চার
ছুটতে ছুটতে একটা বড়সড় মাঠ পেরিয়ে এক আঘাটায় পৌঁছে গিয়েছিল ইগল। দমফোট অবস্থা। সামনে আর পথ নেই। ঝোপঝাড়, জঙ্গল, বড় বড় ঘাসপাতা, গাছপালা। কিসে যে পা আটকে ধড়াস করে পড়ে গেল সে, তা কে জানে! আর পড়েই সব অন্ধকার। না অন্ধকারও ঠিক নয়। আসলে পড়ে গিয়েই সে নেই হয়ে গেল। আলো অন্ধকার নেই, ভয়ডর নেই, ব্যথাবেদনা নেই, আমি-তুমি নেই, সব ফক্কা, সব ডিলিটেড।
রোগা, গোল গোল চোখ, চুল দাড়ি গোঁফ ভ্রু কিচ্ছু নেই, ফোকলা একটা লোক তার সামনে খাপ পেতে বসে খুব হাসছিল ফ্যাকফ্যাক করে। সে চোখ খুলতেই বলে উঠল, “ওয়েলকাম টু পরলোক, ওয়েলকাম টু পরলোক!”
পরলোক শুনে একটু অবাক হল ইগল। হ্যাঁ, চারদিকটা যেন ঘনায়মান সন্ধ্যার মতো একটা আবছায়া, কিছুই স্পষ্ট প্রতীয়মান নয়। তারাহীন আকাশ, আর একটা থম ধরা ভাব। যেন অন্তহীন এক গোধূলি। সে হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর লোকটার দিকে চেয়ে বলে, “আমি কি মারা গেছি?”
“যাননি মানে! আপনি হান্ড্রেড পারসেন্ট মারা গেছেন মশাই! ওই তো দেখুন না আপনার ডেডবডি পড়ে আছে! ওই যে আগাছার জঙ্গল থেকে আপনার ডান পাটা বেরিয়ে আছে, দেখেছেন?”
ইগল তার ডান পাশে, একটু দূরে আকন্দ, কন্টিকারি, আর মুথা ঘাসের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে থাকা একটা ডান পা দেখতে পেল বটে, তবে নিজের ডান পা বলে চিনতে পারল না। আসলে তার ডান পা কেমন দেখতে তা সে কোনওদিনই তেমন করে লক্ষ করেনি। এখন ডান পায়ের জন্য একটু দুঃখই হল তার। চিন্তিত মুখে সে বলল, “তা হলে এখন কী হবে?”
লোকটা ভারী আহ্লাদের সঙ্গে বলল, “আপনার আনন্দ হচ্ছে না?”
“না তো! আনন্দ হওয়ার কথা নাকি?”
“কথা নয়? বলেন কী মশাই! এ সময়ে তো একটা ফিল গুড ভাব হওয়ারই কথা! খুব জোর বাঁচা বেঁচে গেলেন যে! একবার মরলে আর আপনাকে মারে কে? এখন ওই শিবু মণ্ডল, গণেশ হেলা, ট্যারা তপন বা ঢ্যাঙা পটাই আপনার পিছনে যতই তাড়া করুক, কিছুই করতে পারবে না স্যার!”
সে অবাক হয়ে বলে, “এরা কারা বলুন তো!”
“আহা, এরাই তো সারা শহর হন্যে হয়ে খুঁজছে আপনাকে! এদের তাড়া খেয়েই তো আপনি পালিয়ে এলেন! তবে আর চিন্তা নেই। এখন গুলিগোলা, বন্দুকপিস্তল, বোমাপটকা, ছুরিছোরা কিছুই করতে পারবে না আপনার!”
ইগল ভ্রু কুঁচকে বলল, “ওরা আমাকে খুঁজছে কেন জানেন!”
“তা খুঁজবে না! আপনার হিস্ট্রি যে ওরা জানতে পেরে গেছে!”
নিজের মাথাটায় একটু হাত দিয়ে কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করে ইগল, তারপর চিন্তিতভাবে বলে, “আমার কি কোনও হিস্ট্রি আছে?”
“তা থাকবে না! সব জ্যান্ত মানুষেরই একটা করে হিস্ট্রি থাকার কথা। এই যে আমি, পলাশবরণ পালধি, এই আমারও কি হিস্ট্রি নেই? শামুকখোল গাঁয়ে বাস ছিল, পিতা নিবারণ পালধি, মাতা বাসন্তী পালধি, বি এ পাশ, আদালতের মুহুরি, তিন সন্তানের পিতা, ইত্যাদি ইত্যাদি।”
“কিন্তু আমার হিস্ট্রি আমার মনে নেই।”
“হিস্ট্রি দিয়ে আর আপনার দরকারই-বা কী মশাই! ও আপদ গেছে যাক। ওসব ভাবতে গেলে পিছুটান জেগে ওঠে কিনা। হিস্ট্রি অনেকটা শেয়ালের লেজের মতো। শেয়াল যেমন কাঁকড়া ধরতে জলে লেজ ডুবিয়ে বসে থাকে, তেমনই আমাদের হিস্ট্রির লেজও ইহলোকে নামানো থাকে, সেই লেজ ধরে কেউ টানাটানি করলে পরলোকে মানুষের ভারী অসোয়াস্তি হয় মশাই!”
“কিন্তু আমি যে আমার হিস্ট্রিই খুঁজে বেড়াচ্ছি!”
“এই তো মুশকিলে ফেললেন! আমি আবার আপনার ইউটিলিটি এজেন্ট কিনা! দাঁড়ান, দেখছি।”
লোকটা তার জামার বুকপকেট থেকে একটা ছোট ময়লা ডায়েরি বের করে পাতা উল্টে দেখতে দেখতে বলল, “সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, আপনার কোনও জন্মসালের রেকর্ড নেই। নাম ইগল ওরফে বুলু রায় মজুমদার। আনুমানিক বয়স তেইশ বছর, জন্মের কোনও রেকর্ড নেই, মাতাপিতার পরিচয় জানা যায় না, জনকপুরের জনৈক উদ্ধব রায় মজুমদার এবং মধুবনি রায় মজুমদারের কাছে সন্তানবৎ লালিতপালিত, তাঁদের নিজস্ব সন্তানের নাম চতুর্ভুজ রায় মজুমদার। বছর কয়েক আগে এক আপতনে আপনার স্মৃতি বিলুপ্ত হয়।”
বিস্মিত ইগল ভ্রু কুঁচকে বলে, “আপতনে!”
“আমার ডায়েরিতে সেরকমই টোকা আছে। আর একটা কথাও আপনার জানা দরকার। ইহলোকে আপনি কিন্তু একজন বেশ ধনবান ব্যক্তি, কারণ উদ্ধব রায় তাঁর বিশাল বিষয়সম্পত্তির অর্ধেক আপনার নামে লিখে দিয়ে গেছেন। অবশ্য এখন আর তাতে লাভ নেই। মরে গেলে সবই লবডঙ্কা। ওই হিস্ট্রির খাতিরে জানিয়ে রাখলাম আর কী!”
“আর কিছু?”
“আহা, বেশি খুঁড়তে গেলে যে, কেঁচোর বদলে সাপ বেরিয়ে পড়বে মশাই! মরার পর আর ইহলোক নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার কী আপনার? ওই শেয়ালের লেজ ধরে যত টানবেন ততই হাহুতাশ।”
“আমি জানতে চাই যে!”
“আপনাকে নিয়ে ভারী মুশকিল দেখছি! তা হলে ঠারেঠোরে একটুআধটু বলছি। আপনাদের বাড়িতে একটা পোষা ময়নাপাখি ছিল। দাঁড়ে বসে কথাটথা কইত। একদিন কীভাবে যেন শিকল খোলা পেয়ে পালিয়ে যায়। তবে বেশিদূর যেতে পারেনি। শীতকাল বলে দরদালানের জানালাদরজা বন্ধ থাকায় উড়ে যাওয়া হয়নি তার। ধরা পড়ে যায়। পাখির এই বেয়াদবি দেখে রেগে গিয়ে চতুর্ভুজ তার দুটো চোখ কানা করে দিয়েছিল, যাতে আর কখনও পালাতে না পারে।”
“আর কিছু?”
“আরও চাই? যত জানবেন ততই যে ঝঞ্ঝাট বাড়বে মশাই।”
“প্লিজ় বলুন।”
লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “সুখে থাকতে কেন যে ভূতের কিল খেতে চাইছেন! তা হলে বলি, চতুর্ভুজ ফড়িংয়ের পাখনা ছিঁড়তে খুব ভালবাসত, ভালবাসত গুলতি দিয়ে পাখি মারতে, আর আপনার যখন চার বছর বয়স তখন একবার আপনাকে তিনতলার ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আপনি পড়তে পড়তেও কার্নিস ধরে ঝুল খেয়ে ছিলেন, যা ওইটুকু বাচ্চার পক্ষে অস্বাভাবিক। শুধু অস্বাভাবিকই নয়, প্রায় অলৌকিক। উদ্ধব রায় ওই ঘটনায় চতুর্ভুজকে উত্তমকুস্তম মারধর করেন। আর আপনার ঝুলে থাকার ক্ষমতা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে আপনাকে জিমনাস্টিকস শেখাতে জিমে ভর্তি করে দেন।”
“আর কিছু?”
“আরও চাই? আপনার তো খাঁই মিটছে না দেখছি! দিব্যি টুক করে মারা গিয়ে ঝাড়া হাত-পা হয়েছেন, এখন তো আপনার আনন্দ করার সময়। আনন্দটাকে মাটি করতে চান?”
“আমার কোনও আনন্দ হচ্ছে না। আপনি বলুন।”
“আপনার যখন তিন মাস বয়স তখন কে বা কারা একদিন একটা ধামায় করে আপনাকে উদ্ধব রায়ের সদর দরজায় রেখে দিয়ে যায়। ফুটফুটে বাচ্চাটাকে দেখে উদ্ধব রায় আর মধুবনি রায় আপনাকে ফেলতে পারেননি। চতুর্ভুজের বয়স তখন বারো বছর। তার একচ্ছত্র রাজত্বে আপনি ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিক কারণেই সে আপনার ওপর খুশি ছিল না। তার ওপর উদ্ধব আর মধুবনি আপনাকে চোখে হারাতে লাগলেন বলে চতুর্ভুজের সঙ্কট দেখা দেয়। আপনার কি চতুর্ভুজের ওপর রাগ হচ্ছে? হলেও লাভ নেই, আপনি এখন পরলোকে, সব ভালমন্দের ঊর্ধ্বে।”
“তারপর?”
“এরপরেও শুনতে চান? শুনে লাভ কী? যা ঘটে গেছে তা তো আর ওল্টানো যাবে না! শুধুমুদু মনটা খিঁচড়ে থাকবে।”
“তবু আমি শুনতে চাই।”
“আপনার কি মনে হয় না যে, মেমোরি ডিলিট হয়ে যাওয়ার মধ্যেও একটা পজ়িটিভ ব্যাপার আছে! ওই যে কবি বলেছিলেন, কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে! ওসব যত ভুলে থাকা যায় ততই তো ভাল।”
“আপনি বলুন, আমি শুনব।
“আচ্ছা নাছোড় লোক তো আপনি! তা হলে বলি, চতুর্ভুজকে তেমন দোষ দেওয়া যায় না কিন্তু। আপনি অজ্ঞাতকুলশীল, কুড়িয়ে পাওয়া, বাইরের ছেলে, আপনাকে আশকারা দেওয়াটা চতুর্ভুজের পছন্দ না হওয়ারই কথা। তার ওপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার ভিতরে এমন কিছু লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করল যা মোটেই স্বাভাবিক নয়। বরং খানিকটা অতিমানবীয়। মেধা, শারীরিক সক্ষমতা, দ্রুতগতি, সহ্যশক্তি সবকিছুই যেন বাড়াবাড়ি রকমের। এটা চতুর্ভুজের নিরাপত্তার পক্ষে অনুকূল ছিল না। শুধু ছাদ থেকে ফেলে দেওয়াই নয়, সে একবার আপনাকে পুকুরে সাঁতার শেখানোর নাম করে ডুবিয়ে মারারও চেষ্টা করেছিল। তখন আপনার আট বছর বয়স। চার মিনিট ডুবে থাকার পরও আপনি যে মরেননি সেটা তো আর চতুর্ভুজের দোষ নয়। বরং দোষটা আপনারই। স্বাভাবিক নিয়মে আপনার তখনই ভদ্রভাবে মরে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আপনি অত্যন্ত অন্যায়রকম সুবিধাভোগীর মতো বেঁচে ছিলেন। পেটে সামান্য একটু জল ঢোকা আর মূর্ছা যাওয়া ছাড়া আর বিশেষ কিছুই হয়নি। সেই ঘটনায় চতুর্ভুজকে ত্যাজ্যপুত্র করতে চেয়েছিলেন উদ্ধব রায়, মধুবনি রায় হাতেপায়ে ধরে সেটা আটকান।”
“আপনি থামছেন কেন? বলুন।”
“দাঁড়ান মশাই, দাঁড়ান। আগাগোড়া আমি আপনার রিঅ্যাকশন লক্ষ করছি। এসব কুচুটে কথাবার্তা শুনেও আপনি দিব্যি নির্বিকার মুখে বসে আছেন দেখতে পাচ্ছি! আপনার গা গরম হয়ে উঠছে না! মাথা দিয়ে আগুনের হলকা বেরোচ্ছে না! দাঁত কড়মড় করছে না! অথচ আপনার এখন ওগুলোই হওয়ার কথা! আপনি যে স্বাভাবিক নন সেটা আপনার জানা উচিত। এই আপনাদের মতো লোককেই ইংরিজিতে বলে কুল কাস্টমার। আর তাই আপনার মতো লোকের সঙ্গে বসবাস করা যে কারও পক্ষেই বিপজ্জনক। চতুর্ভুজ রায় যে নিরাপত্তার অভাব বোধ করতে শুরু করেন তা অকারণ নয়। বুঝতে পারছেন তো!”
“পারছি পলাশবরণবাবু। এবার এগোন।”
“আমার এসব বলার মোটেই ইচ্ছে ছিল না মশাই, আপনার চাপাচাপিতেই বলতে হচ্ছে। ইউটিলিটি এজেন্টদের কাজই হল মক্কেলদের মন রেখে চলা, তাদের আরামদায়ক অবস্থায় রাখা। শত হলেও একটা নতুন জায়গায় এসেছেন, সব কিছু বুঝতে এবং সয়ে নিতে একটু সময় লাগবে কিনা। তাই এই সময়টায় আপনাকে সঙ্গ দেওয়াই আমার কাজ।”
“থ্যাঙ্ক ইউ। তারপর কী হল বলুন।”
“ওঃ, ভবি দেখছি ভোলার নয়! আপনি সবকিছু না শুনেই ছাড়বেন না দেখছি! তা হলে শুনুন। আঠারো-উনিশ বছর বয়সে আপনি ছ’ফুটের ওপর লম্বা, ধকধকে শরীর, চওড়া কাঁধ, ক্ষুরধার মেধাসম্পন্ন একজন সদ্যযুবা। চতুর্ভুজ আপনার চেয়ে ছ’ইঞ্চি বেঁটে, গোলগাপ্পা চেহারা, অতি মধ্যমেধার লোক। পাল্লাটা একপাশে একটু বেশি হেলে পড়েছিল বলে মনে হয় না আপনার? বেচারা চতুর্ভুজ আপনাকে ভয় পেতে শুরু করেছিল। শিশু বা বালক অবস্থায় সে আপনার ওপর যেসব অত্যাচার করেছিল, তার ভয় হল, এবার আপনি তার প্রতিশোধ নেবেন। তার হাতে মাত্র একটাই রঙের টেক্কা, তা হল আপনি অজ্ঞাতকুলশীল, একজন নোবডি, একজন কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে। কিন্তু তার তাস মাত্র ওই একটাই। আর আপনার হাতে বিস্তর তাস, অনেক টেক্কা বিবি গোলাম। চতুর্ভুজের জেতার কোনও চান্সই ছিল না। উদ্ধব আর মধুবনিরও বলিহারি, পালিতপুত্রের প্রতি তাঁদের অত প্রগাঢ় অপত্যস্নেহেরও কোনও মানে হয় না। উদ্ধব রায় এই সময়ে একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনাদের সম্পর্কটা আরও বিষিয়ে দিলেন। তাঁর যাবতীয় বিষয়সম্পত্তির অর্ধেক তিনি আপনার নামে উইল করেন। তা নিয়ে বাপ আর ছেলের মধ্যে তুমুল বচসা হয়। উদ্ধব বুঝতে পারেননি যে, ওই কাণ্ড করে তিনি আসলে আপনার বিপদই ডেকে আনছিলেন। সেইসময়েই একটি ঘটনা ঘটে। বাড়িতে জিম করার সময় আপনি রিংয়ের দড়ি ছিঁড়ে পড়ে যান। আপনার মাথায় আর ঘাড়ে বড় রকমের চোট হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, রিংয়ের দড়িদুটো কেউ আগে থেকেই অর্ধেকের ওপর কেটে রেখেছিল।”
“তারপর?”
পলাশবরণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “ঘাপলাটা তো ওইখানেই মশাই! পড়ে যাওয়াটা কেউ ভাল চোখে দেখেনি। সন্দেহের অভিমুখ ঘুরে গেল বেচারা চতুর্ভুজের দিকে। এমন কথা অবশ্য বলা যায় না যে, কাণ্ডটা চতুর্ভুজ করেনি। আবার করেছে বলেও প্রমাণ নেই। আপনাকে হাসপাতালে দেওয়া হয়েছিল। দু’দিন পরে আপনার জ্ঞান ফেরে। কিন্তু তখন আপনি সম্পূর্ণ স্মৃতিভ্রষ্ট। কাউকে চিনতে পারেন না, কোনও কথা মনে নেই। ভ্যাবলা, ভ্যাকান্ট লুক, টোটাল ডিমেনশিয়া। ডাক্তার উদ্ধব রায়কে বলে দিয়েছিল, কিছু করার নেই, ভগবানকে ডাকুন। আর ডাক্তার যখন ভগবানকে ডাকতে বলে তখন বুঝতে হবে, কেস হোপলেস।”
“থেমে গেলেন কেন পলাশবরণবাবু? আপনার কি আর কিছু বলার নেই?”
“না মশাই, আর কী থাকবে! আপনার হিস্ট্রি এটুকুই।”
“আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আপনার সব কথা এখনও বলা হয়নি।”
পলাশবরণ একটু খিঁচিয়ে উঠে বলে, “এখানে থাকতে হলে পিছুটান ছেড়ে আসতে হয়। ইহকাল আর পরকালের মধ্যে দড়ি টানাটানি হলে কি ভাল হবে মশাই? দোটানা খুব খারাপ জিনিস। আমি অনেক বলে ফেলেছি। আমার ডায়েরিও শেষ হয়ে এসেছে।”
“আমি দেখতে পাচ্ছি ডায়েরির কয়েকটা পাতা এখনও বাকি আছে। বাকি গল্পটাও বলে ফেলুন।”
“কী মুশকিল! ডায়েরিতে আর যা লেখা আছে তা তো আপনার ফেভারে নাও যেতে পারে স্যার!”
“নাই-বা গেল। এখন আর তাতে কী-ই বা আসে যায়! আপনি বলুন।”
“আপনার মতো নাছোড়বান্দা আমি আর দেখিনি মশাই! আমাকে নাস্তানাবুদ করে মারছেন! যাই হোক, উদ্ধব রায় আর বেশিদিন বাঁচেননি। মধুবনি রায় স্ট্রোকে শয্যাশায়ী। এমত অবস্থায় চতুর্ভুজ আপনাকে পাগলাগারদে ভর্তি করে দেয়। কাজটা সে খুব একটা খারাপও করেনি। ভেবে দেখবেন সে কিন্তু ভাড়াটে খুনি দিয়ে আপনাকে খুন করায়নি, খুব করুণার সঙ্গে আপনার জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিল। আপনার কিন্তু তার প্রশংসাই করা উচিত। তবে হারু কুণ্ডু নামে যে- ওয়ার্ডেন আছে তার সঙ্গে তার একটা বন্দোবস্ত হয়েছিল বটে। যদি দেখা যায় যে কোনও কারণে আপনার স্মৃতি ফিরে আসছে, তা হলে সে যেন সঙ্গে সঙ্গে তা চতুর্ভুজকে জানায়। কারণ, আপনার স্মৃতির প্রত্যাবর্তন তার পক্ষে নিরাপদ নয়।”
“তারপর কী হল?”
“তারপর দু’বছর নিশ্চিন্তে কেটে গেল। আপনি পাগলাগারদে ভোলানাথ হয়ে আছেন, চতুর্ভুজ নিষ্কণ্টক, কোনও অশান্তি ছিল না। তারপরই একটা ছোটখাটো গন্ডগোল করে ফেললেন আপনি। পাগলাগারদের সুপার ইন্দুমতী মিত্র আপনার প্রতি অপত্যস্নেহবশত একদিন বাড়ি থেকে ক্ষীরপুলি তৈরি করে এনে আপনাকে ডেকে খাইয়েছিলেন। তখন সেই ক্ষীরপুলি খেতে খেতে আপনি বলে ফেলেছিলেন, আমার মা-ও ঠিক এরকম ক্ষীরপুলি বানাত। তখন ইন্দুমতী জানতে চান, আপনার মা আর কী কী বানাতেন। আপনি তখন পাটিসাপটা, গোকুলপিঠে আর আসকে পিঠের নাম করেছিলেন। আপনার দুর্ভাগ্যক্রমে হারু কুণ্ডু এই কথোপকথন শুনতে পায় এবং প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই চতুৰ্ভুজকে জানায় যে, আপনার স্মৃতি ফিরে আসছে। আর সেই রাতেই আপনি টারজানের কায়দায় পাগলাগারদ থেকে পালান। এইবার কি আমি একটু দম নিতে পারি?”
“পারেন। আপনার আর কিছু বলার নেই তো!”
পলাশবরণ সেই মার্কামারা ফ্যাকফ্যাক করে দন্তহীন হাসিটা হাসল। তারপর বলল, “এবারই তো ম্যাও বেরোবে স্যার! আমাকে দেখতে বোকাবোকা লাগে বটে, তবে আমি তত বোকা নই কিন্তু!”
“আপনাকে আমার বোকা বলে মনে হয়নি তো!
“মনে না হলেই ভাল। কারণ আমি সত্যিই বোকা নই। আসল কথাটা হল, আপনি একজন ধুরন্ধর বুদ্ধিমান লোক। আমার অনুমান, আপনি টের পেয়েছিলেন যে, চতুর্ভুজের হাত থেকে আপনার পরিত্রাণ নেই। বিশেষ করে উদ্ধব রায় সম্পত্তির অর্ধেক আপনাকে লিখে দেওয়ায় সমূহ বিপদ উপস্থিত। আপনি যতই বুদ্ধিমান বা শক্তিমান হোন না কেন, চোরাগোপ্তা মার ঠেকানো আপনার কর্ম নয়। গুপ্তঘাতকরা আপনাকে নাগালে পাবেই। তাই রিং থেকে পড়ে যাওয়ার পরই আপনি সিদ্ধান্ত নেন, স্মৃতিভ্রষ্টের পার্ট করে গেলে হয়তো পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে। আপনার একটি অমিত শক্তিশালী মস্তিষ্ক আছে। আছে নিজের মনের ওপর অসীম নিয়ন্ত্রণ। তাই আপনি নিজের ওপর স্বতঃঅনুজ্ঞা আরোপ করলেন, যাকে আমরা অটো সাজেশন বলি। নিজেকে মোটিভেট করতে লাগলেন স্মৃতিহীন হয়ে যাওয়ার জন্য। এবং তা হয়েও গেলেন। মেমরি ডিস্ক সাদা হয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু সব মেমরিই লেটেন্ট মেমরি বা হিমায়িত স্মৃতি হয়ে থেকেও গেল। খুব অতিমানবীয় মানুষ হলে এটা পারা যায়। এমনিতে স্মৃতিহীন, কিন্তু ইচ্ছে করলেই স্মৃতিকে রিকল বা জাগ্রত করতে পারার ক্ষমতা।”
“আমি অতিমানব নই।”
“আপনি সাদামাটা মানুষও তো নন স্যার!”
“তা হলে আমি কে?”
“আপনি দ্বিতীয় তরঙ্গের মানুষ। এই পৃথিবীতেই বাস, কিন্তু ভিন্ন কম্পাঙ্কে। ভিন্ন সিভিলাইজ়েশনে। ভিন্ন মাত্রায়।”
“আচ্ছা, এখানে কি একটু জল পাওয়া যাবে? আমার খুব তেষ্টা পেয়েছে।”
পলাশবরণের চোখ গোল থেকে যেন আরও গোলাকার হয়ে গেল, “কী পেয়েছে বললেন?”
“তেষ্টা!”
“তেষ্টা! তেষ্টা পাবে কেন? তেষ্টা পাওয়ার তো কথাই নয়! মরার পর আবার তেষ্টা কিসের!”
“আমার যে খিদেও পাচ্ছে! আজ সারা দিন আমার কিছু খাওয়াও হয়নি।”
“আশ্চর্যের বিষয় মশাই! খুবই আশ্চর্যের বিষয়! তা হলে কি আপনি ঠিকমতো মরেননি? এ তো মুশকিল হয়ে গেল স্যার! ঠিকমতো না মরেই আপনার পরলোকে আসাটা মোটেই বিবেচকের মতো কাজ হয়নি! ভাল করে ভেবে বলুন তো, আপনার কি সত্যিই খিদে এবং তেষ্টা পেয়েছে, নাকি ওটা খিদে আর তেষ্টার স্মৃতি! অনেক সময়ে লৌকিক স্মৃতিও তঞ্চকতা করে কিনা! অনেক সময়ে মনে হয় খিদেতেষ্টা পেয়েছে, কিন্তু আসলে হয়তো পায়নি! সদ্য-সদ্য মরেছেন তো, প্রথম প্রথম ওরকম ভুলভাল হতেও পারে! শত হলেও অনেকদিনের অভ্যাস কিনা!
ইগল একটু ভাবল, তারপর বলল, “না পলাশবরণবাবু, আমার সত্যিই খুব খিদে আর তেষ্টা পেয়েছে। স্মৃতিটিতি নয়।”
পলাশবরণ মুখে আফসোসের একটু চুকচুক শব্দ করে বলল, “তবে তো খুবই মুশকিলে পড়া গেল দেখছি! গাড়ি আবার গ্যারাজে ঢোকাতে হবে। কী যে করেন আপনারা! মরাটাও ঠিকমতো মরতে পারেন না! পটাই যে আপনাকে কুড়ুলের কোপটা মেরেছিল, তাতে তো আপনার মরবারই কথা ছিল মশাই! সুপারম্যানদেরও তো মৃত্যু আছে স্যার। কিন্তু কী আর করা! যদি সত্যিই না মরে থাকেন তা হলে যান হামাগুড়ি দিয়ে আবার খোলসটার মধ্যে ঢুকে পড়ুন গে। যত্ত সব উদ্ভটে ব্যাপার!”
ইগল বাধ্য ছেলের মতো হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে নিজের শরীরটার মধ্যে ঢুকে পড়ল।
