ফেরা

ফেরা

একে রবিবার, তার ওপর আবার কর্ড লাইনের ট্রেনের লেডিজ কম্পার্টমেন্ট। কাজেই বসতে অসুবিধা হয়নি আমার। এই সত্তর কিলোমিটার যাত্রাপথে মাত্র কয়েকজন যাত্রী ওঠানামা করেছে। জানলার ধারের সিটে বসে চলন্ত ট্রেন থেকে বাইরের দিকে তাকিয়ে এ লাইনে প্রথম দিনের ট্রেন যাত্রার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। সেদিন বুকের মধ্যে একটা ধুকপুকানি কাজ করছিল।

সেই আমার প্রথম এ লাইনে আসা। সত্যি কথা বলতে কী তার আগে একলা খুব একটা ট্রেনেও চাপিনি আমি। দু-চার বার ট্রেনে চেপে যখন আত্মীয় স্বজনের বাড়ি গেছি তখন সঙ্গে মা থাকত। তাই প্রথম দিন একলা ট্রেনে চাপার পর উত্তেজনা কাজ করাটাই স্বাভাবিক ছিল। তাছাড়া একদম নতুন জায়গাতে একদম নতুন পরিবেশে যেতে হচ্ছে, তার জন্য মনের মধ্যে একটা চাপ তো ছিলই। তবে সেদিন আজকের মতো ফাঁকা ছিল না কম্পার্টমেন্ট। যথেষ্ট ভিড় ছিল। কোনো মতে বসার জায়গা পেয়েছিলাম আমি। তারপর অবশ্য রোজ আসা-যাওয়া করতে করতে ধীরে ধীরে সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছিল।

তিনমাস আগে পর্যন্ত এক বছর ধরে এ পথে নিয়মিত আসা-যাওয়া করেছি আমি। তবে আজ ট্রেনে চাপার পর অন্য একটা মৃদু শঙ্কা কাজ করছিল। টানা একবছর এই কম্পার্টমেন্টে যাওয়া আসার সুবাদে কিছু নিত্যযাত্রীর সঙ্গে আমার পরিচিতি গড়ে উঠেছিল। তাদের কারো সঙ্গে যদি আজ দেখা হয়ে যায়? যদি তারা আমাকে জিগ্যেস করে গত তিনমাস আমার দেখা নেই কেন, তখন কী জবাব দেব তাদের?—এই শঙ্কাটাই কাজ করছিল। তবে সৌভাগ্যের বিষয় যে তেমন কারো সঙ্গে দেখা হল না আমার।

আজ দশটা নাগাদ ট্রেনে চেপেছিলাম। যেখানে যাচ্ছিলাম সেটা ঘণ্টা দুইয়ের দূরত্ব আমার বাড়ি থেকে। জানলার বাইরে তাকিয়ে পুরোনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে খেয়াল করছিলাম সূর্যের তেজ ক্রমশ কমে আসছে। বর্ষাকাল, এমন হওয়াটা অবশ্য অস্বাভাবিক কিছু নয়! যে স্টেশনে নামব তার দু-তিনটে স্টেশন আগেই আকাশ কালো হয়ে এল। তারপর ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি নামল। গন্তব্যে যখন পৌঁছলাম তখন আকাশ যেন ভেঙে পড়েছে! ছাতাটা খুলে প্ল্যাটফর্মে লাফিয়ে নেমে কোনো রকমে ছুটে একটা গুমটির নীচে গিয়ে দাঁড়ালাম বৃষ্টি থেকে বাঁচবার জন্য। দিনের বেলাতেই চারপাশে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে।

ছোট্ট প্ল্যাটফর্মটাতে কোথাও কোনো লোকজন নেই। এমনিতেই এই ছোট্ট হল্ট স্টেশনে তেমন আনাগোনা ছিল না লোকজনের। তবে বছর তিনেক ধরে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজটা চালু হবার পর থেকে ছাত্রছাত্রী আর কিছু লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়েছে। আমিও এখানে কোনোদিন আসতাম না যদি জয়েন্ট এন্ট্রান্সে র‌্যাঙ্কটা ভালো করতে পারতাম। সরকারি মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেলাম না, অগত্যা এখানে আসতে হল। আমি অবশ্য মাকে প্রথমে বলেছিলাম যে আর একটা বছর পরীক্ষা দিই। দেখি যদি ভালো র‌্যাঙ্ক করে কাছাকাছি কোনো সরকারি হাসপাতালে চান্স পাই?

মা শুনে বলেছিলেন, ‘না, বছর নষ্ট করার দরকার নেই। তোর বাবা চাকরি করতে করতে মারা যাবার পর ডেথ বেনিফিট হিসাবে যে টাকা পেয়েছিলাম, তা তো ব্যাঙ্কেই রাখা আছে। আমার তো আর ছেলেমেয়ে নেই যে তার পিছনেও টাকা খরচ করতে হবে। ওই টাকা দিয়ে তুই ভর্তি হয়ে যা। তাছাড়া আমার যা হার্টের অবস্থা তাতে কবে কী হয় আমার।’

প্রবল বর্ষণসিক্ত প্ল্যাটফর্মের গুমটির নীচে দাঁড়িয়ে মা’র কথা মনে পড়ে গেল আমার। কত আশা নিয়ে মা আমাকে এখানকার মেডিক্যাল কলেজে পাঠিয়েছিল। কিন্তু মা’র শেষ কথাগুলো যে এত দ্রুত ফলে যাবে আমি ভাবিনি। আমি কলেজে ভর্তি হবার তিন মাসের মাথায় এমনই এক বৃষ্টির দিনে, আমাকে কাঁদিয়ে, একলা ফেলে রেখে মা চলে গেল। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক।

মা’র কথা মনে পড়তেই ঝোড়ো বাতাসের মতোই প্রথমে মনটা হুহু করে উঠল আমার। তার পরক্ষণেই আমার মনে হল, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। আজ যদি মা বেঁচে থাকত তবে…

বৃষ্টি থামার কোনো বিরাম নেই। অধৈর্য হয়ে উঠলাম আমি। আরও একটা কথা মনে হতে লাগল আমার। যদিও প্রফেসর মজুমদার ছুটির দিনও বেশির ভাগ সময় কলেজেই কাটান ম্যানেজমেন্টের অংশ বলে। কিন্তু তিনি যদি কোয়ার্টারে ফিরে যান তবে সমস্যা হতে পারে। হয়তো তার সঙ্গে একলা সাক্ষাতের সুযোগ হল না। তখন তো এখানে আসাটাই মাটি হবে। তার সঙ্গে দেখা করার জন্যই তো আমার এখানে আসা। এ ব্যাপারটা কিছুক্ষণ আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাবার পরই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম কলেজের দিকে রওনা হব। বৃষ্টিতে ভিজলে কীই বা হবে আমার? প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে আমি ছাতা মাথায় রেল লাইন বরাবর হাঁটতে লাগলাম। এটাই কলেজ পৌঁছবার শর্টকাট রাস্তা। শহরের বাইরে রেললাইনের পাশে গড়ে উঠেছে ওই প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ।

বিশাল কম্পাউন্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কলেজটা। দু-পাশে ধানী জমি। শহরের তুলনায় এখানকার জমির দাম সস্তা ও অনেক জমি পাওয়া যাবে বলে ব্যবসায়িক বুদ্ধি খাটিয়ে এখানেই নির্মাণ করা হয়েছে কলেজটা। পাশে একটা হস্টেল নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। যদিও সেটা এখনও অসম্পূর্ণ। রেললাইন ধরে এসে আমি পৌঁছে গেলাম কলেজের পিছনের গেটে। কলেজের মেন গেটে এসে থেমেছে বাসরাস্তা। যারা শহর থেকে বাসে করে আসে তারা মেন গেট দিয়ে কলেজে ঢোকে। আর আমরা যারা ট্রেনে আসি তারা লাইন ধরে হেঁটে এসে পিছনের গেট দিয়ে কলেজে ঢুকি। সামনের গেট দিয়ে ঢুকলে বেশ কিছুটা ঘুরে আসতে হয়।

ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলাম আমি। বৃষ্টি যেন আরও বাড়ছে। ছাতা থাকলেও বৃষ্টির ছাট শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে। ক্যাম্পাসের ভিতর কেউ কোথাও নেই। এখানে কোনো ছাত্রাবাস না থাকায় ছাত্রছাত্রীরা হয় নিজেদের বাড়ির থেকে কলেজে যাওয়া-আসা করে অথবা শহরের দিকে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। অধিকাংশ প্রফেসর-ডাক্তাররাও তাই করেন। শুধু ডাক্তার মজুমদারের মতো কয়েকজন কলেজেরই অন্য একটা অংশে কোয়ার্টারে থাকেন।

সিকিওরিটির লোকজনের কাউকেও দেখতে পেলাম না আমি। হয়তো তারা এই বৃষ্টিতে পানীয়তে অথবা তাসের আড্ডায় মগ্ন। অ্যাডমিনিসট্রেটিভ বিল্ডিং, ক্লাসরুম সবই একই ছাদের তলায়। পিছনের লনটা অতিক্রম করে আমি বিল্ডিং-এ প্রবেশ করলাম। ছাতাটা বন্ধ করে এগোলাম আমি। লম্বা অলিন্দ এঁকেবেঁকে চলে গেছে সামনের দিকে। দু-পাশে তালা বন্ধ সার সার ক্লাসরুম, অফিস ঘর, কমনরুম ইত্যাদি। আজ সব তালা বন্ধ। দিনে এ অলিন্দ মুখরিত থাকে ছাত্রছাত্রীদের কথাবার্তায়, ঘরগুলো থেকে ভেসে আসা অধ্যাপকদের ক্লাস নেবার শব্দে। কিন্তু আজ সব নিস্তব্ধ। নিজের পায়ের শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছি আমি।

হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি সেই ঘরটার সামনে পৌঁছে গেলাম। হ্যাঁ, এটাই প্রফেসর মজুমদারের ঘর। বাইরে পিতলের ফলকে জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাম। দরজার পাল্লাটা মৃদু ফাঁক করা। তার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভিতর জ্বলতে থাকা আলোর রেখা বাইরে আসছে। অর্থাৎ তিনি এ ঘরেই আছেন।

ঘরে ঢোকার আগে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালাম আমি। সেদিন কলেজে সেই ঘটনা ঘটার পর আর আমি কলেজে পা রাখিনি। মনে মনে একবার ভাবার চেষ্টা করলাম আমাকে দেখে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে তার? পরক্ষণেই মনে হল, আমি ঘাবড়াচ্ছি কেন? আমি তো অপরাধ করিনি, তিনি করেছেন। ভয় পাবার হলে তারই পাবার কথা। তাই দরজা ঠেলে আমি ঘরের ভিতর প্রবেশ করলাম।

বিরাট কাঁচ ঢাকা টেবিলের অপর প্রান্তে বসে সামনে রাখা কী সব কাগজপত্র দেখছিলেন প্রফেসর মজুমদার। তাঁর বয়স বছর পঞ্চান্ন হবে। চোখে সোনার বাই ফোকাল, গৌরবর্ণ সৌম্যকান্তি চেহারা। কিন্তু ওই চেহারার আড়ালেই যে…। না, ওসব কথা এখন থাক। মগ্ন হয়ে কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলেন তিনি। আমি মৃদু স্বরে তাঁর উদ্দেশে ডাক দিলাম, ‘স্যার?’

মুখ তুলে তিনি আমার দিকে তাকালেন। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ যেন ভূত দেখার মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি প্রবল বিস্মিত ভাবে বলে উঠলেন, ‘সংযুক্তা তুমি?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, স্যার আমি এসেছি আপনার কাছে।’

বেশ কয়েকমুহূর্ত তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন বিস্মিত ভাবে। আমি তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। তারপর সম্ভবত তিনি নিজের উত্তেজনাকে সামলে নিলেন। শুনেছি সার্জারির ডিগ্রির সঙ্গে ম্যানেজমেন্টেরও ডিগ্রি আছে তাঁর। প্রতিকূল পরিস্থিতি কীভাবে ম্যানেজ করতে হয় তা তিনি জানেন। আমি কলেজে ভর্তি হবার কিছু দিনের মধ্যে ঠিকমতো ক্লাস না হওয়াকে কেন্দ্র করে একটা বিক্ষোভ হয়েছিল। সেটা তিনি সুচারু ভাবে ম্যানেজ করেছিলেন। আর একটা কুড়ি বছরের মেয়েকে ম্যানেজ করতে পারবেন না তিনি? বিশেষত যখন তাঁর অগাধ অর্থ-খ্যাতি-প্রতিপত্তি।

প্রফেসরের মুখটা অনেকটা যেন স্বাভাবিক হয়ে গেল। তিনি আমার উদ্দেশে বললেন, ‘বসো।’ তার মুখোমুখি চেয়ারে আমি বসলাম।

আরও কিছুক্ষণ চুপ থেকে সম্ভবত আমার অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করলেন তিনি। আমার চোখে যখন তার প্রতি কোনো ঘৃণা বা বিদ্বেষ ধরা দিল না তখন তিনি বললেন, ‘আমার আগে কিছু বলার আছে তোমাকে। আমার কথা শোনার পর তুমি যা বলার বোলো।’

আমি শান্ত ভাবে জবাব দিলাম, ‘আচ্ছা স্যার।’

ডাক্তার মজুমদার বলতে শুরু করলেন, ‘যে ঘটনাটা তোমার সঙ্গে ঘটেছে, সেটা নেহাতই একটা দুর্ঘটনা। এমন ছোটখাটো দুর্ঘটনা প্রত্যেকের জীবনেই কমবেশি ঘটে। তবে যেহেতু দুর্ঘটনার কারণ আমি, সেহেতু ব্যাপারটা নিয়ে কম্পেনসেট করতে আমি রাজি।’

এই বলে আমার প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য আরও একবার হাসলেন তিনি। আমি চুপ করে রইলাম। তিনি এরপর বললেন, ‘হ্যাঁ, যে কথা আমি বলছিলাম। আমি তোমার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করব। তুমি নিশ্চয়ই জানো যে আমি এই প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজের ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যুক্ত। অংশীদারও বলা যেতে পারে। আমার টাকা লগ্নি করা আছে এই কলেজে। তুমি যদি এ কলেজে পড়তে চাও তবে কোনো সেমিস্টারের জন্য আগামী তিন বছর তোমাকে পয়সা দিতে হবে না। বইপত্র ইত্যাদির জন্য সব খরচও আমার। পড়ার ব্যাপারেও তোমাকে স্পেশাল গাইডেন্সের ব্যবস্থা করব আমি। তাছাড়া পরীক্ষার কোশ্চেন সেট, খাতা দেখার ব্যাপার তো আমার হাতেই থাকে। আমি কী বলছি তা নিশ্চয় বুঝতে পারছ? এ কলেজ থেকে হায়েস্ট মার্কস নিয়ে ডাক্তারি পাশ করবে তুমি আর তারপরই তোমার সামনে ঝলমলে দিন। আসল জীবন তো তোমার শুরুই হয়নি এখনও। যা ঘটেছে ভুলে যাও। ভাবো ওদিনের ব্যাপারটা নিছকই একটা নাইট শেয়ার।’

আমি চুপ করে রইলাম তাঁর কথা শুনে।

ডাক্তার মজুমদার এরপর আমাকে আরও আশ্বস্ত করার জন্য বললেন, ‘এসব ব্যাপার তো এমনিতেই অনেক সময় হয়। ওই যে তোমার ব্যাচমেট দেবাঞ্জনা বলে মেয়েটা। সে তো আমাকে সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছিল কোনো রিসর্টে তাকে নিয়ে বেড়াতে যাবার জন্য। অনেক সময় জীবনে ছোটখাটো কোনো দুর্ঘটনা ভবিষ্যতে ভালো ফল দেয়। ব্যাপারটা তোমার ক্ষেত্রেও তাই হবে।’

প্রফেসর মজুমদারের কথা শুনে এবারও কিছু বললাম না আমি। মাথা নীচু করে রইলাম। হয়তো তাই দেখে তিনি ভাবলেন, আমি তাঁর এ প্রস্তাবে রাজি নই। সে জন্য তিনি অন্য প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, ‘আর যদি তুমি এখানে পড়তে রাজি না থাকো, তবে অন্য কিছু দাবি করো—আমি তোমাকে এখনই দশলাখ টাকার একটা চেক লিখে দিচ্ছি। ওই সামান্য ঘটনার জন্য এটা অনেক বেশি ক্ষতিপূরণ।’

তাঁর দ্বিতীয় প্রস্তাব শুনেও আমি চুপ করে রইলাম। সম্ভবত আমাকে এবারও চুপ করে থাকতে দেখে মৃদু আশঙ্কার জন্ম হল তাঁর মনে। ডাক্তার মজুমদার এরপর বললেন, ‘দেখ তুমি পুলিশে যেতে পারো ঠিকই, কিন্তু তাতে তোমার ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না। হয়তো আমাকে পুলিশে কিছু দিন টানা হ্যাঁচড়া করবে, মিডিয়া ক’দিন বদনাম করবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রমাণ হবে না কিছুই। টাকা আর ক্ষমতা শেষ কথা বলে। আর তা আমার আছে। মধ্যে থেকে তোমার জীবন বিষময় হয়ে উঠবে। শুরুর আগেই শেষ হয়ে যাবে তোমার সামাজিক ভবিষ্যৎ। এ সোসাইটিতে ধর্ষিতা মেয়েদের জন্য সোশাল মিডিয়াতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, মোমবাতি মিছিল হয় ঠিকই, কিন্তু বিয়ে দেবার সময় বা প্রেম করার সময় সবাই ভার্জিন নারী খোঁজে। প্রতিবাদের ঝড় স্তিমিত হলে একলা হয়ে যায় সেই মেয়ে। কেউ তখন তার কোনো খবর রাখে না। যারা তার জন্য একদিন প্রতিবাদ করেছিল তারা তখন মেতে ওঠে অন্য কোনো প্রতিবাদ প্রতিবাদ খেলায়…।’

এ পর্যন্ত শোনার পর আমি আর চুপ করে না থাকতে পেরে বলে উঠলাম, ‘না, না, স্যার! আমি পুলিশের কাছে যাব না। জানি ওসব করে কোনো লাভ নেই। আপনি যা বলেছেন তাই সত্যি।’

আমার কথা শুনে থেমে গেলেন ডাক্তার মজুমদার। তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘তবে কী চাও তুমি বলো?’

আমি বলে উঠলাম, ‘আমি আবার ক্লাসে ফিরতে চাই স্যার।’

কথাটা শুনে তিনি বললেন, ‘তুমি সত্যি বলছ?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, স্যার সত্যি। যা হবার তা হয়েছে। আমি আবার ক্লাসে ফিরতে চাই।’

প্রফেসর কয়েকমুহূর্ত চেয়ে রইলেন আমার দিকে। ধীরে ধীরে আবছা হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে। তিনি বুঝতে পারলেন শেষ পর্যন্ত স্নায়ু যুদ্ধে জিতে গেছেন তিনি। তিন মাস ধরে চলা শঙ্কার অবসান ঘটল তাঁর। মুখে তিনি যাই বলুন তাঁর কৃতকর্মের জন্য গত তিনমাস নিশ্চয় নিশ্চিন্ত ছিলেন না তিনি।

প্রফেসর আমার জবাব শুনে বললেন, ‘দ্যাটস লাইক আ গুড গার্ল।’

তারপর বললেন, ‘এবার তাহলে অন্য কথায় আসি। ইতিমধ্যে একটা সেমিস্টার হয়ে গেছে। মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে সেই সেমিস্টারে বসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি আমি। চিন্তা নেই, ভালো ভাবেই পাশ করবে তুমি। আমার কথার দাম আছে। আর কাল থেকেই ক্লাস শুরু করো তুমি। কাল আমার ক্লাস আছে। আশা করি, ও ঘরে ঢুকতে কাল তোমার অসুবিধা হবে না। যা ঘটার তা ঘটে গেছে। ও কথা আর মনে এনো না।’

শেষ কথাটা কেন তিনি বললেন তা বুঝতে অসুবিধা হল না আমার। কারণ, ও ঘরেই তো ঘটনাটা ঘটেছিল। আমি এবার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বললাম ‘না স্যার, ও ঘরে ঢুকতে আর কোনো অস্বস্তি হবে না। তবে আমার একটা অনুরোধ আছে।’

‘কী অনুরোধ?’ জানতে চাইলেন তিনি।

আমি বললাম, ‘কাল নয়, আমি আজ থেকেই ওখানে ক্লাস শুরু করতে চাই। ও ঘর থেকে বেরিয়েই তো কলেজ ছেড়েছিলাম আমি। দশ মিনিটের জন্য হলেও আপনি ওখানে গিয়ে আমাকে ক্লাস করান। যাতে আমি বুঝতে পারি সত্যিই কলেজ আমাকে ফিরিয়ে নিচ্ছে। আর সত্যিই যদি আমার মনের কোণে ওই ঘরটা সম্পর্কে কোনো অস্বস্তিবোধ লুকিয়ে থাকে, তবে তা কেটে যাবে। কাল ডিসেকশন রুমে ঢুকতে বা অ্যান্টি চেম্বারে ঢুকতে কোনো অসুবিধাই হবে না আমার।’

প্রফেসর কয়েকমুহূর্ত আমার প্রস্তাবটা নিয়ে চিন্তা করলেন। তারপর হয়তো ভাবলেন আমাকে সন্তুষ্ট রাখাই ভালো। তাই একটু ইতস্তত করে এরপর বললেন, ‘ঠিক আছে চলো, তোমার যখন ইচ্ছা তখন আজ থেকেই শুরু করো। কাল একটা বডি এসেছে। রেলের নক ডাউন কেস। মাস তিনেক বেওয়ারিশ লাশটা ওদের কাছেই পড়ে ছিল। সরকারি অনুমতি নিয়ে কালই ডিসেকশনের জন্য বডিটা এখানে আনা হয়েছে।’ কথাটা বলে তিনি দেওয়ালের গা থেকে একটা চাবির গোছা খুলে নিয়ে আমাকে নিয়ে তার ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। বাইরে বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ও মনে হয় পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমরা এগোলাম ডিসেকশন রুমের দিকে।

লাশ কাটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম আমরা। ঘরটার সামনে এসে দাঁড়াতেই আমার বুকটা কেমন যেন করে উঠল ঠিক প্রথম দিনের মতোই। প্রথম দু-তিন দিন কী অস্বস্তি না হয়েছিল এ ঘরে ঢোকার পর। বাড়ি ফিরে ভালো করে খেতে পারিনি। রাতে মাকে জড়িয়ে ধরে শুতে হয়েছিল। তারপর অবশ্য ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে গেছিল সব কিছু। খুব স্বাভাবিকই মনে হতো ডিসেকশন টেবিলে শুইয়ে রাখা বডি সহ এ ঘরের সব কিছু।

চাবি দিয়ে দরজার তালা খুলতে খুলতে ডাক্তার মজুমদার বললেন, ‘ইনফ্যাক্ট তুমি না এলেও হয়তো এ ঘরে আসতাম আমি। বডিটা আনার পর আমি একঝলক দেখেছিলাম বডিটা। ভেবেছিলাম কাল ক্লাস শুরুর আগে আর একবার ভালো করে দেখে নেব বডিটা। তাই হরি ডোমকে বলেছিলাম বডিটা ফ্রিজার থেকে বাইরে বার করে ডিসেকশন টেবিলে রাখতে। বেলা দশটা নাগাদ সে কাজটা সেরে গেছে।’

দরজা খুললেন প্রফেসর মজুমদার। সঙ্গে সঙ্গে একটা ঠান্ডা বাতাস গায়ে এসে লাগল। এসি চলছে ঘরে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে ফর্মালিন দেওয়া মরদেহের পরিচিত গন্ধ এসে লাগল আমার নাকে। বেশ কয়েক মাস পর এলাম বলেই হয়তো গন্ধটা নাকে লাগল। নইলে দু-চারদিন এখানে থাকার পর আর গন্ধটা নাকে লাগে না।

দরজা খুলে দেওয়াল হাতড়ে সুইচ টিপলেন প্রফেসর। মাথার ওপর থেকে ঝুলন্ত বাতিটা জ্বলে উঠল ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা ডিসেকশন টেবিলকে ঘিরে একটা বৃত্ত রচনা করে। আমি দেখতে পেলাম টেবিলের ঠিক মাঝখানে রাখা ডিসেকশন টেবিলকে ঘিরে একটা লাশ শোয়ানো আছে।

প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজের ডিসেকশন রুম সরকারি হাসপাতালের ডিসেকশন রুমের মতো বড় না। মাঝারি আকৃতির এই ঘরটাতে ওই একটাই টেবিল। দেওয়ালের এক পাশে রাখা আছে লাশ রাখার জন্য একটা ফ্রিজার, আর একটা আলমারি। যাতে ডিসেকশনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ইত্যাদি থাকে। আর এ ঘর সংলগ্ন একটা ঘর আছে। সেটা প্রফেসরের অ্যান্টি চেম্বার। ঘরটাতে ঢোকার পরই টেবিলের দিকে তাকিয়ে নিয়ে আমি তাকালাম সেই ঘরটার দিকে।

অ্যান্টি চেম্বারের দরজার পাল্লাটা খোলা। ভিতরে জমাট বাঁধা অন্ধকার, সেদিনও অমনই অন্ধকার ছিল ঘরটা। আমি প্রফেসরের পিছন পিছন গিয়ে ঢুকেছিলাম ও ঘরটাতে। আর তারপর…। আমি আজও যেন কেঁপে উঠলাম সে ঘরের দিকে তাকিয়ে। ওই অন্ধকারের মধ্যেই তো প্রফেসর মজুমদার সেদিন যেন ধারালো স্ক্যালপেল চালাচ্ছিলেন আমার শরীরে। ঘটনার আকস্মিকতায়, আতঙ্কে এতটাই বিহ্বল হয়ে গেছিলাম যে অসহ্য যন্ত্রণা সত্ত্বেও মৃত মানুষের মতোই আমার গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোচ্ছিল না।

প্রফেসর মজুমদার এগিয়ে গিয়ে আলমারিটা খুললেন ডিসেকশন বা শব ব্যবচ্ছেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বার করার জন্য। আর আমি গিয়ে দাঁড়ালাম টেবিলের সামনে। সেখানে দাঁড়াতেই আমার মনে পড়ে গেল সেদিনের সেই ঘটনাটার কথা।

তখন বিকাল। ঠিক এমনই জায়গায় দাঁড়িয়েছিলাম আমি জনা সাতেক ছেলে মেয়ের সঙ্গে। উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রফেসর। একটা ডেডবডির লোয়ার অ্যাবডোমেন ওপেন করে অন্তর্যন্ত্রগুলো তিনি আমাদের বোঝাচ্ছিলেন। হঠাৎ আমার মনে হল তিনি কথা বলতে বলতে বারবার আমার পেটের দিকে তাকাচ্ছেন! কয়েকমুহূর্তের মধ্যে আমি ধরে ফেললাম যে ব্যাপারটা কী ঘটেছে! কোনোভাবে আমার শর্ট টপটা জিন্সের ওপর থেকে অর্থাৎ কোমরের ওপর থেকে ইঞ্চি খানেক ওপরে উঠে গেছে। উন্মুক্ত হয়ে গেছে আমার নাভি। আর সে দিকেই বার বার তাকাচ্ছেন প্রফেসর মজুমদার। আমি জানি নারীর নাভি পুরুষের যৌনতার উদ্রেক ঘটায়, কিন্তু প্রফেসর মজুমদারের ক্ষেত্রে সে ব্যাপারটা আমার ঠিক বিশ্বাস হয়নি। কারণ তিনি আমার শিক্ষক, আর আমার বাবা যদি আজ বেঁচে থাকতেন তবে প্রফেসর মজুমদারের বয়সিই হতেন। তিনি আমার পিতৃতুল্য। আমি তাড়াতাড়ি আমার টপটা টেনে নীচে নামিয়ে দিয়েছিলাম। তবে আজ জানি, সেদিন যদি তাঁকে আমি অবিশ্বাস করতাম তবে আমার মঙ্গল হতো। সেদিন ডিসেকশন শেষ হলে যখন ছাত্রছাত্রীরা ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল প্রফেসর আমাকে বললেন একটা নোটস দেবেন, একটু দাঁড়িয়ে যেতে। যদি সেদিন আমি তার দৃষ্টি পড়তে পারতাম তবে কিছুতেই একলা থাকতাম না এ ঘরে। কিছুতেই তাঁর পিছন পিছন যেতাম না তার ওই অ্যান্টি চেম্বারে। ভুল করেছিলাম আমি। তার খেসারত দিয়ে হয়েছে আমাকে।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম টেবিলের সামনে। মিনিট তিনেকের মধ্যেই হাতে গ্লাভস পরে শব ব্যবচ্ছেদের সরঞ্জাম একটা ছোট ট্রেতে নিয়ে টেবিলের কাছে এলেন প্রফেসর মজুমদার। তিনি এসে দাঁড়ালেন টেবিলের ঠিক ওপাশে আমার ঠিক বিপরীতে। ঠিক যেমন সেই দুর্ঘটনার দিন যে জায়গায় দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। শব ব্যবচ্ছেদের ধারালো ছুরি অর্থাৎ স্ক্যালপেল ইত্যাদি জিনিসসহ ট্রেটা তিনি টেবিলের এক পাশে রাখলেন। তারপর চাদরটা ঠেলে শব দেহের কাঁধের নীচ পর্যন্ত নামিয়ে দিলেন। মৃতদেহটা দেখে চমকে উঠলাম আমি। থেঁতলানো মুখমণ্ডল। চোখ নাক মুখ কিছু বোঝাই যাচ্ছে না। তবে তার চুল দেখে বুঝতে পারলাম সেটা নারী দেহ। তার দেহের যতটা অংশ উন্মুক্ত তা দেখে বুঝতে পারলাম তার রং বেশ ফর্সা ছিল, ঠিক আমারই মতো। আমার মতোই যুবতী ছিল সে। মেয়েটার থ্যাঁতলানো মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে প্রফেসর বললেন, ‘শুনেছি এখান থেকে বেশ দূরের এক স্টেশনে ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়েছিল মেয়েটা। টুকরো হয়নি ঠিকই তবে বাড়ি খেয়ে লাইনের পাশে ছিটকে পড়েছিল। ট্রেনের ধাক্কাতেই চুরমার হয়ে গেছিল ওর স্কালটা। তাতেই সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় মেয়েটা। তবে বডিটা অক্ষতই আছে।’

এ কথা বলার পর তিনি জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা—সেই দিন আমার ক্লাসে তুমি যখন ছিলে তখন আমি তোমাদের কী দেখাচ্ছিলাম মনে আছে?’

মৃদু হেসে আমি জবাব দিলাম, ‘লোয়ার অ্যাবডোমেন।’

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, এবার মনে পড়েছে। তবে সেটাই দেখা যাক।’

প্রফেসর মজুমদার এবার এক ঝটকায় বডির ওপর থেকে পুরো কাপড়টা সরিয়ে দিলেন। হ্যাঁ এটা কোনো যুবতীরই লাশ। ফর্সা দেহ। এখনও দেহটা তেমন বিকৃত হয়নি। বুকের কাছ থেকে পেট পর্যন্ত জেগে আছে সেলাই করা একটা চেরা দাগ। পোস্টমর্টেমের চিহ্ন। তাছাড়া মাথার ওপর থেকে ঝুলতে থাকা তীব্র আলোতে আর একটা জিনিস চোখে পড়ল আমার আর প্রফেসরের। তার শরীরের একটা জন্মদাগ। শবদেহের নাভির ঠিক ইঞ্চিখানের ওপরে নিটোল নাভির মতো দেখতে, বলা ভালো তার চেয়ে বড় আকৃতির একটা কালো জড়ুল!

সেদিকে স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সেদিকে চোখ রেখেই প্রফেসর মজুমদার বললেন, ‘জড়ুলটা দেখেছ! ঠিক যেন কম্পাস বসিয়ে তৈরি করা!’

এরপর তিনি সেই নারী দেহের উদর উন্মুক্ত করার জন্য শব ব্যবচ্ছেদের ছুরি বা স্ক্যালপেলটা হাতে নিলেন। ছুরিটা মৃতদেহের গায়ে চালাবার আগে তিনি তাকালেন আমার দিকে। আমার টপটা এতক্ষণে কোমরের অনেক ওপরে উঠে গেছে। আজও সেদিনের মতো একই পোশাক পরে এসেছি আমি। তবে আজ আর অচেতনে নয়, প্রফেসর যখন শবদেহটার জড়ুলটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন ঠিক তখনই আমি সচেতন ভাবেই আমার টপটাকে বুক পর্যন্ত টেনে তুলেছি।

প্রফেসর আমার দিকে তাকাতেই তাঁর চোখ আটকে গেল আমার উন্মুক্ত শরীরের দিকে। আর তারপরই যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল তার মুখ। অবিশ্বাস্য আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন প্রফেসর মজুমদার। চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে লাগল তাঁর। আর তারপরই মাটিতে পড়ে একদম স্থির হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আমি তাকিয়ে রইলাম তাঁর দেহটার দিকে। তারপর একটু ঝুঁকে পড়ে কবজি স্পর্শ করে বুঝতে পারলাম তিনি আর কোনো দিনই জাগবেন না।

আমাকে তিনি সেদিন যখন পাশের ওই অন্ধকার ঘরে টেনে নিয়ে গেছিলেন, তখন তিনি অন্ধকারে জড়ুলটা খেয়াল করেননি। কিন্তু আজ এই তীব্র আলোকবৃত্তের নীচে দাঁড়ানো আমার উন্মুক্ত ঊর্ধ্বাঙ্গে জড়ুলটা দেখতে পেয়েছেন তিনি। ঠিক যেমন নিটোল বৃত্তাকার জড়ুল আঁকা আছে সামনে টেবিলে শোয়ানো শবদেহের ঠিক একই জায়গাতে! শেষ পর্যন্ত আমি কে, শব দেহটা কার তা বুঝতে পারলেন প্রফেসর মজুমদার। আর তার পরই আতঙ্কে হার্টফেল করলেন।

কৃতকর্মের শাস্তি পেয়েছে ধর্ষক। এবার আমি শান্তি পাব। ফিরতে হবে আমাকে। ডিসেকশন রুম ছেড়ে বেরোবার আগে আমি একবার তাকালাম টেবিলে শোয়ানো লাশটার দিকে। তার মুখটা দেখে বেশ কষ্ট হল আমার। মুহূর্তের জন্য আমার মনে হল অপমানে ক্ষোভে অমনভাবে সেদিন ট্রেনের সামনে ঝাঁপটা না দিলে আমার সুন্দর মুখটা অমন বীভৎস হতো না। তবে টেবিলে পড়ে থাকা আমার ক্ষতবিক্ষত দোমড়ানো মুখটা আজও মাটিতে পড়ে থাকা প্রফেসর মজুমদারের মুখের থেকে অনেক বেশি সুন্দর। সে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম আমি। এবার আমাকে ফিরতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *