সাম্প্রদায়িকতা

সাম্প্রদায়িকতা

আর্যরা যখন ভারতবর্ষে আসে খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের দিকে, তখন তারা যাযাবর পশুচারী কৌমবদ্ধ একটি জনগোষ্ঠী: একটিই সম্প্রদায় বলা যায়। তাদের জীবনযাপন পদ্ধতি মূলত এক ছিল, ধর্মাচরণও ছিল যজ্ঞনির্ভর, যে-যজ্ঞে সমগ্র গোষ্ঠী মুখ্য বা গৌণ ভূমিকায় অংশগ্রহণ করত। এদের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ ঘটে প্রাগার্য অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়দের, যাদের জীবনযাত্রা প্রণালী ছিল ভিন্ন ধরনের এবং যাদের ধর্মবিশ্বাস ও অনুষ্ঠানও সম্ভবত পৃথক ছিল।

এদের ওপরে আর্যদের প্রথম প্রভাব ছিল ধর্মীয়, আর্থনীতিক ও সাংস্কৃতিক। তিন ক্ষেত্রেই কিছু কিছু চিহ্ন রেখে গেছে এ সংযোগ। যজুর্বেদে যে ধর্ম, তার মধ্যে বেশ কিছু আগন্তুক উপাদান দেখা যায় যার উৎস প্রাগার্য ধর্মে, এ কথা মনে করলে ভুল হবে না। আর্যদের পশুচর্যার সঙ্গে মিলল প্রাগার্য কৃষিকাজ, যা আর্যরা শিখে নিল কিছুকালের মধ্যেই। সাংস্কৃতিক প্রভাবের কাল দীর্ঘায়ত, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের কাছাকাছি, যখন প্রথম লেখার পরিচয় পাই শিলালেখে, তখন দেখি, ইন্দো-আর্য ভাষার ওপরে প্রাগার্য কথ্য ভাষার প্রভাব– বাক্যবিন্যাসে, শব্দগঠনে এবং কিছু কিছু তদ্ভব শব্দের সন্নিবেশে। বলা বাহুল্য, দুটি বিভিন্ন সংস্কৃতির জাতি পরস্পরের সঙ্গে ভাবের আদানপ্রদানের জন্যে বাধ্য হয়েই এমন একটি ভাষার উদ্ভাবন করবে যা উভয়ের পক্ষেই বোধ্য হবে। ব্রাহ্মীলিপিও এর সাক্ষ্য বহন করে, এর সৃষ্টি সম্ভবত এই সময়েই। এই সব পরিবর্তনের পশ্চাতে কিছু ব্রাহ্মণ্য জুলুম থাকা অসম্ভব নয়, যা বিজিতের ওপরে বিজয়ী সর্বদাই করে থাকে।

মৌর্যরা খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে ক্ষমতায় আসীন ছিলেন। এঁরা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং ভারতবর্ষে প্রথম সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। এই সময়ে বুদ্ধোত্তর যুগে, ব্রাহ্মণ্যধর্ম কিছুকাল গৌণ ভূমিকায় ছিল এবং বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণরা মৌর্যযুগে মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ভাবে সহাবস্থান করত। আবার জুলুম শুরু হয় পরবর্তী ব্রাহ্মণ্য অভ্যুত্থানের সময়ে। অজাতশত্রু শুধু যে পিতা বিম্বিসারের ওপরে অত্যাচার করেছেন তা নয়, ব্রাহ্মণ্যধর্মকে জোর করে বৌদ্ধ প্রজাদের ওপর চাপিয়ে দেন; এর ফলে বৌদ্ধরা উৎপীড়িত হয়। কল্পদ্রুমাবদানে শ্রীমতীর যে-উপাখ্যান আছে তাকে ভিত্তি করে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘পূজারিণী’ রাজাজ্ঞার বিরুদ্ধে বুদ্ধ উপাসনা করে শ্রীমতী প্রাণ হারায়। ‘দিব্যাবদানে’ নির্গ্রন্থদের ওপরে অত্যাচারের কথা পাই। এই ব্রাহ্মণ্য অভুত্থানের কালে বৌদ্ধপীড়ন যে হয়েছিল তাতে কোনও সংশয় নেই। তবে স্থানে ও কালে তার ব্যাপ্তি কম।

ভারতবর্ষে বুদ্ধের সময়ে, সম্প্রদায়ভেদ ব্রাহ্মণ্যগোষ্ঠীতে, যতদূর জানা যায়, ছিল না। মৌর্য সাম্রাজ্যের শেষ দিকেও নয়, সম্ভবত অশোকের রাজত্বের শেষ পর্বের সমসাময়িক কালে এর উদ্ভব ঘটে। তা-ও ধীরে ধীরে শতাব্দী-ব্যাপী একটা ধারা যে প্রবাহের পরিণতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অভ্যুত্থান। বৈদিক যুগে উপনিষদ পর্যন্ত সাহিত্যে এর উল্লেখ নেই। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে প্রথম শতকের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিদেশি আক্রমণ ঘটে— গ্রিক (যবন), পারদ, শক, পহ্লব ইত্যাদি। এই আগন্তুকরা নিয়ে আসে তাদের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস ও অনুষ্ঠান-প্রণালী। এরই সঙ্গে অভ্যুদয় বা পুনরুদয় ঘটে প্রাগার্য দেবকল্পনা ও উপসনাপদ্ধতির। আর্য যজ্ঞের অনুষ্ঠান ক্ষীণ হয়ে এলে, বৌদ্ধধর্মও আর্যাবর্তে ক্রমে বিলীন হয়ে গেলে, তখন প্রাগার্য ও আগন্তুক আর্য ধর্মবোধের সংমিশ্রণে যে নতুন ধর্মীয়তার সঞ্চার হয় তাতেই প্রথমবার দেখা গেল সম্প্রদায়ভেদ।

এই ভেদ বিভিন্ন উপাস্য ও উপাসনাকে আশ্রয় করে দেখা দেয়। যজ্ঞে লভ্য ঐহিক সুখ ও পরকালে স্বর্গ এ দুই-ই জ্ঞানকাণ্ডে অর্থাৎ বৈদিক সাহিত্যের শেষ দুই অংশে (আরণ্যক-উপনিষদে) পরাজয় মেনেছে আত্মজ্ঞান তথা ব্রহ্মজ্ঞানে লভ্য মোক্ষের কাছে। বৌদ্ধ, জৈনধর্ম যে নির্বাণ বা কৈবল্যের লক্ষ্য এনেছে, তাও জ্ঞান দিয়ে পাওয়া যায়, যার নাম ‘বোধি’। এর পরের যুগে সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের কাছাকাছি ওই সংমিশ্র ধর্মবোধের প্রকাশ ঘটল। এবার আর তা সমস্ত সমাজের যৌথ ভাবে আচরণীয় একটি ধর্ম নয়; সমাজের বিভিন্ন অংশ তখন বিভিন্ন উপাস্যকে প্রধান ও একান্ত জেনে তারই উপাসনায় নিযুক্ত।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে সমাজের অবসংগঠনে নানা সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এসেছিল। কৃষি ব্যাপক ভাবে হচ্ছিল, বহির্বাণিজ্যে সমৃদ্ধি বাড়ছিল, বৃত্তি অনুসারে বর্ণ ছিল না, বহু মিশ্র জাতির উদয় হয়েছিল, যারা বহু বিভিন্ন বৃত্তি অবলম্বন করত। গোষ্ঠী ও কৌম ভেঙে ‘কুল’ বা বৃহৎ যৌথ পরিবার সমাজের একক হয়ে উঠল। কৃষির কারণে বহু ‘কুল’ এক একটি অঞ্চলে স্থায়ী ভাবে বসবাস করত। গ্রামগুলিতে কৃষি, পশুপালন ছাড়াও নানা শিল্পজীবীও বাস করত। উদ্বৃত্ত শস্য ও শিল্পদ্রব্য প্রথমে নগরে ও পরে নৌবাণিজ্যের দ্বারা মধ্যপ্রাচ্য ও ইয়োরোপে পৌঁছত। সমাজের বিন্যাস বহুলাংশে পরিবর্তিত হয়ে গেল। বৃত্তিগত জাতি-বর্ণগত পার্থক্য অনুসারে নতুন এক ভাবে বিন্যস্ত এই সমাজে যে ধর্ম দেখা দিল তা সম্ভবত আগমিক বা প্রাগার্য জাতিগুলির মধ্যে আচরিত ধর্মের নতুন এক রূপভেদ। উপাস্য দেবতার মধ্যে প্রথমে প্রধান ছিলেন দুজন— ১. বিষ্ণু-নারায়রণ-বাসুদেব-কৃষ্ণ ও ২. শিব। এঁদের উদ্দেশ্য পাই খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকেই। এ দুই উপাস্যকে ঘিরে ভারতবর্ষের প্রথম সাম্প্রদায়িক উপাসনাগোষ্ঠী সৃষ্ট হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে ও শতকের পর শতকে। এঁদের মধ্যে মতগত বিরোধ ছিল, যার প্রথম স্পষ্ট প্রকাশ মহাভারতে, প্রধানত অনুশাসনপর্বে এবং অন্যত্রও। পরবর্তী কালে আরও নানা দেবদেবীর উত্থান ঘটে। রামায়ণ-মহাভারতেই দেবী দুর্গা, কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং আরও দু’-চারটি গৌণ দেবী এবং সূর্য, চন্দ্র, গণেশ, কার্তিকেয়, নবগ্রহ ইত্যাদির প্রবেশ দেখতে পাই। প্রত্যেক দেবতাকে ঘিরে স্বতন্ত্র উপাসকমণ্ডলী গড়ে ওঠে, এঁরা প্রত্যেকেই মনে করতেন তাঁদের উপাস্য দেবতাই সমূহ ঐহিক বিপদ নাশ করে সকল পার্থিব সুখ, স্বর্গ এবং অন্তে মোক্ষ দিতে পারেন। তবে অন্য সম্প্রদায় সম্বন্ধে কখনও কখনও অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য থাকলেও সাধারণ ভাবে একটা ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা ছিল। যার ফলে বিভিন্ন উপাসকগোষ্ঠী শান্তিতে সহাবস্থান করতেন।

৪৫৫ খ্রিস্টাব্দে জুনাগড় শিলালেখে স্কন্দগুপ্ত পারস্যের সাসানিডদের সম্বন্ধে ‘ম্লেচ্ছ’ বলে উল্লেখ করেন। এর পূর্বেই মহাভারতে ‘ম্লেচ্ছ’শব্দ আছে। ঘৃণ্য ও সমাজে অপাঙক্তেয়দের মধ্যে ম্লেচ্ছ, শবর, পুল্কস, শ্বপাক, চণ্ডালদের নাম পাই। পরে নবম দশম শতক থেকে ম্লেচ্ছ শব্দ আরবদের বোঝাত। এ শব্দ তখন ঘৃণাব্যঞ্জক।

খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে আরবরা বারবার সিন্ধু আক্রমণ করে। এ ঘটনার বিবরণ স্থানীয় ঐতিহাসিকের রচনা ‘চাচনামাহ্’তে আছে। যদিও তার সব খুঁটিনাটি তথ্য গ্রহণযোগ্য নয়, তবুও মূল কাহিনির ধারাতে দেখতে পাই বারবারই আক্রমণকারী পরাজিত হয়েছে, শেষবারে সিন্ধুনিবাসী ছোট ছোট বৌদ্ধগোষ্ঠী (সব বৌদ্ধরা নয়) ও কিছু ব্রাহ্মণ্যগোষ্ঠীও সিন্ধুর রাজা দাহর (বা দাহির)-এর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে ও বিধর্মী আক্রমণকারীদের সাহায্য করে। প্রলম্বিত যুদ্ধে লোকক্ষয়ের প্রতীকারার্থে শান্তিকামী বৌদ্ধরা এ কাজ করে থাকতে পারেন। আবার সিন্ধুর হিন্দু রাজার প্রতি তাঁদের আনুগত্যের অভাব ছিল কোনও কারণে, এমনও হতে পারে, কিন্তু আগন্তুক আক্রমণকারীদের দেশজয়ের ফলে রাষ্ট্রশক্তি তাদের হাতে চলে গেলে পরে কিছুকাল মোটের ওপর শান্তিতে সহবসতি করে দু’পক্ষ। বিশ্বাসঘাতকরা আর্থনীতিক সুবিধা পায় বিজেতাদের কাছ থেকে— ভূমি, অর্থ, সম্পত্তি। মাহমুদ গজনভি (৯৯৯–১০৫০) যখন সিন্ধুর শাসকরূপে আসেন তখন থেকে বলপূর্বক ধর্মান্তরীকরণ ব্যাপক ভাবে শুরু হয় এবং দ্বাদশ শতক পর্যন্ত চলতে থাকে।

যখন পর্যন্ত ধর্মান্তর করা শুরু হয়নি তখনও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি, সহিষ্ণুতা আদানপ্রদান ছিল। যেমন ছিল পূর্বের বৈষ্ণব, শাক্ত, শৈব, গাণপত্য, সৌর ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে। এবং এ সব সম্প্রদায়ের সংখ্যা বা নাম অগণ্য, অঞ্চলভেদে যুগভেদে সমস্ত পৌরাণিক দেব-দেবী, দেবায়িত গ্রহনক্ষত্র, সাধু-সন্ত সকলেরই পৃথক সম্প্রদায় ছিল। লৌকিক, আদিবাসী, দ্রাবিড়, অস্ট্রিক দেব-দেবীর কত উত্থান পতন, বিকাশ, প্রতাপ, অবক্ষয় হয়েছে। প্রত্যেকের জন্য পৃথক উপাসনাগোষ্ঠী উপাসনাপদ্ধতি স্তবমন্ত্র নির্মিত হয়েছিল। নিজস্ব অভিরূচি অনুসারে মানুষ বেছে নিত তার আরাধ্য ইষ্টদেবতা, কিন্তু প্রতিবেশীর ইষ্টদেবতাকে মনে মনে নিজের দেবতার চেয়ে হীন ভাবলেও তার উপাসনা, ভক্তি শ্রদ্ধাকে উপেক্ষা করত না, বরং প্রচ্ছন্ন একটা ভয়মিশ্রিত সমীহ ছিল। ভয়, কারণ সে দেবতাটি যদি জাগ্রত হন তা হলে তাঁকে হীন জ্ঞান করায় বিপদ থাকতে পারে। সামাজিক ভাবে কোনও যুগে কোনও কোনও অঞ্চলে দুই বা তিন সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরকে পরিহার করেছে, কিন্তু সাধারণ ভাবে সামাজিক মেলামেশায় বাধা সৃষ্টি করেনি কোনও সাম্প্রদায়িক ধর্মবিশ্বাস।

বাধা এল যখন বিশ্বাস থাক না থাক ধর্মকে ওপর থেকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হল রাজশক্তির জোরে। ইসলাম ভারতে অনুপ্রবেশ করার পরেও সিন্ধুদেশে এ নিয়ে বিদ্বেষ বা পরস্পরের সংহারের চেষ্টা ছিল না। তাই দেখি, দশম শতকের ‘চিঞ্চনী’ ভূমিদান পত্রে আরব শাসনকর্তা মধুমতী (অর্থাৎ মহম্মদ) ভবানীমন্দিরে জমি দিচ্ছেন। পশ্চিমভাগ তাম্রলেখে রাজা শ্রীচন্দ্র হিন্দু-বৌদ্ধ দুই সম্প্রদায়ের মঠে-মন্দিরে দান করছেন, সে-ও ওই দশম শতকে। অর্থাৎ যখন পর্যন্ত বিভাজন শুধু ধর্মগত, তখন এর সঙ্গে অত্যাচার জড়িত নয়। উল্টোদিকে বহু পূর্বে খ্রিস্টীয় প্রথম দ্বিতীয় শতকে মথুরা শিলালেখে দেখি রাষ্ট্রশক্তিতে সমাসীন বৌদ্ধ রাজা ব্রাহ্মণ্য নাগ মন্দিরকে ভেঙে বৌদ্ধমঠে পরিণত করছেন। যেমন ব্রাহ্মণ্য রাজশক্তি বৌদ্ধদের ওপরে কখনও কখনও অত্যাচার করেছে, বহু মঠ ভেঙে মন্দিরে পরিণত করেছে। বিশ্লেষণ করলে যে সত্যটি চোখে পড়ে তা হল, দু’টি ভিন্ন ধর্মের মধ্যে নিছক ধর্ম বা সম্প্রদায়গত কারণে বিভেদ থাকলেও সংঘর্ষ বাধে না। সংঘর্ষ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রশক্তির ধর্ম, তারই সমর্থনে বিরুদ্ধ ধর্মাবলম্বীর সংহার, অবদমন অত্যাবশ্যক হয়ে ওঠে। প্রাগার্যদের সংস্কৃতির ওপরে আর্যায়নের প্রভাবও এই চেহারাতেই দেখা গেছে। বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশে যুগ স্বল্পস্থায়ী, তার অত্যাচার করবার ক্ষমতাও ছিল সীমাবদ্ধ, তবু দাহিরের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে বহিঃশত্রুর জয় সুনিশ্চিত করেছিল সিন্ধুর কিছু বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যগোষ্ঠী। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনর্বার প্রতাপ বৃদ্ধি হল গুপ্তযুগে, তখন বৌদ্ধরা সংখ্যায় ও প্রতিষ্ঠায় নগণ্য, তাই রাষ্ট্রশক্তি তাকে শত্রুজ্ঞান করেনি। তবু বৌদ্ধসাহিত্যে বেশ কিছু ব্রাহ্মণ্য-অত্যাচারের সাক্ষ্য রয়ে গেছে। এ অত্যাচার ওই রাষ্ট্রশক্তির একচ্ছত্র দম্ভের প্রকাশ। ইসলাম যখন শুধু ধর্ম হিসেবে প্রবেশ করল তখন প্রথমে প্রায় তিনশো বছর আর একটা সম্প্রদায়ের মতোই বহুধাবিভক্ত ব্রাহ্মণ্য সম্প্রদায়ের ও বৌদ্ধ, জৈনদের পাশাপাশি শান্তিতে বাস করেছে। রাষ্ট্রশক্তিতে সমাসীন হয়েও বিধর্মীকে ভূমি ও অর্থদানে কাতর হয়নি প্রথম পর্যায়ে। যখন আর্থনীতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষমতা সংহত হল মাহমুদ গজনভির আমলে তখনই ধর্মান্ধতা প্রতিস্পর্ধীর রূপে নখদন্ত প্রকাশ করল। তখন ধর্মান্তর গ্রহণে অনিচ্ছুক প্রজার হন্তারক হল রাষ্ট্রশক্তি। এটা ধর্মবিশ্বাসের জন্যে অবশ্যই নয়, শক্তির অবিসংবাদিত স্বীকৃতির জন্যে। না হলে খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দশম শতকে এ দেশে যে মুসলমানরা বাস করেছে তারাও তরবারি হাতে সংহারকের ভূমিকায় দেখা দিত।

দেখা যাচ্ছে, মাত্র একটি বস্তু ধর্মবিশ্বাসকে ধর্মান্ধ আততায়ী ভূমিকায় পরিণত করতে পারে, তা হল রাষ্ট্রশক্তি। ওই ক্ষমতার সাহচর্যেই ধর্ম আর ধর্ম থাকে না, রাষ্ট্রশক্তি প্রতিষ্ঠার অস্ত্র হয়ে ওঠে। আজ সারা ভারতবর্ষ জুড়ে হিন্দু মহাসভার ছানাপোনা— রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বজরঙদল, শিবসেনা, আনন্দমার্গ, আমরা বাঙালী, সন্তান দল, হরেকৃষ্ণ ইত্যাদি যত পল্লবিত হিন্দুমাহাত্ম্য-প্রচারী দল গজিয়ে উঠেছে বর্ষায় ব্যাঙের ছাতার মতো, নিত্য গজাচ্ছে ছোট ছোট ভিন্ন ভিন্ন ‘মা’ ও ‘বাবা’র ছত্রছায়াতলে, তাদের প্রসাদে পুষ্ট হয়ে, তারা কেউ প্রকাশ্যে কেউ বা ছদ্মবেশে ক্ষমতার কাঙাল। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্যে এরা না করতে পারে এমন কিছু নেই। যেহেতু ভারতীয়রা ‘ধর্মভীরু’ তাই এরা বা কোনও বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক তথাকথিত ‘সন্ন্যাসীদল’ যখন ক্ষমতার সঙ্গে ধর্মকে একীভূত করে রঙিন রামরাজ্য ইত্যাদি মোহের সৃষ্টি করতে চায় তখন তারা ভুলে যায় যে, কিছু লোককে কিছুদিন ভোলানো যায়— সকলকে চিরদিন ভোলানো যায় না। তবে এ কাজের জন্যে ভাগ্যের হাতে ভার দিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকলে চলবে না। রাষ্ট্রশক্তি দখলের মুখ্য ভূমিকাটা প্রকাশ করে দিতে হবে, তথাকথিত ধর্মযুদ্ধের আড়াল থেকে। মুখোশ খুলে এদের ক্ষমতালোলুপ চেহারাটা প্রকাশ করে তার বিরুদ্ধে সুস্থ জনমতকে সংহত করাই এখন শুভবুদ্ধিমান মানুষের প্রাথমিক কাজ।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *