১
রিসর্টের লনে দাঁড়িয়ে দূরে গাছে ঘেরা একটা জায়গা দেখিয়ে রুস্তম জানতে চাইল, ‘ওই উঁচু জায়গাটাতে কী আছে? এখানে দেখার মতো কিছু আছে?’
রিসর্টের ম্যানেজার স্থানীয় লোক। সে জবাব দিল, ‘ওই জায়গাটার আড়ালে একটা ছোট নদী আছে সেটা দেখে আসতে পারেন। তাছাড়া এখানে দেখার মতো কিছু নেই। আপনাদের মতো কলকাতা থেকে যাঁরা এখানে আসেন তাঁরা সাধারণত রেস্ট নিতে আসেন।’
পুলক কথাটা শুনে মৃদু আপশোসের ভঙ্গিতে বলল, ‘যাঃ কিছুই তবে দেখার নেই!’
পুলকের কথা শুনে ম্যানেজার লোকটা মৃদু চুপ করে থেকে একটু যেন ইতস্তত করে বলল ‘ওই জঙ্গলের মধ্যে কাকবাবার ঘর আছে। যাঁরা সাধুসন্তে বিশ্বাস করেন তাঁরা কেউ কেউ দেখা করে আসতে পারেন তাঁর সঙ্গে। আপনারা ইচ্ছা করলে তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসতে পারেন। তবে গেলে বেলা থাকতেই যাবেন। সন্ধ্যা নামলে সাধুবাবা আর কুঁড়েতে থাকেন না। নদীর পাড়ে চলে গিয়ে ধ্যানস্থ হন।’
সাধু-সন্তের ওপর আস্থা বা বিশ্বাস রুস্তম বা পুলকের মধ্যে নেই। তবে ম্যানেজার লোকটার কথা শুনে রুস্তম হেসে ফেলে বলল, ‘কাকবাবা!’ বেশ অদ্ভুত নাম তো! এমন নাম কেন?’
লোকটা জবাব দিল, ‘সাধুবাবার পোষা চারটে দাঁড়কাক আছে। ওরা সাধুবাবার কথা শোনে। সাধুবাবার ”কাক বিদ্যা” জানা আছে। ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন। তাঁর ওই দাঁড়ককগুলোর জন্যই লোকে তাঁকে ”কাকবাবা” বলে। কাকবাবা প্রেতসিদ্ধ সাধু।’
সাধুবাবা কাক পোষে! এ কথাটা শুনে এবার রুস্তম আর পুলক একসঙ্গে হেসে ফেলল। আর তা দেখে লোকটা সম্ভবত অনুমান করল যে সাধু-টাধুদের সম্পর্কে এই শহুরে লোকদুটোর কোনও বিশ্বাসই নেই। এ ব্যাপারটা তাদের কাছে বলা তার ঠিক হয়নি। কাজেই সাধুবাবার প্রসঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে লোকটা বলল, ‘এবার আমি যাচ্ছি স্যার। আপনাদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।’—এই বলে রিসর্টের ভিতরে চলে গেল লোকটা।
পুলক গত রাতে এসে উঠেছে এই রিসর্টে। বেশ কিছুদিন ধরে অফিসে কাজের খুব চাপ যাচ্ছিল। হাঁফিয়ে উঠেছিল পুলক। মনটা ঠিক করতে দু-এক দিনের জন্য বাইরে ঘুরে আসার, একটু নিরিবিলিতে থাকা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল তার। ইন্টারনেটে এই জায়গাটার হদিশ পেয়ে সোজা কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে এখানে চলে এসেছে। রুস্তমও এসেছে কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে। তবে গত রাতে নয়। আজ কাক-ভোরে। তাদের দুজনের এই রিসর্টেই আলাপ। দুজনেই তারা সমবয়সি। বয়স তিরিশের আশপাশে। সুতরাং তাদের মধ্যে আলাপও জমে উঠেছে তাড়াতাড়ি। ঘণ্টা তিনেকের পরিচয়তেই পরস্পরের সম্বোধন ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’-তে নেমে এসেছে। তাছাড়া তারা দুজন ছাড়া অন্য কোনও কথা বলারও লোক নেই এখানে। এটা ট্যুরিস্ট সিজন নয়। তাদের দুজনের দুটো ঘর ছাড়া অন্য কোনও কর্মচারীও নেই। ম্যানেজারকেই একা হাতে ম্যানেজার, কুক, গেটম্যান সবার কাজ করতে হচ্ছে।
ম্যানেজার লোকটা চলে যাবার পর রুস্তম জনশূন্য রিসর্ট আর চারপাশের ফাঁকা পরিবেশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইস! জায়গাটা এমন ফাঁকা জানলে কলকাতা থেকে কাউকে তুলে আনতাম। একবার ভেবেও ছিলাম কথাটা। পরে ভাবলাম, না থাক। আজকাল তো সব সময় সব জায়গাতে লোকজন থাকে। হয়তো চেনা কোনও লোকের মুখে পড়ে যাব, তখন বিপত্তি হবে।’
রুস্তমের কথাটা পুরোপুরি বুঝতে না পেরে পুলক বলল, ‘কাকে তুলে আনতে?’
পুলকের কথার জবাবে রুস্তম তার গলার মোটা সোনার চেনটাতে হাত বোলাতে বোলাতে কোনও রাখঢাক না করেই বলল, ‘কোনও মেয়েকে। গতকাল রাতে যখন এখানে আসছি তখন মাঝরাতে হাইওয়ের গায়ে একটা ধাবায় গাড়ি থামিয়েছিলাম চা খাওয়ার জন্য। সেখানে একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম ট্রাক ড্রাইভার খদ্দের ধরার আশায়। বললে সে নিশ্চয়ই এখানে আসতে রাজি হয়ে যেত। ফেরার সময় আবার তাকে জায়গামতো নামিয়ে দিতাম।’
রুস্তমের কথা শুনে একটু অবাক হল পুলক। আর এ ব্যাপারটা সম্ভবত ধরতে পেরেই এরপর রুস্তম বলল, দেখ ভাই, জীবন সম্পর্কে আমার ধারণা খুব স্পষ্ট। পরলোকে বিশ্বাস নেই, তাই পাপের ভয় নেই। আমি শুধু ইহলোকে বিশ্বাসী। তাই যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ জীবনটাকে চেটেপুটে উপভোগ করতে চাই। জীবনের তো কোনও নিশ্চয়তা নেই। কখন কী হয় কে বলতে পারে? এই যে আমার বাঁ পা-টা একটু খুঁত হয়ে গেল। আমাকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে কেন জানো? চাঁদনীর মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎই একটা ট্যাক্সি রাস্তা ছেড়ে ফুটপাতে উঠে এসে আমার পায়ের পাতা মাড়িয়ে চলে গেল! আর একটু হলেই তো সব শেষ হয়ে যেত। কাল যে আমার জীবনে আবার মৃত্যু হানা দেবে না সে কথা কে বলতে পারে? তখন আমার এত বড় ইলেকট্রনিক্স গুডসের ব্যবসা, ব্যাঙ্কে জমানো টাকা কোনও কাজে আসবে না। বিয়ে-থা করিনি, বাপ-মাও কোন কালে উপরে চলে গিয়েছেন। একা মানুষ। তাই যতক্ষণ বেঁচে আছি জীবনকে ভোগ করে যেতে চাই।’—একটানা কথাগুলো বলে থামল রুস্তম।
পুলক সংক্ষিপ্ত জবাব দিল—’বুঝলাম।’
রুস্তম এরপর দূরের গাছে ঘেরা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঘরে বসে আর কী করব? সঙ্গে বোতল আছে বটে, তবে আমি দিনের বেলা মদ্যপান করি না। তার চেয়ে চলো ওই জায়গাটা থেকে ঘুরে আসা যাক।’ পুলক বলল, ‘ওই জঙ্গলে গাড়ি যাবে না। তোমার হাঁটতে সমস্যা হবে না?’
রুস্তম বলল, ‘না, তেমন কিছু হবে না। তাছাড়া ডাক্তারের পরামর্শ মতো আমাকে প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটতে হয়। অপারেশনের পর যাতে পায়ের পেশিগুলো ঠিক হয় তার জন্য। ওই হাঁটার জন্যই ছ’মাসে পা-টা অনেকটাই ঠিক হয়ে এসেছে।’
পুলক আর রুস্তম এরপর বেরিয়ে পড়ল রিসর্ট থেকে।
২
ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে গাছে ঘেরা সেই জায়গাটাতে পৌঁছে গেল দুজন। একটা পায়ে চলা পথ এগিয়েছে ভিতর দিকে। তারা অনুমান করল, এ পথটাই সম্ভবত গাছগুলোর ভিতর দিয়ে এগিয়েছে নদীর পাড়ের দিকে। সেই পথেই প্রবেশ করল তারা। কিন্তু সেখানে ঢোকার পরই তাদের মনে হল যেন বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তারা। চারপাশে কী বিশাল বিশাল সব প্রাচীন গাছ! তাদের ডালপালাগুলো যেন হাত ধরাধরি করে মাথার ওপর পাতার চাঁদোয়া বিছিয়েছে। যদিও বেলা দশটা বেজে গিয়েছে, তবুও সেই প্রখর রোদ্র মাথার উপরের আচ্ছাদন ভেদ করে জায়গাটাতে তেমন ভাবে প্রবেশ করতে পারছে না। ছায়াঘেরা শীতল পরিবেশ চারপাশে। নানারকম গাছ। আম-জাম-শিমূল-বট-অশ্বত্থ। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা বটগাছের মাথার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে রুস্তম বলল, ‘ওই দ্যাখো!’
পুলক দেখল সেই গাছটা থেকে বিশাল বিশাল বাদুড় ঝুলছে। কলকাতায় চিড়িয়াখানার একটা গাছ থেকে বাদুড় ঝুলতে দেখা যায়। আরও বেশ কয়েকটা জায়গাতে এর আগে বাদুড় ঝুলতে দেখেছে সে। কিন্তু এত বড় বাদুড় সে আগে কোনওদিন দ্যাখেনি। চারপাশে কেমন যেন গা-ছমছমে পরিবেশ! কিছু গাছের ফোকলা গুঁড়িগুলোকে ঠিক মানুষের মুখের মতো দেখতে। ঠিক যেন বিশাল হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে কেউ। চারপাশে তাকাতে তাকাতে পুলক হেসে বলল, ‘তন্ত্র-মন্ত্র সাধনার একেবারে আদর্শ জায়গা বলে মনে হচ্ছে!’ রুস্তম হেসে বলল, ‘ঠিক বলেছ। সাধু-সন্ন্যাসীরা শ্মশান বা এসব নির্জন স্থানে ডেরা বাঁধে সাধারণ মানুষকে স্থানমাহাত্ম্য দ্বারা প্রভাবিত করার জন্য।’
বেশ কিছুটা পথ এগোবার পরই মাথার উপরের গাছের চাঁদোয়া হঠাৎ ফিকে হয়ে গেল। বনের মধ্যে বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা। তারপর আবার পথ এগিয়েছে উল্টোদিকের গাছের দঙ্গলের ভিতর দিয়ে। তবে সেই ফাঁকা জায়গার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে দরমার বেড়া আর মাথায় শনের চাল দেওয়া একটা কুঁড়েঘর। তার কাঠের দরজার পাল্লাটা খোলা। ঘরের লাগোয়া একটা বেদি মতো জায়গা আছে। সেখানে একটা ত্রিশূল পোঁতা। ঘরটা চোখে পড়তেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা। তবে কোনও সাধুবাবা বা কাক-টাক চোখে পড়ল না তাদের।
ঘরটার দিকে তাকিয়ে রুস্তম বলল, ‘নিশ্চয়ই এটা সেই কাকবাবার ডেরা। চলো একবার লোকাটাকে দেখা যাক। মনে হয় লোকটা ঘরের ভিতরে আছে।’
তার কথা শুনে পুলক মৃদু বিস্মিত ভাবে বলল, ‘তুমি ওর কাছ থকে ভূত-ভবিষ্যৎ জানতে চাও নাকি?’
রুস্তম বলল, ‘ধ্যুস! নিছক কৌতূহল। লোকটাকে আর তার কাকগুলোকে একবার দেখতে চাই। আর যদি ওর কাছে গাঁজা পাওয়া যায় তবে কলকেতে দু’টান দেব। কলেজ লাইফে সিগারেটে ভরে খেতাম। বহুদিন খাইনি।’ পুলক বলল, ‘আচ্ছা চলো।’ কুঁড়েঘরটার দিকে এগোল তারা।
ঘরটার কাছে পৌঁছে আরও একবার ঘরের সামনে একপাশে ত্রিশূল পোঁতা বেদিটার দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল দুজন। মাটির তৈরি বেদিটার উপর ত্রিশূলটার সামনে বেশ কয়েকটা নরকরোটি আর শুকনো জবা ফুল ছড়ানো। সিঁদুরেরও চিহ্ন আছে জায়গাটাতে। ভালো করে সে দিকে তাকিয়ে পুলক চাপা স্বরে বলল, ‘পাঁচটা খুলি আছে দেখছি। তন্ত্র সাধনাতে পঞ্চমুণ্ডির আসন বলে একটা কথা আছে শুনেছি। যেখানে বসে শবসাধনা করা হয়। এটা সাধুবাবার সাধনা স্থল বলে মনে হয়।’
এরপর কয়েক পা হেঁটে সেই কুঁড়ের খোলা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল তারা। পুলক একটা জিনিস খেয়াল করল। ঘরের দরজা আর তার চারপাশের মাটিতে সাদা রঙের পাখির বিষ্ঠা ছড়িয়ে আছে। কাকের বিষ্ঠা কিনা কে জানে? মুহূর্তখানেক খোলা দরজার সামনে দাঁড়াল তারা। ঘরের ভিতর থেকে কোনও শব্দ আসছে না। তারপর একটু ইতস্তত করে তারা উঁকি দিল ঘরের ভিতর।
দরজার উল্টোদিকে একটা জানলা দিয়ে আলো ঢুকছে ঘরের ভিতরে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ভিতরটা। একপাশে একটা খাটিয়ার উপর খড়ের বিছানা। মেঝেতে রাখা মাটির হাঁড়ি, সরা, টুকিটাকি কিছু বাসনপত্র। তবে সেই সাধু নেই ঘরের মধ্যে। কুঁড়ের ভিতরে চারপাশে তাকাতে তাকাতে তাদের চোখ হঠাৎই থেমে গেল ঘরের এক কোণে। সেখানে দরমার দেওয়ালে ঠেস দিয়ে মাটিতে বসানো আছে একটা নরকঙ্কাল। মাথায় তার সিঁদুর লেপা, গায়ে লাল পাড় সাদা শাড়ি জড়ানো। হয়তো বা কোনও নারীর কঙ্কালই হবে। সাধুবাবার সাধনার কাজে লাগে হয়তো কঙ্কালটা।
ঘরের ভিতর কাউকে দেখতে না পেয়ে রুস্তম মৃদু আশাহত ভাবে বলল, ‘লোকটা মনে হয় অন্য কোথাও গিয়েছে। ফেরার সময় দেখব ওর দেখা পাওয়া যায় কিনা! চলো এবার নদীর দিকে যাওয়া যাক।’
সাধুর ঘর ছেড়ে আবার গাছপালার ফাঁক গলে এগোল তারা। কিছু সময়ের মধ্যে তারা সত্যি পৌঁছে গেল নদীর পাড়ে।
একটা শীর্ণকায় নদী তিরতির করে বয়ে চলেছে। এ পাশে তার গায়ে ভাঁট-থানকুনি আর ধুতুরার ঝোপঝাড়। নদীর ওপারে আবার বড় বড় গাছের জঙ্গল। সূর্যের আলোতে চিক চিক করছে নদীর জল। কোথাও কোনও শব্দ নেই। জল থেকে কিছুটা তফাতে একটা জায়গা বেছে নিয়ে তারা দুজন বসল। রুস্তম সিগারেট ধরাল। নানা ধরনের কথাবার্তা চলতে থাকল দুজনের মধ্যে।
বেশ অনেকটা সময় গল্প করতে করতে কেটে গেল। সূর্য প্রায় মাথার উপর। একসময় গরম লাগতে শুরু করল দেখে পুলক বলল, ‘চলো রিসর্টে ফেরা যাক।’
উঠে দাঁড়াল তারা দুজন। আর সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা তফাতে কর্কশ ভাবে একদল কাক ডাকতে শুরু করল। মৃদু চমকে উঠে সেদিকে তাকাতেই একটা দৃশ্য চোখে পড়ল তাদের। কিছুটা তফাতে একটা ঝোপের আড়ালে একখণ্ড ফাঁকা জমি ঢালু হয়ে নদীতে নেমে গিয়েছে। সেখানে কোমর জলে দাঁড়িয়ে স্নান করছে একজন যুবতী মেয়ে। আর পাড়টাতে তার সামনে রয়েছে চারটে দাঁড়কাক। মাঝে ঝোপের আড়াল থাকায় কেউ কাউকে খেয়াল করেনি। এখন পুলকরা উঠে দাঁড়াতেই তাদের দেখতে পেয়ে সম্ভবত চিৎকার করছে কাকগুলো। হ্যাঁ, তাদের দিকে তাকিয়েই চিৎকার করছে কাকগুলো।
আর এরপর সেই স্নানরত যুবতীও ফিরে তাকাল পুলকদের দিকে। বেশ অস্বস্তি বোধ করল পুলক। কে জানে যুবতী হয়তো ভাবছে যে তারা এই আড়াল থেকে এতক্ষণ তার স্নান দেখছিল। তাদের দেখার পরই দু’হাতে জল সরাতে সরাতে পাড়ে উঠে দাঁড়াল সেই মেয়েটা। পরনে একটাই শাড়ি তার। জলে ভিজে সাদা রঙের শাড়িটা একদম লেপ্টে গেছে মেয়েটার শরীরের সঙ্গে। পূর্ণ যৌবনার দেহের প্রতিটা অঙ্গ, বিভাজিকা-খাঁজ প্রকট হয়ে উঠেছে সূর্যের আলোতে।
মেয়েটা পাড়ে উঠে আরও একবার ভালো করে তাকাল দুই যুবকের দিকে। কোনও লজ্জাবোধ নয়। আবছা একটা হাসি যেন ফুটে উঠল মেয়েটার ঠোঁটের কোণে। নদী-তট থেকে ধীর পায়ে সে এগোল জঙ্গলের দিকে। আর কাকগুলোও মাটির উপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে মেয়েটাকে অনুসরণ করে জঙ্গলের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।
রুস্তম মন্তব্য করল, ‘সাধুবাবার কাক বলে মনে হচ্ছে! মেয়েটাও ওখানে থাকে নাকি?’ নদীর পাড় ছেড়ে এরপর তারাও ফেরার পথ ধরল।
গাছের রাজ্যের ভিতরে ঢুকে কিছুটা এগিয়েই তারা আবার দেখতে পেল সেই মেয়েটাকে। যে পথ ধরে তারা এগোচ্ছে সে পথ ধরেই তাদের কিছুটা আগে আগে চলেছে মেয়েটা। উন্মুক্ত পিঠে মাথার চুল থেকে জল চুঁইয়ে পড়ছে। ভেজা শাড়ি লেপ্টে আছে তার ছন্দোবদ্ধ শরীরে। আর কাকগুলোও একইভাবে লাফাতে লাফাতে তার পিছন পিছন চলেছে।
মেয়েটার পিছন পিছন হাঁটতে হাঁটতে তারা একসময় সাধুর ঘরের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। যুবতীই আগে তার দাঁড়কাকের দল নিয়ে প্রবেশ করল ফাঁকা জমিটাতে এবার আর একজনকে দেখতে পেল ওরা। জটাজুটধারী একটা লোক। পরনে রক্তাম্বর—লুঙ্গির মতো করে পরা। উন্মুক্ত বক্ষ, আর বাহুরে রুদ্রাক্ষের মালা জড়ানো। কাকবাবা!
মেয়েটা তাঁর কাছাকাছি পৌঁছতেই সাধু তার উদ্দেশে হেসে বলে উঠলেন, ‘কাকগুলো কিছুতেই তোকে ছাড়বে না দেখছি!’
এ কথার জবাবে মেয়েটা কী যেন একটা বলল তা ঠিক শুনতে পেল না তারা দুজন। আর এরপর তারা গাছের আড়াল থেকে প্রবেশ করল ফাঁকা জমিটার মধ্যে।
সাধুও এবার দেখতে পেয়ে গেলেন দুজনকে। তাদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা কারা?’ মেয়েটাও এবার ফিরে তাকাল তাদের দিকে।
পুলকরা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল কাকবাবার সামনে। তার কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। রুস্তম জবাব দিল, ‘আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি।’
সাধুবাবা আবার প্রশ্ন করলেন, ‘কলকাতা থেকে?’
মেয়েটার দিকে চোখ রেখেই রুস্তম জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, কলকাতা থেকে?’
রুস্তমের চোখের দৃষ্টি দেখে সাধুবাবা এবার বুঝতে পারলেন মেয়েটার ভেজা শরীরটাকে দেখছে সে। সাধু মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যা তুই ঘরে ঢোক।’
মেয়েটা তার কথা শুনে চপলভাবে খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, ‘ঘরে যাব কেন? গায়ের কাপড়টা আগে শুকিয়ে নিই।’
তার জবাব শুনে সাধুবাবা এরপর ধমকের স্বরেই বললেন, ‘তোকে ঘরে যেতে বলছি ঘরে যা। কথা বাড়াস না।’
এবার তার কথা শুনে মেয়েটা তার উদ্দেশে কপট রাগ দেখিয়ে প্রথমে বলল, ‘এখানে থাকলে কী হতো? তোমার খালি সন্দেহ। ঠিক আছে যাচ্ছি, কিন্তু একটু পর আবার আমাকে নদীর পাড়ে জল আনতে যেতে হবে।’
—এই বলে মেয়েটা স্পষ্টই রুস্তম আর পুলকের উদ্দেশে একটা চোখের ইশারা ছুড়ে দিয়ে হাসতে হাসতে সাধুবাবাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল কুঁড়েঘরটার দিকে। দাঁড়কাকগুলোও তার পিছনে লাফাতে লাফাতে এগোল। মেয়েটা ঘরে ঢুকে যেতেই কাক চারটেও লাফিয়ে ঘরের নীচু ছাদের উপর বসল।
মেয়েটা যতক্ষণ না ঘরের ভিতর গিয়ে ঢুকল ততক্ষণ তাদের দুজনের মতো সাধুবাবাও চেয়েছিলেন সেদিকে। তারপর পুলকদের দিকে তাকিয়ে মেয়েটাকে দেখে পুলকরা বিস্মিত হয়েছে অনুমান করেই হয়তো বললেন, ‘মেয়েটা আমার বামা-স্ত্রী, আমার সাধনাসঙ্গিনী।’
তন্ত্র সাধকদের সাধনাসঙ্গিনী থাকে বলে শুনেছে পুলক। কিন্তু মেয়েটাকে তাঁর বামা-স্ত্রী বলায় একটু অবাকই হল তারা। সাধুর বয়স অন্তত সত্তর হবে, আর মেয়েটার বয়স মেরেকেটে কুড়ি-বাইশ!
কাকবাবা এরপর পুলকদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমাদের কিছু জানার আছে?’
রুস্তম বলল, ‘না, তেমন কিছু নয়। তবে একজনের মুখে শুনলাম এই দাঁড়কাকগুলো নাকি আপনার পোষা?’ আপনার কথা শোনে?
মৃদু চুপ করে থেকে কাকবাবা প্রথমে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, তা বলতে পারো। তবে ওরা আমার থেকে আমার বামারই বেশি অনুগত।’—এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে তোমরা এবার যাও।’
রুস্তম আর পুলক এরপর ফেরার জন্য পা বাড়াতে যাচ্ছিল কিন্তু ঠিক সেই সময় সাধুবাবা বলে উঠলেন, ‘আর একটা কথা শুনে যাও।’ কথাটা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে রুস্তম বলল, ‘কী?’
স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে কাকবাবা বললেন, ‘পরস্ত্রীর দিকে নজর দেওয়া কিন্তু পাপ। ক্ষতি হয় তাতে।’
রুস্তম সাধুবাবার কথায় খুব একটা গুরুত্ব দিল না। সে এগোল ফেরার জন্য। পুলক তাকে অনুসরণ করল। বনপথ ধরে কিছুটা চলার পর রুস্তম মুখ খুলল সে বলল, ‘সাধুবাবার কাকশাস্ত্র জানা আছে কিনা জানি না, তবে মনে হয় কোকশাস্ত্রটা ভালোই জানা আছে। নইলে বুড়ো বয়সে অমন যুবতী মেয়েকে নিজের কাছে রাখতে পারে! তবে ব্যাপারটাতে ভয়ও আছে তার। নারীদের মতিগতি সাধুরাও বুঝতে পারে না। সে জন্যই ফেরার সময় ওই সাবধান বাণীটা শোনাল।’
পুলক হাসল রুস্তমের কথা শুনে।
একসময় জঙ্গলের বাইরে বেরিয়ে এল তারা। বেশ কিছুটা দূরে তাদের রিসর্ট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু রিসর্টের দিকে কিছুটা এগোবার পরই হঠাৎ রুস্তম থমকে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তুমি রিসর্টে ফিরে যাও। আমি একটা কাজ সেরে আসি।’
পুলক জানতে চাইল, ‘কোথায় যাবে?’
রুস্তম জবাব দিল, ‘দেখি কাজটা করতে পারি কিনা। পারলে ফিরে এসে তোমাকে বলব।’
অগত্যা পুলক একাই রওনা দিল রিসর্টের দিকে।
৩
রিসর্টে ফিরে স্নান-খাওয়া সেরে বেলা দুটো নাগাদ বিছানায় শুয়ে পড়েছিল পুলক। রুস্তম তখনও ফেরেনি। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ ম্যানেজারের ডাকে ঘুম ভাঙল। তার চা নিয়ে এসেছে সে। পুলক তার কাছে জানতে চাইল;’রুস্তমবাবু ফিরেছেন?’
লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ, বেলা তিনটে নগাদ ফিরেছেন। খাওয়া সেরে ঘরে ঢোকার সময় বলেছেন, রাতে খাবার দেবার আগে যেন তাকে ডাকা না হয়। গতরাতে ঘুমানো হয়নি তার। গাড়ি চালিয়ে এসেছেন, তাই লম্বা ঘুম দেবেন।’
বাইরে যাবার তেমন কোনও দরকার নেই। তাই সন্ধ্যা থেকে রাত পুরো সময়টা তার নিজের ঘরেই কাটিয়ে দিল পুলক। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ ম্যানেজার আবার এল রাতের খাবার নিয়ে। পুলক তাকে আবার প্রশ্ন করল, ‘আপনার অন্য গেস্টের ঘুম ভাঙল?’
ম্যানেজার জবাব দিল, ‘জানি না স্যার। তার ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। আপনাকে খাবার দিতে এলাম। এবার তার ঘরে যাব।’
এ কথা বলার পর লোকটা বলল, ‘আজ রাতে আমি রিসর্টে থাকব না স্যার। স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রাতে বাড়ি থাকতে হবে। সকাল ছ’টার মধ্যেই আমি আবার রিসর্টে চলে আসব।’
পুলক জানতে চাইল, ‘তাতে আমাদের কোনও অসুবিধা হবে না তো?’
লোকটা বলল, ‘না, এখানে চোর-ডাকাত ছিনতাইবাজদের কোনও উপদ্রব নেই। তবে…’
‘তবে কী?’ জানাতে চাইল পুলক।
তার প্রশ্ন শুনে লোকটা একটু ইতস্তত করে বলল, ‘রাতে রিসর্ট ছেড়ে ওই জঙ্গলের দিকটাতে যাবেন না। আপনারা শহরের লোক, জানি অনেক ব্যাপারে আপনাদের বিশ্বাস নেই। তবে রাতে কাকসাধুর ডেরায় যাবেন না। ওখানে পঞ্চমুণ্ডির আসন আছে। রাতে জায়গাটা ভালো নয়।’
পুলক লোকটার কথা শুনে হাসল। খাবার রেখে চলে গেল লোকটা।
আরও ঘণ্টাখানেক পর রাতের খাবার খেল পুলক। খেতে খেতেই পুলক শুনতে পেল ম্যানেজারের মোটর সাইকেলের শব্দ রিসর্ট ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
খাওয়া সেরে শোবার আগে একটু পায়চারি করার পর পুলকের মনে হল রুস্তম তো আর ফিরে এসে দেখা করল না। একবার তার সঙ্গে দেখা করা দরকার; এ কথা ভেবে পুলক তার সঙ্গে দেখা করার জন্য ঘরের বাইরে বেরতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় রুস্তম নিজেই তার ঘরে এসে ঢুকল। পুলকের উদ্দেশে সে হেসে বলল, ‘আজকের রাতটা জাগতে হবে, তাই সারা দিন ঘুমিয়ে নিলাম। শেষ পর্যন্ত যে কাজে গিয়েছিলাম সে কাজটা হয়েছে।’ পুলক জানতে চাইল, ‘কী কাজ?’
রুস্তম হেসে বলল, ‘মেয়েটাকে রাজি করিয়ে ফেলেছি। মানে, কাকবাবার বামাকে। সাধু রাতে কুঁড়েতে থাকে না। আজ রাতে তাঁর বামার সঙ্গে ওই কুঁড়ে ঘরে রাত কাটাব আমি।’
তার কথা শুনে পুলক আবার বলল, ‘কীভাবে তাকে রাজি করালে?’
রুস্তম বলল, ‘তোমাকে রিসর্টে পাঠিয়ে গাছের আড়াল দিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসেছিলাম। মেয়েটা জল নিতে আসতেই তাকে গিয়ে ধরলাম। রাজি হল মেয়েটা। তবে বেরোবার সময় আমি ভুল করে মানিব্যাগটা ঘরে ফেলে গিয়েছিলাম, কাজেই তাকে রাজি করাবার জন্য গলা থেকে হারটা খুলে দিলাম। যদিও ওর দাম অনেক। কিন্তু কী আর করা যাবে। আজকের রাতটাও তো দামি!’
পুলক বিস্মিতভাবে বলল, ‘তুমি তবে সত্যি সেখানে যাবে?’
রুস্তম বলল, ‘হ্যাঁ। তাই তোমাকে জানাতে এলাম। কাল ভোরের আগেই ফিরে আসব। গুডনাইট।’ এই বলে পুলককে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রুস্তম ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ব্যাপারটা এত বিস্ময়কর লাগল পুলকের কাছে, যে বেশ কিছুক্ষণ পুলক বুঝতে পারল না রুস্তম যা করতে চলেছে তাতে তার বাধা দেওয়া উচিত কিনা? যদিও সে রুস্তমকে বাধা দেওয়ার কেউ নয়, তবুও পুলকের একসময় মনে হল, রুস্তমকে একবার তার নিষেধ করা উচিত ছিল। হয়তো রুস্তম শুনত তার কথা। সে যা করতে চলেছে তা ঠিক নয়। আর এরপরই তার মনে পড়ে গেল ম্যানেজারের বলে যাওয়া কথাগুলো। যদিও পুলক ভূত-প্রেত-অপদেবতা বিশ্বাস করে না, তবু অন্য কোনও বিপদও তো ঘটতে পারে। সাপখোপও তো কামড়াতে পারে। একা চলে গেল ছেলেটা! তার ওপর ছেলেটা স্বাভাবিকভাবে হাঁটচলা করতে পারে না, ব্যাপারটা নিয়ে একটা অস্থিরতা কাজ করতে লাগল পুলকের মনে।
ঘড়ি দেখল পুলক। রুস্তম চলে যাবার পর পনেরো-কুড়ি মিনিট সময় কেটেছে। এখনও হয়তো বেরোলে কুঁড়েতে পৌঁছবার আগে তাকে ধরে ফেলা যেতে পারে। একবার চেষ্টা করে দেখাই যাক না তাকে থামানো যায় কিনা? এ কথাটা মনে করে একটু দোনামোনা ভাবেই শেষ পর্যন্ত ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোল পুলক। প্রথমে রিসর্টের লনে, তারপর কম্পাউন্ড ত্যাগ করে রিসর্টের বাইরে বেরোল।
আকাশে গোল চাঁদ উঠেছে। ধুলো-দূষণহীন জায়গা বলে চাঁদটাকে বেশ বড় দেখাচ্ছে। তার আলো ফটফট করছে চারপাশে। একেই সম্ভবত ‘কাক জ্যোৎস্না’ বলে। চারপাশে সব কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পুলক দ্রুত এগোল জঙ্গলের দিকে। অর্ধেকটা পথ অতিক্রম করার পর পুলক যেন দেখতে পেল একটা লোক প্রবেশ করল সেই জঙ্গলের মধ্যে। নিশ্চয়ই রুস্তম হবে। পুলক তার চলার গতি বাড়িয়ে দিল। একসময় সে পৌঁছে গেল জঙ্গলে প্রবেশ করার সেই পথের মুখটাতে।
জায়গাটাতে পৌঁছে জঙ্গলে ঢোকার আগে একবার মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পুলক ভাবল ভিতরে ঢোকা কি তার ঠিক হবে? কিন্তু এর পরক্ষণেই তার মনে হল, কী আর হবে? রুস্তম যদি সাহস করে রাতে জঙ্গলের ভিতর ঢুকতে পারে, সে তবে পারবে না কেন? পুলক ঢুকে পড়ল জঙ্গলের মধ্যে।
জঙ্গলের ভিতর জমে আছে চাপচাপ অন্ধকার। মাঝে মাঝে শুধু গাছের মাথার উপরে ডালপালার ফাঁক গলে চাঁদের আলো প্রবেশ করছে। সেই আলোতে কিছুটা অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই এগোতে লাগল পুলক। অবশেষে এক সময় সে পৌঁছে গেল সেই ফাঁকা জমিতে।
মাথার উপরে গাছের ডালপালার চাঁদোয়া না থাকায় এ জায়গাটাতে চাঁদের আলো ফটফট করছে। বরং বলা যেতে পারে আকাশ থেকে জ্যোৎস্না যেন চুঁইয়ে নেমে এসেছে এই ছোট্ট ফাঁকা জমিটাতে। হয়তো চারপাশ থেকে অন্ধকার জঙ্গল জায়গাটাকে ঘিরে রেখেছে বলেই ফাঁকা জমিটা বেশি আলোকিত মনে হচ্ছে।
সব কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কাকবাবার পঞ্চমুণ্ডির আসন, তার কুঁড়ে, এমনকী কুঁড়ে ঘরের দরজার মাথার উপরের চালের উপর বসে থাকা দাঁড়কাকগুলোকেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু চারদিক তাকিয়ে রুস্তমকে কোথাও দেখতে পেল না সে। পুলক ভালো করে তাকাল ঘরটার দিকে। দরজার পাল্লাটা খোলা। রুস্তম কি তবে ঘরে ঢুকে পড়েছে? তাহলে তো আর এখন পুলকের কিছু করার নেই। তাকে এবার ফেরার পথ ধরতে হবে।
কিন্তু এ কথা ভেবেও ফিরতে পারল না পুলক। চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে থাকা কুঁড়েঘরের খোলা দরজাটা কেমন যেন আকর্ষণ করতে লাগল তাকে। কোনও গোপন জৈবিক দৃশ্যের আকর্ষণ, না অন্য কিছুর আকর্ষণ তা পুলক বুঝতে পারল না। তার মনে হতে লাগল খোলা দরজাটা যেন তাকে ডাকছে! ফেরার পথ না ধরে কিছুটা সম্মোহিতের মতোই সে ধীর পায়ে এগোতে লাগল কুঁড়ে ঘরটার দিকে।
ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল পুলক। দরজার ঠিক মাথার উপরই সার বেঁধে চারটে দাঁড়কাক বসে আছে। ঠিক যেন পাথর বা মাটির তৈরি মূর্তি তারা। একদম নড়ছে না। তাদের কালো পালক আর ঠোঁটগুলো চকচক করছে জ্যোৎস্নায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঘরের ভিতর অস্পষ্ট খসখস শব্দ শুনতে পেল পুলক। এক অদ্ভুত অজানা আকর্ষণ পুলককে যেন বাধ্য করল ঘরের ভিতর উঁকি দিতে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গলা বাড়িয়ে ঘরের ভেতরে তাকাল সে। উল্টোদিকের একটা জানালা দিয়ে চাঁদের আলো প্রবেশ করছে ঘরে। সেই আলোতে পুলক দেখতে পেল ঘরের মধ্যে খড়ের বিছানার উপর মিলনরত তাদের দুজনকে। সে দৃশ্যের দিকে মুহূর্তখানেক তাকিয়ে সম্বিত ফিরল পুলকের। না, এ দৃশ্য দেখা উচিত হচ্ছে না। দরজার পাশ থেকে সরে আসতে গেল পুলক। ঠিক সেই সময় যেন হাত লেগে দরজার পাল্লাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে উঠল। আর সেই শব্দ শুনেই যেন মিলনরত অবস্থায় দরজার দিকে মুখ ফেরাল সেই নারী। চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার মুখে।
সেই মুখের দিকে তাকিয়ে হিম হয়ে গেল পুলকের শরীর। এ কী দৃশ্য দেখছে সে! আর এর পরমূহূর্তেই ভয়ার্ত চিৎকার করে উঠল রুস্তমও। সে যেন চেষ্টা করল বিছানা থেকে নামার জন্য, কিন্তু পারল না। নারী আলিঙ্গন করে রেখেছে তাকে। আর তার চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গেই মাথার উপর চালে বসা কাকগুলো রাত্রির নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বিকট স্বরে ডাকতে শুরু করল! কেমন যেন এক কর্কশ উল্লাসধ্বনি তাদের ডাকে। যেন এমন কোনও মুহূর্তের অপেক্ষায় এতক্ষণ নিশ্চুপভাবে অপেক্ষা করছিল তারা!
মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন এক ভয়ঙ্কর পরিবেশ তৈরি হল কুঁড়ে ঘরের বাইরে-ভিতরে। পুলক কোনও রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে দরজাটা ছেড়ে ছুটতে শুরু করল। তার পিছনে ঘরের ভিতরে থেকে ভেসে আসতে লাগল বামার কণ্ঠের খিলখিল হাসি আর চালের উপর থেকে দাঁড়কাকগুলোর উল্লাসধ্বনি।
৪
ঘরে ফিরে বাকি রাতটা জেগেই কাটিয়ে দিল পুলক। মাঝে-মাঝেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল কাকসাধুর ঘরের ভিতর দেখা সেই দৃশ্যটা! সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কে হিম হয়ে যাচ্ছিল তার শরীর। একসময় ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। আলো অনেক সময় ভয়কে মুছে ফেলে। ধীরে ধীরে ধাতস্থ হতে শুরু করল পুলক।
বেলা আটটা নাগাদ চা আর ব্রেকফাস্ট নিয়ে ঘরে ঢুকল ম্যানেজার। সে হেসে প্রশ্ন করল, ‘রাতে কোনও অসুবিধা হয়নি তো স্যার?’
গত রাতের ঘটনাটা তাকে জানানো সমীচীন মনে করল না পুলক। হয়তো সে যা দেখেছে সেটা তার মনের ভুল? আবার ঘটনা যদি সত্যি হয়ে থাকে, রুস্তমের সত্যি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, তবে গতকাল রাতের ঘটনা ম্যানেজারকে জানালে সেও কোনও ঝামেলায় জড়িয়ে যেতে পারে। তাই সে শুধু ম্যানেজারকে প্রশ্ন করল, ‘রুস্তমবাবু ঘুম থেকে উঠেছেন?’
ম্যানেজার জবাব দিল, ‘তার ঘরের দরজা বন্ধ দেখলাম। মনে হয় তিনি মর্নিংওয়াকে বেরিয়েছেন অথবা নদীর তীরে বেড়াতে গিয়েছেন।’
তার কথা শুনে পুলক বুঝতে পারল যে গতকালের ঘটনা সম্বন্ধে ম্যানেজারের কিছুই জানা নেই। নিশ্চিন্ত বোধ করল সে। আজই পুলকের কলকাতায় ফেরার কথা। তাই এরপর সে ম্যানেজারকে বলল, ‘বিল রেডি করে রাখবেন। দশটার সময় আমি রুম ছেড়ে দেব।’
‘আচ্ছা স্যার।’ বলে ম্যানেজার চলে গেল।
বাইরে ঝলমল করতে শুরু করেছে দিনের আলো। আর সেই আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় তার মনের সব আতঙ্ক উবে গেল। পুলকের মনে হতে লাগল সে যা দেখেছে সব মিথ্যা। তা কখনওই হতে পারে না। সম্ভবত তা আলো-ছায়ার কারসাজি। পরিবেশ পরিস্থিতি অনেক সময় দৃষ্টিবিভ্রম ঘটায়। এক্ষেত্রেও তেমনই কিছু ঘটেছে নিশ্চয়ই। তবুও তার মনটা কেমন যেন খচ খচ করতে লাগল। একসময় সে সিদ্ধান্ত নিল যে কলকাতায় রওনা হবার আগে একবার কাকবাবার ওখানে যাবে সে। দিনের আলোতে তো আর তার ভয়ের কোনও কারণ নেই। সন্দেহ নিরসন করতে হবে তাকে। বলা যায় না রুস্তমের সঙ্গে হয়তো দেখাও হয়ে যেতে পারে তার। হয়তো ওদিকেই কোথাও আছে সে। সুস্থ অবস্থাতেই আছে। বামার আকর্ষণ ওখানেই আটকে রেখেছে তাকে।
স্নান সেরে বেরোবার জন্য তৈরি হয়ে ঠিক বেলা দশটার সময় ঘর ছাড়ল পুলক। রিসেপশনে গিয়ে রিসর্টের পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে সে ম্যানেজারকে প্রশ্ন করল, ‘তিনি ফিরেছেন?’ ম্যানেজার জবাব দিল, ‘না ফেরেননি। মনে হয় তিনি নদীর দিকে গিয়েছেন। এ সময়টা নদীর পাড় খুব সুন্দর লাগে।’
তার কথার জবাবে পুলক বলল, ‘তিনি ফিরলে বলবেন আমি কলকাতায় রওনা হয়ে গিয়েছি।’
লনের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে পুলকের গাড়িটা। আর তার পাশে রুস্তমের গাড়িটাও। পুলক এসে উঠে বসল তার নিজের গাড়িতে। তারপর গাড়ি স্টার্ট করে রিসর্টের বাইরে বেরিয়ে এল। চারপাশে ঝলমল করছে রোদ্দুর। কোথাও কোনও মলিনতার চিহ্ন নেই। গাড়িটা নিয়ে সোজা এসে দাঁড়াল বনে ঢোকার শুঁড়ি পথের মুখটাতে। তারপর গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে প্রবেশ করল জঙ্গলের ভিতর।
জঙ্গল আজও একই রকম থমথমে। কিন্তু উত্তেজনা কাজ করলেও কোনও অপদেবতার ভয় কাজ করল না পুলকের মনে। হয়তো বা দিনের আলোক মাহাত্ম্যের জন্যই। তার মনে হতে লাগল গত রাতে সে যা দেখেছে সেটা নিছকই তার দৃষ্টিবিভ্রম। গাছের দঙ্গলের ভিতর দিয়ে চলতে চলতে একসময় সে উপস্থিত হল সেই ফাঁকা জমিটাতে।
মাথার উপর উন্মুক্ত আকাশ। সূর্যের আলো ছড়িয়ে আছে চারপাশে। কোথাও কোনও অন্ধকারের লেশমাত্র নেই। সাধুবাবার কুঁড়েটাও প্রকট আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে কাকবাবা, তাঁর বামা কিংবা রুস্তম; কাউকেই দেখতে পেল না পুলক। তবে কাকবাবার কাকগুলোকে দেখতে পেল। ফাঁকা জমির একপাশে রোদের মধ্যে জটলা করছে তারা।
কাক চারটেকে দেখে মনে মনে হেসে ফেলল পুলক। গতকাল রাতে এই কাকগুলোর চিৎকারও পরিবেশটাকে আরও ভৌতিক করে তুলেছিল। নিশ্চয়ই পুলককে দেখে ভয় পেয়েই অমন চিৎকার করেছিল তারা। আর তাতে আরও বেশি ঘাবড়ে গিয়েছিল পুলক। কুঁড়ে ঘরের দরজাটা আগের মতোই খোলা। সাধুবাবা বা তাঁর বামা কি ওই ঘরের মধ্যেই আছেন? বিশেষত, সেই যুবতীকে যদি পুলক দেখতে পায় তবে সে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হবে যে গত রাতে তার দেখা ভুল ছিল। কথাটা মনে করে কুঁড়ের দিকে এগোল সে।
ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সটান ঘরের ভিতর উঁকি দিল পুলক। দরজা জানলা দিয়ে ঢোকা বাইরের সূর্যালোকে ঘরের ভিতরটা আলোকিত। না, কাকবাবা, তাঁর বামা বা রুস্তম কেউই ঘরে নেই। তবে সেই কঙ্কালটাকে দেখতে পেল পুলক। সেটা অবশ্য গতকালের সকালের মতো ঘরের কোণে রাখা নেই। লালপাড় সাদা শাড়ি জড়ানো কঙ্কালটা বেড়ার দেওয়ালে হেলান দিয়ে খড়ের বিছানার উপর বসানো আছে। ভালো করে তার দিকে তাকাতেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করল পুলক। কঙ্কালটার গলা থেকে ঝুলছে একটা সোনার হার! রুস্তমের গলার সোনার হারটা। সেটা দেখে পুলক মৃদু বিস্মিত হলেও মনকে এই বলে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করল যে সেই বামা নিশ্চয়ই তার গলার হারটা কঙ্কালের গলায় পরিয়ে দিয়ে গিয়েছে। এবার পুলককে ফিরতে হবে। কাউকেই কোথাও দেখতে পাচ্ছে না সে।
কিন্তু দরজা ছেড়ে কয়েক পা এগোতেই পুলক দেখতে পেল, নদীর দিকের একটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন সাধুবাবা। ফাঁকা জমিটার মাঝখানে মুখোমুখি হল তারা দুজন। সাধুবাবা তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি এখানে এসেছ কেন?’
পুলক একটু ইতস্তত করে জবাব দিল, ‘গতকাল আমার সঙ্গে এখানে যে এসেছিল সে এখানে আছে কিনা দেখতে।’
তার কথা শুনে কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন কাকসাধু। তারপর যেন মৃদু আপশোসের স্বরে বললেন, ‘আমি তোমার সঙ্গীকে সাবধান করেছিলাম। কিন্তু সে শুনল না। আমি রাতে নদীর ধারে থাকি। এখানে যা ঘটার ঘটল। আমি তার কামনা মেটাতে পারি না। আমার অবর্তমানে সে তার কামনা মেটাল।’
তার কথা শুনে পুলক বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করল, ‘কী ঘটল?’
সাধুবাবা তার প্রশ্নের উত্তরে মুখে কিছু না বলে কিছুটা তফাতে মাটির দিকে আঙুল তুলে দেখালেন। তার অঙ্গুলি নির্দেশ অনুসরণ করে সেদিকে তাকাল পুলক। সেখানে মাটির উপর একটি দাঁড়কাক বসে তাকিয়ে আছে পুলকের দিকে।
সেদিকে তাকিয়ে এরপর কাকবাবা স্পষ্টই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আমার কিছু করার নেই। প্রেত-সঙ্গম করে প্রেতযোনী প্রাপ্ত হলে মানুষ দাঁড়কাকে পরিণত হয়। কাকের সংখ্যা আরও একটা বাড়ল। চার থেকে পাঁচ হল! আসলে দাঁড়কাকগুলো আমার নয়, বামার। ও আমার বামা বলে কাকগুলো আমারও কথা শোনে।’
সাধুবাবার কথা শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তার কুঁড়ের দিকে একটা শব্দ হল। পুলক সেদিকে তাকিয়ে দেখল ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল বামা। তার পরনে লালপাড় সাদা শাড়ি। গলায় সূর্যের আলোতে ঝলমল করছে সোনার হার! তাকে দেখে চমকে উঠল পুলক। এই মাত্র তো ঘরটা দেখে এল সে! ঘরে তো সেই কঙ্কালটা ছাড়া আর কেউ ছিল না! তার পরনেও ছিল একই শাড়ি, একই রকম সোনার হার!
লাস্যময়ী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পুলক আর সাধুবাবার দিকে তাকিয়ে একবার সেই নারী আমোদে খিলখিল করে হাসল। তাকে দেখে চারটে কাক ডানা ঝাপটে উঠল। তাদের দিকে তাকিয়ে বামা প্রথমে বলল, ‘আয় আয়। নদীতে স্নানে যাব। আমাকে দেখবি না?’
এই বলে সে এগোল নদীর দিকে যাওয়ার জন্য। কিন্তু একটু এগিয়েই সে পিছু ফিরে দাঁড়াল। পুলকের কিছুটা তফাতে পঞ্চম কাকটা তখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার উদ্দেশে বামা হেসে বলল, ‘আয় আয়, তুইও আয়। খোঁড়া বলে কষ্ট হচ্ছে বুঝি?’ অন্য চারটে কাক তখন পৌঁছে গিয়েছে তার কাছে।
তার কথা শুনে পুলকের দিকে তাকিয়ে শেষ একটা শব্দ করল কাকটা। হয়তো সে পুলকের উদ্দেশে বলল, ‘চললাম।’
তারপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে লাফাতে লাফাতে এগোল সেই নারীর ডাকে।
মুহূর্তের জন্য পুলকের চোখে ফুটে উঠল গতরাতের সেই দৃশ্য। রুস্তমকে আলিঙ্গন করে আছে এক নরকঙ্কাল! সাধুবাবার বামা!
পাঁচটা কাককে নিয়ে বামা অদৃশ্য হয়ে গেল নদীর দিকে গাছের আড়ালে। আর সঙ্গে সঙ্গেই পুলকও পা বাড়াল দ্রুত সে জায়গা ত্যাগ করার জন্য। কে বলতে পারে সাধুবাবার বামা তাকেই নদীর পাড়ে টেনে নিয়ে যাবে না দাঁড়কাকের সংখ্যা একটা বাড়াবার জন্য? এখনই এ জায়গা ছেড়ে পালাতে হবে তাকে।
