্ক তৈরি হয়ে গেছে। সেটা হাতে পেলে আপনার অনেকটা লাভ, তাই না?”
প্রধান নিজের চেয়ারটা আবার একটু পিছিয়ে আগের জায়গায় নিয়ে, হাত—পা ছড়িয়ে খানিক গা এলিয়ে দিল। ফারুক একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছে। সে সত্যিই শৈল্পিক মানের খেলা দেখছে। খেলোয়াড় আপাতত হ্যাটট্রিক শেষ করে দর্শকাসনের উদ্দেশ্যে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁদের অভিবাদন কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য। প্রধানের স্মিত হাসি অন্তত তাই বলছে।
“মনে হচ্ছে ঠিকঠাকই বলেছি। এবার আপনি বলুন তো, কী মনে করে এতটা রিস্ক নিলেন? নিজের ফ্যামিলির সঙ্গে বিট্রে করে ফেললেন?”
“কেন করব না?” এই প্রথম কেশবের গলায় একটু জোর পাওয়া গেল। “এটা ফ্যামিলির ব্যাপার না, বিজনেসের ব্যাপার! এটা একটা বিজনেস অপরচুনিটি। এরকম অপরচুনিটি আগেও যখন এসেছে, নীলাদ্রি চক্রবর্তী সেকেন্ড টাইম ভাবেনি। তাহলে এবারেই বা অফার শুনবে না কেন?”
“আগেও এসেছে মানে?” এবার ফারুক মুখ খুলল।
“আমি ১৯৯৩—৯৪—এর কথা বলছি। ওরা বাপ—ছেলে দু’জনেই তখন মহেন্দর চৌধুরি হসপিটালে কাজ করছে। সেখানে যত দিন যাচ্ছে, ওর বাবা ড্রিংক করে করে সবকিছু বরবাদ করে ফেলছে। কাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে, সেইসঙ্গে হসপিটালের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। তখন ওই হসপিটালের গভর্নিং বডিতে কে ছিল? আমার মামা! হি টুক আ ডিসিশান। এই হসপিটালকে ঠিক রাখতে হলে ডঃ সমীরণ পালকে ফায়ার করতে হবে। লাকিলি বলুন কি আনলাকিলি, হি কমিটেড সুইসাইড। বিশাল স্ক্যান্ডাল হয়েছিল, হসপিটালের নাম পুরা মাটিতে মিশে গেছে। আমার মামা বুঝেছিলেন যে এভাবে চলবে না। নীলাদ্রি ওয়াজ আ ইয়াং ডক্টর দেন। মামা ওকে অফার করেন ওনার সঙ্গে ফ্রেশ স্টার্ট করতে, ওনার নিজের বিজনেসে। সেই প্রথম বিএমএসটি চালু হল। ‘৯৬—এর নিউ ইয়ার। ডঃ নীলাদ্রি পাল, ডঃ নীলাদ্রি চক্রবর্তী হয়ে এখানে চলে এলেন। নতুন নাম, নতুন কাম। তারপর তো ভালোই তরক্কি করেছেন! তাহলে ওনাকে আর—একটা অপরচুনিটি অফার করতে অসুবিধা কী আছে?”
“অসুবিধা মূলত দুটো, মিস্টার কোঠারি। এক হচ্ছে কারওর পার্সোনাল প্ল্যান চোরের মতো আনফেয়ারভাবে জেনে নিয়ে, তারপর লুকিয়ে তাকে চারদিন ধরে ফলো করে যাওয়া। সেকেন্ডলি, আপনার অফার প্রত্যাখ্যান করার পরেও কাউকে জোর করা। আপনি সেদিন সন্ধ্যাবেলায় নীলাদ্রির কটেজে গিয়ে তাকে জোরাজুরি করেননি? আপনাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়নি? অস্বীকার করে লাভ নেই, উইটনেস আছে।”
কেশবের বাঁ হাত তার মাথায়। আঙুলের ছায়াগুলো মুখের উপর প্রায় সমান দূরত্বে চারটে দাগ টেনে দিয়ে গেছে। সে ওই অবস্থাতেই উত্তর দিল। গলার আওয়াজ এখন বেশ কয়েক পর্দা নেমে গেছে।
“উনি প্রথমেই এত রেগে উঠবেন সেটা আমি এক্সপেক্ট করিনি। উনি বলতে থাকলেন যে আমি ওনাকে ঠকিয়ে এখানে নিয়ে এসেছি। আরে, আমি কোথায় ঠকালাম? দিস ইজ আ নাইস প্লেস। আমি আগে এসে এখানে থেকেছি। আর উনি নিজেও দুপুরবেলা সেকথা স্বীকার করলেন। কিন্তু আমার অফারটা ঠিক করে শুনতেই চাইলেন না। আমি ওনাকে তখন আমার মামার কানেকশনের ব্যাপারটাও বললাম। তাতে মনে হল আরও রেগে গেলেন। আমাকে পুলিশের ভয় দেখাতে শুরু করলেন। চিৎকার—চেঁচামেচি করে কী কাণ্ড! তখন অলরেডি ড্রিংক করতে স্টার্ট করেছিলেন।”
“ফলে, সেই সুযোগে আপনি ওঁর ড্রিংকে বিষ মিশিয়ে দিয়ে এলেন যাতে ওঁকে রাস্তা থেকে সরিয়ে আপাতত আপনার মামার প্ল্যানটা কিছু সময়ের জন্য হলেও বন্ধ রাখা যায়। আপনি এর মধ্যে অন্য ব্যবস্থা করে নেবেন। আপনি তো নিজেই বলেছেন যে জুপিটার ফার্মায় কাজ করার সূত্রে আপনি অনেক ডাক্তারকেই চেনেন।”
“না না! বিষ! এসব আপনি কী বলছেন? আমি খুনি নই, জাস্ট আ বিজনেসম্যান। আমি প্রথমে সব কথা বলিনি ঠিকই আর সেটা আমার ভুল হয়েছে। কিন্তু আমি খুন করিনি, আমি সত্যিই এই ব্যাপারে আর কিছু জানি না। বিশ্বাস করুন।”
“সরি, মিস্টার কেশব কোঠারি।” এতক্ষণে প্রধান আবার গা—ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। তার বিশ্রাম শেষ, সে এবার পরের প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি। “বিশ্বাস—অবিশ্বাসের ব্যাপার অনেক আগে ফেলে চলে এসেছি। আপনাকে একবার থানায় আসতে হবে। এটা অফিশিয়াল অ্যারেস্ট নয়। কিন্তু আপনি আসতে না চাইলে, কালকের মধ্যে ওয়ারেন্ট ইস্যু করে সেটাও করতে পারি। এখন ফারদার কোয়েশ্চেনিংয়ের জন্য পুলিশ স্টেশনে আসতে রিকোয়েস্ট করছি।”
কেশব কোঠারি দু’মিনিটের মধ্যে জামাকাপড় বদলে তৈরি হয়ে নিল। তার বোতলে আর এক ফোঁটা জলও বাকি নেই। তাকে এদিক—ওদিক তাকাতে দেখে, ফারুক বেরিয়ে গিয়ে নিজের ঘর থেকে একটা বোতল এনে দিল। সেখান থেকে কয়েক ঢোঁক জল খেয়ে, সে প্রধানের সঙ্গে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। প্রধানই তাঁর চাবিটা চেয়ে নিয়ে, ঘরে তালা দিয়ে দিল। তারপর চাবিটা কেশবকেই ফেরত দিয়ে, ফারুকের দিকে ফিরল।
“আপনাকে আর এখন নীচে আসতে হবে না। আমি ফোন করে বলে দিচ্ছি গাড়িটা এই নীচ অবধি নিয়ে আসতে। কাল এক সময় একটু বসে কথা বলে নিতে হবে। গুডনাইট।”
কানে ফোন নিয়ে চাপাস্বরে নির্দেশ দিতে দিতে প্রধান বারান্দা দিয়ে হেঁটে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। পাশে কেশবকে মনে হচ্ছে ঘুমের মধ্যে হাঁটছে। ওরা যখন সিঁড়ির শেষ ধাপে, তখন নীচে গাড়ি এসে থামার মৃদু শব্দ পাওয়া গেল। খোলা জায়গাটা দিয়ে ছায়ামূর্তির মতো দু’জন হেঁটে, ঢালু পথটার ওদিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড বাদে আবারও বেশ মৃদু শব্দে গাড়ি স্টার্ট হল। তিন সেকেন্ডের মধ্যে সেই শব্দও মিলিয়ে গেল।
ফারুক বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হাতে একটা সিগারেট, কিন্তু সেটা ধরানোর ব্যাপারে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। আজ একটা লম্বা দিন গেল। কেস নিষ্পত্তির দিকে এগোল কিনা সেটা সময়ই বলতে পারবে। তবে বেশ কিছু মানুষকে নতুন করে চেনা গেল। ঋজু, ঐশানী, নীলাদ্রি, কেশব। একজন মানুষকে নতুন করে চিনলে আসলে তার আশেপাশের মানুষদের ব্যাপারেও নতুন করে ধারণা তৈরি হয়। এই ধরনের ঘটনার সমাধানে সেটা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু থাক, আজ আর ভাববে না। আজ তথ্য আর অভিজ্ঞতার ভারে মাথাটা ক্লান্ত হয়ে আছে।
হয়তো সেই ক্লান্তি খানিক দূর করতেই ফারুক ঘরে না—ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে এই পাহাড়ি গ্রামের রাত উপভোগ করার চেষ্টা করছে। এবার সে সিগারেটটা ধরাল। চারিদিক শুনশান, প্রাণহীন, নিঝুম। নীচে দত্তবাবুদের গাড়িটা আধো আলোছায়ায় দাঁড় করানো, যেন একটা অতিকায় প্রাণী উপুর হয়ে ঘুমিয়ে আছে। এক সেকেন্ডের জন্য ফারুক একটু চমকে উঠল। কিছু যেন একটু নড়ে উঠল। পরক্ষণেই বুঝল চোখের ভুল হয়েছে। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের কাচে উলটোদিকের পাহাড়ের গায়ে যেসব আলো, তার কিছুটা পড়ে ঝকমক করে উঠেছে। আজ আবহাওয়া ভালো, আকাশ পরিষ্কার। অনেক দূরের আলোর খেলাও চোখের সামনে প্রতিফলিত হচ্ছে। ফারুক সিগারেট টানতে টানতে অনেকক্ষণ সেই আলোর দিকে চেয়ে রইল।
