প্রথম দিন
“আপনি ডঃ চক্রবর্তী না?”
গত প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সবার মুখে না শুনতে শুনতে নীলাদ্রি হাঁপিয়ে উঠেছে। তার পক্ষে এরকম বন্ধুত্বপূর্ণ সম্বোধন এড়ানো সম্ভব হল না। হোটেলের লবির কাউন্টারের উপর একটা আলতো চাপড় মেরে ঘুরতেই সে দেখল, প্রশ্নকর্তা তার থেকে হাতখানেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝারি গড়নের লোকটির বয়স তার নিজের মতোই হবে, অর্থাৎ পঞ্চান্ন থেকে ষাটের মধ্যে। মুখের হাসি দেখে মনে হচ্ছে অপ্রত্যাশিতভাবে মহামূল্যবান কিছু একটা সে কুড়িয়ে পেয়েছে। চেহারার কোনো বৈশিষ্ট্যে ধরা না দিলেও, উচ্চারণের টানে এবং সাফারি স্যুট, গলায় সোনার চেন আর হাতের আঙুলে আংটির আধিক্যে, লোকটিকে অবাঙালি বলেই মনে হয়।
“দূর থেকে দেখেই আমি সেন্ট পারসেন্ট শিওর হয়ে গেছিলাম যে আপনিই হবেন”, নীলাদ্রিকে উত্তর দেওয়ার কোনো সুযোগ না দিয়ে লোকটি নিজেই বলে চলল, “আই হোপ আপনি কিছু মাইন্ড করেননি এভাবে এসে কথা বলার জন্য। বাই দ্য ওয়ে, মাইসেলফ কেশব কোঠারি।”
শেষের বাক্যটির সঙ্গে ডানহাত এগিয়ে এসেছে নীলাদ্রির দিকে। সৌজন্য ফিরিয়ে দিয়ে সে বলল, “না না, মাইন্ড করব কেন?” তার মনের আগাগোড়া জুড়ে থাকা বিরক্তির আস্তরণ ঠেলে এখন একটু কৌতূহলও উঁকি দিচ্ছে।
“অ্যাকচুয়ালি আপনি কী সিচুয়েশনে পড়েছেন, তা আমি বুঝতে পারছি। কাল থেকে গোটা টাউনের সব হোটেল, লজ, হোমস্টেতে এক অবস্থা, পাবলিক পুরো প্যানিক করে ফেলেছে!”
“আপনিও কি আমার মতো আটকে পড়েছেন নাকি?”
“ওয়েল… নট এগজ্যাক্টলি। সেই ব্যাপারেই আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতাম। পাঁচ মিনিট বসে কথা বলা যায়?”
নীলাদ্রি মাথা নেড়ে হাতের ইশারায় সায় দিল। সত্যি কথা বলতে, গত দু’মিনিট এই যেচে আলাপ করা কেশব কোঠারির সঙ্গে কথা বলতে মন্দ লাগছে না। নিজেকে আশ্বস্ত মনে না হলেও, অন্তত এতক্ষণ ধরে মাথায় চেপে বসা বিরক্তিকর দিশাহারা ভাবটা একটু হলেও কমেছে। না হলে আজ সকাল থেকে সে নেহাত কম শাপশাপান্ত করেনি; সেই তালিকায় ভাগ্যবিধাতা থেকে জনৈক চা বাগানের মালিক, অনেকেই আছে। এখন এই লবির নিরিবিলি প্রান্তে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে, উলটো দিকে কেশবকে চা অর্ডার করতে দেখে আবার যেন একটু স্বাভাবিক বোধ হচ্ছে।
সোফাগুলো যেদিকে রাখা, তার ডানদিক ও পিছনের দেয়ালজুড়ে বড়ো বড়ো কাচের জানালা। সেখান দিয়ে ঘন কালো মেঘের চাদরে, বা এখন বলা ভালো কম্বলে ঢাকা ছোট্ট লাভা শহরটি বৃষ্টির মধ্যে কোনোমতে মাথা চাড়া দিয়ে আছে। কম্বলের গায়ে এখানে—ওখানে ছ্যাঁদার অংশ দিয়ে ভিতরের টুকরো টুকরো ছবি দেখা যাচ্ছে—নীল ত্রিপল দিয়ে ঢাকা গাড়ি, দোকানের সামনে চাতালের উপর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা লোমশ পাহাড়ি কুকুর, অথবা কোথাও দুরপ্রান্তে কুয়াশায় অদৃশ্য বাড়ির ছাদে যেন শূন্যে ভেসে আছে রঙিন ফুলের সারি দেওয়া টব। এবং আবহাওয়ার এই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে শেষ অবধি লড়ে যাচ্ছে শহরের কেন্দ্রে থাকা লাভা মনাস্টেরি—তার সোনালি চূড়া আর লাল দেয়ালের উপরের অংশ এখনও সগৌরবে দৃশ্যমান।
“আপনি এরকম ফেঁসে গেলেন কেমন করে?” কেশবের প্রশ্নে চটক ভাঙল। ওয়েটার এসে চায়ের সরঞ্জাম সাজিয়ে দিয়ে গেছে। নিজের কাপে চা ঢামতে ঢামতে নীলাদ্রি উলটোদিকে তাকিয়ে একটু হাসল।
ফেঁসে যাওয়াই বটে।
দিন তিনেক আগে সম্পূর্ণ অন্য পরিস্থিতিতে, একদম রোদ ঝলমলে আবহাওয়ায় পুরোপুরি ছুটির মেজাজে ছিল নীলাদ্রি। গরুবাথানের কাছে একটি টি—এস্টেটের বাংলোর বারন্দায় বসে চা সহযোগে ব্রেকফাস্ট করছিল, উলটোদিকের বেতের চেয়ারে বসেছিল তার স্ত্রী আর মেয়ে। চা বাগানের মালিক নীলাদ্রির পেশেন্ট। লিভারের দুরারোগ্য এক সমস্যায় পড়ে বিস্তর ডাক্তার—বদ্যি, বম্বে—মাদ্রাজ ইত্যাদি কম করেননি। তারপর ব্যাঙ্গালোরের বাসিন্দা ডক্টর কুলকার্নির সুপারিশে ভদ্রলোক নীলাদ্রির সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেন। তিন সপ্তাহের অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স, একটি প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার সার্জারি এবং আরও চারদিন হাসপাতালে কাটিয়ে অবশেষে ছুটি মেলে। ছাড়া পাওয়ার পরে ভদ্রলোক অতি দ্রুত তাঁর স্বাস্থ্য এবং মেজাজ পুনরুদ্ধার করেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ গত ছ’মাস ধরে নীলাদ্রির পিছনে পড়ে ছিলেন টি এস্টেটে এসে কিছুদিন পরিবারসহ তাঁর অতিথি হয়ে কাটিয়ে যাওয়ার জন্য।
অবশেষে আচমকা যখন পেশাগত একটি বিশেষ কারণে গ্যাংটকে আসার কথা উঠল, দেখা গেল তার মেয়ে এবং স্ত্রী দুজনের হাতেই তিনদিন মতো ফাঁকা সময় আছে। তখন নীলাদ্রি একরকম ঘাড় থেকে এই কৃতজ্ঞ উপদ্রবকে বিদায় করার জন্যই সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। প্ল্যান যা দাঁড়িয়েছিল, তাতে চা বাগানে তিনদিনের ছুটি আর গ্যাংটকে কাজের মাঝখানে দিন দুয়েকের একটা ফাঁক। এইটুকু সময়ের জন্য কলকাতায় ফিরে এমনিতেও বিশেষ কোনো কাজ হবে না, শুধু যাতায়াতের ঝামেলাই সার হবে। ওদিকে আবার স্ত্রী আর মেয়েকে তাদের নিজের নিজের কারণে শহরে ফিরতেই হবে। তাই নীলাদ্রি ঠিক করেছিল ওদের বাগডোগরার গাড়িতে তুলে দিয়ে, নিজে আর—এক-টা গাড়ি নিয়ে সিকিমের দিকে রওনা দেবে। পথে পেকিয়ং বা পদমচেন গোছের কোনো একটা নির্জন নিরিবিলি জায়গায় দুটো দিন কাটিয়ে, সোমবার সকালে একেবারে গ্যাংটক গিয়ে হাজির হবে।
সবকিছু প্ল্যানমাফিকই যাচ্ছিল, কিন্তু গতকাল বেলার দিকে স্ত্রী এবং মেয়েকে বিদায় দিয়ে নিজের জন্য আর—এক-টা গাড়ির ব্যবস্থা করে বাংলোতে ফিরেই দুঃসংবাদ। আগামী চব্বিশ ঘণ্টায় কালিম্পঙের উত্তর—পূর্ব দিক এবং সিকিমের কিছু এলাকাজুড়ে আবহাওয়ার দ্রুত অবনতি হতে চলেছে। ম্যানেজার বা কেয়ারটেকার কারওর কথায় তেমন আমল না দিয়ে নীলাদ্রি একদম সকাল সকাল রওনা দেওয়া ঠিক করল। উদ্দেশ্য, ঝড়—ঝঞ্ঝার ঝামেলার আগেই গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চলে এরকম হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অর্থ প্রায় নিজের কর্মফলকে আহ্বান জানানো। সকালে গাড়ি চলতে শুরু করার আধ ঘণ্টার মধ্যেই আকাশের চেহারা হয়ে গেল প্রলয়ের প্রাকমুহূর্তের মতো। আরও পনেরো মিনিট পরে শুরু হল বৃষ্টি। বৃষ্টির প্রকোপ যত বাড়তে লাগল, গাড়ির গতিও পাল্লা দিয়ে কমতে থাকল। অবশেষে প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে মোটামুটি সাড়ে চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে যখন লাভা পৌঁছানো গেল তখন আর এক পা যাওয়ারও কোনো মানে হয় না।
নীলাদ্রি ঠিক করে ফেলেছিল যে চুলোয় যাক নিরিবিলি, আপাতত লাভাতেই দু’দিন থেকে যাবে। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। প্রতিকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেয়ে গতকাল বিকেলের মধ্যেই এলাকার সব থাকার জায়গা ভরতি হয়ে গেছে। তারমধ্যে খবর পাওয়া গেছে যে কিছু জায়গায় পাথর ভেঙে গড়িয়ে নাকি রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেছে। আপাতত গোটা শহরে তিলধারণের জায়গা নেই। বহু ঘোরাঘুরি করে, অনুরোধ করে, টাকার লোভ দেখিয়ে, প্রতিপত্তির জোর খাটিয়ে কোনোভাবেই যাকে বলে কিছু ম্যানেজ করা গেল না। বহু হোটেল আর গেস্ট হাউসের দোর ঘুরে বিরক্তি, হতাশা, ক্লান্তি, ইত্যাদি মিলিয়ে যখন মেজাজ সপ্তমে চড়তে শুরু করেছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই কেশব দর্শন।
“ফেঁসে গেছি খানিক নিজের দোষেই, কিন্তু সে যাক। আপনি বলুন কী বলছিলেন।”
“দেখুন, আমি অরিজিনালি কলকাতার লোক হলেও বিজনেসের জন্য এই নর্থ বেঙ্গল বা নর্থ—ইস্ট এলাকায় আমার বহুত আসা—যাওয়া হয়। তো এর জন্য দুটো ব্যাপার আছে—এক হচ্ছে এরকম সিচুয়েশনে আগেও পড়েছি আর তার মোকাবিলা করার এক্সপেরিয়েন্স আছে। আর মোর ইমপর্ট্যান্ট হল গিয়ে কনট্যাক্টস। এখানকার অনেক ছোটোখাটো জায়গা বা গ্রামেও আমার চেনাজানা আছে। তার মধ্যে অনেকেই তো লোককে রেগুলার থাকতে দিচ্ছে, খেতে দিচ্ছে—মানে হোমস্টে বিজনেস!”
কথা বলায় একটু বিরতি নিয়ে কেশব ঘন ঘন তিনবার চায়ে চুমুক দিল। নীলাদ্রিও এবার একটু আন্দাজ করতে পারছে যে কথাবার্তা কোনদিকে এগোচ্ছে বা এগোবে। এর চেনাজানা কোনো এক জায়গায় গিয়ে তুলবে এবং পরিস্থিতির সুযোগ আর নিজের কমিশন যোগ করে হয়তো একটু মোটা দর হাঁকাবে। তা করুক, তাতে অসুবিধা নেই; আপাতত এই ঝামেলার হাত থেকে উদ্ধার পেলেই হল।
“তা এখানে কাছাকাছির মধ্যে আপনার চেনা কোনো হোমস্টে আছে যেখানে দিন দুয়েক থাকা যায়?” নীলাদ্রি ইচ্ছা করেই কেশবের দীর্ঘ বিস্তারের ভূমিকা টপকে সরাসরি প্রশ্ন করল।
“আপনি কোলাখামের নাম শুনেছেন?” পালটা প্রশ্ন এল।
খুব সম্ভবত তার ভ্রমণপিপাসু ও উত্তরবঙ্গ চষে বেরানো বন্ধুদের মুখে নামটা হয়তো শুনেছে, কিন্তু এখন স্মৃতি হাতড়ে আর কিছুই বেরোল না। নীলাদ্রি চুপ করেই রইল।
“লাস্ট কিছু বছরে ট্যুরিস্ট প্লেস হিসাবে নামডাক করেছে। ছোট্ট একটা গ্রাম, কাছে একটা ওয়াটারফল আছে আর ভালো ওয়েদারে স্নো পিক দেখা যায়। এখান থেকে সাত—আট কিলোমিটারের রাস্তা। মেন রোড ছেড়ে ফরেস্টের ভিতর দিয়ে যেতে হয়। গাড়ি এমনিতেই স্লো যাবে, চার্লিশ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা ম্যাক্সিমাম। মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রাই, খুব ভালো লোক। কোনো প্রবলেম হবে না।”
নীলাদ্রি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে। অচেনা জায়গায় দুর্যোগের মধ্যে একটা ব্যবস্থা করতে এমনিতেই বেশ বেগ পেতে হয়। এই লোকটি স্রেফ উপকার করতে হোক বা নিজের টাকা রোজগারের জন্যই হোক, যথেষ্ট ভালো একটা প্রস্তাব দিয়েছে।
“আমার সঙ্গে যে গাড়ি আর ড্রাইভার আছে, তার ব্যবস্থা হবে ওখানে?”
“দেখুন, একটা পার্কিং এরিয়া আছে আর ড্রাইভার কোয়ার্টার্সও আছে। কিন্তু আমি কি সাজেস্ট করি, যে আপনি আপনার গাড়ির বিল মিটিয়ে ওকে ছেড়ে দিয়ে আমার সঙ্গেই চলুন। আই হ্যাভ আ বিগ কার অ্যান্ড ভেরি লিটল লাগেজ। কোনো প্রবলেম হবে না।”
আরও দশ মিনিট পরে নিজের গাড়ির ড্রাইভারের প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে কেশবের গাড়িতে নীলাদ্রি যখন উঠে দরজা বন্ধ করল, তখন মনের কোথাও বিরক্তির আর ছিটেফোঁটাও নেই। বরং মধ্যবয়স পার করে জীবনে প্রথমবার প্ল্যানবহির্ভূত সিদ্ধান্তের চাপা উত্তেজনা তাকে বেশ পেয়ে বসেছে। তার মন বলছে প্রত্যেকবারের মতো পরিস্থিতি অনুযায়ী সে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে সে দুবার জায়গার নামটা মনে মনে আউড়ে নিল।
কোলাখাম। কোলাখাম।
***
বড়ো রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলে ঢুকে, টোল বুথের টাকা মিটিয়ে গাড়ি কয়েক গজ এগোতেই ফারুকের মনে হল কেউ যেন রেডিয়োর স্টেশন বদলে দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ম্যাজিকের মতো মানুষ এবং মানুষের তৈরি যাবতীয় আওয়াজ উবে গিয়ে, তার জায়গায় দ্রুত জোরালো হয়ে উঠছে প্রকৃতির শব্দ। তার মধ্যে এখন বৃষ্টির শব্দই প্রধান—কিন্তু মন দিয়ে শুনলে বোঝা যাবে সেখানেও অনেক তারতম্য আছে। আশপাশের গাছের একদম মগডালের উপর বৃষ্টি পড়ার শব্দ কিন্তু মাঝামাঝি বা নীচের দিকের পাতার উপর বৃষ্টির শব্দর থেকে আলাদা। আবার জঙ্গলের প্রায় কাঁচা এবড়ো—খেবড়ো রাস্তার মাটি বা পাথরের উপর বৃষ্টি আর তাদের ধীর গতিতে এগিয়ে চলা গাড়ির গায়ে জলের ছাঁট লাগার শব্দেরও যথেষ্ট ফারাক আছে।
নিচু ওয়াগন—আর গাড়ি একটা মাঝারি গাড্ডায় পড়ে বড়ো রকমের ঝাঁকুনি খেল। সঙ্গে সঙ্গে ফারুকের পেটের বাঁদিকে পুরানো ক্ষতস্থানের আশপাশটা টনটন করে উঠল। মনে মনে ভাবল, সত্যিই বড়ো গাড়ি না—নেওয়াটা হয়তো সমতলের লোক হয়ে একটু ভুলই হয়েছে। সে সামনের দিকে ঝুঁকে ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল—
“আর কেতনা দূর? রাস্তা কি এরকমই খারাপ?”
“আরও চল্লিশ মিনিট। মাঝে একটা জায়গায় তো রাস্তার অবস্থা আরও খারাপ। রাস্তা যেই ঠিক হবে, ওমনি পৌঁছে যাব।” পাহাড়ি টানে হিন্দিতে উত্তর দেওয়ার সময় রিয়ার ভিউ আয়নায় ড্রাইভারের হাসি হাসি মুখটা দেখা গেল।
বিপদ—আপদের সময় অযথা কাউকে দাঁত বের করে হাসতে দেখলে গা—পিত্তি জ্বলে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ফারুকের মনে হয়েছে যে এহেন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যেখানে একেবারেই একা সফর করতে হবে, সেখানে গোমড়ামুখো ড্রাইভার কপালে থাকলে সেটা আরও খারাপ। এই ছেলেটি নিশ্চয়ই তাকে উদ্দেশ্য করে হাসছে না। ওর হাবভাব, স্বভাব আর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই সম্ভবত এরকম। আজ সকালে যখন আবহাওয়া ক্রমে খারাপ হতে শুরু করেছে, তখন চূড়ান্ত খারাপ খবরটাও সে হাসিমুখেই শোনাতে এসেছিল।
“রিশপের দিকে আর যাওয়া যাবে না। ধস নেমে রাস্তা ব্লক হয়ে গেছে!”
ফারুকদের গাড়ি তখন কালিম্পং শহর থেকে বেরিয়ে, ঋষি রোড ধরে হয়তো পনেরো কিলোমিটারও অতিক্রম করেনি। রাস্তাটা একজায়গায় খানিকটা চওড়া এবং ধারে কিছু গুমটি দোকান দেখতে পেয়ে গাড়ি দাঁড় করানো হয়েছে। সেখানে মোমো বা ওয়াই ওয়াই কিছু খাবে কিনা ভাবতে ভাবতে ফারুক সবে একটা সিগারেট ধরাতে যাবে, ঠিক সেইসময় এই দুঃসংবাদ। আজ পৌঁছোতে একটু দেরি হবে জানলেও দুর্ভোগ যে এরকম আকার নেবে সেটা সত্যিই আন্দাজ করা যায়নি।
হপ্তাখানেক আগে সে কালিম্পং এসেছিল একটা কাজের ব্যাপারে। তার একজন পুরানো সহকর্মী—সে এখনও চাকরি করে যাচ্ছে এবং যথেষ্ট পদোন্নতিও করেছে—ফারুককে অনুরোধ জানিয়েছিল কালিম্পং এসে একটি বিশেষ জটিল পরিস্থিতির ব্যাপারে মতামত দিয়ে সাহায্য করতে। এতদিন আগের সহকর্মী এখনও তার মতামতের এতটা মূল্য দেয় ভেবে মনে মনে বেশ খুশি হয়েই সে সম্মতি জানিয়েছিল। তিন—চারদিনের মাথায় সমস্যার সুরাহা হয়ে যাওয়ায় সবার মেজাজই বেশ ফুরফুরে। তাই ফারুক আরও কয়েকদিন সেই সহকর্মীর আতিথেয়তা গ্রহণ করতে সানন্দেই রাজি হয়ে গেছিল।
কিন্তু এরমধ্যে গত পরশু তার স্ত্রী রোকসানা ফোন করে একটি গুরুতর বিষয় জানায়। স্কুলে পড়াকালীন তার স্ত্রীর সবথেকে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল লাইজা এবং স্কুলের পাঠ চুকে যাওয়ার পরেও তাদের মধ্যে সম্পর্ক যথেষ্ট নিবিড়। এখনও নিয়মিত যোগাযোগ আর কথাবার্তা হয়। তবে গত প্রায় একমাস বাবদ লাইজার কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি। অবশেষে চিন্তিত হয়ে রোকসানা যখন আরও দু—তিনজনকে ফোন করে, তখন জানতে পারে যে লাইজা মাসখানেক হল বেশ অসুস্থ এবং তার জটিল সব চিকিৎসা চলছে। ওরা যেখানে থাকে সেই রিশপ জায়গাটা কালিম্পং থেকে বেশি দূরে নয়। ওখানে ওদের একটা ছোটোখাটো হোটেলের ব্যাবসা আছে। এই অবস্থায়, ফারুক যেন অবিলম্বে রিশপ গিয়ে লাইজার খোঁজখবর করে এবং প্রয়োজনে আর্থিক এবং অন্য সবরকমের সাহায্যের ব্যবস্থা করে দেয়। রোকসানা নিজে অফিসে ছুটির আবেদন করে দিয়েছে—সে সামনের সপ্তাহে রিশপ পৌঁছবে।
কোনো কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে দিয়ে ফারুক পরদিনই রিশপ যাওয়ার বন্দোবস্ত করে ফেলে। তার সহকর্মীই এই গাড়িটার ব্যবস্থা করে দেয়। অল্পবয়সি ড্রাইভার ছেলেটি খুবই চেনাজনা ও বিশ্বস্ত নাম জিতু। জিতুর বাড়ি কাছাকাছি এলাকারই কোনো এক গ্রামে, ফলে ওদিকের রাস্তাঘাটের হালহকিকত সম্পর্কে ছেলেটি ভালোই ওয়াকিবহাল। সব ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ায়, ফারুক বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দেয় যে সে পরদিন সকালের দিকেই রওনা দিয়ে দেবে এবং দুপুরের মধ্যে মোটামুটি একটা পাকা খবর পাওয়া যাবে। রোকসানা শুনে একটু আশ্বস্ত হয়।
কিন্তু ধস নামার কথাটা শোনার পর ফারুকের চিন্তাভাবনা একটু জট পাকিয়ে গেছে। রাস্তার ধারে গুমটির ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে তিন নম্বর সিগারেট ধরাতে গিয়ে একবার মনে হল পুলিশের কথা। কিন্তু সেটা এত চ্যানেলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে অবশেষে কী বার্তা পৌঁছবে আর লাইজার অসুস্থতার মধ্যে তাদের পরিবারে এই আচমকা পুলিশি হস্তক্ষেপের প্রতিক্রিয়া কী হবে—এইসব ভেবে পুলিশের আইডিয়াটা মাথা থেকে বের করে দিল। তার মধ্যে গত মিনিট কুড়ি ধরে সে দেখেছে তার ফোনে টাওয়ারের বিন্দুমাত্র কোনো চিহ্ন নেই। এখন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের দায়িত্ব আর গন্তব্যের থেকে অনির্দিষ্ট দূরত্বে, মোমো নাকি ওয়াই ওয়াই—স্রেফ এই সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। সিগারেটের শেষ অংশটা সিনেমার হিরোদের মতো কায়দা করে টোকা মেরে খাদে ফেলতে গিয়ে প্রায় আধ চামচ ছাই নিজের জুতোর উপরেই পড়ল। বিরক্ত হয়ে, পা ঝাড়তে ঝাড়তে দোকানের দিকে এগোতেই আবার সামনে হাসি হাসি মুখ।
“স্যার, আমার নিজের গ্রামের দিকে যাবেন?”
“মানে? কেন?”
“আপনি যেদিকে যেতে চাইছিলেন, সেখানে তো যাওয়ার আর কোনো রাস্তা নেই, আর ওয়েদারের যা অবস্থা এখন থাকার জায়গা পেতে মুশকিল হয়ে যাবে। আপনি কালিম্পং ফেরত যেতেই পারেন, কিন্তু আমি আপনাকে যদি পৌঁছে দিয়ে আসি তাহলে আমার আর বাড়ি ফেরা হবে না। কালও যেতে পারব কিনা, কোনো ঠিক নেই।”
“তোমার গ্রামের ওখানে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে?”
“একদম! ভালো ঘর পেয়ে যাবেন, উইথ অ্যাটাচড বাথ অ্যান্ড গিজার। খাওয়াদাওয়াও ভালো। আমার এক আংকেল আছেন, দারুণ রান্না করেন! ওয়েদার বেটার হওয়া অবধি ওখানে ওয়েট করে যান। এদিকে দু—একদিনের মধ্যে আর্মির হেল্প নিয়ে একটা যাতায়াতের ব্যবস্থা হয়েও যাবে। আমি নিজে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসব।”
“হুম, তোমার গ্রাম থেকে রিশপ কতদূর? মানে যেতে কতক্ষণ লাগবে?”
“বেশিক্ষণ না স্যার। আর আমি একটা শর্টকাটও চিনি। আধা ঘণ্টায় নিয়ে যাব।”
জিতুর কথাই রইল। সেই দোকানে এক প্লেট চিকেন মোমো খেয়ে তারা আবার রওনা দিয়েছিল পৌনে দশটা নাগাদ। বাকি রাস্তা নির্বিঘ্নেই কেটেছে। জিতুর গাড়ি চালানোর হাত আর মেজাজ দুটোই ভালো। যেটুকু ঝাঁকুনি খেতে হয়েছে, সেটা গাড়ির আয়তনের কারণে, চালকের দোষে নয়। মাঝে শুধু কিছুক্ষণ ফারুক নিজের পছন্দের পুরানো হিন্দি ছবির গান একটানা শুনছিল। তাতে জিতু একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলল যে এই ধিমে লয়ের গান শুনতে শুনতে তার ‘নিন্দ’ এসে যাচ্ছে, তাই গাড়ি চালাতে অসুবিধা হচ্ছে। সেকথা শুনে ফারুক গান বদলে দিয়ে অ্যাবা, বনি এম জাতীয় ইংরেজি গানের শরণাপন্ন হয়েছিল। কিন্তু ছোঁড়ার তাতেও বিশেষ সুবিধা হল না। সে এবার বাকি রাস্তা নিজের পছন্দের গান চালাতে চালাতে এসেছে। গাড়ি যখন লাভার কাছাকাছি, তখন ফারুকের মনে হচ্ছিল এর থেকে ওই ধস নামা রাস্তায় গাড়ি ফুল স্পিডে চালিয়ে দিলেই হত।
ফরেস্ট এরিয়ায় ঢোকার পর অবশ্য সেই আতঙ্ক থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে। বৃষ্টিপ্রধান এই প্রাকৃতিক সিম্ফনি আপাতত শুনতে শুনতে ফারুক লাইজার কথা ভাবছিল। এই মহিলাকে সে একবারই কলকাতায় তাদের বাড়িতে দেখেছে। বেশ একটা স্মার্ট আর ঝকঝকে ব্যক্তিত্ব বলেই মনে হয়েছিল। এরকম একটি মানুষ অসুখে পড়ে শয্যাশায়ী অবস্থায় অন্যের সাহায্যের মুখাপেক্ষী—এটা ভাবতে ভালো লাগছিল না। এই দু—তিনদিনের দেরিতে কোনো বড়োরকমের ক্ষতিই হয়ে গেল কিনা কে বলতে পারে। আধ ঘণ্টা আগে ফোনের টাওয়ার ফিরে আসায় সে রোকসানাকে পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে। এত ঝামেলার মধ্যেও যে ফারুক হাল ছেড়ে না দিয়ে একটা ব্যবস্থা করতে পেরেছে শুনে সে বেশ খুশি। কোন গ্রামে যাচ্ছে প্রশ্ন করায় ফারুকের তখন খেয়াল হয়েছিল যে জিতুর গ্রামের নামটাই জিজ্ঞাসা করা হয়নি। এখন রাস্তা ক্রমশ মসৃণ হচ্ছে দেখে মনে হল তারা গন্তব্যের কাছাকাছিই এসে পড়েছে। সে আর—একবার সামনের দিকে ঝুঁকল।
“যেখানে নিয়ে যাচ্ছ, সেই জায়গাটার নাম কী?”
“কোলাখাম।”
***
“প্রতিভা! ও প্রতিভা!”
নাহ, কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। গেল কই মেয়েটা? ডলি রাইয়ের কপাল আর ভুরুর মাঝের চামড়া ঈষৎ কুঁচকে গেল। সে জানে এই রাগের গোটাটা তার মেয়ের উপর নয়। সে সম্ভবত বাড়িরই কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে থাকবে। তার মধ্যে বৃষ্টির যা অবস্থা, একদম কাছাকাছি না থাকলে গলার আওয়াজ ঠিকঠাক পৌঁছবেও না। ডলির রাগের আসল কারণ হল যে তাকে সামান্য এক বস্তা আনাজ দু’ধাপ সিঁড়ি পার করে হেঁশেলে নিয়ে যাওয়ার জন্যও মেয়ের সাহায্য নিতে হচ্ছে। আজীবন নিজের ক্ষমতা আর বিশ্বাসে ভর দিয়ে চলা মহিলার পক্ষে অন্যের শক্তির উপর নির্ভর করাটা এখনও রপ্ত হয়নি। আর শরীরটা ভাঙছেও যেন খুব তাড়াতাড়ি, বিশেষ করে ওই করোনার পর একগাদা ওষুধ, ইঞ্জেকশন করে যেন গায়ের জোর আর কাজের ক্ষমতা এক ধাক্কায় অনেকটা কমে গেছে। তার আশেপাশের অনেকে যেমন এইসব ভয়ে ভ্যাকসিন বা ওষুধের পথে পা বাড়ায়নি। কিন্তু ডলি এই গ্রামে থাকলেও ওরকম গেঁয়ো কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ নয়। আর তাছাড়া করোনা তার জীবন থেকে যা কেড়ে নেওয়ার তা ভালোভাবেই কেড়ে নিয়েছে।
ডলির গলার আওয়াজে সামনের ডাইনিং হল থেকে বছর ছাব্বিশ—সাতাশের এক বাঙালি যুবক এর মধ্যে বেরিয়ে এসেছে। ডলি তাকে দেখে একটু অপ্রস্তুতই হয়ে পড়ল।
“আরে, তুমি আবার এলে কেন? তুমি ভিতরে গিয়ে গল্প করো। প্রতিভা হয়তো আশেপাশে কোথাও আছে, চলে আসবে।” ডলির বাংলা উচ্চারণে টান কম, শুনতে বেশ স্পষ্ট লাগে।
“তাতে কী হয়েছে? এ তো দশ সেকেন্ডের কাজ। আমি এদিকটা ধরছি, আপনি উঠে আসুন।”
ডাইনিং হলের ভিতরেই রান্নাঘরের এক কোনায় বস্তাটা নামিয়ে রেখে ছেলেটিকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে ডলি একটু কিন্তু কিন্তু ভাব করে জিজ্ঞাসা করল, “তোমার নামটা কী গো? আসলে গেস্টদের সবার নাম তো আর জানা হয় না।”
“জয়দীপ।”
উত্তর দিয়ে ছেলেটি আবার জানালার ধারে তার চেয়ারের দিকে হাঁটা লাগাল। ওখানে বসেই এতক্ষণ সে যেই মানুষটির সঙ্গে গল্প করছিল, তার নাম পৃথ্বী রাই—ডলির স্বামী। পৃথ্বী আপাতত একটা দেশিয় পাইপে নতুন করে স্থানীয় তামাক ভরার কাজে ব্যস্ত। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসা ডলির নেপালি ভাষার গালাগালি তার মুখের নির্লিপ্ত শান্তিতে কোনো ব্যাঘাত করতে পারল না।
হঠাৎ আধ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটো ফোন এসে আজ ডলির ব্যস্ততা খানিক বাড়িয়ে দিয়েছে। নাহলে সে রুটিনমাফিক দিনের বেলার কাজ প্রায় গুছিয়েই এনেছিল। তার কাছে গতকাল থেকে আজ সকাল অবধি দুটো আলাদা পার্টি মিলিয়ে সাতজন গেস্ট, সবাই বাঙালি। ডাইনিংয়ের দরজা দিয়ে বেরিয়ে বাঁ হাতে, অর্থাৎ পুবদিকের একতলায় তিন নম্বরের ট্রিপল বেডরুমে আছে শিলিগুড়ি থেকে আসা একটি পরিবার। বাবা, মা আর মেয়ে—নাম বোধহয় দত্ত। মেয়েটির বয়স প্রতিভার মতোই হবে, অর্থাৎ কুড়ির নীচে। দক্ষিণদিকে ডাইনিং হলের মুখোমুখি এক আর দু’নম্বর ঘর নিয়ে আছে কলকাতা থেকে আসা চারজনের একটি দল। দুটি ছেলে, দুটি মেয়ে সবারই বয়স তিরিশের নীচে। এরা সবাই মিলে হইহই একটু বেশি করলেও বেআদবি কেউ করেনি। সন্ধ্যার পর খাওয়ার জায়গায় অনেকক্ষণ তাস নিয়ে বসেছিল। দত্ত পরিবারের মা আর মেয়েও একসময় সেই আড্ডায় যোগ দিতে দেখা যায়। কিন্তু তার জন্য কখনোই ডলি বা প্রতিভাকে অতিরিক্ত কোনো ফাই—ফরমাশ খাটতে হয়নি, কোনো অন্যায় আবদার মেটাতে হয়নি। এই জয়দীপ ছেলেটি ওই দলেরই একজন।
বস্তা থেকে আলু, পেঁয়াজ ইত্যাদি বের করে সেসব আলাদা করে সাজিয়ে রেখে ডলি সবে আর—এক প্রস্থ চাল ধুয়ে ভাত বসানোর কথা ভাবছে, তখনই আঠারো—উনিশ বছর বয়সি একটি ছিপছিপে মেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে ঢুকল।
“আমাকে খুঁজছিলে?”—মেয়েটির নেপালি উচ্চারণে তার আঞ্চলিক গ্রাম্য টান নেই বললেই চলে। হাবভাবও বেশ স্মার্ট আর স্বতঃস্ফূর্ত—সম্ভবত শহরাঞ্চলে স্কুল—কলেজ যাওয়ার কারণে।
“সে কথা এতক্ষণে কানে গেল?”—ডলির রাগ এখন কমে এসেছে।
“আরে আমি তো কটেজের ওদিকে ছিলাম। ডাক্তারবাবু আমাকে দেখতে পেয়ে ডেকে বললেন যে কামরায় কোনো তোয়ালে নেই, অ্যাশট্রে নেই। আমি আবার দৌড়ে গিয়ে ঘর থেকে সেসব নিয়ে তাঁকে সেটল করিয়ে এলাম। তাও তো আমি খুঁটির উপরের দেয়ালগুলো প্লাস্টিক শিট দিয়ে ঢাকতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু বেরোতেই জানালা দিয়ে বাবাকে দেখলাম আমার দিকে হাত নাড়ছে। ইশারা করে রান্নাঘরের দিকে দেখাল, তারপর একটা আঙুল গলার এপার থেকে ওপার করল। তাই আবার ওটা ফেলে এখানে ছুটে এলাম।”
ডাক্তারবাবু হল নীলাদ্রি—ডলির আট নম্বর গেস্ট এবং সকালের দ্বিতীয় ফোনের পরিণাম। সঙ্গে কোঠারি বলে ওই মাড়োয়াড়ি লোকটিও এসেছে, নয় নম্বর অতিথি হিসাবে। ফোনও সেই করেছিল। লোকটিকে ডলির খুব সুবিধার ঠেকে না। তবে এখনও অবধি যে ক’বার এখানে থেকেছে, কখনও কোনো ঝামেলা বা চালাকি করেনি। এরা দুজনেই একটা গাড়ি নিয়ে এসে পৌঁছাল কিছুক্ষণ আগে। ডলি দু’জনকে পুবদিকের দোতলায় দুটো পাশাপাশি ঘরের চাবি দিয়ে পাঠিয়েও দিয়েছিল। কিন্তু পাঁচ মিনিট পরেই ডাক্তারবাবুটি নেমে এসে ডলির কাছে জানতে চান যে উত্তর দিকে ডাইনিং পেরিয়ে যে কটেজটা দেখা যাচ্ছে, সেখানে থাকা যায় কিনা। যা এক্সট্রা চার্জ লাগবে তিনি দিতে প্রস্তুত।
ডলি বড়োলোকদের এই ব্যাপারগুলো খুব ভালোমতন জানে ও বোঝে। এক হল প্রাইভেসি আর তার থেকেও বড়ো কথা হল সবার থেকে আলাদা বা স্পেশাল কোনো ব্যবস্থা—ঘর, গাড়ি, খাবার যাই হোক না কেন—সেটার প্রতি একটা সাংঘাতিক টান। ডলি কোনো কথা না বাড়িয়ে, ওঁকে দশ মিনিট অপেক্ষা করতে বলে। তারপর কটেজ খুলে পরিষ্কার করে, নতুন বিছানা, বালিশ, চাদর, ইত্যাদি পেতে দিয়ে, ছয় নম্বর ঘর থেকে ওঁর মালপত্র আবার এই নতুন ঘরে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করে দেয়। এখন প্রতিভার কথা শুনে মনে হচ্ছে ডাক্তারবাবু অবশেষে শান্তি পেয়েছেন।
করোনার পরে আচমকা ট্যুরিস্টের চাপ বেশ বাড়তে শুরু করে। সেই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের মাধ্যমে হোমস্টের ব্যাবসায় টাকা খাটাতে আগ্রহী হয়ে পড়ে বহু বাইরের ব্যবসায়ী। নিজেদের অতি সাধের হিলটপ হেভেন হোমস্টেকে এই প্রতিযোগিতায় একটু এগিয়ে রাখতে ডলি কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। ঘরের সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দুটো স্পেশাল কটেজ তৈরি করা—মাটি থেকে একটু উঁচুতে, চারদিকে বারান্দা দিয়ে ঘেরা। ভিতরে স্যুইটের কায়দায় পার্টিশন করা থাকবে যাতে বাথরুম ছাড়াও আলাদা বসার ঘর আর শোয়ার ঘরের অভিজ্ঞতা হয়। এখন অবধি একটার কাজ শেষ হয়েছে আর অন্যটায় সবে হাত দেওয়া হয়েছে। সেটায় এখন খুঁটির উপর চারটে অর্ধেক দেয়াল—ইচ্ছে আছে যদি পুজোর সিজনের আগে কাজ শেষ করে ফেলা যায়।
“যাইহোক, এখানে আর কিছু লাগবে না। তুমি ওই দেয়াল প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে, ভালো করে বেঁধে দিয়ে আসবে। তারপর গোপালকে নিয়ে আর—একবার ছয় নম্বর কামরা ভালো করে ঝাড়পোঁছ করে রেডি করে রাখো। জিতু ফোনে যার কথা বলল, সেই লোককে ওই ঘরটাই দিয়ে দেব। আশা করি তার কোনো প্রবলেম হবে না। এক কাজ করো, ঘরটার কাজেই আগে হাত দাও। গেস্ট যে—কোনো সময় হয়তো চলে আসবে।”
ডাইনিং—কাম—রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে প্রতিভা “গোপাল!” বলে এক হাঁক দিয়ে বাঁদিকের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল। এই সিঁড়িটা সোজা অনেকটা উঠে যায় পাহাড়ের উপরের একটা ধাপে। ওখানে একটা দোতলা বাড়িতে রাই পরিবারের বাস। নীচে দুটো ছোটো ঘর আছে। সেখানে প্রয়োজনমতো ফাই—ফরমাশ খাটা দুটি ছেলে ও ট্যুরিস্টদের সঙ্গে আসা ড্রাইভারদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এই সিঁড়িরই মাঝামাঝি একটা ধাপের ডানদিকে একটা টানা বারান্দা আছে, যেখানে হোমস্টের পাঁচ আর ছয় নম্বর ঘর। দুটোই যাকে বলে সিঙ্গল রুম। আপাতত পাঁচ নম্বরটি দখল করে আছে কেশব কোঠারি। সেই ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিভা দেখল দরজা অর্ধেক ভেজানো, ভিতরে কেশব জুতোজোড়া সমেত পা তুলে দিয়ে খাটের উপর গা এলিয়ে পড়ে আছে।
উপরের এই বারান্দাটা একটু এগিয়ে থাকায় নীচের ঘরগুলোর মানে তিন এবং চার—কিছুই টের পাওয়া যায় না। আবার একই কারণে আশপাশ ও সামনে—পিছনে মিলিয়ে অনেকটা দূর অবধি দেখা যায়। প্রতিভা দেখল কটেজ পেরিয়ে ওদিকে যে বেশ কিছু গাছ আছে, তার আড়াল থেকে তিনজন মেয়ে দুটো ছাতা নিয়ে গায়ে গায়ে হাঁটতে হাঁটতে এদিকেই এগিয়ে আসছে। দত্তবাবুর মেয়ের চুলে উজ্জ্বল লাল স্ট্রিক করা, তাই দূর থেকেই চেনা যায়। বাকিরা কলকাতা থেকে আসা গ্রুপের দু’জন। খুব সম্ভবত বাবা—মা সঙ্গে থাকায় দুই বড়ো ‘দিদি’কে নিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খেয়ে এল। এখন কাছাকাছির মধ্যে চলে এসেছে—বৃষ্টি ছাপিয়ে ওদের হাসির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
প্রতিভার বাঁদিক থেকে একটা শব্দ এল। নীচে এক নম্বরের দরজা খুলে একটি লম্বা ছেলে বেরিয়ে এসে খোলা জায়গাটায় দাঁড়াল। হাতে একটা দোমড়ানো বিয়ারের ক্যান। কলকাতা পার্টির চতুর্থ সদস্য। গায়ে অঝোরে বৃষ্টির জল পড়ছে, কিন্তু তা নিয়ে যেন বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রতিভার সঙ্গে আলতো চোখাচোখি হল, কিন্তু ছেলেটা আবার চোখ নামিয়ে নিল। দলের মধ্যে এ যেন একটু বেশিই গম্ভীর ধরনের। মেয়েদের দলটা অনেকটাই কাছাকাছি চলে এসেছে। এখন তাদের কথাবার্তাও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সেটা আঁচ করেই যেন ছেলেটি সামনের দিকে রাখা লাল প্লাস্টিকের ডাস্টবিনের খোলা মুখ লক্ষ্য করে হাতের ক্যানটা ছুঁড়ে মারল। নির্ভুল নিশানায় একটা মৃদু ধাতব শব্দে সেটা বিনের ভিতরে গিয়ে আছড়ে পড়ল। আর ঠিক নাটক বা সিনেমার মতো, এই শব্দের সূত্র ধরেই যেন রাস্তার শেষ বাঁকের আড়াল থেকে জিতুর জলপাই রঙের ওয়াগন—আর গাড়িটা দেখা গেল।
দশ নম্বর অতিথিও হাজির। বৃষ্টিও ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে। আকাশের যা অবস্থা, অন্তত দিন—তিনেকের জন্য এই দশজনের আপাত ঠিকানা হতে চলেছে কোলাখামের হিলটপ হেভেন হোমস্টে।
***
নিজের ঘরে তালা লাগিয়ে ফারুক দোতলার বারান্দায় একটা কাঠের থামে আলতো হেলান দিয়ে দাঁড়াল। নীচে তাকালে বেশ বড়োসড়ো চৌকোমতন ফাঁকা জায়গা, যেটার এক ধার দিয়ে বেশ কিছু ফুলের টব। সেইসব টবের সারির গা দিয়ে দুটো বেঞ্চের মতো বসার জায়গা এবং এককোণে একটা ডাস্টবিন। এটারই পাশ দিয়ে বাঁদিকে একটা প্রায় একশো আশি ডিগ্রি বাঁক খেয়ে, দশ—বারো মিটার লম্বা ঢালু রাস্তা মেন রোডে গিয়ে নেমেছে। ফাঁকা জায়গাটায় আপাতত দুটো গাড়ি পার্ক করা আছে—একটা সাদা রঙের বড়ো এসইউভি আর অন্যটা জিতুর ওয়াগন—আর। একটা স্বচ্ছ রেনকোট পরা অল্পবয়সি ছেলে এইমাত্র এসইউভির জানালায় টোকা মেরে কিছু একটা বলে যাওয়ায় গাড়ির ড্রাইভার লাফ দিয়ে নেমে ছেলেটির সঙ্গে বৃষ্টি মাথায় করে দৌড় লাগাল।
ফারুক বারান্দা থেকে সামনের দিকে তাকাল। মেন রোডের অন্যদিকে খাদ এবং সেইদিকে আপাতত গোটা আকাশ প্রান্তর জুড়ে আছে গাঢ়, ভারী মেঘের পর্দা। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে নাকি এখান থেকে চমৎকার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। কিন্তু এখন যা অবস্থা, তাতে মেঘের ওপারের সম্ভাব্য দৃশ্য দেখতে গেলে একমাত্র কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে। সেখানে বরফঢাকা পাহাড়ের চূড়াও থাকতে পারে, ঝলমলে আলো আর বিরাট ইমারত দিয়ে সাজানো পেল্লায় শহরও থাকতে পারে আবার রূপকথার গল্পের হারানো রাজ্যও থাকতে পারে। ফারুক দীর্ঘদিন কলকাতায় থেকে বিলক্ষণ বুঝতে পারে যে সে এখন আদ্যন্ত একজন শহুরে মানুষে পরিণত হয়েছে। এইধরনের কল্পনাপ্রবণ বিলাসিতা তার পক্ষে বেশিক্ষণ উপভোগ করা সম্ভব হয় না। ছোটোবেলায় প্রকৃতির সঙ্গে তার যে সরাসরি যোগাযোগ ছিল, তা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে আজ অনেকদিন হল।
“খানা লাগা দিয়া।” স্বচ্ছ রেনকোট যে কোন ফাঁকে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে, সে খেয়ালও করেনি। মাথা নেড়ে বিনা বাক্যব্যয়ে ছেলেটির পিছন পিছন সিঁড়ি দিয়ে নেমে ডাইনিং হলে ঢুকল।
ঘরের ভিতরে অনেক মানুষের উপস্থিতি এবং সেইসঙ্গে পাশে রান্নাঘরের ব্যস্ততা, বাসনকোসনের শব্দ আর গলার আওয়াজের কোলাহল মিশিয়ে বেশ একটা ট্যুরিস্ট স্পট সুলভ আমেজ তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় এরকম পরিবেশের সম্মুখীন হয়ে অধিকাংশ পর্যটকেরই হয়তো তাচ্ছিল্যে আর বিরক্তিতে ঠোঁট উলটে যেত। কিন্তু বাইরের ধূসর প্রদর্শনীর পরে এই রঙিন সার্কাসও যথেষ্ট উপভোগ্য মনে হচ্ছে। দরজা দিয়ে ঢুকেই ডানদিকের একাংশ জুড়ে একটি কাউন্টার। সেটা মূলত রিসেপশন বলা যায়, আবার সেখানে বিক্রির জন্য সিগারেট, জলের বোতল, কোল্ড ড্রিংক, বিয়ার, লজেন্স জাতীয় জিনিসপত্রও সাজানো আছে। কাউন্টারের ঠিক পাশেই রান্নাঘর, যেটা হয়তো ছ’ফুট মতো চওড়া কিন্তু লম্বালম্বি চলে গেছে একদম অপর প্রান্তের দেয়াল অবধি। এছাড়া বাঁদিকে আন্দাজ প্রায় কুড়ি ফুট বাই বাইশ ফুট জায়গা জুড়ে দুটো বড়ো আর দুটো মাঝারি মাপের খাওয়ার টেবিল। রান্নাঘরের দিক বাদ দিয়ে বাকি তিনদিকের দেয়ালেই দুটো করে বড়ো জানালা থাকায় এই ঘন মেঘলা দুপুরেও ঘরের মধ্যে যথেষ্ট আলো আছে।
“এখানে বসতে পারি?” একটু ভিতরের দিকের একটি মাঝারি টেবিলের সামনে গিয়ে চেয়ারের উপর হাত ঠেকিয়ে ফারুক প্রশ্ন করল।
“শিওর, শিওর! হোয়াই নট?” উলটোদিকের লোকটির বাঁ হাত কালোয়াতি গানের ওস্তাদের মতো এক ঝটকায় এগিয়ে এসে তার উদার মনোভাবের কথা জানান দিল। কাছ থেকে লক্ষ করলে বোঝা যায় লোকটির বয়েস আনুমানিক পঞ্চাশের বেশি হবে না। কিন্তু শরীরের অবাঞ্ছিত সব স্থানে মেদ জমাট বেঁধে মানুষটিকে অযথা প্রবীণ নাগরিকদের দলে ঠেলে দিয়েছে। পরনে জাম রঙের উইন্ডচিটারের নীচে আকাশি রঙের গেঞ্জির উপর একটি পরিবেশ সচেতনতা বিষয়ক বার্তা এবং তার নীচে একটি রেড পান্ডার ছবি। গেঞ্জির মালিকের বপুর কারণে অবশ্য রেড পান্ডার মুখটা ঠেলে এগিয়ে এসেছে অনেকটাই।
“আপনারা তো বোধহয় গতকাল চেক ইন করেছেন? তখন তো অবস্থা একটু বেটার ছিল।” ফারুক থালাটা নিজের দিকে অল্প টেনে, সামনের প্লেটে রাখা স্যালাড থেকে দু’টুকরো পেঁয়াজ তুলে নিল।
“বেটার মানে! গতকাল এরকম সময় খেয়ে উঠে আমরা তখন ছাঙ্গে ফল্স যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছি। কেউ কল্পনাই করতে পারেনি ওভারনাইট সিচুয়েশন এরকম হয়ে যাবে। ফ্যামিলি নিয়ে একটু রিল্যাক্স করতে এসে কী দুর্ভোগ বলুন তো! ভালো কথা, এই হল আমার স্ত্রী আর ওইদিকে ওই হল গিয়ে আমার মেয়ে।”
ভদ্রলোকের স্ত্রী ওঁর থেকে হয়তো বছর পাঁচেকের ছোটো হবেন, কারণ এক ঝলক দেখে মহিলাকে অন্তত পনেরো বছরের ছোটো মনে হচ্ছে। উনি তখন সবে মুখে এক গ্রাস ভাত পুরেছেন। এই আচমকা সামাজিকতায় খানিক থতমত খেয়ে, একটু মাথা নাড়ানো ছাড়া আর কিছু করতে পারলেন না। অন্যদিকে মেয়ে কিন্তু পাশের বড়ো টেবিলে বসা একটি অল্পবয়সি বাঙালি দলের সঙ্গে গল্পে মশগুল হয়ে আছে। বোঝা যাচ্ছে একদিনের মধ্যেই এদের মধ্যে আলাপ পরিচয় ও বন্ধুত্ব বেশ নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
এই দলটির সঙ্গে ফারুকেরও একটা প্রাথমিক সাক্ষাৎ আর আলাপ হয়েছে, বা বলা উচিৎ চারজনের মধ্যে তিনজনের সঙ্গে। তার গাড়ি যখন সবে টার্ন নিয়ে ঢুকছে, তখনই দলের দু’জন মেয়ে এবং একজন ছেলে বাইরে পার্কিংয়ের জায়গাটা পার করে সম্ভবত নিজেদের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। গাড়ির ছাদ থেকে একটা স্যুটকেস আর একটা ট্রলি ব্যাগ নামানোর সময় ঐশানী বলে মাঝারি উচ্চতার ঈষৎ ভারী চেহারার মেয়েটি এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করে, তার কোনো সাহায্য লাগবে কিনা। তারপর নিজেই পাশের মেয়েটিকে বলে হোমস্টের মালিককে খবর দিতে এবং ফারুককে ডাইনিং হলের দিকে নির্দেশ করে বলে ওখানে গিয়ে কথা বলতে। আপাতত জানা গেছে যে এরা সবাই কলকাতার বাসিন্দা এবং সদ্যই কর্মজীবন শুরু করেছে।
এখন ওই টেবিল থেকে একটা জোর হাসির রোল উঠেছে। যেটুকু টুকরো টুকরো কথা কানে আসছে তাতে মনে হচ্ছে ঐশানী আর জয়দীপ মিলে গতকাল ছাঙ্গে ফলসের কোনো একটা ঘটনা নিয়ে অন্য মেয়েটির পিছনে লাগছে। খুব সম্ভবত এই মেয়েটিই বাকিদের অনেক আশ্বাস দিয়ে জলে নামার উৎসাহ দেয় এবং তার পরমুহূর্তেই নিজে কোনো একটা শেওলা ঢাকা পাথরে পা হড়কে জলে পড়ে যায়। এই হাসাহাসিতে ফারুকের উলটোদিকে বসা ভদ্রলোকের মেয়েও যথেষ্ট অংশগ্রহণ করছে—কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছে মেয়েটির নাম কৃতিকা। শুধু ওই দলের অন্য লম্বা চেহারার ছেলেটি, যাকে এই খাওয়ার ঘরেই ফারুক প্রথম দেখল, এসবের মধ্যে যোগ না দিয়ে একমনে খেয়ে চলেছে।
উত্তরবঙ্গ বা সিকিম জুড়ে গত বছর দশেক ধরে ট্যুরিস্টদের কাছে হোমস্টের অভিজ্ঞতা নতুন নয়। এদের অধিকাংশেরই খাবারের ধরনটা প্রায় একইরকম। হয় ভাত বা রুটি, সঙ্গে একবেলা ডিমের ঝোল এবং একবেলা মুরগির ঝোল। রান্নার ধরনেরও বিশেষ রকমফের হয় না। এখানে জিতুর আংকেল, যিনি সম্ভবত রান্নার দায়িত্বে, সত্যিই বেশ ভালো রেঁধেছেন। কিন্তু তাও কথাবার্তা বাদ দিয়ে শুধু প্লেটেই মনোনিবেশ করে থাকাটা ওই ছেলেটির ক্ষেত্রে একটু চোখে লাগারই মতো।
ফারুকদের পিছনের টেবিলে একটা চেয়ার টানার শব্দ হল। এতক্ষণ ধরে রান্নাঘরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রাই দম্পতির সঙ্গে অনর্গল নেপালি ভাষায় গল্প করে, এবার কেশব এসে নীলাদ্রির মুখোমুখি খেতে বসল। ঘরের মধ্যে এই টেবিলটাই রান্নাঘর ঘেঁষা এবং বাকিগুলোর থেকে দূরত্ব সামান্য বেশি। ফলে উত্তরের জানালার সান্নিধ্য একটু কম হলেও রান্নাঘরের দেয়ালে রেস্তোরাঁর মতো যে খোপ কাটা আছে, সেটা একেবারেই পাশে। ফলে অন্যান্য টেবিলের তুলনায় ওখানে খাবার পৌঁছোচ্ছে একটু তাড়াতাড়ি।
ব্যাপারটা এতক্ষণে আঁচ করতে পেরে উলটোদিকের ভদ্রোলোক দু’বার আক্ষেপের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে, তারপর ফারুকের দিকে তাকিয়ে গলার আওয়াজ বেশ অনেকটা নামিয়ে আনলেন।
“ওই লোকটা বোধহয় বিহারি। একদম লোকালদের মতো নেপালিতে কথা বলে যাচ্ছিল। অনেক বিহারিরা কিন্তু নেপালি হয়, জানেন তো? ওই হিন্দি সিনেমার গায়ক আছে না, উদিত নারায়ণ?”
আচমকা এহেন বিচিত্র নৃতাত্ত্বিক বক্তব্যের উত্তরে কী বলবে বুঝতে না পেরে ফারুক বলল, “না, বিহারি মনে হয় না। সম্ভবত মাড়োয়ারি। আমার থেকে মিনিট চল্লিশেক আগে চেক ইন করেছেন। রেজিস্টারে এন্ট্রি করার সময় নাম দেখলাম কোঠারি। অন্য ভদ্রলোকটি ডাক্তার, নাম চক্রবর্তী। আপনি বোধহয় মিস্টার দত্ত?”
“একদম ঠিক ধরেছেন! এই এঁরা কিন্তু এসব ফর্মালিটির ব্যাপারে বেশ… মানে ফর্মাল আরকি!”
কোঠারির গলা শোনা গেল। নেপালি ভাষায় রান্নাঘর থেকে কিছু একটা হয়তো চাইছে। উলটোদিকে বসে খেতে খেতে নীলাদ্রির এখন একটু লজ্জাই লাগছে। অকারণে লোকটাকে সুযোগসন্ধানী মনে করে সে সন্দেহ করছিল। আগাগোড়া লোকটা ভদ্র ব্যবহার করা আর সুপরামর্শ দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেনি। এখানে এসে পৌঁছানোর আগে অবধি নীলাদ্রি ধরেই নিয়েছিল যে কোনোমতে মাথা গোঁজার মতো একটা ঘুপচি ঘর গছিয়ে নির্ঘাত প্রচুর টাকার বিল ধরাবে। কিন্তু এখানে এসে শুধু যে তার আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে তাই নয়, বরং রীতিমতো সস্তায় একটা যথেষ্ট ভালো কটেজ পাওয়া গেছে। কেশবকে এখন তার পরম হিতৈষী বলেই মনে হচ্ছে।
“এখানকার বন্দোবস্ত সব ঠিকঠাক লাগছে তো?” প্রশ্নটা এল। প্রায় যেন তার মনের কথা ধরেই।
“হ্যাঁ হ্যাঁ, একদম পারফেক্ট!” নীলাদ্রি একটু বেশি জোরের সঙ্গেই উত্তরটা দিল। “মানে অল থ্যাংকস টু ইউ। একটা এরকম সুন্দর পাহাড়ি জায়গায় এত ভালো একটা কটেজ… এরকম লাস্ট ছিলাম সেই মধ্যপ্রদেশে, আরে কী যেন জায়গাটার নাম—” , বাঁ হাতটা মাথার কাছে এসে দুটো তুড়ি মারতে স্মৃতির অতল থেকে নামটা উঠে এল, “পাঁচমারি!”
“আরে এতে থ্যাংক ইউ—এর কোনো ব্যাপারই নেই। বিপদে পড়লে তো মানুষকে হেল্প না করলে—আরে স্যালাড নেহি, ম্যায়নে সবজি বোলা থা।”
ডলি মৃদু গলায় ‘সরি’ বলে প্লেটটা হাতে নিয়ে ওই কলকাতার দলটার টেবিলে আস্তে করে নামিয়ে রাখল। জয়দীপ আর ঐশানী দুজনেই বেশ খানিক স্যালাড নেওয়ার পরে প্লেটে শুধু দুটো শসা আর একটা পেঁয়াজের টুকরো পড়ে আছে। ওদের দলের চশমা পরা মেয়েটি হাতের ইশারায় না করে দিয়ে লম্বা ছেলেটির দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করল, “এগুলো খেয়ে নিবি ঋজু?”
“নাহ, ফালতু ফালতু খাবার ঠুসতে পারব না।” ঋজুর কথাটা একটু কর্কশ শোনাল।
“যাচ্চলে, দুটো শসা পেঁয়াজে কি তোর পেট ফেটে যাবে?” জয়দীপ হালকা খোঁচা দিয়ে বলল।
“হতেই পারে। খাওয়ার একটা লিমিট তো আছে। সবাইকে অন্তত নিজেরটা বুঝেই চলা উচিৎ!” অন্যদিকে তাকিয়ে উত্তর এল।
“প্লিজ! এই নিয়ে আবার একটা সিচুয়েশন তৈরি করতে হবে না। আমি যতটা পারি নিয়ে নিচ্ছি।” চশমা পরা মেয়েটি হাত বাড়িয়ে শসার টুকরোগুলো তুলে নেওয়ায় এবার জয়দীপও শেষ পেঁয়াজের চাকতিটার দিকে হাত বাড়াল। গোটা কোলাহলের মধ্যে সবথেকে বেশি আওয়াজ এই টেবিল থেকে আসছিল। তাই ওরা সবাই একটু চুপ হয়ে যাওয়ায় পুরো ঘরের শব্দের মাত্রাই একটু নেমে এল। রান্নাঘর থেকে কোনো একটা স্টিলের বাটি বা প্লেট পড়ে যাওয়ার আওয়াজও পাওয়া গেল। তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রতিভা একটা বড়ো ট্রে নিয়ে এসে ফারুকদের ডান পাশে একমাত্র ফাঁকা টেবিলে অতি সন্তর্পণে নামিয়ে রাখল। সেখানে একটা মাঝারি থালায় ভাত আর একটা ক্যাসারলে রুটি।
“আজকে একটু হঠাৎ করেই প্রেশারটা বেশি পড়ে গেছে, নাহলে এঁদের সার্ভিস কিন্তু খুব টিপটপ।” খাওয়া শেষ করে থালাটা আলতো ঠেলে দিয়ে, রান্নাঘরের দিকে চোখের ইশারা করে বললেন দত্তবাবু।
“ঘরদোরের মেনটেন্যান্সও তো দেখলাম বেশ প্রফেশনাল। মানে আমার একটা সাধারণ সাইজের ঘরেও টেবিল, আয়না, প্লাগ পয়েন্ট সবকিছুর অ্যারেঞ্জমেন্টই বেশ যত্ন নিয়ে করা।”
“আসলে এঁরা হাজব্যান্ড ওয়াইফ দু’জনেই অনেকদিন কলকাতা শহরে ছিলেন। ফলে আদবকায়দার ব্যাপারটা আছে, বুঝলেন তো? আচ্ছা আমি একটু উঠছি।”
দত্তবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর স্ত্রী আর মেয়ের খাওয়াও শেষ। মেয়ের পাশের টেবিলেও খাওয়ার পর্ব মিটে গেছে। আপাতত শুধু ঋজু আর তার পাশের চশমা পরা মেয়েটি বসে আছে। ঋজুর হাতে একটা স্প্রাইটের ছোটো বোতল। সে মাঝে মাঝে সেটাতে চুমুক দিচ্ছে আর পাশের মেয়েটির কথা মন দিয়ে শুনে যাচ্ছে। মেয়েটির গলার স্বর এত নীচে, যে সেসব কথা ফারুকের কান অবধি পৌঁছোচ্ছে না। পিছনের টেবিলে আবারও চেয়ারের শব্দ আর মৃদু সৌজন্য বিনিময়ে বোঝা গেল যে কোঠারিও উঠে পড়েছে। হাত ধোয়ার বেসিনটা ঘরের বাইরে। ফারুক একটু বাঁদিকে ঝুঁকে অপর প্রান্তের জানালা দিয়ে দেখল যে সেখানে একটা ছোটোখাটো লাইন তৈরি হয়েছে। সেও এবার হাত চালিয়ে শেষ কিছু গ্রাস তাড়াতাড়ি মুখে পুরে ওঠার প্রস্তুতি নিল।
লাঞ্চপর্ব শেষ বুঝতে পেরে পৃথ্বী রাই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে একটা আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিতে হাত দুটো মাথার উপর তুলে টানটান করে নিয়ে পকেট থেকে তার পাইপটা বের করে তাতে আগুন ধরাল। ধোঁয়া ছাড়ার সময় আমেজে প্রায় চোখ বন্ধ। ফলে, ডাইনিং হলের দরজা দিয়ে বেরোনোর সময় আর—এক-টু হলে সেই চশমা পরা মেয়েটির সঙ্গে ধাক্কা লাগত। ফলে দু’পক্ষই অপ্রস্তুত হয়ে একে অপরের সঙ্গে ‘সরি’ বিনিময় শুরু করায়, এক ফাঁকে ফারুক বেরিয়ে এসে হাত ধোয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ভিতরের কোলাহলটা এখন বাইরে ছড়িয়ে—ছিটিয়ে গিয়ে একটা মাঝারি গুঞ্জনে পরিণত হয়েছে। মিস্টার আর মিসেস দত্ত প্রতিভাকে ডেকে খুব গম্ভীরভাবে তাঁদের বিকেলের চায়ের অভ্যাস সম্পর্কে বোঝাচ্ছেন। ঐশানী কানে ফোন নিয়ে লামাসুলভ ধৈর্য সহকারে অপরদিকে কাউকে বোঝাচ্ছে যে তাদের বৃষ্টি ভিজে অসুস্থ হয়ে পড়া বা ধসের কবলে পড়ে মৃত্যু হওয়া—কোনোটারই সম্ভাবনা নেই। কৃতিকা একটা ছাতা মাথায় দিয়ে ব্যাজার মুখ করে তার বাবা—মায়ের জন্য অপেক্ষা করে যাচ্ছে। এবার চশমা পরা মেয়েটিকে দেখতে পেয়ে, একটু গলা তুলে ডাক দিল।
“দেবলীনাদি, হাত ধুয়ে একবার এদিকে এসো!”
দেবলীনা তার দিকে তাকিয়ে একবার হাত তুলল। ইতিমধ্যে জয়দীপ হাত ধোয়া শেষ করে একটু হেসে ফারুককে জায়গা ছেড়ে দিয়ে, পৃথ্বী রাইকে দেখতে পেয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল।
“খুব ভালো খেলাম! রাতে সেই স্পেশাল চিকেন হবে নাকি?”
“সেই মোরগা তো দল্লে দিয়ে মাখানো হয়। পাহাড়ি লঙ্কার ঝাল! সাধারণ গেস্টরা খেতে পারবে না। তোমরা একা থাকলে করতাম।”
“যাঃ!”
“আচ্ছা দাঁড়াও দেখছি এর মধ্যে আলাদা করে বাড়িতে রান্না করলে তোমাকে আমাদের সঙ্গে খেতে বলব।”
“আরে কেয়া বাত! ভুলবেন না কিন্তু।”
পৃথ্বী রাই খোশ মেজাজে হাসতে হাসতে সিঁড়ির দিকে হাঁটা লাগাল। ফারুক এগিয়ে গেল জয়দীপের দিকে।
“আমরা একদল লোক এসে পড়ে তোমাদের কোনো খাওয়ার প্ল্যান গোলমাল করে দিলাম নাকি?”
“আরে না না, এই পৃথ্বী আংকেলের এটা নাকি স্পেশাল রেসিপি। তাই আমিই একটু ধরেছিলাম। আমার বাকি বন্ধুরাও অত ঝাল খেতে পারে না।”
“তোমার সঙ্গে তো বেশ আলাপ হয়ে গেছে। আর উনি বাংলাটাও বলেন খুব পরিষ্কার। শুনলাম তো একসময় নাকি কলকাতায় থাকতেন।”
“থাকতেন মানে! উনি কিন্তু কলকাতার স্টার ছিলেন। বিখ্যাত ফুটবলার, টানা ফার্স্ট ডিভিশন খেলেছেন। ৮৮ সালে প্রথম জর্জ টেলিগ্রাফের হয়ে খেলেন। তারপর এরিয়ান্সে দীর্ঘদিন ছিলেন। ফাইনালি ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলার সময় একটা চোট পেয়ে বেশ কিছুদিন টিমের বাইরে থেকে, তারপর রিটায়ার করে গেলেন। আমার বাবা—টাবারা তো বলে সুরজিৎ সেনগুপ্তর পর কলকাতার মাঠের গ্রেটেস্ট উইংগার। সবাই বলত নেপালি গ্যারিঞ্চা! আমার আবার খেলাধুলো নিয়ে একটু উৎসাহ আছে। আমিই বলতে গেলে যেচে পড়ে আলাপ করলাম।”
“বোঝ অবস্থা! ঝড়বৃষ্টির পাল্লায় পড়ে, প্ল্যান বাতিল করে, কোন ইন্টেরিয়রে একটা গ্রামের হোমস্টেতে এসে উঠলাম। আর সেখানে কিনা হাতের কাছে এরকম একজন বিখ্যাত মানুষ!”
“দুজন।” শুধরে দেওয়ার ভঙ্গিতে জয়দীপ বলল।
“মানে?” ফারুকের কণ্ঠস্বরে বিস্ময় একেবারে স্পষ্ট।
“আপনার খানিক আগেই যিনি চেক ইন করেছেন। ডক্টর নীলাদ্রি চক্রবর্তী। বিরাট নামজাদা সার্জেন। আমার বন্ধু ঋজু পয়েন্ট আউট করল। ওর এক আত্মীয়র কী একটা ইন্টারনাল হ্যামারেজ টাইপের কিছু হয়েছিল। তখন নাকি বহু সাধ্যসাধনা করে এঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে এঁকে দেখানো হয়। তবে ইন্টারেস্টিংলি, সেই চিকিৎসা বা অপারেশন নাকি সাকসেসফুল হয়নি। পরে কীসব কমপ্লিকেশন দেখা যায়, ঠিক জানি না। তবে ঋজু বা ওদের ফ্যামিলির কেউই এঁকে ঠিক পছন্দ করে না। বাট এনিওয়ে, ভদ্রলোক যে বিখ্যাত সেই নিয়ে সন্দেহ নেই।”
ফারুক সত্যিই অবাক হয়ে ভাবতে লাগল। স্রেফ কাকতালীয়ভাবে একটা জায়গায় এসে উঠে, সেখানে দু’জন নিজের নিজের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া—অঙ্কের হিসাবে এর সম্ভাবনা কতটাই বা হতে পারে? ফারুক ডাইনিং হলের দিকে চোখ ফেরাল। নীলাদ্রি হাত ধুয়ে নিজের চেয়ার আরও বেশ খানিকটা টেনে নিয়ে, উত্তরদিকের জানালা দিয়ে নিজের কটেজের দিকে তাকিয়ে আছে।
হলের ভিতর আর—একজনও বসে আছে। খাওয়া শেষ হয়ে গেলেও ঋজু এখনও নিজের জায়গা থেকে নড়েনি। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে নীলাদ্রির দিকে। সেই দৃষ্টিতে আদপেই কোনো আলগা ঔৎসুক্য নেই।
***
সূর্য যদিও সবার অগোছকরে মেঘের আড়ালে থেকেই অস্ত গেল, সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল সকলকে জানান দিয়েই। গোটা দিনজুড়ে রোদের মুখ না—দেখা মানুষ ও প্রকৃতির উপর দিয়ে আবার নতুন করে আঁধারের তাঁবু খাটিয়ে দেওয়া হল। বৃষ্টির প্রকোপ সামান্য হলেও কমেছে। সেখানে কান পাতলে এখন ঝিঁঝির ডাক শোনা যাচ্ছে, ক্ষীণ কিন্তু অবিরাম। এর বাইরে অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলোর উপর যেন নির্দিষ্ট সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়েছে। শব্দ—দৃশ্য—গন্ধের আর কোথাও কোনো বৈচিত্র্য নেই। জানালা দিয়ে হোক বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে, দোতলায় হোক বা রাস্তায়—সোজা তাকিয়ে থাকলে সব আকৃতি, রং বা দূরত্বের তফাত মুছে গিয়ে শুধুই এক নিশ্ছিদ্র কালো সমুদ্র, যার ঢেউ নেই, গর্জন নেই। যেন সভ্যতার শেষ সীমান্ত, পৃথিবীর অন্তিম প্রহর।
দুপুরবেলা খেয়ে উঠে ফারুক ভাবল হোমস্টের আশপাশটা একটু ঘুরে দেখবে। একটা ছাতা জোগাড় করতে বিশেষ বেগ পেতে হল না। সেটা মাথায় দিয়ে, সে কটেজের পিছন দিকে জঙ্গলের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল। কিন্তু কয়েক পা যেতেই ফারুক বুঝল যে এই পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রাখাই ভালো। সিমেন্ট বাঁধানো রাস্তা শেষ হতেই যে মেঠো পথ এঁকেবেঁকে ওদিকে উঠে গেছে, একটানা বৃষ্টির কারণে সেখানে ইতিমধ্যেই প্রায় গোড়ালি ডুবে যাওয়ার মতো কাদা। তার উপর পথের কিছু কিছু অংশ বেশ ঢালু। ফলে একটা আছাড় খেলে ব্যাপারটা আক্ষরিক অর্থেই অনেকদূর গড়াতে পারে।
দু’মিনিট পরে ফারুক যখন ডাইনিং হলে ফিরে এল, পৃথ্বী রাইয়ের রান্নাঘরের গোছগাছ তখনও শেষ হয়নি। সে বিনা বাক্যব্যয়ে ফারুকের হাত থেকে ছাতাটা নিয়ে ঘরের এক কোনায় মেলে দিল। ডাইনিং হল মোটামুটি ফাঁকা। শুধু ডঃ নীলাদ্রি চক্রবর্তী একদম উত্তর দিকের জানালার ধারে চুপ করে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। ফারুকের মনে হল, এর অবস্থাও হয়তো তার নিজের মতো। সাধারণ ব্যস্ততার মধ্যে এরকম আচমকা জুটে যাওয়া অবসরের সুযোগ সচরাচর মেলে না। এইসব ভাবতে ভাবতে সে সিঁড়ি বেয়ে উঠে দোতলার বারান্দায় পা দিয়ে দেখল, তার পাশের ঘরের অতিথি একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে সামনের রেলিংয়ে পা তুলে বসে আছে। দেখে মনে হচ্ছে গভীর চিন্তামগ্ন। দু’চোখ বন্ধ, কিন্তু মাথার পিছনে হাতের আঙুলগুলো ঠিক একটা নির্দিষ্ট তালে টোকা মেরে চলেছে।
“এক্সকিউজ মি, একটু যাব।”
ফারুকের গলা পেয়ে খানিক চমকে গিয়ে, কেশব তাড়াতাড়ি পা নামিয়ে, চেয়ার ছেড়ে সটান উঠে দাঁড়াল।
“ভেরি সরি। ভেরি সরি!” কেশবের গলা আর গলার আওয়াজ দুটোই একেবারে নুইয়ে পড়েছে।
“কোনো ব্যাপার না।” ফারুক হাত তুলে তাকে আশ্বস্ত করে বলল, “আপনি আর ওই ডাক্তারবাবু তো শুনলাম আমার একটু আগেই এসে পৌঁছেছেন, একেবারে ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে। আপনারা কি একসঙ্গে অন্য কোথাও যাচ্ছিলেন, নাকি এখানেই আসার প্ল্যান ছিল?”
“সে এক কাণ্ড—” কেশব একটু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল।
“ফারুক। ফারুক সিদ্দিকি।” ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে সে নিজের নামটা বলল।
“ভেরি নাইস টু মিট ইউ ফারুকসাব। আমার নাম কেশব কোঠারি।” দু’হাত জোড়া হয়ে একসঙ্গে বুকের কাছে উঠে আবার দু’দিকে নেমে গেল। “তো বলছিলাম কি, আমার এদিকে অনেকদিনের বিজনেস ইন্টারেস্ট আছে। আপাতত এই নেওরা ভ্যালি এলাকায় একটা রিসর্টের জন্য লিজ নেওয়ার ব্যাপারে কথা চলছে। সেসব কাজেই দু’দিনের জন্য এসেছি। এখন তো মনে হচ্ছে আরও কিছুদিন লাগবে।”
“ডাক্তারবাবুও কি এই ব্যাবসায় যোগ দিচ্ছেন নাকি?”
“হোয়াট? নো নো! ওনার সঙ্গে আমার একদম অ্যাক্সিডেন্টালি মোলাকাত হয়ে গেল। আমি ডেলোর সাইড থেকে সকালে স্টার্ট করেছি। লাভাতে একটু চা—পানির জন্য দাঁড়িয়েছিলাম। দেয়ার আই স হিম। আমার একসময় ফার্মায় ইন্টারেস্ট ছিল, বেশ কিছু ডাক্তারকে চিনতাম। আর ইনি তো বিগ শট! থাকার জায়গা পাচ্ছিলেন না, তো আমিই গিয়ে অফার করলাম যে আমার সঙ্গে এখানে চলে আসতে। উনি সোমবার গ্যাংটক যাচ্ছেন। আপনি কি ভ্যাকেশনে?”
বিশেষ বিস্তারে না গিয়ে ফারুক মোটামুটি তার রিশপ যাওয়ার উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনার কথা জানাল। শুনে কেশবও সায় দিয়ে বলল যে সে শুনেছে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে নাকি একটা শর্টকাট আছে রিশপ যাওয়ার। রাস্তাটা খুব একটা ভালো নয়, চড়াই উতরাই একটু বেশিই, কিন্তু খানিক সময় বাঁচে। এইসব কথোপকথনের মাঝে একফাঁকে জিতু এসে ফারুককে বিদায় জানিয়ে তার গাড়ি নিয়ে চলে গেল। এখন নীচে তাকালে শুধু সাদা রঙের এসইউভি গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে।
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে, ফারুক ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মিনিট দুয়েক ওভাবে পড়ে থেকে হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলতেই দেখা গেল ব্যাটারির আয়ু কমে চার পারসেন্টে এসে ঠেকেছে। মনে মনে নিজেকেই গালাগালি করতে করতে আবার উঠে ব্যাগ থেকে চার্জার বের করে, খাটের পাশে প্লাগ পয়েন্টে ফোন চার্জে বসিয়ে রোকসানার নম্বরে চেষ্টা করে দেখল। অনেকবার রিং হওয়ার পর অপর প্রান্তে চাপা স্বরে ‘পরে করছি’ শুনে ফারুক ভেবেছিল একটু বই পড়বে। কিন্তু এক পাতা এগোতেই ঘুমে চোখ ভেঙে এল। ভাতঘুম কাটাতে বদ্ধপরিকর ফারুক তখন আবার ফোনটা তুলে নিয়ে একটি তথাকথিত ওটিটি সিরিজের শরণাপন্ন হয়েছিল। বাকসর্বস্ব প্রথম দৃশ্য পেরিয়ে দ্বিতীয়তে যাওয়ার আগেই হাত থেকে ফোন যে কখন খসে পড়ে গেছে, কে জানে। ঘুম ভেঙেছিল দরজার ঠক ঠক শব্দে। হোমস্টের গোপাল বলে ছেলেটি চা নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে। কাপে প্রথম চুমুক দিতেই ফারুকের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছিল দত্তবাবু ও তাঁর স্ত্রী কেন অতক্ষণ ধরে চায়ের ব্যাপারে ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছিলেন।
ওই চায়ের সঙ্গে লড়াই তিন চুমুকের বেশি স্থায়ী হয়নি। খানিকক্ষণ থম মেরে বসে থেকে ফারুক আবিষ্কার করল যে ফোন হাতে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ায় সেটা চার্জার থেকে খুলে গিয়ে, ব্যাটারি শেষ হয়ে, আপাতত বন্ধ হয়ে আছে। পুনরায় চার্জের ব্যবস্থা করে ঘরের বাইরে পা দিতেই যেন সোজা দুম করে অন্ধকারের দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেল। বেশ কয়েক সেকেন্ড চোখ সইয়ে নেওয়ার পর সে বুঝল যে নীচে দক্ষিণদিকের কোনো একটা ঘরের দরজা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে, আর অপরদিকে ডাইনিংয়ের ভিতর সম্ভবত রিসেপশন কাউন্টারের একটা আলো জ্বলছে। তাছাড়া চারিদিকে যত অবধি চোখ যায় কোথাও কোনো আলোর উৎস নেই। পাহাড়ি জায়গায় সন্ধ্যা হলে সাধারণত দূরে অন্যান্য পাহাড়ের গায়ে আলো জ্বলে উঠতে দেখা যায়। এখন সবকিছুই মেঘ এবং কুয়াশার পর্দার আড়ালে।
দৃষ্টিহীন মানুষের মতো ডান হাত দিয়ে দেয়াল ধরে এগোতে এগোতে সিঁড়িটার কাছে গিয়ে সুইচবোর্ড পাওয়া গেল। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় একটা মৃদু হলদে আলোয় বারান্দা আর সিঁড়ির কিছু ধাপের গাঢ় কালি যেন একটু হালকা হয়েছে। নীচে নেমে ডাইনিংয়ে ঢোকার আগে, একবার বাঁদিকে তাকিয়ে দেখল একদম প্রথম ঘরের আধখোলা দরজার ভিতর থেকে আলোটা আসছে। এদিকে রিসেপশনে আলো জ্বললেও গোটা ডাইনিংয়ে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এরকম একটা নিস্তব্ধ আবহে হাঁকাহাঁকি—ডাকাহাঁকি করতে ফারুকের ঠিক ইচ্ছা করল না। অতএব কী করবে বুঝতে না—পেরে যখন সবে ভাবতে শুরু করেছে ঘরে ফিরে হোমস্টের কাউকে ফোন করবে কিনা, ঠিক তখনই সামনের দিকে খুট শব্দ করে একটা ঘরের দরজা খুলে গেল।
এই ঘরটা কেশব কোঠারির ঘরের ঠিক নীচে। এরকমই ফারুকের নিজের ঘরের নীচেও একটা ঘর আছে, যদিও সেটায় জনপ্রাণী আছে বলে মনে হয় না। একতলায় এই দুটো ঘরের সামনে দিয়ে টানা বারান্দা যেটা ইংরেজি এল অক্ষরের মতো আবার ডানদিকে ঘুরে গেছে। সেখানকার দুটো ঘর নিয়েই কলকাতার তরুণ গ্রুপটা আছে। এল—এর কোনাটায় দু’জোড়া ঘরের মাঝে একটা ছোট্ট দরজা। ঘরের আয়তন দেখে মনে হয় টুলশেড জাতীয় কিছু হবে।
খোলা দরজা থেকে এখন কথোপকথন ভেসে আসছে। শব্দ বা বাক্য অস্পষ্ট হলেও স্বরের ওঠানামায় বোঝা গেল যে কোনো একটা নিষ্পত্তিতে পৌঁছানো গেছে। পরমুহূর্তেই দরজা আর—এক—টু ফাঁক হয়ে বেরিয়ে এলেন মিসেস দত্ত আর কৃতিকা। দ্বিতীয়জন নিজেকে আপাদমস্তক একটা হুডি সহ রেনকোটে মুড়ে ফেলেছে। তার মায়ের মাথা ও শরীর একটা হালকা স্টোল দিয়ে জড়ানো। হাতের ছাতাটা খুলতে খুলতে ভদ্রমহিলাই প্রথম কথা বললেন।
“এখন তাও একটু ধরেছে দেখে বেরোলাম। ঘর বন্ধ করে কতক্ষণ বসে থাকা যায় বলুন তো?”
“সেটা ঠিকই। তা মিস্টার দত্তকে দেখছি না?”
“আর বলবেন না! আমার কোনো কথাই তো কানে তোলার মতো মনে হয় না।”
“আসলে বিকেলে ঘুম ভাঙার পর থেকে বাবার পায়ে একটা ব্যথা শুরু হয়েছে।” কৃতিকা এবার ব্যাপরটা একটু খোলসা করে বলল। “গতকাল ওই ছাঙ্গে ফলসে অতটা ওঠানামা করেছে। তখন খুব একটা বোঝা যায়নি। আজকে সকাল থেকে একটু অস্বস্তি হচ্ছিল, মনে হয় এখন ভালোই ভোগাবে।”
“আমি অনেকবার না করেছিলাম। এমনকি মাঝামাঝি পেরিয়ে এক জায়গায় সুন্দর বসার জায়গা করা আছে, ওখান থেকে ফল্সটাও দেখা যায়। বললাম সেখানে বসতে যতক্ষণে বাকিরা ঘুরে আসে। কিন্তু আমার কথার তো কোনো দাম নেই। তাকে পুরোটা যেতেই হবে! এখন বোঝো! এর মধ্যে বাড়াবাড়ি হলে কী হবে কে জানে!”
“আঃ মা, তুমিও কিন্তু টু মাচ! কিচ্ছু হবে না। রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে।”
“দেখেছেন তো? সবাই আমার থেকে বেশি বোঝে। আপনিই বলুন তো এই রিস্ক নেওয়া কি উচিৎ হয়েছে?”
আচমকা তার থেকে এরকম সেন্সিটিভ বিষয়ে চূড়ান্ত বিচার চাওয়ায় ফারুক পড়ে গেল বেকায়দায়। সে তড়িঘড়ি কথা ঘুরিয়ে দেওয়াই শ্রেয় মনে করল।
“আপনারা কাল বেশ বড়ো গ্রুপ নিয়ে গেছিলেন তো। এই গাড়িটাই ছিল?” ফারুক আঙুল দিয়ে খোলা জায়গায় দাঁড়ানো সাদা এসইউভি—র দিকে দেখাল।
“হ্যাঁ, এই ঘোরাঘুরিগুলো করব দেখেই গাড়িটা সঙ্গে রেখে দিয়েছিলাম। আমরা পৌঁছেছি এই সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ। এসে চা খেতে খেতে ওই ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গে আলাপ হল। ওরা ঋষিখোলা থেকে এসেছে। পৌঁছেছে আমাদেরও খানিকটা আগে। ওদের সঙ্গে আলাপ করে বেশ ভালো লেগেছে, জানেন তো? মেয়ে দুটোই কিন্তু কলেজে পড়ায়, আর—একটি ছেলে রিপোর্টার। সবাই খুব ভদ্র আর শিক্ষিত। ওরাই বলছিল দুপুরে ফল্স দেখতে যাবে। একটা গাড়ির খোঁজ করছিল। আমার বর শুনতে পেয়ে আমাদের গাড়িতে করে সবাই মিলে যাওয়ার একটা প্ল্যান করে ফেলে। তাতে মজাই হয়েছিল, কিন্তু অতিরিক্ত বাহাদুরি করে এখন সে আর নড়তে পারছে না!”
“ওই দলেরও তো একজন বোধহয় একটু চোট পেয়েছে, তাই না? খাওয়ার সময় দেখছিলাম একটু খুঁড়িয়ে হাঁটতে, ওই লম্বাটে মেয়েটি। ওর নাম বোধহয় দেবলীনা।”
“হ্যাঁ দেবলীনাদি আমাদেরই জলে নামার জন্য গাইড করতে গিয়ে, একটা শেওলা ধরা পাথরে একটু স্লিপ করে গোড়ালির সাইডে ব্যথা পেয়েছে। তবে এমন কিছু না। ওই আবার অতটা প্রায় ট্রেক করে উঠতে হল বলে এখনও ব্যথাটা পুরোপুরি যায়নি।”
“যাক তোমাদের কপাল ভালো যে গতকাল ঘুরে আসতে পেরেছিলে। এত শুনে আমার ও যেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু আদৌ হবে কিনা তাই বুঝতে পারছি না।”
ঠিক এই সময় সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল প্রতিভা। ওদের দেখতে পেয়ে একটু হাত নেড়ে বেসিনের কাছে দেয়ালের গায়ে সুইচ টিপে বাইরের একটা আলো জ্বালিয়ে, ডাইনিং হলের ভিতর ঢুকে গেল। ফারুকও এবার মা—মেয়েকে বিদায় জানিয়ে রিসেপশনের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল।
এখন ডাইনিং হলে দু—একটা আলো জ্বলছে। ফলে সন্ধ্যা নামতেই যে ভৌতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সেটা বেশ খানিকটা কমেছে। প্রতিভা রিসেপশনের ওখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা খাতা খুলে কিছু জিনিসের হিসাব করছিল। ফারুক গিয়ে দুটো জলের বোতল চাইল। প্রতিভা সেগুলো দিয়ে জানাল যে এখন টাকা দিতে হবে না। সে লিখে রেখে দিচ্ছে, একবারে চেকআউট করার সময় গোটা হিসাব হয়ে যাবে। আবহাওয়ার কথা বলায় প্রতিভাকে বিশেষ উৎসাহিত হতে দেখা গেল না। সে বলল এরকম অনেক সময়েই হয় যে মাঝে একটু বৃষ্টির প্রকোপ কমে, কিন্তু তারপর আবার দ্বিগুণ তেজ নিয়ে শুরু হয়। আপাতত আবহাওয়া অনুকূল হবে বলে মনে হয় না।
এইসব কথাবার্তার মাঝে জয়দীপদের গোটা দলটা এসে দুপুরে ফারুক যেই টেবিলে বসে খাচ্ছিল, সেখানে চারদিকে চারটে চেয়ার নিয়ে তাস খেলার আয়োজন শুরু করল। টোয়েন্টি নাইন খেলা হবে। দেবলীনার একহাতে একটা বড়ো ফ্লাস্ক আর অন্য হাতে একটা প্যাকেটে চিপস্, চানাচুর জাতীয় শুকনো খাবার। দরজায় ফারুকের সঙ্গে আবার মিসেস দত্ত আর কৃতিকার দেখা। কৃতিকাকে ঢুকতে দেখে জয়দীপ উঠে এল। ফারুক টেবিলের দিকে ইঙ্গিত করে মিসেস দত্তকে প্রশ্ন করল, “আপনারাও খেলবেন নাকি?”
“ওই আর কি। মেয়ে তো কলকাতায় পড়তে গিয়ে এই নেশাটা ধরেছে। আমার বোনের বাড়িতে আবার সবাই খুব এক্সপার্ট। আমি ইদানীং মাঝেমধ্যে খেলছি। বড্ড খেয়াল রাখতে হয়, ব্যাপারটা সহজ না। ওদের মধ্যে ঋজু বোধহয় সবথেকে পাকা খেলোয়াড়। গতকাল ওর পার্টনার হয়ে যেই কটা হাত খেলেছি, সবকটায় জিতেছি!”
“বাঃ আমার এক সহকর্মীর পাল্লায় পড়ে আমিও শিখেছিলাম। দেখি সুযোগ পেলে এই যাত্রা একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাবে।”
“অবশ্যই। ওরাও কেউ খুব একটা টানা খেলে না। কেউ না কেউ একটু ব্রেক নেয়। সেই ফাঁকে বসে যাবেন।”
টেবিলে প্রথম হাতের তাস বিতরণ শেষ। দেবলীনা বসেছে ঐশানীর মুখোমুখি, রান্নাঘরের দিকে পিঠ দিয়ে। অন্যদিকে পার্টনার ঋজু আর কৃতিকা। ঋজুর মুখ তাদের নিজেদের ঘরের দিকে আর কৃতিকার মুখ অন্যদিকের জানালা দিয়ে কটেজের দিকে। মিসেস দত্ত গিয়ে একটা চেয়ার টেনে নিজের মেয়ের পাশে বসে তার তাসের দিকে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন। ফারুক বাইরে বেরিয়ে এল।
বাইরে এখন একটা হাওয়া দিতে শুরু করেছে, গতিমুখ মোটামুটি দক্ষিণ থেকে উত্তরে। ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে যে পথটা উত্তরে কটেজের দিকে ঘুরেছে, জয়দীপ আপাতত সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটের ফাঁকে সদ্য ধরানো একটা সিগারেট। ফারুককে দেখে সে হাসল। ফারুক তার দিকে একটু এগিয়ে গেল।
“তুমি কি খেলা শুরু হওয়ার আগেই ব্রেক নিলে?”
“অ্যাকচুয়ালি আজকে স্টার্ট করতে একটু দেরি হল। আমার আবার সাতটা থেকে একটা খেলা দেখার প্ল্যান আছে। তাই আমি আর এখন শুরুই করলাম না।”
“তুমি কি কোনো কাগজে চাকরি করো না টিভি চ্যানেল?”
“সেই খবর এর মধ্যে পেয়ে গেছেন? না চ্যানেল না, কাগজ। প্রথমে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে, তারপর এই রিসেন্টলি আনন্দবাজার। তবে আমি কিন্তু হার্ড নিউজের লোক নই, আমার বিট হচ্ছে স্পোর্টস। আমার নিজের একটা ইউটিউব চ্যানেলও আছে খেলাধুলো নিয়ে। ইদানীং সেখানেও সাবস্ক্রাইবার একটু একটু করে বাড়ছে। যদি ওটা দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে চাকরি ছেড়ে ওটাই ফুল টাইম করব। সরি, আমি একটু এগোচ্ছি। টাইম প্রায় হয়ে এল।”
হাওয়ার জন্যই হয়তো সিগারেটটা একটু তাড়াতাড়ি পুড়ল। শেষ অংশটা মাটিতে ফেলে, জুতো দিয়ে ঘষে নিভিয়ে জয়দীপ নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। ফারুক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল ভিতরে তাসের আড্ডা বেশ জমে উঠেছে। খেলোয়াড়দের সবারই মুখ গম্ভীর। মিসেস দত্ত মাথা নিচু করে নিজের ফোন ঘাঁটছেন। এটা দেখে ফারুকেরও মনে পড়ে গেল যে দুপুরের পর সে আর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। মাঝে আবার বেশ খানিকক্ষণ ফোন সুইচড অফও ছিল। পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাওয়ার আগেই অন্তত একবার রোকসানাকে ফোন করতে হবে।
***
রাতের খাওয়ার পর্ব এই একটু আগে শেষ হয়েছে।
দুপুরবেলায় ঘরের যে গমগমে রং আর শব্দ ছিল, রাতে তা অনেকটাই ফিকে। সেই একসঙ্গে সবাই মিলে বসে পাড়ার অনুষ্ঠানের পঙ্ক্তিভোজন গোছের ব্যাপারটার পুনরাবৃত্তি হল না। ফারুক যখন পৌনে ন’টা নাগাদ খেতে নেমেছিল, ততক্ষণে গোটা দত্ত পরিবারের রাতের খাওয়া শেষ। মিস্টার দত্তর অবস্থা বিবেচনা করে তাঁকে ঘরেই খেতে দেওয়া হয়েছে। কেশব আর জয়দীপও এক ফাঁকে এসে খেয়ে আবার ঘরে ফেরত চলে গেছে। আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে কাজের ছেলেদুটিকে আগেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে নিজেদের বাড়ি ফিরবে। ডাইনিং হলে দিনের বেলার মেজাজ আর মানসিকতা, রাতের অন্ধকার আর আবহাওয়ার কাছে হার স্বীকার করেছে।
প্রতিভার পূর্বাভাস সঠিক প্রমাণিত করে আটটা থেকে বৃষ্টি সত্যিই দ্বিগুণ তেজ নিয়ে ফিরে এল। সেই সঙ্গে হাওয়া। এখন বেশ একটা স্যাঁতস্যাঁতে ঠান্ডা লাগছে। হয়তো কাজের ছেলেগুলো না থাকার জন্যই প্রতিভা বা তার মাকে বিশেষ একটা দেখা যাচ্ছে না। ডলি মাঝেমধ্যে ঢুকছে—বেরোচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বসার অবকাশ নেই। ন’টা নাগাদ একটা বড়ো ট্রেতে বেশ কিছু ঢাকা দেওয়া থালা—বাটি নিয়ে ডলি কটেজের দিকে রওনা দিল। বোঝা গেল যে ডাক্তারবাবুও ডিনারটা ঘরেই সারবেন। এঁর ক্ষেত্রে কারণ অবশ্য অসুস্থতা নয়, প্রভাব ও বিত্তশালী হওয়ার জন্য ব্যতিক্রমী আপ্যায়ন।
পরিবেশনকারীদের অনুপস্থিতিতে ফারুক নিজেই রান্নাঘরের দেয়ালের খোপ থেকে খাবারের থালা হাতে নিয়ে পাশের টেবিলে এসে বসল। তাসের আড্ডায় তখন একটু বিরতি চলছে। জয়দীপ ছাড়া বাকি তিনজন নিজেদের মধ্যে গল্পগুজবে ব্যস্ত। ওদের টেবিলের এক কোনায় থালা, বাটি, হাতা, ক্যাসারল ইত্যাদি সাজানো দেখে মনে হচ্ছে খাবার রাখাই আছে, এরা সুবিধামতো খেয়ে নেবে। ফারুক সবে খেতে শুরু করেছে, এমন সময় রান্নাঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে পৃথ্বী রাই এসে তার উলটোদিকে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। ফারুক তার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল, “আমাকে জিতু আগেই বলেছিল। তখন অত সিরিয়াসলি ভাবিনি, কিন্তু আপনার রান্না সত্যিই ভালো। ডালটাও এত ভালো হয়েছে!”
“হ্যাঁ, তা বলতে গেলে আমার এই কেরিয়ারও তো হয়ে গেল দশ বছরের উপর।”
“ভালো কথা, কেরিয়ার বলতে মনে পড়ল। আপনি তো নিজে একজন সুপারস্টার! আমি জয়দীপের কাছে শুনলাম। আমি সত্যিই চিনতে পারিনি। বোধহয় আমি যখন কলকাতায় পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেছি, আপনি খেলা ছেড়ে দিয়েছেন।”
“আরে ওসব পুরো আগের লাইফের কথা। আমার সেই চেহারাও নেই, আজকাল তো দেখি স্ট্রেংথ আর এনার্জিও অনেক কমে গেছে।”
“আমার আশেপাশে কিন্তু অনেক লোক আছে যারা আপনাকে খুবই ভালো চিনবে বলে মনে হয়। ফিরে গিয়ে যখন আপনার কথা বলব, তখন সাংঘাতিক এক্সাইটেড হবে! আপনি মির্জা আলিকে চেনেন কি?”
“মির্জা আলি…” স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ক্ষণিকের জন্য পৃথ্বীর গলার স্বর নেমে এল। “এ কি ওই মিড নাইনটিজে স্টার্ট করেছিল? মোহনবাগান? ছোটোখাটো কিন্তু হাট্টাকাট্টা বড়ি? ডিফেন্সে খেলত?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ! রাইট ব্যাক ছিল। এই ২০১১—১২ নাগাদ খেলা ছেড়েছে। এখন আমার বাড়ির খুব কাছে থাকে। রেগুলার দেখা হয়।”
“মির্জা যখন এল, তখন মোহনবাগান একটু খারাপ ফর্মে ছিল। তারপর অমলদা কোচ হয়ে এসে আবার ধীরে ধীরে টিমটাকে ইম্প্রুভ করল।”
“তারপর আমার অফিসের চেনা বেশ কয়েকজন আছেন, আমার থেকে একটু সিনিয়ার। ওঁরা স্পোর্টস কোটাতেই ঢুকেছিলেন। সবাই প্রফেশনালি ফুটবল খেলতেন—তন্ময় বণিক, সূরয গুরুং, ইসমাইল হানিফ, রাতুল লাহিড়ী, রঞ্জন মাঝি, গিরিশ তামাং—”
“আরে এরা তো সব আমার কনটেম্পোরারি!” পৃথ্বীকে এখন বেশ উৎসাহিত শোনাল। “রঞ্জন আর তন্ময় তো আমার টিমেই ছিল। এরিয়ান্সে। আমি লেফট উইংয়ে খেলতাম আর তন্ময় রাইটে। রঞ্জন মিডফিল্ডার হয়ে শুরু করেছিল, তারপর একসময় স্ট্রাইকার হিসাবেও খেলেছে। সূরয দাজুর সঙ্গে অল্প কিছুদিন খেলেছি জর্জ টেলিগ্রাফে। উনি কিন্তু চাকরি কমপ্লিট করে তারপর হিলসেই চলে এসেছেন, মিরিকের কাছে থাকেন। আমার সঙ্গে কনট্যাক্ট আছে।”
ফারুকের খাওয়া প্রায় শেষ। তাদের কথাবার্তার মাঝে মিসেস দত্ত আর কৃতিকা এসে আবার তাসের টেবিলে যোগদান করেছে। বোধহয় খাওয়ার পর আবার এক রাউন্ড খেলে সবাই ঘুমোতে যাবে। ঐশানী ঘরে ফিরে যাওয়ায় আপাতত একদিকে দেবলীনা ও কৃতিকা, অন্যদিকে ঋজু ও মিসেস দত্ত। ফারুক মুরগির শেষ টুকরোটা খেয়ে হাড়টা বাটিতে নামিয়ে রাখল। বাইরে ঝড়বৃষ্টির পরাক্রম একইভাবে বজায় আছে। সেটা দত্ত পরিবারের মা—মেয়ের রেনকোটের অবস্থা দেখলেই বিলক্ষণ টের পাওয়া যায়। তাছাড়া টানা শোঁ—শোঁ আর ঝমঝম শব্দ ভিতর অবধিও যথেষ্ট পৌঁছাচ্ছে।
“আপনার হাতের রান্না খেয়ে আর আপনার সঙ্গে কথা বলে সত্যিই খুব ভালো লাগল”, দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ছাতা খুলতে খুলতে ফারুক বলল।
“সেম হিয়ার। এইসব পুরানো দিনের লোকদের তো এখন কেউ খুব একটা মনে রাখে না। আমার নিজেরই এখন কত দরকারি কথা মনে পড়ে না, কাজের জিনিস কোথায় রেখেছি ভুলে যাই। দেখি যদি খুঁজে পাই, তাহলে আপনাকে আমার কিছু পুরানো অ্যালবাম দেখাব—আমি ছাড়াও যাদের কথা বললেন, তাদেরও ইয়াং এজের ছবি ওখানে পেয়ে যাবেন।”
“আমিও দেখছি কাল সকালে আমার কিছু কলিগকে ফোন করে যদি রঞ্জনদা আর তন্ময়দার নম্বর জোগাড় করতে পারি, তাহলে আপনাকে দিয়ে দেব।”
সেইসব ফোন নম্বর জোগাড় করা সম্ভব হত কিনা, সেটা অবশ্য আর জানা যায়নি। পরদিন পরিস্থিতি যেরকম দাঁড়িয়েছিল, তাতে ফারুকের মাথা থেকে পুরানো সহকর্মীকে ফোন করার কথা বেমালুম মুছে গেছিল।
***
পরে অনেক ভেবেও ফারুক বুঝে উঠতে পারেনি ঠিক কী কারণে রাতে তার ঘুম ভেঙে গেছিল। চোখ খুলে যন্ত্রচালিত অভ্যাসের মতো বালিশের পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিল। বোতাম টিপে অন করে ভুরু কুঁচকে দেখল বারোটা বেজে দশ মিনিট।
রাতে ডিনার সেরে এসে বাড়িতে ফোন করেছিল। ততক্ষণে রোকসানারও কাজকর্ম শেষ, তাই বেশ অনেকটা সময় ধরে কথা হল। তাদের মেয়ে মাহিরা তার কোনো এক বন্ধুর বাড়ি গেছে, রাতে সেখানেই থাকবে। তাদের একটা বেড়াতে যাওয়ার কথা উঠেছে, আজ রাতে নাকি সেসবের ব্যাপারেই ফাইনাল আলাপ—আলোচনা। ফারুক এদিকের পরিস্থিতির কথা জানাতে, রোকসানা বলেছিল চিন্তা না করতে। সে এদিক—ওদিক থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছে যে লাইজার অবস্থা একইরকম আছে, কোনো বিশেষ অবনতি হয়নি। আর রোকসানাও যদি পরের সপ্তাহে রিশপ চলে আসে, তাহলে বাড়ি বন্ধই থাকবে। মাহিরা তখন রিপন স্ট্রিটে তার মামাবাড়িতে থাকবে।
ফোন রেখে, জামাকাপড় বদলে, ফারুক যখন একটা পাতলা কম্বলের নীচে ঢুকল, তখন তার হাতে একটা বই—স্টিফেন কিং—এর মিজারি। করোনা অতিমারির সময় হঠাৎ করে বাড়িতে বসে গিয়ে কীভাবে যেন ভূত—প্রেত, অলৌকিক, অতিপ্রাকৃতিক গোত্রের সাহিত্যের প্রতি ফারুকের একটা ঝোঁক এবং ক্রমে অনুরাগ তৈরি হয়। প্রথমদিকে টানা হেমেন রায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, শরদিন্দু, হুমায়ুন আহমেদ, এসব গোগ্রাসে পড়ে ফেলার পর, তার মেয়ের এক বন্ধুর সংগ্রহ থেকে ফারুকের হাতে আসে ‘পেট সেমাটারি’। মফস্সল ঘেঁষা জঙ্গলের মধ্যে একটি বিশেষ জায়গার গল্প যেখানে পোষ্য প্রাণীদের কবর দিলে তারা আবার জীবন্ত হয়ে ফিরে আসে। সেখানে এক শোকগ্রস্ত বাবা তার সদ্যমৃত সন্তানকে সমাধিস্থ করে এবং তার পরের সব ভয়ংকর কাণ্ডকারখানা ঘিরে একদম গায়ে কাঁটা দেওয়া রুদ্ধশ্বাস কাহিনি। এরপর প্রায় নেশাগ্রস্তের মতো ফারুক একের পর এক উপন্যাস পড়ে গেছে।
এবারের বইটা সে কালিম্পঙে বসেই শুরু করেছিল কিন্তু বেশি দূর এগোতে পারেনি। এখন খানিকটা পড়ে তার বেশ মজাই লাগছে। বইয়ের বিবরণের সঙ্গে তার নিজের পরিস্থিতির একটা আশ্চর্য সাদৃশ্য আছে। উপন্যাসে একজন নামজাদা লেখক একটি নির্জন জায়গায় বসে তাঁর লেখার কাজ শেষ করছিলেন। এমন সময় তুষার ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে তড়িঘড়ি সেখান থেকে রওনা হয়ে যান। কিন্তু পথে তাঁর গাড়ি উলটে গিয়ে খাদে পড়লে, সেখান থেকে তাঁকে স্থানীয় এক মহিলা উদ্ধার করে নিয়ে আসেন তাঁর নিজের বাড়িতে। ফারুকও এক অন্য গন্তব্যের দিকে রওনা দিয়েছিল, কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য আপাতত তার ঠাঁই হয়েছে ডলি রাইয়ের হোমস্টেতে। সাহিত্য আর বাস্তবের এই সাদৃশ্যের কথা ভাবতে ভাবতে কোনো এক সময় সে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
এখন ঘুম ভেঙে সে আপ্রাণ ভাবার ও বোঝার চেষ্টা করছে, তার চোখ খুলে যাওয়ার কারণ কী? মিনিট দুয়েক স্থির হয়ে থেকেও যখন মাথায় কিছু এল না, তখন খানিক অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে ভাবল একবার বাইরেটা দেখে আসবে।
ঘরের দরজা খুলে বেরোতেই আবার সেই একইরকম অন্ধকার দেয়ালের ধাক্কা। চোখ সওয়ার আগেও দুটো ব্যাপার বোধগম্য হল। বৃষ্টির তেজ একটু হলেও আগের থেকে কমেছে আর ঝোড়ো হাওয়াটাও বন্ধ হয়েছে। তবে চারিদিক এখন আলকাতরার মতো কালো আর কবরের মতো নিস্তব্ধ। শুধু বারান্দা থেকে নীচে তাকালে দেখা যাচ্ছে সাদা গাড়িটার মসৃণ গায়ে কোথা থেকে যেন কুয়াশা ভেদ করে, একটা ক্ষীণ আলোর টুকরো প্রতিফলিত হচ্ছে। ফলে, ওই জায়গাটুকু ঘিরে একটা আবছা প্রেতের মতো আকৃতিহীন নীহারিকা তৈরি হয়েছে।
একবার কোনো কারণে ব্যাঘাত ঘটলে আবার ঘুম আসতে ফারুকের একটু সময় লাগে। ঘরে ফিরে আবার শোয়ার তোড়জোড় করবে বলেই ভাবছিল, এমন সময় মনে হলো নীচে অন্ধকারের মধ্যে এক টুকরো অন্ধকার যেন আলাদা করে নড়ে উঠল। ফারুক চমকে উঠে চোখ কুঁচকে অনেকটা একাগ্রচিত্তে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করল, কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হল না। অন্ধকার একেবারে জমাট বেঁধে আছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা করে মনে হল নির্ঘাত ঘুমের ঘোরে চোখের ভুল হয়েছে। বা হয়তো কোনো জন্তু ঢুকে এসেছিল, আবার পালিয়ে গেছে। ঠিক তখনই আবার নড়াচড়া।
পাছে নিজের উপস্থিতির কথা প্রকাশ পায়, তাই ফারুক বেশি ঝুঁকে দেখার চেষ্টাও করছে না। বরং কাঠের থামের সঙ্গে একদম গা লাগিয়ে নজর রেখে বোঝার চেষ্টা করছে ঘটনার গতিমুখ কোন দিকে যাচ্ছে। অন্ধকারটা খানিক যেন গড়িয়ে যখন গাড়িটার কাছাকাছি এল, তখন প্রথমবার একটা মানুষের আকৃতি স্পষ্ট হল। স্পষ্ট হল কথাটা ভুল, কারণ উপর থেকে জিনিসটা দেখাচ্ছে বহু পুরানো সাদা—কালো গ্রুপ ছবির একদম পিছনে দাঁড়ানো ঝাপসা মূর্তিগুলোর মতো।
মূর্তিটা আবার কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। তার অর্ধেক অন্ধকারের সঙ্গে মিশে আছে, বাকিটা ঝাপসা আলোয় দৃশ্যমান। উপর থেকে দেখার জন্য তার উচ্চতা বা শারীরিক গঠন কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আবার সামান্য নড়াচড়া। এখন মূর্তিটার হাতে কোনো একটা ছোটো জিনিস। খানিক চোখের দেখা, খানিক আন্দাজে মনে হচ্ছে সেটা সাদা বা কাছাকাছি হালকা কোনো রঙের। এবার ক্ষণিকের স্থিরতার পরেই একটা ছোটো ঝটকা। তারপর সাদা জিনিসটা উধাও। পরমুহূর্তেই অত্যন্ত দ্রুতবেগে মূর্তিটাও বাড়ির দিকে কয়েক পা এগোতেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। ফারুক যেখানে দাঁড়ানো, সেখান থেকে বোঝা সম্ভব নয় যে তার গতিপথ বা গন্তব্য কোনদিকে।
প্রায় মিনিট দশেক অন্তত একইভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে যখন সেই ছায়ামূর্তি বা অন্য কোনো নড়াচড়া চোখে পড়ল না, ফারুক এবার আস্তে আস্তে থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। গোটা ব্যাপারটা এত আকস্মিক আর অদ্ভুত যে এখনও মনে হচ্ছে সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে নতুন জায়গা নিয়ে কোনো একটা বিচিত্র স্বপ্ন দেখে ফেলেছে। কে এই ছায়ামূর্তি? এই দুর্যোগ, অন্ধকার কোনোকিছুকে তোয়াক্কা না করে বাইরে সে কী করতে এসেছিল? সেসব করে সে মিলিয়েই বা গেল কোনদিকে? আরও মিনিট পাঁচেক এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কোনো প্রশ্নেরই উত্তর মিলল না, আবার নতুন করে কোনো ঘটনারও সূত্রপাত হল না। আচমকা ফারুক কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে একটা বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল।
সটান ঘরে ঢুকে টেবিল থেকে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট হাতে তুলে নিল। সেটায় আপাতত আছে দুটো আপেল, একটা বিস্কুটের প্যাকেট এবং একটা ঠোঙায় মোড়ানো আধ খাওয়া কেক। এই সব কিছু প্যাকেট থেকে বের করে টেবিলে রেখে, প্যাকেটটা টুপির মতো মাথায় পরে নিল। তারপর পা টিপে, কিন্তু দ্রুতবেগে ঘর থেকে বেরিয়ে, বারান্দা পার করে, সিঁড়ি দিয়ে একদম সোজা নীচে। খোলা জায়গাটায় নামতেই বৃষ্টির ছাঁট ভালোভাবেই গায়ে পড়তে লাগল। কিন্তু ফারুকের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। সেই ঝটকার সঙ্গে সাদা জিনিসটা উধাও হওয়া নিয়ে তার একটা ধারণা মাথায় খেলেছে। সেটা এখনই পরখ করে দেখতে হবে।
ফারুক শরীরটা ঈষৎ ঝুঁকিয়ে সাবধানে পা ফেলে এসে দাঁড়াল ডাস্টবিনটার সামনে। তারপর খুব সাবধানে সেটা তুলে নিয়ে, গাড়ির আড়ালে যতটা সম্ভব বৃষ্টির ছাঁট বাঁচিয়ে, উলটে দিল। আজ সকাল থেকেই ঝড়বৃষ্টি হওয়ায় কেউই বিশেষ একটা বাইরে বেরোয়নি বা বাগানের বেঞ্চে বসেনি। তাই হয়তো ডাস্টবিনের ভিতর সেরকম কিছু জমেওনি। ঘাসপাতা, ধুলোমাটি বাদ দিয়ে গোটা চারেক কাগজের কাপ, একটা দোমড়ানো বিয়ারের ক্যান, কিছু চিপস্ জাতীয় খাবারের প্যাকেট এবং একটাই দলা পাকানো সাদা কাগজ। শেষের জিনিসটাই সবথেকে কম ভিজে আছে, কারণ সেটাই হয়তো সবথেকে সদ্য ফেলা হয়েছে।
কাগজটা যত্ন করে পকেটে পুরে, সব জঞ্জাল আবার জড়ো করে ডাস্টবিনে চালান দিয়ে, সেটাকে আবার যথাস্থানে রেখে ফারুক সোজা হয়ে দাঁড়াল। চারিদিকে কোনো প্রাণের সাড়া নেই। মনে হয় না তার এই অ্যাডভেঞ্চারের কোনো সাক্ষী রইল। তাও কোনো ঝুঁকি না নিয়ে, আবার পা টিপে টিপে সে নিজের ঘরে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে দিল।
প্যাকেটটা থাকায় মাথাটা শুকনোই আছে, কিন্তু সর্বাঙ্গ এখন ভিজে জবজব করছে। আবার আর—এক প্রস্থ জামাকাপড় ছেড়ে বিছানায় বসে এবার ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে কাগজটা টান টান করে খুলল। মাঝারি সাইজের রুলটানা রাইটিং প্যাডের পাতা। খুব একটা যত্ন নিয়ে পাতাটা ছেঁড়া হয়নি, কারণ উপরের দিকটা এবড়োখেবড়ো হয়ে আছে। পাতার প্রথম দু’লাইন ছেড়ে নীল পেন দিয়ে ইংরেজিতে লেখা একটা সাড়ে পাঁচ লাইনের অসমাপ্ত চিঠি। যদিও সেই চিঠি কার উদ্দেশ্যে বা প্রেরকের নাম, কিছুই দেওয়া নেই। বয়ানটা এরকম—
Let me straightaway tell you that what you did was a crime. But I was willing to look the other way. But I don’t see you changing or taking any effort to apologize. Is my silence going to validate your actions? Should I take a more drastic step and lodge a formal complaint? The consequences will be—
অর্থাৎ বাংলা করলে দাঁড়ায়—
তোমাকে (অথবা তোকে বা আপনাকে) একটা কথা সোজাসুজি বলি যে তুমি যেটা করেছ সেটা অপরাধ। আমি তাও ভেবেছিলাম চুপ করে থাকব। কিন্তু তোমার মধ্যে অনুতপ্ত হওয়া বা ক্ষমা চাওয়ার কোনো লক্ষণই দেখছি না। তুমি কি ভাবছ আমি চুপ করে থাকা মানে তোমার কাজটা ঠিক? আমার কি তাহলে উচিৎ তোমার বিরুদ্ধে সটান আইনি পদক্ষেপ নিয়ে ফেলা? তার ফল কিন্তু—
পরপর তিনবার লেখাটা পড়ার পর কাগজটা সরিয়ে রেখে ফারুক বুঝল সে এখন পুরোপুরি সজাগ। আবার ঘুমাতে যাওয়ার জন্য তাকে যথেষ্ট কসরত করতে হবে।
