আংশিক মেঘলা – শেষ দিন

শেষ দিন

সকালে যখন চোখ খুলল, তখনও জানালার ফিনফিনে পর্দার ওপারে আলো কতটা ফুটেছে বোঝা যাচ্ছে না। হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে আধবোজা চোখে ফারুক দেখল সকাল পাঁচটা দশ। সেইসঙ্গে একটা ইমেলের নোটিফিকেশন; অনেক রাতে অর্ণব পাঠিয়েছে। ফোন রেখে শোয়া অবস্থাতেই টেবিল থেকে জলের বোতল নিয়ে, খুব সাবধানে দুটো ছোটো ছোটো ঢোঁক জল খেল। ঘুমটা একটু হলেও কাটল, তবে শুধু মাথার ভিতরে। শরীর এখনও বিছানার সঙ্গে আঠা দিয়ে আটকানো।

মাথার যেটুকু অংশ থেকে ঘুম বিদায় নিয়েছে, সেখানে ভাবনা জড়ো হতে শুরু করেছে। প্রথমেই খেয়াল হল যে এই দোতলাটায় আপাতত সে একা। কেশবকে রাতে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং এই খবরটা জনে জনে রাষ্ট্র না করলেও অন্তত হোমস্টের মালিকদের জানাতেই হবে। এই কাজটা কোনো এক ফাঁকে ফারুকেরই সম্ভবত করার কথা। কিন্তু সেটা আরও অন্তত দেড়—দু’ঘণ্টার আগে নয়। তার মানে এই ঘণ্টাদুয়েক সে এমন এক তথ্যের জিম্মাদার যার খবর আর কারওর কাছে নেই। তার চাকরিজীবনে তদন্ত চলাকালীন সবাই এরকম মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকত। তার মানেই এবার খেলা ঘুরতে শুরু করেছে, কেস গোটাতে শুরু করেছে। যে—কোনো তদন্তের মূল মুদ্রাই হল তথ্য। তদন্ত করা মানে আসলে তথ্য সংগ্রহ করা আর সেইসব তথ্যকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখে এবং সাজিয়ে নিয়ে একটি সম্ভাব্য আখ্যান রচনা করা। এই তথ্যের প্রতিযোগিতায় সামান্য হলেও এগিয়ে থাকা মানে, নিষ্পত্তির আর বেশি দেরি নেই।

ভাবনা খানিক এদিক—ওদিক এলোমেলো রাস্তা ঘুরে আবার কেশবের কাছেই ফিরে গেল। লোকটা ধুরন্ধর আর ঝানু ঠিকই, কিন্তু এবারের দানে বেশি বাজি লাগিয়ে একটু বেকায়দায় পড়ে গেছে। তবে তাও ফারুকের ধারণা কেশব সত্যিই খুনি নয়। তার পিছনে আপাতত দুটি যুক্তিই যথেষ্ট। এক হচ্ছে, নীলাদ্রির মৃত্যু আদৌ খুন কিনা এবং হয়ে থাকলে কীভাবে হয়েছে, সেটা সম্পর্কে কেউ এখনও কিছু আলোকপাত করতে পারেনি। আর অন্যদিকে ঋজুকে খুন করার ব্যাপারে কেশবের কোনো উদ্দেশ্যর হদিশ এখনও মেলেনি। এমনকি দু’জনের মধ্যে আদপেই কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক আছে বলেই জানা যায়নি।

তবে খুনি হিসাবে প্রমাণিত না হলেও, গতকাল কেশবের স্বীকারোক্তি অনেকগুলো দিক খুলে দিয়েছে। কিছু ব্যাপারে সন্দেহ ছিল, সেগুলো সুনিশ্চিত করা গেছে। যেমন নীলাদ্রি চক্রবর্তীর গোটা সামাজিক প্রতিষ্ঠা, খ্যাতি ও যশের পিছনে যে বেশ কিছু অপ্রীতিকর বিষয় অতীতের ছায়াঢাকা আছে, সেটা জানা নিঃসন্দেহে জরুরি ছিল। অনেকসময় প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান বা আঙুলের ছাপের মতো অকাট্য প্রমাণের বাইরেও কিছু ঘটনা ও তথ্য জানা প্রয়োজন। তাতে মানুষ চেনা যায়। যেমন ঐশানীর সঙ্গে কথোপকথনে ঋজুর প্রতিকৃতিটা আর—একটু পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠেছে।

ঋজু দাশগুপ্ত ছেলেটি তার গোটা স্বাধীনচেতা ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাবভাবের আড়ালে আদতে একটি আদ্যন্ত কলকাতার বড়োলোকের ছেলে। ফারুক তার কৈশোর থেকে এদের দেখতে দেখতে বড়ো হয়েছে এবং নিজের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এদের প্রতি মনোভাব বদলে বদলে গিয়েছে। সে প্রথম যখন কলকাতায় এসে স্কুলে ভরতি হয়েছিল, তখন মুগ্ধ হয়ে ক্লাসে এইসব ছেলেদের দিকে তাকিয়ে থাকত। এদের মতো কথা বলা, চটপটে হাবভাব, এদের মতো পৃথিবীর নানা ব্যাপারে খোঁজখবর রাখা, এইসবই যেন কিশোর ফারুকের জীবনের লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল। কলেজ পাশ করে যখন সে প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রাপ্তমনস্ক দুনিয়ায় পা রাখল, এদের সংকীর্ণতা ও সুবিধাবাদী আচরণ দেখে ফারুকের বিবমিষা হত। ছোটোবেলায় যাদের দেখে মনে হয়েছিল অ্যাডভেঞ্চার কাহিনির হিরো, তাদের তরুণ সংস্করণদের দেখে মনে হল শেয়াল আর হায়নার দল— একসঙ্গে দল বেঁধে থাকা আর কোনো এককালে বাপ—দাদাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি আর প্রতিষ্ঠার মৃতদেহ থেকে বেঁচে থাকার রসদ জোগাড় করা। অবশেষে চাকরি জীবনের বেশ কয়েক বছর পার করে এবং কিছুটা অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর ফারুক এদের জন্য অনেকটা ঔদাসীন্য আর সামান্য করুণা বরাদ্দ করে রেখেছে।

একাধিক গর্হিত কাজ ও অন্যায় সত্ত্বেও ঋজুর খুন হয়ে যাওয়া একটি দুর্ভাগ্যজনক বিষয়। এখানে ফারুক ঐশানীর সঙ্গে একমত; ঋজুর প্রাপ্য শাস্তি তার পাওয়া হল না। আচমকাই অতর্কিতে তার জীবনে যবনিকা নেমে এল। কিন্তু সেই মৃত্যুও হয়তো তার জীবনের বৃহত্তম ট্র্যাজেডি নয়। ট্র্যাজেডি হল, তার সামান্য জীবনের বেশিরভাগটা ধরে, বহু চেষ্টা করে ঋজু যে নিজের ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের ধারনা তৈরি করেছিল, কলকাতা শহরের কিছু কিছু অঞ্চলে প্রত্যেক বাড়ি থেকে এরকম একটি করে নিদর্শন জোগাড় করা সম্ভব। ঋজু ব্যতিক্রম নয়, বরং তার গোটা অস্তিত্বই একদম ছাঁচে ফেলা ধরনের গতানুগতিক। এই বোধ হওয়ার আগেই তার জীবন শেষ হয়ে গেল, এটাও কম দুর্ভাগ্যজনক নয়।

ফারুক বুঝতে পারছে তার মাথা থেকে ঘুম পুরোপুরিই বিদায় নিয়েছে। এবার শরীরও আস্তে আস্তে সেটা টের পাচ্ছে। একটু মাথা তুলে সে আর—একবার ফোন দেখল— সোয়া ছ’টা। জানালা ও পর্দা ভেদ করে বাইরের নরম আলো ভালোই বোঝা যাচ্ছে। কনুইয়ে ভর দিয়ে শরীরটাকে তুলে ফারুক একটা বড়ো আড়মোড়া ভাঙল।

মিনিট দশেক পরে সে যখন বারান্দায় এসে দাঁড়াল, কোলাখামও তখন আড়মোড়া ভাঙছে। নীচে পেমা একটা কমলা ঝাঁঝরি দিয়ে টবে জল দিচ্ছে, আর থেকে থেকে ডাইনিং হলের দিকে মুখ ফিরিয়ে কিছু কথার উত্তর দিচ্ছে। ফারুক সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এল।

ডাইনিং হলের ভিতরে ডলি একটা চেয়ারে বসে খাতা খুলে কিছু একটা হিসাব করছে। তার পরনে একটা রংচঙে হাউসকোট যেটা প্রায় জাপানি কিমোনোর মতো দেখতে; গোটা পোশাক জুড়ে একটা প্রকাণ্ড ড্রাগন আঁকা। ফারুকের পায়ের শব্দ শুনে সে মুখ তুলে তাকাল।

“গুড মর্নিং। চা হতে কিন্তু আরও অন্তত আধ ঘণ্টা।”

“গুড মর্নিং, কোনো অসুবিধা নেই। আপনার সময়মতো করে পাঠালেই হবে। আমি আসলে একটা অন্য বিষয়ে কথা বলতে এলাম।”

“আবার কিছু হয়েছে?” ডলি খাতা বন্ধ করে দিয়েছে। তার চোখেমুখে উৎকণ্ঠার ছাপ স্পষ্ট।

“না না, ব্যস্ত হবেন না প্লিজ। আপনাকে গোটাটা বলছি।” ফারুক ঘরে ঢুকে একটা চেয়ার নিয়ে বসেছে। “গতকাল পুলিশি তদন্তের ফলে কয়েকটা জিনিস জানা যায়। বোঝা যায় আপনাদের গেস্ট, আমার পাশের ঘরের প্রতিবেশী কেশব কোঠারি, বেশ কিছু তথ্য গোপন করেছিলেন।”

“ও খুন করেছে?”

“দাঁড়ান দাঁড়ান, এগুলো এখনও বোঝার সময় আসেনি। আপাতত কাল রাতে প্রধান এসে মিস্টার কোঠারিকে আর—এক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করে। আমিও উপস্থিত ছিলাম। সেইসব কথাবার্তার ফলে ওঁর স্টেটমেন্টে আরও অনেক গণ্ডগোল আছে বোঝা যায়। আমি আপনাকে সব খুলে বলতে পারব না, শুধু এটুকু বলছি যে এমন কিছু কানেকশন বেরিয়েছে, তাতে পুলিশের তরফ থেকে ওঁর ব্যাপারে আরও তদন্ত চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে, আরও জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য কাল রাতেই মিস্টার কোঠারিকে লাভা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”

“পুলিশ কি ওকেই খুনি বলে সন্দেহ করছে?” ডলি প্রায় একই কথার পুনরাবৃত্তি করল।

“আবারও বলছি, আপাতত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এবার যদি আরও ক্রিটিকাল কোনো কিছু বেরিয়ে পড়ে এবং পুলিশ যদি মনে করে যথেষ্ট কারণ আছে, তখন অফিশিয়ালি অ্যারেস্ট করা হবে। আমি আপনাকে শুধু এই কারণে জানিয়ে রাখলাম যাতে মিস্টার কোঠারির ঘর তালাবন্ধ এবং ওঁকে দেখতে না পেয়ে আপনারা দুশ্চিন্তা না করেন। এই সবকিছু কিন্তু আপনাকে আমি কনফিডেনশিয়ালি বললাম। কথাটা যাতে পাঁচকান না হয়, সেটা একটু দেখবেন। আপনার বাড়ির লোক বা স্টাফ, তাঁদেরও একটু বলে দেবেন।”

ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে আর পেমাকে দেখা গেল না। তার বদলে বেঞ্চে বসে আছে জিন্স, বুট, টুপি, সানগ্লাস পরা এক মূর্তি। ফারুক কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে চিনতে পারল— দেবলীনা। পোশাকের আমূল পরিবর্তন এবং সেইসঙ্গে এত সকালে পুরোদস্তুর তৈরি হয়ে বসে থাকা, দুটোই বেশ অপ্রত্যাশিত। ফারুক কিছু বলার আগে দেবলীনাই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখতে পেয়ে হাত নাড়ল। ফারুকও উত্তরে হাত তুলল, আর তক্ষুনি মনে পড়ল যে ওরা বলেছিল আজকে সকালে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান আছে।

“সবাই রেডি? আমি তো ভাবলাম তোমরা আরও আগে বেরিয়ে যাবে।” ফারুক বেঞ্চের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে দেবলীনার মুখের উপর তার শরীরের ছায়া পড়েছে। সেটা বুঝতে পেরে দেবলীনা নিজের সানগ্লাসটা খুলে ফেলল।

“সেরকমই তো কথা ছিল। আমিই আসলে একটু দেরি করে উঠেছি। কিন্তু সবার আগে রেডি হয়ে গেছি। বাকিদের দেখতে পাচ্ছেন? আর আপনি দাঁড়িয়ে কেন? বসুন!”

দেবলীনা বেঞ্চের একদিকে সরে গিয়ে জায়গা করে দিল। তার মুখে এখন রোদ পড়ছে। সে তাড়াতাড়ি আবার সানগ্লাসটা চোখে দিয়ে নিল। কারওর মনের ভিতর কী চলছে, সেটা বাইরে থেকে দেখে অনেকসময়েই সঠিক অনুমান করা সম্ভব হয় না, কিন্তু সকালের আলোর জন্যই হোক বা তার ঝলমলে পোশাকের জন্যই হোক, আজ দেবলীনাকে অনেক সুস্থ, স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। ফারুক তার পাশে ফাঁকা জায়গাটায় বসে পড়ল।

খানিকক্ষণ দু’জনেই চুপ। নিস্তব্ধতা সবে যখন একটু অস্বস্তিকর লাগতে শুরু করেছে তখন দেবলীনাই মুখ খুলল।

“আসলে আজকের প্ল্যানটায় আমিই জোর দিয়েছি। এইবারের গোটা ট্রিপটা শুরু থেকেই কেমন যেন— আর তারপর ঋজুর ঘটনাটা! লাস্ট দু’দিন ঘরে বসে দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। নিজের বাড়িতে থাকলে কী করতাম জানি না। তবে এখানে এই ঘরে… তাই গতকাল আমিই একটু জোর করে এই জঙ্গলে যাওয়ার ব্যাপারটা ঠিক করেছি। বাকিরা প্রথমে খানিক মুখ চাওয়াচাওয়ি আর কিন্তু কিন্তু ভাব করে তারপর রাজি হল।”

“এখন বাকিরাই দেরি করছে?”

“আরে অদ্ভুত অ্যাটিচুড! আগে আগে ঘুম থেকে উঠে, নিজেরা রেডি না হয়ে আমাকে নাকি আধ ঘণ্টা ধরে ডেকে যাচ্ছিল। তারপর পনেরো মিনিট ধরে বলে গেল কেন আমি দেরি করে ওঠায় সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। আরে নিজেরা রেডি হ! আমি তো জানি ওঠার পর আমার পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট লাগবে! এখন সবার টনক নড়েছে। দু’জন দুটো বাথরুম দখল করে বসে আছে।”

দেবলীনার কথা শেষ হতে না হতেই জয়দীপ ও ঐশানী বেরিয়ে এল। দু’জনকেই দেখে মনে হচ্ছে জঙ্গল ভ্রমণের জন্য পুরোদস্তুর প্রস্তুত। ঐশানী একটা গোল গলার টিশার্টের উপর জলপাই রঙের ফুলহাতা শার্ট জ্যাকেটের মতো চাপিয়ে রেখেছে। শার্টের হাতা কবজির একটু উপর অবধি গোটানো, হাতে স্মার্টওয়াচ। তার পিঠে একটা ছোটো ব্যাকপ্যাক ও কোমরে বেল্টের সঙ্গে বাঁধা একটা পাউচ। জয়দীপেরও গোল গলার টি—শার্ট, তবে ফুলহাতা। গলায় একটা টেলি লেন্স লাগানো ক্যামেরা ঝুলছে। আপাতত দু’জনেরই পরনে জিন্স এবং বুটজুতো। জয়দীপের হাতে একটা মাঝারি সাইজের সাদা রঙের ফ্লাস্ক। ফারুককে দেখে সে যেন একটু স্বস্তি পেল।

“খুব ভালো হল আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে। আমি একটু জলের মাপে গোলমাল করে ফেলায় বেশি কফি করে ফেলেছি। পুরোটা ফ্লাস্কে আঁটছে না, ওই এক মগ মতো এক্সট্রা। আপনি কি কফির মুডে আছেন? তাহলে আর ফেলে দিতে হয় না।”

“আরে সকাল সকাল এর থেকে ভালো অফার আর কী হতে পারে? অবশ্যই দাও। কিন্তু তোমাদের দেরি হচ্ছে না তো?” শেষের প্রশ্নটা করার সময় ফারুক একবার সবার মুখের দিকেই তাকিয়ে নিল।

“না না, এক মিনিট লাগবে। আমি গাইডের সঙ্গে ফোনে কথা বলে নিয়েছি। হাতে সময় আছে বলেছে, কোনো অসুবিধা নেই।” ঐশানী যেরকম তড়িঘড়ি উত্তর দিল, তাতে মনে হল কথাগুলো ফারুকের থেকে বেশি দেবলীনাকে উদ্দেশ্য করেই বলা।

দেবলীনার অবশ্য এতে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। সে আপাতত তার ফোনের ক্যামেরা খুলে হোমস্টের উলটোদিকে খোলা দিগন্তের ছবি তুলছে। আজ আকাশের রং নীল, উপত্যকার রং সবুজ আর পাহাড়ের রং বেগুনি। যেখানে সাদা চূড়া দেখতে পাওয়ার কথা, সেখানে অবশ্য এখনও খানিক মেঘ জড়ানো। একটা খুটখাট শব্দ পেয়ে ঘাড় ঘোরাতেই সবাই দেখল জয়দীপ তালা লাগাচ্ছে নিজেদের ঘরে। পাশে চেয়ারে, ফ্লাস্ক আর একটা ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। জয়দীপ তালা লাগিয়ে এক হাতে ফ্লাস্ক আর অন্য হাতে মগটা নিয়ে অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে এগোতে শুরু করল। সেই অবস্থা দেখে ফারুকই দৌড়ে গিয়ে তার হাত থেকে কফির মগটা নিয়ে নিল।

“থ্যাংক ইউ! দুটো একসঙ্গে হাতে নিয়েই বুঝলাম কেস খেয়ে গেছি। আর—একটু হলেই গায়ে ফেলতাম।”

“আরে থ্যাংক ইউ তো তোমাকে, এটার জন্য।” ফারুক হাতের মগটা তুলে দেখাল। “আমার মনে হয় আর কোনো দুর্ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার আগেই, তোমরা এবার স্টার্ট করো। অযথা দেরি হয়ে যাবে।”

তিনজনেই ফারুকের উদ্দেশ্যে একবার হাত নেড়ে মেন রোডের দিকে নেমে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই সেই সকালের স্বাভাবিক নিস্তব্ধতা ফিরে এল। পাহাড়ে এক লহমায় যেমন দৃশ্য বদলায়, তেমন শব্দও বদলায়। মানুষও বদলায় কি? ফারুকের কাছে এই মুহূর্তে এটাই বড়ো প্রশ্ন। এই দলটা দু’দিন আগেই চারজন থেকে তিনজন হয়ে গেছে, সেটাও বেশ নির্মমভাবে ও অতর্কিতে। প্রত্যেকের উপর সেই ঘটনার প্রভাবও পড়তে দেখেছে। কিন্তু এরই মধ্যে তারা আবার সামলেও উঠেছে, অন্তত সকালে উঠে একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার মতো তো বন্দোবস্ত। কলকাতা শহরে, নিজেদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনে থাকলে কি প্রতিক্রিয়া এরকমই হত, নাকি শোক সামলে ওঠার মুহূর্ত আর—একটু বিলম্বিত হত?

কফি নিয়ে ফারুক বাইরের বেঞ্চেই বসে পড়ল। বসেই মনে পড়ল অর্ণবের পাঠানো ইমেলের কথা। পকেট থেকে ফোনটা বের করে মেল থেকে অ্যাটাচমেন্টগুলো খুলে উলটেপালটে দেখতে শুরু করল। ব্যস্ততার কারণে অর্ণব আর বিশেষ বাছবিছার না করে ডঃ সমীরণ পাল সংক্রান্ত যা যা জোগাড় করতে পেরেছে প্রায় সবই পাঠিয়ে দিয়েছে। ছবি, সার্টিফিকেট, শংসাপত্র, তাঁর লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ, তাঁর সম্পাদনা করা রাজনৈতিক পত্রিকা— সবকিছুরই স্ক্যান কপি এখন ফারুকের চোখের সামনে। সে কফিতে চুমুক দিতে দিতে, এক এক করে ফাইলগুলো খুলে চোখ বোলাতে থাকল।

“গুড মর্নিং!”

ফোনের স্ক্রিনে মনোযোগ থাকায় ফারুক খেয়াল করেনি কখন পৃথ্বী রাই এসে সামনে দাঁড়িয়েছে। এত সকালে পরও সে স্নানটান সেরে একদম ফিটফাট, সারাদিনের কাজকর্মের জন্য তৈরি।

“ডিস্টার্ব করলাম না তো?”

“আরে না না! সকালবেলা এখানটায় বসে খুব ভালো লাগল। তাই এমনিই একটু সময় কাটাচ্ছিলাম।” ফারুক ফোনটা সরিয়ে পাশে রেখে দিয়েছে।

“তা তো বটেই। আপনাদের এই ক’দিন থাকাটা তো খুবই আনফরচুনেট। যেমন ঘটনা ঘটল, সেরকম ওয়েদার খারাপ। এখন অ্যাট লিস্ট ওয়েদারটা ক্লিয়ার হয়েছে।”

“আশা করি অন্যটাও তাড়াতাড়ি ক্লিয়ার হয়ে যাবে।”

“আই রিয়েলি হোপ সো। এনিওয়ে, আপনাকে যেটা বলতে এসেছিলাম— ওই যে অ্যালবামের কথা বলেছিলাম আপনাকে, যেখানে আপনার অফিসের অনেকের ছবি পাবেন, সেটা খুঁজে পেয়েছি। লাস্ট দু’দিন ডলি ঘরের সব জিনিসপত্র খুলে খুলে খুব পরিষ্কার করছিল। তাতেই একটা শোকেসের নীচের তাক থেকে অনেক কাগজপত্রর সঙ্গে বেরোল। ইফ ইউ আর ইন্টারেস্টেড, তাহলে দেখাতে পারি।”

“অবশ্যই ইন্টারেস্টেড। এখন তো আপনি আস্তে আস্তে রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। তাহলে দুপুরে খাওয়ার পরে বসি? খালি আমি দেখে তো লাভ হবে না। আপনাকে একটু গাইড করে দিতে হবে।”

“শিওর শিওর। ওটাই বেস্ট টাইম। তাহলে লাঞ্চের পরে কথা হচ্ছে।”

পৃথ্বী রাই বিদায় নিয়ে চলে গেল। ফারুকের কফি প্রায় শেষ। তলানি যেটুকু পড়ে আছে, সেটা এখন জুড়িয়ে এসেছে। ফারুক আশা নিয়ে একবার ডাইনিং হলের দিকে তাকাল। সাতটা বেজে গেছে। এবার হয়তো সকালের চা দিয়ে যাবে। সে আবার ফোনের স্ক্রিনে ফিরে গেল।

ডঃ পালের জীবন নিঃসন্দেহে কৃতিত্বে ভরা। স্কুল থেকে মেডিক্যাল কলেজ— আগাগোড়াই একেবারে প্রথম সারির ছাত্র। আবার খেলাধুলো ও লেখালেখিও চালিয়ে গেছেন একইসঙ্গে, সেটাও যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে। বাংলার হয়ে দুই মরশুম রঞ্জি ট্রফি খেলেছেন; সেইসব খবরের কাগজের কাটিং আর সেপিয়া টোনের ছবি এখন ফারুকের মোবাইল স্ক্রিন জুড়ে। কাগজে অবশ্য তাঁর রাজনৈতিক জীবনের খবরও ঠাঁই পেয়েছে, বিশেষত ১৯৭০—এ একটি প্রতিবাদী মিছিলে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ায় যখন তিনি গ্রেপ্তার হন।

মেলে পাঠানো পরের অনেকগুলো ফাইল ডঃ পালের সম্পাদনায় বেরোনো তাঁদের দলীয় পত্রিকার পুরানো কিছু সংখ্যা। পত্রিকার নাম ‘মানুষ’। কয়েক পাতা উলটে দেখেই ফারুক বুঝল খুবই যত্ন নিয়ে বের করা বেশ সিরিয়াস পত্রিকা। ফাইলের ক্রমসংখ্যা দেখেই বোঝা যাচ্ছে একদম নিয়মিত বেরোত এবং ষাটের দশকের শেষ থেকে সত্তরের মাঝামাঝি অবধি সবকটাতেই ডঃ পালের নাম সম্পাদক হিসাবে দেওয়া; পরেরগুলোতে অতিথি সম্পাদক। মূলত দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা, তার পরিকাঠামো, চিকিৎসা সংক্রান্ত সরকারি নীতি ইত্যাদি বিষয়ক বিশ্লেষণধর্মী লেখা থাকলেও, সাহিত্য, সিনেমা, খেলাধুলো সব নিয়েই প্রবন্ধ আছে। তবে কোনোটাই লঘু, বিনোদনমূলক নয়।

ফারুক এরকমই একটা সংখ্যায় চোখ বোলাতে বোলাতে হঠাৎ চমকে সোজা হয়ে বসল। ১৯৭৮ সালের একটি সম্মেলনের রিপোর্ট। জলপাইগুড়িসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে প্রায় একমাসব্যাপী একটি ডাক্তারি ক্যাম্প সংঘটিত হয়েছিল। সারাদিন তাঁবু খাটিয়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা, তারপর বিকেলে দু—তিন ঘণ্টা করে আলোচনার ব্যবস্থাও থাকত। ওঁদের সংগঠন এবং সংগঠনের বাইরেরও চিকিৎসক, শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী তাতে অংশগ্রহণ করতেন। মানুষের সুবিধা—অসুবিধার ব্যাপারে আলাপ—আলোচনা। সন্ধ্যাবেলায় একটি গানের অনুষ্ঠান দিয়ে দিন শেষ হত। বেশ বড়ো রিপোর্ট এবং সেইসঙ্গে অনেক ছবি। কিছু ছবি হলদেটে হয়ে গেছে, আর তার উপর স্ক্যান করার জন্য কিছু জায়গায় অসমান আলো পড়েছে ঠিকই, কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। ফারুক আপাতত একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে একটি ছবির দিকে। সেই সম্মেলনেই তোলা পাঁচজনের গ্রুপ ছবি, যার মধ্যমণি অবশ্যই ডঃ সমীরণ পাল। ততদিনে তিনি দেশে—বিদেশে অত্যন্ত সম্মানিত একজন চিকিৎসক। তবে ফারুক তাকিয়ে আছে ডঃ পালের ডানদিকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে। একহারা চেহারার তরুণ, মাথায় কোঁকড়া চুল এবং হিপিদের মতো ঝুলে থাকা গোঁফ। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের ছবি হলেও, লোকটির চোখ এবং নাক দেখে ঠিকই চেনা যায়। আর চিনতে না পারলেও অসুবিধা নেই। ছবির নীচে খুবই যত্নসহকারে গ্রুপের প্রত্যেকের অবস্থান অনুযায়ী নাম দেওয়া রয়েছে। সেই নামও ফারুকের পরিচিত।

ফারুক ইমেল বন্ধ করে, এক চুমুকে তলানিতে পড়ে থাকা কনকনে ঠান্ডা কফি গলায় ঢেলে দিল। তারপর ওখান থেকেই প্রধানের নম্বরে ফোন করতে করতে, নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে হনহন করে হাঁটা লাগাল। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ফোন টানা রিং হয়ে কেটে যাওয়ায়, ফোন বিছানায় ছুড়ে ফেলে সোজা বাথরুম। দু’মিনিট পরে বেরিয়ে এল পুরোপুরি রেডি হয়ে। দরজায় ঠকঠক। পেমা এসেছে চা নিয়ে। ফারুক একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে পেমাকে বলল, “নীলে বলে দিও আমি ব্রেকফাস্ট করব না। একটু বেরোতে হবে।”

পেমা ঘাড় নেড়ে চলে যাওয়ার পর, চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে, ফারুক টেবিলে পড়ে থাকা একটা খোলা প্যাকেট থেকে দুটো বিস্কুট তুলে মুখে চালান করে দিল। প্রধান কলব্যাক করছে না। ফারুক আরও একবার তার নম্বরে চেষ্টা করল। একই অবস্থা, ফোন বেজে যাচ্ছে কিন্তু কোনো উত্তর নেই। এবার ধৈর্য হারিয়ে ফারুক মাঝ পথেই কেটে দিয়ে আর—একটা নম্বর টিপল। এবারে দুটো রিং হতেই ওদিক থেকে চেনা গলার আওয়াজ, “আরে স্যার চিন্তা করবেন না। ম্যাডামের পিক আপ কনফার্মড, একদম টপ প্রায়োরিটি!” জিতু বোধহয় সবসময়েই খোশ মেজাজে থাকে।

“সেজন্য ফোন করিনি। তুমি কি পাঁচ মিনিটে গাড়ি নিয়ে হোমস্টের সামনে আসতে পারবে?”

“দশ মিনিটে পারব।” ফারুকের গলার আওয়াজে নিশ্চয়ই এমন কিছু একটার আঁচ জিতু পেয়েছে, যে সে আর—একটিও কথা বাড়ায়নি।

আগামী পাঁচ মিনিটে ফারুক বাকি চা ও আরও দুটো বিস্কুট শেষ করে, জুতো মোজা পরে নীচে চলে এসেছে। পাছে কারওর সঙ্গে কথোপকথনে জড়িয়ে পড়তে হয়, তাই সে তড়িঘড়ি একদম মেন রোডেই নেমে এল। সবে সাড়ে সাতটা বাজে। মানুষজন বা গাড়িঘোড়ার চলাচল এখনও বেশ কম। তাই কানে আওয়াজ আসার অন্তত দশ সেকেন্ড পরে ডানদিক থেকে টার্ন নিতে দেখা গেল জিতুর জলপাই রঙের ওয়াগনআর। ফারুকের সামনে এসে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে, বিনা বাক্যব্যয়ে জিতু পিছনের দরজা খুলে দিল। উঠে বসার পর ফারুকের মুখ থেকে দুটো শব্দ বেরোল। “লাভা থানা।”

প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে গাড়ি থানার গেটে এসে থামল। গোটা রাস্তা ফারুক কোনো কথা বলেনি। রিয়ার ভিউ আয়নায় তার চেহারা দেখে জিতুও মুখ খোলেনি বা গান চালানোর চেষ্টা করেনি। গাড়ি থেকে নেমে থানায় ঢুকে প্রধানের খোঁজ করায় জানা গেল যে সে অনেক রাত অবধি কেশবের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে ভোরের দিকে বাড়ি গেছে। বেলা দশটার আগে তাকে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাতে অবশ্য ফারুকের কাজ আটকাল না। দু’মিনিট পর সে আবার যখন গাড়িতে উঠল, তার হাতে একটা ঠিকানা লেখা কাগজ। সেটা জিতুর হাতে চালান করতে, এই প্রথম সে মুখ খুলল।

“এর জন্য থানায় এলেন? আগে বলবেন তো!”

“তুমি বাড়িটা চেন?”

“আসলে স্যার, আমার এক দাদা পুলিশে আছে। কনটিনজেন্ট স্টাফ। ওর কনট্যাক্টেই আমি এখান থেকে কালিম্পং টাউন অবধি প্রচুর পুলিশের লোকদের ডিউটি করি। সেই করতে করতে এখন আমি প্রায় সবারই বাড়ি আর অফিসটা চিনে গেছি। এটা বেশি দূর নয়, জাস্ট বাজার ছাড়িয়ে।”

পাঁচ মিনিট পরে গাড়ি যেখানে থামল, সেখানে রাস্তার ধারে একটা সিঁড়ি। সেটা ধরে নীচে নেমে গেলে বাড়ির একতলার দরজা। তার একদিকে বেশ সেকেলে ইউরোপিয়ান ধাঁচের একটি আলোর শেড এবং তার নীচে কলিং বেল। ফারুক বেল বাজাল। কয়েক সেকেন্ড পরে দরজা খুলল। জিজ্ঞাসু চোখে দাঁড়িয়ে আছে একটি বছর তিরিশের স্থানীয় যুবক। পরনে বব মার্লের ছবি দেওয়া টি—শার্ট ও চেক চেক পাজামা।

“ডঃ প্রবীর সেন আছেন? একটু বলো যে ফারুক সিদ্দিকি দেখা করতে এসেছে।”

“ভিতরে চলে আসুন মিস্টার সিদ্দিকি।” ডঃ সেনের গলার আওয়াজ খুব ভারী না হলেও একটা স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য আছে।

যুবকটি আর—একটু বড়ো করে দরজাটা খুলে দিতে ফারুক ভিতরে ঢুকল। ঢুকেই একটা ছোটো করিডোর, যেটা গিয়ে শেষ হচ্ছে বৈঠকখানায়। ডানদিকে রান্নাঘরের দরজা আর তার পাশে সম্ভবত খাওয়ার ঘর। বাঁদিকে সোফা, টেবিল, বেতের চেয়ার ইত্যাদি দিয়ে বসার ব্যবস্থা। এইদিকটাই খাদের দিক হওয়ায় জানালা দিয়ে যথেষ্ট আলো ঢোকে। এদিকের দেয়ালে একাধিক ওয়াল ইউনিট জাতীয় আসবাব। তার বেশিরভাগই ঠাসা বইপত্র দিয়ে, শুধু কিছু কিছু তাকে দু—একটা মূর্তি ও ফ্রেমে বাঁধানো ছবি, আর মাঝে বড়ো খোপের ভিতর একটি আধুনিক এলইডি টিভি। বাড়ির মালিক আপাতত একটি বেতের চেয়ারে বসা। গায়ে পাজামা, পাঞ্জাবি ও একটি পাতলা শাল। সামনে টেবিলের উপর ব্রেকফাস্টের প্লেট, পাশে ভাঁজ করা খবরের কাগজ।

“প্লিজ বসুন। হঠাৎ কী মনে করে?”

“এই বাড়িটা কি আপনার?” ফারুক এখনও মাথা এদিক—ওদিক ঘুরিয়ে ঘরটা দেখছে।

“আজ্ঞে না। আমি এখানে ভাড়া থাকি আজ প্রায় বছর দশেক হবে। এই বাড়ির মালিক থাকেন কালিম্পঙে, মাঝেমধ্যে যখন আসেন, উপরের অংশে থাকেন। উনি একসময় এই অঞ্চলের কাউন্সিলার ছিলেন, তাছাড়া রেস্টুরেন্টের ব্যাবসা আছে। আমার নিজের বাড়ি রায়গঞ্জে।”

“সরি আপনার ব্রেকফাস্টের সময় এসে বোধহয় বিরক্ত করলাম।”

“আমি একা থাকাই পছন্দ করি। ফলে ভদ্রতা করে আপনাকে মিথ্যে কথা বলব না যে খাওয়ার সময় একটি সঙ্গী পেয়ে কৃতার্থ হয়েছি। তবে এটা নিশ্চিন্তে থাকুন যে খুব বিরক্ত করেননি। সাধারণত এর আগেই ব্রেকফাস্ট সারা হয়ে যায়। কাল বেশ রাত অবধি আপনাদের ওখানকার কেসটা নিয়েই কাজ করছিলাম। ফলে, ঘুমোতে আর উঠতে, দুই—ই দেরি হল।”

“কিছু ইন্টারেস্টিং জানা গেল?”

“একেবারে তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো তো নয়, অন্তত আমার চোখে। বাকিটা আশা করি আজ বিকেলের মধ্যেই জেনে যাবেন। রিপোর্ট পুলিশের কাছে পৌঁছে যাবে। কিন্তু আপনি সাতসকালে এতটা পথ পেরিয়ে নিশ্চয়ই এগুলো জানতে আসেননি?”

“না। আমি জানতে এসেছি যে আপনি কেন পুলিশকে জানাননি যে আপনি ডঃ নীলাদ্রি চক্রবর্তীর বাবা ও সম্ভবত তাঁর পরিবারকে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে চেনেন?” ফারুক পকেট থেকে ফোন বের করে ছবিটা খুলে টেবিলের উপর রাখল।

“পঞ্চাশ বছর ধরে চিনি বলাটা ভুল হবে। পঞ্চাশ বছর আগে চিনতাম। একদম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তাও প্রায় তিরিশ বছর হবে। আর নিজে থেকে কিছু বলিনি কারণ এরকম একটা কনভারসেশন হয়তো এড়াতে চাইছিলাম।”

“কেন এড়াতে চাইছিলেন জানতে পারি কি?”

“তার কারণ একগাদা তেতো, অপ্রীতিকর কথাবার্তা উঠে আসবে। যাদের নিয়ে উঠে আসবে তাঁরা কেউই আর ইহলোকে নেই। শেষজনও চারদিন আগে চলে গেছে। লাভের মধ্যে এক বা একাধিক দিন এই তিক্ততা নিয়ে আমাকে থাকতে হবে। আমার বয়সে এসে প্রত্যেকটা দিনের মূল্য অনেক। কিন্তু এসব আর ভেবে লাভ নেই। টু লেট! দরজায় আপনার গলার শব্দ পেয়েছি যখন, তখনই নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলেছি।”

“এক সেকেন্ড। আমি কিছু প্রশ্ন মাথায় নিয়ে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আপনার এই রিঅ্যাকশনটা আশা করিনি। বোঝাই যাচ্ছে, কিছু ব্যাপার আছে যেটা আমি জানি না। সেটা কি ডঃ পালের আত্মহত্যা নিয়ে? নাকি ওই সময় ঘটে যাওয়া অন্য কিছুর ব্যাপারে?”

“হয়তো সবকিছুই মিলিয়ে—মিশিয়ে। সমীরণদা আমার এবং আমার মতো অনেকেরই খুব কাছের মানুষ। শুধু কাছের নয়, আমাদের জীবনে তাঁর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাছে আমার মতো অনেকেরই রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের হাতেখড়ি হয়েছে। ভালো—মন্দের বিচার, কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারার ক্ষমতা, এই সবকিছুর পিছনে সমীরণদার বিরাট অবদান। এই বয়সেও আমার বলতে বিন্দুমাত্র বাধা নেই যে আজও সামাজিক জীবনে সব কাজ, সব সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ওঁকেই অনুসরণ করে চলেছি। ডাক্তার হিসাবেও, আর মানুষ হিসাবেও। কিন্তু আনফরচুনেটলি, ব্যক্তি জীবনের ক্ষেত্রে এই একই কথা আমি বলতে পারব না।”

“ফ্যামিলি লাইফ ভালো ছিল না?”

“নাহ। তবে ঝগড়া, অশান্তি, গৃহহিংসা এসবের কথা কিন্তু বলছি না। এই মানুষটা আসলে পারিবারিক জীবনের জন্য তৈরিই ছিল না। সেখানে এমন এক মহিলাকে ফস করে বিয়ে করে বসলেন যাঁর আবার আগে থেকেই একটি সন্তান আছে এবং সেই সন্তান ততদিনে খানিক বড়োও হয়েছে। নীলের বয়স তখন কত হবে? বছর দশেক তো বটেই।”

“আমার খবর অনুযায়ী এগারো।”

“ওরকমই। ফলে এই বয়সি ছেলের বাবা, অথবা সেই ছেলের মায়ের স্বামী— কোনো ভূমিকাই সমীরণদা ভালোভাবে পালন করতে পারেননি। করার চেষ্টাও করেননি এবং সেই বিষয়ে অন্যের পরামর্শ বা কোনো কথা একেবারেই কানে তোলেননি।”

“ছেলেরটা আমি কিছুই প্রায় জানি না, কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক তো যথেষ্ট ভালোই ছিল বলে মনে হয়। স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ায় যা অবস্থা হয়েছিল—”

“ওই তো! স্বামীর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য স্ত্রী থেকে রুগি হতে হল। সেটাই বলার চেষ্টা করছি। সমীরণদা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ব্যক্তি। মানুষ, মনুষ্যত্ব, মানবাধিকার এইসব ব্যাপারে তাঁর সহমর্মিতা ছিল। ঠিক যেমন, ডাক্তার হিসাবে রুগির ব্যাপারেও ছিল। কিন্তু পারিবারিক জীবনে কাছের মানুষদের নেগলেক্ট করা ছাড়া কিছুই করেননি। নীলের সঙ্গে সম্পর্ক প্রথম থেকেই বেশ নড়বড়ে ছিল, আগাগোড়া মায়ের অসুস্থতা জুড়ে সেই দূরত্ব কয়েক আলোকবর্ষে গিয়ে ঠেকেছিল।”

“কিন্তু ছেলেকে তো নিজে থেকেই ডাক্তারি পড়িয়েছেন।”

“আপনাকে দেখে এবং আপনার সঙ্গে কথা বলে তো আপনাকে বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ লোক বলেই মনে হয়। তাহলে আপনিও জানেন যে এই দিয়ে কিছুই বোঝা যায় না বা প্রমাণ হয় না। অন্তত বাপ—ছেলের সম্পর্কের ব্যাপারে।”

প্রবীর সেন একটু থামলেন। খানিক্ষণ সব চুপচাপ। নিজের প্লেট থেকে শেষ দু’টুকরো শসা তুলে মুখে দিয়ে চিবোতে গিয়ে হঠাৎ ফারুকের দিকে আবার ফিরলেন।

“এটা আমার খুবই অভদ্রতা হয়ে গেছে। আসলে বাড়িতে বিশেষ কেউ আসে না বলে লৌকিকতাগুলো মাথা থেকেই মুছে যেতে বসেছে। আপনি ব্রেকফাস্ট করেছেন?” ফারুকের এতক্ষণে পেটে একটা খিদে খিদে ভাব তৈরি হয়েছে। সে আর মেকি সৌজন্যতার মধ্যে না গিয়ে মাথা নাড়ল।

“তাহলে ব্রেকফাস্ট করবেন? এলাহি কোনো আয়োজন নয়, তবে ডাক্তারের বাড়ির ব্রেকফাস্ট। অন্তত স্বাস্থ্যহানি হবে না। টনি!”

বব মার্লে আবার এসে দাঁড়াল। ডঃ সেন তাকে স্থানীয় ভাষায় কিছু নির্দেশ দিলেন। যুবকটি সব শুনে মাথা নেড়ে টেবিলের এঁটো বাসনপত্র নিয়ে চলে গেল।

“এ আমার ম্যান ফ্রাইডে। খুবই কাজের ছেলে এবং তার থেকেও বড়ো কথা একেবারে চুপচাপ।”

টনির কর্মদক্ষতার প্রমাণ হাতেনাতে পাওয়া গেল। পাঁচ মিনিটের মাথায় একটা ট্রে নিয়ে এসে ফারুকের সামনে রাখল। কড়কড়ে সোনালি টোস্ট, দুটো জারে আলাদা ছুরি দেওয়া জেলি আর পিনাট বাটার এবং একটা ছোটো বাটিতে গোল গোল করে কাটা শসা, টমেটো আর সম্ভবত জলপাই। সঙ্গে দুটো ডিম— একটা সিদ্ধ, অন্যটা পোচ। একটা মাঝারি গ্লাসে লাল রঙের তরল।

“ওটা তরমুজের রস। আপত্তি থাকলে চা বা কফিও বলতে পারি।”

“নাহ, এটাই থাক। ফলের রস খাওয়াটা অভ্যাস করতে হবে। আমার মেয়ে বাড়িতে শুরু করেছে। মাঝেমাঝে আমাকেও জোরাজুরি করে। আপনার পরিবারে কেউ নেই?” ফারুক একটা টোস্টে পিনাট বাটার লাগিয়ে একটা কামড় দিয়ে বলল।

“স্ত্রী মারা গেছে প্রায় সাত বছর হতে চলল। আমার থেকে বয়সে চার বছরের বড়ো ছিল। এক ছেলে আছে, বম্বেতে থাকে। বিজ্ঞাপনে চাকরি করে, শুনি সবসময়েই সাংঘাতিক ব্যস্ত।”

“আপনি নীলাদ্রি আর তার বাবার সম্পর্ক নিয়ে বলছিলেন। নীলাদ্রির মা মারা যাওয়ার পর।”

“ও হ্যাঁ। তা মারা যাওয়ার পর আর কেন? আগেই বা কী এমন ভালো ছিল? সুপ্রিয়াদির বিয়ের পর ওরা যখন নতুন বাড়িতে, নতুন পাড়ায় উঠে এল, নীলের রেজাল্ট একটু খারাপ হতে শুরু করে। ব্যাস! হঠাৎ করে সমীরণদার মনে হল যেকরেই হোক, রেজাল্টের উন্নতি করতেই হবে। আমরা বলার চেষ্টা করেছিলাম, সুপ্রিয়াদি বুঝিয়েছিল, কিন্তু কে শোনে কার কথা! ছেলেটাকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দিল। যথারীতি অবস্থার আরও অবনতি হল। দু’বছর একই ক্লাসে কাটিয়ে যখন তৃতীয় বছরেও অবস্থা প্রায় একইরকম, তখন খানিক টনক নড়ল। আবার ফিরিয়ে আনল। চিন্তা করুন, একটা ছেলের দশ থেকে পনেরো বছর বয়সের মধ্যে তিনটে মেজর চেঞ্জ! যাইহোক, তাও একরকমভাবে নীল হাই স্কুলের দিকে এগোতে থাকল। কিন্তু বোঝা গেল যে ওর আসল প্রতিভা লেখাপড়ায় নয়, সংগীতে। দারুণ পিয়ানো বাজাত, অথচ কোনোদিন কারওর কাছে শেখেনি। ধর্মতলায় মিউজিকের শিট বিক্রি হত, কিনে আনত সেগুলো। তারপর, বাড়ির একটা টেবিলে যত্ন করে স্কেল পেনসিল দিয়ে পিয়ানোর রিডের ছবি এঁকে, তার উপর আঙুল চালিয়ে প্রাকটিস করে করে প্রথমে আয়ত্ত করেছে। পরে এক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে বাজাত। আমরা সবাই খুব উৎসাহ দিয়েছিলাম। কিন্তু নাহ। যেই ক্লাস টুয়েলভে উঠল, সমীরণদা সব বন্ধ করে দিলেন। আমরা সেদিন সত্যিই অবাক হয়ে গেছিলাম। উনি তো এরকম মানুষ নন, ওঁর কাছে শিক্ষা মানে তো শুধু ডিগ্রি নয়। শুনেছিলাম মিস্ত্রি ডাকিয়ে সেই হাতে আঁকা পিয়ানো রিড তুলে দিয়েছিলেন। একটাই যুক্তি ছিল, ছোটোবেলায় বাবা মারা গেছে বলে এই ছেলেকে কিছুতেই গোল্লায় যেতে দেবে না। সেদিন সত্যিই সমীরণদাকে একদম অচেনা মনে হয়েছিল।”

“মা কিছু বলেননি?”

“আসলে ততদিনে সুপ্রিয়াদিও অসুস্থ হতে শুরু করেছেন। মায়ের শরীর ভালো থাকলে নীলের রিঅ্যাকশন কী হত কে জানে! কিন্তু একইসঙ্গে দুটো ফ্রন্টে লড়ে যাওয়া বোধহয় ওইটুকু ছেলের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সে কী ভেবেছিল কে জানে, কিন্তু তার উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট খুবই ভালো হল। তার পরের বছরই ডাক্তারিতেও চান্স পেয়ে গেল। এই সবকিছুই নীল চুপচাপ করে গেছে, কিন্তু তার মনে সৎবাবার প্রতি কতটা ঘৃণা ছিল, সেটা অনেক পরে বুঝেছিলাম।”

“এটা কোন ঘটনার কথা বলছেন?”

“আপনি সমীরণদার মৃত্যু সম্পর্কে কী জানেন?” ফারুকের প্রশ্নের উত্তরে ডঃ সেন উলটে আর—একটা প্রশ্ন করে বসলেন।

“জানি বলতে, স্ত্রীর মৃত্যুর পর ওঁর সম্ভাব্য ডিপ্রেশন এবং ড্রিংকিংয়ের সমস্যার কথা জানি। এবং যদিও ভেরিফাই করতে পারিনি, কিন্তু শুনেছি যে কাজের জায়গায় আচরণ সম্ভবত এমন জায়গায় গেছিল যে হাসপাতাল অথরিটি ওঁকে বরখাস্ত করার কথা ভাবছিল। এই অবস্থায় গলায় দড়ি দেন।”

প্রৌঢ় ডাক্তার খানিকক্ষণ ফারুকের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলেন। ফারুকের মুখে শেষ টোস্টের একটা টুকরো। সেও না চিবিয়ে চুপ করে আছে। অবশেষে ডঃ সেন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

“তাহলে বাইরে থেকে জানেন। জানালা দিয়ে একটু দেখে, কিছুটা শব্দ শুনে কি আর ঘরের মধ্যে কী চলছে, পুরোটা বোঝা যায়?”

“আপনি ঘরের ভিতরেরটা জানেন? আপনি ছিলেন?”

“না, কিন্তু কেউ কেউ ছিল। তাঁরা চাইলে কিছু কথা বলতে পারতেন। কিন্তু সমীরণদা চলে যাওয়ায় হয়তো তাঁরাও ভেবেছেন অযথা এই অতীতকে খুঁচিয়ে কারওর কোনো লাভ হবে না। এখনও সেইসব কথার মধ্যে গিয়ে কি কোনো লাভ হবে?”

“হতেও তো পারে। আপনার কি কোনো কারণে আপত্তি আছে?”

“নাহ, আপত্তি আর কী? প্রথমেই তো বললাম, এই নাটকের সব কলাকুশলীরাই সম্ভবত মৃত। আমি পরলোকে বিশ্বাস করি না, ফলে তাঁদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকারও কোনো ব্যাপার নেই।”

“তাহলে ডঃ সমীরণ পালের মৃত্যুর ঘটনাটা একটু বলবেন? আমার হাতে পাজলের কয়েকটা টুকরো আছে, কিন্তু ছবিটা কিছুতেই সম্পূর্ণ হচ্ছে না।”

“ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯৪—এর কালীপুজোর রাতে। বাপ—ছেলে দু’জনেই তখন মহেন্দ্র রায়চৌধুরি মেমোরিয়াল হসপিটালে কাজ করছে। সমীরণদা সার্জারি বিভাগের হেড, আর নীল তো তখন উঠতি সার্জেন। সেই রাতে স্বাভাবিকভাবেই হাসপাতালে লোকজন খুবই কম। স্টাফ, ডাক্তার, সবাই ছুটি নিয়েছে। নীলের জীবনে বিশেষ বন্ধুবান্ধব নেই, সে রাতে ডিউটি দিয়ে যাচ্ছে। এই সময় এমার্জেন্সিতে একটি রুগি আসে। সম্ভবত একজন বয়স্ক মানুষ। গাড়ি চালাচ্ছিলেন, পিছন থেকে লরি এসে ধাক্কা দিয়ে দেয়ালের সঙ্গে পিষে দিয়েছে। হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে যখন তখনই শেষ অবস্থা, সত্যি কথা বলতে খোদ ঈশ্বর এলেও বাঁচাতে পারবে না। তাও ওটি—তে নিয়ে গিয়ে চেষ্টা শুরু হল। ওটি—র দায়িত্বে তখন নীলাদ্রি এবং এত কমপ্লিকেটেড কেস সে আগে হ্যান্ডেল করেনি। এর মধ্যে সমীরণদাকেও খবর দেওয়া হয়েছে। তিনি যতক্ষণে এসে পৌঁছেছেন, ততক্ষণে প্রায় সব শেষ। প্রত্যক্ষদর্শী স্টাফদের মতে নীলাদ্রির সামান্য এদিক—ওদিকে এমন একটা আর্টারি ছিন্ন হয়ে গেছিল, যে সমীরণদা এসে ঢোকার দু’মিনিটের মধ্যে লোকটি মারা যায়। মৃত্যুর ঠিকঠাক সময়, কারণ, অ্যাক্সিডেন্টের বিবরণ ইত্যাদি সহ রিপোর্ট জমা পড়ে। নীচে সমীরণদার সই এবং অবশ্যই ওই আর্টারি কেটে যাওয়ার কোনো উল্লেখ রিপোর্টে থাকে না।”

“তাহলে তো চুকেই গেল।”

“আজ্ঞে না। এই ঘটনার তিনদিন পরে, মানে ভাইফোঁটার পরের দিন একটা জরুরি বোর্ড মিটিং ডেকে দুই সার্জেনকেই হাজির থাকতে বলা হয়। সেখানে গভর্নিং বড়ির তরফ থেকে এই মৃত্যুর কারণ জানতে চাওয়া হয়। সমীরণদা রিপোর্টে যা যা লিখেছিলেন, প্রায় হুবহু সেই কথাই বলেন। তখন নীলের থেকে জানতে চাওয়া হয় সে একমত কিনা। নীল উঠে দাঁড়িয়ে বলে যে সে অপারেট করতে শুরু করেছিল, কিন্তু সেই সময় ডঃ পাল সার্জারির হেড হিসাবে এসে টেক ওভার করেন। তিনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন এবং তাঁর গাফিলতিতেই একটি বিশেষ আর্টারি ছিন্ন হওয়ার কারণে রুগির মৃত্যু হয়। এই ঘটনার যা পরিণতি হওয়ার তাই হয়। সমীরণদাকে ইমিডিয়েটলি তাঁর পদ থেকে সাসপেন্ড করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও সম্ভবত শুরু হয়। এর দু’দিন পর বাকিটা আপনার জানা।”

“নীলাদ্রির এই আচরণের কোনো ব্যাখ্যা?”

“সেই সময় মহেন্দ্র রায় চৌধুরি মেমোরিয়াল হসপিটালের গভর্নিং বডিতে সবাই ডাক্তার ছিল, দু’জন বাদে। এক হল সৌরিন রায় চৌধুরি, সে ওই পরিবারের লোক। অন্যজন একটি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, নাম দামোদর সিংঘানিয়া। শোনা যায় এই সিংঘানিয়াই নাকি নীলকে বলেছিল বয়ান বদলে ফেলতে। ওটি—র স্টাফদের সে আগেই ম্যানেজ করে ফেলেছিল। তখন থেকেই ওর প্ল্যান ছিল হেলথ কেয়ার বিজনেসে ঢোকার, আর নীলের ছিল বাপের প্রতি ঘৃণা আর অ্যাম্বিশন। যেই অ্যাম্বিশনও আবার নিজের নয়, বাপের থেকেই পাওয়া। হলও তাই; এমআরসি মেমোরিয়াল এই কেলেঙ্কারি থেকে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ওইদিকে ১৯৯৬ সালের নববর্ষের দিন ইস্টার্ন বাইপাসের ধারে বিরাট অত্যাধুনিক বিএমএসটি স্পেশাল ফেসিলিটি হসপিটাল উদ্‌বোধন হয়ে গেল। নীল নিজের নাম পালটে তার নিজের বাবার পদবি ব্যবহার করা শুরু করল, ডঃ নীলাদ্রি চক্রবর্তী। আমার সঙ্গে যোগাযোগও সেই শেষ হয়ে গেল। মাঝেমধ্যে এর—ওর মুখে খোঁজ পেতাম, ওইটুকুই।”

“কখনও অনুশোচনা করেননি?”

“করলেও অন্তত আমার কানে আসেনি। ব্যক্তিজীবনে কী করেছে না করেছে, সে তো আর আমি বলতে পারব না। তবে ওই সময় কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষ নীলকে সরাসরি এই ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিল। তাতে সে নাকি খুবই নির্লিপ্তভাবে বলেছিল, এটা নব্বইয়ের দশক এবং একমাত্র মূর্খ হলেই কেউ হাতে আসা সুযোগ পায়ে ঠেলবে। ফলে শুরুর দিকে কোনো অনুশোচনার তো লেশমাত্র নেই।”

প্রবীর সেন চুপ করলেন। ফারুকেরও খাওয়া শেষ। টনি এল প্লেট, গ্লাস ইত্যাদি নিয়ে যাওয়ার জন্য। নিস্তব্ধ ঘরে চিনেমাটির বাসনের শব্দ ঠং ঠং করে কানে বাজছে। ডঃ সেন চোখ বন্ধ করে মাথাটা আলতো এলিয়ে দিয়ে বসে আছেন। ফারুক একটা গলা খাঁকরানি দিল। “যদি কিছু মনে না করেন, একটা সিগারেট ধরাতে পারি?”

***

জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলেছে হোমস্টের পথে। ঘড়ির কাঁটা প্রায় সাড়ে দশটা ছুঁতে যায়। গাড়িতে হালকা ভলিউমে গান চলছে। ডঃ সেনের বাড়ি থেকে স্টার্ট দিয়ে খানিক দূর যাওয়ার পর জিতুকে দেখে ফারুকের একটু মায়া হয়েছিল। আমুদে ছেলেটা হাওয়া বুঝে একটু তটস্থ হয়ে আছে। ফারুক তাকে বলেছিল, ইচ্ছে হলে সে গান চালাতে পারে। তবে আজকে গানের তালিকাটা নেহাত খারাপ না, আর ভলিউম সে নিজে থেকেই একটু কমিয়ে রেখেছে। ফারুকের মাথাটা ঈষৎ কাত করে জানালার সঙ্গে ঠেকানো। তাঁর দৃষ্টি পাশের জঙ্গলের দিকে, কিন্তু সে কিছু দেখছে না।

এইবার মিলিয়ে ফারুকের এই পথে যাতায়াত বেশ কয়েকবারই হল। এখন আর রাস্তাটা ওরকম অন্তহীন মনে হয় না, কিছু কিছু জায়গা আস্তে আস্তে চেনাও হয়ে গেছে। প্রথমবার গিয়ে মনে হয়েছিল আগাগোড়া পথ খোয়া ফেলা, এবড়ো—খেবড়ো। এখন সে চিনে গেছে মাঝে কোন কোন জায়গায় রাস্তার অবস্থা একটু ভালো। এরকমই এক জায়গা দিয়ে যাওয়ার সময় সে জলের বোতল থেকে কয়েক ঢোক জল খেল। এত ব্যস্ততার মধ্যে রেডি হওয়ায় সে জলের বোতল নিয়ে বেরোতে ভুলে গেছিল। এটা কিনেছে ফেরার সময় লাভা বাজার থেকে। আরও কয়েকটা জিনিস দেখে পছন্দ হয়েছিল, বিশেষ করে রোকসানা আর মাহিরার কথা ভেবে। কিন্তু এই মানসিক অবস্থায় তার পক্ষে দরদাম করে জিনিস কেনা সম্ভব নয়, আর খামোখা সকাল সকাল ঠকে যেতে সে নারাজ।

“স্যার, কাল সকালের ব্যাপারে একটা কথা বলব? পরেও ফোন করে বলতে পারি।” জিতু এখনও কথা বলতে ইতস্তত করছে।

“না না, ফোনের দরকার কী? এখনই বলো।” ফারুক স্বাভাবিক গলাতেই বলল।

“বলছি কাল তো ম্যাডামের পিক আপ সকালের দিকে। সেখান থেকে তো যাওয়ার কথা রিশপ। আপনি যেহেতু সকালে যাচ্ছেন না, তাহলে ম্যাডামকে নিয়ে আপনাকে তুলতে একবার ঢুকে আবার বেরোতে হবে।”

“তোমার সাজেশন কী?”

“আমি বলছিলাম স্যার, আমার এক বন্ধু আছে রৌণক বলে। ও কাল গাড়ি নিয়ে মোটামুটি দশটা নাগাদ স্টার্ট দেবে কালিম্পং যাওয়ার জন্য। আপনি যদি ওর সঙ্গে লাভা চলে আসেন, তাহলে একটু সুবিধা হয়। আমরা আগে পৌঁছে গেলে, আপনার জন্য একটু ওয়েট করে যাব। আর আপনি যদি আমাদের আগে পৌঁছে যান, তাহলে আপনিও একটু ওয়েট করে যাবেন। খুব বেশি ওয়েট করতে হবে না। মোটামুটি একই সময়ে লাভা ঢুকে যাব।”

“বেশ তো, আমার কোনো আপত্তি নেই। যাওয়া নিয়ে কথা।”

“থ্যাংক ইউ স্যার, থ্যাংক ইউ! তাহলে আপনাদের আমি সাড়ে এগারোটার মধ্যে রিশপে নামিয়ে দিতে পারব। আমার আসলে একটা নাগাদ একটা কাজ পড়ে গেছে। ওটা এদিক—ওদিক করাটা মুশকিল হয়ে যেত।”

“না না, কোনো প্ল্যান চেঞ্জ করতে হবে না। আমি তোমার বন্ধুর সঙ্গে লাভা চলে আসব। তোমার কি কোনো সরকারি কাজ?”

“না স্যার। কাল দুপুরে আমার বিয়ের সাগাই, মানে হবু বউকে টিকা পরানোর সেরিমনি।”

আর যাই হোক, ফারুক এই উত্তর পাবে বলে আশা করেনি। একবার মনে হল জিজ্ঞাসা করে যে সে যদি রৌণকের গাড়িতে আসতে রাজি না হত তাহলে জিতু কী করত? নিজের সাগাইয়ে দেরি করে যেত? শেষ অবধি অবশ্য প্রশ্ন না করে ফারুক আবার জানালার বাইরে চোখ ফেরাল। চেনা গাছ, চেনা পাথর পেরিয়ে চেনা বাঁক; হোমস্টের মুখে নামিয়ে দিয়ে জলপাই ওয়াগন—আর হুশ করে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল একবারে আগামীকাল টাকার হিসাব করে নেবে।

ফারুক যখন সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, পিছন থেকে প্রতিভা ডাকল।

“আপনি তো তাড়াহুড়ো করে সকালে বেরিয়ে গেছেন শুনলাম। এখন খাবেন কিছু? বাবাকে বলব?”

“দরকার নেই, আমার পেট বেশ ভরতি। একবারে লাঞ্চ করে নেব। তবে এক কাপ চা পেলে খুব ভালো হয়, যদি অসুবিধা না হয়।”

“কোনো অসুবিধা নেই। আমিই করে নিয়ে আসছি।”

ঘরে ঢুকে জুতো খুলেই ফারুক বিছানায় গা এলিয়ে দিল, হাঁটু থেকে পায়ের বাকি অংশ মাটির দিকে ঝুলছে। চোখ বন্ধ, কিন্তু মাথা সজাগ। টুকরো টুকরো তথ্যগুলো দিয়ে একটা গোটা আখ্যান তৈরির চেষ্টা চলছে। নীলাদ্রির মৃত্যুর একটা সম্ভাব্য কারণ হিসাবে ধরা হল মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তারপর কলকাতায় বিভিন্ন সূত্র থেকে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল যে তার বাবা ডঃ পালও বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন এবং তাঁর মদের প্রতি আসক্তির দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। ডঃ পালের মৃত্যুর কারণ অবশ্য মদ্যপান থেকে শারীরিক অসুস্থতা নয়, আত্মহত্যা। ফারুক ভেবেছিল মদ্যপান ও আত্মহত্যা দুইয়েরই কারণ সম্ভবত তাঁর স্ত্রী, মানে নীলাদ্রির মায়ের মৃত্যু ও সেই থেকে মানসিক অবসাদ। কিন্তু আজকে জানা গেল যে ব্যাপারটা তার থেকেও জটিল— এখানে জড়িয়ে আছে এক বাপ ও ছেলের তিক্ত সম্পর্ক, যার শেষে আছে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

এদিকে নীলাদ্রির একদিন পরে পাওয়া গেল ঋজু দাশগুপ্তর লাশ। পিছন থেকে ছুরির আঘাতে খুন। ঋজুর পরিবারের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে নীলাদ্রির সঙ্গে, যেই ক্ষত সম্ভবত সবথেকে বেশি বয়ে বেরাচ্ছিল ঋজু নিজে। তাহলে কি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এই দুই মৃত্যুর ফলে ওই গল্পে যবনিকা পড়ে গেল? ঋজুর দিদির প্রতি হওয়া অন্যায়ের কি এখানে কোনো ভূমিকাই নেই? কারণ আর্থিক লাভের সম্ভাবনা ছাড়া, এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের পিছনে কারওর না কারওর সঙ্গে ঘটে যাওয়া কোনো অন্যায়ের ভূমিকা থাকে। এইখানে আর্থিক লাভের সূত্র বিশেষ জোরালো নয়, কারণ ঋজুর বাবা খুবই বৈষয়িক মানুষ। তিনি তাঁর সম্পত্তির বন্দোবস্ত বেশ আটঘাট বেঁধেই করেছেন। ঋজুর আচমকা মৃত্যুতে কেউই হঠাৎ করে বিশেষ লাভবান হচ্ছে না।

ফারুক একটা সিগারেট বের করে, কিন্তু না ধরিয়ে সেটা আঙুলের মধ্যে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল। হয়তো দোতলার আপাতত এই নিস্তব্ধতার জন্যই তার মনে হল কেশবের কথা। যদিও পুলিশকে প্রোটোকল অনুযায়ী কিছু কাজ করতেই হবে, নাহলে ফাইল ক্লোজ হয় না, কিন্তু ফারুকের ধারণা এই কাহিনিতে কেশবের আর বিশেষ কোনো ভূমিকা নেই।

“আপনার চা।”

বাইরে প্রতিভার গলা পেয়ে ফারুক উঠে গিয়ে দরজা খুলল। প্রতিভা ঘরে ঢুকে ট্রে থেকে চায়ের কাপটা নামিয়ে টেবিলে রাখল।

“আমার জন্য বেকার এক্সট্রা খাটতে হল!”

“আরে না না, এক কাপ চা আর কী এমন ব্যাপার।” তারপর, এক মুহূর্ত চুপ করে বলল, “আপনাকে একটা কথা বলার ছিল। গতকাল বলেছিলাম না, কলকাতায় একটা অর্গানাইজেশন আমাকে ইন্টার্নশিপের জন্য ডেকেছে? আমি ওদের রিপ্লাই করে দিয়েছি যে আমি সামনের মাসে জয়েন করব।”

“বাবা—মা কী বলছেন?” ফারুক চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিয়ে জিজ্ঞাসা করল।

“কিছু না। মানে, আমি এখনও বাড়িতে বলে উঠতে পারিনি। এমনিতেই একটা স্ট্রেস যাচ্ছে। ভাবছি পরিস্থিতি আর—একটু হালকা হলে তখন বলব। আপনাকে বললাম, কারণ কোনো একটা কারণে আপনার সঙ্গে কথা বলে আমার বোধহয় ডিসিশন নিতে একটু সুবিধাই হয়েছে। এর আগে তো কখনও এগুলো নিয়ে কারওর সঙ্গে কথা বলারও সুযোগ হয়নি। সো, থ্যাংকস।”

“ইউ আর ওয়েলকাম। এবং অবশ্যই গুড লাক!”

প্রতিভার নেওয়া সিদ্ধান্তটা শুনে ফারুকের ভালোই লাগছে। সেই সঙ্গে অবশ্য তার বাড়ির লোকের কী প্রতিক্রিয়া হবে বা হতে পারে, বিশেষ করে ডলির তো। এই ক’দিন ডলির ভাবগতিক থেকে বোঝা যাচ্ছে যে সে খুব সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। এমনিতেই পুত্রশোক যে আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি, সেটা তো মেয়ের মুখেই শোনা। এহেন অবস্থায় এই সিদ্ধান্ত ডলিকে নিঃসন্দেহে প্রাথমিক একটা ধাক্কা দেবে। সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার শক্তি আর অবশিষ্ট আছে কিনা, সেটাই দেখার। কিন্তু তাই বলে কোনো সন্তান তার জীবন ও যৌবনের সমস্ত সম্ভাবনা জামিন রেখে দেবে বাবা—মায়ের সাচ্ছন্দ্য ও শান্তির খাতিরে, এই কথা ফারুক একেবারেই মেনে নিতে পারে না।

গত কয়েকদিনে ফারুক যেইসব মানুষের সংস্পর্শে এসেছে এবং যা যা ঘটনার সাক্ষী থেকেছে, সেখানে কাকতালীয়ভাবে এই বাবা—মায়ের অপত্য স্নেহ ও সন্তানের নিজের ইচ্ছাঅনিচ্ছার বিষয়টা যেন বারেবারে ফিরে এসেছে। ডঃ পাল তাঁর ছেলেকে ডাক্তারি পড়াতে চেয়েছেন, পড়িয়েওছেন। কিন্তু বিনিময়ে ছেলেকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন। তিনি কি আদৌ এই দূরত্ব টের পেয়েছিলেন, না তার আগেই তাঁকে চরম মূল্য দিতে হয়? সম্ভবত একইরকম জোর খাটিয়ে ঋজুর বাবাও ছেলেকে ব্যাবসায় টেনে আনতে চেয়েছিলেন। ঋজু সেই শিকল ছিঁড়ে বেরোতে সক্ষম হয়েছিল, নিজের জীবন নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগও তৈরি হয়েছিল। সেই জীবন যেমন নিষ্কলঙ্ক নয়, তেমন খুব তাড়াতাড়ি শেষও হয়ে গেল। এই দুইয়ের কি কোনো যোগাযোগ আছে? এবং অবশেষে ডলি রাই। ছেলেকে ঘরের কাছে নিজের পছন্দের বিষয় চর্চা করার সুযোগ না দিয়ে কোনো এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় তাকে দূরে পাঠালেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। এই ক্ষেত্রে বোধহয় ভাগ্য সবথেকে নির্মম। ডলি আজও পুত্রশোক আর অনুতাপে জর্জরিত হয়ে মেয়েকে কোনোমতে আঁকড়ে ধরে আছে। কিন্তু প্রতিভাকে এখান থেকে বেরোতেই হবে, এগোতে হবে সম্ভাবনার দিকে। ফারুককেও করতে হয়েছিল, একদম কিশোর অবস্থায়। তখন মন ভেঙে গেছিল, আজ আর কোনো অনুশোচনা নেই।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে ঘড়ি দেখল, সোয়া দুটো বাজে। ফারুক একটু ধড়মড় করেই উঠল। শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে দু’চোখের পাতা এক হয়ে গেছে, খেয়ালও করেনি। বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে ভাবল, একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সবার খাওয়া শেষ, কারওর সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ঘর থেকে বেরোবার আগে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল প্রধানের দুটো মিসড কল। ফারুক কলব্যাক না করে, নীচে যেতে যেতে একটা মেসেজ করল যে একেবারে বিকেলের দিকে ফোন করে কথা বলে নেবে।

খেতে বসার সময় আশেপাশে আর কাউকে দেখা গেল না। আজকে ডালের সঙ্গে একটা নতুন পদ হয়েছে, যেটা ফারুকের অচেনা। খুব সম্ভবত স্থানীয় কোনো শাক শুকিয়ে নিয়ে তারপর কাঁচালংকা বাটা এবং সামান্য পোস্ত ছড়িয়ে দিয়ে একটু মুচমুচে করে ভাজা। ফারুক দু’বার চেয়ে খেল, আর মনে মনে ঠিক করল এটার রেসিপিটা জেনে নেবে। হঠাৎ একটা গানের শব্দ কানে আসায় ফারুক ঘাড় ঘোরাল। ডাইনিং হলের বাইরে সিঁড়ির ধাপের কাছে কৃতিকা দত্ত একটি মোবাইল ফোনে গান চালিয়ে খুব মন দিয়ে হাত—পা ছুঁড়ে নাচছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে তার উলটোদিকে আর—একটা মোবাইলে ক্যামেরা অন অবস্থায় সেটাকে ব্যালেন্স করে একটা রেলিংয়ের উপর দাঁড় করানো আছে। সেখানে গোটা নাচের দৃশ্য রেকর্ড হচ্ছে। ফারুকের ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লাগল— কৃতিকা সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য রিল বানাতে ব্যস্ত। খাওয়া যখন প্রায় শেষের দিকে, রান্নাঘর থেকে পৃথ্বীকে বেরোতে দেখা গেল। মুখে তার পরিচিত পাইপ, দু’হাত দিয়ে তামাকের প্যাকেটের জন্য পকেট হাতরে যাচ্ছে। ফারুক দেখতে পেয়ে ডাক দিল, “আপনি ফ্রি হলে বলবেন। ছবিগুলো দেখব।”

পৃথ্বী তামাকের প্যাকেট খুঁজে পেয়েছে, সে এক চিমটি তামাক নিয়ে মন দিয়ে পাইপে ভরতে ভরতে মাথা নাড়ল। তামাক ঠুসে, পাইপে আগুন ধরানো হল। তারপর একটা বড়ো টান দিয়ে অনেকটা ধোঁয়া ছেড়ে পৃথ্বী উত্তর দিল, “কোনো চিন্তা নেই। এখানেই এনে রেখেছি। আপনি খেয়ে উঠে হাত—মুখ ধুয়ে নিন। আমি এখানেই আছি।”

ফারুকের খাওয়া আর বাইরে কৃতিকার রিল বানানো প্রায় একই সময়ে শেষ হল। বাইরে বেসিনে যখন হাত ধুতে এল, তখন চারদিক আবার শান্ত আর চুপচাপ হয়ে গেছে। পৃথ্বী সিঁড়িতে বসে একমনে পাইপ টেনে যাচ্ছে। উপরে আকাশ একদম ঝকঝকে নীল, আশেপাশের জঙ্গল জলে ধোয়া সবুজ। নীচের দিকে ছড়িয়ে—ছিটিয়ে থাকা পাহাড়ি গ্রাম এখন ভাতঘুমে আচ্ছন্ন। ট্যুরিজম বিভাগের ওয়েবসাইট বা ব্রোশিওরে যেরকম ছবি দেখা যায়, সেগুলো হয়তো এরকম দুপুরেই তোলা হয়। ফারুক রুমাল দিয়ে মুখ মুছে, একটা সিগারেট ধরিয়ে পৃথ্বীর পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

“এখানেই বসবেন, নাকি ভিতরে?”

“এখানেই বসি, যদি আপনার আপত্তি না থাকে। এরকম দুপুরবেলা তো আর কলকাতায় পাই না।”

খানিকক্ষণ আবার চুপচাপ। পাইপ আর সিগারেটে তামাক পুড়ে ছাইয়ের ছোটো স্তূপ মাটিতে জমছে। চোখ বুজে শেষ কিছু টান দিয়ে, পাইপটা উলটো করে মাটিতে ঠকঠক করে কয়েকবার ঠুকে, সেটা আবার পকেটে চালান করে ডাইনিং হলের দিকে পৃথ্বী উঠে গেল। একটু পরেই যখন ফিরে এল, তার হাতে দুটো প্যাকেট। একটা প্যাকেট, যেটা দেখলেই বোঝা যায় বহু পুরানো, সেটার মধ্যে বড়ো চৌকো জিনিস রাখা আছে। অন্য প্যাকেটটা পোঁটলার মতো করে বাঁধা। সেটা নামিয়ে রাখার সময় ভিতরে ঝনঝন শব্দ হল। সেটার দিকে দেখিয়ে পৃথ্বী বলল, “আমাদের বাড়ির কিছু পুরানো রুপোর প্লেট। কোনো সময় হয়তো পুজোর কাজে ব্যবহার হত। ডলি অনেক কিছুর সঙ্গে এগুলোকেও খুব ঘষে—মেজে পরিষ্কার করেছে, দু—তিনবার করে। তারপর আমাকে হুকুম করে গেছে যাতে ভালো করে শুকিয়ে সবকটা গুনে গুনে নিয়ে যাই!”

“আর এটা সেই অ্যালবাম?”

“ইয়েস! আমার হিস্ট্রি বুক। হাঃ হাঃ হাঃ! প্যাকেটটা একটু ধরবেন?”

পৃথ্বী খুব সাবধানে অ্যালবামটা বের করে দুই হাঁটুর উপর রেখেছে। জিনিসটা আন্দাজ এক ফুট বাই দেড় ফুট সাইজের লম্বাটে আঁকার খাতার মতো। কালো রঙের হার্ডকভারের উপর চারদিকে মার্জিন এবং মাঝে ইংরেজিতে লেখা আছে ফটো অ্যালবাম। আপাতত বাঁধাই বেশ আলগা হয়ে এসেছে। অ্যালবামটা খুললে কালো চার্ট পেপারের মতো পাতা, যেখানে ফটোগ্রাফের সাইজমতো চারকোনায় চারটে জায়গা ছোটো করে কাটা আছে। ছবিগুলো নিয়ে চারকোনা ধরে ওগুলোর মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে। এক এক পাতায় চারটে ছবির জায়গা হবে। পরপর দুটো পাতার মাঝে ট্রেসিং পেপারের মতো কাগজ দেওয়া।

অ্যালবাম খুলেই বাঁদিকে, অর্থাৎ ছবি শুরু হওয়ার আগেই একটা বড়ো ইংরেজি কাগজের খবর কেটে আঠা দিয়ে লাগানো আছে। খবরের সঙ্গে একটা বড়ো ছবি। ইস্টবেঙ্গলের জার্সি গায়ে তরুণ পৃথ্বী রাই তিনজন মোহনবাগানের ডিফেন্ডারের মধ্যে থেকে লাফিয়ে উঠে হেড দিয়ে বল জালে পাঠাচ্ছে। উপরে শিরোনামে লেখা আছে ‘Prithvi Rai’s East Bengal head toward final’। ফারুক ঝুঁকে পড়ে একবার খবরটাতেও চোখ বুলিয়ে নিল। ১৯৯৫ সালের টাইমস অফ ইন্ডিয়ার খবর।

প্রথম দিকের কিছু পাতা উলটে একটি বিশেষ জায়গায় গিয়ে পৃথ্বী থামল। তার আঙুল একটা ছবির উপর। খেলা শুরুর আগে গোটা দলের ছবি। নীচে একটা ছোটো কাগজের লেবেল সাঁটানো— এরিয়ান্স, ১৯৯২/৯৩। সামনে পাঁচজন খেলোয়াড় মাটিতে আধ বসা, আর পিছনে ছ’জন সার বেঁধে দাঁড়িয়ে। পৃথ্বী অ্যালবামটা খানিক এগিয়ে দিল ফারুকের দিকে। “দেখুন তো কাউকে চিনতে পারেন কিনা?”

ফারুক একটু খুঁটিয়ে দেখার সময় নিল। যাঁদের দেখতে পাবে বলে আশা করছে, তাঁরা সবাই ফারুকের থেকে অন্তত বছর দশেকের বড়ো। তাঁদের ফারুক দেখেছে মধ্যবয়সি সিনিয়ার অফিসার হিসাবে। সেই চেহারার কোনো ইঙ্গিত এই ছবিতে পাওয়া নেহাত সহজ কাজ নয়। সামনে বসা একজনের মুখের আদল দেখে চেনা চেনা লাগছিল। তারপর হঠাৎ করেই পিছনে একদম এক ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝারি হাইটের খেলোয়াড়ের উপর আঙুল রাখল। “তন্ময় বণিক, তাই তো?”

“কারেক্ট। আমার খাস পার্টনার! যেমন স্কিল, তেমন স্পিড। তখন একদম রোগা পাতলা চেহারা ছিল। পারলে ডিফেন্ডারের পায়ের ফাঁক দিয়েও গলে বেরিয়ে আসত!”

“তাই দেখলাম। আমি যতদিনে অফিসে দেখেছি, চেহারা পুরো বদলে গেছে। তার মধ্যে হাইট যেহেতু খুব বেশি নয়, আরও মোটা লাগত। সত্যি কথা বলতে, আমি চিনতে পারলাম চুলটা দেখে। তখন থেকেই পাতলা হয়ে কপালটা বড়ো হতে শুরু করেছে। বোঝা যাচ্ছে, কয়েক বছরের মধ্যেই টাক পড়ে যাবে।”

“দাঁড়ান, আর—একটা ছবি দেখাই।” পৃথ্বী আরও বেশ কিছু পাতা উলটে আর—এক জায়গায় এসে থামল। এখানেও পাতাজুড়ে ওই কাগজের কাটিংটার মতো খেলা চলাকালীন নানা মুহূর্তের ছবি।

“এটা গোয়ার সঙ্গে শিল্ড সেমিফাইনাল। দিল্লিতে খেলা ছিল। এই ছবিটা দেখুন, আপনাদের অফিসের দু’জনকে দেখতে পাবেন— রঞ্জন আর গিরিশ। সেদিন আমার আর রঞ্জনের কম্বিনেশনের সামনে ওরা দাঁড়াতে পারেনি। টেলিপ্যাথির মতো হয়ে গেছিল, ম্যাজিক। প্রত্যেক মোমেন্টে আমরা কে কোথায় দাঁড়িয়ে, একজন অন্যজনের থেকে কত দূরে, একটা ডিসট্যান্স দৌড়ে আসতে কতক্ষণ লাগবে, সব অঙ্কের মতো মিলে যাচ্ছিল। এটা সেকেন্ড গোল হওয়ার জাস্ট আগে। আমাদের সেন্টার ব্যাক ছিল দেবাশীষ, একটা থ্রু পাস দিয়েছিল গিরিশের দিকে। গিরিশ আড়চোখে পিছনে আমাকে দেখতে পেয়ে বলের দিকে ছুটে গিয়েও বল না ছুঁয়ে জাস্ট বেরিয়ে গেল। রিসিভ করলাম আমি, কিন্তু ততক্ষণে আমাকে ঘিরে চারজন। আমি বলটা লব করে আবার গিরিশের কাছে ফেরত দিলাম, স্রেফ দু’সেকেন্ডের জন্য ধরে রাখতে। অপোনেন্ট তখন সবে গিরিশের দিকে চোখ ফিরিয়েছে। আমি একটা গ্যাপ পেয়ে ওখান থেকে দু’পা বেরিয়ে ওর থেকে বল নিয়েই বক্সে শট। আর এই সবের মধ্যে রকেটের মতো বক্সে ঢুকে এসেছে রঞ্জন। আমার পাঠানো বল না নামিয়ে, ভলিতেই সোজা গোলের মধ্যে। টপ লেফট হ্যান্ড কর্নার। এটা রঞ্জনের সেই দৌড়ের ছবি।”

পৃথ্বীর কথা শুনতে শুনতে ফারুকও খানিক মগ্ন হয়ে গেছিল। ধারাভাষ্যের মতো অতীতের খেলার বিবরণ দিয়ে যাচ্ছে প্রৌঢ় মানুষটি। কিন্তু গলার আওয়াজে টগবগ করছে যৌবনের উদ্দীপনা আর উৎসাহ। এই ক’দিনের দেখা পৃথ্বী রাইয়ের সঙ্গে এর অনেক তফাত। এই মানুষটি খেলা থামিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আসলে রিটায়ার করেনি। তার আশেপাশের চলমান দৈনন্দিনতার থেকে এই পাতাগুলোয় আটকানো স্থিরছবি পৃথ্বীর কাছে অনেক বেশি বাস্তব। সে ওখানেই বেঁচে আছে, পাশের মানুষটি তার একটা ছায়ামাত্র। আজ দুপুরে এই অ্যালবাম নিয়ে না বসলে আসল পৃথ্বী রাইয়ের সঙ্গে প্রকৃত অর্থে আলাপই হত না।

দু’জনে আরও মিনিট পনেরো বসে ছিল। পরবর্তীকালে পুলিশে চাকরি করেছে এরকম লোক ছাড়াও বেশ কিছু বিখ্যাত মানুষের ছবি রয়েছে এই অ্যালবামে। দেশের রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার নেওয়ার ছবি, একটি চ্যারিটি ম্যাচে বহু ফিল্মস্টারের ছবি এবং পৃথ্বীর কাছে সবথেকে মূল্যবান ছবি— ইটালিতে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে, কিংবদন্তি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার সক্রেটিসের সঙ্গে হ্যান্ডশেক। ফারুক আশা করেছিল পৃথ্বী নিশ্চয়ই এই ছবিটা নিয়ে অনেক গল্প বলবে। কিন্তু সে খানিক চুপ করে থেকে ছবির উপর শুধু দু’বার আঙুলের টোকা দিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “মাই হিরো”।

ফারুক যখন পৃথ্বীর থেকে বিদায় নিয়ে উপরে উঠে এল তখন প্রায় সাড়ে তিনটে বাজে। ঘরে তালা খুলতে গিয়েও মত বদলে, সে একটা চেয়ার নিয়ে বারান্দাতেই বসল। এখানে বসে যেমন মেঘে ঢাকা, বৃষ্টি ভেজা কোলাখাম দেখেছে, তেমন রোদ ঝলমলে কোলাখামও সে উপভোগ করতে চায়। এইবেলা প্রধানকে ফোনটা করে নিলেও হয়। সে কি নতুন কোনো খবর জোগাড় করতে পেরেছে? দু—তিনবার বাজার পরে ফোনে উত্তর মিলল।

“হ্যাঁ বলুন। আপনি সকালে যখন ফোন করেছিলেন, আমি বাড়িতে গেছিলাম ঘুমোতে।”

“শুনলাম। আপনার তো সারারাত থানাতেই কেটেছে। কোঠারির থেকে আর কিছু জানা গেল?”

“নট মাচ। ওর জালি কারবার নিয়ে কিছু কথা বলল। কিন্তু সেগুলো এখানে খুব রেলিভ্যান্ট বলে মনে হয় না। আপনি হঠাৎ ডঃ সেনকে খুঁজছিলেন কেন? কিছু ডেভেলপমেন্ট আছে?”

যতটা সংক্ষেপে সম্ভব, ফারুক সকালের ঘটনাটা গুছিয়ে বলল। প্রধান যে খুব উৎসাহিত হল, সেরকম মনে হল না। মুখে বলল, “এটা বড়ো কোইন্সিডেন্স। উনি আমাকেও কিছু বলেননি। আবার বুঝতেও পারছি কেন চুপ থাকা প্রেফার করেছেন। গোটা ব্যাপারটাই এত আনসেভারি— যাইহোক, আপনার অবজার্ভেশন কী? বা ওপিনিয়ন?”

“ইমিডিয়েটলি পারস্যু করার মতো কোনো ক্লু যে এখান থেকে পাচ্ছি, সেরকম নয়। তবে চিকিৎসার গাফিলতি বা দুর্নীতির বাইরেও নীলাদ্রির জীবনে যে আরও বড়ো দাগ আছে, তার হাতে যে আরও ক্ষতি হয়েছে, অপরাধ হয়েছে, সেটা পরিষ্কার হল। এখান থেকে একটা মোটিভ বেরিয়ে আসে।”

“রিভেঞ্জ? এতদিন পরে? কে করতে পারে?”

“এতদিন পরে কেন, পৃথিবীতে এর থেকেও বেশি দেরিতে অনেক রিভেঞ্জের ঘটনার নজির পাওয়া যাবে। ঘৃণা বা বিদ্বেষ খুব পাওয়ারফুল ফ্যাক্টর। আর সন্দেহ এই মুহূর্তে কারওর উপর নেই। ফ্র্যাংকলি, সবথেকে লাইকলি ক্যান্ডিডেট ডঃ সেন নিজেই। নীলাদ্রির বাবার ক্লোজ ছিলেন, গোটা ঘটনা কাছ থেকে দেখেছেন, ডাক্তার হিসাবে বিষ বা যে—কোনো সাবস্ট্যান্সের রিঅ্যাকশন সম্পর্কে নলেজও থাকার কথা।”

“সরি, আপনাকে ইন্টারাপ্ট করছি। ডঃ সেন কিন্তু সেদিন সকালেই কালিম্পং থেকে ফিরেছিলেন। ওখানে একটা পার্টি ছিল। সেটা অ্যাটেন্ড করেছেন, প্রচুর লোক সেটার সাক্ষী ইনক্লুডিং আমার দুই সিনিয়ার অফিসার।”

“আরে, আমি কিন্তু সত্যিই ওঁকে সন্দেহ করছি না। সেটা খুবই অবভিয়াস হয়ে যাবে। আমি একটা প্রোফাইলের কথা বললাম। এটা নিয়ে আর—একটু চিন্তা করব, দেখি কিছু আইডিয়া আসে নাকি।”

“ওকে। এদিকে আর কিছু ইন্টারেস্টিং বা রেলিভ্যান্ট না পেলে আজকে সন্ধ্যার পর কোঠারিকে রিলিজ করে দেব। আপনি কি এদিকে আসবেন?”

“সে যেতেই পারি। কাজ তো কিছু নেই। কথা বললে, আলোচনা করলে, অনেক সময় খুব হেল্প হয়।”

“একজ্যাক্টলি! ওহ, বাই দ্য ওয়ে, নীলাদ্রি চক্রবর্তীর টক্সিকোলজি রিপোর্ট এসেছে। আউট অফ অর্ডিনারি বলতে কিছু ঘুমের ওষুধের ট্রেস পাওয়া গেছে, কিন্তু সেটা খুব একটা বেশি মাত্রায় না। এত বিজি, স্ট্রেসফুল লাইফ যেসব লোকদের, তাদের জন্য খুবই নর্মাল। এর বাইরে দু—একটা অন্যান্য কম্পাউন্ড যেগুলো নানারকম ওষুধে থাকে। একটা গোটা লিস্ট আছে, চাইলে আপনাকে পাঠিয়ে দিতে পারি। বাট নাথিং দ্যাট ক্যান বি ক্লাসিফায়েড অ্যাজ পয়জন। শরীরে কোথাও বিষের কোনো চিহ্ন নেই।”

“বুঝলাম। তাহলে আবার একটু ভেবে দেখতে হবে।”

“ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব? আপনি এটা ধরেই এগোচ্ছেন কেন যে ডঃ চক্রবর্তীর মার্ডার হয়েছে? যেখানে ঋজুর কেসটা আরও ডিরেক্ট আর অবভিয়াস?”

“এখনই পুরোটা আমি খুব গুছিয়ে বলতে পারব বলে মনে হয় না। এগুলো হাঞ্চ, যার পিছনে যৌক্তিক কারণ হয়তো সবসময় পাওয়া যায় না, কিন্তু আপনি আমি দু’জনেই জানি এগুলো কীরকম এফেক্টিভ হয়। তাই আমার এই হাঞ্চটা ব্যাখ্যা করতে পারব না। এর বাইরে একটা কারণ বলতে পারি যে কেন ভাবছি ঋজুর খুনটা সেকেন্ডারি। হোমস্টেতে নীলাদ্রি আসার একদিন আগে থেকে ঋজুরা এসে ছিল। ঋজু মেন টার্গেট হলে এই দু’দিনে তাকে খুন করা যেত। তা না করে প্রথম মৃত্যু, এখনও খুন বলছি না, হওয়ার পরে যখন গোটা হোমস্টের উপর পুলিশের নজর, বেছে বেছে তখনই কেন খুন করতে হবে? আমার কাছে এর একটাই উত্তর। খুন করতেই হত, নাহলে বিপদ। এটা কারওর একটা মরিয়া প্রচেষ্টা এবং এতটা মরিয়া মানুষ একমাত্র বাঁচার জন্য করে। এখানে কীসের হাত থেকে বাঁচার প্রশ্ন উঠতে পারে? পুলিশের হাতে ধরা পড়া? আইনি সাজার আওতায় চলে আসা? সেখান থেকেই আমার আরও বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে যে এর আগের মৃত্যুও স্বাভাবিক নয়, খুন। কীভাবে, সেটা এখনও ভেবে উঠতে পারিনি। আশা করছি শিগগিরই একটা সূত্র বেরোবে।”

ফোন রেখে দেওয়ার পরও কথোপকথনের রেশ মাথায় ঘুরছে। নীলাদ্রির শরীরে যেহেতু আর কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, তার মানে তাকে কোনো অস্ত্র দিয়ে মারা হয়নি। মানে গতানুগতিক মার্ডার ওয়েপনের ধারণা যেরকম— বন্দুক, ছুরি বা অন্য ধারালো বস্তু, অথবা ভারি কোনোকিছু দিয়ে শরীরের বিশেষ জায়গায় বাড়ি মারা। এর বাইরে পড়ে থাকে বিষপ্রয়োগ কিন্তু টক্সিকোলজি রিপোর্ট সেই সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়ায় ফারুক একটু যেন মুষড়েই পড়েছে। প্রধানের কথা শুনে মনে হল সে হয়তো ঋজুর খুনটা নিয়েই বেশি মাথা ঘামাচ্ছে। সেটা একদিক থেকে ভালো। দুটো আলাদা মাথা দুটো ভিন্ন বিষয় অনুসন্ধানে লিপ্ত। এটাই বরং রিসোর্সের সঠিক ব্যবহার।

কিছুক্ষণ ধরেই একটা ব্যাপার নিয়ে ফারুকের মনের এক কোনায় খচখচ করে যাচ্ছে। নীলাদ্রি বা ঋজুর ঘটনার মধ্যে বারেবারে পৃথ্বীর অ্যালবামের চিন্তা ঢুকে আসছে। অত্যন্ত অস্বস্তিজনকভাবে সে কিছুতেই কারণটা ধরতে পারছে না। কোনো বিশেষ ছবি কি? সে কিছু একটা দেখেছে কিন্তু মন দিয়ে লক্ষ করেনি। এখন কিছুতেই আর সেটা চিন্তায় ধরা দিচ্ছে না। এ তো আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেল! এরকম মাঝে মাঝেই ছোটোখাটো ব্যাপার নিয়ে হয়। একটা বিজ্ঞাপন দেখে বা শুনে, সেটার সুরটা হয়তো চেনা চেনা ঠেকল। তারপর সারাদিন ধরে মাথার ভিতর ঘুরপাক খায়, কিন্তু সেই সুর কোথাকার বা তার সঙ্গে কোন স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সেটা কিছুতেই মনে পড়ে না।

ফারুক জোর করেই অ্যালবাম বিষয়ক চিন্তা মাথা থেকে ঠেলে দূর করে, নীলাদ্রির ব্যাপারে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করল। কিন্তু নাহ! বারবার সেই অস্বস্তিজনক খচখচানিটা থেকেই যাচ্ছে। তার অফিসের সিনিয়ার লোকজনের বাইরে আরও কি কারওর ছবি ওখানে ছিল, যেটা ফারুক দেখেনি বা দেখে চিনতে পারেনি? আর তা যদি হবেও বা, সেটা এখন মাথার ভিতর খোঁচাতে থাকছে কেন? তাহলে কি ছবি দেখতে দেখতে পৃথ্বী তাৎপর্যপূর্ণ কিছু একটা বলেছে, যেটা সেই মুহূর্তে ফারুক অতটা আমল দেয়নি? সে প্রাণপণে ঘটনাক্রমটা আবার ভাবার চেষ্টা করল। দু’জনেই ডাইনিং হলের বাইরে ধূমপান করছিল। পৃথ্বী গিয়ে অ্যালবামটা নিয়ে এল, সঙ্গে ডলির কিছু জিনিস। ওরা ছবি দেখতে বসেছে আর পৃথ্বী আগাগোড়াই ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড ও বিবরণ দিতে দিতে গেছে। কলকাতার ফুটবলের, পুলিশে চাকরি পাওয়া খেলোয়াড়দের এবং পৃথ্বীর বিভিন্ন বিখ্যাত মানুষদের সংস্পর্শে আসার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা হয়েছে। তারপর সে আবার অ্যালবামটা যত্ন করে প্যাকেটে মুড়ে বাড়ির দিকে চলে গেছে।

মনে পড়েছে!

ফারুক চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। একটা অতি সামান্য ডিটেল। চোখের সামনে ছিল, কিন্তু সেদিকে মন ছিল না। পাজলের টুকরো বোধহয় সবকটাই জায়গামতো পড়ে গেল। ফারুক চোখের সামনে ঝড়ের বেগে সিনেমার মতো সবটা দেখতে পাচ্ছে। না, পুরো ছবি নয়। তবে নিঃসন্দেহে ছবির ট্রেলার। মূল ব্যাপার ফারুকের কাছে পরিষ্কার, কিন্তু আখ্যান সম্পূর্ণ করতে গেলে এখনও কিছু শূন্যস্থান ভরা প্রয়োজন। ফোন তুলে প্রধানের নম্বর প্রায় টিপেও, ফারুক কেটে দিল। তার আশু গন্তব্য পরিষ্কার। পা দিয়ে চেয়ার ঠেলে ফারুক হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল। খোলা জায়গাটা পার করে, ঢালু পথ ধরে রাস্তার দিকে সে যেভাবে আধা হেঁটে আধা দৌড়ে গেল, প্রত্যক্ষদর্শী কেউ থাকলে ভাবত ভূতে ভর করেছে।

তবে এরকম সময় ফারুককে একটা ভূতই ভর করে। উত্তেজনা, উদ্দীপনা, অনুসন্ধিৎসা— সেই ভূতের নাম যাই হোক না কেন। সে পুলিশের চাকরি সফলভাবে করে গেছিল এই ভূতকে লালন করেই। সেই আততায়ীর হামলার পরে অনেকে ভেবেছিল, সে নিজেও ভেবেছিল, যে ভূত বুঝি পালিয়ে যাবে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে, বিশ্রাম নিয়ে, ব্যায়াম করে সে শারীরিক শক্তি আবার যখন ফিরে পেয়েছে, তখন বুঝেছে যে ভূত আগাগোড়া তার কাছেই থেকেছে। তারপর এসেছিল চিৎপুর রোডের সেই রাত। মোক্ষম মুহূর্তে পরিচিত ভূতের বদলে আচমকা এক অনাহূত ভূতের আক্রমণ। পরাস্ত ফারুক পরে জেনেছিল এর পোশাকি নাম প্যানিক অ্যাটাক। এটা নাকি আদপেই কোনো বিরল ব্যাপার নয়, ফারুকের মতো অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেলে পরবর্তী সময় এরকম একটা না একটা কিছু হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।

সেই রাতে একজন দুষ্কৃতি তার চোখের সামনে দিয়ে, বাইরে উপস্থিত তারই এক সহকর্মীকে মারাত্মক জখম করে পালিয়ে যায়। সরকারিভাবে অভিযানকে সফল বলে ধরা হয় এবং পরদিন ফারুক লালবাজার পৌঁছোলে তাকে রীতিমতো সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ফারুক গোটা দিন চুপচাপ ছিল। বিকেলের দিকে সে সটান কমিশনারের কাছে গিয়ে বলে যে তাকে যেন একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়, ডেস্ক জব। অনেক কথাবার্তা বলেও তার সিদ্ধান্ত থেকে কিছুতেই নড়ানো যায় না। সাতদিন পরে, খুব দ্রুত কিছু কাগজপত্র চালাচালি করে, তাকে একটি সুদৃশ্য নতুন অফিসে পোস্টিং দেওয়া হয়। তার দায়িত্ব এই বৃহৎ ডিপার্টমেন্টে যত জিনিস কেনাবেচা হয়, আলপিন থেকে বুলেটপ্রুফ গাড়ি, এই সবকিছু হিসাবমতো হচ্ছে কিনা তার উপর নজর রাখা। হিসাবের লোক আছে, ফারুকের কাজ পাতার পর পাতা সই করে যাওয়া।

সেই হালফ্যাশনের অফিসে ঢুকেই ফারুক বুঝেছিল যে এইখানে তার পোষা ভূতটি জায়গা পাবে না। আর হলও তাই। সেই ভূত যে তাকে ত্যাগ করল, আর ফিরল না। বলা ভালো ফারুক নিজেই বোধহয় ফেরার রাস্তা বন্ধ করে দিল। ভূতহীন চাকরি জীবন অবশ্য বেশিদিন টেকেনি। চার মাসের মাথায় হাঁপিয়ে উঠে সে চিরতরে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে ইস্তফা দিল। তাদের বিভাগের থেরাপিস্টের মতে ততদিনে সে সম্পুর্ণ সুস্থ এবং অ্যাকটিভ ডিউটিতে যোগ দেওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু ফারুক ঝুঁকি নিতে নারাজ। তাকে কেউ বিন্দুমাত্র দায়ী না করলেও, সে আজও জানে যে তার সাময়িক অক্ষমতার জন্য তার সহকর্মীর প্রাণহানি হত।

আজ এত বছর পরে কোলাখামের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে সে আবার ওই চেনা অশরীরি উপস্থিতি টের পাচ্ছে। এই সময় তার মাথা প্রায় আলোর গতিতে কাজ করে চলে। সেই উৎপাদিত এনার্জিই তাকে ঠেলে নিয়ে চলে খিদে, তৃণা, ভয় সবকিছু উপেক্ষা করে। আপাতত দেড় কিলোমিটার রাস্তা সে অতিক্রম করেছে চার মিনিটে। আর একটা বাঁক ঘুরতেই সেই গুমটি দোকান যার সামনে একটা লম্বা বেঞ্চ পাতা। আপাতত সেই বেঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে ছোট্ট সাহস একটা বাদামি কুকুরের মুখে একটুকরো আপেল গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কুকুরটা পিছনে দু’পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনের দুটো পা সাহস এক হাত দিয়ে ধরে, অন্য হাত দিয়ে ফলের টুকরোটা নিয়ে লড়ে যাচ্ছে। দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করা। ফারুকের পায়ের শব্দ পেয়ে সাহস ঘাড় ঘোরাল আর সেই সুযোগে কুকুরটা লাফ দিয়ে নেমে সোজা দৌড়। অন্তত পঁচিশ গজ দূরে গিয়ে সে থেমেছে। ফারুক হিন্দিতে প্রশ্ন করল, “তোমার নাম সাহস না? তোমার মা বাড়িতে আছেন? বা বড়ো কেউ? একটু ডেকে দেবে?”

বাচ্চাটি হাঁ করে ফারুকের দিকে তাকিয়ে কী বুঝল কে জানে, আচমকা এক লাফে বেঞ্চ থেকে নেমে সেই ফলের টুকরোটা সটান নিজের মুখে চালান করে, দুদ্দাড় করে খাদের দিকে নেমে গেল।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে। ফারুক দাঁড়িয়ে থেকে কী করবে বুঝতে পারছে না। এরকম ঘুমন্ত গ্রামের ধারে দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি করে আদৌ কোনো ফলে হবে কিনা তারও ঠিক নেই। সে ঠিক করল প্রথমে দোকানের ঝাঁপে একটু ঠকঠক করে দেখবে। সেদিকে এক পা এগোতেই, সাহস যে পথ দিয়ে নেমে গেছিল, সেখান দিয়ে এক নেপালি বৃদ্ধ উঠে এলেন। ফারুককে দেখতে পেয়ে নমস্কার করে বললেন, “কিছু দরকার আছে? কাকে খুঁজছেন।”

“আমি অত্যন্ত দুঃখিত এভাবে বিরক্ত করার জন্য।” ফারুকও প্রতিনমস্কার করল। “আমি আসলে উপরে হোমস্টেতে আছি, যেখানে মার্ডার হয়েছে, শুনেছেন নিশ্চয়ই। আমি সেই ব্যাপারে একটা—দুটো জিনিস জানার চেষ্টা করছি। তার মধ্যে একটা ওই বাচ্চাটিকে নিয়ে।”

“আপনিই ওই কলকাতার পুলিশওয়ালা?”

“আমি অনেক আগে পুলিশে চাকরি করতাম। এখানে বেড়াতে এসেছি, কিন্তু ঘটনাচক্রে একটু জড়িয়ে পড়েছি বলতে পারেন। কয়েকদিন আগেই বিকেলের দিকে আমি এই দোকানে বসে চা—ম্যাগি খেয়ে গেছি। তখন বোধহয় সাহসের মা ছিলেন।”

“হ্যাঁ, আমার ছেলের বউ। সাহস আমার নাতি।”

“আমি ওর মায়ের মুখে, তারপর হোমস্টেতেও শুনেছি যে আরও ছোটোবেলায় ওর নাকি বাড়াবাড়ি শরীর খারাপ হয়েছিল। তখন ডলি রাইয়ের জন্য ওর প্রাণ বাঁচে। আপনি একটু ঘটনাটা খুলে বলতে পারবেন?”

“হ্যাঁ, এই তো বোধহয় দু—আড়াই বছর আগের কথা। তখনও করোনা পুরোপুরি কাটেনি, লকডাউন উঠবে উঠবে করছে। সাহসের তখন ওই পাঁচ বছর মতো বয়স। দেখছেনই তো কীরকম বিচ্ছু, তখন আরও চঞ্চল। এক সেকেন্ড কোথাও বসে না। সারাদিন কিছু না কিছু, কোথাও না কোথাও, ধ্বংস করে বেড়াচ্ছে। ওরকম একদিন, শীতকাল তখনও আছে, বাড়িতে ঢুকেই ওইটুকু ছেলে পেট ব্যথায় ছটফট করছে। হাত দিয়ে দেখি গা গরম। এদিকে বাড়িতে আমার দুই ছেলের কেউ নেই। শিলিগুড়িতে আটকে আছে। আশেপাশে লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। ততক্ষণে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আমার এক দাদার ছেলের বাইক আছে। ও রেডি হচ্ছিল আরও নীচের দিকে একটা হেলথ সেন্টার আছে, সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এর মধ্যে দেখি বাচ্চার মুখে ফেনা ফেনা হচ্ছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে ওর প্যান্টের পকেট চেক করে দেখি তখনও কয়েকটা পড়ে আছে— বেগুনি রং, আঙুরের থেকেও ছোটো ফল। সাংঘাতিক বিষাক্ত। আমি বুঝেছিলাম হেলথ সেন্টার নিয়ে যাওয়ার টাইম নেই। আমি দাদার ছেলেকেই বলি বাইক নিয়ে ডলিকে ডেকে নিয়ে আসতে। ও দু’মিনিটের মধ্যে ডলিকে নিয়ে এল। ডলি ওষুধ দিল। তারপর আধ ঘণ্টা পরে অবস্থা একটু ঠিক হল। ডাক্তারের কাছে যখন নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেও বলেছে যে ডলি ওষুধ না দিলে বাঁচত না।”

“জাস্ট দুটো প্রশ্ন। তারপর আর বিরক্ত করব না। এক হচ্ছে, ডলি রাই ঠিক কী ওষুধ দিয়েছিলেন? সেটা কিছু জানেন?”

“ওষুধের নাম তো বলতে পারব না। কিন্তু বিষ বের করার জন্য দেওয়া হয়, সিরাপের মতো জিনিস। খেলে বমি হয়ে যায়।”

“শেষ প্রশ্ন।” উত্তেজনায় ফারুকের গলা এবং জিভের পিছন দিকটা শুকিয়ে আছে। “এই চরম বিপদের মধ্যে যখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার সময় নেই, তখন ডলি রাইয়ের কথাই কেন মনে হয়েছিল?”

বৃদ্ধ বেশ অবাক হয়েই তাকালেন।

“ডলি তো নার্স ছিল। একসময় কলকাতার বড়ো হসপিটালে বেশ কিছুদিন চাকরিও করেছে!”

***

ফেরার পথ যেন অন্তহীন। হাঁটার গতি যত মন্থর হচ্ছে, রাস্তা যেন আরও প্রসারিত হচ্ছে। সেই গুমটি দোকান থেকে বেরিয়ে, ফারুক সবে দুটি বাঁক পেরিয়েছে। তার মধ্যেই বুঝতে পারছে চারিদিকে আলো কমে আসছে। সন্ধ্যা নামতে বেশি দেরি নেই। অন্ধকার হওয়ার আগে তাকে ফিরতে হবে।

একটা—দুটো ব্যাপার যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন। প্রথম ফোনটা করতে হবে প্রধানকে।

“হ্যাঁ বলুন, আপনি কি ওখান থেকে স্টার্ট করে দিয়েছেন?”

“না, অন্য কারণে ফোন করলাম। নীলাদ্রির শরীরে যেই কমপাউন্ড বা সাবস্ট্যান্সের ট্রেস পাওয়া গেছে, তার একটা লিস্ট পাঠাতে পারবেন? এখনই হলে ভালো হয়।”

“শিওর! ওই অংশটার একটা ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপ করে দিলে হবে? কাগজটা আমার টেবিলেই পড়ে আছে।”

“হবে। থ্যাংক ইউ। পরে কথা বলছি।”

একটা টুং শব্দ করে ছবিটা ফারুকের ফোনে এসে ঢুকল। এই শব্দটার সঙ্গে হাতকড়া পড়ানোর শব্দ অথবা ফাঁসিকাঠে হাতল টানার শব্দের খুব একটা গুণগত পার্থক্য নেই। এই মুহূর্তে নেই, এই প্রসঙ্গে নেই। ফারুক তালিকাটায় চোখ বোলাল। এর পরের ফোনটা করতে হবে একজন ডাক্তারকে, যিনি মানবশরীর বিশেষজ্ঞ এবং শরীরের উপর বিশেষ কিছু কেমিক্যালের প্রভাব কী হতে পারে, সেই বিষয়ে জরুরি প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন। ডঃ প্রবীর সেনকেই করা যেত, কিন্তু সকালে ফারুক যখন তাঁর ঠিকানা জোগাড় করেছে, ফোন নম্বরটা নেয়নি। তবে তার এই মুহূর্তের প্রশ্নের জবাব সম্ভবত যে—কোনো পেশাদার ডাক্তারই দিতে পারবেন। সে ফোনে তাদের বাড়ির ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানের নম্বরটাই টিপল। ভদ্রলোক তখনও চেম্বারে ঢোকেননি। পাঁচ মিনিটের একটা কথোপকথনে তিনি সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, ফারুকের যাবতীয় সংশয় দূর করে দিলেন।

বাইরে এখন বেশ তাড়াতাড়িই আলো কমছে। হোমস্টে অবধি পৌঁছানোর আগেই দূর থেকে দত্তবাবুদের বড়ো গাড়িটা দেখা গেল; ঢালু পথ বেয়ে মেন রোডে নেমে লাভার দিকে যাচ্ছে। এতটা দূরত্বে বোঝা গেল না ভিতরে কে বা কারা আছে। ফারুক খানিক গা—ঝাড়া দিয়েই বাকি রাস্তা একটু গতি বাড়িয়ে হেঁটে হাঁপাতে হাঁপাতে হোমস্টের খোলা জায়গাটায় উঠে এল।

“কী হল? হাঁপাচ্ছেন যে, শরীর ঠিক আছে তো?”

শেষ পথটুকু বেশ হুড়মুড়িয়ে ওঠায়, ফারুক লক্ষও করেনি যে ডলি কখন এসে দাঁড়িয়েছে। এবার সে শরীরটা সোজা করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তার থেকে হাত দুয়েক দূরে দাঁড়িয়ে আছে ডলি রাই। মুখে ঈষৎ উৎকণ্ঠার ছাপ। ফারুক আর—একটা জোরে নিশ্বাস ছেড়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে হাত তুলল।

“আমি ঠিক আছি। একটু বেশি তাড়াতাড়ি হেঁটে ফেলেছিলাম। মিস্টার দত্তদের গাড়িটা বেরোতে দেখলাম। কিছু হয়েছে?”

“না না। মিস্টার দত্তর পায়ে ব্যথার সমস্যা, তার মধ্যে এই পুলিশের রেস্ট্রিকশন— ওরা এতদিন ঘরে বন্দি হয়ে পড়ে আছে। তাই আজকে ঠিক করেছে একটু লাভার দিকে যাবে, হয়তো কিছু কেনাকাটা করে, একবারে ডিনার করে ফিরবে।”

“ওহ, আজ তাহলে কম লোকের রান্না?”

“হ্যাঁ, সেটা একদিক দিয়ে ভালোই। আমার হাজব্যান্ড দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নেয়। নাহলে শরীর খারাপ করে। আজ দুপুরে কাজ শেষ করে আসতে আসতে বেশ দেরি করেছে, ফলে ঘুমটা আর আসেনি। এখন বিকেল থেকে ওই শরীর খারাপ ভাবটা স্টার্ট হয়েছে। চিন্তার কিছু নেই, প্রতিভা আছে দেখাশোনা করার জন্য। কাল সকালের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আজকে সন্ধে—রাতটা রেস্ট লাগবে।”

ফারুক দু’সেকেন্ড চুপ করে উত্তর দিল, “আপনি বেশ ডাক্তারের মতো ডায়াগনোজ করে ফেললেন।”

“এ তো কলকাতা নয়, এখানে বেঁচে থাকতে গেলে এগুলো জানতেই হয়।”

ডলি ডাইনিং হলের দিকে চলে গেল। ফারুক আবার সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিজের ঘরে ফেরার মতো দম এখনও পায়নি। এখানে আসা ইস্তক, দত্তবাবুদের গাড়িটা সারাক্ষণ পার্ক করা থাকত। এখন না থাকায় জায়গাটা অন্যরকম লাগছে। বেশ বড়ো আর ছড়ানো মনে হচ্ছে, আর তার থেকেও বেশি ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে। ফারুক এক আর দুই নম্বর ঘরের দিকে একবার তাকিয়ে দেখল। কোনো ঘরেই তালা নেই, কিন্তু ভিতরে আলোও জ্বলছে না। তার মানে জঙ্গল অভিযান সেরে অভিযাত্রীরা ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু ভোরে ওঠা আর হাঁটাহাঁটির ধকলে আপাতত গভীর নিদ্রামগ্ন। ফারুক ডাইনিং হলের দিকে পা বাড়াল।

ডলি সন্ধের চা ও জলখাবারের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। তার সামনে টেবিলের উপর আদা, পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচালংকা এইসব আলাদা আলাদা করে রাখা। একটা গামলার মতো বড়ো পাত্রে ময়দা, যার ছিটেফোঁটা ডলির ডান হাতে লেগে সাদা ছোপ ছোপ হয়ে আছে। ডাইনিং হলের কোথাও আলো না জ্বললেও, রান্নাঘরের উত্তর—পশ্চিমের জানালা দিয়ে সূর্যাস্তের শেষ আলোটা ঢোকে। এখন সেটাও প্রায় নিভে যাওয়ার মুখে। ডলি কাজ করতে করতে মুখ না তুলেই আলো জ্বালানোর জন্য হাত বাড়াল।

“খানিকক্ষণ এভাবেই থাক।” ফারুকের থমথমে গলার স্বরে ডলি চমকে গেছে।

“ওহ, আপনি কখন ঢুকেছেন খেয়াল করিনি।”

ফারুক উত্তর না দিয়ে চুপ করে আছে। একটা বিশাল বড়ো ঘরে মাত্র দু’হাত ব্যবধানে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি মানুষের মধ্যে লম্বা হতে থাকা নিস্তব্ধ সময় বড়োই অস্বস্তিকর। ফারুকই প্রথম মুখ খুলল।

“জানি আপনি ব্যস্ত, কিন্তু তাও কাজ থামিয়ে যদি একটু এদিকের একটা টেবিলে এসে বসেন— অত্যন্ত জরুরি কিছু কথা ছিল।”

“একটু পরে বসলে হবে? ধরুন আধ ঘণ্টা—পঁয়তাল্লিশ মিনিট? আমি ততক্ষণে —”

“সরি, কিন্তু এটাই ঠিক সময়। আমি ইনসিস্ট করছি।”

কথা বলার মাঝপথে বাধা পড়ায় ডলি ক্ষণিকের জন্য একটু হতভম্ব হয়ে গেছিল। ফারুকের কথা বলার ধরনে এমন কিছু একটা ছিল, যে হঠাৎ করেই সে তার সংবিৎ ফিরে পেল। যখন সে মুখ তুলে ফারুকের চোখে চোখ রাখল, সে দৃষ্টিতে কিয়দংশ সতর্কতা এবং অধিকাংশ জুড়েই উপলব্ধি। একটা ছোটো নিশ্বাসের শব্দ। তারপর হাতের চামচটা নিঃশব্দে নামিয়ে রেখে ডলি ফারুককে পাশ কাটিয়ে গিয়ে খাওয়ার জায়গার একটা চেয়ার টেনে বসল। লাঞ্চ বা ডিনারের সময় এই চেয়ারে সাধারণত ফারুক বসে। তাকে গোটা টেবিল পার করে গিয়ে, উলটোদিকের আর—একটা চেয়ারে বসতে হল।

“আমরা দুজনেই জানি এখানে আমরা কেন বা কী নিয়ে কথা বলতে বসেছি। আমি দীর্ঘদিন হল পুলিশের চাকরি ছেড়েছি। হঠাৎ করে এখন পুলিশি কায়দায় কথার মারপ্যাঁচের মধ্যে দিয়ে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করার ইচ্ছে বা প্রবৃত্তি, কোনোটাই নেই। ফলে সরাসরি মূল কথাতেই আসছি।”

ডলি নিশ্চুপ। শুধু নিশ্চুপ নয়, চেয়ারে বসার পর থেকে যেন বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতো স্থির, নিথর। শরীরের একটা পেশিও কাঁপছে না। বাইরে আলোর শেষ কণাটুকুও পশ্চিমের পাহাড়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। ঘরের ভিতরটা ছায়াময়। সেখানে ডলির চোখের পলক পড়ছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না।

“আমার একটা মোটামুটি পরিষ্কার ধারণা হয়েছে,” ফারুক বলে চলল, “গোটা ঘটনার ব্যাপারে। কেন করা হয়েছে এবং টু অ্যান এক্সটেন্ট, কীভাবে করা হয়েছে, সেই ব্যাপারেও। অবশ্যই আমি গোটাটা জানি না। সেটা একমাত্র জানেন আপনি। ফলে এবার আপনাকে আমি সরাসরি জিজ্ঞাসা করছি, আপনি কি কনফেস করবেন? স্বীকার করে নেবেন নিজের অপরাধ?”

“আমার মনে হয়, এরকম মুখ বন্ধ রাখার সময় আমরা পার করে চলে এসেছি।” ডলিকে একইভাবে চুপ করে বসে থাকতে দেখে ফারুকের একটু ধৈর্যচ্যুতি হল।

“আপনি সোজা পুলিশের কাছে না গিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে এলেন কেন? তাহলে কি আপনার কাছে আসলে কোনো প্রমাণ নেই? আছে শুধু অনুমান আর তার উপর ভিত্তি করে সাজানো গল্প? হয়তো যুক্তিসঙ্গত, কিন্তু উইদাউট এভিডেন্স!”

এক মুহূর্তের জন্য ফারুক যেন একটু বেকায়দায় পড়ল। সেটা ডলির বক্তব্যের ধারও হতে পারে, আবার এতক্ষণ পর ডলির আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্বের আভাস পেয়েও হতে পারে। নিজেকে সামলে নিতে ফারুকের কিছু অতিরিক্ত সেকেন্ড ব্যয় হল।

“হয়তো গল্পই। কিন্তু গল্পের ক্ষমতাকে ছোটো করবেন না। তার মধ্যে আমার গল্পটা ন্যায়সঙ্গত ও বিশ্বাসযোগ্য। এবং দেখা যাচ্ছে, আজও পুলিশের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কারণে, আমি যদি একটা গল্প বলি তারা সেটা মন দিয়ে শুনবে। শুনে কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নেবে। তার মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন। সেটা হল গোটা তদন্তের ফোকাস আপনার দিকে ঘুরে যাওয়া। মানুষের চলাচল, গতিবিধি এবং সবথেকে বড়ো কথা মানুষের অতীত— এগুলো টেনে বের করার ব্যাপারে পুলিশের জুড়ি নেই। আমি একা মানুষ যেটা সারা বছরে পারব না, পুলিশ সেটা চব্বিশ ঘণ্টায় অনায়াসে করে ফেলবে। ফলে আপনি এটা থেকে পালাতে পারবেন না। এবং ফ্র্যাংকলি বলছি, আমার মনে হয় না আপনি পালিয়ে যাওয়ার মতো মানসিকতার মানুষ। আপনি নিজের মধ্যে চেপে রাখেন, কিন্তু পালিয়ে যান না।”

“আমি পালিয়েছিলাম!” ডলির চিৎকার করে ওঠাটা এতই আকস্মিক যে ফারুক নিজের অজান্তেই চেয়ারটা একটু পিছিয়ে নিল। “আমি সব জেনেই পালিয়েছিলাম। নাও পালাতে পারতাম, কিন্তু আমি পালিয়েই গেলাম, পালিয়েই গেলাম—”, ডলির গলা হয়তো চিৎকারের কারণেই একটু চিরে গিয়ে ফ্যাসফ্যাসে শোনাচ্ছে। এখন সেই অবস্থায় সে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠছে, আর মুখ হাঁ করে নিশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে।

ফারুক চেয়ার ছেড়ে, কাউন্টারের দিকে গেল। তাকের উপর সারি দেওয়া জলের বোতল। সবই দু’লিটারের। রান্নাঘরে উকি দিতেই কাচের গ্লাসগুলো চোখে পড়ল। একটা বোতল খুলে, সেখান থেকে এক গ্লাস জল ঢেলে, ফারুক জায়গায় ফিরে এল। দুই চুমুক জল খেয়ে ডলি একটু দম ফিরে পেয়েছে। বাইরে দু—এক জায়গায় আলো জ্বলেছে। তাতে ঘরের ভিতরের অন্ধকার মোটেই কাটেনি, বরং ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে অদ্ভুত আলোছায়ার নকশা তৈরি হয়েছে। একটা আলোর রেখা দু’জনের মাঝখানে, টেবিলের উপর দিয়ে চলে গেছে। ডলি নড়াচড়া করলে, কখনো—কখনো তার মুখের কিছু অংশে আলো পড়ছে, আবার ছায়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে।

“আমি ভাবছিলাম আপনি যদি বলেন। কিন্তু ঠিক আছে, আমিই গল্পটা বলতে শুরু করি। কোথাও ভুল বললে, বা কোনোকিছু বাদ পড়ে গেলে, আশা করি শুধরে দেবেন বা ধরিয়ে দেবেন। আমি যা যা ঘটনা যেভাবে দেখেছি, সেই অর্ডারে বলার চেষ্টা করি।”

পকেট থেকে সিগারেট বের করে, একটা ধরিয়ে নিয়ে সেটায় বড়ো টান দিয়ে, ফারুক শুরু করল, “ডঃ নীলাদ্রি চক্রবর্তীর মৃত্যু দিয়েই শুরু করি। এটা কি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত খুন? পুলিশ নিজের প্রোটোকল মেনে এগোচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু আমার নিজের সন্দেহ হতে থাকে অন্য কারণে। আর—একটু যদি পিছিয়ে যাই, তাহলে সেই দিন সকাল থেকেই একাধিক ঘটনা ঘটে যা রুটিন বা নিয়মের বাইরে, যাকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ না বললেও উল্লেখযোগ্য তো বলতেই পারি। প্রথমত, আচমকা ওয়েদার খারাপ হওয়ায় এই হোমস্টেতে এক এক করে কেশব, নীলাদ্রি এবং আমার আবির্ভাব। ফলে, হঠাৎ কালিম্পঙের একটা ছোট্ট গ্রামে একই ছাদের নীচে কলকাতা শহরের নিজের নিজের ক্ষেত্রে দুই বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি। আমি আপনার হাজব্যান্ডের কথা বলছি। সম্পর্কের এই বিচিত্র নেটওয়ার্ক এখানেই থামে না। দেখা যায়, উপস্থিত এক তরুণ— ঋজু দাশগুপ্ত, নীলাদ্রির পূর্বপরিচিত এবং সে পরিচিতির ধরন মোটেই ভালো নয়। অবশেষে মধ্যরাতে ওদিকে অত্যধিক মদ্যপানে পালমোনারি অ্যাস্পিরেশনে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় নীলাদ্রি। আর প্রায় ঘড়ি ধরে একই সময়ে আমি একটা অদ্ভুত ফেলে দেওয়া অসম্পূর্ণ চিঠি পাই, যেখানে কোনো এক ঘটে যাওয়া অপরাধের দিকে সরাসরি ইঙ্গিত করা আছে।

কেন? কেশবের কথা বাদ দিলেও, এর মধ্যে যে—কোনো ঘটনাকে আলাদা করে বিচার করলে, তা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং সাধারণ মনে হতেই পারে। কিন্তু বারো—চোদ্দ ঘণ্টার ব্যবধানে এক ছাদের নীচে এতগুলো ঘটনা আমার কাছে প্রথম থেকেই সন্দেহজনক মনে হয়েছিল। এবার এই সন্দেহ, অর্থাৎ নীলাদ্রি চক্রবর্তী খুন হয়েছে ধরে যদি আমি এগোতে থাকি, তাহলে সঙ্গত কারণেই তিনটে প্রাথমিক প্রশ্ন উঠে আসে। এক হল, খুন কে করেছে? এরকম সুপরিকল্পিত খুন কোনো অচেনা বাইরের আততায়ীর কাজ হবে না। তাহলে চেনা কেউ? এখানে নীলাদ্রির চেনা বলতে সেই অর্থে কেশব এবং ঋজু। কিন্তু তাঁদের কথা ভাবলেও দ্বিতীয় প্রশ্নে আসতে হয়— মোটিভ। কেশবের কথা ভাবলে মাথায় আসে আর্থিক মুনাফার কথা, ব্যবসায়িক লাভের কথা। ওদিকে ঋজুর ক্ষেত্রে মোটিভ নিঃসন্দেহে প্রতিশোধ— গুড ওল্ড ফ্যাশনড রিভেঞ্জ। নীলাদ্রির মৃত্যুতে ঋজুর আর কোনোভাবে লাভবান হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। তবে নীলাদ্রিকে যে—কোনো কারণেই, যেই—ই হত্যা করে থাকুক, সবথেকে জরুরি হল শেষ প্রশ্ন— কীভাবে? এখানেই আমি সবথেকে বড়ো ধাক্কাটা খাচ্ছিলাম। মৃত্যুর ধরন অস্বাভাবিক এবং বিরল হলেও, ডাক্তারি কোনো রিপোর্টেই কোনো বিষের উল্লেখ নেই। ফলে পুলিশের সঙ্গে সঙ্গে আমিও একটা সময় নিজেকে সন্দেহ করতে শুরু করেছিলাম। নীলাদ্রির মৃত্যু সত্যিই দুর্ঘটনা নয় তো?

এইসব ভাবনাচিন্তা, তদন্ত, খোঁজখবর শুরু করতে না করতেই ঋজু দাশগুপ্তর লাশ মিলল। এই মৃত্যু নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। নিজের ঘর থেকে বেশ খানিক দূরে, একটা তাঁবুর মতো কাঠামোর মধ্যে সারারাত পড়ে থাকার পর মৃতদেহ আবিষ্কৃত হল। তার মাথার পিছনে, ঘাড় আর মাথার মাঝামাঝি একটা ধারালো অস্ত্রের ক্ষত। এই ক্ষতস্থানটা বেশ ইন্টারেস্টিং এবং তাই নিয়ে অনেক মাথাও ঘামানো হয়েছে। প্রথমত, আঘাতের গতিমুখ নীচ থেকে ক্রমশ উপরের দিকে। সাধারণভাবে শরীরের উপর ভাগে ছুরির ফলা ঢোকে হয় সোজাসুজি নয়তো উপর থেকে নীচে। ফলে, প্রাথমিকভাবে ধারণা হয় আততায়ী এমন কেউ, যার হাইট বেশ কম। একবার মনে হয়েছিল যে আততায়ী শরীরের নীচের দিকে পেটের আশপাশে কোথাও ছুরি না চালিয়ে বেছে বেছে ওখানেই আঘাত করল কেন? এটা বলছি কারণ দেখা গেল আঘাতের ধরন অত্যন্ত পেশাদার। একবার, স্রেফ একবার অস্ত্র ঢুকে শরীরের মোক্ষম স্নায়ু ও শিরা ছিন্ন করে বেরিয়ে এসেছে। মৃত্যু একেবারেই তাৎক্ষণিক এবং সম্ভবত যন্ত্রণাহীন। সেইসঙ্গে প্রাথমিক তদন্ত ও ডাক্তারি পরীক্ষা করে বোঝা গেল যে খুন ওখানেই হয়েছে। অন্য জায়গায় খুন করে এখানে লাশ লুকিয়ে রাখা হয়নি।

“স্বাভাবিকভাবেই, ঋজুর মৃত্যুর পর তদন্তের গোটা ফোকাস ওইদিকেই ঘুরে যায়। তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, বাইরে থেকে দেখে যেরকমই মনে হোক, তাদের নিজেদের মধ্যে নানারকম টানাপোড়েন আছে। ঋজুকে মানুষ হিসাবে, বা দেবলীনার বয়ফ্রেন্ড হিসাবে, জয়দীপ বা ঐশানী একেবারেই পছন্দ করে না। এবং এই অপছন্দের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশিই বলা চলে। এই আলোচনায় একটা জিনিস স্পষ্টভাবে উঠে আসে। তাদের এবারের বেড়ানো শুরু হতে না হতেই, কোনো একটা কারণে, ছুটি বা আনন্দের মেজাজটা নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ কারওর কাছে স্পষ্ট নয়, কিন্তু ভিতরে ভিতরে কিছু একটা বড়ো রকমের ছন্দপতন হয়েছে। এর একটা অন্য তাৎপর্য পরে আমার কাছে পরিষ্কার হবে।

ঋজুর খুনের তদন্ত এগোতে থাকে। এখানে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং অন্যান্য নানাসময়ে কথা বলার ফলে দুটো মূল্যবান বয়ান আমার কাছে আসে। প্রথমটি সরাসরি ঋজুকে কেন্দ্র করেই। ওরা সবাই যেদিন এসে পৌঁছেছে, সেদিন থেকেই এখানে ওদের একটা তাসের আড্ডা বসেছে। ঘটনাচক্রে মিসেস দত্ত ও তাঁর মেয়েও অংশগ্রহণ করেন। মিসেস দত্তর মুখ থেকে জানতে পারি, যে নীলাদ্রি মারা যাওয়ার রাত্রে, মোটামুটি এগারোটার পরে ঋজু তাস খেলতে খেলতে বেজায় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। সে মিসেস দত্তকে টপকে সামনের জানালার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। ঋজুর মতো একজন পাকা তাসুড়ের এহেন আচরণ চোখে পড়ার মতোই বটে। অতএব, ধরে নেওয়া যায় ডাইনিং হলের সামনের দিকে অত রাতে এমন কিছু একটা ঘটেছে, যা ঋজুর কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। মনে রাখতে হবে ওই একই জায়গায়, আর দেড় ঘণ্টা পরে, আমি এক রহস্যময় ছায়ামূর্তির ফেলে দেওয়া চিঠি উদ্ধার করব। তাহলে প্রশ্ন ওঠে যে ঋজু কী দেখেছিল? সে কি কোনো মানুষ? তাহলে কি সেই কারণে এবং তার হাতেই ঋজুর প্রাণ গেল?

দ্বিতীয় বয়ান পাই ঐশানীর থেকে। সেদিন সন্ধ্যায়, অর্থাৎ আমি এসে পৌঁছানোর দিন সন্ধ্যাবেলায়, জঙ্গলের দিক থেকে কটেজের পাশ দিয়ে আসার সময়, ঐশানী ভিতর থেকে চাপা কথা কাটাকাটি এবং নীলাদ্রির চড়া গলা শোনে। সে কাউকে শাসানির ভঙ্গিতে বলছে যে এরকম কথা সে আর একবার শুনলে, সোজা পুলিশ ডাকবে। এবার একটু ঐশানীর ব্যাপারে ভাবি। আমরা যে কম হাইটের আততায়ীর কথা ভাবছিলাম, সেই শারীরিক বর্ণনার সঙ্গে সবথেকে বেশি মিল তার। সে বুদ্ধিমতি এবং তার সঙ্গে কথা বললেই তার ব্যক্তিত্বের জোর টের পাওয়া যায়। ঠিক—ভুল বিচার করে নিজের মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে। ফ্র্যাংকলি স্পিকিং, হাইট বাদ দিয়ে এই গোটা প্রোফাইলটা আপনার সঙ্গেও প্রায় হুবহু মিলে যায়। যদিও সেটা তখন মাথায় আসেনি। এনিওয়ে, ঋজুর তাস খেলতে খেলতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ার সময়ও ঐশানী ঘরে ছিল না। সব মিলিয়ে, ওর প্রতি একটা সন্দেহ তৈরি হয়। এটাও মনে হয়, যে নিজের উপর থেকে অ্যাটেনশন ঘোরাতেই হয়তো নীলাদ্রির ঘরের ভিতর কথা কাটাকাটির ব্যাপারটা সে আমার কাছে কনফাইড করছে।”

অনেকক্ষণ হল ফারুকের হাতের সিগারেট জ্বলে শেষ হয়ে গেছে। টেবিলে এক জায়গায় বেশ খানিকটা ছাই পড়ে স্তূপ হয়ে আছে। হাতে ধরা ফিল্টারের অংশটা সে উত্তর দিকের জানালা দিয়ে ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দিল। ওদিকে দু—একটা অন্যান্য বাড়িতেও আলো জ্বলেছে। তার কিছুটা টেবিলের একাংশে এসে পড়েছে। সেই আলোয়, ফারুক একটা টিস্যু পেপার নিয়ে, অতি যত্নে ছাইটা জড়ো করে সেই কাগজে মুড়ে পকেটে পুরল। ডলির পুরো অবয়বটাই এখন একটা ছায়ার মতো হয়ে আছে। আলোর উৎস গোটাটাই তার পিছনে, ছবির ভাষায় যাকে বলে সিল্যুয়েট। তার সামনের গ্লাস থেকে এক চুমুক জল খেয়ে ফারুক আবার বলতে শুরু করল,

“এই ঘটনায় আসলে অতীত সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি। যে—কোনো ক্রাইমের তদন্তেই মোটামুটি অতীতের একটা ভূমিকা থাকে। কিন্তু এবারে যেন একটু বেশিই। নানারকমের অতীত— সুদূর অতীত, অবদমিত অতীত, আবার একদমই সাম্প্রতিক অতীত; সেইসঙ্গে ব্যক্তিগত অতীত, পারিবারিক অতীত, বা পালটে যাওয়া সমাজের অতীত। জানতে পেরেছি, সন্তান ও বাবা মায়ের সম্পর্কের ব্যাপারেও; সেই সম্পর্কের টান এবং সেই সম্পর্কে ঘটে যাওয়া ভুলের ব্যাপারেও। এর মধ্যে কিছুকিছুর সরাসরি ভূমিকা আছে তদন্তের ক্ষেত্রে, কিন্তু বাকি শিক্ষা ও উপলব্ধি একান্তই আমার ব্যক্তিগত এবং দামি।

যেমন, ঋজুর বাবা চেয়েছিলেন ছেলেকে ব্যাবসায় আগ্রহী করে তুলতে, তার হাতে পারিবারিক ব্যাবসার ভার তুলে দিতে, কিন্তু ঋজু হেঁটেছে সম্পূর্ণ উলটো পথে। আপনি ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানানোর জন্য বাড়ি থেকে অনেক দূরে পাঠিয়ে দিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে, সে আর ফিরল না। আপনি আজও ছেলের মৃত্যুর জন্য নিজেকেই দায়ী করেন। সচেতনভাবে না হলেও, এই অপরাধবোধ থেকে নিশ্চয়ই আপনি মুক্তির পথ খোঁজেন। এবং এই তালিকায় অবশ্যই জায়গা পাবে নীলাদ্রি ও তার বাবা, ডঃ সমীরণ পাল। ডঃ পাল প্রায় মিশনারিদের মতো উদ্যমে সৎ ছেলেকে, তাঁর মতে বিপথে যাওয়া থেকে আটকাতে, তাকে ডাক্তারি সাফল্যের রাস্তায় ঠেলে দিলেন। হয়তো ভাগ্যেরই পরিহাস, যে এই সিদ্ধান্তই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াল। লক্ষ করলে দেখা যাবে যে ভুল—ত্রুটি—অন্যায়—অপরাধ দিয়ে তৈরি একটা গল্পের চেন এখানে পাওয়া যাচ্ছে, যার শেষ পরিণতি এই গত কয়েকদিনে আমাদের সামনে ঘটে গেল। ছোটোবড়ো মিলিয়ে অনেকের অনেক ভুল— বাবা হিসাবে ডঃ পালের ভুল, মা হিসাবে আপনার ত্রুটি, ছেলে এবং ডাক্তার দুই হিসাবেই নীলাদ্রির অন্যায় এবং মানুষ হিসাবে ঋজুর অপরাধ। এই সবকিছুর হিসাব—নিকাশের উপরেই আসলে এই গোটা কেসের সমাধান সূত্র বা নিষ্পত্তি দাঁড়িয়ে আছে।

সমাধানের দিকে এগোনোর রাস্তায় আমি বেশ অপ্রত্যাশিতভাবে প্রথম দিশাটি পাই। সম্পূর্ণ অন্য এক ব্যাপারে ঐশানীর বাড়ির ঠিকানা খোঁজ করতে গিয়ে আপনাদের রেজিস্টারে ওর হাতের লেখা চোখে পড়ে যায়। সেই হাতের লেখা হুবহু মিলে যায় আমার প্রথম রাতে উদ্ধার করা চিঠির সঙ্গে। এই প্রমাণের উপর নির্ভর করে যখন ঐশানীর মুখোমুখি হই, তখন জানতে পারি কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া একটি অপ্রীতিকর, জঘন্য ঘটনার ব্যাপারে। তবে সেখানে, ওই পসিবল সেক্সুয়াল অ্যাসল্টের বাইরেও একটা অন্য বিষয় আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ওই ঘটনার পর থেকে ঋজু আর ঐশানীর সম্পর্ক যেমন ঠান্ডা ও থমথমে হয়ে যায়, আবার ঋজু নিজে একেবারেই একটা নির্লিপ্ত, উদাসীন ভাব করে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। বাকিরা বিরক্ত হলেও, ধরে নেয় যে এটা ওর স্বভাবসিদ্ধ ব্যাপার— ঋজু সবসময়ই ভীষণ মুডি!

কিন্তু আমার কাছে, বন্ধুদের থেকে ঋজুর এই আপাত দূরত্বের একটা অন্য তাৎপর্য তৈরি হয়। মিসেস দত্ত যেই রাতের কথা বলছেন, সেই রাতে যদি ঋজু সত্যিই কিছু দেখে থাকে, তাহলে সে তার বন্ধুদের সঙ্গে আর সেই বিষয়ে আলোচনায় যাবে না। এমনকি তার পুলিশ, প্রশাসন, বা সিস্টেমের উপরেও এত আক্রোশ যে হোমস্টেতে একটা অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়ে যাওয়ার পরেও আমার বা প্রধানের সামনে সে মুখ খুলবে না। কিন্তু তাই বলে কি ছেলেটি একেবারেই বোধবুদ্ধিহীন বা দায়িত্বজ্ঞানহীন? উঁহু! সে অনেক ভেবে নিশ্চয়ই ঠিক করেছিল যে ব্যাপারটা একদম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছেই বলবে। একটা হোমস্টেতে একজন অতিথির অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এবং তাতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। আগের দিন রাতে ঋজুর চোখে এমন কিছু একটা পড়েছে, যেটা আর কিছু না হোক অন্তত রুটিনমাফিক নয় নিশ্চয়ই। এহেন পরিস্থিতিতে ঋজুর চোখে সবথেকে রেলিভেন্ট ব্যক্তি কে হতে পারে?

এই প্রথম আমার আপনার ব্যাপারে সন্দেহ হয়। একটা সম্ভাব্য ঘটনাক্রম ভাবতে শুরু করি— ঋজু কিছু একটা দেখেছে, সে আপনাকে জানিয়েছে, আপনি ওর মুখ বন্ধ করার জন্য ওকে তড়িঘড়ি রাস্তা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। খুব ভুল আসলে ভাবিনি। কিন্তু তখন এটা স্রেফ একটা সন্দেহ, একটা হাঞ্চ। না আছে প্রমাণ, না আছে অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর। তাই এই সন্দেহটা ওই মুহূর্তে আমি আর কাউকেই বলিনি।

প্রশ্নের উত্তর খুব দ্রুত আসতে শুরু করে গত চব্বিশ ঘণ্টায়। প্রথমে ঐশানীর সঙ্গে কথাবার্তা বলে ওই চিঠি এবং ঋজুর ব্যাপারটা আলাদা করে বুঝতে পারি। তারপর রাতে প্রধানের উপস্থিতিতে কেশব কোঠারির আর—এক প্রস্থ জেরা। কেশবের আগাগোড়া উদ্দেশ্য এবার পরিষ্কার হয়, বোঝা যায় যে তার গল্পের স্রোত আলাদা দিকে বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে আর—একটি তথ্যও যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমআরসি মেমোরিয়ালের সঙ্গে নীলাদ্রির সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি। একদা প্রভাবশালী ও সকলের শ্রদ্ধার ডঃ পালের চাকরি চলে যাওয়ার মুহূর্তে আত্মহত্যা এবং ঠিক ওই মুহূর্তেই এক উঠতি মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে নীলাদ্রির নতুন জীবন শুরু। নীলাদ্রির চরিত্রের এই বিশেষ দিকটা মনে হয়েছিল এই কেসে জরুরি হয়ে উঠবে।

তবে সঠিক আলো সত্যিই দেখতে পাই আরও রাতে এবং বেশ আক্ষরিক অর্থেই। পুলিশ কেশবকে নিয়ে যাওয়ার পরে, আমি কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওয়েদার একেবারেই ক্লিয়ার, হঠাৎ দেখি দত্তবাবুদের গাড়িটার উইন্ডস্ক্রিন জুড়ে আলো ঝকমক করছে। আমার দু’সেকেন্ড লাগে বুঝতে যে আলো ওখানে জ্বলছে না, বরং উলটোদিকের রাস্তায় এবং পাহাড়ের গায়ে বিভিন্ন জায়গায় যেসব আলো আছে, গাড়ির কাচে তারই প্রতিফলন হচ্ছে। এটা মাথায় ঢুকতেই, মনে পড়ে যায় প্রতিভার মুখে আলাদা আলাদা সময় শোনা দুটো কথা, যার তাৎপর্য তখন বুঝিনি। প্রথমত, যেই রাতে নীলাদ্রির মৃত্যু হয়, সেদিন সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া হচ্ছিল। আপনাদের এদিকে চেয়ার—টেবিল যাতে জলে ভিজে নষ্ট না হয়, তাই প্রতিভা তড়িঘড়ি সব জানালা বন্ধ করতে এসেছিল। কিন্তু আপনি একটু আপসেট অবস্থায় আচমকা এসে পড়ায়, সবকটা জানালা আর বন্ধ করা হয়ে ওঠেনি। বন্ধ ছিল দক্ষিণের সবকটা জানালা, আর পাশের দেয়ালের প্রথমটা। বাকিগুলো খোলাই ছিল। রাতে আমি যখন খেয়ে উঠি, তখনও ওই অবস্থাতেই দেখি। দ্বিতীয় কথা, আপনাদের বাড়ির বারান্দায় যে আলো লাগানো, সেটা সম্ভবত ক’দিন যাবৎ অকেজো হয়ে পড়েছিল। ফলে আপনাদের বাড়ির সামনের অংশ থেকে শুরু করে কটেজের আশপাশ, এই গোটা এলাকা অন্ধকার হয়েই থাকত। কিন্তু সেইদিন সকালেই, ইন ফ্যাক্ট যখন নীলাদ্রি আর কেশব গাড়ি করে এখানে ঢুকছে, প্রতিভা নতুন বাল্ব এনে বারান্দায় ফিট করে। ফলে সেদিন সন্ধ্যা থেকে ওই পুরো জায়গাটায় আলোর কোনো অভাব ছিল না।

তার মানে বাসবী দত্তর কাঁধের উপর দিয়ে ঋজু যখন কিছু একটা দেখে থমকে গেছে, সেটা ডাইনিংয়ের সামনের কোনো ঘটনা নয়, বরং উত্তরের খোলা জানালা দিয়ে পিছনে কটেজের দিকের কোনো দৃশ্য। বন্ধ জানালার কাচে সেটা আয়নার মতো প্রতিফলিত হয়েছে। সে একজ্যাক্টলি কী দেখেছিল, সেটা একমাত্র আন্দাজ করাই সম্ভব। হয়তো কোনো মানুষকে অদ্ভুত কোনো আচরণ করতে দেখেছিল। সেই মানুষ কে, এটা তার পক্ষে বুঝে ফেলা সম্ভব হয়নি। তখন তার সম্ভবত কিছু একটা খটকা লেগেছিল। পরদিন সকালে নীলাদ্রির মৃত্যুর ব্যাপারে জানতে পেরে, সে আর—একটু সিরিয়াস হয়ে যায়। বিস্তর ভাবনাচিন্তা করে সে আপনাকে বলে এবং পরোক্ষভাবে নিজের মৃত্যুর পরোয়ানাতে নিজেই সই করে দেয়।

ঋজুর মৃত্যু এবং তার আগে নীলাদ্রির মৃত্যু— এই দুই মৃত্যু নিয়ে যখন প্রথম ভাবতে শুরু করেছিলাম, তখনও শিওর ছিলাম না যে দুটো একই সূত্রে গাঁথা কিনা। হয়তো অভিজ্ঞতার কারণে একটা ধারনা তৈরি হয়েছিল, যে এতটা সমাপতন ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু দুই মৃত্যুর ধরন পাশাপাশি রাখলে একটা স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছিল। নীলাদ্রির মৃত্যু খুবই যন্ত্রণাদায়ক, বেশ খানিক সময় ধরে। ঘুমন্ত বা আচ্ছন্ন অবস্থায় একটা মানুষের শেষ নিশ্বাসটা ফুরোতে যতটা সময় লাগে। অন্যদিকে ঋজুর মৃত্যু প্রায় যন্ত্রণাহীন ও একদমই তাৎক্ষণিক। একটা মৃত্যুর পিছনে যেন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য। অন্য মৃত্যুটি নেহাতই কার্যসিদ্ধির জন্য। তবে ঋজুর মৃত্যুর ক্ষেত্রে পুলিশের মতো আমাকেও ভাবিয়ে তুলেছিল আঘাত করার ওই বিচিত্র ধরন যেখানে ছুরির আঘাত নীচ থেকে উপরের দিকে গেছে।

ইতিমধ্যে আপনার মেয়ে আমাকে কথায় কথায় বলেছিল যে করোনার কারণে ছেলের ওইরকম আকস্মিক মৃত্যুর আঘাত বা শোক আপনি সামলে উঠতে পারেননি। এবং সেই শোক প্রকাশ করার বদলে আপনারা ভুলে থাকার রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন। ফলে, সেই শোক, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা, অন্যভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করে ছোটোখাটো নানারকম খামখেয়ালিপনা বা ব্যবহারের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে। প্রতিভার মনে হয়েছিল চোখের সামনে পরপর দুটো মৃত্যু হয়তো সেরকম কোনো আচরণকেই উসকে দিচ্ছে আপনার অজান্তেই। আর পাঁচজন সন্তানের মতো সে আপনাকে নিয়ে চিন্তিত। তার মনে হয়েছিল পাগলের মতো ঘরদোর পরিষ্কারের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া বুঝি আপনার সেরকমই কোনোকিছুর বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু প্রতিভার কথামতো আপনি শুধু ঘরবাড়ি পরিষ্কারে নামছেন না, বরং যাবতীয় ছোটোখাটো শো পিস, ঘর সাজানোর জিনিস ইত্যাদি সব নামিয়ে সেগুলো ধোয়ামাজা শুরু করেছেন। প্রতিভা এবং পরে আপনার হাজব্যান্ড, দু’জনেই বলেছিল যে আপনি সব পুরানো জিনিস আবার ধুয়েমেজে চকচকে করে ফেলছেন।

খুব সম্ভবত ওই চকচকে কথাটাই আমার কানে এবং মাথায় বসে গেছিল। ঋজুর মৃত্যু নিয়ে যখন বিস্তর মাথা ঘামাচ্ছি, তখন ওই শব্দটাই যেন হঠাৎ সম্পূর্ণ ছবিটা সিনেমার মতো আমার সামনে মেলে ধরল। আবারও বলছি, এটা আমার যুক্তিসঙ্গত একটা আন্দাজ। ডিটেল অবশ্য একমাত্র আপনিই বলতে পারবেন। আমার ধারণা, ঋজু এক ফাঁকে আপনাকে ডেকে বলেছিল যে আগের দিন রাত এগারোটার পরে সে কটেজের আশেপাশে সন্দেহজনক কিছু একটা দেখেছে। আমি অলমোস্ট শিওর ওখানে সেই সময় আপনিই ছিলেন, ফলে আপনি রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়েন। খানিকটা হয়তো নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন, যখন শুনলেন যে ঋজু কথাটা আর কাউকে বলেনি। আপনি সময় চেয়ে নিলেন। ওকে বললেন, রাতে সবাই শুয়ে পরার পর কটেজের ওখানে দেখা করতে। সম্ভবত বলেছিলেন যে আপনার দিক থেকেও কিছু বলার বা দেখানোর আছে। দেখানোর কথা এইজন্যই বলছি কারণ ওই অছিলাতেই একমাত্র প্লাস্টিকে মোড়া অসম্পূর্ণ কন্সট্রাকশনের ভিতরে ঢোকা যায়। এইবার আসল খেলা। আপনি কোনো একটা ধাতব জিনিস বাড়ি থেকে এনে মাটিতে রেখে দিয়েছিলেন। মোবাইলের আলোতে সেটা চকচক করে উঠতেই ঋজু নিচু হয়ে সেটা দেখতে গেল, আর ওমনি সেই সুযোগে আপনি এক মোক্ষম আঘাতে ছুরি গেঁথে দিলেন। আপনি উপর থেকে নীচেই ছুরি চালিয়েছেন, কিন্তু ঋজু ঘাড় নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকায়, আমাদের মনে হচ্ছিল কম উচ্চতার কোনো আততায়ী নীচে থেকে উপরের দিকে ছুরি চালিয়েছে। আমাদের প্রথম থেকে একটাই ভুল সমানে বিভ্রান্ত করে যাচ্ছিল। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে ঋজু দু’পায়ে সোজা হয়েই দাঁড়িয়েছিল। আপনার পুরানো চকচকে জিনিসের কথার তাৎপর্য মাথায় ঢুকতেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়। বুঝতে পারি যে শরীর যদি নিচু হয়ে মাটি থেকে কিছু কুড়ানোর ভঙ্গিতে থাকে এবং ঠিক সেই মুহূর্তে আঘাত উপর থেকে নেমে আসে, তাহলে আঘাতের কোনাকুনি গতিমুখ দেখেও নীচ থেকে উপরে, অর্থাৎ আপওয়ার্ড থ্রাস্ট মনে হতে পারে। এই ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল বলে আমার স্থির বিশ্বাস। একটাই আঘাত, নিখুঁত এবং সঠিক জায়গায়। আমার ধারণা ঋজুর বডি পুরোপুরি মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগেই তার প্রাণ বেরিয়ে গেছে।

এরপর আজকের সকাল থেকে দুপুর। ঝকঝকে আকাশ, ঝলমলে রোদ, এবং প্রকৃত অর্থেই আমার আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার দিন। এতদিন ধরে একটু একটু করে নানা রকম তথ্য ও বয়ান শুনে, সেইসব জোড়া লাগিয়ে ডঃ নীলাদ্রি চক্রবর্তী বলে যে চরিত্রটা আস্তে আস্তে স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল, তাতে মানুষটিকে যেমন বিশেষ শ্রদ্ধেয়ও মনে হয়নি, আবার উল্লেখযোগ্য রকমের কোনো কলঙ্কও সেখানে খুঁজে পাইনি। মনে হয়েছিল, আমাদের যুগেরই আর দশজন সাধারণ লোকের মতো সাফল্য ও অ্যাম্বিশনের পিছনে ছুটে চলা টিপিক্যাল সুবিধাবাদী লোক। চোখ খুলে দিলেন ডঃ সেন। উনি দীর্ঘদিন ধরে ডঃ পালকে চিনতেন, নীলাদ্রিকে ছোটোবেলা থেকে দেখেছেন। ওঁর মুখেই শুনলাম বাবা আর ছেলের মধ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকা দূরত্ব ও তিক্ততার কথা, এবং কালীপূজোর রাতে ওটি—র ঘটনাকে কেন্দ্র করে গভর্নিং বডির সামনে চরম বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি। নীলাদ্রির এমআরসি মেমোরিয়াল ছেড়ে সিংঘানিয়ার হাসপাতালে যাওয়ার ব্যাপারটা এতদিন ভাবছিলাম শুধুই সাফল্য ও প্রতিষ্ঠার পিছনে দৌড়ে যাওয়া। এবার বুঝলাম যে ওই এক ঘটনায় নীলাদ্রি তার ভিতর জমে থাকা অনেক কিছুর শোধ নিয়েছিল।

এইবার আমার কাছে মোটিভের জায়গাটা পরিষ্কার হল। নীলাদ্রির মৃত্যু যে ঠান্ডা মাথায় খুন, সেই বিষয়ে আমার মন থেকে সন্দেহর শেষ বিন্দুটাও মিলিয়ে গেল। কিন্তু মোটিভ বুঝলেও, বাকি দুটো প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— কে এবং কীভাবে?

ঘটনাচক্রে, সেগুলোর উত্তর মিলতেও খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। প্রথম দিন এসে আপনার হাজব্যান্ডের সঙ্গে যখন আলাপ হয়, তখনই ওঁর ফুটবল জীবনের কথা জানতে পারি। কথা বলতে গিয়ে দেখি, ওঁর অনেক সতীর্থই পরবর্তীকালে আমাদের ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতে এসেছেন। পৃথ্বী রাই তখন আমাকে বলেছিলেন যে একদিন সেইসব পুরানো ছবি দেখাবেন। তারপর ঘটনা এমন মোড় নিল যে সেই সুযোগ মেলেনি। আজ দুপুরে খাওয়ার পর সেই প্রাচীন অ্যালবাম নিয়ে বসা হয়েছিল। ছবি দেখলাম, গল্প শুনলাম, অনেক কথা হল এবং তারপর অ্যালবাম বন্ধ করে উনি চলে গেলেন, আমিও ঘরে ফিরে এলাম। কিন্তু তারপর থেকেই একটা অস্বস্তি হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল ছবিগুলো দেখতে গিয়ে কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস চোখে পড়েছে, কিন্তু খেয়াল করতে পারছি না। চোখ বুজে খাওয়ার পরের ঘটনাগুলো এক এক করে ভাবার চেষ্টা করলাম, আর তক্ষুনি মাথায় আলো জ্বলে উঠল। অ্যালবামের ছবি নয়। অ্যালবাম যেটায় মোড়া ছিল, সেই প্যাকেট!

জরাজীর্ণ অবস্থার প্লাস্টিকের উপর মলিন হয়ে যাওয়া রং হলেও, ইংরেজি অক্ষরগুলো স্পষ্ট— এমআরসি মেমোরিয়াল হসপিটাল, ক্যালকাটা। নীলাদ্রির প্রথম কাজের জায়গা, নীলাদ্রির চূড়ান্ত অপরাধের জায়গা। আপনার পরিবারে চারজন। তারমধ্যে আপনার সন্তানদের জন্মের আগে ওই হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। আপনার হাজব্যান্ড বিখ্যাত খেলোয়াড়, তিনি যদি কোনো কারণে এমআরসি মেমোরিয়ালের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, সেটা লুকোতে যাওয়া বোকামি কারণ সত্যিটা বের করতে একবেলাও লাগবে না। বাকি থাকেন আপনি। হতেই পারে হয়তো নিজের বা অন্য কারওর চিকিৎসার জন্য বহুবছর আগে গেছিলেন। কিন্তু আপনার একটি বিশেষ দক্ষতার কথা গ্রামে প্রায় সকলেই জানে।

সাহসের নাম না জানলেও, ওর অসুস্থতা এবং আপনার সাহায্যের ব্যাপারে জানতে পারি প্রথমদিন বিকেলেই। হাঁটতে হাঁটতে ওদের দোকানে চা খেতে বসেছিলাম। তখন শুনে বিশেষ মাথা ঘামায়নি। অসুখ—বিসুখ, বা যে—কোনো বিপদ—আপদে এরকম ছোটো জায়গায় মানুষ একে—অপরের পাশে দাঁড়াবে, সাহায্য করবে, এটা খুবই দৈন্দিন ও স্বাভাবিক ব্যাপার বলেই মনে হয়েছিল। আজকে ওই প্যাকেটের ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই আমি দৌড় লাগাই সাহসের বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাহসের মা ছিল না, কিন্তু কথা হয় ওর দাদুর সঙ্গে। সাহসের বিষাক্ত পাহাড়ি ফল খেয়ে ফেলা এবং আপনার উপস্থিত বুদ্ধির ফলে বেঁচে যাওয়ার গল্প শুনি। ততক্ষণে পুরোটাই পরিষ্কার, কিন্তু তাও বৃদ্ধ ভদ্রলোক নিজের মুখেই বলেন যে বহু বছর আগে আপনি কলকাতার হাসপাতালে নার্স হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন।

ওখান থেকে ফেরার পথে আমাকে একটা—দুটো ফোন করতে হয়েছে। প্রধানের থেকে নীলাদ্রির পোস্ট মর্টেম আর টক্সিকোলজি রিপোর্টটা চেয়েছিলাম। তারপর আমার এক পরিচিত ডাক্তারকে ফোন করতে উনি জলের মতো সহজ করে আমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন। এমেটিক বলে এই বিশেষ ধরনের ওষুধ আমাদের ডেলি লাইফে অতটা লাগে না বলেই হয়তো এটার ব্যাপারে খেয়ালও থাকে না। বিভিন্ন ন্যাচারাল এবং কেমিক্যাল কম্পাউন্ডের এই বিশেষ গুণ থাকে— মানুষের শরীরে প্রবেশ করে খানিকক্ষণের মধ্যেই এমন প্রতিক্রিয়া শুরু করে যে গোটা পাকস্থলি খালি করে বমি হয়ে যায়। অ্যাক্সিডেন্টালি বিষাক্ত কিছু পেটে চলে গেলে, বা ঘুমের ওষুধ জাতীয় কিছু খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা, এরকম নানা কেসে ডাক্তাররা ইমিডিয়েটলি দুটো কাজ করেন— রোগীকে কিছুতেই ঘুমোতে দেন না এবং নির্দিষ্ট পরিমাণে এমেটিক প্রেসক্রাইব করেন। আপনার ডাক্তারি জগতের অভিজ্ঞতা ছিল এবং আমার মতে আর পাঁচজনের তুলনায় আপনি মানুষ হিসাবে অনেক বেশি বিচক্ষণ ও শার্প। আপনি নিখুঁতভাবে যেমন জানতেন যে ঋজুর শরীরের ঠিক কোন জায়গায় ছুরি মারলে এক আঘাতেই তৎক্ষণাৎ কার্যসিদ্ধি হবে, তেমনই নীলাদ্রির ক্ষেত্রেও আপনার প্ল্যান ছিল নির্মম ও অভাবনীয়।

যদিও ভেরিফাই করার আর হয়তো উপায় নেই, তবে আমার ধারণা নীলাদ্রিকে আপনার নিজের স্টক থেকে বাছাই করা অ্যালকোহল অফার করার আইডিয়াটা আপনারই। কটেজের অতিথি হিসাবে সে যে বিশেষ পরিসেবা পাবে, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। ফলে সন্ধেবেলা থেকেই আপনি তার জন্য বিশেষ খাবারের বন্দোবস্ত করতে লেগে গেলেন। এই গোটা সময়জুড়ে আপনি খাবারে বা ড্রিংকে ঘুমের ওষুধ এবং ওপিঅয়েড মিশিয়ে গেছেন। ফলে নেশার মাত্রা যখন চরম, যখন নীলাদ্রির পক্ষে আর এক মুহূর্তের জন্যও চোখ খুলে রাখা বা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়, তখন আপনি দিলেন আপনার শেষ চাল। হয়তো খাওয়ার জলের সঙ্গে বা এমনি হজমের ওষুধ হিসাবে এমেটিকের একটা মোক্ষম ডোজ ওকে খাইয়ে দিলেন। এমেটিক কাজ করতে কুড়ি মিনিট থেকে আধ ঘণ্টা নেয়। ঘুমে ও নেশায় আচ্ছন্ন নীলাদ্রির শরীরে যতক্ষণ বমি হওয়া শুরু হবে, সে আর কিছুতেই সোজা হয়ে উঠে বসার অবস্থায় থাকবে না। তার আগেই সেই বমির পর্যাপ্ত পরিমাণ তার শ্বাসনালীতে জমতে শুরু করবে। নিশ্বাস নেওয়ার জন্য সে যত হাঁ করার চেষ্টা করবে, বমিতে তার শ্বাসনালী ততটাই বুজে আসবে। তিল তিল মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে অন্তত মিনিট পাঁচেক ধরে সে মারা যাবে।”

ফারুক যখন একটানা নীলাদ্রির মৃত্যুর বিশদ বর্ণনা দিয়ে চলেছে, ডলি তখন টেবিলের উপর কনুইয়ে ভর দিয়ে, দু’হাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেলেছে। আধো আলোয় বোঝা যাচ্ছে তার শরীর একটু একটু কাঁপছে, কিন্তু কান্নার শব্দ নেই। এইবার সে মুখ থেকে হাত নামাল। দু’চোখ থেকে জল বেরিয়ে গাল ভিজে রয়েছে। ডলি একবার সশব্দে নাক টেনে প্যান্টের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করল। তারপর কিছুক্ষণ সেটা মুখে চেপে ধরে রাখার পর, অনেকটা সময় ধরে ভালো করে মুখ মুছে একটু থিতু হল। ফারুক ততক্ষণে জলের গ্লাসটা আবার তার দিকে এগিয়ে দিয়েছে। তাতে সামান্যই জল আর বাকি আছে।

“এইবার আপনি আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। কেন? নীলাদ্রিকে এইভাবে কেন হত্যা করলেন? ডঃ পালের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ছিল?”

ডলি এক ঢোকে জলটা শেষ করে ফেলেছে। ফারুকের প্রশ্ন শুনে সে একবার বাঁদিকের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কটেজের দিকটা দেখল। বাড়ির দোতলার বারান্দায় আলো জ্বলায় ওই জায়গাটা এখন যথেষ্ট আলোকিত। একটুক্ষণের জন্য ডলির মুখটাও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। এবার সে উত্তর দেওয়ার জন্য যখন ফারুকের দিকে ঘুরল, তখন তার মুখ আবার ছায়ায় ঢেকে গেছে।

“আপনি যদি সত্যিই জানতে চান, তাহলে অনেক কথা বলব। সেগুলো অজুহাত নয়, কিন্তু না বললে আমি গোটাটা এক কথায় উত্তর দিয়ে বোঝাতেও পারব না।”

“বেশ তো, বলুন। আমি তো শোনার জন্যই আপনার মুখোমুখি বসে আছি।”

“আমি প্রথম কলকাতায় আসি একেবারে আশির দশকের শেষের দিকে ট্রেনি নার্স হিসাবে। তখন আমার উনিশ বছর বয়স, আমি থার্ড ইয়ারে পড়ি। আমি জানি না আপনি কতদিন কলকাতায় আছেন, কিন্তু সেইসময় কলকাতা এখনকার মতো ছিল না। সব জায়গায় এত অবাঙালি চোখে পড়ত না, বিশেষ করে হেলথ কেয়ার, হসপিটাল, এই জগতটায়। আবার আমার জায়গাটাও এখনকার মতো ছিল না। এই সব জায়গা দার্জিলিং জেলায় পড়ত। সেইসময় প্রথম গোর্খাল্যান্ড মুভমেন্ট ঘিরে মারামারি, ঝামেলা সবেমাত্র একটু থিতিয়েছে। একজন পাহাড়ি মেয়ের কলকাতা শহরে পার্সোনালি বা প্রফেশনালি সেটল করা মোটেই সহজ ছিল না। বেশিরভাগ লোক সরাসরি সন্দেহের চোখে দেখত, কেউ কেউ উপরে ভদ্রতা করলেও আড়ালে অপমানজনক কথা বলত, আর মোস্টলি সবাই এড়িয়ে চলত। আমি ঘর শেয়ার করার জন্যও কাউকে পাইনি, কারণ আমাদের নাকি চরিত্র নোংরা আর গায়ে গন্ধ।

“এরকম অবস্থায় আমি ডঃ সমীরণ পালের সংস্পর্শে আসি। মানে প্রথমে দূর থেকেই দেখি। আমি তখন সবে ট্রেনিং শেষ করছি, আর উনি মোটামুটি শহরের সবথেকে নাম করা, রেসপেক্টেবল সার্জেন। ওকে প্রথম দেখতে পাওয়ার অনেক আগে থেকেই এত কিছু শুনেছি, যেরকম লোকে ফিল্মস্টারদের নিয়ে কথা বলে! ফলে কাজের সূত্রে যখন একটু একটু করে আলাপ হয়, আমি দেখি একইসঙ্গে একজন লেজেন্ডারি ডক্টর, আর অন্যদিকে জীবনযুদ্ধে হেরে কোনোমতে বেঁচে থাকা নিঃসঙ্গ একটা মানুষ। ততদিনে ওর মদ খাওয়া নিয়ে সবাই আড়ালে কথা বলা শুরু করেছে। কিন্তু কী আশ্চর্য কেউ একবিন্দু হেল্প করার চেষ্টা করছে না! ডঃ নীলাদ্রি পাল যে ওর ছেলে সেটা বুঝতে আমার বছর ঘুরে গেছিল। বাবা—ছেলের মধ্যে সম্পর্কের কোনো রেশই নেই!

“অথচ উনি কিন্তু প্রথম থেকেই আমার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করতেন। নর্থ বেঙ্গলের নানা জায়গায় উনি জীবনের বিভিন্ন সময় ঘুরে বেড়িয়েছেন। অনেক জায়গা চেনেন, অনেক মানুষকে চেনেন, এমনকি কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো নেপালিও বলতে পারেন। ওই বয়সে ওইরকম একটা হোস্টাইল জায়গায় নিজের ভাষায় কথা বলার যে কী আরাম, আমি বলে বোঝাতে পারব না। আমার কলকাতায় আর কোনো বন্ধুবান্ধব বা কোনো সোশ্যাল লাইফ ছিল না, তাই কোনো ডিস্ট্র্যাকশনও ছিল না। আমি মনপ্রাণ দিয়ে কাজ শিখতে লাগলাম, আর সেটায় সবথেকে খুশি হলেন ডঃ পাল। কয়েক মাসের মধ্যেই আমি প্রায় ওর চিফ অ্যাসিসট্যান্টের মতো হয়ে গেলাম। আমার প্রথম সাকসেসফুল ওটি—র পর উনি আমাকে কেবিনে ডেকে একটা ছোটো সিলভার মেডেল দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এটা উনি কলেজ লাইফে স্পোর্টসে রিমার্কেবল অ্যাচিভমেন্টের জন্য পেয়েছিলেন। আজকে নাকি আমিই এটার সবথেকে ডিজার্ভিং ক্যান্ডিডেট। আমার আজকের ওটি—র পারফর্মেন্সও নাকি রিমার্কেবল। মিস্টার সিদ্দিকি, আমি জীবনে যেমন অনেক হারিয়েছি, সেরকম অনেক পেয়েওছি। আই নো মাই ব্লেসিংস, আমি ঈশ্বরের প্রতি অকৃতজ্ঞ নই। কিন্তু তাও বলব কুড়ি বছর বয়সে, ওই মুহূর্তটা আমার লাইফের গ্রেটেস্ট মোমেন্ট!

“আমাদের একটা রুটিনের মতো হয়ে গেছিল। সারাদিন দুটোর বেশি সার্জারি সাধারণত থাকত না। সন্ধ্যার পর কাজের চাপ কমে আসত, আমার নিজের ঘরে ফেরার কোনোই তাড়া ছিল না। ফলে, কখনও হসপিটালের স্টাফ ক্যান্টিনে, কখনও ডঃ পালের নিজের কেবিনে অনেকক্ষণ বসে কথা হত। ডাক্তারির বাইরেও নানারকম ইন্টারেস্টিং বিষয়ে ওর আগ্রহ আর পড়াশুনা ছিল। আমি হাঁ করে সেসব শুনতাম। চোখের সামনে আমার পৃথিবীটা বড়ো হতে শুরু করেছিল। সে এক অদ্ভুত এক্সাইটমেন্ট, অদ্ভুত নেশা! এরকম একদিন কথা বলতে বলতে অনেক রাত হয়ে গেছিল, প্রায় বারোটা। উনি রেডি হয়ে বেরোতে গিয়ে হঠাৎ পিছন ফিরে আমাকে বললেন, আজকে কথা বলতে বলতে এত মশগুল হয়ে গেছি যে সারা সন্ধ্যায় এক ড্রপ মদও মুখে ঠেকাইনি। আমি ফস করে বলে ফেলি, রোজ এমন হলেই তো ভালো হয়। উনি মাথা নেড়ে বলেন, আই এগ্রি।

“আমি পুরানো দিনের কথা বলতে গিয়ে হয়তো অনেক বেশি কথা বলে ফেলছি। কিন্তু আপনাকে বুঝতে হবে যে এটা একটা লোককে দেখে অল্প বয়সে তার প্রেমে পড়ে যাওয়া নয়। আমি ওর সংস্পর্শে এসে সত্যিই নিজেকে রোজ একটু একটু করে আবিষ্কার করছিলাম। ওই মানুষটির জন্য আমি, আমি হয়ে উঠছিলাম। আর একই সঙ্গে উনি নিজেই স্বীকার করতে শুরু করেছিলেন যে আমার সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর থেকে নাকি ওর জীবনে অনেক ইম্প্রুভমেন্ট হয়েছে। এই কথাটা যে আমার জন্য কতটা মূল্যবান! আর সত্যিই ওর অ্যালকোহল প্রবলেম নিয়ে যে লোকে গসিপ করে যেত, সেটা অলরেডি অনেক চেকে চলে এসেছিল। আমাদের দেখাসাক্ষাৎ, কথাবার্তা সবই মোস্টলি হসপিটাল প্রেমিসেই হত। অত বড়ো হসপিটাল, অত বড়ো শহর, কিন্তু যখন একসঙ্গে সময় কাটত, মনে হত পৃথিবীতে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই।

“আমি একদিনই ওর বাড়িতে গেছিলাম। সেটাও একটা দরকারে। একটা কমপ্লিকেটেড সার্জারি ছিল, পেশেন্টের বাঁচার প্রায় কোনো সম্ভাবনাই ছিল না, আর হলও তাই। বাট স্টিল, ডঃ পাল ভীষণ আপসেট হয়ে বিকেলেই বাড়ি ফিরে গেলেন। সেদিন আমার ডিউটি ছিল রাত্রে। আমি হসপিটাল পৌঁছে ওকে দেখতে না পেয়ে ফোন করি। কিছু ডিসচার্জের কাগজে ওর সইয়ের দরকার ছিল। উনি আমাকে বাড়ি চলে আসতে বলেন। আমি ন’টা নাগাদ ওর বাড়িতে যাই। বিরাট তিনতলা বাড়িতে কেউ থাকে না। উপরের একটা ঘরে একা বসে বসে ড্রিংক করছিলেন। অ্যাকচুয়ালি আমি যখন ঘরে ঢুকি, হি ওয়াজ কমপ্লিটলি ড্রাংক! কার্পেটের উপর একটা খাবারের প্লেট উলটে পড়ে আছে, টোটাল মেস! আমি চেষ্টা করি একটু জিনিসপত্র পরিষ্কার করে দিয়ে আসতে। উনি আমার সামনে দুপুরের সার্জারির কথা বলতে বলতে হঠাৎ কেঁদে ফেলেন। ওই তারিখটা ছিল ওঁর স্ত্রীর মৃত্যুবার্ষিকী।

“আমি কাগজপত্রের কথা না বলে ওর পাশে গিয়ে বসলাম। উনি অনর্গল, অসংলগ্ন কথা বলে যাচ্ছিলেন। স্ত্রীর ব্যাপারে, ছেলের ব্যাপারে, নিজের একাকিত্বের ব্যাপারে। আমি চুপ করে বসে শুনছিলাম। কলকাতা শহরের একটা নির্জন বড়োলোক পাড়ায়, একটা প্রাসাদের মতো বাড়িতে, শহরের সবথেকে প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার এবং আমার জীবনের সবথেকে ইম্পর্ট্যান্ট মানুষের হাত নিজের হাতে ধরে তার সবথেকে দুর্বল মুহূর্তের কথা শুনে যাচ্ছি। কতবার মনে হয়েছে, মানুষটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি, চুলের মধ্যে দিয়ে আঙুল বুলিয়ে আশ্বাস দিই। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, সেটা এথিকাল হবে না। আমি আগাগোড়া প্রায় দম বন্ধ করে বসেছিলাম। একসময় বোধহয় উনি ক্লান্ত হয়েই সোফায় গা এলিয়ে দেন। আমি কোনোমতে পাশের ঘরে আলনায় রাখা একটা কাঁথা এনে ওর গায়ে চাপা দিয়ে, ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। পরদিন আমি যখন সকালের দিকে হসপিটাল থেকে বেরোচ্ছি, তখন লবিতে মুখোমুখি দেখা। আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে প্রথমে বললেন, থ্যাংক ইউ! তারপর বললেন, আজ থেকে মদ বন্ধ।

“এরপর আর সাঁইত্রিশ দিন বেঁচে ছিলেন। কিন্তু নিজের কথা রেখেছিলেন, অলমোস্ট। নট আ সিঙ্গল ড্রপ! দুর্গাপুজোর সময় ছুটিতে যাওয়ার আগে আমাকে ডেকে বললেন, ক্রিসমাসের সময় আমার দেশে আসতে চান। খুব খুশি হয়ে বললাম, আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। তারপর একটু চুপ করে বললেন, তার আগে দুটো দিন যদি অন্য কোথাও একসঙ্গে কাটিয়ে তারপর যাই, তাহলে আমার কোনো আপত্তি আছে? আমার যেন গলা শুকিয়ে গেছিল, আমি কোনোমতে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেছিলাম।

“সেই কালীপুজোর রাতের ব্যাপারে আপনি অনেকটাই জানেন। এতক্ষণে এটাও জানেন যে ওটি—তে প্রথম থেকেই আমি ছিলাম। সেই পেশেন্ট এত ক্রিটিকাল অবস্থায় এসেছিল যে কিছুতেই বাঁচত না। তাও সার্জারির সময় ভুলটা ডঃ নীলাদ্রি করে এবং ডঃ পাল যখন এসে ঢোকেন, তখন চৌত্রিশ দিন হল উনি কমপ্লিট সোবার। কিন্তু তার পরদিন রাত থেকেই নানারকম কথাবার্তা কানে আসতে লাগল। শোনা যায় গভর্নিং বডির মিস্টার সিংঘানিয়া এই ইস্যুটা নিয়ে কিছু একটা বড়ো পলিটিক্স করতে চাইছে, সব ওটি স্টাফকে পয়সা বা অন্য লোভ দেখিয়ে হাত করে ফেলেছে। আমি তখন স্বপ্নেও ভাবিনি যে ডঃ নীলাদ্রি নিজে এতে ইনভলভড্ থাকবে! নিজের বাবার এগেনস্টে এরকম একটা কনস্পিরেসিতে! কীসের জন্য? টাকা? সাকসেস? আর—একটা মানুষের লাইফ শেষ করে দিয়ে?

“মিটিংটা হয়েছিল দুপুরের দিকে, পোস্ট লাঞ্চ। আমি সন্ধ্যার সময় যখন হসপিলালে ঢুকছি, তখন সবার মুখে মুখে একই কথা। মদ খেয়ে অপারেশন করতে গিয়ে রোগী মেরে ফেলার জন্য দ্য গ্রেট ডঃ পালকে ফায়ার করা হয়েছে। আমাদের ঘনিষ্ঠতার পুরোটা না জানলেও, অনেকেই জানত যে আমাদের একটা বিশেষ বন্ধুত্ব রয়েছে। এই সুযোগে একটা লোকও আমাকে কথা শোনাতে ছাড়েনি। আমার ডেস্কে কাগজপত্রের মধ্যে একটা সাদা কাগজে লেখা ছিল, ‘Drunk and a whore … birds of same feather!’ আমার মনে হচ্ছিল ছুটে গিয়ে মালিকদের অফিসের দরজা ধাক্কা দিয়ে বলে আসি, এটা মিথ্যে, ওকে ফাঁসানো হচ্ছে, আমি সব দেখেছি! কিন্তু তারপরেই মনে হয়েছিল এই শহরে কেউ আমার কথা বিশ্বাস করবে না। আমি পাহাড়ি মেয়ে, আমার চরিত্র নোংরা, আমার গায়ে গন্ধ।

“পরদিন ভোরবেলা ডঃ পালের কেবিনেই ওর বডি ডিসকভারড হয়। ঘর পরিষ্কারের লোক ঢুকে দেখতে পেয়ে, চিৎকার—চেঁচামেচি শুরু করে। বোঝা যায় একদম ভোররাতের দিকে হসপিটালে ফিরেছিলেন। পোস্ট মর্টেম হয়েছিল। অন্তত একটা গোটা বোতল হুইস্কি খেয়ে গাড়ি চালিয়ে এসেছিলেন। পথেও অ্যাক্সিডেন্ট করে মারা যেতে পারতেন। হয়তো চেয়েছিলেন তাই কিন্তু ভাগ্যক্রমে হসপিটাল পৌঁছে যাওয়াতে অন্য রাস্তা বেছে নিলেন। সবার সামনে কান্নাকাটি করলে লোকে বলাবলি করবে, তাই চুপ করে গেছিলাম। হয়তো শরীর, মাথা, সব নাম্ব হয়ে গেছিল। বেলার দিকে ডঃ নীলাদ্রির সঙ্গে করিডোরে দেখা হল। খুব ক্যাজুয়ালি মাথা নেড়ে বললেন, খুবই দুঃখজনক, কিন্তু বাবা তো এদিকেই এগোচ্ছিল! হি ওয়াজ স্টিল ক্যারিং অন উইদ দ্য লাই! আমার জীবন থেকে সবথেকে দামি জিনিস কেড়ে নিয়েছে এই লোকটা। আমার প্রিয় মানুষ আর সেই সঙ্গে একটা সুন্দর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। তারপরেও ওর সাহস হয় আমার চোখে চোখ রেখে মিথ্যে কথা বলার! কারণ আমি একটা নেপালি নার্স আর ও সিংঘানিয়ার আগামী দিনের পার্টনার। আমার ফিউচারের দাম দিয়ে ও নিজের ফিউচার কিনেছিল! আমি ওই মুহূর্তে মনে মনে ভেবেছিলাম যে কোনোদিন সুযোগ এলে ওর মাথায় গুলি করতে আমার একবারও হাত কাঁপবে না।

“তার কয়েকদিনের মধ্যেই আমি এমআরসি মেমোরিয়াল ছেড়ে দিই। ইন ফ্যাক্ট নার্সিং প্রফেশন থেকেই দূরে চলে যাই। পারতপক্ষে ওটা মেনশনও করি না, ভুলে থাকি। ওটাই হয়তো আমার কোপিং মেকানিজম। আস্তে আস্তে ভুলতেও থাকি। আমার একটা অন্য জীবন শুরু হয়, সেটা একরকম নিজের ছন্দে চলতে থাকে। আপস অ্যান্ড ডাউনস হয়। সেই দিনগুলো, সেই মানুষগুলো ধীরে ধীরে মনের কোথাও, কোনো এক কোণে হারিয়েই যায়। আনটিল ফাইভ ডেজ এগো, যখন কেশব কোঠারি ফোন করে বলে এক স্পেশাল গেস্ট নিয়ে সে এক ঘণ্টার মধ্যে আসছে।”

ডলি একটু বিরতি নিয়েছে। ফারুকের সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার টেবিলের উপরেই রাখা ছিল। ডলি সেদিকে হাত বাড়িয়েও শেষ মুহূর্তে ফারুকের দিকে অনুমতি নেওয়ার ভঙ্গিতে তাকাল। ফারুক মাথা নাড়ল। সে প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিয়ে, মাথাটা পিছন দিকে এলিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। উনুনের মতো নীচ থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উপরের দিকে উঠতে উঠতে মিলিয়ে যাচ্ছে। প্রায় মিনিট তিনেক চুপচাপ কেটে গেল। অবশেষে সিগারেটের শেষাংশ মাটিতে ফেলে, চটিতে পিষে দিয়ে, ডলি আবার ফারুকের দিকে ফিরল।

“আমাকে একটা কথা বলুন। আপনি নিজের মুখেই বলছেন যে অতদিন আগের কথা, আপনার মন থেকে প্রায় মুছেই গেছিল। এরমধ্যে কোনোদিন আর খোঁজখবরও রাখেননি। তাহলে এতদিন পরে নীলাদ্রি এখানে পা দেওয়ামাত্র চিনলেন কীকরে?”

“পা দেওয়ামাত্র তো চিনতে পারিনি। তখন ভেবেছিলাম কোঠারির ব্যাবসার সূত্রে চেনা কোনো লোক। মনে রাখবেন যে আমি যাকে চিনতাম সে নিজেকে তখনও নীলাদ্রি পাল নামেই পরিচয় দিত। সে ছিল ছিপছিপে চেহারার অল্পবয়সি এক বাঙালি যুবক— গাল ভাঙা, ঘাড়ের কাছে চুলগুলো একটু লম্বা। তার সঙ্গে এই প্রায় টাক পড়ে যাওয়া, চোখে চশমা এবং ভারী গালে ফ্রেঞ্চকাট দাড়িওয়ালা লোককে আমি কখনোই মেলাতে পারিনি। নামও লিখেছিল নীলাদ্রি চক্রবর্তী।”

“তাহলে চিনলেন কখন?”

“দুপুরবেলা খেতে বসার সময়। আপনারা সবাই এখানে ছিলেন তখন। ও কোঠারির সঙ্গে কিছু একটা কথা বলতে গিয়ে বাঁ হাতটা মাথার কাছে এনে চোখ বুজে দু’বার তুড়ি মারল। ব্যাস! ওই একটা জেশ্চার, বিদ্যুতের মতো তিরিশ বছর আগের ঘটনা চোখের সামনে দিয়ে ঝড়ের মতো বয়ে গেল। আমি বলে বোঝাতে পারব না যে ওই সময়টা আমি কীভাবে কাটিয়েছি। লাঞ্চের ব্যাপারটা মিটে গেলে আমি ঘরে ফিরে, দরজা বন্ধ করে অনেক ভাবলাম, অনেক কিছু চিন্তা করলাম। ভিতরে ভিতরে বুঝতে পারছিলাম যে আমার রাগ এতদিনে একফোঁটাও কমেনি। কোনো একটা বাক্সে বন্ধ করে রেখেছিলাম, আজ সেই বাক্সের ডালা খুলে গেছে! আমার চোখ, নাক, কান দিয়ে তখন যেন আগুন বেরোচ্ছে, যেন গতকালের ঘটনা! আমি ঈশ্বরের থেকে বেশি বিশ্বাস করি ভাগ্যে, ডেস্টিনিতে। আজ এত বছর পর সেই লোক এভাবে আচমকা আমার বাড়ি এসে হাজির হয়েছে, ভাগ্যের এই ইশারা আমি অগ্রাহ্য করতে পারব না। সেদিন সানসেটের আগে আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।

“আমার প্ল্যান আর সেটাকে যেভাবে ইমপ্লিমেন্ট করেছি, সেটা আপনি অলমোস্ট ঠিকঠাকই আন্দাজ করেছেন। স্পেশাল গেস্ট হিসাবে বাকিদের থেকে একটু আলাদা মেনু করায় কেউ সন্দেহ করেনি। ওপিঅয়েডের কথা তখন থেকেই ভেবে রেখেছিলাম তাই রাতের রান্নায় সবজি আর চিকেন, দুটোই পোস্ত দিয়ে করি। এমনকি সন্ধ্যার স্ন্যাক্সের কোটিংয়েও যথেষ্ট পরিমাণে পোস্ত দিই। ধরেই নিয়েছিলাম, পোস্ট মর্টেমে যখন মাত্রাতিরিক্ত আফিম বা তার কোনো ডেরিভেটিভের ট্রেস থাকবে, সেটার একটা ঠিকঠাক ব্যাখ্যাও থাকবে।

“প্রতিভা এসে যখন জানায় স্ন্যাক্স পৌঁছে দিয়ে এসেছে, আমি বাড়ি থেকে একটা স্কচ হুইস্কি আর একটা ভালো ভদকার বোতল নিয়ে কটেজে নক করি। আমার একটা ভয় ছিল যদি ও রিফিউজ করে। বাট হি ওয়াজ গ্রেটফুল! খুব খুশি হয়ে দাম দিতে চায় আমাকে। আমি না বলায় আমাকে আমন্ত্রণ করে ওর সঙ্গে একটা ড্রিংক শেয়ার করতে। আমি ওর ঘরে ঢুকি, আমার প্রথম স্টেপ কমপ্লিট হয়। প্রথম পেগ বেশ দ্রুত শেষ করে যখন দু’নম্বরের মাঝামাঝি, আমি সেইসময় আমার নিজের পরিচয় দিই। নীলাদ্রি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং বিন্দুমাত্র অনুতাপ তো দূরের কথা, প্রায় গোটা ব্যাপারটা ডিনাই করে। ওই অবস্থায় আমি উঠে আসি। নীলাদ্রি তখন অলরেডি তৃতীয় পেগে।”

“তাহলে ওইরকম সময়েই কেশব কোঠারি গিয়ে তার প্রস্তাব দেয় এবং নীলাদ্রির কাছে সাংঘাতিক ঝাড় খেয়ে, হতভম্ব হয়ে ফিরে আসে! যাইহোক, আপনি কন্টিনিউ করুন।”

“এরপর সাড়ে আটটা—পৌনে ন’টা নাগাদ ডিনার দিই। সেই খাবারে ঘুমের ওষুধ আর ওপিঅয়েডের কড়া ডোজ ছিল। ততক্ষণে হুইস্কির বোতল শেষ করে ভদকা খোলা হয়ে গেছে। আমি ট্রে রেখে চলে আসি, আমাদের মধ্যে কোনো কথা হয় না। এরপর আমি বাড়ি ফিরি আমার এমেটিকের স্টক বের করতে। সেইসময় বাথরুম থেকে বেরিয়ে পৃথ্বী আমাকে দেখে ওষুধের বাক্স ঘাঁটতে। ন্যাচারেলি আমাকে জিজ্ঞাসা করে কার কী হয়েছে। আমি তখন বলি যে কটেজের গেস্ট একটু অ্যান্টাসিড চেয়েছে। দুটো ট্যাবলেট নিয়ে কটেজে রেখে এসেছিলাম। আপনাদেরও একই কথা বলি।

“যাই হোক, এরপর দশটা নাগাদ গিয়ে আবার ওই ঘরে ঢুকি। ততক্ষণে ছবি বদলে গেছে। ভদকার বোতল তলানিতে। একটু ভাত আর একটা রুটি বাদে গোটা ডিনারটাই শেষ— ট্রে আর থালা বিছানার উপরেই রাখা। আর বালিশে হেলান দিয়ে ঢুলছে নীলাদ্রি। আমি গিয়ে একটু ঠেলতে কোনোমতে চোখ খুলল। বুঝলাম হুইস্কি, ভদকা, ঘুমের ওষুধ আর ওপিঅয়েডের এফেক্ট ভালোভাবেই শুরু হয়েছে। ডিনায়াল আর ঔদ্ধত্যের দেয়াল হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে। এখন সাংঘাতিক অনুশোচনা আর আমার কাছে সমানে ক্ষমা চাওয়া। এরকম মিনিট দশেক চলার পর আমি বললাম ঠিক আছে, এইসব পুরানো কথা ভুলে গিয়ে একটা নতুন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে টোস্ট করি। সামান্য ভদকা পড়ে আছে। ওইটুকু ফেলে রাখা ব্যাড লাক।

“নীলাদ্রি খুব মাথা নাড়ল। আমি ওর দিকে গ্লাস এগিয়ে দিলাম, তাতে ভদকার সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণে এমেটিক এজেন্ট মেশানো। প্রায় এক চুমুকে সেটা শেষ করে কৃতজ্ঞতাভরে নীলাদ্রি গ্লাসটা আমাকে ফেরত দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। আমি বিছানা থেকে খাবারের সরঞ্জাম ট্রেতে গুছিয়ে, বোতলগুলো শেলফের নীচে সাজিয়ে, ঘর থেকে চলে এলাম।”

ফারুক চুপ করে নীলাদ্রির জীবনের শেষ মুহূর্তের বর্ণনা শুনে যাচ্ছিল। এবার সে বলল, “ওই সময় আপনার মানসিক অবস্থা কীরকম হতে পারে, তা হয়তো খানিক আন্দাজ করতে পারি। ফলে খাবারের ট্রে ক্লিয়ার করতে গিয়ে আপনি একটা ছোট্ট ভুল করেছিলেন যেটা খেয়াল করেননি। যেমন বাইরে আলোর ব্যাপারটাও মাথায় রাখেননি।”

“কী ভুল?”

“নীলাদ্রি যেহেতু বিছানায় বসেই মদ খাচ্ছিল, ফলে ধরেই নিচ্ছি তার জলের বোতলটাও বিছানার উপরেই ছিল। সে যখন এখানে সকালবেলা চেক ইন করে, তার সঙ্গে একটা এক লিটারের বোতল ছিল। সেটা ঘরেই পাওয়া গেছে। কিন্তু লাঞ্চের পর কাউন্টার থেকে সে আর—একটা বোতল নেয়। মনে রাখবেন, আপনাদের এখানে জলের বোতল শুধু দু’লিটারেরই পাওয়া যায়। সে বিকেল থেকে সেই জলই ব্যবহার করেছে, এমনি খাওয়ার জন্য হোক বা হুইস্কিতে মেশানোর জন্যই হোক। ফলে সেই বোতলে জল নিশ্চয়ই রাতের ওই সময় অনেকটাই কমে এসেছিল। আপনি পরের দিন বয়ানে বলেছিলেন যে খাবারের ট্রে বাইরে বের করা ছিল, আপনি গিয়ে কালেক্ট করে নিয়ে এসেছিলেন। সেই ক্ষেত্রে নীলাদ্রির ঘরে দু’লিটারের জলের বোতলটা খালি অবস্থাতেও আমাদের দেখতে পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা কোনো বোতলই দেখতে পাইনি। ঘরের কোথাও না, এমনকি ডাস্টবিনেও না। আমার ধারণা ওই অবস্থায় নীলাদ্রিকে, যাকে বলে শেষবারের মতো শুইয়ে দিয়ে, আপনি যখন বিছানা ক্লিয়ার করেছেন, তখন থালা, বাটি, গ্লাস ইত্যাদির সঙ্গে জলের বোতলটাও নিয়ে চলে এসেছিলেন। ওটার কথা আলাদা করে ভাবেননি।”

ডলি ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। উপলব্ধি বড়োই বিড়ম্বনার বস্তু। সকলেই তার পথ চেয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে যখন ধরা দেয়, তখন অবধারিতভাবে দেরি হয়ে গেছে। ফারুক বেশ খানিকক্ষণ একটা সিগারেট বের করে দু’হাতের আঙুলে সেটা নিয়ে আনমনে এদিক থেকে ওদিক পাকিয়ে যাচ্ছে। সেই অবস্থাতেই আর—একটা প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, আমাকে একটা কথা বলুন। আপনি নিঃসন্দেহে আপনার অর্জিত ডাক্তারি জ্ঞান ও দক্ষতা খাটিয়ে এই প্ল্যান করেছিলেন। কিন্তু আজ আমি যখন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছিলাম, একটা ব্যাপারে উনি আমাকে একাধিকবার সচেতন করে দিচ্ছিলেন। সেখান থেকেই আমি এই প্রশ্নটা করছি, এটা আমার একটা কৌতূহল বলতে পারেন। থিয়োরিটিক্যালি আপনার প্ল্যান একটা পর্যায়ে ঠিক, কিন্তু এটা কী একেবারে নিশ্চিত যে ঘুমের ওষুধে আচ্ছন্ন মানুষ এমেটিকের প্রভাবে বমি করতে গিয়ে জেগে উঠবে না, বা দুইয়ের অন্য কোনো রিঅ্যাকশনে ওষুধগুলোর অন্য কোনো এফেক্ট হবে না? আমি জানতে চাইছি, আপনার এই প্ল্যান যদি কাজ না করত, তাহলে কী করতেন? সেটা ভেবেছিলেন?”

ডলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল। মুখে এক ঝলক বিমর্ষ হাসি।

“ইয়েস, ভেবে রেখেছিলাম। আমার একটা প্ল্যান বি ছিল। সেটা গোদা, এতটা সফিস্টিকেটেড নয়। আর আনফরচুনেটলি সেই কারণেই গোটা ব্যাপারটায় ঋজু ঢুকে আসে।”

“কীরকম?”

“আমি খাবারের ট্রে ইত্যাদি সবকিছু রেখে, আবার মোটামুটি দশ—পনেরো মিনিট পরে ফিরে আসি। আমার অ্যাপ্রনের পকেটে একটা কিচেন নাইফ। তখন ধরুন ঘড়িতে সাড়ে দশটা পার হয়েছে। এমেটিকের প্রভাব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে দশ—পনেরো মিনিট থেকে ম্যাক্সিমাম আধ ঘণ্টার মধ্যে দেখা যায়। আমি বাইরে, কটেজের আশপাশ দিয়ে, পায়চারি করতে থাকি। ভিতরে কী শব্দ হচ্ছে না হচ্ছে, সেদিকে কান খাড়া। বমির শব্দ পাচ্ছি কিনা, বিছানা থেকে উঠে পড়ার শব্দ পাচ্ছি কিনা, এইসব মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করছিলাম। যদি বুঝতে পারতাম কোনো কারণে কাজ হচ্ছে না, তাহলে শেষবারের মতো ঘরে ঢুকে, ওর গলার মোক্ষম জায়গায় ছুরি বসিয়ে দিয়ে আসতাম।

“সেইসবের প্রয়োজন হয়নি। এগারোটার একটু পরে, একটা মৃদু কিন্তু স্পষ্ট গোঙানির শব্দ পাই, প্রায় মিনিট তিনেক ধরে। তারপর সব একদম চুপ। লাস্ট আমিই আলো নিভিয়ে ওই ঘর থেকে বেরিয়েছিলাম। ফলে এবার গিয়ে ঠেলতেই দরজা খুলে গেল। লাইট অন করলাম। বিছানায় নীলাদ্রির লাশ পড়ে আছে। আমি বেশ খানিকটা গ্যাপ দিয়ে দু’বার নাড়ি চেক করে দেখেছিলাম। হি ওয়াজ ডেফিনিটলি ডেড! আমি আবার লাইট নিভিয়ে, এবার ভিতর থেকে দরজার নবটা ঘুরিয়ে, বাইরে থেকে টেনে লক করে দিয়ে চলে এলাম। কিচেন নাইফ সারা রাত আমার বালিশের নীচে ছিল। সকালে নীচে নেমে আমি ওটা জায়গামতো রেখে দিই। তখন জানতাম না আবার ওটা ব্যবহার করতে হবে।”

ফারুকের এখন চোখ বোজা; সম্ভবত মনে মনে দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করছে। এবার সে মুখ খুলল, “ঋজু নিজের সন্দেহর কথা আপনাকে কখন বলেছিল?”

“সেদিন তো আপনারা সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন অনেক বেলা অবধি। লাঞ্চ করতে করতেও দেরি হয়েছিল। লাঞ্চের আগে, আমাকে সাইডে ডেকে নিয়ে ঋজু জানায় যে আগের দিন রাতে তাস খেলার সময় ও একটা ছায়ামূর্তিকে দেখেছে কটেজের চারপাশে টানা ঘুরে বেরাতে। যেহেতু একটা দিকেই আলো পড়ছিল, ছায়ামূর্তিটা থেকে থেকে আলোর মধ্যে আসছিল, আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল। এইভাবে বেশ কয়েকবার হওয়ার পর, একসময় খানিকক্ষণের জন্য কটেজের ভিতর আলো জ্বলে ওঠে। মিনিট পাঁচেক পর আবার নিভে যায়। তারপর শেষবারের মতো ছায়ামূর্তিটা অন্ধকারে হারিয়ে যায়। ও ঘরের ভিতর থেকে, তাও বৃষ্টির মধ্যে রিফ্লেকশনে দেখেছিল, তাই চিনতে পারার প্রশ্নই ওঠে না।

“আমার শুনে বুকের ভিতরটা ধরাস করে ওঠে। কিন্তু ও বলে যে পুলিশকে এইসব কিছুই বলেনি কারণ হি হেটস কপস! কাউকেই হয়তো বলত না, কিন্তু যেহেতু আমার প্রপার্টিতে একটা মিস্টিরিয়াস ডেথ হয়েছে এবং কটেজের মধ্যেই হয়েছে, ঋজুর মনে হয়েছে অন্তত আমার জানা উচিত। আমি ওকে তখনকার মতো ব্যস্ততা এবং আশেপাশে অনেক লোকজনের অজুহাত দিয়ে চলে আসি। গোটা খাওয়ার সময়টা ধরে আমি চিন্তা করে গেছি। আমি বুঝতে পারছিলাম যে ওর মুখ বন্ধ করতে না পারলে, আমার সব প্ল্যান মাটি হয়ে যাবে। এক—একবার মনে হচ্ছিল যে যা হয় হবে, আমি পুলিশের কাছে গিয়ে সারেন্ডার করি। ট্রাস্ট মি মিস্টার সিদ্দিকি, ওই সময়টা আমার জন্য… ইট ওয়াজ মোস্ট ডিফিকাল্ট!

“কিন্তু তারপর একটা ব্যাপার ঘটে এবং ইন্সিডেন্টালি তখন আপনিও ওখানেই ছিলেন। সেদিন খাওয়ার সময় ঋজুদের টেবিল থেকে হঠাৎ জোরে জোরে কথাবার্তা শুনে আমরা দু’জনেই ওদিকে তাকাই। আশা করি আপনার মনে আছে, ঋজু ওর বাবার ফোনের ব্যাপারে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করছিল। আমি জানি না এটা আমার কোনো খামতি কিনা, কিন্তু স্রেফ নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অন্য কারওর ক্ষতি করে দেওয়াটা আমি জাস্ট বুঝতে পারি না। ওর বাবার এত কমপ্লিকেটেড একটা অসুখ, অ্যান্ড হি ওয়াজ সো মিন অ্যাবাউট ইট! ও দরকার হলে ওটা ইউজ করে ওর বাবাকে ব্ল্যাকমেল করবে বলে ভাবছিল। আমি যেন আবার চোখের সামনে ডঃ পাল আর নীলাদ্রিকে দেখতে পাচ্ছিলাম— সেই স্বার্থপরতা, সেই বিট্রেয়াল!

“ওই মুহূর্তে ঋজুর কথাগুলো শুনে আমার গোটা শরীরে একটা সাংঘাতিক ঘেন্না তৈরি হয়েছিল। মনে হয়েছিল, এরকম একজন মানুষের জন্য আমি আমার এত কষ্টে তৈরি করা জীবনটা কিছুতেই নষ্ট হতে দেব না। ইউ ক্যান ট্রাস্ট মি এগেন, এরপর হয়তো আমার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আর—একটু সহজ হয়ে গেছিল। লাঞ্চটাইমের ঘটনাটা না হলে, আমি সত্যিই জানি না কী করতাম।

“যাইহোক, লাঞ্চের পর এই জায়গাটা একটু ফাঁকা ফাঁকা হয়ে গেলে, একটা সুযোগ দেখে এইবার আমি ঋজুকে একধারে ডেকে নিয়ে আসি। ওকে বলি, তোমার কথা শুনে এখন আমারও সন্দেহ হচ্ছে। আজ একদম সকালের দিকে আমিও একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করেছি এবং একটা অদ্ভূত জায়গায়। ওই ইনকমপ্লিট কটেজের প্লাস্টিক শিটের নীচে। এখনও দিনের আলো আছে, লোক যাতায়াত আছে। তুমি যদি রাজি থাকো, তাহলে আজকে একটু রাতের দিকে, সবাই শুয়ে পড়ার পর ওখানে দেখা করি। ব্যাপারটা দেখে তুমি যদি কনফার্ম করো, তাহলে আমি নিজেই পুলিশকে জানাব। তোমার নাম নেব না। ঋজু জানতে চায় জিনিসটা কী, কিন্তু আমি বলি এখন এত কথার সময় নেই। একবারে রাত সাড়ে এগারোটার পর ওখানেই দেখা হচ্ছে।

“অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুযায়ী ঋজু এসেছিল, আমিও গেছিলাম। আমার সঙ্গে আবার সেই কিচেন নাইফ। বাকি ঘটনা আপনি একদমই সঠিক আন্দাজ করেছেন। আমাদের মধ্যে একটা শব্দেরও আদান—প্রদানের সুযোগ দিইনি।”

“আপনারা এইখানে! এরকম অন্ধকারে বসে আছেন কেন?”

হঠাৎ একটা অন্য গলার আওয়াজ শুনে দু’জনেই চমকে দরজার দিকে তাকাল। সেখানে ছায়ার মতো একটি মাঝারি আকারের অবয়ব দাঁড়িয়ে। চোখ সইয়েও কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল তাকে চিনতে। গোপাল। সন্ধ্যাবেলার চা—জলখাবারের ব্যবস্থা এত দেরি দেখে সে খোঁজ নিতে এসেছে।

“এই এবার ডাকতেই যাচ্ছিলাম। কথা বলতে বলতে একটু দেরি হয়ে গেছে। তুই চায়ের ব্যবস্থা কর। আজকে তো আংকেলের শরীরটা একটু খারাপ। স্ন্যাক্সের জন্য বরং আমি গীতাকে ফোন করে দিচ্ছি। ও কয়েক প্লেট মোমো ফ্রাই করে, ছেলের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেবে। তুই এক কাজ কর। সবার জন্য চা করার আগে, আমাদের দু’কাপ করে দে। প্লেন ব্ল্যাক টি, লাইট লিকার। চিনি, দুধ, আদা, মশলা, কিচ্ছু না।”

গোপাল হয়তো কিছু একটা আন্দাজ করেই, রান্নাঘরে ঢুকে একটা তুলনামূলক ছোটো আলো জ্বালিয়ে কাজ শুরু করেছে। সেই আলোর কিছু রেশ ফারুকদের টেবিলে এসে পড়েছে। আলো সামান্যই, কিন্তু এতক্ষণ পরে এইটুকুতেও যেন চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। রান্নাঘর থেকে নানারকম শব্দ আসছে— বাসন নাড়াচাড়া করার শব্দ, গ্যাস স্টোভ জ্বলার একটা শোঁ—শোঁ আওয়াজ, বা খালি স্টিলের বাসনে কল থেকে জল পড়ার শব্দ। আবারও, শব্দের মাত্রা খুব বেশি নয়। কিন্তু এতক্ষণ শুধু কণ্ঠস্বর আর নৈঃশব্দ্যের সংগীতের পর, এইটুকু অর্কেস্ট্রাও অতিরিক্ত মনে হচ্ছে।

ফারুক এখনও চুপ। সে ইতিমধ্যে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছে। মাথার ভিতর নানা জটিল চিন্তাভাবনার জাল টপকে, সে দ্রুত একটা সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে। কেমন যেন সেটা আন্দাজ করেই ডলি জানতে চাইল, “তাহলে? এবার কী করবেন?”

ফারুক আরও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে, সিগারেটে বেশ কিছু টান দিয়ে বলল, “নতুন কিছু তো করার বা বলার নেই।” তারপর একবার আড়চোখে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে দেখে নিয়ে, গলা আর—একটু নামিয়ে বলল, “আমার যেখানে জানানোর, সেটা আমাকে জানাতেই হবে। আমি হয়তো এখন আর ইউনিফর্ম পরি না, কিন্তু কিছু বেসিক জিনিসে কোনো পরিবর্তন হয়নি। একটাই হতে পারে, যদি আমার বদলে ফোনটা আপনি নিজেই করেন।”

“আমার কিন্তু মনে হয় পরিবর্তন হয়েছে। না হলে কাগজ—কলম, সই—সাবুদ—সাক্ষী ছাড়া এতক্ষণ বসে আমার কথা শুনতেন না। তার বদলে আমি আর—একটা প্রস্তাব দিতে পারি। আপনি শুনবেন?”

ঠিক এই সময় গোপাল একটা ট্রেতে দু’কাপ চা এবং একটা ছোটো প্লেটে কিছু চিজ বিস্কুট রেখে গেল। কথাবার্তায় বিরতি পড়ল। প্লাস্টিকের ট্রে এবং চিনেমাটির কাপ—প্লেটের মৃদু শব্দ কেটে যাওয়ার পর, ফারুক চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “কীরকম প্রস্তাব?”

“আপনার বক্তব্য অনুযায়ী আপনি পুলিশকে এই গোটা ব্যাপারটা বলবেন। তারা সেই শুনে একটা নতুন ইনভেস্টিগেশন স্টার্ট করবে। সেটার ফলাফলের উপর নির্ভর করবে, এই কেসের প্রাথমিক চার্জশিট এবং ফাইনালি ভার্ডিক্ট। মাঝে সাক্ষী—প্রমাণ ঠিকমতো জোগাড় না হলে, কেস অনির্দিষ্টকালের জন্য চলবে বা হয়তো ডিসমিস হয়ে যাবে, বা এক কোর্ট থেকে আর—এক কোর্টে গিয়ে উঠবে। আমি এবং আমার পরিবার একটা দমবন্ধ করা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাব ঠিকই, কিন্তু তারপরেও অনেককিছু অনিশ্চিত। আপনি যে জাস্টিসের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে আপনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সেটা কি এভাবে নিশ্চিত করতে পারবেন? ক্যান ইউ বি শিওর?”

ফারুক চুপ করে আছে। চিজ বিস্কুটের প্লেট যেরকম এসেছিল, সেরকমই পড়ে আছে।

“তার থেকে বরং আপনি ফোনটা করার আগে, আমাকে আধ ঘণ্টা সময় দিন।” এবার শুধু ডলির গলার আওয়াজই নেমে আসেনি, কথাগুলোও সে বলছে খুব ধীরে ধীরে, মেপে মেপে। তার দৃষ্টিও ফারুকের দিকে নয়, সে কথা বলছে চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে, “আমি শেষবারের মতো আমার পরিবারের সঙ্গে একটু সময় কাটাই। এখনও নিজের মুখে কিছু না বললেও, আমি জানি আমার মেয়ে এখান থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। ওকে আমি এমনিতেও ধরে রাখতে পারব না।”

“আমি এত কিছু হারিয়ে ফাইনালি এই লাইফটা পেয়েছিলাম! এর যেটুকু যা অবশিষ্ট পড়ে আছে, সেটাকেই দামি, দুষ্প্রাপ্য জিনিসের মতো আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। তারমধ্যে অনেক অনেক যুগ ধরে জমিয়ে রাখা একটা যন্ত্রণার একটা ক্লোজার হয়েছিল, এই তিন দিন আগে।”

ডলি একটু থামল। রান্নাঘর থেকেও কোনো শব্দ আসছে না— গোপাল বোধহয় চা ভিজিয়ে অপেক্ষা করছে। ফারুক এখনও মুখ বন্ধ করে একদৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। ডলির চোখ অবশ্য এখনও টেবিলের দিকেই। তার কপাল এবং মাথার চুলের কিছু অংশ বাদে বাকি পুরোটাই অন্ধকারে। সে যখন আবার মৃদুস্বরে কথা বলতে শুরু করল, তার গলার আওয়াজ মনে হল যেন টেবিলের ওপার নয়, বরং বহু আলোকবর্ষ দূর থেকে আসছে।

“পৃথ্বী আমার অনেক অনেক দিনের সাথি, আমার একমাত্র বন্ধু। আমার একটা লাইফের সম্ভাবনা তছনছ হয়ে যাওয়ার পরেও আমি জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ, আর সেটা পৃথ্বীর জন্য। এই গোটা ব্যাপারটা ও আমার মুখে শোনাই ডিজার্ভ করে। ওকে একটা প্রপার গুডবাই না জানিয়ে আমি কোথাও যেতে চাই না। আমি জানি এটা একদমই আপনাদের নিয়মের বিরুদ্ধে। কিন্তু এর বদলে আমি পুলিশকে সবথেকে জরুরি সাহায্য করতে রাজি। গোটা ইনিভেস্টিগেশনের সময় এবং রিসোর্স খরচা করার দরকার নেই। আমি নিজে দেখিয়ে দেব কিচেন নাইফ কোথায় রাখা আছে। আপনাদের প্রমাণ খুঁজে বেড়াতে হবে না। এমনকি ঋজুর দৃষ্টি মাটির দিকে আকর্ষণ করার জন্য যেটা ব্যবহার করেছিলাম, সেটাও আপনাদের হাতে তুলে দেব। আমাকে জাস্ট এই সময়টা দিন। কথা দিচ্ছি, পালাব না। ফ্র্যাংকলি স্পিকিং, আমার আর পালানোর কোনো জায়গাও নেই। আধ ঘণ্টা সময়।”

এই ক’দিনের এত চিন্তাভাবনা, এত রহস্যের জাল, এত জট ছাড়ানোর পরেও যেন কিছু কিছু জানা—বোঝা এখনও বাকি থেকে গেছে। ফারুকের কাছে আস্তে আস্তে সেগুলো স্পষ্ট হচ্ছে। ডলিকে সে গৃহকর্ত্রী হিসাবে দেখেছে, খুনের ঘটনার পর জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, তার আশেপাশের লোকজনের থেকে তার ব্যাপারে জেনেছে এবং অবশেষে তার সযত্নে লুকিয়ে রাখা অতীতের কথাও ফারুকের সামনে এসেছে। তার কাছে ডলির গোটা জীবনই যেন পরিষ্কার হয়ে গেছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে সে আবার নতুন করে চিনছে। এবং তার থেকেও বড়ো কথা, ফারুক নিজেকেও নতুন করে চিনছে।

“বেশ।” একটাই শব্দ কিন্তু সেটাও যখন ফারুকের গলা দিয়ে বেরোল, একটু যেন অচেনা ঠেকল।

ডলিও যে এই উত্তর আশা করেনি, সেটা তার চকিত চাহনিতেই বোঝা গেল। ফারুক চায়ের কাপ হাতেই চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। গোপাল ওদিকে একটা বড়ো ট্রেতে বাকিদের চায়ের কাপ সাজিয়ে রাখছে। এবার ডলিও আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে—মুখে এখন রান্নাঘরের আলো পড়ছে। সেখানে এখনও ছিটেফোঁটা অবিশ্বাস। ফারুক ধীর পায়ে গোপালের পিছন পিছন ডাইনিং হলের দরজার দিকে এগোল। দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার ঘুরে ডলির দিকে তাকিয়ে ইশারা করল নিজের হাতঘড়ির দিকে।

বাইরেটা তুলনামূলক বেশি আলোকিত। পাহাড়ের উপর নানা জায়গার আলো ছাড়াও রাস্তার কিছু কিছু জায়গায় আলো জ্বলছে। ওদিকে এক নম্বর ঘরের ভিতরেও আলো দেখা যাচ্ছে। তার মানে ঐশানীদের ঘুম ভেঙেছে। গোপাল ওদের দরজার দিকেই এগোচ্ছে। মাথার উপর আকাশ কালো, কিন্তু পরিষ্কার। সেখানে এখন তারাদের ভিড়। ফারুক ফুলের টবগুলোর পাশে বেঞ্চে গিয়ে বসল। এখানে বসলে নীচের কোনো বাড়ি থেকে গানের আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যায়। ফারুকের সুরটা চেনা চেনা লাগছে। কোনো জনপ্রিয় নেপালি গান, এই ক’দিনে হয়তো কানে এসেছে। সুর চিনলেও কথার একবর্ণও তার বোধগম্য নয়।

ডলিও এবার বেরিয়ে এসে ডাইনিং হলের বাইরে দাঁড়িয়েছে। বেরোনোর আগে দরজার পাশের আলোটা জ্বালিয়ে দিয়েছে। এখন তার গোটা অবয়ব সোজা এবং স্থির, দৃষ্টি চতুর্দিকে। যেন এক প্রহরী বহু যুগ বাদে ছুটি পেয়ে, তার দায়িত্ব অন্য কাউকে সঁপে দেওয়ার আগে, শেষবারের মতো তার দুর্গের চারিপাশ নিরীক্ষণ করছে। হিলটপ হেভেন হোমস্টের ডলি রাই।

ফারুকের হাতে চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে এসেছে। ডলি এবার এক পা এক পা করে সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছে। নেপালি গানটা শেষ হওয়ায় আশপাশের ঝিঁঝিপোকার ডাক আর—একটু স্পষ্ট হল। ডলি সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। ডাইনিং হলের সামনে যে এলইডি বাল্ব, তার আলো সিঁড়ির মাঝামাঝি ধাপের বেশি পৌঁছায় না। ডলি এখন প্রায় সেই ধাপে। সে একবার পিছন ফিরে সোজা তাকাল ফারুকের দিকে। ফারুকও মাথাটা ডানদিকে ঈষৎ হেলিয়ে, হাতটা অল্প তুলল। হয়তো দু’সেকেন্ড। তারপর ডলি গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে, কোলাখামের সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *