দ্বিতীয় দিন
আজ সকালে পাওয়া খবরের ফলে অনেকেই বেশ চিন্তিত। সরকার থেকে নির্দেশ এসেছে যে আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টার জন্য মানুষজন বা যানবাহনের চলাফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে। একমাত্র চরম বিপদকালীন পরিস্থিতি বা এমার্জেন্সি সিচুয়েশন ছাড়া এক জায়গা থেকে আর—এক জায়গা যাওয়ার অনুমতি মিলবে না। যা বোঝা গেল, এর পিছনে দুটি কারণ আছে। প্রথমত, সামরিক বাহিনীর সাহায্যে স্থানীয় প্রশাসন এই সময়সীমার মধ্যে কিছু রুটের রাস্তা, যেগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে, সেগুলোকে মেরামত করে যান চলাচলের জন্য চালু করে দিতে চাইছে। এতে অন্তত জরুরি পরিসেবা ব্যবস্থার কিছুটা উপকার হবে। দ্বিতীয় কারণটি হল মৃত্যুর হার যতটা সম্ভব শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসা। এই দুর্যোগের মধ্যেও কোনোরকম বিধিনিষেধ না মেনে বেশ কিছু মানুষ, তার মধ্যে সমতলের পর্যটকরাও আছেন, জোর করে যাতায়াত করার চেষ্টা করেছেন। ফলে বহু জায়গা থেকে দুর্ঘটনার খবর এসেছে। মৃত্যুর হার আজ সকাল অবধি দুই সংখ্যার ঘর পেরিয়ে গেছে।
এই খবর পাওয়ার পর থেকে গোটা হোমস্টে জুড়ে লোকজন হয় ফোন কানে দিয়ে একা একা, অথবা দু—তিনজনের জটলা পাকিয়ে, গম্ভীর মুখে এই নিয়েই আলোচনা করে যাচ্ছে। ফারুক ব্রেকফাস্টের জন্য নামার সময় দেখেছে কেশব কোঠারি হাতে একটা ছোটো নোটবই আর কলম নিয়ে হিন্দি, ইংরেজি আর বাংলা মিশিয়ে ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত। ফোনটা দেখা যাচ্ছে না, হয়তো পকেটে আছে। কিন্তু কানে সাদা রঙের ব্লুটুথ যন্ত্রটা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। নোটবইয়ের পাতা থেকে একবারও চোখ না তুলে সে পূর্ণ মনোযোগে কথা বলতে বলতে পায়চারি করে চলেছে। তারও একটা নির্দিষ্ট ছন্দ তৈরি হয়েছে—সিঁড়ি ধরে ঠিক চার ধাপ উঠছে, আবার চার ধাপ নামছে। মাঝে মাঝে হাতের কলমটা দিয়ে নোটবইতে সামান্য দাগ দিয়ে নিচ্ছে।
খাবার জায়গায় ঢুকে ফারুক দেখল বাঁদিকের টেবিলে ঋজু আর দেবলীনা পাশাপাশি বসে আছে। উলটোদিকে কৃতিকা। সবারই সামনে মাঝারি সাইজের মেলামাইনের লাল রঙের প্লেটে পুরি এবং পাশে একটা খোলা ক্যাসারলে আলুর তরকারি। ওদের দিকে তাকিয়ে গুড মর্নিং—এর ভঙ্গিতে একটু হাত তুলে, ফারুক কৃতিকার পাশে একটা চেয়ার ছেড়ে, পরের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসল। গোপাল এসে একই খাবার তার সামনে রেখে দিয়ে গেল। ঋজু তখন মন দিয়ে কৃতিকাকে বুঝিয়ে চলেছে যে পরীক্ষা বা ক্লাসের অ্যাটেনডেন্স নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণই নেই। কৃতিকা অবশ্য তাতে বিশেষ নিশ্চিন্ত হতে পারছে বলে মনে হয় না।
“আমি কিন্তু বাবা—মা কী বলবে সেটা নিয়ে চাপ নিচ্ছি না। আমি ভাবছি এখন ইন্টারনালটা দিলে সিলেবাসের একটা ছোটো পোরশান পড়তে হবে। কিন্তু সাপ্লিগুলো হয় একদম শেষের দিকে। তখন দশ নম্বরের জন্য গোটা সিলেবাস পড়তে হবে!”
“আরে সে তো ফাইনাল পরীক্ষা যখন দিবি, তখন পুরোটাই থাকবে। ভালোই তো। একটা প্রিপারেশনে দুটো পরীক্ষা দিয়ে দিবি।”
“ঋজু, অশান্তি না করে আমার লাস্ট লুচিটা খেয়ে নিবি? আমিই চেয়ে নিয়েছিলাম, কিন্তু এখন আর পারছি না।” দেবলীনার বলার ভঙ্গিতে কিছু একটা ছিল যাতে ঋজুও চুপচাপ লুচিটা তুলে নিল। ফারুকের মনে হল এই দুটি মানুষ একে অপরের এরকম আবদার—অনুরোধ মেটাতে অনেকদিন ধরে অভ্যস্ত।
“তার মধ্যে নিজের দোষেই আমি টাইমমতো টিউটোরিয়ালও সাবমিট করিনি।” কৃতিকা এখনও চিন্তামুক্ত হচ্ছে না।
“কত ওয়ার্ড লিখতে হবে?” দেবলীনা জিজ্ঞাসা করল।
“হাজারের মতো।”
“তো লিখে ফেল! কতক্ষণই বা লাগবে? জয়দীপের থেকে ওর ল্যাপটপটা নে। ওর ওই বালের ভিডিয়ো দু’দিন না বানালে দুনিয়ায় কারওর কিছু এসে—যাবে না!”
“এই, যেখানে—সেখানে খিস্তি করাটা বন্ধ কর তো!” দেবলীনা ঋজুকে এক ধমক দিল। তারপর কৃতিকার দিকে ফিরে বলল, “তবে কথাটা তো ঠিকই বলেছে। এখানে আর যাই হোক নেটওয়ার্কের প্রবলেমটা নেই। তুই যেখানে সুবিধা হয় সেখানে বসে লিখে মেল করে দে। সকাল থেকে কলকাতায় ফেরা নিয়ে টেনশনে মরে যাচ্ছে!”
শেষের কথাটা ফারুকের উদ্দেশ্যে বলা। সে একটু হেসে কৃতিকার দিকে তাকিয়ে বলল, “আগে কী করেছ জানি না, এবারে কিন্তু ঠিকঠাক কারণ আছে। এই অবস্থার কথা কালকাতাতেও সবাই জানে। তোমার কোন কলেজ?”
উত্তরে কৃতিকা দক্ষিণ কলকাতার খুবই কায়দার এবং বড়োলোকি একটি বেসরকারি কলেজের নাম বলল। দেবলীনা আবার ফারুককে প্রশ্ন করল।
“আপনিই বলুন তো। কলেজে উঠে তারপর অ্যাটেনডেন্স নিয়ে এরকম টেনশন করার কোনো মানে হয়?”
“দেখ, এটা বোধহয় আমাকে জিজ্ঞাসা করা ঠিক হবে না। আমার জেভিয়ার্স থেকে গ্র্যাজুয়েশন। পরীক্ষা স্কিপ করার কথা মনেও আনতে পারিনি। আমাদের ধারণা ছিল ক্লাস বাঙ্ক করলে পিঠের চামড়া ফাদারের ঘরের বাইরে দেয়ালে টাঙানো থাকবে।”
খাওয়া শেষ করে যখন সবাই হাত ধুতে বাইরে এল, তখনও বৃষ্টি হয়ে চলেছে একইভাবে। কিন্তু গত চব্বিশ ঘণ্টার টানা অভিজ্ঞতায় সবারই কম—বেশি অভ্যাস হয়ে গেছে। এই যে বিরামহীন একটানা বৃষ্টি হয়েই যাবে, সবাই মানসিকভাবে এটার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। তাই বেশ জোরে বৃষ্টি হলেও, কেউই খুব একটা আমল দিচ্ছে না। দেবলীনা আর কৃতিকা একটা ছাতার নীচে গায়ে গা ঘেঁষে ডাইনিং হলের পিছন দিকটার উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল। ঋজু হাত ধুয়ে আবার ভিতরে গেল ডলির থেকে একটা জলের বোতল চাইতে। ফারুকও ঘরের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।
কেশব কোঠারির ফোনে কথোপকথন আপাতত শেষ হয়েছে। সিঁড়ির আশপাশটা এখন ফাঁকা। একতলার বারান্দা থেকে উঁচু গলায় কথাবার্তা শুনে ফারুক তাকাল। গতকাল দুপুর থেকে টানা বিশ্রাম করে দত্তবাবু যে অনেকটাই ভালো হয়ে উঠেছেন, সেটা সকাল থেকে তাঁর হম্বিতম্বিতেই টের পাওয়া যাচ্ছে। আপাতত তিনি প্রতিভাকে পাকড়াও করে নিজের বিবিধ দাবিদাওয়া পেশ করে চলেছেন।
“দেখুন এরকম অবস্থা তো এই সিজনে পাহাড়ে হতেই থাকে। কখনো—কখনো এবারের মতো বাড়াবাড়িও হয়ে যায়। এই অবস্থায় ওয়েট করা ছাড়া তো কিছু করার নেই। আমরা গেস্টদের যতটুকু হেল্প করতে পারি, সেটা করার তো চেষ্টা করেই যাচ্ছি।” প্রতিভা যথাসম্ভব মাথা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করে যাচ্ছে।
দু’দিন যাতায়াত বন্ধ থাকার খবরটা আসার পরেই ডলি সকলকে জানিয়ে দিয়েছিল যে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট বুকিংয়ের অতিরিক্ত যে কদিন এই দুর্যোগের কারণে এখানে আটকা পড়ে থাকতে হবে, তার জন্য কোনো ঘরভাড়া দিতে হবে না। খাওয়ার খরচা বাবদ সামান্য কিছু দিলেই হবে। দুর্যোগের সুযোগে নিখরচায় থাকার এই প্রস্তাব অবশ্য সবাই অস্বীকার করেছে। এর বাইরেও ডলি জানিয়েছে যে কালিম্পঙে তার এক মামাতো ভাই আছে। সে অনেকদিন ধরে একটি ট্রাভেল এজেন্সির মালিক। ডলি তার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবে, যাতে ট্রেন বা প্লেনের টিকিট ক্যানসেল করা, তার টাকা রিফান্ডের ব্যবস্থা, আবার নতুন করে কনফার্মড টিকিট পাওয়া, এইসব কাজ সুষ্ঠুভাবে করা যায়।
“না, একটা ট্রাভেল এজেন্টের ফোন নম্বর দেওয়াটা যথেষ্ট হেল্প নয়। আর আমিও আমার গোটা লাইফ নর্থ বেঙ্গলে কাটিয়েছি, অনেকবার এরকম খারাপ ওয়েদারের জন্য ইন্টেরিয়র সব জায়গায় আটকে গেছি। সেখানে কিন্তু তারা আমাকে ঠিকই একটা ফেরার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।” দত্তবাবুর গলা আরও কয়েক মাত্রা চড়ল।
“আপনি কী হেল্প চাইছেন?” প্রতিভার গলা এখনও সংযত।
“যেভাবেই হোক, এখানে কোনো লোকাল লিডার বা পঞ্চায়েত প্রধান, যে কাউকে হোক, বলে—কয়ে কাল সকালে আমাদের একটা নামার ব্যবস্থা করে দিতেই হবে!”
“হাউ ইজ দ্যাট পসিবল, মিস্টার দত্ত? আমরা এখানকার সাধারণ মানুষ। আমরা বলব আর ওমনি সরকারি অর্ডারের উপর দিয়ে আমাদের জন্য বন্দোবস্ত করে দেবে? তাও এই ওয়েদারে? এটা হয় কখনও?”
“এটা কিন্তু ও ঠিকই বলছে।” এবার ফারুক পাশে এসে দাঁড়িয়ে কথোপকথনে যোগদান করল। “আর আপনি ফেরার জন্য এরকম অস্থির হয়ে উঠছেন কেন? যাবেন তো শিলিগুড়ি। রাস্তা ক্লিয়ার হলে সবার আগে আপনারাই বাড়ি পৌঁছোবেন। আপনার মেয়ে পর্যন্ত এখানে বসেই হোমওয়ার্ক করে ফেলছে!” ফারুক একটু পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করল।
“আমার সিচুয়েশন না জেনে আপনি আবার এর মধ্যে ঢুকছেন কেন?” দত্তবাবু এবার বেশ ঝাঁঝিয়ে উত্তর দিলেন। “আমি তো আপনার মতো দিব্যি একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছি না। আমার সঙ্গে ফ্যামিলি আছে। আমার একটা দায়িত্ব আছে। একটা গোটা বিজনেসের জন্য আমি রেসপনসিবল। একগাদা লোক, তাদের টাকা—পয়সা, সবকিছু আমার উপর ডিপেন্ড করে থাকে! আমি ফিরতে চাইছি, তার যথেষ্ট কারণ আছে। সেটার জন্য আমি জবাবদিহি করতে পারব না।”
“একটু বেশি বলে ফেলছেন।” ফারুকের গলার ঠান্ডা ভাবটায় সংযম বা ভদ্রতা ছাড়াও অন্য কিছু একটার আভাস পাওয়া গেল। “আপনিও অন্যের পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন, তাই দুম করে কাউকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বা চালচুলোহীন বলার আগে ভেবে দেখবেন।”
দত্তবাবুর থতমত খাওয়া মুখ দেখে বোঝা গেল তিনি এই উত্তর বা প্রতিক্রিয়া আশা করেননি। দু—একবার আমতা আমতা করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন। প্রতিভা আর কোনো কথার মধ্যে না গিয়ে বারান্দার মেঝে থেকে সকালে খাওয়া চায়ের কাপ আর প্লেটগুলো তুলে নিয়ে চলে গেল। ফারুকও আর তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত না করে দক্ষিণের বারান্দার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
এক আর দুই নম্বর ঘরের মাঝে, দেয়ালের সামনে একটা চেয়ার নিয়ে জয়দীপ বসে আছে। মাথার চুল একটু উশকোখুশকো, যেন এই সবে ঘুম থেকে উঠে এল। পায়ের কাছে একটা ফ্লাস্ক। সেটারই ঢাকনায় করে গরম একটা কিছুতে থেকে থেকে আয়েশ করে চুমুক দিচ্ছে। কাছে যেতে কড়া কফির গন্ধটা নাকে এল।
“কিছু ঝামেলা হল নাকি?”
“আরে, এসব ফালতু ব্যাপার। সেরকম কিছু না।” প্রথম ঘরের সামনে থেকে আর—এক-টা চেয়ার নিয়ে এসে ফারুক জয়দীপের পাশে বসে উত্তর দিল। “বাই দ্য ওয়ে, এক কাপ চলবে?”
ফারুক আপত্তি করল না। চায়ের বিষয়ে কথা বলার ব্যাপারটা তার কিছুতেই মনে থাকছে না। অতএব সকালে আবার সম্মুখীন হতে হয়েছিল দুধ, চিনি, আদা, মশলা ইত্যাদি দেওয়া ওই দুঃস্বপ্নের। এবার অবশ্য সে একটা চুমুক দেওয়ার চেষ্টাও করে দেখেনি। জয়দীপ ঘর থেকে একটা বড়ো সেরামিকের কফি মগ নিয়ে এল। সাদার উপর বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাবের লোগোটা ছাপানো। সেটা প্রায় ভরতি করে ফারুকের হাতে দিয়ে বলল, “ফেরার ব্যাপারটা নিয়ে মিস্টার দত্ত অতিরিক্ত চাপ খেয়ে গেছেন।”
“আমাকে যদি টানা এই হোমস্টের চা খেয়ে যেতে হয়, তাহলে বোধহয় আমিও ওরকমই ক্ষেপে উঠব।” একটা বড়ো চুমুকেই ফারুকের মেজাজ আবার ঠান্ডা হয়ে গেছে। “তা তোমার এই হাল কেন? রাতে ঘুমোওনি ঠিক করে?”
“ঘুমিয়েছি। কিন্তু অনেক দেরিতে। এই একটু আগে উঠলাম।”
“রুমের কোনো সমস্যা নাকি?”
“না না, ওই আমার ইউটিউব চ্যানেলটার কথা বলেছিলাম না? কালকের খেলাটা দেখে ওটার উপর একটা ভিডিয়ো করার কথা মাথায় এল। যেহেতু ল্যাপটপটা সঙ্গেই আছে আর এখানে ইন্টারনেটও ভালো পাওয়া যাচ্ছে, তাই ভাবলাম ভিডিয়োটা বানিয়েই ফেলি। ব্যাপারটা মাথায় ফ্রেশ থাকতে থাকতে। গোটাটা শেষ হতে তিনটে বেজে গেল। ঘুমিয়েছি বোধহয় সাড়ে তিনটে নাগাদ।”
“তুমি ল্যাপটপ অন করে কাজ করলে তোমার ঘরে অন্য বন্ধু যে আছে, তার অসুবিধা হয় না?”
“ওহ, আমি তো ঘরে একাই ছিলাম। ওরা তিনজন অন্য ঘরে ঘুমিয়েছে। আমরা এগুলো মাঝে মাঝেই করি। দুটো ঘর হয়তো নেওয়া হল। কিন্তু রাতে গল্প করতে করতে সবাই একসঙ্গেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। এখানে আসার আগে ঋষিখোলাতেও একই জিনিস হয়েছে। কাল ঐশানীকে বলাতে প্রথমে একটু গাঁইগুঁই করে, তারপর চলে গেছিল। আমি দরজা লাগিয়ে, কানে হেডফোন দিয়ে আরামসে প্রায় চার ঘণ্টা ধরে কাজটা নামিয়ে ফেললাম।”
আরও মিনিট পনেরো পরে, ফারুক নিজের ঘরে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। এক লহমায় সকালের সমস্ত অভিজ্ঞতা, সব লোকজন, যাবতীয় কথাবার্তা, সবকিছু এক অন্য বাস্তবের জিম্মায় চলে গিয়ে, গতকাল রাতের ঘটনা ফারুকের ঘর এবং মনের আগাগোড়া দখল করে নিল। চিঠিটা এখনও টেবিলে পড়ে আছে, তার মানিব্যাগ দিয়ে চাপা দেওয়া। সেটা নিয়ে আবার বসতে গিয়ে একটা কথা মনে হল। ফারুক তার ট্রলি ব্যাগ থেকে জামাকাপড়ের নীচে সযত্নে চাপা দেওয়া একটা খাম বের করে আনল। সেটা থেকে বেরোল একগুচ্ছ সুদৃশ্য সব ছবি দেওয়া পোস্টকার্ড। পোস্টকার্ডগুলো একত্রে ভরা আছে একটা পাতলা, স্বচ্ছ প্লাস্টিকের প্যাকেটে যেটার মুখ হালকা আঠা দিয়ে সিল করা। ফারুক সেটা খুলে পোস্টকার্ডগুলো বের করে খামের ভিতরে ঢুকিয়ে আবার সেটা যেভাবে ছিল, সেভাবেই ট্রলির মধ্যে রেখে দিল।
এবার ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে, চিঠিটাকে টান করে মেলে ধরে নিজের ফোনে একটা ছবি তুলল। সেই ছবি খুলে, বড়ো করে দেখে যখন সন্তুষ্ট হল, তখন খুব সাবধানে একটা রুমাল দিয়ে কাগজটার একটা কোনা ধরে তুলে, সেটাকে ওই প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে মুখটা চেপে সিল করে দিল। গোটা জিনিসটা এবার ঢুকে গেল ট্রলির ডালার একটা ছোটো পকেটের মতো জায়গায়। এখন প্রয়োজন পড়লে সে নিজের ফোনেই চিঠিটা দেখে নেবে। একটু পরে ক্রসের চটিটা খুলে পা—জোড়া বিছানায় তুলে বেশ আরাম করে প্রথম থেকে বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করতে লাগল।
একটা ব্যাপার নিশ্চিত ধরেই ফারুক এগোচ্ছে। কাল রাতের ওই ছায়ামূর্তি এই হোমস্টেরই কেউ। মালিকপক্ষেরও হতে পারে, আবার অতিথিদের মধ্যেও কেউ হতে পারে। তার একটা কারণ হচ্ছে, পাহাড়ে ঝড়বৃষ্টির রাতে অন্য কোনো জায়গা থেকে কোনো মানুষ এখানে একটা কাগজ ফেলতে আসবে, এটা একটু অবিশ্বাস্য। ফেলতে হলে পথে ঘাটে নর্দমায় বা খাদে যে—কোনো জায়গায় ফেলা যেতে পারে। আর দুই হচ্ছে ডাস্টবিনের সঠিক অবস্থানের ব্যাপারে জ্ঞান। ফারুক যতবার মনে মনে কালকের গোটা ঘটনার পুনরাবৃত্তি করছে, ততই মনে হচ্ছে যে ছায়ামূর্তি খানিক ইতস্তত করলেও, এদিক—অদিক মোটেই খুঁজে বেড়ায়নি। বরং ধীর পায়ে কিন্তু নিশ্চিতভাবেই ডাস্টবিনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে কাগজটা ফেলে আবার দ্রুত ফিরে গেছিল।
এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে চিঠিটা কার লেখা? ইংরেজি হাতের লেখা একেবারে মুক্তোর মতো না হলেও, খুবই স্পষ্ট ও সমান। ভাষার উপরেও যথেষ্ট দখল। কোথাও কোনো শব্দের বানান বা ব্যাকরণগত ভুলের জন্য কাটাকুটি নেই। খুঁটিয়ে দেখলে মেয়েলি ছাঁদের মনে হলেও ফারুক জানে যে এই ব্যাপারে আরও অনেক পরীক্ষা—নিরীক্ষা না করে কোনো কিছু হলপ করে বলা সম্ভব নয়। ফলে এখানে সম্ভাব্য লেখকের তালিকা দীর্ঘ। বরং কাদের বাদ রাখা যায় সেটা ভাবাই তুলনামূলক সহজ।
নিজেকে বাদ দিয়ে প্রথমেই মনে আসে মিস্টার দত্তর কথা। ভদ্রলোকের ইংরেজি উচ্চারণ যেরকম এবং একাধিকবার অতি সাধারণ ইংরেজি শব্দের জন্যেও যেভাবে লড়াই করতে দেখা গেছে, তার পক্ষে এতটা কথা পরিষ্কার ইংরেজিতে লিখে যাওয়া অসম্ভব। মিসেস দত্তর ব্যাপারটা বিশেষ পরিষ্কার নয়। তাঁর আচার—আচরণ বা কথাবার্তায় একটা স্বাভাবিক বুদ্ধির ছাপ আছে। কিন্তু এদিকে দত্তবাবুর মতো লোকই স্ত্রীর কথায় বা পরামর্শে বিন্দুমাত্র আমল দেন না। যদিও এতে মহিলার শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অন্তত তাঁর ইংরেজি লেখার ক্ষমতার ব্যাপারে কিছুই প্রমাণ হয় না। এছাড়া আছে পৃথ্বী রাই। প্রথাগত স্কুল শেষ না করলেও কাজ চালাবার মতো ইংরেজি বলতে পারেন। কিন্তু এই হাতের লেখার ধরন অত্যন্ত পাকা। অতএব স্কুলের গণ্ডি না পেরোনো মানুষটিকেও এই তালিকা থেকে হয়তো বাদ রাখা যেতে পারে। কিন্তু তার স্ত্রী এবং মেয়েকে ফারুক ঝরঝরে ইংরেজিতে ফোনে কথা বলতে শুনেছে। তাই আপাতত তালিকায় থাকছে ডলি, প্রতিভা, কৃতিকা, ডক্টর চক্রবর্তী, কেশব কোঠারি, ঋজু, জয়দীপ, ঐশানী এবং দেবলীনা—সব মিলিয়ে ন’জন।
এখানে আর—এক-টা বড়ো প্রশ্ন। ছায়ামূর্তি কি সে, যে চিঠি লিখেছে? নাকি যে চিঠি পেয়েছে? অসম্পূর্ণ চিঠি লেখকের কাছে থাকাই স্বাভাবিক, তবে যেটাকে অসম্পূর্ণ বলে মনে করছে ফারুক, সেটা আবার প্রচ্ছন্ন হুমকি হিসাবেও ভাবা যেতে পারে। তবে যেই হোক না কেন, সে অন্তত জিনিসটাকে চোখের সামনে থেকে দূর করে দিতে চেয়েছে। তাই ঘরের ময়লা ফেলার জায়গায় ছুঁড়ে না ফেলে, গভীর রাতে বাইরে এসে ফেলে দিয়ে গেছে। আর এই জন্যই ব্যাপারটা নিতান্ত সাদামাটা, গুরুত্বহীন বলে মনে হচ্ছে না ফারুকের। সে অকারণে ভেবে ভেবে মেঘের প্রাসাদ তৈরি করছে না।
এমন সময় বাইরে একটা গোলমাল শোনা গেল। প্রথমে মনে হচ্ছিল একাধিক মানুষ গলা চড়িয়ে কথা বলছে। ফারুক একবার ভাবল দত্তবাবু আবার কারওর সঙ্গে ঝগড়া বাধালেন বোধহয়। কিন্তু আওয়াজটা ঝগড়ার মতো শোনাচ্ছে না। কেমন যেন খাপছাড়া মতন। একবার মনে হল কেউ যেন আর্তনাদও করে উঠল।
ফারুক চেয়ার থেকে উঠে, পায়ে চটি গলিয়ে ঘরের দরজা খুলে বেরোতেই চোখের কোনায় ধরা পড়ল ডাইনিং হলের সামনে দিয়ে কেউ দৌড়ে চলে গেল। একটা উত্তেজনা, বিস্ময় আর কিঞ্চিৎ আতঙ্ক মেশানো চেঁচামেচি কানে আসছে, কিন্তু কথাগুলো স্পষ্ট নয়। ঠিক এই সময় দোতলার বারান্দায় অপর প্রান্তে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতে দেখা গেল কোঠারিকে। তার চোখের দৃষ্টি, চলার ভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি কোনোটাই স্বাভাবিক নয়। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে আছে মনে হচ্ছে। সকাল সকাল নেশা করে এল নাকি? কিন্তু তাতে বাকি সবাই চিৎকার চেঁচামেচি করবে কেন?
কেশব এখন হাত দুয়েকের মধ্যে এসে পড়েছে। গতি এখনও মন্থর। অবোধ শিশুর মতো হাত তুলে পিছনে কটেজের দিকে দেখাল। তারপর কেমন যেন বিস্মিত কণ্ঠে একটাই কথা বলল।
“ডঃ চক্রবর্তী কাল রাত্রে মারা গেছেন।”
***
পুলিশ এসে পৌঁছাল ঠিক পৌনে বারোটায়। তার এক মিনিট পরে গোপাল ছাড়া অন্য যে কাজের ছেলেটি, সে দৌড়ে এল কটেজের সামনে যারা অপেক্ষা করছিল তাদের খবর দিতে। সঙ্গে দু’জন কনস্টেবল।
ফারুক এই আকস্মিক দুঃসংবাদ শুনে তড়িঘড়ি নীচে নেমে এসেছিল। ততক্ষণে ডাইনিং হলের সামনে আর সিঁড়ির আশপাশ জুড়ে ভালোই জটলা তৈরি হয়েছে। হয় কিছু বক্তব্য অথবা কোনো দাবি আছে প্রত্যেকেরই। কিন্তু সবাই একসঙ্গে কথা বলায় কোনো কিছুই পরিষ্কারভাবে শোনা যাচ্ছে না। ফারুক আর—এক-টু কাছে এগোতে বুঝতে পারল যে এই ভিড় মোটামুটি দুই ভাগে বিভক্ত। একদলের আতঙ্ক কম, কৌতূহল বেশি। তারা চায় নিজেরাই কটেজের ওখানে গিয়ে একদম সরাসরি খবর জোগাড় করতে এবং এই বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে। অন্যদলের কৌতূহল বিন্দুমাত্র নেই, কিন্তু আতঙ্ক মাত্রাতিরিক্ত। এদের মূলত একাধিক প্রশ্ন আছে—এই আচমকা মৃত্যু ঠিক কীভাবে হয়েছে, এর পিছনে কারওর হাত আছে কিনা এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আর কারওর এরকম বিপদের সম্ভাবনা আছে কিনা।
ফারুক অনেক চেষ্টায় ভিড় ঠেলে এগিয়ে অবশেষে রাই দম্পতির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারল। তারা দু’জনেই আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে এই ভিড় সামলাতে। প্রথমবারে তো ফারুকের কথা শোনাই গেল না। এবার ফারুক বাধ্য হয়েই “সাইলেন্স!” বলে প্রচণ্ড এক হুংকার ছাড়ল। এই আচমকা শব্দে সবাই যেন খানিক সম্বিত ফিরে পেয়ে, চুপ করে গেল।
“বাকি ডিটেইল না বলে, শুধু বলুন কতক্ষণ আগে মৃতদেহ আবিষ্কার হয়েছে? আর কে দেখেছে?”
“এই দশ মিনিট মতো হবে। প্রতিভার সঙ্গে গোপালকে পাঠিয়েছিলাম।” প্রচণ্ড ধাক্কা খেলেও ডলির মাথা মোটামুটি পরিষ্কার কাজ করছে।
“তারপর আর কে কে ওই ঘরে ঢুকেছে?”
“আমি আর প্রতিভার বাবা। আর কেউ না।”
“বেশ, লাস্ট প্রশ্ন। এটা প্লিজ ভেবে উত্তর দিন। আপনাদের এই চারজনের মধ্যে কেউ কি ভুল করেও, বা বুঝতে না পেরে, ওঁর শরীর বা ঘরের অন্য কোনোকিছুতে হাত দিয়েছেন?”
“গোপাল আর প্রতিভা ঘরে পা দিয়েই দৌড়ে খবর দিতে এসেছিল। আর যায়নি। আমি গিয়ে একবার ওঁর ডান কবজি তুলে পাল্স দেখেছি। পাইনি। আর নাকের কাছে হাত নিয়ে গেছিলাম, কিন্তু ছোঁয়াইনি। আমার হাজব্যান্ড দাঁড়িয়ে ছিল। কিচ্ছু ধরেনি।”
“আপনি এত কিছু জানতে চাইছেন কেন? আপনি কে এইসব প্রশ্ন করার?” দত্তবাবু এতক্ষণে সামলে উঠে আবার নিজের মেজাজ ফিরে পেয়েছেন।
“আমি যেই হই না কেন, একটা চেষ্টা করে দেখছি যাতে আমরা সবাই কোনো সিরিয়াস আইনি ঝামেলায় না পড়ি। মিসেস রাই, আপনি এখনই পুলিশে খবর দিন। পুরোটা বলবেন। আর বলবেন যাতে সঙ্গে একজন ডাক্তার আসেন। মৃত্যুটা অফিশিয়ালি কনফার্ম করতে হবে।”
“এই কী হচ্ছেটা কী? আপনি যেচে আবার পুলিশের ঝামেলা নিয়ে আসছেন কেন?”
“ওঁদের প্রপার্টিতে ঘটনাটা ঘটেছে। ওঁদের ডিসাইড করতে দিন। আপনি সবকিছুর মধ্যে আগ বাড়িয়ে ঢোকেন কেন? এ তো অদ্ভুত স্বভাব আপনার!”
“তাহলে আপনিই এক কাজ করুন। ওঁদের থেকে একটা কুড়ুল নিয়ে জঙ্গলে কাঠ কাটতে যান। তারপর নিজে হাতে চিতা বানিয়ে, বডি পুড়িয়ে ফেলুন! তখন থেকে টানা ফালতু ঝামেলা করে যাচ্ছেন। ক্রাইসিসের সময় হেল্প করতে না পারলে চুপ করে থাকবেন।” ফারুককে গত চব্বিশ ঘণ্টায় এরকম মেজাজ হারাতে কেউ দেখেনি। তার এই আচমকা রুদ্রমূর্তিতে সবাই যেন দু—এক পা পিছিয়ে গেল। জড়ো হয়ে থাকা ভিড়টার বাঁধনও একটু আলগা হয়ে এসেছে। দত্তবাবুও এদিক—অদিক তাকিয়ে কারওর থেকে, এমনকি নিজের পরিবারের থেকেও কোনো সমর্থন না পেয়ে অবশেষে মুখ বন্ধ করে ফেললেন।
“দেখুন, আমি জানি এটা একটা শকিং ব্যাপার। কিন্তু আপনারা প্লিজ একটু শান্ত হয়ে বসুন। নিজেদের ঘরে যেতে পারেন, বা চাইলে ডাইনিংয়েও ওয়েট করতে পারেন। আপনাদের যা ইচ্ছা।” ডলি এবার গলাটা যেন ইচ্ছে করেই একটু তুলল, “আর বিপদের সময় ভালো অ্যাডভাইস, যার থেকেই আসুক না কেন, সবসময় ওয়েলকাম!”
ডলি তার হাউসকোটের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে একটু তফাতে গিয়ে দাঁড়াল। পৃথ্বীও এবার ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগোচ্ছে। ভিড়টাও আস্তে আস্তে হালকা হচ্ছিল, কিন্তু ফারুক অনুরোধ করল যাতে সবাই একটু অপেক্ষা করে। তারপর প্রতিভাকে দেখতে পেয়ে, দোতলার ঘর থেকে কেশবকে একটু নীচে আসতে বলার জন্য অনুরোধ করল। এতক্ষণে ডলির ফোন করে পুলিশে খবর দেওয়া হয়ে গেছে। এবার ফারুক তার কাছে গিয়ে নিচু গলায় পুরো ঘটনাটা জানতে চাইল।
যা বোঝা গেল, ডঃ চক্রবর্তী গতকাল সন্ধ্যায় ঘরে বসে একা একা অনেকটা মদ খেয়ে ফেলেছিলেন। ডলি যখন তার ডিনার নিয়ে গেছিল, তখনই তিনি বেশ বেসামাল। ডলির থেকে দুটো অ্যান্টাসিড চেয়েছিলেন। ফলে আজ সকালে যখন ব্রেকফাস্ট করতে আসেননি, ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে তিনি এখনও অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। কিন্তু যখন প্রায় সাড়ে দশটা বাজতে চলল, তখন ডলি তার মেয়েকে পাঠায় খোঁজ করতে। আর কিছু না হোক ডাক্তারবাবু লাঞ্চ করবেন কিনা, সেটা তো অন্তত জানতে হবে। প্রতিভা অনেক ডাকাডাকি এবং দরজায় রীতিমতো ধাক্কাধাক্কি করেও সাড়া না পেয়ে যখন ফিরে এল, তখন গোপাল সঙ্গে গেছিল, যাতে দরকারে দরজা ভেঙে ফেলা যায়। শেষ পর্যন্ত সেভাবেই ঢুকতে হল, আর তারপর তো এই অবস্থা। ডলি গিয়ে দেখেছে, ডাক্তারবাবু বিছানায় স্থির হয়ে পড়ে আছেন। ডান হাতটা খাট থেকে বাইরে ঝুলছে। মুখের আশপাশ আর বালিশ—বিছানা, বমিতে মাখামাখি হয়ে আছে। ডলি একবারই শুধু নিশ্বাস পড়ছে কিনা ও পাল্স আছে কিনা চেক করে আবার পৃথ্বীকে নিয়ে ফিরে এসেছে।
ডলির সঙ্গে কথা বলে ফারুক যখন ডাইনিং হলে ঢুকল, তখন সবাই ছড়িয়ে—ছিটিয়ে বসে আছে। কেশবও নীচে নেমে এসেছে। পৃথ্বী রাই রান্নাঘরের কাজ থামিয়ে ওই খোপের কাছে কনুইতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে। ডলি আর প্রতিভাকে ঢুকতে দেখে ফারুক চেয়ারে বসে একটা বড়ো নিশ্বাস নিয়ে কথা বলতে শুরু করল।
“আমরা সবাই একটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির মধ্যে আটকে পড়েছি। এরকম ঘটনার মধ্যে থাকতে সাধারণত কেউই চায় না, কিন্তু একবার ঘটে গেলে তখন সেই অনুযায়ী কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং একভাবে মাথা ঠান্ডা রেখে এগোনো ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমি নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে এতটা কথা বলছি, নানারকম পরামর্শ দিচ্ছি, এসবের একমাত্র কারণ হল আমার আনফরচুনেটলি এই ধরনের মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা আগেও হয়েছে। এবং ঠিক সেই জায়গা থেকে আমার আর—এক-টা প্রস্তাব আছে। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে। তারা নিশ্চয়ই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসে একটা প্রাথমিক তদন্ত আরম্ভ করবে। বলাই বাহুল্য আমাদের সবার কাজ সেই তদন্তে সহযোগিতা করা। এবং এখানে আজকে উপস্থিত থাকার কারণে পুলিশ নিঃসন্দেহে আমাদের প্রত্যেকের গতিবিধি এবং অন্যান্য ডিটেইলস জানতে চাইবে। এহেন অবস্থায়, এরকম একটা এমনিতেই খোলামেলা প্রপার্টি আর তার উপর ন্যায্য কারণেই কটেজের দরজা ভাঙা—এই পরিস্থিতিতে বডি ফেলে রাখাটা কাজের কথা নয়। তাই আমার প্রস্তাব হল আমরা সবাই মিলে একটা দল তৈরি করি। প্রত্যেক পার্টি থেকে একজন বা দু’জন থাকুক যাতে আমরা বডিটাও পাহারা দিতে পারি আর শুনতে খারাপ লাগলেও, একে অপরের উপর নজরও রাখতে পারি।”
একটানা এতটা কথা বলে ফারুক একটু থামল। গোটা ঘর চুপচাপ। কথার যৌক্তিকতার জন্যই হোক বা তার বলার ভঙ্গিতে যে আত্মপ্রত্যয়ের ভাব ছিল সে কারণেই হোক, সবাই একটু—আধটু বিড়বিড় করে রাজি হয়ে গেল। প্রাথমিকভাবে ঠিক হল ফারুক, কেশব, প্রতিভা, দত্তবাবু, ঐশানী ও জয়দীপ মিলে পাহারায় বসবে।
ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে কটেজের দিকে পা বাড়ানোর সময় ফারুক জয়দীপকে একবার ডেকে বলল, “এই অবস্থায় এরকম আবদার করতে খুবই খারাপ লাগছে, কিন্তু তুমি আমাকে আর—এক মগ কফির ব্যবস্থা করে দিতে পারবে?”
পুলিশ আসার খবর পেয়ে এখন সবাই মোটামুটি লাইন করে কটেজের ডানদিকে, অর্থাৎ মেন রোড সংলগ্ন পথটা ধরে আবার ডাইনিং হলের সামনে এসে জড়ো হল। আপাতত ওই কনস্টেবল দু’জন কটেজের বাইরে মোতায়েন আছে।
পুলিশের যে প্রাথমিক তদন্তকারী দল এসেছে, তার নেতৃত্বে আছে বিপুল প্রধান। লাভা থানার ভারপ্রাপ্ত সাব ইনস্পেক্টর। বয়স পঁয়ত্রিশের ওপারে হওয়ার থেকে এপারে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মাঝারি উচ্চতা কিন্তু একদম পেশাদার অ্যাথলিটদের মতো পেটানো শরীর। গায়ের ইউনিফর্মটা যেমন গোটা শরীরে একদম মাপে মাপে বসে গেছে, মাথার চুলও ততটাই পরিপাটি করে কাটা এবং আঁচড়ানো। আগাগোড়া চালচলনে বেশ একটা ধারালো দক্ষতার ছাপ আছে। সেজন্যই হয়তো মেঘলা আকাশে বৃষ্টিবাদলার মধ্যেও চোখের এভিয়েটর সানগ্লাসটা খুব একটা বেখাপ্পা লাগছে না।
প্রধানের সঙ্গে পুলিশকর্মী এসেছে আরও চারজন। তার মধ্যে দু’জন মিলে দত্তবাবুদের গাড়িটাকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের গাড়িটা সোজা করে পার্ক করতে গিয়ে, কোনো একটা কারণে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। এছাড়া আর—এক-জন মানুষ আছেন। রোগা, লম্বা চেহারার এক প্রৌঢ়। একটা বিরাট মাপের রেনকোটের মধ্যে বলতে গেলে হারিয়েই গেছেন। আপাতত ডাইনিং হলের সামনে ছাউনির নীচে নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে একটা বেশ বড়োসড়ো কালো রঙের ফোলিও ব্যাগ। গোটা দৃশ্যের মধ্যে লোকটি নিতান্তই বেমানান। যেন এক নাটকের চরিত্র ভুল করে অন্য নাটকের মহড়ায় ঢুকে পড়েছে।
ফারুকের সঙ্গে বাকিরা প্রায় মিশনারি স্কুলের বাধ্য ছাত্রছাত্রীর মতো লাইন দিয়ে এসে যখন পৌঁছাল, প্রধান তখন মন দিয়ে ডলির থেকে ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ শুনছে। সেই বয়ান প্রায় সকালের কথারই হুবহু পুনরাবৃত্তি। বাকিরা এসে পড়ায় যে সামান্য গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল, সাব ইনস্পেক্টর ঘাড় না ঘুরিয়ে হাত তুলে সেটা থামিয়ে দিল। ফারুক অপেক্ষা করেছিল ডলির বক্তব্য শেষ হওয়ার জন্য। এবার সে প্রধানের দিকে এগিয়ে গেল।
“নমস্কার, আমার একটা কথা ছিল। আপনি কি একবার একটু সাইডে আসবেন? কথা দিচ্ছি, এটা আপনাদের তদন্তের জন্য রেলিভেন্ট।”
মনে মনে খানিক বিরক্ত হলেও প্রধানের মুখে তার কোনো বহিঃপ্রকাশ হল না। নিজের অভিজ্ঞতায় সে দেখেছে প্রত্যেক ঘটনাতেই এরকম অন্তত একজন লোক থাকে, যার ধারণা তার হাতেই গোটা তদন্তের চাবিকাঠি আছে। প্রথম দিকে এদের একটা দাবড়ানি দিয়ে চুপ করিয়ে দিত। কিন্তু ইদানীং বুঝেছে যে গোড়াতেই এদের সঙ্গে কথাটা সেরে ফেলা ভালো। না হলে এরা আগাগোড়াই থেকে থেকে খুঁচিয়ে যাবে। তাছাড়া একশো বারের মধ্যে নিরানব্বই বার এদের কথাবার্তা বা এদের দেওয়া তথ্য একেবারে অবান্তর হলেও, ওই একবার কিন্তু তীর সঠিক নিশানায় এসে লাগে। পুলিশে চাকরি করে প্রধান বুঝেছে এই কাজের মূল অস্ত্র ধৈর্য আর অধ্যাবসায়।
অপ্রয়োজনীয় জেনেও প্রতিটি জিনিস পরখ না করে ফেলে দেওয়া যায় না। অতএব বিরক্তিকর লাগলেও প্রত্যেক উদ্ভট, সন্দেহপ্রবণ বা হামবড়া ব্যক্তির বয়ান মন দিয়ে শোনা তার ডিউটির মধ্যে পড়ে।
“বলুন কী বলবেন।” ফারুকের কথার জবাব প্রধান ইংরেজিতেই দিল।
“আসলে কথাটা কীভাবে বলে উঠব ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি এখানে গতকাল থেকে আছি। এর মধ্যেই একটা অদ্ভুত রহস্যময় ঘটনার সাক্ষী হয়েছি। সেটা একটু পরে আপনাকে আরও বিশদে বলব। তাছাড়াও একটা দুটো কথা কানে এসেছে, যেগুলো এই তদন্তের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। আপনি বলতেই পারেন যে সেরকম কথা জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেকের কাছ থেকেই হয়তো জানা যাবে। কিন্তু আমি বলব যে সেসব কথা বা ঘটনা জানা, শোনা, বোঝা এবং সেগুলো আপনার সঙ্গে শেয়ার করাটা আমার ক্ষেত্রে বাকিদের থেকে আলাদা হবে। আপাতত নিশ্চয়ই কথাগুলো শুনতে একটু প্রলাপের মতো লাগছে, কিন্তু আমি একটি বার অনুরোধ করব আপনি যদি একবার কালিম্পঙে আপনাদের বড়োকর্তা অতুল ছেত্রীকে একটা ফোন করেন। আমার নিজের মুখে পরিচয় দেওয়া এবং তারপর সেটা প্রমাণ করার পিছনে যা সময় নষ্ট হবে, সেই তুলনায় এটা সব দিক থেকে সিম্পল।”
“আমাদের এসপি সাহেব? তাঁকে কেন ফোন করতে যাব? আপনি কে?”
“আমি এখানে আসার আগে প্রায় চার—পাঁচ দিন ওঁর অতিথি হয়েই ছিলাম। আমার মনে হয় উনিই আমার পরিচয়ের ব্যাপারটা আপনাকে ভালো করে বলতে পারবেন। এটা কোনো প্র্যাংক নয়, আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন।”
প্রধান কয়েক সেকেন্ড নিষ্পলকভাবে ফারুকের দিকে চেয়ে থেকে মাথা নামিয়ে খানিকক্ষণ ভাবল। মন দিয়ে ভাবার সময়, প্রধান খানিকটা জিভ বের করে নীলের ঠোঁট চাটতে থাকে। এভাবে আরও কয়েক মুহূর্ত কাটার পর পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে, কয়েকবার বুড়ো আঙুল বুলিয়ে কয়েক হাত দূরে সরে গেল। সে যে খুবই দ্বিধাবিভক্ত ও সন্দেহের বশবর্তী হয়ে ফোনটা করছে, সেটা তার ঘাড় নিচু করে দাঁড়ানো এবং ডান হাত দিয়ে মুখের অধিকাংশ ঢেকে রাখা থেকেই স্পষ্ট। এবার মনে হয় অপর প্রান্তে কেউ ফোনটা তুলেছে। প্রধানের মাথা নড়ানো দেখে বোঝা যাচ্ছে সে পরিস্থিতি যতটা সম্ভব গুছিয়ে বলার চেষ্টা করছে। এবার সে খানিকক্ষণের জন্য স্থির। সম্ভবত অপর প্রান্তে কেউ টানা কথা বলছে। সেই অবস্থাতেই প্রধানের ঘাড় আস্তে আস্তে সোজা হল, ডানহাত মুখ থেকে কোমরের কাছে নেমে এল, তারপর একবার সামান্য মাথা ঘুরিয়ে ফারুকের দিকে দেখে নিয়ে, দু’বার ঘন ঘন মাথা নেড়ে, ফোন নামিয়ে রাখল। এবার একটা বড়ো নিশ্বাস নিয়ে দৃপ্ত পদক্ষেপে হেঁটে এসে ফারুকের সামনে দাঁড়িয়ে, তার দিকে তাকিয়ে সোজা একটা স্যালুট।
“আরে, এত ফর্মালিটির দরকার নেই!” ফারুক একটু হেসে হাতের ইশারায় প্রধানকে আশ্বস্ত করল।
“আপনি এসিপি সিদ্দিকি! সরি স্যার, আপনাকে চিনতে পারিনি।”
“আমি এসিপি ছিলাম, বেশ অনেক বছর আগে। এখন আমি সিভিলিয়ান। আপনার আমাকে চেনার কথাও না।”
“সেরকম না স্যার। আপনারই মনে থাকার কথা নয়, কিন্তু আমি যখন ট্রেনিংয়ে ছিলাম, তখন আমাদের ব্যাচে একটা সপ্তাহে তিনটে স্পেশাল লেকচার দিতে আপনি এসেছিলেন। এটা প্রায় বারো বছর আগের কথা। তখন আসলে আপনার চেহারাটা অনেক ছিপছিপে ছিল, গোঁফ রাখতেন, চুলটাও বোধহয় ব্যাকব্রাশ করা থাকত। এখন অনেকটা চেঞ্জ হয়ে গেছে। আর ছেত্রী স্যার তো অনেকদিন আপনার সঙ্গে কাজ করেছেন। উনিও অনেকবার আপনার কথা বলেছেন। ওঁর কাছ থেকেই আপনার আনফরচুনেট অ্যাক্সিডেন্ট আর তারপর রিটায়ারমেন্টের কথা শুনেছি। এভাবে আপনার সঙ্গে দেখা হবে, এটা একদম আনএক্সপেক্টেড।”
“আসলে নিজের একটা পুরানো পরিচয় দিয়ে নিজে থেকে একগাদা ইনফরমেশন দিতে শুরু করলে হয়তো আপনার মনে হত যে আমি জোর করে খবরদারি বা ইন্টারফিয়ার করছি। আমি সম্পূর্ণ অন্য কাজে নর্থ বেঙ্গলে এসে, একদমই ঘটনাচক্রে এখানে জড়িয়ে পড়েছি। সেসব এখানে নয়, পরে বলছি।”
হোমস্টের বাকি সকলে এতক্ষণ চুপ করে, অদম্য কৌতূহল নিয়ে দূর থেকে ফারুক আর প্রধানকে দেখে যাচ্ছে। দূরত্বের কারণে কথাবার্তা কিছুই কানে আসছে না। মনে হচ্ছে যেন এক অপ্রত্যাশিত মূকাভিনয়ের দর্শক হওয়ার সুযোগ হয়েছে সকলের। এবং তাদের চোখের সামনেই এই মুহূর্তে নাটকের এক অন্যতম প্রধান চরিত্র উন্মোচিত হল।
“আপাতত আপনারা নিজেদের মতো ওয়েট করুন। আমরা লোকেশনটা একটু দেখে আসছি। তারপর সবার সঙ্গে কথা বলব। তবে আর যাই করুন, এখানকার খবর এখনই বাইরে জানাবেন না। যদি লিক হয়, আমরা কিন্তু ফোন বা ইমেল ট্র্যাক করে ট্রেস করব আর তারপর স্টেপ নেব। ব্যাপারটা সিরিয়াস, হালকাভাবে নেবেন না। আর—এক-টা কথা।” এবার প্রধান ফারুকের দিকে হাত তুলে দেখাল। “আপনারা ওঁকে গতকাল থেকে দেখছেন। আপনাদের জানার কথা নয়, কিন্তু একসময় ক্যালকাটা পুলিশের অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার ছিলেন। নানারকমের ক্রাইমের ব্যাপারে ভাস্ট এক্সপেরিয়েন্স। আমরা টাইম টু টাইম একসঙ্গে কনসাল্ট করব, ওঁর হেল্প নেব। আপনাদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও উনি প্রেজেন্ট থাকবেন। এটা আপনাদের জানানো উচিৎ, তাই বলে রাখলাম।”
গোটা জটলার মধ্যে একটা হতভম্ব নিশ্চুপ ভাব। কেউ কেউ আড়চোখে ফারুকের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু চোখাচোখি হয়ে যাওয়ার ভয়ে আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে। রাই পরিবারই প্রথম ওখান থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোল। রূপকথার জিয়নকাঠি ছোঁয়ার মতো সবার চটক ভেঙে আস্তে আস্তে এদিক—অদিক ছড়িয়ে—ছিটিয়ে গেল। শেষ অবধি দাঁড়িয়ে ছিল কেশব কোঠারি। তার মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে যেন সে দ্রুত একটা বড়ো অঙ্কের হিসাব আর—এক-বার মিলিয়ে নিচ্ছে।
“চলে আসুন।” ছাউনির নীচে দাঁড়ানো প্রৌঢ়কে উদ্দেশ্য করে প্রধান হাঁক পাড়ল। ভদ্রলোক একটু উঁকিঝুঁকি মেরে বৃষ্টির তেজ বোঝার চেষ্টা করে, শেষে হাতের ব্যাগটা মাথার উপর চাপিয়ে এগিয়ে এলেন। ওই দু’জন কনস্টেবলও খানিকক্ষণ আগে সফলভাবে গাড়িটা পার্ক করে, একটা ধারে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রধান আলাপ করিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত তুলল। “ইনি মিস্টার ফারুক সিদ্দিকি। এক্স এসিপি, ক্যালকাটা পুলিশ। আর ইনি আমাদের মেডিক্যাল টিমের খুবই সিনিয়ার মেম্বার, ডক্টর প্রবীর সেন।”
ফারুক হেসে হাত বাড়িয়ে দিল। ডক্টর সেন হ্যান্ডশেক করলেও মুখের অভিব্যক্তির বিশেষ কোনো পরিবর্তন হল না। পরিচয়পর্ব শেষ করে পাঁচজনের দলটা ডাইনিং হলের বাঁদিকের পথ ধরে কটেজের দিকে রওনা দিল।
***
একটি ভীষণ পরিপাটিভাবে সাজানো—গোছানো কটেজের মধ্যে মৃত্যুর উপস্থিতি কলঙ্কের মতো।
আপাতত সবাই খাটের চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খাটের বাঁদিকে একটা বড়ো আয়নাসহ ড্রেসিং টেবিল আর তার সামনে একটা অটোমান গোত্রের গদিমোড়া নিচু বসার টুল। তার ওপারে একটা জাপানি কায়দার স্ক্রিন পার্টিশন দিয়ে কটেজটা দু’ভাগে বিভক্ত। পার্টিশনটা এদিকের দেয়াল থেকে শুরু হয়ে উলটোদিকের দেয়ালে পৌঁছানোর ফুট তিনেক আগে শেষ হয়ে গেছে। এই মাঝের খোলা জায়গাটা দিয়ে ওপারে গেলে একটা ছোটো বসার ঘরের মতো জায়গা। সেখানে একটা কফি টেবিল আর দুটো গদি দেওয়া বেতের চেয়ার। সেগুলো পেরোলে কটেজের মূল দরজা। আগাগোড়া মেঝেতে কার্পেট বিছানো।
খাটের ডানদিকে একটা সুদৃশ্য ওয়ার্ডরোব জাতীয় আলমারি যার একদিকটা একটু বাড়িয়ে নিয়ে একটা কোমর সমান উঁচু শেল্ফ তৈরি হয়েছে। তার উপর কিছু জিনিস এলোমেলোভাবে পড়ে আছে—একটা মানিব্যাগ, একটা ছোটো চাবির গোছা, একটা দামি ফ্রেমের প্রোগ্রেসিভ লেন্সের চশমা, একটা সস্তার লাইটার, গোটা স্ট্রিপ থেকে কাঁচি দিয়ে কেটে নেওয়া দুটো ওষুধের ট্যাবলেট, কিছু খুচরো পয়সা আর তার নীচে দু—তিনটে বিভিন্ন খাবারের দোকানের বিল। ট্যাবলেটগুলো বাজারে চালু অ্যান্টাসিড। শেল্ফের একদম নীচের তাকে শোয়ানো অবস্থায় রাখা আছে একটা হাফ সাইজের ভদকার বোতল এবং একটা সাড়ে সাতশো মিলিলিটার সাইজের হুইস্কির বোতল। দুটোই বেশ দামি ব্র্যান্ডের এবং দুটো বোতলই খালি। সেগুলোর পাশে একটা দোমড়ানো এক লিটারের প্লাস্টিকের জলের বোতল, যেটার গা থেকে নীল লেবেলটা খানিক ছিঁড়ে, খুলে এসেছে।
খাটের দিকটাও খুবই ছিমছাম। মাথার উপর একটা গোল শেড দেওয়া দু—মুখো আলো। তার নীচে একটা চেনা পেন্টিংয়ের কপি সুন্দর করে বাঁধানো। ছবিটায় উত্তাল সমুদ্রে একটা বিরাট ঢেউ উঠেছে আর তার সঙ্গে অসম মোকাবিলা করে যাচ্ছে তিনটে ডিঙি নৌকা। ঠিক তার নীচে, খাটের ডানদিক ঘেঁষে পড়ে আছে নীলাদ্রি চক্রবর্তীর নিথর দেহ। দু’চোখ বোজা। মুখ ঈষৎ হাঁ হয়ে আছে। সেখান দিয়ে বাদামি হলদেটে রঙের বমি গাল বেয়ে নেমে পাশের বালিশ আর বিছানার চাদরের উপর শুকনো হয়ে দলা পাকিয়ে আছে। কাছে গেলে একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে যার সঙ্গে ফ্রিজে রাখা বাসি খাবারের গন্ধের মিল আছে। হাঁ—করা মুখে এমনভাবে বমি লেগে আছে, দেখে ফারুকের আচমকা বিজয়া দশমীর কথা মনে পড়ল। বিসর্জনের আগে যখন প্রতিমা বরণ করে, তখন তাদের মুখে ঠেসে ঠেসে সন্দেশ দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে সেগুলোর চেহারাও এরকমই হয়। দলা পাকানো খাবার দিয়ে নিশ্চল, নিষ্পলক মুখগুলো বন্ধ করে রাখা।
ডক্টর সেনের সামনে আপাতত তাঁর ব্যাগ থেকে বের করা রাইটিং প্যাড ও কিছু কাগজপত্র। সেসব গুছিয়ে নিয়ে সামনে ঝুঁকে মৃতদেহের বাঁ কবজিতে নিজের আঙুল চেপে কয়েক সেকেন্ড পরীক্ষা করলেন। তারপর মন দিয়ে একাধিক জায়গায় নোট নিয়ে, কাগজগুলো পাশের শেল্ফে রেখে পকেট থেকে ডাক্তারি দস্তানা বের করে দু’হাতে পরে নিলেন। একবার মৃতদেহের চোখ ফাঁক করে দেখে, আলতো করে মাথাটা ওপাশ ফিরিয়ে, চোয়ালের নীচে গলার কাছে আঙুল দিয়ে কিছু একটা হিসাব করলেন।
ইতিমধ্যে প্রধান পেন্টিংয়ের উলটোদিকের দেয়ালে একটা দরজা খুলে বাথরুমটা ঘুরে এসেছে। এবার সে নিচু হয়ে ওয়ার্ডরোবের সামনে বসল। সেটার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো নীলাদ্রির লাগেজ। লাগেজ বলতে একটা বড়ো সাইজের সবুজ রঙের ট্রলি ব্যাগ আর তার উপর রাখা একটা বেশ দামি, মাঝারি আয়তনের কাঁধে ঝোলানো চামড়ার ব্যাগ। দুটোই বন্ধ এবং দেখে মনে হচ্ছে এখানে আসার পর আর খোলা হয়নি। ট্রলির চেনদুটোর মধ্যে দিয়ে একটা ছোটো তালাও লাগানো আছে। সেটার গায়ে নানা জায়গায় দেশ—বিদেশের বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ছেঁড়া—ছেঁড়া লেবেল।
“একটা ব্যাগ লাগবে।” ডক্টর সেনের গলা শোনা গেল। তিনি মৃতদেহের মাথার কাছ থেকে প্রায় বালিশের নীচে ঢুকে যাওয়া একটি কাচের গেলাস তুলে ধরেছেন। চওড়া এবং খাটো হুইস্কি খাওয়ার পাত্র যাকে সাধারণত কাট গ্লাস বলা হয়। এখন সেটা একদমই খালি এবং শুকনো। একজন কনস্টেবল একটা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ব্যাগ তাঁর দিকে এগিয়ে দিল। তিনি গেলাসটা ভরে আবার সেটা ফেরত দিয়ে দিলেন।
“একবার ওয়ার্ডরোবটা খোলা যায়?” ফারুক বলল।
প্রধান একটু সরে এসে হাতলে টান দিতেই একদিকের পাল্লা খুলে গেল। মাঝখানে তাকের উপর ভাঁজ না—করা একটা হালকা সোয়েটার আর একটা ঘিয়ে রঙের ফুলহাতা শার্ট। দেখে বোঝা যায় যে দুটোকেই অবহেলাভরে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে আলমারির ভিতর। এছাড়া বাকিটা একেবারেই ফাঁকা। রডে ঝোলানো চারটে হ্যাঙ্গার পাল্লা খোলার ঝাঁকুনিতে একটু দুলে উঠেছে। তাতে খুবই মৃদু ঠুংঠাং আওয়াজ হচ্ছে।
“ভদ্রলোকের পকেট চেক করে একবার দেখবেন সিগারেটের প্যাকেট আছে কিনা?” ফারুক প্রশ্ন করল।
সেটা একবার প্যান্টের পকেটে হাত দিতেই পাওয়া গেল। দামি বিদেশি ব্র্যান্ডের বড়ো প্যাকেট। তাতে খান পাঁচেক সিগারেট অবশিষ্ট থাকলেও সারা রাত পকেটে থাকায়, চাপ লেগে একেবারে শোচনীয় অবস্থা। অ্যাশট্রেটা খাটের এককোণেই দেখা যাচ্ছে। সেটা মোটামুটি ভরতি। তবে সেটা যে বালিশের পাশ থেকে গত সন্ধ্যায় বা রাতে কোনো একসময় স্থানান্তরিত করা হয়েছে, তার প্রমাণ সাদা বিছানায় একটা গোল ধুসর ছোপ।
“আমার প্রাথমিক অনুমান মৃত্যু হয়েছে রাত সাড়ে এগারোটা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে।” ডক্টর সেন এতক্ষণ উবু হয়ে ঝুঁকে অনেক কিছু লিখছিলেন। এবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
“আপাতত কারণ কিছু বোঝা যাচ্ছে?” প্রধান জানতে চাইল।
“এখনই একদম কমিট করব না, কিন্তু আমার ধারণা ব্যাপারটা পালমোনারি অ্যাসপিরেশন টাইপের কিছু। সাধারণত নেশার ঘোরে এটা হয়। শরীরে একটা রিফ্লাক্স মতো হয়ে বমি হয়, কিন্তু এক্সটারনাল কারণে, যেমন মদ বা ড্রাগের নেশার জন্য, শুয়ে ঘুমিয়েই থাকে মানুষ। এহেন অবস্থায় নিজের বমিতেই শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু হয়।”
“এই মুহূর্তে অন্য কোনো কিছু থেকে আর কোনো কারণ আন্দাজ করা সম্ভব? যেমন ধরুন বিষপ্রয়োগের চান্স আছে?” এবার ফারুক জানতে চাইল।
“এটা এখনই বলা সম্ভব নয়। শারীরিক কোনো উপসর্গে তো নেই, কিন্তু আপনি হয়তো কোনো গন্ধের সূত্র ধরে বলতে চাইছেন। সেক্ষেত্রে বলতে পারি যে সাধারণত আমাদের চেনা যেই রেসিডুয়াল গন্ধ থেকে আমরা বিষের উপস্থিতি টের পাই, সেরকম কিছু বুঝিনি। মানে সায়ানাইডের ক্ষেত্রে বাদামের গন্ধ, ফসফরাসের রসুন জাতীয় গন্ধ, অথবা নাইট্রোবেঞ্জিনের কড়া মিষ্টি গন্ধ। এবার এর বাইরেও অজস্র ক্যাটেগরি আছে, সবকিছুর গন্ধ হয়ও না। আর ফ্র্যাংকলি আমার শার্লক হোমসের মতো ঘ্রাণশক্তি এবং বিষের ক্যাটালগ নিয়ে জ্ঞান নেই। তাই মৃত্যুর স্পেসিফিক সময় এবং কারণ জানতে আপাতত বডি পোস্ট মর্টেমের জন্য পাঠানো এবং সম্ভব হলে যত তাড়াতাড়ি একটা ডিটেইল টক্সিকোলজি—এর বাইরে আর কোনো প্রফেশনাল ওপিনিয়ন নেই।”
ভদ্রলোক হাতের দস্তানা খুলে ফেলেছেন। ঠিক এই সময় বাইরে পাহারায় থাকা একজন কনস্টেবল ভিতরে ঢুকে জানাল যে গাড়ি এসে গেছে। অর্থাৎ মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য বরাদ্দ যে গাড়ি। ডক্টর সেনও তাঁর কাগজপত্র ব্যাগে ভরে নিয়ে কটেজের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন। হয়তো বডি নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা নিজে দাঁড়িয়ে করাতে চান। এই সুযোগে ফারুক প্রধানকে ইশারায় বাইরের বসার জায়গাটায় আসতে বলল। তারপর দু’জন দুটো বেতের চেয়ার দখল করে বসার পর, ফারুক প্রথমে নীলাদ্রি এবং ঋজুর সম্ভাব্য পূর্বপরিচিতির ব্যাপারটা জানাল। তারপর আরও গলা নামিয়ে আগের রাতের গোটা ঘটনাটা বিশদে বলে ফোন থেকে ওই চিঠির ছবিটা দেখাল।
“এত কোইন্সিডেন্স কি সম্ভব? একই রাতে একটা এরকম চিঠি আর তার থেকে একটু দূরেই একজন মারা গেলেন, যেটা আর যাই হোক স্বাভাবিক মৃত্যু না।” প্রধান ফোন ফেরত দিয়ে মন্তব্য করল।
“দেখুন, এখনই কোনো কনক্লুশনে পৌঁছানোটা ভুল হবে। কিন্তু আমিও আপনার সঙ্গে একমত। এটাকে একটা ওভারড্রিংকিং বা ওভারডোজের দুর্ঘটনা বলে হালকা ভাবে নেওয়াটা ঠিক হবে না। তাছাড়া দেখাই যাচ্ছে যে একজন অন্তত আছে যে মৃত ব্যক্তিকে আগে থেকে চিনত এবং খুবই অপছন্দ করত। এগুলো তো প্রথমে একটু তলিয়ে দেখা দরকার।”
“ভেরি ওয়েল!” প্রধান উঠে দাঁড়িয়েছে। “প্রথম রাউন্ডের জিজ্ঞাসাবাদের একটা অ্যাপ্রোচ অন্তত পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে আর সময় নষ্ট না করে আমরা শুরু করে দিই? আপনি তো থাকবেন। আপনারও নিশ্চয়ই কিছু প্রশ্ন আছে।”
“আছে।” ফারুকও উঠে দাঁড়াল। “সামান্য খটকা, একটা জলের বোতল নিয়ে।”
***
“আপনার পুরো নাম বলুন।”
“কেশবলাল নন্দলাল কোঠারি।”
“আপনি নীলাদ্রি চক্রবর্তীকে কীভাবে চিনতেন?”
“আমি ২০০৫ থেকে ২০১০—এর মধ্যে ব্যাঙ্গালোরের একটা ওষুধ কোম্পানিতে কাজ করতাম, জুপিটার ফার্মা। কলকাতার সমস্ত অপারেশন বলতে গেলে আমিই দেখাশোনা করতাম। আমার উপরে খালি রিজিওনাল ম্যানেজার ছিলেন। আমাদের কাজে ডক্টরদের সঙ্গে রেগুলার টাচে থাকতে হত। ডঃ চক্রবর্তী তখন বিরাট নাম করে ফেলেছেন। বিএমএসটি হসপিটাল তো জানেন। ওটা বলতে গেলে ওনার আন্ডারেই এই জায়গায় উঠতে পেরেছে। তখন একটা—দুটো অফিশিয়াল মিটিং হয়েছিল। তাছাড়া কিছু কর্পোরেট পার্টিতে দেখেছি, কিন্তু কথা হয়নি। আফটার অল উনি একজন প্রায় সুপারস্টার সার্জেন আর আমি মামুলি সেল্স এক্সিকিউটিভ। প্লাস আমার চেনাজানা অনেকেই, বোথ ফ্রেন্ডস অ্যান্ড রিলেটিভস ওনার পেশেন্টও ছিল।”
“এখানে একসঙ্গে এলেন কীভাবে?”
“আমি বিজনেসের কাজে এই অঞ্চলে ছিলাম। ডেলোর সাইড থেকে আসছিলাম। সকালে চা—বিস্কুট খেয়ে বেরিয়েছিলাম। তো লাভায় থামলাম একটু খাওয়া—দাওয়া করতে। তখনই চোখে পড়ল যে ডঃ চক্রবর্তী একটা হোটেল থেকে বেরিয়ে আর—এক-টা হোটেলে ঢুকলেন। এতদিন পর দেখলাম, এরকম জায়গায়। একদম আনএক্সপেক্টেড! আমিও ওই হোটেলে ঢুকলাম। তখন বুঝতে পারি যে উনি একটা রুম খুঁজছেন কিন্তু ওয়েদারের যা অবস্থা, কোথাও কিছু পাচ্ছেন না। তো আমিই গিয়ে সাজেস্ট করি এখানকার কথা। উনি রাজি হয়ে যান।”
“আপনি কি এখানেই আসছিলেন?”
“সেরকম ঠিক না। কিন্তু কিছুদিন ধরে ভাবছিলাম যে এদিকে এসে একবার নেওরা ভ্যালি ফরেস্টের অথরিটির সঙ্গে একটা মিটিং করব। একটা পসিবল রিসর্টের ব্যাপারে। তাই ভাবলাম এদিকে ঘুরেই যাই। আমার কাজও হবে, ওনার কাজও হবে।”
“কিন্তু সকালে কাজটা প্ল্যান করে বেরোননি?”
“না, নট এগজ্যাক্টলি।”
“তাহলে বলা যায় যে ডাক্তারবাবুর উপকার করতেই এদিকে এলেন?”
“মানে, এভাবে বললে বেকার বেকার খুব মহান শোনায়। এরকম কোনো ব্যাপার না। জাস্ট একটা জেশ্চার…”
“হুম, উনি আপনাকে চিনতে পেরেছিলেন?”
“মনে তো হয় না। প্রায় পনেরো—কুড়ি বছর আগের অল্প পরিচয়। উনি এত ব্যস্ত লোক। আমি ভেবেছিলাম এখানে কথাবার্তা হলে একসময় বলব। মওকা কাঁহা মিলা?” কেশবের গলা যেন একটু ভারী হয়ে এল। দু—একবার সশব্দে নাক টেনে, ডান হাতের দুটো আঙুল দিয়ে চোখের কোনা একটু মুছে নিল। তারপর একটা বড়ো নিশ্বাস ফেলে সামনের দিকে তাকাল। প্রধানও এতক্ষণ টানা প্রশ্ন করে এবার ঘাড় ঘুরিয়ে ফারুকের দিকে তাকিয়ে আছে। ফারুক একবার সামান্য ভুরু কুঁচকে একটা চেয়ার টেনে কেশবের সামনে বসল।
“আপনাকে একটা ডেলিকেট প্রশ্ন করতে চাই। এখানে যতজন উপস্থিত আছেন, তার মধ্যে নিঃসন্দেহে আপনি সবথেকে বেশিদিন ডঃ চক্রবর্তীকে চেনেন। আপনার কাজের সূত্রে আপনি কলকাতার ডাক্তারি মহলটা খানিক হলেও চেনেন। নীলাদ্রি চক্রবর্তী কি অ্যালকোহলিক ছিলেন, মানে মাতাল? এরকম কিছু কখনও শুনেছেন?”
“না না। ড্রিঙ্ক যে করতেন না, তা নয়। পার্টিগুলোতে আমি নিজেই দেখেছি হুইস্কি গ্লাস হাতে। কিন্তু সেটা লিমিটের মাধ্যেই, বাকি সবার মতো। বরং এটাই শুনেছি যে উনি ওনার বাবার মতো নন।”
“তার মানে?”
“এটা অ্যাকচুয়ালি আমিও খুব ডিটেইলে বলতে পারব না। এক তো অনেকদিন আগের কথা। আর তাছাড়া এগুলো প্রায় গসিপের মতো। আমি এসবের মধ্যে একদম থাকা পছন্দ করি না। তবে শুনেছি ওনার বাবাও বড়ো ডাক্তার ছিলেন, কিন্তু মদের নেশা খুব ছিল। মারাও গেছিলেন বোধহয় ওই কারণে, কিন্তু আমি শিওর হয়ে বলতে পারব না।”
“লাভা থেকে ডঃ চক্রবর্তী যখন আপনার গাড়িতে ওঠেন, তখন ওঁর সঙ্গে কী কী লাগেজ ছিল, একটু বলতে পারবেন? ছোটো ব্যাগ, পাউচ, প্লাস্টিকের প্যাকেট, কিচ্ছু বাদ দেবেন না। আপনার যা যা মনে পড়ছে, সবটা শুনতে চাই।”
“ওরকম ছোটোখাটো জিনিস তো কিছু ছিল বলে মনে হচ্ছে না। একটা বড়ো ট্রলি ছিল, ওটা গাড়ির ছাদে তুলে দেওয়া হল। এর বাইরে, একটা এক্সপেনসিভ লেদার ব্যাগ কাঁধে ঝুলছিল। গাড়িতে ব্যাক সিটে আমাদের দু’জনের মাঝে রাখা ছিল গোটা রাস্তা। এছাড়া আর কী? একটা চশমার কেস ক্যারি করছিলেন। সেটা তো বোধহয় জানতে চাইছেন না। এছাড়া… এছাড়া ও হ্যাঁ। হাতে একটা জলের বোতল ছিল, এক লিটারের।”
“কোন ব্র্যান্ডের মনে আছে কি?”
“এই রে! ওটা তো সেরকম নোটিস করিনি। একদম রেল নীর টাইপ অর্ডিনারি বোতল। ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিক, নীল লেবেল।”
“বেশ, আপনি আগে আমাকে বলেছিলেন যে উনি সোমবার গ্যাংটক যাচ্ছিলেন। কী কারণে আপনি জানেন?”
“একদমই জানি না। তবে কোনো কাজেরই ব্যাপারে। কারণ উনি ফ্যামিলির সঙ্গে ভ্যাকেশনেই এদিকে এসেছিলেন। ছুটি কাটিয়ে বাকি ফ্যামিলি মেম্বাররা ফিরে গেছিলেন আর উনি কাজের জন্য স্টে করে গেলেন।”
“কোথায় ছুটি কাটাচ্ছিলেন জানেন?”
“না, সরি।”
“পুরো নাম?”
“ডলি রাই।”
“আপনার বাড়ি কোথায়?”
“আমার নিজের বাড়ি কালিম্পং টাউনের কাছে। আমার হাজব্যান্ড এখানকার।”
“এখানে আছেন কত বছর?”
“২০০৩ থেকে। আমার শ্বশুরের একটা হার্ট অ্যাটাক হয়। তখন চলে আসি।”
“তার আগে?”
“শিলিগুড়িতে।”
“সেখানে কতদিন?”
“প্রায় পাঁচ বছর। তার আগে বেশ কিছুদিন কলকাতায় ছিলাম। শিলিগুড়ি আসি ১৯৯৮—এ, সেই বছরই আমার বিয়ে হয়।”
“আর হোমস্টে কবে থেকে?”
“২০১০। প্রথমে শুধু দুটো ঘর দিয়ে শুরু করেছিলাম। ২০১৫—র পর থেকে একটু একটু করে বাড়াতে থাকি।”
“আপনার এখানে বুকিং হয় কীভাবে?”
“প্রথমদিকে ফোনে হত। এখন অনেকদিন ধরে হোয়াটসঅ্যাপেই হচ্ছে। ফোন নম্বর বিভিন্ন ব্লগ আর বেড়ানোর ম্যাগাজিনে দেওয়া আছে। তাছাড়া একটা ফেসবুক পেজও আছে।”
“ডঃ চক্রবর্তী তো বোধহয় নিজে ফোন করেননি।”
“না, ফোন করেছিলেন মিস্টার কোঠারি। উনি আগেও কয়েকবার এখানে থেকে গেছেন। এই শীতকালেও এসেছিলেন। আমার ঘরও খালি ছিল। অসুবিধা হয়নি।”
“উনি প্রথমে তো কটেজে ওঠেননি।”
“না, আমি দোতলায় পাশাপাশি দুটো ঘর দু’জনকে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওঁর কটেজটা দেখে ভালোলেগে গেছিল। আমিও শিফট করিয়ে দিয়েছিলাম।”
“কটেজে ঢোকার পরে ওঁর সঙ্গে আপনার আর কতবার দেখা হয়?”
“দুপুরে খাওয়ার সময় তো সবাই ছিল। তারপর আমি পাঁচটা নাগাদ বিকেলের চা বানিয়ে নিয়ে যাই। উনি দরজা খুলে আমার হাত থেকে চায়ের কাপ—প্লেট নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন যে এখানে মদ পাওয়া যাবে কিনা। উনি দেখেছিলেন যে আমাদের কাউন্টারে বিয়ার আছে। কিন্তু উনি আর—এক-টু কড়া কিছু চাইছিলেন। আমি না বলায় উনি বেশ হতাশই হলেন মনে হল। তখন আমি ওঁকে বলি যে আমার ব্যক্তিগত স্টকে কিছু আছে কিনা দেখে জানাব। তারপর ফিরে এসে আমাদের নিজেদের আলমারি থেকে একটা প্রায় আধ বোতল ভালো হুইস্কি আর—এক-টা ছোটো প্রায় খালি ভদকার বোতল নিয়ে ওঁকে দিয়ে আসি। আমার কাছে একটা সস্তার হুইস্কিও ছিল। কিন্তু সেটা অফার করিনি। বোতলগুলো নিয়ে উনি খুবই খুশি হয়ে আমাকে দাম দিতে চাইলেন। কিন্তু এগুলোর জন্য কত নেওয়া উচিৎ সেটা আমি বুঝতে পারিনি, তাই বলেছিলাম পরে হিসাব হবে। এরপর রাতে ওঁর ঘরে ডিনার পৌঁছতে যাই। উনি বলেছিলেন রেখে যেতে, পরে খাবেন। তারপর জানতে চেয়েছিলেন আমার কাছে কোনো অ্যান্টাসিড আছে কিনা। আমি বাড়ি থেকে দুটো ট্যাবলেট আবার দিয়ে আসি। তখন রাত ন’টা মতন হবে। আর একবারই গেছিলাম আরও এক ঘণ্টা পরে। গিয়ে দেখলাম ডিনারের বাসনপত্র উনি দরজার বাইরে রেখে দিয়েছেন। সবটা খাননি। আমি ওগুলো নিয়ে চলে আসি। তখন আর দেখা হয়নি। তারপর আজকে সকালে—”
সকালের ঘটনা ডলির মুখ থেকে ফারুক আগেই শুনেছে। সে আস্তে দরজা খুলে, বাইরে এসে দাঁড়াল। এটা হোমস্টের চার নম্বর ঘর। ফাঁকা পড়ে থাকায়, এটাকেই তদন্তের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাইরে একজন কনস্টেবল দাঁড়িয়ে আছে। একজনের সঙ্গে কথাবার্তা হয়ে গেলে, সে গিয়ে আর—এক-জনকে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আপাতত দূরে ডাইনিং হলের ভিতরে পৃথ্বীকে ছাড়া আর কাউকেই কোথাও দেখা যাচ্ছে না। শুধু পাশে বাঁদিকের ঘর থেকে মিস্টার আর মিসেস দত্তর চাপা গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
ফারুক মাথা নামিয়ে একটু ভেবে পকেট থেকে ফোনটা বের করে একটা সেভ করা নম্বর টিপল। দু’বার বাজার পর ওদিক থেকে একটি পুরুষ কণ্ঠে উত্তর এল।
“ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট। কাকে চাইছেন?”
“অর্ণব মিত্র। একটু জরুরি দরকার।”
“স্যারকে এখন ডাকা যাবে না। আপনার কী দরকার বলুন।”
“সেটা সরাসরি আপনার স্যারকেই বলব। আপনি ফোনটা কানেক্ট করে দিন।”
“অসম্ভব। স্যার এখন একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন। আমি বিরক্ত করতে পারব না।”
“এই বেলা বারোটায় আবার বিশ্রাম নেওয়ার কী আছে? উনি রাতে নিজে চোর ধরতে বেরোন নাকি? অযথা সময় নষ্ট না করে ডাকুন। বলুন ফারুক সিদ্দিকি ফোন করেছে। দশ সেকেন্ডের মধ্যে ফোন না ধরলে কপালে অশেষ দুঃখ আছে। যান!”
ঠিক আট সেকেন্ডের মাথায় একটা ক্লিক শব্দ ও তারপর নতুন গলা ভেসে এল।
“ফারুকদা! এ তো দারুণ ব্যাপার? হঠাৎ কী মনে করে?”
“ন্যাকামো বন্ধ করো। ট্যাক্সপেয়ারের টাকায় এসি অফিসে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছ আর তারপর অবাক হয়ে যাও যে মানুষ কেন পুলিশকে পছন্দ করে না!”
“আরে, ব্যাপারটা ওরকম না। এখন আসলে অফিসের ভিতরে কাজের ফোনগুলো সব অন্য একটা নম্বরে আসে। এই নম্বরে সাধারণত রিপোর্টার বা ওইরকম লোকেদের উটকো ফোন আসে। তার জন্যই মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিংটা হয়েছে।”
“বাহ! রিপোর্টার যদি জানতে পারে জয়েন্ট কমিশনার অফিসে বিশ্রাম নিচ্ছে, তাহলে তো মিটেই গেল।”
“বিশ্বাস করুন ফারুকদা, ওটা আমি বলতে বলিনি।”
“হুম, যাই হোক। আমিও আসলে মেজাজ ঠিক রাখতে না পেরে এতটা বলে ফেললাম। অ্যাকচুয়ালি আমি যেখানে আছি, সেখানে একটা বাজে ব্যাপার হয়ে গেছে। সেসব বিস্তারিত পরে বলব। তোমাকে ফোনটা করেছি একটু সাহায্য চাওয়ার জন্য।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন না।”
“একটু নোট করে নাও। নীলাদ্রি চক্রবর্তী। বয়স পঞ্চাশের মাঝামাঝি। কলকাতার একদম প্রথম সারির সার্জেন। বিএমএসটি হসপিটালের সঙ্গে যুক্ত। এঁর ব্যাপারে জানতে চাই। আপাতত কোনো বাছবিচার নেই, দরকারি—অদরকারি যত তথ্য সম্ভব।”
“হসপিটালের নামটা আর—এক-বার বলুন।”
“বিএমএসটি। এটা বাইপাসে, ওই সায়েন্স সিটির কাছাকাছি।”
“ওহ বুঝেছি। এটার বিজ্ঞাপন প্রচুর চোখে পড়ে। বৃজ মোহন সেবা ট্রাস্ট। বেশ বড়োসড়ো ব্যাপার। কিন্তু এই সার্জেনের কেসটা কী? আপনার ফ্যামিলির সঙ্গে ঝামেলা করছে?”
“না না। আরও বাজে ব্যাপার। আমি আপাতত খানিক ব্যক্তিগত কারণে কালিম্পং ডিস্ট্রিক্টে কোলাখাম বলে একটা জায়গায় আছি, একটা হোমস্টে। আরও কিছু গেস্ট আছেন, ইনক্লুডিং এই ডাক্তারবাবু। সবে গতকাল এসে উঠেছি। আর আজ সকালে দেখা গেছে ভদ্রলোক নিজের ঘরে মরে পড়ে আছেন। পুলিশ একটা প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু আমার মানুষটার ব্যাপারে কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড ইনফরমেশন দরকার। আপাতত যা জোগাড় হয়, সেরকম স্পেসিফিক কিছু বলছি না। কিন্তু তথ্যগুলো চাই। যতখানি সম্ভব আর যত তাড়াতাড়ি, পারলে আজ বিকেলের মধ্যে। সেরকম হলে তুমি যদি অন্য কারওর কন্টাক্ট দিতে পারো, তাতেও হবে। আমি তাকে ফোন করে নেব।”
“সে পরে দেখা যাবে নাহয়। আপনি তো ভালো ঝামেলায় পড়েছেন! ব্যক্তিগত যে কাজের কথা বললেন, সেই ব্যাপারেও যদি কোনো হেল্প লাগে, প্লিজ বলবেন! আপাতত আমি কতটা তথ্য জোগাড় করতে পারি দেখি। পাঁচটার পরে আপনাকে ফোন করছি। আপনি এমনি ভালো তো? বাড়ির সবাই? অনেকদিন দেখা হয় না।”
“হ্যাঁ সবাই ভালো। আশা করি শিগগিরই দেখা হবে। তুমি এই ব্যাপারটা একটু দেখো। এখন রাখি।”
ফোন রেখে ফারুকের মনে হল সে হয়তো একটু অভদ্রভাবেই কথোপকথনটা শেষ করল। কিন্তু এখন লৌকিকতা করার সময় বা প্রবৃত্তি কোনোটাই তার নেই। সে কানে ফোন লাগিয়ে বারান্দা ধরে হাঁটতে হাঁটতে এদিক—অদিক করছিল। এর মধ্যে ডলি কথাবার্তা শেষ করে চলে গেছে। ফারুক ভিতরে গিয়ে দেখল প্রধান তখন পৃথ্বীর সঙ্গে কথা বলছে।
পৃথ্বী রাই নীলাদ্রির ব্যাপারে আলাদা করে বিশেষ একটা আলোকপাত করতে পারল না। তার সঙ্গে কলকাতার এই ডাক্তারের একবারই সেভাবে দেখা হয়েছিল, দুপুরে খাওয়ার পর। সে পৃথ্বীকে দেখে চিনতে পেরেছিল, বলেছিল যে একটা—দুটো খেলাও দেখেছে। আর তাছাড়া খবরের কাগজের ছবি থেকেও এই প্রাক্তন ফুটবলারকে তার মনে আছে। তাও সে খাওয়ার পরে ঘর ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষা করছিল, একবার নিজে কথা বলে যাচাই করে নেওয়ার জন্য। এত বড়ো ডাক্তার তাকে এতদিন পরে দেখেও চিনতে পারছে, ভেবে পৃথ্বীর ভালোই লেগেছিল। সেই নীলাদ্রিকে বলেছিল একটু বসে এক কাপ গ্রিন টি খেয়ে যেতে। চায়ের কাপ নিয়ে তারপর সে উত্তরের জানালার ধারে প্রায় কুড়ি মিনিট মতো বসেছিল। চা শেষ করে পৃথ্বীকে ধন্যবাদ জানিয়ে, একটা জলের বোতল নিয়ে সে ঘরে ফিরে যায়। তারপর আর তাদের দেখা হয়নি। এবং না, কলকাতায় থাকাকালীন সে নীলাদ্রি চক্রবর্তীর নাম শোনেনি।
“আপনি সম্ভবত একটা ইনজুরির সমস্যার পর খেলা থেকে রিটায়ার করেন এবং কলকাতা ছেড়ে শিলিগুড়ি চলে আসেন। সেখানে কী করতেন?” ফারুক প্রশ্ন করল।
“বাচ্চাদের একটা অ্যাকাডেমিতে কোচিং করাতাম। তারপর ২০০০ সালে আর—এক-জনের সঙ্গে একটা স্পোর্টস গুডসের ব্যাবসা শুরু করি। কিন্তু বাবার শরীর খারাপের পর আমার অংশটা বিক্রি করে চলে আসি।”
“আপনি তখন বিবাহিত?”
“হ্যাঁ।”
“ডলি ম্যাডাম ওখানে কী করতেন?”
“নাথিং। হাউসওয়াইফ ছিল।”
“আপনাদের কী তাহলে বাড়ি থেকে দেখাশোনা করে বিয়ে হয়েছে? আপনাদের আলাপ কীভাবে?”
“ওহ, আলাপ তো শিলিগুড়িতে না, কলকাতায়। তখন সবে আমাদের টিমের নতুন স্পনসরশিপ হয়েছে। বড়ো রিয়েল এস্টেট কোম্পানি। এটা আমি ১৯৯৫/৯৬—এর কথা বলছি। তাদের কলকাতার অফিসের হেড একদিন আমাদের সবাইকে তাঁর বাড়িতে ডাকলেন। বালিগঞ্জের কাছে বিশাল ফ্ল্যাট। সেখানে ওঁর বয়স্ক মা—ও থাকতেন। ডলি ওঁকে দেখাশোনা করত। তার পরে—পরেই, একটা নেপালি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আবার ওকে দেখতে পেয়ে আলাপ করি। এরপর আমরা বেশ কয়েকবার দেখা করি, আলাপ—পরিচয় আর—এক-টু গভীর হয়। নেক্সট ইয়ার ঠিক করি বিয়ে করব। কিন্তু আমার ইনজুরি, খেলা ছাড়া, এসব নিয়ে আরও এক বছর দেরি হয়। ওই সময়েই শিলিগুড়ির কাজের অফারটা পেয়ে কলকাতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই। ডলিও রাজি হয়ে যায়।”
“আপনার ইনজুরির চিকিৎসা কোন হসপিটালে হয়েছিল?”
“গুড শেফার্ড। ব্যাঙ্গালোরে।”
পৃথ্বী বেরোতে না বেরোতেই প্রতিভা এত তাড়াতাড়ি ঢুকল, যেন ঘরের বাইরেই অপেক্ষা করছিল। মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছে এখনও প্রাথমিক শক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ফারুক তাকে জিজ্ঞাসা করল সে এখন কথা বলার অবস্থায় আছে কিনা। সেরকম হলে বাকিদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করে তাকে ডাকা যেতে পারে। কিন্তু প্রতিভা মাথা নেড়ে জানাল, এখনই ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে চায়। এবার প্রধান শুরু করল।
“তুমি যে হোমস্টের কাজে মা—বাবাকে সাহায্য করছ, এর বাইরে কি তুমি আর কিছু করো?”
“এমএ করব। সেটার জন্য একটা পরীক্ষা দিতে হবে। এই বছরটা প্রিপারেশন নিচ্ছি।”
“তোমার গ্র্যাজুয়েশন কীসে?”
“সোশিওলোজি।”
“কলেজ?”
“কালিম্পং।”
“এইখানে থেকে এত কাজ আর ব্যস্ততার মধ্যে পড়াশুনার অসুবিধা হয় না?”
“না, খুব একটা হয় না। গোটা বছর অত গেস্ট থাকে না। আর থাকলেও মেন কাজ মা—বাবাই করে। আমি অ্যাসিসট্যান্টের মতো।”
“যখন ব্যস্ততা থাকে, তখন তোমাকে কী কী কাজ করতে হয়?”
“সেরকম স্পেসিফিক কিছু না, মিলিয়ে মিশিয়ে। রেজিস্টারে নামধাম এন্ট্রি করানো। ঘরের তালা খুলে দেওয়া, খাওয়ার সময় পরিবেশন করতে সাহায্য করা, চা বা স্ন্যাক্সের কাপ—প্লেট রুমে দিয়ে আসা, নিয়ে আসা, এরকম সব। তবে এই সবই মা—ও করে, আবার গোপাল বা পেমাও করে। আর—এক-টা কাজ বলতে গেলে আপাতত আমিই করছি। সপ্তাহে দু’বার চেক করে নিই কোনো কিছু ফুরিয়ে যাচ্ছে কিনা। সেইমতো বাজারের লিস্টে নোট করে রাখি।”
“ডঃ চক্রবর্তীকে কি এখানেই প্রথমবার দেখেছিলে?”
“হ্যাঁ, অফকোর্স।”
“কখন কখন দেখা হয়েছে, কোনো কথা হয়েছে কিনা, এগুলো একটু মনে করে আমাদের বলো।”
“আমি ওদের গাড়িটাকে ঢুকতে দেখি দূর থেকে। আমি তখন আমাদের নিজেদের বাড়িতে। বারান্দায় কিছু শুকনো খাবার দেওয়া ছিল, সেগুলো তুলে ফেলছিলাম। ডাক্তারবাবু আর মিস্টার কোঠারি দু’জনকেই নামতে দেখি। ওদের এন্ট্রি বা ঘরে নিয়ে যাওয়া, এর কোনোটাই আমি করিনি। এর প্রায় আধ ঘণ্টা মতো পরে হবে, আমি তখন আমাদের বারান্দায় একটা বাল্ব কেটে গেছিল, ওটা বদলাচ্ছিলাম। উনি কটেজের ব্যালকনি থেকে আমাকে দেখতে পেয়ে ডাকেন। আমি যাই। উনি খুবই ভদ্রভাবে বলেন যে এভাবে ডাকার জন্য উনি লজ্জিত, কিন্তু এখানকার কারওর ফোন নম্বর ওঁর কাছে নেই। ঘরে সেটল করার পর উনি লক্ষ করেছেন যে কোনো অ্যাশট্রে নেই আর বাথরুমে তোয়ালে নেই। আমি আবার বাড়ি ফিরে যেখানে এসব এক্সট্রা স্টক থাকে, সেখান থেকে অ্যাশট্রে আর তোয়ালে নিয়ে ওঁকে দিয়ে আসি। সেইসঙ্গে আমার আর মায়ের ফোন নম্বরটাও দিয়ে এসেছিলাম। এরপর লাঞ্চটাইমে দেখেছি, কিন্তু কোনো কথা হয়নি। গতকাল আর একবারই দেখা হয়েছিল, শেষবারের মতন। এই ধরুন সোয়া ছ’টা নাগাদ স্ন্যাক্সের ট্রে নিয়ে ওঁর দরজায় নক করি। উনি দরজা খুলে সরে দাঁড়ান। আমি ভিতরে ঢুকে টেবিলে রেখে চলে আসি।”
“আর আজ সকালে?”
মুহূর্তের জন্য মনে হল প্রতিভার শরীরটা একটু শক্ত টানটান হয়ে উঠল। প্রায় সবার অলক্ষে সে একটা ছোট্ট ঢোঁক গিলল।
“সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ মা পাঠিয়েছিল ওঁর ঘরে নক করতে। অনেকবার নক করে সাড়া না পেয়ে ফিরে আসি। তারপর টানা মিনিট পাঁচেক ফোনে চেষ্টা করা হয়, কিন্তু ফোন বেজেই যায়। এবার গোপালকে সঙ্গে নিয়ে আবারও বেশ জোরে জোরে ধাক্কাধাক্কি করেও যখন কোনো ফল হয় না, তখন দু’জনে লাথি মেরে দরজা ভেঙে ঢুকি। বাইরের ঘর থেকেই একটা গন্ধ পাই। সিগারেট আর পচা খাবার মেশানো একটা গন্ধ। তারপর স্ক্রিনটা পার করে আমি ঢুকি, আমার পিছনেই গোপাল। খাটের উপর চোখ পড়তেই বুঝি ভয়ংকর ব্যাপার হয়ে গেছে। জ্যান্ত মানুষ ওরকম স্থির হয়ে থাকতে পারে না। তারমধ্যে চারিদিকে অতটা বমি হয়ে আছে… আমি দৌড়ে বেরিয়ে আসি। তারপর আর ওদিকে যাইনি।”
“ভেরি সরি। এই অবস্থায় আবার এই কথাগুলো তোলার জন্য।” এবার ফারুক বলল, “আর একটা—দুটো ছোটো জিনিস জিজ্ঞাসা করব। তারপর ডিস্টার্ব করব না।”
“বলুন।”
“আজ সকালে যখন দরজা ভেঙে ঢুকেছিলে, তখন কোনো জিনিসে হাত দিতে হয়েছিল?”
“না, আমরা ঢুকেছি আর ওই অবস্থা দেখে বেরিয়ে এসেছি। কোথাও হাত দিইনি।”
“এর বাইরে আর একবারই ওই ঘরের ভিতরে ঢুকেছিলে, গতকাল সন্ধ্যাবেলায়। তখন উনি কোন জামা গায়ে দিয়েছিলেন সেটা খেয়াল আছে?”
“যতদূর মনে পড়ছে, লাঞ্চের সময় যেই জামাটা দেখেছিলাম, সেটাই। একটা ক্রিম রঙের ফুলশার্ট।”
“ওঁর লাগেজ কী অবস্থায় ছিল, দেখতে পেয়েছিলে?”
“না, সেটা বোধহয় শোয়ার ঘরে রাখা ছিল।”
“আপনার পুরো নাম?”
“স্যার, আমি অত্যন্ত লজ্জিত, মানে আমার যে কী খারাপ লাগছে! আমি একদম না জেনে, না বুঝে আপনার সঙ্গে ওরকমভাবে কথা বললাম—”
“আহ, ওসব থাক। এখন কাজের ব্যাপারটা সেরে ফেলা যাক।”
“না স্যার, আমি যে কীভাবে আপনার থেকে ক্ষমা চাইব! আমি যদি জানতাম আপনি এতবড়ো একজন অফিসার—”
“আরে সে আপনি জানবেন কী করে? এখন যেটা জানতে চাওয়া হচ্ছে—”
“আমি কথা দিচ্ছি স্যার। আমি সবরকমভাবে কোঅপারেট করতে—”
“আমি তিন গোনার মধ্যে যদি আপনি নিজের পুরো নাম না বলেন—”
“ইন্দ্রাশীষ দত্ত স্যার। আমার স্ত্রী বাসবী দত্ত, আর আমার মেয়ে কৃতিকা দত্ত।”
“শান্ত হয়ে বসুন। এতকিছু তো জানতে চাইনি। আপনি কি আজীবন শিলিগুড়ির বাসিন্দা?”
“হ্যাঁ স্যার। আমার বাবা ছোটোবেলায় আসামের দিক থেকে চলে আসেন। আমার জন্ম, স্কুল, কলেজ সবই শিলিগুড়িতে।”
“আপনার দুটো দোকান আছে। একটা হংকং মার্কেটে, আর—এক-টা মাটিগারার ওদিকে। ব্যাবসার কাজে আপনাকে এদিক—অদিক ট্রাভেল করতে হয় না?”
“হয় না মানে? প্রত্যেক মাসে একবার দু’বার করে দেশের নানা জায়গা ঘুরে বেড়াতে হয়। দিনকাল খুব টাফ স্যার। জাস্ট কোনোমতে বেঁচে থাকতেই—”
“কলকাতা যাতায়াত করতে হয়?”
“হ্যাঁ স্যার। অনেকবারই হয়। তারমধ্যে এখন মেয়ে কলকাতার কলেজে পড়ছে।”
“কখনও ডাক্তার দেখাতে বা অপারেশন করাতে কলকাতায় গেছেন?”
“না স্যার, সত্যি বলতে কি ঈশ্বরের আশীর্বাদে সিরিয়াস কোনো সমস্যায় পড়িনি সেরকম। ওই মেয়ে হওয়ার সময়, তাও আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে জোরাজুরি করল দেখে কলকাতায় ডেলিভারি হল।”
“কোথাও, কোনোভাবে, কোনো প্রসঙ্গে ডঃ নীলাদ্রি চক্রবর্তীর নাম শুনেছো?”
“শিওর হয়ে বলতে পারব না স্যার। আমি বা আমার বাড়ির কেউ কখনও ওঁর কাছে যাইনি। তবে আমার এক প্রতিবেশীর মায়ের একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। কলকাতায় গিয়ে অনেকগুলো অপারেশন করতে হয়। তখন ফিরে এসে চক্রবর্তী বলে এক সার্জেনের খুব সুখ্যাতি করেছিল। এখন একই ডাক্তার কিনা বলতে পারব না।”
“সেই প্রতিবেশি বা তার মায়ের নাম বলতে পারবেন? বা কবেকার ঘটনা?”
“এই রে, বগাইয়ের ভালো নামটা যে কী! পদবি তো মজুমদার। মায়ের নামটাও ঠিক জানি না, মানে আমরা ছোটোবেলা থেকে মাসিমা বলি তো। ব্যাপারটা বছর দশেক আগে হবে।”
“যদি ফোন করে জানতে পারেন, বা কোনোভাবে মনে পড়ে, তাহলে জানাবেন।”
“অফকোর্স অফকোর্স। এভাবে একজন এতবড়ো ডাক্তারের চলে যাওয়াটা—এই তো আফটার অল সমাজেরও একটা ক্ষতি। কাল কি কেউ কল্পনা করতে পেরেছিল যে ওভারনাইট এরকম একটা ব্যাপার ঘটে যাবে?”
“আপনি এবারে আসুন।”
মিসেস দত্ত বা কৃতিকা, কারওর থেকেই নতুন কিছু জানা গেল না। কৃতিকা অকপটে স্বীকার করল যে খাওয়ার সময় সে গল্প করতেই মশগুল ছিল। অপর প্রান্তের টেবিলে বসা নীলাদ্রির উপস্থিতি সে ভালো করে টেরও পায়নি। কাজের মধ্যে মিসেস দত্ত নিশ্চিতভাবে বললেন যে তাঁদের প্রতিবেশীর মা যেই ডাক্তারের কাছে অপারেশন করিয়েছিলেন, তার নাম নীলাদ্রি চক্রবর্তী। এবার এই নামে অন্য কেউ আছে কিনা, সেটা তিনি বলতে পারবেন না। তবে নাম মনে না থাকলেও, হসপিটালটা যে বাইপাসের কাছে ছিল, সেটা তাঁর মনে আছে। এমনকি এটাও হলপ করে বললেন যে এই ঘটনা ২০১৫ সালের গরম কালে, কারণ ওই সময় তাঁর দিদির ছেলে বিদেশ থেকে ফিরেছিল। প্রতিবেশীর মায়ের নাম জানতে চাওয়ায় একটুও না ভেবে বললেন, অঞ্জলি মজুমদার।
ঋজু ঘরে ঢুকলই যেন একটা সতর্ক ভাব নিয়ে। তার চলাফেরায়, কথাবার্তায় যেই স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা এবং খানিক উদ্ধত ভাব থাকে, বোঝা যাচ্ছে যে সেটা একান্তই চেষ্টা করে চেপে রাখা আছে। তার বদলে যেটা তৈরি হয়েছে, সেটা দেখলে শিকারির স্পটলাইটে আচমকা ধরা দেওয়া চিতাবাঘের কথা মনে হয়। অন্য কাউকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সে নিজেই শুরু করল।
“জানি এতে কারওর কিছু এসে যায় না, কিন্তু পুলিশ বা পুলিশি ব্যবস্থায় বিশ্বাস করি না আমি।”
“কেন?” প্রধানের কাঁধে আলতো হাত রেখে ফারুক জিজ্ঞাসা করল।
“আমার মতে পুলিশের উপস্থিতি সমাজে অহেতুক ভয় আর অবিশ্বাসের আবহ তৈরি করে। এতে ক্রাইম কমার বদলে আরও বাড়ে।”
“আমি যে খুব দ্বিমত পোষণ করছি তা নয়, তবে যতদিন না সেরকম সমাজ তৈরি হচ্ছে, আপাতত যা আছে তাই দিয়েই আমাদের কাজ চালাতে হবে।”
“দ্যাট’স ফাইন। আমাকে পেট্রোনাইজ না করলেও হবে। কী জানতে চান বলুন।”
“আপনার পুরো নাম আর পেশাটা দিয়ে যদি শুরু করেন।”
“ঋজু দাশগুপ্ত। পেশা বলতে পারব না।”
“কেন?”
“কারণ, আপাতত কিছুই করি না। গড়পড়তা কাজে আমার বিশেষ ইন্টারেস্টও নেই। আমি এমন একটা কাজ করতে চাই যেটায় সার্থকতা আছে। সেটা কী এখনও জানি না, কিন্তু সময় দিলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারব। বাবার পেপার মিলের ব্যাবসায় সেটা নেই, এটা আমি নিশ্চিত।”
“আপনার কোয়ালিফিকেশন জানতে পারি? মানে লেখাপড়ার কথা বলছি।”
“টুয়েলভের পর বাড়ির পরামর্শে বিবিএ করতে ঢুকি। এক বছরের মধ্যে একঘেয়েমিতে মরে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। ফলে একদিন সোজা গিয়ে ফিলোজফি পড়তে ঢুকে যাই। এবার বাড়ির লোকের হার্ট অ্যাটাকের মতো অবস্থা হল। কিন্তু তিন বছর পর বেশ ভালো রেজাল্ট করে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করায় আর কেউ ঘ্যানঘ্যান করেনি। মাস্টার্স করেছিলাম সিনেমা নিয়ে। কিন্তু শেষ সেমেস্টারে একটা বড়ো ডিসার্টেশন করতে হয়, থিসিস লেখার মতো। ওটা আর আমি শেষ করে উঠতে পারিনি, তাই মাস্টার্সের কোনো ডিগ্রি নেই।”
“তারপর? কখনোই কোনো কাজের মধ্যে থাকেননি?”
“গত পাঁচ বছরে অনেক বই পড়েছি, প্রচুর সিনেমা দেখেছি আর নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়ে নানারকম মানুষজনের সঙ্গে মিশেছি। আমার কাছে এগুলো কাজ। আপনারা একমত নাই হতে পারেন।”
“আপনার কথা অনুযায়ী এখানেও কি কাজেই এসেছেন?”
“না, এসেছি বেড়াতে। কিন্তু চোখ—কান খোলা রাখলে, কাজ কখনোই থেমে থাকে না।”
“বেশ, পর্যটন ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্যে কোলাখামকে বেছে নেননি তাহলে?”
“এরকম একটা অফরুট নির্জন জায়গায় আর কীই বা উদ্দেশ্য থাকতে পারে?”
“আপনি নীলাদ্রি চক্রবর্তীকে কীভাবে চেনেন?”
“ডাক্তার হিসাবে। আজীবন চিনতাম না। প্রথম নাম শুনি ২০১৯—এ। আমার বড়োজেঠুর বড়োমেয়ে, মানে আমার বড়দির একটা পিঠে ব্যথার সমস্যা হচ্ছিল। লোয়ার ব্যাক। সেটা ক্রমে বাড়তেই থাকে। পরীক্ষা করে দেখা যায় যে শিরদাঁড়া আর কোমরের ওখানে হাড়ের একটা অস্বাভাবিক গ্রোথ হচ্ছে। অনেকেই তখন এঁর কথা বলে। বহু সাধ্য সাধনা করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায়। ন্যাচারেলি অপারেশনের কথা ওঠে। উনিও এমন তাড়া দিয়ে চাপ সৃষ্টি করলেন আর বাড়ির সবারও মনে হল যে আবার ফিরে দেখাতে গেলে হয়তো অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার চক্করে দেরি হয়ে যাবে। ফলে অন্য কারওর সঙ্গে কনসাল্ট করা বা সেকেন্ড ওপিনিয়ন নেওয়ার আগেই ধর তক্তা, মার পেরেক করে সার্জারি হয়ে গেল। সেটা থেকে রিকভার করার আগেই জানিয়ে দিলেন বোন গ্রাফটিং করতে হবে। তাও হয়ে গেল। এবার শুরু হল শরীরে রিঅ্যাকশন। প্রথমদিকে একটা মারাত্মক ঝিঁঝি ধরার মতো নীচের দিক অসাড় হয়ে যাওয়া শুরু হল। টয়লেট সিটে একবার বসলে আর নিজে থেকে উঠতে পারত না। আস্তে আস্তে পা ফেলার ক্ষমতা চলে গেল। মাসখানেকের মধ্যে পুরোপুরি বেড রিডেন। সেটাই পার্মানেন্ট হয়ে গেছে। ইদানীং হাত—পাগুলো সরু হতে শুরু করেছে। মানুষটা এক ধাক্কায় শেষ হয়ে গেছিল। এবার শরীরটাও মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে।”
“আপনারা ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন?”
“অবশ্যই। উনি প্রথমত কোনোরকম দায়িত্ব নিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। এবং তারপর নিজের ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির জোর খাটিয়ে, ওঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার রাস্তাগুলোও বন্ধ করেন। করোনা এসে অনেকটাই বাঁচিয়ে দিল। তবে এই ইনসিয়োরেন্স যে লং টার্ম ছিল না, সে তো বোঝাই যাচ্ছে।”
“এখানে আপনাদের মধ্যে কোনো কথাবার্তা হয়েছিল?”
“উঁহু। আমি খাওয়ার টেবিলে বসে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। একবার ভেবেছিলাম সবার সামনে কলার চেপে ধরব, কিন্তু আমি তো ওই মানুষটা নই। তবে একবার কনফ্রন্ট তো করতামই। সেই সুযোগ পাওয়া গেল না।”
“ওঁর মৃত্যু আপনার হাতে হলে খুশি হতেন? এখন আক্ষেপ হচ্ছে?”
“আমার হাতে? আপনি আমাকে খুনের দায়ে ফাঁসাতে চাইছেন নাকি? আক্ষেপ হচ্ছে, সবার আড়ালে এরকম জনমানবহীন জায়গায় ঘুমের মধ্যে লোকটা মরে গেল। এর উচিৎ ছিল জেলের ঘানি টানা। সেটা শেষ অবধি ঠিকই ম্যানেজ করে ফেলল।”
ঋজু উঠে চলে যাওয়ার পরেও অনেকক্ষণ কথাগুলো ফারুকের মাথায় ঘুরছিল। প্রধানও ঘরের তাপমাত্রা বুঝে চুপ করে রইল। প্রত্যেক মানুষের একটি বাহ্যিক বা সামাজিক এবং একটি নিজস্ব ব্যক্তিগত দিক থাকে। এই দুইয়ের এমনিতেই তফাত থাকা স্বাভাবিক, আর খ্যাতনামা বা প্রতিষ্ঠিত মানুষের ক্ষেত্রে হয়তো তফাত আরও বৃদ্ধি পায়। সেটা মুছে ফেলে এই দুটি দিক যত কাছাকাছি নিয়ে আসা যায়, মানুষকে তত ভালোভাবে চেনা যায়। এবং যে—কোনো তদন্তের কাজই প্রাথমিকভাবে মানুষ চেনার কাজ—নিবিড়ভাবে, প্রকৃতভাবে চেনা।
ঋজুর অভিজ্ঞতার কথা শুনতে শুনতে একইসঙ্গে দু’জন মানুষের পরিচয় একটু একটু করে ফুটে উঠছিল। এটা একদমই পুরানো অ্যানালগ যুগের ছবি তোলার মতো একটা পদ্ধতি। শাটার টেপা আর হাতে নিয়ে ছবি দেখার মধ্যে অনেকটা সময় আর শ্রম যায়। অনেক সূক্ষ্ম আর জটিল সব প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। বিভিন্ন পাত্রে বিভিন্ন রসায়নিক উপাদান থাকে। সেগুলোর মধ্যে দিয়ে ক্রমপর্যায়ে যেতে যেতে অবশেষে প্রিন্ট হওয়ার পর রং, অবস্থান, আকৃতি ইত্যাদি তথ্য নিয়ে ছবি পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে।
তবে এতক্ষণ কথাবার্তার ফলে সেই পরিষ্কার ছবির দিকে যতটা এগোনো গেছিল, বাকিদের সঙ্গে কথা বলে সেই কাজে বিশেষ কোনো অগ্রগতি হল না। লাভের মধ্যে প্রত্যেকের পুরো নাম জানা গেল—দেবলীনা ঘোষ, ঐশানী দেব এবং জয়দীপ অধিকারী। জানা গেল যে দেবলীনা পিএইচডি করছে আর ঐশানী গবেষণা শুরু করতে চলেছে। দু’জনেই আপাতত কলকাতার দুটি সরকারি কলেজে পার্ট টাইম অধ্যাপনা করছে। কিন্তু কারওর থেকেই নীলাদ্রির অতীত বা বর্তমান সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য বা ধারণা পাওয়া গেল না। ছবি এখনও অসম্পূর্ণ।
***
দুপুরের অগোছালো আর থমথমে খাওয়ার পর্ব মিটতে মিটতে প্রায় পৌনে চারটে বেজে গেল। স্বাভাবিকভাবেই আজকের রান্নার আয়োজনও ছিল সামান্য ও মামুলি—ভাত, ডাল আর সেই সঙ্গে আলু আর ডিম সিদ্ধ। ডালে নুনের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত। কিন্তু সেই নিয়ে অভিযোগ করার মতো উৎসাহ কারওর মধ্যেই দেখা গেল না। একটা ব্যাপার স্পষ্ট। অতিথিদের মধ্যে সবাই ফারুকের সঙ্গে মৌখিক ভদ্রতা বজায় রাখলেও, অতিরিক্ত কথা বলা থেকে বিরতই থাকছে।
ডলি ঘুরে ঘুরে তাও যতটা সম্ভব তদারকি করে যাচ্ছে। তার হাবেভাবে একটা অসম্ভব ক্লান্তির ছাপ, যেন একটা অন্ধকার ঘর আর বিছানা পেলে সে এখনই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। ফারুকের সঙ্গে চোখাচোখি হতে সে তার টেবিলের দিকে এগিয়ে এল।
“আপনার আর কিছু লাগবে?”
“না, না। আমি বলছি যে আপনি একটু দু’মিনিট বসে নিন। আজকে তো কম ঝড়ঝাপটা গেল না!” ফারুকের হাতের ইঙ্গিত উলটোদিকের চেয়ারের উদ্দেশ্যে।
ডলি কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভেবে চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল। তার হাসিতে বিষণ্ণভাবের মধ্যেও একটা কৃতজ্ঞতার আভাস।
“আমি সত্যিই দুঃখিত। এই গোটা ঘটনাটা এত আনফরচুনেট! এবং তার ফলে আপনাদের এই ভোগান্তিটাও একদমই আনফেয়ার।”
ফারুকের কথাগুলোর মধ্যে স্পষ্ট আন্তরিকতা থাকার কারণেই হয়তো ডলির মুখের মেঘ একটু হালকা হল। সে বলল, “থ্যাংক ইউ। আপনি থাকায় হয়তো ভোগান্তি কমই হচ্ছে। পুলিশ তো দেখলাম আপনাকে খুবই রেসপেক্ট করে।”
“তার জন্য কিছু না। এই সাব ইনস্পেক্টর প্রধান বেশ প্রফেশনাল লোক মনে হল। আশা করি খুব তাড়াতাড়ি ব্যাপারটার একটা সুরাহা হবে। আপনাদের বেশিদিন এই অশান্তি ভোগ করতে হবে না।”
“আশা করি যেন তাই হয়।” তারপর আবার কয়েক মুহূর্ত চুপ করে ডলি বলল, “আসলে এই যে দেখছেন আমার বাড়ি, পরিবার, এই হোমস্টে—এর কোনোটাই আমি খুব সহজে পাইনি। আমার গোটা জীবনটা এভাবে সাজিয়ে নিতে অনেক কিছু পোহাতে হয়েছে। ফলে, এখন এই সাধারণ, বৈশিষ্ট্যহীন জীবনটাও আমার কাছে যে কী দামি, সেটা বলে বোঝাতে পারব না। আমি কোনোমতেই এটা খোয়াতে চাই না। আমি জানি আজকেই একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাঁরও নিশ্চয়ই পরিবার, পরিজন আছেন এবং এটা তাঁদের জন্য অবশ্যই মর্মান্তিক। সেখানে আমার এই দুশ্চিন্তা বা আমার কথাগুলো হয়তো স্বার্থপরের মতো লাগছে। কিন্তু মাথায় যা চলছে সেটা আড়াল করে রাখারও মানে নেই।”
এরকম সময় পাশের টেবিল থেকে একটু চড়া গলায় কথাবার্তা কানে এল। গোটা দত্ত পরিবার ইতিমধ্যেই লাঞ্চ সেরে ঘরে ফিরে গেছে। কেশব কোঠারিকেও দেখা যাচ্ছে না। আপাতত ডাইনিং হলে ফারুক ছাড়া অতিথি বলতে কলকাতা থেকে আসা দলটা। গলার আওয়াজ তাদের টেবিল থেকেই আসছে। ফারুক আর ডলি দু’জনেই সেদিকে ঘাড় ঘোরাল। চড়া গলাটা মূলত ঋজুর, বাকিরা তাকে খানিক শান্ত করার চেষ্টা করছে। যা বোঝা গেল, আজ সকালে এত কিছুর মধ্যে, কোনো এক সময় ঋজুর বাবা ফোন করেছিলেন। বক্তব্য সেই এক ছেলে যাতে এবার পারিবারিক ব্যাবসায় মন দেওয়া শুরু করে। বলাই বাহুল্য, বাবা ছেলের কথোপকথন দু’মিনিটের মধ্যে চূড়ান্ত কথা কাটাকাটিতে গিয়ে ঠেকে। ফোন রাখার আগে ভদ্রলোক নাকি ছেলেকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এভাবে চলতে থাকলে তিনি ঋজুর থাকা, খাওয়া এবং তাঁর ভাষায় যাবতীয় ‘ফালতু ফুটানি’ করার জন্য এক পয়সাও আর ঠেকাবেন না।
ঋজু এই গোটা ব্যাপারটা প্রথমে দেবলীনা ছাড়া কাউকে জানায়নি। কিন্তু এখন খেতে বসে দেবলীনাই বাকিদের সামনে এই প্রসঙ্গ তুলেছে। ফলে স্পষ্টতই টেবিলের তাপমাত্রা একেবারে তুঙ্গে। ঋজু আপাতত তার বাবার উদ্দেশ্যে অশ্রাব্য ভাষায় ব’কার চ’কার তুলে গালাগালি দিয়ে যাচ্ছে। রেগে গেলে সত্যিই তার শরীরটা কাঁপতে থাকে, মুখটাও ঈষৎ বিকৃত দেখায়। জয়দীপ তার দিকে একটা জলের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল, “তুই একবার মাথা ঠান্ডা করে ব্যাপারটা সিরিয়াসলি কনসিডার করেও তো দেখতে পারিস। কাজটা তো অ্যাকচুয়ালি ভালোলেগেও যেতে পারে।”
“আমার সঙ্গে খিল্লি করছিস? ওই শালা প্রোকিওরমেন্ট, ম্যানুফ্যাকচারিং, ডিস্ট্রিবিউশন, ব্যালেন্স শিট, অডিট—দেখেনি। এই কাজ আমার ভালোলেগে যেতে পারে?” ঋজু জলের গ্লাস ছুঁয়েও দেখেনি।
“জাস্ট একটা সাজেশন ছিল, বাদ দে! কিন্তু তোর কিছু একটা প্ল্যান তো লাগবে।”
“তা তো লাগবে। সেরকম অনেক প্ল্যান আমার আছেও। আমার বাবা ভেবেছে আমাকে থ্রেট করে লাইনে নিয়ে আসবে? আমি এত সহজে লেজ গুটিয়ে হেরে যাব? আমিও ওই একই বংশের ছেলে। আমার বাপ ঢ্যামনা তো আমিও সমান তিলে খচ্চর!”
“এই মুহূর্তে তোকে ভদ্রভাবে কথা বলতে বলাটা পয়েন্টলেস। তবে দুম করে কিছু করার আগে মাথায় রাখিস যে তুই কিন্তু এখনও তোর ফ্যামিলির উপর ডিপেনডেন্ট। এটা শুনে রাগ হলেও কিছু করার নেই।” দেবলীনা কথাগুলো বলে আবার খাবারের প্লেটে মনোনিবেশ করল।
“না, রাগ তো করছি না। কিন্তু আমি আমার বাপকে তো এভাবে জিততে দেব না। মোক্ষম মোমেন্টে এমন কেস খাওয়াব যে আমাকে থ্রেট করা বেরিয়ে যাবে।” এবার একটা নিশ্বাস নিয়ে বলল, “এই মুহূর্তে আমার ফ্যামিলির সবথেকে বড়ো সিক্রেট কী জানিস? আমার বাবার ডিমেনশিয়া ধরা পড়েছে। একদমই আর্লি স্টেজ, কিন্তু ডাক্তারদের কোনো সন্দেহ নেই। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অ্যালজাইমার্স সেট ইন করে যাবে। আর তারপর লং গুডবাই।”
টেবিলের বাকিরা হাঁ করে ঋজুর দিকে তাকিয়ে আছে। দেবলীনা খাওয়া বন্ধ করে কথা শুনে যাচ্ছে। ঋজু বলে চলল, “আপাতত বাড়িতে মা ছাড়া কেউ জানে না। এর বাইরে বাবার উকিল আর এক পুরানো বিজনেস ম্যানেজার আছে লোহিয়া বলে—এরা মিলে ব্যাবসার কাজকারবার সামলাচ্ছে আর আপ্রাণ চেষ্টা করে খবরটা চেপে রেখেছে। এই জন্যই আরও বেশি বেশি করে আমার ঘাড়ে গোটা ঝামেলাটা ফেলার চেষ্টা। আমি যে অলরেডি জানি, সেটা কেউ জানে না। আর—এক-দিন আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলুক—আমি সোজা হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেব! তারপর দেখব এই বিজনেস কোথায় যায়। ওই বালের গুডউইল পুরো চাঁদে চলে যাবে!”
ঋজু চুপ করে যাওয়ায় গোটা ডাইনিং হল প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। তার বন্ধুরা যে আর কোনো বাকবিতণ্ডায় যেতে চায় না, সেটা স্পষ্ট। ঐশানী সবার আগে টেবিল ছেড়ে উঠে গেল। বাকিরাও খাওয়ার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। “আমি উঠি”, বলে ডলি বিদায় নেওয়ায় ফারুকের ও চটক ভাঙল। সে আপাতত আবার খাওয়ায় মন দিল।
খাওয়া—দাওয়া যখন শেষের দিকে তখন বৃষ্টির প্রকোপ একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে। চারিদিক অন্ধকার করে, সবার কানে প্রায় তালা লাগিয়ে আধ ঘণ্টা ধরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি! সাড়ে চারটের একটু আগে সেই বৃষ্টি ধরে এসে একটা ঝিরঝিরে অবস্থায় দাঁড়াল। প্রতিভা একগাছা নাইলনের দড়ি নিয়ে তার বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। ফারুক তার কাছে জানতে চাওয়ায়, সে বলল যে অন্তত দু’ঘণ্টার আগে আবার জোরে বৃষ্টি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আগের দিন সন্ধ্যাবেলার পর প্রতিভার ফোরকাস্ট গুগলের থেকে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে। অতএব ফারুক ঠিক করল এই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়েই একটু হেঁটে আসবে। সারাদিন এই এক চৌহদ্দিতে থেকে এবং একই মুখগুলোকে দেখতে দেখতে চিন্তাভাবনা সীমিত হয়ে যায়, মাথা ঠিকমতো খোলে না।
আপাতত একটা ধার করা রেনকোট গায়ে চাপিয়ে, ফারুক ঢালু পথ বেয়ে নেমে বড়ো রাস্তা ধরে ডানদিকে হাঁটছে। এটাও প্রতিভার বদান্যতায় জোগাড় হয়েছে। জিনিসটা তার বাবার। বেরিয়ে যাওয়ার মুখে কী মনে হওয়ায়, ফারুক প্রতিভার থেকে একটা রেনকোট ধার চাইল। তাতে তার সামনে রাই পরিবারের তিনজনের তিনটে রেনকোট মেলে ধরা হল। কিন্তু প্রতিভা বা তার মায়ের জাপানি কার্টুন আঁকা আকাশি নীলের বদলে এই কোনোরকম ডিজাইন বিহীন স্বচ্ছ রেনকোটই ফারুক বেছে নিয়েছে। আপাতত থেকে থেকে খানিক খচমচ শব্দ হলেও, হাত খালি রেখে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে মন্দ লাগছে না।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের পালা চলেছে দুটো অবধি। তারপরে ফারুক প্রধানকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে বসেছিল। আগের রাতের চিঠিটা প্লাস্টিকে মুড়ে রাখা আছে, ক্রাইম স্পটে কুড়িয়ে পাওয়া এভিডেন্সের মতো। সেটা নিজের ফাইলে চালান করার সময় প্রধান ফারুকের কাজের নিখুঁত নৈপুণ্যের তারিফ না করে পারল না। এবার দু’জনে দুটো সিগারেট ধরিয়ে বসেছিল একটু আলোচনা করার জন্য। প্রাথমিকভাবে দু’জনেই একমত যে আপাতত এটাকে রহস্যজনক মৃত্যু হিসাবেই ভাবা উচিৎ। সেটাও খানিক হালকাভাবে নেওয়া যেত যদি প্রায় একই সময় এই চিঠির ঘটনাটা না ঘটত। চিঠির প্রেরক ও প্রাপকের পরিচয় যতক্ষণ না পরিষ্কার হচ্ছে, ততক্ষণ বোঝা সম্ভব না যে দুই ঘটনার কোনো যোগাযোগ আছে কিনা।
এছাড়া আলাদা করে নীলাদ্রির মৃত্যু নিয়ে ভাবলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে যে এর পিছনে কারওর কোনো কারসাজি আছে কিনা। যদি থাকে, তাহলে সেটা কীভাবে আছে? কারণ এমনিতে অতিরিক্ত মদ্যপানের পর এরকম দুর্ঘটনা অহরহ না ঘটলেও খুব একটা বিরলও নয়। কিন্তু সেখানেই আবার খটকা কারণ ডঃ নীলাদ্রি চক্রবর্তী যে লাগামহীন মদ্যপ সে কথা এখনও কেউ জোর দিয়ে বলেনি। তাহলে হঠাৎ এক সন্ধ্যায় তিনি দুটি বোতল মিলিয়ে প্রায় আধ লিটারের বেশি মদ্যপান করলেন কেন? এখানেই কি কোনো সম্ভাব্য সূত্র লুকিয়ে আছে? তার বাবার মদ্যপান এবং সম্ভবত সেই কারণেই যে মৃত্যু—এই তথ্য কি এখানে আদৌ গুরুত্বপূর্ণ?
অন্যদিকে এই মানুষটির মৃত্যু যদি ‘ঘটানো’ হয়ে থাকে, তাহলে তার পিছনে কার কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? এখানেই কি চিঠির ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে? চিঠির বয়ান অনুযায়ী অপরাধ করে অনুতাপহীন হয়ে ঘুরে বেরানো মানুষটি কি নীলাদ্রি? সেই অপরাধের ধরন কীরকম? সেটা কি ঋজুর পরিবারের অভিজ্ঞতার মতো চিকিৎসা জনিত কোনো অসাধু আচরণ বা অন্তত চূড়ান্ত কোনো উদাসীন আচরণ, যাকে বলে ক্রিমিনাল নেগলিজেন্স? সেই ক্ষেত্রে হাসপাতালের ভূমিকা কী? এবং এত বড়ো ডাক্তার হিসাবে হাসপাতালের ক্রিয়াকলাপেই বা নীলাদ্রির ভূমিকা কী? আপাতত এখান থেকে তার পরের গন্তব্য ছিল গ্যাংটক। সেখানে পৌঁছানোর আগেই সে ইহলোক থেকে বিদায় নিল। তাহলে কি গ্যাংটক যাওয়া, বা সেখানে কাজের কোনো বিশেষ তাৎপর্য আছে?
প্রধান আর ফারুক প্রায় একইসঙ্গে খেয়াল করল যে তারা দু’জনেই তিন নম্বর সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছে। প্রধান একটু গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর একসঙ্গে নীচে নেমে খোলা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে একে অপরকে বিদায় জানানোর সময় ফারুক বলল যে তারা হয়তো বৃথাই এতটা ভাবছে। হয়তো চিঠি আর মৃত্যু দুটো বিচ্ছিন্ন কাকতালীয় ঘটনা। প্রধান গাড়িতে উঠে বলল, যাই হোক না কেন, সে ফারুককে কেসের গতিবিধি সম্পর্কে জানাতে থাকবে। ফারুকও সায় দিয়ে বলল যে কলকাতা থেকে কোনো কাজের খবর পেলে সেও জানাতে দেরি করবে না।
আপাতত এইসব কথা একদম না—ভাবার নিরর্থক চেষ্টা করতে করতে সে পাহাড়ি রাস্তা ধরে হাঁটছে। মাঝেমধ্যে হাওয়ার জন্য তার নাকের ডগায় একটু বৃষ্টির ছাঁট আসছে বটে, কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি কেটে যাওয়ার পর হাত—পা ছড়াতে পেরে বেশ ভালোই লাগছে। যে রাস্তা ধরে ফারুক হাঁটছে তার একদিকে খাদ আর অন্যদিকে স্পষ্টতই কংক্রিট উন্নয়নের ছাপ। গড়ে পঁচিশ পা হাঁটলেই একটা করে নতুন কনস্ট্রাকশন চোখে পড়ছে। তারমধ্যে অনেকগুলোই বেশ চার—পাঁচতলা উঁচু এবং কাঠামোর গড়ন দেখলে ভবিষ্যতে হোটেল হবে বলেই মনে হয়। এছাড়া অনেক বাড়িতেই বোঝা যায় অল্পবিস্তর হোমস্টে ব্যাবসা চালু হয়েছে, কারণ নামের বোর্ডগুলো তুলনামূলক নতুন—তাদের রং এখনও উজ্জ্বল।
এত কিছুর পরেও এখন অবধি জায়গাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জৌলুস খুব একটা কমেনি, তবে পাঁচ বছর পরে কী হবে সেটা বলা মুশকিল। আপাতত ফিকে আলোয়, ভেজা নিস্তব্ধতায় হাঁটতে চমৎকার লাগছে। এতক্ষণে সে হিলটপ হেভেন হোমস্টে থেকে অন্তত দেড় কিলোমিটার দূরে। তবে আসার পথ মূলত ঢালু, ফেরার সময় চড়াই উঠতে হবে। এই কথাটা মনে হতেই ফারুক ভাবল যে কোথাও একটা ছাউনি বা নিদেনপক্ষে বড়ো পাথরের চাঁইও যদি চোখে পড়ে, তাহলে এবার খানিকক্ষণ বসবে। সেসব কিছু চোখে না পড়লেও, এর পরের বাঁকটা পেরোতেই খাদটা তার বাঁদিকে চলে এল আর তার মুখেই পাওয়া গেল একটা ছোট্ট গুমটি দোকান, যার সামনে লম্বা বেঞ্চ পাতা আছে।
ফারুক বেশ আরাম করেই বসল, কারণ দোকানের সামনে যে টিনের ছাউনি, তার একাংশ এগিয়ে এসে বেঞ্চের উপরটাও ঢেকে রেখেছে। দোকানের সামনের দিকে বয়ামে রকমারি লজেন্স, স্থানীয় আচার এবং কিছু বিস্কুট। তার পাশে একটা নেভানো স্টোভের উপর বহুব্যবহৃত মাঝারি সাইজের ডেকচি। সামনে আংটায় চিপস্ জাতীয় খাবার এবং সাবান—শ্যাম্পুর ছোটো ছোটো প্যাকেট ঝুলছে। ভিতরে দেয়ালে কিছু তাক করা আছে। সেখানে আরও কিছু বিস্কুটের প্যাকেট, জল ও কোকাকোলার বোতল এবং কিছু সিগারেটের প্যাকেট থাকে থাকে সাজানো। ঘরের ভিতর আলো কম, কিন্তু একটু ঠাহর করলে পিছনের দিকে দেয়ালের সঙ্গে ঠেকানো পরিপাটি বিছানা করা ছোটো চৌকিটা দেখা যায়। চৌকির পাশে একটা ভেজানো দরজার সামান্য ফাঁক দিয়ে এক চিলতে আলো এসে ঘরের মেঝেতে একটা সোজা দাগ কেটেছে।
ফারুক সবে ভাবতে আরম্ভ করেছে যে এরকমভাবে আর কতক্ষণ বসে থাকবে, ঠিক সেই সময় মেঝেতে আলোর দাগটা চওড়া হয়ে একটা বড়ো চৌকো আকার নিল আর দরজা দিয়ে ঢুকে এল একদমই অল্পবয়সি এক পাহাড়ি গৃহবধূ। মেয়েটির বয়েস কোনোমতেই পঁচিশ—ছাব্বিশের বেশি হবে না। পরনে একটা লম্বা ঝুল দেওয়া স্কার্ট আর গায়ে একটা নীল রঙের ফুলহাতা জিনসের জামা, যেটার বোতামগুলো একদম গলা অবধি আঁটা। মুখে স্বভাবসিদ্ধ হাসি নিয়ে জানাল যে পাশের ছাদের এক আন্টি ফারুককে বেঞ্চে বসে থাকতে দেখে তাকে জানিয়েছে। এমনিতে এরকম সময় এই রাস্তায় লোক চলাচল নেই বললেই চলে।
“ঠিকই। এই ওয়েদারে তো ট্যুরিস্টও আসবে না।”
“আর ওয়েদার! ট্যুরিস্ট সিজন তো এবার পুরো বরবাদ মনে হচ্ছে। যাই হোক, আপনি কী নেবেন?”
“আপাতত একটু চা হবে? যদি একটু বেশি করে করো, তাহলে আরও দু’এক রাউন্ড খেতে পারি।”
“সঙ্গে কিছু? মোমো? থুকপা? বা এমনি ম্যাগি?”
“এখন এই সামনের বিস্কুট দাও একটা। পরে ম্যাগি খেতে পারি।”
ফারুক এই মুহূর্তে হোমস্টে থেকে একটু দূরত্ব চাইছে। এখানে যদি বেশ খানিকটা সময় কাটানো যায়, ভালোই হয়। বৃষ্টির প্রকোপ এখনও খুব একটা বাড়েনি। আর বাঁদিকে ঘাড় ঘোরালে সামনে বিস্তৃত উপত্যকা জুড়ে বর্ষার দৃশ্য খুবই মনোরম। এর মধ্যে মেয়েটি স্টোভ জ্বালিয়ে তাতে জল বসিয়ে দিয়েছে। তারপর কিছু কাপ, প্লেট, বাটি, চামচ ইত্যাদি নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে, উবু হয়ে সেগুলো মাজতে বসল। “এগুলো ফেলে রেখেছিলাম দুপুর থেকে। সন্ধ্যার দিকে ফরেস্টের কিছু লোক, এদিক দিয়ে ফেরে, তখন লাগবে।”
“সারাদিন কি কেউই আসে না? হেঁটে আসার সময় তো দেখলাম রাস্তার পাশে প্রচুর থাকার জায়গা হয়েছে। আরও নতুন তৈরি হচ্ছে। ট্যুরিস্ট কি একেবারেই নেই?”
“এগুলো সব নতুন হয়েছে। এক বছর হবে। কোনো—কোনোটা দু—এক মাস। সেভাবে স্টার্ট হয়নি। আপনি কোথায় আছেন?”
“হিলটপ হেভেন হোমস্টে। রাই বলে একটা ফ্যামিলি চালায়।”
“এখানে প্রায় সব ফ্যামিলিই রাই। কিন্তু আপনি যেটার কথা বলছেন, সেটা তো ডলি আন্টির বাড়ি। ওখানে তো সাংঘাতিক কাণ্ড হয়ে গেছে! সারাদিন সবাই বলাবলি করছে। ঠিক করে কেউই জানে না।” এবার একটু গলা নেমে এল, “শুনলাম নাকি মার্ডার হয়ে গেছে!”
“সে কী! এইসব গুজবে একদম কান দেবেন না। ওরকম কিচ্ছু হয়নি। মোটামুটি আমার বয়েসি একজন হঠাৎ ঘুমের মধ্যে মারা গেছেন। এরকম অবস্থায় পুলিশকে ইনভেস্টিগেট করে দেখতেই হয়, সরকারি নিয়ম। এর বেশি কিছু হয়নি।”
“ঘুমের মধ্যে তাহলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে? নাকি স্ট্রোক?”
“সেটার জন্যই তো ইনভেস্টিগেশন। পরীক্ষা করে জানা যাবে।”
“ওহ, তাহলে তো ইনভেস্টিগেট করে বেরোতে পারে যে মার্ডারই হয়েছে!” বোঝা গেল মেয়েটি নিজে থেকে এত সহজে ব্যাপারটা ছাড়বে না। ফারুক আবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করল।
“ওই হোমস্টেটা তো মনে হয় না খুব একটা নতুন।”
“না না! ওটা এখানকার একদম প্রথম একটা—দুটো হোমস্টের মধ্যে। তখন তো এই জায়াগাটা কেউ অত জানতও না আর আসতও না। তবে ডলি আন্টি খুব শক্ত মহিলা। লেগে থেকে বিজনেস দাঁড় করিয়েছেন।”
“ব্যাবসা দাঁড় করাতে সমস্যা হয়েছিল?” ফারুকের মনে পড়ে গেল আজ দুপুরে খাওয়ার সময় ডলির সঙ্গে তার কথোপকথন।
“সেরকম কিছু না। কিন্তু প্রথমদিকে সেরকম লোকজন হত না আবার কিছু পলিটিকাল ঝামেলা ছিল। মানে বোঝেন তো। লাইসেন্স, ট্যাক্স এসবের ভয় দেখিয়ে টাকা খিঁচতে চায়। কিন্তু আন্টি কখনও আংকেলকে নিয়ে, আবার কখনও একা একাই ছোটাছুটি করে সেসব ঝামেলা মিটিয়েছে।”
“পৃথ্বী রাই কি খুব একটা এইসব দৌড়াদৌড়ি করেন না?”
“একসময় তো খুব করতেন। ওঁরা দু’জনেই আমাদের এলাকার খুব সম্মাননীয় মানুষ। সবাই ওঁদের খুব মানে। বিপদে—আপদে পরামর্শ নেয়। ওঁরা হেল্পও করে অনেক। আর আমি কী বলব? আমার বাচ্চাটা অসুস্থ হয়ে গেছিল। তখন ওঁরা না থাকলে হয়তো বাঁচতই না। আর আংকেল ছিল আমাদের গ্রামের মাথার মতো—নিজের বাড়ির থেকেও আশেপাশে সবাই ঠিকঠাক আছে কিনা, কারওর কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা, সেসব দিকে খুব নজর। ওঁর চারিদিকে প্রচুর চেনাজানাও ছিল—কালিম্পং, দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, এমনকি কলকাতা, দিল্লি, বম্বে এসব জায়াগাতেও। আর সেসবের জন্য এখানে সবার কিছু—না—কিছু উপকার হয়েছে। কিন্তু লাভের মধ্যে বাড়ি সামলানোর বেশিরভাগটাই আন্টির ঘাড়ে পড়ে যেত।”
ফারুক ইতিমধ্যে দ্বিতীয় কাপ চা হাতে নিয়ে ফেলেছে। পাশে রাখা আছে গরম ধোঁয়া ওঠা ম্যাগির বাটি এবং সদ্য কেনা দু’প্যাকেট সিগারেট। সেগুলো ফারুকের পছন্দের ব্র্যান্ড নয়, কিন্তু আপাতত হাতের কাছে যা পাওয়া যাচ্ছে সেটাই স্টক করে রাখা ভালো। পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত। চা শেষ করে এবার সে বাটি থেকে ম্যাগি তুলে বেশ কয়েকবার ফুঁ দিয়ে এক চামচ মুখে দিল। মেয়েটি এখনও দোকানের ভিতর থেকে হাসি হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
“ভালো হয়েছে খেতে?”
“ফার্স্ট ক্লাস। অনেকদিন পর এরকম স্যুপের মতো ম্যাগি খেলাম!”
“যাক! আমি আবার খুব ভালো রান্না পারি না। এগুলো এমনিতে কাস্টমার এলে আমার হাজব্যান্ডই করে দেয়। তার মধ্যে আপনি তো ওখানে পৃথ্বী আংকেলের রান্না খাচ্ছেন। উনি তো এক্সপার্ট!”
“তা ঠিক। উনি রান্নাঘর দুর্দান্ত সামলাচ্ছেন। কিন্তু একটা কথা বলো। ওঁকে দেখে কিন্তু বোঝা যায় না যে উনি এখানে সবার সঙ্গে এতটা মেলামেশা করেন। এমনিতে নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকা চুপচাপ লোক বলেই মনে হয়।”
“সে তো করোনার পর থেকে উনি একদম গুটিয়ে গেছেন!”
“ওহ, মেজর কোনো শরীর খারাপ কিছু—”
“না না, ওঁর ছেলের ঘটনাটা হল যে!”
“ছেলে?”
“আপনি তাহলে জানেন না। ওঁদের মেয়েকে দেখেছেন তো, প্রতিভা? প্রতিভার এক দাদা ছিল, ধীরজ। এরা দুই ভাই—বোনই লেখাপড়ায় খুব ভালো। আবারও পুরো ডলি আন্টির ক্রেডিট। ধীরজ দার্জিলিঙের স্কুলে পড়ত। তারপর স্কুল শেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পেয়ে ব্যাঙ্গালোর চলে গেল। সেটা ছিল ২০১৮ সালের এরকম সময়, মানে ওই জুন—জুলাই। দু’বছর পর এল করোনা। মার্চ মাসে সব লকডাউন হয়ে গেল। এপ্রিলে ধীরজের ফোন এসেছিল যে শরীরটা ভালো না, ওষুধ স্টার্ট করেছে। তার ঠিক দু’দিন বাদে গভর্নমেন্টের লোক ফোন করে জানিয়েছিল সব শেষ। তখন নিয়ম ছিল, ওরা বডি—ও পুড়িয়ে দিয়েছে। তার বোধহয় দেড় কি দু’মাস বাদে পোস্ট অফিস থেকে ফোন পেয়ে পৃথ্বী আংকেল গাড়ি করে গিয়ে ধীরজের ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছিলেন। ব্যাস। তারপর আর কোনো দিন বাড়ির বাইরে পা রাখেননি। কারওর সঙ্গে কথা বলেননি। ফোন ফেলে দিয়েছেন। কোনো ডাক্তারের কাছে না, কোথাও নেমন্তন্ন না, কিচ্ছু না। এখন তো শুনি একমাত্র গেস্ট, মানে যারা বাইরের লোক, শুধু তাদের সঙ্গেই কথা বলেন। আগের মানুষটা উধাও হয়ে গেছে।”
আরও মিনিট কুড়ি পরে হোমস্টের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ফারুক রাই দম্পতির জীবনে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ব্যাপারটা নিয়েই ভাবছিল। তার নিজের জীবনেও সে উপলব্ধি করেছে যে সন্তান স্নেহ সম্ভবত তার সবথেকে বড়ো দুর্বলতা। সন্তান হারানোর ভয় হয়তো তার মনের অতলে লুকিয়ে থাকা সবথেকে বড়ো ভীতি। সেই বিচ্ছেদ, তাও এরকম অতর্কিতে আর নির্মমভাবে, সহ্য করেও এই দুটি মানুষ জীবন নিয়ে এগিয়ে চলেছে। বেরোনোর আগে সে পৃথ্বীর হাতের রান্না খেয়ে বেরিয়েছে, ডলি তার ফেরার টিকিট ক্যানসেল করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ফারুক জানে না তার নিজের পক্ষে এই অসম সাহস জোগাড় করা সম্ভব হত কিনা।
হোমস্টের কাছাকাছি একদম শেষ বাঁকের দিকে এগোতে গিয়ে ফারুক একটু দাঁড়াল। হঠাৎ তার নিজের মেয়ে, নিজের স্ত্রীর অনুপস্থিতি যেন বেশি করে টের পাচ্ছে। ওরা থাকলে ফারুকের দিগন্ত বিস্তৃত হয়। সে পৃথিবীকে, প্রকৃতিকে বেশি ভালো করে উপভোগ করতে পারে। এই যে তার সামনে খোলা উপত্যকা এবং তাকে ঘিরে আছে সবুজে ঢাকা পর্বতমালা, ফারুকের স্বাভাবিক দৃষ্টি আর চেতনা এই রসাস্বাদনে খানিক অপারগ। এখনও প্রাথমিকভাবে তার চোখ এবং মনোযোগ চলে গেছে নীচে একটি বাড়ির ছাউনি দেওয়া ছাদে। সেখানে অন্তত তিনরকম আলাদা উচ্চতায় তিনটে জামাকাপড় শুকানোর দড়ি টাঙানো আছে। বোঝাই যায় বাড়ির গৃহিণী বা যিনিই এসবের দায়িত্বে আছেন, তিনি তাঁর কাজে অত্যন্ত পটু এবং নিপুণ। বড়ো মাপের কাপড়ের জন্য সবথেকে উপরের দড়ি, মাঝারি মাপের জন্য মাঝের দড়ি এবং একদম ছোটোখাটো হাফপ্যান্ট, রুমাল বা আন্ডারওয়্যারের জন্য সম্ভবত নীচের দড়ি ব্যবহার হওয়ার কথা। কিন্তু এখন একবার তাকালেই বোঝা যাবে যে সেই মানুষটি নিশ্চয়ই বাড়ি নেই এবং আপাতত এই দায়িত্ব অন্য কারওর হাতে এসেছে। ফলে মাঝের দড়িতে দুটো বিছানার চাদর মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে এবং উপরের দড়িতে একটি নিঃসঙ্গ টি—শার্ট পাশে মেলা একজোড়া মোজার সঙ্গে হাওয়ায় দুলছে। দীর্ঘদিনের কড়া প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলা ফারুককে একভাবে গড়েপিটে নিয়েছে। নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর ঈষৎ অসঙ্গতির মধ্যে পরেরটাই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য।
আচমকা চিন্তার জাল ছিঁড়ে তার ফোন বেজে উঠল। পকেট থেকে বের করে দেখা গেল অর্ণবের নাম জ্বলজ্বল করছে। সময় পাঁচটা আটান্ন। ফারুক আর হোমস্টের দিকে না এগিয়ে রাস্তার এক ধারে সরে গিয়ে রেনকোটের মাথার হুডটা ভালো করে টেনে নিল। তারপর ফোন কানে দিয়ে বোতাম টিপল।
“বলো কী জানা গেল।”
“সরি ফারুকদা, ফোন করতে একটু দেরি হয়ে গেল। এদিকে ডাক্তারি মহল তো পুরো সরগরম! আপনি ফোন করার আরও প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পরে এখানে খবরটা আসে। আমার ধারণা, বাড়ি, হাসপাতাল, মিডিয়া সবাই প্রায় একইসঙ্গে খবর পেয়েছে। কালিম্পং পুলিশ থেকে একটা অফিশিয়াল ইনটিমেশন এসেছে, কিন্তু ওরা এখনও আমাদের থেকে তথ্য বা অন্য কোনো হেল্প চায়নি। তবে টিভি খুললেই সমানে এই নিউজ! তাতে অবশ্য আমার একটু সুবিধাই হয়েছে। মানে মিডিয়াই আমার কাজ খানিক এগিয়ে রেখেছে, হেঃ হেঃ! যাইহোক, যা যা জানলাম, আপনার সঙ্গে শেয়ার করি। আপাতত বেসিক ইনফরমেশন, কারণ আপনি বিশেষ কোনোদিকে ফোকাস করার কথা তো বলেননি।”
“অসুবিধা নেই, কোথাও একটা তো শুরু করতে হবে। বলো।”
“পুরো নাম নীলাদ্রি চক্রবর্তী তো জানেন। বয়েস সাতান্ন বছর, এই সামনের সেপ্টেম্বরে আটান্ন হবে। জন্ম কলকাতাতেই, বাড়ি ছিল বিকে পাল অ্যাভিনিউ, শোভাবাজারের কাছে। বাবা ছিলেন বেশ প্রতিষ্ঠিত পদার্থবিদ, নাম অরুণেন্দু চক্র—”
“এই দাঁড়াও দাঁড়াও। বাবা তো শুনলাম ডাক্তার ছিলেন! ব্যাপারটা ফিজিক্স হয়ে গেল কী করে?”
“আরে দাঁড়ান, নানা ঘটনা আছে। বলছি। হ্যাঁ, তো এই অরুণেন্দু চক্রবর্তী বিদেশে কনফারেন্সে গেছিলেন ১৯৭০ সালে। দেশটা সুইডেন না সুইৎজারল্যান্ড, সেটা নিয়ে একটু ধোঁয়াশা আছে, পরে কনফার্ম করছি। কিন্তু সেখানেই একটা পথদুর্ঘটনায় ভদ্রলোক মারা যান। নীলাদ্রির তখন তিন বছর বয়েস। মায়ের কাছে থেকেই সে বড়ো হচ্ছিল। ১৯৭৬ নাগাদ ভদ্রমহিলার সঙ্গে ডঃ সমীরণ পালের আলাপ হয়। কীভাবে আলাপ হল সেই ডিটেইলস্ কিন্তু এখনও জানি না। সেসব লাগবে?”
“আপাতত মনে হয় না। যখন মনে হবে অবশ্যই বলব। এখন আর কী জানলে?”
“১৯৭৮—এ নীলাদ্রির মা—নাম সুপ্রিয়া চক্রবর্তী, ওঁর বিয়ে হয় ডঃ সমীরণ পালের সঙ্গে। নীলাদ্রি সহ তিনজন ডঃ পালের যোধপুর পার্কের বাড়িতে বসবাস শুরু করে। এই সময় ডঃ পাল খুবই প্রতিষ্ঠিত ছিলেন বোঝা যায়। কালকাতায় বসে নানারকম সব কমপ্লিকেটেড সার্জারি সাকসেসফুলি করছিলেন। মহেন্দ্র রায়চৌধুরির নামে যে এমআরসি মেমোরিয়াল হসপিটাল, সেখানকার সার্জারির হেড ছিলেন আজীবন। আমাদের নীলাদ্রিও ওখানেই কাজ করা শুরু করে।”
“বাবা ছেলে একসঙ্গেই ওখানে ছিল?”
“হ্যাঁ। আশির দশকের শেষে নীলাদ্রি ডাক্তারি পড়া শেষ করে বাবার আন্ডারেই কাজ করা শুরু করে। এই ব্যাপারে বাপ—ছেলের লাইফের গতিবিধির বেশ মিল আছে।”
“কীরকম মিল?”
“এই যে নীলাদ্রি, সেও এখন অনেকদিন যাবৎ ওই বৃজমোহন, মানে বিএমএসটি হসপিটালের সার্জারি বিভাগের হেড। তবে সেই সঙ্গে সম্ভবত অংশীদার এবং হাসপাতালের গভর্নিং বডির সদস্যও বটে। বিয়ে করেছেন ১৯৯৯ সালে। কন্যা সন্তান জন্মায় ২০০২ সালে। এদেরকে সঙ্গে নিয়েই ছুটি কাটাতে এসেছিলেন একটি টি—গার্ডেনে, সেটা গরুবাথানের কাছে চা বাগানের মালিক এঁর পেশেন্ট। তবে নীলাদ্রির মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্যাংটক। সেখানে নিঃসন্দেহে ব্যাবসা সংক্রান্ত কোনো কাজ আছে। এর বেশি ইনফরমেশন দিতে সেক্রেটারি বেজায় গাঁইগুঁই করছে। আপনি যদি বলেন, তাহলে অন্যভাবে আদায় করতে হবে।”
“এটা লাগতেই পারে। ফলে মাথায় রেখো। বাই দ্য ওয়ে, এই ডঃ পালের মদের নেশা এবং সেই থেকে অসুস্থতা এবং মৃত্যু—এইসব কিছু জানা গেল?”
“মদের নেশা নিয়ে তো এখনও কিছু শুনিনি। বললে খোঁজ নেব। কিন্তু উনি তো কোনো অসুস্থতায় মারা যাননি।”
“তাহলে কী হয়েছিল?”
“গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন।”
