৮. টুপি

৮. টুপি 

একটু পরে চাচী ঘরে ঢুকে আমাকে জাগিয়ে দিল। প্রথম যে চিন্তাটা আমার মাথায় খেলে গেল তা হলো রাতটা ভালোয় ভালোয় কেটে গেলে হয়।

চাচী হেলেন বিছানার কাছে এসে আমার দিকে হেলে পড়ে। আমি ভয়ে আঁতকে উঠি মিকা না আবার ওর পায়ে চিমটি কেটে বসে। 

‘উঠে পড় জো,’ সে আমাকে ডাকে, খুশিতে ওর মুখ জ্বল জ্বল করে।

আমি তখনও পুরোপুরি জেগে উঠিনি আর চোখ রগড়ে ঘুম তাড়াতে এখনও বাকী। চাচী হেলেন বিছানার প্রান্তে বসে আমার চুল রগড়ে দেয়। 

‘জেগে উঠ জো!’ সে আবার বলে। 

‘তুমি ছোট্ট একটা ভাই পেয়েছ। বাবা হাসপাতাল থেকে ফোন করেছে।’ 

কথাটা শুনে এক মুহূর্তেই আমার ঘুম ছুটে পালিয়েছে। আমার ছোট্ট ভাইটির পৃথিবীতে পদার্পণ ঘটেছে। 

‘আমি জানতাম ছেলেই হবে,’ আমি বললাম। 

হেলেন চাচী বলে সে প্রাতরাশের জন্য কিছু ডিম সিদ্ধ করতে যাচ্ছে। বাবা শীগগীরই বাড়ি পৌঁছবে, আর আমাকে নিয়ে যাবে হাসপাতালে বাচ্চাকে দেখাতে। 

চাচী চলে যেতেই আমি শরীর বাঁকিয়ে বিছানার নিচে উঁকি মারলাম। 

‘শ্‌শ্‌শ্।’ ওকে সাবধান করলাম। 

কিন্তু কেউ নেই ওখানে। কেবল তখনই চোখে পড়ল আমার কম্বলটা আমার বিছানার পাশে মেঝের ওপর পড়ে আছে। 

একই সাথে দুটি চিন্তা আমার মাথার মধ্যে খেলে গেল। মিকা এবার জেগে উঠেছে, তাই আর ওখানে নেই ও। কিন্তু 

পুরোপুরি জেগে ওঠার আগে ও ঠিকমতো তার নিজের গ্রহ এলিওতে পৌঁছতে পেরেছে তো? আর বাড়ি পৌঁছে না থাকলে কোথায় থাকতে পারে সে? 

আরো একটা জিমিস খোয়া গেছে। আমার সাদা খরগোশটা। মিকার সাথে দেখা হওয়ার আগে আমার একমাত্র খাঁটি বন্ধু ছিল খরগোশটা। এখন কোথাও ওটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। 

মহাশূন্য পেরিয়ে ওর নিজের গ্রহে যেতে যদি নিঃসঙ্গতার সাথী হয়, তাহলে সেটা আমার ভালোই লাগার কথা। হাজার হলেও আমি তো ছোট্ট একটা ভাই পেয়েছি। 

বাথরুম শেষ করে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলাম। সেখানে চাচী টেবিলে ব্রেকফাস্ট সাজাচ্ছিল। দীর্ঘ কঠিন চিন্তার পর চাচীকে বলতে পারলাম আমার ডিমের মাথাটা কেটে দিতে, আমাদের পরিবারে কথাটা এভাবেই বলার রীতি। 

ব্রেকফাস্ট শেষে উপরতলায় গিয়ে আমার লেগো নিয়ে খেলা শুরু করেছি, ঠিক তখনই নিচে গাড়ির শব্দ কানে এলো। চাচী হেলেন আর আমি একসাথে সদর দরজার দিকে ছুট, বাবা দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বেল বাজাচ্ছে, কারণ সে চাবি নিতে ভুলে গিয়েছে। এক মুহূর্তে মিকার কথা মনে পড়ল, বেলের শব্দে কেমন আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ত সে, তারপর মনে হলো হয়তো ভীষণ গতিতে সে ছুটেছে তার সৌর মণ্ডলের দিকে। 

বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে শূন্যে ঘোরাতে থাকে। 

‘তুমি বিস্ময়কর ছোট্ট, এক ভাই পেয়েছ, জো!’ সে বলে। আগে আমার সার্ট বদলে দাঁত ব্রাশ করে আসি। তারপর তোমাকে নিয়ে হাসপাতালে যাব তোমার মাকে আর ভাইকে দেখতে।’ 

এতসব ঘটনা ঘটে যাওয়ায় আমি কাঁদতে শুরু করি। কোনোদিনই বুঝতে পারিনি সেদিন কেন কেঁদেছিলাম, ভাইয়ের জন্মের কথা শুনে যেখানে আমার এত খুশী হওয়ার কথা। বাবার বাহু বন্ধনে থেকে অঝোরে কেঁদেই চলেছি, যেন যুগ যুগ ধরে।

চাচী হেলেনকে শহর পর্যন্ত লিফ্ট দেয়া হলো, তাকে বাচ্চাটা দেখার অনুমতি দিল না, কারণ সেদিনের জন্য পরিবারের অতি ঘনিষ্ঠ জন ছাড়া কারো দেখা করার অনুমতি থাকে না। প্রথমে আমার পালা। মা হাত বাড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে, তবে আমার মনে হলো তাকে পুরোপুরি সুস্থ দেখাচ্ছে না। স্বাভাবিকের চাইতে অনেক ফ্যাকাশে লাগছে ওকে, আমার ছোট্ট ভাইটি একটা মস্ত বড় ঘরে আরো অনেক বাচ্চার সাথে একটা ছোট বিছানায় শোয়ানো। 

প্রথমবার দেখে একটু হতাশই হলাম। যেমনটা কল্পনা করেছিলাম তারচে অনেক ছোট দারুন লালমুখো আর গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। তারপর কিছু একটা ঘটে গেল। আস্তে আস্তে জেগে উঠছে ও। প্রথমে ওর শীর্ণ আঙুলগুলি নাড়াচ্ছে আর টান টান করছে। তারপর হাত চুষতে শুরু করল। এখনও কথা বলতে পারছে না, হয়তো সে ভাবতেও পারছে না। তা সত্ত্বেও মনে হলো যে অজানা পৃথিবীতে সে এসেছে তাতে সে অবাক হয়ে গেছে। মনে হয় শূন্যে কী যেন আঁকড়ে ধরতে চায়, আর তার আঙুল নাড়িয়ে আমাকে কী যেন বলতে চায়। 

মিকা আমাকে সর্বশেষ যে কথাটা বলেছিল সেটা মনে পড়ল। এখন ঠিক সেই কথাটাই বললাম আমার ভাইকে। 

‘ভাই, ভাই, হ্যাপি বার্থডে, গোটা দুনিয়া তোমার জন্য অপেক্ষা করছে!’ 

কয়েকদিন পর ছোট্টমণিকে নিয়ে মা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরল। 

তার জন্য আমি একটা সুন্দর ছবি এঁকেছিলাম, যাতে ছিল বহির্বিশ্ব থেকে পৃথিবীকে কেমন দেখায় সেই ছবি। ছবিটার ওপরে আমি লিখেছি। 

‘শুনছ, ওখানে আছ কি কেউ?’ 

প্রথম কয়েক দিন আর কয়েক সপ্তাহ ধরে বাচ্চাটা বেশি বেশি করে আমার ভালোলাগা আকর্ষণ করতে থাকে। মাঝে মাঝে এত জোরে চেঁচাত যে আমাকে কানে আঙুল দিতে হতো। মা কাছে এলে তাড়াতাড়ি শান্ত হয়ে যেত। মুখের মধ্যে একটু দুধ পড়তেই কান্না থেমে যেত। আমার বা বাবার পক্ষে ওকে শান্ত করার কোনো উপায় ছিল না। 

আমি নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তবে আমার মনে পড়ে আমার সাদা খরগোশটার খোঁজ চালিয়ে যাই আমি। জানতাম এখন যেহেতু আমার ছোট্ট ভাইকে পেয়েছি, তাই হয়তো ওটার তেমন চাহিদা নাই, তবু মনে মনে কৌতূহল জাগত ওটার কী হয়ে থাকতে পারে। 

মাঝে মাঝে মিকার খোঁজও করতাম। আমার সারা জীবন ধরেই এই কাজটা চলে আসছে। যখনই খাড়ির অবতরণ ধাপে অথবা পাহাড়ের টিলার ওপরে পাথরের পুরনো স্তূপটার ওপর বসে থাকতাম তখনই মনে পড়ত এলিও থেকে আগত সেই মাম্বোর সাথে আমার দীর্ঘ কথোপকথনের কথা। 

আর এবার ক্যামিলা, তোমাকে অন্য একটা কথা বলার আছে। এ ব্যাপারটায় আমি একটু বিব্রত বোধ করি, কিন্তু তবু কথাটা তোমাকে বলতেই হবে। 

মিকা সম্বন্ধে মা-বাবাকে কিছুই বলিনি, তবে তাদের বলেছি তারা যখন হাসপাতালে ছিল তখন কিছু মজার ছবি তুলেছি। আমার ক্যামেরাটা ওকে দিয়ে বলেছি ছবিগুলো ডেভেলপ করে দিতে। তুমি কল্পনাও করতে পারবে না, ক্যামিলা কী ভুল কাজটাই না করেছি : ক্যামেরার মধ্যে কোনো ফিল্মই ছিল না! 

বাচ্চাটার নাম দেওয়া হবে মাইকেল। বাবা-মা দুজনেই বলল নাম দুটো একদম মিলে যাবে- জো আর মাইকেল। ঠিক মনে করতে পারছি না কখন এটা স্থির করা হয়। নামটা নির্বাচনে হয়তো আমারও হাত আছে। কিন্তু হয়তো মা-বাবা ওর জন্মের আগেই এটা ঠিক করে রেখেছিল। 

তবে ক্যামিলা, ওরা নিশ্চিত হতে পারেনি ছেলে হবে না মেয়ে, শুধু আমিই সেটা নিশ্চিতভাবে জানতাম। আজ অবস্থা বদলে গেছে। আজকাল হাসপাতালে আলট্রাসাউণ্ডে নিশ্চিত করা যায় মায়ের পেটের বাচ্চাটা ছেলে না মেয়ে। 

হয়তো তুমি ইতিমধ্যে ভাবতে শুরু করেছ আমার কি সত্যি সত্যি মিকার সাথে দেখা হয়েছিল নাকি গোটা ব্যাপারটাই আমার কল্পনা। এই প্রশ্নটায় আমি মাটির সাথে নত হয়ে বাউ করি, কারণ আমি নিজেও এই প্রশ্নটা অনেকবার করেছি। যখন দুজন লোক তাদের উপত্যকা থেকে মাথা তুলে পাহাড়ের চূড়ায় মিলিত হয়, তখন পাহাড়টার কি নাম আর লোক দুটোই বা কোত্থেকে এলো, তাতে কিছুই যায় আসে না। পাহাড়ের শীর্ষে দাঁড়িয়ে মনে হয় আমরা পৃথিবীর শীর্ষে দাঁড়িয়ে আছি। আর যে রাতে আমার ক্ষুদে ভাইটি পৃথিবীতে এলো, আমি সেদিন সত্যিই পৃথিবীর শীর্ষে। 

আমার বিশ্বাস আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিটিংগুলি, ঘুমের মধ্যেই হয়ে থাকে। আমাদের জীবনে কতকগুলি স্বপ্ন আসে যেগুলি মনে হয় আমাদের উপত্যকার জীবনের চাইতে বেশি প্রাণবন্ত। 

মিকার সাথে আমার সাক্ষাৎ আমাকে জ্যোতির্বিদ হতে উৎসাহ যুগিয়েছিল, আর আমি তাই হয়েওছিলাম। আমার যৌবনকালের সবটাই অতিবাহিত হয়েছে বহির্বিশ্ব নিয়ে গবেষণা করে। তাছাড়া সময় বের করে পৃথিবীর অদ্ভুত জিনিসগুলি দেখে বেড়িয়েছি, তবে আমার দিক থেকে বিবেচনা করলে সেটাও আকাশের তারার দিকে চেয়ে থাকার মতোই। মাঝে মাঝে শূন্য মণ্ডলে দৃষ্টি প্রসারিত করে দিয়ে মনে হয় আমি আসলে ওখানে মিকাকেই খুঁজছি। 

ঠিক আছে ক্যামিলা, তোমাকে যে গল্পটা শোনাব বলে ওয়াদা করেছিলাম এটাই সেটা। তুমি যখন এখানে আসবে ছুটিতে তখন তোমাকে মিকার গল্প শোনাব, আর তুমি নিজেও যদি একটা ক্ষুদে ভাই বা বোন পেয়ে যাও, তাহলে তার চাইতে উত্তম আর কিছুই হতে পারে না। তোমরা হয়তো জেনেছ তোমাদের কী প্রত্যাশা হতে পারে! 

আমি যতটুকু মনে করতে পারি তার সবটাই তোমাকে বললাম। কিছু টুকরো টাকরা হয়তো ভুলেও গিয়ে থাকতে পারি, আবার কিছুটা আমার কল্পনাও হতে পারে, তবে অনেক দিনের পুরনো কোনো ঘটনা বর্ণনা করতে গেলে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। 

আমার বিশ্বাস আমরা এ যাবৎ যা কিছু দেখেছি, বা যেভাবে বেঁচেছি, প্রতি রাতেই তার একটু একটু করে ভুলে যাই। আবার একই সময়ে আমাদের মন ঘুমের মাঝে কঠোর সংগ্রাম করে চলে। ঐ সময়টাতেই আমরা স্বপ্নের জগতে ডুবে যাই। ঠিক যেন আমাদের পরিচিত পৃথিবী থেকে গড়িয়ে নতুন এক পৃথিবীতে গিয়ে পড়ি। এ নিয়ে ভাবতেও আমার অবাক লাগে। হয়তো রাতে আমরা স্বপ্ন দেখি এ কারণে যে ঘুমের মধ্যে বিস্মৃতির যে গর্ত সৃষ্টি হয়, স্বপ্ন দিয়ে আমাদের মন সেটুকু পূরণ করতে চায়। আর সকালে ঘুম ভেঙ্গে জেগে ওঠার পর যা কিছু স্বপ্নে দেখেছিলাম শীঘ্রই তা ভুলে যাই। যেন সকালের রোদে শিশির বিন্দু মিলিয়ে যায়। আমার মনে হয় দিনের বেলা এতো বিচিত্র ঘটনার মধ্যে দিয়ে চলতে থাকি যে তার জায়গা করে দিতে গিয়ে স্বপ্নেরা সব উবে যায়। 

স্বপ্ন মনে রাখাটা যেন হাত দিয়ে উড়ন্ত পাখি ধরার চেষ্টার মতো, তবে মাঝে মাঝে পাখিটা নিজের ইচ্ছায় আপোষে আমাদের কাঁধে এসে বসে। 

অনেক আদরসহ-

জো চাচা 

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *