তিন
ক্লাস নাইনে বাংলায় রচনা এসেছিল ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য’। তাইতে নন্দলাল লিখেছিল, আমার জীবনের লক্ষ্য হইল একজন ভাল গুন্ডা হওয়া। গুন্ডাকে সকলেই ভয় পায় এবং সমীহ করে। তাহাদের গায়ে অনেক জোর থাকে, এবং তাহারা কাহাকেও ভয় পায় না। সকলেই তাহাদের পূজার চাঁদা দেয়, কেহ বেয়াদবি করিতে সাহস পায় না। পাঁচু মোদকের দোকানে শিঙাড়া ও জিলাপি খাইলে তাহাদের দাম দিতে হয় না। আমাদের পাড়ার হাবু গুন্ডার অনেক মাসল আছে, তাহার চুলও খুব লম্বা, হাতে লোহার বালা। আমারও ওইরূপ হওয়ার ইচ্ছা। বেশি লেখাপড়া শিখিলে গুন্ডা হওয়া যায় না, তাই আমারও বেশি লেখাপড়া করার ইচ্ছা নাই। ইত্যাদি। এই রচনা পড়ে বাংলার মাস্টারমশাই রমেশবাবু তার কান মলে দিয়েছিলেন, আর বাড়িতেও সকলের কাছে হেনস্থা হতে হয়েছিল।
তা বলে জীবনের লক্ষ্য থেকে নন্দলাল বিচ্যুত হয়নি। গুন্ডা হওয়ার কেতাই আলাদা। গুন্ডা মানেই শিহরন, উত্তেজনা, গ্ল্যামার, খাতির। তাই হাপুসহুপুস ব্যায়াম করে সে তাগড়াই চেহারা বানিয়েছে। কুংফু কারাটেরও তালিম নিয়েছে। লম্বা চুল রেখেছে, হাতে লোহার বালাও হয়েছে তার। চলনবলন যতদূর সম্ভব গুন্ডার মতোই করে তোলার চেষ্টাতেও কসুর করেনি সে।
কিন্তু তার অভীষ্ট সিদ্ধ হয়েছে কি না তা বলা যায় না। কারণ, গুন্ডা হওয়ার সাধনার সঙ্গে সঙ্গে তার বাবার তাড়নায় তাকে বি এ আর এম এ-ও পাশ করতে হল। আর লেখাপড়ার চাপে গুন্ডা হওয়ার তেমন ফুরসতটাই পাওয়া গেল না। তারপরও ঝামেলা কি কম? গুন্ডাগিরিতে তো আর মাসমাইনে পাওয়া যায় না, তাই নানা জায়গায় চাকরির জন্য দরখাস্ত আর সি ভি পাঠাতে হচ্ছিল। আর পাঠাতে পাঠাতে হঠাৎ অবাক কাণ্ড! একদিন দেখল যে সে পুলিশের চাকরিতে বহাল হয়ে গেছে! কী আশ্চর্য! যা হতে চেয়েছিল, হল তার একদম উল্টো! গুন্ডার বদলে পুলিশ!
তবে যদি ধরে নেওয়া যায় যে, পুলিশও আসলে বকলমে উর্দিধারী গুন্ডাই, তা হলে বলতে হবে, নন্দলালের অভীষ্ট একরকমভাবে সিদ্ধই হয়েছে। এখন তাকে সবাই ভয় পায় এবং যথেষ্ট সমীহ করে। এখন ইচ্ছে করলে সে যে কোনও মিষ্টির দোকানে বসে বিনা পয়সায় শিঙাড়া আর জিলিপিও খেতে পারে বটে।
আজ সকাল থেকে একটা লোকের পিছনে হা-হয়রান হতে হচ্ছে থানার ওসি নন্দলাল চক্রবর্তীকে। লোকটা হল ইগল রায় নামে একজন পাগল। তার আবার দুটো আইডেন্টিটি। পাগলাগারদের খাতায় তার নাম ইগল রায়, আবার কারও কারও মতে সে একজন প্রাক্তন জিমন্যাস্ট বুলু মজুমদার। তাকে আবার নিছক পাগলও বলা যাচ্ছে না। পাগলাগারদের ইনচার্জ ইন্দুমতী মিত্রর মতে ইগল রায় পাগল নন, স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষ। আবার একই রাতে লোকটা দু’বার মিসিং হয়েছে। একবার পাগলাগারদ থেকে। আর একবার বাঘাযতীন অ্যাথলেটিক ক্লাব থেকে। পাগলাগারদ থেকে সে পালিয়েছে টারজানের কায়দায়, তিনতলার জানালার গ্রিল খুলে, সেখান থেকে লাফ দিয়ে আমগাছের ডাল ধরে এবং দেওয়াল টপকে। আর ক্লাব থেকে তার নিপাত্তা হওয়াটা অন্যরকম, কেউ বা কারা লাথি মেরে দরজা ভেঙে ঢুকেছে, কারণ দরজায় বেশ কয়েকটা জোরালো জুতোর ছাপ রয়েছে। ঘটনাস্থলে পাওয়া গেছে লোহার রড, একটা হাঁসুয়া, একটা ক্রিকেট ব্যাট, মেঝেয় রক্তের দাগ। ভায়োলেন্সের স্পষ্ট প্রমাণ। সুতরাং ধরেই নেওয়া যায় যে, ইগল রায়কে মারধর করে অপহরণ করা হয়েছে। অন্তত ক্লাবের ছেলেদের তাই ধারণা। তাই চোখের সামনে একটা ভারচুয়াল জিগস পাজল নিয়ে বসে নন্দলাল মাথা খাটানোর চেষ্টা করছিল। আর এ কথা কে না জানে যে, শরীরের কসরতের চেয়ে মাথার কসরত অনেক বেশি কঠিন! দারোগার কাজে তাই সুখ পায় না নন্দলাল।
শহরের তালেবর গুন্ডাদের একটা লিস্ট থানায় আছে বটে, কিন্তু মুশকিল হল যত দিন যাচ্ছে তত নতুন নতুন মস্তানের আবির্ভাব ঘটছে। বেকার বাড়লে গুন্ডাও বাড়ে, সকলের হিসেব রাখা সহজ নয়। লিস্টটা সুতরাং আপডেট করা দরকার। সাতজন বাছা বাছা গুন্ডাকে লক আপে পোরা হয়েছে। তারা অবশ্য শপথ খেয়ে বলেছে, অপহরণটা তারা করেনি। বেলা বাড়লে আরও কয়েকজনকে ধরে আনা হবে। কেউই সহজে স্বীকার করবে না। সুতরাং থার্ড ডিগ্রি লাগাতে হবে। তাতেও কাজ না হলে অগাধ জল।
খড়কের মাথায় তুলোর ঢিপলি পরিয়ে তার ডান কানের খোল পরিষ্কার করে দিচ্ছিল গনা। ডান কানের পর বাঁ কান ধরবে। দুটো কান হয়ে গেলে মাথা চুলকে দেবে। এইসব কাজ গনা ভালই পারে। শুধু চুরিটাই যা পেরে ওঠে না। শেষরাতে লাহাবাবুদের বাড়ির একতলার দক্ষিণের ঘরের জানালার পাল্লা খোলার চেষ্টা করছিল বলে লাহাবাবুদের দারোয়ান মিশিরলাল তাকে ধরে গোয়ালঘরে বেঁধে রেখেছিল। আজ সকালে থানায় এনে জমা করে গেছে।
তবে থানা জায়গাটা মোটেই খারাপ লাগে না গনার। অনেকটা নিজের বাড়িঘরের মতোই। সবাই ভারী চেনাজানা, আপনজন বললেই হয়। মাঝে মাঝে চড়-থাপ্পড়ও জোটে বটে, তবে সেসব গায়ে মাখলে কি চলে! মা-বাপও কি ছেলেপুলেদের চড়টা থাপ্পড়টা দেয় না? আর বড়বাবু তো সাক্ষাৎ বড় ভাইয়ের মতো। গনা তাই খুব যত্ন করে বড়বাবুর কানের খোল বের করার চেষ্টা করছিল। তা বলে তার চোখ কান যে সজাগ নেই তা নয়। ঘটনার গতিপ্রকৃতি সবই সে মনেমনে টুকে নিচ্ছিল। একসময়ে সাহস করে গলাটা একটু নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বড়বাবু, একটা কথা কব?”
“কী কথা?”
“বলছিলুম কী, যে লোকটা অপহরণ হয়েছে তাকে উদ্ধার করে এনে দিলে সরকার কি পুরস্কার টুরস্কার কিছু দেবে বলে মনে হয়?”
চোখ না খুলেই নন্দলাল বলে, “কেন রে, পুরস্কার দিলে তোর তাতে সুবিধে কী?”
“আজ্ঞে সুবিধে তেমন নেই বটে, তবে পুরস্কার টুরস্কার হলে একটু খুঁজেটুজে দেখতাম আর কী!”
“তার চেয়ে বরং চুরিটা ভাল করে শেখ, কাজে দেবে। রোজ রোজ ধরা পড়ে থানায় জমা হচ্ছিস, তোর লজ্জাশরম নেই!”
“আজ্ঞে আজ কিন্তু আমাকে ঝুটমুট ধরে আনল মিশিরলাল। চুরিধারি কিছুই করিনি মশাই, একটু হাঁটাহাঁটি করতে বেরিয়েছিলাম। অনেকটা হাঁটাহাঁটি হওয়ায় সবে একটু হাঁফ ছাড়তে দাঁড়িয়েছি, একটা দেওয়ালে একটু ঠেসও দিয়ে ফেলেছিলুম। খেয়াল করিনি যে, সেটা লাহাবাবুদের বাড়ির দেওয়াল। কারও দেওয়ালে ঠেস দেওয়াটা তো আর কোনও বেআইনি কাজ নয়! কিন্তু কে শোনে কার কথা! হঠাৎ পিছন থেকে এসে জাম্বুবানটা সাপটে ধরে ফেলল।”
“মাঝরাতে হাঁটাহাঁটি করতে বেরিয়েছিলিস কেন? ভাল লোকদের তো মাঝরাতে ঘুমোনোর কথা!”
“তা বটে, তবে কাল রাতে আমার ভায়রাভাই এসেছে কিনা, তাই বিছানাটা তাকে ছেড়ে দিয়ে আমি সময় কাটাতে একটু বেরিয়েছিলাম আর কি। শত হলেও কুটুম মানুষ, খাতিরই আলাদা।”
“ভায়রাভাই! তুই আবার বিয়ে করলি কবে?”
জিভ কেটে গনা বলে, “আজ্ঞে কী যে বলেন বড়বাবু! আমারই আধপেটা জোটে না তার আবার বিয়ে!”
অবাক হয়ে নন্দলাল বলে, “বিয়ে না করলে তোর ভায়রাভাই হয় কী করে?”
গনা মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলে, “ভায়রাভাই হতে হলে কি বিয়ে করতে হয় নাকি বড়বাবু? এটা তো জানা ছিল না!”
বিরক্ত হয়ে নন্দলাল বলে, “তোর দোষ কী জানিস, মিথ্যে কথাটাও গুছিয়ে বলতে শিখলি না!”
গনা ভালমানুষের মতো বলল, “আজ্ঞে আমার তিন কুলে কেউ নেই কিনা, তাই সম্পর্কগুলো ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। ইনি আসলে আমার দূরসম্পর্কের জামাইদাদা। মুখ ফস্কে ভায়রাভাই বলে ফেলেছি।”
“হলেই ভাল। জামাইদাদা যেন আবার ফস করে পিসেমশাই না হয়ে যায়, দেখিস বাপু!”
লজ্জা পেয়ে গনা জিভ কেটে বলে, “আজ্ঞে আর ভুল হওয়ার জো নেই, ইনি নির্যস আমার জামাইদাদাই বটে।”
“তা তোর জামাইদাদাও কি তোর মতোই হাড়হাভাতে নাকি?”
“না না স্যার, কী যে বলেন! জামাইদাদার বিরাট অবস্থা! দু’হাতের আঙুলে আটখানা আংটি, গলায় সোনার চেন, সুটেড বুটেড মানুষ, পুরুষ্টু মানিব্যাগ।”
“বলিস কী! তা তোর জামাইদাদার কিসের কারবার, স্মাগলার না কালোবাজারি?”
“না না, বড়বাবু, সেসব নয়। বেশ ফাঁদালো ব্যবসা।”
“তোর জামাইদাদা কি পাজি লোক নয় বলছিস? তবে শোন, পাজি লোকদের আমি পছন্দই করি। দুনিয়াটা তো পাজি লোকরাই চালাচ্ছে কিনা। আমি যে পুলিশের কাজে হাত পাকালুম তাও তো পাজি লোকদের সঙ্গে মেলামেশা করেই। পাজি লোকেরা আছে বলেই মাসের শেষে আমরা বেতন পাই। বুঝলি? মন দিয়ে বরং একজন পাজি লোক হওয়ার চেষ্টা কর দিকি!”
“যে আজ্ঞে বড়বাবু।”
সেপাই রামপদ ঠান্ডা সুস্থির মানুষ। ঘরে ঢুকে সেলাম করে দাঁড়াল। তারপর গম্ভীর মুখে বলল, “বড়বাবু, একটা কথা ছিল।”
“বলে ফ্যাল।”
“যে লোকটার অপহরণ হয়েছে সেই ইগল রায়কে নাকি একটু আগে খাসনবিশদের মাঠে বাচ্চাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে দেখা গেছে!”
নন্দলাল অত্যন্ত অবাক হয়ে বলে, “সে কী! অপহরণ হওয়ার পর তার তো ক্রিকেট খেলার কথা নয়! তাকে তো আমরা এখনও রেসকিউই করিনি! তা হলে সে ক্রিকেট খেলছে কী করে? তার তো এখন কোনও অন্ধ কুঠুরিতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকার কথা!”
“কলিকালে কত কী হয় বড়বাবু! বানরে সঙ্গীত গায়, শিলা জলে ভাসি যায়!”
“এখনও মুক্তিপণ চাওয়া হল না, কোনও থ্রেট কল এল না, তার আগেই লোকটা ক্রিকেট খেলতে নেমে গেল!”
এসব শুনে গনা শশব্যস্তে বলে উঠল, “বড়বাবু, আমি তা হলে এখন আসি গিয়ে! বাড়িতে মস্ত কুটুম এসেছে, একটু বাজারহাট না করলেই যে নয়!”
নন্দলাল হাত নেড়ে বলে, “যা যা, বিদেয় হ, আমাকে এখনই বেরোতে হবে।”
থানা থেকে বেরিয়ে পাঁইপাঁই করে ছুটে প্রথমে খাসনবিশদের মাঠে গিয়ে হাজির হল গনা। যা দেখল তা আশাপ্রদ নয়। মাঠ ফাঁকা, একটা বুড়ি ছাগলের খুঁটো পুঁতছে।
“বলি ও খুড়িমা, এই মাঠে যারা খেলছিল তারা কোথায় গেল বলো তো!”
“তারা সব বাড়ি চলে গেছে বাছা। কতগুলো মুশকো গুন্ডা এসে এমন তাড়া করল যে, বাছারা পালানোর পথ পায় না।”
“গুন্ডা! গুন্ডা তাড়া করবে কেন?”
“তা কি জানি বাছা। ‘ওই ওই ধর ধর’ বলে কতগুলো লোক এমন মারমুখো হয়ে ধেয়ে এল যে আঁত শুকিয়ে যায়। ওই খোকাদের দলে একজন ধেড়ে লোকও ছিল।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ সেই ধেড়ে লোকটা কোনদিকে গেল বলো তো খুড়িমা!”
“তা কে দেখেছে বাপু! যে যেদিকে পেরেছে দৌড়ে পালিয়েছে। আহা, বাছারা সবে একটু টিফিন করতে বসেছিল, তাড়া খেয়ে সব ফেলে পালাল। পাড়ার কুকুরগুলো এসে এই একটু আগে সব কাড়াকাড়ি করে সাবাড় করেছে।”
তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল গনা। দরজা হাঁ হাঁ করছে খোলা। ঘরে হাওয়াবাতাস বইছে। ঘর ফাঁকা। উঠোন, কুয়োতলা, কুয়োর পাশে কচুবন সব আঁতিপাতি করে দেখল সে। ইগল রায় হাওয়া। ঘরে এসে চৌকির তলা, এমনকি তার পাতলা তেলচিটে তোশকটা অবধি একটু তুলে তলাটাও দেখল। ইগল রায়ের চিহ্নমাত্র নেই। বুকটা ভারী দমে গেল গনার, একটা দুটো নয়, দশ-দশটি হাজার টাকা! সোজা কথা তো নয়! মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল সে।
রাতে ঘুম হয়নি, মিশিরলাল তাকে গোয়ালঘরে বেঁধে রেখেছিল বলে সারা রাত মশার কামড় খেতে হয়েছে, তার ওপর দশ হাজার টাকা হাতছাড়া হওয়ার দুঃখ। বসে বসে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে একটু ঢুলুনি এসে গিয়েছিল তার।
হঠাৎ ঘরে জোরালো শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনে চটকাটা ভাঙল। চেয়ে যা দেখল তাতে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল গনার। পাঁচ-সাতজন দানবাকৃতি লোক কখন নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে তার দিকে কুটিল ও হিংস্র নয়নে চেয়ে আছে। একটু পিছনে হারু কুণ্ডুকেও আধখানা দেখতে পাচ্ছিল গনা। তবে সেই পাগলাগারদের দোর্দণ্ডপ্রতাপ হারু কুণ্ডু নয়, খানিক জড়সড় ভয় খাওয়া, কাঁচুমাচু আর চুপসে যাওয়া হারু কুণ্ডু। চুল উড়োঝুড়ো, ডান চোখের নীচে কালশিটে, ঠোঁটের কষে একটু রক্তও শুকিয়ে আছে বলে মনে হল যেন! তার মানে ইগল রায় পাগলাগারদ থেকে পালিয়ে যাওয়ায় হারু কুণ্ডুর ওপরেও বেশ ডলাইমলাই হয়েছে! দেখে খুশিই হল গনা। তবে গতিক যে ভাল নয় তা বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধি খরচ করার দরকার হল না। ডান দিকের উঠোনের দরজাটা খোলা এবং সে হরিণের মতো দৌড়োতে পারে, এই ভরসায় হঠাৎ চৌকি থেকে এক লাফে নেমে সে উঠোনে ঝাঁপ খেয়ে পড়ার একটা চেষ্টা করল বটে, কিন্তু সবার সামনে দাঁড়ানো মিশমিশে কালো আর আড়েদিঘে পাহাড়প্রমাণ হেক্কোড়টা বিনা আয়াসে একখানা পা বাড়িয়ে তাকে ছোট্ট করে একটা ল্যাং মারল শুধু। গনা ডিগবাজি খেয়ে ঘচাত করে মেঝেতে পড়ে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে রইল। তারপর নিরুপায় হয়ে ভারী গ্যালগ্যালে একটা হাসি হেসে বলল, “আজ্ঞে নমস্কার! নমস্কার! আস্তাজ্ঞে হোক, বস্তাজ্ঞে হোক! কী সৌভাগ্য আমার! কী সৌভাগ্য!”
সামনের সর্দার গোছের লোকটা স্থির দৃষ্টিতে তাকে দেখছিল, বাঁশফাটা গলায় বলল, “সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য সেটা একটু পরে বুঝতে পারবি। এবার বল, কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস লোকটাকে! জ্যান্ত বা মড়া যে কোনও অবস্থাতে লোকটাকে আমাদের চাই।”
ভারী ভালমানুষের মতো মুখ করে গনা বলে, “আজ্ঞে, কার কথা বলছেন বলুন তো কর্তা! আমার তো কারও কথা মনে পড়ছে না!”
“আমরা ভাল লোক নই, বুঝতে পারছিস তো! আর আমাদের মেজাজও ভাল নেই। লোকটা তোর ঘরে রাতে গা ঢাকা দিয়ে ছিল। সত্যি কিনা!”
গনা খুব ভাবিত মুখে বলে, “আপনারা যাকে খুঁজছেন সেই লোকটাই কি না জানি না, তবে একজন লোক কাল রাতে ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে একটু মাথা গোঁজার জায়গা চেয়েছিল বলে থাকতে দিয়েছিলাম বটে। কিন্তু কাউকে বিশ্বাস নেই মশাই। সেই লোক তো দেখছি আমার তোশকের তলায় লুকোনো দশ হাজার টাকার বান্ডিলটা নিয়ে পালিয়ে গেছে! আগে জানলে কি ঘরে ঢোকাতুম?”
গনা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার গালে একটা বাঘা থাবড়া এসে পড়ল। মারধর অনেক খেয়েছে বটে গনা। কিন্তু এই থাবড়াটা খেয়ে বুঝল, ওস্তাদের মার কাকে বলে! ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত গরম হয়ে চোখে ফুলঝুরি দেখতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ গেল ধকলটা সামলাতে।
লোকটা গম্ভীর গলায় বলে, “ইগল রায়ের বাজারদর জানিস? কোটি কোটি টাকা! তোর ওঁছা ওই দশ হাজার টাকা সে পা দিয়েও ছোঁবে না।
গনা গালে হাত বোলাতে বোলাতে বলে, “যে আজ্ঞে। তা হলে বোধহয় তিনি ভাল লোকই হবেন! আমারই ভুল হয়েছিল।”
“সে ভাল লোক না খারাপ লোক তা বুঝে ওঠা তোর কম্মো নয়। এখন বল লোকটা গেল কোথায়?”
“আজ্ঞে কর্তা, আপনারা গণ্যমান্য লোক, আপনাদের কাছে মিছে কথা কয়ে কি নরকবাস করব মশাই? আমি কাল রাতে এক গোয়ালঘরে বাঁধা ছিলুম, তারপর থানায় গস্ত হই। এই একটু আগে ছাড়া পেয়েছি। তাঁর গতিবিধি আমার কিছুই জানা নেই।”
“ওসব বলে লাভ হবে না। কাল রাতে ইগল রায় একবার বরাতজোরে বেঁচে গেছে, কিন্তু এবার আর বাঁচবে না। তার সঙ্গে কাল রাতে তোর কী কী কথা হয়েছে বল দেখি!”
গনা অবাক হয়ে বলে, “তেমন কিছু কথা হয়নি তো কর্তা! তিনি তো পুরনো কথা সব ভুলে মেরে দিয়ে বসে আছেন! ওরকম লোকের সঙ্গে কি আর কথা কয়ে সুখ আছে কর্তা?”
লোকটা চোখ সরু করে তার দিকে চেয়ে বলে, “আমরা খবর রাখি তুই একসময়ে পাগলাগারদে ঝাড়পোঁছের কাজ করতিস। তখন থেকেই কি তোর সঙ্গে লোকটার সাঁট!”
থতমত খেয়ে গনা বলে, “আজ্ঞে না, সাঁট হবে কেন? সাঁট কিসের আজ্ঞে? আমি সামান্য মনিষ্যি বই তো নয়!
“সাঁট না থাকলে সে সবাইকে ছেড়ে তোর ঘরে এসে উঠল কেন? আর তুইও তেমন ভালমানুষ নোস যে, এমনি এমনি একটা উটকো লোককে ফস করে নিজের ঘরে থাকতে জায়গা দিলি। আলবাত দু’জনের মধ্যে একটা বন্দোবস্ত হয়েছে! লোকটা কোথায় গা ঢাকা দিয়েছে তা তোর জানার কথা।”
গনা কী বলবে তা একটু গুছিয়ে ভেবে নেওয়ার চেষ্টা করছিল মিছে কথা কওয়াটা একটা আর্ট, গুছিয়ে এবং ফাঁদিয়ে বলতে না পারলে বিপদআপদ থেকে গা বাঁচানো মুশকিল। একটু নাটক থিয়েটার করার অভ্যাস থাকলে সুবিধে হত। সেই কবে একবার ‘সীতার বনবাস’ পালায় লবকুশের লব হয়েছিল বটে সে, কিন্তু তার মোটে তিনটে ডায়ালগ ছিল, ‘তাই নাকি’, ‘ওরে বাবা’ আর ‘হায় হায়’! ওইটুকু অ্যাক্টিং দিয়ে কি আর এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গনা বলে, “একটা কথা কব কর্তা?”
“কী কথা?”
“আমি বলি কী, আপনারা বরং জুত করে এখানেই সেঁটে বসে থাকুন। আমি বরং গিয়ে ফটিকের দোকান থেকে আপনাদের জন্য চা আর বিস্কুট নিয়ে আসি। আপনারা আরাম করে চা বিস্কুট খেতে থাকুন, ততক্ষণে মনে হয়, ওঁর যখন যাওয়ার আর জায়গা নেই, তখন ঘুরেফিরে, হা-হয়রান হয়ে উনি এখানেই ফিরে আসবেন। তখন ক্যাঁক করে চেপে ধরলেই হল! হেঁ হেঁ!”
“বাঃ, তোর ওইটুকু মাথায় তো এক জাহাজ বুদ্ধি রে!”
গনা গদগদ হয়ে, হাত কচলে বলে, “না না, এ আর এমন কী!”
“আমার সঙ্গে চালাকি!” বলেই লোকটা পট করে হাত বাড়িয়ে তার বিশাল পাঞ্জায় গনার সরু আর পলকা কণ্ঠাটা এমনভাবে চেপে ধরল যে, ঘাড়ের হাড় মট করে প্রতিবাদ জানাল। গলা দিয়ে একটা ‘আঁক’ শব্দ আপনা থেকেই বেরিয়ে গেল গনার, তারপরই দম আটকে, চোখের ডেলা বেরিয়ে যায় যায় অবস্থা। অন্তিম সময় কি এসে গেল তা হলে! ইস, কত কী বাকি থেকে গেল যে! এ বছর শীতে এখনও পাটিসাপটা আর নলেন গুড়ের পায়েস খাওয়া হল না! ‘শোলে’ সিনেমাটা তিনবার দেখা আছে তার, আর একবার দেখার খুব ইচ্ছে ছিল, সেটা হল না! মাহেশের রথ দেখবে বলে কতকাল খাপ পেতে আছে সে, সেই মাহেশও গেল! নরেশ ঘোষের মতো একটা গোলাপি সিল্কের পাঞ্জাবির ভারী শখ ছিল, সেটাও হল না। আরও কত কী বাকি থেকে গেল! অন্তিম সময়ে আর লিস্ট বাড়িয়ে লাভ নেই। চোখ অন্ধকার হয়ে আসছিল তার। ওই ঝাপসা চোখের আবছায়াতেও হঠাৎ সে টুপিটা দেখতে পেল। সেই সাদা আর আশ্চর্য এক টুপি দরজার ওপরটায় চালের কাছাকাছি শূন্যে ভেসে আছে। কেন ভেসে আছে কে জানে! তবে টুপিটাকে দেখে খুব ভাল লাগল গনার। মরে যেতে যেন আর কষ্ট নেই!
ঠিক এই সময়ে হুড়মুড় করে একটা লোক ঘরে ঢুকে সর্দারের কানেকানে ফিসফিস করে কী যেন বলল। সর্দার চমকে উঠে বলে, “তাই নাকি?”
তারপরই দুদ্দাড় করে লোকগুলো হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ছাড়া পেয়ে গনা প্রথমে লটকে পড়ে গেল মেঝের ওপর, তারপর হ্যা হ্যা করে দম নিতে লাগল। সঙ্গে প্রচণ্ড কাশি। কিছুক্ষণ ঠান্ডা মেঝেতেই পড়ে রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে উঠল। টিনের চালের কাছ বরাবর, যেখানে টুপিটা ভেসে ছিল সেখানে এখন আর কিছু নেই। তবু ওই শূন্য জায়গাটায় অবাক হয়ে চেয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল গনা।
