ছয়
চোখ খুলল ইগল। ইহলোক না পরলোক তা বুঝতে পারল না। সে সত্যিই বেঁচে আছে না মরে গেছে তাও জানে না সে। চারদিকটা আবছায়া, জোনাকি জ্বলছে, কানে পনপন করছে মশা, পায়ে আর গায়ে বেয়ে বেড়াচ্ছে পিঁপড়ে আর পোকামাকড়। চারদিকে ঘাসপাতা, কাঁটাঝোপ, শিয়রে মস্ত একটা গাছের গুঁড়ি। উপুড় অবস্থা থেকে একটু কষ্ট করে চিত হয়ে শুতে গিয়েই সে দেখতে পেল সাদা কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে তার চারদিক। জায়গাটা চেনার উপায় নেই। সেই চেষ্টাও করল না ইগল। উঠে বসবার একটা চেষ্টা করতে গিয়ে টের পেল, তার সর্বাঙ্গে ব্যথাবেদনার শেষ নেই। তবে এইসব ব্যথাবেদনা তার এখন সয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ব্যথা মাথার পিছনে ডান দিকে। হাত দিয়ে টের পেল আঠা আঠা, বোধহয় রক্ত জমে আছে। ওখানেই কি কুডুলের কোপটা পড়েছিল? হবেও বা।
উঠে বসবার পর সে চারদিকটাকে অনুভব করার চেষ্টা করতে লাগল। ধারেকাছে বোধহয় লোকের বসতি নেই। অনেক গাছপালা। আবছায়া একটা বাড়ির ভগ্নস্তূপ। কুয়াশা আর ঠান্ডা, ঝিঁঝি আর শেয়ালের ডাক। আর নিস্তব্ধতা। পেটে খিদে আর কণ্ঠায় তেষ্টা। তবে এইসব নিয়েই ঝুবুস হয়ে বসে রইল ইগল, যেন কিছু করার নেই, কোথাও যাওয়ার নেই, এখানেই তার নকটার্ন। ওটা অন্ধকারে কী ভেসে আছে সামনে, একটু উঁচুতে! সেই টুপিটা না? সাদা ফেডোরা! টুপিটা কি কিছু বলতে চায় তাকে? কোনও সঙ্কেত! হাঁ করে চেয়ে রইল ইগল।
একটা মলিন টর্চের আলো সামনের মাঠের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা চাপা কণ্ঠস্বর খুব আকুলতার সঙ্গে কার উদ্দেশে যেন বলছে, “স্যার! স্যার! বেঁচেবর্তে আছেন কী? কাছেপিঠে থাকলে একটু সাড়া দেবেন প্লিজ়!”
গলাটা চেনা লাগল। ইগল তাই অনুচ্চ স্বরে বলে, “আপনি কি আমাকে খুঁজছেন গনাবাবু!”
গলার স্বরটা আবেগে একটু কেঁপে উঠল, “আপনি কি বেঁচে আছেন স্যার! একটু হাতড়ে দেখুন তো, আপনার ঘাড়ের ওপর মুন্ডুটা এখনও আছে কি না! পটাই গুন্ডা যে-কুডুলের কোপটা বসিয়েছিল বলে শুনেছি, তাতে তো ধড় আর মুন্ডু আলাদা হয়ে যাওয়ারই কথা! হাত-পা সব ঠিক জায়গায় আছে তো! শ্বাস পড়ছে কি? বুকে ধুকপুকুনি চলছে, নাকি বন্ধ হয়ে গেছে!”
“গনাবাবু, আমার মনে হচ্ছে আমি এখনও বেঁচেই আছি।”
“তবু সাবধানের মার নেই। আর একবার ভাল করে দেখুন দেখি, বুকের ধুকপুকুনিটা হচ্ছে তো!”
“হচ্ছে।”
“শ্বাসপ্রশ্বাস?”
“চলছে।”
“ওঃ, কী অদ্ভুতভাবে বেঁচে আছেন আপনি! কী সুন্দরভাবে বেঁচে আছেন! কী পাগলের মতো বেঁচে আছেন! কী বোকার মতো বেঁচে আছেন! একেবারে প্রহ্লাদের মতো বেঁচে আছেন! আহ্লাদের সঙ্গে বেঁচে আছেন!”
“যে আজ্ঞে!”
টর্চবাতিটা একটু এগিয়ে এল তার দিকে। তবে বড্ড নিবুনিবু আলো। “আপনি কোথায় স্যার?”
“এই তো, এখানে। ঝোপঝাড়ের মধ্যে বেকায়দায় পড়ে আছি। অত কমজোরি আলোয় কি দেখতে পাবেন?”
“আজকাল একটা টর্চবাতির কীরকম দাম হয়েছে তা কি জানেন?”
“না গনাবাবু, টর্চবাতি সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই কম।”
“কম করেও পঞ্চাশ টাকা। তবে ভারী কাজের জিনিস, কী বলেন?”
“তাই তো মনে হয়।”
“টর্চবাতি একটা বেশ বাবুগিরির জিনিসও বটে। বোতাম টিপলেই ফস করে আলোর একেবারে ভাসাভাসি কাণ্ড! হাতে নিলেই গা বেশ গরম হয়, নিজেকে কেষ্টবিষ্টুর মতো লাগে। তাই অনেকদিন ধরে একটা টর্চের ভারী শখ ছিল মশাই। কিন্তু জোগাড় আর হয় না। আজ ভাবলুম, না, একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। তেজেনের দোকান থেকে মালটা সরিয়ে ফেলেছিলুম প্রায়, কিন্তু কপাল খারাপ, নোলক পরা একটা খুকি পেনসিল কিনতে এসে ব্যাপারটা দেখে ফেলে এমন চেঁচায় যে, পালিয়ে বাঁচি না। তারপর মনে পড়ল গিরিধারী পৈতুন্ডী শিয়রে টর্চবাতি নিয়ে ঘুমোয়। তা জানালা দিয়ে লগি বাড়িয়ে মালটা প্রায় গস্ত করে ফেলেছিলুম আর কী। এমন সময়ে পৈতুন্ডীর গিন্নি পানের পিক ফেলতে কেন যে ওই জানালাটাই বেছে নিল কে জানে মশাই! আমার সর্বাঙ্গে সেই পানের পিক আর দোক্তার গন্ধ নিয়ে কী ঘিনঘিনে অবস্থা! অবশেষে হাইস্কুলের ভাবেভোলা মাস্টারমশাই ধনেশ খামরু যখন টিউশনি পড়াতে যাচ্ছিলেন তখন তাঁকে তিন বাতির মোড়ে পাকড়াও করে ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললাম, টর্চবাতিটা একটু দিন তো মাস্টারমশাই, পায়ে কী একটা কামড়াল একটু দেখি! তা উনি দিলেন। টর্চটা হাতে নিয়েই তৎক্ষণাৎ পাঁইপাঁই করে দে ছুট। আর পিছু ফিরে চাইনি। কিন্তু টর্চবাতিটার যে এমন মরণদশা তা কে জানত মশাই! আর এই সবই আপনার জন্য।”
“আমার জন্য! কী আশ্চর্য, আমার জন্য কেন গনাবাবু?”
“টর্চ না হলে এই শালবনির জঙ্গলে আপনাকে খোঁজা আর খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজা যে একই ব্যাপার মশাই!”
“আপনি যে একজন ভাল লোক তা আপনাকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম।”
“এই আপনিই যা বুঝলেন। এই কথাটা আর কারও মুখ দিয়ে আজ অবধি বেরোল না!”
“আমার মনে হয়, একদিন সবাই ঠিকই বুঝবে যে, আপনি একজন ভাল লোক।”
“স্যার, আমি আপনার গলার স্বর শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না কেন বলুন তো!”
“পাচ্ছেন না?”
“না। আপনার গলার স্বর যেখান থেকে আসছে সেই জায়গায় তো কাউকে দেখা যাচ্ছে না, মশাই! টর্চের আলো কমজোরি বটে, কিন্তু এই শর্মার চোখের জোর তো কম নয় স্যার। আমি অন্ধকারেও দেখতে পাই।”
“তা হলে বোধহয় আমাকে আর দেখতে পাবেনও না, গনাবাবু! আমার মনে হচ্ছে, আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি! না, আমি যাচ্ছি না, আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।”
গনা আর্তনাদ করে ওঠে, “সে কী, আপনি যাচ্ছেন কোথায়? পরলোকেই রওনা দিলেন নাকি?”
“না গনাবাবু, এটা ঠিক পরলোক নয় বটে, তবে মনে হয়, এটা অন্য একটা জগৎ।”
“গ্রহান্তর নাকি স্যার?”
“না গনাবাবু, গ্রহান্তর নয়। এই কাছেপিঠেই। তবে এর কম্পাঙ্ক আলাদা, তরঙ্গ আলাদা, সবকিছুই অন্যরকম। এ ভারী সুন্দর জায়গা। এই পৃথিবীর মধ্যেই আর-একটা পৃথিবী, যেমন পৃথিবীর কথা মানুষ কল্পনা করে, সেখানে যেতেও চায়, কিন্তু পেরে ওঠে না। বাতাসের ভিতরেই একটা অদ্ভুত দরজা খুলে গেছে। আমি চলে যাচ্ছি।”
একটু ব্যগ্র হয়ে গনা জিজ্ঞেস করে, “ওখানে আমার একটা ব্যবস্থা হয় না স্যার? এখানে তো তেমন সুবিধে হচ্ছে না কিনা! ওখানে গেলে একটু সুবিধে হত।”
“এই জগতের কম্পাঙ্ক আপনার সহ্য হবে না। আমি আসলে এই জগতেরই লোক। কেউ আমাকে শিশুকালে আপনাদের জগতে ফেলে এসেছিল। বিদায় গনাবাবু। আপনি কিন্তু সত্যিই ভাল লোক।”
“কিন্তু স্যার, আগামী কাল যে বাঘা যতীন ক্লাবে আপনার সংবর্ধনা!”
“তাদের আমার নমস্কার জানিয়ে দেবেন।”
“স্যার! স্যার! আমাকে ফেলে যাবেন না স্যার!”
কেউ আর সাড়া দিল না।
টর্চটা শেষ অবধি নিবেই গেল। গনা কিছুক্ষণ হাঁ করে অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইল। তারপর হতাশ মনে আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে রওনা হল।
