দুই
তিনতলার জানালার পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল ইগল। রাত এখন নিশুত। আজ রাতেই এই পাগলাগারদ থেকে তাকে পালাতে হবে। এই নরকে আর নয়। সে বহুবার এদের বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে, সে পাগল নয়, স্মৃতিভ্রষ্ট মাত্র। কিন্তু সেই কথা কেউ কানেই তোলেনি। তাকে নাকি তারই বাড়ির লোক পাগল বলে এখানে ভর্তি করে দিয়ে গেছে। কে তার বাড়ির লোক তা জানে না ইগল। মা বাবা ভাই বোন কোনও আত্মীয় বা বন্ধুর মুখ তার মনে পড়ে না। কোথায় বাড়ি তাও তার মনে নেই। গত দু’বছরে কেউ তাকে এই পাগলা গারদে দেখতে আসেনি বা খোঁজও নেয়নি। এখানে চিকিৎসার নামে যা হয় তা সহ্য হয় না ইগলের। কখনও ইলেকট্রিক শক, কখনও ঘুমের ওষুধ, কখনও মারধর। খাওয়াদাওয়া খুব খারাপ। তার প্রায় রোজই মনে হয় এত সব পাগলের সঙ্গে থাকতে থাকতে সেও একদিন ঠিক পাগল হয়ে যাবে।
তার ওপর আছে খুব ঠান্ডা মাথার এক শয়তান। তার নাম হারু কুণ্ডু, ওয়ার্ডেন। সর্বদা হাসিমুখ, চিৎকার চেঁচামেচি করে না, হাতে একটা দু’আড়াই ফুট লম্বা রবারের হোস নিয়ে ঘুরে বেড়ায় শুধু। কেউ সামান্য একটু বেয়াদবি করলেই হোসটা দিয়ে এমন নৃশংস ভাবে পেটায় যে, চোখে দেখা যায় না। তা ছাড়া সে রুটিন করেও পেটায়। সপ্তাহের এক- একদিন কয়েকজনের পালা পড়ে। তাদের কমনরুমে নিয়ে গিয়ে পেটানো হয়। হারুর বদ্ধমূল ধারণা মারের ওপর ওষুধ নেই। পাগলকে মারলে তো আর পাগল ভাল হয়ে যাবে না, বরং চেঁচাবে, আর্তনাদ করবে। কিন্তু ওটাই হারুর আনন্দ। সে নিজেও হারুর হাতে বিস্তর হোসের বাড়ি খেয়েছে। সেটা এত জোরে লাগে যে, চোখ অন্ধকার হয়ে আসে। যেখানে লাগে সেখানটা জ্বালা করে লাল হয়ে যায়, তারপর কালশিটে পড়ে। এই গারদের প্রত্যেকটা পাগলের গায়ে অজস্র কালশিটে।
তার ঘরের একজন রুমমেট, অর্থাৎ পাগল মহেন্দ্ৰ এখন ঘুমোচ্ছে। ও এমনিতে ঘুমোয় না, ওকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়াতে হয়। ইনজেকশন না দিলে সারা রাত আকাশ বাতাসের সঙ্গে কথা কয়ে যায়, যার কোনও মাথামুন্ডু নেই। ইগলকেও আগে ইনজেকশন দেওয়া হত, আজকাল হয় না, তার স্বাভাবিক ঘুম হয় বলে।
জানালাটায় গ্রিল আছে। দু’মাস আগে কিছু মিস্তিরি এসেছিল মেরামতির কাজ করতে। তখনই ইগল ওই মিস্তিরিদের যন্ত্রপাতি থেকে একটা স্ক্রু ড্রাইভার সরিয়ে ফেলেছিল। তাতে মিস্তিরিরা হইচই করেছিল বটে, কিন্তু তাকে সন্দেহ করা হয়নি। কারণ সে এইসব পাগলের মধ্যে সবচেয়ে শান্ত আর বাধ্য। সে স্ক্রু ড্রাইভারটা সুপারের অফিসঘরে যে- বইয়ের আলমারিটা আছে তার মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল। সে জানে, এই গারদে বইয়ের আলমারিটা কখনও কেউ খোলে না। বইয়ের আলমারি রাখার নিয়ম আছে বলে ওটা রাখা আছে, কিন্তু কস্মিনকালেও কেউ কোনও বইটই পড়ে না। তাই স্ক্রু ড্রাইভারটাও নিরাপদে ছিল, কেউ খুঁজে পায়নি। অসীম ধৈর্যে সে গত একমাস ধরে গভীর রাতে গ্রিলের স্ক্রু একটা একটা করে খুলেছে। আজ শেষ স্ক্রুটা একটু আগেই খুলে ফেলেছে সে। এখন গ্রিলটা সহজেই আলগা করা যাবে। তবে তারপরও বিপদ আছে। জানালা দিয়ে বেরিয়ে প্রথমে এই পুরনো ঝুরঝুরে বাড়ির নীচের কার্নিসে নামতে হবে। কার্নিস যদি তার ভার নিতে না পারে তবে হুড়মুড় করে নীচে পড়বে সে, আর তাতে শুধু চোটই হবে না, ধরাও পড়ে যাবে। কার্নিশে নামবার পরও বিপদ বড় কম নেই। কাছাকাছি যে-আমগাছটা আছে তার একটা বাড়িয়ে দেওয়া ডাল ধরে ঝুল খেয়ে তারপর ওই গাছ বেয়েই নামতে হবে। আর পথ নেই। একতলায় এখানকার কাজের লোক আর ওয়ার্ডেনরা থাকে, তারা অনেক রাত অবধি জেগে তাসটাস খেলে। দোতলায় অন্য সব পাগলদের ঘর। কাজেই পালাতে হলে তিনতলাই সবচেয়ে ভাল।
গাছের ডালটা নিয়েই ভাবছিল ইগল। ওটাই তার লাইফলাইন। কিন্তু গাছের ডালটা নাগালের মধ্যে নয়। কার্নিস থেকে লাফ মেরে ডালটা ধরতে হবে। ফস্কালে সমূহ বিপদ। তবে গত দু’মাস ধরে অনেক ক্যালকুলেশন করে রেখেছে সে। সে বেশ লম্বা, আর তার স্বাস্থ্যও মোটামুটি ভাল। তবে এখানকার যাচ্ছেতাই খাবার খেয়েখেয়ে তার শরীরে ততটা শক্তি নেই আর। কিন্তু পালাতে হলে এটুকু ঝুঁকি না নিলেও নয়।
মহেন্দ্রর নাক ডাকছে। ও জেগে গেলেও বিপদ নেই। পরিস্থিতি অনুধাবন করতে মহেন্দ্রর অনেকটা সময় লাগে। বাইরে অবশ্য দু’জন পাহারাদার আছে। তবে পাগলা গারদ তো আর জেলখানা নয়, তাই পাহারার তেমন কড়াকড়ি না থাকারই কথা। তবু সাবধানের মার নেই। ধরা পড়লে কপালে দুঃখ আছে।
গ্রিলটা খুব সাবধানে আলগা করল সে। তারপর সেটা নামিয়ে ঘরের দেয়ালের সঙ্গে ঠেসান দিয়ে রেখে দিল আস্তে করে। জানালা টপকানোর আগে সে একবার পিছন ফিরে তার দু’বছরের আস্তানাটার দিকে তাকাল। এই গারদের সুপার একজন বয়স্কা মহিলা, ইন্দুমতী সেন। তিনি এখানে থাকেন না, বাড়ি থেকে আসা-যাওয়া করেন। একমাত্র তাঁকে দেখলেই একটু মায়ের মতো লাগে ইগলের। ইন্দুমতী কাউকে কখনও একটা কড়া কথাও বলেন না। সকলের সঙ্গেই ভারী ভাল ব্যবহার। মাঝে মাঝে বাইরে থেকে নিজের খরচে খাবার এনে সবাইকে খাওয়ান। এই গারদে ওঁকে যেন মানায় না। এখান থেকে পালিয়ে গেলে ইগলের একমাত্র ওঁর কথাই মনে পড়বে। ইন্দুমতী সেনই একমাত্র মানুষ যিনি ইগলকে একাধিকবার বলেছেন, তুমি যে কেন এখানে আছ তা বুঝি না। তুমি তো বাবা পাগল-টাগল নও। দিব্যি ভালমানুষ! কিন্তু এখানে সরকারি নিয়মকানুন এত কড়া যে, ছাড়তেও পারছি না। ইন্দুমতীই তাকে খাতা খুলে দেখিয়েছেন, তাকে এখানে ভর্তি করে দিয়ে গেছেন চতুর্ভুজ রায় নামে একজন, সম্পর্কে বড় ভাই। কিন্তু চতুর্ভুজ রায় নামে কাউকে মনে পড়েনি ইগলের। বাহিরগঞ্জ বলে একটা জায়গার ঠিকানাও দিয়ে গেছে চতুর্ভুজ রায়। এরকম কোনও জায়গার কথা ইগলের অবশ্য মনেও পড়েনি।
আর দেরি করাটা ঠিক হবে না। ইগল জানালার চৌখুপিতে উঠে সাবধানে শরীরটা নীচে নামিয়ে দিল। কিন্তু ঝুল খেয়েও নীচের কার্নিসটা পায়ের নাগালে পেল না। অগত্যা লাফ দিয়ে কার্নিসটায় পড়ল সে। কপাল ভাল, কার্নিসটা পুরনো হলেও তার ভার সামলে নিল। এই শীতেও তার পরনে ফতুয়া, একটা সস্তা পুলওভার আর পায়জামা, যেটা এই পাগলা গারদের পেটেন্ট পোশাক। পায়ে জুতো নেই। এরা একজোড়া হাওয়াই চটি দিয়েছে বটে, কিন্তু সেটা পালানোর পক্ষে উপযুক্ত জিনিস নয়। তার চেয়ে খালি পা ভাল। কার্নিসে দাঁড়িয়ে সে আমগাছটার বাড়ানো ডালটাকে লক্ষ করল। অন্তত তিন-চার ফুট দূরে। তবে অসাধ্য নয়। লাফটার ওপর সব নির্ভর করছে। ফস্কালে তিনতলা থেকে পড়ে হাত-পা ভাঙবে। ধরাও পড়তে হবে। একটা সুবিধে হল, ডালটা একটু নিচুতে। নাগাল পাওয়া খুব শক্ত নয়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বুক ভরে বারকয়েক বড় বড় শ্বাসে দম নিল সে, তারপর একটু কোলকুঁজো হয়ে লাফটা মারল। ডান হাতটা ফস্কে গেল বটে, কিন্তু বাঁ হাতে ডালটা ধরে ফেলতে পারল সে। তবে ঝাঁকুনির চোটে হাতখানা ছিঁড়ে যাওয়ার জোগাড়। পট করে ডান হাতেও ডালটা সাপটে ধরে ঝুল খেয়ে রইল খানিক। ডালপালায় একটু হুড়মুড় শব্দ হয়েছে, কেউ টের পেল না তো! একটু চুপ করে ঝুলে রইল সে। তারপর ঝুল খেয়ে খেয়ে এগিয়ে গিয়ে মূল কাণ্ডের কাছে পৌঁছে ফের একটু জিরেন নিতে হল তাকে। আসল বাধাটা টপকানো গেছে। সম্ভবত একটা কাকের বাসায় হাত পড়ে গেছে, তাই একটা কাক তারস্বরে চেঁচাচ্ছিল। একটু অপেক্ষা করে ধীরেসুস্থে নেমে এল ইগল। শিশিরে ভেজা ঘাসে পা দিয়ে শীত করে উঠল বটে, কিন্তু সেইসঙ্গে একটা মুক্তির আনন্দও হচ্ছিল। একটুখানি ঘাসজমি পেরিয়ে সে ঘের পাঁচিলটার সামনে পৌঁছে গেল।
পাঁচিলটা ছয় বা সাড়ে ছয় ফুট উঁচু, ডিঙোনো একেবারেই শক্ত নয়। কিন্তু ইগল লক্ষ করেছে পিছনের পাড়ায় রাতে নাইটগার্ড পাহারা দেয়। রাত দশটার পর এই রাস্তায় নাইটগার্ডদের হুইল-এর শব্দ শুনেছে এবং টর্চের আলো দেখেছে সে। তারা যদি এই রাত দুটোর সময় তাকে দেওয়াল ডিঙোতে দেখে তা হলে চোর বলে পাকড়াও করবে। তার ওপর আবার তার গায়ে পাগলাগারদের মার্কামারা পোশাক। সুতরাং দেওয়াল ডিঙোনোর আগে হাতের ভর দিয়ে উঠে মুখ বাড়িয়ে ও পাশের রাস্তাটা দেখে নিল সে। না, কেউ নেই। একটু আগেই একজন গার্ড হুইল বাজিয়ে ডান থেকে বাঁ দিকে গেছে। সুতরাং সে হাতের ভর দিয়ে দিব্যি দেওয়ালে উঠে পড়ল এবং অনায়াসে লাফিয়ে মুক্ত পৃথিবীতে পা রাখল। রাস্তার ধারে গাছপালা আছে, সুতরাং আড়ালের অভাব নেই। লোক দেখলেই গা ঢাকা দেওয়া যাবে।
এই শহরটা তার চেনা নয়। গত দু’বছরে তাদের গারদ থেকে বেরোতে দেওয়া হয়নি। সকাল-বিকেলে কম্পাউন্ডের মধ্যেই একটু হাঁটাচলা ছাড়া আর কোনও স্বাধীনতা ছিল না। তাই অচেনা রাস্তায় কোথায় যাবে তা ভাবছিল সে। এই শহরে কি রেলস্টেশন আছে? তা হলে রেলস্টেশনে গিয়ে বসে থাকা যায়। ট্রেন এলে উঠেও পড়তে পারে। তার যখন কোনও গন্তব্য নেই তখন যেখানে খুশি গেলেই হয়, শুধু ওই পাগলাগারদটা থেকে যতদূরে যাওয়া যায় ততই তার পক্ষে ভাল। কিন্তু স্টেশন কোন দিকে তা তার জানা নেই। সুতরাং সে হারা উদ্দেশে হাঁটতে লাগল।
খানিকক্ষণ হেঁটে তার মনে হল, শুধুমুদু শরীরকে হয়রান করছে সে। সকাল না হলে জায়গাটার আন্দাজ পাওয়া যাবে না। তাই এখন তার কোথাও বসে একটু অপেক্ষা করা উচিত। সে যে পালিয়েছে সেটা পাগলাগারদের লোকেরা সকালের আগে টের পাবে না। সুতরাং ব্যস্ত হয়ে লাভ নেই।
একটু হেঁটে যাওয়ার পর বাঁ দিকে একটা স্কুলবাড়ি দেখতে পেল সে। স্কুলবাড়িতে অবশ্য দারোয়ান থাকবে। ঢোকা যাবে না। তবে বন্ধ ফটকের বাইরের দিকটায় দু’দিকে দুটো রক আছে। ইগল আর ভাবনাচিন্তা না করে সোজা গিয়ে একটা রকে শুয়ে পড়ল। গাছ বেয়ে, লাফঝাঁপ দিয়ে এবং পালানোর উত্তেজনায় তার এখন শরীর এলিয়ে আসছে। একটু জিরোনো দরকার। রকের ওপর শুয়ে হাতে মাথা রেখে শরীরটা ছেড়ে দিতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে।
ঘুম যখন ভাঙল তখন সবে সকাল হয়েছে। রাঙা রোদ পড়েছে তার গায়ে। রাস্তায় লোকজন দেখা যাচ্ছে দু’চারজন। ইগলের ভয় হচ্ছে তার পোশাকটা নিয়ে। এটা যে পাগলাগারদের পোশাক সেটা লোকে বুঝতে পারলে বিপদে পড়তে হবে। তার ওপর তার চুল আর দাড়ি দুটোই বড় হয়েছে, অনেকদিন নখ কাটা হয়নি। ফলে তার চেহারাটা বোধহয় এখন বেশ সন্দেহজনক! প্রকাশ্য দিবালোকে গা ঢাকা দেওয়াও তো কঠিন! তার ওপর এখন তার খিদে পাচ্ছে, তেষ্টা পাচ্ছে। তার পকেটে পয়সা নেই, আর এটা অচেনা শহর। তবে হঠাৎ তার মনে পড়ল, সব শহরেই মন্দির-টন্দির থাকে। আর মন্দির মোটামুটি নিরাপদ জায়গা, সেখানে প্রসাদ-সাদ পাওয়া যেতে পারে, আর তেষ্টার জলও।
একটা লোক ঝুড়িতে কয়েকটা লাউ নিয়ে বোধহয় বিক্রি করতেই যাচ্ছিল, ইগল উঠে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, এখানে মন্দির কোথায় আছে জানেন?”
লোকটা বিরক্ত মুখে বলে, “এখানে তো মেলাই মন্দির বাপু! তা তুমি কোন মন্দির খুঁজছ?”
“আজ্ঞে, কালীমন্দির নেই?”
“তা থাকবে না কেন? এই নাক বরাবর সোজা গিয়ে তেমাথার মোড় থেকে ডাইনের রাস্তা ধরলে কালীমন্দির পেয়ে যাবে। তবে এত সকালে তো খোলে না বাপু!”
একটু দমে গিয়ে ইগল বলে, “আসলে আমার মনটা খুব খারাপ। যে- কোনও মন্দিরে গিয়ে একটু বসলে হয়তো একটু শান্তি পাব।”
কে জানে কেন, তার এই কথাটা লোকটার মনে ধরল। একটু নরম হয়ে বলে, “তাই বলো। তা মনের ভালমন্দ তো সকলেরই আছে! তা হলে বাপু, সোজা যাও, গিয়ে থানা পেরিয়ে কয়েক কদম গেলেই বাঁদিকে সিদ্ধিনাথের মন্দির পাবে। বড় ভাল জায়গা। সকালে আরতি হয়। মন ঠান্ডা হবে।”
লোকটা তার লাউ নিয়ে চলে যাওয়ার পর ইগল ধীরেসুস্থে রওনা হল। থানা পেরিয়ে একটু এগোতেই বাগানে ঘেরা চমৎকার পাথরের মন্দিরটা দেখতে পেল সে। ফটক খুলে ভিতরে ঢুকে মনটা সত্যিই ঠান্ডা হয়ে গেল। ভিতরের পরিসরটা নানা গাছগাছালিতে ছাওয়া। মন্দিরের সামনে মস্ত বাঁধানো চাতাল। ফুল আর ধূপধুনোর গন্ধে চারদিক ম’ম’ করছে। ভিতরে ঘণ্টাধ্বনিও শুনতে পেল সে। তার মানে আরতি হচ্ছে। একজন বয়স্ক লোক লম্বা পাইপ দিয়ে বাগানের গাছগাছালিতে জল দিচ্ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করতেই মন্দিরের চাতালের পাশে জলের কল দেখিয়ে দিল। সম্ভবত ভক্তরা মন্দিরে ঢোকার আগে এখানে হাত-পা ধুয়ে নেয়। শীতকালে কলের জল কনকনে ঠান্ডা, তবু ইগল ঘোঁতঘোঁত করে পেট পুরে জল খেল। জলে খিদেতেষ্টা দুটোই জব্দ হয়, অন্তত কিছুক্ষণের জন্য।
ইগল জানে না সে নাস্তিক না আস্তিক। মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে উঠে সে খোলা দরজা দিয়ে দেখতে পেল, মস্ত সিংহাসনের ওপর পেতলের একটি বড় শিবের মূর্তি। আসনপিঁড়ি হয়ে বসা, মাথায় জটা, গলায় সাপ। প্রণাম করা উচিত কি না সে বুঝতে পারছিল না। সে কি ভগবান মানে? একটু দোনোমোনা করে অবশেষে সে হাতজোড় করে একটা দায়সারা প্রণাম করেই ফেলল। গরদ বা শুদ্ধবস্ত্র পরা বয়স্ক এক পুরুতমশাই আরতি করছিলেন। দরজার বাইরে বসে সেটা একটু দেখল সে। তার জামাকাপড় নোংরা এবং বাসি, গায়েও যথেষ্ট ময়লা জমে আছে। কতকাল ভাল করে স্নান করা হয়নি! এই অবস্থায় বোধহয় মন্দির-টন্দিরে ঢুকতে নেই! তাই সে আবার নেমে এসে বাঁধানো চাতালটার একধারে চুপ করে বসে রইল। গায়ে রোদের আরামদায়ক ওম লাগছিল।
তার সামনে কোনও গন্তব্য নেই, পকেটে পয়সা নেই, মাথায় কোনও স্মৃতি নেই, তার ওপর সে একজন পলাতক। তাই এরপর কী করবে তা বুঝতে পারছিল না ইগল। লম্বা হাতটা বাড়িয়ে একটা ঘাসের ডগা তুলে এনে আপনমনে চিবোতে লাগল সে।
একটু বাদে পুরুতমশাই নেমে এলেন। ইগল উঠে দাঁড়িয়ে একটা নমস্কার করে বলল, “ঠাকুরমশাই, আমার বড় খিদে পেয়েছে। একটু প্রসাদ কি পাওয়া যাবে!”
মধ্যবয়স্ক, ফর্সা এবং ভালমানুষের মতো দেখতে পুরুতমশাই তার দিকে বিস্মিত চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, “তোমার এমন অবস্থা কেন বাবা? তোমাকে দেখে তো ভাল ঘরের ছেলে বলে মনে হয়!
ইগল কী বলবে তা ভেবে না পেয়ে বলল, “আমি একটু বিপদে পড়েছি কিনা!”
“বুঝতে পেরেছি বাবা। বোসো, আমি তোমার জন্য প্রসাদ নিয়ে আসছি।”
পুরুতমশাই আবার ওপরে উঠে গেলেন, একটু বাদে দুটো শালপাতার বড় ঠোঙা নিয়ে নেমে এলেন। একটা ঠোঙায় গোটা চারেক সন্দেশ, দুটো কদমা, দুটো লাড্ডু, কয়েকটা বাতাসা আর এক খাবলা মিহিদানা। আর একটা ঠোঙায় কলা, কমলালেবু, শসা, কয়েকটা আঙুর আর মুসুম্বি লেবুর টুকরো। এত ভাল আর এত বেশি পরিমাণের খাদ্যবস্তু বহুকাল দেখেনি ইগল। কৃতজ্ঞতায় তার চোখে জল আসার জোগাড়।
পুরুতমশাই সস্নেহে বললেন, “তোমার মুখ দেখেই বুঝেছি যে, তোমার খুব খিদে পেয়েছে। খাও বাবা, নিশ্চিন্তে বসে খাও। এখানে একটু বিশ্রামও নিতে পারো।”
ইগল বহুকাল পরে পেট ভরে খেল। এত স্বাদের খাবার বহুকাল খায়নি সে। কোনওকালে খেয়েছে কি না তাও মনে পড়ে না।
চাতালের মিঠে রোদে বসে সিঁড়ির নীচের পিলারটায় হেলান দিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখ আবার একটু লেগে এসেছিল। হঠাৎ কে যেন তাকে একটা নাড়া দিয়ে ধমকে উঠল, “এই! তুমি কে বলো তো! এখানে বসে আছ কেন?”
ইগল চোখ চেয়ে দেখল, তার সামনে চার-পাঁচটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। হাবভাব একটু মারমুখো। গুন্ডা মস্তানও হতে পারে। সে একটু ভয় খেয়ে বলল, “ঠাকুরমশাই আমাকে বসতে বলে গিয়েছেন, তাই একটু বসে আছি।
“ঠাকুরমশাই কি তোমাকে চেনেন? তুমি তার কে হও?”
ইগল মাথা নেড়ে বলল, “আমি ঠাকুরমশাইয়ের কেউ হই না। একটু জিরোতে এসেছিলাম।”
কালো এবং ষণ্ডা চেহারার একটা ছেলে একটু এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় বলে, “তোমাকে তো এই টাউনে আগে কখনও দেখিনি! কোথা থেকে উদয় হলে বাপ? চেহারা দেখে তো স্মাগলার বা অ্যান্টিসোশাল মনে হচ্ছে!”
ইগল প্রমাদ গুনল। তার পোশাক বা চেহারার যা শ্রী হয়েছে, তাতে লোকের এরকম সন্দেহ হতেই পারে। সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আমি ওসব নই। বিশ্বাস করুন।”
আর একজন চোয়াড়ে চেহারার ছোকরা বলে উঠল, “দু’ঘা দিলেই পেট থেকে আসল কথা বেরোবে। মনে হচ্ছে জেল থেকে পালিয়ে এসেছে!”
ইগল বুঝল, তার বলার মতো কথা কিছুই নেই। কী বললে ভাল হয় তা সে বুঝে উঠতে পারছে না। সে হাল ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে খুব নরম গলায় বলল, “আপনারা তা হলে আমাকে মারুন।”
এই কথায় ছেলেগুলো একটু থমকে গেল। নিজেদের মধ্যে নিচুস্বরে কী একটু বলাবলি করে নিল। তারপর ওদের মধ্যে বয়সে বড় ছেলেটি বলল, “সেই ভাল, একে ক্লাবঘরে নিয়ে চল। তখন বোঝা যাবে।”
প্রকাশ্যে না মেরে হয়তো ক্লাবঘরে নিয়ে মারবে, এরকমই মনে হল ইগলের। মারধরকে তার বিশেষ ভয় নেই। মারধর তাকে প্রায় রোজই সহ্য করতে হয়। ভয় হল, এরা না আবার তাকে পাগলাগারদে ফেরত নিয়ে যায়!
ক্লাবঘরটা আসলে একটা জিমনাসিয়াম। মন্দির থেকে একটু দূরে। মিনিট তিনেকের হাঁটাপথ। ছেলেগুলো একরকম ঘেরাও করে তাকে নিয়ে গিয়ে তাদের ক্লাবঘরের একটা বেঞ্চে বসাল। ইগল ক্লাবঘরটা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল। আশ্চর্য এই যে, জিমনাসিয়ামের যন্ত্রপাতিগুলো তার ভারী চেনা। ছাদের সিলিং থেকে রিং ঝুলে আছে, একদিকে প্যারালাল বার, আর এক পাশে প্লাস্টিক শিটের ওপর বারবেল সাজিয়ে রাখা, কব্জির ব্যায়ামের জন্য একসারসাইজার, ঘুষি মারার জন্য পাঞ্চিং ব্যাগ সবই তার ভীষণ পরিচিত।
ছেলেগুলো কোথা থেকে একজন ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর বয়সি স্বাস্থ্যবান লোককে ডেকে নিয়ে এল। তার যেমন দশাসই চেহারা তেমনি চোমরানো মোচ। তাকে বিশুদা বলে ডাকছিল সবাই। সেই কালো ছেলেটা বলল, “দেখুন তো বিশুদা, এই ছেলেটাই নাকি!”
বিশু নামক লোকটি তাকে আপাদমস্তক ভাল করে দেখে নিয়ে বলল, “না, এ নয়। একে কোথায় পেলি তোরা?”
“সিদ্ধিনাথ মন্দিরে বসে ছিল।”
বিশু তার দিকে চেয়ে বলল, “তোমার নাম কী হে?”
“ইগল রায়।”
“ইগল! বলো কী হে! ছদ্মনাম ধরেছ নাকি?”
সবাই অল্পবিস্তর হাসছে তার ইগল নাম শুনে।
ইগল মাথা নেড়ে বলে, “আমি তো আমার নাম ইগল বলেই জানি। ছদ্মনাম হবে কেন?”
“তোমাকে তো এই শহরের ছেলে বলে মনে হচ্ছে না! কোথায় বাড়ি?”
ইগল তার ডান হাতের তর্জনী নিজের মাথায় ঠেকিয়ে বলল, “জানি না। মেমরি লস।’
লোকটা খুব অবাক হয়ে বলে, “মেমরি লস! ইয়ার্কির আর জায়গা পাওনি! মেমরি লস বললেই কি ছাড়া পাবে ভেবেছ! ওসব চালাকি আমার জানা আছে।”
ইগল খুব হতাশ গলায় বলে, “আমার সত্যিই কিছু মনে পড়ছে না। মা বাবা বাড়িঘর কিচ্ছু না। এমন কি ইগল নামটাও আমার আসল নাম কিনা তাও বলতে পারব না।”
“তা হলে এই শহরে কী করে এসে জুটলে চাঁদু?”
সে যে পাগলাগারদে ছিল সেই কথাটা এদের বলা যাবে না। তাই সে অম্লানবদনে একটা মিথ্যে কথা বলল, “আমি কোথা থেকে যেন ট্রেনে চেপে চলে এসেছি। কী করব, কোথায় যাব তা জানি না।”
“কোথা থেকে এসেছ তা মনে নেই?”
মাথা নেড়ে ইগল বলে, “না, মনে পড়ছে না।”
বিশু আচমকা ডান হাতে তার বাঁ গালে ঠাসিয়ে একটা চড় কষাল, যাতে শব্দটা হল বজ্রপাতের মতো। তারপর বলল, “এবার মনে পড়ছে?”
পৃথিবীতে হারু কুণ্ডুর মতো অনেক লোক আছে যারা মারধরে খুব বিশ্বাসী। হঠাৎ চড়টা খেয়ে ইগল প্রায় পড়েই যাচ্ছিল বেঞ্চ থেকে। কিন্তু সামলে নিল। লোকটার গায়ে জোর আছে। সম্ভবত ব্যায়ামবীর। তার গালটা চড়ের দাপটে জ্বালা করছে। সে খুব নরম গলাতেই বলল, “সত্যিই বলছি, আমার কিছু মনে পড়ছে না। আপনারা ইচ্ছে করলে আমাকে আরও মারতে পারেন।”
লোকটা হাঁ করে অবাক হয়ে তার দিকে একটু চেয়ে থেকে বলল, “জোশ আছে দেখছি! আমার চড় খেয়েও বসে থাকতে পারা তো কম কথা নয়! গালে একবার হাতও বোলালে না দেখছি! তার মানে তুমি গভীরতর জলের মাছ!
ইগল এবার তার চারপাশে তাকিয়ে দেখল, ছেলেগুলো তার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে, এদের হাত থেকে তার পরিত্রাণ নেই। অসহায় মুখে সে শুধু বলে, “আমি ওরকম নই।”
বিশু এবার অন্যদের দিকে চেয়ে বলল, “একে প্যারালাল বারের সঙ্গে ভাল করে বেঁধে রাখ। আমি থানায় খবর দিচ্ছি। শহরে চুরি ছিনতাই ডাকাতি ভীষণ বেড়েছে। এই ছোকরাকে আমার সুবিধের লোক বলে মনে হচ্ছে না। জঙ্গি বা ফেরারি আসামীও হতে পারে। পুলিশের হাতেই দেওয়া ভাল। তোরা কী বলিস?”
সবাই প্রায় সমস্বরে বলে উঠল, “সেটাই ভাল হবে বিশুদা।”
শুধু একটা পুঁচকে রোগা আর ফর্সামতো ছেলে বলে উঠল, “একে দেখে কিন্তু আমার খুব খারাপ লোক বলে মনে হচ্ছে না বিশুদা। টেম্পোরারি ডিমেনশিয়া হতেও পারে।”
বিশু ছেলেটার দিকে চেয়ে বলে, “তোর বাবা ডাক্তার বলে খুব পণ্ডিত হয়ে গেছিস নাকি! গতকাল আমার বোনের ব্যাগ ছিনতাই হয়েছে কাছারির মোড়ে! তিনদিন আগে অনিমেষ পালের বাড়িতে দিনেদুপুরে ডাকাতি হয়ে গেছে। থানা থেকে বলেছে, এরা সব বাইরে থেকে আসা লোক, শহরের চেনা ক্রিমিনাল নয়। এখন অচেনা লোক মানেই সন্দেহজনক।”
ছেলেটা চুপ করে গেল।
মুশকিলে পড়ল ইগল। পুলিশের হাতে পড়লেও আবার সেই লক আপে আটকে থাকা। আর পুলিশের কাছে পাগলাগারদ থেকেও নিশ্চয়ই তার নিরুদ্দেশের ডায়েরি করবে। আবার ধরা পড়তে হবে তাকে। এত কষ্ট করে পালানোর কোনও মানেই থাকবে না! সে টালুমালু করে চারদিকে তাকিয়ে একটা পন্থা খুঁজছিল। কিন্তু তার মাথায় কোনও বুদ্ধিই আসছে না।
একটা ছেলে একটা নাইলনের দড়ির বান্ডিল নিয়ে ক্লাবঘরে ঢুকল। প্রমাদ গুনল ইগল। এবার তাকে বাঁধা হবে। তারপর পুলিশ আসবে। তারপর লক আপ। তারপর পাগলাগারদের লোকেরা আসবে। তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে ফের। অতল হতাশায় ইগল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
সেই পুঁচকে ছেলেটা হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলল, “বিশুদা! একটা খবর আছে!”
“কী খবর?”
“আমি এই ভদ্রলোকের ছবি তুলে একটু আগে ফেসবুকে দিয়েছিলাম, যদি কেউ চিনতে পারে। এই দেখো, একজন জানিয়েছে, সে এঁকে চেনে। এর নাম বুলু মজুমদার।”
“আর কী লিখেছে?”
“আর কিছু নয়, ওটুকুই। তবে দাঁড়াও, এরপর ডিটেলস আসতে পারে।”
বিশু তার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হে, তোমার নাম কি বুলু মজুমদার?”
ইগল মাথা নেড়ে বলে, “আমি জানি না।”
পুঁচকে ছেলেটা তার মোবাইলের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে ছিল। তাকে ঘিরে ধরে অন্য ছেলেগুলোও মোবাইলের কমেন্ট দেখছে মন দিয়ে। পুঁচকেটা এবার বলল, “এই তো! আরও একজন লিখেছে, জনকপুরের বুলু মজুমদারের সঙ্গে এর চেহারার আশ্চর্যরকম মিল আছে। বুলু মজুমদার দুর্দান্ত জিমন্যাস্ট ছিল। তবে বেশ কিছুদিন আগে বুলু মজুমদার নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তার আর কোনও খবর নেই। লোকে বলে বুলু মজুমদার মারা গেছে।”
বিশু অবাক হয়ে বলে, “জিমন্যাস্ট! বলিস কী! ওহে বাপু, তুমি কি জিমন্যাস্টিকস কিছু জানো?”
ইগল তার চারদিকে আরও একবার চেয়ে দেখল, তারপর বলল, “না, আমার কিছু মনে পড়ছে না। তবে এই জিনিসগুলো আমি চিনি। এই বারবেল, প্যারালাল বার, রিং, পোমেল্ড হর্স, ডাম্বেল – “
পুঁচকে ছেলেটা তার মোবাইলের দিকেই চেয়ে আছে একদৃষ্টে। এবার বলল, “দাঁড়াও বিশুদা, আরও খবর আছে।”
“কী খবর বলবি তো!”
সমর ঘোষ নামে একজন লিখেছে, “ইনি সম্ভবত ব্লু মজুমদার, বুলু নয়। একসময়ে ন্যাশনাল লেভেলের অ্যাথলিট ছিলেন। মেনলি জিমন্যাস্ট। একসময়ে ভাল স্প্রিন্টার ছিলেন, ফুটবলও খেলতেন। অনেকদিন এঁর কোনও খোঁজ নেই। রটনা আছে যে, এঁকে গুম করে খুন করা হয়েছে।”
এসব শুনে বিশু বেশ দমে গেল। একটু থতমত খেয়ে বলল, “তাই তো! এত জনে যখন চিনতে পারছে তখন নিশ্চয়ই ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। কী হে বাপু ইগল, এখন কি কিছু মনে পড়ছে?”
ইগল উদাস গলায় বলে, “না, আমার কিছু মনে নেই।”
“কিছু মনে কোরো না, না জেনে-বুঝে তোমাকে একটা থাপ্পড় দিয়ে ফেলেছি। আই অ্যাম রিয়েলি সরি ফর দ্যাট। এই ঝিন্টু, আর কোনও কমেন্ট এল?”
“কমেন্ট তো অনেক আসছে। বেশির ভাগই বোগাস বলে মনে হচ্ছে। এক ভদ্রমহিলা লিখেছেন, এ তো আমার ছেলে সুজিত গুহ, সাত বছর আগে এলাহাবাদের কুম্ভমেলায় গিয়ে আর ফেরেনি। আর একজন লিখেছেন, এই খুনিটার নাম মানব জহুরি, আটটা মার্ডার কেস ঝুলছে এর নামে। এখনও পর্যন্ত মোট চারজন এঁকে বুলু বা ব্লু মজুমদার বলে আইডেন্টিফাই করেছেন। এখন দেখো কী করবে।”
বিশু বলে, “তোর বাবাকে একবার দেখাবি নাকি? এর সত্যিকারের ডিমেনশিয়া হয়েছে কি না!”
“আমার বাবা সাইকায়াট্রিস্ট বা নিউরোলজিস্ট নন, গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট। এই কেসে বাবা কী করবে?”
সেই মারকুটো কালো যা চেহারার ছেলেটা বলল, “বিশুদা, আমাদের এখন উচিত হবে ভদ্রলোককে হেল্প করা। দেখছ তো, এঁর পায়ে এই শীতেও জুতো নেই, গায়ের পোশাক ভীষণ ময়লা, চুলটুলও মনে হয় কাটা দরকার। চাঁদা তুলে করা যায় না?”
বিশু চিন্তিতভাবে বলে, “তা করা যাবে না কেন? আমাদের ক্লাবে তো আর ফান্ডের অভাব নেই! আমার নতুন কেনা একটা পুলওভার দিয়ে দেবখন, আর নতুন কেনা শার্টও আছে। জয়ন্ত, তুই তো বেশ লম্বা, তোর প্যান্টের সাইজ এর হয়ে যাবে না?”
“মনে তো হয়। আমি একটা জিন্স দিতে পারি। আর পায়জামাও, বাড়িতে পরার জন্য।”
ঝিন্টু এবার একটু উত্তেজিত হয়ে বলে, “বিশুদা, এই দেখো জনকপুর থেকে পরিমল সাধুখাঁ নামে একজন এঁর একটা ছবি পাঠিয়েছেন, কয়েকবছর আগেকার। ইনিও বলছেন, এই ছবিটা ব্লু মজুমদারের, আর এঁর সঙ্গে বেশ মিল আছে।”
‘দেখি! দেখি!” বলে সবাই হামলে পড়ল ঝিন্টুর মোবাইলের ওপর। ছবির মুখে দাড়ি বা গোঁফ নেই, চুলও ক্রু কাট। তবু একটু ভাল করে দেখলেই বোঝা যায় লোকটা ইগলই।।
ইগল নিস্পৃহ ভাবে বসে ছিল, ছবি দেখার আগ্রহ তার হয়নি। তার কপালে কী আছে তা বুঝতে পারছিল না সে। ছবির মুখের সঙ্গে তার মুখশ্রী না মিললে তাকে এরা হয়তো ফের ঝামেলায় ফেলে দেবে! তাই মুখে নৈরাশ্য মেখে বসে ছিল। একটু উৎকণ্ঠা নিয়ে।
বিশু ফের এসে তার মুখোমুখি লোহার চেয়ারটায় বসে বলে, “বাপু হে, তুমি একজন ভাল জিমন্যাস্ট, একজন অ্যাথলিট, এত লোক তোমাকে চিনতে পারছে, আর তুমিই তোমাকে চিনতে পারছ না!”
ইগল অসহায় গলায় বলে, “আমি আসলে কে তা কিন্তু আমি এখনও জানি না।”
“ইগল নামটা তুমি কোথায় পেলে?”
ঠোঁট উল্টে ইগল বলে, “কে জানে! খাতায় তো ওই নামই ছিল।”
“খাতা! কোন খাতার কথা বলছ?”
ইগল বুঝল, সে ভুল করে পাগলাগারদের খাতার কথা বলে ফেলেছে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, “আমি একটা অনাথ আশ্রমে কিছুদিন ছিলাম। সেখানকার খাতায় আমার ওই নাম ছিল।’
বিশু তার দিকে চেয়ে বলল, “তোমার অবস্থা দেখে আমাদের মনে হয়েছে তোমাকে টেম্পোরারি একটা শেলটার দেওয়া দরকার। তুমি এই ক্লাবঘরে থাকতে পারো। তোমার কাছে বোধহয় পয়সাকড়ি নেই!”
“আজ্ঞে না।”
“ঠিক আছে। একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ক্লাবঘরে থাকতে পারবে তো!”
ইগলের চোখে জল আসছিল, বলল, “আপনারা বড্ড ভাল লোক। এই ক্লাবঘর তো আমার কাছে রাজপ্রাসাদ। খুব থাকতে পারব।”
পরবর্তী দু’ঘণ্টার মধ্যে যা ঘটল তা ইগলের কাছে রূপকথার মতো। প্রথমেই এল একটা নেয়ারের খাটিয়া, শতরঞ্চি, চাদর, বালিশ আর একটা ভাল কম্বল। তার পিছুপিছু এল জামা প্যান্ট, পায়জামা, পুলওভার, একটা গামছা, সাবান, এক জোড়া নতুন হাওয়াই চটি। সেইসঙ্গে এল একজন নাপিত। বাইরের রোদে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে তাকে বসিয়ে নাপিত লোকটি বলল, “স্যার, আপনার মাথায় তো জটা হতে শুরু করেছে! আর থিকথিক করছে উকুন। যদি অনুমতি দেন তবে ন্যাড়া করে দিই! নইলে উকুন আপনাকে খুবলে খাবে।”
আইডিয়াটা খারাপ লাগল না ইগলের। মাথা ন্যাড়া করলে তাকে চট করে কেউ চিনতে পারবে না। পাগলা গারদের লোকেরা এতক্ষণে নিশ্চয়ই হন্যে হয়ে তাকে খুঁজতে মাঠে নেমে পড়েছে! সে বলল, “তাই দিন।”
মাথা ন্যাড়া করা হল, দাড়িগোঁফ চেঁছে ফেলা হল, নেলকাটার দিয়ে বড় বড় নখ কেটে ফেলা হল। নাপিতের হাতআয়নায় নিজেকে চিনতেই পারছিল না ইগল। হারু কুণ্ডু বা তার দলবলও চট করে চিনতে পারবে বলে মনে হয় না।
ক্লাবঘরের বাথরুমে ঢুকে আজ ইচ্ছেমতো সাবান দিয়ে স্নান করল সে। জলটা বেজায় ঠান্ডা। স্নান করতে কাঁপুনি উঠে গেল বটে, কিন্তু স্নানের পর অনেকদিন বাদে নিজেকে ভদ্রলোকের মতো মনে হচ্ছিল তার। ময়লা জামাকাপড় বদলে কাচা জামা আর পায়জামা পরল সে, হোক তা সেকেন্ডহ্যান্ড। ঝিন্টু তার বাড়ি থেকে টিফিন ক্যারিয়ারে ভাত নিয়ে এসেছিল। দু’বছর বাদে এত সুস্বাদ তরকারি দিয়ে সরু চালের ভাত তার পেটে গেল। আর এসব তার স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল।
খাওয়ার সময় ঝিন্টু বলল, “সকালে আপনাকে ভ্যাগাবন্ডের মতো লাগছিল। এখন আপনাকে বেশ হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে। চেনাই যাচ্ছে না!”
ইগল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, সে দেখতে কেমন তা সে ভুলেই গেছে।
.
সন্ধেবেলা যখন ক্লাবঘরে কয়েকজন ব্যায়াম করতে এল তখন তার নেয়ারের খাটে বসে জুলজুল করে দেখছিল ইগল। রিং-এ উঠে একজন গ্রেট সার্কেল করছিল। একজন প্যারালাল বারে উঠে ঝুল খেয়ে রিভার্স করছে। জয়ন্ত নামে ছেলেটা তার দিকে চেয়ে বলল, “একটু চেষ্টা করে দেখবেন নাকি?”
ইগল ভয় খেয়ে বলল, “আমি কি পারব?”
“দেখুন না একটু চেষ্টা করে।”
ইগলের আবছা মনে পড়ছিল, কোনওকালে সে এইসব যন্ত্রপাতি নিয়ে কসরত করেছে। কিন্তু কোথায় এবং কবে তা বুঝতে পারছিল না। ভয় এবং দ্বিধা নিয়েই সে উঠে পড়ল। একটা লাফ দিয়ে উঠে রিংটা ধরে ঝুলে থাকল কিছুক্ষণ। কসরত করার উপযুক্ত পোশাক তার পরনে নেই। তবু একটা ঝুল খেয়ে সে গ্রেট সার্কেল করতে চেষ্টা করল। প্রথম দু’বার হল না। তার পরের বার দিব্যি পেরে গেল। তবে হাঁফ ধরে যাচ্ছে, হাত ভেরে আসছে।
সবাই হাঁ করে দেখছিল তাকে, অবাক দৃষ্টি। জয়ন্ত বলে উঠল, “আরে! আপনি তো একজন এক্সপার্ট!”
আর একজন ছমছমে চেহারার ছেলে বলল, “আপনার প্র্যাকটিস নেই বটে, কিন্তু আপনি তো ভালই জানেন!
এরপর একটু প্যারালাল বারেও উঠতে হল তাকে। হাঁফ ধরে যাচ্ছিল বটে, কিন্তু সামান্য কিছুক্ষণ সে সবাইকে প্রায় চুপ করিয়ে রাখল তার অনায়াস দক্ষতায়।
প্রচুর প্রশংসা আর পিঠ চাপড়ানো জুটল তার। বহুদিন পর মনটা একটু ফুরফুরে লাগছে ইগলের। নিজের একটা আইডেন্টিটি অন্তত ধরা পড়ছে তার কাছে। এইভাবেই যদি বাকি আইডেন্টিটিও ধরা দেয়! তা কী হবে?
রাতে যখন ক্লাবঘরে একা হল ইগল তখন সারা দিনের হ্যাপায় বড় ক্লান্ত লাগছিল তার। পরিশ্রম আর টেনশন তাকে কাহিল করে ফেলেছে। রাত্রিবেলা একজন লোক এসে রুটি আর আলুর তরকারি দিয়ে গেল। বলল, “বিশুবাবু পাঠিয়েছে।” এত সুস্বাদু রুটি আর আলুর তরকারি বহুকাল খায়নি সে। পেট ভরে খেয়ে সে দশটা না বাজতেই শুয়ে পড়ল। ঘুমও এসে গেল তৎক্ষণাৎ।
ঘুমটা আচমকা ভাঙল মধ্যরাতে। দরজায় কে বা কারা যেন জোরে জোরে ধমধম করে চাপড় মারছে। চমকে উঠে বসল ইগল। বুকটা ধড়ধড় করছিল তার। শঙ্কিত গলায় সে বলল, “কে?”
ভারী এবং গম্ভীর একটা গলায় কে যেন বলল, “দরজা খোলো। আমরা পুলিশ।”
পুলিশ শুনে ভারী দমে গেল ইগল। সর্বনাশ! তা হলে তো পাগলাগারদ থেকেই পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে! এরা কি তাকে ফের ওখানে ফেরত নিয়ে যাবে? ভয়ে আর সাড়া দিল না সে। চুপ করে বসে রইল। সে যতদূর জানে, এই ক্লাবঘরের একটাই দরজা। বেরোনোর আর কি কোনও রাস্তা আছে? মনে পড়ল না। অন্ধকারে চুপ করে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইল সে। ওদিকে দরজায় ধাক্কা জোরালো হচ্ছে। ওই একই গলায় কে যেন হুমকি দিয়ে বলছে, “ভাল চাও তো দরজা খোলো, নইলে আমরা দরজা ভেঙে ফেলব কিন্তু!”
হঠাৎ ইগলের একটা মরিয়া ভাব এল। এত কষ্টে পাওয়া স্বাধীনতা কি এত সহজে বিসর্জন দিতে হবে? পুলিশ তো কী হয়েছে, পুলিশের কাছেই বা সে ধরা দেবে কেন? ফের ওই পাগলাগারদে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই নেই, মরে গেলেও না।
তার শিয়রের দিকটায় ক্লাবঘরের এক কোণে ক্রিকেটের সরঞ্জাম আছে, দেখেছিল সে। আগে সে পুলওভারটা পরে নিল। পালাতে হলে এটা দরকার হবে। তারপর অন্ধকারে উঠে গিয়ে সে ঘরের কোনাটায় হাতড়ে হাতড়ে ক্রিকেটের সরঞ্জামের মধ্যে একটা ভারী ব্যাট পেয়ে গেল। আপাতত এতেই তার কাজ হয়ে যাবে। ব্যাটটা হাতে নিয়ে সে ফের বিছানায় এসে প্রস্তুত হয়ে বসে রইল। বাইরে নিচু গলায় কারা যেন শলাপরামর্শ করছে। করুক। দরজা ভাঙলে সে ছেড়ে কথা কইবে না। এখন সে মরিয়া।
বাইরে একটু চুপচাপ, তারপর হঠাৎ দমাস করে কে যেন কাঠের দরজাটায় একটা লাথি মারল। ক্লাবঘরের দরজা খুব একটা মজবুত হওয়ার কথা নয়। এক লাথিতেই কেমন যেন কাঠ ফাটার মতো শব্দ হল। পরের লাথিটাতেই দরজাটা ভেঙে পড়ে যাবে। ইগল নিঃশব্দে উঠে গিয়ে দরজার একপাশটিতে দাঁড়াল, হাতে দৃঢ় মুষ্টিতে ধরা ভারী ক্রিকেট ব্যাটটা। হিসেব করে মারতে হবে। সে তো মানুষ খুন করতে চায় না! ভারী ব্যাটের ঘা বেকায়দায় লেগে গেলে মানুষ মরেও যেতে পারে।
তৃতীয় লাথিটায় দরজাটার ছিটকিনি আর খিল দুটোই উড়ে গিয়ে একটা পাল্লা কেতরে ঝুলে পড়ল, আর একটা দরজা ঠাস করে ভিতরের দেওয়ালে গিয়ে লাগল। তারপর একটা জোরালো টর্চের আলো এসে পড়ল ঘরের ভিতরে।
কয়েক সেকেন্ড পরে ওভারকোট পরা একজন লম্বাচওড়া লোক একটু কোলকুঁজো হয়ে ভিতরে ঢুকে এল। তার এক হাতে টর্চ, আর অন্য হাতে একটা ডান্ডা গোছের জিনিস। ইগল অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করল না, ব্যাটটা তুলে বিদ্যুৎগতিতে বসিয়ে দিল লোকটার ডান হাঁটুতে। শব্দটা হল জবরদস্ত। মালাইচাকি ভেঙে যাওয়ার কথা! সেই জোরালো মারে লোকটা আঁক করে একটা আর্তনাদ ছেড়ে দু’হাতে হাঁটুটা জড়িয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। হাত থেকে একটা লোহার রড খসে পড়ে গেল মেঝেতে ঝনঝন শব্দে। সেইসঙ্গে টর্চটাও। দ্বিতীয় লোকটা বোধহয় ব্যাপারটায় হকচকিয়ে গিয়ে “কী হল, কী হল” বলে ভিতরে ঢুকতেই তার বাঁ কাঁধে ব্যাটটা সজোরে বসিয়ে দিল ইগল। শরীরের যে কোনও অঙ্গে জোরালো চোট হলে সমস্ত শরীরই অকেজো হয়ে যায়, উল্টে কিছু করা যায় না। দ্বিতীয় লোকটা জখম কাঁধটা অন্য হাত দিয়ে চেপে ধরে ‘বাপ রে’ বলে বসে পড়ল। এরও এক হাতে লোহার রড ছিল, সেটাও খসে পড়ে গেল মেঝেয়। সাবধানের মার নেই, তাই ইগল অন্ধকারেই যতদূর সম্ভব লক্ষ্য স্থির করে লোকটার ডান কাঁধেও একটা মোক্ষম ঘা বসিয়ে দিল। আত্মরক্ষার জন্য এটুকু তাকে করতেই হত। বাইরের রাস্তায় আরও একজন আছে, বুঝতে পারছিল ইগল। সেই লোকটা চেঁচিয়ে বলল, “কী হল তোদের? ঠুকে দে ব্যাটাকে! শেষ করে দে!” তাকে আর ভিতরে ঢুকতে দিল না ইগল। এক লাফে বাইরে বেরিয়ে লোকটার মুখোমুখি হয়েই সে ব্যাটটা আড়াআড়িভাবে চালিয়ে দিল, যেখানে লাগে লাগুক। লোকটা তাকে দেখেই একটা কিছু অস্ত্র তুলেছিল মারবে বলে। রাস্তার ক্ষীণ আলোয় মনে হল, হাঁসুয়া। কিন্তু তার আগেই ইগলের মারে লোকটার হাত থেকে হাঁসুয়া জাতীয় অস্ত্রটা খসে ছিটকে এল ইগলের পায়ের কাছে। তারপর ইগল আর সামলাতে পারল না নিজেকে। গুন্ডাটার শরীরের দু’পাশে এলোপাথাড়ি কয়েকটা ঘা বসিয়ে দিল সে। হতভম্ব লোকটা কিছু বুঝবার আগেই লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তারপর ‘বাপ রে মা রে’ বলে চিৎকার করতে লাগল। এরা পুলিশ কি না বুঝতে পারল না ইগল। কারও পরনে পুলিশের পোশাক নেই, এবং পুলিশ লোহার রড বা হাঁসুয়া নিয়ে বেড়ায় না বলেই জানে সে।
ইগল যথেষ্ট ভয় পেয়েছে। মারপিট করা তার কাজ নয়। এরা কেনই- বা তার ওপর চড়াও হল, তাও বুঝতে পারছে না সে। অন্ধকারে যেটুকু দেখেছে তাতে এদের পাগলাগারদের লোক বলে মনে হয় না। পুলিশের লোকও নয়। তবে এরা কারা? যেই হোক, এরা যে ভাল লোক নয় তা বোঝাই যাচ্ছে। আরও ভয়ের কথা হল, এদের দলবল থাকতেই পারে, হয়তো আছেও। খবর পেয়ে তারা এসে জুটলে বিপদ।
সে আর দাঁড়াল না। দ্রুত হাঁটা দিল। সামনের গলিটা পেরিয়ে বড় রাস্তায় পড়ে অনেকটা হাঁটল ইগল। রাস্তাঘাট নিঝুম। ঘন কুয়াশা, বেজায় শীত এবং অন্ধকার। কোথায় যাচ্ছে তা বুঝতে পারছে না সে। শহরটা চেনে না ইগল। তবে ক্লাবঘরটা থেকে যতদূরে যাওয়া যায় ততই মঙ্গল। অনেকটা হাঁটার পর সে ডানধারে কিছু আলো দেখতে পেল, আর সামান্য সেই আলোয় একটা লোহার বেড়া আর প্ল্যাটফর্ম। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সে। রেলস্টেশন! এই ভাল হল। প্রথম যে-ট্রেন আসবে তাতেই চেপে বসবে সে। যেখানে হোক চলে যাবে। এই শহরে আর নয়।
স্টেশনে জনমনিষ্যি নেই। প্ল্যাটফর্ম হাঁহাঁ করছে ফাঁকা। ইগল নির্জন প্ল্যাটফর্মের একটা শিশিরে ভেজা, ঠান্ডা, কেঠো বেঞ্চে বসে দম নিতে লাগল। পরপর এত উত্তেজক ঘটনায় সে বেশ হকচকিয়ে গেছে। হুহু উত্তুরে হাওয়ায় ঠকঠক করে কাঁপছিল সে। খানিকটা শীতে, খানিকটা ভয়ে। তার মাথা ভাল কাজ করছে না, কোনও বুদ্ধি আসছে না। শুধু পালিয়ে যাওয়া ছাড়া যেন তার আর কোনও কাজ নেই! কিন্তু আর কত পালাবে সে?
অনেকক্ষণ বসে থেকেও কোনও ট্রেন আসার লক্ষণ দেখল না ইগল। আজ রাতে হয়তো ট্রেন নেই। এটা হয়তো খুব ছোট আর এলেবেলে একটা স্টেশন! তবু তার অপেক্ষা করা ছাড়া উপায়ই-বা কী!
বসে বসে একটু ঢুলুনি এসে গিয়েছিল তার। কাল রাত থেকে ঘুম হয়নি। তার ওপর এত হুজ্জোত। ঢুলুনি আসার আর দোষ কী! কতক্ষণ কেটেছে কে জানে, হঠাৎ বেঞ্চের হাতলে রাখা বাঁ হাতটা হড়কে যাওয়ায় চমকে উঠে তার চটকাটা ভেঙে গেল। ফের সোজা হয়ে বসল সে। তারপর হঠাৎ ভারী অবাক হয়ে দেখল, সামনে হাত কয়েক তফাতে আবছা অন্ধকারে, কুয়াশার মধ্যে একটা সাদা রঙের টুপি শূন্যে ভেসে আছে। এ টুপি চেনে সে। ফেডোরা। প্রথমটায় তার ভয় হল, ওই গুন্ডাগুলোর কেউ নাকি! তক্কে তক্কে এতদূর এসেছে! কিন্তু প্ল্যাটফর্মের মৃদু আলোয় ঠাহর করে দেখল, টুপির নীচে কোনও লোক দেখা যাচ্ছে না। শুধু একটা টুপিই ভেসে আছে। মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম অনুযায়ী এরকম হওয়ার কথা নয়! তাই ভারী অবাক হয়ে চেয়ে ছিল সে। টুপিটা স্থির হয়ে আরও কিছুক্ষণ ভেসে রইল। তারপর নিঃশব্দে হঠাৎ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
ঘটনাটার মাথামুন্ডু কিচ্ছু বুঝতে পারল না ইগল। হয়তো ঘুমের ঘোর এখনও ঠিকমতো কাটেনি বলেই ভুলভাল দেখছে, এই ভেবে ইগল ফের চোখ বুজে ফেলল। হঠাৎ খুব কাছে, তার ডান পাশ থেকে কে যেন চাপা মোলায়েম গলায় বলে উঠল, “স্যার, কিছু দেখলেন?”
চমকে উঠে ইগল দেখে, বেঞ্চে তার পাশেই একজন ছোটখাটো চেহারার লোক বসে আছে, গায়ে ফুলহাতা সোয়েটার, মাথায় বাঁদুরে টুপি, গলায় একটা মাফলার। লোকটা কোথা থেকে হঠাৎ উদয় হল কে জানে! সে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে?”
“আমি! আমি হলুম গনা। কিছু কি দেখতে পেলেন স্যার?”
ইগল আমতা আমতা করে বলল, “হ্যাঁ, কী যেন একটা দেখলাম! মনে হল, একটা টুপি। তবে আমার মনে হচ্ছে আমি ভুল দেখেছি। হ্যালুসিনেশন।”
লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়া দিয়ে বলে, “না স্যার। দু’জন কি একসঙ্গে ভুল দেখতে পারে? সেই কুসুমপুরের জলা থেকে ওই টুপির পিছনে ছুটতে ছুটতে এই এতদূর এসেছি!”
ইগল কিছু বুঝতে পারছে না। লোকটার দিকে বুরবকের মতো কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, “টুপির পিছনে ছুটছেন কেন?”
“ছুটব না! বলেন কী স্যার? ওটা কি এলেবেলে টুপি ভাবলেন নাকি! এই গনা দাস আজগুবি জিনিসের পিছনে ছোটে না। চোর হতে পারি, কিন্তু বোকা নই।”
ইগল অবাক হয়ে বলে, “আপনি কি চোর নাকি?”
গনা একটু চুপ করে থেকে যেন কিছু ভাবল, তারপর একটা গভীর শ্বাস ফেলে বলল, “পেটে বিদ্যে নেই যে চাকরিবাকরি করব, মাথায় তেমন বুদ্ধি নেই যে ব্যবসা বাণিজ্য করে দু’পয়সা কামাব, গতরে খেটে যে খাব তা লোকে তো কাজকর্মই দিতে চায় না মশাই! চুরি কি আর সাধে করতে হয় স্যার!”
ইগল সমব্যথীর মতো বলল, “তাও তো বটে!”
“তবে আর বেশিদিন নয়। ওই টুপির কল্যাণে এবার হিল্লে একটা হয়ে যাবে বলেই মনে হয়। তখন এই গনা দাসকে আর পায় কে!”
ইগল ভারী অবাক হয়ে বলে, “টুপির কল্যাণে! কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না তো!”
গনা গলাটা আর একটু নামিয়ে বলে, “যার তার টুপি নয় স্যার, ও হল এলিয়েন সাহেবের টুপি।”
“এলিয়েনসাহেব! সেটা আবার কে বলুন তো!”
গনা কানের কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে বলে, “অত ভেঙে বলা যাবে না মশাই! তবে ওঁরা সব বহির্বিশ্বের লোক। হয়কে নয় করতে পারেন, নয়কে হয়। বুঝলেন কিছু?”
“না তো!”
“বুঝবেনও না। চলি স্যার।”
এই বলে গনা উঠে রওনা দিয়েও হঠাৎ আবার ফিরে এসে সন্দিহান গলায় বলল, “আচ্ছা, আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে কেন বলুন তো!” ইগল সতর্ক হয়ে গিয়ে বলল, “না না, আমাকে আপনার চেনার কথা নয়। আমি এদিককার লোক নই।”
গনা একদৃষ্টে তার দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে একটা ঝোড়ো শ্বাস ফেলে বলে, “কপালের দোষে আমি একজন পাকা চোর হয়ে উঠতে পারিনি বটে, কিন্তু একজন ভাল চোর হওয়ার মতো অনেক গুণ আমার ভিতরে ছিল মশাই। তার মধ্যে একটা হল চোখ। আমি একবার যা দেখি তা সহজে ভুলি না। আপনি ন্যাড়া হয়েছেন, গোঁফদাড়ি চেঁছে ফেলেছেন বলেই কি আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবেন? আপনি হলেন সরকারি পাগলাগারদের উনিশ নম্বর পেশেন্ট ইগল রায়। ঠিক কি না!”
ইগল ভয় খেয়ে খানিকটা কুঁকড়ে গিয়ে মিনমিন করে বলে, “আপনার কোথাও বোধহয় ভুল হচ্ছে গনাবাবু! আমি ইগল-টিগল নই। আমার নাম বুলু মজুমদার।”
“বিপদে পড়লে নামধাম ভাঁড়াতে হয়, এটাই তো দুনিয়ার নিয়ম! তবে পেটের দায়ে ওই পাগলাগারদে আমি বেশ কিছুদিন ঝাড়পোঁছের কাজ করেছি কিনা! সব জানি। তখনই শুনেছিলাম, আপনি নাকি ভাল ঘরের ছেলে, কিন্তু নিজের নামঠিকানা সব ভুলে মেরে দিয়ে বসে আছেন।”
ইগল ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে গনার দিকে জুলজুল করে চেয়ে ছিল।
গনা দুঃখের গলায় বলে, “আর কিছুদিন টিকে থাকতে পারলে ইন্দুমতী ঠাকরুন এতদিনে আমাকে পাগলাগারদের বাজার সরকার করে দিতেন। আর বাজার সরকারের যে দোহাত্তা রোজগার এ কথা কে না জানে! কিন্তু কপালটাই খারাপ মশাই, একটা পাঁউরুটি চুরির দায়ে হারু কুণ্ডু কী মারটাই না মারল আমাকে! তারপর ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বার করে দিল। আপনিই বলুন, কাজটা কি ঠিক করেছিল হারু কুণ্ডু?”
ইগল সমব্যথীর মতো বলল, “না না, এটা হারু কুণ্ডু মোটেই ঠিক কাজ করেনি গনাবাবু।”
“তা হলেই বলুন। একতলা থেকে তিনতলা অবধি ঝাড়পোঁছ করতে একটা লোকের যে-মেহনতটা হয় তাতে তো খিদেতেষ্টাও পায়, নাকি! তাই হাতছিপ্পু করে ওই পাঁউরুটি আর রাজুর গুড়ের কৌটো থেকে একডেলা গুড় নিয়ে গিয়ে ছাদে বসে টাউটাউ করে মেরে দিয়েছিলাম বটে। এমন কী অন্যায় হয়েছিল বলুন তো! কিন্তু তার বাবদে ওরকম উত্তমকুস্তম মারতে হয়? ক্ষমাঘেন্না বলেও তো একটা কথা আছে না কি! এদেশেই কি গান্ধীবাবা জন্মাননি? অহিংসা অহিংসা করে এত যে গলা শুকোলেন, তাতে কোনও লাভ হল মশাই?”
“তা তো বটেই।”
“তা পাগলাগারদ থেকে আপনার কি ছুটি হয়ে গেছে নাকি ইগলবাবু? বাড়ি যাচ্ছেন বুঝি?”
“হ্যাঁ, অনেকটা ওরকমই।”
“কিন্তু রাত্তিরে তো ট্রেন নেই স্যার। পরের আপ গাড়ি ঢিকিয়ে- ঢিকিয়ে আসতে সেই কাল দুপুরবেলা। তাও যদি টাইমে আসে। আর ডাউন গাড়ি তো আরও দেরিতে। ততক্ষণ খোলা প্ল্যাটফর্মে বসে থাকবেন নাকি? ন্যাড়া মাথায় তো ঠান্ডা লেগে যাবে মশাই!”
কাঁচুমাচু মুখ করে ইগল বলে, “কী আর করা যাবে বলুন! কপালে একটু কষ্ট আছে বুঝতে পারছি।”
গনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাঁদুরে টুপির ওপর দিয়েই একটু মাথা চুলকোনোর চেষ্টা করল। তারপর বলল, “আপনি তো আমাকে বেজায় বেকায়দায় ফেলে দিলেন মশাই! আপনি পুরনো চেনা লোক, এই উদোম প্ল্যাটফর্মে আপনাকে এরকম অবস্থায় ফেলে যাই-ই বা কী করে! শুনলে লোকে বলবেই-বা কী! চোর বটি, কিন্তু অমানুষ তো নই! এই কাছেই রথতলায় আমার একখানা বাবাকেলে টিনের ঘর আছে। ব্যবস্থা তেমন ভাল নয় বটে, তবে মাথা গোঁজা যায় আর কী!”
প্রস্তাবটা মোটেই খারাপ শোনাল না ইগলের কাছে। এই প্রচণ্ড ঠান্ডায় তার হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। উত্তুরে হাওয়াটা যেন চামড়া কেটে বসে যাচ্ছে। অবশ্য মুখে ভদ্রতা করে বলল, “আরে না না, আমার জন্য আপনি কেন কষ্ট করবেন গনাবাবু! আমি কোনওরকমে এখানে বসে কাটিয়ে দিতে পারব।”
গনা এক গাল হেসে বলে, “আমার আর কষ্ট কী? রাতবিরেতে কি আমার আরাম করে লেপমুড়ি দিয়ে শোয়ার জো আছে মশাই! আমার যে রাতবিরেতেই কাজ। নাইট ডিউটি না করলে কি আর পেট চলবে স্যার? আপনি চলুন তো। এই ঠান্ডায় নিউমোনিয়া হয়ে আপনি ঢেঁসে গেলে যে আমার মহাপাতক হয়ে যাবে!”
অগত্যা ইগল উঠে পড়ল।
গনার ঠেক খুব একটা খারাপ নয়। টিনের ঘর, দরজা জানালা আছে, ইটে বাঁধানো পাকা মেঝে। ঘরে একখানা চৌকিতে বিছানা পাতা, হোক তা শতরঞ্চি আর চাদরের। আর একখানা সস্তা তুলোর কম্বলও রয়েছে বটে। খোলা প্ল্যাটফর্মের তুলনায় স্বর্গ।
গনা ভারী আপ্যায়ন করে বলে, “আপনি টেনে ঘুম দিন, আমি ততক্ষণে একটা রোঁদ দিয়ে আসি। লাহাবাবুদের বাড়িতে মেয়ের বিয়ের জোগাড়যন্ত্র চলছে, দেখি যদি কিছু সুবিধে হয়।”
গনা ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইগল দরজাটায় খিল দিয়ে টেনে ঘুম দিল।
সকালবেলা দরজায় ধাক্কার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ইগলের। একটু সময় লাগল সে কোথায় আছে তা বুঝতে। বুঝে খুব একটা খুশি হল না সে। খুশি হওয়ার কথাও নয়। গনা নামে একজন চোরের ডেরায় সে গস্ত হয়েছে। কাল রাতের কাণ্ডকারখানা মনে পড়ায় সচকিত হল ইগল। পুলিশ নয় তো! নাকি গনাবাবুই ফিরে এলেন?
সে সতর্ক গলায় জিজ্ঞেস করল, “কে?”
একটা কচি গলার জবাব পাওয়া গেল, “ও গনাদা, দরজা খোলো। আমি বাবলু।”
বাবলু কে তা বোঝা গেল না, তবে বাচ্চা ছেলে যখন, তখন ভয় নেই। সে উঠে গিয়ে দরজার বাটাম খুলে দিয়ে দেখতে পেল দু’টি দশ-বারো বছরের ফুটফুটে ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পরনে সাদা ফুলপ্যান্ট, সাদা শার্ট আর নীল রঙের সোয়েটার, পায়ে কেডস। তাকে দেখে দু’জনেই অবাক হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
ইগল একটা হাই তুলে বলে, “তোমরা কাকে খুঁজছ?”
“এটা তো গনাদার ঘর। কিন্তু আপনি কে?
“আমি ওঁর একজন বন্ধু বলতে পারো। গনাদা তোমাদের কে হয়?” বড় ছেলেটি বলল, “গনাদা আমাদের মাসতুতো দাদা। আমি বাবলু আর এ হল আমার ছোট ভাই গাবলু।”
শুনে একটু হাঁ হল ইগল। এই দু’টি তো রীতিমতো ভাল ঘরের ছেলে! গনার মাসতুতো ভাই হওয়ার তো কথা নয় এদের! বিস্ময়টা চাপা দিয়ে সে ভালমানুষের মতো বলল, “ওহ, কিন্তু গনাবাবু তো এখন বাড়িতে নেই। উনি কাল রাতে একটু কাজে বেরিয়ে গেছেন। কখন ফিরবেন তা বলে যাননি।”
দুই ভাই একটু মুখ তাকাতাকি করে নিল, তারপর বাবলু বলল, “সে আমরা বুঝতে পারছি। গনাদা তো একদম এক্সপার্ট নয়, নিশ্চয়ই ধরা পড়ে গেছে। তবে চিন্তা নেই, একটু পরেই পুলিশ গনাদাকে ছেড়েও দেবে।”
“তাই বুঝি?”
বাবলু একটু দুঃখের গলায় বলে, “গনাদা কিচ্ছু পারে না। গুগল খুলে কত শেখানোর চেষ্টা করেছি, হাউ টু বি এ গুড থিফ, কিন্তু গনাদার মাথাতে কিছুই ঢোকে না যে!”
ইগল একটু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে, “ভাল চোর কী করে হওয়া যায় বলো তো!”
বাবলু বেশ উৎসাহের সঙ্গে বলে, “সে অনেক কথা! ভাল চোরের বেশি লোভ করতে নেই। যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু নিতে হয়। ভাল চোর কখনও আগে থেকে রিসার্চ না করে কাজ করবে না। যখন কাজ করবে তখন করবে নিখুঁতভাবে। সেই সবচেয়ে ভাল চোর, যে প্রয়োজন মিটে গেলে চুরি করা জিনিস বা টাকা আবার আসল মালিককে ফিরিয়ে দেয়। আরও অনেক কথা বলা আছে গুগলে।”
“বাঃ, গুগলে এসবও লেখে বুঝি?”
“আচ্ছা, আপনি গনাদার কেমন বন্ধু? আমরা তো গনাদার কোনও বন্ধুর কথা কখনও শুনিনি! আমরা তো জানতাম গনাদার কোনও বন্ধু নেই।”
ইগল বলে, “গনাবাবুর সঙ্গে আমার গতকাল রাতেই আলাপ হয়েছে। তখন থেকেই বন্ধু। উনি খুব ভাল লোক তো, তাই আমাকে ওঁর ঘরে থাকতে দিয়েছেন।”
“কেন, আপনার কি থাকার জায়গা নেই?”
ইগল মাথা নেড়ে বলে, “নাঃ, আমার থাকার কোনও জায়গা নেই।”
“তা হলে আপনি কি এখন থেকে এখানেই থাকবেন?”
“না বাবলু, আমি একটু বিপদে পড়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছি। একটা ব্যবস্থা হলেই চলে যাব।”
“কোথায় যাবেন?”
“ঠিক জানি না। আমার বাড়ি কোথায় তা আমার মনে পড়ছে না। “ “কেন মনে পড়ছে না?”
ইগল তার মাথাটা দেখিয়ে বলল, “আমার স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে। আমি সব অতীত ভুলে গেছি।”
বাবলু উত্তেজিত হয়ে বলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, ওকে তো অ্যামনেশিয়া বলে! অ্যামনেশিয়া নিয়ে অনেক সিনেমাও হয়েছে। আপনার কী করে হল?”
“তাও তো জানি না।”
“আপনার নিজের নাম মনে আছে?”
“আমার একটা নাম হচ্ছে ইগল রায়, কিন্তু সেটা আমার আসল নাম কি না তা বলতে পারব না।”
“তা হলে এখন আপনার কী হবে?”
“তাই তো ভাবছি, কিছু বুঝে উঠতে পারছি না।
গাবলু ছলছলে চোখে বলে, “আপনার কি মা-বাবাকেও মনে নেই?” ইগল মাথা নেড়ে বলে, “না, কিচ্ছু মনে নেই গাবলু।”
“তা হলে আপনি আমাদের বাড়িতে থাকবেন চলুন। আমি মাকে রাজি করিয়ে আপনাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাব।”
ইগল একটু মিষ্টি হাসি হেসে বলে, “তুমি ভারী ভাল ছেলে তো, তাই আমার ওপর মায়া হয়েছে। কিন্তু তোমাদের বাড়িতে যাওয়া আমার ঠিক হবে না।”
“কেন ঠিক হবে না?”
“আমি ভাল লোক না খারাপ লোক তা তো জানি না। আগে নিজের আইডেন্টিটি খুঁজে পাই, তা না হলে তোমাদের বাড়িতে গেলে পাঁচটা কথা উঠবে। কিন্তু তোমাদের দুই ভাইকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। কী স্মার্ট তোমরা! আমার মতো বোকা নও!”
বাবলু বলে, “আপনাকে তো একটুও বোকা বলে মনে হচ্ছে না!” ঠোঁট উল্টে ইগল বলে, “কী জানি! আমি বোকা না চালাক তাও তো জানি না!”
“দেখবেন একদিন একটা অ্যাকসিডেন্ট হবে, মাথায় চোট লাগবে, আর আপনার সব মনে পড়ে যাবে। সিনেমায় তো তাই হয়।”
ইগল একটু ম্লান হাসি হাসল, “মনে পড়লেই ভাল। তা তোমরা এত সকালে কোথায় যাচ্ছ? ক্রিকেট খেলতে?”
“হ্যাঁ তো! আজ কুমোরপাড়ার সঙ্গে আমাদের টি টুয়েন্টি ম্যাচ। আর গনাদা আমাদের আম্পায়ার। তাই গনাদাকে ডাকতে এসেছিলাম।”
অবাক হয়ে ইগল বলে, “গনাবাবু আম্পায়ারিংও জানেন নাকি!”
“গনাদা অনেক কিছু জানে। আম্পায়ারিং জানে, হোমিওপ্যাথি জানে, ইলেকট্রিকের ফিউজ় সারাতে পারে, হাওয়াই চপ্পলের স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে গেলে নতুন স্ট্র্যাপ লাগিয়ে দিতে পারে, মায়ের চশমার ডাঁটি ভেঙে গিয়েছিল, গনাদাই তো জুড়ে দিল!”
“বাঃ, গনাবাবুর তো অনেক গুণ!”
“আপনি কখনও ক্রিকেট খেলেছেন?”
“খেলেছি হয়তো, এখন মনে নেই। সব ধু ধু।”
বাবলু করুণ মুখ করে বলে, “আসলে আমাদের একজন আম্পায়ার খুব দরকার। বড়রা কেউ আম্পায়ার না হলে ছোটরা মানতে চায় না, খুব ঝগড়া লেগে যায়। আপনি আম্পায়ার হবেন?”
ইগল এই প্রস্তাবে থতমত খেয়ে গেল। সে কি কখনও ক্রিকেট খেলেছে? ক্রিকেটের কিছু কি সে জানে? কাল রাতে সে ক্রিকেট ব্যাটকে অন্য একটা কাজে লাগিয়েছিল বটে, কিন্তু সেটা তো আর ক্রিকেট খেলা নয়! সে কাঁচুমাচু হয়ে বলে, “কিন্তু যদি ভুলভাল করে ফেলি?”
“সেসব ম্যানেজ করা যাবে, আপনি বেশ লম্বাচওড়া আছেন, কেউ ট্যান্ডাই ম্যান্ডাই করতে সাহস পাবে না।”
গাবলু বলে উঠল, “আর স্যার, আজ ভাল টিফিনও আছে কিন্তু। মাখন পাঁউরুটি, ডিমসেদ্ধ, কলা, কমলালেবু, ভেজিটবল চপ আর দুটো করে সন্দেশ।”
ইগল চোখ বড় বড় করে বলে, “বাপ রে! তা হলে তো যেতেই হয়!”
তার আম্পায়ারের পোশাক নেই, গায়ে ঢলঢলে একটা নীল পুলওভার, পরনে লম্বায় খাটো জিন্স, পায়ে হাওয়াই চপ্পল এবং ন্যাড়া মাথা। তবে বাবলু কোথা থেকে একটা সাদা টুপি জোগাড় করে এনেছে। সেইটে মাথায় দিয়ে যখন ইগল স্টাম্পের পিছনে দাঁড়াল তখনই ক্রিকেট খেলাটাও যেন একটু একটু মনে পড়ে যেতে লাগল তার। ওই তো স্লিপ, কভার, মিড উইকেট, লং অন, লং অফ, পয়েন্ট, লং লেগ! ছয় বলে ওভার হয়। নিয়মকানুনগুলোও ধীরে ধীরে মনে পড়ে যাচ্ছে তার। সবুজ মাঠ, আর মাঠভরা আহ্লাদী রোদ। মনটা ভারী চনমনে হয়ে উঠল ইগলের। রক্তে অ্যাড্রেনালিন ছুটছে। খেলা হচ্ছে টেনিস বলে। ব্যাটে বল লাগার পং শব্দটাও যে কী ভাল লাগল তার কানে, আর ঘাসের ওপর দিয়ে সাদা বলটার পড়ি কি মরি দৌড়ের দৃশ্যও তো দেখার মতো!
কুমোরপাড়ার ওপেনিং ব্যাটসম্যান সমীর ক্রস ব্যাট ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ইগল আম্পায়ারিং ভুলে তার কাছে গিয়ে সোজা ব্যাট কী করে ধরতে হয় তা সযত্নে শিখিয়ে দিল। তীর্থঙ্কর বারবার মারতে গিয়ে ফসকাচ্ছে, ইগল এগিয়ে এসে বলল, “ইয়ংম্যান, ড্রাইভ মারতে হলে পিছনের পায়ে ভর দিতে হবে যে! আর শরীরটা হেলিয়ে দিতে হবে পিছনের দিকে। এসো দেখিয়ে দিচ্ছি!” বলে নিজেই একটা ড্রাইভ মেরে দেখাল। সর্বজিৎ পরপর ওয়াইড বল দিচ্ছিল, তার কাছে গিয়ে বলল, “বেশি জোরে বল করতে যেয়ো না, মাথা ঠান্ডা রেখে স্টাম্পের ওপর বল রাখো।” নিজেই একটা ইয়র্কার বল করে দেখিয়ে দিল। আর এইসব করতে করতেই ইগল বুঝতে পারছিল, বাচ্চারা তাকে ভারী পছন্দ করে ফেলছে। কেউ আউট হলেই সে ‘সরি’ বলে দুঃখ প্রকাশ করে, কেউ একটা চার বা ছয় মারলে চেঁচিয়ে ওঠে ‘সাবাস!”
আস্তে আস্তে কখন নিজের অজান্তে বাচ্চাদের এই ক্রিকেট ম্যাচটা তাকে এমন সম্মোহিত করে ফেলল যে, তার চারদিকের বাস্তবতা লুপ্ত হয়ে গেল, সে কী অবস্থায় আছে তাও তার মনে রইল না।
চটকা ভাঙল, যখন মাঠের বাইরে থেকে হঠাৎ হেঁড়ে গলায় কে একজন চেঁচিয়ে উঠল, “এই বীরু, তোদের আম্পায়ারটা কে রে? এ তো চেনা মুখ নয়! কোথা থেকে ধরে এনেছিস?”
বীরু নামের ছেলেটা মিড উইকেটে ফিল্ডিং করছিল, চেঁচিয়ে বলল, “উনি ইগলদা, বাবলুর দাদা।”
ইগল তটস্থ হয়ে দেখল, মাঠের বাইরে বেশ কিছু লোকজন খেলা দেখতে জড়ো হয়ে গেছে। দেখে একটু দুশ্চিন্তা হল তার। লোকজনের মধ্যে কেউ আবার তাকে চিনে ফেলবে না তো!
টিফিনটাইমে বাচ্চাদের সঙ্গে মাঠের রোদে বসে সবে পাঁউরুটিতে কামড় বসিয়েছে ইগল, ঠিক সেইসময়ে মাঠের বাইরে একটা সোরগোল উঠল, “ওই তো! ওই তো বসেবসে পাঁউরুটি খাচ্ছে! ধর ধর—”
ইগল চকিতে দেখতে পেল, কয়েকটা ষণ্ডামার্কা লোক ছুটে এদিকেই আসছে, সবার আগে হারু কুণ্ডু। হাতের পাঁউরুটিটা ফেলে ইগল পট করে উঠেই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে লাগল। কোথায় উড়ে গেল তার হাওয়াই চটি, কোথায় ভেসে গেল তার টুপি! আঁদাড়পাদাড় ভেঙে প্রাণপণে দৌড়োতে লাগল সে।
