আয়োদধৌম্য ঋষির শিষ্যত্রয়

আয়োদধৌম্য ঋষির শিষ্যত্রয়

পূর্বকালে আয়োদধৌম্য নামে এক বিখ্যাত ঋষি ছিলেন— তাঁহার শিষ্যদের মধ্যে তিনটি প্রধান শিষ্য ছিলেন— উপমন্যু, আরুণি ও বেদ।

একদিন তিনি আরুণিকে কহিলেন,—‘হে আরুণি, আমার খেতের আল ভাঙিয়া গিয়াছে, তুমি তাহার সংস্কার করিয়া এসো।’

গুরুর আদেশে আরুণি খেতে গিয়া দেখিলেন মাঠের আল ভাঙিয়া গিয়াছে। তাহার ভিতর দিয়া অন্য খেতের জল সবেগে প্রবেশ করিতেছে। আরুণি অনেক চেষ্টা করিয়াও সেই আলের মুখ বন্ধ করিতে পারিলেন না।

অবশেষে নিরুপায় হইয়া নিজেই সেই আলের মুখে শুইয়া জলরোধ করিয়া রাখিলেন।

সন্ধ্যার সময়েও আরুণি ফিরিল না দেখিয়া আয়োদধৌম্য অপর দুই শিষ্য লইয়া খেতের নিকট গেলেন এবং উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতে লাগিলেন,—‘আরুণি, আরুণি, তুমি কোথায় আছ, শীঘ্র এসো।’

গুরুর আহ্বানে আরুণি উঠিয়া আসিলেন এবং গুরুকে কহিলেন,—‘প্রভু, জলরোধ করিতে না পারিয়া আমি আলের মুখে শুইয়া স্রোতের বেগ আটকাইতেছিলাম। এখন আপনার কথায় উঠিয়া আসিয়াছি, আজ্ঞা করুন কী করিতে হইবে?’

আয়োদধৌম্য সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন,—‘বৎস, তুমি খেতের আল ভেদ করিয়া উঠিয়াছ— তাই তোমার নাম হউক ‘উদ্দালক’। তুমি আমার আজ্ঞা পালন করিয়াছ, সেইজন্য তোমার মঙ্গল হইবে, সমস্ত বেদ ও ধর্মশাস্ত্র তোমার অন্তরে প্রকাশিত থাকিবে।’

আয়োদধৌম্য আর একদিন অপর শিষ্য উপমন্যুকে কহিলেন,—‘বৎস, তুমি আমার গো-রক্ষা করো।’

উপমন্যু প্রতিদিন গাভী চরাইয়া সন্ধ্যায় আসিয়া গুরুকে প্রণাম করিতে লাগিলেন।

ধৌম্যঋষি একদিন তাহাকে কহিলেন,—‘তোমাকে বেশ স্থূল দেখিতেছি, সমস্ত দিন কী খাও?’

উপমন্যু বিনীতভাবে কহিলেন,—‘আমি ভিক্ষা করিয়া জীবিকা নির্বাহ করি।’

গুরু কহিলেন,—‘আমাকে নিবেদন না করিয়া তোমার ভিক্ষান্ন ভোজন করা উচিত নহে।’

উপমন্যু ইহার পর হইতে সমস্ত ভিক্ষাদ্রব্য আনিয়া গুরুকে দিতে লাগিলেন।

তথাপি তাহাকে পুষ্ট দেখিয়া গুরু কহিলেন,—‘এখন তুমি কী খাও?’

শিষ্য কহিলেন,—‘আপনাকে ভিক্ষাদ্রব্য নিবেদন করিয়া আবার আমি ভিক্ষা করি, তাহাই খাই।’

গুরু কহিলেন,—‘ইহা উচিত নহে।’

আবার শিষ্যকে হৃষ্টপুষ্ট দেখিয়া গুরু প্রশ্ন করিলেন,—‘এখন তুমি কী খাইতেছ?’

শিষ্য কহিলেন,—‘আমি গোরু চরাইতে গিয়া এইসব গোরুর দুধ খাই।’

গুরু কহিলেন,—‘আমার অনুমতি ছাড়া তুমি দুধ খাইবে না।’

আবার কিছুদিন পরে ধৌম্যঋষি উপমন্যুকে কহিলেন,—‘এখনও তোমার দেহ স্থূল দেখিতেছি। কী খাইতেছ?’

শিষ্য কহিলেন,—‘স্তন্যপানের পর বাছুরের মুখ দিয়া ফেনা উঠে, আমি তাহাই খাই।’

গুরু কহিলেন,—‘ইহাও তোমার খাওয়া উচিত নহে। ইহাতে বাছুরের ক্ষতি হয়।’

গুরুর সব আজ্ঞা মানিয়া উপমন্যু গোরু চরাইতে লাগিলেন। একদিন ক্ষুধায় আর থাকিতে না পারিয়া তিনি কিছু আকন্দপাতা খাইলেন, তাহাতে তাঁহার চক্ষু অন্ধ হইয়া গেল। অন্ধ অবস্থায় চলিতে চলিতে তিনি এক কূপের মধ্যে পড়িয়া গেলেন।

সন্ধ্যার সময়ও উপমন্যু ফিরিতেছে না দেখিয়া ধৌম্যঋষি তাহার খোঁজে বাহির হইলেন এবং খুঁজিতে খুঁজিতে কূপের মধ্য হইতে তাহাকে উদ্ধার করিলেন।

উপমন্যুর মুখে সমস্ত কথা শুনিয়া, তিনি কহিলেন,—‘বৎস, তুমি অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের স্তব করো। তাহাতে আবার দৃষ্টিশক্তি লাভ করিবে।’

অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের স্তব করিয়া দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়া পাইয়া উপমন্যু আবার গুরুর নিকট উপস্থিত হইলেন। গুরু প্রীত হইয়া তাহাকে আশীর্বাদ করিলেন,—‘বৎস, তোমার মঙ্গল হইবে, সকল বেদ ও শাস্ত্র তুমি আয়ত্ত করিবে। তোমার পরীক্ষার শেষ হইল।’

আয়োদধৌম্য তাহার পর তাঁহার অপর শিষ্য বেদকে কহিলেন,—‘তুমি কিছুকাল আমার গৃহে বাস করিয়া আমার সেবা করো।’

বেদও গুরুগৃহে থাকিয়া দীর্ঘকাল একান্তভাবে পরম নিষ্ঠার সহিত তাঁহার সেবা করিলেন।

গুরু ধৌম্যঋষি তাহাকে আশীর্বাদ করিলেন,—‘আমি তোমার উপর সন্তুষ্ট হইয়াছি। তুমি শ্রেয় ও সর্বজ্ঞতা লাভ করো। তোমারও পরীক্ষা শেষ হইল।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *