ওরা ৪ জন

ওরা ৪ জন

শ্যামবর্ণ মেয়েটা ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, ‘আমরা কি তবে গাছের তলায় রাত কাটাব?’

জিনস-টপ পরা তার সঙ্গিনী প্রলয়কে বলল, ‘আপনাদের বুকিং স্লিপটা যে আসল তা বুঝব কী করে?’

প্রলয়ও জবাব দিল, ‘আপনাদের বুকিং স্লিপটাও তো নকল হতে পারে! নইলে একই ডেটে দুটো পার্টির বুকিং কীভাবে সম্ভব?’

মেয়েটার কথার জবাব দিয়ে সে এরপর রাজর্ষিকে বলল, ‘কীরে ট্রাভেল এজেন্টকে পেলি?’

রাজর্ষি সেলফোনটা কান থেকে নামিয়ে বলল, ‘পাঁচবার রিং হল, কিন্তু কল রিসিভ হচ্ছে না। ডিসগাস্টিং!’

রুদ্রর মনে হল, এমনও হতে পারে যে, ট্রাভেল এজেন্সির লোকটা তার গলদটা বুঝতে পেরেছ। একই দিনে সে এই বন-বাংলো-ভূত বাংলোর বুকিংটা দুটো পার্টিকে দিয়ে ফেলেছে, তাই বেগতিক দেখে ফোন ধরছে না। সে মেয়ে দুটোর উদ্দেশে বলল, ‘আপনারা আর একবার ফোন করে দেখুন তো ওই ট্রাভেল এজেন্টকে পান কিনা? তাহলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে।’

কৃষ্ণাঙ্গী একটু অসন্তুষ্টভাবেই তার সেলফোনটা বার করে রাজর্ষির মতোই তাদের বুকিং স্লিপে লেখা কলকাতার সেই ট্রাভেল এজেন্টের নম্বর ডায়াল করল। তারপর ফোনটা কিছুক্ষণ কানে ধরে রেখে বলল, ‘ওঃ শিট! কল রিসিভ করছে না।’

কেয়ারটেকার ছেলেটা কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে বিবদমান দু’পক্ষের মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। স্পষ্টতই সে বুঝে উঠতে পারছে না তার কী করা উচিত। যদিও রুদ্ররা প্রথমে উপস্থিত হয়েছে, তবুও তাদের জন্য ঘর খুলতে না খুলতেই তো হাজির হল এই দু’জন ম্যাডাম। তাদের হাতে একটা ঘরের বুকিং স্লিপ, আর এই তিনজন স্যারের কাছে দুটো ঘরেরই বুকিং স্লিপ। কিচেন ছাড়া মাত্র দুটো ডাবল বেডরুম আছে এই বাংলোতে। রুদ্ররা তিনজন বলে তারা দুটো ঘরই বুক করেছে।

রুদ্র হিন্দিতে কেয়ারটেকার ছেলেটাকে বলল, ‘বুকিং কিসকা হ্যায়, কোই সমাচার হ্যায় তুমহারা পাস?’

ছেলেটা ও কথার জবাবে হিন্দিতে যা বলল, তার মর্মার্থ হল, না নেই। আগাম খবর তাকে দেওয়া হয় না। যারা আসে তারা বুকিং স্লিপ নিয়ে আসে। আর তা দেখে ঘর খোলে ফাগুয়া নামের এই দেহাতি ছেলেটা। এ বাংলোটা নাকি মাত্র বছরখানেক হল ভাড়া দেওয়া শুরু হয়েছে। আর তখন থেকে এ ব্যবস্থাই চালু আছে। স্লিপ দেখালে ঘরের দরজা খুলে দেয় ফাগুয়া। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ সমস্যার মুখে সে কোনওদিন পড়েনি।

সূর্য ডুবে গিয়েছে। বেলা পড়ে এসেছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নামবে শাল-মহুয়ার জঙ্গল ঘেরা এই ছোট্ট বন-বাংলোতে। পিচ রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে রুদ্রদের জিপটা তাদের তিনজনকে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছে। সে আবার আসবে কাল ভোর পাঁচটায়। সে জায়গা থেকে পায়ে হেঁটে জঙ্গলের মধ্যে এই বাংলোতে আসতে রুদ্রদের মিনিট দশেক সময় লেগেছে। মেয়ে দুটো যে গাড়িতে এসেছে সে গাড়িও এই একই জায়গাতে তাদের নামিয়ে দিয়ে ডালটনগঞ্জ শহরের দিকে ফিরে গিয়েছে। কাল সকালের আগে তারা যে কোথাও যাবে সে উপায়ও নেই।

তবুও রুদ্র জানতে চাইল, কাছাকাছি কোনও থাকার জায়গা আছে কিনা?

ফাগুয়া জানাল থাকার জায়গা যেগুলো আছে তা সবই সাত-আট কিলোমিটার দূরে। আর ট্যুরিস্ট সিজন বলে সে সব জায়গাতেও ঘর পাওয়া যাবে না। সে সব জায়গাতে ঘর না পেয়ে আজ সকালেই নাকি দুটো ট্যুরিস্ট পার্টি এখানে এসেছিল ঘরের জন্য। তাদের কাছে বুকিং স্লিপ না থাকাতে ঘর দেয়নি ফাগুয়া।

মেয়ে দুটো তাকিয়ে আছে রুদ্রদের দিকে। কোনও একটা সিদ্ধান্ত এবার নিয়ে ফেলতে হবে রুদ্রদের। অন্ধকার নামতে চলেছে। এভাবে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার কোনও মানে হয় না। এ বাংলোতে ভূত দেখা যায়; এ কথাটা নিশ্চয়ই ট্যুরিস্টদের আকর্ষণ করার জন্য বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে। কিন্তু ভূত না থাকলেও জঙ্গল ঘেঁষা এই জায়গাতে কোনও বন্য প্রাণী বেরিয়ে আসতে পারে। সাপ তো বেরোতেই পারে। জিপ ড্রাইভার তাদের গাড়ি থেকে নামাবার সময় সতর্ক করে বলেছিল, ‘একটু সাবধানে যাবেন। ওয়াইল্ড লাইফ মাঝে মাঝে এখানেও চলে আসে। বিশেষত ভল্লুক।’

কথাটা মনে পড়াতে রুদ্র একটু ভেবে নিয়ে মেয়ে দু’জনের উদ্দেশে বলল, ‘আমাদের দু-দিনের জন্য বাংলোটা বুক করা। আমরা আজকের রাতের জন্য একটা ঘর আপনাদের ছাড়তে পারি। কাল সকালে আপনাদের গাড়ি এলে কিন্তু আপনাদের অন্যত্র চলে যেতে হবে। রাজি থাকলে বলুন?’

মেয়ে দুটোর অবস্থার কথা ভেবে রুদ্রর প্রস্তাবে প্রলয় আর রাজর্ষিও সহমত প্রকাশ করে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। কলকাতা থেকে পুরো একটা দিন জার্নি করে এসে এখন বেশ ক্লান্ত লাগছে। ঘরে ঢুকে বিছানাতে হাত-পা ছড়িয়ে বিশ্রাম নেওয়া দরকার। মেয়ে দুটোর চোখে-মুখেও ক্লান্তির ছাপ। তারা বাঙালি যখন, তখন তারাও হয়তো সরাসরি কলকাতা থেকেই আসছে।

অন্ধকার নামছে। মেয়ে দুটোও সম্ভবত এবার পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুভব করল। তাদের বুকিং স্লিপে দু-দিনের বুকিং থাকলেও তারা এবার নমনীয় হল। নিজেদের মধ্যে মৃদু দৃষ্টি বিনিময়ের পর কৃষ্ণাঙ্গী মেয়েটা মৃদু হেসে বলল, ‘আচ্ছা তাই হবে।’

সমস্যার সমাধান হওয়াতে হাসি ফুটে উঠল রুদ্রদের তিনজনের মুখেও। রাজর্ষি এবার মেয়ে দু’জনকে ভদ্রতাবশত প্রশ্ন করল, ‘আপনারাও কি কলকাতা থেকে সরাসরি আসছেন? আপত্তি না থাকলে পরিচয়টা দেবেন?’

শ্যামবর্ণা মেয়েটা বলল, ‘হ্যাঁ, সোজা কলকাতা থেকেই। একে তো রিজারভেশন পাইনি বলে সারা ট্রেন দাঁড়িয়ে এসেছি, তারপর এখানে এসে ঘর নিয়ে এই ঝামেলা। আমার নাম কৃষ্ণকলি বসু, আর ওর নাম রাধিকা গুপ্ত। কলকাতার একটা ল’ফার্মে একসঙ্গে চাকরি করি। আপনাদের পরিচয়টা?’

রাজর্ষি বলল, ‘আমি রাজর্ষি। আমি আর এই প্রলয় কলকাতাতে কম্পিউটার পার্টসের ব্যবসা করি। আর ও হল রুদ্ররূপ। সরকারি চাকরি করে। কলেজ লাইফ থেকে আমরা বন্ধু।’

নমস্কার বিনিময়ের পর রাধিকা নামের মেয়েটা বলল, ‘কিছু মনে করবেন না। আপনাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছিলাম। আসলে এত ক্লান্ত যে মেজাজ ঠিক রাখতে পারিনি। আমার এখন মনে হচ্ছে ভুলটা কলকাতার ওই ট্রাভেল এজেন্সিরই—ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, ওরা আমাদের দু-পার্টিকেই একই দিনে বুকিং দিয়েছে।’

রুদ্র বলল, ‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে।’

ট্যুরিস্ট পার্টিদের মধ্যে ঝামেলা মিটে যাওয়াতে ইতিমধ্যে বাংলোর বারান্দায় উঠে গিয়ে দুটো ঘরই খুলে ফেলেছে ফাগুয়া।

সে ওপর থেকে বলল, ‘কামরা খোল দিয়া। আইয়ে আপলোগ।’

রুদ্রদের মালপত্র ওপরে ওঠানোই ছিল। মেয়ে দুটো আসার পর ফাগুয়ার সঙ্গে তাদের তর্ক করতে দেখে তারা নীচে নেমে এসেছিল।

ফাগুয়ার কথা শুনে রাধিকা নামের মেয়েটা তার পাশে নামিয়ে রাখা সুটকেসটা তুলে নিল। তারপর সবাই এগোল বাংলোতে ওঠার জন্য।

কাঠের তৈরি বাংলোটা বেশি বড় নয়। কাঠের মেঝে, দেওয়াল। দুটো মাত্র থাকার ঘর আর তার একপাশে দুটো ছোট ঘর, স্টোর রুম আর কিচেন। আর ওদের বৃত্তাকারে ঘিরে আছে কাঠের রেলিংওয়ালা বারান্দা। ঘর আর বারান্দার মাথার ওপর টিনের ঢালু ছাদ দেওয়া। বাংলোটা দেখে বেশ পুরোনোই মনে হয়। তাই বারান্দায় উঠে আসার পর ফাগুয়ার কাছে প্রলয় জানতে চাইল, ‘এ বাংলোটা কত পুরোনো?’

সে জবাব দিল, ‘একশো বছরেরও পুরোনো। হিগিন্স সাহেব নামের এক সাহেব বাংলোটা বানিয়েছিলেন। তিনি শিকার খেলতে আসতেন এখানে। তখন চারপাশে বাঘের আনাগোনা ছিল। এখানকার মালিক অবশ্য একজন মাড়োয়ারি। হাজারিবাগ শহরে থাকে। বাংলোটা সারিয়ে নিয়ে রাঁচি আর কলকাতার ট্যুর এজেন্সির মাধ্যমে ভাড়া দিচ্ছে।

ফাগুয়া দুটো ঘরের মধ্যে একটা ঘর মেয়ে দু’জনকে দেখিয়ে বলল, ‘আপলোগ ইস কামরেমে যাইয়ে।’

সে ঘরের দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ কৃষ্ণকলি নামের মেয়েটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে মৃদু ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘ওরে বাবা! ওটা কী!’

তার দৃষ্টি অনুসরণ করে অন্যরা এবার দেখতে পেল জিনিসটা। দুটো ঘরের মাঝামাঝি জায়গাতে বারান্দার সিলিং থেকে তাদের মাথার ওপর ঝুলছে বিরাট বড় একটা মৌচাক! হাজারে হাজারে মৌমাছি বিজবিজ করছে তার শরীরে। জিনিসটা দেখা মাত্রই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সবাই। মৌমাছিগুলো যদি এখন তাদের আক্রমণ করে তবে কেউ বাঁচবে না!

কিন্তু ফাগুয়া তাদের আশ্বস্ত করে বলল, ‘ভয় নেই। নিশ্চিন্ত থাকুন, ওরা কাউকে কামড়ায় না। নিজেদের কাজে সারা দিন ব্যস্ত থাকে। এখানে তো ইলেকট্রিক নেই। রাতে তেলের বাতি বা মোম জ্বালালে অনেক সময় আলো দেখে দু-একটা ঘরে ঢুকে পড়ে। দরজা বন্ধ রাখবেন বাতি জ্বলার পর সমস্যা হবে না।’

তার কথা শুনে আশ্বস্ত হল সবাই। রুদ্র এবার তার সামনে দাঁড়ানো কৃষ্ণকলিকে মজা করে বলল, ‘মৌমাছির হাত থেকে না হয় রেহাই পেলেন, কিন্তু ভূত যদি হানা দেয়? ভূত যে কিছু করবে না তার গ্যারান্টি কী? ট্যুর এজেন্সির বিজ্ঞাপনটা দেখেছেন নিশ্চয়?’

জবাবটা দিল রাধিকা। সে হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই দেখেছি। আর সেটা দেখেই তো ট্যুর এজেন্সির কাছে গিয়েছিলাম।’

ভূত দেখতেই তো আমাদের এখানে আসা। তবে ভূতের দেখা পাই, না পাই দেখুন জঙ্গলের ভেতরগুলো কেমন থমথমে হয়ে উঠেছে! আর এই পুরোনো বাংলোটাও বেশ। কেমন যেন নিঝুম ভৌতিক পরিবেশ!

রুদ্র তাকিয়ে দেখল, সত্যিই বাংলোর চারদিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় শাল-সেগুন-মহুয়া গাছগুলোর আড়ালে অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। এক অদ্ভুত ভৌতিক নিস্তব্ধতা যেন ঘিরে ধরতে শুরু করেছে এই প্রাচীন বন-বাংলোকে।

রাজর্ষি জানতে চাইল, ‘বাংলোর পিছন দিকে কী আছে?’

ফাগুয়া জবাব দিল, ‘জঙ্গল। তারপর ছোট একটা নদী আছে। সেটা ধরে এগোলে কিছুটা তফাতে কোয়েল নদীতে পৌঁছনো যায়।’

ঘরটা বেশ বড়। ডাবল বেড হলেও তাতে তিনজনে অনায়াসে শোওয়া যায়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অ্যাটাচড বাথ। ঘরের পিছনে বারান্দার দিকেও একটা জানলা আছে। সেটা খুলতেই বারান্দা ও তার ওপাশের অন্ধকার জঙ্গল দেখা গেল। তারা ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই যেন ঝুপ করে সন্ধ্যা নামল। কাচের চিমনি দেওয়া একটা তেলের বাতি টেবিলের ওপর রাখা ছিল। সেটা জ্বালিয়ে বাথরুমে গিয়ে একে একে ফ্রেশ হয়ে নিল তারা তিনজন। ইতিমধ্যে ফাগুয়া এসে জানিয়ে দিয়ে গেল সে মুরগির ঝোল আর রুটি পাকাচ্ছে রাতের খাবারের জন্য। আজ শুধু সে এটুকুই ব্যবস্থা করতে পারবে। পরদিন অবশ্য সাহেবরা যা খেতে চাইবে তা সে বাজার থেকে কিনে আনবে তারা তাকে পয়সা দিলে।

সে চলে যাবার পর তারা দরজা বন্ধ করে খাটে হাত-পা ছড়িয়ে বসল। ব্যাগ থেকে একটা হুইস্কির বোতল বার করল রুদ্র। সঙ্গে কাজুবাদাম-চানাচুরের প্যাকেট। রুদ্রর নিয়মিত পানের অভ্যাস আছে। রাজর্ষি আর প্রলয়ের মদ্যপানে তেমন আকর্ষণ না থাকলেও, স্থান মাহাত্ম্যের কারণে তিনটে গ্লাসেই মদ ঢালা হল। ‘চিয়ার্স’ বলে গ্লাসে গ্লাস ঠেকাবার পর গ্লাস মুখে তুলল তারা। রুদ্র অবশ্য তার অভ্যাসমতো এক চুমুকেই গ্লাস ফাঁকা করে দিল। অন্য দু’জন অবশ্য এক পেগের বেশি খাবে না। ধীরে ধীরে পেগটা শেষ করবে তারা। তাই মৃদু চুমুক দিয়ে গ্লাস নামাল তারা দু’জন। প্রলয় একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘জায়গাটা কিন্তু দারুণ! কেমন নির্জন, গা ছমছমে, নিস্তব্ধ!’

রুদ্র একটা বাদাম মুখে দিয়ে বলল, ‘এখানে ভূত দেখা যায়—ওটা নিশ্চয়ই বাজে কথা। কিন্তু পরিবেশটা সত্যিই ঘোস্ট স্টোরির মতো!’

রাজর্ষি বলল, ‘আমার কিন্তু এখানে এসে আরও একটা ব্যাপার দেখতে পেয়ে ভালো লাগল।’

‘কী?’ প্রশ্ন করল রুদ্র।

রাজর্ষি গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘ওই মেয়ে দুটোকে। যতই তর্ক করুক না কেন, দারুণ ফিগার। সেক্সি অ্যাপ্রোচ আছে।’

প্রলয় বলল, ‘ঠিক তাই। বিশেষত রাধিকা বলে মেয়েটা ভীষণ…।

রাজর্ষি বলল, ‘আমিও ব্যাপারটা খেয়াল করেছি। সত্যি দারুণ শেপ। আর ওদের নাম দুটো দারুণ। কৃষ্ণকলি আর রাধিকা। নামের মধ্যেই কেমন যেন প্রেম প্রেম গন্ধ আছে!’

তাদের কথা শুনে রুদ্র নিজের গ্লাসে হুইস্কি ঢালতে ঢালতে বলল, ‘তোদের কি মেয়ে নিয়ে আলোচনা ছাড়া অন্য কোনও কথা নেই?’

কথাটা শুনে প্রলয় বলল, ‘তুই তো শালা আর এ স্বাদ চেখে দেখলি না। শুধু মাল খেয়েই জীবন কাটাচ্ছিস। আমাদের মতো চেখে দেখলে বুঝতিস, এ নেশা মদের নেশার থেকেও বড়।’

রাজর্ষি বলল, ‘হ্যাঁ, একদম ঠিক কথা।’ তিনজনেই হেসে উঠল একসঙ্গে।

নানা আলোচনা, হাসি-ঠাট্টা শুরু হল এরপর। সময় এগিয়ে চলল। বাইরে অন্ধকার কেটে গিয়ে চাঁদও উঠল। চাঁদের আলোতে জানলার বাইরে পিছনের বারান্দার ওপাশে জঙ্গলটাকে যেন আরও বেশি ভৌতিক লাগছে। ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে সেখান থেকে।

রাত আটটা নাগাদ খাবার দিতে এল ফাগুয়া। হাতে গড়া রুটি আর শালপাতার বাটিতে ধোঁয়া ওঠা মুরগির মাংস। টেবিলের ওপর খাবার নামিয়ে রেখে ফাগুয়া বলল, ‘আমি এবার গ্রামে ফিরে যাব। কাল নিশ্চয়ই আপনারা জঙ্গল সাফারিতে যাবেন। তার আগেই ফিরে আসব। চিন্তা নেই। এখানে চোর-ডাকাতের ভয় নেই। তবে রাতে বাংলো ছেড়ে বেরোবেন না। গাছে অনেক মৌচাক আছে। মধুর লোভে ভল্লুক আসে মাঝে মধ্যে।’

প্রলয় বলল, ‘আর ভূতের ভয় নেই? ভূত দেখা যায় না এখানে? ট্যুর এজেন্সি তো বলছে, এখানে ভূত দেখা যায়!’

এ প্রশ্নের জবাবে ফাগুয়া জানলার বাইরে চন্দ্রালোকিত জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, কখনও-সখনও যায়।’

রাজর্ষি জানতে চাইল, ‘কার ভূত?’

একটু চুপ করে থেকে ফাগুয়া জবাব দিল, ‘হিগিন্স সাহেবের ভূত।’

ফাগুয়ার কথা বিশ্বাস না করলেও রাজর্ষি বলল, ‘সাহেবরা তো কবে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছে! তা হিগিন্স সাহেবের ভূত এখনও এখানে রয়ে গেলেন কেন? তুমি নিজে তাকে দেখেছ?’

ফাগুয়া বলল, ‘না, দেখিনি। স্থানীয় মানুষদের তিনি দেখা দেন না। তাঁর রাগ শহরের লোকদের ওপর। তাই তিনি এ বাংলোতে শহর থেকে লোক এলে তাদের তাড়াবার জন্য অনেক সময় দেখা দেন। অনেকেই তাঁকে দেখেছে।’

প্রলয় সিগারেটে টান দিয়ে বলল, ‘শহরের লোকদের ওপর হিগিন্স সাহেবের রাগ কেন?’

ফাগুয়া বলল, ‘হিগিন্স সাহেব ছিলেন পূর্ণিয়ার কালেক্টর। যে ক্রান্তিকারীরা হিগিন্স সাহেবকে গুলি করে মেরেছিল তারা শহর থেকেই এখানে এসেছিল। এই বাংলোতে তারা হিগিন্স সাহেবকে গুলি করে মেরে পালিয়ে যায়। তাই শহরের লোকেদের ওপর সাহেবের রাগ।’

তিন পেগ খাওয়া হয়ে গিয়েছে রুদ্রর। সে এবার সোজা হয়ে বসে তার সঙ্গীদের হেসে বলল, ‘ট্যুর এজেন্সির লোকরা কিন্তু ফাগুয়াকে গল্পের ট্রেনিংটা ভালোই দিয়েছে তাই না?’

রুদ্রর কথা শুনে রাজর্ষি আর প্রলয় সম্মতি প্রকাশ করে হাসল।

রাজর্ষি ফাগুয়াকে বলল, ‘তোমার গ্রাম কোথায়? কীভাবে যাবে?’

ফাগুয়া বলল, ‘পাঁচ মাইল দূরে। সাইকেলে যাব।’

রুদ্র বলল, ‘আচ্ছা তুমি যাও। দেখি তোমার হিগিন্স সাহেব রাতে আমাদের ভয় দেখাতে আসে কিনা!’

ফাগুয়া এবার তাদের সেলাম জানিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াতে গেল, ঠিক সেই সময় পাশের ঘর থেকে প্রচণ্ড চিৎকার ভেসে এল। কৃষ্ণকলি আর রাধিকার ভয়ার্ত চিৎকার!

কী হল? মৌমাছির ঝাঁক ঢুকে পড়ল নাকি তাদের ঘরে? নাকি সাপখোপ অন্য কিছু?

চিৎকার শুনে রুদ্ররা খাট থেকে লাফিয়ে নেমে ফাগুয়ার সঙ্গে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। ফাগুয়া পাশের ঘরের দরজাতে ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। হুড়মুড় করে সে ঘরে ঢুকল তারা চারজন। এ ঘরের ভেতরটাও ঠিক রুদ্রদের ঘরের মতোই। একই রকম তেলের বাতি জ্বলছে ঘরে। সেই আলোতে রুদ্ররা দেখল, ঘরের ঠিক মাঝখানে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে কৃষ্ণকলি আর রাধিকা। তাদের দু’জনের পরনেই নৈশ পোশাক; স্লিভলেস নাইটি। পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে ঠকঠক করে কাঁপছে তারা। ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে দু’জনের মুখ! প্রলয় জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে আপনাদের?’

রাধিকা কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল, ‘ভূ-উ-উ-ত!’

রুদ্র বলল, ‘কোথায়?’

কৃষ্ণকলি কাঁপা কাঁপা হাতে পিছনের জানলার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওই যে বারান্দার ওপাশে নীচের জমিতে দাঁড়িয়েছিল।’

কথাটা শুনেই তারা তিনজন গিয়ে দাঁড়াল জানলার সামনে। বাইরে চাঁদের আলোতে বারান্দার রেলিং-এর নীচের জমিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। রাজর্ষি আর রুদ্র এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে পিছনের বারান্দায় গিয়ে চারপাশ ভালো করে দেখল। না, কোনও কিছুই দেখতে পেল না তারা। বারান্দা থেকে তারা ফিরে এসে আবার যখন ওদের ঘরে ঢুকল তখন আতঙ্ক পুরোপুরি না কাটলেও কৃষ্ণকলি আর রাধিকা যেন কিছুটা ধাতস্থ হয়েছে বলে মনে হল রুদ্রদের। রুদ্র প্রশ্ন করল, ‘আপনারা কী দেখেছেন একটু খুলে বলুন তো?’

কৃষ্ণকলি বলল, ‘ফাগুয়া খাবার দিয়ে যাবার পর আমরা খাট থেকে নেমে টেবিলের দিকে যাচ্ছিলাম খেয়ে নেবার জন্য। রাধিকা জানলার বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ কাঁপতে শুরু করল। তারপর আমিও বাইরে তাকিয়ে তাকে দেখলাম। নীচের জমিতে দাঁড়িয়ে দু’হাতে বারান্দার রেলিং ধরে আমাদের দিকে তাকিয়েছিল সে!’

রাজর্ষি প্রশ্ন করল, ‘কেমন দেখতে তাকে?’

রাধিকা আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে বলে উঠল, ‘একজন সাহেব! তার সারা মুখ রক্তে মাখামাখি। পরনে একটা কোট, সেই সাদা কোটটাও রক্তে লাল হয়ে আছে! জ্বলন্ত চোখে সে তাকিয়েছিল জানলার দিকে। কী ভয়ঙ্কর সেই দৃষ্টি।’

রুদ্ররা অবাক হয়ে গেল তার কথা শুনে। একটু আমতা আমতা করে রুদ্র বলল, ‘আপনারা ঠিক দেখেছেন তো? অনেক সময় ছায়াটায়া দেখে দৃষ্টিবিভ্রম হয়।’

কৃষ্ণকলি মৃদু কাঁপাগলায় বলল, ‘একদম ঠিক দেখেছি। দু’জনের কি একসঙ্গে দৃষ্টিবিভ্রম হয়!’

রাজর্ষি মন্তব্য করল, ‘তাও তো বটে।’

রুদ্ররা এরপর তাকাল ফাগুয়ার দিকে। ফাগুয়া বলল, ‘আপনারা শহরের মানুষ। আমার কথা বিশ্বাস করেননি। সাহেব দেখা দিয়েছিল।’

তার কথার জবাবে কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না রুদ্ররা। ফাগুয়া এরপর বলল, ‘আমি এবার যাচ্ছি। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অনেকটা পথ যেতে হবে। রাত বাড়লে জানোয়ার বেরোয়।’—এ কথা বলে নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে চলে গেল সে।

ব্যাপারটা আসলে কী ঘটেছে তা বুঝে উঠতে পারল না রুদ্ররা। এ কীভাবে সম্ভব?

ফাগুয়া চলে যাবার পর ঘরের মধ্যে চুপচাপ দাঁড়িয়ে এই অদ্ভুত ব্যাপারটার কূল-কিনারা না করতে পারার পর রুদ্র একসময় কৃষ্ণকলিকে প্রশ্ন করল, ‘হিগিন্স সাহেবের গল্পটা কি ফাগুয়া আপনাদের বলেছিল?’

সে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, সন্ধ্যাবেলাতে বলেছিল। কিন্তু সেটা যে সত্যি আর এ বাংলোতে যে সত্যি ভূত দেখা যায়, সে কথা আমরা বিশ্বাস করিনি। ব্যাপারটা সত্যি জানলে কিছুতেই আমরা এখানে আসতাম না।’

তার কথা শুনে রুদ্রর মনে হল যে ফাগুয়ার বলা গল্পটাই হয়তো কোনওভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে মেয়ে দুটোর মনে। হ্যালুসিনেশন হয়েছে। কারণ, ভূতের ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে কিছুতেই মন চাইছে না রুদ্রর। বন্ধু দু’জনের দিকে তাকিয়ে রুদ্রর মনে হল তাদের মনের ভাবও একই।

আরও কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পর রুদ্র কয়েক পা এগিয়ে জানলাটা ভালো করে বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘নিন, এবার খাওয়া সেরে শুয়ে পড়ুন।’

কথাটা শুনে রাধিকা বলে উঠল, ‘আর আপনারা?’

রাজর্ষি রাধিকার উদ্দেশে বলল, ‘আমরাও এবার আমাদের ঘরে গিয়ে খাওয়া সেরে শুয়ে পড়ি। ভোর, পাঁচটাতে উঠতে হবে। গাড়ি আসবে। পালামৌতে জঙ্গল সাফারিতে যাব।’

কৃষ্ণকলি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘না, না, আপনারা যাবেন না। সে যদি আবার আসে তখন কী হবে? দরজা-জানলা বন্ধ করে তো আর ভূতকে আটকানো যাবে না!’

রাজর্ষি তাকাল কৃষ্ণকলির দিকে।

কৃষ্ণকলির কথা শুনে রুদ্র বলল, ‘তা কী করে সম্ভব? এ ভাবে রাত কাটানো যায় নাকি?’

রাধিকা বলে উঠল, ‘একটা রাতের তো ব্যাপার। গল্প করতে করতেই সময় কেটে যাবে। আপনারা না থাকলে আমরা আতঙ্কে মরেই যাব। তেমন হলে আমরা আপনাদের ঘরে যাচ্ছি।’

‘এদের নিয়ে মহামুশকিলে পড়া গেল তো!’—এ কথাটা মনে মনে বলে রুদ্র তাকাল তার দুই বন্ধুর দিকে। রাজর্ষি একটু ইতস্তত করে রুদ্রকে বলল, ‘ওনারা যখন ভয় পাচ্ছেন তখন আমিই নয় এ ঘরে ওনাদের সঙ্গে গল্প করে কাটাই। এমনিতেই আমার নতুন জায়গাতে ঘুম আসতে চায় না।’

তার কথা শুনে প্রলয় তাকে বলল, ‘তুই যদি থাকিস তবে আমিও নয় তোদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে রাত কাটিয়ে দেব।’ প্রলয় আর রাজর্ষি যে মেয়ে দুটোর আকর্ষণে রাত জাগতে চাইছে তা রুদ্রর বুঝতে অসুবিধা হল না। তবে রুদ্রর রাত জাগার ইচ্ছা নেই। পাঁচ পেগ মদ খাওয়া হয়ে গিয়েছে তার। এবার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। খাওয়া সেরে যত তাড়তাড়ি শুয়ে পড়া যায় ততই ভালো। রুদ্র তার বন্ধুদের উদ্দেশে বলল, ‘তবে তোরা দু’জন থাক। খাওয়া সেরে এখানে চলে আয়।’

কৃষ্ণকলি সঙ্গে সঙ্গে রাজর্ষিকে বলল, ‘আপনাদের খাবার এখানে নিয়ে আসুন না। গল্প করতে করতে একসঙ্গে খাওয়া যাবে।’

রাজর্ষি রুদ্রর সঙ্গে নিজেদের ঘরে ফিরে এল তার আর প্রলয়ের খাবার পাশের ঘরে নিয়ে যাবার জন্য। রুদ্র তাকে বলল, ‘তোরা পারিসও বটে!’

রাজর্ষি বলল, ‘তোকে বললাম না, এ নেশা বড় নেশা। তুই শালা খাওয়া সেরে এবার শুয়ে পড়।’

রুদ্র বলল, ‘কাল ভোর পাঁচটাতে বেরোতে হবে খেয়াল থাকে যেন।’

রাজর্ষি তাদের খাবার নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরোবার কিছুক্ষণের মধ্যেই খাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে পড়ল রুদ্র। অস্পষ্ট কথাবার্তার শব্দ ভেসে আসছে পাশের ঘর থেকে। গল্পে মেতেছে তারা চারজন। সেই অস্পষ্ট শব্দ শুনতে শুনতে রুদ্র ঘুমিয়ে পড়ল।

ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিল রুদ্র। সেই শব্দতেই ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ ঘুম ভাঙল তার। বাইরের আকাশে তখন শুকতারা মুছে গিয়ে অন্ধকার হালকা হতে শুরু করেছে। যদিও সূর্যোদয় তখনও হয়নি। রাজর্ষি আর প্রলয় ঘরে ফেরেনি। নিশ্চয়ই তারা এখনই চলে আসবে। এ কথা ভেবে রুদ্র বাইরে বেরোবার জন্য নিজের প্রস্তুতি শুরু করল। দাঁত মেজে, বাথরুমের কাজ সেরে জামাকাপড় পরতে মিনিট পনেরো সময় লাগল। বাইরের আকাশে এবার আলো ফুটতে শুরু করেছে। দু-চারটে পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু প্রলয় আর রাজর্ষি তখনও ঘরে ঢোকেনি দেখে তাদের ডাকার জন্য বেরতে যাচ্ছিল রুদ্র। ঠিক সেই সময় তারা দু’জন ঘরে ঢুকল। তাদের দেখে রুদ্র বলল, ‘নে তাড়াতাড়ি তৈরি হ। পাঁচটা বাজতে চলল।’

কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে রাজর্ষি বলল, ‘তুই বরং ঘুরে আয়। আমরা বাংলোতেই থাকি।’

রুদ্র বলল, ‘তার মানে?’

প্রলয় বলল, ‘মানে হল, আমরা জঙ্গল সাফারিতে যাব না। ওদের সঙ্গে থাকব।’

রুদ্র বলল, ‘কী ফাজলামি করছিস তোরা? এত পয়সা খরচ করে বেড়াতে এসে ঘরে বসে থাকবি? তাছাড়া ওদের তো আজ বাংলো ছেড়ে দেবার কথা?’

প্রলয় বলল, ‘না, ওরা এখানেই থাকবে আজকে রাতেও। আমরাই ওদের থাকতে বলেছি। কোথায় বা যাবে ওরা? কোথাও ঘর পাবে না।’—এই বলে সে হাসল।

রুদ্র এবার ব্যাপারটা কিছুটা অনুমান করতে পেরে বলল, ‘তোরা কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি শুরু করেছিস! কোথা থেকে কী হয়ে যাবে শেষে বিপদে পড়বি।’

রাজর্ষি তার কথায় আমল না দিয়ে হেসে বলল, ‘তুই কিছু চিন্তা করিস না। ভালো করে সারাদিন ঘুরে বেড়া। তাছাড়া দুটো ঘরই আজ সারাদিন আমাদের দরকার। একটা ঘরে তো আর দু-জোড়া নারী পুরুষ মিলে…।’

রাজর্ষির অসম্পূর্ণ বাক্যটা বুঝতে রুদ্রর অসুবিধা হল না। বিস্মিতভাবে রুদ্র বলে উঠল, ‘তবে তোরা সত্যিই যাবি না?’ প্রলয় বলল, ‘না, যাব না। ওরাও রাজি। জীবন তো সবাই উপভোগ করতে চায়। আমরা যাব না।’—এ কথা বলে রুদ্রকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল তারা।

রুদ্র খাটের উপর বসে পড়ল। এত দিনের চেনা দুই বন্ধুকে হঠাৎই যেন খুব অচেনা মনে হল তার। মনটা কেমন যেন তেতো হয়ে গেল রুদ্রর। বাইরে এবার ভালো করে আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাখির ডাকও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সেদিকে জানলা দিয়ে তাকিয়ে রুদ্রর একসময় মনে হল, না, এই সুন্দর সকালে এভাবে মন খারাপ করার কোনও মানেই হয় না। রাজর্ষি আর প্রলয় তাদের যা ইচ্ছা করুক, সে এখানে ঘুরতে এসেছে, ঘুরে বেড়াবে তার নিজের মতো। ঠিক পাঁচটাতে ফাগুয়া চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। রুদ্রদের ভোরবেলা বেরবার কথা বলে সে আগেই চলে এসেছে। কোনও মতে চা শেষ করে ক্যামেরা আর কিট ব্যাগ নিয়ে ঘরের বাইরে বেরোল সে। পাশের ঘরের দরজা খোলা। মেয়েগুলির সঙ্গে রাজর্ষিদের কথার শব্দ ভেসে আসছে। সেদিকে একবারও না তাকিয়ে ঘরটা দ্রুত অতিক্রম করে বারান্দা থেকে নীচে নেমে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রুদ্র রওনা হল পিচ রাস্তার দিকে। কথামতোই রুদ্রদের জন্য জিপটা অপেক্ষা করছিল সেখানে। অন্য দু’জন যাবে না, এ কথাটা ড্রাইভারকে জানিয়ে দিয়ে রুদ্র একাই রওনা হয়ে গেল জঙ্গল সাফারির জন্য।

সারাটা দিন অদ্ভুত সুন্দরভাবে কেটে গেল রুদ্রর। প্রথমে পালামৌয়ের জঙ্গলে জিপ সাফারি। বেতলা টাইগার রিজার্ভের একটা অংশ হল পালামৌয়ের জঙ্গল। বাঘ দেখতে না পেলেও প্রচুর হরিণ, বন্য বরা আর পাখি দেখল সে। তাছাড়া জঙ্গলে বেড়াবার আলাদা রোমাঞ্চ তো আছেই। জঙ্গল আর কোয়েল নদী দেখার পর প্রাচীন পালামৌ দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। এসব দেখতে দেখতেই দুপুর গড়িয়ে গেল। তারপর দুপুরের খাওয়া সেরে ডালটনগঞ্জ স্টেশনে ট্রেন ধরতে যাবার কথা। ড্রাইভার জানাল সে এখন আর ডালটনগঞ্জ ফিরবে না। রাতটা সে গাড়িতে কাটিয়ে পরদিন ভোরে সকলকে নিয়ে একসঙ্গে ফিরবে। গাড়ি থেকে নেমে রুদ্র এগোল বন-বাংলোর দিকে। রুদ্র যখন বন-বাংলোর সামনে পৌঁছল ঠিক তখনই অন্ধকার নামতে শুরু করল।

বারান্দাতে উঠে এল রুদ্র। মেয়েগুলির ঘরের দরজা বন্ধ হলেও তার ঘরের দরজা খোলা। সে ঘরে প্রবেশ করে রুদ্র দেখল তার ঘরের চাদর ঠিক করছে ফাগুয়া। অর্থাৎ রুদ্রর অবর্তমানে এ ঘরে কেউ বা কারা শুয়েছিল। টেবিলের উপর এরপর একটা চুলের ক্লিপও নজরে পড়ল। নিশ্চয়ই সেটা রাধিকা বা কৃষ্ণকলির হবে। রুদ্র জানতে চাইল, ‘বাবুরা বাইরে বেরিয়েছিলেন? ম্যাডামরা কি চলে গেছেন?

ফাগুয়া জবাব দিল, ‘না, বেরোননি, তারা ঘরেই ছিলেন। ম্যাডামরাও আছেন।’

ফাগুয়া চলে যাবার পর ফ্রেশ হয়ে বাতিটা জ্বালিয়ে খাটে বসল রুদ্র। এবার দুই বন্ধুর প্রতি একটা তীব্র অভিমান জমা হতে শুরু করল রুদ্রর মনে। মেয়ে দুটোর প্রতি রাজর্ষি আর প্রলয় এত আসক্ত হয়ে পড়ল যে, তার কথা তাদের খেয়ালই পড়ছে না!

বেশ কিছুক্ষণ একলা বসে থাকার পর ওয়ার্ডরোব খুলে মদের বোতল বার করল রুদ্র মদ্যপান শুরু করবে বলে। ঠিক সেই সময় ঘরে ঢুকল প্রলয় আর রাজর্ষি।

প্রলয় তাকে জিগ্যেস করল, ‘কী রে কখন ফিরলি?’

অভিমানী কণ্ঠে রুদ্র জবাব দিল, ‘তা জেনে তোরা কী করবি? তোরা যা করছিস সেটা কর।’

রাজর্ষি বলল, ‘আহা রাগ করছিস কেন? সারাদিন কেমন বেড়ালি বল?

রুদ্র বলল, ‘বললাম তো ওসব জেনে তোদের দরকার কী? এই তোদের সঙ্গে আমার শেষ বেড়াতে আসা। তোদের নিশ্চয় ভালো কেটেছে?

প্রলয় বলল, ‘হ্যাঁ, দারুণ। সত্যি কথা বলতে কী, সম্ভব হলে আরও ক’দিন এখানে থেকে যেতাম।’ এই বলে সে এগিয়ে এসে হাত রাখল বন্ধুর কাঁধে।

রুদ্র এক ঝটকায় প্রলয়ের হাতটা তার কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলতে যাচ্ছিল, ‘ও ঘরে যা। দরকার হলে বল আমি এ ঘরের বাইরে চলে যাচ্ছি!’ কিন্তু ঠিক সেই সময় সে দেখতে পেল দরজার সামনে রাধিকা আর কৃষ্ণকলি এসে দাঁড়িয়েছে। বাইরের লোকের সামনে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করা উচিত নয় বলে কথাগুলি বলতে গিয়েও থেমে গেল রুদ্র।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রাধিকা বলল, ‘আসুন না, চাঁদ ওঠা পর্যন্ত আমরা সবাই আমাদের ঘরে বসে গল্প করি…’

কথাটা শুনে প্রলয় রুদ্রকে বলল, ‘হ্যাঁ, রুদ্র ওঘরে চ। সবাই মিলে ওঘরে আড্ডা দিই।’

রুদ্র জবাব দিল, ‘না, তোরা যা। আমি এ ঘরেই থাকি।’

প্রলয় বলল, ‘চল রুদ্র। আর রাগ করিস না।’

রুদ্র বলল, ‘বলছি তো ভলো লাগছে না। তাছাড়া আমি এখন পান করব।’

রাধিকা বলল, ‘সেটা আপনি আমাদের ঘরে গিয়েও করতে পারেন। কোনও আপত্তি নেই।’

রুদ্র কথার কোনও জবাব দিল না।

কৃষ্ণকলি এবার বলল, ‘রুদ্রবাবু প্লিজ আসুন না। নইলে বুঝব আপনি আমাদের অপছন্দ করছেন।’ ব্যাপারটা ঠিক হলেও মেয়েটার কথা শুনে অস্বস্তিতে পড়ে গেল রুদ্র। তাদের মুখের ওপর তো বলা যায় না, ‘ঠিক বলছেন।’

রাজর্ষি রুদ্রর হাত থেকে মদের বোতল আর গ্লাসটা টেনে নিয়ে বলল, ‘আর কোনও কথা বলব না। চল ওঘরে গিয়ে খাবি।’ এই বলে সে দরজার বাইরে পা বাড়াল। অগত্যা অনিচ্ছাকৃত ভাবেই রুদ্র সবার পিছন পিছন গিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকল। কৃষ্ণকলি রুদ্রর উদ্দেশে বলল, ‘কোনও সংকোচ করবেন না। আমাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে আপনি মদ্যপান চালিয়ে যান।’

রাজর্ষি মদের বোতল আর গ্লাসটা সে ঘরের টেবিলে রাখল। তারপর খাটে বসল। অন্যরাও খাটে বসল। আর রুদ্র গিয়ে বসল টেবিল সংলগ্ন চেয়ারে। জলের বোতলও রাখা ছিল টেবিলে। পেগ বানিয়ে গ্লাসে চুমুক দিল রুদ্র।

তার পেগটা শেষ হবার পর রাজর্ষি তাকে বলল, ‘এবার নিশ্চয়ই তোর মাথা একটু ঠান্ডা হয়েছে? সারাদিন কী দেখলি বল?’

রুদ্র জবাব দিল ‘পালামৌ ফরেস্ট, তারপর পালামৌ ফোর্ট আর ফেরার পথে ডালটনগঞ্জ।

কৃষ্ণকলি প্রশ্ন করল, ‘আপনি কোয়েল নদী দেখেছেন?’

রুদ্র বলল, ‘হ্যাঁ, দেখেছি। বেশ জলও আছে নদীতে।’

রাজর্ষি রুদ্রকে বলল, ‘আমরাও কোয়েল নদী দেখতে যাব।’

রুদ্র গ্লাসে মদ ঢেলে দ্বিতীয় পেগটা বানিয়ে নিয়ে বলল, ‘কাল ভোরে কিন্তু আমাদের বেরোবার কথা। সকাল আটটাতে ডালটনগঞ্জ থেকে ফেরার ট্রেন। কীভাবে নদী দেখতে যাবি?’

রাধিকা বলল, ‘কাল নয় আজ।’

রুদ্র বলল, ‘তার মানে?’

প্রলয় জানলার বাইরে বন-বাংলোর পিছনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে কিছুটা এগোলেই একটা ছোট নদী আছে। আর তার পাড় বরাবর কিছুটা এগোলেই কোয়েল নদী। কাল এখানে আসার পর ফাগুয়া বলেছিল তোর মনে নেই। ভালো করে চাঁদ উঠলে আমরা সবাই সেখানে যাব।’

গ্লাসটা গলায় ঢেলে দিয়ে রুদ্র বিস্মিতভাবে বলল, ‘এত রাতে ওখানে যাবি?’

কৃষ্ণকলি বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, রাতেই যাব। চাঁদনি রাতে অপূর্ব লাগে কোয়েল নদী। দু’পাশে জঙ্গল আর তার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে কোয়েল নদী। চাঁদ এসে ধরা দেয় নদীর জলে।’

রুদ্র বলল, ‘কিন্তু অত রাতে সেখানে যাওয়া কি ঠিক হবে? যদি কোনও বন্য প্রাণী…।’

তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে রাজর্ষি বলল, ‘আমরা একসঙ্গে এতজন লোক। বন্যপ্রাণী কাছে ঘেঁষবে না। তাছাড়া ওই দেখ, ফাগুয়ার থেকে কয়েকটা লাঠি আনিয়ে রেখেছি।’—এই বলে সে ঘরের কোণায় রাখা গাছের কয়েকটা শুকনো শক্ত ডাল ইশারায় দেখাল রুদ্রকে।

প্রলয় বলল, ‘তুই আমাদের সঙ্গে যাবি তো রুদ্র?’

রুদ্র জবাব দিল, ‘না, আমি যাব না, তোরা ঘুরে আয়।’

তার কথা শুনে সবাই মনে হয় খুশিই হল। কারণ দু’জোড়া যুবক যুবতীর এই অভিসারে রুদ্র অডম্যান।

তবুও ভদ্রতার কারণেই হয়তো প্রলয় আবারও বলল, ‘কেন যাবি না? চল।’

রুদ্র পাশ কাটাবার জন্য বলল, ‘বললাম তো আমি যাব না। সারাদিন ঘুরে বেড়িয়ে খুব ক্লান্ত লাগছে। কাল সকালেই তো আবার ফেরার জন্য বেরিয়ে পড়তে হবে।’

কথাটা শুনে কৃষ্ণকলি বলল, ‘উনি যখন ক্লান্ত, তখন আর ওনাকে টেনে নিয়ে গিয়ে লাভ নেই। আমরা চারজনই ঘুরে আসব।’

এ কথার পর আর রুদ্রকে কেউ যাবার জন্য চাপাচাপি করল না। নিজেদের মধ্যে গল্প শুরু করল তারা চারজন। আর ঘরের কোণে বসে মদ্যপান করতে লাগল রুদ্র। ঘণ্টাখানেক বাদে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ ঘরের কোণ থেকে লাঠিগুলি তুলে নিয়ে ঘর ছেড়ে, বন-বাংলো ছেড়ে পিছনের জঙ্গল দিয়ে নদীর দিকে রওনা হয়ে গেল তারা চারজন। সে ঘরেই বসে রইল রুদ্র। সময় এগিয়ে চলল।

নিজের জায়গাতেই বসেছিল রুদ্র। ইতিমধ্যে আরও কয়েক পেগ হুইস্কি খেয়েছে সে। নেশাটা বেশ চড়েছে। একটা শব্দ শুনে মুখ তুলে তাকাল। ফাগুয়া ঘরে ঢুকেছে। রুদ্র তার দিকে তাকাতেই সে বলল ‘আটটা বাজে। সাহেবরা কখন ফিরবে জানেন? আপনাদের খাবার দিয়ে আমাকে ফিরতে হবে।’

রুদ্র জবাব দিল, ‘না, আমি জানি না।’

ফাগুয়া তার জবাব শুনে আর কোনও কথা না বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু ফাগুয়া চলে গেলেও সে একটা শঙ্কার বীজ বুনে দিয়ে গেল রুদ্রর মনে। রাতের বেলাতে জঙ্গল ভেঙে নদী দেখতে যাওয়া কি তাদের ঠিক হল? কোনওরকম বিপদ-আপদ যদি ঘটে? উৎকণ্ঠা তৈরি হতে শুরু করল রুদ্রর মনে।

ফাগুয়া চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘর থেকে বেরিয়ে ঈষৎ টলোমলো পায়ে রুদ্র ঘর দুটোকে বেড় দিয়ে উপস্থিত হল বারান্দার পিছনের অংশে। আজ মনে হয় পূর্ণিমা। ফটফটে আলো ছড়িয়ে পড়েছে সামনের এক ফালি ফাঁকা জমিতে আর তাকে ঘিরে থাকা গাছগুলোর মাথায়। একটা কালো পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে গাছগুলোর মাথার ওপর। বাদুড়ও হতে পারে। ওই গাছের প্রাচীরের আড়ালেই তো নাকি সেই নদীটা। যেটা গিয়ে মিশেছে কোয়েল নদীর সঙ্গে। বারান্দার কাঠের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে উৎকণ্ঠিতভাবে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে রাজর্ষিদের ফেরার প্রতীক্ষা করতে লাগল সে। সময় এগিয়ে চলল।

‘রুদ্রবাবু?’—নারী কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠে রুদ্র পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেল তার কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে আছে কৃষ্ণকলি আর রাধিকা! রুদ্র তো সামনের দিকেই তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তবে কি ঘুরপথে বন-বাংলোতে ফিরে এসেছে সবাই? মেয়ে দু’জন সদ্য ফিরেছে বলেই মনে হয়, এখনও তাদের দু’জনেরই হাতে গাছের ডাল বা লাঠি ধরা।

রুদ্র তাদের প্রশ্ন করল, ‘আপনারা কখন ফিরলেন? রাজর্ষি আর প্রলয় ঘরে ঢুকেছে?’

কৃষ্ণকলি জবাব দিল, ‘আমরা আপনাকে ডাকতে এলাম। তারা দু’জন এখনও নদীর পাড়েই আছে। আপনাকে তারা সেখানে যেতে বলেছে। একটা বিশেষ জিনিস আপনাকে ওরা দেখাবে।’

রুদ্র বেশ অবাক হয়ে গেল তাদের কথা শুনে। বিস্মিতভাবে সে বলল ‘আমাকে নদীর পাড়ে ডেকে পাঠিয়েছে! কী জিনিস দেখাবে?’

রাধিকা হেসে বলল, ‘সেটা ওখানে গেলেই জানতে পারবেন। ওই তো ওই জঙ্গলটার পিছনেই নদীর পাড়। মিনিট পাঁচেক সময় লাগবে যেতে। তারপর সবাই আবার একসঙ্গে ফিরে আসব।’

রুদ্র চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। রাধিকা আর কৃষ্ণকলি এগিয়ে এল রুদ্রর কাছে। রাধিকা রুদ্রর সামনে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, ‘প্লিজ চলুন না। ওরা তো অপেক্ষা করছে।’

চাঁদের আলো এসে পড়েছে রাধিকার শরীরে। কয়েকমুহূর্তের জন্য রুদ্রর চোখ আটকে গেল সেদিকে। আর সেটা বুঝতে পেরেই রাধিকা মনে হয় হাসল। এর পরক্ষণেই অবশ্য নিজেকে সামলে নিয়ে রুদ্র রাধিকার শরীর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে সামনের জঙ্গলের দিকে তাকাল। ঠিক সেই সময় রেলিং-এর ঠিক নীচে একটা শব্দ হল। সেটা শুনে রুদ্ররা নীচে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। রেলিং-এর নীচে কয়েক হাত তফাতে এসে দাঁড়িয়েছে একজন। এক সাহেব। তার পরনে কোট, মাথায় হ্যাট। সারা শরীর বেয়ে তার রক্ত ঝরছে! মুখ, কোট সব রক্তে মাখামাখি। জ্বলন্ত চোখে সে চেয়ে আছে বারান্দার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের দিকে। কী হিংস্র দৃষ্টি! মুহূর্তের মধ্যে যেন নেশার ঘোর কেটে গেল রুদ্রর। আর এর পরেই একসঙ্গে আতঙ্কিত চিৎকার করে উঠল কৃষ্ণকলি আর রাধিকা। একটা চিৎকার বেরিয়ে এল হিগিন্স সাহেবের কণ্ঠ থেকেও। চিৎকার করে সেই প্রেতাত্মা ছুটতে শুরু করল নীচের জমি দিয়ে বাড়ির সামনের অংশের দিকে যাওয়ার জন্য। আর তাই দেখে হঠাৎই রুদ্রর মনে হল ‘সে যদি হিগিন্স সাহেবের প্রেতাত্মা হয়ে থাকে তবে ওভাবে পালাচ্ছে কেন? আর কেনই বা সে পালাবে?’

নেশার ঘোর কেটে গেছে রুদ্রর। তার মনে এবার অন্য একটা প্রশ্নচিহ্ন উঁকি দিল। বারান্দার পিছনের অংশ থেকে ছুটে সে সামনের অংশে চলে এল। হিগিন্স সাহেবের ভূত তখন বাংলোর সামনের ফাঁকা জমিটা টপকে জঙ্গলের দিকে এগোচ্ছে, হয়তো বা জঙ্গল অতিক্রম করে বড় রাস্তাতে যাওয়ার জন্য। কে ও? সত্যি প্রেতাত্মা নাকি অন্য কেউ? শেষ দেখতে হবে ব্যাপারটার। এই ভেবে বারান্দা থেকে লাফিয়ে নেমে রুদ্রও ছুটল লোকটার পিছনে। আর তার পিছন পিছন লাঠি হাতে ছুটল কৃষ্ণকলি আর রাধিকাও। চিৎকার চেঁচামেচির শব্দে কিচেন ছেড়ে বাইরের বারান্দায় এসে ফাগুয়া ব্যাপারটা দেখতে পেল। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাটা অনুমান করে নিয়ে ফাগুয়াও বারান্দা থেকে লাফিয়ে নেমে পশ্চাদ্ধাবন করল তাদের।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে লোকটার পিছনে ছুটছে সবাই। রুদ্রর সঙ্গে ক্রমশই ব্যবধান কমে আসছে হিগিন্স সাহেবের প্রেতাত্মার। জঙ্গলের বাইরে বেরোবার ঠিক মুখটাতে পৌঁছে লোকটাকে প্রায় ধরে ফেলল রুদ্র। তার পিছন পিছন ছুটে আসছে মেয়ে দুটো। ফাগুয়াকে অবশ্য খেয়াল করেনি রুদ্র। রুদ্র তাকে ধরে ফেলবে বুঝতে পেরেই হয়তো শেষ একবার তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে পালাবার জন্য পিছনে ফিরে দাঁড়াল সেই প্রেতাত্মা। কিন্তু কাজটা সে করতে পারল না। রুদ্রর পিছন পিছন ছুটে আসা কৃষ্ণকলিদের দেখে সে যেন প্রচণ্ড আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটির ওপর পড়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তেই হুড়মুড় করে সেখানে এসে পড়ল রাধিকা আর কৃষ্ণকলি। চিৎকার করে তারা বলে উঠল, ‘মেরে ফেলতে হবে, মেরে ফেলতে হবে হিগিন্স সাহেবের ওই ভূতটাকে!’—একথা বলে তারা দু’জন হিংস্র চিৎকার করতে করতে লাঠি চালাতে লাগল ভূপতিত হিগিন্স সাহেবের দেহের ওপর। রুদ্র বুঝে উঠতে পারছে না তার কী করা উচিত। আর এরপরই সেখানে এসে উপস্থিত হল ফাগুয়া। সে কৃষ্ণকলি আর রাধিকার উদ্দেশে বলে উঠল ‘ওকে মারবেন না, মারবেন না। ও হল বিরজু। আমাদের সাজানো লোক। ভূত সেজে ট্যুরিস্টদের ভয় দেখায়।’

কিন্তু তার কথায় কর্ণপাত করল না মেয়ে দুটো। পাগলের মতো লাঠি চালাতে চালাতে তারা চিৎকার করে উঠল, ‘খুন করব। খুন করব ওকে।’

‘লোকটা এবার মরে যাবে। থামুন থামুন!’ বলে ফাগুয়া এরপর রাধিকার হাতের লাঠিটা ধরতে গেল। কিন্তু কাজটা সে করতে পারল না। সে রাধিকার হাতটা ধরতে যেতেই কৃষ্ণকলি প্রচণ্ড জোরে তার হাতের লাঠিটা চালিয়ে দিল ফাগুয়ার মাথায়। তার আঘাতে ফাগুয়া ছিটকে পড়ে স্থির হয়ে গেল। বোধহয় সেও জ্ঞান হারাল।

রুদ্র হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার কিছুটা তফাতে দু’পাশে পড়ে আছে হিগিন্স সাহেবের প্রেতাত্মা আর ফাগুয়া। আর রুদ্রর সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাধিকা আর কৃষ্ণকলি। চাঁদের আলোতে কেমন যেন জান্তব হিংস্রতা ফুটে উঠেছে তাদের মুখে। রাধিকা একবার তাকিয়ে নিল মাটিতে পড়ে থাকা দুটো দেহর দিকে। তারপর হাতের লাঠিটা একটু তুলে ধরে বলল, ‘যাক, এবার আর ওরা আমাদের বাধা দিতে পারবে না।’

কৃষ্ণকলি এবার রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চলো এবার। তোমার বন্ধুরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’

রুদ্র বলল, ‘এভাবে এ দু’জনকে ফেলে রেখে কোথায় যাব?’

রাধিকা এসে রুদ্রর একটা হাত চেপে ধরে বলল, ‘কোয়েল নদীতে। যেখানে রাজর্ষি আর প্রলয় রয়েছে।’

রুদ্র বলে উঠল, ‘না, আমি যাব না। এদের এভাবে মারাটা ঠিক হয়নি।’

কৃষ্ণকলি এগিয়ে এসে রুদ্রর অন্য হাতটা চেপে ধরে হিসহিস করে বলল, ‘যেতে তোমাকে হবেই। তোমার বন্ধুরা যে তোমাকে ডাকছে…।

দুটো কঠিন হাত চেপে বসেছে রুদ্রর দু-হাতের কব্জির ওপর। কী হিমশীতল সেই স্পর্শ। হাত দুটো তাকে তাদের সঙ্গে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে কোয়েল নদীর পথে।

রুদ্র শেষ একটা চেষ্টা করল, হাত দুটো ছাড়াবার জন্য। প্রচণ্ড একটা ঝটকায় হাত দুটো তাদের হাত থেকে খসিয়ে নিল সে। সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড আক্রোশে জ্বলে উঠল কৃষ্ণকলি আর রাধিকার চোখ। রুদ্রর প্রতি একরাশ ঘৃণা, আক্রোশ যেন ফুটে উঠল। কৃষ্ণকলির ঠোঁটের কোণে একটা বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, ‘তবে তোমাকে অন্যভাবে আমাদের সঙ্গী করি, যেমন আমাদের সঙ্গী হয়েছে তোমার বন্ধুরা।’

এই বলে সে তার হাতে ধরা মোটা লাঠিটা চালাল রুদ্রর মাথা লক্ষ করে। ব্যাপারটা অনুমান করে রুদ্র মাথাটা সরিয়ে নিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল ‘তোমরা কি পাগল হয়ে গিয়েছ!’

এক চুলের জন্য লাঠির মারাত্মক আঘাত থেকে নিজের মাথাকে বাঁচাল সে।

তার কথার কোনও জবাব দিল না তারা। রুদ্রর দু’পাশ থেকে কৃষ্ণকলি আর রাধিকা তাদের লাঠি দুটো ধীরে ধীরে তুলতে শুরু করল, মোক্ষম আঘাত হানার জন্য।

আঘাত হানতে যাওয়ার শেষ মুহূর্তে কয়েকটা জোরালো টর্চের আলো এসে পড়ল তাদের ওপর। রাস্তার দিক থেকে কয়েকজন লোক ঢুকছে। টর্চের আলো তাদেরই। থেমে গেল রাধিকা-কৃষ্ণকলি। আলোগুলো ক্রমশ এগিয়ে আসছে। শেষবারের জন্য একবার তারা তাকাল রুদ্রর দিকে। তাদের চোখে রুদ্রর প্রতি তীব্র ঘৃণা আর হিংস্রতা ফুটে উঠল শেষবারের জন্য। সে দৃষ্টি যেন কাঁপন ধরিয়ে দিল রুদ্রর বুকে। আর তারপরই রাধিকা আর কৃষ্ণকলি অদৃশ্য হয়ে গেল বন-বাংলোর দিকে। হয়তো তারা রওনা হল বাংলোর পিছনের রাস্তা দিয়ে নদীর পাড় বরাবর কোয়েল নদীর দিকে। আর এরপরই টর্চের আলো এসে ঘিরে ধরল রুদ্রকে।

পুলিশ। তাদের সঙ্গে রুদ্রদের জিপের ড্রাইভারও আছে। নৈশ প্রহরাতে বেরিয়েছিল পুলিশের পেট্রলিং কার। চিৎকারের শব্দ শুনে গাড়ি থেকে নেমে ছুটে এসেছে তারা। একজন পুলিশ অফিসার আর চারজন কনস্টেবল।

অফিসার হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রকে প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে?’

প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠে রুদ্র সংক্ষেপে ব্যক্ত করল ঘটনাটা।

অফিসার শুনে বিস্মিত হয়ে দু’জন পুলিশকর্মীকে নির্দেশ দিল বাংলোর দিকে যেতে এবং নদীর পাড় থেকে মেয়ে দু’জন আর রাজর্ষিদের ডেকে আনতে। নির্দেশ পেয়ে সেদিকে এগোল দু’জন কনস্টেবল।

আর এরপরই একজন পুলিশকর্মী মাটিতে পড়ে থাকা হিগিন্স সাহেবের প্রেতাত্মার মুখের ওপর আলো ফেলে বলে উঠল, ‘আরে! এ যে আমাদের বিরজু ডোম।’

অফিসারও বিস্মিতভাবে বলে উঠল ‘হ্যাঁ, তাই তো। কিন্তু ও এ পোশাকে কেন?’

আঘাত সামলে ফাগুয়া তখন উঠে দাঁড়িয়েছে। যন্ত্রণা মিশ্রিত গলায় সে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ সার ও বিরজু। হিগিন্স সাহেবের ভূত সেজে ট্যুরিস্টদের দেখা দেয়। ট্যুরিস্ট টানার জন্য আমরা ওকে দিয়ে হিগিন্স সাহেবের ভূত দেখাই।’

অফিসারদের সঙ্গী দু’জন পুলিশকর্মী এবার লেগে পড়ল বিরজু বলে লোকটার জ্ঞান ফেরাবার কাজে। রুদ্রদের ড্রাইভার ছুটে গিয়ে গাড়ি থেকে জল নিয়ে এল। আর অফিসার আরও একবার ফাগুয়ার থেকে জেনে নিলেন ঘটনাটা। ফাগুয়ার বয়ান মিলে গেল রুদ্রর বলা কথার সঙ্গে।

কিছুক্ষণের মধ্যে জলের ঝাপটাতে উঠে বসল বিরজু নামের লোকটা। অফিসার তাকে জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছিল?’

আতঙ্কিতভাবে চারপাশের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে বিরজু বলে উঠল, ‘ওরা বেঁচে উঠেছে সাহেব। আমাকে ওরা খুন করতে চেয়েছিল।’

অফিসার বললেন, ‘কারা তোমাকে খুন করতে চেয়েছিল?’

বিরজু বলে উঠল, ‘ওই যে গতকাল যে মেয়ে দুটোর লাশ নদী থেকে তুলে আপনার সঙ্গে গিয়ে মর্গে রেখে এসেছিলাম।’

কথাটা শুনে অফিসার বিরজুকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘কী যা তা বলছ? ক-গ্লাস মদ খেয়েছ আজ? এখনও নেশা কাটেনি?’

বিরজু বলে উঠল, ‘আমি সত্যি বলছি হুজুর। গতকাল আমি যখন ভূত সেজে এসেছিলাম তখন মেয়ে দুটো ঘরের মধ্যে থাকায় আমি ওদের চিনতে পারিনি।

আজ ওরা বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। আমি ওদের দেখেই চিনতে পেরে চিৎকার করে উঠলাম। ওরাও আমাকে দেখে চিনতে পেরে একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল। আর তারপর…।’

কথা শেষ না করে আতঙ্কিত বিরজু বোতল থেকে ঢকঢক করে জল খেল। রুদ্র এবার নিজেকে সামলে নিয়ে অফিসারকে বলল, ‘এই বিরজু কাদের কথা বলছে?’

পুলিশ অফিসার বললেন, ‘আপনি জানেন নিশ্চয়ই এই ফরেস্ট বাংলোর পিছনে একটা ছোট নদী আছে। সেটা গিয়ে মিশেছে কোয়েল নদীর সঙ্গে। গতকাল সেখান থেকে সকালবেলাতে আমরা দুটো মেয়ের লাশ উদ্ধার করেছি। মনে হয় ট্যুরিস্ট। তবে তখনও তাদের পরিচয় জানা যায়নি।

আসলে ও জায়গাটা খুব সুন্দর হলেও প্রচণ্ড চোরাস্রোত আছে। ভুল করে হাঁটু জলে নামলেই আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে। পাথরে বাড়ি খেতে খেতে জলে ডুবে মারা পড়বেন আপনি। লাশ অবশ্য বেশি দূরে যায় না। কিছুটা এগিয়ে বাঁকের মুখে পাথরের বোল্ডারের খাঁজে আটকে থাকে। মেয়ে দুটোর লাশও ওখান থেকেই পাওয়া গিয়েছে। ওদের কথাই বলছে বিরজু। কাল দুপুরে বডি দুটোর পোস্টমর্টেমও হয়ে গিয়েছে।’

কথাটা শুনে রুদ্র বলে উঠল, ‘তা কী করে সম্ভব? তাছাড়া ওরা তো কাল সন্ধ্যা থেকেই আমাদের সঙ্গে ছিল। ওদের নাম কৃষ্ণকলি আর রাধিকা।’

পুলিশ অফিসার রুদ্রর কথার কোনও জবাব দিলেন না। চুপ করে দাঁড়িয়ে তিনিও সম্ভবত মনে মনে ভাবতে লাগলেন বিরজুর কথাটা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য কিনা?

প্রায় আধঘণ্টা পরে যে দু’জন কনস্টেবল চারজনকে খুঁজতে গিয়েছিল তারা এসে জানাল, ‘বন-বাংলো বা কোয়েল নদীর কাছে তারা কোথাও তাদের কাউকে খুঁজে পায়নি।’

পুলিশ অফিসার প্রথমে সদ্য উঠে দাঁড়ানো বিরজুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কাল সকালে দশটার আগে তো মর্গ খুলবে না। নইলে এখনই গিয়ে দেখে আসতাম সেখানে লাশ দুটো আছে কিনা? যদি তোমার কথা মিথ্যে বলে ধরা পড়ে তবে এমন মার মারব যে আর কোনওদিন নেশা করে পুলিশকে মিথ্যা বলবে না।’

তার কথা শুনে বিরজু আবারও বলে উঠল, ‘আমি সত্যি বলছি হুজুর। আমি নিজের হাতে লাশ দুটো টেনে তুলেছি আর চিনতে পারব না।’

অফিসার এরপর রুদ্রকে বললেন, ‘আপনি এবার আমার সঙ্গে থানায় চলুন। রাতটা আপাতত আমার ওখানেই কাটান। এখানে থাকলে আবার কী ঘটবে কে জানে?’

রুদ্র বলল, ‘কিন্তু আমার বন্ধু রাজর্ষি আর প্রলয় কোথায় গেল?’

পুলিশ অফিসার বললেন, ‘আজ এত রাতে আর তাদের খোঁজ করা যাবে না। কাল ভোরেই তাঁদের খোঁজে লোক পাঠাব। হয়তো এখানেই কোথাও আছেন তারা। আপাতত আপনি থানায় চলুন।’

রুদ্র এরপর অফিসারের সঙ্গে রাস্তায় এসে চড়ে বসল পুলিশের গাড়িতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই থানায় এসে পৌঁছে গেল তারা। থানাতেই একটা ফাঁকা ঘরে রুদ্রর রাত্রিবাসের ব্যবস্থা হল। রাজর্ষি আর প্রলয়ের কথা ভেবে ভেবে প্রচণ্ড উৎকণ্ঠায় সারা রাত জেগে কাটাল রুদ্র। ভোরের আলো ফুটতেই অফিসার তার পুলিশকর্মীদের পাঠিয়ে দিলেন রাজর্ষি আর প্রলয়ের খোঁজে, আর সেই দু’জন মেয়ের খোঁজেও। যারা বন-বাংলোতে ছিল রুদ্রদের সঙ্গে।

থানার সেই ঘরটাতেই চুপচাপ বসেছিল রুদ্র। সকাল ন’টা নাগাদ সেই পুলিশ অফিসার প্রবেশ করলেন সে ঘরে। তার চোখেমুখে কেমন যেন একটা অদ্ভুত ভাব। এই সকালেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে রুদ্র প্রশ্ন করল ‘ওদের খোঁজ মিলেছে?’

অফিসার জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, ওই কোয়েল নদীতেই। কিন্তু এ কীভাবে সম্ভব?’

এ কথা বলার পর একটু থেমে তিনি বললেন, ‘আপনি একবার বাইরে আসুন।’

ঘর থেকে বেরোল রুদ্র। থানার সামনের ছোট চত্বরটার মাঝখানে গোল করে একটা জায়গা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কিছু পুলিশকর্মী। অফিসারের সঙ্গে রুদ্র গিয়ে উপস্থিত হল সে জায়গাতে। পুলিশকর্মীদের ঘেরা জায়গাটার মাঝখানে পরপর চারটে লাশ শোয়ানো আছে কাপড় ঢাকা দিয়ে। চারটে লাশই একই সঙ্গে তুলে আনা হয়েছে কোয়েল নদী থেকে। পুলিশ অফিসারের ইশারায় একজন পুলিশকর্মী প্রথমে দুটো লাশের ওপর থেকে কাপড় সরিয়ে নিল।

রুদ্র আর্তনাদ করে বলে উঠল, ‘এরাই আমার বন্ধু রাজর্ষি আর প্রলয়। কীভাবে এ ঘটনা ঘটল?’

অফিসার বললেন, ‘জলে ডুবে। সম্ভবত কাল রাতের ঘটনা। টাটকা লাশ। পচন ধরেনি এখনও।’

এ কথা বলার পর পুলিশ অফিসারও যেন একটু কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘দেখুন তো অন্য দু’জনকে চিনতে পারেন কিনা?’

অন্য দুটো লাশের ওপর থেকে কাপড় সরে যেতেই রুদ্র দেখতে পেল দুটো নগ্ন নারীদেহ। ফুলে ওঠা দু-তিনদিনের পুরোনো দুটো লাশ। তাদের বুক থেকে পেট পর্যন্ত চেরা পোস্টমর্টেমের দাগ।

দিনের আলোতেও মুহূর্তের জন্য রুদ্রর চোখে ভেসে উঠল গত রাতের সেই দৃশ্য! তার দুটো হাত দু’পাশ থেকে শক্ত করে ধরে তার বন্ধুদের কাছে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে কৃষ্ণকলি আর রাধিকা। নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠেছে তাদের ঠোঁটে। লোকজন এসে না পড়লে এখন রুদ্রর লাশটাও শোয়ানো থাকত রাজর্ষি আর প্রলয়ের পাশে।

পুলিশ অফিসার আবারও জানতে চাইলেন, ‘মেয়ে দুটোকে চিনতে পারছেন?’

থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে সংজ্ঞা হারাবার আগে রুদ্র জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, ওরাই। কৃষ্ণকলি আর রাধিকা।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *