এক
চোরেক্কে চোর বললে যা বোঝায় গনা হচ্ছে তাই। তার না আছে স্যাঙাত, না আছে ইয়ারবন্ধু, না আছে বাপ-মা বা আর কেউ। যাকে একাচোরা বলে সে ঠিক তাই। একা এক চোর। শহরে চোরের অভাব নেই, মেলা চোর। বড় চোর, ছোট চোর, ছ্যাঁচড়া চোর, ছিঁচকে চোর, কিন্তু গনাকে কেউ চোর বলেই গণ্য করে না। গনা বড়জোর ঘটিবাটি বা বদনা চুরি করে। তাও পুলিশের হাতে প্রায়ই ধরা খায়। আর পুলিশও লোক চেনে বলে তাকে একবারও হাজতে পোরেনি, দু’চারটে চড়চাপড় দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। চোর হিসেবেও তার তেমন প্রেস্টিজ নেই।
তা বলে গনা যে খুব খারাপ আছে, তাও নয়। আসলে তার একটা মাসি আছে, তিন কুলে ওই একটা মাসিই তার সম্বল। আর মাসির অবস্থা তেমন খারাপও নয়। তার মেসো বিজয় মল্লিক মস্ত মহাজন। টাকার লেখাজোখা নেই, কিন্তু মুশকিল হল, মেসো গনাকে দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। দেখলেই কুকুর বেড়ালের মতো দূরদূর করে তাড়া করেন। তবে মাসির একটু মায়াদয়া আছে তার প্রতি। শত হলেও নিজের বোনপো বলে কথা! নিতান্তই মাথা নেই বলে ছেলেটার লেখাপড়া হল না। তা বলে তো আর না খেতে পেয়ে মরতে দেওয়া যায় না! মেসো দুপুরবেলায় বাড়িতে থাকেন না, ওই সময়ে গনা গিয়ে পাছদুয়ার দিয়ে মাসির বাড়িতে ঢোকে, পিছনের বারান্দায় বসে পেট পুরে ডাল ভাত, মাছ, তরকারি সাঁটিয়ে আসে। দু’দশটাকা হাতখরচাও দেয় মাসি, আর তাতে গনার একরকম চলে যায়।
মাসির দুটো ছেলে, বাবলু আর গাবলু। দু’জনেই ভাল স্কুলে পড়ে, ফটাফট ইংরেজিতে কথা কইতে পারে, পরীক্ষায় ফার্স্ট সেকেন্ড হয়। তারা দু’জন কিন্তু গনাকে অপছন্দ করে না। বাবলু তো তাকে বলে, “গনাদা, ভাল চোর যদি হতে চাও তা হলে তোমাকে মাস্টারমাইন্ড হতে হবে। ছোটখাটো চোর হয়ে লাভ কী! দাঁড়াও, তোমাকে গুগল সার্চ করে দেখিয়ে দিচ্ছি হাউ টু বি এ গুড থিফ।” এই বলে মাঝেমধ্যে তাকে মোবাইল ঘেঁটে গুগল থেকে পড়ে শোনায়। গনা খুব মন দিয়ে ব্যাপারটা বুঝবার চেষ্টাও করে। কিন্তু সবটা তার মাথায় ঢোকে না।
আর গাবলু বলে, “দূরদূর। চোরটোর খুব ছোটখাটো জিনিস, হতে হলে ডন হয়ে যাও। এটা ডনদেরই যুগ। ডনকে সবাই খাতির করে।” শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে গনা। অত বড় কিছু হওয়ার মতো এলেমই তার নেই।
যতীন ঘোষ হাই স্কুলে অঙ্কের জাঁদরেল মাস্টার। খুব নামডাক। যতীনবাবু সোনার ডিবে থেকে নস্যি নেন বলে শোনা ছিল গনার। কথাটা কয়েছিল বটে ভোলা অধিকারী। হেঁড়ে গলায় কেত্তন গেয়ে মাধুকরী করে বেড়ায়। তা সেদিন যতীনবাবুর বাড়িতে গিয়েছিল, অনেকক্ষণ গলাবাজি করেও জুটেছিল আধ কৌটো মোটা, পোকায় ধরা চাল। তাই রাগ করে বেশ হেঁকে পাঁচজনকে শুনিয়েই বলেছিল, “অমন কিপ্পুস লোক হয় না বাপু, কিন্তু বারফট্টাই আছে খুব। সোনার ডিবেয় নস্যি নেয়!” সেইটে শুনে ফেলেছিল গনা। যতীনবাবু ভাবে ভোলা মানুষ, সারা দিন অঙ্কের চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকেন। দিনরাত্তির কোথা দিয়ে চলে যায় টেরই পান না। এমন মানুষের নস্যির ডিবে চুরি করা তো জলের মতো সোজা কাজ। কেন যে এই সোজা কাজটা এতদিন কেউ করেনি, সেটাই ভেবে কূল পায় না গনা। তা ছুটির দিনে যতীনবাবু দুপুরবেলা খাওয়ার পর তাঁর জানালার ধারের চেয়ারটায় বসে একটু ঝিমোন, সামনেই টেবিলের ওপর নস্যির ডিবেটা হেলাফেলায় রাখা থাকে। জানালা দিয়ে হাত বাড়ালেই একেবারে নাগালের মধ্যে। কয়েকদিন তক্কেতক্কে থেকে ব্যাপারটা লক্ষ করল গনা। রোববার দিন দুপুরবেলা ঝোপ বুঝে কোপ মারতে জায়গামতো হাজির হয়ে দেখল, যতীনবাবুর মাথাটা ডান দিকে কাত হয়ে আছে, নাকও যেন ঘুরঘুর করে ডাকছে বলে মনে হল। এত সোজা কাজ যে, গনার হাসিই পাচ্ছিল। সে নির্ভয়ে, বীরের মতোই তার সরু হাতখানা গ্রিলের ফাঁকে বাড়িয়ে দিয়ে একবারেই ডিবেটা মুঠোয় পেয়ে গেল। প্রায় অট্টহাসি হাসতে যাচ্ছিল সে। কিন্তু মুশকিল হল, তুমি যাও বঙ্গে কপাল যায় সঙ্গে। হাতটা টেনে নিতে যাবে, হঠাৎ খপ করে তার কব্জিটা চেপে ধরে ফেললেন যতীনবাবু। আর সেই হাতের খপ্পর থেকে হাত ছাড়ানোর মতো জোরবল যে তার নেই, এটাও সে হাড়েহাড়ে টের পেল।
যতীনবাবু তাঁর একখানা চোখ আধখানা খুলে তাকে একটু নিরীক্ষণ করলেন, তারপর একটু আদুরে গলাতেই বললেন, “তুই কে রে!”
গনা কাঁচুমাচু হয়ে বলে, “আজ্ঞে আমি হলুম গনা।”
“তুই কি চোর নাকি!”
“আজ্ঞে, অনেকটা ওরকমই।”
“তা কেমন চোর তুই! নস্যির ডিবে কি একটা চুরি করার জিনিস হল বাপু!”
ডান হাতখানা গ্রেফতার হয়ে আছে, তাই অগত্যা বাঁ হাতে মাথা চুলকোতে চুলকোতে গনা বলে, “আজ্ঞে ভুল হয়ে গেছে।”
যতীনবাবু সখেদে বললেন, “এ যে বড় ঘেন্নার কথা রে! যে-চোর নস্যির ডিবে চুরি করে, লোকসমাজে কি তার মুখ দেখানো উচিত!”
গনা যতীনবাবুর সঙ্গে একমত হয়ে বলল, “আজ্ঞে তা বটে। আর চুরি করব না মশাই!”
যতীনবাবু অবাক হয়ে বলেন, “চুরি করবি না! চুরি করবি না কেন? দেশের আগাপাশতলা যদি চোর হয় তা হলে তুই আর চোর হয়ে কী এমন দোষ করলি! তবে বিদ্যেটা মন দিয়ে শিখবি তো। আর নজরটাও তো একটু উঁচু হওয়া দরকার! নস্যির ডিবের মতো এলেবেলে জিনিস চুরি করলে যে ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ। যে-বস্তুর রিসেল ভ্যালু নেই সেই জিনিস চুরি করে কোন আহাম্মক! তুই কি নস্যি নিস?”
“আজ্ঞে না। শুনেছি নস্যি নিলে হাঁচি হয়।”
“তা হলে চুরি করছিলি কেন?”
“আজ্ঞে, কানাঘুষো শুনেছি, ওটা নাকি সোনার ডিবে।”
যতীনবাবু সখেদে বলেন, “ছ্যা ছ্যা, সোনা আর পেতলের তফাত বুঝিস না, তুই তো নিজের নাম ডোবালি!”
আত্মগ্লানিতে গনার চোখে জল এসে যাচ্ছিল। ধরা গলায় বলল, “ওই জন্যই তো আমার কিছু হল না মশাই।”
যতীনবাবু তার হাতটা মায়াভরে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “আহা, অত ভেঙে পড়ছিস কেন? বলি লেখাপড়া কিছু শিখেছিস? ছয়ের ঘরের নামতা বল তো!”
“আজ্ঞে, ছয়েকে ছয়, ছয় দুগুনে বারো, তিন ছয়ে আঠেরো, চার ছয়ে চব্বিশ …”
“ওরেব্বাস রে! তোর তো পেটে বিদ্যে আছে দেখছি! আয় তো, ঘরে আয়, তোকে একটু বাজিয়ে দেখি।”
তা বাজিয়ে দেখলেনও বটে যতীনবাবু। কোথায় থাকিস, কী করিস, পেট চলে কী করে, বাড়িতে কে কে আছে, এই সব। গনার লুকোছাপা কিছু নেই, সব গড়গড় করে বলে দিল। খুব মন দিয়ে শুনলেন যতীনবাবু তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ওই মাসির আদরেই তোর কিছু হচ্ছে না, বুঝলি! মাসি পেট পুরে খাওয়ায় বলেই তোর খিদে হচ্ছে না। আর খিদে না হলে কি চোরের মাথা খোলে! নাকি হাত পা সচল হয়! খিদে চাড়ি মারলে দেখবি, অনায়াসে বড় বড় চুরি করে ফেলতে পারবি। তখন আর নস্যির ডিবে কিংবা ঘটিবাটির দিকে নজরও পড়বে না।
কথাগুলো ন্যায্য বলেই মনে হল গনার। জ্ঞানী মানুষের সঙ্গ করলে কত কী শেখা যায়! তাই সে পরদিন থেকে মাসির বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিল। খিদেটাকে চাগিয়ে তোলা দরকার। খিদেটা বেশ জম্পেশ হয়ে উঠলে মাথার বোঁদা ভাবটা মরে গিয়ে বুদ্ধি ঠেলে উঠবে। তখন আর তাকে পায় কে?
তা খিদেটাও হল বটে। দু’দিন দাঁতে দাঁত চেপে উপোস থেকে তিন দিনের দিন দেখল, পেটের মধ্যে যেন বাঘের হাঁচড় পাঁচড়। মাথা ঝিমঝিম। হাত পায়ে খিল ধরার মতো ভাব। বুদ্ধির ঝিকিমিকির দেখা নেই। উল্টে মাথাটা যেন আরও ভোম্বল হয়ে গেছে। বিকেলের দিকে আর পেরে উঠল না গনা। ঘর থেকে বেরিয়ে শহরের উত্তর দিকটার জঙ্গুলে জায়গাটায় গিয়ে ঢুকল। এখানে কয়েকটা পেয়ারাগাছ আছে। বুনো কুল আর বন করমচার গাছেরও সন্ধান জানা আছে তার। শীতকালে খুব ফলন হয়। ইচ্ছেমতো বন করমচা আর বুনো কুল খেয়ে আগে পেটের হাঁচড় পাঁচড় সামাল দিল সে। তারপর কয়েকটা ডাঁসা পেয়ারা নিয়ে বসল বিশ্বাসদের ভাঙা ভূতুড়ে বাড়িটার চাতালের একধারে। দিব্যি নিরিবিলি জায়গা। এখানে বসে নিজের ভবিতব্য নিয়ে ভাববার খুব সুবিধে। তা ভাবছিলও সে। একমনে পেয়ারা খেতে খেতে ভবিষ্যতের কর্মসূচি ঠিক করার চেষ্টা করছিল। এমন সময়ে অবাক হয়ে দেখল, বিশ্বাসদের পোড়ো বাড়ির ভিতর থেকে একজন গোলগাল চেহারার মাঝবয়সি লোক বেরিয়ে এল, গায়ে ফতুয়া, পরনে হেঁটো ধুতি, মাথাজোড়া গোলাপি রঙের টাক, ভুঁড়ো গোঁফ। হাতে একটা পেতলের ঘটি। ঘটি থেকে জল ঢেলে একমনে পা ধুতে লাগল। গনাকে তেমন গ্রাহ্যই করল না।
গনা বেশির ভাগ লোককেই সমীহ করে, আগ বাড়িয়ে কারও সঙ্গে কথাটথা কইতে যায় না। সে মুখ্যুসুখ্যু বোকাসোকা লোক, তার কোন কথায় কে ভুল ধরে তার তো ঠিক নেই। তবে আজ লোকটাকে দেখে সে এত অবাক হল যে, কথা না কয়ে পারল না। আগে গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে জানান দিয়ে নিল, তারপর যথাসাধ্য মোলায়েম গলায় বলল, “আজ্ঞে, আপনি কি এখানে নতুন এসেছেন?”
লোকটা তার দিকে তাচ্ছিল্যের চোখে চেয়ে বলে, “নতুন এসেছি মানে! আমি হলুম ঝিকু বিশ্বেস, আর এ হল আমার সাত পুরুষের ভিটে। নতুন আসতে যাব কেন হে!”
“আজ্ঞে, আগে কখনও দেখিনি তো! আর এ তো ভূতুড়ে বাড়ি, এখানে তো কারও থাকার কথা নয়!”
লোকটা ভারী অসন্তুষ্ট হয়ে বলে, “তা হলে আমি আছি কী করে?”
“আজ্ঞে, সেইটেই তো জানতে চাইছি মশাই। বাড়ির তো একটাও কড়ি বরগা বা ছাদ আস্ত নেই, ঘরগুলোয় জঙ্গল গজিয়ে গেছে, তার মধ্যে বিছুটিপাতাও আছে, সাপখোপ আর পোকামাকড়ের আড্ডা। ভূতও আছে বলে শুনেছি।”
লোকটা তেরিয়া হয়ে বলে, “শুনলেই হল! আমি তো বাপু দিব্যি হাত পা ছড়িয়ে আরামে এখানে এতকাল ধরে বসবাস করছি। আমার তো কোনও অসুবিধে হচ্ছে না বাপু!”
“তাই তো দেখছি মশাই! আপনি ধন্যি মানুষ।”
“আরে বাপু, সব কিছুর সঙ্গেই মানিয়ে গুছিয়ে নিতে হয়, নইলে দুনিয়ায় কি টিকে থাকার উপায় আছে?”
গনা একমত হয়ে বলে, “তা অবিশ্যি ঠিক। তা হলে কি এখন থেকে এখানেই থাকা হবে?”
“থাকা হবে মানে! আমি তো বহুকাল ধরেই এখানে আছি। তা তুমি এত খতেন নিচ্ছ কেন হে বাপু? মতলব কী তোমার?”
“আজ্ঞে মতলব কিছু খারাপ নয়। এলাকার পাঁচজনের খবরাখবর নেওয়াটা কি খারাপ কিছু?”
“আমি গায়েপড়া লোক বিশেষ পছন্দ করি না। আজকাল যা চোরছ্যাঁচড়ের উপদ্রব! কাউকে বিশ্বাস নেই।”
গনা কোঁত করে মুখের পেয়ারার ছিবড়েটা গিলে ফেলে বলে, “তা অবিশ্যি ঠিক। তবে কিনা সত্যি কথা বলতে গেলে বলতে হয় যে, এই বাড়িতে তো চোরের অম্বুবাচী। নিতান্ত নির্লজ্জ, হাড়হাভাতে দু’কান কাটা, নিচু নজরের চোরও এই পোড়োবাড়ির ত্রিসীমানায় পা দেবে না।
লোকটা তেরিয়া হয়ে বলে, “বললেই হল! কেন হে, আজকালকার চোরদের কি পাখা গজিয়েছে নাকি যে বিশ্বেসবাড়িতে পা দেবে না! বলি বিশ্বেসরা কমতি যায় কিসে? পোড়োবাড়ি তো কী হয়েছে! মরা হাতি লাখ টাকা।”
গনা অবাক হয়ে বলে, “তবে কি মশাই, এই বাড়িতে গুপ্তধন টন আছে!”
লোকটা গম্ভীর হয়ে বলে, “থাকলেই বা, তোমার সেই খবরে কী দরকার?”
“না, এই সাপখোপ, বিছুটিপাতা, ভূতপ্রেতের মধ্যে তো আর কেউ সাধ করে থাকে না! নিশ্চয়ই গভীর কোনও কারণ আছে!”
লোকটা এবার একটু নরম হয়ে বলে, “আরে না না, গুপ্তধন টন কিছু নেই বাপু, এদিকে নজর দিয়ে কোনও লাভ হবে না।”
এবার গনা নিশ্চিন্ত মনে পেয়ারায় আর একটা কামড় বসিয়ে বলে, “তা বললে হবে কেন মশাই! গুহ্য কারণ না থাকলে কেউ কি এই বাড়ির মাটি কামড়ে পড়ে থাকে! আমি কেমন যেন গুপ্তধনের গন্ধ পাচ্ছি।”
লোকটা এবার কাহিল গলায় বলে, “ওরে বাপু, গুপ্তধন টন নয়, আমার আর যাওয়ার জায়গা নেই বলে এখানে এতকাল মাটি কামড়ে পড়ে আছি।”
“তা কতদিন হল বলুন তো!”
লোকটা মন দিয়ে কড় গুনতে লাগল। তারপর বিড়বিড় করে কী সব হিসেব নিকেশ সেরে নিয়ে বলল, “এই একশো সাতান্ন বছর পাঁচ মাস তেরো দিন।”
গনা চোখ বড় বড় করে বলে, “একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে যে মশাই! একটু কমসম করলে হয় না!”
লোকটা বেজার মুখে বলে, “কম করার উপায় নেই হে, এ একেবারে অঙ্কের হিসেব।”
“তা হলে কি বলতে চান আপনি মনিষ্যি নন!”
“কেন আমাকে দেখে তোমার মনিষ্যি বলে মনে হচ্ছে না নাকি!”
“তাও হচ্ছে বটে। কিন্তু বড্ড ধন্দে ফেলে দিয়েছেন। দেড়শো বছর ধরে মানুষের বেঁচে থাকাটা তো কাজের কথা নয় কিনা। সবাই যদি অবিবেচকের মতো দেড়শো-দুশো বছর বাঁচতে শুরু করে তা হলে চারদিকে যে বুড়োবুড়িদের গাদি লেগে যাবে, মশাই!”
ঝিকু বিশ্বাস একটা আপসরফায় আসার মতো ভালমানুষি গলায় বলল, “রোসো বাপু, তুমি কথাটা ঠিক বুঝতে পারছ না। নিয়মমতো মানুষকে যে মরতে হয় সে কি আমি জানি না নাকি! তা সেই হক্কের মরা আমি তো কবেই মরেছি। শরীর-টরীরও নেই বাপু।”
গনা চোখ বড় বড় করে বলে, “তা হলে কি আপনি সত্যিই ভূত নাকি মশাই? তা হলে তো বড় ভয়ের কথা হল!”
ঝিকু বিশ্বাস একটু নিরাশ গলায় বলে, “তা তো হলই, কিন্তু তোমার মধ্যে তো ভয় পাওয়ার কোনও লক্ষণই দেখছি না হে! কী দিনকালই যে পড়েছে! চোখের সামনে ভূত দেখেও একটা লোক নির্বিকার মুখে নির্লজ্জের মতো পেয়ারা খেয়ে যাচ্ছে!”
গনা একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলে, “ভয় যে হচ্ছে না তা কিন্তু নয় মশাই। আসলে হয়েছে কী, দু’দিন ধরে উপোস থাকায় আমার ভয়টা ঠিক যেন ঠেলে উঠতে পারছে না! ভয়ভয় ভাবটা হচ্ছে বটে, কিন্তু তেমন যেন জম্পেশ হয়ে উঠছে না! বুঝতে পারছি, ভয় পাওয়াটা উচিত, কিন্তু পেটে খিদে থাকলে সব কেমন উল্টোপাল্টা হয়ে যায়।”
ঝিকু বিশ্বাস বিরক্ত হয়ে বলে, “থাক, তোমাকে আর ধ্যাস্টামো করতে হবে না বাপু।”
গনা বলে, “যদি কিছু মনে না করেন তা হলে একটা কথা কই, আপনার এই দৃশ্যমান হয়ে ঘুরে বেড়ানোটা কি ঠিক হচ্ছে মশাই! আপনি মরেছেন, শ্রাদ্ধশান্তিও নিশ্চয়ই হয়ে গেছে! তারপরও আপনার এইভাবে প্রকট হয়ে থাকাটা কি ঠিক?”
লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “তা তো ঠিক কথাই বাপু। এ হল ওই কিম্ভূত আর বিটকেল লটকার কাজ। এতকাল দিব্যি বায়ুভূত হয়ে ছিলুম, কেউ আমাকে দেখতেও পেত না। হঠাৎ কোথা থেকে যে ওই জাম্বুবানটা এসে হাজির হল কে জানে। ফস করে গায়ে একটা স্প্রে-র মতো কী যেন ছিটিয়ে দিল। সেই থেকে আমি প্রকট হয়েছি, লোকে আমাকে দেখতে পাচ্ছে। এই তো সেদিন, জটেশ্বরের মা কাঠকুটো কুড়োতে এসে আমাকে দেখতে পেয়ে ‘ভূত, ভূত’ করে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করে ছুটে পালিয়ে গেল। কী মুশকিল বলো তো! এই তো তুমিও আমাকে দিব্যি দেখতে পাচ্ছ, কথাটথাও কইছ, কিন্তু তাতে আমার যে ঝামেলা বাড়ল তা আর কে বুঝছে বলো! ফলিত হয়ে থাকার ফলে এখন রাজ্যের লোকের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।”
পেয়ারার শেষ টুকরোটা মুখে ফেলে চিবোতে চিবোতে গনা বলে, “তা এই লটকাটা কে মশাই?”
ঝিকু বিশ্বেস অত্যন্ত বিরক্তির গলায় বলে, “তার কথা আর কোয়ো না। কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে তা কে জানে। ওই কুসুমপুরের জলার ওদিকটায় কোথায় যেন ঘাপটি মেরে আছে। কী সব যন্ত্রপাতি দিয়ে দিনরাত খুটখাট করে। সে নাকি এই পৃথিবীর মনিষ্যি নয়। গ্রহান্তরের জীব। কে জানে বাপু কী! তবে লোক মোটেই সুবিধের নয়। আমার কী সর্বনাশটাই করল বলো তো!”
“তাতে কি আপনার খুব অসুবিধে হচ্ছে মশাই?”
“অসুবিধে হবে না! এই যে লোকে দেখতে পাচ্ছে, সন্দেহ করছে, এসব কি আর ভাল? তার ওপরে আগে আমাকে সাপে কামড়াত না, বিছে হুল দিত না, মশামাছি গায়ে বসত না। আজকাল আমাকে সাপে কামড়ায়, বিছে হুল দেয়, মশামাছি গায়ে বসতে চায়।”
“আপনার কি লাগে?”
ঝিকু বিশ্বেস আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “তা লাগে না বটে। কিন্তু এরাও যে আমাকে দেখতে পাচ্ছে এটাই চিন্তার কারণ। তবে লটকা বলেছে যে, মাসখানেক বাদে গা থেকে স্প্রেটা উবে গেলে নাকি আবার আমি গায়েব হয়ে যাব। তা হলে বাঁচি বাবা!
গনা মাথা নেড়ে বলে, “আজ্ঞে, কথাটা ঠিকই। গায়েব হয়ে থাকতে পারলে বিস্তর সুবিধে। নিশ্চিন্ত মনে কাজকর্ম করা যায়।”
ঝিকু বিশ্বেস গম্ভীর মুখ করে একটা ‘হুঁ’ দিয়ে তার ঘটিখানা হাতে নিয়ে বাড়ির ভিতরে সেঁধিয়ে গেল।
গনা এলিয়েনদের কথা খুব জানে। বাবলুর কাছে গল্প শুনেছে। তারা নাকি রকেটে চেপে অন্য সব গ্রহ থেকে আসে। তাদের মেলা ক্ষমতা। হয়কে নয় করতে পারে, নয়কে হয়। তেমনই একজন এলিয়েন যদি কুসুমপুরের জলায় এসে ঘাপটি মেরে থেকে থাকে, তবে তো সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার! একবার গিয়ে ধরে পড়লে তার ভাগ্যই হয়তো বদলে যাবে। হয়তো তাকে দেখেই এলিয়েনটা বলে উঠবে, ‘এই তো! তোমাকেই তো আমি খুঁজছিলুম! এতদিন কোথায় ছিলে বলো তো! এসো তোমার একটা হিল্লে করে দিই।’— এই বলে হয়তো স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে তার মাথার খুলিটা খুলে খানিকটা একস্ট্রা ঘিলু ঢুকিয়ে দিল। আর গনা রাতারাতি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বসল। কিংবা হয়তো ফস করে এমন একটা ইনজেকশন দিয়ে দিল যাতে গনা দেখ না দেখ হয়ে উঠল শিবু প্রতিহারের মতো ধুরন্ধর চোর। কিংবা হাবু বৈরাগীর মতো দুর্ধর্ষ ডাকাত! কিংবা এমনও হতে পারে যে, তাকে পছন্দ হয়ে যাওয়ায় নিজেদের গ্রহেই নিয়ে গেল। সেখানে গেলে কি আর গনা এই গনা থাকবে! চুরি চোট্টামি করে এরকম নিচ্ছন জীবন কাটাবে আর! নতুন দুনিয়ায় গিয়ে পড়লে হয়তো দেখবে, সেখানে দোবেলা পোলাও বিরিয়ানির আয়োজন, দালানকোঠায় নরম গদির বিছানায় ঘুম, নিত্য নতুন জামা, নিত্য নতুন জুতো, চোখে কালো চশমা পরে ডাঁটে ঘুরেঘুরে বেড়ানো। এমনও হতে পারে, এলিয়েনরা তাকে নিজেদের গ্রহে নিয়ে গেল না, কিন্তু হয়তো একটা পরশপাথর কিংবা জিনভরা পিদিম দিয়ে গেল! সে শুনেছে এলিয়েনদের অসাধ্য কিছু নেই। যাই হোক, কিছু একটা হলেই হল, এরকম লাঞ্ছনার জীবন তো আর কাটাতে হবে না!
এইসব ভেবে তার মাথাটা বেশ গরম হয়ে রইল। রাতে ভাল ঘুমই হল না। পরদিন আর উপোসের রাস্তায় গেল না গনা। মাসির বাড়িতে পেট পুরে খেয়ে সে একটু সাজগোজ করল। অবশ্য সাজগোজ করার মতো তার বিশেষ পোশাকটোশাক নেই। তবে একটা কালো প্যান্ট আছে তার, প্রায় নতুনই বলা যায়, গতবার পুজোয় মাসি দিয়েছিল, প্রাণে ধরে এতকাল বিশেষ পরেনি, আজ সেটা পরল। সবুজ জামাটা পরশুদিনই কেচেছে, আজ সেইটা গায়ে দিল। আর এলিয়েনবাবুকে ইম্প্রেস করার জন্য লাল মাফলারটাও গলায় জড়িয়ে নিল। মনে হল সাজগোজটা বেশ ভালই হয়েছে, এলিয়েনবাবু খুব একটা অপছন্দ করবেন না তাকে। তারপর ভরদুপুরে কুসুমপুরের জলার রাস্তা ধরল সে। জায়গাটা তার অচেনা নয়। অনেকবার জলা থেকে মাখনা আর পদ্মফুলের বীজ তুলতে এসেছে। মহাজনরা ভাল দামে কিনে নেয়। কখনও চুনো মাছ ধরতে কি শাপলা তুলতেও আসতে হয়েছে। পেটের দায়ে কত কী করতে হয় মানুষকে!
জায়গাটা শহর থেকে বেশ অনেকটাই দূর। পৌঁছোতে একটু বেলা হয়ে গেল। জলাটা পেল্লায়, শীতকাল বলে জল অনেকটাই কমে গেছে। জলার মাঝখানটায় লম্বামতো মস্ত একটা চর জেগে উঠেছে। তাতে বিস্তর আগাছার জঙ্গল। একধারে বাঁশঝাড় আর বনভূমি। গনা জলার ধারে দাঁড়িয়ে একটু ইতিউতি দেখছিল। সব কাজই হিসেবনিকেশ করে করতে হয়। এই জলার ভিতরেই কি লটকাবাবু থাকেন? নাকি ওই জঙ্গলের মধ্যে? কেমন মানুষ তিনি? গনাকে কি গেরাহ্যি করবেন? কিছুই আন্দাজ করতে পারছিল না সে। তবে দাঁড়িয়ে থেকে তো লাভ নেই। সে প্যান্ট গুটিয়ে হাঁটুজলে নেমে পড়ল। তারপর জল পেরিয়ে নয়া চরটার বুকসমান আগাছার জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। তারপর মৃদুস্বরে “লটকাবাবু কি বাড়িতে আছেন? লটকাবাবুকে কি এখানে পাওয়া যাবে?” বলতে বলতে এগোতে লাগল। চারদিকে তীক্ষ্ণ নজর। আগাছার জঙ্গলের ভিতর হাঁটা ভারী শক্ত। সরুসরু বেতের মতো গাছপালা ছিপটির মতো গায়ে লাগে, কাঁটায় হাত-পা ছড়ে যায়, পিঁপড়ে আর নানা পোকামাকড়ের কামড় তো আছেই। কিন্তু উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে এসব তুচ্ছ অসুবিধেকে গ্রাহ্যই করছিল না সে। ভয়ভয় করছে, বুকের ভিতর গুড়গুড় করছে, তেষ্টা পাচ্ছে। বিস্তর শামুক, দু’তিনটে কচ্ছপ আর কয়েকটা ধূর্ত শেয়াল ছাড়া আর কারও দেখা পেল না সে। তবে চিন্তা নেই। সে ফের জল পেরিয়ে কুসুমপুরের জঙ্গলে ঢুকে পড়ল।
কুসুমপুরের জঙ্গলে আগে বাঘের আস্তানা ছিল। এখন বাঘের কথা শোনা যায় না। তবে বনবেড়াল, ভাম, বাঘডাশা, দু’চারটে হায়না, শেয়াল বা সাপখোপ আছে বটে। তাদের তেমন গ্রাহ্য না করলেও চলে। খুব সাবধানে চারদিকে নজর রাখতে রাখতে জঙ্গলের মধ্যে হাঁটা ধরল গনা।
“লটকাবাবু, একবারটি কি আপনার দেখা পাওয়া যাবে?”
“লটকাবাবু কি এখন বাড়িতে আছেন?”
“লটকাবাবু কি এখন দুপুরে চাট্টি খেয়ে একটু ভাতঘুম ঘুমোচ্ছেন?”
“আজ্ঞে, আমি হলুম গে গনা, একবার কি একটু পায়ের ধুলো পাওয়া যাবে?”
“লটকাবাবু, দয়া করে কুপিত হবেন না, একটু দর্শন দিলে বড় ভাল হয়।”
এই করতে করতে জঙ্গলের মধ্যে বিস্তর ঘুরপাক খেল গনা। কোথাও লটকাবাবুর কোনও চিহ্নই খুঁজে পাওয়া গেল না। একটু কাশির শব্দ, একটু গলা খাঁকারি কিংবা একটু ঢেঁকুর তোলার শব্দ, কি চটিজুতোর আওয়াজ কিছু একটা তো শোনা যাবে! ভারী লাতন হয়ে পড়ল গনা। তা হলে কি লটকাবাবু নেই! নিজের গ্রহে ফিরে গেলেন কি! নাকি কোনও বিষয়কর্মে বেরিয়েছেন, সময়মতো ফিরবেন! যদি থেকেই থাকেন তা হলে তাঁর রকেট বা মহাকাশযানটাই বা কোথায় গেল?
ঘুরতে ঘুরতে হয়রান হয়ে গনা একটু জিরোনোর জন্য একটা মস্ত বটগাছের তলায় বসল। জঙ্গল ভারী ভাল জায়গা, নিরিবিলিতে বসে চিন্তাভাবনা করা যায়। আর এখন চিন্তাভাবনা করাটাও তার খুব দরকার। লটকাবাবুকে না পাওয়া গেলে তার পুনমূষিক হওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। ঝিকু বিশ্বাস তাকে ধোঁকা দেয়নি তো! ভূতপ্রেতকে বিশ্বাসই বা কী! এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে দুটো চোখ নিজের অজান্তেই লেগে এল তার। বেলা পড়ে আসছে, অন্ধকার হওয়ার আগেই ফেরা দরকার, এসব জানা সত্ত্বেও হয়রান শরীরে ঘুমটাকে আটকাতে পারল না গনা। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে একটা স্বপ্নও দেখে ফেলল সে। দেখল, একটা বাড়িতে সে চুরি করতে গেছে। গিয়ে দেখে গেরস্ত ভদ্রলোক গিলে করা পাঞ্জাবি আর কোঁচানো ধুতি পরে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। ভারী বিগলিত মুখ। তাকে দেখেই হাতজোড় করে বললেন, কী সৌভাগ্য! কী সৌভাগ্য! এতদিনে আমার বাড়িটা আপনার চোখে পড়ল! আসুন আসুন, এই নিন আলমারির চাবি, ইচ্ছেমতো চুরি করুন তো মশাই, প্রাণভরে দেখি। ওঃ কতকাল আপনার পথ চেয়ে বসে আছি, এই এতদিনে বুঝি আপনার সময় হল? ওমনি উল্টোদিকের বাড়ি থেকে আর একজন হেঁকে বলে উঠলেন, না না হরেন, এটা তো ঠিক হচ্ছে না হে! আমি বয়সে তোমার চেয়ে সিনিয়র, উনি আমার বাড়ি ছেড়ে তোমার বাড়িতে আগে যাবেন কেন? আমিও যে চাবির গোছা হাতে নিয়ে ওঁর পথ চেয়েই এতদিন বসে আছি! আর এ কথা কে না জানে যে, আমার বাড়িতে তোমার বাড়ির চেয়ে অনেক বেশি সোনাদানা আছে। উনি আমার বাড়িটা আগে সেরে নিন তারপর না-হয় তোমার বাড়িতেও একবার ঢুঁ মারবেন! তখন প্ৰথম গেরস্ত আর্তনাদ করে উঠলেন, না না বিজয়বাবু, তা হয় না। আমার স্ত্রী যে উনি আসবেন বলে নলেন গুড়ের পায়েস অবধি রান্না করে রেখেছেন! এমন সময়ে পাশের বাড়ি থেকে আরও একজন লোক ব্যস্তসমস্ত হয়ে বেরিয়ে এসে বললেন, আরে রাখো তোমার পায়েস, আমার বউ তো ওঁর জন্য পোলাও আর পাঁটার মাংস সেই সন্ধেবেলায় রেঁধেবেড়ে বসে আছেন, সঙ্গে আশি ভরি গয়নার পোঁটলা আর নতুন নোটে এক লাখ কড়কড়ে টাকা! আমার ছেলেমেয়েরা তো ওঁর চুরি করা দেখবে বলে রাত জেগে বসে আছে! এইভাবে তিনজনের একটা ঝগড়া পাকিয়ে উঠতে না-উঠতেই অন্য সব বাড়ির দরজা খুলে আরও সব গেরস্ত বেরিয়ে আসতে লাগলেন, ইনি বলেন ‘আমার বাড়ি আগে’, উনি বলেন ‘আমার বাড়ি আগে’। ফলে একটা বিশাল হাল্লাচিল্লা আর গোলমাল পাকিয়ে উঠল। হাতাহাতি লাগার জোগাড়! গনা ভারী ফাঁপরে পড়ে গেল। ঠিক এই সময়ে পেটে একটা খোঁচা খেয়ে ঘুমটা না ভেঙে গেলে গনার ভারী মুশকিল ছিল।
সোজা হয়ে বসে গনা দেখল, চারদিক অন্ধকার হয়ে এসেছে, তার ওপর ঘন কুয়াশা আর বেজায় শীত। আজকের পেরাসনিটা বৃথাই গেল ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিল গনা। এমন সময়ে দেখতে পেল সামনের অন্ধকারে বাতাসের ভেতর একটা সাদা টুপি ভেসে আছে। খুব ঠাহর করে দেখল গনা। আশ্চর্যের বিষয়, টুপির নীচে কোনও মাথা বা মুখ দেখা যাচ্ছে না! অথচ নিয়মমতো টুপির নীচে একটা মাথা বা মুখ থাকার কথা। তবে কি গনা ভুলভাল দেখছে? তার ঘুম কি এখনও ভাল করে ভাঙেনি!
একটু ভড়কে গিয়ে গনা কাঁপা গলায় বলে, “আজ্ঞে, আপনার আগাপাশতলা কিছুই যে দেখতে পাচ্ছি না। অন্তত চরণ দু’খানার দেখা পেলেও হত, একটু পায়ের ধুলো নিতুম আর কী।”
টুপি কোনও জবাব দিল না। যেমন ভেসে ছিল তেমনই ভেসে রইল। গনা সিঁটিয়ে বসে রইল, নড়াচড়া করারও সাহস হল না। তার কেন যেন মনে হচ্ছিল, টুপির নীচে মুখ নেই বটে, তবে যেন দুটো অদৃশ্য চোখ তাকে কষে মাপজোখ করছে। তারপর হঠাৎ টুপিটা আস্তে আস্তে ওপরে উঠে গেল। কেউ বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ালে যেমনটা হয়। যেখানে থামল সেটা বেশ অনেকটাই ওপরে। একজন প্রমাণ সাইজের মানুষের মাথা যেখানে থাকা উচিত তারও প্রায় দেড় হাত ওপরে। এলিয়েনবাবু ইচ্ছাধারী মানুষই হবেন বোধহয়, যখন-তখন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারেন। আর এলিয়েনবাবু যে বেজায় লম্বা তা বুঝতে গনার বেশি মাথা ঘামাতে হল না। এত লম্বা লোক কখনও দেখেনি গনা। তার ওপর যদি সেই অনুপাতে চওড়াও হয়ে থাকেন, তা হলে বলতে হবে এলিয়েনবাবু বেশ দশাসই মানুষ। শ্রদ্ধায় চোখে প্রায় জল এসে গেল গনার, এরকম লম্বাচওড়া না হলে কি এলিয়েনবাবুদের মানায়? এঁরা দশাসই হবেন না তো কি তার মতো মর্কট হবেন?
সে গদগদ হয়ে হাতজোড় করে বলে, “এই পোড়া চক্ষে একবার কি দর্শন পাব না? শ্রীচরণে কিছু কথাও নিবেদন করার ছিল কিনা!”
কোনও জবাব এল না। তবে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হঠাৎ একটা উত্তুরে বাতাস হুহু করে বয়ে গেল। সেই বাতাসটাই যেন গনার কানে- কানে বলে গেল, বাড়ি যাও— বাড়ি যাও
টুপিটা কখন যে গায়েব হয়ে গেল তা ঠিক ঠাহর করতে পারল না গনা। এই ছিল, এই নেই!
