৫. ডিম

৫. ডিম

আমি সারা বাড়ির চারপাশে ছুটাছুটি করতে থাকি। ও মুরগীর খোয়াড়ে বসে আছে, ওর হাতে সদ্য পাড়া একটা ডিম। 

‘দেখ একটা ডিম পেড়েছে!’ সে চেঁচায়, যেন এটা এক অসাধারণ ব্যাপার, বিরাট রহস্যময়। 

আমরা মুরগী পুষি মজা করার জন্য, তবে সেগুলো যথেষ্ট ডিম দেয় সকালের নাস্তার জন্য আর প্যানকেক তৈরির জন্য। 

‘সাবধানে ধর,’ আমি ওকে সতর্ক করি। 

সে গম্ভীরভাবে মাথা দোলায়। ‘তাই হবে, কারণ এর মধ্য থেকে একটা বাচ্চা বের হবে।’ 

‘মুরগীর ছানা,’ আমি বলি। লক্ষ লক্ষ বছর আগে সরীসৃপ থেকে পাখির সৃষ্টি, যেমনটা হয়েছে স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে। 

মিকা একটা মুরগীর দিকে আঙুল তোলে। ‘কতদিন পর পর মুরগী ডিম পাড়ে?’ সে জিজ্ঞেস করে। 

এই প্রশ্নের জবাবে আমি নত হয়ে বাউ করি, ‘মাঝে মাঝে ওরা প্রতিদিনই একটা করে ডিম পাড়ে।’ আমি বলি। অন্য পাখি বা সরীসৃপরা এমনটা করে না। ওদের অধিকাংশই বছরে মাত্র একবার করে ডিম পাড়ে।’ 

মিকা এমন অবাক বিস্ময়ে তাকায় যে আমি না হেসে পারি না। 

মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে মুরগী পালছে আর যেগুলো বেশি ডিম পাড়ে সেগুলোই সংরক্ষণ করেছে, আমি বলি। ‘ঠিক যেমন গরুর ক্ষেত্রে যেগুলো বেশি বেশি দুধ দেয়, সেগুলোই নির্বাচন করি, যে ভেড়া বেশি পশম উৎপাদন করে, আর যে ঘোড়া বেশি জোরে ছোটে, আর বেশি শক্তিশালী।’ 

মিকা সযত্নে ডিমটা নামিয়ে রেখে, তারের খোয়ার থেকে বেরিয়ে আসে। 

দেখতে পেলাম হেলেন চাচী একটা ডেক চেয়ার হাতে করে বাগানের দিকেই আসছে, কাজেই আমরা গুড়ি মেরে বাড়িতে গিয়ে একেবারে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ি। সেখানে গিয়ে মিকা একটা প্লেটের ওপর কয়েকটা ডিমের খোসা দেখতে পায়। চাচী প্যানকেক বানিয়ে খোসাগুলো ফেলে রেখেছে। দৃশ্যটা ওকে এতই বিচলিত করে যে সে দুইহাতে চোখ ঢাকে। 

তা সত্ত্বেও তাকে রান্না ঘরের টেবিলে বসিয়ে জুতোর মধ্যে লুকিয়ে রাখা অর্ধেক করে রাখা দুই টুকরো প্যানকেক বের করলাম। সে নিজের শরীরের মধ্যে এত বেশি জ্যাম মেখে ফেলে যে সে এক বিশ্রী ব্যাপার। ওর প্যানকেক খাওয়া শেষ হলে পরে ওকে নিয়ে গিয়ে বাথরুমে ঢুকি। মেঝেতে একটা টুল পেতে ওকে তার ওপর বসিয়ে বাচ্চার ফ্লানেল দিয়ে রগড়ে ওর মুখ আর পেট পরিষ্কার করে দিই। 

ঠিক তখনই ব্যাপারটা লক্ষ্য করলাম! সে কারণেই এখন পর্যন্ত তোমাদের সেটা বলা হয় নাই। মিকার কোনো নাভি নাই। বুঝতে পারছ ক্যামিলা, কতটা অবাক হয়েছিলাম আমি? 

সব মানুষের পেটের মাঝামাঝি একটা বোতাম থাকে, কারণ মায়ের পেটে থাকতে নাভি রজ্জু দিয়েই বাচ্চারা তাদের পুষ্টি সংগ্রহ করে। মিকার নাভি নাই। তাহলে কিভাবে ওর জন্ম হলো? 

বুঝতে পারছি না ব্যাপারটার সমাধান কী? আমি একটা তোয়ালে দিয়ে ওর গা মুছে দিয়ে টুল থেকে নামিয়ে দিই। সে ছোট ঘরটা দিয়ে হলের দিকে ছোটে, এটা আমার কচি ভাইটার রুম। ও বাচ্চার দোলনা দেখতে পেয়ে ওটার ওপর উঠে পড়ে। আমি ওকে ধীরে ধীরে দোলাতে থাকি যাতে ও বুঝতে পারে এটা কী কাজে লাগে। মিকা প্রাণ খুলে হাসে। 

‘আমার একটা ছোট্ট ভাই হবে, তার জন্যই এটা রাখা হয়েছে,’ আমি বুঝিয়ে বলি। ‘এই দোলনাতে সে শুয়ে শুয়ে ঘুমাবে। 

‘আমার পাশে ওকে দারুণ মানাবে,’ মিকা ঝটপট জবাব দেয় দোলনা থেকে নামতে নামতে। ওকে কিছুটা বিচলিত মনে হয়। ঘুম থেকে জেগে উঠার আগেই অবশ্য আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। 

সে ফ্যাল ফ্যাল করে রুমের চারদিকে তাকিয়ে বলে : 

‘আমি তো কোনো ডিম দেখতে পাচ্ছি না।’ 

ঠিক সে মুহূর্তে মাথায় একটা চিন্তা খেলে গেল। ক্যামিলা, তুমি নিশ্চয়ই স্বস্তি বোধ করছ! 

আমরা নিচ তলায় ড্রয়িং রুমে নেমে এলাম। কফি টেবিলের নিচের শেলফে একটা বড় ফটো এ্যালবাম ছিল। আমি ওটা টেবিলে রেখে সোফায় বসলাম। মিকা আমার পাশে বসে। 

‘এটা একটা ফটো এ্যালবাম,’ আমি বলি। 

সে আমার মুখের দিকে তাকায়। বুঝতে পারি ফটো এ্যালবাম সম্বন্ধে ওর বিন্দু বিসর্গ ধারণাও নাই। 

‘এক মিনিট চুপ করে বসো,’ আমি বলি। আমি আমার রুমে ছুটে গিয়ে আমার ক্যামেরা নিয়ে আসি। বেশ মনে আছে, প্রথমে দেখে নেই ফ্ল্যাশটা ঠিকমত কাজ করছে কিনা। তারপর কিছুটা দূরে গিয়ে মিকার একটা ছবি তুলি। আমি প্রথমে নিশ্চিত হয়ে নেই, পুরো পেটটা ক্যামেরায় আসছে কিনা, যাতে লোকে বুঝতে পারে ওর নাভি নাই। 

‘ক্লিক!’ ছবি তোলার শব্দ। আমি এই ক্লিক শব্দটা কখনও ভুলব না। মিকা যদি হঠাৎ করে উধাও হয়েও যায়, তাহলেও অন্তত প্ৰমাণ থাকবে সত্যি ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিল। 

মিকা ফ্ল্যাশের ঝলকানিতে চমকে উঠল, আর ওর ঘাড়ে আমার আঙুল বুলিয়ে দিতে হলো যাতে ও চিৎকার শুরু করে না দেয়। তারপর আমি ফটো এ্যালবাম খুললাম। 

‘এ্যালবামটাতে আমাদের পরিবারের অসংখ্য ফটো আছে, আমরা পরস্পর ফটোগুলো তুলেছি, আমি ব্যাখ্যা করে বোঝালাম। এখন এর মধ্যে তোমার একটা ফটোও রাখতে পারব। আমি বাবা-মা’র ফটোগুলো দেখালাম সেগুলো ওদের বিয়ের আগের তোলা। তারপর এলাম মায়ের একটা ছবিতে যেখানে ওর বিশাল স্ফিত উদর। যখন আমি ছিলাম ওর পেটের মধ্যে। ‘এই পেটের মধ্যেই রয়েছি আমি নিজে, ওকে বললাম। ‘পেট থেকে বেরিয়ে আসার কিছু আগের ছবি এটা।’ 

পরিষ্কার বোঝা গেল মিকা কিছু একটা বুঝেছে। 

‘মায়ের পেটে জীবন্ত বাচ্চা,’ সে বিড়বিড় করে আমি এ্যালবামের পাতা উল্টাই। আমি মায়ের দুধ খাচ্ছি, এরকম একটা ছবি বাবা তুলেছিল। 

‘এই যে এইটা আমি, ক্ষুধা পেলে এভাবেই মায়ের দুধ খেতাম।’ 

‘দুধ?’ বড় বড় চোখ করে তাকায় মিকা। আমার হাসি পেল। যদি স্তন্যপায়ী সম্বন্ধে মিকার ধারণা না থাকে তাহলে দুধ সম্বন্ধেও ধারণা না থাকার কথা। 

‘এটা কচি শিশুদের খাবার,’ আমি বলি। সে ফটো এ্যালবাম থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। আমার মনে হয় আমার মায়ের দুধ চোষাটা ওর বিদঘুটে মনে হয়েছে। 

‘তুমি যদি স্তন্যপায়ী, আর আমি যদি অন্য কিছু তাহলে আমরা দুজনে দেখতে একরকম হলাম কি করে?’ ও প্রশ্ন করে। এই ব্যাপারটা আমাকেও অবাক করছিল। ঠিক যেন মিকা ওর মুখ দিয়ে আমার কথাটাই বলছে, কাজেই ওর প্রশ্নটাতে আমি বাউ করারও প্রয়োজন বোধ করলাম না। 

আমার এটা আগেই ভাবা উচিত ছিল। মিকা মহাশূন্যের অন্য এক গ্রহ থেকে এসেছে, যে গ্রহের ইতিহাস পৃথিবীর ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাহলে কি করে সে দেখতে আমার মতো হলো? 

বুঝলে ক্যামিলা, মিকাই সমস্যাটার সমাধান বের করল। আর শীঘ্রই এটা তোমার কাছেও প্রকাশ করব। 

ঠিক সেই সময়ে শুনলাম হেলেন চাচী এদিকে আসছে। 

‘জো, তুমি কোথায়? তুমি ঠিক আছ তো? বাগানে গিয়ে খেলছ না কেন তুমি? আমি শোবার ঘরের দরজা দিয়ে মাথা বের করে তাকালাম। সে হলের মধ্যে দাঁড়িয়ে। ‘আমি এখন বাইরে যাচ্ছি,’ আমি বললাম। ‘ভালো, এখন আমি রান্না শুরু করব;’ রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায় চাচী। 

আমি মিকার হাত ধরে পা টিপে টিপে সামনের দরজা গলিয়ে সোজা বাগানে। আমরা বাড়ির সামনে পাহাড়ী ঢিবিটায় চড়ে পাথরের এক স্তূপের উপর বসে পড়ি। বাবা আর আমি মিলে ওটা বানিয়েছিলাম। মা- বাবা এটাকে প্রায়ই বলতো ক্ষুদে পাহাড়। ওখান থেকে নিচে তাকিয়ে একদিকে যেমন আমাদের বাড়ি দেখা যায় অন্যদিকে তেমনি দেখা যায় পাথুরে সৈকত আর সমুদ্র উপকূল। শঙ্খচিলের কিচির মিচির আর তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। একদিক থেকে ভালোই, কারণ মিকা যদি হঠাৎ করে চেঁচাতে শুরু করে তাহলে শঙ্খচিলের আওয়াজে তা ঢাকা পড়ে যাবে। পাথুরে ঢিবিটার ওপর থিতু হয়ে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মিকাকে গল্প শোনাতে শুরু করি কিভাবে সমুদ্রের মধ্যে প্রথম জীবের উন্মেষ ঘটে। এবার ওর পালা ওর গ্রহে কিভাবে জীবের আবির্ভাব ঘটেছিল তা বর্ণনা করা। 

মাঝে মাঝে ওর বুড়ো আঙুল চোষা আর আঙুল ছড়িয়ে পাখার মতো বাতাস করা চলতে থাকে। তবে ওর গ্রহে জীবের আবির্ভাব নিয়ে কথা বলার সময় ওকে মনে হয় বাবার মতো গম্ভীর। 

‘আমি যে গ্রহ থেকে এসেছি তার নাম এলিও,’ মিকা বলে। ‘কয়েকশ কোটি বছর আগে ওখানেও জীবনের উন্মেষ ঘটেছিল সমুদ্রে। কিভাবে এটা ঘটেছিল কেউই জানে না। তবে এখন এলিওর বুকে রয়েছে অনেক প্রজাতির জীবজন্তু।’ 

ঠিক এখানকার মতোই, আমি ভাবলাম। যদিও মিকা আর আমি দুটি পৃথক গ্রহ থেকে এসেছি, তবুও আমরা একই বিষয় নিয়ে কথা বলছি। সে বলে চলে : ‘শত শত কোটি বছর আগে এলিওতে এক জীবের আবির্ভাব ঘটে যার নাম ছিল মাম্বো। তারা শক্ত খোসাযুক্ত ডিম পাড়ত। ‘আমাদের গ্রহে এমন কোনো প্রাণী নাই যারা জীবিত বাচ্চা প্রসব করে।’ 

‘তাহলে তোমাদের মতো লোক কিভাবে এলো?’ আমি উচ্ছ্বাসভরে জিজ্ঞেস করি।

মিকা এতই উত্তেজিত হয়ে উঠে যে আমার প্রশ্নের জবাবে সে বাউ করতেও ভুলে যায়। সে নিজের আঙুল নিয়ে খেলা করতে করতে জবাব দেয়। 

‘আমাদের গ্রহে মাম্বোদের বিলোপ হয়ে যাওয়ার মতো তেমন কিছুই ঘটেনি। কাজেই লক্ষ কোটি বছর ধরে তারা অভিব্যক্তি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলতে থাকে। কালান্তরে তাদের মধ্যে নানান পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আজ মাম্বোদের মধ্যে পরস্পর কথাবার্তা চলে, এমন কি তারা বহির্বিশ্ব সম্বন্ধে প্রশ্নও করতে পারে। আমি সেই মাম্বোদেরই একজন। আমি নিজেও সেই মাম্বোদের একজন ক্যামেলিয়া!’ 

মিকা বলে চলে, আমি একটা ডিমের মধ্যে ঘুমিয়েছিলাম, যা আমার মা-বাবা কুশনের নিচে একটা গরম ঘরে রেখে দিয়েছিল। তারা ডিমটা কখনও একা ছেড়ে থাকতে সাহস করত না। তুমি বোধ হয় বুঝতে পারছ, এলিওতে কিছু নোংরা প্রাণী আছে যারা অন্যের ডিম চুরি করে খেয়ে ফেলে। কাজেই তারা একটা ছোট্ট ঠেলাগাড়িতে রেখে ডিমটা সাথে সাথে নিয়ে বেড়াত। ডিমটাকে মহা সম্পদ বলে গণ্য করত, এলিওতে ডিমকেই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বলে গণ্য করা হয়। 

এখন বুঝতে শুরু করেছি কিভাবে মিকার জন্ম। 

‘ইতিমধ্যে আমার হাত-পা এত শক্ত হয়ে গেছে যে হাত-পা ছোড়াছুড়ি করতে গিয়ে ডিমটা ফাটতে শুরু করে,’ মিকা বলে চলে। ‘এই ঘটনাটা চলাকালে আমার গোটা পরিবারের সদস্যরা সোফায় বসে তা লক্ষ্য করে। 

‘আর তখনই তুমি গুড়ি মেরে বেরিয়ে এলে?’ আমি চেঁচিয়ে উঠি।

মিকা মাথা দোলায়। 

‘আমি এসবের কিছুই মনে করতে পারছি না, তবে উজ্জ্বল আলোয় নিশ্চয়ই আমার চোখ ঝলসে গিয়েছিল। ডিমের মধ্যে ছিল ঘোর অন্ধকার, আর পূর্ণ নীরবতা। আমার ধারণা ওখানে শুয়ে শুয়ে আমি শুধু নিজের আঙুল চুষতাম।’ 

তুমি কি মনোযোগ দিয়ে শুনছ ক্যামিলা? মিকার কথা আমার কাছে চমকপ্রদ আর রহস্যময় মনে হচ্ছিল। তবে সত্যি বলতে কি ওর কাছে আমি পৃথিবীর যে ইতিহাস বলেছি তার চাইতে বেশি আশ্চর্যের নয়। আর আমার ছোট্ট ভাইয়ের জন্ম কথা যেমনটা শুনিয়েছি সেটাও কম অবাক করার নয়। এখনই কেবল বুঝতে পারছি স্তন্যপায়ীদের কথা কেন মিকার কাছে এত দুর্বোধ্য মনে হচ্ছিল। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর যে ব্যাপারটা তা হলো এত ভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে আসা আমাদের দুজনের মধ্যে এতটা মিল হলো কি করে? 

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *