মহিষাসুরের গল্প

মহিষাসুরের গল্প

বিপ্রচিত্তি নামে সেকালে এক বিরাট দৈত্য ছিল। সে নানা বেশ ধারণ করিয়া স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালে ভীষণ উপদ্রব করিয়া বেড়াইত।

বিপ্রচিত্তির কন্যা মাহিষ্মতী নানা জন্তু-জানোয়ারের রূপ ধারণ করিয়া মুনি-ঋষিদের ভয় দেখাইয়া বড়ই আমোদ উপভোগ করিত। তাঁহারা যখন ভীত হইয়া পলায়ন করিত, তখন সে নিকটে দাঁড়াইয়া হো হো করিয়া হাসিত। একদিন সিন্ধুদ্বীপ ঋষি আশ্রমে বসিয়া ধ্যান করিতেছেন, এমন সময় দৈত্যকন্যা মাহিষ্মতী একটু মজা করিবার জন্য একটা মহিষের রূপ ধারণ করিয়া তাঁহাকে গুঁতাইয়া দিল।

সিন্ধুদ্বীপ ঋষি যে-সে লোক ছিলেন না। ভীষণ তেজ ছিল তাঁহার। মহিষের গুঁতায় তাঁহার ধ্যান ভাঙিয়া গেল। চোখ লাল করিয়া তিনি মাহিষ্মতীকে অভিশাপ দিলেন,—‘আমি সব জানি, দাঁড়া তোকে মজা দেখাইতেছি; তুই নেহাৎ স্ত্রীলোক বলিয়া তোকে ভস্ম করিলাম না, তুই যে মহিষের রূপ ধরিয়া আমাকে আঘাত করিলি, সেই রূপ লইয়াই তোর জীবন কাটুক।’

ঋষির অভিশাপ শুনিয়া তো দৈত্যকন্যা শিহরিয়া উঠিল। হায়, হায়, তাহার এ কী সর্বনাশ হইল! তাহাকে সারাজীবন মহিষ হইয়া থাকিতে হইবে।

মাহিষ্মতী ঋষির পায়ে লুটাইয়া পড়িয়া বলিল,— ‘দোহাই মুনিঠাকুর, আমায় ক্ষমা করুন। এরূপ অন্যায় কাজ আমি আর কোনওদিন করিব না।’

সেকালের মুনি-ঋষিদের রাগও যেমন চট করিয়া হইত আবার অতি সহজেই তাঁহারা শান্ত হইতেন।

মাহিষ্মতীর কাতর অনুনয়ে তিনি কহিলেন,— ‘আমি যাহা বলিয়াছি, তাহা অব্যর্থ। তবে আমি তোকে আশীর্বাদ করিতেছি তোর পেটে যে ছেলে হইবে— সে হইবে ত্রিভুবনের রাজা। বিশ্বজননী মহামায়ার হাতে তাহার মৃত্যু হইবে। তখন তুই ও তোর পুত্র উভয়েই মুক্তি পাইবি।’

মুনির কথায় মাহিষ্মতী কিছুটা সান্ত্বনা লাভ করিল। আবার মুনিকে প্রণাম করিয়া প্রস্থান করিল।

এই মহিষরূপী মাহিষ্মতীর পুত্র হইল মহিষাসুর। সে বড় হইয়া অতিশয় দুর্দান্ত হইয়া উঠিল এবং একটি দৈত্যের দল গঠন করিল। উদগ্র, মহাহনু, অসিলোমা, চিক্ষুর, বাস্কল, বিড়ালাক্ষ প্রভৃতি বড় বড় দৈত্যগণ আসিয়া এই দলে ভিড়িল।

মহিষাসুরের দল বেশ ভারী হইয়া উঠিয়াছে। সে তাহার দল লইয়া চলিল স্বর্গ জয় করিতে।

দৈত্যরা স্বর্গ আক্রমণ করিয়াছে, স্বর্গের রাজা ইন্দ্র অন্যান্য দেবতাদের লইয়া দৈত্যদের বাধা দিতে গেলেন— কিন্তু দৈত্যদের সঙ্গে আঁটিয়া উঠিতে পারিলেন না। একশত বছর ধরিয়া দেবাসুরে তুমুল সংগ্রাম হইল। অবশেষে দেবতাদের পরাজিত করিয়া মহিষাসুর হইল স্বর্গের রাজা।

স্বর্গরাজ্য হারাইয়া দেবতাদের আর দুঃখের অন্ত নাই। তাঁহাদের দুঃখের কথা শুনিয়া ব্রহ্মা বিচলিত হইলেন। তিনি দেবতাদের লইয়া বিষ্ণু ও মহাদেবের কাছে গেলেন।

ব্রহ্মার মুখ হইতে সমস্ত কথা শুনিয়া মহাদেব রাগে কাঁপিতে লাগিলেন আর তাঁহার ললাট কুঞ্চিত হইতে লাগিল। বিষ্ণুর মুখ থেকে বাহির হইতে লাগিল তীব্র তেজ। এই তেজ দেখিয়া ব্রহ্মা ও মহেশ্বরের মুখ হইতেও তেজ বাহির হইতে লাগিল এবং ক্রমে ক্রমে উপস্থিত দেবতাদের মুখ হইতেও জ্যোতি বাহির হইতে আরম্ভ হইল।

দেবতাদের এই সম্মিলিত তেজ একত্রে মিলিত হইয়া এক অপরূপ নারীমূর্তির সৃষ্টি হইল। সেই জ্যোতির্ময়ী নারীমূর্তি দেবতাদের অভয় দিলেন,—‘মা ভৈঃ! ভয় করিও না, আমি ওই মহিষাসুর দৈত্যকে বিনাশ করিব।’ দেবতাগণ তখন সেই মহাদেবীকে নিজ নিজ অস্ত্রশস্ত্রে ও বসন-ভূষণে মনের মতো সাজাইয়া দিলেন। হিমালয় দিলেন দেবীর বাহন সিংহটিকে।

অস্ত্রশস্ত্র ও বসন-ভূষণে সজ্জিতা হইয়া সেই মহাশক্তি তখন এক ভয়ংকর হুংকার ছাড়িলেন, তাহাতে ত্রিভুবন থরথর করিয়া কাঁপিতে লাগিল।

মহিষাসুর এসব কিছুই জানে না। সে স্বর্গরাজ্য দখল করিয়া আমোদ-প্রমোদে মত্ত হইয়া আছে— এমন সময় দেবীর সেই প্রলয়ংকর হুংকারের শব্দ শুনিতে পাইল।

ব্যাপার কী জানিবার জন্য সে দলবল লইয়া ছুটিয়া আসিল সেই শব্দ লক্ষ্য করিয়া।

তাহার সহিত সংগ্রাম করিতে কে একজন দেবী আসিয়াছেন শুনিয়া মহিষাসুর তাহার সঙ্গীগণকে লইয়া চারিধার হইতে দেবীকে আক্রমণ করিল। দেবীও প্রচণ্ড বিক্রমে তাহাদের একে একে ধরাশায়ী করতে লাগিলেন।

কিন্তু এ কী হইল? দেবীর সঙ্গে সংগ্রাম করিতে আসিয়া ক্রমে মহিষাসুরের সমস্ত দৈত্যসেনা নিঃশেষ হইয়া গেল-এখন বাকি রহিল শুধু মহিষাসুর। দুর্দান্ত মহিষাসুর তথাপিও দমিল না।

মহিষাসুর এইবার মহিষের রূপ ধরিয়া দেবীকে তাড়া করিল। সে তাহার খুর দিয়া জগৎটাকে ক্ষতবিক্ষত করিতে লাগিল। বড় বড় পাহাড় তাঁহার দিকে ছুড়িতে লাগিল। লেজের আঘাতে সমুদ্রের জলে বন্যা বহাইয়া দেবতাদের ভাসাইতে লাগিল।

দেবী অসুরটাকে কাবু করিবার জন্য তাহাকে পাশ দিয়া বাঁধিলেন। দেখিতে দেখিতে সে একটা ভয়ংকর সিংহের আকার ধারণ করিল। দেবী খড়্গ দ্বারা সিংহের মস্তক কাটিতেই তাহার ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিল এক ভীষণ দর্শন খড়্গধারী যোদ্ধা।

তখন দেবী অনায়াসে বাণ দিয়া তাহার গলা কাটিতেই, সে হাতির রূপ ধারণ করিল। হাতিটা শুঁড় দিয়া দেবীর বাহন সিংহকে জড়াইয়া ধরিল।

দেবী এইবার হাতির শুঁড়টাকে কাটিয়া দিলেন, অমনি অসুরটা আবার মহিষের রূপ ধারণ করিল।

দেবী তখন তাঁহার পদ দ্বারা সেই মহিষকে চাপিয়া ধরিলেন। তাহাতে মহিষের দেহ হইতে অসুরের আধখানা মূর্তি বাহির হইয়া আসিল। অমনি দেবী অসুরের বক্ষে শূলের আঘাত করিয়া মহাখড়্গে তাহার মস্তক কাটিয়া ফেলিলেন। এইবার মহিষাসুর মরিল।

তখন দেবতারা উৎফুল্ল হইয়া মহাদেবীর স্তব করিতে লাগিলেন। তাঁহারা আবার তাঁহাদের হৃতরাজ্য ফিরিয়া পাইলেন।

মহিষাসুরের অত্যাচারে যেসব দেবতাগণ এতদিন প্রাণের ভয়ে লুকাইয়াছিলেন, তাঁহারা এবার আনন্দে নৃত্য করিতে করিতে বাহির হইয়া আসিলেন। তাঁহাদের জয়ধ্বনিতে আকাশ বাতাস কাঁপিতে লাগিল।

‘জয় মহামায়ার জয়’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *