১০. ‘হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা অন্য কোন্ খানে!’

১০. ‘হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা অন্য কোন্ খানে!’

শেষ অবধি ভারত আমাকে ত্যাগ করতেই হল। সিদ্ধান্তটি আমি নিজেই নিই। নিতে হয়। এ ছাড়া, সত্যি বলতে কী, আমার উপায় ছিল না। আমার রক্তচাপ উদ্বাহু নৃত্য করে যাচ্ছে। মুহূর্তে কমছে, মুহূর্তে বাড়ছে। দুশ্চিন্তার ওপরও কিছু আর নির্ভর করছে না। রক্তচাপ কমানোর ওষুধ, আর যার রক্তচাপই কমাক, আমার রক্তচাপ কমাতে পারছে না। কিডনি আর চোখ পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন ডাক্তার। চোখের ডাক্তারের কাছে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল। পরীক্ষা করে ডাক্তার বলে দিলেন, রেটিনোপ্যাথি ধরেছে চোখে। তার মানে চোখ আমার নষ্ট হওয়ার পথে।

রক্তচাপ যতবারই পরীক্ষা করছি, ততবারই অদ্ভুত সব রক্তচাপ দেখতে পাচ্ছি। আর যাকেই বিশ্বাস করা যায়, এই চাপকে করা যায় না। অন্য যে কোনো লোক কবেই মরে যেতো এই চাপে। আমি কী করে বেঁচে থাকি জানি না। রক্তচাপ দাবিয়ে রাখার ব্যবস্থা হয় বটে, তবে বছর পার হওয়ার পর যে ভয়ংকর সংবাদটি আমাকে নিউইয়র্কের রক্তচাপ বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন, তা হল, আমার রক্তচাপের চরিত্র এখন এমনই দাঁড়িয়ে গেছে, সে কখনও কোনো ওষুধে বশ মানবে না, সে তার নিজের খুশি মতো, যখন ইচ্ছে আকাশে উঠবে, যখন ইচ্ছে পাতালে ঝাঁপ দেবে। এমন রক্তচাপ নিয়েই আমাকে বাঁচতে হবে, যতদিন বাঁচি। নৃত্য যদি রক্ত একবার শিখে যায়, সে নৃত্য তার থামে না কিছুতেই। আমার রক্ত নৃত্য শিখেছে নিরাপদ বাড়ির চাপে আর তিন তিনটে ভুল ওষুধে।

পৃথিবীতে দুটো বাড়িকেই আমি বাড়ি বলে মনে করি, অথবা আমার বাড়ি বলে ভাবতে পারি। এক ঢাকায় শান্তিনগরের বাড়ি। দুই কলকাতার বাড়ি। যদিও কলকাতার বাড়িটি ভাড়া বাড়ি, কিন্তু বাড়িটির ভাড়া আমি দিয়েছি, অন্য কেউ নয়। আমার সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব ওখানেই। আর ওই দুটো বাড়িতেই আমার প্রবেশ নিষেধ। আমি শুধু ঢাকা বা কলকাতা শহরের আমার বাড়িতে নয়, যে দেশে ওই শহরগুলো, সেই দেশগুলোতেও যেতে পারবো না, আমি নিষিদ্ধ। পশ্চিমের দেশে আমার নির্বাসন জীবন শুরু হয়। এই নির্বাসন সারা জীবনের, নাকি ক্ষণিকের, কিছুই আমার জানা নেই। অনিশ্চয়তার কাঁধে ভর দিয়ে আমাকে হাঁটতে হয়। কতদূর হাঁটতে পারবো, তাও আমার জানা নেই। দেশে দেশে ঘুরি ফিরি।

ভারত সরকার বিজনেস ক্লাস টিকিট দিয়েছে সুইডেনে যাওয়ার। ওয়ান ওয়ে টিকিট। পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজস্থান যাওয়ার টিকিট দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ওই টিকিটও ছিল ওয়ান ওয়ে টিকিট। কলকাতা টু জয়পুর। ভারত সরকার থেকেও দেওয়া হল, দিল্লি টুস্টকহোম। তবে ভারত সরকার থেকে বিদেয়টা অনেকটা ঘটা করেই হয়েছে। অনেকটা বাড়ির অতিথিকে পোলাও মাংস খাইয়ে বিদেয় জানানোর মতো। অথবা অনেকটা ফাঁসির আসামীকে যেমন ফাঁসির আগে যা চাওয়া হয়, তাই দেওয়া হয়, তেমন। যাওয়ার দিন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হবে, এ কথা শুনে কলকাতা থেকে বন্ধুরা এসেছিল দেখা করতে। রীতিমত পাঁচ তারা হোটেলে ওদের সঙ্গে দেখা করানোর ব্যবস্থা হল। গভীর রাতে ফ্লাইট। ডিনার করো বন্ধুদের সঙ্গে। যত ইচ্ছে খাও। দুতিন ঘণ্টার জন্য বরাদ্দ হল তাজ হোটেলের একটা সুইট। যে রাতে আমার ভারত ছাড়তে হবে, সে রাতে সেই তাজ হোটেলেই ডিনার করতে হবে কলকাতার বন্ধুদের সঙ্গে। রুম সার্ভিসকে যা খুশি তাই অর্ডার করতে পারি। কেবল তাই নয়, ওই বন্ধুদের সবাইকে হোটেলে রাখা, খাওয়ানো, সবই দেওয়া হল সরকার থেকে। সবই হচ্ছে আমার ভারত ছাড়ার উপহার। প্রভু নিজেই এসব করলেন। আমি আবদার করিনি কিছুর। বরং বলেছি এত খরচ করার দরকার নেই। ওরা নিজেরা এসেছে, নিজেরাই নিজেদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে নেবে। কিন্তু কে শোনে আমার কথা! অনেকটা মিশন সাকসেসফুল হওয়ার মহোৎসবের মতো লাগছিল সবকিছু। তবে জানি না সরকারের কে কী ভেবেছিলেন, আমি কিন্তু শরীর সুস্থ করার উদ্দেশেই যাচ্ছিলাম। রক্তচাপে কোনো অসুবিধে না দেখলে আমি হাজার বছর থেকে যেতে পারতাম। হ্যাঁ ওই বন্দি অবস্থাতেই। অন্যায় না করে শাস্তি পেতে থাকলে পালিয়ে না গিয়ে বরং ওই শাস্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা আর বাক স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করা, সে জীবন ভর লড়াই করতে হলেও করার পক্ষপাতী আমি। মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছেগুলো খুব পুরোনো শোনায়, যে আদর্শের কথা বলি তা এখন অচল, মানুষ ঠিক বোঝে না কী বলছি, যেন সেই চল্লিশ বা পঞ্চাশ দশকের কোনো অশরীরী কেউ এসে কিছু বলছে। গোলগোল চোখ করে লোকে তাকায়। অনেকে ভাবে, আমার নিশ্চয়ই আসলে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে, না হলে নিজের কথা না ভেবে অন্যের কথা ভাবছি কেন, নিশ্চয়ই কোনো ফায়দা। লোটার উদ্দেশে অন্যের জন্য দরদ দেখাচ্ছি, তলে তলে অন্য প্ল্যান।

আমি তখন ভীষণ ক্লান্ত। এ আমার এক ধরনের হেরে যাওয়াও বটে। ভারত কখনও ছাড়বো, এ আমি কোনোদিন ভাবিনি। কিন্তু আগে তো বাঁচতে হবে। তারপর তো কোন দেশে যাপন করবোজীবন, সেই প্রশ্ন। ভারত আর বাংলাদেশ বাদ দিলে বাকি দুনিয়া আমার কাছে এক, সবই বিদেশ। সুইডেনে যাওয়ার উদ্দেশ্য, ও দেশে আমার চিকিৎসার সুবিধে। ও দেশের যারা নাগরিক, বা যারা বাস করে ওদেশে, সবাই পায় রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ইওরোপ আমেরিকায় চিকিৎসা করা! ও সত্যিকার রাজা বাদশা ছাড়া আর কেউ পারবে না। সুইডেনে নেমেই দেখি সুইডিশ পেন ক্লাবের মারিয়া, মাইব্রিট, আর সিসিলিয়াভিকম, সুইডেনের সংসদ সদস্য, আমাকে নেবার জন্য এসেছে। আমার থাকার ব্যবস্থাও করে রেখেছে। সংস্কৃতি দপ্তর থেকে আমাকে একটা গ্রান্ট বা স্কলারশিপ দেওয়া হয়েছে। উপসালা শহরে একটা অ্যাপার্টমেন্ট দেওয়া হবে আমাকে। সুয়েনসন এসেছিলো বিমান বন্দরে। কিন্তু ওর বাড়িতে যেতে গেলে বাধা আসে। কী রকম সব সাজানো মনে হয় সব। সিসিলিয়া তার গাড়িতে করে উপসালা নিয়ে গেল। জানা নেই শোনা নেই, অথচ ব্যবহার করছে যেন আমি তার কতকালের আপন। আমার জন্য তার উপচে ওঠা আবেগ আমাকে বড় বিব্রত করে। উপসালা শহরের এক হোটেলে রাখা হল আমাকে, সঙ্গে মাইব্রিট রইলো। এত দিন পর আমার মানসিক অবস্থাও বোধহয় অদ্ভুত হয়ে গেছে। পুলিশ আমকে ঘিরে রাখছে না, কিন্তু আমার খবরাখবর রাখছে। এ জানার পরও পুলিশ বেষ্টিত না হয়ে রাস্তায় বেরোতে ভয় পাচ্ছিলাম। এ কলকাতা নয়, দিল্লি নয়, এ উপসালা, তারপরও। দীর্ঘদিন ভারতে আমাকে কুঁকড়ে থাকতে হয়েছে ভয়ে, এই বুঝি কেউ মেরে ফেলতে আসছে। মৌলবাদী আজকাল পৃথিবীর সব জায়গায়। দিন দিন এমন হচ্ছে, কোনো দেশ বা শহর নেই যেখানে ওদের চিহ্ন নেই। সুইডিশ এক শিল্পী কুকুরের ছবিতে মোহাম্মদের মুখ বসিয়ে দেওয়ার পর তার ওপরও হামলা হয়েছে। তাকেই এখন লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে। আমি আর মাইব্রিট দুজন বেরোলাম রাতে বাইরে খেতে। খেতে তো যেতেই হবে। আমার হাঁটার মধ্যে আমি লক্ষ করি আড়ষ্টতা। এদিক ওদিক তাকাই, কেউ আবার চিনে ফিলছে না তো আমাকে! যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। অনেকটা সেরকম। সুইডিশ লোকেরা আমাকে সম্ভাষণ জানাচ্ছে। কেউ দৌড়ে এসে ফুলও দিল। কী কারণ হঠাৎ আমাকে এভাবে চেনার! গা ছমছম করে।

সিসিলিয়াই উপসালা হাসপাতালের ডাক্তারকে বলে দেয় আমার শরীরের সব পরীক্ষা করতে। চোখ, হৃদপিণ্ড, রক্তচাপ সব। সব দেখে ডাক্তার বললেন, কোথাও কোনও অসুবিধে নেই। সব ঠিক আছে। রক্তচাপের ওষুধ বরং কমিয়ে দিলেন।

সুয়েনসনের বাড়িতে আমার কাপড়চোপড় কমপিউটার জিনিসপত্র। কলকাতায় সংসার করছিলাম বটে, কিন্তু সুইডেন থেকে এত বছরের ব্যবহার করা সবকিছু সরানো হয়নি। সুইডেন থেকে সরেছিলাম, জিনিসপত্র অনেক রয়ে গেছে। সুটকেসে তেইশ কিলো করে কত আর কী নেওয়া যায়। সুয়েনসনের বাড়ি ভর্তি এখনও আমারই জিনিসপত্র। এভাবে উপসালা শহরের হোটেলে থাকার কোনো মানে হয় না। দ্বিতীয় রাতে সুয়েনসন দিয়ে যায় বটে ইন্টারনেট ব্যবহারের ডিভাইস, কিন্তু তৃতীয় রাতেই সুয়েনসনের সঙ্গে রওনা হই তার উপলাস ভিয়েসবির বাড়িতে। আমার স্টাডি ঠিক সেভাবেই আছে, যেভাবে শেষবার রেখে গিয়েছিলাম। পপকর্ন মাটিতে যেভাবে যে জায়গায় পড়েছিলো, এখনও সেখানেই আছে। চায়ের কাপ যে কটা ছিল টেবিলে, যেভাবে ছিল, সেভাবেই আছে, শুধু কাপের অবশিষ্ট চা শুকিয়ে চিহ্ন রেখে গেছে। পুরো বাড়ি পরিষ্কার করলেও সুয়েনসন কোনোদিন আমার ও ঘরটা পরিষ্কার করবে না। যদি হাজার বছর আমি না আসি, হাজার বছর এ ঘর এভাবেই থাকবে। অথচ আমি যখন ঘর দোর সাফ করি, তার স্টাডি বাদ দিয়ে সাফ করিনি কোনোদিন। পুরুষের চরিত্রে ভয়ংকর এক হিংসে কিলবিল করে। বাড়িটিতে বহু বছর থাকার কারণে বাড়িটি খুব চেনা, নিজের বাড়ি বলেই মনে হয়। নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় স্টাডিতে কাটাতে থাকি দিন রাত, আগে যেমন কাটাতাম।

ওদিকে উপসালার স্কলারশিপ দেওয়ার খবর ঘোষণা হয়ে গেছে। সুইডেন ছাড়িয়ে এ খবর ছড়িয়ে গেছে অন্য দেশে। সুয়েনসনের ব্যবহার দিন দুই হয়তো ভালো থাকে, এরপর যে কে সেই। আমাকে সঙ্গ দিতে থাকে মাইব্রিট। একদিন ও আমাকে টেনে নিয়ে যায় উপসালায়, স্কলারশিপের বাড়িখানা দেখতে। একজনের বাস করার জন্য খুব মন্দ নয়, তবে সে বাস অবশ্যই দীর্ঘ দিনের জন্য নয়। ক্ষণিকের অতিথি হতে চাই না আর। অনেক হয়েছি, এ দেশ ও দেশ অনেক তো হল। আমি ক্লান্ত। কোথাও বাকি জীবনের জন্য কাটাতে পারি, যেন সব ছেড়ে ছুঁড়ে আবার কোথাও ছুটতে না হয়। বাড়িটি উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই। জায়গা সুন্দর। দু’পা এগোলেই অরণ্য-মত কিছু। কিন্তু ভেতরে হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা! সিসিলিয়া বলছে, উপসালা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ফেলোশিপ দেবে, স্কলারশিপটি গ্রহণ করার জন্য নানা কায়দায় আমাকে উৎসাহ দেওয়া হয়। তারপরও আমার ‘হেথা নয়, হেথা নয়’ কাটে না। সুইডেনেই যদি থাকতে হয়, তবে এই বাড়িই বা কেন, সুয়েনসনের বাড়িতেই থাকতে পারি, অথবা সুয়েনসনের বাড়িতে যদি ভালো না লাগে, নিজের জন্য কোনো বাড়ি ভাড়া নিতে পারি, যে বাড়ি ছ’মাস বা এক বছর পর ছেড়ে দিতে হবে না। সিসিলিয়া জোঁকের মতো লেগে থাকে আমার গায়ে। তাঁর বাড়িতে নেমন্তন্ন করলো শুধু আমাকে নয়, আমার বন্ধু বান্ধবকেও। প্রথম মনে হয়েছিল, চমৎকার মেয়ে। কর্মঠ, বুদ্ধিমতী, আন্তরিক। তাই হতো, যদি না আমাকে প্রেস কনফারেন্সের জন্য অমন চেপে না ধরতো। নিজে, পেন ক্লাবের সদস্যদের দিয়ে, এমনকী তার সেক্রেটারিকে দিয়েও আমাকে প্রেস কনফারেন্সে রাজি করাতে মরিয়া হয়ে উঠলো। আমি প্রথম থেকেই বলেছি, আমি কোনো প্রেসের সঙ্গে কথা বলবো না। আমি দুনিয়াকে জানাতে চাই না আমি কোথায় আছি। কারণ স্কলারশিপটা আমাকে দেওয়া হয়েছে, এ খবর রাষ্ট্র করা মানে সবাইকে ঢাড়া পিটিয়ে একরকম জানিয়ে দেওয়া হল এই আমার ঠিকানা। সরকারি এই স্কলারশিপের বাড়িটা কোথায়, কারও দুমিনিট লাগবে না বের করতে। আমি এত ঝুঁকি নিতে পারবো না জীবনের। কিন্তু কে শোনে আমার কথা, সিসিলিয়া বারবারই বলতে লাগলো, না জানালে উপসালার স্কলারশিপ যে আমাকে দিয়ে উদ্বোধন হল, তা লোকে জানবে না। দেশের জন্য, এমনকী উপসালার জন্য এ বড় খবর যে, উপসালা শহর এখন থেকে পৃথিবীর নির্যাতিত লেখক শিল্পীদের পাশে দাঁড়াবে, বাক স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করবে। একদিন দুপুরে তাঁর বাড়িতেই আমাকে কিছুতেই যখন প্রেস কনফারেন্সে রাজি করাতে পারলো না, হাল ছেড়ে দিয়ে চলে গেল মিটিং আছে বলে। সেই মিটিংটা যে তার সেই প্রেস কনফারেন্সে যাওয়া ছিল, তা বুঝলাম পরদিন, যেদিন সারা পৃথিবীর কাগজে দেখলাম ছাপা হয়েছে, সিসিলিয়া ভিকস্ট্রম-এর উদ্যোগে উপসালা শহরে আমাকে স্কলারশিপ দেওয়া হচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। নামের কী আশ্চর্য মোহ! ক্ষমতার জন্য সে কী ভীষণ পিপাসা! যত ভালো কাজে নাম বাড়বে, তত তার সিঁড়ি মসৃণ হবে ওপরে ওঠার। মনে মনে বলি, গুডবাই উপসালা, গুডবাই সিসিলিয়া।

চলে যাই ফ্রান্সের দক্ষিণে, মদনজিৎ সিং ডাকছেন আমায়। মদনজিৎ সিংএর বাড়িটি সত্যি বলতে কী সত্যিকার সাগরসৈকতে। সামনে নীল ভূমধ্যসাগর, পেছনে পাহাড়। এক টিলায় তার প্রাসাদ। ঘর থেকেই দেখা যায় আদিগন্ত নীলজল আর শোনা যায় পাড়ের ঢেউ ভাঙার শব্দ। সমুদ্রে সাদা সাদা নৌকো ভাসছে, পাখিরা উড়ছে, খোলা নীল আকাশ। যত না মুগ্ধ হই প্রকৃতির সৌন্দর্যে, তার চেয়ে বেশি মুগ্ধ হই মদনজিৎ সিংকে দেখে। সাতাশি বছর বয়স, আদ্যোপান্ত নাস্তিক। আশি বছর বয়সে দু’শ মিলিয়ন ডলার পেয়েছিলেন, অকাতরে ঢেলে দিয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার সেবায়। দক্ষিণ এশিয়ার ছেলে মেয়েদের বৃত্তি দেওয়া হবে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনে পয়সায় পড়ার জন্য। যেন দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ধর্ম বর্ণ ভাষা সংস্কৃতির ছাত্র ছাত্রীরা একসঙ্গে পড়তে গিয়ে নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারে। মদনজিৎ সিং স্বপ্নবান মানুষ। ঠিক যে স্বপ্ন আমি দেখি, একই স্বপ্ন তিনি দেখেন। এত আন্তরিক মানবিক মানুষ তিনি, এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে যদি বেশি হতে আরো, পৃথিবী সুন্দর হতো আরও। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী সহ যাকে যাকে চেনেন, সবাইকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন আমাকে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করে ভালোয় ভালোয় কলকাতা পাঠাতে। মৌলবাদীর কাছে হেরে যাওয়া ভারতের মতো দেশকে মানায় না। উপদেশ দিয়ে তিনি অনেককে চিঠি লেখেন। জানি না ক’জন মানেন তার উপদেশ। একসময় ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। প্রচুর বই লিখেছেন, ছবি এঁকেছেন। এখনো লিখে চলেছেন বই। এই বয়সেও। তার সব কথা আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি। অর্থহীন নয় তাঁর একটি বাক্যও।

পর পর অনেক কিছু ঘটতে থাকে। প্যারিসে আমাকে দেওয়া হচ্ছে সিমোন দ্য বুভোয়ার পুরস্কার। পুরস্কার নেবোপররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানবাধিকার মন্ত্রীর হাত থেকে। তখন একের পর এক ফরাসি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিতে হচ্ছে। এখানে এমনই হয়, একটা বই বের হলো, তো বই-প্রকাশক টিভিরেডিওদৈনিকসাপ্তাহিকে লেখকের সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সবার বেলায় এমন ঘটে না। যার কিছুনাম ডাক আছে, প্রচার মাধ্যম তার প্রতিই আগ্রহ দেখায়। প্রকাশক তড়িঘড়ি করে একটা বই করেছে, বইটির ফরাসি নামের বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘আমার কারাগার থেকে। তড়িঘড়িই বলবো। সেই আমি দিল্লিতে গৃহবন্দি অবস্থায় থাকাকালীন প্রকাশক তাড়া দিলেন, ‘কিছু লেখো, অথবা ওখানে বসে যা লিখেছো, তাই দাও। আমি বলেছি, লেখার মধ্যে কিছু কবিতা, আর টুকরো টুকরো কিছু ভাবনার কথা। বললেন, ”যা লিখেছে পাঠিয়ে দাও, আমি বই করবো’। আমি অনেকবার বলেছি, ‘বই হওয়ার মতো কিছু লিখিনি। আত্মজীবনী আমি তো লিখছিই। লেখা শেষ হলে নিশ্চয়ই তোমাকে পাঠাবো’। আবারও বললেন, ”যা লিখেছে তাই নিয়েই ছোটমতো একটা বই করবো, ঠিক বই নয়, সংকলন মতো। আমি খুব ভালো করে জানি, কিছু কবিতা আর দুটো মনের কথা দিয়ে আস্ত একটা বই বের করলে পাঠক ঠকানো হবে, আর কিছু নয়। এমনিতে ধুমধাম করে ফতোয়া ফতোয়া আওয়াজ দিয়ে লজ্জা বের করার পর পাঠক নিশ্চয়ই আকাশ থেকে পড়েছে, এই বইয়ের জন্য ফতোয়া জারি হওয়ার কারণ কেউ কিছু খুঁজে পায়নি। যে বই, বা আমার যেসব লেখার কারণে সত্যিকার ফতোয়া জারি হয়েছিল, সেসব হয় ছাপানোই হয়নি, নয়তো ছাপানো হলেও ফতোয়া ফতোয়া বলে কোনও লম্ফঝম্ফও হয়নি। নতুন বইটিই সবার হাতে হাতে, সাক্ষাৎকার দিতে হচ্ছে সবখানে। সকাল থেকে রাত অবদি ব্যস্ত। লমন্দ এ পুরো পাতা সাক্ষাৎকার। কানাডা থেকে চলে এসেছেন মাইক বাক স্বাধীনতার ওপর তথ্যচিত্র বানাচ্ছেন, এমপায়ার অব দ্য ওয়ার্ড, ধারাবর্ণনা করছেন হিস্টরি অব রিডিংএর লেখক আলবার্তো ম্যাংগুয়েল। ওখানে আমার কথা ও কাহিনী থাকছে। সাত সকালে রেডিওতে ছোটো, দশটা থেকে সাংবাদিক আসতে শুরু হয়। রাত্তিরে টিভি থেকে ফেরা। ঘটা করে পুরস্কার অনুষ্ঠান হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সিমোন দ্য বোভোয়া পুরস্কার আমাকে দিয়েই শুরু হল ফ্রান্সে। কেবল আমি নই, আমার সঙ্গে আছে আয়ান হিরসি আলি। দু’জনে এই পুরস্কারটা পেয়েছি। তবে ও আগেই নিয়ে গেছে ওর ভাগ, আমার ভাগটা নিতে হল পরে।

এরপর আবার আমন্ত্রণ প্যারিসে। এবার প্যারিস সিটি কাউন্সিল আমাকে সম্মানীয় নাগরিক করবে। সিটি হলে বা টাউন হলে বা হোটেল দ্য ভিলে নেওয়া হল আমাকে। মেয়র উপহার দিলেন দামি, কথা বললেন চমৎকার, তোমাকে শুধু নামকাওয়াস্তে নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছে না, সত্যি সত্যিই নাগরিক হিসেবে তুমি প্যারিসে থাকো, তাই আমরা চাইছি। মেয়র যখন আমাকে প্যারিসের নাগরিক কেন করা উচিত এক এক করে সিটি কাউন্সিলের অ্যাসেম্বলিতে বলছিলেন, বলা শেষ হলে, ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের একশ আশি জন সদস্যই দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে মেয়রের প্রস্তাব সমর্থন করলেন। দেখা করতে বেলজিয়াম থেকে আইরিন চলে এলো। স্টিভ মারা যাওয়ার পর আইরিন অনেকটাই বদলে গেছে। ছোঁক ছোঁকটা বেড়েছে। মাথা ঠিক রাখার মুঠো মুঠো ওষুধ আগেও যেমন খেতো, এখনও খাচ্ছে। তবে এখন যেন পরিমাণটা আরও বেশি। বেলজিয়ামের গেন্ট শহরে থাকছে,যার বাড়িতে থাকছে, তার দুর্নাম করেই যাচ্ছে তো করেই যাচ্ছে। ও জায়গা তার পোযাচ্ছে না, টাকা পয়সার অভাব, বয়স বিচ্ছিরি রকম বেড়ে গেছে, স্টিভের রেকর্ডগুলো এখনও বিক্রি করতে পারছে না, ইত্যাদি। কী জানি কেন, আইরিনের নিরন্তর অভিযোগ একসময় বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। স্টিভের অসুস্থতার সময় স্টিভের বন্ধুদের সঙ্গে এমনকী আমার সঙ্গেও কী অসভ্যের মতো ব্যবহার করতো, সেসব মনে পড়ে। যে মানুষটা মারা যাচ্ছে, তাকে চোখের দেখাও দেখতে দেয়নি শেষদিকে। স্টিভকে নিজের সম্পত্তি ঠাউরেছিলো। স্টিভের অসুখ হওয়াটা আইরিনের এত অসহ্য লাগতো যে অসুস্থ স্টিভের সঙ্গেও ভালো ব্যবহার করতো না। সেই ভয়াবহ প্রতাপশালী আইরিন এখন শিশুর মতো হয়ে গেছে। মেয়র ডিনার পার্টি দিচ্ছেন আমার সম্মানে, গোঁ ধরেছে সেখানে যাবে। আমি আপত্তি করিনি। আইরিনের জন্য আবার মায়াও হয়। আমার নাগরিকত্ব পাওয়া ও আমার পাশে থেকে দেখতে পেলো বলে খুশিতে লাফায়। আইরিনকে আমি অনেকবার ক্ষমা করেছি, জানে ও। অনেকবার নিজের ভুল সে স্বীকার করেছে। আইরিনের দুঃসময়ে পাশে আমি দাঁড়িয়েছি অনেক। অনেককাল ওকে জানি। মায়া হয় যখন ওষুধ খেয়ে ওকে সামাজিক হতে হয়, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়, আত্মহত্যা করার আগ্রহ দূর করতে হয়। আবারও প্যারিসে আমন্ত্রণ, যারা ফরাসি সরকারের মানবাধিকার পুরস্কার পেয়েছে, তাদের সবাইকে নিয়ে উৎসব হচ্ছে। সেই উৎসবে সামিল হলাম। এক ডিনারে ক্যাথারিন দনোভকে দেখে সে যে কী ভালো লাগে! একসময়ের ডাকসাইটে ফরাসি অভিনেত্রী। সত্যি বলতে কী, সিনেমাজগতে ক্যাথারিনকেই আমার সবচেয়ে রূপসী বলে মনে হয়। সেই সত্তর/আশির দশকের চলচ্চিত্রগুলো এখনও মুগ্ধ হয়ে দেখি! এদিকে আবার আরেক আমন্ত্রণ, আমাকে বোর্ড মেম্বার হতে হবে ‘ফাউণ্ডেশন ফর উইমেন’-এর। বিরাট এক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান পিপিআর শুরু করছে সারা পৃথিবীর মেয়েদের সাহায্য করার জন্য এই ফাউণ্ডেশন। ফাউণ্ডেশনে থাকবে স্টেলা ম্যাককার্টনি, ওয়ারিশ দুরি, এবং আরও কয়েকজন। বড় বড় সব লোক। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার নির্যাতিত নিপীড়িত মেয়েদের অবস্থার উন্নতি করার জন্য কাজ করবো সবাই। প্রচণ্ড উৎসাহ পাই এ কাজে।

এরকমই একটা সময় আমার মন উদাস। ভারতের রেসিডেন্স পারমিট ফুরোবার আগে গিয়েছিলাম দিল্লিতে। ঢুকতে দিয়েছে, এক বন্ধুর খালি বাড়িতে থাকতেও দিয়েছে কয়েকদিন। শত শত পুলিশ ঘিরে রেখেছে বাড়িকে, আমাকে। কিন্তু যাওয়ার পর পরই রেসিডেন্স পারমিট ছ’মাসের জন্য বাড়িয়ে আমাকে বিদেয় করে দেওয়া হয়েছে। আমি থাকবো না ভারতে, এ কথাটি ওদের মাথায় হাত দিয়ে বললে, নিজের বুকে হাত দিয়ে প্রতিজ্ঞা করলে তবেই আমাকে ‘ভারতে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। মুচলেকা দিতে বলা হয়েছে, দিতে বাধ্য হয়েছি। ছমাস পরেও গিয়ে দেখি সিদ্ধান্ত পাল্টায়নি। ওই একই, রেসিডেন্স পারমিট দেবো, তবে এক শর্তে, পারমিট পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে চলে যাও। ভারত যদি থাকতেই না দেয়, যেতেই না দেয় কলকাতায়, আমাকে তো কোথাও না কোথাও থাকতে হবে, এরকম কিছুদিন সুইডেনে সুয়েনসনের বাড়িতে, কিছুদিন নিউইয়র্কে ইয়াসমিনের বাড়িতে, কিছুদিন প্যারিসের হোটেলে হোক না সে ফাঁইভ স্টার হোটেল, কিছুদিন মদনজিৎ সিংএর প্রাসাদে –এভাবে জীবন ঠিক যাপন করা যায় না। সুয়েনসনের বাড়িতে কিছুদিন থাকা যায়, দীর্ঘদিন থাকা যায় না। প্যারিসের আমি সম্মানীয় নাগরিক, মেয়রও বলেছেন প্যারিসে যেন থাকি। তবে প্যারিসেই থাকি না কেন। অনেকে বলেছে, ফরাসি সরকারের কত কত বাড়ি পড়ে আছে, দিতেই পারে একটি। তা কি সত্যি আমাকে দিতে পারে, ফরাসি কত লোক রাস্তায় জীবন যাপন করে, আর আমি কে যে আমাকে একটা বাড়ি দিতে হবে। শুধু লমন্দ নয়, অন্যান্য পত্রিকাও ভারত থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর আমার গৃহহীন অবস্থার কথাই লিখেছে। প্যারিসের মেয়র বাট্রণ্ড দোলানয়ে দিলেন ছ’মাসের জন্য স্কলারশিপ, শিল্পীদের থাকার জায়গায় আমার জন্য ঘর হবে, মাসে মাসে হাত-খরচের টাকা হবে। লেখক শিল্পী সাহিত্যিকের সঙ্গে প্যারিসের মধ্যিখানে সেইন নদীর ধারে এক বাড়িতে থাকা আমাকে পুলকিত না করলেও আমার ফরাসি বন্ধুদের করে। হৈহুল্লোড় করে কিছু বন্ধু লেখক ধুমধাম করে খেয়েও গেল, তুমুল আড্ডা দিয়ে গেল আমার জন্য বরাদ্দ ঘরটিতে। অনেকটা উদ্বোধনের মতো। তবে ঘরে, সত্যিকার অর্থে আমার থাকা হয়নি, চলে গেছি নিউইয়র্কে, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে আমাকে ফেলোশিপ দেওয়া হয়েছে।

নিউইয়র্কে থাকতে শুরু করি, তবে ছুটতে হয় আরও অনেক দেশে। সুইডেনে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন, স্পেনের বিলবাওয়ে সেন্সরসিপের বিরুদ্ধে সেমিনার, সানফ্রান্সসিস্কোতে কবিতা উৎসব, বীট-কবিরা যেখানে কবিতা পড়তেন, সেখানে কবিতা পড়া, সেই নর্থ বিচ,সেই সিটি লাইটস, সেই বিসুভিয়াস! ইতালিতে কবিতা উৎসব, লুক্সেমবার্গেও তাই, আমস্টারডামে মুক্তচিন্তা বিষয়ে অনুষ্ঠান, ভিয়েনায় জগতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করার · মূল্যবান আলোচনা অনুষ্ঠান। ইওরোপিয়ান পার্লামেন্ট থেকে শাখারভ পুরস্কারের পঁচিশ বছর পূর্তি। বেলজিয়ামের লোভেইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডক্টরেট কিছু না কিছু আছেই। কিছু না কিছু থাকেই। ঘরে বসে নিশ্চিন্তে লেখালেখি করার জো নেই। অথবা এ একধরনের ঘরে বসে থাকার একঘয়েমি থেকে মুক্তি।

তবে নিউইয়র্কে যে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বিষয় করে সাহিত্য উৎসব হচ্ছে, তাতে কেউ আমাকে আমন্ত্রণ জানায় না। ভিন্ন মত প্রকাশ করার অপরাধে যে লেখককে এত কাল ধরে এত ভয়ংকর জীবন যাপন করতে হচ্ছে–যাকে এই কদিন আগে ছেড়ে আসতে হচ্ছে ভারতের মতো বিরাট একটা গণতান্ত্রিক দেশ তাকে ডাকা হয়নি, ডাকা হয়েছে অগুনতি অজ্ঞাত অখ্যাত লেখকদের। আমেরিকান পেন ক্লাব সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করেছে। আমেরিকার এই লেখক সংগঠন কি আমাকে চেনে না? খুব চেনে। এ খবর কি জানে না যে এখন আমি নিউ ইয়র্কে। না জানার কোনো কারণ নেই। তবে কেন অন্য লেখকরা আজ তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলছে, কিন্তু তাদের চেয়েও অনেক বেশি অত্যাচারিত হওয়ার পরও আমি বলার অধিকার পাচ্ছি না। ভারতে আমার লেখার। কারণে মুসলিম মৌলবাদীর হামলা, আমাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দেওয়া, দিল্লিতে অজ্ঞাতবাসে আমাকে রাখা, অবশেষে আমার ভারত ছাড়তে বাধ্য হওয়া এসব অন্য কেউ যদিও না জানে, পেন এর সভাপতি তো জানেন নিশ্চয়ই। সভাপতি সালমান রুশদি। তবে কি সালমান রুশদি সভাপতি বলেই এ শহরে আমি উপস্থিত থেকেও আন্তর্জাতিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে সেমিনারে আমি আমন্ত্রিত হতে পারি না! কী অপরাধ আমার। সেই যে কতকাল আগে জার্মানির ডাস্পিগাল পত্রিকায় ‘মৌলবাদীদের কাছে সালমান রুশদির ক্ষমা ভিক্ষে চাওয়া উচিত হয়নি’ বলেছিলাম বলে? সত্য কথা শুনে তখন রেগে আগুন হয়েছিলেন জানি, রাগ যে এত কাল পুষে রেখেছেন তা কে জানবে!

ইয়াসমিনের বাড়িতে থাকছিলাম। ভালোবাসা কিছুতেই রাজি নয় আমি ও বাড়িতে থাকি। ও আস্ত একটা বাস্তবজ্ঞানবর্জিত অদ্ভুত মানুষে পরিণত হয়েছে। হাত পা ছুরি দিয়ে কাটছে। কেন? তার বয়ফ্রেন্ড নেই, নিশ্চয়ই সে কুৎসিত, তা না হলে সবার বয়ফ্রেণ্ড থাকে, তার নেই কেন! ইয়াসমিনকে অনেক বলেছি ওকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিতে। ইয়াসমিন রাগে ফেটে পড়ে সাইকিয়াট্রিস্টের নাম শুনলে! তার মেয়ের কেন মাথা নষ্ট হতে যাবে। তার মেয়ে কি পাগল নাকি! অ্যানাল ফিশারে অনেকদিন ভুগে ওটাই ওর হয়ে উঠেছিল অবসেশন, এখন ভালোবাসা অবসেশন। ভালোবাসা ঘরের রানী, আর তার বাপ মা তার চাকর বাকর। এই ধরনের একটা রোলপ্লে চলে ইয়াসমিনের বাড়িতে। অসুস্থ পরিবেশ, জানি। আমি নিজের জন্য হন্যে হয়ে একটা অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজি। অ্যাপার্টমেন্ট পাওয়া কি আর চাট্টিখানি কথা। ক্রেডিট হিস্টরি লাগবে, যেটি নেই আমার। কত উপার্জন করি বছরে তার একটা প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। যদি লক্ষ ডলার বছরে না উপার্জন করি, কেউ আমাকে বাড়ি ভাড়া দেবে না। তারপরও খুঁজি। শেষ পর্যন্ত ভাড়া নিই বটে না থাকা-টুইন-টাওয়ারের কাছে, হাডসন নদীর প্রায় পাড়ে, একজন গ্যারেন্টর জাদুর মতো যোগাড় হয়েছিল বলে। আমি যদি বাড়ি ভাড়া নেওয়ার শর্তগুলো পূরণ করতে না পারি, তবে আমাকে তার আশ্রয় নিতে হবে, যার ক্ষমতা আছে ওই শর্ত পূরণ করার। গ্যারেন্টর পাওয়াটা অমাবস্যার চাঁদ পাওয়ার মতো। যে দীর্ঘ বছর ধরে আমাকে চেনে একজন সৎ মানুষ হিসেবে, সে পিছিয়ে গেল, এগিয়ে এলো এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে আমার জানা নেই শোনা নেই, কিছু নেই। পৃথিবী বড়ই বিচিত্র।

ছ’মাস অন্তর অন্তর ভারতে ঢোকার অনুমতি জোটে রেসিডেন্স পারমিটের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য, তবে ভারতে থাকার জন্য আবেদন করলে কিন্তু ওই একই নিয়ম চলে। ‘তুমি কথা দাও তুমি ভারতে থাকবে না, তাহলে তোমাকে ভারতে থাকার ভিসা দেবো’। বাইরের কেউ জানে না এসব কথা। কাউকে জানানো চলবে না। বছরের পর বছর কলকাতার তালাবন্ধ বাড়ির ভাড়া দিতে হচ্ছে। যখন হাড়ে মজ্জায় বুঝেছি, কলকাতায় আমাকে কিছুতেই যেতে দেওয়া হবে না, কলকাতার বাড়ির জিনিসপত্র সব পাঠিয়ে দিতে বললাম বন্ধুদের। সরকার থেকেই ও বাড়ি খালি করে জিনিসপত্র দিল্লি আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো, এনে নাকি দিল্লির সরকারি গুদামে রেখে দেবে। গুদামে বন্দি করতে আমি রাজি হইনি। বন্দিদশা আমার সয় না। আমি নিজেই আনিয়েছি। নিজে আনা মানে, টাকা দিয়েছি, কলকাতার বন্ধুরা ওখান থেকে বাহক ডেকে সব বাক্সবন্দি করে পাঠিয়ে দিয়েছে। সরকারকে আমার জিনিসপত্র টানাটানি করার বিশাল দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছি। তবে কিছু বাড়তি আসবাব দিল্লির সরকরি গুদামে রাখা হয়েছিল, দু’বছর পর ফেরতও নিয়েছি। এই রাখার জন্য কোনও খরচ নেয়নি সরকার। দাদাদিল্লি এলো একবার, কলকাতা থেকে মিনুকে আনিয়ে নিলাম। মিনু উড়োজাহাজে করে এলো কলকাতা থেকে দিল্লি। আবার যখন আমার ভারত ছাড়ার ঘণ্টা বাজলো, মিনুকে দাদার সঙ্গে পাঠিয়ে দিলাম শান্তিনগরে, আমার ঢাকার বাড়িতে। এ ছাড়া উপায় ছিল না। দিল্লিতে মিনুকে রাখার অনেক চেষ্টা করেছি। বেড়াল ভালোবাসে এমন লোকের সঙ্গেও কথা বলেছি, পশুপাখি রক্ষা সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি, কিন্তু লাভ হয়নি। ছ’মাস নাকি খাঁচায় বন্দি করে রাখবে বেড়াল! আবারও উড়লো মিনু। এবার ভারত থেকে ভারতের বাইরে। তবে যেহেতু ও মানুষ নয়, ওকে খাঁচায় বন্দি হয়ে উড়তে হয়। মানুষ বাস করে অদৃশ্য খাঁচায়। মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেছে খাঁচায়। মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী আজও কোথাও কোনও খাঁচায় বন্দি হতে চায় না। আবারও আমাকে সব ফেলে চলে যেতে হল। আবারও বিদায় বলতে হল ভারতকে। আবারও অনিশ্চয়তার পথে আমার পা।

মদনজিৎ সিংএর চিঠির জবাব ভারতের প্রধানমন্ত্রী একবার দিয়েছিলেন, বড় ভালো সেই চিঠি, ভারতীয় উপমহাদেশের অন্য কোনো দেশের অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রীও যদি লিখতে পারতেন এমন চিঠি!

Dear Shri Madanjeet Singh,

I read your letter with great interest. Let me share you that many of us here share the sense of anguish you feel at Taslima Nasreen’s plight. It is most unfortunate that someone like her should be the target of extremist elements. Actions of this kind, though by a small minority tend to undermine our secular credentials and damage our image as an inclusive society.

You may rest assured, however that we shall never deviate our age-old tra ditions and principles. Right through the ages we have offered sanctuary and a

home to anyone who has sought our help. We have always shown compassion to those who have been persecuted. His Holiness the Dalai Lama is one shin ing example. We are unhappy at the turn of events in the case of Ms Taslima Nasreen, but in her case also we have honourned our ancient pledge. I can’t say how pleased I am that you have offered her a place to stay in Paris, till such time as she finds it convenient to return to India,

Taslima has been a victim of the politics of hate that a small section of ex tremists within our country are now pursuing. Her preference was to stay in Kolkata, but the West Bengal Government apprehended that this might lead to a law and order situation in the State. I cannot say whether this apprehension is valid, but we nevertheless welcomed her here in Delhi. Taslima misses being in Kolkata, however.

It is not correct to say that while in Delhi she was kept in solitary confine ment in a small room. Certain restrictions on her movements had to be im posed based on perceptions of the threat to her personal security. Otherwise she had relative freedom of movement. The restrictions that were imposed, no doubt, weighed heavily on her mind, and I can understand her predicament. External Affair Minister, Mr. Pranab Mukherjee, and senior officials did meet her from time to time to assuage many of her concerns.

She left for Sweden on her own volition, and not because we asked her. She will always be welcome in India as our guest. Her personal security, however, remains a matter of concern and we will need to take precautions to ensure her protection as long as she is our guest. We can try and see whether she could go back to Kolkata where she feels comfortable, but for this we would need the cooperation of the West Bengal Government.

India’s glorious traditions of welcoming people irrespective of caste and creed, community and religion will continue, whatever be the odds. The atmo sphere of hate being perpetrated by a small segment within the country will not prevent us from persisting with this tradition. We recognize Taslima Nasreen’s right to remain in a country of her choice, viz., India in this case. She should also have the option to choose whichever city of state she chooses.

Thope you would try to make her understand this You should also try to per suade her to realize that whatever was done while she was in India was dictated by the necessity to ensure her safety and security.

With regards,
Yours sincerely
Manmohan Singh.

এই চিঠি মদনজিৎ সিংকে গর্বিত করে, আমাকে তো করেই। আমি আশায় আশায় থাকি, অন্তত বাংলাদেশে যদি না-ই সম্ভব হয়, ভারতে বাস করতে পারবো আমি। কিন্তু ওই চিঠির পরও আমি দিল্লিতে থাকতে পারিনি দু’বছর।

২০১০ এর ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপের ফরাসি জার্মান আর্তে টেলিভিশন ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানানো শুরু করেছে আমাকে নিয়ে। রেসিডেন্স পারমিটের মেয়াদ বাড়াতে আবারও দিল্লি যেতে হয় আমাকে। আর্তে টেলিভিশনের লোকেরা আগেই এসে বসে ছিল। এক ঘণ্টার একটা ছবি বানাতে ওরা মিলিয়ন ইউরো খরচ করছে। কত জায়গায় যে আমার পিছু নিল। লিওঁ, দিল্লি, নিউইয়র্ক। নিজেরা গেল কলকাতায়, ঢাকায়, ময়মনসিংহে, শুধু আমার ফেলে আসা স্মৃতির খুঁদ কুড়ো খুঁজে পেতে। ওরা অপেক্ষা করছিলো আমার রেসিডেন্স পারমিটের মেয়াদ এবার বাড়ানো হয় কি না দেখতে, সম্ভবত এ কারণেই করছিলো যে মেয়াদ বাড়বে না, আমাকে পাততাড়ি গুটোতে হবে, আর ওরা ক্যামেরায় চমৎকার ধরে রাখতে পারবে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো। আর আমাকে আর থাকতে দেওয়া হবে না ভারতে, প্রতিবারই এই সংশয়ই কাজ করে। এবার রেসিডেন্স পারমিটের মেয়াদ আমার বাড়ানো হয় বটে, তবে একটি চিঠি সঙ্গে দেওয়া হয়। চিঠিতে লেখা, এবারই শেষ আমাকে থাকার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, কারণ পাঁচ বছর পূর্ণ হয়ে গেছে। এরপর থেকে আমাকে আর ভারতের ভেতর থেকে ভিসা দেওয়া হবে না। যদি নিতান্তই ভারত ভ্রমণ করতে চাই, তবে বিদেশের ভারতীয় দূতাবাসে আমাকে দরখাস্ত দিতে হবে। এর চেয়ে ভয়ংকর কোনও চিঠি আমি আর হাতে পাইনি জীবনে। দু’বছরে এই প্রথম রেসিডেন্স পারমিট দেবার বেলায় কোনো শর্ত দেওয়া হয়নি আমাকে, ভারত ছাড়তে বলা হয়নি। জানি না কী করবো আমি। কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো। কাকে বোঝাবো আমি! ভারতীয় যাকেই বলি, হ্যাঁ করে তাকিয়ে থাকে আমার মুখের দিকে। আমি বুঝি রেসিডেন্স পারমিট, এক্সটেনসন, ইমিগ্রেশন ল’ –এসব সম্পর্কে কেউ খুব একটা জানে না।

মার্চে কর্ণাটকে ভীষণ দাঙ্গা শুরু হল আমার একটা লেখা নিয়ে। কর্ণাটকের এক পত্রিকা আমার বোরখা নিয়ে একটা লেখা নিজেরাই ছাপিয়ে দিয়েছিল। আমার অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। লেখাটা ২০০৬ সালের। আউটলুক নামের একটি ইংরেজি ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল লেখাটা। কেউ কেউ বললো, এ দাঙ্গাটির পেছনেও রাজনীতি কাজ করেছে। বিজেপি কর্ণাটকে ক্ষমতায়, তাই কংগ্রেসের এক নেতা দাঙ্গা বাধিয়ে কর্ণাটক সরকারকে বিপদে ফেলতে চেয়েছে। আমি তো একা মানুষ। আমার বিরুদ্ধে পথে নামলে, ফতোয়া দিলে, আমাকে মেরে ফেলতে চাইলে কে বাধা দেবে, কে দাঁড়াবে! এমন যার কেউ নেই কিছু নেইকেই মনে পড়ে দাঙ্গা বাধাবার বেলায়, ফতোয়া দেওয়ার বেলায়। আমার লেখাটায় ছিল, কোরানেও যদি লেখা থাকে বোরখা পরার কথা, তারপরও মেয়েদের বোরখা পরা উচিত নয়। বোরখার পক্ষের লোকেরা নেমে গেছে রাস্তায়। টেলিভিশনে দেখাতে থাকে কর্ণাটকের রাস্তাঘাট, পনেরো হাজার বোরখার পক্ষের মানুষ রাস্তায়, এক শহর থেকে আরেক শহরে ছড়িয়ে যাচ্ছে উন্মত্ত লোকে। বাস ট্রাক দোকান পাট যা সামনে পাচ্ছে তাই পোড়ানো হচ্ছে। আমার রক্তচাপ বেড়ে জানিনা কোন আকাশে উঠেছিল। হাত পা ঠাণ্ডা হতে শুরু করে। এ রকম ভয়াবহ দাঙ্গা আমার লেখাকে কেন্দ্র করে, যে কোনো সময় কোনো উন্মাদ ধর্মান্ধ আমাকে খুন করতে আসবে, আর যদি খুন না-ই হই, ভারতের। পাট বুঝি উঠলোই এবার। ঘরের বাতি নিবিয়ে দিয়ে, টেলিভিশন বন্ধ করে আমি শুয়ে পড়ি। এক্ষুণি না ঘুমোলে লম্ফ ঝম্ফ করা রক্তচাপ আমার হৃদপিণ্ড আচমকা অচল করে দেবে। প্রাণপণে শান্ত করতে চাই মন। আমি শুধু জানিয়ে দিয়েছি পিটিআইএর পল্লবকে, কর্ণাটকের পত্রিকায় আমি কোনও লেখা পাঠাইনি।

মন ভালো হয়ে যায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বিবৃতিতে। টেলিভিশনে বললেন, এই দাঙ্গার পেছনে তসলিমার কোনো ভূমিকা নেই। পত্রিকার লোকেরা লেখকের বিনাঅনুমতিতে লেখা প্রকাশ করেছে। এ পত্রিকার লোকদেরই দুষ্ট পরিকল্পনা। পত্রিকা অফিস ভাংচুর হল। যদিও মন ভালো হয়, আমাকে বাঁচিয়েছেন বলে, কিন্তু ভাবি, মত প্রকাশের স্বাধীনতার তবে হবে কী! কপি রাইট লংঘন করা ছাড়া আর কোনো অপরাধ নেই পত্রিকা সম্পাদকের। ভিন্ন মত প্রকাশের অধিকার থাকবে না কেন! দোষ তো ওই রাস্তার গুণ্ডাদের, যারা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে শহর, কারণ ভিন্ন কোনো মত তারা সইবে না।

আমাকে চলে যেতে হয় অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে। গ্লোবাল এথিস্ট কনভেনশনে। কর্ণাটকের দাঙ্গার কথা উল্লেখ করি ওখানে। ধর্ম মুক্ত বিজ্ঞান-বিশ্বাসী মানুষদের মধ্যেই আমি সবচেয়ে আরাম বোধ করি, যেন তারাই আমার সমাজ, আমার সত্যিকার স্বদেশ। আড়াই হাজার ধর্মমুক্ত মানুষ ইওরোপ আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছে। বাঘা বাঘা বক্তা সব। রিচার্ড ডকিন্স, পিজি মেয়ার্স, এসি গারলেইং। সবার মধ্যে আমিই একমাত্র পেয়েছি স্ট্যান্ডিং অভেশন। সবার দাঁড়িয়ে হাততালি। খুব বড় সম্মান। এত বড় সম্মানে আমার মন ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়া সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য ধরেছে, না কাউকে দিইনি সাক্ষাৎকার, ইমেইলের উত্তরও দিইনি। রাস্তায় উদাস হাঁটি, মানুষ দেখি। পেঙ্গুইনের মিছিল দেখতে দৌড়োই। ইস্কুলের বান্ধবী মমতা থাকে সিডনিতে, উড়ে এলো একদিন দেখা করতে। দেখা হয়নি। আমি তখনও পেঙ্গুইনে। আরও গ্লোবাল কনভেনশনে ডাক পড়ে। যাইনি। ডেনমার্কে যাওয়ার জন্য টিকিটও হয়ে গিয়েছিলো। ইচ্ছে করেনি। ঘরে বেড়াল আছে, ওকে আদর করি কোলে নিয়ে, কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। আকাশে আকাশে জীবনের অনেকটা বছর কাটিয়েছি। আকাশ-জীবন থেকে এবার একটু মুক্তি চাই। ঘর আমাকে ভীষণ টানে। কতকাল ঘর জোটে না।

আবারও নিউইয়র্ক, আমার সেই ২৩তলার মিলিয়ন ডলার ভিউ’ অ্যাপার্টমেন্টে। দেয়াল জুড়ে কাঁচের জানালা। যত পারো দেখ খোলা আকাশ আর নদী। নদীতে নানা রকম ঢেউ, আকাশে নানা রকম রং। সত্যিকার নিরাপদ বাড়ি, নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলোশিপ শেষ হওয়ার পরও অপার সম্ভাবনা –কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি, উড্রোউইলসন ফেলোহিসেবে বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো, ব্রডওয়ে মিউজিকাল, লিংকন সেন্টারের অনুষ্ঠান, নারীবাদীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, সব সম্ভাবনা, সব সমর্থন ছেড়ে, ইয়াসমিন,সুহৃদ যে দুজন আমার জীবনের একমাত্র আত্মীয় তাদেরও ছেড়ে, নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট কুইন, দীর্ঘকালের বন্ধু ওয়ারেন অ্যালেন স্মিথ, মেরেডিথ ট্যাক্স সবাইকে ছেড়ে, সুন্দর এই প্রকৃতি ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই ভারতে, যে ভারত আমাকে চিঠি দিয়েছে যে আর আমার ভিসা বাড়ানো হবে না। এ আমি মেনে নিচ্ছি না। বিদেশের কোনও ভারতীয় দূতাবাস ভারত সরকারের আদেশ ছাড়া আমাকে ভিসা দেবে না। সরকারই যদি সে আদেশ দেওয়ার হর্তাকর্তা, তবে আর ভারতের বাইরে থেকে ভিসা নিতে হবে কেন, ভেতর থেকেই তো নেওয়া সম্ভব। আর সয় না ভেতর বাহির। যে করেই হোক নিশ্চিন্তিবাস চাই জীবনে। অনেক তো হল। অকাতরে ছেড়ে আসতে পারি সব। জীবনে এক দেশ ছেড়ে আরেক দেশে গেছি অনেক। এক শহর ছেড়ে আরেক শহরে। এভাবেই এক ঠিকানার আশায় আশায় জীবন ফুরোয় আমার।

আগস্ট মাস অবদি আমার থাকার অনুমতি দিল্লিতে, ভিসা আমি বাইরে থেকে চাইবো না। একবার যদি আমার ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়, আমি আর নতুন কোনো ভিসা পাবো না। এ অনেকটা বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে যেমন বলা হয়েছিলো, তুমি যাও দেশের বাইরে, দু একদিন বা দু তিন মাস পর ফিরে এসো, তেমন সেই ফিরে আসা কোনওদিন আর হয়নি। সব বিদেয় ফিরে আসার জন্য নয়। অনেক বিদেয়-এর পর দরজা চিরতরে ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

শুনেছি বিদেশি কিছু লেখকও বিবৃতি দিয়েছেন আমার ভারত বাসের অধিকার নিয়ে। ভারত সরকারকে অনুরোধ করেছেন আমাকে যেন ভারতে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। একদিন সুইডিশ দূতাবাসে গেছি নতুন পাসপোর্ট করতে, কারণ অতি ভ্রমণে পাসপোর্ট সিলে সিলে একাকার, এক বিন্দু জায়গা নেই ভিসার সিলের। ওই দূতাবাসেই শুনলাম দিল্লির কয়েকটি বিদেশি দূতাবাস থেকে লোক যাচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারও সঙ্গে দেখা করতে, আমাকে যেন থাকতে দেওয়া হয় দিল্লিতে, এই আবেদন নিয়ে। মন ভালো হয়ে ওঠে। কোনও ভালো খবর পেলে লোকে বলে, ‘তাহলে বলতে হয় ঈশ্বর আছেন’, আমি তা বলি না, আমি বলি, তাহলে ভালো মানুষ পৃথিবীতে এখনো আছেন। এখনও মানুষ আছেন, যাঁরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, এখনও তবে পৃথিবীটা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়নি। তারা ঠিক কারা আমি জানি না, যারা আমাকে ভারত ছাড়া করার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, যারা আমাকে ছ’মাস নয়, পুরো এক বছরের ভিসা দিয়েছেন, এবং প্রতি বছর দিয়ে যাবেন। মন কৃতজ্ঞতায় ভরে যায় আড়ালের সেই মানববাদী, মত প্রকাশে বিশ্বাসী মানুষের প্রতি। আমি ভারতের নাগরিক নই, আমাকে যদি থাকতে না দেওয়া হত, কার কী বলার ছিল, আমাকে যদি ভিসা একেবারেই না দেওয়া হত, ভিসা পাওয়ার কোনো ক্ষমতাই তো আমার ছিল না। আমাকে যদি নিরাপত্তা না দেওয়া হত, কী-ই বা করার থাকতো আমার! মোদ্দা কথা, কিছুই না। আমি অতি নিরীহ প্রাণী, লেখার জোর ছাড়া আর সত্য কথা বলার জোর ছাড়া আর কিছুর জোর নেই আমার। এই পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবীতে নারীর অধিকারের জন্য লেখার মাধ্যমে লড়াই চালিয়ে যাওয়া বড় সেকেলে জিনিস। বেশির ভাগ নারী পুরুষ নারীবাদ বিষয়টিকেই ভালো চোখে দেখে না। তারা বিশ্বাস করে সমাজে নারী পুরুষের সমতা পুরোপুরিই প্রতিষ্ঠিত, শুধু গোটা কয় বর্বর অশিক্ষিত লোক কদাচিৎ নারীকে অসম্মান করে।

ভারতবাসের শর্তহীনঅনুমতি শেষ অবদি জোটেবটে ২০১০ সালের শেষে, তবেইতিমধ্যেই আমি উপমহাদেশের সাহিত্য জগতে নিষিদ্ধ একটি নাম। কোনও বাংলা পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয় না। বাংলাদেশের কথা বাদই দিলাম, ওরা বন্ধ করেছে সতেরো বছর আগে। পশ্চিমবঙ্গ অনুসরণ করেছে বাংলাদেশের পদাঙ্ক। দৈনিক স্টেটসম্যান বন্ধ করে দিয়েছে আমার লেখা ছাপানো, যদিও আমার লেখা ভীষণই জনপ্রিয় ছিল। আনন্দবাজার, দেশ, প্রতিদিন, রোববার ইত্যাদি ম্যাগাজিন এবং পত্রিকায় আমি নিষিদ্ধ নাম। রোববারের সম্পাদক ঋতুপর্ণ ঘোষ খুব ঘোষণা দিয়ে আমার লেখা ছাপাতে শুরু করেছিল। একটি লেখা ছাপা হওয়ার পর বন্ধ করে দিল ছাপানো। ওপর থেকে শুনেছি নির্দেশ আসে আমাকে বাতিল করার। এরপর দিল্লির ‘জনসত্তা’ নামের একটি হিন্দি দৈনিকে লিখতে শুরু করলাম, কর্ণাটকে আমার লেখা নিয়ে দাঙ্গা হওয়ার পর সেখানেও বন্ধ করে দেওয়া হল কিছুদিন পর। সবাই পিছিয়ে যায়। সবার কাছেই ওপর থেকে আদেশ আসে আমাকে বন্ধ করার। বই ছাপানোও বন্ধ করেছে প্রায় সব প্রকাশক। কারণ কি এই যে আমার বই বিক্রি হয় না, বা দৈনিকে সাপ্তাহিকে আমার লেখা কেউ পড়ে না? মোটেও তা নয়। লেখা ছাপালে কাগজ বেশি বিক্রি হয়, বই ছাপালে বই বেস্ট সেলার হয়। বোম্বের বিখ্যাত ‘ব্যাগ ফিল্মস’ আমার ‘ফরাসি প্রেমিক’ উপন্যাসের ফিল্ম রাইটস কিনেও ছবি বানায়নি। নামি পরিচালক মহেশ ভাট আমাকে নিয়ে ছবি বানাচ্ছেন, চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করেছেন ঘোষণা দিয়েও চুপ হয়ে যান। ইউটিভির মতো বড় প্রডাকশান কোম্পানিকেও আমার ওপর ছবি বানানো শুরু করেও অজ্ঞাত কারণে বন্ধ করে দিতে হয়। কলকাতায় আমার গল্প নিয়ে মেগাসিরিয়ালের একশ এপিসোড সুটিং করার পরও টেলিভিশনে প্রচার করা বন্ধ করে দিতে হয়। সম্প্রতি কলকাতার তিনজন পরিচালক আমার জীবন এবং আমার উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র। নির্মাণের সব পাকা কথা হয়ে যাওয়ার পর, চুক্তিপত্রে সই নিয়ে যাওয়ার পরও ছবি বানানো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলেন। একটা কালো হাত আমার সমস্ত কিছুর ওপর থাবা বসাচ্ছে। একটা অদৃশ্য হাত। একটা ভুতুড়ে হাত। আমার শিরদাঁড়ায় ঠাণ্ডা ভয় বইতে থাকে। কণ্ঠদেশ চেপে ধরে আমাকে মেরে ফেলবে না তো হঠাৎ একদিন!

শুধু লেখাই বন্ধ হয়নি, বেশিরভাগ বন্ধুও যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। ভারতবর্ষে আমি একা। একটি বিন্দুর মতো একা। কোনো লেখক বিনা দোষে এমন নিষিদ্ধ হয়েছে। পৃথিবীর কোথাও? হয়তা গ্যালিলিও হয়েছিলেন প্রায় চারশ’ বছর আগে। মাঝে মাঝে আমার অবাক লাগে ভাবতে আমি বাস করছি একুশ শতকের পৃথিবীতে।

দিল্লিতে থাকার স্বপ্ন তো কোনোদিন আমি দেখিনি। কলকাতায় বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতির মধ্যে যতদিন না যেতে পারি, বা বাংলাদেশে, আমার দেশে, যতদিন না যেতে পারি, আমি শান্তি পাবোনা। এ ঠিক আমার ব্যক্তিগত বাসের জন্য নয়। হয়তো অধিকার পেলে আমি বাংলায় বাসও করবো না। কিন্তু বাস করার অধিকারের জন্য চেঁচিয়ে যাবো।

বাকস্বাধীনতার জন্য এ আমার লড়াই। যেসব দেশ আমাকে তাড়িয়েছে মৌলবাদীর মতের চেয়ে ভিন্ন কোনো মত তারা সইবে না বলে, সে দেশ বা সে অঞ্চলে আমার প্রবেশাধিকার যদি না হয়, তবে সে দেশ মৌলবাদীদের অসহিষ্ণুতাকে জয়ী করে তুলবে। এ আমার একার সুখ স্বস্তির চেয়ে বড় কিছু। যদিও লড়াই করছি আমি, একটি বিন্দুর মতো একা আমি, কিন্তু এ ছোট কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য মোটেই নয়, আরও বড় স্বার্থে। আমি হয়েছি, হয়েছি, পৃথিবীর আর কোনোমানুষই যেন নিজের মত প্রকাশের কারণে কোনওদিন নির্বাসন, নিষেধাজ্ঞা, নিষিদ্ধকরণ ইত্যাদির শিকার না হয়।

দিল্লিতে ধু ধু নিঃসঙ্গতা। শুধু বেড়ালটিই সঙ্গ দেয়। এই একটি প্রাণীর গোটা জীবন আমার ওপর নির্ভরশীল। আর কারও জীবন সম্পূর্ণ আমার ওপর নির্ভর করছে না। একে দিল্লিতে রেখে আমাকে প্রতি মাসেই বিদেশ ভ্রমণ করতে হয়। আসলে যে অনুষ্ঠানগুলোয় অংশ না নিলে চলে না সেগুলোতেই যাই। বাকিগুলো ফিরিয়ে দিই। বেলজিয়ামের বিশ্ববিদ্যালয় ডক্টরেট দেবে, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ও দেবে ডক্টরেট, পশ্চিমের অনেকগুলো সিটি সাম্মানিক নাগরিকত্ব দেবে, ইওরোপিয়ান পার্লামেন্টে বক্তৃতা করতে হবে মানবাধিকার নিয়ে, নরওয়েতে হিউম্যানিস্ট কংগ্রেস। যেতেই হয়। যতটা কম সময় থাকা সম্ভব, ততটা সময় থেকেই উড়ে আসি। ঘন ঘন ফিরে আসি বেড়ালের কাছে। ও একা আছে বলে। কী অসাধারণ এক ভালোবাসা গড়ে উঠেছে আমাদের মধ্যে। কে বলেছে, বেড়ালরা খুব স্বার্থপর, কাউকে ভালোবাসে না। মিনু ঠিক ভালো বাসে। ভীষণই বাসে। আর কেউ না বুঝুক, আমি বুঝি। ওর সঙ্গে দিন রাত ওই ভালোবাসা নিয়েই নিভৃতে কথা হয়। ভারতের ধনী লোকেরা কুকুর পোষে, কিন্তু বেড়াল নয়। বেড়ালে ভয়। বেড়ালে কুসংস্কার। বেড়াল দেখাশোনা করার তাই কেউ নেই দিল্লিতে। কলকাতাতেও ছিল না। কিন্তু কাউকে কাউকে শিখিয়ে পড়িয়ে তবেই ওদের কাছে বেড়াল রেখে যেতাম। দিল্লিতে কাউকে শেখাবো, সে সুযোগও নেই। বর্ধমান থেকে জয়প্রকাশ আগরওয়াল আসেন আমার অনুপস্থিতির দিনগুলোতে বেড়ালের দেখাশোনা করতে। কিন্তু বেড়ালের সঙ্গে তার কেবল তিক্ত সম্পর্কই গড়ে ওঠে। বেড়াল নিয়ে যত কুসংস্কার আছে ভারতে, তার বেশির ভাগই হয়তো তিনি বিশ্বাস করেন। দিল্লির কাউকে বেড়াল দেখাশোনা করার কথা বলা হয় না। দিল্লির কারও সঙ্গে পরিচয় নেই এমন নয়। কিন্তু পরিচয়গুলো বন্ধু বা বন্ধুমতো কোনো সম্পর্কে গড়াতে যা যা হওয়া উচিত তা হয়ে ওঠে না। আমারই আলস্য নাকি ওদের, কে জানে। কলকাতায় আমার এই আলস্য নিয়েই বন্ধু এবং বন্ধুমতো অনেকে গড়ে উঠেছিলো। ক্রমশ এক-ঘরের মানুষ হয়ে উঠি, চাই বা না চাই। জগতের মধ্যে আরেক জগৎ। আমার একার নিভৃত জগৎ।

ভারতীয় উপমহাদেশে জন্ম আমার। অথচ এখানেই মুখ খোলা নিষেধ, আমাকে মুখ খুলতে হয় ইওরোপ আর আমেরিকায়। ওখানেই আমি আমার বিশ্বাসের কথা বলতে পারি। ওখানেই আজ্ঞা আলোচনা মত প্রকাশ। অবশ্য সব ধর্ম নিয়ে পশ্চিমের আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলোতেও আজকাল নির্ভয়ে আর নির্বিঘ্নে নিজের মত প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

বক্তৃতার সময় আমার নিরাপত্তার জন্য পুলিশ থাকে, হয় মঞ্চে, নয়তো মঞ্চের ঠিক নিচে। পৃথিবী ক্রমশ অনিরাপদ হয়ে উঠছে। অসহিষ্ণু মানুষ আজকাল পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত বিচরণ করছে। শুধু একবারই আমি পশ্চিমের মেইনস্ট্রিম সোসাইটির বাইরের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম, সেদিন মঞ্চ থেকে নেমে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম আমি। আমেরিকার প্রবাসী বাঙালি হিন্দুরা প্রতি বছর বঙ্গ সম্মেলনের আয়োজন করে, সেই সম্মেলনের মঞ্চ থেকে। বঙ্গ সম্মেলনে আমার যাওয়ার কোনও ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আয়োজকদের অতি অনুরোধে রাজি হয়েছিলাম। আর যখন কি না আমেরিকার বিদেশ নীতির, বিশেষ করে যত্রতত্র যুদ্ধ বাধানোর নিন্দে করে কবিতা পড়ছিলাম, ম্যাডিসন স্কোয়ারের পনেরো হাজার বাঙালির মধ্যে একটি প্রভুভক্ত, যুদ্ধপ্রেমী অংশ হৈ চৈ করে আমাকে থামিয়ে দিল। হ্যাঁ, মুশকিল সেসব জায়গায় হয়ই, যেসব জায়গায় আমার একমাত্র পরিচয় ‘ইসলামবিরোধী’, এবং আমার ‘ইসলাম বিরোধিতা’র গল্পই তারা চায় শুনতে। কিন্তু যদি জানে যে আমি আসলে আরও অনেক কিছুর বিরোধী, মুসলমানরা যে যুদ্ধে মরছে, সেই যুদ্ধেরও বিরোধী, তখনই শুনি দূর হ, দুর হআওয়াজ। যখনই পৃথিবীকে সুন্দর করার স্বপ্ন নিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে ঘটতে থাকা সব কিছুরই সমালোচনা করছি, তখনই ক্ষুদ্র মানুষের সঙ্গে সংঘাত ঘটে। ক্ষুদ্র মানুষের ভিড় থেকে দূরে সরি, সরতে সরতে বুঝি আমি একঘরে, আমি আলাদা, আমি একা, আমাকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে অন্যরা। বড় মানুষ আছে পৃথিবীতে তবে তাদের সঙ্গে হয় আমার দেখা হয় না, অথবা দেখা হয়, তবে খুব কম হয়।

এদিকে ভিকিলিকস খবর ফাঁস করলো আমার বিষয়ে। ভারতের আমেরিকান দূতাবাস থেকে আমেরিকার সরকারের কাছে পাঠানো তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে আজকাল। Author Taslima Nasreen; Pawn In Political web নামে ২৮ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে পাঠানো তারের দুটো টুকরো এমন

11. (SBU) After Nandigram, Nasreen represented a convenient foil for both the CPM and fundamentalist Muslim leaders in Kolkata. From their actions (or lack thereof), it is clear

NEW DELHI 00005119 003 OF 003

India’s main political parties could not care less about Nasreen or her writ ing beyond how their parties’ reactions to events play to voters. Not wanting to offend the Muslim vote bank, neither Congress nor CPM has officially support ed an extension of Nasreen’s visa. Both parties want the situation to go away. The BJP will ensure that will not happen by raising the issue in Parliament to bat ter both the CPM and Congress and to burnish their own tarnished secular cre dentials. The BJP has seized the high ground and will milk the controversy for all its worth. For Taslima, the last week has been chaotic, but will no doubt provide ample material for her next book. As for the CPM, the public are increasingly aware that their lofty rhetoric about looking out for the little guy rings hollow, since they have stooped recently not only to kill peasants at Nandigram but to abandon a female author in order to pander to vote banks. Surely they could have found space for one woman in a teeming city of 16 million? MULFORD.

12. (SBU) Comment: Even though few in the Indian Muslim community are familiar with Nasreen’s work, there is a general sense amongst the Indian Mus lims community that her writings have somehow insulted or disparaged Islam. The Muslim groups’ public opposition is a reflection of this unhappiness with Nasreen. There are also politics at play. The Communist Party of India Marx ist (CPM) had originally driven Nasreen out of Kolkata to divert attention from the CPM’s central role in the Nandigram violence, as well as to win favor from Muslims who were the main victims of the Nandigram brutality (ref E). The Muslim groups have put pressure once again on the UPA government to act more decisively on Nasreen. Vote bank politics has been an important factor in the Nasreen controversy. India’s political parties are ready to use any tar get of opportunity available to pander to voting groups in preparation for the next national election, due before May 2009. The UPA’s hot-cold response in the Nasreen affair illustrates that the Congress Party, the original and still most prolific practitioner of vote bank pandering, is attempting to juggle its national image and the Muslim vote. End Comment. MULFORD

আর ওদিকে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জয় গোস্বামী কবিতার বই ২০০৭”আমার শ্যামশ্রী ইচ্ছে, স্বাগতা ইচ্ছেগুলি’ তো উৎসর্গ করলেনই আমাকে, আমাদের সময়ের উজ্জ্বল ফলক তসলিমা নাসরিনকে’ লিখে, একটি কবিতাও লিখলেন, ‘আমাদের কাউকে যদি তোমার লড়াই লড়তে হত?/দূরে দূরে, নিরাপদ আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে/আমরা তোমার কত দোষ খুঁজে বার করলাম/আগুনের সামনে গিয়ে দেখলাম না আঙুলটি বাড়িয়ে/জানলায় দড়ির মই ঝোলানোই ছিল, কিন্তু তুমি/ বেরিয়ে আসার কোনো সুযোগ নিলে না/জ্বলন্ত বাড়ির মধ্যে থেকে যাওয়াটাই বেছে নিলে/ তোমার যুদ্ধের কাছে/আমার জীবন কিছু নয়। এখন আমার পিঠে ঠেকেছে দেওয়াল/এরপর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে/আমার জীবনটি ওই ধানক্ষেতে ফেলে দিয়ে যাবে/নায়েব, গোমস্তা, লাঠিয়াল/না, আমি তোমার মতো/ ঘুরে পাল্টা লড়তে পারবো না/এমনকী অবস্থানটুকু/জানাতে যাবো না কাউকে পতাকা নাড়িয়ে/যদি বন্ধু মনে করো, শুধু এ শুভেচ্ছাটুকু দাও, সাহসিকা/অন্তত ঘাড় গুঁজে যেন মরতে পারি একা একা স্বধর্মে দাঁড়িয়ে।

২০০৭/২০০৮ সালে অনেকেই কবিতা লিখেছিলেন। বেশ কিছু বই আর ম্যাগাজিন বেরিয়েছিলো আমাকে কলকাতা ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মানুষের প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প কবিতা ছাপিয়ে। মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন, দেওয়ালে পোস্টার সেঁটেছিলেন, আন্দোলন করেছিলেন, অনশন করেছিলেন। প্রতি বছর ২২ নভেম্বর তারিখে আমাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অনুষ্ঠান হয়। ধীরে ধীরে সেসব ফিকে হয়ে এলো। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হল। সিপিএম-এর চৌত্রিশ বছর শাসন গেল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক বিজয় হল। কিন্তু দু’একজন কাছের মানুষ ছাড়া কেউ আর আমার প্রসঙ্গ তোলে না। যেন আমি বলে কিছু আর বেঁচে নেই কোথাও। আমার আর বাংলায় ফেরা জরুরি। নয়। যেন এক বাঙালি লেখককে বাংলা থেকে নির্বাসনদণ্ড দেওয়ার ঘটনাটি ইতিহাসের পাতা থেকে দিব্যি মুছে দেওয়া গেল।

কোটি কোটি বছর আগে জন্ম নেওয়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোটি কোটি নক্ষত্র আর গ্রহের ভিড়ে পৃথিবী নামক গ্রহের অস্তিত্বই ক্ষণস্থায়ী, এই গ্রহে মানুষ নামের প্রজাতির বিচরণ আর এর নির্মূল হয়ে যাওয়ার ঘটনাও নিতান্তই তুচ্ছ ঘটনা। মানুষের গোটা ইতিহাসও হয়তো কিছুই না, কিছুই না, কিছুই না। ব্রহ্মাণ্ডে কে আর কোথায় আছে মানুষের ইতিহাস খুঁড়ে .দেখতে যাবে। এখনও বেঁচে আছি বিরুদ্ধ স্রোতে, এই তো বেশি।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *