দুর্বাসার দুর্দশা

দুর্বাসার দুর্দশা

অম্বরীষ নৃপতি বিখ্যাত সাধুপুরুষ ছিলেন। তিনি অসংখ্য দানধ্যান, ব্রত-পার্বণ করিয়াছিলেন।

একবার কার্তিক মাসের একাদশী তিথিতে ব্রত করিয়া দ্বাদশীতে অতি সমাদরে ব্রাহ্মণদের ভোজন করাইয়া তিনি তাঁহাদের হাজার হাজার গাভী দান করিলেন। এই কার্য শেষ করিয়া সকলের অনুমতি লইয়া যখন তিনি নিজে আহারে বসিবেন, এমন সময় উপস্থিত হইলেন দুর্বাসা মুনি। নৃপতি অম্বরীষ তৎক্ষণাৎ উঠিয়া তাঁহাকে প্রণাম করিয়া আহারের জন্য সবিনয়ে অনুরোধ জানাইলেন।

খুশি হইয়া দুর্বাসা মুনি কহিলেন, ‘আমার এখনও স্নান হয় নাই, আমি এখনি কালিন্দী নদীতে স্নান সারিয়া আসিয়া খাইব। তুমি আমার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো।’

মুনি সেই যে স্নান করিতে গেলেন আর ফিরিবার নাম নাই। এদিকে দ্বাদশী তিথি পার হইয়া যায়, ইহার মধ্যে নৃপতির উপবাস ভঙ্গ করা চাই-ই। উপবাস ভঙ্গ না করিলে মহাপাপ হইবে-আর অতিথিকে ফেলিয়া কিছু খাইলেও গুরুতর অপরাধ হইবে। রাজা অম্বরীষ তখন নিরুপায় হইয়া ব্রাহ্মণদের পরামর্শ লইয়া শুধু একটু জল মুখে দেওয়া স্থির করিলেন। কারণ ইহাতে খাওয়াও হইবে না, নিয়ম রক্ষাও হইবে। রাজা অম্বরীষ নিয়ম রক্ষা করিবার জন্য মুখে একটু জল দিলেন।

একটু পরেই দুর্বাসা মুনি স্নান সারিয়া ফিরিলেন এবং জানিলেন অম্বরীষ পূর্বেই জল মুখে দিয়াছেন।

দুর্বাসা অতিশয় ক্রোধী মুনি ছিলেন। তিনি তো রাগিয়া আগুন— কী এত বড় স্পর্ধা অম্বরীষের; অতিথিকে না খাওয়াইয়া তিনি আগেই জল গ্রহণ করিয়াছেন? ক্ষুধায় তাঁহার পেট জ্বলিতেছে, অথচ তিনি অম্বরীষের গৃহে আর অন্ন গ্রহণ করিবেন না— তিনি তাঁহাকে রীতিমতো অপমান করিয়াছেন।

কারণে অকারণে অভিশাপ দেওয়া দুর্বাসা মুনির স্বভাব— এজন্য সকলেই তাঁহাকে ভয় করিত।

রাজা অম্বরীষও ভীষণ ভয় পাইয়া গেলেন। হাতজোড় করিয়া বারংবার ক্ষমাভিক্ষা করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহাতে মুনির রাগ একটুও কমিল না এবং তিনি মাথার একটা জটা ছিঁড়িয়া ফেলিয়া তাহা দিয়া এক ভীষণ-মূর্তি বীরপুরুষ নির্মাণ করিলেন। দেখিতে দেখিতে সেই ভৈরবমূর্তি জ্বলিয়া উঠিল— আর সেই প্রজ্বলিত পুরুষ বিরাট শাণিত খড়্গ লইয়া রাজা অম্বরীষের পানে ছুটিয়া আসিতে লাগিল। রাজা কিন্তু অচল অটল।

বিষ্ণু দেখিলেন তাঁহার ভক্ত অম্বরীষ নিরপরাধ, দুর্বাসা মুনিই দোষ করিয়াছেন। নির্দোষ ভক্তের এইরূপ নিগ্রহ দেখিয়া তিনি আর থাকিতে পারিলেন না, তাঁহার সুদর্শনচক্র দ্বারা সেই ভয়ংকর প্রজ্বলিত পুরুষকে ধ্বংস করিলেন। সেই মূর্তিকে ধ্বংস করিয়া চক্র এইবার ছুটিল দুর্বাসার দিকে।

প্রাণের ভয়ে দুর্বাসা ছুটিতে লাগিলেন, কিন্তু চক্রও তাঁহাকে অনুসরণ করিতে লাগিল। মুনি যেখানেই যান, সেইখানেই দেখেন সুদর্শনচক্র তাঁহার দিকে ছুটিয়া আসিতেছে। উদ্ধারের আর কোনও উপায় না দেখিয়া মুনি উপস্থিত হইলেন ব্রহ্মার কাছে।

সমস্ত শুনিয়া ব্রহ্মা কহিলেন,—‘তুমি বিষ্ণুর পরমভক্ত অম্বরীষের ক্ষতি করিয়াছ, তাই স্বয়ং বিষ্ণু তোমাকে এই শাস্তি দিয়াছেন। তুমি শীঘ্র শিবের নিকট যাও— যদি তিনি কিছু করিতে পারেন।’

মুনি হতাশ হইয়া কৈলাসে শিবের নিকট ছুটিয়া গেলেন। শিবও সমস্ত কথা শুনিয়া তাঁহাকে স্বয়ং বিষ্ণুর কাছে যাইতে উপদেশ দিলেন।

অগত্যা দুর্বাসা মুনি বৈকুণ্ঠে যাইয়া বিষ্ণুর চরণে আছাড় খাইয়া পড়িলেন,—‘প্রভু, আপনার চক্রের হাত হইতে আমাকে বাঁচান, আর যে পারি না!’

বিষ্ণু কহিলেন,—‘তুমি অপরাধ করিয়াছ অম্বরীষের কাছে, আমি আর কী করিতে পারি?’

দুর্বাসা মুনি কহিলেন, ‘এখন উপায় কী করি বলুন, আপনার চক্র যে আমাকে ছাড়িতেছে না!’

বিষ্ণু কহিলেন,—‘তুমি এখনই গিয়া অম্বরীষের কাছে ক্ষমাভিক্ষা করো, ইহা ভিন্ন অন্য কোনও উপায় নাই।’

এবার দুর্বাসা মুনি ছুটিয়া গিয়া অম্বরীষের পায়ে পড়িলেন। রাজা ইহাতে অত্যন্ত লজ্জিত ও দুঃখিত হইলেন। রাজার প্রার্থনায় সুদর্শনচক্র শান্ত হইল, দুর্বাসাও প্রাণে বাঁচিয়া গেলেন।

দুর্বাসা মুনি বুঝিলেন, অম্বরীষ রাজা অতিশয় বিষ্ণুভক্ত। বিষ্ণুভক্তকে জব্দ করিতে গেলে হাতে হাতে ফল পাইতে হয়।

তখন তিনি শান্ত হইয়া অম্বরীষের চিরকল্যাণ কামনা করিয়া তাঁহার সঙ্গে আহার করিতে বসিলেন। বুঝিলেন ভক্তের জয় সর্বত্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *