সোমক রাজা ও তাঁহার পুরোহিত
বহুদিন পূর্বে ভারতবর্ষে সোমক নামে একজন বিখ্যাত রাজা বাস করিতেন। তাঁহার যেমনি ঐশ্বর্য তেমনি প্রতাপ। তাঁহার কিছুর অভাব ছিল না তবুও তাঁহার মনে কোনও সুখ নাই। বিধাতা তাঁহাকে সবই দিয়াছেন, দেননি কেবল কোনও পুত্র, এইজন্য রাজার চিন্তার আর শেষ নাই। তাঁহার মৃত্যুর পর কে এই অতুল সম্পদ ভোগ করিবে?
পুত্র পুত্র করিয়া রাজা অস্থির হইয়া উঠিলেন আর ক্রমে ক্রমে বিবাহ করিয়া একশত রানি ঘরে আনিলেন। কিন্তু হায়, সবই বৃথা হইল। এদিকে রাজার যৌবন পার হইয়া তিনি ক্রমে বৃদ্ধ হইয়া পড়িতে লাগিলেন। আর যখন পুত্র পাইবার কোনও আশা নাই— এমন সময় ভগবান মুখ তুলিয়া চাহিলেন। রাজা সোমকের একটি পুত্র হইল।
রাজার আর আনন্দের শেষ নাই। পুত্রটি দেখিতে যেমন সুন্দর, স্বভাবও তেমনি চমৎকার। সারা রাজ্যে উৎসব শুরু হইল। ঘরে ঘরে আনন্দের লহরী ছুটিল, দিবারাত্র গীত-বাদ্য ও নৃত্যের যেন আর কামাই নাই।
রানিরাও এই পুত্রকে লইয়া মাতিয়া রহিলেন, তাঁহারাও প্রায় আহার-নিদ্রা ভুলিলেন।
রাজা সোমক আদর করিয়া এই পুত্রের নাম রাখিলেন ‘জন্তু’।
একদিন ‘জন্তু’কে একটা পিঁপড়া কামড়াইল। ব্যথায় সে চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। আর যায় কোথায়, রাজার একশত রানি ছুটিয়া আসিলেন। নয়নের মণি পুত্রের চোখের জল দেখিয়া তাঁহাদের চোখেও জল ঝরিতে লাগিল। তাঁহারাও চিৎকার করিয়া কাঁদিতে লাগিলেন।
রাজা বসিয়াছিলেন বিচারসভায়, হঠাৎ রানিদের বিলাপধ্বনি তাঁহার কর্ণে প্রবেশ করিল। তিনি আর কিছুতে স্থির থাকিতে পারিলেন না। জন্তু কোনও বিপদে পড়ে নাই তো? তিনি ছুটিয়া আসিলেন অন্দরমহলে— পড়িয়া রহিল তাঁহার বিচারকার্য।
অবশেষে কারণ জানিয়া অল্পক্ষণের মধ্যেই আবার তিনি বিচারসভায় ফিরিয়া আসিলেন। মন্ত্রী ও পুরোহিতের ভীতি-উৎসুক মুখের দিকে চাহিয়া আক্ষেপভরে রাজা কহিলেন,—‘একটি পুত্র থাকা অপেক্ষা কোনও পুত্র না থাকাই ভাল। ইহাতে দুশ্চিন্তা বাড়িয়া যায়, অশান্তির শেষ থাকে না। কিন্তু আমি যে উপায়হীন।’
পুরোহিত কহিলেন,—‘মহারাজ দুঃখ করিবেন না। ইহারও উপায় আছে। আপনিও শত পুত্রের পিতা হইতে পারেন কিন্তু সেকাজ অতি কঠিন।’
রাজা সোমক উৎসাহের সহিত কহিলেন,—‘কী কাজ করিতে হইবে আপনি বলুন, তাহা যতই কঠিন হউক আমি নিশ্চয়ই পারিব। শত পুত্র লাভ করিবার জন্যে কোনও কাজই আমার পক্ষে অসাধ্য নয়।’
পুরোহিত কহিলেন,—‘একটি যজ্ঞ করিতে হইবে, আর সে-যজ্ঞের হোমে যাহা আহুতি দিতে হইবে, তাহা আপনি পারিবেন না।
রাজা সোমক ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিলেন,—‘নিশ্চয়ই পারিব, আপনি বলুন কীসের আহুতি দিতে হইবে সেই হোমে?’
পুরোহিত কহিলেন,—‘আপনার পুত্র জন্তুর চর্বিতে আপনাকে দিতে হইবে সেই আহুতি। তাহারই গন্ধে আপনার শত মহিষীর উদরে একটি করিয়া পুত্র হইবে।’
পুরোহিতের বাক্যে রাজা কাতর হইয়া প্রশ্ন করিলেন,—‘কিন্তু আমার জন্তু?’
‘সেও আবার ফিরিয়া আসিবে তাহার জননীর উদরে। তাহার বক্ষের বামভাগে একটি স্বর্ণবর্ণ তিল দেখিয়া তাহাকে চিনিতে পারিবেন’— পুরোহিত কহিলেন।
তাহার পর সেই ভীষণ যজ্ঞ আরম্ভ হইল। যজ্ঞের ধূমে আকাশ বিবর্ণ হইয়া গেল। পূর্ণাহুতির সময় নির্মম রাজপুরোহিত জন্তুকে লইয়া আসিলেন তাহার জননীর কাছ হইতে ছিনাইয়া। শত রানি মূর্ছিত হইয়া পড়িলেন। যজ্ঞকার্য শেষ হইল জন্তুর চর্বিতে।
ইহার পর অনেকদিন কাটিয়া গিয়াছে, সোমক রাজার পুরোহিতের মৃত্যু হইয়াছে। রাজারও মৃত্যু হইল। তিনি মৃত্যুর পর নরকে গিয়া দেখেন রাজপুরোহিত ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক কুম্ভীপাক নরকে দারুণ কষ্টভোগ করিতেছেন। তাঁহাকে দেখিয়া রাজা প্রশ্ন করিলেন,—‘আপনার এ দুর্দশা কেন ঠাকুর?’
পুরোহিত কহিলেন, ‘মহারাজ, ওই নিষ্ঠুর যজ্ঞের জন্য আমার এই শাস্তি।’ রাজা ব্যথিত হইলেন। কাতর প্রাণে যমরাজকে বলিলেন,—‘ধর্মরাজ, এ শাস্তি আমারই প্রাপ্য। আমি পিতা হইয়া এই যজ্ঞের অনুমতি দিয়াছি।’
যমরাজ কহিলেন,—‘তাহা হয় না। কর্মফল অমোঘ। একের জন্য অন্যে শাস্তি পায় না। যাহার কর্ম তাহাকেই ফল ভোগ করিতে হয়। তুমি অনেক সৎকর্ম করিয়াছ, তাহার ফল ভোগ করিবে চলো স্বর্গলোকে। তোমার পুরোহিত এই স্থানেই তাহার নিষ্ঠুর কর্মের ফল ভোগ করুক।’
সোমক কহিলেন,—‘হে ধর্মরাজ, এই ব্রহ্মবাদী পুরোহিতকে এখানে ফেলিয়া আমি স্বর্গে পুণ্যভোগ করিতে চাহি না। আমরা একই কর্ম করিয়াছি, আমাদের পাপ-পুণ্যের ফল সমান হউক।’
সোমকের কথায় যমরাজ সম্মত হইলেন। তখন সোমক তাঁহার পুরোহিতের সহিত কিছুকাল নরক ভোগ করিয়া পাপক্ষয়ের পর উভয়েই স্বর্গে পুণ্যভোগ করিতে গেলেন।
