পাতাল বটুক

পাতাল বটুক

শীতের সকালে তাদের ছোট্ট বারান্দায় বসে বেশ আয়েস করে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজ দেখছিল পর্ণাভ। হঠাৎই একটা পাতায় একটা ছোট খবরে চোখ আটকে গেল তার। মাত্র চোদ্দ পনেরো লাইনের একটা খবর। আর পর্ণাভ সেটা পাঠ করেই বেশ উত্তেজিতভাবে বলল, ‘আরে দ্যাখো বড় জ্যাঠার খবর বেরিয়েছে কাগজে।’

রান্না ঘরে ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছিল সেমন্তী। পর্ণর কথা শুনে সে বারান্দাতে এসে বলল, ‘বড় জ্যাঠা মানে সেই যে যিনি…।’

সেমন্তীকে কথা শেষ করতে না দিয়ে পর্ণাভ বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তিনিই। কাগজে কি লিখেছে শোন—

কথাটা বলেই সংবাদটা পাঠ করতে শুরু করল—

‘যাবজ্জবীন কারাদণ্ড প্রাপ্ত বন্দির মুক্তি।’

নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা—

দীর্ঘ পনেরো বছর পর কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে মুক্তি পেলেন খুনের মামলার আসামি ঈশান চক্রবর্তী। পনেরো বছর আগে বীরভূম জেলার বাসিন্দা ঈশান চক্রবর্তী তার স্ত্রী তারাসুন্দরীকে নৃশংসভাবে খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। নিম্ন আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ শুনিয়েছিলেন। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলেই সাজা খাটছিলেন ঈশান। যদিও উচ্চ আদালতে তিনি তার প্রতি সুবিচারের আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারী নানা টালবাহানা ও আদালত কর্মীদের মন্থরতার ফলে মামলার শুনানি হতে পনেরো বছর সময় লেগে গেল। অবশেষে কলকাতা হাইকোর্টের মহামান্য ডিভিশন বেঞ্চ ঈশান চক্রবর্তীকে বেকসুর খালাস বলে ঘোষণা করেছেন। সকালে আদালতের রায় বেরবার পর দীর্ঘ পনেরো বছর মিথ্যা মামলাতে সাজা খেটে এদিন বিকালেই সেন্ট্রাল জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বীরভূমে বাড়ি ফেরার জন্য রওনা হয়েছেন তিনি।’

লেখাটা পাঠ করে পর্ণাভ বেশ উৎফুল্ল ভাবে বলল, ‘আজ যদি বাবা-মা বেঁচে থাকতেন তবে খুব খুশি হতেন এ খবরটা শুনে। যদিও বড় জ্যাঠামশাই ঠাকুর্দার পালিত পুত্র ছিল। সন্তান না হওয়ার কারণে প্রথমে তিনি দত্তক নিয়েছিলেন তাকে। তারপর ঠাকুমার তিন সন্তান বাবা কাকাদের একে একে জন্ম হয়, তবু তিনি বাবার দাদা তো। শেষের দিকে ঠাকুমা বাবা-কাকাদের খুব বেশি যোগাযোগ না থাকলেও জেঠাইমার খুনের ঘটনাটা ঘটে যাবার পর বাবা কিন্তু প্রায়ই বলতেন, ‘হতে পারেন তিনি তন্ত্র সাধনা করেন, তাই বলে নিজের স্ত্রীকে খুন করবেন তা হতেই পারে না। তারাসুন্দরীদেবীর পৈত্রিক সম্পত্তিতে অনেক বড় অংশ ছিল। আর সেই সম্পত্তির লোভে তার জ্ঞাতি ভাইরাই তাকে খুন করায়, তারপর ঈশান চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে জেলে পাঠায়। সত্যি একদিন প্রকাশ পাবেই।’

সেমন্তী জানতে চাইল, ‘তোমার জেঠাইমার খুনের ঘটনা যখন ঘটে তখন তোমার বয়স কত?’

পর্ণাভ বলল, ‘পনেরো-ষোলো বছর হবে। তবে জ্যাঠাইমার মুখটা আমার ঠিক মনে নেই। বাবার সঙ্গে আমার শেষ ওই বাড়িতে যাওয়া বছর দশেক বয়সে। আমার জন্মের অনেক আগেই ঠাকুর্দার মৃত্যুর পর ঠাকুমা বীরভূমের পাঠ চুকিয়ে নিজের ছেলেদের নিয়ে কলকাতায় চলে এসেছিলেন। সেখানে শুধু রয়ে গেছিলেন বড় জ্যাঠা। তারপর তিনি বিয়ে করেন।

আমার কিন্তু বড় জ্যাঠার চেহারাটা স্পষ্ট মনে আছে। টকটকে ফর্সা লম্বা চেহারা। খালি গা, গলাতে রুদ্রাক্ষের মালা, পরনে একট লাল কাপড় লুঙ্গির মতো করে পরা। পায়ে কাঠের খড়ম। তখন মনে হয় তার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। গালে কাঁচাপাকা দাড়ি ছিল। আমি তার আগে কোনো দিন খড়ম দেখিনি। তাই তাকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, ‘বড় জ্যাঠা’ আপনার পায়ে ওটা কী?’

তিনি হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘একে খড়ম বলে। বেল কাঠের পাদুকা।’

তারপর তিনি হেসে জানতে চেয়েছিলেন, ‘তুমি আমাকে বড় জ্যাঠা বলছ কেন? শুধু জ্যাঠা বা জ্যাঠামশাই বললেই তো হয়?’

জবাবটা অবশ্য আমার হয়ে বাবাই দিয়েছিলেন, ‘আসলে অন্য ভাইয়ের ছেলেরা তো আপনাকে বড় জ্যাঠা বলে। তা শুনেই ও বলেছে।’ ব্যস এটুকু স্মৃতিই আমার মনে আছে।’

সেমন্তী এরপর প্রশ্ন করল, ‘উনি জেলে যাবার পর তোমরা কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে যাওনি?’

পর্ণাভ জবাব দিল, ‘বাবা একবার গেছিলেন। অন্য কাকারা যাননি। আসলে বাবার সঙ্গেই যা একটু সম্পর্ক ছিল বড় জ্যাঠার। ঠাকুমা আর কাকারা তো পরের দিকে বড় জ্যাঠার নামই সহ্য করতে পারতেন না ঠাকুর্দা বীরভূমের বাড়িটা বড়জ্যাঠাকে লিখে দিয়েছিলেন বলে। বাগান সমেত পেল্লায় দোতলা বাড়ি। ঠাকুর্দা জজকোর্টের উকিল ছিলেন। দু-হাতে পয়সা রোজগার করতেন।’

সেমন্তী জানতে চাইল, ‘তোমার ঠাকুর্দাই বা স্ত্রী, নিজের সন্তানদের বঞ্চিত করে বাড়িটা বড় জ্যাঠাকে লিখে দিয়েছিলেন কেন?’

চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে একটু ভেবে পর্ণাভ বলল, ‘আসলে বড় জ্যাঠা তেমন পড়াশোনা করেননি বাবা-কাকাদের মতো। ঠাকুর্দা কোটের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন আর ঠাকুমা নিজের ছেলেদের নিয়েই। যতদূর জানি ক্লাস এইটের পর আর পড়াশোনা করা হয়ে ওঠেনি বড় জ্যাঠার। সম্ভবত শেষ জীবনে ঠাকুর্দা তার দত্তক পুত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কিত ছিলেন। ঠাকুমাও খুব একটা ভালো ব্যবহার করতেন না তার সঙ্গে। কাজেই তার দত্তক পুত্র ভবিষ্যতে কোথায় থাকবে, কী খাবে, এ সব ভেবে নিয়ে শেষ পর্যন্ত ঠাকুর্দা বড় জ্যাঠাকেই বাড়িটা লিখে দেন।

তাছাড়া বড় জ্যাঠাকে স্নেহ করার পিছনে ঠাকুর্দার আর একটা কারণ ছিল। ঠাকুর্দাও একটু আধটু জ্যোতিষচর্চা করতেন। আর বড় জ্যাঠার কিশোর বয়স থেকেই তন্ত্রসাধনার প্রতি ঝোঁক ছিল। বীরভূম জেলা হল তন্ত্রসাধনার পীঠস্থান। অনেক তান্ত্রিকের দেখা মেলে সেখানে। এ ব্যাপারটাতে কিছুটা মিল ছিল তাদের দুজনের মধ্যে। আর ঠাকুর্দা কিন্তু ঠাকুমা বা, বাবা-কাকাদের বঞ্চিত করেননি। ঠাকুর্দা তার গচ্ছিত মোটা অঙ্কের টাকা সম্পূর্ণটাই দিয়েছিলেন ঠাকুমা ও অন্য পুত্রদের।’

সেমন্তী বলল, ‘অত বড় বাড়িতে তবে এখন একা কী করবেন বড় জ্যাঠা? নতুন করে আবার বিয়ে করার, সংসার করার বয়সও তো পেরিয়ে গেছে।’

পর্ণাভ কথাটা শুনে হেসে বলল, ‘আমার কী মনে হচ্ছে জানো? একবার বড় জ্যাঠার সঙ্গে দেখা করতে গেলে কেমন হয়? আমার পরিচয় পেলে হয়তো বা তিনি খুশিই হবেন। বাবাকে তিনি স্নেহ করতেন। সেই সঙ্গে পূর্বপুরুষদের ভিটেটাও দেখিয়ে আনা যাবে তোমাকে। কিছুটা আউটিং-ও হবে। অফিস আর বাড়ি করা ছাড়া অনেক দিন বাইরে যাওয়া হয়নি। আমার অফিসে ছুটি জমেছে। যাবে নাকি ক’দিনের জন্য? ফেরার পথে তারাপীঠ, শান্তিনিকেতন হয়ে ফেরা যেতে পারে। তাছাড়া…।’—এই বলে থেমে গেল পর্ণাভ।

‘তাছাড়া কী?’ জানতে চাইল সেমন্তী।

পর্ণাভ বলল, ‘এ খবরটা হয়তো তোমার খুড়তুতো দেওরদেরও চোখে পড়বে। এত বড় সম্পত্তিটার ওপর ওদের বেশ লোভ আছে। এর আগে একটা বিয়ে বাড়িতে ওদের সঙ্গে দেখা হওয়াতে ওরা বাড়িটার ভবিষ্যৎ জানতে চেয়েছিল। বলেছিল বাড়ি-জমিটা কোনোভাবে বিক্রির বন্দোবস্ত করা যায় কিনা? তখন অবশ্য জানা ছিল না যে বড় জ্যাঠা কোনোদিন মুক্তি পাবে। আমি অবশ্য বাড়িটা নিয়ে বেআইনি ঝামেলাতে যেতে রাজি হইনি। বড় জ্যাঠার মুক্তির খবর পেয়ে তারা হয়তো এতদিন পর উপস্থিত হতে পারে বাড়িটা হাতাবার জন্য। আমরাও যাতে বঞ্চিত না হই সে জন্যও একবার ওখানে যাওয়া দরকার।’

সেমন্তী বলল, ‘ওসব ব্যাপার তুমি বোঝ। কিন্তু মানবিক কারণেও লোকটাকে একবার দেখে আসা দরকার। বিনা দোষে এতগুলো বছর জেল খাটলেন। একে তার আর কেউ নেই, তার ওপর আবার বয়সও হয়েছে।’

পর্ণাভ হিসাব করে বলল, ‘তা সত্তর-বাহাত্তর বছর বয়সতো হবেই।’

সেমন্তী বলল, ‘সমস্যা হল, আমাদের দেখেও তিনি যদি ভাবেন—আমরা ওই সম্পত্তির লোভে দেখা করতে গেছি? তিনি যদি আমাদের সেখানে থাকতে না দেন তখন?’

পর্ণাভ বলল, ‘তিনি কি ভাববেন তা জানি না। তবে থাকতে তিনি দেবেন বলেই মনে হয়। কারণ, ঠাকুর্দা তাকে বাড়িটা দান করলেও তার দানপত্রে একটা শর্ত ছিল যে ঠাকুর্দার অন্য কোনো পুত্র অথবা তার পৌত্ররা যদি তার পূর্বপুরুষের ভিটেতে এসে থাকতে চায় তবে সাত রাত থাকতে দিতে হবে। পূর্ব পুরুষদের ভিটে দেখা থেকে তাদের বঞ্চিত করা যাবে না। তবে এ সব নিয়ে অযথা ভেবে লাভ নেই। গেলে চলো। তবে গাড়িতে করে দুদিন পর রবিবার সকালেই বেরিয়ে পড়ব। কলকাতা থেকে সেখানে পৌঁছতে ঘণ্টা পাঁচেক লাগবে। সিউড়ি পর্যন্ত রাস্তা আমি চিনি। তারপর সেখান থেকে হরীতকী বাগান কোথায় জেনে নেব। অসুবিধা হবে না।’

সেমন্তী বলল, ‘ঠিক আছে চলো তবে। রবিবারেই রওনা হব তোমার বাপ-ঠাকুর্দার ভিটের উদ্দেশে। তিনি এখন কলঙ্কমুক্ত একজন মানুষ। ঠিক আমাদেরই মতো। তার সঙ্গে দেখা করতে এখন আর অন্য কোনো বাধা নেই।’

গাড়ি চালাচ্ছিল পর্ণাভই। তার বাবার আমলের পুরোনো অ্যাম্বাসাডার গাড়িটা যত্নে রাখার কারণে এখনও বেশ ভালোই চলে। পর্ণাভর পাশের আসনে বসে সেমন্তী। কোনো ড্রাইভারকে সঙ্গে নিলে আবার তার থাকা-খাওয়ার হাঙ্গামা আর বাড়তি অনেকগুলো টাকা খরচ দিতে হতো। সকালে যখন তারা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল তখন কলকাতা শহরে শীতের কুয়াশা কাটেনি।

ওদের কোনো তাড়া নেই। তাই ধীরে সুস্থেই গাড়ি চালাচ্ছিল পর্ণাভ। ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল বর্ধমানের শক্তিগড়। সেখানে চা জলখাবার খেয়ে আবার যাত্রা শুরু। ফাঁকা রাস্তা। দুপাশে কোথাও অনাবাদি জমি, কোথাও ধানের ক্ষেত। আবার কোথাও ছোট ছোট বাজার-দোকানপাট। শীতের সবজি সাজিয়ে বসেছে চাষীরা। গ্রামের দিকে বড় একটা আসা হয় না পর্ণাভর। তাই চারপাশ দেখতে দেখতে এগোতে বেশ ভালোই লাগছিল তাদের। বেলা দশটা নাগাদ সিউড়িতে পৌঁছে গেল তারা। বেশ বড় মফস্বল শহর। আধুনিক দোকান, বাজার লোকজন সবই আছে। তবে তারা শহরের ভিতর ঢুকল না। শহরে ঢোকার রাস্তার মুখে একটা ছোট চায়ের দোকানের সামনে গাড়ি থেকে নামল চা পান করার জন্য আর হরীতকী বাগানের রাস্তাটা চিনে নেবার জন্য। চায়ের দোকানের সামনে কেঠো বেঞ্চে চাদর মুড়ি দিয়ে বসেছিলেন কয়েকজন বৃদ্ধ। পর্ণাভ চায়ের দোকানীকে দু-ভাঁড় চা দিতে বলার পর তাদের দেখে এক বৃদ্ধ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কোথা থেকে আসছেন? কোথায় যাবেন?’

পর্ণাভ বলল, ‘কলকাতা থেকে আসছি। হরীতকী বাগান যাব। জায়গাটা কোথায় বলতে পারেন?’

প্রশ্ন শুনে এক বৃদ্ধ বললেন, ‘এখান থেকে সোজা রাস্তা ধরে পাঁচ মাইল গেলে, বাম হাতে পঞ্চায়েতের সুরকি বিছানো রাস্তা পাবেন। সে রাস্তা ধরে মাইল তিনেক হর্তুকিবাগান। এক সময় ওখানে অনেক হর্তুকি গাছ ছিল। এখন আর নেই। নামটাই শুধু রয়ে গেছে। ওখানে একটা পুকুর আছে ‘কালো বাওড়’ নাম। আমি এককালে ওখানে মাছ ধরতে যেতাম।’

‘কালো বাওড়’ নামটা শুনে পর্ণাভর তার বাবার মুখে শোনা একটা কথা মনে পড়ে গেল। লোকজনের সামনে পর্ণাভ আর কথাটা বলল না সেমন্তীকে।

চা-পান হয়ে গেলে আবার গাড়িতে উঠে এগোতে এগোতে পর্ণাভ এবার বলল, ‘উনি যে কালো বাওড় নামের পুকুরটার কথা বললেন ও নাম আমি বাবার মুখে শুনেছি। ছেলেবেলাতে বাবার সঙ্গে যখন এসেছিলাম তখন দেখেছি ও। হয়তো এখন খেয়াল করতে পারছি না।’

এরপর একটু হেসে সে বলল, ‘বাবার মুখে শুনেছি, ওই পুকুরেই নাকি বড় জ্যাঠাইমার লাশটা ভেসে উঠেছিল।’

কথাটা শুনে সেমন্তী বলল, ‘জলে ডুবিয়ে মারা হয়েছিল ওনাকে?’

পর্ণাভ বলল, ‘না জলে ডুবিয়ে নয়। তার দেহটা জলে ফেলা হয়েছিল তাকে খুন করার পর। মুন্ডুহীন লাশ। ধড়টাই কেবল ভেসে উঠেছিল। কে যেন মুন্ডুটা কেটে ফেলেছিল কোনো ধারালো অস্ত্রের এক কোপে। পুকুরে জালটাল ফেলেও আর জেঠাইমার মুন্ডুটা উদ্ধার করা যায়নি।’

পর্ণাভ সম্ভবত এরপর আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ওই মুন্ডুকাটা লাশের কথা শুনে সেমন্তী আঁতকে উঠে বলল, ‘থাক থাক ও সব ব্যাপার নিয়ে এই সকালে আর আলোচনা করার দরকার নেই। ওসব কথা বাদ দাও।’

সেমন্তী তার কথা শুনে ভয় পেয়েছে বুঝতে পেরে পর্ণাভ আবার কথা থামিয়ে গাড়ি চালাতে লাগল।

নির্দেশিত পথ ধরেই এগোল তারা। প্রথমে পাঁচ মাইল পথ এগোবার পর বড় রাস্তা ছেড়ে সুরকির রাস্তা ধরল গাড়ি। এ জায়গাটা এখনও তেমন উন্নত হয়নি। দু-চারটে ঘরবাড়ি এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে আছে। বড়বড় গাছও আছে বেশ কিছু। সে পথ ধরে মাইল তিনেক এগোবার পর রাস্তার পাশেই একটা বেশ বড় পুকুর চোখে পড়ল। পর্ণাভ বলল, ‘এটাই কালো বাওড় হবে। দেখেছ জলের রঙ কেমন কালো! আমরা পৌঁছে গেছি।’

পুকুর পাড়ে বসে একটা লোক ছিপ হাতে মাছ ধরছিল। গাড়ি থামিয়ে গলা বাড়িয়ে পর্ণাভ তাকে জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা, এখানে চক্রবর্তীদের বাড়িটা কোন দিকে?’

প্রশ্ন শুনে মৃদু বিস্মিতভাবে পর্ণাভর দিকে তাকিয়ে লোকটা বলল, ‘ও! উকিলবাবুর পুরোনো বাড়ি! ওই তো কাছেই।’ হাত তুলে একটা দিকে দেখাল লোকটা।

তার দৃষ্টি অনুসরণ করে পর্ণাভ দেখল, কিছুটা দূরে গাছগাছালির মাথার ওপর দিয়ে একটা বাড়ির চিলেকোঠা যেন দেখা যাচ্ছে। গাড়ির অ্যাক্সিলেটারে চাপ দিল পর্ণাভ।

সেমন্তী বলল, ‘সিউড়ি শহর থাকতে এই নির্জন জায়গাতে তোমার ঠাকুর্দা বাড়ি বানিয়ে ছিলেন কেন? তার তো পয়সার অভাব ছিল না!’

গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে পর্ণাভ বলল, ‘বাবার মুখে শুনেছি এ বাড়ি নাকি ”কূর্মভূমি”। অর্থাৎ কচ্ছপের পিঠের মতো উঁচু জায়গা। চারপাশে ঢাল আছে। অনেক দূর থেকে দেখলে নাকি বোঝা যায়। ঠাকুর্দা জ্যোতিষ শাস্ত্র, বাস্তু শাস্ত্র এসব মানতেন। শাস্ত্রমতে নাকি এই কূর্মভূমি বাসস্থান নির্মাণ, তন্ত্রসাধনার পক্ষেও আদর্শ স্থান। তিনি তাই বাড়িটা এখানে বানিয়েছিলেন। বাড়ির কাছেই নাকি কোথাও একটা ছোট শ্মশানও আছে। ঠাকুর্দা আর বড় জ্যাঠা সেখানে নাকি যাওয়া আসা করতেন।’

কথা বলতে বলতেই গাড়িটা পৌঁছে গেল পর্ণাভর পৈতৃক বসতবাটির সামনে। গাড়ি থেকে নামল পর্ণাভ আর সেমন্তী।

অনুচ্চ প্রাচীর ঘেরা বড় বড় গাছের বাগানের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট প্রাচীন বাড়িটা। একতলা, দোতলার টানা বারান্দা বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছে। সিমেন্টের নক্সা কাটা রেলিং ঘেরা ছাদে যে চিলেকোঠার ঘর রয়েছে সেটাকে দূর থেকে দেখতে পেয়েছিল পর্ণাভ। ছাদের রেলিং কোথাও কোথাও ভেঙে গেলেও আর বাড়ির দেওয়ালের গা থেকে পলেস্তারা খসে পড়লেও বাড়ির কাঠামোটা অক্ষুণ্ণই আছে। পুরোনো দিনের বাড়ি চট করে নষ্ট হয় না। অবাক হয়ে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে সেমন্তী প্রশ্ন করল, ‘বাড়িটার কত বয়স হবে?’

পর্ণাভ জবাব দিল, ‘তা অন্তত একশো বছর হবে।’

আগল সরিয়ে বাগানে প্রবেশ করে বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল তারা। নীচে বা ওপরের বারান্দাতে কেউ কোথাও নেই। কাছ থেকে দেখে তারা দেখল বারান্দা সংলগ্ন ঘরগুলোর অনেককটা দরজা জানলারই পাখিতোলা পাল্লাগুলো ঘুণ ধরে, জলে ভিজে খসে পড়েছে। বটের চারা শিকড় বিস্তার করেছে বারান্দার থামগুলোর গায়ে। কোথাও কোনো লোকজন নেই। একদল পায়রা শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছে বারান্দাতে।

সেমন্তী বলল, ‘কাগজে ঠিক লিখেছিল তো? তিনি এখানেই ফিরে এসেছেন? কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছি না! বাড়িটাকে জাস্ট ভূতের বাড়ি বলে মনে হচ্ছে! ভূতের সিনেমার শুটিং-এর পক্ষে আইডিয়াল জায়গা!’

বাড়িটার এক পাশের ফাঁকা অংশ দিয়ে পিছনের দিকের বাগানের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে। সেমন্তী কথাটা বলার পরই হঠাৎ সেদিকে চোখ গেল পর্ণাভর। সেখানে একটা গাছের তলায় বাড়িটার দিকে পিছন ফিরে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে একটা লাল লুঙ্গির মতো পোশাক, গায়ে একটা লাল র‌্যাপার। মাথার চুল সম্ভবত সাদা। তাকে দেখতে পেয়ে পর্ণাভ বলল, ‘ওই দ্যাখো! বড় জ্যাঠাই মনে হচ্ছে! জেলের ডোরাকাটা জামা ছেড়ে বাড়িতে ফিরেই আবার রক্তাম্বর ধারণ করেছেন মনে হচ্ছে!’

বাড়িটাকে একপাশে রেখে পর্ণাভরা এগোল সেদিকে। পায়ে পায়ে এগিয়ে তারা পৌঁছে গেল গাছটার কাছে। মাঝারি আকৃতির একটা গাছ। তার ডালপালাগুলো মাথার ওপরে ছাতার আকৃতির চাঁদোয়ার সৃষ্টি করেছে। সম্ভবত তাদের পায়ের শব্দ পেয়েই ফিরে দাঁড়াল লোকটা। দীর্ঘকায় মেদহীন গৌরবর্ণ চেহারা। ভ্রূ, দাড়ি, চুলের রঙ সাদা। টিকালো নাক। চুল নেমে এসেছে কাঁধ পর্যন্ত। দাড়ি স্পর্শ করেছে বুক। বয়স মনে হয় সত্তরের ওপর হবে। তবে তার চোখের দৃষ্টি এখনও বেশ তীক্ষ্ন। পর্ণাভ চিনতে পারলেন তাকে। ইনিই তার জেল খাটা বড় জ্যাঠামশাই ঈশান চক্রবর্তী। তিনি পর্ণাভদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা কারা? দেখে তো শহরের লোক মনে হচ্ছে! সাংবাদিক?’

পর্ণাভ তাকে প্রথমে প্রশ্ন করল, ‘আপনি বড় জ্যাঠামশাই তো?’

‘বড় জ্যাঠামশাই!’ শব্দটা বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে বৃদ্ধ যেন তার স্মৃতি হাতড়ে মনে করার চেষ্টা করলেন এ নামে তাকে কেউ কোনো দিন ডাকত কিনা?

তিনি ব্যাপারটা ঠিক ধরতে পারছেন না দেখে পর্ণাভ এরপর বলল, ‘আমি পর্ণাভ। আপনার ভাই ইন্দ্রর ছেলে আমি। পর্ণাভ চক্রবর্তী। আর এ আমার স্ত্রী সেমন্তী।’

কথাটা শুনে ঈশান চক্রবর্তী বেশ কিছুক্ষণ বিস্মিত ভাবে তাকিয়ে রইলেন তাদের দিকে। তারপর বললেন, ‘ইন্দ্রর ছেলে তুমি! সত্যি বলছ?’

পর্ণাভ হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, সত্যি। সঙ্গে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড আছে। দেখাতে পারি।’

ঈশান বললেন, ‘থাক, থাক ওসব আর দেখাবার দরকার নেই, বিশ্বাস করলাম। কত বছর পর নিজের কাউকে দেখলাম। বড় ভালো লাগছে।’

সেমন্তী ঈশান চক্রবর্তীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। পর্ণাভর আবার ঠিক প্রণাম-টনাম আসে না। সে তারপর বলল, ‘কাগজে আপনার খবরটা দেখে মনে হল একবার আপনার সঙ্গে দেখা করে আসি। তাছাড়া সেমন্তীকেও এই সুযোগে পূর্বপুরুষের ভিটেটা দেখানো হয়ে যাবে—তাই চলে এলাম।’

ঈশান চক্রবর্তী বললেন, ‘ইন্দ্র মারা গেছে!’

পর্ণাভ বলল, ‘হ্যাঁ, বছর ছয়েক হল। আর দু-বছর আগে মা। কাকারাও আর নেই। তবে তাদের ছেলেরা আছে।’

ঈশান আপশোসের সুরে বলল, ‘আসলে গত পনেরো বছর জেলের চার দেওয়াল আমাকে বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ আড়াল করে রেখেছিল। কিছুই জানতে পারিনি। সবই আমার অদৃষ্ট। যতই তারা দূরে থাকুক তারা আমার ভাই ছিল। আমি এখন আত্মীয় পরিজনহীন এক জেলখাটা আসামি।’

সেমন্তী বলল, ‘এমন ভাবে বলবেন না বড় জ্যাঠামশাই। আমরা কি আপনার নিজের লোক নই?’

ঈশান হেসে বললেন, ‘না, না, তোমরাও আমার নিজের লোকই। আমি এভাবে কথাটা বলিনি।’

পর্ণাভ এবার আসল কথাটা পাড়ল। সে বাগানের চারদিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী নিরিবিলি সুন্দর জায়গা! ভাবছি আপনার সঙ্গে দু-তিনটে দিন এ বাড়িতে কাটিয়ে যাই। আর কোনোদিন এখানে আসা হবে কিনা জানা নেই।’

সেমন্তী বলল, ‘হ্যাঁ, আমারও বেশ লাগছে জায়গাটা। চারদিকে কত সবুজ! কলকাতার মতো ধুলো-ধোঁয়া নেই।’ তাদের কথা শুনে ঈশান বললেন, ‘কিন্তু তোমরা কি এ বাড়িতে থাকতে পারবে? ইলেকট্রিক নেই, রান্নাঘরের কোনো ব্যবস্থা নেই। আমি এসে দুটো ঘর মাত্র সাফশুতরো করেছি। একটা লড়ঝড়ে তক্তপোষ ছাড়া কিছুই তোমাদের দিতে পারব না। বাড়ির সামনের দিকে বাগানের একপাশে একটা কুয়ো আছে। স্নান খাওয়ার জল বলতে কিন্তু সেটাই। পর্ণাভ বলল, ‘তাতে কোনো অসুবিধা হবে না। আমাদের গাড়িতে রান্নার জন্য গ্যাস, ওভেন, ইত্যাদি সব কিছুই আছে। তৈরি হয়েই বেরিয়েছি আমরা। সিউড়ি বাজার তো এখান থেকে বেশি দূরে নয়। যা, যা প্রয়োজন হবে তা কাল সকালে কিনে আনব।’

ঈশান বললেন, ‘তবে থাকো। বাড়িটা তো এক অর্থে তোমাদেরও। চলো ঘরটা দেখিয়ে দিই।’

বাগান ছেড়ে বাড়ির সামনের দিকে এল সবাই। বারান্দা দিয়ে উঠে সিঁড়ি ভেঙে দোতলাতে পৌঁছে গেল তারা। দোতলার বারান্দাও কাঠকুঠো, পায়রার বিষ্ঠাতে ভর্তি। দরজা ঠেলে বারান্দা সংলগ্ন একটা ঘরে তাদেরকে নিয়ে প্রবেশ করে ঈশান বললেন, ‘এই তোমাদের ঘর। দ্যাখো থাকতে পারো কিনা?’

মোটামুটি পরিষ্কার একটা ঘর। যদিও দেওয়ালের পলেস্তারা খসে গেছে, মেঝেও ফেটে গেছে জায়গাতে জায়গাতে। আসবাব বলতে ঘরের মাঝখানে একটা কাঠের তক্তেপোষ বা চৌকি রাখা। ঘরের কোণে রাখা আছে একটা নতুন ঝাঁটা। বেশ বড় একটা জানলা আছে ঘরে। তা দিয়ে পিছনের বাগানটা দেখা যাচ্ছে।’

সেমন্তী ঘরের চারপাশে তাকিয়ে বলল, ‘কোনো অসুবিধা হবে না। আর একটা কথা, বড় জ্যাঠামশাই আমরা যে দু-তিন দিন আছি, একটা দিন কিন্তু আপনি আমাদের সঙ্গে খাবেন।’

ঈশান হেসে বললেন, ‘আমাকে নিয়ে ভেব না। জেল থেকে ছাড়া পেয়েই আমি এ বাড়িতে ফিরে এলাম কেন জানো? আসলে আমার একটা সাধনা অসম্পূর্ণ রেখে গেছিলাম। এবার তা সম্পূর্ণ করার সময় হয়েছে। তন্ত্র সাধকদের কিছু নিয়ম মানতে হয়। আমি একবেলা ভোজন করি, তাও নির্দিষ্ট কিছু জিনিস। তোমরা তোমাদের মতো থাকো, খাও—কোনো অসুবিধা নেই। এ কথা বলে তাদেরকে ঘরটা বুঝিয়ে অন্য দিকে চলে গেলেন ঈশান।

তারা দুজন এরপর কাজে লেগে পড়ল। পর্ণাভ ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে রাস্তা থেকে গাড়িটাকে বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দিল প্রথমে। তারপর গাড়ি থেকে মালপত্র নিয়ে ওপরের ঘরে তুলতে লাগল। সেমন্তী লেগে গেল ঘরের সামনের বারান্দা পরিষ্কার আর রান্নার কাজে। রান্না মেটার পর নীচে নেমে কুয়োর ঠান্ডা জলে স্নান সেরে নিল সেমন্তী। পর্ণাভ তাকে বারণ করেছিল, কিন্তু সে শোনেনি। পুরোনো বাড়ি, বাগান, কুয়ো, এ সবই নতুন তার কাছে। বেশ লাগছে এ জায়গাটা। স্নান খাওয়া সেরে তক্তপোষে শুয়ে পড়ল তারা।

সেমন্তীর ডাকে পর্ণাভর যখন ঘুম ভাঙল তখন বিকাল হয়ে গেছে। চা করছে সেমন্তী। একটা চায়ের কাপ পর্ণাভর হাতে ধরিয়ে দিয়ে, নিজের কাপটা হাতে নিয়ে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে নীচে বাগানের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘বড় জ্যাঠামশাই বাগানে দাঁড়িয়ে আছেন।’

পর্ণাভ উঠে গিয়ে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে পেল। শীতকাল, বেলা পড়ে এসেছে। বিকাল পাঁচটা বাজে। দিনের শেষ আলোতে ছাতার মতো সেই পাতাঅলা গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে ওপর দিকে তাকিয়ে আছেন ঈশান চক্রবর্তী। সেমন্তী বলল, ‘ওঁকে দেখে আমার বেশ ভালো মানুষই মনে হল। কেমন নিঃসঙ্গ দেখাচ্ছে মানুষটাকে। স্ত্রীকে তো হারালেনই, তার সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যা মামলাতে এতগুলো বছর জেল খাটলেন।’

চায়ে চুমুক দিয়ে পর্ণাভ বলল, ‘চলো, একবার নীচ থেকে ঘুরে আসি। বাগান দেখাও হবে আবার ওঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে।’

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ঘর ছেড়ে নীচে নেমে বাগানের সেই গাছটার কাছে হাজির হয়ে গেল তারা। ঈশান তন্ময় ভাবে তাকিয়েছিলেন গাছটার দিকে। পর্ণাভদের দেখার পর ঈশান বললেন, ‘কী? কেমন লাগছে?’

সেমন্তী বলল, ‘খুব ভালো। আচ্ছা, ওটা কী গাছ জ্যাঠামশাই?’

গাছটার দিকে তাকিয়ে এবার যেন আবছা হাসি ফুটে উঠল ঈশান চক্রবর্তীর শুভ্র দাড়ি গোঁফের ফাঁকে। তিনি বললেন, ‘হরীতকী গাছ। তবে এক বিশেষ হরীতকী গাছ। নিশীথ হরীতকী। তন্ত্র সাধনার কাজে লাগে। দুষ্প্রাপ্য গাছ। বছরে একবার একটা মাত্র ফল ধরে। বলতে গেলে এই গাছটার জন্যই আমি এত বছর পরে এখানে ছুটে এলাম। আমাকে যেদিন পুলিশ ধরল তার আগের দিন ছিল অমাবস্যার রাত। যে রাতে শুদ্ধ হয়ে গাছটা পুঁতেছিলাম। জেলে বসে খালি ভাবতাম গাছটা যদি বেঁচে না থাকে তবে আমার সব কষ্ট বৃথা হয়ে যাবে। আমার সাধনা এ জীবনে আর সম্পন্ন হবে না। কিন্তু কালভৈরব করুণাময়। তিনি বাঁচিয়ে রেখেছেন গাছটাকে।’

সেমন্তী জানতে চাইল, ‘ফল ধরেছে গাছটাতে?’

ঈশান বললেন, ‘যতক্ষণ না কোনো গাছে ফল বা বীজ ধরছে ততক্ষণ সে গাছ তন্ত্র সাধনার কাজে লাগে না। সাধারণ যে পূজা-অর্চনা, তাতে যে আম্রপল্লব ব্যবহার করা হয়, তা সে গাছে যদি ফল না ধরে থাকে তা শাস্ত্র মতে ব্যবহার নিষিদ্ধ। আর এ গাছের ফলটাই তো আসল। ভালো করে সেদিকে তাকাবার পর ফলটা চোখে পড়ল সেমন্তী আর পর্ণাভর। সাধারণ হরীতকী তারা দেখেছে। কিন্তু এই ফলটা তার তুলনাতে আকারে বেশ বড়। খাঁজ কাটা কালো রঙের ফল। হয়তো বা ফলটার কৃষ্ণ বর্ণের কারণেই ওর নাম, ‘নিশীথ হরীতকী।’

ঈশান এরপর চারপাশে বাগানের অন্য গাছগুলো দেখিয়ে বলল, ‘এ বাগানে অন্য যে সব বড় গাছ দেখছ তা সবই আমার নিজের হাতে পোঁতা।’

এ কথা বলে তিনি আঙুল তুলে আশেপাশের গাছগুলো চিনিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘ওটা হল অশ্বত্থ গাছ, তার পাশে যজ্ঞডুমুর, পরেরটা বহরা, তার বাম দিকে শ্বেতখাদির গাছ, আর ডান দিকের গাছটা অর্জুন। প্রাচীরের কাছে গাছটা হল, ঘোড়া নিম। আর দক্ষিণের গাছটা হল রক্তচন্দন। আমরা যে গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে সেটা তো বললামই যে নিশীথ হরীতকী। সব মিলিয়ে আটটা বড় গাছ। তার মধ্যে এই হরীতকী গাছটাই আমার সাধনার জন্য সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এ গাছ আমি সংগ্রহ করে এনেছিলাম পাণ্ডবদের মহাপ্রস্থানের পথ কেদারনাথ থেকে।’

সেমন্তী বলল, ‘তন্ত্রসাধনাতে নানা অদ্ভুত জিনিস লাগে তাই না?’

ঈশান বললেন, ‘তন্ত্র সাধনার জন্য মুখ্য অঙ্গ হল আটটি। গুরু, দীক্ষা, সাধনাস্থল, সময়, আসন, মালা, উপাদান এবং নিষেধ। অর্থাৎ সাধকদের যা করতে নেই। প্রতিটা ব্যাপারেই সাধনার সফলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক এক ধরনের শক্তি সাধনার জন্য এই মুখ্য অঙ্গগুলোর পরিবর্তন ঘটে।’

সেমন্তীর জ্যোতিষ, তন্ত্র এসব ব্যাপারে মৃদু আগ্রহও আছে। সন্তান হচ্ছে না বলে আঙুলে অনেকগুলো পাথরও ধারণ করেছে সে ডাক্তার দেখানোর পাশাপাশি। পর্ণাভ অবশ্য এসব ব্যাপার ঠিক বিশ্বাস করে না। যদিও সে সেমন্তীকে নিষেধও করে না এসব ব্যাপারে। যার যার ভাবনা তার কাছে।

বড় জ্যাঠামশাইয়ের কথা শুনে সেমন্তী বলল, ‘মুখ্য অঙ্গ পরিবর্তন মানে? কেমন পরিবর্তন হয়?’

ঈশান হেসে বললেন, ‘সব তো তুমি বুঝবে না মা। তবু তোমাকে সরল ভাবে কিছুটা বুঝিয়ে দিচ্ছি।’

এ কথা বলে একটু যেন ভেবে নিয়ে ঈশান বললেন, ‘ধরো একটা অতি পরিচিত তন্ত্রসাধনা হল—বশীকরণ তন্ত্রসাধনা। অনেকেই এই সাধনাতে সিদ্ধ হবার চেষ্টা করে। যদিও এটি অত্যন্ত নিম্ন বর্গের তন্ত্র সাধনা। যে কারণে অনেকেই সিদ্ধিলাভ করে এ সাধনাতে। তন্ত্রসাধনার মাধ্যমে এ ক্ষমতা রপ্ত করতে সাধনাস্থল তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটা কাঠের পাটাতন বিছিয়েই সাধনাস্থল রচনা করা যায়। সময় হল শনিবার রাত্রিকালে যে কোনো সময়, দিক হল পশ্চিম দিক, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে মন্ত্র জপ করবে, আসন হল রক্তবর্ণের, মালা হল ”হাকিক” মালা বা বিশেষ ধরনের মালা বা সাতাশ দানার মুগার মালা আর উপাদান হল তৈল প্রদীপ আর রুপোর কলস। উপাচারগুলোকে শুদ্ধ করে সাজিয়ে নিয়ে বসে তোমাকে এগারো দিন ধরে দশ সহস্রবার এ মন্ত্র উচ্চারণ করতে হবেঃ”ওঁ নমো আদেশ গুরু কো রাজা প্রজা মোহং ব্রাহ্মণ বনিয়া মোহং, আকাশ পাতাল মোহং, দশ দিশায়ে মোহং, জো রামচন্দ্র পরমানিয়া অমুক কো অমুক গুরু কী শক্তি ফুরো মন্ত্র ঈশ্বরো বাচা।”

আবার ”মারণ উচাটন” তন্ত্র বিদ্যাতে সিদ্ধি লাভের মন্ত্র হল, ”ওঁ নমো পেঁচকরাজে নমো লক্ষ্মীবাহনে মম অভিলাষা পূর্ণ কুরু ”অমুকস্য” উচ্চাটনং কুরু কুরু কুরু ঐং হ্রং ক্লীং গ্লৌ ফট স্বাহা।”—এর দিন হল মঙ্গলবার, সময় অর্ধরাত্রি, আসন হল ছাগ চর্মর, মালা হল আমলকীর। আর প্রধান উপকরণ হল শনিবার, ভবানী নক্ষত্রযুক্ত ধরে আনা কালো প্যাঁচার ডান দিকের ডানার শেষের তিনটে পালক। সাধনাস্থলে বসে প্রথমে উড়িয়ে দিতে হয় পেঁচাটাকে। এবার নিশ্চয়ই ব্যাপারটা তোমাকে বোঝাতে পারলাম যে আলাদা আলাদা তন্ত্রসাধনার জন্য মুখ্য অঙ্গের কী ধরনের পরিবর্তন হয়?’

বড় জ্যাঠামশাইয়ের এসব অদ্ভুত কথা, মন্ত্রোচ্চারণ শুনে বেশ মজা লাগল পর্ণাভর। যদিও সে মুখের ভাবে তা প্রকাশ করল না। তবে সেমন্তীর মুখ দেখে পর্ণাভর মনে হল এসব কথা শুনে তার বেশ শ্রদ্ধা জেগেছে বড় জ্যাঠামশাইয়ের প্রতি। সেমন্তীর যেন প্রশ্নের শেষ নেই। এরপর সে প্রশ্ন করল, ‘অনেক তান্ত্রিক শুনেছি মুখ দেখে মনের কথা বলতে পারেন? কথাটা ঠিক?’

প্রশ্ন শুনে ঈশান একটু তাচ্ছিল্যভাবে প্রথমে বললেন, ‘হ্যাঁ, ওসব ওই, বশীকরণ, উচাটন বিদ্যার মতো নিম্ন বর্গের তন্ত্রসাধনার ফলে প্রাপ্ত ক্ষমতা। কাক চরিত বিদ্যা লাভের অঙ্গ। ওসব বিদ্যা তো আমি বহু বছর আগেই করায়ত্ত করেছিলাম।’

এরপর তিনি একটু থেমে বললেন, ‘কিন্তু আমি যে তন্ত্রসাধনা করছি, যার সাধনা করছি তার জন্য বহু বছর সময় লাগে। অনেকে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে এই সাধনা করতে গিয়ে। ধরো আমার সাধনার আবশ্যিক উপাদান এই হরীতকী গাছটা। সাধারণ হরীতকী গাছ অন্য জায়গাতে পাওয়া গেলেও এই নিশীথ হরীতকী গাছ সংগ্রহ করে আনতে হয় পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চল থেকে। তারপর অন্তত পনেরো, কুড়ি বছর অপেক্ষা করতে হয় এ গাছে ফল ধরার জন্য। সব থেকে বড় কথা হল এই হরীতকী গাছকে এক বিশেষ ভাণ্ড বা আধারে ভরে মাটিতে রোপন করতে হয় যা আমার সাধনার কঠিনতম পর্ব। সব মানুষ সেটা করতে পারে না। তবে একবার গাছটা রোপণ করে ফল ধরাতে পারলে বলা যেতে পারে, সাধনার অর্ধেক কাজ সাঙ্গ হয়ে গেছে।’

পর্ণাভ কোন একটা গল্পের বইতে যেন পড়েছিল—তান্ত্রিকরা দশমহাবিদ্যার কাউকে অথবা ডাকিনী, যোগিনী এমন কাউকে আহ্বান করে তাকে মন্ত্র দিয়ে বেঁধে অথবা খুশি করে ক্ষমতা লাভ করে। তাই সে নিজেও এ ব্যাপারটা সম্বন্ধে কিছু হলেও খবর রাখে, তা বোঝাবার জন্য বলল, ‘আপনি কি দশমহাবিদ্যার মধ্যে কাউকে তুষ্ট করার জন্য বা তার দর্শন লাভের জন্য সাধনা করছেন?’

ঈশান কীভাবে যেন তার মনের ভাব ধরতে পেরে বললেন, ‘এসব কথা তুমি গল্পের বইতে পড়েছ বুঝি? আসলে অধিকাংশ তান্ত্রিকরাই এই দশমহাবিদ্যার আবাহন করেন অথবা বিভিন্ন উপদেবীর আবাহন করেন বলে তাদের নিয়েই গল্প-উপন্যাস লেখা হয়। আর ওসব পড়ে মানুষ ভাবে তন্ত্র সাধনা মানেই ওসব নারী মহাবিদ্যা বা উপদেবীর সাধনা। ওসব সাধনা করতে একটু সাহসের দরকার হয় ঠিকই কারণ তারা নানা রূপ ধারণ করে কখনও ভেলকি দেখায়, আবার কখনও ভয় দেখায়। কিন্তু আমি যার সাধনা করছি তার সাধনার জন্য প্রচুর সময় ও সাহসের প্রয়োজন হয়।’

পর্ণাভ বলল, ‘তবে কোন দেবীর সাধনা করছেন আপনি?’

একটু চুপ করে থেকে ঈশান বললেন, ‘সে হল ”পাতাল বটুক”। বটুক ভৈরব নয়।’

‘পাতাল বটুক! সে আবার কে?’ বিস্মিত ভাবে জানতে চাইল পর্ণাভ।

সূর্য ডুবে গেছে। আবছা একটা কুয়াশার স্তর আর অন্ধকার ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে গাছগুলোর মাথায়। সেদিকে তাকিয়ে ঈশান বললেন, ‘স্বর্গ, মর্ত আর পাতাল নিয়ে আমাদের ব্রহ্মাণ্ড। দেবতা বা তুমি যে দেবী বা দেবতা ও মানুষের মধ্যবর্তী উপ-দেবদেবীর কথা শুনে থাকবে তারা সবাই থাকেন আকাশে। আর মানুষ থাকে আমরা চলতি কথায় পৃথিবী বলতে যে স্থান বুঝি সেখানে। তবে দেবতা, উপদেবতা, যক্ষ মানব ছাড়াও আর এক ধরনের জীবের অস্তিত্ব আছে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে। দেবতা বা উপদেবতাদের থেকেও বেশি ক্ষমতাধর সেই জীবেরা। যদিও তাদের জীব বলা হয়তো ঠিক নয়। আমাদের পরিচিত কোনো জীবের সঙ্গে তাদের মিল নেই। বলা যেতে পারে, তারা একটা ‘ভয়ঙ্কর অস্তিত্ব।’ পাতালে বাস করে তারা।

স্বর্গ, মর্তের কিছু খবর মানুষ জানলেও পাতালের খবর বলতে গেলে অজানা সবার কাছে। ওই ‘ভয়ঙ্কর অস্তিত্ব’দের একমাত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন মহাদেব। শিব পুরাণের এক স্থানে এদের উল্লেখ আছে। পাণ্ডবরা যখন মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করেন সে সময় মহাদেব তাদের দর্শন দেবেন না বলে পাতালে প্রবেশ করেন। তখন পাতালে এই ভয়ঙ্কর অস্তিত্বরা মহাদেবের অনুচর হয়, যেমন কৈলাসে ভূতপ্রেতরা তার সঙ্গী। তখন এই সব পাতালবাসী ভয়ঙ্কর অস্তিত্বদের কোনো নাম ছিল না। কিন্তু কোনো নামে তো তাদের ডাকতে হবে। স্কন্ধ পুরাণে আছে মহাদেবের তৃতীয় নয়ন থেকে বটুক ভৈরবের জন্ম হয়েছিল, যে ব্রহ্মার মস্তক ছেদন করেছিল। তাই মহাদেবের আর এক নাম বটুকেশ্বর। মহাদেব যখন পাতালবাসী বা পাতাল ভৈরব হলেন তখন তিনি তার বহু নামের মধ্যে এই বটুকেশ্বর নামের প্রথম অংশটা তার পাতালবাসী ভয়ঙ্কর অস্তিত্বদের দান করেন। বটুক ভৈরবের ব্রহ্মহত্যার ভয়ঙ্কর অন্ধকার পাপের মতোই সেই অন্ধকারের বাসিন্দাদের অস্তিত্বের কারণে তাদের এমন নামকরণ করেন মহাদেব। তারা দেবতা, যক্ষ, মানব এমনকী নারী বা পুরুষও নয়। তারা শুধুই ভয়ঙ্কর এক অস্তিত্ব; পাতাল বটুক।’ একটানা কথাগুলো বলে থামলেন ঈশান। আকাশ থেকে কুয়াশা মাখা অন্ধকারের চাদরটা এবার দ্রুত নেমে আসতে শুরু করেছে। সেদিকে তাকিয়ে বড় জ্যাঠামশাই বললেন, ‘চলো ফেরা যাক। ওই দেখ বাড়ির পিছন দিকে ওই লোহার প্যাঁচালো সিঁড়িটা দিয়েও বাগান থেকে দোতলায় ওঠা যায়।’

সেদিকেই এরপর পায়ে পায়ে এগোল তিনজন। পর্ণাভ বুঝতে পারল এসব তন্ত্র সাধনার ব্যাপার সত্যি হোক বা মিথ্যা হোক বড় জ্যাঠামশাই এ সব ব্যাপারে অনেক কিছু জানেন। একটু কৌতূহলবশত সে জানতে চাইল, বড় জ্যাঠামশাই, ওই পাতাল বটুকের সাধনাতে সিদ্ধি লাভ করলে কি শক্তি লাভ হয়?’

ঈশান বললেন, ‘ত্রিকাল দর্শন হয়। বিশেষত অতীত দর্শন বা পাতাল দর্শন। এই যেমন আমার নিজেরই জানা নেই যে আমি কার ঔরসজাত সন্তান ছিলাম? কার গর্ভে জন্মেছিলাম? কোন অপরাধে তারা তাদের সন্তানকে কালো বাওড়ের পাড়ে ফেলে গেছিল? এমনকী আমি আমার পূর্বজন্মগুলোর কথাও জানতে পারব।’

কথা বলতে বলতে সিঁড়ির কাছে পৌঁছে গেল তারা। ঈশান বললেন, ‘এবার তোমরা ওপরে যাও। আমি একটু বাইরে বেরোব।’—এই বলে তিনি অন্য দিকে পা বাড়াতে গেলেন।

সেমন্তী এতক্ষণ চুপ করেছিল, কিন্তু এবার হঠাৎ সে বলে উঠল, ‘আপনি তো বললেন যে বশীকরণ, উচাটন, মনের কথা বলার মতো কাকশাস্ত্র বিদ্যা, এসব আমি বহুদিন আগেই রপ্ত করেছেন। আচ্ছা আপনি বলতে পারবেন, আপনি এখন কী ভাবছি?’

এগোতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন ঈশান। সেমন্তীর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘তুমি কি আমাকে পরীক্ষা করছ মা?’

সেমন্তী প্রশ্নটা শুনে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘না, না, এমনি প্রশ্ন করলাম।’

ঈশান মৃদু হেসে বললেন, ‘যে কারণেই তুমি প্রশ্নটা করে থাকো, আমি উত্তরটা দিচ্ছি।’ কয়েক মুহূর্ত এরপর তিনি স্থির দৃষ্টিতে সেমন্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সাত বছর বিয়ে হয়েছে তোমার, কিন্তু সন্তান হচ্ছে না। তুমি ভাবছ তন্ত্র সাধনা করে তান্ত্রিকরা কি এমন কোনো দক্ষতা লাভ করতে পারে যার ফলে সে অন্য কাউকে সন্তান লাভ করাতে পারে? ঠিক বললাম কিনা? এও বলি সে ক্ষমতা আমার আছে।’ কথাগুলো বলে আর না দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলেন ঈশান চক্রবর্তী।

কথাটা শুনে বেশ চমকে উঠল পর্ণাভ আর সেমন্তী দুজনেই। ঈশান হয়তো অনুমান করতেই পারল যে তাদের বাচ্চা নেই বলে সেমন্তী এই কথাটাই ভাবছে। বিশেষত বাচ্চা হবার জন্য যে আংটিগুলো সেমন্তী আঙুলে পরেছে সেগুলো তিনি চিনতেই পারেন। কিন্তু তাদের যে—সাত বছরের বিবাহিত জীবন—তা তিনি জানলেন কীভাবে?’ তারা দুজন এরপর সেই লোহার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল।

ঘরে উঠে এসে একটা বড় মোমবাতি জ্বালালো পর্ণাভ। সেমন্তীর চোখমুখ থেকে বিস্ময়ের ভাবটা যেন যাচ্ছে না। সে বলল, ‘তুমি তো এসব ব্যাপার একদম বিশ্বাস করো না। লোকটার কিন্তু ক্ষমতা আছে। নইলে কীভাবে তিনি জনলেন আমাদের সাত বছর বিয়ে হয়েছে?’

পর্ণাভ বলল, ‘এ কথা ঠিকই যে পুরাণ-তন্ত্র এসব ব্যাপার নিয়ে ওনার বেশ পড়াশোনা আছে। ওনার কথাটা যে আমাকেও চমকে দেয়নি তা নয়। কিন্তু এমনও হতে পারে আমাদের পরিচিত কেউ হয়তো বা আমার খুড়তুতো ভাইদের কেউ জেলে কোনো বিশেষ কারণবশত ওর সঙ্গে দেখা করতে গেছিল আর তাদের থেকেই খবরটা পেয়েছেন উনি।’ শেষ কথাটা ঠিক পছন্দ হল না সেমন্তীর। সে বলল, ‘তোমার অবিশ্বাস কিছুতেই যায় না। আমি ভাবছি…।’ এই বলে থেমে গেল সে।

পর্ণাভ বলল, ‘কী ভাবছ?’

একটু চুপ করে থেকে সেমন্তী বলল, ‘আমি ভাবছি আমার ব্যাপারে ওনাকে বলে একবার দেখব কিনা? যদি সত্যি কোনো কিছু পারেন তিনি। এ ক’বছরে ডাক্তার-বদ্যি তাবিজ আংটি কোনো কিছু তো কম করলাম না। কোনো কিছুই কাজে এল না। উনি তো নিজের মুখেই বললেন যে এ ক্ষমতা তার আছে। বলব একবার, তুমি কী বলো?’

পর্ণাভর নিজের এ সব ব্যাপারে বিশ্বাস নেই। কিন্তু সে যদি আপত্তি জানায় তবে আর কোনো দিন সন্তান না হলে সেমন্তীর মনে হয়তো এ ভাবনা আসতে পারে পর্ণাভর নিষেধের কারণেই সে একবার সন্তান লাভের সুযোগ হারিয়েছিল। সেমন্তীর কথার কী জবাব দেবে বুঝতে না পেরে পর্ণাভ বলল, ‘তুমি যা ভালো বোঝ করো। তবে তোমাকেই কিন্তু কথা বলতে হবে তার সঙ্গে। আমার বলতে লজ্জা করবে।’

পর্ণাভর কথা শুনে সেমন্তী হেসে বলল, ‘ঠিক আছে আমিই বলব। তুমি শুধু সঙ্গে থেকো। তাহলেই হবে।’

পর্ণাভ আর সেমন্তী লুডো খেলতে বসল। ঘণ্টা খানেক খেলল তারা। তারপর চাদর মুড়ি দিয়ে সামনের বারান্দাতে এসে দাঁড়াল তারা। বাইরে চাঁদের আলো চিকচিক করছে। ঝিঁঝি পোকার ডাক ছাড়া কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ পর্ণাভরা দেখল আগল ঠেলে বাগানে প্রবেশ করলেন বড় জ্যাঠামশাই। তার এক হাতে একটা সরু কঞ্চির মতো একটা লাঠি আর অন্য হাতে কী যেন একটা ঝুলছে। তিনি বাড়ির নীচে বারান্দার কাছে আসতেই ব্যাপারটা বুঝতে পারল পর্ণাভরা। বড় জ্যাঠামশাই মাছ ধরতে গেছিলেন। তার এক হাতে ছিপ আর অন্য হাত থেকে একটা বেশ বড় কালো রঙের মাছ ঝুলছে। তাই দেখে সেমন্তী ওপর থেকে জানতে চাইল, ‘জ্যাঠামশাই, কী মাছ ধরলেন?’

ঈশান হঠাৎ তার গলার স্বর শুনে চমকে উঠে ওপরে তাকিয়ে বললেন, ‘শোল মাছ। কালো বাওড় থেকে ধরে আনলাম।’—এ কথা বলেই তিনি বারান্দাতে উঠে নীচের কোনো একটা ঘরে ঢুকে গেলেন। তাকে আর দেখতে পেল না তারা।

গ্যাস স্টোভ জ্বালিয়ে রাতের খাবার গরম করতে বসল সেমন্তী। কিছুক্ষণ পর তার নাকে যেন নীচ থেকে একটা পোড়া গন্ধ ভেসে আসতে লাগল। পর্নাভও উৎকট গন্ধটা টের পেয়ে বলল, ‘কীসের গন্ধ বলো তো?’

সেমন্তী বলল, ‘কাঁচা মাছ পোড়ালে এমন গন্ধ হয়। বড় জ্যাঠামশাই কি শোল মাছ পুড়িয়ে খাচ্ছেন নাকি?’

পর্ণাভ বলল, ‘কে জানে হতে পারে হয়তো। সাধু সন্ন্যাসী, তন্ত্র সাধকদের ব্যাপারই আলাদা।’

খাওয়া হয়ে গেল পর্ণাভদের। খাবার পর শোবার আগে জানলার সামনে গিয়ে একটা সিগারেট ধরাল সে। রাতে খাবার পর একটা সিগারেট ধরানো তার অভ্যাস বা বদ অভ্যেসও বলা যায়। সেমন্তীও এসে দাঁড়াল তার পাশে। ঠিক তখনই তারা আবার দেখতে পেল বড় জ্যাঠামশাইকে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনি বাগানের দিকে এগোলেন। তার কোলে দু-হাত দিয়ে ধরা একটা কলাপাতা। সেই নিশীথ হরীতকী গাছটার কাছে গেলেন তিনি। কলাপাতা থেকে তিনি কী যেন গাছটার নীচে ফেলে ফিরে এসে আবার নীচের বারান্দাতে ঢুকে গেলেন। পর্ণাভদের তিনি খেয়াল করলেন না। সেমন্তী একটা হাই তুলে বলল, ‘চলো শুয়ে পড়ি। কাল সকালেই কথাটা ওঁর কাছে পাড়ব।’ একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে তক্তপোষে জড়াজড়ি করে শুয়ে পড়ল দুজন।

পরদিন বেলা আটটা নাগাদ ঘুম ভাঙল তাদের। জানলা খুলতেই তারা দেখতে পেল সকালের আলো ছড়িয়ে পড়েছে বাগানে। দোতলার একটা ভাঙা বাথরুমকেই ওয়াশরুম হিসাবে ব্যবহার করছে তারা। সেখানে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে চা খেয়ে তারা নীচে নামল। বাগানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সেমন্তী বলল, ‘কাল রাতে আমি একটা অদ্ভুত জিনিস দেখেছি। তবে সেটা সত্যি, নাকি স্বপ্ন কে জানে? মনে হল আমি যেন রাতে বিছানো ছেড়ে উঠে গিয়ে জানলাটা খুললাম। তারপর বাইরে তাকিয়েই দেখলাম ওই নিশীথ হরীতকী গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে এক মহিলা। ঘোমটা টানা। পরনে ডুরে শাড়ি। হাতে শাঁখা। সে যেন হাত বাড়িয়ে আমাকে ডাকছিল। ব্যাস তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।’

পর্নাভ বলল, ‘এত রাতে আবার এখানে মহিলা আসবে কীভাবে? হয়তো পুরোটাই তোমার স্বপ্ন অথবা জানলা খুলে ঘুম চোখে ভুল দেখেছ। কাল বড় জ্যাঠামশাইয়ের মুখে নানা অদ্ভুত গল্প শুনেছ, সেটাই হয়তো কোনোভাবে মনের মধ্যে কাজ করেছে।

হাঁটতে হাঁটতে সেই নিশীথ হরীতকী গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়াল তারা। চারপাশে তাকিয়ে পর্ণাভ বলল, ‘জায়গাটা বেশ সুন্দর তাই না। জ্যাঠামশাই কিন্তু বাড়িটাকে ছোটখাটো পিকনিক পার্টিকে ভাড়াও দিতে পারেন। তাতে তার দুটো পয়সাও হবে। শুধু কয়েকটা ঘর মেরামত করে নিতে হবে আর খবরের কাগজ বিজ্ঞাপন দিতে হবে। বড় জ্যাঠামশাইয়ের মাথায় এটা দেব।’

সেমন্তী বলল, ‘আগে আমার কথাটা বলে দেখি উনি কী বলেন? তারপর ওসব নিয়ে আলোচনা কোরো।’

এ কথা বলার পর সে বলল, ‘হ্যাঁ, জায়গাটা সুন্দর ঠিকই, তবে একটা জিনিস খেয়াল করেছ? এখনে কোনো পাখি নেই! একটাও পাখির ডাক শুনিনি!’

পর্ণাভ তার কথার জবাবে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় সে পায়ে পিঁপড়ের কামড় অনুভব করল। ঝুঁকে পড়ে পা ঝাড়তে যেতেই একটা জিনিস চোখে পড়ল তার। কিছুটা তফাতে পড়ে আছে মাছের একটা মাথা। একটা পোড়া শোলমাছের মাথা। ছোট ছোট লাল পিঁপড়ে সার বেঁধে এগোচ্ছে সেদিকে। তারাই কামড় বসিয়েছে তার পায়ে। জিনিসটা সে সেমন্তীকে দেখাতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় বড় জ্যাঠামশাইয়ের গলা শোনা গেল, ‘ওখানে কী করছ? এদিকে এসো।’

বাড়ির পিছন দিকে এসে দাঁড়িয়েছেন বড় জ্যাঠামশাই।

তাকে দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি পা ঝেড়ে নিয়ে পর্ণাভ আর সেমন্তী এগোল সে দিকে। দুজনে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি আবারও প্রশ্ন করলেন, ‘ওখানে কী করছিলে?’

পর্ণাভ বলল, ‘তেমন কিছু না। এমনি হাঁটতে হাঁটতে গাছটার তলায় দাঁড়িয়েছিলাম।’

ঈশান মৃদু হেসে বললেন, ‘আসলে ওই গাছটা তন্ত্রমতে রোপণ করা তো। তাই কিছু নিয়ম মানতে হয়। থুতু, প্রস্রাব, মাথার চুল অথবা অন্য কোনো দেহরস ওখানে ত্যাগ করা যায় না। স্নান না করে গাছের গুঁড়ি স্পর্শ করা যায় না।’

পর্ণাভ হেসে বলল, ‘না, আমরা ওসব কিছু করিনি ওখানে।’

ঈশান এরপর জানতে চাইলেন, ‘রাতে ভালো ঘুমিয়েছিলে তো? কোনো অসুবিধা হয়নি তো?’

সেমন্তী বলল, ‘না, বড় জ্যাঠামশাই, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তবে আপনার কাছে আমার একটা নিবেদন আছে।’

‘কী নিবেদন?’ জানতে চাইলেন ঈশান।

সেমন্তী একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘আমি জানি আপনার অনেক ক্ষমতা। নইলে মনের কথা পড়তে পারতেন না। দেখুন না আমাদের জন্য কিছু করতে পারেন কিনা? ছেলে বা মেয়ে, যে-কোনো কিছু একটা হলেই হবে। কত চেষ্টা করছি, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের যখন দেখি তখন বুক ফেটে যায়। মনে হয় আমারও এমন যদি কেউ থাকত। আত্মীয়-স্বজন আমাকে আকারে ইঙ্গিতে বাঁজা বলে খোঁটা দেয়।’—এই বলে থামল সে। সকালের সূর্যালোকে সেমন্তীর চোখের কোলে জল চিকচিক করে উঠল। পর্ণাভর মতো ঈশানেরও সম্ভবত তা নজর এড়াল না।

সেমন্তীর মুখের দিকে চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর তিনি বললেন, ‘তোমার মনের ব্যথা আমি বুঝতে পারছি। সত্যি কথা বলতে কি কাল রাতে আমিও এটা নিয়ে ভাবছিলাম। কিছু ক্ষমতা যখন আছে তখন সেটা যদি তোমাদের কাজে লাগে। আমার তো কেউ নেই। ক্ষমতাটা কাজে লাগালে যদি ভবিষ্যতে আমাকে মনে রাখো তোমরা। হ্যাঁ, কাজটা আমি করতে পারি। শুধু সন্তান নয় পুত্র সন্তান লাভ করবে তোমরা। যদি তোমার বা তোমার স্বামীর আপত্তি না থাকে তবে সে কাজে নামতে পারি আমি। তোমাদের সাহায্যও লাগবে। এ বাড়িতেই কাজটা করব আমি। বাড়ির সামনের জায়গাটাতে।’

পর্ণাভ জানতে চাইল, ‘কেমন কাজ? কী করতে হবে?’

তেমন কিছু না। আমার সঙ্গে মধ্যরাতে হোম আর পূজাপাঠে বসতে হবে তোমার স্ত্রীকে। তবে হ্যাঁ, সেখানে তৃতীয় কারো উপস্থিত থাকা চলবে না। এ কাজের আসল জিনিসগুলো অবশ্য আমিই জোগাড় করে নেব। তবে তোমার বউয়ের জন্য একটা লাল পেড়ে শাড়ি আর দশকর্মার কিছু জিনিস কিনে আনতে হবে।’

কথাটা শুনে সেমন্তী বলে উঠল, ‘না, না, এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।’

পর্ণাভও ব্যাপারটার মধ্যে তেমন আপত্তিকর কিছু খুঁজে পেল না। পঁচাত্তর বছরের বড় জ্যাঠামশাই নিশ্চয়ই মধ্যরাতে ভ্রাতুষ্পুত্রের স্ত্রীকে একলা পেয়ে জাপটে ধরার মানুষ নন। পর্ণাভ তাই বলল, ‘কবে কাজটা করবেন আপনি? ফর্দ করে দিন। জিনিসগুলো কিনে আনব।’

ঈশন বললেন, ‘কাল মঙ্গলবার। শুভ দিন। কালই বসব তবে। তবে আজকে বাজারে গিয়ে লাভ নেই। সোমবার বাজার বন্ধ থাকে। কাল সকালে বেরিয়ে কেনাকাটা কোরো।’

সেমন্তী বলল, ‘আমাকে কোনো নিয়ম মানতে হবে কি?’

ঈশান চক্রবর্তী জবাব দিলেন, ‘না, তোমার কিছু মানার দরকার হবে না। যা খুশি খেতেও পারো। শুধু আসনে বসার আগে স্নান সেরে, নতুন বস্ত্র পরিধান করে বলতে হবে। যা মানার আমিই মানব যজ্ঞের পুরোহিত হিসাবে।’ কথাগুলো বলে তিনি বললেন, ‘তাহলে এবার আমি যাই। আমার কিছু কাজ আছে।’

ঈশান চলে গেলেন অন্য দিকে। দোতলায় উঠে এল পর্ণাভরা। এবার বেশ খুশি খুশি লাগছে সেমন্তীকে। সে বলল, ‘হয়তো এ ব্যাপারটার জন্যই ভগবান আমাদের এখানে টেনে এনেছেন। নইলে আমরা হঠাৎ এখানে এলাম কেন? ঠাকুর যা করেন তা মঙ্গলের জন্যই করেন।’

পর্ণাভ তার কথার জবাবে কোনো উত্তর দিল না। এসব করে যদি সেমন্তী শান্তি পায় তো পাক।

রান্না, গল্পগুজব করে খেয়েদেয়ে বাকি দিনটা কেটে গেল। দুপুরে ঘুমিয়ে উঠে একবার বাগানে ঘুরে এল তারা। সন্ধ্যা নামার কিছু পরে খড়মের শব্দ শোনা গেল তাদের দরজার সামনে তারা। ঈশান এসে দাঁড়ালেন ঘরের সামনে। সেমন্তী বলল, ‘আসুন আসুন ভিতরে আসুন।’

ঈশান বললেন, ‘না, ঘরে ঢুকব না। আমি কালকের প্রস্তুতির জন্য কিছু কাজ সারব। ফর্দটা দিতে এলাম।’

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পর্ণাভর হাতে ফর্দটা ধরিয়ে দিয়ে ফিরে গেলেন ঈশান। লাল কালিতে লেখা ফর্দটা একবার মোমের আলোতে দেখল পর্ণাভ। কিছু চেনা, কিছু অজানা দশকর্মার জিনিস।

গত রাতের মতোই লুডো খেলে সন্ধ্যাটা কাটিয়ে দিল তারা। তারপর খাওয়া সেরে রাত দশটায় বিছানাতে শুয়ে পড়ল।

ঘণ্টা খানেক বাদে পর্ণাভর ঘুমটা হঠাৎই ভেঙে গেল। পাশ ফিরে হঠাৎ সে খেয়াল করল সেমন্তী বিছানাতে নেই। ঘরের দরজাটা খোলা। সেমন্তী কি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেছে? মিনিট পাঁচেক পর যখন সেমন্তী ফিরল না তখন টর্চ হাতে খাট থেকে নামল পর্ণাভ। সে খেয়াল করল জানলাটাও খোলা। কিন্তু তার যতদূর খেয়াল হল জানলাটা সে শোবার আগে বন্ধ করেছিল। খোলা জানলা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে ঘরে। পর্ণাভ এগিয়ে গেল জানলাটা বন্ধ করার জন্য। আর তখনই সে দেখতে পেল সেমন্তীকে! সেই নিশীথ হরীতকী গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে সেমন্তী!

ব্যাপারটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে সামনের বারান্দা হয়ে পিছনের বারান্দাতে হাজির হল। ওপর থেকে সেমন্তীর ওপর টর্চের আলো ফেলে সে বলল, ‘তুমি ওখানে কী করছ? চলে এসো।’

টর্চের আলোতে মনে হয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল সেমন্তীর। সে একটা হাত দিয়ে চোখটা আড়াল করল। তা দেখে পর্ণাভ আলোটা নিভিয়ে দিল। তার ডাকে সেমন্তী গাছতলা ছেড়ে আবার বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করল। পিছনের ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে সে ওপরে উঠে আসতেই পর্ণাভ বিস্মিত ভাবে বলল, ‘ওখানে গেছিলে কেন?’

জড়ানো গলাতে সেমন্তী জবাব দিল, ‘জানলা দিয়ে আবার দেখতে পেলাম গাছের নীচে সেই মহিলাকে! ব্যাপারটা কী দেখবার জন্য গেলাম, কিন্তু কেউ নেই!’

কথাটা শুনে পর্ণাভ ভর্ৎসনার স্বরে বলল, ‘তোমার কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই? কোনো ডালের ছায়াটায়া পড়ে কী দেখতে কী দেখেছ! তার জন্য এত রাতে ছুটে গেছ ওখানে! যত্তসব উদ্ভট ব্যাপার!

সেমন্তী শুধু ঘুম জড়ানো গলাতে বলল, ‘এবার খুব ঘুম পাচ্ছে, ঘরে চলো।’

ঘুরে ঢুকে ভালো করে দরজা জানলা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল তারা।

সকালবেলা সেমন্তীর আলতো ধাক্কাতে উঠে বসল পর্ণাভ। সেমন্তী চায়ের কাপটা হাতে ধরিয়ে পর্ণাভকে বলল, ‘তোমাকে আজ সিউড়ি বাজার যেতে হবে তো জিনিসগুলো আনতে। তাড়তাড়ি যাও। তাড়াতাড়ি ফিরো।’

সেমন্তীর গলার স্বরটা কেমন যেন ভাঙা ভাঙা লাগছে! চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে পর্ণাভ বলল, ‘তোমার গলা ভেঙেছে নাকি?’

সেমন্তী আধ ভাঙা গলাতে উত্তর দিল, ‘সকালে উঠে তাই তো দেখছি।’

পর্ণাভ মৃদু রাগত স্বরে বলল, ‘হবে না! তোমাকে নিষেধ করলাম, অভ্যাস নেই, ঠান্ডা কুয়োর জলে স্নান কোরো না। তুমি আমার কথা শুনলে না। তার ওপর কাল রাতে কী না কী দেখার জন্য শীতের রাতে চাদর ছাড়া গাছতলায় গিয়ে দাঁড়ালে। সবেতেই তোমার ওস্তাদি। এবার সামলাও! নির্ঘাত ঠান্ডা লেগেছে!’

সেমন্তী তার কথার কোনো জবাব দিল না। যা হবার তা হয়েছে। সাত সকালে আর বউকে বকাঝকা করল না সে। সেমন্তীকে সে বলল, ‘কিট ব্যাগে ঠান্ডা লাগার ওষুধ আছে খেয়ে নাও। দ্যাখো ঠিক হয় কিনা! আর একটু গার্গেল করে নাও।’

চা খেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরোবার জন্য তৈরি হয়ে নিল পর্ণাভ। বেরোবার আগে সে সেমন্তীকে বলল, ‘ভাবছি একটা হুইস্কি আনব। বহু দিন খাওয়া হয়নি। এমন ফাঁকা নিরিবিলি জায়গাতে একটু পান করতে ইচ্ছা করছে অন ইওর কাইন্ড পারমিশন।’

সেমন্তী সম্মতিসূচক হাসল। তারপর ভাঙা ভাঙা গলাতে বলল, ‘দেখো তো বাজারে শোল মাছ পাওয়া যায় কিনা? অনেকদিন খাইনি।’

পর্ণাভ বুঝতে পারল পরশু রাতে বড় জ্যাঠার হাতে শোল মাছ দেখে তার শোল মাছ খাবার ইচ্ছা হয়েছে। আর তারপরই তার মনে পড়ে গেল গতকাল সকালে নিশীথ হরীতকী গাছের নীচে দেখা পিঁপড়ে ধরা পোড়া শোল মাছের মাথাটার কথা। ব্যাপারটা সে বলতে গিয়েও বলল না সেমন্তীকে। কথাটা শুনে পাছে ঘেন্নাতে সেমন্তীর শোল মাছ খাবার ইচ্ছা চলে যায় সেজন্য। সে বলল, ‘পেলে নিয়ে আসব।’

ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে পর্ণাভ যখন তার গাড়ির দিকে এগোচ্ছে তখন সে বড় জ্যাঠামশাইকে দেখতে পেল। বাড়ির এক পাশে বারান্দা লাগোয়া কুয়োটা যেখানে আছে সেখানে একটা বড় তালপাতা হাতে বড় জ্যাঠামশাই দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে দেখতে পেয়ে পর্ণাভ হেসে জানতে চাইল, ‘কী করছেন?’

ঈশান বললেন, ‘এ জায়গাটা ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করব। রাতে এখানেই কাজটা হবে।’

পর্ণাভ বলল, ‘আচ্ছা, আমিও ফর্দর জিনিসগুলো কিনতে যাচ্ছি।’ কথাগুলো বলে গাড়িতে উঠে বসল সে।

সিউড়ির বাজার বেশ বড়। সেখানে গিয়ে প্রথমে দশকর্মা আর কাপড়ের দোকান থেকে শাড়িটা কিনে ফেলল সে। মদের দোকানও আছে। হুইস্কি কিনতেও অসুবিধা হল না। তারপর শাক-সবজি আর কিছু বাজার করে মাছের বাজারে ঢুকে সৌভাগ্যক্রমে একটা ছোট শোল মাছও পেয়ে গেল। কেনাকাটা সেরে বেলা দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরল পর্ণাভ। জিনিসগুলো দিতে হবে বড় জ্যাঠামশাইকে। বেরোবার সময় পর্ণাভ সেখানে বড় জ্যাঠামশাইকে দেখেছিল সেদিকে তাকিয়ে দেখল যে জায়গাটা ঝকঝকে পরিষ্কার করে সম্ভবত গোবরজল লেপা হয়েছে। মাটির ওপর কোমর সমান উঁচু কুয়োর দেওয়ালের বাইরেটাও ঘসে মেজে পরিষ্কার করা হয়েছে। তবে তিনি সেখানে নেই। অবশ্য এর পরেই পর্ণাভ দেখতে পেলেন তাকে। বাড়ির পিছন থেকে একরাশ কাঁচা পাতা নিয়ে এসে দাঁড়ালেন তিনি। পর্ণাভ তার হাতে দশকর্মা আর শাড়ির প্যাকেটটা দিয়ে পাতাগুলো দেখে জানতে চাইল, ‘এসব পাতা দিয়ে কী হবে?’

ঈশান জবাব দিলেন, ‘রক্ত চন্দনের পাতা দিয়ে মালা বানাব। ঘোড়া নিম, অশ্বত্থ আর বহড়ার পাতা সেলাই করে আসন বানাব। ঠিক রাত বারোটাতে তোমার স্ত্রীকে নীচে নামিয়ে আনব আমি। শেষ রাতে আবার ঘরে পৌঁছে দেব। তারপর তোমরা মিলিত হবে। আর তোমাকে একটা আয়ুর্বেদিক ওষুধ আর কেশর মিশ্রিত দুধ দেব। সেটা পান করবে আমি যখন বউমাকে আনতে যাব তার পরেই। কথাগুলো তোমাকে জানিয়ে রাখলাম।’ কথাগুলো বলে জিনিসপত্র নিয়ে একতলার একটা ঘরে চলে গেলেন ঈশান। অন্য একটা ব্যাগের মধ্যে রাখা বাজার, মাছ আর মদের বোতল নিয়ে পর্ণাভ ওপরে উঠে এল। ঘরে ঢুকে বোতলটা বার করে ব্যাগটা সেমন্তীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে পর্ণাভ বলল, ‘এই নাও শোল মাছ পেয়েছি। আর কিছু কাঁচা সবজি, আনাজও আছে।’

কথাটা বলে হাসি ফুটে উঠল সেমন্তীর ঠোঁটে। সে বলল, ‘কত দিন পর শোল মাছ খাব!’

সেমন্তীর গলাটা আরও বেশি ভাঙা শোনাল এবার। পর্ণাভ জিগ্যেস করল, ‘ঠান্ডা কমার ওষুধটা খেয়েছ?’

ভাঙা গলায় সেমন্তী কী একটা বলল তা বুঝতে পারল না পর্ণাভ। বহুদিন পর হুইস্কির বোতলটা হাতে পেয়ে তার যেন আর সেটা খোলার জন্য তর সইছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ভিতরের বারান্দাতে গ্লাস, বোতল, চানাচুর সব সাজিয়ে নিয়ে বসল পান করার জন্য। ঘরের ভিতর থেকে বাসনপত্রের শব্দ শুনে পর্ণাভ বুঝতে পারল ওদিকে সেমন্তীও রান্না করতে বসল। মদ্যপান শুরু করল পর্ণাভ।

অনেকদিন পর মদ্যপান করে বেশ একটা ঝিমুনি ভাব এসে গেছিল পর্ণাভর। ঘণ্টা তিনেক বাদে বেলা একটা নাগাদ কিছু একটা পোড়ার তীব্র গন্ধ আর একটা মিহি শব্দে হুঁশ ফিরল তার। মাছ পোড়ার কটু গন্ধ আর বিড়ালের ডাক। বারান্দা থেকে উঠে ঘরের দিকে এগোল সে। দরজার বাইরে একটা সাদা বিড়াল বসে ঘরের ভিতর তাকিয়ে ‘মিউ মিউ’ করে ডাকছে। পোড়া মাছের গন্ধেই সম্ভবত কোথা থেকে সে হাজির হয়েছে। পর্ণাভকে দেখে বিড়ালটা একটু সরে গেল। পর্ণাভ ঘরে ঢুকে দেখল স্টোভের ওপর একটা সসপ্যানে শোল মাছের টুকরোগুলো পুড়ছে। উৎকট গন্ধ আর ধোঁয়া বেরোচ্ছে তার থেকে। ঠিক যেমন সেদিন রাতে বড় জ্যাঠামশাইয়ের ঘর থেকে গন্ধ ভেসে আসছিল। আর স্টোভের কিছুটা তফাতে চোখ বুজে আছে সেমন্তী। ব্যাপারটা দেখে পর্ণাভ বলে উঠল, ‘তুমি ঘুমাচ্ছ! এদিকে মাছ পুড়ে ঝামা হয়ে গেল!’

চোখ খুলে তাড়াতাড়ি উঠে স্টোভের নবটা বন্ধ করল সেমন্তী। সসপ্যানটাও সে এক পাশে নামিয়ে রাখল। ধোঁয়াটা একটু কমলে মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে পর্ণাভ বলল, ‘এ মাছ আর খাওয়া যাবে না। মনে হয় তেলও তো দাওনি! বিড়াল এসেছে। ওকে দিয়ে দাও।’

সেমন্তী ভাঙা গলায় বলল, ‘হ্যাঁ, তেল দেওয়া হয়নি। ভুলে গেছি। তুমি স্নান করে নাও। অন্য রান্না হয়ে গেছে।’

সেমন্তী মনে হয় আজ রাতের ব্যাপারটা ভেবে সব ভুলে যাচ্ছে। শোল মাছ অবশ্য পর্ণাভর নিজের খুব একটা পছন্দের নয়। সে আর কিছু বলল না সেমন্তীকে।

পর্ণাভ স্নান সেরে আসার পর সেমন্তী বলল, ‘তুমি আগে খেয়ে নাও। তারপর আমি খাচ্ছি।’

পর্ণাভ খেতে বসল। ভাত খাওয়া শেষ হবার পর হাত ধুয়ে ঘরে ঢুকে পর্ণাভ দেখল সেই পোড়া মাছের সসপ্যানটা টেনে নিয়ে বসেছে সেমন্তী! পর্ণাভ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘ও দিয়ে তুমি কী করবে?’

সেমন্তী ভাঙা গলাতে বলল, ‘এত টাকা দামের মাছ! দেখি না খাওয়া যায় কিনা!’ এই বলে সে মাছের পোড়া মাথাটা তুলে নিয়ে মুখে দিয়ে একটু চিবিয়ে বলল, ‘ভালোই লাগছে কিন্তু। অনেক দিন পর শোল মাছ খাচ্ছি।’

পর্ণাভর হঠাৎ মনে পড়ে গেল গাছের নীচে পিঁপড়ে ধরা সেই শোল মাছের মাথাটার কথা। সে কথা মনে পড়তেই গাটা কেমন ঘিনঘিন করে উঠল তার। মাথাটা চিবিয়ে আর একটা পোড়া মাছের টুকরো তুলে নিল সেমন্তী। শরীরটা কেমন গুলিয়ে ওঠাতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল পর্ণাভ। দরজার বাইরে মাছের আশাতে তখন আবার বিড়ালটা এসে দাঁড়িয়েছে।

সামনের বারান্দা হয়ে আবার পিছনের দিকের বারান্দায় এসে দাঁড়াল পর্ণাভ। সে এবার দেখতে পেল বড় জ্যাঠামশাইকে। সেই নিশীথ হরীতকী গাছের নীচে তিনি। হাতে একটা লগি। গাছের নীচ থেকে তিনি কী যেন একটা কুড়িয়ে বাড়িতে ফিরে এলেন। পর্ণাভকে তিনি খেয়াল করলেন না। কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর পর্ণাভ যখন ঘরে ফিরে এল তখন সেমন্তী পুরো মাছটাই শেষ করে ফেলেছে। পর্ণাভর দিকে তাকিয়ে সে হেসে বলল, ‘বেশ খেলাম কিন্তু।’ তার গলা এখন এতটাই ভাঙা যেন মনে হয় অন্য কারো গলা! পর্ণাভ হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, ফিস তন্দুরি খেলে! কথাটা বলে তক্তপোষে শুয়ে পড়ল সে।

বিকাল পাঁচটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠল পর্ণাভ। কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে সেমন্তী। তাকে রাত জাগতে হবে। তাই তাকে আর ডাকল না। ঘর থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সে নেমে এল পিছনের বাগানে। বেলা পড়ে আসছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে সে পৌঁছে গেল নিশীথ হরীতকী গাছের নীচে। একটা ছোট ডাল আর কিছু পাতা পড়ে আছে মাটিতে। ওপর দিকে তাকিয়ে সে সেই হরীতকীটা দেখতে পেল না। তার মনে হল ওই ডালটাই মাটিতে পড়ে আছে। তবে কি হরীতকীটা পেড়ে নিয়েছেন জ্যাঠামশাই? এরপর কিছুক্ষণ বাগানের চারদিকে ঘুরে বেড়াল সে। তারপর যখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করল তখন সে বাগান ছেড়ে ফেরার পথ ধরল। ঘরে ঢুকে সে দেখল সেমন্তী তখনও ঘুমাচ্ছে। মোম না জ্বালিয়ে আবার সে শুয়ে পড়ল সেমন্তীর পাশে কম্বল মুড়ি দিয়ে।

শুয়ে পড়লেও জেগেই ছিল পর্ণাভ। রাত আটটা নাগাদ বিছানাতে উঠে বসল সেমন্তী। পর্ণাভ বিছানা থেকে নেমে মোম জ্বালিয়ে তাকাল সেমন্তীর দিকে। চোখ দুটো কেমন যেন লাল মনে হচ্ছে তার। মুখটাও ফোলা ফোলা। পর্ণাভ তাকে প্রশ্ন করল, ‘তোমার শরীর কেমন?’

সেমন্তী জবাব দিল, ‘ঠিক আছে। তবে আমি আর রাতে খাব না। শোল মাছ খেয়ে পেট ভরে গেছে।’

পর্ণাভ জবাব দিল, ‘ঠিক আছে! কিন্তু তোমার গলা তো পুরো ভেঙে গেছে গো! মনে হচ্ছে অন্য মানুষের গলা! তার ওপর চোখও লাল দেখাচ্ছে! ঠান্ডা তো লাগিয়েছ বোঝা যাচ্ছে! এ অবস্থায় যজ্ঞে বসবে কীভাবে? আর স্নান করলে তো নির্ঘাত নিমুনিয়া হবে! বড় জ্যাঠামশাইকে বলি, আজ এসব থাক। তেমন হলে নয় বড় জ্যাঠামশাইয়ের কথামতো কোনো একটা দিন দেখে আবার আমরা এখানে আসব।’

পর্ণাভর কথাটা শুনেই সোজা হয়ে বসল সেমন্তী। তারপর বলল, ‘না, আজই বসব আমি। কিছু হবে না আমার। এই আমার শেষ সুযোগ। বাধা দিয়ো না। বাধা দিলেও আমি শুনব না।’

সেমন্তী শেষ কথাগুলো এমন শক্ত ও রুক্ষ ভাবে বলল তাতে বেশ অবাক হয়ে গেল পর্ণাভ। সেমন্তী বেশ নরম স্বভাবের মেয়ে। এই সেমন্তীকে যেন বেশ অচেনা বলে মনে হল পর্ণাভর। সে একটু আহত ভাবে বলল, ‘আচ্ছা, যা ইচ্ছা তাই করো। কাল সকালে তোমাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটতে হবে মনে হচ্ছে।’

সেমন্তী তার কথার কোনো জবাব দিল না। যেন সে একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে!

জানলার সামনে গিয়ে চুপ করে দাঁড়াল পর্ণাভ। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে বাগানে। নিশীথ হরীতকী গাছটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অন্য গাছগুলো। অশ্বত্থ, বহরা, ঘোড়া নিম, শ্বেত খাদির। চাঁদের আলোতে তাদের কেমন যেন জীবন্ত মানুষ বলে মনে হচ্ছে। হরীতকী গাছটাকে ঘিরে ধরে কী যেন বলছে তারা। বাড়ির সামনের অংশ থেকে মাঝে মাঝে অস্পষ্ট শব্দও যেন ভেসে আসছে। বড় জ্যাঠামশাই হয়তো তার যজ্ঞের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। তারই শব্দ এসব। সময় এগিয়ে চলল।

পুরোনো মোমবাতিটা শেষ হয়ে এসেছিল। নতুন একটা বড় মোম জ্বালিয়ে রাত এগারোটা নাগাদ রাতের খাওয়া সেরে নিল পর্ণাভ। ঘরের বাইরে বিড়ালটা আবার হাজির হয়েছে। রুগ্ন বিড়াল। এই পোড়ো বাড়িতে খাবারের লোভে আবার এসেছে সে। উচ্ছিষ্টগুলো তাকে দিয়ে মুখ হাত ধুয়ে পর্ণাভ যখন ঘরে ঢুকল তখন সেমন্তী বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পর্ণাভর উদ্দেশে সে বলল, ‘তুমি কোনো চিন্তা কোরো না।’ কথাটা বলে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। বাইরের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘এই নিশীথ হরীতকী গাছটা কী সুন্দর তাই না?’

সেমন্তীর ব্যবহারে পর্ণাভর বেশ একটু অভিমান হয়েছে। তাই সে তার কথার কোনো জবাব দিল না। বাইরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেমন্তী।

ঠিক রাত বারোটাতে পর্ণাভর ঘরের সামনে এসে উপস্থিত হলেন বড় জ্যাঠামশাই ঈশান চক্রবর্তী। তার এক হাতে একটা লণ্ঠন আর অন্য হাতে একটা মাটির গ্লাসের মতো পাত্র। তাকে দেখে পর্ণাভ দরজার সামনে এগিয়ে গেল। আর তার পিছনে সেমন্তীও। তাকে দেখে পর্ণাভ বুঝতে পারল, সদ্য স্নান সেরে এসেছেন তিনি। তার শুভ্র দাড়ির ডগা থেকে এখনও জল ঝরছে। দুধ পূর্ণ মাটির গ্লাসটা পর্ণাভর হাতে দিয়ে তিনি বললেন, ‘এবার বউমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। ওই দুধটা খেয়ে শুয়ে পড়ো তুমি। ঘর থেকে বেরিয়ো না। যজ্ঞস্থলে তৃতীয় কারো উপস্থিতি থাকতে নেই। তবে সব মাটি হয়ে যাবে।’

দুধের পাত্রটা হাতে নিয়ে বলব না বলব না করেও শেষ পর্যন্ত কথাটা, বড় জ্যাঠামশাইকে উৎকণ্ঠিত ভাবে বলেই ফেলল পর্ণাভ। সে বলল, ‘খুব ঠান্ডা লেগেছে সেমন্তীর। গলা ধরে গেছে, কথা বলতে পারছে না। এই ঠান্ডার মধ্যে স্নান করলে আবার বিপত্তি না হয়!’ কথাটা শুনে ঈশান বললেন, ‘ও তাই নাকি! তবে মাথায় একটু জল ছিটিয়ে নিলেই হবে। আর মন্ত্রোচ্চারণ মনে মনে করলেই হবে।’ পর্ণাভ হয়তো এরপর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাকে টেনে পাশে সরিয়ে দিয়ে বড় জ্যাঠামশাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সেমন্তী। তারপর ইশারাতে বড় জ্যাঠামশাইকে বলল, ‘চলুন।’

দরজা ছেড়ে ঈশান তাকে নিয়ে এগোলেন নীচে নামার জন্য।

তারা চলে যাবার পর পর্ণাভ মাটির পাত্রটা মাটিতে নামিয়ে রাখল। তখনই দুধটা খেতে ইচ্ছা করল না তার। বিছানাতে শুয়ে পড়ল সে। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসতে চাইল না তার। বিছানাতে বসে কেবলই এপাশ-ওপাশ করতে করতে সে ভাবতে লাগল এত শরীর খারাপ নিয়ে ঠান্ডার মধ্যে সম্ভবত খোলা আকাশের নীচে বসে আছে সেমন্তী। নির্ঘাত অসুস্থ হয়ে পড়বে সে! ক্রমশ এগিয়ে চলল সময়। একঘণ্টা, দু-ঘণ্টা…

রাত দুটো নাগাদ হঠাৎই একটা ঠক করে শব্দ শুনে কম্বল ছেড়ে বিছানাতে উঠে বসল পর্ণাভ। মোমটা জ্বলতে জ্বলতে শেষ হয়ে দপদপ করছে। সেই আলোতে পর্ণাভ দেখল সেই বিড়ালটা কখন যেন ঘরে ঢুকে বসেছিল। দুধের ভাঁড়টা সে উল্টে দিয়ে মাটি থেকে দুধ চেটে চেটে খাচ্ছে। খাচ্ছে খাক। বড় জ্যাঠামশাই যা করছেন বা করতে বলেছেন তাতে পর্ণাভর কোনো বিশ্বাসই নেই। শুধু মাত্র সেমন্তীর বিশ্বাসকে আঘাত না করার জন্য, তাকে শান্তি দেবার জন্য বড় জ্যাঠামশাইয়ের প্রস্তাব মেনে নিয়েছে পর্ণাভ।

সে বিড়ালটার দিকে তাকিয়ে তার দুধ চাটা দেখতে লাগল। আর তারপরই হঠাৎ মোমবাতিটা নিভে গিয়ে ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। অন্ধকার ঘরে বসে পর্ণাভ যেন আরও অস্থির হয়ে উঠল। নানা কথা ভাবতে ভাবতে সেমন্তীর জন্য কেমন যেন একটা অজানা আশঙ্কা কাজ করতে লাগল তার মনে। এক সময় সে ভাবল বড় জ্যাঠামশাই যাই বলুন না কেন নীচে নেমে সে আড়াল থেকে দেখবে সেমন্তী কী করছে?—এ কথা ভেবে নিয়ে বিছানা থেকে নেমে ঘরের বাইরে বেরোল পর্ণাভ। পিছনের বারান্দা দিয়ে নীচে বাগানে নেমে সন্তর্পণে সে এগোল যেদিকে তাদের থাকার কথা সেদিকে।

কুয়োটা দেখতে পেল পর্ণাভ। তার ওপাশে যেন আগুনের আভা দেখা যাচ্ছে। ওর আড়ালে বসে ব্যাপারটা দেখা যেতে পারে ভেবে সন্তর্পণে সেদিকে এগোল। তারপর মার্জার পায়ে গুঁড়ি মেরে সামান্য একটু ফাঁকা জায়গা পেরিয়ে কুয়োর প্রাচীরের আড়ালে গিয়ে বসে পড়ল।

পর্ণাভ সামনে তাকালো। কুয়ো থেকে হাত কুড়ি পঁচিশ দূরে একটা যজ্ঞকুণ্ডের দু-পাশে মুখোমুখি বসে আছে তারা দুজন। আগুনের আভাতে পাশ থেকে দুজনের মুখ দেখা যাচ্ছে। সেমন্তীর পরনে নতুন লাল পেড়ে শাড়ি, পিঠে এলিয়ে আছে খোলা চুল।

বড় জ্যাঠামশাইয়ের পরনে একখণ্ড রক্তবস্ত্র। ঊর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত। পাতার সামনে বসে বেশ জোরে জোরে মন্ত্রোচ্চারণ করছেন তিনি। আর মাঝে মাঝে অগ্নিকুণ্ডে কী সব যেন ছেটাচ্ছেন পাশ থেকে তুলে তুলে। মাটির পাত্রে, কলাপাতার টুকরোতে নানা উপাচার সাজানো আছে তার চারপাশে। ভালো করে তাকিয়ে একটা কলাপাতার ওপর সেই কালচে সবুজ রঙের ফলটাকেও দেখতে পেল পর্ণাভ। নিশীথ হরীতকী!

কুয়োর আড়ালে বসে ব্যাপারটা দেখতে লাগল পর্ণাভ। সেমন্তী পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। হয়তো সে মনে মনে মন্ত্রোচ্চারণ করছে—ভাবল পর্ণাভ। সময় এগিয়ে চলল।

একসময় পর্ণাভ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত তিনটে বেজে গেছে। অনেক সময় কেটে গেছে। এদিকে যজ্ঞের আগুনটাও কেমন যেন নিবু নিবু হয়ে এসেছে। বেশ স্তিমিত হয়ে এসেছে বড় জ্যাঠামশাইয়ের কণ্ঠস্বর। এবার নিশ্চয় কাজ শেষ হবে। বড় জ্যাঠামশাই, সেমন্তীকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসার আগেই এ জায়গা থেকে উঠে পর্ণাভকে ঘরে ফিরতে হবে।

সেখান থেকে উঠতে যাচ্ছিল পর্ণাভ। ঠিক সেই সময় কেমন যেন একটা অস্পষ্ট খচমচ শব্দ শুনল সে। পিছনে, আশেপাশে তাকিয়ে তেমন কিছু চোখে পড়ল না তার। কিন্তু এরপরই আবারও শব্দটা কানে গেল তার। পর্ণাভর এবার মনে হল শব্দটা যেন কুয়োর ভিতর থেকেই আসছে। কুয়োর ভিতর দেওয়ালের গা বেয়ে যেন উঠে আসছে কিছু একটা। হ্যাঁ, আবার সেই খচমচ শব্দ!

পর্ণাভ শব্দটার দিকে মনোযোগ দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু বড় জ্যাঠামশাইয়ের গলার শব্দে সে আবার সামনের দিকে তাকাল। আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে তারা দুজনেই। বড় জ্যাঠামশাইয়ের এক হাতে পাতার মালা অন্য হাতে কলাপাতাতে রাখা নিশীথ হরীতকী ফলটা।

ঈশান, সেমন্তীকে বললেন, ‘এই রক্ত চন্দনের মালাটা গলায় ধারণ করো। তারপর এই নিশীথ হরীতকী ফলটাকে নিয়ে ও কুয়োর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। আমি বললে ফলটাকে কুয়োর জলে বিসর্জন দেবে।’

সেমন্তী চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল তার কথা শুনে।

ঈশান, মালা আর ফলটা তুলে ধরে আবারও বললেন, ‘নাও থালাটা আর ফলটা নাও। দেরি কোরো না। তিথি পেরিয়ে যাবে। নিশীথ হরীতকী তোমাকে বিসর্জন দিতে হবে।’

বড় জ্যাঠামশাইয়ের কথা শুনে সেমন্তী এবার বলে উঠল, ‘কাকে বিজর্সন দেব? শুধু ফলটা, নাকি তার সঙ্গে নিজেকেও?’ সেমন্তীর কণ্ঠস্বরটা এবার স্পষ্টতই যেন অন্য কারো কণ্ঠস্বর বলে মনে হল পর্ণাভর।

বড় জ্যাঠামশাই যেন মৃদু চমকে উঠে বললেন, ‘তার মানে?’

সেমন্তীর ঠোঁটে যেন মৃদু হাসি ফুটে উঠতে শুরু করেছে। সে বলল, ‘আপনি এতক্ষণ যে মন্ত্র পাঠ করছিলেন সে তো সন্তান ধারণের মন্ত্র নয়। পাতাল বটুকের আবাহন মন্ত্র।’

তার গলা শুনে পর্ণাভর এবার আর কোনো সন্দেহই রইল না। এ গলা সেমন্তীর নয়, অন্য কারো গলা।

তান্ত্রিক ঈশান চক্রবর্তী বিস্মিত ভাবে বলে উঠলেন, ‘তুমি কে?’

তাদের কথা শুনতে শুনতে পর্ণাভর মনে হল সেই খচমচ শব্দটা যেন কুয়োর ভিতর থেকে উঠে আসতে শুরু করেছে!

বড় জ্যাঠামশাইয়ের প্রশ্নের জবাবে একটু চুপ করে থেকে সেমন্তী বলল, ‘আমার গলা শুনেও এখনও ঠিক চিনতে পারছ না আমাকে! ভেবেছিলে পোড়া শোল মাছ খাইয়ে শান্ত রাখবে আমাকে। তোমার ও মাছ ছুঁয়েও দেখিনি। আমি সে, যার মাথা কেটে তুমি তার খুলির মধ্যে মাটি ভরে নিশীথ হরীতকীর চারা পুঁতেছিলে। এবার চিনতে পারছ আমাকে?’

তার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বড় জ্যাঠামশাই আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন, ‘তারাসুন্দরী!’ বলে। তার হাত থেকে খসে পড়ল রক্তচন্দন পাতার মালা আর নিশীথ হরীতকী!

অট্টহাস্য শুরু করল সেমন্তীর গলা থেকে বেরিয়ে আসা সেই অচেনা বীভৎস স্বর। আর তারপর সে হাত বাড়িয়ে ধরতে গেল বড় জ্যাঠামশাইকে। বাঁচার জন্য ঈশান ছুটলেন কুয়োর পাশ দিয়ে বাগানের বাইরে পালাবার জন্য। আর ঠিক সেই সময় খচমচ শব্দটা প্রবল হয়ে উঠল। জ্যাঠামশাই যখন ঠিক কুয়োর গায়ে এসে পড়েছেন ঠিক সেই সময় কুয়োর ভিতর থেকে বাদুড়ের ডানার মতো দুটো কালো চাদরের পর্দা যেন হাতের মতো বেরিয়ে এল! পুঁতিগন্ধময় সেই কালো চাদর দুটো আঁকড়ে ধরল ধাবমান বড় জ্যাঠামশাইকে। তারপর নিমেষের মধ্যে বড় জ্যাঠামশাইয়ের শরীরটাকে আবৃত করে অচেনা, অজানা আতঙ্ক অদৃশ্য হয়ে গেল কুয়োর ভিতর! সেই বামা কণ্ঠস্বর প্রবল অট্টহাস্য করে বলে উঠল, ‘নিয়ে গেল! নিয়ে গেল!’—এ কথা বলে সে ছুটতে শুরু করল বাগানের দিকে।

প্রাথমিক বিস্ময়, বিহ্বলতা আতঙ্ক কাটিয়ে পর্ণাভ এরপর ছুটল তার পিছনে। সেই নিশীথ হরীতকী গাছের নীচে গিয়ে পড়ে গেল সেমন্তী। পর্ণাভ যখন তার কাছে গিয়ে পৌঁছালো তখন সংজ্ঞাহীন সেমন্তী। পর্ণাভ তার কাছে পৌঁছে কাঁধ ধরে ঝাঁকাতেই সেমন্তী চোখ মেলে উঠে বসল। তারপর বিস্মিত ভাবে চারপাশে তাকিয়ে বলল, ‘এখানে আমি কীভাবে এলাম?’ সেমন্তীর কণ্ঠস্বর এখন আর ভাঙা নয়, অপরিচিত নয় সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।

কোনোরকমে তাকে দোতলার ঘরে উঠিয়ে নিয়ে এল পর্ণাভ।

ভোরের আলো ফুটল একসময়। ততক্ষণে জিনিসপত্র সব গুছিয়ে ফেলেছে পর্ণাভ। এ বাড়ি যথাসম্ভব দ্রুত ছাড়তে হবে তাকে। পর্ণাভ, সেমন্তীর সঙ্গে যতটুকু কথাবার্তা বলেছে তাতে সে বুঝতে পেরেছে পরশু রাতে যে সে নিশীথ হরীতকী গাছের তলাতে গিয়েছিল এরপর তার কিছুই মনে নেই। ঘরে ফেরা, শোল মাছ খাওয়া, যজ্ঞে বসা, কিছুই মনে নেই। পর্ণাভ তার কাছে কিছুই ভাঙল না। শুধু তাকে জানাল দ্রুত এ বাড়ি ছাড়তে হবে তাদের।

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই মালপত্র নিয় তারা নীচে নেমে এল। যজ্ঞস্থলে পড়ে আছে গতকালের নানা উপাচার। সে সব দেখে কিছুই মনে করতে পারল না সেমন্তী। মালপত্র গাড়ির ডিকিতে ওঠাবার পর গাড়িতে উঠে বসল সেমন্তী। পর্ণাভ গাড়িতে ওঠার সময় হঠাৎই দেখতে পেল কিছুটা তফাতে মরে পড়ে আছে সেই বিড়ালটা। কাক ঠোকরাচ্ছে তাকে। তবে কি বিষ মেশানো ছিল সেই দুধে? পর্ণাভ আর সেমন্তী, দুজনেরই কোনোদিন আর হদিশ পাওয়া যেত না? কেঁপে উঠল পর্ণাভ। গাড়িতে উঠে বসে এঞ্জিন স্টার্ট করতেই সেমন্তী বলল, ‘বড় জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে একবার দেখা করে গেলে হতো না?’

কথাটা শুনে পর্ণাভ তাকাল কুয়োটার দিকে। তার চোখে মুহূর্তের জন্য ফুটে উঠল সেই দৃশ্য! দুটো কালো পর্দা বড় জ্যাঠামশাইকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কুয়োর অন্ধকারে, পাতালে। ভয়ঙ্কর এক অস্তিত্ব; পাতাল বটুক।

কিছু কথা

পাতাল বটুক দেবতা নয়, প্রেত নয়, উপদেবতা নয়, মানুষ নয়, এক অন্য অস্তিত্ব। কেউ কেউ বলেন ভয়ঙ্কর অস্তিত্ব! স্থান, কাল, দেশ ভেদে বিভিন্ন নামে ডাকা হয় তাদের। নির্দিষ্ট কোনো চেহারার বর্ণনাও নেই তাদের। সুড়ঙ্গ বা কূপের ভিতর থেকে পাতাল ছেড়ে উঠে আসে তারা। বিদেশি লেখকদের লেখাতে, আসামেও কিছু লেখকের রচনাতে নানা ভাবে নানা নামে আবির্ভূত তারা। যদিও তাদের নিয়ে লেখা খুব বেশি হয়নি। এ কাহিনি কোনো বিশ্বাস বা ধর্মীয় ভাবনাকে আঘাত করার জন্য নয়। কল্পিত ভাবনা, কল্পিত চরিত্র নিয়ে এ কাহিনি রচনা করা হয়েছে শুধু মাত্র পাঠক-পাঠিকার মনোরঞ্জনের জন্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *