গয়াসুরের কথা

গয়াসুরের কথা

দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের নিকট দৈত্যবংশের বহু বালক পড়াশুনা করিত। একদিন তাঁহার নিকট পড়িতে যাইয়া এক অসুরবংশীয় বালক অন্যান্য বালকদের প্রশ্নে একটু অপমান বোধ করিল। সে বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া তাহার মাতা প্রভাবতীকে কহিল,—‘মা আমি আর গুরুর নিকট পাঠ শিখিতে যাইব না। পিতার নাম বলিতে পারি না বলিয়া সকলে আমাকে পরিহাস করে। তুমি সত্য করিয়া বলো— আমার পিতার নাম কী?’ এই বলিয়া বালকটি ফোঁপাইয়া কাঁদিতে লাগিল।

বালকের অন্তরের ব্যথা বুঝিতে পারিয়া প্রভাবতীর চোখেও জল আসিল। তিনি কোনওরকমে তাহা সামলাইয়া পুত্রকে কহিলেন,—‘বাবা, তুই বড়ই ভাগ্যহীন-কারণ অতি শৈশবেই তোর পিতার মৃত্যু হইয়াছে।’

এই কথা শুনিয়া পুত্র কৌতূহলে আবার প্রশ্ন করিল,—‘তাঁহার নাম কী মা? কীরূপে তাঁহার মৃত্যু হইল?’

মাতা কহিলেন, ‘ধুন্দ অসুর বংশে তোর জন্ম। তোর পিতার নাম ত্রিপুর। তাঁহার মতো বীরপুরুষ ত্রিভুবনে আর কেহ ছিল না। তিনি যুদ্ধে দেবরাজ ইন্দ্রকেও পরাস্ত করেন। তখন অন্যান্য দেবতারা মহাদেবের কাছে গিয়া করজোড়ে প্রার্থনা করেন,—‘হে দেবাদিদেব মহাদেব, আপনি না বাঁচাইলে আমরা তো আর বাঁচি না— গেল মান, গেল প্রাণ।’

‘তখন মহাদেব তোমার পিতার সঙ্গে যুদ্ধ করিতে আসেন এবং সেই মহাযুদ্ধেই মহাদেবের হাতে তোমার পিতার মৃত্যু হয়। তোমার বাবা এত পরাক্রমশালী ছিলেন যে, তাঁহাকে বধ করিবার পর শিবের নাম হয়— ত্রিপুরারি।’

মাতার মুখে এই কথা শুনিয়া বালকের মুখে হাসি ফুটিয়া উঠিল। সে তৎক্ষণাৎ ছুটিয়া হাজির হইল গুরু শুক্রাচার্যের কাছে এবং অন্যান্য বালকদের সম্মুখে। তাহার বংশ-পরিচয় এবং পিতার নাম বলিয়া গুরুকে কহিল, ‘গুরুদেব, আমি আমার পিতা অপেক্ষাও বড় বীর হইতে চাই— আমাকে অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা দিন।’

সর্বজ্ঞ শুক্রাচার্য তাহার সকল কথাই জানিতেন। তিনি তাহাকে সস্নেহে কোলে টানিয়া লইলেন এবং পরম যত্নে অস্ত্রবিদ্যা শিখাইতে লাগিলেন। গুরুর নিকট শিক্ষা সমাপন করিয়া যৌবনের প্রারম্ভেই সে বাড়ি ফিরিল এবং মাতাকে প্রণাম করিয়া ত্রিভুবনের সমস্ত অসুরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করিল।

পিতৃহত্যার প্রতিশোধ লইতে হইবে। তাই এইবার সে সুমেরু শিখরে অসুর-সৈন্য সমাবেশ করিল। ইন্দ্র প্রভৃতি সব দেবতাই একে একে তাহার নিকট পরাজিত হইলেন। অবশেষে বাধিল শিবের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ। অন্যান্য দেবতারা এই যুদ্ধ দেখিয়া বিশেষ শঙ্কিত হইয়া জগদীশ্বর বিষ্ণুর নিকট গিয়া করজোড়ে স্তব আরম্ভ করিলেন।

স্তবে সন্তুষ্ট হইয়া বিষ্ণু দেবতাদের নিকট কহিলেন—‘আপনারা নির্ভয়ে ঘরে ফিরিয়া যান আমি আজই এই অসুরকে বধ করিব।’

বিষ্ণু তখন করিলেন কি, একটি বালকের রূপ ধরিয়া উপস্থিত হইলেন অসুররাজের সম্মুখে এবং অসুররাজকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন,—‘ওহে অসুররাজ, তোমার শরীরে তো শক্তি অসীম, এসো আমার সহিত মল্লযুদ্ধ করো।’ বালকের আস্পর্ধা দেখিয়া অসুররাজ হাসিয়া কহিল,—‘ওরে অর্বাচীন বালক, তুই কেন মরিতে চাহিতেছিস। জানিস না-তুই আমার অঙ্গুলির যোগ্য নহিস, আমার যে কোনও সৈন্যই তোকে পরাস্ত করিতে পারে। কেন মরিবি, যা ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়া যা।’

কিন্তু বালক নাছোড়বান্দা।

তখন মল্লযুদ্ধ আরম্ভ হইল, কিন্তু স্বয়ং বিষ্ণুও অসুররাজের সঙ্গে আঁটিয়া উঠিতে পারিলেন না। একশত বৎসর ধরিয়া এই মল্লযুদ্ধ চলিল। সেই মল্লযুদ্ধ দেখিতে দেবতারাও ভিড় করিয়া আসিলেন। অবশেষে বালকের ক্ষমতা দেখিয়া অসুররাজ মুগ্ধ হইয়া কহিল,—‘ওহে বালক, তোমার ক্ষমতায় আমি মুগ্ধ হইয়াছি। অসামান্য তোমার শক্তি। আমি সন্তুষ্ট হইয়া বলিতেছি— তুমি আমার নিকট ইচ্ছামতো বর প্রার্থনা করো।’

বালকরূপী বিষ্ণু কহিলেন,—‘যদি একান্তই বর দিবে— তবে আমার ইচ্ছা পূর্ণ করো। তুমি এখন হইতে পাষাণ হইয়া থাকো।’

বালকের প্রার্থনা শুনিয়া অসুররাজ বড়ই মুশকিলে পড়িল। কিন্তু একবার বর দিতে চাহিলে তাহা যতই কঠিন ও দুরূহ হউক না কেন তাহা দিতেই হয়। তাই অসুররাজ নিরুপায় হইয়া বালকের প্রার্থনায় রাজি হইল।

বালকরূপী বিষ্ণু তখন আনন্দিত হইয়া কহিলেন, ‘আমিও তোমাকে একটি বর দিতেছি, তোমার কীর্তি জগতে চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবে।’

অসুররাজ এইবার বুঝিল এই বালক সামান্য লোক নহেন, ইনিই সকলের ত্রাণকর্তা। তাই সে কহিল,—‘প্রভু, আমি আপনাকে এইবার বুঝিতে পারিয়াছি, আপনি ত্রিভুবনের ঈশ্বর। এইবার কৃপা করিয়া আমার মস্তকে চরণ অর্পণ করুন এবং আমার নামে এই স্থানের নাম হউক— ইহাই আমার অন্তিম ইচ্ছা।’

বিষ্ণু তখন অসুরের মস্তকে চরণ অর্পণ করিয়া কহিলেন—‘তোমার উপরে যে তর্পণ করিবে এবং পিতৃপুরুষের পিণ্ডদান করিবে তাহার পূর্বপুরুষগণ সর্বপাপ হইতে মুক্তিলাভ করিবে। এ স্থানটি মহাতীর্থে পরিণত হইবে।’

এই মহাপরাক্রমশালী অসুররাজের নাম গয়াসুর। এই নাম হইতেই ‘গয়াতীর্থে’র নাম হইয়াছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *