আংশিক মেঘলা – ৩য় দিন

তৃতীয় দিন

সকালবেলায় পাহাড়ের গ্রাম ঠিক মানুষের মতোই ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। এটা যত না দৃশ্যে প্রত্যক্ষ করা যায়, তার থেকে বেশি হয়তো শব্দে অনুভব করা সম্ভব। যত বেলা বাড়ে শব্দের অভিজ্ঞতা ততই প্রাকৃতিক থেকে সভ্যতার পথে এগোতে থাকে। আজ একদম ভোরের দিকে ফারুক ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় একটা চেয়ার পেতে কিছুক্ষণ বসেছিল। গাছ, মাটি, বাড়ির ছাদ ইত্যাদি বিভিন্নরকম আলাদা আলাদা জিনিসের উপর ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ার সমবেত কোরাস ছাড়াও কানে আসছিল কিছু বিক্ষিপ্ত পশুপাখির ডাক। একটা মোরগ সাড়ে পাঁচটা থেকে প্রায় টানা পনেরো—কুড়ি মিনিট নিজেকে জাহির করে গেল। সেই কোঁকড় কোঁ ডাকের মাঝে মাঝে যতিচিহ্নের মতো ভেসে আসছিল অচেনা পাখি আর দূর থেকে কুকুরের ডাক। এরপর ঘড়ির কাঁটা আর—একটু এগোতেই, আশেপাশের বাড়িঘর থেকে দরজা জানালা খোলা, রান্নাঘরে বাসনকোসন নাড়াচাড়া, প্লাস্টিকের পাত্রে কল থেকে জল ভরা বা কোথাও ক্ষীণ ভলিউমে রেডিয়োর শব্দ যোগ হতে থাকে। এইসময় থেকেই রাস্তায় অল্পবিস্তর লোক এবং গাড়ি চলাচলও শুরু হয়। ফলে খানিকক্ষণের মধ্যেই এই সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় একটা মাঝারি কোলাহল এবং প্রাকৃতিক শব্দ বলতে গেলে ঢাকাই পড়ে যায়।

এখন অবশ্য বৃষ্টি হওয়ায় প্রকৃতি ভালোভাবেই তার উপস্থিতির কথা জানান দিয়ে চলেছে। একটু আগে পেমা এসে সকালের চা দিয়ে গেছে। গতকাল এত কিছুর মধ্যেও ফারুক রাতের দিকে মনে করে ডলিকে ডেকে তার চায়ের সমস্যার কথা বলতে পেরেছিল। ফলে আজকে তার কাপে মাঝারি রকমের লিকার চা আর আলাদা বাটিতে চিনি। গত কয়েক বছর ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করছে চায়ে চিনি খাওয়ার অভ্যাসটা ছাড়ার, কিন্তু কেন কিছুতেই পেরে উঠছে না, এর উত্তর তার নিজেরও জানা নেই। আরও অদ্ভুত ব্যাপার হল, সে কফি কিন্তু খায় একদম কালো এবং ভয়ংকর তেতো। তাতে সাধারণ মানুষের অনুপাতে কফির পরিমাণ দ্বিগুণ আর এদিকে একবিন্দু চিনিও তাতে থাকে না। বহুকাল আগে রাজ্যের হোম সেক্রেটারি একবার নাকি ভুল করে ফারুকের কাপ থেকে কফি খেয়ে নিয়েছিলেন। তারপর চারটে রাজভোগ আর একটা গোটা ক্যাডবেরি ডেয়ারি মিল্ক খেয়ে ধাতস্থ হতে হয়েছিল। এরকম চিরতা খাওয়া মুখে কেন চিনি ছাড়া চা রোচে না, এই রহস্যের সমাধান গোটা কলকাতা কমিশনারেটের তাবড় তাবড় গোয়েন্দা অফিসাররাও করতে পারেনি।

আপাতত ফারুক বেশ তৃপ্তি সহকারে একদম তলানিশুদ্ধ গোটা কাপের চা শেষ করে সেটা নামিয়ে রাখল। তার ভালোলাগার আর—একটা কারণ আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তন এবং সেটা অবস্থার উন্নতির দিকে। বৃষ্টি এখনও হয়ে চললেও আকাশের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে যে মেঘের পরত গত দু’দিনের তুলনায় অনেক পাতলা হয়ে এসেছে। আজ ভোরবেলায় সূর্যোদয় দেখা না গেলেও সামনের পাহাড়ের উপর এবং আশেপাশে কালো মেঘের আড়ালে লালচে কমলা আভাস ভালোভাবেই বোঝা গেছে। এবারের মতো হয়তো দুর্যোগ সত্যিই কাটতে চলেছে। তাও ফারুক ঠিক করে রেখেছে যে একবার প্রতিভার কাছে ব্যাপারটা যাচাই করে নেবে।

গতকাল সন্ধেবেলায় আর কোনো ভাজাভুজি খাওয়ার মধ্যে না গিয়ে, আটটা বাজতে না বাজতেই ডিনার সেরে ফারুক নিজের ঘরে ফিরে এসেছিল। নানা কারণের মধ্যে একটা অবশ্যই ছিল বাকি অতিথিদের একটু এড়িয়ে যাওয়া। ফারুকের আগের কর্মজীবনের পরিচয় জানার পর থেকে সবাই যেন একটু আড়ষ্ট হয়ে আছে। সামনাসামনি পড়ে সেই আড়ষ্টতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাক, এটা সে চায়নি। তাছাড়া তখনও মাথায় নানা চিন্তা ঘুরপাক খেতে খেতে এটা—ওটার সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছিল। সেগুলোকে কোনো একটা ক্রমপর্যায়ে সাজাতে গেলেও সবকিছু থেকে একটু স্বস্তির প্রয়োজন।

ঘরে ফিরতেই অবশ্য বিপুল প্রধানের ফোন এল। তার থেকে জানা গেল যে পরদিন সন্ধ্যার আগে মেডিক্যাল রিপোর্ট পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে এই ব্যাপারে যেকোনো ধরনের তদন্তই এক অর্থে স্থগিতই থাকবে। ফারুক অবশ্য নিজে থেকে আর কিছু বলল না। সে এখনও নিজেই ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না যে তার জোগাড় করা খবরগুলো আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কিনা। পুলিশে চাকরি করার অভিজ্ঞতা থেকে সে বিলক্ষণ জানে যে প্রায় প্রত্যেক মানুষের জীবনে নানারকম গোপন, অপ্রীতিকর ঘটনা থাকে। সাধারণ লোকের তুলনায় সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষ সেইসব কেচ্ছা কেলেংকারি বেশি উদ্যম নিয়ে ঢেকে রাখতে চায় এবং রাখেও। ক্ষমতার কারণেই তাদের জন্য সেই কাজ সহজ হয়ে যায়, আবার সেই কাজে সক্ষম দেখেই তারা ক্ষমতা ধরে রাখতেও সফল হয়। তার মানে সেইসব কথা প্রকাশ্যে এলেই যে সব রহস্যের উদ্ঘাটন হয়ে যাবে, তা মোটেই নয়।

অতএব, নীলাদ্রির বাবা একজন সম্মাননীয় ডাক্তার ছিলেন এবং তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন— এই ঘটনা যতই আকর্ষণীয় শুনতে হোক, তাতে দিগ্‌বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে গা ভাসিয়ে দিলে, সমস্যার সমাধান হবে না। আর সবথেকে বড়ো কথা, এখানে সমস্যা বলতে সে যা ভাবতে চাইছে, তা আদৌ বাস্তবিক কিনা সেটাও এই মুহূর্তে প্রমাণ সাপেক্ষ। একই পেশায় থেকে দীর্ঘদিনের ব্যবধানে বাবা ও ছেলের আকস্মিক মৃত্যু— রহস্যজনক বা কাকতালীয় শুনতে লাগলেও খুব একটা অভূতপূর্ব নয়। এই পেশাই যদি সেনাবাহিনীর কাজ হত, তাহলেই এটা নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করা ছাড়া এক মুহূর্তও মাথা ঘামানোর কিছু ছিল না। একজন সফল ডাক্তারের জীবন নিঃসন্দেহে প্রত্যাশা ও কাজের চাপে জর্জরিত। সেই চাপ মাত্রাতিরিক্ত জায়গায় পৌঁছালে এরকম মর্মান্তিক পরিণতি কি খুব অস্বাভাবিক? সে আত্মহত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই হোক বা অত্যধিক মদ্যপানের ফলে দুর্ঘটনা?

তুলনামূলকভাবে ফারুক হয়তো এখনও বেশি চিন্তিত চিঠিটা নিয়ে। গোটা ঘটনায় একমাত্র ওই চিঠির প্রথম লাইনেই ক্রাইম বা অপরাধ কথাটা উচ্চারিত হয়েছে। ওই চিঠিটাই এক অর্থে একমাত্র প্রমাণ যে আশেপাশের কেউ একজন কোনো—না—কোনো অপরাধে লিপ্ত বা অপরাধের সাক্ষী। সেই অপরাধ অবশ্য যে এইখানেই সংঘটিত হয়েছে তা নাও হতে পারে। চিঠির সম্ভাব্য লেখক বা লেখিকার যে তালিকা ফারুক মনে মনে তৈরি করেছিল, সেখান থেকে অনেক ভেবে সে দেবলীনাকে বাদ দিয়েছে। তার কারণ সে যতটা সম্ভব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সেই রাতের ঘটনা মনে করে দেখেছে যে সেই ছায়ামূর্তির হাঁটাচলায় কোনো অসঙ্গতি বা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। শুরুতে একধরনের সতর্কতার জন্য ধীরে ধীরে এগোলেও, চিঠিটা ফেলে সে বেশ দ্রুতই পা চালিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেছিল। কিন্তু ছাঙ্গে ফসে পা পিছলে যাওয়ায় দেবলীনা পায়ে যে চোট পেয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি সারেনি। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের সময় ঘরে ঢুকতে—বেরোতেও সে সামান্য খোঁড়াচ্ছিল। ফলে রাতের সেই ছায়ামূর্তি আর যেই হোক দেবলীনা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

অনেক ভেবেও চিঠির ব্যাপারে ফারুক এর থেকে বেশি আর এগোতে পারেনি। নিজের ব্যক্তিগত তদন্তের এহেন গতি দেখে নিজেই বেশ মুষড়ে পড়ে আবার স্টিফেন কিং—এর বইটা খুলে বসেছিল। আগের দিন বইয়ের প্লটের সঙ্গে নিজের পরিস্থিতির সাযুজ্য আছে বলে মনে হয়েছিল। এখন প্রচ্ছদে সোনালি অক্ষরে মিজারি নামটা দেখে মনে হল তার বর্তমান অনুভূতির সঙ্গেও মিল পাওয়া যাচ্ছে। টানা অনেকক্ষণ বই পড়ে ফারুক শুতে গেছিল অনেক রাতে, কিন্তু তা সত্ত্বেও যখন একদম ভোরের দিকে ঘুম ভাঙল, সে আর বিছানায় ফেরত যায়নি।

এখন ফারুক ঘরে এসে টেবিল থেকে হাতঘড়িটা তুলে দেখল সকাল আটটা পঁচিশ বাজে। ব্রেকফাস্টের ডাক আসতে এখনও সামান্য দেরি আছে। সে ঠিক করল তাও একবার নীচে গিয়ে খোঁজ করে দেখবে আর—এক কাপ চা জোটে কিনা। নাহলে একটু পায়ে হেঁটে ঘুরে আসবে। ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে সেটাকে বগলদাবা করল। তারপর সকালের চায়ের কাপ—প্লেট এক হাতে নিয়ে, অন্য হাতে ঘরের তালা লাগাতে গেল। টিপ তালার ব্যবস্থা, চাবির দরকার হয় না। তাও এক হাতে গোটা কাজ সারতে কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় লাগল। ঠিক যেন এই সুযোগেই পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এল কেশব কোঠারি। চোখের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এরও নিদ্রাহীন রাত কেটেছে, তবে সেটা সাহিত্যচর্চার কারণে বোধহয় না। মুখের হাসিটা দেখে মনে হচ্ছে অপটু হাতে কাগজ কেটে, সস্তার আঠা দিয়ে আটকানো।

“গুড মর্নিং!”

ফারুকও একটু মাথা নেড়ে কেশবকে সুপ্রভাত জানাল।

“ফাইনালি তো মনে হচ্ছে ওয়েদার ক্লিয়ার হওয়ার দিকেই যাচ্ছে। সবার কাজকর্ম আবার নর্মালি শুরু হতে পারবে।”

বগলে ছাতা আর হাতে কাপ—প্লেট নিয়ে এবারেও সে সায় দিয়ে মাথা নাড়ল। অযথা খেজুরে আলাপ বা ভদ্রসমাজে যার নাম দেওয়া হয়েছে স্মল টক, সেটা দীর্ঘদিন শহরে থেকেও ফারুক ঠিকমতো আয়ত্ত করে উঠতে পারেনি। ফলে এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়লে, তাকে খুব তাড়াতাড়ি মাথার ভিতর কিছু কথার পিঠে কথা তৈরি করে নিতে হয়। এবারেও মুখ খোলার আগে সে কয়েকটা বাক্য একটু ঝালিয়ে নিল।

“আপনারও তো বোধহয় দুটো দিন একদমই নষ্ট হল।”

“তা তো হল ঠিকই। কিন্তু কী বলুন তো? আমি সবসময় পজিটিভ থাকি। কাজ দু’দিন হল না ঠিকই, কিন্তু এই যে এখানে এসে থাকা হল, নতুন নতুন লোকের সঙ্গে আলাপ হল— এই রিলেশনগুলোর কি কোনো দাম নেই?”

“আপনি এখানে আগেও থেকেছেন তো?”

“ইয়েস ইয়েস! থেকেছি।” ফারুকের প্রশ্নে কেশব ক্ষণিকের জন্য যেন খেই হারিয়ে একটু থতমত খেয়ে নিজেকে আবার সামলে নিল। “কিন্তু এসব জায়গা প্রত্যেকবার নতুন লাগে, এত ফ্রেশ! আর প্রত্যেকবার তো লোকজন এক থাকে না ফারুকসাব। এই এবারেও ধরুন না, আপনার মতো এত ইন্টারেস্টিং একজনের সঙ্গে আলাপ হল!”

“আরে না না, সেরকম কোনো—”

“কী বলছেন ফারুকসাব? ক্যালকাটা পুলিশের একজন অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার! তিনি এরকম একটা জায়গায় আমারই পাশের ঘরে এত সিম্পলভাবে আছেন, এ তো আমি ভাবতেই পারছি না। আর আপনার চালচলনে, হাবভাবে কোনো অ্যাটিচুড নেই, এক ফোঁটা না। কিন্তু কাল ক্রাইসিসের মোমেন্টে এক সেকেন্ডে পালটে গিয়ে আপনি যেইভাবে পুরো সিচুয়েশনের চার্জ নিলেন, হ্যাটস অফ টু ইউ!”

“সিচুয়েশনের চার্জ কিন্তু লাভা থানার অফিসারের হাতে। আমার আগের পরিচয় জেনে উনি আমাকে ভদ্রতা করে ইনভাইট করেছেন, এইটুকুই। আর পুলিশে কাজ করলে হোমস্টেতে থাকা যায় না আপনাকে কে বলল? আপনার কি পুলিশের সঙ্গে খুব ওঠাবসা আছে?”

“না, না, একদমই না। আমি আমার কামকাজ নিয়ে থাকি। বাট লাইক আ ডিউটিফুল সিটিজেন, আই রেসপেক্ট দ্য ল! যেমন মেডিক্যাল প্রফেশন। ইমেন্স রেসপেক্ট! আমি কাল থেকে ডঃ চক্রবর্তীর ব্যাপারটা মাথা থেকে কিছুতেই বের করতে পারছি না। এটা সোসাইটির জন্য কী লস ভাবুন তো!”

“হ্যাঁ, খুবই দুঃখজনক ঘটনা—”

“এই ঘটনার জন্য কে একজ্যাক্টলি রেসপন্সিবল, ইনভেস্টিগেট করে তা নিশ্চয়ই আপনারা বের করবেন। কিন্তু আমি শুধু ভেবে যাচ্ছি যে আমিই ওনাকে এখানে টেনে আনলাম। আমি যদি সাজেস্ট না করতাম, তাহলে হয়তো উনি অন্য কোথাও ব্যবস্থা করতেন, হয়তো ঠিকঠাক থাকতেন।”

“আপনি আবার ভুল করছেন, মিস্টার কোঠারি। এখনও কিন্তু এমন কোনো কারণ নেই যে আমাদের রেসপন্সিবিলিটির কথা ভাবতে হবে। আপাতত একজনের আচমকা মৃত্যু কীভাবে কখন হল, সেটা ঠিক করে জেনে নেওয়ার প্রাথমিক তদন্ত চলছে— এটা প্রোটোকল। আপনার কাছে কি এমন কোনো তথ্য বা এমনকি ধারণাও আছে, যাতে মনে হয় এখানে আসার জন্যই ডঃ চক্রবর্তীর মৃত্যু হয়েছে? যদি না থাকে, তাহলে অযথাই এই গিল্টের বোঝা নিজের মাথায় চাপাচ্ছেন।”

“ঠিক ঠিক, আপনি একদম ঠিকই বলছেন। আসলে এরকম অবস্থায় মাথায় সব গুলিয়ে যায়। আমরা অর্ডিনারি লোকজন, আমাদের এরকম ক্রাইসিসের এক্সপেরিয়েন্স নেই বললেই চলে। এই আপনার সঙ্গে কথা বলে মাথাটা একটু পরিষ্কার হল, মনটাও হালকা হল। মানে এই অবস্থায় যতটা হালকা হতে পারে আরকি।”

“যাক, আপনার একটু কাজে আসতে পেরে খুবই ভালো লাগল। যদি কিছু মনে না করেন, আমি একটু ডাইনিংয়ের দিকে এগোই?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, শিওর! ভেরি সরি আপনাকে এতটা সময় আটকে রাখলাম। অ্যান্ড ওয়ান্স এগেন থ্যাংক ইউ সো মাচ!”

ফারুক এরমধ্যে নীচে নামার সিঁড়ির দিকে তিন পা এগিয়েও গেছে। সে কেশবের শেষ কথার উত্তর দেওয়ার জন্য আর পিছনে ফিরল না। ওই অবস্থাতেই এক হাত তুলে তাকে আশ্বস্ত করে আরও জোরে পা চালিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। ডাইনিং হলে ঢোকার মুখেই দেখা হল পৃথ্বী রাইয়ের সঙ্গে। পৃথ্বী বলল যে সকালের আলু পরোটা আর চাটনি রেডি। ডলি এখন সেসব পরিবেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মিনিট দশেকের মধ্যে ব্রেকফাস্ট রেডি হয়ে যাবে। ফারুক একটু কিন্তু কিন্তু ভাব করে আর—এক কাপ চা খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায়, পৃথ্বী তাকে এক অন্য প্রস্তাব দিল।

“আপনি বরং আমার সঙ্গে বাড়ি চলে আসুন। আমিও এক কাপ চা খাব ভাবছিলাম। একটু বেশি করেই বানিয়ে নেব।”

“আপনার কোনো অসুবিধা হবে না তো?”

“কিচ্ছু না। দেখুন, এখানে রান্নাঘর আমি সামলাই ঠিকই। কিন্তু আমি যদি এখন ডলির কাজের মধ্যে ওখানে ঢুকি, কপালে দুঃখ আছে। তার থেকে এই ভালো।”

ফারুক আর কথা না বাড়িয়ে পৃথ্বীর পিছন পিছন আবার ওই সিঁড়ি বেয়েই ডানদিকে নিজের ঘরের দিকে না ঘুরে একদম উপর অবধি উঠে গেল। সেখান থেকে বাঁদিকে একটা অসমতল রাস্তা সামান্য এঁকেবেঁকে গিয়ে উঠেছে রাই পরিবারের বাড়ির একদম দোরগোড়ায়।

সুন্দর ছোটো ছিমছাম দোতলা বাড়ি। দূর থেকে মেঘলা আবহাওয়ায় দেয়ালের রং সাদাই মনে হত। এখন কাছ থেকে দেখে বোঝা যাচ্ছে সেটা খানিক মলিন হয়ে যাওয়া হালকা হলুদ। দরজা জানালা বেশ মানানসই সবুজ রঙের আর দোতলার সামনের দিকটা ঢেকে রেখেছে লাল টালির তিনকোনা ছাদ। মাটি থেকে দুটো ধাপ উঠে একতলার বারান্দা। সেখান থেকে কয়েক পা এগিয়ে, ডানদিকে একদম কোণের সিঁড়ি বেয়ে পৃথ্বী আর ফারুক দোতলায় উঠে এল। দোতলার টানা বারান্দা জুড়ে কোমর সমান উঁচু সাদা রেলিং। রেলিংয়ের গায়ে লোহার রিং ঝালাই করে, তাতে ফুলের টব বসানো আছে। এছাড়াও রেলিংয়ের উপরে আংটা দিয়ে ঝোলানো অবস্থায় এবং মেঝেতে সারি দিয়েও প্রচুর ফুলের টব। সব মিলিয়ে টবের সংখ্যা পনেরোর বেশিই হবে। প্রত্যেকটিতেই যত্ন আর পরিচর্যার ছাপ স্পষ্ট। ফলে লাল, হলুদ, সাদা, বেগুনি, নীল ইত্যাদি মিলিয়ে পুরো জায়গাটায় একটা রঙের বিষ্ফোরণ হয়েছে। এই ধূসর আবহাওয়াতেও বারান্দাটা ঝলমল করছে।

একটা গদি দেওয়া ফোল্ডিং চেয়ার পেতে ফারুককে বসতে দিয়ে, পৃথ্বী গেল বারান্দার একদম শেষপ্রান্তে রান্নাঘরে চায়ের জল বসাতে। চেয়ারে গা এলিয়ে বসায় ফারুকের চোখ উপর দিকে গেল। সেখানেও শৌখিনতার অভাব নেই। ফুলের টবগুলোর মাঝে যে দূরত্ব, সেই হিসাব করে সুদৃশ্য সব হোল্ডারে আলো লাগানো আছে। অর্থাৎ রাতেও এই বাগানের জৌলুস বিন্দুমাত্র কমার সম্ভাবনা নেই। রেলিংয়ের ওপারে হোমস্টের অনেকটাই দেখা যায়। একদম সোজা তাকালে বড়ো ডাইনিং হলটাই চোখে পড়বে। তারপর দৃষ্টি ডানদিকে সরালে কটেজ আর বাঁদিকে সরালে বাকি অতিথিদের থাকার জায়গাও দিব্য দেখা যাচ্ছে। যেমন এইমাত্র মিস্টার দত্ত তাঁর মেয়েকে নিয়ে খাওয়ার জায়গার উদ্দেশ্যে হাঁটা লাগালেন।

রান্নাঘর বাদেও এই বারান্দার উপর আরও দুটো বড়ো বড়ো ঘর আছে। চেয়ারে বসা অবস্থায় উঁকি দিয়ে যেটুকু বোঝা যাচ্ছে তাতে প্রথমটা বসার ঘর এবং পরেরটা শোয়ার ঘর বলেই মনে হয়। দুটোই যে খুব যত্ন নিয়ে পরিপাটিভাবে সাজানো সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শোয়ার ঘরের ভিতরে, অপর প্রান্তে, একটা দরজা দিয়ে সম্ভবত আর—একটা ছোটো বারান্দায় যাওয়া যায়। একটা খুট শব্দ পেয়ে মাথা ঘুরিয়ে ফারুক দেখল যে পৃথ্বী একটা ছোটো ফোল্ডিং টেবিল খুলে পেতে রাখছে।

“আরে, আপনি এত ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন কেন?” ফারুক একটু বিব্রতই বোধ করল। “ব্যস্ততার কিছু নেই। আমরাও এখানে বসেই চা খাই। আর তার জন্য একটা টেবিল তো লাগবেই।” “আপনাদের বাড়িটা অপূর্ব সুন্দর। আমি ডলি ম্যাডামকেও আলাদা করে বলব।” “অবশ্যই বলবেন। সব আইডিয়া ওর। আমি হলাম মেনটেন্যান্স স্টাফ!”

এই সময় উপরের সিঁড়ি দিয়ে প্রতিভা নেমে এল। বাড়ির ভিতর যেই সিঁড়ি দিয়ে তারা দু’জন দোতলায় উঠেছে, সেই সিঁড়িটাই আর—এক ধাপ উপরে উঠে গেছে। হয়তো চিলেকোঠা গোছের কোনো ঘর আছে। শেষ ধাপে এসে বারান্দায় ফারুককে বসে থাকতে দেখে প্রতিভা এক মুহূর্তের জন্য একটু অপ্রস্তুত হয়ে আবার পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর নিজের বাবার উদ্দেশ্যে নেপালি ভাষায় কিছু একটা বলল। এর ফলে একটা ছোটো কথোপকথন শুরু হল যেখানে চা, মা, দেরি হওয়া, এরকম টুকরো টুকরো কিছু কথা ছাড়া কিছুই ফারুকের বোধগম্য হচ্ছিল না। তার মুখের ভাব লক্ষ করে পৃথ্বী একটু হেসে বলল যে গতকালই তার সবজি বাগানে কিছু কাজ ছিল, যেটা এবেলা না করলে একেবারেই দেরি হয়ে যাবে। ফলে একসঙ্গে বসে চা খাওয়ার প্ল্যান আপাতত মুলতুবি রেখে তাকে ছুটতে হবে। তাদের সবজি বাগানটা কটেজের পিছন দিকের জমিতে। ফারুকও একটু ঝুঁকে পড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল একটা বড়ো এলাকা জুড়ে বেড়া দেওয়া আছে যেখানে শালগম বা কপি জাতীয় কিছুর একটা চাষ করা হয়েছে।

প্রতিভা এর মধ্যে ফারুক আর পৃথ্বীকে তাদের নির্দিষ্ট চায়ের কাপ হাতে ধরিয়ে, নিজে এক ঝুড়ি মটরশুঁটি আর—একটা ফাঁকা বাটি নিয়ে টেবিলের উলটোদিকে বসল। পৃথ্বী চায়ে চুমুক দিতে দিতে নীচে নেমে গেল। সেদিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফারুক প্রতিভার দিকে ফিরল।

“তোমার বাবার সামনে অনেক ভেবেও বলে উঠতে পারলাম না। গতকাল বিকেলে হাঁটতে বেরিয়ে একটু নীচের দিকে একটা দোকানে বসে কিছুক্ষণ কথা বলছিলাম। সেখানে তোমার ভাইয়ের ব্যাপারে জানতে পারলাম।”

“ভাই না, দাদা। এখন তো বেশ অনেকদিনই হয়ে গেল।” প্রতিভা নিবিষ্টচিত্তে মটরশুঁটি ছাড়িয়ে চলেছে। এর মধ্যেই বাটির ভিতরটা সবুজ দানায় ভরে গেছে, আর টেবিলে খোসার একটা ছোটো স্তূপ তৈরি হয়েছে।

“তুমি তো বোধহয় তখন স্কুলে পড়তে।”

“হ্যাঁ, কিন্তু লকডাউনে বাড়ি চলে এসেছিলাম। তখনও অনলাইন ক্লাস চালু হয়নি। আমাদের টুয়েলভের বোর্ড পরীক্ষা হবে কি হবে না, এসব নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে টেক্সট করতাম। আমাদের একটা ছোটো ড্যান্স গ্রুপ ছিল। একসঙ্গে রিহার্সাল করে মাঝেমাঝে টিকটক ভিডিয়ো বানাচ্ছিলাম। ওরকম একটা সেশনের মধ্যে একদিন দাদার ভিডিয়ো কল আসছিল। ও বোধহয় তখন বাড়িতে একা একা বোর হত। আমি কল কেটে দিয়ে মেসেজ করেছিলাম যে পরে করব। তারপর ভুলে গেছিলাম, আর করা হয়নি। দাদাও আর মনে করায়নি। এরপর বোধহয় আর চার—পাঁচ দিন। শেষ খবর দিয়ে ফোন যখন এল, আমি নীচে আমার এক মাসির বাড়ি গেছিলাম কিছু শাক দিয়ে আসতে। মেন রোড থেকে দেখলাম বাড়ির সামনে ভিড় হয়ে আছে। তখন এমনিতে কেউ খুব একটা বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে না। আমার দেখেই মনে হল খারাপ কিছু হয়েছে। দৌড়ে উঠে এসে দেখি মা ওখানে মাটিতে শুয়ে চিৎকার করছে আর বাবা মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মার পিঠে মুখ গুঁজে রেখেছে।”

ফারুক প্রতিভার আঙুল অনুসরণ করে একতলার দিকে তাকাল। সিঁড়ি আর ডাইনিংয়ের মাঝামাঝি একটা জায়গা। সেখানে এখন এক ধারে একটা ভাঙা বালতি। সেটার ভিতর একটা লম্বা হাতলের ঝাঁটা আর পাশে ফিনাইল জাতীয় জিনিসের দুটো বোতল রাখা।

“তোমার বাবা তো যা বুঝলাম তারপর থেকে এখানকার সোশ্যাল লাইফ থেকে একদমই নিজেকে সরিয়ে ফেলেছেন। আমাদের মতো বাইরের লোকের সঙ্গে শুধু কথা বলেন। স্বাভাবিকভাবেই ছেলের প্রসঙ্গ তোলেন না।”

“কেউই তোলে না। আপনি আজ বললেন দেখে এই বাড়িতে বোধহয় তিন বছর পর দাদাকে নিয়ে কথা হল। এমনিতে সব ছবি ঢুকিয়ে রাখা আছে। ওর জামাকাপড়, বই, সিডি, পোস্টার, সবকিছু বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটা সুন্দর দেখতে ডিপ পার্পলের টি—শার্ট ছিল। ওটা আমি লুকিয়ে সরিয়ে রেখেছি। বাইরে কোথাও সেটল করলে, গায়ে দেব। এটা প্লিজ বাবামাকে বলবেন না।”

“একদমই না। ওঁরা যে কীসের মধ্যে দিয়ে গেছেন, বা আজও যাচ্ছেন, আমার পক্ষে সেটা কল্পনা করাও সম্ভব নয়। সেখানে তোমার বাবা যদি এরকম ডেলিবারেট ভুলে যাওয়া দিয়ে এই ট্র্যাজেডির সঙ্গে কোপ করতে চান, আমি কেন বাধা দেব?”

“এটা ঠিকই বলেছেন। বাবা একদম স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার অ্যাপ্রোচ নিয়েছে। হয়তো খানিকটা সফলও হয়েছে। আজকাল মাঝেমাঝে কাজের মধ্যে থাকলে বা গেস্টদের সঙ্গে গল্প করার সময়, বাবাকে প্রায় স্বাভাবিকই মনে হয়। আমার চিন্তা মাকে নিয়ে। মা এক মুহূর্তের জন্যও ভোলেনি।”

“সেটা কেন মনে হয়? যেহেতু তুমিই বললে যে দাদাকে নিয়ে বাড়িতে কোনো কথাই হয় না, তাহলে কী থেকে বুঝলে?”

“খুব স্পষ্ট করে বলতে পারব না। এক হচ্ছে শুরুর দিকে তো থেকে থেকেই কথা উঠত আর কান্নাকাটি হত। তখন মা বলত যে মা—ই নাকি জোর করে ব্যাঙ্গালোরে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পাঠিয়েছিল। দাদার ইচ্ছে ছিল শিলিগুড়িতে ম্যাক বলে একটা ইনস্টিটিউটে অ্যানিমেশন নিয়ে পড়বে। এরপর একদিন বাবা—মার সাংঘাতিক ঝগড়া হওয়ার পর মা এই নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেয় ঠিকই কিন্তু আমি বুঝতে পারি আমাকে নিয়ে মায়ের একটা নতুন অ্যাংজাইটি তৈরি হয়েছে। সারাক্ষণ মায়ের চোখের সামনে থাকতে হবে। এমনিতে আমাকে কোনো কাজে বাধা দেওয়া বা শাসন করা, সেসব কিছু নেই। কিন্তু যদি বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গেও ফোনে কথা বলি, সেটাও পারলে মায়ের সামনে বসে বলতে হবে।”

“কিন্তু এটা তো তোমার পক্ষে করে যাওয়া সম্ভব না। তুমি এরপর পড়তে যাবে। বা এখনও হোমস্টের নানা কাজে এদিক—ওদিক তো যেতে হয়। তখন?”

“চিৎকার করে ডাকে। একটু কান খোলা রাখলেই শুনতে পাবেন। এখন রান্নাঘরের জানালা দিয়ে সামান্য হলেও দেখা যাচ্ছে, তাই। নাহলে এতক্ষণে ডাকাডাকি করে বাড়ি মাথায় উঠে যেত। মাঝেমাঝে লজ্জায় পড়ে যেতে হয়। এই পরশুদিনই সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টির সঙ্গে হাওয়ার তেজ এমন বেড়ে গেল যে ডাইনিংয়ের দক্ষিণ দিকের জানালা দিয়ে জল ঢুকে সব ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। বড়ো টেবিলটা, দুটো মাঝারি তাক, এগুলো একদম জানালা ঘেঁষে রাখা থাকে। আমি বাড়িতে ছিলাম। সেখান থেকে দৌড়ে গেছি জানালা বন্ধ করতে। অনেকগুলো জানালা, হাওয়ায় বন্ধ করতেও টাইম লাগে। এরমধ্যে মা বাড়িতে এসে আমাকে না পেয়ে ডাকাডাকি করে, উদ্ভ্রান্তের মতো তারপর ছোটাছুটি করে কী অবস্থা! ফাইনালি দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরে প্রায় কেঁদেই ফেলল। ওখানে সবাই বসে তাস খেলছিল। এমব্যারাসিং! আমি কাজ শেষ না করেই ওখান থেকে চলে এলাম। এরকম আগেও অনেকবার হয়েছে। আমি জানি না এখান থেকে শিফট করলে মা কীভাবে কোপ করবে। অনেকবার বলার চেষ্টা করেছি, শহরে গিয়ে ভালো কোনো স্পেশালিস্টের কাছে কাউন্সেলিং করাও। কিন্তু সেই ব্যাপারে আবার ভীষণ ইগো। কিছুতেই নিজের কোনোরকমের দুর্বলতা মেনে নিতে পারে না।”

মিনিট দশেক পর গরম ধোঁয়া ওঠা আলু পরোটার প্লেট সামনে নিয়ে ফারুক ডলির কথা ভাবছিল। গত দু’দিনে সামনে থেকে দেখে আর লোকমুখে শুনে সে বুঝেছে যে ডলি শারীরিক ও মানসিকভাবে একজন শক্তিশালী নারী। তাকে শুধু এই ব্যাবসা দাঁড় করাতেই বিভিন্ন বাধার মোকাবিলা করতে হয়েছে। তার আগেও নিশ্চয়ই হয়েছে, সব তো আর ফারুক জানে না। কিন্তু এই একটা মৃত্যু মানুষটিকে ভিতর থেকে আমূল পালটে ফেলেছে। এখন একই অবয়বের মধ্যে দুটি মানুষ বাস করছে, যারা একে অপরকে মেনে নিতে অক্ষম। কোনো মনোবিদের সাহায্যে হয়তো বা এই বোঝাপড়া সম্ভব। আর না হলে, সত্যিই যখন প্রতিভা এই গ্রাম ছেড়ে পড়াশুনা বা চাকরির জন্য অন্যত্র চলে যাবে, সেই আঘাতে হয়তো গোটা অবয়বটাই ভেঙে পড়ে যাবে। ফারুক বাঁদিকে তাকালে দেখতে পাচ্ছে রান্নাঘরে ডলি মন দিয়ে খাওয়া বাসনগুলো গুছিয়ে সিঙ্কে নামিয়ে রাখছে। আজকে বোধহয় সবাই ফারুকের আগে ব্রেকফাস্ট সেরে ফেলেছে। সে যখন খেতে ঢুকেছে, তখন কেশব ছাড়া আর কাউকেই দেখতে পায়নি। তাও কেশব ততক্ষণে খাওয়া শেষ করে বেসিনের দিকে যাচ্ছিল হাত ধুতে।

“আপনাকেই খুঁজছিলাম। ঋজুকে দেখেছেন?”

চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকায় কোন ফাঁকে যে জয়দীপ আর দেবলীনা ঘরে ঢুকেছে, সেটা ফারুক খেয়ালও করেনি। প্রশ্ন শুনে মুখ তুলে দেখল দু’জনের চেহারাতেই স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। ঘাড় ঘোরালে জানালা দিয়ে বাইরে দেখা যাচ্ছে ঐশানী আর কৃতিকাও গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে।

“না, সকাল থেকেই দেখিনি। তোমাদের কাউকেই দেখিনি। কী হয়েছে?”

“কাল রাতে আমরা এক ঘরে ছিলাম। ঋজু আলাদা ঘরে একা শুয়েছিল। আজ সকালে উঠে দেখতে না পেয়ে ভেবেছিলাম এদিক—ওদিক কোথাও আছে। কিন্তু অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পর যখন এল না, ফোন করতে শুরু করলাম। কিন্তু ফোন টানা বেজে যাচ্ছে। কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।” দেবলীনার গলা খুবই বিপর্যস্ত শোনাল।

“কোথাও হাঁটতে বেরোয়নি তো? আজ কিন্তু ওয়েদার তুলনামূলক ভালো। ফোন হয়তো সাইলেন্ট অবস্থায় ঘরেই কোথাও আছে। ভালো করে দেখেছ?”

এর মধ্যে ডলিও রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে মেয়েদের থেকে কেশব আর প্রতিভাও সম্ভবত গোটাটা শুনেছে। সবারই মুখ চিন্তিত। “ঋজুকে আপনি চেনেন না। এক নম্বরের ল্যাদখোর। ঠেলে বের করা যায় না। কোনো হিলস্টেশনে এসে আজ অবধি সানরাইজ দেখেনি। জিজ্ঞেস করলে বলে ও নাকি সানসেট বেশি পছন্দ করে। এই ছেলে একা একা বৃষ্টি কমেছে বলে পাহাড়ে হাঁটতে বেরিয়ে যাবে, এটা ইমপসিবল! আর আমরা ঘর, বাইরের বারান্দা, বাথরুম, এই ডাইনিং, সব তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখেছি। ঋজুর ফোন কোথাও নেই।”

“দেখ সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে কিন্তু একটা প্রাপ্তবয়স্ক লোকের ব্যাপারে মিসিং ডায়ারি করা সম্ভব নয়। তুমি ঋজুর নম্বরটা আমাকে দাও। আমি আনঅফিশিয়ালি কিছু করতে পারি কিনা দেখছি।”

নম্বরটা সেভ করে ফারুক একবার এমনিই ফোন করে দেখল। সত্যিই ফোন বেজেই চলেছে, কোনো উত্তর নেই। গোটাটা রিং হয়ে বন্ধ হওয়ার পর ফারুক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “এক কাজ করি। দু—তিনটে গ্রুপে ভাগ হয়ে আমরা আর—একবার ফাইনালি আশেপাশে ভালো করে খুঁজে দেখি। হয়তো সত্যিই হাঁটতে গিয়ে কোথাও জখম হয়ে পড়ে আছে, অথবা সিরিয়াস চোট পেয়ে জ্ঞান হারিয়েছে। এক—দেড় কিলোমিটারের মধ্যে যদি খুঁজে না পাই, তাহলে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। আপাতত সবাই রেডি হও। পাঁচ মিনিটে বেরোব।”

ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে যে যার নিজেদের ঘরের দিকে সবেমাত্র দু’পা ফেলেছে, এমন সময় একটা আর্তনাদ কানে এল। গলাটা পৃথ্বী রাইয়ের। শব্দটা আসছে পিছনে কটেজের দিক থেকে। কালবিলম্ব না করে সবাই দৌড় লাগাল সেই দিকে। দূরত্ব বেশি নয়। দশ সেকেন্ডের মধ্যে গোটা দলটা গিয়ে হাজির হল যেখানে পৃথ্বী ফ্যাকাশে মুখে একটা কোদালের উপর ভর দিয়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। সবাইকে দেখে সে আঙুল তুলে প্লাস্টিকের শিট দিয়ে ঢাকা অসম্পূর্ণ কটেজের কাঠামোর দিকে দেখাল। এটা নীলাদ্রির কটেজের ঠিক পিছনেই তৈরি হচ্ছে। আপাতত খুঁটির উপর দু’দিকে কাঠের অস্থায়ী দেয়াল তোলা হয়েছে। বৃষ্টির কারণে পুরোটাই নীল রঙের প্লাস্টিক দিয়ে মুড়ে বেঁধে রাখা।

ফারুক আর কেশব দু’দিকে দুটো দড়ির গিঁট খুলতেই প্লাস্টিক আলগা হয়ে এল। সেটা পর্দার মতো তুলে সবাই ভিতরে ঢুকতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মাটিতে উপুর হয়ে পড়ে আছে ঋজু। বাঁ হাতটা একটু বেকায়দায় শরীর থেকে বেরিয়ে আছে। সেই হাতের থেকে ছ’ইঞ্চি মতো দূরে তার মোবাইল ফোন। গোটা দৃশ্য এতটাই অস্বাভাবিক যে এই দেহে প্রাণ বলে যে কিছুই অবশিষ্ট নেই, সেটা বোঝার জন্য ঘাড়ের কাছে গভীর ক্ষতস্থান আর তার আশেপাশে জমাটবাঁধা রক্তের দিকে না তাকালেও চলে।

ঘটনার আকস্মিকতা আর ভয়াবহতা যেন ফারুকের সব ইন্দ্রিয়গুলোকে সাময়িকভাবে অকেজো করে দিল। তার পাশে দাঁড়ানো দেবলীনার আতঙ্কিত চিৎকারটাও মনে হচ্ছিল অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে।

***

আবারও একই ঘর, একই মানুষ, একই প্রশ্নের পালা। একদল শহুরে মানুষ এই নির্জন পাহাড়ি গ্রামে জড়ো হয়ে কীভাবে যেন তাদের নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন পুনরাবৃত্তির রুটিন সঙ্গে নিয়ে এসেছে। পুলিশে খবর দেওয়া এবং পুলিশের এসে পৌঁছানো, সবই যেন আজ আরও তাড়াতাড়ি আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে হল। হোমস্টে পৌঁছে মৃতদেহ পরীক্ষা করা, আশপাশের জায়গা প্রাথমিকভাবে ঘুরে দেখা আর মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা সব কাজেই যেন পুলিশকে আজ বেশি অভ্যস্ত আর দক্ষ মনে হচ্ছে। এমনকি গাড়িটাও আজ একবারে ব্যাক গিয়ারে পিছিয়ে এনে পার্ক করা হয়ে গেল। ডঃ সেন আজকে আসেননি। তিনি খুব সম্ভবত নীলাদ্রির পোস্টমর্টেম নিয়ে ব্যস্ত। তাঁর বদলে এসেছে এক ছোটোখাটো চেহারার নেপালি তরুণ— নাম পোখরেল।

তারুণ্যের জন্যই হোক বা স্বভাবগত কারণে, ডঃ পোখরেলের কাজের বা কথা বলার ধরনে একটা নার্ভাস ছটফটে ভাব আছে। মৃতদেহ পরীক্ষা করে দেখে, অনেকবার মুখের অভিব্যক্তি বদলে, অজস্র ডাক্তারি পরিভাষা ব্যবহার করে সে জানাল যে মৃত্যু অন্তত আট থেকে দশ ঘণ্টা আগে হয়েছে, অর্থাৎ রাত দেড়টা—দুটো নাগাদ। মৃতদেহ গোটা রাত বাইরেই ছিল, এভাবে মাটিতে উপুর হয়ে। শরীরের পিঠের দিক আর সামনের দিকের মধ্যে পার্থক্য খালি চোখেই সুস্পষ্ট।

আপাতত দেখে মনে হচ্ছে গলার পিছন দিকে যে ক্ষতস্থান, সেই আঘাতেই মৃত্যু হয়েছে। মাঝারি আকারের ধারালো ছুরি জাতীয় কোনো অস্ত্র একবারই সজোরে শরীরে প্রবেশ করেছে। আশ্চর্য ব্যাপার হল, এই আঘাতের ফলে এমন কিছু নার্ভ ছিন্ন হয়ে গেছে, যা দিয়ে সাধারণত যন্ত্রণার অনুভূতি হয়। অর্থাৎ ঘটনাচক্রে মৃত্যু হয়েছে প্রায় তাৎক্ষণিক এবং যন্ত্রণাহীন। তবে পোখরেলের মতে আঘাতের ধরন বা ক্ষতস্থানের আকার বেশ উল্লেখযোগ্য। দেখে মনে হচ্ছে ছুড়ির গতিমুখ ছিল নীচ থেকে উপরের দিকে, অর্থাৎ ঘাড় ও পিঠের সংযোগস্থলে প্রবেশ করে গলা বরাবর আঘাত ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী প্রায় চার ইঞ্চি অবধি। এছাড়া, ক্ষতস্থানের অবস্থান ঈষৎ ডানদিক ঘেঁষা। আপাতত আন্দাজ করা হচ্ছে আততায়ী ডানহাতি এবং তার উচ্চতা মৃত ব্যক্তির থেকে অনেকটাই কম, প্রায় ফুটখানেক। একমাত্র সেরকম মানুষের পক্ষেই পিছনে দাঁড়িয়ে এরকমভাবে ধারালো অস্ত্র চালানো সম্ভব। ঋজুর থেকে লম্বা বা কাছাকাছি উচ্চতার মানুষের পক্ষে এরকম আঘাত করতে গেলে শরীর বেঁকিয়ে, নিচু হয়ে, ঘাড় গোঁজ করে ছুরি চালাতে হবে, যা আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব এবং অর্থহীন।

প্রশ্নোত্তরের পালা শুরু হয়েছে পৃথ্বী রাইকে দিয়েই। ফারুক এখনও একটু ঘোরের মধ্যে আছে। নীলাদ্রির মৃত্যু নিয়ে তার কিছু কৌতূহল থাকলেও কোথাও যেন সে নিশ্চিত ছিল যে ওটা অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ। চিঠির ব্যাপারটা কাকতালীয় এবং সেটার নিষ্পত্তি অন্যভাবে হবে। ঋজুর মৃত্যু নিঃসন্দেহে হত্যা এবং একইসঙ্গে সমাপতনের সমস্ত সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে একটা ছোট্ট নিঝুম ট্যুরিস্ট স্পটে পরপর এতগুলো ঘটনা কাকতালীয় হতে পারে না। ফারুকের বহুকাল ধরে চাপা দিয়ে রাখা পুলিশি প্রবৃত্তিগুলো সজাগ হয়ে উঠছে। আবার পরমুহূর্তেই পুরানো কিছু ঘটনা, নিজেকে ও কাছের মানুষকে দেওয়া কিছু প্রতিশ্রুতির কথাও মনে পড়ে যাচ্ছে। এতসব তালগোল পাকানো চিন্তার মধ্যে পৃথ্বীর বয়ান রেডিয়োর ধারাভাষ্যের মতো শোনাচ্ছে।

“নাহলে হয়তো খারাপই হয়ে যাবে। তাই মেয়ের কথা শুনে তাড়াতাড়ি নীচে নেমে এসে সবজি বাগানের কাজ শুরু করলাম। কাজ যে খুব বেশি তাও না। এখন তো হয়ে আছে কিছু শালগম আর কিছু শাক। দুটো আলাদা ঝুড়ি আর কোদাল নিয়ে চালু হয়ে গেলাম। আধ ঘণ্টায় মোটামুটি শাকের লাইন শেষ করলাম। তারপর শালগমে হাত লাগানোর আগে মনে হল একটু তামাক খাই। পিছনে জঙ্গলে যাওয়ার যে চোরা বাটো, সেখানে কিছু অংশে ধাপ করা আছে। সেরকম একটা ধাপে বসে পাইপ ধরিয়ে কয়েক টান দিয়েছি, হঠাৎ খুব কাছে জোরে ফোন বেজে ওঠার শব্দ। আমি চমকে উঠে আশেপাশে তাকিয়ে বুঝলাম যে শব্দটা আসছে প্লাস্টিকে ঢাকা দেওয়া হাফ তৈরি হওয়া কটেজের ওখান থেকে। আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে কোদালটা দিয়েই প্লাস্টিকের শিটটা ফুট দুয়েক তুলে নিচু হয়ে উঁকি মারতেই দেখলাম যা দেখার।”

“ঋজুকে চিনতে পারলেন?”

“সত্যি কথা বলতে, না। চিনতে পারিনি। ভালো করে চেহারাটা দেখতেও পাইনি তখন। আমি দেখলাম একজোড়া জুতো পরা পা, আর অনেক রক্ত। আমার হাত—পা কাঁপছিল। ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিলাম। কোনোমতে কোদালে ভর দিয়ে সামলেছি, নাহলে হয়তো মাটিতেই পড়ে যেতাম।”

“আমরা যা বুঝেছি, মার্ডার হয়েছে কাল গভীর রাতে। বডি তখন থেকে পড়ে আছে। এই সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়েছিল?”

“গভীর রাতের কথা তো বলতে পারব না। আমি এগারোটার মধ্যে শুতে চলে যাই। আমার ঘুম খুবই গভীর, এক ঘুমে রাত কাবার হয়ে যায়। ঘুম ভাঙে পাঁচটা নাগাদ। আজকেও উঠেছি। ঘরের কিছু কাজ ছিল, সেসব করেছি। নীচে নেমেছি সাড়ে ছ’টা নাগাদ। তারপর একদম ওইখানে না গেলেও, আশপাশ দিয়ে তো অনেকবারই যাতায়াত, ওঠানামা করেছি। সেরকম কিছুই চোখে পড়েনি। আর এই ক’দিন টানা বৃষ্টি হচ্ছে দেখে কুকুর—টুকুরও এদিকে খোলা জায়গাতে আসছে না, সব শেডের নীচেই থাকছে। নাহলে ওরা এসে চেঁচামেচি করত।”

“ঋজুর ব্যাপারে কী জানেন?”

“কলকাতা থেকে এসেছে। আর কিচ্ছু না। আমার খানিকটা আলাপ আর কথাবার্তা হয়েছে জয়দীপের সঙ্গে।”

জয়দীপ ঘরে ঢুকেই অনুরোধ করল যদি দেবলীনার সঙ্গে কথাবার্তাটা সবার শেষে বলা যায়। এখনও নাকি একটু শক পেয়ে আছে। নার্ভ ঠান্ডা হয়ে পুরোপুরি ধাতস্থ হয়নি। থেকে থেকেই সাংঘাতিক কান্নাকাটি করছে। বিপুল প্রধান একবার ফারুকের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে জানাল যে তাতে অসুবিধা নেই। দেবলীনাকে সবার শেষেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। জয়দীপ ফাঁকা চেয়ারটা টেনে বসল।

“ঋজুর সঙ্গে কীভাবে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব হল, এটা একটু বলতে পারবে?” প্রধান কিছু বলার আগেই ফারুক প্রশ্নটা করে বসল।

“বন্ধুত্ব?” জয়দীপ যেন শব্দটাকে যথাযথ গুরুত্ব সহকারে মেপে দেখল। “অ্যাকচুয়ালি দেবলীনা আমার দূর সম্পর্কের বোন হয়। আমাদের দু’জনের বাড়িও খুব কাছাকাছি। ছোটোবেলা থেকেই দেখেছি যে আমাদের দু’জনের ফ্যামিলি, প্রতিবেশী হিসাবেই বরং খুব ঘনিষ্ঠ। ফলে যাতায়াত, মেলামেশা, একসঙ্গে বেরোনো বা বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান— এসব লেগেই থাকত। আমি আর দেবলীনা বলতে গেলে একসঙ্গেই বড়ো হয়েছি। একই স্কুল, একই কোচিং, ফলে একটা কমন বন্ধুদের গ্রুপও তৈরি হয়েছিল। কলেজে উঠে আমরা প্রথম আলাদা আলাদা জায়গায় পড়তে গেলাম। আমি আবার কোনো কালেই নিজের বয়সি লোকজনের সঙ্গে বিশেষ মিশতে পারি না। একা থাকাই পছন্দ করি। তাই কলেজে আমার নিজের তেমন বন্ধুবান্ধব বা গ্রুপ তৈরি হয়নি। ওই দেবলীনা কোনো প্ল্যান করে ডাকলে আমি মাঝেমধ্যে যেতাম। সেরকমই একবার পুজোর সময় বেরিয়ে ঋজুকে দেখি। ও দেবলীনার কলেজে না পড়লেও, কিছু কমন বন্ধুদের মাধ্যমে আলাপ হয়েছিল। এত কম আলাপে কাউকে কেন ডেকেছে, সেটা মনে হলেও আমি কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। তারপর সেকেন্ড ইয়ার থেকে যখন দু’জনে প্রেম করা শুরু করল, তখন বুঝলাম।”

“তোমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়েছিল?”

“নট রিয়েলি। বললামই তো আমি বিশেষ একটা বন্ধু টাইপ নই। আর ঋজুকে প্রথম থেকেই আমার খুব একটা পোষায়নি। এই সাংঘাতিক বড়োলোকদের ব্যাপারে আমার একটা অ্যালার্জি আছে। তারা ধরেই নেয় যে বাকিরা তাদের স্বভাব—চরিত্র—খামখেয়ালিপনা সবই মেনে নেবে। ঋজু যে আলাদা করে খুব অন্যদের অসুবিধা সৃষ্টি করত তা বলছি না, কিন্তু বিরক্তিকর কিছু ব্যাপার ছিল।”

“কীরকম?”

“ছোটো ছোটো ব্যাপার। কিন্তু আশেপাশে থাকলে চোখে পড়তে বাধ্য। ধরা যাক একটা আড্ডায় পাঁচ—ছ’জন আছে। সবাই নানা কিছু কথা বলছে। কিন্তু ঋজুর সবাইকে থামিয়ে ওর নিজের কথা বলতে হবে। এটা ঠিক যে ওর ভাবনাচিন্তা পড়াশুনা হয়তো আমাদের সবার থেকে বেশি। কিন্তু অন্যকে থামিয়ে নিজে গোটা সময় কথা বলে যাওয়াটা অত্যন্ত বিরক্তিকর। এবং তার মধ্যে কোনো কারণে যদি ওকে সেটা করতে না দেওয়া হয়, তাহলে হয়ে গেল। মুখ গোমড়া করে বসে থাকবে, খোঁচা দেওয়া কথা বলবে, বা মোবাইলে ভিডিয়ো চালিয়ে দেখতে থাকবে। এরকম প্রায় সব ব্যাপারেই। কোথায় যাওয়া হবে, কী খাওয়া হবে, সব ব্যাপারে ওর মতই যেন শেষ কথা। এবং এসব করতে গিয়ে যে বন্ধুদের কাউকে আঘাত বা অপমান করছে, সেই বোধও বিশেষ ছিল বলে মনে হয় না। ওর কখনোই কোনো ভুল বা দোষ নেই। বরং ওর সাজেশন বা অ্যাডভাইস না নিয়ে বাকিরাই ভুল করছে।”

“তাহলে তোমরা একসঙ্গে কীভাবে ফাংশন করো? শুনলাম তো তোমাদের এই গ্রুপটা অনেকদিনের এবং তোমরা নানা জায়গা একসঙ্গে যাও, নানা কিছু একসঙ্গেই করো। ঋজুকে নিয়ে অসুবিধা হয় না?”

“হয়। কিন্তু দেবলীনার জন্য করি। ও সত্যিই একজন ভালো বন্ধু, আ স্পেশাল পারসন। আর ঐশানীও যথেষ্ট স্ট্রং পারসোনালিটি। ফলে, মোটামুটি একটা ব্যালেন্স থাকে।”

“তুমি আর দেবলীনা ঠিক কীরকম ভাই—বোন?”

“এই রে! এটা খুবই জটিল সম্পর্ক। আমার এক পিসির শ্বশুরবাড়ির দিকের কী একটা যেন। মানে একবার অনেক কষ্ট করে হিসাব করে দেখেছিলাম যে ব্যাপারটা ভাই—বোন না হয়ে আমি ওর মামাও হতে পারি। এটা যদি জানতে চান, আমাকে বাড়িতে ফোন করে কথা বলে জানতে হবে।”

“যাই হোক, বোঝা যাচ্ছে তোমরা সেকেন্ড কাজিনও নও। তার থেকেও দূরের সম্পর্ক। তোমার কখনও দেবলীনার প্রতি প্রেম হয়নি? তোমরা তো একদম একসঙ্গে বড়ো হয়েছ?”

কয়েক সেকেন্ড চুপ। ঘরের বাতাসে অর্ধেক আড়ষ্টতা, অর্ধেক সতর্কতা। জয়দীপ একটা ছোট্ট নিশ্বাস ছাড়ায় সেই বাতাস কিছুটা হালকা হল।

“হয়েছিল। প্রেম না বলে ক্রাশ বলাই ভালো। কারণ তখন আমরা সবে ক্লাস নাইনে উঠেছি। অনেকদিন আগের কথা। সেসব কাটিয়েও এসেছি বারো—তেরো বছর হয়ে গেছে। ন্যাচারেলি দেবলীনাকে কোনোদিন কিছু বলিনি। আমার তো আসলে একটাই বন্ধু।”

“আচ্ছা, গতকাল রাতের ঘটনায় আসি। ঋজুকে শেষ কখন দেখেছিলে এবং কেমন দেখেছিলে?”

“কাল খাওয়ার পর আমরা এক নম্বরে, মানে একদম সাইডের ঘরটায়, আড্ডা মারতে বসেছিলাম। এটা—সেটার পর নেক্সট বেড়াতে যাওয়া নিয়ে অনেকক্ষণ কথা হল। ফাইনালি প্রায় ঠিকও হয়ে গেল যে আমরা সবাই বালি বা ভিয়েতনাম কোথাও একটা যাব। সাউথ ইস্ট এশিয়া। এরকম সময় হঠাৎ ঋজু বলল আজকে রাতটা সে অন্য ঘরে একা থাকতে চায়, যদি কারওর কোনো আপত্তি না থাকে। ওর নাকি মাথায় কিছু ভাবনা এসেছে। কোনো ডিস্টার্বেন্স ছাড়া সেগুলো নিয়ে একা একা একটু চিন্তা করতে চায়। আপত্তির কারণও ছিল না। একে আজ দুপুরে ওর বাবার ফোন আর তার পরের ব্যাপারটা জানেনই তো! তার মধ্যে এই একই আবদার আমি আগের দিন রাতে করেছি। আজকে ঋজুকে না করে দিলে, ব্যাপক অশান্তি হত। ফলে একটু পরে ও চলে গেল। তখন আন্দাজ সাড়ে এগারোটা মতো হবে। ওই লাস্ট দেখা।”

“তোমরা কেউ তারপর আর রাতে ঘর থেকে বেরোওনি?”

“না না। আমরা আরও হয়তো পঁয়তাল্লিশ মিনিট মতো জেগে ছিলাম। তারপর একবারে সকালে উঠে আমি একটা মেসেজ করি ঋজুকে কফি খাওয়ার ব্যাপারে। উত্তর না দেওয়ায় ধরেই নিই যে এখনও ঘুমোচ্ছে। সাড়ে সাতটা পৌনে আটটা নাগাদ বেরিয়ে দেখি ও ঘরে নেই। আর—একবার ফোন করি। রিং হয়ে যায়। সাড়ে আটটার পরেও কোনো হদিশ না পেয়ে এবার একটু চিন্তা হয়। আশপাশটা খুঁজে দেখি, সবাইকে জিজ্ঞাসা করি। তারপরেই ঘটনা তো জানেনই।”

“বেশ, আপাতত এই থাক। আবার কিছু মনে হলে পরে কথা বলব। তুমি বরং ঐশানীকে পাঠিয়ে দাও।”

জয়দীপ বেরিয়ে যাওয়ার পর প্রধান একটু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ফারুকের দিকে তাকাল। আগের দিন দুপুরে খাওয়ার টেবিলে বসে শোনা ঋজুর বাবার টেলিফোনের ব্যাপারে ওর প্রতিক্রিয়া এবং ভদ্রলোকের অসুস্থতার কথাটা ফারুক মোটামুটি গুছিয়ে জানাল। প্রধান সব শুনে মাথা নেড়ে, কনস্টেবলকে হাঁক দিয়ে বলল পরেরজনকে পাঠিয়ে দিতে।

এক ঝলক দেখলে ঐশানীকে কখনোই খুব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বা চোখে পড়ার মতো চেহারা বলে মনে হবে না। রাস্তাঘাটে বেরোলে এই বয়সি বাঙালি মেয়েদের মধ্যে এই চেহারা হয়তো প্রতি পাঁচজনের মধ্যে অন্তত দু’জনের। মাঝারি উচ্চতা, ফরসা রং এবং শরীরের গড়ন একটু ভারীর দিকে। কিন্তু কথা বলতে শুরু করলে বা এমনকি চোখের দিকে দেখলেও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের ছাপ স্পষ্টতই পাওয়া যায়। আপাতত যেন সেই ব্যক্তিত্বের পরিচ্ছন্নতা একটা দমকা হাওয়ায় কিঞ্চিৎ এলোমেলো হয়ে রয়েছে। ঘরে ঢুকে একবার প্রধানের দিকে, একবার ফারুকের দিকে সে একটু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। প্রধানের নির্দেশ করা চেয়ারে বসার পর ফারুক মুখ খুলল।

“জয়দীপকেও একই প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলাম। তোমাকেও সেটাই জিজ্ঞাসা করছি। ঋজুর সঙ্গে তোমার আলাপ এবং বন্ধুত্ব হয় কবে এবং কীভাবে?”

“আমি আর দেবলীনা ক্লাস ফোর থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড। এক বেঞ্চে বসতাম, একসঙ্গে টিফিন খেতাম, একসঙ্গে প্রথমে কার্টুন, তারপর এমনিই টিভি বা সিনেমা দেখতাম। ঘটনাচক্রে আমাদের হাইস্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি সব কিছুই এক। ফলে বলতে পারেন বন্ধুত্ব আরও বেশি করে গাঢ় হয়েছে। আমরা একে অপরের লাইফের কনস্ট্যান্ট প্রেজেন্স। দেবলীনা আমাকে প্রথম ঋজুর কথা বলে কলেজের একদম শুরুর দিকে। ফেসবুকে আলাপ হয়েছে, একদিন দেখা করবে। যেদিন প্রথম একটা ক্যাফেতে দেখা করল, আমি পাশের টেবিলে গোটা সময় ঘাপটি মেরে ছিলাম। আমাদের একজনের কাছে অন্যের মতামতের গুরুত্ব অনেক। যাইহোক, ওরা যখন ডেট করতে শুরু করে, তারপর তো অনেকই দেখাসাক্ষাৎ হত। আস্তে আস্তে উইকেন্ডগুলো একসঙ্গে আড্ডা মেরে কাটানো শুরু হল। ২০১৬—তে প্রথম আমরা চারজন মিলে বেড়াতে গেলাম— গোপালপুর অন সি। সেইথেকেই মোটামুটি আমাদের এরকম সময় কাটানো, বেড়াতে যাওয়া, এগুলো চলছে।”

“জয়দীপকে তুমি আগাগোড়াই চিনতে?”

“হ্যাঁ, দেবলীনার বন্ধু ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরত। ওরা তো বোধহয় কীরকম একটা আত্মীয়ও হয়। তবে জয়দীপ কোনোকালেই খুব একটা বলিয়ে—কইয়ে ছিল না। নিজের মতো, নিজের জগৎ নিয়ে থাকত। ওই সময় ছিল কমিক্স, তারপর হল খেলা। ইদানীং তো তাও কথাবার্তা বলে। কয়েক বছর আগে অবধিও ও আছে কি নেই, তাই বোঝা যেত না।”

“বলতে চাইছ ঋজুর ব্যাপারটা সেরকম নয়?”

“ও বাবা, হেভেন অ্যান্ড হেল! ঋজু হয় পুরো ঘরের মধ্যমণি হয়ে থাকবে, নাহলে ঝামেলা অশান্তি পাকিয়ে এনশিওর করবে যাতে গোটা অ্যাটেনশন ওর উপরেই থাকে। নিঃসন্দেহে ভীষণ শার্প, নানারকম বিষয়ে আগ্রহ এবং খোঁজখবর, আর অত্যধিক মাত্রায় স্পয়েল্ড। এর সঙ্গে হাইট, এলোমেলো চুল ও ধারালো চোয়াল— ব্যাস একদম ক্লাসিক ব্যাডবয়! একে পছন্দ—অপছন্দ যাই হোক, অন্তত অগ্রাহ্য করা যাবে না!”

“তোমার পছন্দ ছিল?”

ঐশানী একটু চুপ করে কী যেন ভাবল। তারপর তার ঠোঁটের কোণে অল্প হাসির আভাস দেখা গেল।

“আমি লেসবিয়ান। স্কুলে থাকতেই বুঝতে পারি। প্রথমদিকে দেবলীনা ছাড়া আর কেউ জানত না। পরে মাস্টার্স করার সময় একটা স্টেডি সম্পর্ক হয়। তখন আরও হাতেগোনা কয়েকজন জানতে পারে। ফলে, ঋজুর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার প্রশ্ন আমার কাছে অবান্তর। কিন্তু তার চেহারায় যে আকর্ষণ আছে, সেটা কীকরে অস্বীকার করি? আমি সমকামী, অন্ধ তো নই।”

“বুঝলাম। এখানে আসার প্ল্যানটা কার?”

“আমারই। আসলে, অগাস্টের মাঝামাঝি আমি স্কটল্যান্ড চলে যাচ্ছি, এডিনবরা। ওখানে পিএইচডি করব। আমার আর্থিক অবস্থা নেহাতই সাধারণ। ওখানে যা স্টাইপেন্ড পাব, তা দিয়ে টিকিট কেটে দেশে ফেরাটা এই ক’বছরে খুব বেশি হবে না। ফলে, এটা একটা ছোটোখাটো ফেয়ারওয়েল ট্রিপের মতোই ভাবা হয়েছিল।”

“তাতে সবার সায় ছিল?”

“একদমই। এক্সেপ্ট ঋজু। ও পাহাড় খুব একটা ভালোবাসে না। ওর পছন্দ সমুদ্র। কিন্তু এই ক্ষেত্রে বিশেষ আপত্তি করেনি, কারণ এক হল আগের ট্রিপে আমরা গোকর্না গেছিলাম, এছাড়া দ্বিতীয়ত এই ট্রিপে আমার পছন্দটাই প্রায়োরিটি পাবে। ঋজুকে একভাবে ডিল করে যেতে হবে, অতিরিক্ত ছাড় না দিয়ে। এটা আমরা সবাই আস্তে আস্তে বুঝেছিলাম।”

“তোমাদের দু’জনের সঙ্গে কথা বললাম। দু’জনেরই ছেলেটিকে নিয়ে যথেষ্ট সমস্যা আছে বলেই মনে হচ্ছে। আমার সত্যিই জানতে আগ্রহ হচ্ছে যে তোমরা তাও কেন ওকে নিয়ে তোমাদের প্ল্যানগুলো করো?”

“এটা বুঝতে এত অসুবিধা হচ্ছে কেন? একটা প্রাপ্তবয়স্ক জগৎ, সেখানে সম্পর্কের ধরণ তো জটিলই হবে। আপনি কি ভাবছেন চারজন বন্ধু মানে এরা সবাই সারাক্ষণ একে অপরের হ্যাঁ—তে হ্যাঁ মিলিয়ে যাবে? আমরা তো বাচ্চা নই, আর এটা বিকেলের খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। আর সবথেকে বড়ো কথা, ঋজু দেবলীনার জন্য ইম্পর্ট্যান্ট। আর দেবলীনা আমার জন্য ইম্পর্ট্যান্ট। ও আমার জীবনের অনেকটা জুড়ে আছে। ওর জন্য আমি অনেক কিছু করতে পারি।”

“ধরো দেবলীনা খারাপ আছে জানলে, কোনো চরম পদক্ষেপ নিতে পারো?” “অফ কোর্স। কিন্তু দেবী খারাপ আছে বলে আমি তো শুনিনি। আপনারা এমন কিছু আঁচ করেছেন কী?”

ডলিকে ঘরে ঢুকতে দেখে ফারুকের মনে হল এই মানুষটির পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। পর পর দু’দিনের ঘটনায় বিধ্বস্ত এই মহিলাকে আসল মানুষটির এক ফ্যাকাশে ছায়ার থেকে বেশি কিছু মনে হচ্ছে না। ফারুক লক্ষ করে দেখল ডলি দু’পায়ে আলাদা দু’পাটি চটি পরে আছে। কাছাকাছি দেখতে, কিন্তু নিঃসন্দেহে আলাদা পাটি। মহিলা নিঃসন্দেহে নিজের হোমস্টে এবং সেই ব্যাবসার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে দিশাহীন বোধ করছে। সেটা ফারুক মনে মনে বুঝলেও, এই মুহূর্তে আর সেই প্রসঙ্গের অবতারণা করল না।

“খুবই খারাপ লাগছে আপনার এখানে এরকম ঘটনা ঘটায়। আশা করি সব সমাধান হয়ে গেলে আপনার হোমস্টে আবার ঠিকঠাকই চলবে।” খানিক সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে এবং সম্ভবত ফারুকের অভিব্যক্তি থেকে কিছুটা আন্দাজ করে, প্রধান ডলির উদ্দেশ্যে কথাগুলো ইংরেজিতেই বলল।

“ধন্যবাদ। আমি সেটা নিয়ে চিন্তিত ঠিকই। কিন্তু একটা এইটুকু ছেলের জীবন এভাবে শেষ হয়ে গেল, এটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। মৃত্যু আমার কাছে নতুন নয়। কিন্তু তাও কোনোভাবেই অভ্যস্ত হতে পারি না।”

“ঋজুকে কি কাছ থেকে জানার কোনো সুযোগ হয়েছিল?” এবার ফারুক জিজ্ঞাসা করল। “একদমই না। সত্যি কথা বলতে, আমি এখনও ওর পুরো নামও জানি না। খাওয়ার টাইমগুলো বাদ দিয়ে ওকে খুব একটা দেখতামও না। ধরে নিয়েছিলাম চুপচাপ, চাপা স্বভাবের। ওদের গ্রুপের মধ্যে আমার বেশি কথা হয়েছে জয়দীপ আর ঐশানীর সঙ্গে। জয়দীপ আমার হাজব্যান্ডকে চিনতে পেরে আলাপ করে। ওদের অনেক কথা হয়েছে। তার ফাঁকে ফাঁকে আমার সঙ্গেও দেখা আর কথা হয়েছে। আর ঐশানীই এখানে প্রথম ফোন করা থেকে শুরু করে বুকিং ফর্মালিটিজ সব করেছে। তাই এখানে পৌঁছে চেক ইন করা থেকে ওর সঙ্গেই কথাবার্তা হচ্ছে বেশি।”

“আপনার সঙ্গে ঋজুর সামনাসামনি দেখা বা কথা একবারও হয়নি?” “সে হয়েছে। কিন্তু খুবই অল্প সময়ের জন্য, আর একদম মামুলি ব্যাপারে।” “তাও, একটু সেগুলো বলুন।”

“প্রথম দিনই চেক ইন করার একটু পরেই এসে, আমি তখনও ওর নাম জানি না, আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে ডাইনিং হলে খাওয়ার টাইম বাদ দিয়েও ওরা বসতে পারে কিনা, আর তাস খেললে আমার আপত্তি আছে কিনা। আমার কোনোটাতেই প্রবলেম ছিল না। সেটা জেনে তখন চলে গেছিল। তার পরের দিন একটু বেলার দিকে, মানে আপনারা এসে পৌঁছানোর একটু আগে, ওদের বারান্দায় আমাকে দেখতে পেয়ে একটা বিয়ারের ক্যান চায়। আমি বলি কাউন্টারে এসে নিয়ে যেতে। পরে শুনেছিলাম এসে নাকি আমার হাজব্যান্ডের কাছ থেকে নিয়ে গেছিল। আর তারপর গতকাল লাঞ্চের পরে, মানে প্রায় বিকেলের দিকে। ওটাই শেষবার।”

“তখন কী কথা হয়েছিল?”

“আসলে তখন ঠিক কথা হয়নি। সবে খাওয়া শেষ করে সবাই হাত—টাত ধুচ্ছে। হঠাৎ আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল যে ওর একটা ছোটো ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা আছে। কিন্তু এখন না, পরে সময়—সুযোগ করে বলবে। আমিও বললাম যে শিওর, যখন সময় হবে। সেই সময় আর হল না।”

“কী ব্যাপারে কথা বলতে চেয়েছিল, কোনো ধারণা করতে পারেন?”

“নাহ। তখন থেকে এইটাই মাথার ভিতর চলছে। কিন্তু ভেবে পাচ্ছি না। হয়তো একদম সাধারণ কোনো ব্যাপার। কিন্তু তাও, একটা মানুষ কথা অসম্পূর্ণ রেখেই চলে গেল, এটা ভাবলে খুব খারাপ লাগছে।”

কৃতিকা দত্তকেই প্রথম বাকিদের তুলনায় একটু স্বাভাবিক অবস্থায় পাওয়া গেল। তার হাবভাব চলাফেরা ইত্যাদির মধ্যে পরিস্থিতি সম্পর্কে এক সচেতনতার আভাস থাকলেও, সে বাকিদের মতো ভেঙে পড়েনি বা চোখের সামনে মৃত্যুর ভয়াবহতা তাকে বিশেষ শকও দিতে পারেনি। ডলি বেরোনোর মিনিট দুয়েক বাদে যেভাবে “আসব?” বলে ঘরের মধ্যে ঢুকল, তাতে মনে হল যেন কলেজের পরীক্ষা দিতে এসেছে।

“বয়সের বেশ খানিকটা তফাত থাকলেও, তোমার সঙ্গে ঋজুদের গোটা গ্রুপটারই ভালো বন্ধুত্ব হয়েছিল, তাই না?” ফারুকের আজকের প্রশ্নগুলো অনেক বেশি সরাসরি।

“গোটা গ্রুপের বলাটা হয়তো ঠিক হবে না। ঐশানীদি ও দেবলীনাদির সঙ্গে বেশি বন্ধুত্ব হয়েছিল ডেফিনিটলি। ওরা এমনিতেই খুব ফ্রেন্ডলি, বিশেষ করে ঐশানীদি। নিজে থেকেই আমাকে ডেকে আলাপ করা, আড্ডা মারা, এদিক—ওদিক টুকটাক হাঁটতে যাওয়া, এসব করছিল। এছাড়া জয়দীপদাও আর ঋজুদাও কম—বেশি কথাবার্তা বলেছে। আসলে সবথেকে বেশি সময় ওদের সঙ্গে কাটিয়েছি তাস খেলে। তখন তো এমনিই কথাবার্তা কম হয়। ওরা সবাই বেশ সিরিয়াসলি খেলে। জয়দীপদার উৎসাহ হয়তো একটু কম। বেসিক্যালি সত্যিকারের স্পোর্টস নিয়ে বেশি ইন্টারেস্টেড ও— মানে ক্রিকেট, ফুটবল, এইসব আরকি।”

“আলাদা করে যদি ঋজুর কথা জিজ্ঞাসা করি, তাহলে তোমার কী মত?” “এই রে! এত কম সময়ে কারওর ব্যাপারে মত দেওয়া কি ঠিক? তার জন্য তো আরও চিনতে হয়।”

“এমনিতে হয়তো ঠিক নয়। কিন্তু এটা তো সাধারণ, স্বাভাবিক, সামাজিক পরিস্থিতিও নয়। আর অনেক সময় প্রাথমিক কিছু ব্যাপার, মানে ফার্স্ট ইমপ্রেশন কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিচয়ের থেকে হয়তো বেশিই জেনুইন হয়।”

“এরকমভাবে বললে আমি কিছু কথা বলতে পারি। কিন্তু সেগুলো আমার একদমই নিজের অবজার্ভেশন বা ধারণা। এগুলো যে ঠিক হবেই তার কোনো মানে নেই।” “বেশ তো, তুমি বলোই না।”

“আমার অ্যাকচুয়ালি ওদের একটা পুরানো বন্ধুদের গ্রুপ বলে মনেই হয়নি। আমি এটা খুব ভালো করে বোঝাতে পারব না। ঐশানীদি আর দেবলীনাদিকে ডেফিনিটলি মনে হয় অনেকদিনের বন্ধু। জয়দীপদাকে আবার মনে হয় যে—কোনো কারওর সঙ্গেই এ একইরকমভাবে থাকবে বা মিশবে। মানে ওদের সঙ্গে যেভাবে মিশছে, আমার সঙ্গেও সেভাবেই। আলাদা করে বন্ধুত্বর কিছু ঠিক বুঝিনি। আর ফাইনালি ঋজুদাকে তো একদমই অড ম্যান আউট মনে হয়েছে। যেন দায়ে পড়ে এসেছে। তিনটে অন্য লোক জোগাড় হয়ে গেলে ও এদেরকে ছেড়ে তাদের সঙ্গে তাস খেলতে চলে যাবে।”

“এটা কী কোনো বিশেষ কিছু দেখে বা কোনো কথা শুনে তোমার মনে হয়েছে?”

“ওরকম পিনপয়েন্ট করা মুশকিল। ওই জন্যই বলতে চাইছিলাম না। আমার এক—একবার মনে হত ঋজু, দেবলীনা, আর ঐশানীর মধ্যে কিছু একটা জটিল সম্পর্ক আছে যেটা বাইরের লোক ধরতে পারবে না। মানে কেউই মুখ ফুটে কিছু বলছে না, কিন্তু সামান্য ছোটোখাটো ব্যাপারেও বেশ খোঁচা দিয়ে কথাবার্তা, বা ইনডিরেক্টলি আঘাত দেওয়া— এগুলো বাইরের লোক হিসাবে আমার সামনে যখন হচ্ছে আমার একটু অস্বস্তি তো হয়েছেই। যেমন একাধিকবার ঐশানীদি দেবলীনাদিকে র‍্যানডম কথার আগে—পরে, মনে করানোর মতো করে বলেছে যে ওরা কিন্তু অনেকদিনের বন্ধু। আবার কী একটা সামান্য তাস খেলার ব্যাপারে ঋজুদাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করায় কীরকম ঘুরিয়ে কাউকে একটা শুনিয়ে যেন বলল যে তাদেরকেই জিজ্ঞাসা করতে যারা কোনো কথাই সহজে ভোলে না, যাদের মেমোরি খুব ভালো। আমি যেহেতু ব্যাপারগুলোই জানি না, আমার কাছে এগুলো একটু অদ্ভুত লেগেছে।”

“বেশ, তোমার কথাগুলো কিন্তু একদম ফেলে দেওয়ার মতোও নয়। এগুলো আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কিনা সেটা হয়তো পরে বোঝা যাবে, কিন্তু আপাতত তোমার যে কিছু কিছু ব্যাপার অস্বস্তিজনক লেগেছে, এটা তো অস্বীকার করা যায় না। যাই হোক, একদম গতকালের ঘটনা দিয়ে শেষ করি। তুমি ঋজুকে শেষ কখন দেখেছ এবং সেইসময় কি এরকম কোনো কথা বা পরিস্থিতি হয়েছিল, যেগুলো এর আগে তোমার অদ্ভূত বা অস্বস্তিকর লেগেছে?”

“গতকাল শেষবারের মতো সবাইকেই একসঙ্গে এক নম্বর ঘরে দেখেছিলাম। এই রাত দশটা নাগাদ, মানে ডিনারের পরে। এটা আপনাদের বলছি। প্লিজ বাবা—মাকে জানাবেন না। আমি ওদের ঘরে সিগারেট খেতে গেছিলাম। ওরা তখন বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান নিয়ে কথা বলছিল। সাউথ ইস্ট এশিয়ার কোথাও যাবে কিনা এই নিয়েই কথাবার্তা হচ্ছিল। আমি সেই প্রসঙ্গে বললাম যে আমার কলেজে একটি বাঙালি ছেলে আছে যার ফ্যামিলি অনেকদিন থাইল্যান্ডে ছিল, আর—একটি ভিয়েতনামিজ মেয়ে আছে। কিছু জানার হলে আমি ওদের জিজ্ঞাসা করতে পারি। তারপর আমি আরও পনেরো মিনিট মতো ছিলাম। আমি সাড়ে দশটার আগে নিজের ঘরে ফিরে এসেছি।”

“আড্ডা স্বাভাবিক ছিল?” “একদমই।” “বেশ। তোমার মাকে একটু আসতে বলো।”

মেয়ের তুলনায় মা স্পষ্টতই ঘটনার আকস্মিকতা ও ভয়াবহতায় অনেক বেশি আক্রান্ত। মিসেস দত্ত যখন বিপুল প্রধানের উলটো দিকের চেয়ারে এসে বসলেন, তাঁর চোখেমুখে বেদনা ও আতঙ্ক সমানভাবে মিশে আছে। বসেই তিনি অনেকক্ষণ ধরে দুঃখপ্রকাশ করলেন। বললেন যে মাত্র দু’দিন আগে আলাপ হওয়া প্রাণশক্তিতে ভরপুর একটি যুবকের এরকম নির্মম পরিণতি তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। তারপর যতটা সম্ভব খুঁটিয়ে ঋজুর পরিবারের ব্যাপারে, তার মা—বাবার ব্যাপারে জানতে চাইলেন। জানতে চাইলেন যে তাঁদের খবর দেওয়া হয়েছে কিনা এবং তাঁরা সৎকারের জন্য নিজেদের সন্তানের দেহ কীভাবে বা কতক্ষণে পাবেন। আগাগোড়া নিয়মকানুন এবং সরকারি প্রোটোকল সম্পর্কে আশ্বস্ত করে, ফারুক মূল প্রসঙ্গে এল।

“আপনাকে যতটা সম্ভব কম প্রশ্ন করা যায়, সেই চেষ্টাই করি। আপনি গতকাল শেষ কখন ঋজুকে দেখেছেন?”

“গতকাল গোটা দিন সেভাবে দেখা হয়নি। মানে কটেজে ডাক্তারবাবু আচমকা মারা গেছেন জানতে পেরে সবার মতো আমিও বাইরে ভিড় করেছিলাম। সেখানে ঋজুও ছিল, কিন্তু কোনো কথা হয়নি। তারপর আমি ঘরে ফিরে এসেছিলাম। এই ধরনের স্ট্রেস হলে আমার হাজব্যান্ডের একটা গ্যাস অ্যাসিডিটির প্রবলেম আছে, সেটা আবার বাড়ে। ফলে কাল শরীরটা খুব একটা ভালো ছিল না। আমি মোটামুটি ঘরেই ছিলাম। ওকে দেখাশোনা করছিলাম। তাই বাকিদের সঙ্গে খাওয়ার টাইমও ম্যাচ করেনি। আর গতকাল এসবের পর স্বাভাবিকভাবেই আর তাসের আড্ডা বসেনি।”

“আপনার কি ঋজু এবং ওর বন্ধুদের সঙ্গে মূলত তাস খেলতে গিয়েই কথাবার্তা হয়েছে, নাকি তার বাইরেও?”

“তার বাইরে বলতে আমরা যখন একসঙ্গে ছাঙ্গে ফল্স গেছি, তখন খানিকটা গল্প হয়েছে। তবে সেটা মূলত মেয়েদের সঙ্গেই। ঋজু বা জয়দীপের সঙ্গে কথাবার্তা তাসের আড্ডাতেই।”

“সেই অভিজ্ঞতা থেকে আপনার কিছু চোখে পড়েছে বা আপনি কিছু খেয়াল করেছেন? হয়তো আপাতভাবে গুরুত্বহীন, কিন্তু কোনো কিছু?”

“একটা ব্যাপার তো একদম স্পষ্ট ছিল যে ঋজু এদের সবার মধ্যে টোয়েন্টি নাইনে সবথেকে এক্সপার্ট। মেয়ে দু’জনও বেশ ভালো। অন্যদিকে বোঝা যেত জয়দীপ নেহাতই চার নম্বর লোক। অন্য কেউ নেই দেখে খেলছে। কিছুটা আমারই মতো, মানে একদম আনকোড়া আনাড়ি বা ওরই কাছাকাছি। ফলে আমি বা আমার মেয়ে মূলত জয়দীপের খালি করে দেওয়া জায়গাতেই ঢুকে পড়তাম। সাধারণত এমনভাবে বসা হত, যে খেলাটা ছেলেদের বনাম মেয়েদের মধ্যে হয়। ফলে একদিকে ঐশানী আর দেবলীনা পার্টনার, আর এদিকে জয়দীপ আর ঋজু। তাই আমি সবসময় জয়দীপের জায়গায়, ঋজুর পার্টনার হয়েই বসেছি। তাতে লাভই হয়েছে। ওর আমাকে নিয়ে এবং আমার কাঁচা হাতের খেলার ব্যাপারে যথেষ্ট ধৈর্য ছিল। আর আমি বড়ো রকমের কোনো ভুল না করলে ও মোটামুটি একাই মাথা খাটিয়ে খেলা বের করে আনত। পরশু রাতের শেষ দু’দানের আগে তো টানা জিতে গেছি।”

“পরশু রাত মানে যেদিন ডঃ চক্রবর্তী মারা গেলেন? সেদিন দুটো দান হেরেছিলেন? আপনারই ভুল না ঋজুর?”

“এতকিছুর মধ্যে এটার কথা মাথা থেকে বেরিয়েই গেছিল। এখন আবার মনে পড়ল ব্যাপারটা তখন একটু কেমন যেন ঠেকেছিল। সেদিন রাতে আপনি যখন খেতে খেতে মিস্টার রাইয়ের সঙ্গে গল্প করছিলেন, তখন আমি আর মেয়ে দু’জনেই আবার ডাইনিংয়ে গিয়ে ওদের তাস খেলায় জয়েন করি। আমার ধারণা তখন এই সাড়ে ন’টা মতো হবে। প্রথমে আমার মেয়ে ঋজুর পার্টনার হয়ে ওর উলটোদিকে বসেছিল। তারপর দশটা নাগাদ ঐশানী উঠে যাওয়ায়, মেয়ে সরে গিয়ে এবার দেবলীনার পার্টনার হয়ে বসে। আমি মেয়ের খালি করা জায়গায় আবার ঋজুর পার্টনার হিসাবে বসি। ভালোই খেলা চলছিল। ততক্ষণে বেশ কিছু দান খেলে আমিও অনেকটা রপ্ত করে নিয়েছি। ভুল কম হচ্ছে। টানা জিতছি, মজাও লাগছে। ঘড়ির দিকে আর তাকাইনি। কিন্তু আমার ধারণা অন্তত এক ঘণ্টা কেটে গেছিল। মানে এগারোটা বেজে গেছিল।”

“কী হয়েছিল?”

“আমি হঠাৎ দেখি ঋজু একদম বোকার মতো একটা দান খেলেছে। মানে কিছু ভারী তাস এখনও বেরোয়নি জেনেও একটা দরকারি কিন্তু হালকা তাস খেলে দিল এবং আমার মেয়ে তো হইহই করে সেটাকে মাত দিয়ে তুলে নিল। তারপর ও আর দেবলীনা মিলে খুব কথা শোনাল, মানে খেলায় হারলে বা ভুল করলে বিপক্ষ যেরকম করে আরকি। আমি এরকম কাঁচা কাজ করতে দেখে বেশ অবাক হয়ে দেখি ঋজু কেমন যেন হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে আছে। আমি আর কথা না বলে খেলা চালাতে গিয়ে দেখি পরের হাতে আবার একই রকম আনাড়ি মার্কা ভুল। ওই দান হেরে গোটা হাতটা হেরে গেলাম। এবার যেন ঋজুও হঠাৎ করে ঘোর কাটিয়ে বুঝতে পেরেছিল যে সে গত ক’মিনিটে এই কীর্তি করেছে। তারপর বিড়বিড় করে রাত হয়ে যাওয়া, শুয়ে পড়া দরকার, নাকি শরীর খারাপ এরকম কীসব যুক্তি দিয়ে উঠে পড়ার তোড়জোড় করতে লাগল। দেবলীনা আর আমার মেয়ে তো খুব করে বলল যে পরদিন নাকি এখান থেকে খেলা কন্টিনিউ করবে। যাইহোক, আমরা বোধহয় সোয়া এগারোটা নাগাদ ঘরে ফিরে এসেছিলাম। ওই আমার ঋজুর সঙ্গে শেষ সামনাসামনি দেখা হওয়া এবং কথা বলা।”

“এই গোটা ঘটনাটা আপনার কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছিল?”

“হবে না? ওরকম পাকা তাসুড়ে! সে আচমকা পরপর দু’দান একদম আনাড়ির মতো দুটো তাস খেলে গোটা হাত খুইয়ে বসল? কী এমন মাথায় চলছিল কে জানে?” “এই আচরণের কী কারণ হতে পারে, সে নিয়ে আপনি ভাবেননি?”

“ভেবেছিলাম। কিন্তু সে ভাবনা ঠিক না ভুল সে তো আর যাচাই করে দেখার সুযোগ পাইনি। তারপরেই যা সব কাণ্ড একের পর এক শুরু হল!”

“যেটা মনে হয়েছিল, সেটা বলুন।”

“সেদিন রাতে ঘুমানোর সময় এটা খুব মাথায় ঘুরছিল। তখন মনে হয়েছিল যে প্রথম ভুল তাস খেলায় যখন আমার মেয়ে লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে, আমি একবার চোখ তুলে ঋজুর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। ঋজু আমার মুখোমুখি থাকলেও, ওই মুহূর্তে মনে হয়েছিল সে আমার মাথার পিছনে অন্য কিছুর দিকে তাকিয়ে আছে, আর সেই কারণেই হয়তো অন্যমনষ্ক হয়ে ভুলটা করেছে।”

“এটা আপনি শিওর?” ফারুকের গলায় স্বর সামান্য হলেও পালটেছে। সেটা টের পেয়েছে প্রধানও।

“দেখুন এইটা আমি শিওর যে আমি যখন তার দিকে তাকিয়েছি, তার মুখ আমার দিকে ফেরানো থাকলেও দৃষ্টি আমাকে পেরিয়ে দূরে অন্য কিছুর দিকে ছিল। এবার সেটাই তার অন্যমনষ্কতার কারণ কিনা, এটা আমি জোর দিয়ে বলতে পারব না।”

“বেশ। ফেয়ার এনাফ। লাস্ট একটা কথা খালি বলুন। আপনাদের বসার অ্যারেঞ্জমেন্টটা কীরকম ছিল? মানে ওই সময়ে কে কোনদিকে মুখ করে বসেছিলেন?”

“দাঁড়ান, আমাদেরটা তো মনে আছে। মেয়ে আর দেবলীনারটা মনে করি। যদি খুব ভুল না করি, আমার মেয়ে আমার বাঁদিকে ছিল। তার মানে মেয়ের মুখ ছিল রান্নাঘরের দিকে। তাহলে দেবলীনা বসেছিল মেন রোডের দিকে মুখ করে, আমার ডান দিকে। আমি ছিলাম উত্তরমুখী, মানে ধরুর ওই কটেজের দিকে মুখ করা। আর আমার উলটোদিকে ঋজু ছিল দক্ষিণে মুখ করে, মানে যেদিকের জানালা দিয়ে বাইরের খোলা জায়গাটা দেখা যায়, যেখানে ফুলের টব, বা ওই বসার বেঞ্চ, ডাস্টবিন, এইসব রাখা। আর সেসব পেরিয়ে সোজা তাকালে ওদের নিজেদের ঘরদুটো দেখা যায়।”

বাসবী দত্ত চলে যাওয়ার পর প্রধান আর ফারুক দু’জনেই চুপ করে বসেছিল। কিন্তু এই নির্বাক অবস্থাতেও দু’জনেরই যে মাথা ওভারটাইম কাজ করে চলেছে, তাতে সন্দেহ নেই। আচমকা একগাদা নতুন তথ্য মাথায় চেপে বসলে অনেক সময় ভাবনা বিপথে চালিত হয়। দু’জনে হয়তো সেটাকেই প্রতিরোধ করে, তথ্যগুলোকে মাথার যথাস্থানে জায়গা করে দিয়ে যুক্তির রাস্তা খোলা রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রশ্নোত্তরের পালা শেষ হলে যে দু’জনেই একে অপরের সঙ্গে আলোচনায় বসতে ব্যগ্র, সেটাও একজনের আর—একজনকে বুঝিয়ে দিতে কোনো শব্দের প্রয়োজন হচ্ছে না।

মিসেস দত্তর পরে পরপর ঢুকলেন দত্তবাবু, কেশব কোঠারি এবং প্রতিভা। এদের কারওর সঙ্গে কথা বলেই ঋজুর ব্যাপারে নতুন কোনো হদিশ মিলল না— অতীতেরও না, বর্তমানেরও না। কেশবের বড়োবাজারের ব্যবসায়ী সত্তাটি পুরোপুরিই এখন বেরিয়ে এসেছে। সে প্রত্যেকটি শব্দ অতি সন্তর্পণে, যেন গয়নার দাঁড়িপাল্লায় মেপে তারপর ব্যয় করছে— একটি অক্ষর বা একটি মাত্রাও তাতে অতিরিক্ত নেই। প্রতিভা এই ঘটনার নিষ্ঠুরতায় যতটা প্রভাবিত, তার থেকে স্পষ্টতই বেশি চিন্তিত নিজের মা—বাবা এবং তাদের হোমস্টে নিয়ে। কিছু অনুচ্চারিত কিন্তু স্পষ্ট কারণেই, এভাবে এরকম মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়া ওদের পক্ষে হয়তো অত্যন্ত ক্ষতিকর। দত্তবাবুকেও দেখে মনে হল একেবারে অন্য মানুষ। সেই হাঁকডাক করা বাচাল মানুষটির বদলে নেহাতই ভীত, গোবেচারা গোছের একজন মানুষ যার আশেপাশের সবকিছু তার বোধগম্যের বাইরে। একাধিকবার জানতে চাইলেন যে খুনির হাতে তাঁদের কোনো বিপদের সম্ভাবনা আছে কিনা। সেইসঙ্গে এটাও বললেন যে একই বিল্ডিংয়ে ফারুক থাকায় অনেকটা নিশ্চিন্তও বোধ করছেন। এবং অবশেষে তিনদিনে তৃতীয়বারের জন্য বললেন যে গতকাল এরকম সময়ে কেউ কল্পনাও করেনি যে এরকম ঘটনা ঘটবে।

ঋজুকে আগে থেকে চেনার ব্যাপারে তিনজনেই সজোরে মাথা নেড়ে অস্বীকার করে। দেবলীনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়ে ফারুক আর প্রধান, দু’জনেরই বেশ অপরাধবোধ হল। দুর্দশার মুহূর্তে কোনো কোনো মানুষকে দেখে মনে হয় তার উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। দেবলীনাকে দেখে মনে হচ্ছে জাহাজডুবি হয়ে সে সমুদ্রের কোন অতলে তলিয়ে গেছে, আর কোনোদিন তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধু যে পোশাক বা চুল এলোমেলো হয়ে আছে বা কান্নাকাটি করে চোখ—মুখের চেহারা পালটে গেছে তাই—ই নয়, বরং দাঁড়ানোর ভঙ্গি বা চোখের দৃষ্টির আমূল পরিবর্তনের ফলে মানুষটিকেই চেনা দায়। তাকে প্রশ্ন করায়, সে কলের পুতুলের মতো চেয়ারে বসে বাচ্চাদের ছড়া আবৃত্তি করার মতো একটানা নিরুত্তাপ কণ্ঠে উত্তর দিয়ে গেল।

“ঋজুর মধ্যে একধরনের ছেলেমানুষি ছিল। এই কারণে তাকে সহজেই ভুল বোঝা যায়, তার উপর বিরক্ত হওয়া যায় এবং সবাই হতও সেরকম। কিন্তু আমার কাছে ওই ছেলেমানুষিরই অনেক দাম। ওই ছেলেমানুষিতে নিখাদ কৌতূহল আছে, বিস্ময় আছে, সত্যি কথা বলে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। ন্যাচারেলি, বেশিরভাগ লোকেরই সেটা ভালো লাগবে না। ফলে ঠিক কিছু ভাঙলে বা নষ্ট হলে যেমন বাড়িতে সবাই বাচ্চাদেরই দোষ দেয়, ঋজুকেও আজীবন নানা কিছুর ব্যাপারে কথা শুনে যেতে হয়েছে। যার যেখানে যা গণ্ডগোল, সবই ঋজুর দোষ।”

“জয়দীপ আর ঐশানী তো তোমার খুবই কাছের বন্ধু। ওদেরও কি ঋজুকে নিয়ে সমস্যা ছিল?”

“কখনো—কখনো মনে হত ছিল। ওরা বলত না। হয়তো আমার কথা ভেবেই বলত না। তার জন্য আমি গ্রেটফুল। কিন্তু ওরা হয়তো আর—একটু এফোর্ট দিলে নিজেদের প্রেজুডিসগুলো কাটিয়ে উঠতে পারত, ঋজুকে সত্যিই বুঝতে পারত। ঋজু যে বড়োলোক বাড়িতে জন্মেছে, এটা তো ওর দোষ নয় নিশ্চয়ই?”

“এবার কি কোনো সমস্যা হয়েছিল?”

“আলাদা করে কোনো ঝগড়া বা কথা কাটাকাটি তো হয়নি। কিন্তু এবারের ট্রিপটা প্রথম থেকেই কেমন যেন মরে গেছিল। মানে, প্রথমদিকে এক—দু’দিন যখন আমরা ঋষিখোলাতে ছিলাম, তখন ভালোই লাগছিল। আমি মনে—প্রাণে চাইছিলাম যে এবারের বেড়ানোটা স্পেশাল হয়ে থাকুক। এটাকে আমরা ঐশীর ফেয়ারওয়েল হিসাবেই দেখছিলাম। ও অত দূরে চলে যাবে। কিন্তু হল না। আমরা সবই করছিলাম, কিন্তু কেমন যেন রুটিনমাফিক। গল্প বা আড্ডাও যা হচ্ছিল সবই স্পেসিফিক কোনো—না—কোনো কাজ বা ব্যাপার নিয়ে, যেমন খাওয়া, তাস খেলা, বেড়াতে যাওয়া, এরকম। আমি গতকাল বা আজকের কথা বলছি না। কোনো সেরকম মেজর সমস্যার কথাও বলছি না। কিন্তু কোনো সমস্যা ছাড়াও বেড়ানোটা পয়েন্টলেস হয়ে গেছিল। আমি তো অন্তত ওয়েট করে ছিলাম, কখন কলকাতা ফিরব।”

“ঋজু বয়ফ্রেন্ড হিসাবে কেমন ছিল?”

“এটা হয়তো সবাই নিজেদের পার্টনারের ব্যাপারে বলে, বা হয়তো বলে না। কিন্তু হি ওয়াজ দ্য বেস্ট! সবার কিছু—না—কিছু দোষ—ত্রুটি থাকে, সবাই মানুষ। কিন্তু ঋজু আমার লাইফে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল। ওর মাথাটা একটা আইডিয়ার গোল্ডমাইন ছিল। মাঝেমধ্যে হয়তো সেজন্য ছোটোখাটো ব্যাপারে ধৈর্য হারিয়ে ফেলত, চেঁচামেচি করে ফেলত। কিন্তু ও সত্যিই মানুষকে রাস্তা দেখিয়ে দিতে পারত। ও আমাকে জোর না করলে আমি কোনোদিন পিএইচডি করার কথা ভাবতাম না। অ্যাকাডেমিক কেরিয়ারের কথা ভাবতাম না। পাতি কোনো একটা স্কুলে হয়তো বাচ্চাদের ছবি আঁকা শিখিয়ে লাইফ কেটে যেত।”

“তুমি ছবি আঁকো?”

“ওই টুকটাক আঁকতাম। কিন্তু সে এমন কিছু না। শখের জন্য। ভেবেছিলাম আর্ট কলেজ যাব। কিন্তু তার জন্য খুব একটা এফোর্টও দিইনি। ঋজুই আমাকে এসবের পিছনে সময় নষ্ট না—করে মাস্টার্স ও তারপর পিএইচডি করার জন্য এনকারেজ করে।”

“তোমাকে এরকম টানা প্রশ্ন করে যেতে সত্যিই খারাপ লাগছে। যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি সেরে ফেলার চেষ্টা করছি। ওর বাড়ির সঙ্গে ওর সম্পর্ক তো ভালো ছিল না। এটার কোনো কারণ কিছু বলতে পারবে? বা এই খারাপ সম্পর্ক কি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছিল নাকি পরিস্থিতি ভালোর দিকে যাচ্ছিল? মাথায় রেখো গতকাল লাঞ্চের সময় তোমাদের টেবিলের কথাবার্তার অনেকটাই কিন্তু আমার কানে এসেছে।”

“আমি যে ওর ফ্যামিলির ব্যাপারে খুব কিছু জানি, সেটা না। প্রথমদিকে একবার—দু’বার গেলেও তারপর আমার সঙ্গে আর কোনোদিন ও—বাড়ির কারওর প্র্যাকটিক্যালি দেখা হয়নি। আমি যতটুকু জানি, ওর ফ্যামিলি একদমই ব্যাবসায় ফোকাসড। তার বাইরে অন্য যে—কোনো কাজকে তারা সময় নষ্ট মনে করে। আর ঋজু ছিল ফ্যামিলি বিজনেসের ব্যাপারে আটারলি ডিসইন্টারেস্টেড। অশান্তির সেটাই শুরু। গ্র্যাজুয়েশনের সময় থেকেই ও আলাদা একটা ফ্ল্যাটে থাকতে শুরু করে, রুবির কাছে। এরপর আলাদা করে ঝগড়াঝাটি আমি বাড়তেও দেখিনি, আবার কিছু ইম্প্রুভ করেছে বলে শুনিওনি। তবে ওর বাবার ডিমেনশিয়ার ব্যাপারটা আমি কালই প্রথম জানতে পারি। ওরকম মোমেন্টে, ওই প্রসঙ্গে শুনে এত শকিং লাগল! ভেবেছিলাম ঋজুর মাথা ঠান্ডা হলে এই নিয়ে একটু কথা বলব। সেটা আর হয়নি।”

“ওরা কয় ভাই—বোন? তাদের মধ্যে সম্পর্ক কীরকম?”

“নিজের ভাই—বোন কেউ নেই। ওই একমাত্র ছেলে ছিল। বাকিরা কাজিন, মানে কাকাজ্যাঠা বা মামা—মাসির ছেলে মেয়ে। তাদেরকে আমি যে খুব চিনি এমনটাও নয়। তবে তারা সবাই মোর অর লেস ফ্যামিলি বিজনেসেই ইনভলভড। একমাত্র এক্সেপশন ছিল ওর বড়দি।”

“এই কী ওর বড়োজ্যাঠার মেয়ে? যার সম্ভবত ভুল চিকিৎসা হয়েছিল ডঃ চক্রবর্তীর হাতে?”

“হ্যাঁ। ও বড়দি বলেই ডাকত। ভালো নাম মোস্ট প্রবাবলি ঋত্বিকা। ও ঋজুর থেকে খানিকটা বড়ো হলেও, ওরা খুব ক্লোজ ছিল। ঋজু বলত যে ওর এই নানা ব্যাপারে ইন্টারেস্ট, এটা নাকি বড়দির জন্যই। ওর অপারেশনের ঘটনাটা ঋজুকে সাংঘাতিক অ্যাফেক্ট করেছিল। আমি তার আগে ওকে চিরকালই সব সিচুয়েশনে যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে কাজ করতেই দেখেছি। সেই প্রথম ওরকম টোটালি ইমোশনাল অবস্থায় দেখেছিলাম।”

“কান্নাকাটি করেছিল?”

“না, রাগে থরথর করে কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল যেন ফিট হয়ে যাবে। আমি সেদিন অনেকক্ষণ ওর ফ্ল্যাটে ওর কাছে বসেছিলাম। কথা বলে বলে তারপর একসময় যেন সবকিছু নিয়ন্ত্রণে এল। কিন্তু এটাও বুঝেছিলাম যে রাগ এখনও বিন্দুমাত্র কমেনি।”

“কেন? কী বলেছিল?”

“বেশ রাতের দিকে আমি যখন ফাইনালি বেরোচ্ছি, তখন দরজা বন্ধ করার আগে ঠান্ডা গলায় বলেছিল যে কোনোদিন যদি সুযোগ পায়, তাহলে ওই ডাক্তারকে নিজে হাতে খুন করবে।”

গত তিনদিনে এই প্রথম বৃষ্টি থেমেছে। মিনিট পনেরো হতে চলল এক ফোঁটাও বৃষ্টি হয়নি। তার মানে মোটেও এমন নয়, যে আবহাওয়া পরিষ্কার হয়েছে। আকাশের দিকে তাকালে এখনও নীলের দেখা নেই, পুরোটাই মেঘাচ্ছন্ন। আপাতত জঙ্গলের অসমতল রাস্তা দিয়ে গাড়ি করে ধীর গতিতে যেতে যেতে ফারুকের মনে হচ্ছিল গত পরশু আর আজকের মধ্যে সবকিছুরই কতটা তফাত হয়ে গেছে। দু’দিন আগে সে এই পথ ধরেই যাচ্ছিল। তখন উদ্দেশ্য ছিল খারাপ আবহাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে একটা নিরিবিলি গ্রামে ক’দিন একটু মাথা গুঁজে থাকা। মাথায় চিন্তা বলতে ঘুরছিল লাইজার অসুস্থতার কথা, তাকে সাহায্য করার উপায় ইত্যাদি। আর এখন লাইজার কথা ভাবলে মনে হচ্ছে অনেকদিন আগে পড়া কোনো গল্প বা উপন্যাসের কোনো কাল্পনিক চরিত্র। এই মুহূর্তে চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে আবিষ্কৃত দুটো মৃতদেহ বাস্তবের গোটাটা দখল করে আছে।

***

সকালে সবার সঙ্গে প্রশ্নোত্তরের পর্ব শেষ করে, প্রধান আর ফারুক দু’জনেই চাইছিল একটু নিভৃতে বসে আলাপ—আলোচনা করতে। এখন আর এটাকে খুনের কেস বলতে কোনো বাধা নেই। এই কেস সংক্রান্ত কথাবার্তা বলতে, নিজেদের ভাবনাচিন্তা আদান—প্রদান করতে দুজনেই বেশ উদগ্রীব ছিল। ফলে, প্রধান যখন তার কোয়ার্টারে দুপুরের খাওয়াদাওয়া করার প্রস্তাব দেয়, ফারুক তৎক্ষণাৎ সম্মতি জানিয়েছিল।

বিপুল প্রধানের কোয়ার্টার বলতে লাভা বাজার পেরিয়ে ছোটোখাটো কিন্তু সুদৃশ্য একটি একতলা বাড়ি। বড়ো লোহার গেট দিয়ে ঢুকে সিমেন্টে বাঁধানো খানিকটা উঠানের মতো জায়গা। তার একদিকে একটা সবুজ ছাউনি দিয়ে সেখানে গাড়ি রাখা থাকে। অন্যদিকে কিছু ফুলের টব এবং একটা ছোটো গোল টেবিল। টেবিলের দু’পাশে দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার। এই জায়গাটা পেরিয়ে দুটো ধাপ সিঁড়ি উঠে বাড়ির বারান্দা। প্রধান ফারুককে খুবই সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে বাড়ির ড্রয়িংরুমে এনে বসিয়ে তার স্ত্রীকে খবর দিতে গেল। ঘরটি বেশ বড়োসড়ো এবং লম্বাটে ধরনের। একদিকে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা, আর অন্যদিকে খাওয়ার টেবিল—চেয়ার রাখা আছে। ঘরের আগাগোড়া জিনিসপত্র দিয়ে ঠাসা। সোফা, টেবিল, তেপায়া, ফ্লোর ল্যাম্প, বুকশেলফ, শোকেস, আর চতুর্দিকে দেয়ালজুড়ে ছবি, থাংকা, একটা কালিম্পং জেলার ম্যাপ, কিছু মুখোশ, সব মিলিয়ে ঘরের কোথাওই দৃষ্টি খুব বেশি এগোনো সম্ভব নয়।

প্রধানের স্ত্রী ট্রেতে এক গ্লাস সরবত আর প্লেটে কিছু কুকি, কাজু বাদাম, আর পেস্ট্রি নিয়ে ঘরে ঢুকল। মহিলার বয়স হয়তো তিরিশের নীচেই হবে। এই মুহূর্তে অন্তত পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। নাম গরিমা। এই যে ফারুক প্রথমবার বাড়িতে এল, অথচ তাকে বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে খাওয়াতে হচ্ছে, তাই নিয়ে সে স্পষ্টতই বিব্রত। বারবার করে ফারুককে বলে দিল এরপর যেন অবশ্যই স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে তাদের বাড়িতে আর—একবার আসে। একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর স্বামী—স্ত্রী খানিকক্ষণের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল খাবার অর্ডার করা নিয়ে। কোনো এক স্থানীয় দোকানে নাকি দুর্দান্ত পর্ক বাও রান্না করে। প্রধান প্রায় সেই দোকানে ফোন করতে গিয়ে হঠাৎ অপ্রস্তুত হয়ে ফারুকের দিকে তাকাতে, ফারুক হাত তুলে জানিয়ে দিল যে তার কোনো খাবারেই আপত্তি নেই।

চেনা খদ্দেরের কারণেই হোক, বা থানার বড়োবাবুর বাড়ি বলে, খাবার পৌঁছে গেল পনেরো মিনিটের মধ্যে। বিভিন্ন পদ এবং প্রচুর পরিমাণে। শুধু পর্কই এসেছে তিন রকমের। গরিমার পক্ষে এখন চেয়ার—টেবিলে বসে খাওয়াটা অস্বস্তিকর। প্রধান তার স্ত্রীর জন্য একবাটি স্যুপ ও কিছুটা ড্রাই চিলি পর্ক একটা প্লেটে তুলে দিয়ে, শোয়ার ঘরে দিয়ে এল। গরিমা যাওয়ার আগে আর—একবার ফারুককে বাড়ি আসার কথা মনে করিয়ে দিয়ে গেল। অবসরপ্রাপ্ত ও ভারপ্রাপ্ত দুই গোয়েন্দা অফিসার যে যার প্লেটে খাবার নিয়ে বসল। খাবার সত্যিই খুব সুস্বাদু। প্রথম পাঁচ মিনিট প্রায় নীরবে কেটে যাওয়ার পর, প্রধানই প্রথম মুখ খুলল।

“আমরা গতকাল নীলাদ্রি আর ঋজুর ব্যাপারটা ধরে যে এগোব ভাবছিলাম, সেই হিসাব তো এবার একটু ওলট—পালট হয়ে গেল।”

“পুরোপুরি গেল কি? লজিক্যালি স্পিকিং, নীলাদ্রিকে ঋজু খুন করেছে এবং তারপর সম্পূর্ণ অন্য কারণে ঋজু নিজে খুন হয়ে গেছে, এটা হতে বাধা কোথায়?”

“আপনি বিশ্বাস করেন যে নীলাদ্রি খুন হয়েছে?”

“বিশ্বাস করতে গেলে প্রমাণ দরকার। আপাতত এটুকুই বলছি যে ঘটনাক্রম হিসাবে এটা সম্ভব। ফলে, ওই লাইন অফ ইনভেস্টিগেশন একদম বন্ধ করে দেওয়ারও কারণ নেই। এটা আমার মত।”

“ঠিক। তবে আমি এই মুহূর্তে হয়তো ঋজুর কেসটায় বেশি ইন্টারেস্টেড। আফটার অল, অন্যটা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও, এটা যে খুন সেটা তো দিনের আলোর মতো ক্লিয়ার। ভাবছিলাম, এটা নিয়েই একটু আলোচনা করব, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড।”

“অফকোর্স। মাইন্ড করার প্রশ্নই আসে না। প্রথমে দেখা যাক, আপাতত আমরা কী কী জানি।”

“রাইট!” প্রধানকে বেশ উৎসাহিত শোনাল, “খুনটা হয়েছে গতকাল গভীর রাতে। মৃতদেহ পাওয়া গেছে বেশ অপ্রত্যাশিত এক জায়গায়— প্লাস্টিকে মুড়ে রাখা আধা তৈরি কটেজের ভিতরে। প্রাথমিক পরীক্ষা—নিরীক্ষা ও ময়না তদন্তের পরে বোঝা যাবে যে তাকে ওখানেই খুন করা হয়েছে নাকি অন্য কোথাও খুন করে মৃতদেহ ওখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে? যদিও আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে অন্য কোথাও খুন করে বৃষ্টির মধ্যে মৃতদেহ বয়ে নিয়ে গিয়ে ওরকম তাঁবুর মতো একটা জায়গার ভিতরে রেখে আসা প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু একাধিক মানুষ থাকলে একেবারে অসম্ভবও নয়। অপরাধীদের জন্য বৃষ্টির কিছু সুযোগসুবিধাও আছে। পায়ের ছাপ বা অন্যান্য কোনো চিহ্ন কিছুক্ষণের মধ্যেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, খুন যদি ওখানেই হয়ে থাকে, তাহলে জানতে হবে ঋজু ওখানে কী করতে গেছিল? এখানে ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্ট, সেদিন রাতে ঋজুর আলাদা ঘরে একা শুতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। সে যেচে বাকি বন্ধুদের চোখের আড়ালে থাকতে চেয়েছিল। ফলে, ধরেই নেওয়া যেতে পারে যে ঋজু আচমকা, অর্থাৎ রাতে কোনো কিছু দেখে বা কোনো শব্দ শুনতে পেয়ে, ওখানে গিয়ে হাজির হয়নি। আগে থেকে ঠিক করে রাখা টাইমমতো বেরিয়ে, ওই নির্দিষ্ট জায়গায় কারওর জন্য ওয়েট করছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, কার জন্য ও কী কারণে? পরিস্থিতি ধরে বিচার করলে, এখানে আই উইটনেস পাওয়া বা অ্যালিবাই যাচাই করা অসম্ভব ধরেই এগোতে হবে। আপনার কী মনে হয়?”

“এখন অবধি আমি সম্পূর্ণই সহমত। তবে এগুলোর সঙ্গে মোটিভের ব্যাপারটাও ভাবা প্রয়োজন বলে মনে হয়।”

“আপনি কী ভাবছেন? টাকাপয়সা?”

“এটা এত বেসিক যে অগ্রাহ্য করার তো উপায় নেই। ঋজু নিঃসন্দেহে বিশাল সম্পত্তির ওয়ারিশ। খোঁজ নিলে দেখা যাবে যে এখনই তার নামে যা টাকাপয়সা, জমি—বাড়ি, বন্ড ইকুইটি ইত্যাদি আছে, শুধু সেসবের পরিমাণই হয়তো আকাশছোঁয়া। এই ব্যাপারটা একটু সাবধানে খোঁজখবর নিয়ে জানতে হবে যে ওই পরিবারের বৈষয়িক ভাগাভাগির অঙ্কটা কী অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাবসার গোটা অংশের মালিকানা যদি ওর বাবার না হয়, তাহলে খুড়তুতো, জ্যাঠতুতো ভাইবোনেরাও এই মূল সম্পত্তির ভাগীদার। তার মধ্যে একজন চিরতরে শয্যাশায়ী। এদিকে বাবার ডিমেনশিয়া সেট ইন করছে। সেটা কী সত্যিই গোপন আছে? না থাকলে কারা কারা জানে? এহেন অবস্থায় আর—এক ভাগীদার সরে গেলে বাকিদের পক্ষে সেই পরিস্থিতি যে টাকাপয়সার দিক থেকে অত্যন্ত লাভজনক, সে কথা আলাদা করে কিছু বলার নেই। তবে এই পথে এগোনোর আগে অন্যান্য কাকা—জ্যাঠা বা ভাই—বোনদের সম্পর্ক এবং আর্থিক অবস্থার একটা পাকা খবর প্রয়োজন।”

“ঠিকই বলছেন, তবে আমি খানিক ডিফার করতেও চাই। যদি কিছু মনে না করেন—”

“আরে, আপনি বারবার এত বিব্রত হয়ে পড়ছেন কেন? অফকোর্স ডিফার করবেন। নাহলে আর আলোচনা কীসের? আর তাছাড়া এটা তো আপনারই কেস। ইউ হ্যাভ দ্য লাস্ট ওয়ার্ড!”

“থ্যাংক ইউ, কিন্তু ওরকমও নয়। আমি সবসময়ই ঠিকঠাক মানুষের থেকে অ্যাডভাইস পেতে ইন্টারেস্টেড। যাইহোক, যেটা বলছিলাম, টাকা যদি মোটিভ হয়, সেই ক্ষেত্রে তো ধরে নিতে হবে এর পিছনে পরিবারের কেউ আছে। কিন্তু এই স্পেসে তো তারা কেউ প্রেজেন্ট নেই। প্রভাবশালী, বড়োলোক ফ্যামিলির কেউ এই কাজ করতে বা করাতে চাইলে, কলকাতাতেই সেটা হতে পারে, তার জন্য এই জায়গাটা বেছে নেওয়ার কারণ কী হতে পারে? আমি ডেফিনিটলি ওদের ফাইন্যানশিয়াল সিচুয়েশন খোঁজ নিয়ে দেখব, তবে আমার কাছে মোটিভ হিসাবে অন্য জিনিস হয়তো কাজ করছে।”

“সেটা কী?” ফারুকের খাওয়া প্রায় শেষ। পেট ভরে গেলেও, খাবারের স্বাদের টানে সে এখনও প্লেট থেকে মাঝেমধ্যে ছোটো মাংসের টুকরো, বা মশলা দেওয়া গ্রেভি, এইসব তুলে তুলে খাচ্ছে।

“এক কথায় বলতে গেলে ঘৃণা। ঋজুর মতো ছেলের ক্ষেত্রে আমার কাছে মোটিভ হিসাবে এটা খুবই কনভিন্সিং মনে হয়। তার সবথেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে দু’জনেরই ঋজুর ব্যাপারে যথেষ্ট ওপিনিয়ন আছে। তাদের কথাবার্তা শুনে এটা পরিষ্কার যে ঋজুর জনপ্রিয়তার হিসাব করলে, এক আঙুলে গুনেই শেষ করে ফেলা যায়। এবং দেবলীনার বয়ান থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট নীলাদ্রির ব্যাপারে ঋজুর লাগামহীন রাগ এবং ঘৃণা ছিল। একজন মানুষ যদি কারওর প্রতি এতটা ঘৃণা পোষণ করতে পারে, তাহলে উলটোদিক থেকে ঋজুর প্রতিও কারওর একইরকম ঘৃণা থাকা অসম্ভব নয়। সেই কথাটা হয়তো যে—কোনো মানুষের ব্যাপারেই খাটে, কিন্তু ঋজুর হাবভাব, কথাবার্তা, বা স্বভাব হয়তো ট্রিগারের মতো কাজ করে। তবে সেখান থেকে একেবারে খুন করে ফেলার মতো চূড়ান্ত পদক্ষেপ এই পথটা পেরোতে গেলে আরও জোরালো কিছু কারণ দরকার, আরও তদন্ত প্রয়োজন।”

“এই ঘৃণার রাস্তা ধরে যদি আর—একটু ভাবা যায়, তাহলে মাথায় আসে প্রতিশোধের কথা। ঘৃণার ছোটোভাই বলা যায়, বা কাজিন। ঋজুর প্রতি ঘৃণাপোষণকারি যদি মনে করে, সে সত্যি হোক বা মনগড়া, যে তার প্রতি এমন এক অন্যায় হয়েছে, যার সুবিচার সে কোনোভাবেই পাবে না, তাহলে সে চূড়ান্ত কোনো পদক্ষেপের দিকে হয়তো এগোবে। আবারও, এই মুহূর্তে এটা একেবারেই একটা অনুমানের জায়গায় দাঁড়িয়ে। এটাকে অন্তত তদন্তের খাতিরে একটা চলনসই থিয়োরির জায়গাতে খাড়া করতে গেলে আরও বেশ কিছু তথ্য—প্রমাণ প্রয়োজন।”

গোটা লাঞ্চপর্ব মিটতে মিটতে প্রায় সাড়ে তিনটে বাজল। গরিমা নিজের ঘরে তার খাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রধান একবার সেখানে গিয়ে, খাবারের বাসনপত্র গুছিয়ে তুলে রান্নাঘরে রেখে এল। ফারুক ততক্ষণে খাওয়ার টেবিল অনেকটাই গুছিয়ে ফেলেছে। তাই দেখে প্রধান যথারীতি আবার বিব্রত হয়ে পড়ল। লাঞ্চ পরবর্তী পরিষ্কার এবং গোছগাছের পালা মিটিয়ে দু’জনে দুটো চেয়ার এবং এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে বারান্দায় এসে বসল। ফারুক একটা সিগারেট মুখে নিয়ে, দেশলাই জ্বালিয়ে প্রথমে প্রধানের সিগারেট ধরাতে সাহায্য করল। তারপর নিজেরটা ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, “ঋজুর খুনের ব্যাপারে আমার একটা অন্য জিনিস মনে হচ্ছে যেটা বিবেচনা করে দেখা দরকার। সেটা হচ্ছে, সে যেভাবেই হোক, ঋজুর মুখ বন্ধ রাখা। অর্থাৎ, সে কিছু একটা জানত বা জেনে ফেলেছিল, যা অন্য কারওর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই জেনে ফেলার ব্যাপারটা দু’ভাবে হতে পারে। প্রথমত সে নিজে জানে যে সে অত্যন্ত গুরুতর কোনো তথ্যের সন্ধান পেয়েছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আছে। আর অন্যদিকে এটাও সম্ভব যে ঋজুর কানে কোনো একটা কথা এসেছে, বা সে কিছু একটা দেখেছে। কিন্তু সে নিজে জানে না এই দেখা বা শোনার তাৎপর্য কী। ধরুন যদি ভাবি যে ঋজুই সেই চিঠির প্রেরক, তাহলে একটা সম্ভাবনা তৈরি হয় যেখানে ঋজু জানে যে সে কিছু একটা প্রত্যক্ষ করেছে। এবং এই চিঠি লেখা, সেটা শেষ না করা, তারপর সেটাকে চোখের সামনে থেকে দূরে ফেলে দেওয়ার আগাগোড়া প্রচেষ্টার মধ্যে একধরনের প্রবণতা বা চিন্তাভাবনা আছে, যেটা মানুষ একমাত্র নিকটজনের ব্যাপারেই করে। এখানে নিকটজন বলতে তার কলকাতার বন্ধুরা।”

“একজ্যাক্টলি!” প্রধান যেন এই প্রসঙ্গ উত্থাপনের জন্যই অপেক্ষা করেছিল, “আমি অ্যাকচুয়ালি ওই ঐশানী মেয়েটির ব্যাপারে ভাবছিলাম। দেখুন, পরশু রাতে তাস খেলার সময় ঋজু একটা সময় খুবই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। এতটাই অন্যমনস্ক যে একই ভুলে পরপর দুই হাত খোয়াতে হয়। ভেরি আনন্যাচারাল ফর হিম। মিসেস দত্তর বয়ান অনুযায়ী, সেই সময় ঋজু একদৃষ্টে সামনের দিকে তাকিয়েছিল। সেটা ডাইনিং হলের বাইরে হোমস্টের খোলা জায়গা, যেখান থেকে আর কয়েক পা পেরোলে ওদের নিজেদের দুটো ঘর। তাসের আড্ডায় সেই সময় ডাইনিং হলে ছিল না ঐশানী আর জয়দীপ। ঋজু কি ওদেরকে বা ওদের মধ্যে কাউকে কিছু একটা করতে দেখেছিল? যদিও সেই দেখা আর ফাইনালি খুন হওয়ার মধ্যে একটা গোটা দিনের তফাত। কিন্তু তাতে কোনোদিকেই কিছু ঠিক—ভুল প্রমাণ হয় না। ঋজুর সামান্য খটকা লাগলেও, সে কী দেখছে সেটা হয়তো সে বুঝেই ওঠেনি। পরে হয়তো এমনিই কথাচ্ছলে সেই ব্যাপারটা প্রকাশ করে এবং অপরাধীর টনক নড়ে।

এছাড়া আমি ঐশানীর কথা ভাবছি আর—একটা কারণেও। ডাক্তারের মতে ঋজুর মৃত্যু হয়েছে ছুরির আঘাতেই। পিছন থেকে একটাই পারফেক্ট স্ট্যাব। ছুরিও মোক্ষম স্থানে ঢোকে এবং প্রায় তৎক্ষণাৎ মৃত্যু। এই কারণেই সন্দেহ করা যায় যে আততায়ী হয়তো একজনের বেশি নয়। কিন্তু তার থেকে ইন্টারেস্টিং হল আঘাতের ধরন। ছুরির আঘাত সাধারণত আমরা দু’রকমের দেখে অভ্যস্ত। হয় সোজাসুজি, যার ফলে শরীরে একটা প্রায় সোজা গর্তের মতো ক্ষতস্থান তৈরি হয়। নাহলে দেখা যায় ছুরি কোনাকুনিভাবে প্রবেশ করেছে এবং ক্ষতস্থানের চেহারা ও চরিত্রও সেভাবে বদলে যায়। এই ক্ষেত্রে আমরা স্পষ্টতই দ্বিতীয় সম্ভাবনাটা দেখতে পাচ্ছি। এবার আসি আঘাতের গতিমুখের প্রশ্নে। অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি যে সোজাসুজি ছুরির আঘাত শরীরের প্রায় যে—কোনো জায়গাতেই হওয়া সম্ভব এবং সেরকম বহুবার হতেও দেখেছি। কিন্তু কোনাকুনি আঘাতের ক্ষেত্রে দুটো বেসিক তফাত করাই যায়। শরীরের উপরের অংশে আঘাত হলে, সে ক্ষেত্রে প্রায় নিয়মের মতোই আততায়ীর হাত ও ছুরি উপর থেকে নীচে নেমে আসে। ফলে ক্ষতস্থানের ধরন ও গতিপথ হয় নিম্নমুখী। উলটোদিকে, শরীরের নিম্নাংশে আঘাত হলে, ছুরি ধরা হাত নীচে থেকে উপরে ওঠে— ইংরেজিতে যাকে বলে আপওয়ার্ড থ্রাস্ট। ঋজুর ক্ষেত্রে বৈশিষ্ট্যটাই হচ্ছে শরীরের ঊর্ধ্বাংশে আপওয়ার্ড থ্রাস্ট। আর সেই কারণে আপাতত একটিই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়— আততায়ী ঋজুর তুলনায় বেশ অনেকটাই কম হাইটের সেরকম মানুষের আপওয়ার্ড থ্রাস্ট হলেই এই ধরনের ক্ষতস্থান আর এরকম গতিমুখ হওয়া সম্ভব যেটা ঋজুর ক্ষেত্রে হয়েছে, নীচ থেকে উপরে। ঋজুর মতো, বা তার থেকে লম্বা কেউ হলে এই থ্রাস্ট শরীরের নীচের দিকে হওয়ার কথা। এই মুহূর্তে শুধুমাত্র যদি হোমস্টের মানুষদের কথাই ভাবি, তাহলে এরকম দু’জনকে পাওয়া যাচ্ছে— কৃতিকা এবং ঐশানী। দু’জনেরই উচ্চতা আন্দাজ পাঁচ ফুটের আশেপাশে হবে। কিন্তু কৃতিকার সঙ্গে ঋজুর দু’দিনের আলাপ। অন্যদিকে ঐশানীর সঙ্গে ঋজুর নানারকম সমস্যার কথা সে নিজের মুখেই স্বীকার করেছে। দেয়ারফোর—”

প্রধান নিজের বাক্য অসম্পূর্ণ রেখে সামনের ছাইদানিতে সিগারেট পিষতে লাগল। ফারুক এর মধ্যে অন্যমনস্ক হয়ে নিজের সিগারেটের জ্বলন্ত শেষ অংশ বারান্দা দিয়ে বাইরে উঠোনে ফেলে দিয়েছে। এখন প্রধানকে ছাইদানি ব্যবহার করতে দেখে একটু লজ্জিতই লাগছে। একবার ভাবল ব্যাপারটার জন্য সরি বলবে, কিন্তু তাতে হয়তো প্রধান সাংঘাতিক বিব্রত হয়ে পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর করে তুলবে। ফারুক কেসের প্রসঙ্গেই ফিরে গেল।

“আমি একমত এবং আপনার অ্যাপ্রোচ খুবই মেথডিকাল। আমি শুধু এর বাইরে দু—একটা জিনিস বলতে চাই। প্রথমত, ঋজু ডলিকে বলেছিল যে সে কিছু কথা বলতে চায়। কিন্তু সেই কথোপকথন আর হয়নি। ঋজু কী ব্যাপারে কথা বলতে চেয়েছিল— মামুলি দৈনন্দিন কিছু, নাকি গুরুতর কিছু, যার সঙ্গে তদন্তের সরাসরি যোগাযোগ আছে? এবং দ্বিতীয়ত, তার থেকেও বেশি ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন হল দীর্ঘদিনের এই চার বন্ধুর এতটা কাঙ্ক্ষিত একটা বেড়ানোর প্ল্যান কেন শুরু থেকেই বেলাইনে যাচ্ছে? এটার দিকে সবাই কম—বেশি ইঙ্গিত করেছে, কিন্তু কেউই খুব নির্দিষ্ট কিছু বলতে পারেনি। কী এমন ঘটনা ঘটেছে যে এবারের বেড়ানো কিছুতেই মনমতো হচ্ছে না?”

মেঘ এবং কুয়াশাঘেরা লাভা টাউনের দুপুরবেলা নেহাতই অলস ও স্থবির। সময় যেন গরুর গাড়ি করে যায়। কিন্তু বিকেল হতেই যেন হঠাৎ সবার হুঁশ ফিরে আসে। গাড়ি থেকে গরু খুলে দিয়ে, ঘোড়া লাগিয়ে দেওয়া হয়। মেঘের আড়ালে থেকেও সূর্য পশ্চিমের পাহাড়ের দিকে ছুটতে থাকে। কেস সংক্রান্ত আলোচনার মাঝে, আচমকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একসময় প্রধানই লাফিয়ে উঠে তড়িঘড়ি থানায় ফোন করে একটা জিপের ব্যবস্থা করে দিল। সন্ধ্যা হয়ে গেলে আবার ফরেস্ট এরিয়ার ভিতর দিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নানারকম নিয়মকানুন আছে। তার জন্য অযথা ঝক্কি পোয়াতে হবে।

ফারুক আপাতত সেই গাড়িতেই হোমস্টের দিকে ফিরছে। চারিদিক বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। বৃষ্টি না থাকায় আজকে জঙ্গলের ভিতরের শব্দের অভিজ্ঞতা অন্যরকম। সন্ধ্যা হয়ে আসার কারণেই হয়তো একটা টানা পাখির কলরব শোনা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে কখনো—কখনো পাখির, বা গাছের ডালে ছোটোখাটো কোনো প্রাণী চলাফেরা করলে পাতার একটা খশখশানি। আগের দিন বৃষ্টির জন্য বোঝা যায়নি, কিন্তু আজকে কান পাতলে এখানে—ওখানে পাহাড়ি নালা বা ছোটো ঝরনার জলের কুলকুল শব্দও টের পাওয়া যাচ্ছে। গাড়ির কাচ নামানো থাকায় গন্ধের অভিজ্ঞতাও অন্যরকম।

কিন্তু এর কোনো কিছুর দিকেই এই মুহূর্তে ফারুক খুব একটা মন দিতে পারছে না। তার মন ও মাথার আগাগোড়া জুড়ে রয়েছে আজকে সারা দুপুর ধরে চলা এই কেস বিষয়ক কথোপকথন। এই দীর্ঘ কথাবার্তার ফলে যেমন সত্যিই বেশ কিছু সূত্র বেরিয়ে এসেছে, তেমন আবার কিছু প্রসঙ্গ খুব একটা আলোচিতই হয়নি। ফারুক বুঝতে পারছে যে আজকে ঋজুর মৃতদেহ আবিষ্কারের পর থেকে নীলাদ্রির মৃত্যুটা নিয়ে প্রধান খুব বেশি মাথা ঘামাতে নারাজ। কিন্তু কিছু খটকা ফারুকের থেকেই যাচ্ছে, কিছু প্রশ্নের সদুত্তর না—মেলা অবধি তার পক্ষে এই ব্যাপারটা পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব না। সে একটু চোখ বুজে পরপর কিছু ঘটনাক্রম সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।

অল্পবয়সে পিতৃহারা নীলাদ্রি সৎবাবার কাছে থেকে পড়াশুনা শেষ করে তার মতোই ডাক্তারি পাশ করে। তারপর বাবা—ছেলে একসঙ্গে একই হাসপাতালে কাজ শুরু করে। কয়েক বছর বাদে বাবা হঠাৎ গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। এর পিছনে কারণ কী? বা বলা ভালো যে সেই কারণ কী এতটাই সুদূরপ্রসারী যে তার অভিঘাত এখনও টের পাওয়া যায়? নাকি সেটা নীলাদ্রির বাবার একান্তই ব্যক্তিগত কোনো কারণ যার প্রাসঙ্গিকতা তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে? সত্যি, মিথ্যা, নাকি গুজব সেটা জানা নেই, কিন্তু শোনা যায় যে ভদ্রলোকের অত্যধিক মদ্যপানের দোষ ছিল। সেই দোষ আর তার অন্তিম পরিণতি কি একই সূত্রে বাঁধা? এই ব্যাপারে কাল সকালের মধ্যে আরও কিছু খবর পাওয়া না গেলে আর—একবার অর্ণবকে ফোন করে তাগাদা দিতে হবে।

এবার যদি নীলাদ্রির বর্তমান গতিবিধির প্রসঙ্গে আসা যায়, সে তার পরিবারসহ উত্তরবঙ্গে এসেছিল ছুটি কাটাতে। একটা চা বাগানে দিন তিনেক নিরুপদ্রবেই কেটে গেছিল বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু এই ট্রিপের মূল উদ্দেশ্য ছিল নীলাদ্রির গ্যাংটক যাত্রা। যেটুকু জানা গেছে, সেটা পেশাগত কারণে যাওয়া এবং সেটা পেশাগত কারণে হলেও কোনো মেডিক্যাল কনফারেন্স বা সেমিনার জাতীয় কিছু না। এই ব্যাপারে আরও তথ্য দিতে হাসপাতাল অনিচ্ছুক। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই আবহাওয়ার কারণে তাকে ঠাঁই নিতে হয় কোলাখামে— মূল সড়ক থেকে অফরুটে একটা গ্রাম। সেখানে আসার পরামর্শ দেয় ও তাকে নিয়ে আসে এক পূর্ব পরিচিত ব্যবসায়ী। দু’জনে একসঙ্গেই আসে এবং সে রাত্রেই নীলাদ্রির মৃত্যু হয়। ফলে তার আর গ্যাংটক যাওয়া হয়নি। যদি নীলাদ্রির মৃত্যু স্বাভাবিক না হয়ে থাকে, এবং এটা নিঃসন্দেহে যথেষ্ট বড়ো একটা প্রশ্নচিহ্ন, তাহলে কি সেই ক্ষেত্রে এই গ্যাংটক যাওয়ার কোনো ভূমিকা আছে? অথবা সেখানে যেতে না দেওয়ার ব্যাপারে কেশবের কোনো ভূমিকা আছে? গ্যাংটকের কাজ এবং এই কেশব কোঠারির ব্যাকগ্রাউন্ড— দুটো ব্যাপারেই আরও বেশি করে জানতে হবে।

তৃতীয় এবং শেষ সূত্র নীলাদ্রির দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও ডাক্তারি নৈতিকতা প্রসঙ্গে। ঋজুর বয়ান অনুযায়ী, এই ব্যাপারে দেবলীনা আর সেই সঙ্গে বাকিরাও সায় দিয়েছে, ডঃ নীলাদ্রি চক্রবর্তীর ডাক্তার বা সার্জেন হিসাবে যতই সুনাম থাকুক, সে মোটেই নিষ্কলঙ্ক নয়। কিছু বছর আগে ঋত্বিকা (যদি দেবলীনা ঠিক বলে থাকে) নামক এক মহিলাকে সে তড়িঘড়ি অপারেশনের পরামর্শ দেয়, প্রয়োজনীয় বা যথেষ্ট পরীক্ষানিরীক্ষা ছাড়াই এবং রোগীর পরিবারের অভিযোগ, ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থে। অপারেশনের ফলে মহিলা পঙ্গু ও শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। নীলাদ্রি এই ঘটনার দায়িত্ব নিতে সরাসরি অস্বীকার করে এবং পরে নিজের ক্ষমতার জোর খাটিয়ে শাস্তির সম্ভাবনাও অনায়াসে এড়িয়ে যায়। এই ঘটনায় অন্তত একজনের যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, সেটা তো জানাই যাচ্ছে। সেইসঙ্গে এটাও পরিষ্কার যে ঋজু এক মুহূর্তের জন্য সেটা ভোলেনি এবং তার রাগ বা দ্বেষ এই ক’বছরে বিন্দুমাত্র কমেনি।

এখন কথা হচ্ছে দেশজুড়ে, এমনকি গোটা পৃথিবীতেই, এই ধরনের ঘটনা আকছার ঘটে। চিকিৎসাব্যবস্থার ভার যদি মুনাফাকামী প্রাইভেট ব্যবসায়ীদের হাতে থাকে এবং স্বাভাবিকভাবেই তাদের সঙ্গে যখন সরকার বা অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ঠিকঠাক বোঝাপড়া থাকে তখন এই ধরনের ঘটনা না ঘটাই বরং আশ্চর্যের। ফলে ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে আবেগের বশবর্তী হয়ে কেউ একজন ডাক্তারকে দায়ী করতেই পারে। কিন্তু এই ধরনের কার্যকলাপে গোটা সিস্টেম সমানভাবে জড়িত এবং দায়ী। নীলাদ্রি এবং ঋত্বিকার ঘটনা এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই। তার মধ্যে নীলাদ্রি এই হাসপাতালের শীর্ষস্থানীয় একজন। শুধু ডাক্তার বা সার্জারি নয়, আগাগোড়া হাসপাতালের কার্যকলাপের গতিবিধি কী হবে বা কোনদিকে যাবে, সেখানে তার সিদ্ধান্তের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ফলে, চিকিৎসা দুর্নীতির ঘটনায় নীলাদ্রির সঙ্গে সঙ্গে গোটা হাসপাতালের মাথারাও নিশ্চয়ই জড়িত। এদের নাগাল পাওয়া কখনোই সহজ হয় হয় না। কিন্তু কিছু খবর আরও জোগাড় করতে হবে, একটু বেশিই সাবধানতা অবলম্বন করে।

ফারুক এই নিয়ে একটু বেশিই ভাবছে, তার হয়তো দুটো কারণ। এক হল এই ধরনের বড়ো কর্পোরেট সংস্থা নিজেদের হাঁড়ির খবর মোটামুটি পারিবারিক কলঙ্কের মতো লুকিয়ে রাখে। ফলে সেখানে যাবতীয় যত গোলমাল আছে, তার গোটাটার হদিশ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ঋত্বিকার ঘটনা এবং নীলাদ্রির এই গোপন গ্যাংটক যাত্রা মিলিয়ে মনে হচ্ছে ওখানে কিছু পাওয়া গেলেও যেতে পারে। এর সঙ্গে দ্বিতীয় এবং আরও বড়ো কারণ হল গত দু’দিনে যা ঘটনা ঘটেছে, সেখানে এই চিকিৎসা দুর্নীতির ব্যাপারটাই একমাত্র সম্ভাব্য যোগসূত্র। গোটা ঘটনায় এই একটিমাত্র কারণে দুটো মানুষের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। তাছাড়া ওই রাতে এই রহস্যময় চিঠিতে যে অপরাধ, অনুতাপ এবং কর্মফলের কথা উল্লেখ করা আছে, আপাতত একমাত্র নীলাদ্রি আর ঋজুর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই তার একটা মানে দাঁড়ায়। এই ভাবনার কাঠামোটা আরও জোরালো হতে পারত, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে নীলাদ্রির মৃত্যুর একদিনের মাথায় ঋজুও খুন হয়ে গেল।

লাভা থানার গাড়িটা যখন অবশেষে চেনা বাঁকটি পেরিয়ে এসে হিলটপ হেভেন হোমস্টেতে ওঠার ঢালু রাস্তার মুখে এসে থামল, তখন চারিদিক অন্ধকার। নীচে ডাইনিং এবং আশেপাশে আলো জ্বললেও, উপরে তাকালে ডলিদের বাড়ির বারান্দার আলোয় ফুলের রঙিন টবগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ড্রাইভারকে ওখান থেকেই বিদায় জানিয়ে, ফারুক পায়ে হেঁটে ওই ঢালু পথ বেয়ে, সিঁড়ি দিয়ে উঠে নিজের ঘরে গিয়ে বসতেই দরজায় টোকা। মিস্টার দত্ত।

“সরি স্যার। ডিস্টার্ব করলাম কি? পরে আসব?” ফারুক মনে মনে বলল যে কখনও না এলে সবথেকে ভালো হয়। কিন্তু মুখে ভদ্রতা বজায় রাখল। “আরে আপনি এরকম স্যার স্যার করে কথা বলছেন কেন? আপনি তো আমার সাবঅর্ডিনেট নন, আর এটা কোনো অফিশিয়াল মিটিং হচ্ছে না।” “তা তো বটেই। তা তো বটেই। আসলে আপনার মতো এরকম একজন সিনিয়ার অফিসার যিনি পুলিশের কাজে এতদিন—” “আপনি কি কিছু বলতে এসেছিলেন?” ফারুক এবারে একটু বাধা না দিয়ে পারল না। “হ্যাঁ, কিছুটা সেরকমই। কিন্তু আপনাকে বিরক্ত করতেও এত খারাপ লাগছে—” “কোনো ব্যাপার না। হেল্প করতে পারলে অবশ্যই করব।” ফারুক এখনও আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ধৈর্য না হারানোর। “অ্যাকচুয়ালি, আপনি তো জানেন, পুলিশের তরফ থেকে তো অফিশিয়ালি একেবারে স্টে অর্ডার দিয়ে গেছে। মানে যতক্ষণ না কেসের সমাধান হচ্ছে বা সমাধানের কোনো ঠিকঠাক রাস্তা বেরোচ্ছে, ততক্ষণ আমাদের সবাইকে এখানেই থাকতে বলা হয়েছে। এবার ব্যাপারটা হচ্ছে আমরা তো ওয়েদারের জন্য অলরেডি বেশিদিন ধরে আছি। এবার এরকম একেবারে ইনিফি—ইনডিফি— মানে কতদিন এভাবে থেকে যাওয়া তার কোনো একটা যদি আঁচ পাওয়া যেত….” ভদ্রলোক বাক্য অসম্পূর্ণ রেখে জিজ্ঞাসুভাবে ফারুকের দিকে চাইলেন।

“দেখুন, এটা এখন সরকারিভাবে একটা পুলিশি তদন্ত। এখানে আমি একজন প্রাক্তন পুলিশকর্মী হয়ে নাক গলিয়ে কোনো কিছু বলতে বা করতে পারি না। আর হলেও সেটা আদৌ গ্রাহ্য হওয়ার কথা নয়। এগুলোর কিছু স্পষ্ট নিয়মকানুন আছে যেটা মেনে চলতে হয়। মাঝেমধ্যে ব্যতিক্রম হয়। কিন্তু সেটা রাজ্যপাল বা প্রেসিডেন্ট হস্তক্ষেপ করলে হয়। আমার বলায় নয়। এমনকি কমিশনার নিজে বললেও হয় না। এর বাইরে থাকে দুর্নীতি। আমি ধরে নিচ্ছি আপনি সেদিকে ইঙ্গিত দিচ্ছেন না।”

“এ বাবা, ছিঃ ছিঃ ছিঃ!” ভদ্রলোক কালী ঠাকুরের মতো জিভ কেটে প্রায় মাটিতেই মিশে যাওয়ার জোগাড়। “এ কথা একদম মনে—মুখেও আনবেন না স্যার। মানে সরি, ফারুক—বাবু।”

“বেশ, তাহলে তো মিটেই গেল। তাও এরপর যখন দেখা বা কথা হবে, আমি প্রধানকে জিজ্ঞাসা করব আপনাদের আর্লিয়েস্ট কবে ছেড়ে দেওয়া যায়।”

“থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।” সেই বিগলিত ভাব এখনও কাটেনি। “আর কিছু বলবেন?” “না মানে, এটা হয়তো আপনি কীভাবে মানে আমি কীভাবে বলি?” “কী ব্যাপার?”

“দেখুন, এই যে ছেলেটি মারা গেল। খুবই আনফরচুনেট ব্যাপার। কিন্তু এ তো এমনি এমনি মারা যায়নি। এ তো শিওর শট খুন। মানে আমি জানি তদন্ত চলছে, কিন্তু খুনি কি আমাদের মধ্যেই কেউ হতে পারে? তাহলে তো আমরা কেউই সেফ নই। এই বিপদের মধ্যে আমাদের এখানে থেকে যাওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে? মানে আপনি যদি একটা সামান্য হিন্টও দেন, আমি সেই মতো একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলব।”

এরপর প্রায় দশ মিনিট ধরে অসীম ধৈর্য সহকারে ফারুক মিস্টার দত্তকে তদন্তের কোনোরকম তথ্য বা ভাবনা জানতে না দিয়ে বুঝিয়ে গেল যে আপাতত তাঁদের কোনো বিপদের সম্ভাবনা আছে বলে মনে হচ্ছে না। ভদ্রলোক নিজের সন্দেহ এবং দুশ্চিন্তার কিয়দংশ সঙ্গে নিয়েই আবার যতক্ষণে ঘরের দিকে পা বাড়ালেন, ফারুকের মনে হচ্ছিল সে এখন ওই মশলা দেওয়া চা—ও পরপর তিন কাপ খেয়ে ফেলতে পারবে। এই কথাবার্তার মাঝেই তার ফোনে বেশ কয়েকবার মেসেজ আসার শব্দ হয়েছে। এবার সে গিয়ে ফোন তুলে দেখল পাঁচটা মেসেজের মধ্যে একটাই দরকারি বিপুল প্রধানের ফোন থেকে এসেছে। সেটা খুলে ফারুক দেখল লেখা আছে যে ডক্টর সেন একটা প্রাথমিক পরীক্ষা—নিরীক্ষা শেষ করেছেন। তাঁর গোড়ার সন্দেহই ঠিক। মৃত্যুর কারণ পালমোনারি অ্যাসপিরেশন। সময় ওই সাড়ে বারোটা নাগাদ। এই মুহূর্তে সন্দেহ করার মতো আর কিছু নেই। তবে তিনি আর—একটু ডিটেল ইনভেস্টিগেশন করে দেখবেন।

ফোন নামিয়ে রেখে ফারুক ভাবল যে সে হয়তো অযথাই নীলাদ্রির ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। হয়তো দুর্ভাগ্যজনক এবং কাকতালীয়, কিন্তু আখেরে অ্যাক্সিডেন্টাল মৃত্যু। তার থেকে বরং ঋজুর ব্যাপারটায় মন দেওয়া যেতে পারে। পরক্ষণেই মনে হল যে সে নিজে দীর্ঘদিন রিটায়ার্ড এবং আসলে এর কোনোকিছুর ব্যাপারেই মাথা ঘামানো নিয়ে তার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এগুলো বহুদিন যাবৎ আর তার কাজের আওতায় পড়ে না। আবার দরজায় টোকা। এবার ফারুক ঠিক করল এক বাক্যে ভদ্রলোককে বিদায় করবে, নাহলে সত্যিই তার পক্ষে ধৈর্য ধরে মেজাজ ঠিক রাখা মুশকিল। সে উঠে গিয়ে একটু জোরের সঙ্গেই টান দিয়ে দরজাটা খুলল। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ঐশানী।

“ভিতরে আসতে পারি? একটু দরকারি কথা ছিল।”

ফারুক একটু অবাক হয়েই, কোনো কথা না বলে দরজার এক পাশে সরে দাঁড়াল। ঐশানী ঘরে ঢুকলে, ফারুক দরজা ভেজিয়ে সেখানে পিঠ দিয়ে দু’হাত ভাঁজ করে চোখের ইশারায় তাকে চেয়ারে বসতে বলল।

“আমি কয়েকটা কথা বলতে চাই। মানে জানাতে চাই। কিন্তু এটা আমি পুলিশের সামনে বলতে চাইনি। কারণটা শুনলেই বুঝতে পারবেন।” ফারুক এখনও চুপ। ঐশানী একবার চোখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে আবার কথা বলে চলল।

“আমার কলেজ লাইফ থেকে গাঁজা খাওয়ার অভ্যাস আছে। আমি নেশাগ্রস্ত নই। কিন্তু দিনের শেষে, বিশেষ করে খুব স্ট্রেস গেলে, আমি একটা মাঝারি জয়েন্ট ধরাই। আমার বন্ধুরা জানে, কিন্তু ওদের নেশা বা অভ্যাস কোনোটাই নেই। তাই ওরা জয়েন করে না। আমি গোটা জিনিসটা সবসময়েই নিজের সঙ্গে ক্যারি করি, যাতে প্রয়োজন পড়লে একটা রোল করে নিতে পারি। এবার বেড়াতে এসে ঋষিখোলায় প্রথমদিনের পর আর খাওয়া হয়নি। এখানে এসে সেকেন্ড দিন, মানে যেদিন অনেক রাতে ডঃ চক্রবর্তী মারা গেলেন, সেই দিন সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ আমি একটা জয়েন্ট রোল করে ওই কটেজ পেরিয়ে জঙ্গলের দিকে যাই। ওই সময়টা স্ন্যাক্স আর ডিনারের মাঝামাঝি একটা টাইম। তারমধ্যে বৃষ্টি থাকায় একেবারেই নিরিবিলি ছিল। আমার কারওর সঙ্গে দেখা হয়নি। যাই হোক, আমি ধরিয়ে নিয়ে প্রায় কুড়ি মিনিট মতো ওখানে ছিলাম। হাফ জয়েন্ট শেষ হল, আমি বাকিটা নিভিয়ে আবার একই রাস্তা ধরে ঘরের দিকে ফিরছিলাম। ডাক্তারবাবুর কটেজের পাশ দিয়ে যখন হাঁটছি, শুনতে পেলাম ভিতরে চাপা গলায় কথাবার্তা হচ্ছে। কথাগুলো ক্লিয়ার না। কিন্তু সবে যখন জায়গাটা পেরোচ্ছি, তখন একটা গলা হঠাৎ চড়ে গেল। আমি নাইন্টি ফাইভ পারসেন্ট শিওর ওটা ডাক্তারেরই গলা। অন্যজনকে বেশ শাসানির সুরে বলছেন যে তার এরকম আস্পর্ধা হয় কোথা থেকে এবং এটা যেন তিনি আর না শোনেন, তাহলে তিনি স্টেপ নেবেন।”

“ঠিক কী বলেছিল, মনে আছে? মানে কোট করতে পারবে?”

“না, আসলে তখন অতটা মনও দিইনি। কান পাততে পাততেই কিছু কথা হয়ে গেছিল। তবে খুব ভুল যদি না করি তাহলে কথাগুলো এরকমই ছিল, ‘তোমার সাহস হয় কীকরে আমাকে এগুলো বলার? আবার যদি এই এই ব্যাপারে কিছু বলো বা করো, তাহলে আমি কিন্তু স্টেপ নিতে বাধ্য হবো’। একদম হুবহু হয়তো শব্দগুলো এরকম না, কিন্তু বক্তব্য একেবারেই এটা। তাতে সন্দেহ নেই।”

“কথাগুলো বাংলায় বলছিল?” “হ্যাঁ।” “বেশ, কিন্তু এটা তো একটা সিরিয়াস ইনফরমেশন। এটা আমি পুলিশকে না জানিয়ে কী করে থাকব?”

“অফকোর্স জানাবেন। কিন্তু আমার একটা রিকোয়েস্ট যে আমার গাঁজা খাওয়ার বা ক্যারি করার কথাটা যদি না বলেন। আমার সামনে বিদেশে যাওয়া আছে, এখনও সব কাগজ রেডি হয়ে আসেনি। এরমধ্যে কিছু হলে আমার খুবই ক্ষতি হয়ে যাবে।”

“বুঝলাম। কথা দিতে পারছি না, কিন্তু দেখছি কী করা যায়। তোমাকে ধন্যবাদ যে তুমি তাও নিজে থেকে এসে কথাটা জানালে। তা তুমি ঘরে না ধরিয়ে অতদূর গেছিলেই বা কেন?”

“এক হচ্ছে ব্যাপারটা জানলেও জয়দীপ এই নিয়ে অশান্তি করে। ওর বক্তব্য যে ও স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু বেসিক্যালি মরালিস্ট। আমার এইসব পোষায় না। তাছাড়া এখানে আসার পর মাঝেমাঝেই ওই কৃতিকা বলে মেয়েটি আমাদের ঘরে এসে গল্প করে, সময় কাটায়। ও আমাদের থেকে অনেকটা ছোটো। আমি ওর সামনে দুম করে একটা গাঁজার জয়েন্ট ধরিয়ে ফেলতে কমফোর্টেবল নই।”

“লাস্ট একটা প্রশ্ন করি। যদি ধরে নিই ওটা ডাক্তারের গলাই ছিল, কথাটা কার উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছিল সেই ব্যাপারে কোনো ধারণা আছে? বা আন্দাজ করতে পারো?”

“ইট ক্যান বি এনিবডি। আমি কী করে বলব? শুধু এটা বলতে পারি যে আমাদের কাউকে বলেনি। কারণ আমি নেক্সট তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে ঘরে ফিরে এসেছিলাম।” “তখন তোমরা সবাই ঘরে ছিলে?”

ক্ষণিকের জন্য চুপ। “না। অ্যাকচুয়ালি আমি ঘরে ফিরে দেখি শুধু দেবলীনা আছে। জয়দীপ আর ঋজু অন্য ঘরে ছিল। সেটা দেবলীনা আমাকে বলে। আমি তো আর সেটা তখন কনফার্ম করে দেখিনি।”

মেয়টি চলে যাওয়ার পরে ফারুক বেশ কিছুক্ষণ খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে, মেঝেতে পা ঝুলিয়ে রেখে, সিলিংয়ের দিকে চেয়ে রইল। মাথায় বিভিন্ন চিন্তা, বিভিন্ন সূত্র ঘুরপাক খাচ্ছে। সে বিলক্ষণ বুঝতে পারছে যে এই ঘটনার শেষ না দেখে সে ছাড়তে পারবে না। কোনো সরকারি পদ বা ভূমিকা না থাকলেও এই তদন্তে সে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েছে। এই জট তাকে নিজে হাতে খুলে মুক্তি পেতে হবে। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করা যায়? একটা গিঁট আলগা করতে না করতেই আবার নতুন গিঁট পাকিয়ে যায়। নীলাদ্রির এই ব্যাপারটা এখন নতুন করে ভাবাচ্ছে। কথাগুলো কার উদ্দেশ্যে বলা? যেহেতু বাংলায়, তাই পৃথ্বী রাই আর তার মেয়েকে বাদ দিয়ে যে কাউকেই বলা হতে পারে। আপাতত যেই কথাটা মাথায় সবথেকে বেশি ঘুরছে সেটা হল নীলাদ্রির শাসানি আর সেই চিঠির বয়ানের সাদৃশ্য। প্রায় একই কথা দু’জায়গায় বলা হয়েছে। ভুল করেছ। সহ্য করেছি। আর করব না। এবার ফল ভোগ করতে প্রস্তুত হও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *