হেমলক

হেমলক

তৃষিত অফিসে নিজের ছোট্ট ঘরটাতে বসে একটা কপি লিখছিল। চিফ রিপোর্টার সুপ্রকাশদা তার ঘরে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে তৃষিত চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কপিটা প্রায় হয়ে গেছে দাদা। আর মিনিট দশেকের মধ্যে আপনার চেম্বারে গিয়ে দিয়ে আসছি।’

সুপ্রকাশদা বললেন, ‘ওটা পরে দিলেও চলবে। তাড়া নেই। আসলে ”বড়সাহেব” মানে আমাদের মালিক এসেছেন। তিনি তাঁর চেম্বারে ডেকেছেন তোমাকে।’

তৃষিত কথাটা শুনে একটু ঘাবড়ে গেল। মালিক মানে পরিতোষ মুখার্জি। বেশ রাশভারী লোক। এ রাজ্যের একজন অন্যতম শিল্পপতি। তৃষিত মাত্র বছর দুই হল এই খবরের কাগজের অফিসে সাংবাদিক হিসেবে চাকরি করছে। কাগজের বিনোদনের পাতাটা সে দেখে। এই দু’বছরের মধ্যে দু-চারবার সে মালিকের মুখোমুখি হয়েছে কয়েকটা অনুষ্ঠানে। তবে সৌজন্য বিনিময় ছাড়া কোনও কথাবার্তা হয়নি। হবার কথাও নয়। তার মতো কনিষ্ঠ সাংবাদিককে তেমন প্রয়োজন হয় না মালিকের। কাগজের সম্পাদক আর চিফ রিপোর্টার ছাড়া কারও সঙ্গেই বিশেষ কথা বলেন না তিনি। কাজের প্রয়োজনে তৃষিতকে মাঝে মাঝে বিনোদন জগতের নানা সেলিব্রেটির সঙ্গে কথা বলতে হয়, তাদের নিয়ে কাগজে লিখতে হয়। তবে কি তাদের মধ্যে কেউ কোনও অভিযোগ জানিয়েছে মালিকের কাছে? তৃষিত সুপ্রকাশদাকে বলল, ‘রিপোর্টিং-এ কোথাও কোনও ভুল করে ফেলেছি নাকি? কেউ কোনও কমপ্লেন করেননি তো?’

সুপ্রকাশদা বললেন, ‘সম্ভবত তা নয়। তাহলে চিফ রিপোর্টার হিসাবে তিনি প্রথমে আমার কাছেই জবাবদিহি চাইতেন, যেমন চেয়ে থাকেন। কারণটা আমি ঠিক জানি না। গিয়ে দেখো উনি কী বলেন?’; এই বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি। সুপ্রকাশদা ঘর থেকে চলে যাবার পর তৃষিত ওয়াশরুমে গিয়ে যথাসম্ভব ফিটফাট হয়ে নিল। তারপর রওনা হল বড়সাহেবের চেম্বারের দিকে।

চেম্বারের বাইরে যে বেয়ারা দাঁড়িয়েছিল তৃষিত তাকে মালিক ডেকেছেন জানাতেই সে চেম্বারে ঢুকে কয়েকমুহূর্তের মধ্যে ফিরে এসে বলল, ‘যান, ভেতরে যান।’

বড়সাহেবের চেম্বারে প্রবেশ করল তৃষিত। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল ঘরটার ঠিক মাঝখানে ওক কাঠের বিরাট সেক্রিটেরিয়ট টেবিলের ওপাশে রিভলভিং চেয়ারে বসে আছেন বড়সাহেব। পরিতোষ মুখার্জি। তৃষিত তাঁর উদ্দেশে বলল, ‘গুড আফটারনুন স্যার।’

বড়সাহেব মৃদু হেসে চোখের ইশারায় সামনের চেয়ারে বসতে বললেন। তাঁর নির্দেশ পালন করে টেবিলের এপ্রান্তে মুখোমুখি একটা চেয়ারে তৃষিত বসল।

টেবিলের উপর একটু ঝুঁকে পড়ে নাকের ডগায় নেমে আসা বাইফোকালের উপর দিয়ে তিনি কয়েকমুহূর্ত তৃষিতের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি ”হেমলক” শব্দটা শুনেছেন?’

যদিও পরিতোষ মুখার্জি ষাটোর্ধ্ব, আর তৃষিতের বয়স সাতাশ, মানে বয়সে সে অনেকটাই ছোট, তবুও সবাইকে ”আপনি” সম্ভাষণ করে কথা বলাই বড়সাহেবের অভ্যাস।

তৃষিত জবাব দিল, ‘হ্যাঁ স্যার, শুনেছি।’

‘মানে জানেন? কী বলুন তো?’

তৃষিত বলল, ‘এক ধরনের উদ্ভিদ। এর পয়জন হেমলক, বিষাক্ত প্রজাতির।’

‘এ বিষয়ে আর কিছু জানেন?’ আবার প্রশ্ন করলেন মুখার্জি সাহেব।

তৃষিত জবাব দিল, ‘গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসকে এই হেমলকের রস পান করিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।’

‘ভেরি গুড!’ প্রশংসাসূচকভাবে কথাটা বলে সোজা হয়ে বসলেন বড়সাহেব। এবার ভয়টা একটু কাটল তৃষিতের। তার মনে হল বড়সাহেব বকাঝকা করার জন্য ডাকেননি তাকে।

মুখার্জি সাহেব এরপর বললেন, ‘এই হেমলক কথাটা শুনে আর কিছু মনে আসছে আপনার?’

তৃষিত একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, স্যার। একটা সফট ড্রিঙ্কস। হেমলক নাম। বাজারে ইদানীং বেশ চলছে।’

‘খেয়ে দেখেছেন? কেমন?’

প্রশ্নটা শুনে একটু ইতস্তত করে তৃষিত জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, স্যার। ভালো। বাজার চলতি সফট ড্রিঙ্কসগুলোর থেকে একটু অন্যরকম এই ঠান্ডা পানীয়। বেশ ভালো।’

বড়সাহেব তৃষিতকে বললেন, ‘আপনি জানেন নিশ্চয়ই, ”রেনবো” নামে আমারও একটা সফট ড্রিঙ্কস কোম্পানি আছে। রেনবোর থেকে হেমলকের স্বাদ কি ভালো? আপনি নিশ্চয়ই খেয়েছেন।’

তৃষিত এবার বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। রেনবোর থেকে হেমলকের স্বাদ যথেষ্ট ভালো। কিন্তু সেটা খোদ রেনবোর মালিকের সামনে বলা উচিত হবে কিনা তা বুঝে উঠতে পারল না তৃষিত।

তাকে চুপ করে থাকতে দেখে বড়সাহেব তার রিভলভিং চেয়ারটা এপাশে ওপাশে ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, ‘আপনার নিশ্চুপ থাকার কোনও কারণ নেই। সত্যিটা সব সময় সত্যি হয়। আপনার হয়ে জবাবটা আমিই দিচ্ছি। রেনবোর থেকে হেমলক স্বাদে ভালো। আর শুধু রেনবোর থেকে নয়, অন্যান্য যে সব দেশীয় ঠান্ডা পানীয় আছে তাদের সবার থেকে হেমলকই স্বাদে ভালো। আর এ ব্যাপারেই একটা আলোচনার জন্য আপনাকে ডেকেছি।’

বড়সাহেবের কথা শুনে মৃদু বিস্মিত হয়ে তৃষিত তাকাল তাঁর দিকে। বড়সাহেব সোজা হয়ে বসে বলতে শুরু করলেন, ‘হ্যাঁ, ওই স্বাদের জন্যই হেমলক পিছনে ফেলে দিচ্ছে আমাদেরকে। বড় বড় বহুজাতিক সংস্থার নরম পানীয়র কথা বাদই দিচ্ছি। কিন্তু আমরা যারা মাঝারি বা ছোট নরম পানীয়র ব্যবসা করি, তারা অনেক টাকা খরচ করেও কিছুতেই পেরে উঠছি না হেমলকের সঙ্গে। অথচ হেমলক বহুজাতিক কোম্পানি তো নয়ই, এমনকী সে আমাদের থেকেও ছোট কোম্পানি। কিন্তু কী চাহিদা তার! হেমলক চাহিদা অনুযায়ী জোগান দিয়ে উঠতে পারছে না। যে একবার হেমলক খাচ্ছে সে অন্য কোনও পানীয় মুখে তুলছে না।’

মুখার্জি সাহেব এ পর্যন্ত কথাগুলো বলার পর তৃষিত ব্যাপারটা কিছুটা আন্দাজ করে বলে উঠল, ‘কিন্তু আপনাদের এ নিয়ে আশঙ্কার কী কারণ? বলছেন তো খুব ছোট কোম্পানি। চাহিদা অনুসারে বাজারে জোগানই দিতে পারছে না।’

বড়সাহেব বললেন, ‘এটা বাজারে চাহিদা বাড়াবার ব্যবসায়িক কৌশল হতে পারে। আবার যদি পুঁজি না থাকার কারণে হয়, তবে বেশি দিন সে সংকট থাকবে না। যার জিনিসের বাজারে এত চাহিদা তার কিছুদিনের মধ্যেই পুঁজি তৈরি হয়ে যাবে। অথবা ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা বাড়াবে। তখন মুখ থুবড়ে পড়বে আমাদের মতো মাঝারি আর ছোট কোম্পানিগুলো।’

এ কথা বলে একটু থেমে মুখার্জি সাহেব বললেন, ‘ওই পানীয়তে নিশ্চয়ই হেমলকের বিষ মেশানো হয় না। তবে তা খেলে কেউ বাঁচত না। তবে কীসের জন্য অমন স্বাদ সেটাই ধরতে পারছি না। হ্যাঁ, এটা ঠিকই যে, প্রত্যেক পানীয় প্রস্তুত সংস্থার আলাদা আলাদা গোপন রেসিপি থাকলেও তার পঁচানব্বই শতাংশই মোটামুটি এক হয় নরম পানীয়ের ক্ষেত্রে। কিন্তু হেমলকের রেসিপিতে কী এমন গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে যে তার কাছে পাত্তা পাচ্ছি না আমরা? নাকি প্রযুক্তির বিশেষ কোনও ব্যবহার? অনেক সময় টেম্পারেচার, মিক্সিং ইত্যাদির সামান্য কৌশল স্বাদের পার্থক্য তৈরি করতে পারে। আপনাকে একবার তাদের কোম্পানিতে যেতে হবে। কথা বলতে হবে মালিকের সঙ্গে।’ আসল কথাটা এবার পাড়লেন বড়সাহেব।

‘আমাকে?’ বিস্মিতভাবে বলে উঠল তৃষিত।

বড়সাহেব বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনাকেই। আমাদের বিনোদনের পাতার জন্য হেমলকের মালিক নীলকণ্ঠ গুপ্তর একটা ইন্টারভিউ নেবেন আপনি। সম্ভব হলে ফ্যাক্টরিটাও ঘুরে দেখবেন। ছবি তোলার চেষ্টা করবেন। নীলকণ্ঠ গুপ্ত যে আপনাকে রেসিপিটা জানিয়ে দেবেন সে আশা করি না। কারণ, এমন বোকা তিনি নিশ্চয়ই নন। কিন্তু হয়তো তাঁর কথার মধ্যে এমন কোনও সূত্র পাওয়া গেল, যেটা শুনে আমরা হয়তো ব্যাপারটা সম্বন্ধে আন্দাজ করতে পারলাম অথবা কোনও যন্ত্রাংশের ছবি হয়তো আমাদেরকে বুঝিয়ে দিল ব্যাপারটা। সেই আশাতেই আপনাকে ওঁর কাছে পাঠানো। আর আপনাকে নির্বাচন করার পিছনে দুটো কারণ আছে। বিনোদন মানে তো শুধু সিনেমা-থিয়েটার নয়, খাদ্য-পানীয়র ব্যাপারটা অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। লোকটা যদি আপনার ব্যাপারে সতর্ক হয়ে আগাম খোঁজ নেয়, তবে দেখবেন আপনার বক্তব্য সত্যি। কারণ ওই পাতাতে আপনার নাম থাকে। আর দ্বিতীয় কারণ হল, কাজের ব্যাপারে আমি আপনাদের মতো তরুণদের ওপর বেশি আস্থাশীল। আপনাদের উদ্যম আর রিফ্লেক্স আমাদের মতো মানুষের চেয়ে বেশি হয়। কী, কাজটা করতে পারবেন তো?’

তৃষিত বলল, ‘আমি নিশ্চয়ই করার চেষ্টা করব স্যার।’

বড়সাহেব বললেন, ‘ভেরি গুড।’ একথা বলার পর বড়সাহেব একটা কাগজের টুকরো এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে ওর অফিস। এখানে টেলিফোন নম্বর লেখা আছে। নিন, এবার কাজে লেগে পড়ুন। আমি আজ রাতের ফ্লাইটে দিন সাতেকের জন্য বাইরে যাচ্ছি। ফিরে এসে রিপোর্ট নেব। আর হ্যাঁ, এ ব্যাপারটা অফিসের কাউকে জানাবার দরকার নেই। কেউ আপনাকে এ ব্যাপারে কিছু জিগ্যেস করলে বলবেন আমার যে ‘চা’-এর ব্যবসা আছে সে ব্যাপারে কয়েকটা কাজ করে দেবার জন্য আমি আপনাকে সাময়িকভাবে নিযুক্ত করছি। ব্যাপারটা আমি চিফ রিপোর্টারকেও জানিয়ে দিচ্ছি।’ এই বলে টেলিফোনের দিকে হাত বাড়ালেন তিনি।

বড়সাহেবের চেম্বার থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এল তৃষিত। নিজের চেয়ারে বসার পর কাগজের টুকরোটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের কর্তব্য স্থির করে রিসিভার তুলে কাগজে লেখা ফোন নম্বরে তৃষিত ডায়াল করল। বেশ কয়েকবার রিং হবার পর ওপাশে কেউ একজন ফোন ধরল। তৃষিত বলল, ‘হ্যালো? এটা কি হেমলক কোম্পানি?’

ওপাশের লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ, হেমলক। কিন্তু এখন আমাদের কাছে কোনও স্টক নেই। দিন সাতেক পর একবার খোঁজ নেবেন।’ মাঝবয়সি এক লোকের গলা।

তৃষিত বলল, ‘না আমি স্টকের ব্যাপারে কথা বলার জন্য ফোন করিনি। আমি কোম্পানির প্রপ্রাইটর মিস্টার গুপ্তর সঙ্গে কথা বলতে চাই।’ এই বলে নিজের নাম পরিচয় দিল তৃষিত।

কয়েকমুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর ওপাশের কণ্ঠস্বর বলল, ‘আপনি সাংবাদিক? আমিই নীলকণ্ঠ গুপ্ত। বলুন কী ব্যাপার?’

তৃষিত বলল, ‘আমাদের কাগজে শনিবারের বিনোদনের একটা পাতা আছে। খাদ্য পানীয়ও তো বিনোদনের অংশ। এ ব্যাপারে ওই পাতার জন্য আপনার একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই। টেলিফোনে তো সব কথা হয় না। যদি কিছুক্ষণের জন্য সামান-সামনি কিছুটা সময় দেন আমাকে?’

এ কথা শুনে নীলকণ্ঠ গুপ্ত যেন একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘আজ সন্ধ্যা ছ’টায় আমার অফিসে চলে আসতে পারেন। তখন কথা বলা যেতে পারে। আমার অফিস অগরবাল ম্যানসন। বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে।’

তৃষিত বলে উঠল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। আমি আপনার অফিসে ঠিক ছ’টায় পৌঁছে যাচ্ছি।’

নীলকণ্ঠ গুপ্ত ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে ফোন রেখে দিলেন।

লোকটার সঙ্গে যে এত তাড়াতাড়ি দেখা করার সুযোগ মিলবে তা ভাবতে পারেনি তৃষিত। বেশ উৎসাহিত হল সে। নিজেকে কেমন যেন গোয়েন্দা গোয়েন্দা মনে হল তার। একটা রাইটিং প্যাড টেনে নিয়ে লোকটাকে কী কী প্রশ্ন করা যায় তা লিখতে শুরু করল সে। প্রশ্নমালা এক সময় তৈরি হয়ে গেল। সেগুলো মাথার মধ্যে গুছিয়ে ফেলে ঠিক পাঁচটার সময় বেরোবার জন্য সে উঠে পড়ল। শীতের বেলা, বাইরে কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা নামবে।

বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট তার অফিস থেকে কিছুটা দূরে হলেও নির্ধারিত সময়তেই সেখানে পৌঁছে গেল তৃষিত। একটা গলির ভেতর পাঁচতলা একটা পুরোনো বাড়ি। ছোট-বড় নানা কোম্পানির অফিস আছে সেখানে। লিফটম্যানকে জিগ্যেস করে লিফটে চেপে থার্ড ফ্লোরে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গেল সে। একটা ঘর নিয়েই অফিসটা। দরজার মাথার উপর একটা সাইন বোর্ড ঝুলছে—’হেমলক ব্রেভারিজ’। পাল্লাটা ভেজানো। তৃষিত দরজাতে টোকা দিতেই ভেতর থেকে কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘ভেতরে চলে আসুন।’

ঘরের ভেতর প্রবেশ করল তৃষিত। মাঝারি আকৃতির একটা ঘর। চারপাশে কয়েকটা আলমারি। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা টেবিল, তাকে ঘিরে কয়েকটা চেয়ার। ছোট কোম্পানির অফিসঘরগুলো যেমন হয়।

টেবিলের মাথার উপর থেকে ঝুলন্ত একটা আলো নেমে এসেছে। আর ঠিক সেই আলোর নীচে বসে আছে মাঝবয়সি একজন লোক। মাথার চুল হালকা ধরনের। দাড়ি-গোঁফহীন মুখ। গায়ে একটা কালো তুষের চাদর জড়ানো। সব মিলিয়ে সাদামাটা চেহারার একজন ভদ্রলোক। লোকটা তাকে দেখে সৌজন্যসূচকভাবে মাথাটা ঝুঁকিয়ে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘আপনি সাংবাদিক তৃষিতবাবু তো? আমি নীলকণ্ঠ গুপ্ত। আপনি বসুন।’

হেমলকের প্রপ্রাইটর নীলকণ্ঠ গুপ্তর মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসল তৃষিত।

তাকে ভালো করে একবার দেখে নিয়ে নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘বলুন কী জানতে চান?’

তৃষিত বলল, ‘খাদ্য-পানীয় তো এখন বিনোদনের প্রধান অঙ্গ। আপনাদের হেমলকের কথা এখন লোকের মুখে মুখে। আর আপনি এই কোম্পানির কর্ণধার। এ ব্যাপারে আমরা একটা সাক্ষাৎকার ছাপব আপনার।’

কথাটা শুনে নীলকণ্ঠবাবুর মুখে হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘অবশ্যই সাক্ষাৎকার দেব। আমি নগণ্য মানুষ। আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছেন এটাই একটা বিরাট ব্যাপার। তাছাড়া আমি তো খবরের কাগজে হেমলকের বিজ্ঞাপন দিতে পারি না। সে সামর্থ্য এখনও হয়ে ওঠেনি। সাক্ষাৎকারটাই বিজ্ঞাপনের কাজ করবে।’

তৃষিত হেসে বলল, ‘তা তো করবেই। আমি আপনার সাক্ষাৎকারটা মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে নেব।’—এই বলে তৃষিত পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বার করতে যাচ্ছিল, কিন্তু নীলকণ্ঠবাবু তার চাদরের আড়াল থেকে বাম হাতটা বার করে তৃষিতকে থামাবার ভঙ্গিতে বললেন, ‘না, ওটা থাক। আসলে ওই রেকর্ডিং-এর ব্যাপার হলে আমি নার্ভাস হয়ে যাব। গুছিয়ে কথা বলতে পারব না। কথাবার্তা এমনিই হোক। পরে আপনি সে কথাগুলো লিখে নেবেন। তবে আপনার চিন্তা নেই। আমি মিথ্যা বলি না। আর কোনও কথা বলার পর সে কথা অস্বীকারও করি না।’

রেকর্ডিংটা করে রাখলে কাজের সুবিধা হতো তৃষিতের। কিন্তু লোকটা যখন নিষেধ করছে তখন তাকে এ ব্যাপারে রাজি করানোর চেষ্টা না করাই ভালো। বলা যায় না—লোকটার মনের মধ্যে কোনও সন্দেহ জাগতে পারে, এমনকী বিগড়েও যেতে পারে লোকটা। কাজেই এ কথা ভেবে নিয়ে তৃষিত বলল, ‘ঠিক আছে রেকর্ডিং করছি না। শুধু মুখে মুখেই কথা হোক। তবে আমি প্রশ্নগুলো করি?’

নীলকণ্ঠবাবু তাঁর হাতটা আবার চাদরের ভেতর ঢুকিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসে বললেন, ‘হ্যাঁ, করুন।’

তৃষিত প্রথম প্রশ্ন করল তাঁকে, ‘আপনার পানীয়ের তেমন কোনও বিজ্ঞাপন না থাকলেও হেমলকের নাম তার স্বাদের জন্য লোকের মুখে মুখে ছড়াচ্ছে। কীভাবে গড়ে তুললেন এই কোম্পানি?’

মৃদু চুপ করে থেকে নীলকণ্ঠবাবু প্রথমে বললেন, ‘এখনও পুরো গড়ে তুলতে পারিনি। তবে যতটুকু গড়েছি তা গড়ে উঠেছে আমার রক্ত আর পরিশ্রমের বিনিময়ে। আমাকে বাঁচার জন্য এ ব্যবসায় দাঁড়াতেই হবে এ ভাবনা থেকে।’

তারপর তিনি বললেন, ‘জানেন আমার পূর্বপুরুষরা ছিলেন কবিরাজ। অর্থাৎ দেশিয় পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতেন। নানা গাছগাছড়া থেকে ওষুধ বানাতেন। কিন্তু তথাকথিত আজকের এই আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি এদেশে চালু হবার সঙ্গে সঙ্গে কবিরাজির পসারও কমতে শুরু করল। আমার ঠাকুর্দার আমল থেকেই এই ঘটনাটা শুরু হয়েছিল, কিন্তু বাবার সময় এসে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ল এই পারিবারিক পেশা। সংসার অচল হয়ে গেল আমাদের। পারিবারিক সূত্রে আমি কিছুটা ভেষজ ওষুধপত্রের ব্যবহার শিখে নিলাম। বাবার মৃত্যুর পর আমি চেষ্টা করলাম সে সবের কারবার করার। শিয়ালদা স্টেশনের পাশে প্রথমে একটা ভেষজ ওষুধের দোকান দিলাম। চলল না। তারপর নানা কাজ করেছি আমি। এমনকী ট্রেন কম্পার্টমেন্টে হজমি গুলি বিক্রি পর্যন্ত।

পনেরো-কুড়ি বছর এভাবে কোনও রকমে বেঁচে থাকার পর একজন আমাকে খবর দিল যে কলকাতার কিছুটা দূরে এক মাড়োয়ারি খুব ছোট্ট একটা সফট ড্রিঙ্কসের কারখানা খুলেছিল। কিন্তু উৎপাদন শুরু না করেই সে সেটা লিজে দিয়ে দিতে চায়। জলের ব্যবসাতে নাকি অনেক পয়সা, যদি আমি সেটা ঠিকমতো চালাতে পারি। তখন আমার একদম কোণঠাসা অবস্থা। সম্পত্তি বলতে কলকাতায় আমাদের পৈতৃক বাড়িটা ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। ভাবলাম জীবনে প্রথমবারের জন্য একটা জুয়া খেলি। হয় ঘুরে দাঁড়াব, না হয় শেষ হয়ে যাব। আমি বিয়ে-থা করিনি। কিছুদিন আগে আমার শেষ টানটুকু আমার মা’ও প্রায় না খেতে পেয়ে মারা গেছেন। আমার তখন হারাবার মতো কিছু ছিল না। কাজেই ”যা আছে কপালে” বলে বাড়ি-জমি বেচে দু’বছর আগে লিজ নিয়ে নিলাম ওই ছোট্ট কারখানা। পাঁচ-ছ’জন কাজ জানা লোক জোগাড় করে ব্যবসা শুরু করলাম। প্রথম প্রথম তো আমি ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না, কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিল। তারপর আবার ধীরে ধীরে…।’

তৃষিত বলে উঠল, ‘তারপর আবার ধীরে ধীরে আপনার রক্ত-ঘাম-পরিশ্রমের বিনিময়ে হেমলককে তুলে ধরলেন, তাই তো?’

নীলকণ্ঠবাবু শান্তস্বরে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ।’

তৃষিত বলল, ‘আপনার হেমলকের তো এত চাহিদা। একদম সাধারণ মানুষ থেকে বড় বড় মানুষও এই পানীয়ের প্রেমে পাগল। আমি কিছুদিন আগে একটা ফিল্ম স্টুডিয়োতে এক নায়িকার ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিলাম। তিনি হেমলকের বোতলে চুমুক দিতে দিতে আমাকে ইন্টারভিউ দিলেন। যে পানীয়ের এত চাহিদা তার জোগান নেই কেন?

নীলকণ্ঠবাবু হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, কথাটা ঠিক। এই যে আপনি এখানে এলেন কিন্তু আপনাকে হেমলক খাওয়াতে পারছি না। একটাও বোতল নেই। সব শেষ। আমার কারখানার ফ্রিজে হয়তো একটা-দুটো বোতল থাকতে পারে। আসলে হেমলক বানাতে একটা জিনিস লাগে। সেটা সবসময় পাওয়া যায় না। তাই প্রোডাকশন বন্ধ রাখতে হয়। হেমলকের গুণমানের সঙ্গে তো আর আপোস করা যায় না।’

তৃষিত প্রশ্ন করল, ‘আপনার পানীয়ের নাম হেমলক দিয়েছেন কেন? হেমলক তো বিষ?’

নীলকণ্ঠবাবু হেসে বললেন, ‘যদিও আজকাল সংবাদপত্রে অনেক সময় লেখা হয় যে, বহুজাতিক সংস্থার নরম পানীয়তে কীটনাশকের উপস্থিতি মিলেছে, কিন্তু হেমলকের ব্যাপারে আমি হলফ করে বলতে পারি যে, তেমন কোনও বিষাক্ত পদার্থ এতে মেশানো নেই। হ্যাঁ, হেমলক হল বিষ। কিন্তু বিষের মধ্যেই অমৃত লুকিয়ে থাকে। বেদনার মধ্যে লুকিয়ে থাকে আনন্দের স্বাদ। বলতে পারেন মজা করেই আমার এই পানীয়ের নাম রেখেছি হেমলক।’

তৃষিত বলল, ‘পাঠকদের নিশ্চয়ই আগ্রহ থাকবে কীভাবে হেমলক তৈরি হয় সেটা জানতে। এ ব্যাপারে কিছু বলবেন?’ কৌশলে তার চতুর্থ প্রশ্নটা করল তৃষিত।

তিনি হেসে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। যেমনভাবে সব নরম পানীয় প্রস্তুত হয়। পরিশুদ্ধ পানীয় জলের সঙ্গে চিনি আর বর্ণ-গন্ধের জন্য নানা সিরাপ বা যৌগ মিশিয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইড দিয়ে বোতলগুলো সিল করা হয়।’

তৃষিত বলল, ‘ওই সিরাপের ব্যাপারটাই আসল, তাই না?’

একটু চুপ করে থেকে নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, সেটাই আসল। খাদ্য বা পানীয় প্রস্তুতকারক সংস্থার এসব ব্যাপারে নিজস্ব গোপন ফর্মূলা থাকে।

তৃষিত বুঝতে পারল অন্য কোনও পানীয় প্রস্তুতকারককে এ প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যেত, নীলকণ্ঠবাবুও স্বাভাবিকভাবেই একই জবাব দিলেন। গোপন ফর্মূলা তো আর কেউ বাইরে বলবেন না।’

তৃষিত বলল, ‘আমার শেষ প্রশ্ন, হেমলকপ্রেমীদের কাছে আপনার বার্তা কী?’

নীলকণ্ঠবাবু হেসে বললেন, ‘হেমলকই হল জীবন, আর জীবনই হল হেমলক। হেমলক পান করুন, জীবন উপভোগ করুন।’

প্রশ্নোত্তর পর্ব মোটামুটি শেষ হল। তৃষিত এবার তার আসল প্রস্তাবটা পাড়ল। ‘আপনার কাছে আমার আর একটা অনুরোধ আছে। আপনি যদি আপনার কারখানাটা একবার ঘুরিয়ে দেখানোর ব্যবস্থা করেন তবে ভালো হয়। আপত্তি না থাকলে কারখানার ছবি নেব। আর আমার লেখাতেও অনেক সুবিধা হবে তাতে।’

কথাটা শুনে নীলকণ্ঠবাবু সাবলীলভাবে বললেন, ‘বেশ তো আসুন না। আমার কারখানাটা ডায়মন্ডহারবারের দিকে। এখন অবশ্য প্রোডাকশন বন্ধ আছে। আমি যদি দু-চার দিনের মধ্যে টেলিফোন করি তবে আপনি নিশ্চয়ই সেখানে চলে যেতে পারবেন! আসলে এ ক’দিন আমার কী কী অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে সেটা একবার আমাকে দেখে নিতে হবে। তাছাড়া বোঝেনই তো, হঠাৎ করে কখন কী কাজ এসে পড়ে! কাজেই ঠিক এই মুহূর্তে নির্দিষ্ট করে সময়টা বলতে পারছি না।’

তৃষিত বলল, ‘আমার কোনও অসুবিধা হবে না। ঘণ্টা দুয়েকের তো পথ। আপনি ফোন করলেই আমি পৌঁছে যাব।’ এই বলে তৃষিত তার ফোন নম্বর লেখা ভিজিটিং কার্ডটা এগিয়ে দিল নীলকণ্ঠবাবুর দিকে।

কার্ডটা হাতে নিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি নিশ্চয়ই ডেকে নেব আপনাকে। আমাকে এবার অফিস বন্ধ করে বেরোতে হবে। খুব খারাপ লাগছে যে, আপনি আমার অফিসে এলেন কিন্তু আপনাকে হেমলক খাওয়াতে পারলাম না। আমার ফ্যাক্টরিতে যেদিন যাবেন, সেদিন চেষ্টা করব খাওয়াতে। দেখা হবে।’ এই বলে নীলকণ্ঠবাবু চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

নীলকণ্ঠবাবুকে নমস্কার জানিয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে লিফটের দিকে এগোল তৃষিত। প্রাথমিক সাক্ষাতে নীলকণ্ঠবাবুকে বেশ সরল-সাধারণ মানুষ বলেই মনে হল তার। বিশেষত, ব্যবসায়ীসুলভ কোনও আত্ম-অহংকার লোকটার মধ্যে নেই।

দু’দিন পর সকালবেলা কিন্তু নীলকণ্ঠবাবু সত্যিই ফোন করলেন, ‘আজ চলে আসুন…।’

বেলা দশটা নাগাদ নীলকণ্ঠবাবুর টেলিফোন পেয়ে বেলা এগারোটা নাগাদ বেরিয়ে পড়েছিল তৃষিত তার বাইক নিয়ে। অফিসের গাড়ি নিলে ড্রাইভার ব্যাপারটা জেনে যেত। আর সেখানে ট্রেনে যাওয়া সমস্যার। কারণ, নীলকণ্ঠবাবু তাঁর কারখানার অবস্থান যে জায়গাতে বলে জানিয়েছেন তা রেলস্টেশন থেকে চোদ্দো-পনেরো কিলোমিটার দূরে। ডায়মন্ডহারবার রোড ধরে গেলেই সুবিধে হবে। তাই বাইক নিয়েই বেরিয়েছিল তৃষিত।

কলকাতা ছাড়াতেই ফাঁকা রাস্তা। শীতের নরম রোদ পিঠে লাগিয়ে বাইক চালাতে তৃষিতর ভালোই লাগছিল। রাস্তার দু’পাশে ফাঁকা মাঠ; ধানের খেত, মাঝে মাঝে ছোট ছোট গঞ্জের মতো জায়গা। গ্রামীণ মানুষজন। ধুলো-দূষণহীন এ এক অন্যরকম পরিবেশ।

নীলকণ্ঠবাবুর সেদিনের কথোপকথন নিয়ে দু’দিন ধরে চিন্তা করেছে তৃষিত। হেমলকের রেসিপির ব্যাপারে একটা ভাবনা তার মাথায় এসেছে। নীলকণ্ঠবাবুরা তো বংশ পরম্পরায় কবিরাজ ছিলেন। হয়তো তিনি হেমলকের সঙ্গে গাছ-গাছড়ার এমন কোনও আরক বা নির্যাস মেশান যা হেমলকে অদ্ভুত স্বাদ এনে দেয়। নীলকণ্ঠবাবু হেমলকের যে কাঁচা মালের অপ্রতুলতার কথা বললেন, তা কোনও দুষ্প্রাপ্য গাছ বা তার শিকড় হতে পারে। যা হয়তো সহজে পাওয়া যায় না।

ইতিমধ্যে নরম পানীয় কীভাবে তৈরি হয় তা নেট ঘেঁটে দেখেছে তৃষিত। তাতে কাঁচামাল হিসাবে যেসব জিনিসের কথা বলা আছে বাজারে তা সহজলভ্য। তার অভাবে উৎপাদন বন্ধ হবার কথা নয়। তৃষিতের তাই ধারণা হয়েছে যে, সেই কাঁচামাল কোনও দুষ্প্রাপ্য গাছ-গাছড়া হতে পারে।

বেলা দুটো নাগাদ জায়গাটার কাছাকছি পৌঁছে গেল সে। রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে চা খেতে বাইক থামাল সে। চা পানের পর তৃষিত বাইক নিয়ে রওনা হয়ে কিছুটা এগিয়ে পাকা রাস্তা ছেড়ে একটা কাঁচা পথ ধরল। মাইলখানেক চলার পর অবশেষে সে পৌঁছে গেল নীলকণ্ঠবাবুর কারখানার সামনে।

পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বিঘেখানেক জমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে হেমলকের কারখানা। তবে তা বেশি বড় নয়। মাথায় টিনের শেডওয়ালা একটা লম্বাটে বাড়ি। প্রবেশপথের মাথায় সাইনবোর্ডে লেখা আছে ‘হেমলক’। মেইন গেটটা একটি ফাঁক করা। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তৃষিত বারকয়েক বাইকের হর্ন বাজাল। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ বাইরে বেরিয়ে এল না বলে তৃষিত একটু ইতস্তত করে গেটের ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। কারখানার সামনের চত্বরটা শান বাঁধানো। সেখানে এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে হেমলকের ফাঁকা কার্টন, বোতল, নানা ধরনের ছোট-বড় পাত্র বা কনটেনার ইত্যাদি। জায়গাটার এক পাশে একটা ঘরের গায়ে ‘অফিস’ কথাটা লেখা আছে দেখে তৃষিত বাইক নিয়ে সে ঘরটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ঘরের ভেতর থেকে বাইরে এসে দাঁড়ালেন নীলকণ্ঠবাবু। আজও তাঁর গায়ে সেই তুষের কালো চাদরটা জড়ানো। তৃষিতকে দেখে নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘আসুন, আসুন, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি।’

বাইক থেকে নেমে গাড়িটা দাঁড় করাতে করাতে তৃষিত বলল, ‘এখানে কোনও লোকজন নেই? নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘প্রোডাকশনের সঙ্গে যুক্ত বলতে মাত্র চার-পাঁচজন লোক। আমার তো ছোট ফ্যাক্টরি। আর বলতে গেলে সব মেশিনেই হয়। এখন প্রোডাকশন বন্ধ তাই লোকজনও নেই।’

নীলকণ্ঠবাবুর সঙ্গে তাঁর অফিসঘরে ঢুকল তৃষিত। ঘরের চারদিকে কাগজপত্র ঠাসা আলমারি। হেমলকের কিছু হোর্ডিং, ব্যানারও আছে। তাছাড়া টেবিল-চেয়ার তো আছেই। নীলকণ্ঠবাবুর চেয়ারের একপাশে দেওয়ালের গায়ে একটা ছোট ফ্রিজও রয়েছে। টেবিলের দু’পাশে দুজন মুখোমুখি বসার পর নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘এতটা পথ বাইক চালিয়ে এসেছেন একটু জিরিয়ে নিন। আপনার এখানে আসতে কোনও সমস্যা হয়নি তো?’

তৃষিত বলল, ‘অসুবিধা হয়নি। জায়গাটা দূর হলেও রাস্তাটা মোটামুটি সোজাই। তবে এ অঞ্চলটা বেশ পলিউশন ফ্রি। শান্ত নিরিবিলি।’

নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, চারপাশে শুধুই ধানখেত। আগে এলে হয়তো দু-একজন লোককে ধানখেতে চোখে পড়ত আপনার। কিন্তু এখন তারাও শীতের ধান কেটে নিয়ে চলে গেছে। ফ্যাক্টরি চালাবার পক্ষে জায়গাটা আদর্শ। কোনও ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট নেই।’—এ কথা বলার পর নীলকণ্ঠবাবু চেয়ারে বসা অবস্থাতেই হাত বাড়িয়ে ফ্রিজ খুলে ইঞ্চি ছয়েক লম্বা একটা হেমলকের বোতল বের করে টেবিলে রেখে বললেন, ‘একটাই বোতল অবশিষ্ট ছিল। সেদিন আপনাকে খাওয়াতে পারিনি। আজ খান। তবে ওপেনার নেই। আপনাকে দাঁত দিয়ে ছিপি খুলতে হবে।’

বোতলটা দেখে তৃষিতের মনে হল সে যদি না খেয়ে বোতলটা সঙ্গে করে নিয়ে যায় তবে সেটা পরে কাজে লাগতে পারে কোনও পরীক্ষার জন্য। তাই সে বলল, ‘আপনি যদি কিছু মনে না করেন তবে বোতলটা সঙ্গে করে নিয়ে যাব ফেরার পথে রাস্তায় খাবার জন্য। আসলে একটু আগেই আমি রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে চা খেয়েছি। সঙ্গে জল নেই। ফেরার পথে বোতলটা কাজে লেগে যাবে।’

তৃষিতের কথা শুনে নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, নিয়ে যান, নিয়ে যান। কোনও অসুবিধা নেই।’

বোতলটা জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে তৃষিত বলল, ‘আপনাদের প্রোডাকশন আবার কবে নাগাদ শুরু হতে পারে? কালকেই একটা ঠান্ডা পানীয়ের দোকানে দেখলাম একটা ছেলে হেমলকের খোঁজ করছিল।’

কয়েকমুহূর্ত চুপ করে থেকে তৃষিতের দিকে তাকিয়ে নীলকণ্ঠবাবু জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, কাঁচামাল এসে গেছে। আশা করি, আর চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই হেমলকের কিছু বোতল বাজারে ছাড়তে পারব। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত পারি কিনা?’

এরপর বেশ কিছু মামুলি কথাবার্তার পর নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘চলুন তবে এবার ফ্যাক্টরিটা আপনাকে দেখিয়ে আনি?’

তৃষিত বলল, ‘হ্যাঁ। কিন্তু তার আগে একবার একটু ইউরিনালে যেতে পারলে ভালো হয়।’

নীলকণ্ঠবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘বাইরে চলুন। এ ঘরের পিছন দিকে একটা ইউরিনাল আছে।’

বাইরে বেরিয়ে এল তারা দু’জন। নীলকণ্ঠবাবুর দেখানো রাস্তায় ইউরিনালে গিয়ে ঢুকল তৃষিত। দরজা বন্ধ করে মোবাইল ফোনের মুভি ক্যামেরাটা চালু করে সেটা তার জ্যাকেটের বুক পকেটে তৃষিত এমনভাবে রাখল যাতে ফোনের ক্যামেরার অংশটা বাইরে বেরিয়ে থাকে। কারখানার ভেতরের অংশের ছবি তুলে নিয়ে যেতে পারলে নিশ্চয়ই খুশি হবেন বড়সাহেব। যদিও কারখানার ছবি তোলার কথা নীলকণ্ঠবাবুকে এর আগে জানিয়েছে তৃষিত। কিন্তু কারখানার ভেতরের অংশের ছবি বা বিশেষ বিশেষ যন্ত্রের ছবি তুলতে নাও দিতে পারেন নীলকণ্ঠবাবু। কাজেই এ পথ নেওয়াই ভালো। তৃষিত চটপট কাজ সেরে ইউরিনাল থেকে বেরিয়ে নীলকণ্ঠবাবুর কাছে ফিরে এল। তিনি তাকে নিয়ে এগোলেন কারখানার দিকে।

নীলকণ্ঠবাবুর সঙ্গে তৃষিত প্রবেশ করল কারখানার ভেতরে। প্রথমে বিরাট বড় একটা ঘরে ঢুকল তারা। বিশাল বড় একটা ধাতব গ্লোবের মতো আধার আছে সেখানে। মাটি থেকে আর দেওয়ালের গা বেয়ে নানা রকমের নল এসে যুক্ত হয়েছে সেই গ্লোবের সঙ্গে। নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘এ ঘরটাকে ফ্যাক্টরির আঁতুড়ঘর বলতে পারেন। এই যে বিশাল গ্লোবের মতো দেখছেন ওতে জল পিউরিফাই হয় অর্থাৎ পরিশুদ্ধ হয়। কিছু খনিজ লবণও মেশানো হয় জলের সঙ্গে। তারপর মানুষের পান করার উপযোগী পরিশুদ্ধ জল নলবাহিত হয়ে চলে যায় পাশের ঘরটাতে। যে ঘরটাকে আমরা ফ্যাক্টরির হেঁশেল বা কিচেন রুম বলি।’

তৃষিত ঘরটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে লাগল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে নীলকণ্ঠবাবুর অগোচরে তৃষিতের বুক পকেটের মোবাইল ক্যামেরা চলমান ছবি তুলে যেতে থাকল।

ঘরের মধ্যে দিয়েই এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাবার জায়গা। নীলকণ্ঠবাবু এরপর তৃষিতকে নিয়ে প্রবেশ করলেন তার রসুইঘরে। প্রথম ঘরের থেকে এ ঘরটার আকৃতি দ্বিগুণ বলা যায়। এ ঘরে নানা বিরাট মুখ হাঁ-করা পাত্র আছে ছোট-বড় নল দিয়ে যুক্ত। তাদের নলগুলো আবার মিশেছে ঘূর্ণায়মান একটা সিলিন্ডারের সঙ্গে। আর এ ঘরের বিশেষত্ব হচ্ছে এখান থেকে একটা লম্বা কনভেয়ার বেল্ট বা চলমান চওড়া ধাতব ফিতা ঘরের এক প্রান্ত থেকে একটা যন্ত্রের ভেতর থেকে বেরিয়ে সোজা সামনের আর একটা ঘরের ভেতর প্রবেশ করেছে দেওয়ালের গায়ের ফোকর দিয়ে। কনভেয়ার বেল্টের উপর ছ’ইঞ্চি দূরত্ব বরাবর তার খাঁজে হেমলকের বোতল বসানো। এছাড়া নানা ছোট-বড় যন্ত্রপাতি তো এ ঘরে আছেই। অবাক হয়ে ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল তৃষিত। নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘বলতে পারেন এ ঘরেই হেমলক তৈরির নিরানব্বই শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। ওই যে হাঁ-করা পাত্রগুলো দেখছেন ওখানে হেমলক তৈরির কাঁচামাল ঢালা হয়। সেগুলো কয়েকটা প্রক্রিয়ার মধ্যে গিয়ে মেশে ওই সিলিন্ডারে রাখা পরিশোধিত জলের সঙ্গে। তারপর আরও কয়েকটা প্রক্রিয়ার পর কনভেয়ার বেল্টে রাখা হেমলকের বোতলে বন্দি হয়।’

তৃষিত একটু কায়দা করে জানতে চাইল, ‘কাঁচামাল মানে?’

নীলকণ্ঠবাবু জবাব দিলেন, ‘চিনি, কিছু জিনিসের নির্যাস, তাছাড়া স্বাদ-গন্ধ-বর্ণের জন্য খাবার উপযোগী কিছু রাসায়নিক ইত্যাদি।’

তৃষিত গিয়ে দাঁড়াল কনভেয়ার বেল্টের সামনে পানীয় ভর্তি সার সার হেমলকের বোতল। বোতলগুলোর মুখ পাতলা অ্যালুমিনিয়ামের কাগজ দিয়ে সিল করা। নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘বলতে পারেন এগুলো প্রায় ফিনিশড প্রোডাক্ট। তবে সিলগুলো টেম্পোরারি। কনভেয়ার বেল্ট বাহিত হয়ে এরা চলে যাচ্ছে পাশের ঘরে। সেখানে যন্ত্রের মাধ্যমে সিল খুলে যায়। শুধু একটা জিনিস সেখানে মেশানো হয়। তারপর ছিপি বসে যায় বোতলের মুখে। তৈরি হয়ে যয় হেমলক।’

হেমলকের রসুইঘরটা তৃষিত ভালো করে দেখার পর নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘আসুন এবার আপনাকে কারখানার শেষ ঘরটা দেখাব।’

তৃষিতকে নিয়ে নীলকণ্ঠবাবু দাঁড়ালেন তৃতীয় ঘরের প্রবেশ মুখে। তবে এখানে কিন্তু ইস্পাতের একটা দরজা আছে। তালা ঝুলছে তাতে। চাবি বার করে তালা খুলতে খুলতে হেমলকের মালিক নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘এ ঘরে কিন্তু আমার অন্য কর্মচারীরাও ঢুকতে পায় না। শেষ কাঁচামালটা এ ঘরেই আমি মেশাই। বলতে পারেন সেটাই হেমলকের গোপন রেসিপি। আপনি এত আগ্রহ নিয়ে ফ্যাক্টরি দেখতে এসেছেন তাই এ ঘরে নিয়ে যাচ্ছি।’

তৃষিত বেশ খুশি হল কথাটা শুনে।

নীলকণ্ঠবাবুর সঙ্গে সে-ঘরে প্রবেশ করল তৃষিত। ঘরটার একটা অংশ প্ল্যাটফর্মের মতো উঁচু। কোনও জানলা নেই এ ঘরে। এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত একটা দেওয়ালের গা ঘেঁষে প্ল্যাটফর্মটা। তার ঠিক নীচে রয়েছে পাশের ঘর থেকে দেওয়াল ফুঁড়ে আসা বেল্টটা। কাঠের প্ল্যাটফর্মের এক জায়গাতে বিরিয়ানির হাঁড়ির মতো প্রকাণ্ড পাত্র আছে। আর তার নীচের অংশটা সরু হতে হতে শেষে একটা তীক্ষ্ন মুখওয়ালা ফানেলের রূপ নিয়েছে। কনভেয়ার বেল্টটা কিন্তু সোজা এগিয়ে উল্টোদিকের দেওয়ালের ফোকর গলে বাইরে বেরিয়ে গেছে। আর তার আগে কনভেয়ার বেল্টের উপর আর একটা ছোট যন্ত্র বসানো আছে। কাঠের প্ল্যাটফর্ম যেদিকে সেদিকের দেওয়ালে একটা ছোট অ্যান্টি চেম্বারের মতো ঘর আছে। তৃষিতকে নিয়ে কাঠের প্ল্যাটফর্মটার উপর উঠে সেই হাঁড়ির মতো আধারটার সামনে দাঁড়ালেন নীলকণ্ঠবাবু।

পাত্রটা যে কাঠামোর উপর আছে তার গায়ে একটা সুইচ দেখিয়ে নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘ব্যাপারটা আপনাকে বুঝিয়ে বলি। পাত্রটার ভেতর দাঁত আছে দেখতে পাচ্ছেন নিশ্চয়ই। এই বোতামটা চালু করে পাত্রের ভেতর কিছু ফেললেই কাঁটাগুলো সেটাকে পিষে রস বার করতে শুরু করে। সেটা গিয়ে জমা হয় নীচের ফানেলে। কনভেয়ার বেল্টটা চালু হয়ে যায়। বেল্ট বেয়ে পাশের ঘর থেকে বোতলগুলো এসে থামে এই সূচিমুখ ফানেলের নীচে। ফানেলের মুখটা ওঠা-নামা করে ছন্দোবদ্ধভাবে। অ্যালুমিনিয়াম কাগজ ভেদ করে প্রতিটা বোতলের ভেতরে এক ফোঁটা তরল প্রবেশ করানো হয় ফানেলের মুখ দিয়ে। সেলাই মেশিনের সূচের মতোই ওঠা-নামা করে বিশাল এই পাত্রের নীচের ফানেলটা। ফানেলের বাহিত তরলের ফোঁটা বোতলে প্রবেশ করার পরই সেটা এগিয়ে যায়। তারপর কনভেয়ার বেল্টের উপর আর একটা যে ছোট যন্ত্র দেখছেন তার মাধ্যমে ছিপি এঁটে কনভেয়ার বেল্টের মাধ্যমেই দেওয়ালের ওপাশে বেরিয়ে যায়। ওপাশে একটা বড় বাস্কেট আছে। তার মধ্যে গিয়ে জমা হয় বোতলগুলো। সেখান থেকে বোতল সংগ্রহ করে বাজারে পাঠাবার জন্য কাগজের বাক্সে ভরা হয়। এই হল পুরো ব্যাপারটা।’

নীলকণ্ঠবাবু তৃষিতকে বুঝিয়ে দিলেন এ ঘরের যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে।

তৃষিত যথাসম্ভব ভালো করে দেখার চেষ্টা করতে লাগল ঘরের যন্ত্রপাতিগুলোকে।

বিশাল হাঁড়ির মতো পাত্রটার ভেতরটাতে উঁকি দিয়ে দেখছিল তৃষিত। একটা মানুষ ঢুকে যেতে পারে তার মধ্যে। ঠিক এমন সময় নীলকণ্ঠবাবু বলে উঠলেন, ‘এ ঘরে হেমলকে কী মেশানো হয় সেটাই হয়তো আপনি জানতে চান তাই না? সেটা জানার জন্যই তো আপনি আসলে এখানে এসেছেন? হেমলকের গোপন ফর্মূলা?’

কথাটা শুনে মৃদু চমকে উঠে তৃষিত তাকাল নীলকণ্ঠবাবুর দিকে। আবছা হাসি ফুটে উঠেছে নীলকণ্ঠবাবুর ঠোঁটের কোণে। তৃষিতকে অবাক করে দিয়ে তিনি এরপর বললেন, ‘আপনার কাগজের কোম্পানির মালিক আর রেনবো পানীয়র মালিক তো একই ব্যক্তি—পরিতোষ চ্যাটার্জি। ঠিক কিনা? আর তিনিই আপনাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন ব্যাপারটা অনুসন্ধান করতে। আপনার জ্যাকেটের বুক পকেটে রাখা মোবাইল ফোনে একটা আলোকবিন্দু যে মাঝে মাঝে জ্বলে উঠছে সেটাও খেয়াল করেছি আমি। সম্ভবত মোবাইল ফোনের ক্যামেরাটা ছবি তুলে চলেছে চারপাশের।’

ধরা পড়ে গেছে তৃষিত। সে কী বলবে তা বুঝে উঠতে পারছে না। তার অবস্থা দেখে নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘আপনার অবস্থা আমি বুঝতে পারছি, লজ্জা পাবার কিছু নেই। আপনি যে ব্যাপারটা জানার জন্য এখানে এসেছেন সে ব্যাপারটা বলব আপনাকে। একটু গোড়া থেকেই খুলে বলি সে ঘটনার কথা—’

নীলকণ্ঠবাবু মৃদু চুপ করে থেকে বলতে লাগলেন, ‘আপনাকে তো বলেইছি এই কারখানাটা আমি কীভাবে কিনেছিলাম। কারখানা তো কিনলাম, চালুও করলাম। কিন্তু নামী-দামি কোম্পানির সঙ্গে লড়াই করে বাজার ধরা কি মুখের কথা? তার ওপর বিজ্ঞাপন দেবার সামর্থ্য ছিল না। কিছু দিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম যে, এ ব্যবসাতে আমি ডুবতে চলেছি। একসময় অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে বেতন না পেয়ে কাজ বন্ধ করে দিল কর্মীরা। তখন আমার সামনে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনও পথই খোলা নেই। বাজারে বেশ দেনাও হয়ে গেছে। ঠিক এমন সময় অনেকটা কাকতালীয়ভাবে একটা ছোট ক্যাটারার সংস্থা আমাকে মাত্র একশো বোতলের অর্ডার দেয়। কর্মীরা তখন কাজ বন্ধ করে দিলেও কয়েকশো বোতল তখনও এই কারখানায় প্রায় তৈরি হয়ে বসেছিল। শুধু শেষ জিনিসের একটা ফোঁটাই তখন মেশানো বাকি ছিল বোতলে।

অর্ডারটা পেলে যে দু-তিনশো টাকা আমার লাভ তখন সে টাকাই আমার কাছে অনেক। কাজেই সেই লোভে একদিন একলাই চলে এলাম ফ্যাক্টরিতে। সেসময়ে আমার তৈরি একটা আয়ুর্বেদিক মণ্ড আমি ফেলতাম এই হাঁ করা পাত্রে। তা নিংড়ে এক ফোঁটা করে রস মিশত প্রতি বোতলে। ওটা মিশিয়ে পানীয়তে একটা ঝাঁঝ তৈরি করতাম আমি। সেদিনও যন্ত্রগুলো নিয়ে এ ঘরে ঢুকলাম আমি। মেশিনটাও চালু করলাম। কিন্তু মণ্ডগুলো ঢালতে যেতেই অসতর্কতার কারণে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। আমার হাতটা কোনওভাবে আটকে গেল পাত্রের ভেতর। আর ভেতরের কাঁটাগুলো পিষতে শুরু করল আমার হাতটাকে। এই বলে একটু কেঁপে উঠে থেমে গেলেন নীলকণ্ঠবাবু। সম্ভবত সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতিটাই তার শরীরে কাঁপন ধরাল।

তৃষিত বিস্মিতভাবে বলে উঠল, ‘তারপর? তারপর?’

নীলকণ্ঠবাবু আবার বলতে শুরু করলেন, ‘কোনওরকমে হাতটাকে এই গহ্বর থেকে বার করে আমি হাসপাতালে ছুটলাম। দিনচারেক আমাকে সেখানে থাকতে হল। সাত দিন পর আবার আমি ফিরে এলাম এই ফ্যাক্টরিতে। মেশিনটা চালু থাকায় একশোর মতো বোতল তখন সিল হয়ে গিয়েছিল। সেগুলো আমি পাঠিয়ে দিলাম সেই ক্যাটারারের কাছে। কয়েকদিন পর ক্যাটারার এসে জানাল যে, আরও পাঁচশো বোতালের জোগান দিতে হবে আমাকে। হেমলক খেয়ে সবাই নাকি ধন্য ধন্য করছে। কিন্তু ব্যাপারটা কী? একটু ভাবতেই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল ব্যাপারটা। কাঁটাগুলো যখন আমার হাতটাকে পিষছিল তখন যে রক্ত বেরিয়েছিল তা এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে মিশেছিল হেমলকের বোতলে। যে পদার্থগুলো হেমলকের মধ্যে ছিল তার সঙ্গে ওই এক ফোঁটা রক্তের রাসায়নিক ক্রিয়াতে হেমলকের ওই অপূর্ব স্বাদ সৃষ্টি হয়েছে…।’

তৃষিত বলে উঠল, ‘কী বলছেন আপনি?’

নীলকণ্ঠবাবু শান্ত স্বরে বললেন, ‘ঠিকই বলছি। হেমলকের স্বাদের গোপন রহস্য ওই এক ফোঁটা রক্ত। গল্পটা আপনি বিশ্বাস করলেন না? তবে এই দেখুন।’—এই বলে তিনি চাদরের তলা থেকে তাঁর ডান হাতটা বার করলেন। ক্ষত-বিক্ষত সে হাতের কব্জি থেকে নীচের অংশটা নেই।

তৃষিত স্তম্ভিত, হতভম্ব!

নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘এক মিলিমিটার রক্ত মানে কুড়ি ফোঁটা রক্ত। আমরা যে এক পাউচ বা এক ইউনিট রক্ত দিই তাতে পাঁচশো মিলিলিটার রক্ত থাকে। অর্থাৎ এক ইউনিট রক্ত দিয়ে এক হাজার বোতল হেমলক বানানো যায়। আমি মিথ্যা বলি না। প্রথম দিন আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় আমি আপনাকে বলেছিলাম হেমলক তৈরি হয়েছে আমার রক্ত আর পরিশ্রম দিয়ে। তার আসল অর্থ সেদিন আপনি ধরতে পারেননি।

তৃষিত নিজের চোখ-কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। সে বলল, ‘আপনি নিশ্চয়ই মজা করছেন আমার সঙ্গে? আপনি কি তবে ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে রক্ত এনে হেমলকের সঙ্গে মেশান?’

এ প্রশ্নের জবাবে নীলকণ্ঠবাবু যা বললেন, তাতে আরও চমকে গেল তৃষিত। নীলকণ্ঠবাবু বললেন, ‘সে চেষ্টা আমি করেছিলাম। কিন্তু টাটকা গরম রক্তের ফোঁটা না হলে হেমলকের স্বাদটা ঠিক আসে না। ওই ঘটনার পর থেকে এ ফ্যাক্টরি আমি একাই চালাই। ভবঘুরে ধরনের কোনও লোক পেলে এখানে নিয়ে আসি, আর আপনার মতো কিছু অতি উৎসাহী লোকও কখনও-সখনও আমার এখানে আসেন। আর আপনারাই তো আমার হেমলকের দুষ্প্রাপ্য কাঁচামাল, গোপন রেসিপি। যখন পাই না প্রোডাকশন বন্ধ থাকে। একজন মানুষের শরীরে সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ লিটার রক্ত থাকে। হাজার সাত আটেক বোতল তো অনায়াসে তৈরি হয়ে যায় তা দিয়ে। প্রতি বোতলের জন্য তো মাত্র এক ফোঁটা রক্ত লাগে।’—এই বলে তৃষিতের দিকে বাম হাত তুলে ধরলেন নীলকণ্ঠবাবু। কখন যেন তাঁর হাতে উঠে এসেছে একটা পিস্তল।

তৃষিত হতভম্ব হয়ে গেল। মৃদু কাঁপা গলায় সে বলে উঠল, ‘আপনি পিস্তল বার করলেন কেন?’

হিংস্র হাসি ফুটে উঠেছে নীলকণ্ঠবাবুর ঠোঁটের কোনো। হিস হিস করে চাপা স্বরে তিনি বলে উঠলেন, ‘যাতে আপনি ফিরে গিয়ে এ গল্প কাউকে করতে না পারেন সে জন্য, যাতে আরও বেশ কয়েক হাজার হেমলকের বোতল বাজারে ছাড়া যায় সে জন্য। জানেনই তো প্রচুর চাহিদা হেমলকের।’

এরপর তিনি তৃষিতকে বললেন, ‘সামনে ছোট ঘরের যে দরজাটা আছে ওর ভেতরে ঢুকে পড়ুন। আমি চেষ্টা করব মৃত্যুর আগে যতটা সম্ভব কম যন্ত্রণা দিতে আপনাকে। আপনার শরীর থেকে ধীরে ধীরে রক্ত নেব আমি। কয়েকটা লোককে তো আমি সটান এই কাঁটাওয়ালা পেষাই পাত্রের ভেতর ঠেলে ফেলেছিলাম। আমি পাঁচ গুনব অথবা গুলি চালাব। তাতে দুটো দিন আয়ু কমে যাবে আপনার।’

পাশবিক হাসি ফুটে উঠেছে নীলকণ্ঠবাবুর মুখে। তিনি ধীরে ধীরে গুনতে শুরু করলেন—’এক… দুই…।’

পিছু হটতে শুরু করল তৃষিত। কিন্তু এরপরই হঠাৎ তার মনে হল যে এই মুহূর্তে হোক আর দু’দিন পর হোক মরতে যখন তাকে হবেই এখন বাঁচার জন্য একটা শেষ চেষ্টা তাকে করতেই হবে। কিন্তু কীভাবে? আর এরপরই হঠাৎ তার খেয়াল হল জ্যাকেটের পকেটে রাখা হেমলকের বোতলটার কথা। বাঁচার শেষ চেষ্টা স্বরূপ সেই বোতলটা মুহূর্তের মধ্যে বার করে তৃষিত সজোরে ছুড়ে মারল নীলকণ্ঠবাবুকে লক্ষ করে।

এ ঘটনা যে ঘটতে পারে তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। বোতলটা প্রচণ্ড জোরে আছড়ে পড়ল তাঁর মাথায়। তার হাতের পিস্তলটা ছিটকে পড়ল মাটিতে। প্রচণ্ড শব্দে একটা গুলি বেরিয়ে গেল তার থেকে। কিন্তু নীলকণ্ঠবাবু এত সহজে দমবার পাত্র নন। কাচের বোতলের আঘাতে কপাল ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে তাঁর। সেই অবস্থাতেই ঝুঁকে পড়ে মাটি থেকে পিস্তলটা কুড়িয়ে নিতে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু তৃষিত ছুটে এসে ধাক্কা মারল তাঁকে। আর টাল সামলাতে না পেরে নীলকণ্ঠবাবু হুমড়ি খেয়ে পড়লেন সেই হাঁড়ির মতো পেষাইযন্ত্রের ভেতরে। নীলকণ্ঠবাবু তাঁর শরীরটাকে তার ভেতর থেকে বার করে আনতে চেষ্টা করছিলেন ঠিকই কিন্তু বাইরে বেরিয়ে থাকা তাঁর শরীরের নীচের অংশের ধাক্কাতে কোনওভাবে চাপ লাগল কাঠামোর গায়ের স্যুইচটাতে। চালু হয়ে গেল পেষাই যন্ত্র। তার ধাতব কাঁটাগুলো আঁকড়ে ধরল গহ্বরের ভেতরে থাকা নীলকণ্ঠবাবুর দেহের ঊর্ধ্বাংশকে। সেই ভয়ঙ্কর পেষাই যন্ত্রের ভেতর থেকে শেষ একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল নীলকণ্ঠবাবুর গলা থেকে। তারপর তৃষিতের চোখের সামনে নীলকণ্ঠবাবুর পুরো দেহটাই ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল হাঁ করা পেষাই যন্ত্রের গহ্বরে। একটা অদ্ভুত মট মট শব্দ শুধু ভেসে আসতে লাগল সেই হাঁড়ির মতো পেষাই যন্ত্রের ভেতর থেকে। সম্ভবত হাড় আর খুলি ভাঙার শব্দ।

তৃষিতের যখন সম্বিত ফিরল, ততক্ষণে কনভেয়ার বেল্টটাও চালু হয়ে গেছে। পাশের ঘর থেকে সে বহন করে আনছে হেমলকের বোতলগুলো। বোতলগুলো এসে কয়েকমুহূর্তের জন্য থামছে পেষাই যন্ত্রের নীচে। যন্ত্রের নীচের সরু ধাতব ফানেলের সূচাগ্র মুখটা মুহূর্তের জন্য বোতলের ভেতর প্রবেশ করে এক ফোঁটা করে রক্ত মিশিয়ে দিচ্ছে হেমলকের বোতলে। চুনির মতো এক ফোঁটা গাঢ় রক্ত মিশে যাচ্ছে সাদা রঙের পানীয়তে। বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছে স্বচ্ছ বোতলগুলোর ভেতরটা। তারপর সেই বোতলগুলো কনভেয়ার বেল্ট বাহিত হয়ে কিছু দূরের ছোট যন্ত্রের ভেতর ঢুকে ছিপি এঁটে বেরিয়ে যাচ্ছে ঘরের বাইরে।

তৃষিত এরপর সেখানে আর দাঁড়াল না। একবার সে বোতলগুলোর দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে টলতে টলতে সেই ঘর ছেড়ে, কারখানা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে কোনওরকমে বাইকে চেপে বসল। শীতের বেলা, সূর্য ডুবে গেছে। চারপাশের খোলা মাঠ থেকে অন্ধকার আর কুয়াশা ভেসে আসছে কারখানার দিকে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকারে হারিয়ে যাবে সব কিছু। বাইক স্টার্ট করে তৃষিত রওনা হল কলকাতার দিকে। তার পিছনে পড়ে রইল হেমলকের কারখানা। তখনও হয়তো হেমলকের প্রতিটা বোতলে এক ফোঁটা করে মিশে চলেছে নীলকণ্ঠবাবুর রক্ত। হেমলকের গোপন রেসিপি। যা তৈরি করছে হেমলকের অতুলনীয় স্বাদ।

এই গল্পের সব চরিত্র, সব সংস্থার নাম ও ঘটনা কাল্পনিক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *