2 of 3

হাতে খড়ি

হাতে খড়ি

পুরনো গড়িয়াহাট বাজারের ভিতরে যেখানে আলুর আড়ত ছিল তারই একেবারে পিছনদিকে ছিল শ্যামাদাসীর ঠেক। ঠেক মানে একটা বে-আইনি চুল্লুর দোকান। এ দোকানের কোনও দরজাকপাট ছিল না।

সারা দিনরাতই খোলা। সারা দিনরাতই জমজমাট। গড়িয়াহাট মোড়ের এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে চারপাশে দিনরাতে যত মাতাল দেখা যেত তার আধাআধি এই ঠেক থেকে বেরুত।

গল্পের মধ্যে যাওয়ার আগে শ্যামাদাসী ও তার চুল্লুর একটু বিবরণ দেওয়া প্রয়োজন।

এ প্রায় তিরিশ বছর আগেকার কথা। শ্যামাদাসীর বয়েস তখন পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন হবে। শক্ত পাকাটে চেহারা। গায়ের রং কালো কুচকুচে, সাদা ঝকঝকে দাঁত। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার এক গ্রাম থেকে সবজি বেচতে এসে সে কী করে চুল্লুর ঠেকওয়ালি হয়েছিল তার ইতিহাস উদ্ধার করা আর মহেঞ্জোদারোর শিলালিপি পাঠ করা প্রায় একই রকম কঠিন।

গাছকোমর করে কালো ফিতে-পাড় সাদা শাড়ি পড়ত শ্যামাদাসী, সম্ভবত সে ছিল বালবিধবা। দুর্দান্ত পরাক্রম ছিল তার, তার আদেশে চোরে-পুলিশে এক গেলাসে চুল্লু খেত।

চুল্লু নামে যে কুটির-শিল্পজাত বঙ্গীয় পানীয় নানা জায়গায় বিক্রি হয় সেটা একেক ঠেকে একেক রকম। কোথাও সেটা নেহাত দিশি চোলাই, সাইকেলের টিউবে বা ফুটবলের ব্লাডারে কোনও ঘাঁটি থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।

কিন্তু শ্যামাদাসীর ঠেকের চুল্লুর জাত ছিল আলাদা। তার যেমন তেজ, তেমনি ঝঝ। বাইরে থেকে আসত না, শ্যামাদাসীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তার ঠেকে সরাসরি তৈরি হত সেটা। মাতালদের মুখে মুখে তার নামকরণ হয়েছিল শ্যামা চুল্ল। দু গেলাস খাওয়ার পরে জিব জড়িয়ে যেত। আলজিব থির থির করে কঁপত, মাতালেরা আর শ্যামা চুল্লু বলতে পারত না, বলত ছেমাউল্লু।

শ্যামা চুল্লু প্রস্তুত প্রণালী ছিল যথেষ্ট সহজ। এক বালতি কর্পোরেশনের জল, এক টিন মেথিলেটেড স্পিরিট আর কয়েক কেজি কলিচুন। সঙ্গে সম্ভবত নিশাদল বা ওই জাতীয় রাসায়নিক দ্রব্য। প্রতি গেলাসের দাম ছিল আট আনা। সাধারণ গেলাস নয়, আজকাল আর সেরকম পেল্লায় সাইজের মহাভারতীয় কাঁচের গেলাস দেখতে পাওয়া যায় না। মোটা কাঁচের ভারি ওজনের রীতিমতো তিনপোয়া আয়তনের সেই গেলাস শুধুমাত্র প্রাপ্ত বয়স্কেরাই এক হাতে ধরতে পারত। শিশু বালক বা দুর্বল নারী-পুরুষের পক্ষে সে গেলাস দু-হাতে না ধরে উপায় নেই।

এই রকম একটা গেলাসে একটু কেমিক্যাল, একভাগ জল, একভাগ স্পিরিট আর একভাগ চুন–সব একসঙ্গে মেলালে প্রথমে ধোঁয়া বেরোবে, ফিকে নীল রঙের ঝাঝালো ধোঁয়া। তারপরে প্রচুর বুদবুদ এবং সেই সঙ্গে ফেনা আর ফেনা।

বেকুবের ঢালা বিয়ারের ফেনা যেমন কখনও কখনও গেলাস উপচিয়ে পড়ে, এ ফেনাও সেই রকম উপচিয়ে পড়ত, তবে কখনও কখনও নয়, সর্বদাই।

নীল ধোঁয়া মিলিয়ে যাওয়ার পরে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে তেড়ে তেড়ে উঠে আসত বুদবুদ আর ফেনা। গেলাস উপচিয়ে শ্যামাদাসীর কাঠের পাটাতনের ওপরে হ্যাঁক হ্যাঁক করে পড়ত সেই গলিত বিষাক্ত তরল। সেই পাটাতনের সর্বত্র চাকা চাকা পোড়া দাগে ভরে গিয়েছিল।

প্রতি গেলাস চুল্লু আলাদাভাবে তৈরি করা হত। তারপরে লোহার জালের ছাকনি দিয়ে অন্য একটা গেলাসে ঘঁকা হত। তখন কাদা, ফেনা এসব বাদ দিয়ে প্রায় অর্ধেক গেলাস হত সেই পানীয়। যার দাম ছিল আট আনা। ভুলে গেলে চলবে না তখন এক প্যাকেট চারমিনার সিগারেটের দাম ছিল পুরনো সাত পয়সা, একসঙ্গে বড় দোকান থেকে পাঁচ প্যাকেট নিলে আট আনা।

সন্ধ্যার দিকে যখন চুল্লুর গ্রাহকদের খুব ভিড় বেড়ে যেত, ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে যেত, তখন আর ছাকনি দিয়ে হেঁকে নেবার অবসর হত না। তখন গেলাসে গেলাসে সেই জ্বলন্ত পানীয় তুলে দেওয়া হত গ্রাহকদের হাতে, গ্রাহকদের নিজ দায়িত্বে গেলাসের উপরিভাগের ফেনার অংশ এবং নীচে থিতিয়ে পড়া চুনটুকু ফেলে অত্যন্ত কৌশলে মধ্যভাগের পানীয়টুকু গলাধঃকরণ করতে হত।

তিরিশ বছর। ঠিক তিন দশক আগের গল্প এটা।

বড়দিন।

২৫ ডিসেম্বর।

দুই বন্ধু জয়দেব আর মহিমাময় পার্ক স্ট্রিট, চৌরঙ্গি ইত্যাদি নানা অঞ্চলে ঘুরেফিরে রাত প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ গড়িয়াহাটের মোড়ে এসে পৌঁছাল।

দুই বন্ধুরই তখন অল্প বয়েস, বিশের কোঠার নীচের দিকে। যার যেটুকু লেখাপড়ার ব্যাপার ছিল, বেশ কিছুদিন হল সেসব চুকিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন চলছে দুঃসহ বেকারত্বের জীবন।

কিন্তু ঠিক নির্ভেজাল বেকারত্ব নয়।

মহিমাময় ভবানীপুরে গাঁজা পার্কের খুব কাছেই একটা আফিং, ভাং এবং গাঁজার দোকানে প্রতিদিন রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত আবগারির খাতা লেখে।

খুব কঠিন কাজ।

তখন গাঁজা ছিল দু রকমের–গাঁজা আর চরস। সেই সঙ্গে আরও বিক্রি হত ভাং এবং আফিং।

 চার রকম মাদকের চারটে রেজিস্টার ছিল। প্রত্যেক খাতায় দৈনিকের কী স্টক, কতটা বিক্রি, দিনের শেষে কত পরিমাণ কী জিনিস রইল। খুব ঝামেলার হিসেব, সামান্য একটু এদিক ওদিক হয়ে গেলে আবগারির দারোগা এসে ধরবে। আর সেই রোগা, শুটকো আবগারি সাব-ইন্সপেক্টরের সে কী ছিল হম্বিতম্বি। তোলা-ভরি-পুরিয়ার হিসেবে লাল পেনসিল দিয়ে সই দেয়ার আগে নগদ দশ টাকা নিত আর কোমরে দড়ি বেঁধে ঘাড়ে ধাক্কা দিতে দিতে নিয়ে যাব এই ধরনের খারাপ শাসানি দিতে থাকত।

সেসবে ভয় পেত না মহিমাময়। আসল অসুবিধে ছিল মাইনে নিয়ে। মহিমাময়ের আগে যে লোকটি খাতা লিখত সে ছিল এক রিটায়ার্ড কেরানি। তার টাকা পয়সার দিকে খুব লোভ ছিল না।

আসলে সে ছিল এক বদ্ধ গেঁজেল।

গাঁজার দোকানদার সেই রিটায়ার্ড কেরানিকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দু-ছিলিম গাঁজা সরবরাহ করত, আর সেই সঙ্গে পাশের মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে এক পোয়া গরম দুধ। গেঁজেলদের দুগ্ধ একান্ত আবশ্যক। কিন্তু এত দুধ খেয়েও কিন্তু সেই আগের ভদ্রলোক শেষরক্ষা করতে পারেননি। একদিন সন্ধ্যায় গাঁজার কলকেতে মুখ দিয়ে একটা চো চো টান দিতেই চোখ উলটিয়ে পড়ে যান, তারপর আর জ্ঞান ফেরেনি। দিনকয়েক পরে দেহত্যাগ করেন।

মহিমাময় তখন দুবেলা ভাত খেত যতীন দাস পার্কের কাছে ভবসিন্ধু পাইস হোটেলে। সেখানে ওই গাঁজার দোকানের এক কর্মচারিও খেতে আসত। তার সঙ্গে সামান্য মুখ-পরিচয় ছিল মহিমাময়ের।

কী যেন নাম ছিল সেই লোকটার, রসিকলাল, বোধহয় রসিকলই হবে। সেই রসিকলালই খাতা লেখার প্রস্তাবটা দেয় মহিমাময়কে। দৈনিক সন্ধ্যাবেলা আধঘণ্টাখানেক মাত্র কাজ, আগের লোককে বিনিময়ে মাগনা গাঁজা আর দুধ দেওয়া হত।

রসিকলাল পরামর্শ দিল সন্ধ্যাবেলা কয়েক ছিলিম গাঁজা আর একটু দুধ খেলে রাতের মিলের খরচা বেঁচে যাবে, কোনও খাবার খেতে হবে না। হোটেলে শুধু দিনে একবেলা খেলেই হবে, তাতে মাসে অন্তত পনেরো-ষোলো টাকা বাঁচবে, সেটাই বা কম কী!

একাধিক কারণে এই প্রস্তাবে আপত্তি ছিল মহিমাময়ের। গাঁজার দোকানে আবগারির খাতা লেখা, এত ছোট কাজ সে করে কী করে, পিরোজপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির ছেলে সে। তার ধমনীতে বইছে নীল রক্ত। পিরোজপুরের বিখ্যাত মোক্তার ভুবনময় রায়চৌধুরীর সে পৌত্র। আজ পার্টিশন হয়েছে বলে তাকে পাইস হোটেলে খেতে হচ্ছে। তাই বলে গাঁজার হিসেব লেখা!

ভাগ্য বিপর্যয়ে মানুষ কত কী করে। না হয় গাঁজার খাতাই লিখতে হবে কিন্তু তার জন্যে গাঁজাও খেতে হবে! তা ছাড়া মহিমাময়ের কাছে গাঁজার চেয়েও মারাত্মক হল দুধ। ছোটবেলায় জোর করে বাটি বাটি দুধ তাকে খাওয়ানো হয়েছে। আর সেই পিরোজপুরের ঘন ক্ষীরের মতো দুধ, লালচে আভা তাতে। মিষ্টি স্বাদে ভরা সেই দুধ দিনের পর দিন খেয়ে খেয়ে আর খেয়ে মহিমাময়ের দুধ সম্পর্কে প্রচণ্ড অনীহা।

কিন্তু একটা কিছু করাও তো দরকার।

উত্তরাধিকার সূত্রে ভবানীপুরের একটা প্রাচীন তিনমহলা অট্টালিকার শেষ মহলের অর্ধেক অংশ সে পেয়েছে। তার মানে নীচে দেড়খানা আর ওপরে একখানা ঘর। নীচের সেই দেড়খানা ঘরে বারো টাকা ভাড়ার এক ঘর আদ্যিকালের ভাড়াটে। দোতলার ঘরটায় মাথা গোঁজার কাজ চলছে, কিন্তু ওই একমাত্র বারো টাকা মাসিক আয়ে চালানো অসম্ভব।

অগত্যা বাধ্য হয়েই মহিমাময় গাঁজার দোকানে খাতা লেখার কাজ নিল। তবে গাঁজা দুধ নয়, নগদ টাকার বিনিময়ে। মাসে পনেরো টাকা।

মহিমাময়ের তবু বারো আর পনেরো এই দুই মিলে মাসে সাতাশ টাকা বাঁধা আয়। তার মাসে দরকার অন্তত সত্তর বাহাত্তর টাকা। হোটেল, চা-জলখাবার, খবরের কাগজ, ইলেকট্রিক বিল, যৎসামান্যই হাতখরচ, সব মিলে এর থেকে কমে কিছুতেই হতে চায় না।

থাকার মধ্যে আছে কিছু পুরনো কাসা পিতলের বাসন আর টুকরো-টাকরা কিছু সোনার গয়না। মহিমাময়ের ঠাকুমা রেখে গেছে মহিমাময়ের বউয়ের জন্যে।

কোথায় বউ? কীসের কী? নিজের খাওয়া-পরার সংস্থান নেই, এর মধ্যে বউ আসবে কোথা থেকে?

সুতরাং সেই অবাস্তব সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে, অনাগত বধূর বাসন-কোসন, গয়নাগাঁটি প্রয়োজন অনুসারে বিক্রি করে বা বন্ধক দিয়ে মহিমাময়ের আপাতত চলে যাচ্ছিল।

সে তুলনায় জয়দেবের অবস্থা কিন্তু ভয়াবহ। সে থাকে খায় মামার বাড়িতে। কিন্তু জামাকাপড়ের, ধোপানাপিতের হাতখরচের পয়সা তো চাই।

শুধু এসব নয়, দামি দামি নেশা আরম্ভ করছে জয়দেব। চোলাই, বাংলা, চুল্লু, হাতে পয়সা থাকলে বিলিতি থ্রি এক্স বা ড্রাই জিন। আর ওপরে উঠতে পারলে সাদা ঘোড়া, কালো কুকুর বা মাস্টারমশায় মার্কা আসল বিলাইতি, সোনালি পানীয়।

জয়দেবের অবশ্য এ ব্যাপারে কোনও বাদবিচার নেই। যখন যা হাতের কাছে পেল তাই সই।

এই হাতের কাছে পাওয়ার ব্যাপারটা শুধু পানীয় সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে নয়, পানীয়ের দাম সংগ্রহ করার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

টুকটাক এদিক ওদিক মামার বাড়ির জিনিসপত্র যখন যেটুকু সম্ভব জয়দেব সরিয়ে ফেলে এবং বেচে দেয়। পুরনো জিনিস বেচার ব্যাপারে তার মতো দক্ষ লোক জগৎ-সংসারে কোনও কালে পাওয়া যাবে না।

পুরনো পাপোশ কোথায় ভাল দামে বিক্রি হয়, রোয়া-ওঠা চল্লিশ বছরের ব্যবহৃত পারস্য গালিচা কারা কেনে, বাতিল হয়ে যাওয়া জং-ধরা ডি সি পাখার বাজার কোথায় রমরমা এসব জয়দেবের নখদর্পণে।

এমনকী চিৎপুরের একটা গলিতে পুরনো লেপ, কম্বল, শতরঞ্চি পর্যন্ত যে বিক্রি করা যায়, বউবাজারের পিছনে একটা বিক্রিওলা পুরনো পাথরের থালাবাটি কেনে আর নিমু গোস্বামীর লেনে এক ভট্টাচার্য বুড়ো পুরনো পাঁজি একেকটা চার আনা দামে কেনে এসব ধীরে ধীরে জয়দেব জানতে পেরেছে।

এতদিন পর্যন্ত ভালই চলছিল কিন্তু যখন মামাবাড়ির অ্যালসেশিয়ান কুকুরের তিনটে বাচ্চা জয়দেব হাতিবাগান বাজারে গিয়ে এক রোববার দশ টাকা করে তিনটেকে তিরিশ টাকায় বেচে দিল, তারপর তার পক্ষে আর মামার বাড়িতে থাকা সম্ভব হল না। মামা-মামিরা বা মামাতো ভাইবোনেরা হয়তো এ নিয়ে তেমন কিছু বলত না কিন্তু যে মাদি কুকুরটা এই বাচ্চা তিনটের মা সে ছিল যেমন হিংস্র তেমনি প্রতিহিংসাপরায়ণ। সে কী করে বুঝতে পেরেছিল জয়দেবই তার ছানাগুলিকে সরিয়েছে। বাচ্চাগুলিকে হাতিবাগানে বেচে দিন দুয়েক এদিক ওদিক ফুর্তি করে জয়দেব পরের মঙ্গলবার অনেক রাতে যখন মামাবাড়িতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করল বিউটি নাম্নী সেই সারমেয় জননী মামাবাড়ির দরজা থেকে আধ মাইল রাস্তা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল।

ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত এবং প্রভূত মত্ত অবস্থায় এর পরে সারাজীবন ধরে জয়দেব প্রচুর দৌড়েছে। সেই দীর্ঘ দৌড়যাত্রার হাতেখড়ি হয়েছিল শ্রীমতী বিউটির কাছে।

খাঁটি জার্মান ব্যাভারিয়ান শেফার্ড বংশের গাঢ় নীল রক্ত ছিল শ্রীমতী বিউটির ধমনীতে। সে চট করে কাউকে আক্রমণ করে না, শুধু তাড়া করে যায়। যখন কাছে পায় দাঁত দেখায়, নখ দেখায় কিন্তু ছিঁড়ে ফেলে না, হয়তো একটু আধটু ছোঁয়।

ছুটতে ছুটতে সেদিন জয়দেব তিন-চারবার ধরাশায়ী হয়েছিল, প্রচুর খিদে এবং সুপ্রচুর তৃষ্ণার সেই অভাব তার স্বাভাবিক তুরঙ্গম গতি বার বার ব্যাহত করছিল। কিন্তু শ্রীমতী বিউটি একবারে তাকে বাগে পেয়ে ছিঁড়ে টুকরো করেনি। শুধু উদ্যত নখর, খরশান দন্তরাজি, লেলিহান জিহ্বা ইত্যাদি যথাসাধ্য প্রদর্শন করে জয়দেবের ওঠা এবং পুনরায় দৌড়ান পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে।

এবং তারপর আবার জয়দেবের দৌড়।

এবং তারপর আবার জয়দেবের আড়াই হাত পিছনে শাণিত জিহ্বা, কস্তুকণ্ঠী, খরনখী শ্রীমতী বাভারিয়া সুন্দরীর ক্রমাগত আস্ফালন।

যেকোনও মানুষ এর পরে হয় আত্মসমর্পণ করত অথবা হার্টফেল হয়ে মরে যেত।

কিন্তু আত্মসমর্পণ বা সনাতন হার্টফেল করার জন্যে জয়দেব জন্মায়নি।

আধ মাইলের মাথায় নিমতলার মড়াখোঁচা কয়েকটি নেড়ি কুকুরকে শেষবার ধরাশায়ী হয়ে ওঠার মুহূর্তে সে লেলিয়ে দিল বিউটির দিকে।

শ্রীমতী বিউটি পথ-লড়াই বিষয়ে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞা, চোঁ চোঁ পালানো ছাড়া তার আর কিছু করার ছিল না।

ফলে এ যাত্রা জয়দেব রক্ষা পেল। কিন্তু বিউটির ভয়ে মামাবাড়ির বারোয়ারি আশ্রয় তাকে ছাড়তে হল। এমনকী দু-একটা পুরনো জামাকাপড়, একজোড়া প্রায় নতুন চটি, গামছা, টুথব্রাশ এই সব দৈনন্দিন ব্যবহারের টুকিটাকি জিনিস মামাবাড়িতে সব কিছুই পড়ে রইল, সে আর সাহস পেল না সেগুলো উদ্ধার করে আনতে যেতে।

কিন্তু কোথাও তো মাথা গুঁজতে হবে, রাতে শুতে হবে। তা ছাড়া একটা কারণে জয়দেবের একটু ফঁকা জায়গা লাগে। সে ছবি আঁকে। অল্প অল্প নাম করছে। শিল্পী জয়দেব পালের নাম তত বিখ্যাত হলেও তখন বেশ ছড়াতে শুরু করেছে।

মনে রাখতে হবে পাকা তিরিশ বছর আগের ঘটনা এটা।

তখনও ভবঘুরে আর ধান্দাবাজেরা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মগুলোর স্বত্ত্ব দখল করে নেয়নি।

 বলা যায় যে জয়দেবই এ ব্যাপারে পথিকৃৎ। একেকদিন রাতে, অনেক রাতে মদ খেয়ে, অনেক মদ খেয়ে শেয়ালদা স্টেশনে ঢুকে পড়ে জয়দেব। কোনও অসুবিধা হয় না, কেউ আপত্তি করে না।

এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। এ ছাড়াও সে হাওড়া স্টেশনে, লেক গার্ডেন বাস টার্মিনাসের ডিপোতে, ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে, এমনকী একদিন রাজভবনে আর একদিন হাইকোর্টে মত্ত অবস্থায় অবলীলাক্রমে গভীর রাতে ঢুকেছে। কখনও কোনও অসুবিধে হয়নি।

শুধু হাইকোর্টে সিঁড়ি দিয়ে সন্তর্পণে যে ঘরে ঢুকে সে ঘুমিয়েছিল সেটা ছিল এক বদরাগী জজ সাহেবের এজলাশ। তাতে কিছু আসে যায় না, রাতের বেলা তো আর জজসাহেবের এজলাশ তখন বসে না।

কিন্তু পরের দিন সকালে জয়দেবের ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায়, অনেক বেলায় ঘুম থেকে উঠে সে যখন জজবাহাদুরের খাস কামরায় বাথরুমে প্রাতঃকৃত্য করছিল তখন বেলা সাড়ে দশটা। জজবাহাদুর এসে গেছেন, তিনি এজলাশে ওঠার আগে নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাসবশত বাথরুমের আয়নায় একটু চিরুনি চালিয়ে আকপাল বিস্তৃত টাকের সামান্য অঙ্গসজ্জা করতে গিয়ে দেখলেন ভেতর থেকে বন্ধ।

এর পরের ঘটনা মুদ্রিত অক্ষরে বিস্তৃত করা আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়বে। বরং মত্ত জয়দেবের চিড়িয়াখানায় রাত সাড়ে তিনটেয় প্রবেশ করার গল্পটা অনেক নিরাপদ।

খিদিরপুর খালের চারপাশে আরব্য রজনীর পৃথিবী, সেখানে খারাপ-ভাল, সস্তা-দামি এমন কোনও সাকি ও সুরা জগৎসংসারে নেই যা পাওয়া যায় না।

সুখের কথা জয়দেবের সাকিঘটিত দুর্বলতা কস্মিনকালেও ছিল না, সেই নবযৌবনেও না। তবে এবং সেই জন্যেই বোধহয় পরের দ্রব্যটি অর্থাৎ সুরার প্রতি তার টান ছিল অদম্য এবং মাত্রাতিরিক্ত।

সে যা হোক, সেই সময়ে চিড়িয়াখানার উত্তরদিকের গেটের সামনেই মানে খিদিরপুরের খালধারে শতাব্দী প্রাচীন গোরু-মোষের আন্তর্জাতিক হাট। আন্তর্জাতিক এই অর্থে যে যদিও তখনও বাংলাদেশ হয়নি, সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের চোরাচালানি গোরুবাছুর, ভায়া দ্বারভাঙ্গা নেপালের মোষ, ভায়া কালিম্পং তিব্বতের চমরি ছাগল ইত্যাদি মাংসল জন্তু সেই সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানি উট এবং মূলতানি রামছাগল পর্যন্ত এই সমস্ত জন্তুর মেলা বসত সপ্তাহে একদিন।

হাটটা বসত সপ্তাহের মাঝামাঝি। সজ্ঞানে কখনও জয়দেব মনে করতে পারত না মঙ্গলবার নাকি বুধবার, একেক সময় ভাবত নিশ্চয়ই শুক্রবার হবে, বেস্পতিবার বা সোমবার হতেই আপত্তি কী!

কিন্তু এসব চিন্তা ও প্রশ্ন সাদা চোখে। পেটে দু-চার পাত্র পড়ার পরে জয়দেব অন্য মানুষ, যাকে বলে ত্রিকালজ্ঞ। তখন আর বার-তারিখ, তিথি-নক্ষত্র এগুলোর জন্যে অপেক্ষা করতে হয় না জয়দেবের, সে রক্তের স্পন্দনে টের পায় আজ অমুক জায়গায় দরজা খোলা, অমুক জায়গায় লেটনাইট পার্টি।

এই গোহাটার যে হাটবাবু অর্থাৎ সরকারি খাজনা আদায়কারী ছিল, তার সঙ্গে জয়দেবের আলাপ হয়েছিল ওয়েলেসলি স্ট্রিটের কুখ্যাত দিশি পানশালা খালাসিটোলায়। লোকটির নাম ছিল খুব কাব্যময়–হৃদয় বৈরাগী।

পানশালায় আলাপ, আলাপ থেকে গভীর বন্ধুত্ব। প্রায় প্রতি হাটবারে রাত দশটার পরে হাটের ভিতরে চিড়িয়াখানার দেয়াল ঘেঁষে আসর বসাত বৈরাগী। হই হই কাণ্ড। রাজস্থানি উটওয়ালা, দিনাজপুরি গোরুর পাইকার, বিহারের ছাগল সম্রাট, জৌনপুরের বলদ শ্ৰেষ্ঠী কেনাবেচা শেষ করে বৈরাগীর আসরে সামিল হত। সেই সঙ্গে এদিক ওদিক, এ প্রান্ত ও প্রান্ত থেকে জয়দেবের মতো আরও দু-চারজন রসিক বন্ধুবান্ধব।

এক বর্ষার শেষরাতে, রাত প্রায় তিনটে সাড়ে তিনটে, ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, পানীয় নিঃশেষিত, আড্ডাধারীরা সবাই ক্লান্ত ও স্তিমিত, এমন সময় রাজস্থানি উটওয়ালা বলল যে সে তার একটা পোষা উট বছরখানেক আগে কলকাতার চিড়িয়াখানায় উপহার দিয়েছে–সেটা এখন কেমন আছে, তার খুবই দেখতে ইচ্ছে করছে।

এই ইচ্ছের গভীর ব্যঞ্জনা জয়দেব ছাড়া কেউ বুঝতে পারেনি। জয়দেব উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তাহলে সিংজি চলো যাই, দেখে আসি।

যেমন কথা তেমন কাজ। অন্য মাতালেরা কেউ কিছু বোঝার আগে প্রথমে জয়দেব তারপরে সিংজি নিঃশব্দে দেয়াল ডিঙিয়ে চিড়িয়াখানার ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

এর পর কী হয়েছিল বলা খুব কঠিন। কেউ বলে ওরা দুজনে জলহস্তির ডেরায় গিয়ে পড়েছিল, অন্যেরা হিসেব করে বলেছে তা নয়, ভালুকের খাঁচার ওপরে।

জয়দেব পরে বলেছিল, দেয়াল টপকে ভালুকের খাঁচার উপরে পড়া সম্ভব নয় তবে সামনে পড়েছিল।

কিন্তু আসল কথা হল তারা দুজনে পড়েছিল চিড়িয়াখানার এক অস্থায়ী অনতিপ্রৌঢ়া জমাদারনির দেয়াল-ঘেঁষা ঝুপড়ির বাঁশের চাল ভেঙে তার বিছানার ওপরে।

তারপরে চিৎকার, চেঁচামেচি হইচই। যা কিছু হওয়া সম্ভব। চিড়িয়াখানার ভেতরে রাত্রিতে যে দু-চারজন লোক থাকে এদিক ওদিক নানা কোয়ার্টারে, তারা ভাবল বাঘ কিংবা সিংহ খাঁচা খুলে বেরিয়েছে। কেউ বলল একটা হাতি খেপে গিয়ে শিকল ছিঁড়ে ছুটছে।

জয়দেবের এই রকম সব বহুমুখী অভিজ্ঞতার কাছে মহিমাময় নিতান্ত শিশু।

.

আজ এই বড়দিনের উৎসবের রাতে জয়দেব প্রায় জোর করেই মহিমাময়কে নিয়ে বেরিয়েছে পানীয়ের পৃথিবীর সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যে। এর আগে মহিমাময় একটু-আধটু পানীয় শৌখিনভাবে কখনও কখনও চেখে দেখেছে। সেও সুপরিবেশে দামি পানীয়। কিন্তু সেসব খেতেও তার মোটেই ভাল লাগেনি। কেমন তেতো তেতো, ঝাঁঝওয়ালা স্বাদ।

আজও একটু আগেই সাহেবপাড়ায় পার্ক স্ট্রিটে জয়দেবের সঙ্গে একটা বারে গিয়েছিল মহিমাময়। বড়দিনের বাজারে সেখানে ভীষণ ভিড়, হই-হুঁল্লোড় ঠেলাঠেলি। বহু কষ্টে ধাক্কাধাক্কি করে জয়দেব কাউন্টার থেকে দু গেলাস হুইস্কি সোডা সংগ্রহ করেছিল, একটু দূরে কিঞ্চিৎ ফাঁকায় মহিমাময় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছিল।

আসার পথে এক স্থূলকায়া মেমসাহেবের গুঁতো খেয়ে গেলাসসুদ্ধু জয়দেব উলটিয়ে গেল। মেমসাহেবের মহার্ঘ্য গাউন প্লাবিত হয়ে গেল দুই গেলাস মদে।

কোথায় দু গেলাস বৃথা গেল বলে শোক করবে, সে জায়গায় উলটে মেমসাহেব জয়দেবের কলার চেপে ধরল বদমায়েশি করে গাউন নষ্ট করে দেয়ার জন্যে। জয়দেব যত বোঝাতে চেষ্টা করে যে ক্ষতিটা তারই বেশি হয়েছে, এই দুর্দিনের বাজারে বহুকষ্টে আহরিত দু পাত্র দুমূল্য পানীয় লোকসান করে বদমায়েশি করার ক্ষমতা বা ইচ্ছে তার নেই, ততই মেমসাহেব শাটআপ শাটআপ বলে চেঁচাতে থাকে এবং সেই সঙ্গে মাঝে মাঝে জয়দেবকে স্কাউড্রেল এবং রাস্কেল বলে সম্বোধন করতে থাকে।

এ অবস্থায় কী করবে বুঝতে না পেরে দূরে দাঁড়িয়ে মহিমাময় ভয়ে ঠকঠক করে কঁপছিল, এমন সময় বারের ম্যানেজার এসে জয়দেবকে উদ্ধার করলেন। জয়দেব এখানকার পুরনো এবং বাঁধা খদ্দের, তার হেনস্তা দেখে তিনি বাধ্য হয়ে এগিয়ে এসেছেন।

অবশ্য ম্যানেজার সাহেব যা করলেন তা কহতব্য নয়। মোটা মেমসাহেবের ঘাড় ধরে দরজার দিকে ঠেলে নিয়ে গেলেন, যেতে যেতে বললেন ফ্যাট গার্ল গো হোম, দিস ইস নট ইয়োর নাইট  (Fat girl go home, this is not your night.) সরাসরি অর্থ হল, মোটা মেয়ে বাড়ি যাও, এ রাত তোমার রাত নয়।

মেমসাহেব কী বুঝে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যানেজার সাহেবের গালে চকাস করে একটা চুমু খেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে গাইতে লাগলেন, কে সারা সারা।

জয়দেব কী ভাবল কী ভাবল না কে জানে, কিন্তু মহিমাময়ের এ ধরনের অভিজ্ঞতা এই প্রথম। তার মনে হল দ্রুতপায়ে এখান থেকে সরে পড়াই ভাল। এবং এ কথা মনে হওয়া মাত্র সে বার থেকে ফুটপাথে গিয়ে নামল।

ফুটপাথে তখন বড়দিনের সন্ধ্যা জমজমাট। রাত প্রায় আটটা বাজে। বারের ভেতরের থেকে ফুটপাথের ভিড় আরও বেশি। ভিড়টা চৌরঙ্গির দিক থেকে, সুতরাং মহিমাময় পার্ক স্ট্রিট ধরে পুবমুখী পার্ক সার্কাসের দিকে হাঁটা শুরু করল।

বেশিক্ষণ যেতে হল না। এই ভিড় আর হই-হুঁল্লোড়ের গণ্ডগোলে জয়দেব একটু পরেই তাকে এসে ধরল, কীরে, পালাচ্ছিস কোথায়?

মহিমাময় বলেন, না পালিয়ে উপায় কী? ভিড়ে দমবন্ধ হয়ে মারা পড়ব নাকি?

জয়দেব জিব দিয়ে একটু চুক চুক করে বলল, ভিড় তত ভালই, শুধু এই বড়দিনের রাতে দু গেলাস হুইস্কি অদানে অব্রাহ্মণে গেল, তারপর মেমসাহেবের গালাগাল খেলাম। আর সাহেবপাড়ায় নয়, চল বাঙালি পাড়ায় নিরিবিলিতে ফুর্তি করা যাক।

মহিমাময় জানতে চাইলে, বাঙালি পাড়ায় আবার কোথায়?

জয়দেব বলল, গড়িয়াহাটায় শ্যামাদাসীর ওখানে, চমৎকার জায়গা।

এর আগে শ্যামাদাসীর নাম শোনেনি মহিমাময়, সে চমকিয়ে উঠল, না না, ওসব খারাপ জায়গায় যাব না।

জয়দেব হাত তুলে আশ্বস্ত করল, আরে না, কোনও খারাপ ব্যাপার নেই। মোটেই খারাপ জায়গা নয়। শ্যামাদাসীর খুব ডিসিপ্লিন। তা ছাড়া দামে সস্তা এবং খাঁটি মাল। চোখের সামনে তৈরি করে দেয়।

খাঁটি মাল শুনে খুব ভয় পেয়েছিল মহিমাময়, তবে সামনে তৈরি করে দেয় শুনে বুঝতে পারল জয়দেব সুরা সম্পর্কে বলছে, সাকি সম্পর্কে নয়।

এতক্ষণে হাঁটতে হাঁটতে দুজনে লোয়ার সার্কুলার রোডের ট্রাম রাস্তায় এসে গেছে। এখানেও বড়দিনের জটলা, অধিকাংশ দিশি ফিরিঙ্গি আর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান।

সামনের ফুটপাথ থেকে দুটো রঙিন কাগজের টুপি কিনে জয়দেব নিজে একটা মাথায় দিল আর একটা মহিমাময়কে দিল। মহিমাময় অবশ্য সেটা মাথায় দিল না, রাস্তা দিয়ে একটা বাচ্চা ছেলে যাচ্ছিল তার মাথায় পরিয়ে দিল। জয়দেব সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে তাড়াতাড়ি মহিমাময়ের হাত ধরে টানতে টানতে রাস্তার ওপারে ট্রাম স্টপে এল।

উত্তর দিক থেকে একটা গড়িয়াহাটার ট্রাম আসছিল, প্রায় কঁকা। দুজনে মিলে সেটায় উঠল। তারপরে গড়িয়াহাটায় নেমে সোজা আলুর আড়তের পিছনে শ্যামাদাসীর ঠেক।

প্রিয় পাঠক মহোদয়, অনুগ্রহ করে একবার তিরিশ বছর পিছন ফিরে তাকান।

ওইখানে আলুর আড়তের ফাঁক দিয়ে দেখুন। কলঙ্কিত তক্তাপোশের ওপরে জয়দেব এবং মহিমাময় বসে আছে। আশেপাশে আরও দু-চারজন। আগামী তিরিশ বছরের বর্ণোজ্জ্বল মাতাল জীবনে আজ মহিমাময়ের হাতেখড়ি। সামনে বড় কাঁচের গেলাসে টগবগ করে ফুটছে কড়া পানীয়, উচ্ছল ফেনা গেলাস থেকে চারপাশে গড়িয়ে পড়ছে, ছ্যাঁক হ্যাঁক করে শব্দ হচ্ছে।

একটু পরে গেলাসের উচ্ছ্বাস থেমে গেল। নতুন খদ্দের দেখে শ্যামদাসী নিজের হাতে আঁকনি। দিয়ে হেঁকে মহিমাময়ের হাতে একটা গেলাস এগিয়ে দিল। কম্পিত হাতে গেলাসটা ধরে একটু ঠোঁটে ছোঁয়াল মহিমাময় স্বাদ নেওয়ার জন্যে এবং সঙ্গে সঙ্গে টের পেল যে শুকনো লঙ্কা সরষের সঙ্গে বেটে অ্যাসিডে মেশালে যে স্বাদ হবে সে এর চেয়ে অনেক নরম ও সুস্বাদু।

কিন্তু মুহূর্তের দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে এক হাতে নাক টিপে, চোখ বুজে এক নিশ্বাসে মহিমাময় সেই তরল গরল গলাধঃকরণ করল। বন্ধুর এই কীর্তি দেখে জয়দেব হাততালি দিয়ে উঠল। শ্যামাদাসীও অবাক হয়ে মহিমাময়ের দিকে তাকিয়ে রইল, তার পোড়খাওয়া আসববৃত্তির দীর্ঘজীবনে এর আগে আর কাউকে দেখেনি, জীবনের প্রথম পানীয় বিশেষ করে এই এসপেশাল চুল্লু এমন চোঁ-চোঁ করে এক টানে মেরে দিতে।

মহিমাময়ের নাক আর কান দিয়ে তখন গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে, গলায় আগুন জ্বলছে, পায়ের গোড়ালি থেকে ব্রহ্মতালু পর্যন্ত ঝিমঝিম করছে, সে হঠাৎ দেখতে পেল শ্যামাদাসী তাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে, এবং একটু পরেই দেখল শ্যামদাসীকে হাটিয়ে দিয়ে তার প্রাণের বন্ধু জয়দেব গড় হয়ে তার পায়ের ধুলি নিচ্ছে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *