১
তাঁবু খাটাচ্ছিল ঈশানবাবুর সঙ্গে আসা লোকগুলো। আর তিনি তাকিয়ে দেখছিলেন চারদিকে। অপরূপ কাশ্মীর উপত্যকা। এ জায়গাটা পহেলগাঁওর একটু উপরদিকে পঞ্চাশ মাইল দূরে জনবসতিহীন একটা অঞ্চল। যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই নীল আকাশের বুকে জেগে আছে তুষারশোভিত পর্বতমালা। তার কিরীটগুলো মধ্য গগনের সূর্যালোকে যেন জ্বলছে। আর কাছেপিঠে পাহাড়ের ঢালগুলোতে দাঁড়িয়ে আছে পান্না সবুজ পাইন বন। ধীরে ধীরে ওপর দিকে উঠে গেছে গাছগুলো। এখন গ্রীষ্মকাল হলেও মাথার ওপরের শেষ সারির গাছগুলোর গায়ে যে বরফের আস্তরণ আছে তা দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে।
না, ঈশানবাবু সে অর্থে কোনো ট্যুরিস্ট নন, তিনি একজন জিওলজিস্ট, অর্থাৎ একজন ভূতাত্ত্বিক। জিওলজিক্যাল সার্ভেতে চাকরি করেন। সে সংস্থা থেকেই তাঁকে এ অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে এখানকার মাটি পরীক্ষার জন্য। পহেলগাঁও থেকে স্থানীয় কয়েকজন মানুষকে সঙ্গী হিসাবে জোগাড় করে একটা জিপে কিছুক্ষণ আগেই তিনি এখানে হাজির হয়েছেন। ঈশানবাবুকে দিন তিনেক থাকতে হবে এ জায়গাতে। মাটি পরীক্ষা করতে হবে, নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। আর সেজন্যই তাঁবু খাটানোর কাজ হচ্ছে।
চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে করতে হঠাৎ ঈশানবাবুর চোখে পড়ল তাঁর ঠিক সামনেই পাইনবনে ঢাকা যে অনুচ্চ পাহাড়ের ঢালটা ওপরের দিকে উঠে গেছে, তার মাথার দিকে যেন একটা কাঠামো মতো দেখা যাচ্ছে। ঘর-বাড়ি মতো কিছু একটা। তবে জায়গাটা পাইন গাছে ঘেরা বলে এত দূর থেকে জিনিসটা কী, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। ঈশানবাবুর মনে হল, হয়তো জায়গাটাতে আর্মি আউটপোস্টও থাকতে পারে।
তাঁবু খাটানো হয়ে গেল একসময়। দুটো তাঁবু। একটা তাঁবু ঈশানবাবুর রাত্রিবাসের জন্য। আর বড় তাঁবুতে থাকবে ঈশানবাবুর তিনজন কাশ্মীরি সঙ্গী আর ড্রাইভার। সেও স্থানীয় মানুষ। গাড়ি থেকে ঈশানবাবুর কাজের যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য মালপত্র ইত্যাদি তাঁর তাঁবুতে নিয়ে রাখবার পর ঈশানবাবুর সঙ্গীদের মধ্যে সবথেকে বয়স্ক যে লোকটা, সে এসে দাঁড়াল ঈশানবাবুর সামনে। লোকটার নাম বশির। বৃদ্ধ কাশ্মীরি। তার পরনে স্থানীয় মানুষদের মতোই গরম কাপড়ের তৈরি লম্বা ঝুলের পোশাক বা পিরান, মাথায় কাপড়ের টুপি, একমুখ সাদা দাড়ি।
বশির ঈশানবাবুকে প্রশ্ন করল, ‘সাব, আমরা এখন কী করব? কাজ কি এখন থেকেই শুরু হবে?’
ঈশানবাবু জবাব দিলেন, ‘না, আজ বিশ্রাম। কাল সকাল থেকে কাজ শুরু হবে। ঘুরে ঘুরে চারপাশের মাটি পরীক্ষা করতে হবে।’
এ কথা বলার পর ঈশানবাবু জানতে চাইলেন, ‘এ জায়গাটা নিরাপদ তো? কোনো গোলাগুলির ব্যাপার নেই তো?’ কাশ্মীর মানেই তো আজকাল সমতলের মানুষের কাছে গোলা-বন্দুক-জঙ্গি; এসব শব্দ। সমতলের মানুষদের কাছে এসব শব্দের আড়ালে হারিয়ে যেতে বসেছে কাশ্মীরের আসল সৌন্দর্য। যদিও বনেবাদাড়ে নির্জন জায়গাতে কাজ করতে হয় বলে ঈশানবাবুর একটা লাইসেন্সড রিভলবার আছে আত্মরক্ষার জন্য এবং সেটা তিনি সঙ্গে এনেছেন। ঈশানবাবুর মনের ভাব বুঝতে পেরে বশির হেসে বলল, ‘না, সাব। এই মুলুক খুব শান্ত। ওসব ভয় এদিকটাতে নেই। এদিকে কোনো মানুষ থাকে না। যেখানে মানুষ থাকে সেখানেই গন্ডগোল। তা ছাড়া বর্ডারও অনেকটা দূর। বেশ কয়েকটা পাহাড় টপকাতে হয়।’
তার জবাব শুনে আশ্বস্ত হয়ে ঈশানবাবু এরপর প্রশ্ন করলেন, ‘পাহাড়ের ঢালের জঙ্গলগুলোতে নেকড়ে বা অন্য কোনো হিংস্র জানোয়ার আছে নাকি?’
বশির হেসে বলল, ‘না, হিংস্র জানোয়ার নেই। তবে এখানে কস্তুরী হরিণ আছে। কস্তুরী হরিণ কাকে বলে তা নিশ্চয়ই জানেন?’
কথাটা শুনে ঈশানবাবু বেশ অবাক হয়ে বললেন, ‘জানব না কেন! যদিও চোখে দেখিনি। কস্তুরী মৃগ; মাস্ক ডিয়ার বলে ইংরেজিতে। তাদের নাভিতে সুগন্ধী গ্রন্থি থাকে, তাকে বলে কস্তুরী। খুব দামি জিনিস, সুগন্ধ প্রস্তুতিতে আর অন্য নানা কাজে ব্যবহার হয়। বিশেষত পৌরুষত্ব বাড়াতে নাকি কস্তুরী কাজে লাগে।’
বশির হেসে বলল, ‘জি সাব। পুরুষ হরিণের দেহে ওই কস্তুরী পাওয়া যায়। অনেক দূর থেকে বাতাসে তার গন্ধ ভাসে। কোনো বাড়িতে এক টুকরো আসল কস্তুরী রাখলে দশ বছর পরেও তার গন্ধ পাওয়া যায়।’
ঈশানবাবু উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘তুমি দেখেছ তাদের? আমরা তো এখানে তিনদিন থাকব। তাদের দেখা মিলবে?’
বশির দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, দেখেছি। এখানেই একবার দেখেছি। অনেকটা ছাগলের আকৃতির হয়। পাগুলো সরু সরু। ওই পা নিয়ে খাড়া পাহাড়ের ঢালে চলতে পারে ওরা। কুড়ি-পঁচিশ ফুট লাফাতে পারে অনায়াসে। পুরুষ কস্তুরী হরিণ চেনা যায় তাদের ওপরের চোয়ালের বাইরে নেমে আসা দাঁত থেকে। অমন দাঁত অন্য কোনো হরিণের থাকে না। তবে দেখা মিলবে কিনা বলা যায় না। নসিবে থাকলে মিলবে। ওরা খুব লাজুক প্রাণী। নারী-পুরুষ বছরের অধিকাংশ সময় একা একাই ঘোরে মিলনের ঋতু ছাড়া।’
এ কথা বলে একটু থেমে বশির আঙুল তুলে সামনের ঢালের জঙ্গলের মাথাটা দেখিয়ে বলল, ‘ওই যে ওখানে কখনও-সখনও ওদের দেখা যায়। আমরা একবার কাঠ কাটতে গিয়ে ওখানে একটা কস্তুরী হরিণ দেখেছিলাম।’ বশিরের দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকিয়ে ঈশানবাবু আবারও জানতে চাইলেন, ‘ওখানে কোনো ঘর-বাড়ি আছে নাকি?’
বশির জবাব দিল, ‘ওখানে একটা পুরোনো ছোট মন্দির ছিল একসময়। এক সন্ন্যাসী থাকতেন। তবে এখন আর নেই। মন্দিরটাও ভেঙে গেছে। কাঠামোর একটা অংশ শুধু এখনও দাঁড়িয়ে আছে। সেটাই দেখা যাচ্ছে। কোনো লোক থাকে না ওখানে। গিয়ে দেখে আসতে পারেন জায়গাটা। হয়তো বা কস্তুরীরও দেখা মিলতে পারে।’—কথা শেষ করে হাসল বশির। এ জায়গা সম্বন্ধে ঈশানবাবুর মোটামুটি কিছুটা জানা হয়ে গেল বশিরের কাছ থেকে। তিনি বশিরকে বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি যাও। কোনো প্রয়োজন হলে বলব তোমাকে।’
সেলাম ঠুকে বশির এগোল তার সঙ্গীদের দিকে।
২
ঈশানবাবু বেশ কিছুক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলেন। বশির আর তার সঙ্গীরা তাঁবুর সামনে বসে আড্ডায় মেতেছে। মাথার ওপর মধ্যাহ্নের সূর্যের ঝলমলে আলো। তাঁবুর ভিতরে গিয়ে ক্যাম্পখাটে শুয়ে পড়ার ইচ্ছা নেই ঈশানবাবুর। আবার বশিরদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বসাটাও তাঁর পক্ষে সমীচীন নয়, তাই ঈশানবাবু ভাবলেন আশপাশটা একটু দেখে আসা যাক।—এ কথা ভেবে নিয়ে তিনি সোজা এগোলেন সামনের ঢালটার দিকে। যার মাথার ওপর রয়েছে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, বশিরের কথা অনুযায়ী যেখানে কস্তুরী মৃগর দেখা মিলতে পারে।
ঢালটা ধীরে ধীরে ওপর দিকে উঠেছে। সেটা বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলেন ঈশানবাবু। শীতকালে এই ঢালের মাটি নিশ্চয়ই বরফের চাদরের তলায় ঢাকা থাকে, এখন পাতার রাশিতে ঢাকা, আর তার ফাঁক দিয়ে কোথাও কোথাও ঘাসও উঁকি দিচ্ছে। ঈশানবাবুর যাত্রাপথের হাত পনেরো-কুড়ি তফাতে তফাতেই আছে বিরাট বিরাট পাইন গাছ। কিছু ওক গাছও আছে। জল চুঁইয়ে পড়ছে তার গুঁড়ি বেয়ে। ঝিঁঝিপোকার শব্দ আর গাছের মাথা থেকে জল খসে পড়ার টুপটাপ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
ঈশানবাবু একসময় ঢালের মাথার ওপর উঠে এলেন। জায়গাটাতে পৌঁছে বেশ একটু অবাকই হলেন তিনি। প্রায় একটা ফুটবল মাঠের মতো সমতল জায়গা। নীচ থেকে যা ঠিক বোঝা যায় না। যেখানে মন্দিরের ভগ্নাবশেষটা দাঁড়িয়ে আছে, সে জায়গার পাইনবন একটু ফাঁকা ফাঁকা হলেও কিছুটা এগিয়ে তা গিয়ে মিশেছে ঘন বনের সঙ্গে। আধো অন্ধকার আর ঘন কুয়াশামাখা বন সম্ভবত গিয়ে মিশেছে পাশের পাহাড়ের ঢালের সঙ্গে।
চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে নিয়ে ঈশানবাবু এগোলেন মন্দিরের ধ্বংসস্তূপের দিকে। উচ্চতায় বা দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে মন্দিরটা কত বড় ছিল, তা আজ তার ধারণা করার কোনো উপায় নেই। তবে কাঠ আর পাথুরে দেওয়াল আজও দাঁড়িয়ে আছে মাটির ওপরে। ঢালের প্রায় কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা এই দেওয়ালটাকেই নীচ থেকে ঈশানবাবু দেখতে পেয়েছিলেন। মন্দিরটা কোন দেবদেবীর তাও আজ আর বোঝার কোনো উপায় নেই। কিছুক্ষণ সেই ধ্বংস্তূপের মধ্যে ঘোরাঘুরির পর ঈশানবাবু ফেরার পথ ধরতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় একটা মৃদু মিষ্টি গন্ধ তাঁর নাকে এল, আর তারপরেই একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে পিছনে তাকিয়ে তিনি দেখতে পেলেন, একলা দাঁড়িয়ে থাকা সেই দেওয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে একজন লোক। তার পরনে চেককাটা কোট, পায়ে জুতো, মাথায় টুপি। লোকটা হিন্দিতে ঈশানবাবুকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি ট্যুরিস্ট?’
ঈশানবাবু জবাব দিলেন, ‘না, ট্যুরিস্ট নই। একটা সরকারি কাজে এখানে এসেছি। ওই নীচেই তাঁবু ফেলেছি।’
লোকটা এবার ঈশানবাবুর কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়াল। সেই মিষ্টি গন্ধটা আর-একটু বাড়ল। লোক না বলে ছেলে বলাই মনে হয় ভালো। তার দাড়ি-গোঁফ কামানো ফর্সা মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে ঈশানবাবুর মনে হল এই আগন্তুকের বয়স খুব বেশি হলে সাতাশ-আঠাশ হবে। ছেলেটা এরপর ঈশানবাবুকে অবাক করে দিয়ে স্পষ্ট বাংলায় প্রশ্ন করল, ‘বাঙালি মনে হচ্ছে? কলকাতা থেকে আসছেন?’
মৃদু বিস্মিতভাবে ঈশানবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, কলকাতা থেকে আসছি। আপনিও বাঙালি নাকি? ট্যুরিস্ট?’
ছেলেটা হেসে বলল, ‘না বাঙালি নই। আমার নাম রঘুবীর ত্রিবেদী। আদতে উত্তরপ্রদেশের মানুষ হলেও বহু বছর কলকাতায় কাটিয়েছি। আপনার হিন্দি বলার ঢং দেখে বুঝতে পারলাম আপনি বাঙালি। না, আমি ট্যুরিস্ট নই, এখানেই থাকি।’
ঈশানবাবু এবার নিজের পুরো পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘আপনি কী করেন? চাকরি না ব্যবসা?’
ত্রিবেদী হেসে বলল, ‘কলকাতায় থাকাকালীন বড়বাজারে ব্যবসা করতাম। এখানে এখন আপাতত কিছু করি না।’
ব্যক্তিগত ব্যাপারে আর কোনো প্রশ্ন করা সমীচীন নয় মনে করে এসব ব্যাপারে তাকে আর কোনো প্রশ্ন করলেন না ঈশানবাবু। তবে যেহেতু ছেলেটা এখানেই থাকে তাই জায়গাটা সম্বন্ধে খোঁজখবর নেবার জন্য ঈশানবাবু বললেন, ‘আচ্ছা, শুনলাম, এই পাইন বনে নাকি কস্তুরী হরিণ থাকে? কথাটা কি সত্যি?’
ত্রিবেদী, প্রশ্ন শুনে বেশ কয়েকমুহূর্ত ঈশানবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। ওই যে পাশের পাহাড়ের ঢালে ওরা থাকে। ওদিক থেকেই ওরা এখানে আসে।’
ঈশানবাবু বললেন, ‘আপনি দেখেছেন ওদের?’
ত্রিবেদী হেসে বলল, ‘বহুবার। আমি তো এখানেই থাকি। বিশেষত এই সময়টা ওদের প্রজনন ঋতু। ওরা এখানে আসে। পুরুষ হরিণের কস্তুরীর গন্ধ স্ত্রী হরিণদের কাছে টেনে আনে। মজার ব্যাপার হল, পুরুষ হরিণ কিন্তু বুঝতে পারে না যে কস্তুরীর ঘ্রাণ তার শরীর থেকে আসছে। সেই গন্ধের খোঁজে নিজেরাও এসময় উত্তেজিত হয়ে ছোটাছুটি করে।’
তার কথা শুনে ঈশানবাবু বললেন, ‘আমি একবার গুজরাটে কাজ করতে গিয়ে সিংহ দেখেছিলাম। এখানে এসে যদি কস্তুরী মৃগ দেখতে পাই তাহলে সেটা জীবনে স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে। ছোটবেলা থেকে কস্তুরী মৃগর কথা শুনেছি, কিন্তু চোখে দেখিনি।’
ত্রিবেদী, ঈশানবাবুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি সত্যি কস্তুরী হরিণ দেখতে চান?’
ঈশানবাবু বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। কেন, আপনি দেখাতে পারবেন?’
কয়েকমুহূর্ত চুপ করে থেকে ত্রিবেদী জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনি রাতে এখানে আসতে পারবেন?’
‘রাত’ কথাটা শুনে ঈশানবাবু একটু দমে গিয়ে বললেন, ‘রাতে! কেন দিনের বেলা ওদের দেখা মিলবে না?’
ত্রিবেদী বলল, ‘না, এমনিতেই ওরা খুব লাজুক প্রাণী। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে ওরা একা একাই ঘোরে। আজ বসন্তপূর্ণিমার রাত। এ রাতে ওদের দেখা মেলে। মিলনের জন্য পাগল হয়ে ওঠে ওরা।’
কথাটা শুনে ঈশানবাবু ইতস্তত করে বললেন, ‘আসলে অচেনা জায়গা তো, তাই রাতে আসতে কেমন কেমন যেন লাগছে।’
তার কথার উত্তরে ত্রিবেদী বলল, ‘আপনার তাঁবু তো কাছেই। এখান থেকে হাঁক দিলে আপনার তাঁবুতে শব্দ পৌঁছবে। এখানে কোনো চোর-ডাকাত নেই। অন্য কোনো হিংস্র প্রাণী নেই। আর আমি তো এখানে থাকবই। অবশ্য আমাকে যদি আপনার ভদ্রলোক মনে না হয় তবে অন্য কথা।’
ত্রিবেদীর শেষ কথাটা শুনে ঈশানবাবু লজ্জিত ভাবে বললেন, ‘না, না, আপনাকে আমার যথেষ্ট ভদ্রলোক মনে হচ্ছে। আর আপনি যখন নিশ্চিতভাবে বলছেন যে ওদের দেখা মিলবে, তখন আসার চেষ্টা করব।’
ত্রিবেদী বলল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই দেখাব আপনাকে। তবে একলা আসবেন। কারণ এমনিতেই ওরা লাজুক প্রাণী। আমি দীর্ঘদিন এখানে আছি বলে ওরা আমাকে চেনে। বেশি লোকের উপস্থিতি ওরা ধরে ফেলবে। তখন আর দেখা দেবে না।’ কথাটা শুনে ঈশানবাবু বললেন, ‘ঠিক আছে, এলে একলাই আসব। এবার তাঁবুতে ফিরব। আপনি নীচে যাবেন না?’ ত্রিবেদী জবাব দিল, ‘না, আমি নীচে যাব না। আমি তো এখানেই থাকি। সত্যি কথা বলতে কী, এই কস্তুরী মৃগর জন্যই বহু বছর ধরে এখানে রয়েছি আমি।’
ঈশানবাবু বললেন, ‘তার মানে? আপনি কি ওদের নিয়ে কোনো গবেষণা বা প্রিজারভেশনের কাজ করছেন?’
এ প্রশ্নের জবাবে ত্রিবেদী হেসে বলল, ‘রাতে আসুন না। এখানে কেন আছি সে গল্প তখনই না-হয় শুনবেন। আর হরিণও দেখবেন।’
ত্রিবেদীর কথা শুনে হেসে ‘আচ্ছা তাই হবে’ বলে পাহাড়ের মাথার সমতল জায়গাটা অতিক্রম করে ঢাল বেয়ে নীচে নেমে তাঁবুতে ফিরে এলেন।
৩
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল। তারপর সূর্য ডুবতে শুরু করল। সে এক অপরূপ দৃশ্য। কেউ যেন লাল আবির ছড়িয়ে দিয়েছে পাহাড়শৃঙ্গগুলোর মাথায়! সে দৃশ্য দেখে মোহিত হয়ে গেলেন ঈশানবাবু। তারপর সত্যিই একসময় সূর্য ডুবে গেল। ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করল পাহাড়ের মাথা থেকে। ঈশানবাবু তাঁবুর ভিতর ঢুকে ব্যাটারি লাইট জ্বেলে কম্বল মুড়ি দিয়ে স্থানীয় ভূ-তত্ত্ব সম্পর্কিত একটা বই খুলে বসলেন। কিন্তু বইটাতে যেন ঠিক মনোনিবেশ করতে পারছেন না তিনি। তাঁর বারেবারে মনে পড়ে যাচ্ছে ত্রিবেদী নামের সেই ছেলেটার কথা। আর মাঝে মাঝে তাঁর নাকেও যেন একটা মিষ্টি গন্ধ এসে লাগছে! যে গন্ধটা ছেলেটার সঙ্গে কথা বলার সময় পেয়েছিলেন। যদিও তিনি এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেননি যাবার ব্যাপারে।
রাত সাড়ে সাতটা নাগাদ বশির ঘরে ঢুকল খাবার নিয়ে। খাবারের থালাটা নামিয়ে রেখে তাঁবুর বাইরে বেরোতে গিয়েও সে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে নাক টেনে বলল, ‘সাব কি কস্তুরী মেখেছেন নাকি?’
ঈশানবাবু মৃদু অবাক হয়ে বললেন, ‘কই না তো?’
বশির আবারও নাক টেনে বলল, ‘জরুর কস্তুরীর গন্ধ আছে। এ গন্ধ আমি চিনি। আপনি ওই পাহাড়ের ওপরে গেছিলেন তাই তো?’
ঈশানবাবুর এবার খেয়াল হল ত্রিবেদীর সঙ্গে দেখা হবার সময় বেশ কয়েকবার একটা মিষ্টি গন্ধ তাঁর নাকে এসে লেগেছিল। তবে কি সে কস্তুরী মেখেছিল? আর তার থেকেই গন্ধটা ঈশানবাবুর গায়ে এসেছে? যেটা তিনি নিজেও মাঝে মাঝে টের পাচ্ছিলেন? এ ভাবে কি গন্ধ ছড়ানো সম্ভব?’
ঈশানবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, ওপরে গেছিলাম। ওখানেও একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে লাগছিল বটে!’
বশির বলল, ‘আপনাকে বলেছিলাম না ওখানে কস্তুরী হরিণ আছে। নিশ্চয়ই আপনি এমন কোনো জায়গাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, অথবা এমন কোনো জায়গাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, অথবা এমন কোনো জায়গাতে হাত রেখেছিলেন যেখানে কস্তুরী হরিণ এসে দাঁড়িয়েছিল বা গা ঘষেছিল। তার থেকেই গন্ধটা আপনার গায়ে এসেছে।’
ঈশানবাবু বললেন, ‘কস্তুরীর এত ক্ষমতা!’
বৃদ্ধ বশির দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল, ‘জি বাবুসাব। তিন হাজার কিসিমের মধ্যে আপনি যদি এক টুকরো আসল কস্তুরী রাখেন তবে ওই তিন হাজার কিসিমের জিনিসে কস্তুরীর গন্ধ লাগে! আমাদের এখানে একটা কথা চালু আছে, কেউ যদি একবারের জন্য গায়ে খাঁটি কস্তুরী লাগায় তবে সে মরে জন্নত বা স্বর্গে গেলে হুরি অর্থাৎ পরির দল তাকে ঘিরে ধরে। আত্মার গায়েও কস্তুরীর গন্ধ লেগে থাকে।’
তার কথা শুনে ঈশানবাবুর মনে পড়ল, তিনি কোথায় যেন শুনেছিলেন যে কস্তুরী শুধু যৌন বলবর্ধকই নয়, তার গন্ধ তীব্র কামোদ্দীপকও বটে। যে কারণে সম্রাটদের হারেমে কস্তুরীর প্রচুর চাহিদা ছিল। মোহনলাল এই কাশ্মীরেরই মানুষ ছিলেন। তিনি নাকি নবাব সিরাজদৌল্লার কাছে প্রথমে গেছিলেন এই কস্তুরী বিক্রির জন্যই। তারপর দুজনের সখ্য হয়।
বশির এরপর বলল, ‘আপনার কোনো কাজ না থাকলে এবার আমরা খাওয়া সেরে শুয়ে পড়ব।’
ঈশানবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, শুয়ে পড়ো। কাল আলো ফুটলেই কাজ শুরু করব।’
বশির সেলাম দিয়ে চলে যাবার পর কিছুক্ষণের মধ্যে খাওয়া শুরু করলেন ঈশানবাবু। খেতে খেতে তিনি ভাবতে লাগলেন ওই ছেলেটার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি কস্তুরী মৃগ দেখতে যাবেন, নাকি যাবেন না? কিন্তু তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। খাওয়া সেরে জলের বোতল নিয়ে হাত ধোবার জন্য বাইরে বেরোলেন ঈশানবাবু। বশির আর তার লোকজনেরা ততক্ষণে তাদের তাঁবুতে ঢুকে পর্দা ফেলে শুয়ে পড়েছে।
আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। এখানকার আকাশ দূষণমুক্ত বলেই হয়তো চাঁদটাকে অনেক বেশি বড় আর উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। জ্যোৎস্না যেন আকাশ থেকে গলে গলে পড়ছে এই নির্জন কিরীটশোভিত পৃথিবীর বুকে। ঈশানবাবুর চোখ গেল সামনের ঢালের মাথার ওপর সেই পাইন বনের দিকে। তার মাথার ওপর আলো ছড়াচ্ছে পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের মধ্যেও আদিমতা থাকে, যৌনতার আহ্বান থাকে, আর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েই হয়তো চাঁদনি রাতে মিলিত হয় কস্তুরী হরিণ-হরিণীর দল, কস্তুরীর গন্ধে মেতে উঠে মিলিত হয় বন্য যৌনতায়।—এ কথাটা ঢালের মাথার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলেন ঈশানবাবু।
আরও কিছুক্ষণ চন্দ্রাতাপের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বনানীর দিকে তাকিয়ে ঈশানবাবুর মনে হল, ওখানে যেতে তাঁর সমস্যা কোথায়? প্রথমত, ওই ছেলেটাকে তাঁর খারাপ লোক বা মিথ্যাবাদী বলে মনে হয়নি। কস্তুরী মৃগ দেখার সুযোগ হয়তো জীবনে দ্বিতীয়বার আসবে না। আর দ্বিতীয়ত তার মনে যদি অন্য কোনো মতলব থেকেও থাকে তবে সে সহজে ঈশানবাবুর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবে না। পঞ্চাশ বছর বয়স হলেও ঈশানবাবু এখনও নিয়মিত শরীরচর্চা করেন। তাঁর শরীর যথেষ্ট শক্তপোক্ত আর সক্ষম। কিছুদিন আগে এক ডেঁপো ছোকরাকে এক চড়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন। আর সব থেকে বড় কথা রিভলবারটা তো সঙ্গে রইলই।—এ কথাগুলো ভেবে নিয়ে ঈশানবাবু কয়েকমুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন তিনি যাবেন। মুখ ধুয়ে তাঁবুতে ঢুকে প্রথমে পোশাক পাল্টে জুতো পরলেন। সুটকেস থেকে রিভলবার বার করে সেটা একবার পরীক্ষা করে কোমরে গুঁজে নিয়ে গায়ে চামড়ার জ্যাকেট চাপিয়ে টুপি-মাফলার-দস্তানায় সজ্জিত হয়ে এরপর আবার তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে সামনের পাহাড়ের ঢালের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
৪
রাত হলেও ঢাল বেয়ে উঠতে খুব একটা কষ্ট হল না ঈশানবাবুর। তিনি ওপরে উঠে এলেন। সমতল জায়গাটাতে প্রাচীন মন্দিরের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাঠামোর ওপর চাঁদের আলো এসে পড়েছে। তবে এখানে-ওখানে কিছুটা তফাতে তফাতে দাঁড়িয়ে থাকা পাইন গাছগুলোকে কেমন যেন জীবন্ত মানুষের মতো মনে হচ্ছে। তারা যেন নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে ঈশানবাবুর দিকে। মনের ভিতর কেমন যেন একটা অস্বস্তি হল ঈশানবাবুর। কিন্তু এরপরই ত্রিবেদীকে দেখতে পেয়ে তাঁর অস্বস্তি ভাবটা কেটে গেল। একটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে ছেলেটা এসে দাঁড়াল ঈশানবাবুর সামনে। ছেলেটার কোটের বুকের বোতাম খোলা। চাঁদের আলোতে মুহূর্তের জন্য একটা জিনিস ঝিলিক দিয়ে উঠল তার বুকের কাছে। ত্রিবেদীর গলাতে একটা সোনার লকেটসমেত হার আছে। আর সে কাছে এসে দাঁড়াতেই আবারও সেই মিষ্টি গন্ধ এসে লাগল ঈশানবাবুর নাকে। ত্রিবেদী মৃদু হেসে ঈশানবাবুকে বলল, ‘আপনি যে আসবেন সেটা আমি অনুমান করেছিলাম।’
ঈশানবাবু হেসে বললেন, ‘সুযোগটা হাতছাড়া করতে মন চাইল না, চলেই এলাম। হরিণ দেখা যাবে তো?’
ত্রিবেদী হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। হরিণী তো নিশ্চয়ই দেখতে পাবেন। এখানেই তারা আসবে।’
ঈশানবাবু এরপর বললেন, ‘আচ্ছা, একটা মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছি, তখনও পেয়েছিলাম। এটা কি কস্তুরীর গন্ধ? আপনার গা থেকে আসছে?’
ত্রিবেদী জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’
এরপর কিছুটা তফাতে মাটিতে পড়ে থাকা একটা গাছের গুঁড়ি দেখিয়ে বলল, ‘চলুন ওখানে গিয়ে বসি।’ ত্রিবেদীর কথামতো ঈশানবাবু তার সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে গুঁড়িটার ওপর বসলেন, ত্রিবেদীও তাঁর পাশে বসল। তাদের সামনে একটু দূরে একটা কচ্ছপের পিঠের মতো উন্মুক্ত জায়গা, তারপর ছোট ছোট পাইন গাছের সারি গিয়ে মিশেছে বড় বড় গাছের দঙ্গলের সঙ্গে। সেদিকে বনের গভীরে চাঁদের আলো প্রবেশ না করলেও ঈশানবাবুদের সামনে কচ্ছপের পিঠের মতো উন্মুক্ত জায়গাটা চাঁদের আলোতে ফটফট করছে। সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কাছের পাইন গাছের পাতাগুলো রুপোর পাতের মতো চিকচিক করছে চাঁদের আলোতে। বাতাসে কস্তুরীর মৃদু মিষ্টি গন্ধ। সব মিলিয়ে পরিবেশটা বেশ ভালো লাগল ঈশানবাবুর। তিনি বললেন, ‘চারপাশটা খুব সুন্দর লাগছে!’
ত্রিবেদী বলল, ‘এখানে একটা খুব পুরোনো শিবমন্দির ছিল। মন্দিরের সামনের ফাঁকা জায়গাটা ওই ঢিপি ছাড়িয়ে আরও কিছুটা বিস্তৃত ছিল। খেয়াল করে দেখুন ঢিপির ওপাশের গায়ের গাছগুলো বয়সে অনেক নবীন।’
ঈশানবাবু জানতে চাইলেন, ‘মন্দিরটা ধ্বংস হল কীভাবে?’
ত্রিবেদী জবাব দিল, ‘আমি এখানে আছি অন্তত দশ বছর। তার বেশি সময়ও হতে পারে কিন্তু কম হবে না। আমি আপনাকে আমার গল্পটা বলি। তাহলে সব বুঝতে পারবেন।’
ঈশানবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, বলুন আপনার গল্প।’
একটু চুপ করে রঘুবীর ত্রিবেদী বলতে শুরু করল তার কথাঃ।
‘আমি আপনাকে আগেই বলেছি আমি জন্মসূত্রে উত্তরপ্রদেশের মানুষ। কলকাতার বড়বাজারে আমার ব্যবসা ছিল। আমার কোনো ভাইবোন ছিল না। আমি তখন সদ্য যুবক। বাবা-মা মারা যাবার পর দেশের সব সম্পত্তি বেচে দিয়ে কলকাতায় এসে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। বড়বাজারে কাপড়ের ব্যবসা। ভালোই চলছিল ব্যবসা। বছর সাত-আটের মধ্যে বেশ ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল কারবার। বিয়ে করিনি, একলা মানুষ। দিব্যি ছিলাম ব্যবসা নিয়ে। বেশ কিছু নগদ টাকাও জমিয়ে ফেলেছিলাম এ সুযোগে।
বড়বাজারে নানা ধরনের লোক আসে। একদিন একজন লোক এসে আমাকে জানাল, শেয়ার বাজারে টাকা লাগালে নাকি অনেকগুণ বেশি লাভ হতে পারে ছিট কাপড়ের ব্যবসা থেকে। তার কথা শুনে একটু ইতস্তত করেই আমার জমানো টাকার একটা অংশ শেয়ার বাজারে লাগালাম। তিন মাসের মধ্যে সে টাকা দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এল আমার কাছে। আর এরপরই আমি ঢুকে গেলাম শেয়ার বাজারের কারবারে। আমার সব টাকা ঢালতে শুরু করলাম এ ব্যবসাতে। সত্যি কথা বলতে কী ক্ষতি যে কখনও হতো না তা নয়, তবে লাভ যা হতো তা ক্ষতির থেকে অনেক বেশি। ছিট কাপড়ের ব্যবসা গুটিয়ে আমি এরপর পুরোপুরি ঢুকে পড়লাম শেয়ার ব্যবসাতে। কিন্তু কারো দিন সমান যায় না। হঠাৎই একদিন বজ্রপাতের মতো শেয়ার বাজারে ধস নামল, আমি যে কোম্পানির শেয়ার কিনেছিলাম তাতে। আমার প্রায় সব টাকা আমি লগ্নি করেছিলাম সে কোম্পানিতে।
আমি প্রাথমিক অবস্থায় ভেঙে না পড়ে বাজার থেকে বেশ কিছু টাকা ধার করে অন্য একটা কোম্পানির শেয়ার কিনলাম লাভের আশাতে। আর সেটাই আমার সব থেকে বড় ভুল ছিল। খারাপ সময় মানুষকে যখন তাড়া করে তখন সে কিছুতেই তার পিছু ছাড়তে চায় না। আমি নতুন কোম্পানির শেয়ারে টাকা ঢালবার কিছুদিনের মধ্যে সে কোম্পানিও ডুবে গেল, আর আমি পড়ে গেলাম অথৈ জলে।’—এই বলে থেমে গেল ত্রিবেদী। সে তাকিয়ে রইল সামনের ঢিপিটার দিকে।
তাকে চুপ হয়ে যেতে দেখে ঈশানবাবু জানতে চাইলেন, ‘কিন্তু সে ঘটনার সঙ্গে এ জায়গার সম্পর্ক কী?’
ত্রিবেদী জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, সে কথা এবার বলছি।’
আবার সে বলতে শুরু করল তার কাহিনি, ‘আমার দুর্দশা এরপর ক্রমশ বাড়তে শুরু করল। পাওনাদাররা এসে টাকা ফেরতের জন্য বাড়িতে হানা দিতে শুরু করল। প্রথমে গালিগালাজ তারপর কেউ কেউ মারধরের হুমকিও দিতে শুরু করল। আমার তখন সম্বল বলতে দু-হাজার টাকা আর আমার গলার এই সোনার লকেটটা। আর বাজারে আমার দেনার পরিমাণ প্রায় লাখ তিনেক টাকা! পাওনাদারের হুমকিতে একসময় আমি সিদ্ধান্ত নিলাম কলকাতা থেকে দূরে কোথাও আমাকে পালাতে হবে। অন্তত ততদিন আমাকে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে যতদিন না শেয়ার বাজার আবার চাঙ্গা হয়। আমি আমার লগ্নি করা টাকা ফেরত পেয়ে পাওনাদারদের ধার শোধ করতে পারি। তবে এত দুরে যে আমি চলে আসব তা ভাবিনি…।’
ঈশানবাবু তার কথার মাঝেই বলে উঠলে, ‘তবে এলেন কীভাবে?’
ত্রিবেদী বলল, ‘ভাগ্যই হয়তো আমাকে অদ্ভুতভাবে টেনে এনেছিল এখানে। কলকাতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে একদিন সন্ধ্যায় আমি সামান্য কিছু জামাকাপড় নিয়ে হাওড়া স্টেশনে উপস্থিত হলাম। আমার ইচ্ছা ছিল বাংলারই কোনো মফস্বল শহরে গিয়ে কিছু কাজ খুঁজে নিয়ে সেখানে থাকার।
আমি যখন টিকিট কাউন্টারের দিকে এগোচ্ছি ঠিক তখনই আমি দেখতে পেলাম আমার এক বড় পাওনাদারকে। সঙ্গে কয়েকজন গুন্ডা চেহারার লোক। পাওনাদার আর তার সঙ্গীদের চারপাশে তাকানোর ভঙ্গি দেখে আমি বুঝতে পারলাম তারা আমাকেই খুঁজছে! কোনোভাবে আমার পালানোর খবর জানতে পেরে তারা পিছু ধাওয়া করে এসেছে! এবার কী করব আমি! ধরা পড়লে চরম লাঞ্ছনা কপালে। ঠিক সেই সময় আমি শুনতে পেলাম একটা ট্রেনের হুইসেলের শব্দ। কোনো একটা ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে। বাঁচার জন্য ভিড় ঠেলে আমি ছুটতে শুরু করলাম সেই ট্রেন লক্ষ করে। তারপর লাফিয়ে উঠে পড়লাম সেই অজানা ট্রেনে।
আমার কাছে কোনো টিকিট ছিল না। ফার্স্টক্লাস কম্পার্টমেন্টটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা। টিকিট চেকারের মুখে পড়ার ভয়ে আমি একটা আপার বাংকে উঠে তাড়াতাড়ি একটা চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমের ভান করে শুয়ে পড়লাম। ছুটে চলল ট্রেন। সৌভাগ্যক্রমে কেউ আর আমার কাছে টিকিট চাইতে এল না। পরদিন ভোরবেলা আমি সহযাত্রীদের কথা শুনে বুঝতে পারলাম এ ট্রেন জম্মু যাচ্ছে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ট্রেন যেখানে যাচ্ছে আমি সেখানেই নামব। একদিন পর আমি উপস্থিত হলাম জম্মুতে। সেখানে ক’দিন থাকার পর চলে এলাম শ্রীনগর। তারপর ঘুরতে ঘুরতে পহেলগাঁওতে।’—একটানা কথাগুলো বলে থামল ত্রিবেদী।
ঈশানবাবু বললেন, ‘আপনার কাশ্মীরে আসার ঘটনাটা বেশ রোমাঞ্চকর তো!’
ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট একটা হাসি ফুটিয়ে ত্রিবেদী বলল, ‘হ্যাঁ, তবে আসল গল্প এবার বলব। এতক্ষণ যা বললাম তা বলতে পারেন আমার কাহিনির ভূমিকা মাত্র।’
ঈশানবাবু উৎসাহিতভাবে বললেন, ‘হ্যাঁ, বলুন।’
মাথার ওপরের চাঁদ আলো ছড়াচ্ছে সামনের জমিটাতে। পাইন গাছের গায়েও পিছলে পড়ছে আলো। বাতাসে কস্তুরীর মিষ্টি গন্ধ যেন মৃদু বেড়েছে। শুধু ত্রিবেদীর গায়ের গন্ধ নয়, ঈশানবাবুর মনে হল, হয়তো বা কোনো কস্তুরী মৃগও কাছাকাছি কোথাও থাকতে পারে! ত্রিবেদী এবার শুরু করল তার আসল গল্প—
৫
‘পহেলগাঁওতে যখন এসে পৌঁছলাম, তখন আমার পকেট আরও ফাঁকা হয়ে গেছে। আমি আশ্রয় নিলাম অতি সস্তার একটা বাড়িতে। ঘোড়ার সহিসরা যেখানে রাত কাটায়। সেখানে ক’দিন কাটাবার পর আমি বুঝতে পারলাম আমার পকেটের যা হাল তাতে দৈনিক খবার খরচ নিয়ে মাত্র কুড়ি টাকা ভাড়াতেও বেশিদিন থাকা সম্ভব হবে না। হঠাৎই এক ঘোড়াঅলার মুখে খবর পেলাম এখানে নাকি এক মন্দির আছে। এক সাধুবাবা থাকেন এই মন্দিরে। ভালো লোক। কেউ মন্দিরে গেলে যত্নআত্তি করেন। মন্দিরের নাম ‘সৌগন্ধ মন্দির’ অর্থাৎ ‘সুগন্ধ মন্দির’। যদিও তখনও আমি জানতাম না, এ মন্দিরের কেন এমন নাম। আমি মন্দিরের কথা শুনে ভাবলাম, একবার মন্দিরটাতে গিয়ে দেখা যাক। যদি সেখানে আশ্রয় মিলে যায়, বিনা খরচায় ক’দিন থাকা-খাবার বন্দোবস্ত হয়? এ কথা ভেবে পহেলগাঁও থেকে আমি চলে এলাম এখানে।
আমি যখন ঢাল বেয়ে এই চত্বরটাতে উঠে এলাম তখন বিকাল। বসন্তকালের শুরু হলেও সেবার শীতকালে প্রচণ্ড তুষারপাত হওয়াতে মন্দির সংলগ্ন এই চত্বরটা তুষারের চাদরের আড়ালে মোড়া ছিল। এ জায়গাতে উঠে আসতেই আমার নাকে একটা মিষ্টি গন্ধ এসে লাগল। সে গন্ধ তখনও আমার চেনা ছিল না। কাঠ আর পাথরের তৈরি এক অতি প্রাচীন মন্দির। বয়সের ভারে বৃদ্ধ মানুষের মতো কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। আমি সদর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই একজন বৃদ্ধ সন্ন্যাসী মন্দিরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন। এই শীতের দেশেও তাঁর গায়ে একটা নামমাত্র বস্ত্রখণ্ড। খালি পা। আমি বুঝতে পারলাম ইনিই এই মন্দিরের সন্ন্যাসী, আমি তাঁকে প্রণাম জানিয়ে বললাম, আমি দেশভ্রমণে বেরিয়ে এখানে এসেছি। টাকা-পয়সা সব শেষ। তিনি যদি আমাকে কিছুদিনের জন্য আশ্রয় দেন তবে আমি বাঁচতে পারি।
আমার কাতর আবেদন শুনে সাধুবাবা বললেন, ‘দেবতার মন্দিরে কেউ আশ্রয় চাইলে তাকে তো আর ফেরানো যায় না। এসো ভিতরে এসো।’
আমি প্রবেশ করলাম মন্দিরে। গর্ভগৃহে একটা শিবলিঙ্গ আছে। সাধুবাবা প্রথমে আমাকে সেখানে নিয়ে গেলেন। দেবতা দর্শনের পর আমি তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘সন্ন্যাসীরা পূর্বাশ্রমের পরিচয় দেয় না। তবু তোমাকে কয়েকটা কথা বলি। প্রথম জীবনে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম আমি। একদিন বৈরাগ্য দেখা দিল। দেশের নানা জায়গা ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে এ মন্দিরে পৌঁছলাম আমি। তখন এই প্রাচীন মন্দিরে এক সন্ন্যাসী থাকতেন। আমিও সন্ন্যাস গ্রহণ করে এ মন্দিরেই রয়ে গেলাম। একসময় সেই সন্ন্যাসী দেহ রাখলেন। তারপর থেকে আমি এখানে একলাই থাকি। সব মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ বছর এখানে আছি।’
এরপর সেই সন্ন্যাসীর সঙ্গে আরও কিছু কথা বলার পর আমি বুঝতে পারলাম কৌপীন পরা এই সন্ন্যাসী প্রকৃত অর্থেই নানা জ্ঞানের অধিকারী। যাই হোক, সেই সন্ন্যাসী আমার খাবারের ব্যবস্থা করলেন, একটা ঘরে খড়ের বিছানাতে আমার রাত্রিবাসেরও ব্যবস্থা করলেন। একটা জিনিস আমি খেয়াল করলাম যে মন্দিরের ঘরে-বাইরে সেই মিষ্টি গন্ধ যেন সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। ঘুমের মধ্যেও যেন আমি সে গন্ধ টের পেতে থাকলাম!
পরদিন ভোর হল। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে সাধুবাবার সঙ্গে দেখা হতে তাঁকে গন্ধের ব্যাপারটা জিগ্যেস করলাম।
তিনি হেসে বললেন, ‘চলো তোমাকে একটা জিনিস দেখাব। বাইরে চলো।’
তাঁর সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এলাম আমি। আপনার সামনে যে উঁচুমতো জায়গাটা দেখছেন ঠিক ওখানেই কাঠের বেড়া দেওয়া বেশ বড় একটা খোঁয়াড়ের মতো মাথায় পাতার ছাদ দেওয়া ঘর ছিল। সাধুবাবা আমাকে নিয়ে ওই ঘরটার দিকে এগোতেই মিষ্টি গন্ধের তীব্রতা যেন আরও বাড়তে লাগল। খোঁয়াড়টার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলাম এই মিষ্টি গন্ধের উৎসস্থল এই ঘরটাই। সাধুবাবার সঙ্গে ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে ভিতরে উঁকি দিতেই আমি দেখতে পেলাম একটা প্রাণীকে। ছাগলের মতো একটা ছোট প্রাণী উত্তেজিতভাবে ঘরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পায়চারি করছে। তার শিং দুটো ছোটো ছোটো। কিন্তু চোয়ালের ওপর থেকে ইঞ্চি চারেক লম্বা ছুরির ফলার মতো দুটো দাঁত বাইরে বেরিয়ে এসেছে। আর তীব্র মিষ্টি গন্ধটা তার গা থেকেই আসছে!
আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, ‘সাধুবাবা এটা কী প্রাণী?’
তিনি বললেন, ‘কস্তুরী মৃগর নাম শুনেছ? এটা কস্তুরী মৃগ। ওর পেটের কাছটা খেয়াল করো। নাভির কাছে।’
তাঁর কথা শুনে আমি প্রাণীটাকে ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম। একটা আবের মতো অংশ আছে সেখানে। আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি ওকে কোথায় পেলেন?’
সাধুবাবা বললেন, ‘বছর বারো আগে ওকে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম এখানকারই এক জঙ্গল থেকে। এখানকার জঙ্গলে কস্তুরী মৃগ আছে। কোনো কারণে ওর মা ওকে ত্যাগ করেছিল। আমি ওকে তুলে এনেছিলাম মন্দিরে। তারপর থেকে এখানেই আছে। ওর গায়ের গন্ধের জন্যই আজকাল এ মন্দিরকে অনেকে সৌগন্ধ মন্দির নামে ডাকে।’
এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘এমনি সময় ও ছাড়াই থাকে। কিন্তু এই বসন্তকালে ওদের প্রজনন ঋতুতে ওকে আটকে রাখতে হয়। নইলে কামের তাড়নায় হরিণীর খোঁজে ও জঙ্গলে পালাবে। কিন্তু সমস্যা হল ও নিজে কোনোদিন খাবার খুঁজে খায়নি। আমি ওকে ওর নিজের হাতে শিশু অবস্থা থেকে খাইয়ে এসেছি। জঙ্গলে গেলে নির্ঘাত ও না খেয়ে অথবা অন্য কোনো পুরুষ হরিণের সঙ্গে লড়াইতে মারা পড়বে। তাই ওকে এখন আটকে রাখতে বাধ্য হচ্ছি।’
সন্ন্যাসীর কথা শুনে আবারও আমি ভালো করে তাকালাম হরিণটার দিকে। সাধুবাবার কথা যে সত্যি তা এবার আমি বুঝতে পারলাম। কস্তুরী মৃগটার টুকটুকে লাল শিশ্নটা বেশ কিছুটা তার আবরণের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। কামের আগুনে জ্বলছে প্রাণীটা!
তাকে দেখাবার পর সাধুবাবা আমাকে নিয়ে আবার মন্দিরে যাবার জন্য এগোলেন। বরফমোড়া চত্বর দিয়ে এগোতে এগোতে আমি কৌতূহলবশত প্রশ্ন করলাম, ‘একটা হরিণের দেহে কী পরিমাণ কস্তুরী থাকে?’
তিনি বললেন, ‘দশ বছর বয়সে কস্তুরী গ্রন্থি পরিপক্ক হয়। অন্তত পঞ্চাশ থেকে পঁয়ষট্টি গ্রাম কস্তুরী থাকে একটা হরিণের গ্রন্থিতে।’
আমি বললাম, ‘শুনেছি কস্তুরীর অনেক দাম। আসল কস্তুরী রাজারাজড়াদের জিনিস!’
সন্ন্যাসী বললেন, ‘এক ভরি আসল কস্তুরী তিন ভরি সোনার দামের সমান। সোনার দর অনুসারে কস্তুরীর বাজার দর ঠিক হয়।’
সাধুবাবার সঙ্গে আমি এরপর মন্দিরে প্রবেশ করলাম।’
এ পর্যন্ত বলে ত্রিবেদী থামল। বাতাসে কস্তুরীর গন্ধটা যেন আরও বেড়েছে বলে মনে হল ঈশানবাবুর। ত্রিবেদী যেন ঘাড়টা একটু উঁচু করে ঢিপির ওপাশের পাইন বনের আড়ালটা দেখার চেষ্টা করল। চাঁদের আলোতে তার চোখে-মুখে মৃদু উত্তেজনার ছাপ। তবে কি হরিণ কাছেই আছে? তবে সেদিকে ঈশানবাবু তেমন কিছু দেখতে পেলেন না। ঘাড় নামিয়ে ত্রিবেদী এবার শুরু করল তার অবশিষ্ট কথা—
৬
দিন কেটে গেল একসময়। সূর্য ডুবে গেল। সাধুবাবা তাঁর সাধনকক্ষে ধুনি জ্বালিয়ে বসলেন। আর আমি খাওয়া সেরে খড়ের বিছানাতে শুয়ে পড়লাম। বাইরে প্রথমে অন্ধকার নামল তারপর ধীরে ধীরে চাঁদ উঠতে লাগল। আর আমি শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম আমার ভাগ্য বিপর্যয়ের কথা। আমি মন্দিরে আশ্রয় পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমি তো সন্ন্যাসী নই। আমাকেও কি সারাজীবন এমনভাবে এখানে কাটাতে হবে? ঘুম এল না আমার। ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠতে লাগল দুশ্চিন্তা। আর রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কস্তুরীর গন্ধটা যেন জানলার ফাঁক গলে বেশি বেশি করে ঘরের মধ্যে ঢুকতে লাগল। বিছানা ছেড়ে উঠে আমি জানলাটা খুললাম। সেদিনও আজকের মতোই ফুটফুটে জ্যোৎস্না ছিল। সেই আলোতে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি খোঁয়াড়টা। বসন্তের এমন জ্যোৎস্না রাতেই তো মিলিত হয় কস্তুরী মৃগ। কার্যত প্রাণীটা নিশ্চয়ই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার জন্য ছটফট করছে খোঁয়াড়ের ভিতর।
প্রাণীটার কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎই আমার মনে পড়ে গেল সন্ন্যাসীর বলা একটা কথা—’এক ভরি কস্তুরীর দাম তিন ভরি সোনার দামের সমান।’ তার মানে অন্তত পনেরো ভরি সোনা অর্থাৎ লাখ দুই-তিন টাকা দাম আছে ওই নাভির! আমার খেয়াল হল বড়বাজারে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে—যে কস্তুরীর ব্যবসা করে। আমি যদি নাভিটা তার হাতে তুলে দিতে পারি তবে আমার ধার অনেকটাই শোধ হয়ে যাবে। খোঁয়াড়টার দিকে তাকিয়ে ভাবনাটা যেন ক্রমশই চেপে বসতে লাগল আমার মনে। আমি কিছুতেই মন থেকে চিন্তাটা সরাতে পারলাম না। আমার ভিতর থেকে কেউ যেন বলতে লাগল—’এটাই তোমার বাঁচার শেষ সুযোগ। ভাগ্য তোমাকে সেই সুযোগের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। নইলে তো তোমার এখানে আসার কথা ছিল না।’
সেই ভয়ংকর আহ্বান অস্বীকার করতে পারলাম না আমি। সিদ্ধান্ত নিলাম কাজটা আমাকে করতেই হবে। কিন্তু কীভাবে? আমার হঠাৎ মনে পড়ল ডাল লেকের ফুটপাথ থেকে কাঠের হাতলঅলা একটা ধারালো ছুরি কিনেছিলাম ফল কাটার জন্য। বেশ বড় ধারালো ছুরি। ওতেই কাজ চলে যাবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ছুরিটা সঙ্গে করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। প্রথমে আমি এলাম সাধুবাবার ঘরের সামনে। দরজার দিকে পিছন ফিরে ধুনির সামনে বসে ধ্যান করছেন। আমি সন্তর্পণে দরজার পাল্লা টেনে বাইরে থেকে আগল টেনে দিলাম। ব্যস এবার আমি নিশ্চিন্ত। অসহায় প্রাণীটার অন্তিম আর্তনাদ শুনলেও সন্ন্যাসী আমাকে ধরতে পারবেন না। মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে বরফের চাদরের ওপর দিয়ে আমি এগোতে লাগলাম খোঁয়াড়টার দিকে।
আমি তখন প্রায় খোঁয়াড়ের কাছ প্রায় পর্যন্ত পৌঁছে গেছি। হঠাৎ পিছনে মন্দিরের ভিতর থেকে সাধুবাবার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ আমি ফিরে তাকিয়ে দেখলাম তাঁর বন্ধ ঘরের জানলার গরাদ ধরে সাধুবাবা দাঁড়িয়ে। তাঁর ধ্যান ভেঙে গেছে!
আমি তাঁর কথার কোনো জবাব দিলাম না প্রথমে। কিন্তু সাধুবাবা মনে হয় দেখতে পেলেন চাঁদের আলোতে ঝিলিক দেওয়া বড় ছুরিটা। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, ‘তুমি কি প্রাণীটাকে মারতে যাচ্ছ? ও কাজ কোরো না।’
আমি এবার জবাব দিলাম, ‘হ্যাঁ, কাজটা আমাকে করতেই হবে। তবে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না।’
সাধুবাবা বললেন, ‘ও কাজ কোরো না তুমি। আমি প্রাণীটাকে সন্তানের মতো মানুষ করেছি। নিরীহ প্রাণীকে মেরো না। তোমার ক্ষতি হবে। তুমি মরবে।’
আমি বলে উঠলাম, ‘কোনো ক্ষতি হবে না আমার। মরার জন্য নয়, বাঁচার জন্য কস্তুরীটা আমার চাই।’
আমার কথা শুনে সন্ন্যাসী ত্রু«দ্ধস্বরে চিৎকার করে উঠলেন, ‘ও কাজ তুই করিস না। তোকেও তবে ওই হতভাগ্য প্রাণীটার মতো আটকে থাকতে হবে ওখানে। তুই পালাতে পারবি না। মরবি, মরবি!’
সাধুবাবার চিৎকার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলোতে—’তুই মরবি! মরবি!’
এরপর সাধুবাবার সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে আমি পা বাড়াতে যাচ্ছিলাম খোঁয়াড়টার দিকে। ঠিক সেই সময় একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটল। আমার পায়ের তলার মাটিটা হঠাৎ মৃদু দুলে উঠল! ভূমিকম্প! আমি পড়ে গেলাম। আর এরপর দ্বিতীয় ও শেষ ঝটকা। আর তাতেই আমার সামনে হুড়মুড় করে মাটিতে ভেঙে পড়ল হেলে পড়া প্রাচীন মন্দিরটা। সাধুবাবা চাপা পড়ে গেলেন তার নীচে। তারপরই পৃথিবী শান্ত হয়ে গেল। আমি যদি মন্দিরের ভিতর থাকতাম তবে আমার কী পরিণতি হত ভেবে আমি শিউরে উঠলাম। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি মন ও শরীরে শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়ালাম। না, এবার আর কোনো বাধাই…।
আমি গিয়ে পৌঁছলাম খোঁয়াড়ের কাছে। সাবধানে দরজা খুলে খোঁয়াড়ে প্রবেশ করলাম। কাঠের বেড়ার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলোতে খোঁয়াড়ের এককোণে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে প্রাণীটা। সে মনে হয় কোনোদিন মানুষের আক্রমণের সম্মুখীন হয়নি। তাই তার সামনে যেতেই সে পালাবার চেষ্টা না করে শুধু একবার মাথা তুলে তাকাল। তাকে আর নড়াচড়া করার সুযোগ দিলাম না আমি। বিদ্যুৎগতিতে ঝুঁকে পড়ে আমি এক হাতে ছুরি চালিয়ে দিলাম তার গলায়। প্রথমে একবার, তারপর আর একবার। অস্পষ্ট একটা আর্তনাদ করে মাটিতে পড়ে স্থির হয়ে গেল প্রাণীটা। আমার সামনে বেড়ার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলোতে পড়ে আছে হরিণটা। রক্তের স্রোত বেরোচ্ছে তার কণ্ঠ থেকে। স্থির হয়ে যাওয়া চোখটা যেন প্রচণ্ড আতঙ্কে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। মৃত প্রাণীটার পেটের কাছে তার কস্তুরী নাভিটাও দেখা যাচ্ছে। আমার প্রথম কাজ শেষ। এবার শেষ কাজটা করতে হবে। আমি বসে পড়লাম প্রাণীটার সামনে। এক হাতে খামচে ধরলাম নাভিটা আর অন্য হাতে ছুরিটা বসিয়ে দিলাম নাভির গায়ে কস্তুরী গ্রন্থিটা দেহের বাইরে উৎপাটিত করার জন্য’…এই বলে থেমে গেল ত্রিবেদী।
ঈশানবাবুর গল্পটা শুনতে শুনতে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। ত্রিবেদী হঠাৎ থেমে যেতেই ঈশানবাবু ‘তারপর? তারপর?’ বলে তাকালেন ত্রিবেদীর মুখের দিকে। ত্রিবেদীর মুখটা যেন উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে। বাতাসে কস্তুরীর গন্ধ হঠাৎই যেন আরও বাড়তে শুরু করেছে! ঈশানবাবুর কথার কোনো জবাব না দিয়ে ত্রিবেদী শুধু আঙুল তুলে সামনেটা দেখাল। সেদিকে তাকিয়ে ঈশানবাবু দেখলেন পাইন বনের আড়াল থেকে বেরিয়ে চাঁদের আলোতে সেই ঢিপিটার ওপর কখন যেন উঠে দাঁড়িয়েছে অনেকটা ছাগলের মতো একটা ছোট প্রাণী—কস্তুরী হরিণী!
ঈশানবাবু চেয়ে রইলেন সেদিকে। এরপর আর একটা, তারপর আর একটা, মোট তিনটে হরিণী এসে দাঁড়াল ঢিপিটার ওপর। ঈশানবাবুর প্রথমে যেন মনে হল তারা জমিটার গন্ধ শুঁকছে। আর এরপরই যেন তারা সরু সরু ঠ্যাঙের খুর দিয়ে আর ছোট ছোট শিং দিয়ে মাটিটা খোঁড়ার চেষ্টা করতে লাগল। যেন মাটির নীচে কিছু আছে আর সেটা বার করার চেষ্টা করছে কস্তুরী হরিণীর দল। ঈশানবাবু বিস্মিতভাবে চেয়ে রইলেন সেই দৃশ্যের দিকে। মিষ্টি গন্ধটা যেন ক্রমশই বাড়ছে আর তার সঙ্গে সঙ্গে যেন ক্রমশই পাগল হয়ে উঠেছে হরিণীর দল। শিং দিয়ে, খুর দিয়ে তীব্র আঘাত হানছে ঢিপিতে। ছিটকে উঠেছে মাটি, ঘাসের কুচি। যেন মাটির তলায় চাপা পড়ে থাকা কিছু তাদের বাইরে বার করে আনতেই হবে!
এই অদ্ভুত ব্যাপারটা দেখে ঈশানবাবু চাপাস্বরে বললেন, ‘ওরা এমন করছে কেন? কিন্তু এরা তো সব হরিণী, হরিণ কই?’
কিন্তু তাঁর কথার কোনো জবাব না পেয়ে ঈশানবাবু পাশে তাকিয়ে দেখলেন ত্রিবেদী কখন যেন উঠে দাঁড়িয়েছে। চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার মুখে। লাল হয়ে উঠেছে তার মুখ। নাক-মুখ দিয়ে লালা ঝরতে শুরু করেছে তার! চোখ দুটো যেন ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। একমুঠো গন্ধহীন টাটকা বাতাস নেবার জন্য ফুলে উঠেছে নাসারন্ধ্র! তার শরীর কাঁপছে। ত্রিবেদীর এমন ভয়ংকর অবস্থা দেখে ঈশানবাবু উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কী হয়েছে? কী হল আপনার? অমন করছেন কেন?’
আর এরপরই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। উত্তেজিত ঈশানবাবুর গলার স্বর যেন কানে গেল হরিণীগুলোর। আর তারপরই তারা ঢিপি থেকে লাফ দিয়ে নেমে ধেয়ে এল তাঁদের দিকে। আর তাদের আসতে দেখেই ত্রিবেদী একটা আর্তনাদ করে ছুটল মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের দিকে। আর তার পিছু ধাওয়া করল হরিণীর দল। ত্রিবেদী সম্ভবত বাঁচার জন্য ভাঙা দেওয়ালের আড়ালে অদৃশ্য হল। আর হরিণীর দলও দেওয়ালের পিছনে গেল তাকে খোঁজার জন্য। কয়েকমুহূর্তের মধ্যেই সেই হরিণীর দল অবশ্য দেওয়ালের অন্য পাশ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল একজনের পিছু ধাওয়া করে। ঈশানবাবু বিস্মিতভাবে দেখল কামার্ত হরিণীগুলো এবার যার পিছু ধাওয়া করেছে সে ত্রিবেদী নয়, হরিণীগুলোর চেয়ে আকারে কিছু বড় একটা পুরুষ হরিণ! চাঁদের আলোতে তার লম্বা দাঁত দেখা যাচ্ছে! কস্তুরী মৃগ! হতম্ভব, বিস্মিত ঈশানবাবুর চোখের সামনে দিয়ে ছুটে কয়েকমুহূর্তের মধ্যেই পাইন বনের আড়ালে হারিয়ে গেল সেই কস্তুরী মৃগ আর তার পেছনে ধাওয়া করা কামার্ত হরিণের দলটা। চাঁদের আলোতে একলা দাঁড়িয়ে রইলেন ঈশানবাবু।
বেশ কিছুটা সময় লাগল ঈশানবাবুর সম্বিত ফিরতে। ত্রিবেদীর খোঁজে প্রথমে তিনি সেই দেওয়ালটার পিছনে গেলেন। না, সেখানে কেউ নেই। বেশ কয়েকবার তিনি ত্রিবেদীর নাম ধরে হাঁকও দিলেন। কিন্তু তার কোনো সাড়া মিলল না। চাঁদের আলোতে সেই উন্মুক্ত জায়গাটায় ত্রিবেদীর ফেরার প্রত্যাশায় আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন ঈশানবাবু। কিন্তু সে ফিরল না। একসময় প্রচণ্ড শীত করতে লাগল ঈশানবাবুর। অগত্যা তিনি নীচে নামার পথ ধরলেন।
৭
ঈশানবাবুর চোখে সারারাত আর ঘুম এল না তাঁবুতে ফেরার পর। তাঁর চোখে কেবলই ভেসে উঠতে লাগল সেই অদ্ভুত দৃশ্যগুলো। আর ত্রিবেদীরই বা কী হল? ঈশানবাবুকে অমনভাবে ফেলে রেখে সেই বা কোথায় অদৃশ্য হল? এসব ভাবতে ভাবতেই একসময় ভোর হয়ে এল।
ভোরের আলো ফোটার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঈশানবাবু তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন ঢালের মাথায় সে জায়গার উদ্দেশে। ওই ঢিপিটার নীচে কিছু আছে কিনা তা তাঁকে দেখতে হবে। ওপরে উঠে ঢিপির কাছে উপস্থিত হল সবাই। ঈশানবাবু খেয়াল করে দেখলেন ঢিপিটার ওপর স্থানে স্থানে ঘাসের চাবড়া ওঠা। তার মানে গতকালের দৃশ্যটা মিথ্যা নয়। হরিণীগুলোর শিং আর খুরের চিহ্ন আঁকা হয়ে আছে মাটির বুকে। ঈশানবাবু জায়গাটা খোঁড়ার নির্দেশ দিলেন।
কোদাল আর গাঁইতির ঘায়ে মাটির ভিতর থেকে প্রথমে উঠে আসতে লাগল পচা কাঠের টুকরো। আর তার সঙ্গে সঙ্গে কস্তুরীর মিষ্টি গন্ধ যেন মাটির নীচ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে লাগল। কাঠের টুকরোগুলো দেখে একজন বলল সম্ভবত এখানে একটা কাঠের ঘর ছিল।
ত্রিবেদীর মুখে শোনা সেই খোঁয়াড়টা? ঈশানবাবু একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন জায়গাটার দিকে। গর্ত যত খোঁড়া হতে লাগল তত তীব্র হতে লাগল সেই গন্ধ। যারা মাটি খুঁড়ছে তারাও বেশ বিস্মিত ব্যাপারটাতে। হাত পাঁচেক মাটি খোঁড়ার পরই হঠাৎ গাঁইতির ঘায়ে মাটি সরে গিয়ে বেরিয়ে এল একটা মানবকঙ্কালের কিছু অংশ! এরপরই সাবধানে আরও কিছু মাটি সরাতেই বেরিয়ে এল পুরো কঙ্কালটাই। কস্তুরীর গন্ধ তখন প্রচণ্ড তীব্র হয়ে উঠেছে। মিষ্টি গন্ধ হলেও তার ঝাঁঝে নাক জ্বলতে শুরু করেছে ঈশানবাবুর। নাকে রুমাল চাপা দিয়ে ঈশানবাবু চেয়ে রইলেন নরকঙ্কালটার দিকে। এরপর আরও দুটো জিনিস উদ্ধার হল কঙ্কালটার গা থেকেই। সোনার লকেটঅলা একটা হার আর মরচে পড়া একটা ছুরির ফলা!
বিস্মিত ঈশানবাবু স্বগতোক্তি করলেন, ‘এ কার কঙ্কাল? এসব এখানে কীভাবে এল?’
বৃদ্ধ বশির বলল, ‘এ মাটিতে কস্তুরীও আছে। সেজন্য এত গন্ধ। ব্যাপারটা আমি অনুমান করতে পারছি। কস্তুরী কাটতে গিয়ে মারা পড়েছিল এ লোকটা। যেমন অনেক অপটু লোক মারা যায়। কস্তুরী তো মৃত্যুও ডেকে আনে। একটু অসতর্ক হলেই মৃত্যু নিশ্চিত।’
ঈশানবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘মৃত্যু ডেকে আনে মানে?’
বশির স্থানীয় মানুষ। এ সব ব্যাপারে সে অনেক কিছু জানে। সে বলল, ‘হ্যাঁ, মৃত্যু ডেকে আনে। সেজন্য কস্তুরী নাভি সংগ্রহের সময় অত্যন্ত সতর্ক হতে হয়। হরিণের দেহ থেকে ছিন্ন করার আগে ভেজা কাপড় দিয়ে নাক-মুখ ভালো করে জড়িয়ে নিতে হয়। বিপদ এড়াবার জন্য সঙ্গে প্রচুর জল রাখতে হয়। কারণ গ্রন্থিটা হরিণের শরীর থেকে ছিন্ন করার সঙ্গে সঙ্গেই এক তীব্র মিষ্ট ঝাঁঝের সৃষ্টি হয়। নাক-মুখ দিয়ে সে ঝাঁঝ যদি আপনার শরীরে প্রবেশ করে তবে মস্তিষ্কে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সঙ্গে সঙ্গে নাক-মুখ দিয়ে লালা ঝরতে শুরু করবে। আর তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কে পক্ষাঘাত হয়ে সেখানেই মারা পড়বেন আপনি। যে কারণে নাকে-মুখে ভালো করে ভেজা কাপড় বেঁধে মুহূর্তের মধ্যে কস্তুরী গ্রন্থিটা ছিন্ন করে একটা জলপূর্ণ পাত্রের মধ্যে কস্তুরীটা ফেলে পাত্রের মুখটা এমনভাবে বন্ধ করতে হয় যে তার ভিতর থেকে বাতাস যাতে বাইরে না আসে। এ কাজে সামান্য ভুল হলে মৃত্যু নিশ্চিত। এই ভুলটাই ঘটেছিল এ লোকটার ক্ষেত্রে। দেখছেন না মাটির গভীরে এতদিন পড়ে আছে তবু কস্তুরীর কী ঝাঁঝ!’
বশিরের কথা শুনে ত্রিবেদীর বলা গল্পের একটা অংশ মনে পড়ে গেল ঈশানবাবুর। এজন্যই সেই সন্ন্যাসী ত্রিবেদীকে বলেছিলেন, ‘তুই মরবি।’ কারণ কস্তুরী গ্রন্থি ছেদনের পদ্ধতি জানা ছিল না ত্রিবেদীর।
কামার্ত হরিণীগুলো কেন মাটি খুঁড়ছিল তা এবার বুঝতে অসুবিধা হল না ঈশানবাবুর। মাটির ভিতর থেকে উঠে আসা কস্তুরীর ঘ্রাণ পেয়ে তারা মাটির নীচ থেকে তাদের পুরুষ সঙ্গীকে খোঁজার চেষ্টা করছিল। কামের তাড়নাতে পাগল হয়ে গেছিল হরিণীগুলো।
বশিরের কথা শোনার পর বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ ঈশানবাবুর চোখে ভেসে উঠতে লাগল গতরাতে দেখা দৃশ্যগুলো—পাগলের মতো মাটি খুঁড়ছে কামার্ত হরিণীর দল, ত্রিবেদীর চোখ-মুখ বেয়ে ঝরে পড়ছে লালা, চাঁদের আলোতে দেখা একটা কস্তুরী মৃগের পিছু ধাওয়া করে পাইন বনের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে হরিণীর দল…মৃত্যুর পরও যে এই মিষ্টি মৃত্যুগন্ধ ত্রিবেদীর গায়ে লেগেছিল—তা তাকে পরিণত করেছিল কস্তুরী মৃগতে।
—
