শেষ সময়

৭. শেষ সময়

দাক্ষিণাত্য বিজয়

আমি এই দুনিয়ার মানুষদেরকে খুবই লোভী দেখেছি, আওরঙ্গজেব আলমগিরের মতো সম্রাট একেবারে বিনা কারণে এত ব্যাকুলতা ও আবেগ নিয়ে দুর্গ দখল করেন যে মনে হয় তিনি ব্যক্তিগতভাবে কিছু পাথরের স্তূপের জন্য হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটছেন ।
–হিন্দু সৈনিক ভীমসেন স্যাক্সেনার ফারসি স্মৃতিকথা, ১৭০৭

যদি কোনো দরবেশ অর্ধেক রুটি খান, তবে তিনি বাকিটা দেবেন কোনো গরিবকে।
রাজা কোনো পুরো ভূখণ্ড জয় করলেও তিনি আরেকটির জন্য ব্যাগ্র হয়ে ওঠেন।
–সাদি, গুলিস্তাঁ

আওরঙ্গজেব ১৬৮০-এর দশকের প্রথম দিকে দিল্লির ময়ূর সিংহাসন পেছনে ফেলে দাক্ষিণাত্যের দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি দাক্ষিণাত্যে মোগল সম্প্রসারণ অভিযানে একের পর এক কমান্ডারকে পরিচালনা করছিলেন, কিন্তু কোনো কিছুতেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাননি। দাক্ষিণাত্যের প্রতি মোগলদের আকর্ষণ ছিল সেই আকবরের আমল থেকে, আগের শতকে তারা ওই এলাকায় অনেকগুলো সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল। কিন্তু আওরঙ্গজেব দক্ষিণ ভারত জয় করার জন্য নজিরবিহীন সম্পদ নিয়োজিত করেছিলেন, নিজেও জীবনের শেষ দশকগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে কাটিয়েছেন ।

আওরঙ্গজেব তার সব জীবিত ছেলে (যুবরাজ আকবর ছাড়া, তিনি ছিলেন বিদ্রোহী) ও হেরেমসহ বিপুলসংখ্যক সহকর্মী নিয়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গেলেন। চলমান তাঁবু শিবিরের সাথে নিশ্চিতভাবেই ভ্রাম্যমান বাজার, সেনাবাহিনী, আমলাতান্ত্রিক কর্মকর্তা ও চাকর-বাকরের দল ছিল। কয়েক মাস পথ চলার পর কাফেলা দাক্ষিণাত্যে পৌঁছে, বিজয়ের দিকে দৃষ্টি ফেললেন আওরঙ্গজেব ।

মোগল সম্রাটেরা অনেক সময়ই চলমান অবস্থায় থাকতেন, আওরঙ্গজেব সম্রাটের সাথে রাজধানী নিয়ে চলাচল করার মহান মোগল ঐতিহ্য অনুসরণ করেছিলেন। তবে আওরঙ্গজেবের পদক্ষেপে অভিনবত্ব যা ছিল তা এই যে তিনি রাজধানী স্থায়ীভাবে দক্ষিণ দিকে সরিয়ে নেন। তার অনুপস্থিতিতে ও জনসংখ্যা বেশ কমে যাওয়ায় অনেকের কাছে দিল্লি পরিণত হয় ভুতুরে নগরীতে। লাল কেল্লার কক্ষগুলো ধূলিমলিন হয়ে সফরকারী দূতদের যাওয়ার অনুপযুক্ত বিবেচিত হয় ।

ভূখণ্ডগত সম্প্রসারণের পরিভাষায় আওরঙ্গজেব তার দাক্ষিণাত্য অভিযানে নজিরবিহীন সাফল্য লাভ করেন। উপমহাদেশের দক্ষিণাংশজুড়ে মোগল নিয়ন্ত্ৰণ সম্প্রসারণের জন্য তিনি সামরিক ও কূটনীতি উভয় সম্পদই ব্যবহার করেন । কিন্তু আওরঙ্গজেব জীবিত কালেই দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে ইঙ্গিত দিতে থাকে যে মোগল সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত ভালো নয়। আওরঙ্গজেবের শেষ দশকগুলোর নির্মম আক্রমণ ও সীমাহীন অবরোধ ছিল কৃত্রিমভাবে সাফল্যপূর্ণ, তবে চূড়ান্তভাবে ফাঁপা ।

দাক্ষিণাত্যে আওরঙ্গজেবের অনেক বিজয়ের মধ্যে বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয় ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, অবশ্য তা ছিল বেশ ব্যয়বহুলও ।

আওরঙ্গজেব ১৬৮৫ সলে বিজাপুর অবরোধ করেন। এটি ১৪৮৯ সাল থেকে আদিল শাহি রাজবংশের মাধ্যমে শাসিত হতো, তাদের সেনাবাহিনীতে সদস্য ছিল ৮০ হাজার। বিজাপুরের শাসক সিকান্দারকে তার ৩০ হাজার লোকসহ নগরীর সুরক্ষিত প্রাচীরগুলোর অভ্যন্তরে ১৫ মাস ধরে আটকে ফেলা হয়। ক্ষুধায় উভয় পক্ষের অনেক লোক মারা যায়, কিন্তু সিকান্দার আদিল শাহ আত্মসমর্পণ করার আগে পর্যন্ত মোগলরা অবরোধ প্রত্যাহার করেনি। পরাজিত শাসক ১৬৮৬ সালে আওরঙ্গজেবের কাছে এসে মোগল সার্বভৌমত্ব গ্রহণ করার ব্যাপারে তার ইঙ্গিত নিশ্চিত করতে ভূমিতে নত হন ।

কুতুব শাহি রাজবংশ নিয়ন্ত্রণ করত গোলকোন্ডা। ১৫১৮ সালের দিক এই রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের মাধ্যমে পরের বছরই মোগল বাহিনীর কাছে এর পতন ঘটে। মোগলরা প্রথমে কুতুব শাহি সেনাবাহিনীর বেশির ভাগ অংশকে গোলকোন্ডা দুর্গে তাড়িয়ে তারপর অবরোধ আরোপ করে (চিত্র ৬)। মোগল সেনাবাহিনী আট মাস ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে। এ সময় তারা কুতুব শাহি বাহিনীকে খাদ্য, পানি ও শক্তিবৃদ্ধি থেকে বঞ্চিত করে। এ ধরনের বঞ্চনা আর সহ্য করতে না পেরে এক কর্মকর্তা এক রাতে ফটক সামান্য খুলে চলে যাওয়ার জন্য আওরঙ্গজেবের কাছ থেকে ঘুষ নেন। মোগল বাহিনী দ্রুততার সাথে তাতে প্রবেশ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কুতুব শাহি রাজ্য গ্রহণ করে, এর বিখ্যাত হিরার খনিগুলো মোগল পতাকার অধীনে নিয়ে আসে ।

গোলকোন্ডার পর আওরঙ্গজেবের কাছে প্রধান বিরোধী হিসেবে টিকে থাকে কেবল মারাঠারা। মারাঠা নেতারা ১৬৯৮ সালে মোগলদের কাছে তামিল নাড়ুর দুর্গ জিনজি (গিনগি) খোয়ায়। ১৬৯৯ থেকে ১৭০৬ সাল পর্যন্ত আওরঙ্গজেবের বাহিনী মারাঠাদের এক ডজন দুর্গে আক্রমণ চালায়, মোগল সীমান্ত বৃদ্ধি পায়, প্রায় পুরো উপমহাদেশ তাদের হাতে চলে আসে। সামগ্রিকভাবে আওরঙ্গজেব চারটি নতুন মোগল প্রদেশ যুক্ত করেন, যা সম্মিলিতভাবে ছিল পুরো মোগল সাম্রাজ্যের এক চতুর্থাংশের চেয়ে বেশি। তবে এই মোগল দখলদারিত্ব হয়েছিল স্বল্পস্থায়ী। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যেই মোগলরা দাক্ষিণাত্যে তাদের সব অর্জন খুইয়ে ফেলে; সাম্রাজ্য সঙ্কুচিত হয়ে আসতে থাকে ।

এমনকি আওরঙ্গজেবের জীবনকালেও দাক্ষিণাত্যে সামরিক অভিযানে মোগল রাষ্ট্রের জন্য বড় বড় সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। অব্যাহত সঙ্ঘাতে কোষাগার খালি হয়ে পড়ছিল, অনেক অভিজাত সদস্যের ইচ্ছা নষ্ট হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে রাজপুত ও উত্তর ভারতের অন্যান্য এলাকার মানুষ দক্ষিণ ভারতে দশকের পর দশক ধরে কাটাতে বিরক্ত হয়ে পড়েছিল। এলাকাটি ছিল তাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে, সেখানকার জলবায়ু, সংস্কৃতি ও জনসাধারণকে নিজের মনে করত না তারা। উদাহরণ হিসেবে উত্তর প্রদেশের কায়স্থ বর্ণের ভীমসেন স্যাক্সেনার কথা বলা যেতে পারে। তার পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে মোগলদের অধীনে কাজ করেছে। তিনিও খোলামেলাভাবে সফর ও পরিবার থেকে দীর্ঘ সময় আলাদা থাকার কষ্টের কথা বলেছেন । তিনি দক্ষিণ ভারতীয়দের প্রতি তার প্রতি বিতৃষ্ণা প্রকাশ করে তাদেরকে পুরোপুরি বিদেশী লোক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ১৬৯০-এর দশকের মধ্যভাগে দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধগুলো সম্পর্কে ভীমসেন যা লিখেছেন তাতে আধুনিককালের দৃষ্টিতে বেশ আপত্তিকর মনে হবে। তিনি দক্ষিণের হিন্দুদের সম্পর্কে লিখেছেন : ‘তারা কালো বর্ণের, বাজে গড়নের ও কুৎসিত চেহারার। আগে দেখা হয়নি, এমন কারো সাথে যদি রাতের অন্ধকারে সাক্ষাত হয়, তবে সে হয়তো ভয়েই মরে যাবে।’ এ ধরনের লোকদের মুখোমুখি হওয়াকে তারা বিরক্তিকর মনে করত, অনেকে ভাবত যে মোগল চাকরি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে।

অন্য মোগল কর্মকর্তাদের কাছে অবশ্য দক্ষিণের জীবন সহ্যকর বলেই মনে হয়েছিল। তবে মোগল মনসব ব্যবস্থা নিজের ভারেই ভেঙে পড়ে ছিল। অভিজাতদেরকে আয়ের উৎস ভূমি পাওয়ার (জায়গির) জন্য প্রায়ই তাদেরকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো। ইতোমধ্যেই মোগল রাষ্ট্র তার কাছ থেকে যে নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য পাওয়ার প্রত্যাশা করত, ওই সব সৈন্যের বেতনের জন্য যে সম্পদ ব্যয় করতে হতো, তা এমন অবস্থায় তাদের কাছে থাকত না। বিশ্বাসঘাতকতা করা ও দলত্যাগ ছিল সাধারণ ঘটনা ।

জিনজি অবরোধের সময়কার অস্থিরতা এমন কিছু ইঙ্গিত দিয়েছিল যা দাক্ষিণাত্যের বছরগুলোতে অনেক মোগল সৈন্য ও অভিজাতকে হঠাৎ করে অভিভূত করে ফেলেছিল। আওরঙ্গজেব ১৬৯৮ সালে জিনজি দখল করেন, তবে তা হয়েছিল আট বছর অবরোধের পর। এত দীর্ঘ অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি যুক্তিগ্রাহ্য করা কঠিন। পর্যবেক্ষকেরা এজন্য কমান্ডার জুলফিকার খানকে দায়ী করেন। তাদের মতে, এই কমান্ডার দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিশীল ছিলেন না। এ নিয়ে অনেক গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। এর একটি ছিল এই যে তিনি জিনজি নিয়ন্ত্রণকারী মারাঠাদের সাথে গোপন আঁতাত করেছিলেন । তাছাড়া তিনি হতশ্রী কান্দহার অভিযানেও যেতে না চাওয়ায় বিজয় সম্পন্ন করার কাজে সময়ক্ষেপণ করছিলেন। কারণ, এর পরই তাকে সেখানে পাঠানো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। যাই হোক না কেন, একটি অবরোধ অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘায়িত হওয়ায় মনে হচ্ছে যে সেনাবাহিনীর নৈতিক শক্তি ও রাজকীয় কর্তৃত্ব শিথিল হয়ে যাওয়া ।

আওরঙ্গজেবের লোকজন দোদুল্যমান হয়ে পড়লেও বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিযানও বাড়াচ্ছিলেন আওরঙ্গজেব। সম্রাট তার জীবনের ৬০, ৭০ ও ৮০-এর দশকগুলো দাক্ষিণাত্যে কাটানোর পাশাপাশি প্রায়ই ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধ ও অবরোধ তদারকি করতেন। ভীমসেনের ভাষায়, খুব একটা ইতিবাচকভাবে নয়, ‘[আওরঙ্গজেব] ব্যক্তিগতভাবে কিছু পাথরের স্তূপের জন্য হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটছেন।’ আওরঙ্গজেব তার ক্রমবর্ধমান তৎপরতার মাধ্যমে সাফল্য লাভ করছিলেন, সুস্থ বা অসুস্থ থাকুন, সৈন্যদল পরিচালনার নির্দেশ দিয়েই যাচ্ছিলেন। তিনি এক প্রশাসককে লিখেছেন, ‘যতক্ষণ এই নশ্বর জীবনের একটি শ্বাসও বাকি থাকবে, ততক্ষণ শ্রম আর কাজ থেকে মুক্তি নেই।’ অফিসারেরা পছন্দ না করলেও দাক্ষিণাত্যে বাস করাটা সম্রাট নিজে উপভোগ করতেন। আগের যুবরাজ আমলে তিনি তার বাবাকে দাক্ষিণাত্যের টাটকা বাতাস, মিষ্টি পানি আর ব্যাপক চাষাবাদের প্রশংসা করে লিখেছিলেন ।

দাক্ষিণাত্যে আওরঙ্গজেবের অনেক কার্যক্রমের জন্য মানুষের জীবন ও জীবিকার দিক থেকে উচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে। মোগল ও মারাঠা উভয়েই গ্রাম এলাকা জ্বালিয়ে দিয়েছিল, কোনো কোনো এলাকায় দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল । মোগল অবরোধের ফলে অনেক এলাকায় বিপুলসংখ্যক প্রাণহানি ঘটত, আবার এর পর নেমে আসত রোগ-বালাই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৯০ সালে পাঁচ বছর আগের তুলনায় বিজাপুরের জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে। এখানেও মোগল আক্রমণের পরপরই কলেরার বিস্তার ঘটে। করুণা লাভের জন্য আকুল আবেদনে সম্প্রসারণ অভিযান পরিত্যক্ত করা বা তার কৌশলে পরিবর্তন ঘটত না। অবশ্য কোনো কোনো সময় সামান্য স্বস্তির ব্যবস্থা করা হতো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভয়াবহভাবে আক্রান্ত এলাকায় তিনি কর মওকুফ করে দিতেন, খরার কারণে ১৬৮৮-৮৯ সময়কালে হায়দরাবাদের জিজিয়া বাতিল করেছিলেন, দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধের ক্ষতির কারণে ১৭০৪ সালে পুরো দাক্ষিণাত্যের জিজিয়া কর থেকে রেহাই দিয়েছিলেন। মোগল ও মারাঠা সঙ্ঘাতের ফলে যে কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, এসব পদক্ষেপ তাতে সামান্যই স্বস্তি সৃষ্টি করতে পারত ৷

আওরঙ্গজেব ছিলেন সম্রাট। ফলে তার সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের জন্য বিশেষ কোনো কারণ দেখানোর প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু তারপরও বৃদ্ধ বয়সে ও অনেক মোগল কর্মকর্তার আরো যৌক্তিক বিবেচনাকে অগ্রাহ্য করে আওরঙ্গজেব কেন এ ধরনের আগ্রাসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, সে প্রশ্ন জাগতেই পারে। সামনাসামনি যুদ্ধে মোগলদের সমকক্ষ না হওয়া সত্ত্বেও রাজকীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্র, আকস্মিক ও গেরিলা কৌশল অবলম্বন করে অনেক বেশি কার্যকারিতার পরিচয় দেওয়া মারাঠা যোদ্ধাদের অব্যাহত প্রতিরোধে কি আওরঙ্গজেব হতাশ হয়েছিলেন? আওরঙ্গজেব কি বিশ্বাস করতেন যে আরো ভূখণ্ড মোগল রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হবে? কিভাবে সরে আসতে হবে, তা না জানার কারণেই কি তিনি দক্ষিণ ভারত জয়ের জন্য তার জীবনের এতটা অংশ নিবেদন করেছিলেন? কারণ যাই হোক না কেন, মনে হচ্ছে, আরো বেশি বেশি ভূখণ্ড জয়ের নেশায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলেন আওরঙ্গজেব ।

মৃত্যুন্মুখ রাজা

এই দুনিয়ার যন্ত্রণা তো খুবই ভয়াবহ, আর আমি স্রেফ একটা কোমল কলি–
আমি কিভাবে সূর্যঘড়িতে মরুভূমির সব বালি ঢেলে দেব?
–আওরঙ্গজেব

আওরঙ্গজেব তার শেষ বয়সের বড় একটি অংশ যুদ্ধক্ষেত্রে কাটালেও নিজের জীবন ও মোগল রাষ্ট্রের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মতো সময় বের করতে পেরেছিলেন। সম্রাট দাক্ষিণাত্য দিয়ে পথ চলার সময় (ক্রমবর্ধমান হারে তাকে বহন করে নেওয়া হচ্ছিল, চিত্র ৭) জেনারেল, রাজকীয় কর্মকর্তা ও পরিবার সদস্যদের কাছে পত্র লিখতেন। এসব নথিপত্র তার অন্তঃদৃষ্টি ও নিজের জীবনের ব্যাপারে অনুশোচনা, ভারতবর্ষের ইতিহাসে তার স্থান, মোগল সাম্রাজ্যের বিশাল অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছে।

আওরঙ্গজেবের শেষ বয়সের কিছু উদ্বেগ ছিল দুনিয়াবি ও চরমভাবে মানবীয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তিনি বারবার তার অন্যতম প্রিয় ফল আম নিয়ে লিখেছেন। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের আমল থেকেই মোগলরা আম ভালোবাসত। তিনি তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘আম যখন ভালো, তখন সত্যিই ভালো।’ আওরঙ্গজেব তার ছেলে ও কর্মকর্তাদের ঝুড়ি ঝুড়ি আম পাঠাতে বলতেন, তারা তা করলে তিনি তাদের প্রশংসা করতেন। আওরঙ্গজেব অপরিচিত প্রজাতির আমের নাম রাখতেন সংস্কৃত শব্দভাণ্ডার থেকে উৎপত্তি হওয়া হিন্দি শব্দে, যেমন সুধারস, রসনাবিলাস ইত্যাদি। হাতে আসা আমের চালান নষ্ট হয়ে গেলে তিনি অসন্তুষ্ট হতেন।

আওরঙ্গজেব তার যৌবনকালের কথাও স্মরণ করতেন, পরিবারের সাথে তার দিনগুলো ছিল অনেক সুখের ছিল বলে মনে করতেন। যুবরাজ আযমকে লেখা ১৭০০ সালের এক চিঠিতে তার ছেলের শৈশবের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছেন। রাজকীয় ঢোলের শব্দ নকল করে আযম হিন্দি শব্দে বাবা সম্বোধন করে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘বাবাজি, ধুন, ধুন।’ শেষ বয়সে আওরঙ্গজেব বিশেষভাবে উদয়পুরির (তার সবচেয়ে ছোট ছেলে কাম বকশের মা । আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো, তিনি ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ) সঙ্গ উপভোগ করতেন। মৃত্যুশয্যায় কাম বকশকে লেখা এক চিঠিতে আওঙ্গজেব বলেন যে অসুস্থতা সময় উদয়পুরি তার সাথে আছেন এবং মৃত্যুর পর তিনিও অল্প সময়ের মধ্যে তার সঙ্গী হবেন। উদয়পুরি মারা যান ১৭০৭ সালে, আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর কয়েক মাস পর ৷

শেষ বছরগুলোতে আওরঙ্গজেব প্রায়ই পেছনের সময়ে ফিরলেও সামনের দিকে তাকাতেন এবং যা দেখতেন তা অপছন্দ করতেন ।

আওরঙ্গজেব তার সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত নিয়ে আশঙ্কায় ছিলেন। এর পেছনে যুক্তিগ্রাহ্য কারণও ছিল। মোগল সাম্রাজ্যকে চেপে ধরা আর্থিক ও প্রশাসনিক ভয়াবহ সমস্যা ছাড়াও এ ধরনের জটিলতা কাটানোর মতো সক্ষমতাসম্পন্ন কাউকে আশপাশে দেখতে পাননি তিনি ।

মৃত্যুর সময় আওঙ্গেজেবের তিন ছেলে জীবিত ছিলেন (অপর দুজন বাবার আগেই মারা গিয়েছিলেন)। এদের কাউকেই তিনি রাজা হওয়ার উপযুক্ত মনে করতেন না। উদাহরণ হিসেবে অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে মোয়াজ্জেমকে লেখা একটি চিঠির কথা বলা যায়। এতে কান্দাহার জয় করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি তাকে তিক্ত ভাষায় গালাগাল করে বলেন, ‘অপদার্থ ছেলের চেয়ে মেয়েও অনেক ভালো।’ তিনি এরপর মোয়াজ্জেমকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘এরপর তুমি কিভাবে এই দুনিয়ায় তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে এবং সর্বোচ্চ পবিত্র মহামান্বিত খোদাকে মুখ দেখাবে?”

আওরঙ্গজেব বুঝতে পারেননি যে মোগল সিংহাসনে আরোহণের জন্য তার ছেলেদের দুর্বল প্রস্তুতির জন্য অনেকাংশে দায়ী তিনিই। ইতিহাসবিদ মনিস ফারুকি বিস্তারিতভাবে লিখেছেন কিভাবে আওরঙ্গজেব রাজকীয় অন্দরমহলে হস্তক্ষেপ করে মোগল রাজপুত্রদের শৃঙ্খলিত করে রেখে ছিলেন, যুবরাজদের স্বায়ত্তশাসন খর্ব করেছিলেন। ১৭০০-এর দিক থেকে আওরঙ্গজেব ছেলেদের বিপরীতে নাতিদের বেশি আনুকূল্য প্রদান করতে থাকেন, এটিও ছেলেদের অবস্থান আরো নাজুক করেছিল। অনেক সময় আওরঙ্গজেব যুবরাজদের চেয়ে অভিজাতদের অগ্রাধিকার দিতেন। যেমন ১৬৯৩ সালে জিনজিতে মারাঠা শাসক রাজারামের সাথে অবৈধ আলোচনা শুরু করার পর আওরঙ্গজেব তার সর্বকনিষ্ঠ ছেলে কাম বকশকে গ্রেফতার করার দায়মুক্তি সুযোগ দিয়েছিলেন তার প্রধান উজিড় আসাদ খান ও সামরিক কমান্ডার জুলফিকার খানকে। আওরঙ্গজেবের তাৎপর্যপূর্ণ শেষ ইচ্ছায় তিনি মোগল সাম্রাজ্যকে তিন ছেলের মধ্যে ভাগ করে দেন, আসাদ খানসহ কয়েকজনকে স্থায়িত্ব দিয়ে বিশেষ কর্মকর্তা নিয়োগ করেন ৷

মোগল যুবরাজদের প্রজন্মগুলো বিশাল নেটওয়ার্ক নির্মাণ করতেন, এটিই নতুন নতুন গ্রুপকে মোগল পতাকাতলে নিয়ে আসত, অবিভক্ত সাম্রাজ্যের মুকুটের জন্য যুবরাজদের লড়াই করতে সক্ষম করে তুলত। সংক্ষেপে বলা যায়, উত্তরাধিকার লড়াইই মোগল রাষ্ট্রকে নতুন জীবন দিত, প্রাণবন্ত করে তুলত। আওরঙ্গজেব মোগল যুবরাজদের দন্তনখরহীন করে ফেলেছিলেন। ফলে যখন সময় এলো, তখন তারা আর যুদ্ধ করতে বা শাসন করতে সক্ষম হননি ।

আওরঙ্গজেব তার ছেলেদের নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে কিভাবে মোগল রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতি করেছেন, সে ব্যাপারে অন্ধ থাকলেও মোগল রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি বুঝতে পেরেছিলেন। শেষ বয়সে ছেলে ও নাতিদের কাছে লেখা চিঠিপত্রে আওরঙ্গজেব মোগল সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে তার ব্যাপক অন্তঃদৃষ্টি প্রকাশ করেছেন।

আওরঙ্গজেব ১৬৯১-পরবর্তী সময়ে আযম শাহের বড় ছেলে, তার নাতি বিদার বখতকে লেখা এক চিঠিতে কিভাবে সর্বোত্তমভাবে জীবনযাপন ও শাসন করা যায়, সে ব্যাপারে নিজের কর্মপন্থা তুলে ধরে উপদেশ দেন। তিনি শুরু করেন এই সুপারিশ দিয়ে যে পানি সামনে রেখে ফজরের নামাজ পড়তে ও কোরআন তেলায়াত করতে হবে, তারপর ওই পানি পান করতে হবে। এতে করে রোগ ও বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। বিদার বকশকে তার পরবর্তী পরামর্শ ছিল আকবরের আমল থেকে প্রচলিত একটি মোগল প্রথা অনুসরণ করার। এতে নিজেকে বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে ওজন করা হতো। আওরঙ্গজেব এটিকে হিন্দু প্রথা বিবেচনা করা সত্ত্বেও লিখেছেন, ‘যদিও সোনা, রুপা, তামা, শস্য, তেল ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে কারো পুরো দেহের ওজন করা আমাদের পূর্বপুরুষদের দেশের বা এখানকার [ভারতবর্ষ] মুসলিমদের প্রথা নয়, কিন্তু এই ব্যবস্থার ফলে অনেক অভাবগ্রস্ত ও গরিব মানুষ বিপুলভাবে উপকৃত হয়।’ চিঠিতে সম্রাট তার নাতিকে বলেন যে শাহ জাহান বছরে দুবার নিজেকে ওজন করাতেন। তবে তিনি বিদার বকশকে পরামর্শ দেন, তিনি যেন বছরে ১৪ বার এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। আমরা দেখেছি, আওরঙ্গজেব তার শাসনকালের প্রথম দশকে নিজের ওজন করার প্রথা অনুসরণ করলেও পরে তা বাদ দেন (তবে শেষ বয়সে তিনি সম্ভবত আবার তা চালু করেছিলেন। এমন মত দিয়েছেন চ্যাপলিন জন ওভিঙ্গটন)। আওরঙ্গজেব হিন্দুভিত্তিক ওজন করা প্রথাটিকে ভারতীয় মোগল ঐতিহ্যের অংশ বিবেচনা করেছিলেন, এমনকি যদিও ব্যক্তিগতভাবে নিজে তা থেকে দূরে ছিলেন ।

একইভাবে আওরঙ্গজেব শেষ দিকে তার ছেলে আযম শাহকে লেখা এক চিঠিতে শাহ জাহানের সঙ্গীত উপভোগকে অনুমোদন করে বলেছিলেন, এটি যথার্থ রাজকাজ। উল্লেখ্য, তিনি এর কয়েক দশক আগেই এটি পরিত্যাগ করেছিলেন। মোগল বাদশাহ হওয়ার জন্য আরো অনেক পথ ছিল। শেষ বয়সের চিঠিতে আওরঙ্গজেব সমন্বয়বাদকে অনুমোদন করেছিলেন যা ছিল তার রক্তধারার অংশ, এটিই ছিল প্রবল বিরোধিতার মুখে সাম্রাজ্যের টিকে থাকা নিশ্চিতকারী বিপুল শক্তি ।

আওরঙ্গজেব ১৭০৭ সালের প্রথম দিকে মধ্য ভারতের আহমদনগরে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে খুলদাবাদে সুফি দরবেশ জয়নুদ্দিন শিরাজির (মৃত্যু ১৩৬৯) মাজারে অচিহ্নিত এক কবরে সমাহিত করা হয়। আপনিও এখন ওই কবর দেখতে যেতে পারেন, যদিও সেখানে ছোট, উন্মুক্ত স্থানে দেখার তেমন কিছুই নেই। হুমায়ূন, আকবর ও শাহ জাহানের জাঁকালো সমাধিসৌধের তুলনায় এই মাজারে বছরে খুব কম পর্যটকই যায় ।

আওরঙ্গজেবের সাদামাটা কবরটি তার জটিল জীবনের একেবারে বিপরীত বিষয়। আওরঙ্গজেব তার ধার্মিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করার জন্যই কবরের স্থান হিসেবে এই গাম্ভীর্যতা ও পারিপার্শ্বিকতা বাছাই করেছিলেন । বস্তুত আওরঙ্গজেব তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ক্রমবর্ধমান হারে ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। অবশ্য সম্রাটের আধুনিক সমালোচকেরা বিষয়টি যেভাবে কল্পনা করে, তিনি তা করেছিলেন তার চেয়ে ভিন্নভাবে। অন্যদের প্রতি ধর্মীয় উগ্রতাপূর্ণ আচরণ করার বদলে আওরঙ্গজেবের ধর্মভক্তি প্রকাশিত হয়েছিল তার অন্তঃমুখী উদ্বেগে যা তিনি করেছিলেন খোদার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। তিনি তার শেষ বয়সের চিঠিপত্রে প্রায়ই হাশরের ময়দানের কথা উল্লেখ করতেন, পরবর্তী দুনিয়ায় প্রবেশ করতে উদ্যত এক অচেনা লোক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন।

ইসলামের সাথে এই বহুরূপী সম্রাটের সম্পর্ক ছিল জটিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ধর্মের গণ্ডিতে আটকে রাখার মতো ছিলেন না তিনি। বস্তুত, আওরঙ্গজেব সম্পর্কে সাদামাটা বিষয়াদি রয়েছে সামান্যই। আওরঙ্গজেব ছিলেন ক্ষমতা, নিজস্ব ধরনের ন্যায়বিচার ও সম্প্রসারণে নিবেদিতপ্রাণ এক সম্রাট। তিনি ছিলেন দারুণ মেধাসম্পন্ন শাসক, সেইসাথে অনেক ভুলও করেছেন। তিনি মোগল সাম্রাজ্যকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সম্প্রসারিত করেছিলেন, এবং সম্ভবত এটি ভাঙার অবস্থায়ও নিয়ে গিয়েছিলেন। কোনো একক বৈশিষ্ট্য বা পদক্ষেপে আওরঙ্গজেব আলমগিরকে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি প্রায় ৫০ বছর মোগল সিংহাসনকে অলংকৃত করেছিলেন, জনসাধারণের কল্পনাশক্তিকে অনেক দূর পর্যন্ত বিমোহিত করেছেন।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *