শিবার ফিরে আসা

শিবার ফিরে আসা – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস

।।১।।

হাসপাতালের ডাক্তার বলেছিলেন, একদম নড়াচড়া নয়। পাঁচ হপ্তা পর প্লাস্টার খোলা হবে।

সেদিন তার বেড—এর পাশে ওরা সবাই ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল।

শ্রীকান্তদা বলেছিল, ”কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় শরীরে অত আঘাত নিয়ে অতটা ছুটে যাওয়া! ওটা আমার কথা নয়, ডাক্তারবাবুই বললেন। পাজরে, পেটে, মাথায়, কোথায় না মেরেছে, হাত দুটোর অবস্থা তো…”

ভবানী—সার বলেছিলেন, ”তোমার পক্ষে এখন কথা বলা তো সম্ভব নয়, পরেই নয় বলব। মনের জোর এবার তোমায় সারিয়ে তুলবে।”

শচীনকাকু একটা খোলা ছাড়ানো সিদ্ধ ডিম বার করে মুখের দিকে এগিয়ে দিচ্ছিল। তখন সাগরমামি ছোট্ট একটা ধমক, ”খাবে কী, চিবিয়ে কিছু খাওয়ার ক্ষমতা কি ওর আছে?”

”ডিমটারে কী কইরবেন?” ননী বলেছিল। ”আমারে দ্যান, ক্ষুধা লাগচে।” ডিমটা শচীনকাকুর হাত থেকে তুলে নিয়ে, কামড় বসাতে গিয়ে থমকে গেছল ননী। ”নাহ, আগে ওস্তাদরে ফিট কইরা তুলি, তারপর ভাগ কইরাই খামু। অ নিতুদা, অরে কবে বাড়ি লইয়া যাইতে পারুম?”

”ডাক্তার তো বললেন, দিন দশেকের আগে নয়।”

”অঃ। তারপর ফিট হইতে—হইতে আরও তিন—চার মাস, এইডা কোনও সময়ই না।” তারপর মুখের কাছে ঝুঁকে ননী বলেছিল, ”তোর বস্তাফস্তা, দড়িদড়া, গ্লাভস সব তদ্দিনে আবার রেডি হইয়া যাইব।”

প্লাস্টারের বাইরে যতটুকু শরীর, তাতে হাত বুলোতে—বুলোতে মা বলেছিল, ”ছোট থেকেই বাড়ন্ত গড়ন। বেশি বয়সী ভেবে সবাই ওর সঙ্গে বড়দের মতো ব্যবহার করেছে, ওর মনটা যে বাচ্চচা হয়ে গেছে সেটা আর কেউ ভেবে দেখেনি।”

চোখ দুটো এধার—ওধার ঘুরিয়ে শিবা সকলের মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। ঘাড় ঘোরাবার ক্ষমতা ছিল না। তখন তাকে দেখাচ্ছিল মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত প্লাস্টারে মোড়া মমির মতো।

সেই সময় তার মনে হচ্ছিল, যন্ত্রণা তার শরীরে নয়, সেটা যেন, যারা তার বেড ঘিরে দাঁড়িয়ে, তাদেরই মনে। সবার চোখ ব্যথায় ঘন, নরম, ছলছল হয়ে রয়েছে। তখন তার মনে হয়েছিল, একটা নাড়ির বাঁধন যেন রয়েছে তার সঙ্গে দেবদাস পাঠক রোডের দু’ ধারের মানুষদের, তার সঙ্গে ‘পূর্বপল্লী’ কলোনির প্রতিবেশীদের। ওদের চাহনিতে কী একটা যেন রয়েছে, শিবা সেটা ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল সে আবার নতুন করে যেন জন্মাচ্ছে। এইবার সে কেঁদে উঠবে। মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় বাচ্চচা যেমন করে কেঁদে ওঠে, সেইভাবে কান্না তার গলায় উঠে আসছিল। সে তখন মনে—মনে বলেছিল, ”আমি ফিরব, ফিরে আসব, আবার আমি রিং—এ উঠব।”

।। ২।।

”অ শিবা, ওঠ ওঠ।”

কাঁধ ধরে মা নাড়া দিল যাকে, সে শুধু ” উঁ উঁ উঁ ” বলে পাশ ফিরল।

”ওঠ বাবা। নিতু কখন উঠে বেরিয়ে গেছে, দেরি করিসনি আর।”

”হুঁউউ।”

আরও মিনিট পাঁচেক শুয়ে থেকে শিবা প্রায় লাফিয়েই উঠে পড়ল। ছ্যাঁচা বাঁশের দেওয়ালের ঘর। দেওয়ালের ফাঁকগুলোয় জোনাকির মতো বিন্দু—বিন্দু আলো থেকে সে অনুমান করার চেষ্টা করল সূর্য কতটা উঠেছে। তার মনে হল এখন সাড়ে ছ’টার বেশিই হবে। অবশ্যই তা হলে দেরি হয়ে গেছে।

ওদের একটাই ঘর। তাতে দুই ভাই আর মা থাকে। ঘরটা লম্বায় দশ হাত, চওড়ায় আট হাত। মেঝেয় একসময় সিমেন্টের একটা আস্তরণ ছিল, এখন সবটাই প্রায় চটা ওঠা। ঝাঁট দিলে চুন—সুরকির গুঁড়ো ওঠে। দেওয়ালগুলোয় একটি করে দু’ হাত লম্বা জানলা। দড়িতে ঝুলছে জামা—প্যান্ট ইত্যাদি। চন্দনের ও সিঁদুরের দাগ লাগা লক্ষ্মীর পট যে দেওয়ালে, তার বিপরীত দেওয়ালে আঁটা শীর্ণকায় একটি লোকের আবক্ষ বাঁধানো ফোটো।

ছবিটা শিবার মৃত বাবা দয়ালচাঁদ আইচ—এর। লম্বাটে মুখ, পাতাকাটা চুল, আয়ত চোখ দুটিতে আত্মবিশ্বাস ও জেদ প্রকাশ পাচ্ছে। স্কুলে পড়ার সময় বিয়াল্লিশের ”ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে যোগ দিয়ে আট মাস জেল খাটেন। বড় ছেলের নাম নেতাজি ও মেজো ছেলের নাম শিবাজি রেখেছিলেন সংগ্রামী মানসিকতাকে শ্রদ্ধা জানাতে। তার পরের দুটি ছেলে, যারা অল্পবয়সে কলেরায় মারা যায়, তাদের নামের সঙ্গে কোনও দেশবরেণ্যর স্মৃতি আর তিনি জড়াননি। তারা শুধুই দিলীপ আর নীলেশ। প্রায় ভিখারি অবস্থায়, তিক্ত, ভগ্ন হৃদয়ে, বিনা চিকিৎসায় তিনি যক্ষ্মা রোগে মারা যান এই ঘরে। জমিদার মুখুজ্যেদের পোড়ো জমি তাঁরই নেতৃত্বে জবরদখল করে গড়ে উঠেছে ‘পূর্বপল্লী’, নামকরণ দয়াল আইচেরই।

ঘরের কোণে একটা বেঞ্চ। তার ওপর গোল করে পাকানো দুটো মাদুর মোড়া কাঁথা ও বালিশ। শিবা তার নিজের শয্যা অর্থাৎ কাঁথা—মাদুর ওই দুটির ওপর রেখে দিল। একটা টেবিল ঘরের অন্য দেওয়াল ঘেঁষে। সেখান থেকে গুঁড়ো মাজনের কৌটোটা তুলে ঢাকনা খুলেই শিবা ভ্রূ কোঁচকাল। চেঁচিয়ে বলল, ”মা, নিতুদা মাজন শেষ করে রেখে গেছে। এখন কী করি?”

ঘরের বাইরে চার হাত চওড়া মাটির দাওয়া। টালির চালটা তার ওপর এত ঝুঁকে পড়েছে যে, মাথা নামিয়ে বাইরে থেকে দাওয়ায় উঠতে হয়। দাওয়ায় এক প্রান্তে ইটের কোমর—উঁচু দেওয়ালে ঘেরা অংশটা রান্নার জায়গা। করুণা তখন উনুনে কয়লা সাজাচ্ছিলেন। চেঁচিয়ে বললেন, ”কি আবার করবি, ছাই দিয়ে মেজে নে।”

”না।” শিবা বিরক্ত মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ”ওতে দাঁত খারাপ হয়ে যায়।”

দাওয়া থেকে নেমে ডান দিকে প্রায় কুড়ি হাত দূরের তাদেরটার মতোই আর—একটা টালির ঘরের কাছে এসে দাঁড়াল।

”মামি আছ নাকি?”

”কেন রে শিবা?” ঘরের ভেতর থেকে সাগরমামি সাড়া দিল।

”তোমার কাছে মাজন আছে, সাদা মাজন?” আমাদের ফুরিয়ে গেছে।”

”দাঁড়া দিচ্ছি।”

সাগরমামি ঘর থেকে বেরিয়ে এল, হাতে লাল প্লাস্টিকের একটা কৌটো। পেছনে তার স্বামী শক্তি দাস।

”এইসব মাজনটাজনে দাঁত মাজিস না, এতে দাঁত শক্ত হয় না।” শক্তি দাসের হাতে নিমের দাঁতন। সেটা চিবোতে শুরু করল। ”এই যে নিমের রস, এটা শুধু দাঁতেরই নয়, লিভারের পক্ষেও ভাল।”

সাগরমামি কড়া চোখে একবার স্বামীর মুখে তাকিয়ে কৌটোটা শিবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ”আধ ঘণ্টা ধরে নিমের কাঠি চিবোতে গেলে মেয়েদের চলে না।”

”তুমি ঢেলে দাও।” শিবা বাঁ হাতের তালু মেলে ধরল। কৌটোর ঢাকনা খুলে ঝাঁকিয়ে মাজন বার করতে গিয়ে সাগরমামি থমকে গেল।

”তোর আঙুলটা তো এখনও বাঁকা রয়ে গেছে!”

শিবার বাঁ হাতের তর্জনীটা দু’ আঙুলে ধরে সাগরমামি নাড়ানাড়ি করে দেখতে লাগল।

”আগে আরও বাঁকা ছিল।” শিবা বলল।

”ব্যথা করে?”

”না, একদমই না।” শিবা হাসল।

”কতদিন হল বল তো?”

”সাড়ে তিন বছর তো হবেই।”

কৌটোটা ঝাঁকিয়ে তালুতে মাজন ঢেলে সাগরমামি বলল, ”তবু ভাল, বড়রকমের কোনও অঙ্গহানি হয়নি। যা মার তোকে মেরেছিল, ভাবলে এখনও শিউরে উঠি।”

‘ওদের টার্গেট ছিল শিবার দুটো হাত। আর যাতে না ঘুসি ছুড়তে পারে সেজন্য অকেজো করে দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য।” শক্তি দাস বহুবার বলা এবং শোনা কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করল। শুধু নতুন একটা কথা যোগ করল, ”শিবার ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ান হওয়ার সাধটা আর পূরণ হল না। ওই একবারই যা ফাইনালে—”

শিবা তখন ডান হাতের তর্জনীতে মাজন লাগিয়ে দাঁতে ঘষতে শুরু করে দিয়েছে। ঘষা বন্ধ রেখে শক্তি দাসের দিকে একবার তাকাল। কিছুই বলল না। চাউনি থেকেও বোঝা গেল না ব্যাপারটা নিয়ে সে কখনও ভেবেছে কি না।

”না শিবা না, ঘুসোঘুসিতে আর যাসনি।” সাগরমামির আন্তরিকতা তার চোখে ফুটে উঠল। ”এ বড় মারাত্মক খেলা। তুই এইই ভাল আছিস। গরিবের ছেলে গতর খাটিয়ে কাজকম্মো করে খেতে হবে, ঘুসোঘুসি গুণ্ডা—বদমাশরা করুক।”

”আহহা, শিবা গুণ্ডা হওয়ার জন্য ঘুসি চালাবে নাকি? এর নাম বক্সিং, রীতিমত শিক্ষা করতে হয়, ট্রেনিং করতে হয়। লড়াই হয় মোটা কাছি দিয়ে ঘেরা উঁচু একটা দালানের মতো জায়গায়…সেদিন শ্রীকান্তদার ঘরে টিভিতে দেখলে না, দু’জনে লড়ছিল। হাতে পরা ছিল বস্তার মতো দুটো গ্লাভস। ওটা পরে ঘুসি মারলে তেমন লাগে না।”

”লাগে না তো, ঘুসি খেয়ে একজন দড়াম করে চিতপটাং হয়ে আর উঠল না কেন? বাজে বকা তোমার একটা ওব্যেস। লাগে কি লাগে না তা আর আমায় বোঝাতে এসো না।”

সাগরমামির মুখঝামটা ভোরবেলায় আরম্ভ হলে সেটা রোদ চড়ার সঙ্গে—সঙ্গে একই তেজে চড়বে। শক্তি দাস দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত তার এই জ্ঞানটুকু এবার বিজ্ঞতা সহকারে প্রয়োগ করল।

”দড়াম করে চিতপাত হল কেন, সেটা তোমার মতো বুদ্ধিমতীকে কি বুঝিয়ে দিতে হবে? একজনের ঘুসির জোর বেশি, আর—একজনের শরীরের ক্ষমতা কম, ব্যস। শিবার শরীরের ক্ষমতা আমার থেকে বেশি, এই আমি যদি এখন ওকে ঘুসি মারি—” শক্তি দাস দাঁতনটা দাঁতে চেপে দু’হাতের ঘুসি পাকাল। সাগরমামির চোখও সঙ্গে—সঙ্গে বিস্ফারিত হল।

”তার মানে? তুমি ওকে ঘুসি মারবে নাকি? খবদ্দার বলছি, এই সেদিন অত ঝড় বয়ে গেল ওর শরীরের ওপর দিয়ে, ছেলের অখনও গায়ের ব্যথা মরেনি।”

”না, না, মামি, এতদিন হয়ে গেল, ব্যথাটাথা কিছু নেই, একদম ফিট।” শিবা তাড়াতাড়ি তার শারীরিক ক্ষমতা সম্পর্কে ভুল ধারণাটা ভেঙে দেওয়ার জন্য আর—একটু যোগ করল, ”দু’বার ডেকচিভরা আলুর দম ঘাড়ে নিয়ে এক মাইল যেতে হয়, বালতি—বালতি জল টিউকল থেকে বয়ে আনতে হয়, প্লেট, গ্লাস ধুতে হয়, খদ্দেরকে দেখতে হয়, এসব কি শরীরে ক্ষমতা না থাকলে করা যায়?”

পূর্বপল্লী আর দেবদাস পাঠক রোডের বহু লোকের মনে ধারণা তৈরি হয়ে গেছে, শিবার শরীরে আগের মতো আর জোর নেই। সাধুর লোকেরা যেভাবে মেরে রাস্তায় ফেলে রেখে দিয়েছিল, তারপর তো শক্তি ফিরে পাওয়া কোনওভাবেই সম্ভব নয়। বক্সার হিসেবে ও তো শেষ হয়েই গেছে। সবাই ওকে একটু করুণার চক্ষেই দেখে। এজন্য সে অস্বস্তি বোধ তো করেই, মনে মনে রেগেও ওঠে। গায়ে জোর নেই, এটা তার কাছে লজ্জার ব্যাপার।

দাওয়ায় জলভরা বালতিতে প্লাস্টিকের মগ ভাসছে। শিবা মগে জল নিয়ে মুখ ধুয়ে চলে যাওয়ার জন্য দু’ পা গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ল। ”মামি, এখানকার গুণ্ডা—মাস্তানরা ঘুসোঘুসি করে না, তাই তাদের গায়ের জোর থাকারও দরকার হয় না। বোমা, পিস্তল, পাইপগান আর চার—পাঁচজনে চেপে ধরে একজনকে ছোরা মারার জন্য কি এক্সাইজ করার দরকার হয়?”

”সাধুর শরীরে কিন্তু প্রচণ্ড জোর আছে, একসময় ও এক্সাইজ করত।” শক্তি দাসের চোখে, স্বরে সমীহ ও ভয় ফুটে উঠল।

দপ করে উঠেই শিবার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। পুরনো সিনেমার বিবর্ণ ছবির মতো একসার ঘটনা ও মানুষ তার মাথার মধ্যে ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। সে ধীরে—ধীরে মাথাটা দু—তিনবার নেড়ে স্বীকার করল কথাটা। হ্যাঁ, সাধুর শরীরে ক্ষমতা আছে, ওয়েটলিফটার ছিল। শিবা কথা না বলে চলে গেল।

”শিবার গায়েও জোর আছে।” সাগরমামি নরম গলায় বলল শিবার ঘাড় আর পিঠের দিকে তাকিয়ে।

”জোর বলে জোর। ওর একটা ঘুসিতেই সাধু চিতপটাং হয়েছিল, তখন তো ওর বয়স মাত্র সতেরো!” শক্তি দাস প্রায় চার বছর ধরে তার জমিয়ে রাখা বিস্ময় থেকে খানিকটা ব্যয় করে ভারমুক্ত হল। ”এখন সে বিত্তান্ত কাউকে বললে তো ভাববে গাঁজায় দম দিয়ে গপ্পো ফাঁদছি!”

”কাউকে বলার দরকার কী? যেমন দাঁতন করছ তাই করো, শিবা যেমন আছে তেমনই থাক।” নিঃসন্তান সাগরমামি স্বামীর দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে ঘরের মধ্যে যাওয়ার সময় বলল, ”সাধটাধ পূরণ করার ইচ্ছেটা আর ওর মধ্যে চাগিয়ে তুলো না।”

”চাগিয়ে কি আর তুলতে হয়, এসব ব্যাপার আপনা থেকেই হয়ে যায়।” দাঁতনকাঠিটা চিবোতে—চিবোতে শক্তি দাস আপন মনে বলল, ”ঘুসিটা কি আর আগে থেকে ভেবেচিন্তে তারপর মেরেছিল? ওটা না মারলে শিবা কোনওদিন কি বক্সার হতে পারত? ঘর থেকে স্ত্রীকে বেরিয়ে আসতে দেখে শক্তি দাস এবার জোরে—জোরে দাঁতন ঘষতে শুরু করে দিল।

যে বৃত্তান্তর কথা শক্তি দাস উল্লেখ করল, সেটা লোকের মুখে—মুখে পল্লবিত হয়ে এখন কিংবদন্তির চেহারা নিয়েছে। এই অঞ্চলে নবাগত কাউকে সে কাহিনী বললে সত্যিই সে বিশ্বাস করবে না।

দুর্দণ্ড প্রতাপশালী সাধন ঘোষ, যে এখন অনেকের কাছে সাধনবাবু বা সাধুদা, কয়েক বছর আগে সে কিন্তু সবার কাছে পরিচিত ছিল সাধু গুণ্ডা নামে। তখন বোমা, ছোরা, পাইপগান নিয়ে রাহাজানি, গুণ্ডামি, ট্রাক থেকে মাল লুট ছাড়াও, দাঙ্গা বাধানো, ধর্মঘট ভাঙা, ভাড়াটে তোলা, ভোটের বুথ দখল করা, বস্তিতে আগুন দেওয়া, রাস্তার বাজার থেকে তোলা আদায়, এমনকী স্কুলের পরীক্ষায় টোকাটুকির ব্যবস্থা ইত্যাদি নানা ব্যাপারে সাধুর কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত ছিল।

গত তিন বছর ধরে সে একটা কালীপুজো করছে ধুমধামিয়ে । তার পাড়া মিলনপল্লী থেকে বি টি পর্যন্ত সাতদিন আলোর বন্যায় ভেসে যায়। সর্বত্র লোডশিডিং হলেও সাধুর কালীপুজোয় হয় না। পুজোয় সে পঞ্চাশজন গরিবকে বস্ত্র বিতরণ করে। এম.পি., এম.এল. এ, ফুটবলার, ফিল্মস্টাররা আসে, গানের ফাংশন হয়, গুণিজন সংবর্ধনা হয়, যাত্রা হয়, তিনদিন সিনেমা দেখানো হয়। এলাকায় সাধু খুবই জনপ্রিয়। বহু লোক ওকে ভক্তিশ্রদ্ধাও করে। বছরে একটি দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়ের যাবতীয় খরচ সে দেয়। এজন্য কেউ—কেউ তাকে রবিনহুডের সঙ্গে তুলনা করে।

কিন্তু চার বছর আগে সাধু যখন ভয়াবহ গুণ্ডা হিসেবেই পরিচিত অর্থাৎ যখনও সে ‘বাবু’ হয়ে ওঠেনি, সেই আমলের একটা সন্ধ্যায় ঘটনাটা ঘটেছিল।

শিবা তাকে ঘুসিটা মেরেছিল।

।। ৩ ।।

দশ কিলোগ্রাম আলু, তারই দম। রাত্রে সমান মাপে আধখানা করে আলুগুলো কেটে সিদ্ধ করে রাখেন তারাময়ী। ভোরবেলায় কয়লার উনুন ধরিয়ে তিনি আলুর দম তৈরি করতে বসেন। নিতুর নির্দেশমতোই ঝোলটা বেশি, ঝালটাও বেশি, এমন একটা দম তাকে তৈরি করতে হয় যাতে রসুনের গন্ধটা যেন নাকে লাগে। জুট মিলের মজুররা এমন জলখাবারই পছন্দ করে যেটা দামে শস্তা, খেতেও বেশ! পাউরুটি কোয়ার্টার পাউন্ড আর আলুর দম দু’ টুকরো দেড় টাকা। ওরা ঝোলটাই বেশি করে চায়। একটার সময় টিফিনের ভোঁ বাজলে নিতু আর শিবার দম ফেলার সময় হয় না। দশ কিলো আলুর দম আর কুড়ি থেকে পঁচিশ পাউন্ড পাউরুটি আধ ঘণ্টায় উড়ে যায়। এইসঙ্গে আছে চা আর ওমলেট।

বিটি রোড থেকে প্রায় এক মাইল পশ্চিমে গঙ্গার ধারে, পার্কিনস জুট মিল—এর কাছে ফিডার রোডের মোড়ে সাত—আটটি চায়ের ও খাবারের দোকানের একটি হল নিতুর। তিন বছর আগে সে শুধু আলুর দমের ডেকচি, থলিভরা পাঁউরুটি, জলের বালতি ও কয়েকটি চায়ের প্লেট নিয়ে খোলা আকাশের নীচে তার ব্যবসা শুরু করেছিল। এখন বাঁশের খুঁটিতে লম্বায় ও চওড়ায় চার হাত করে পলিথিন চাদরের চালা, ইট আর মাটি দিয়ে তৈরি কোমর সমান উঁচু কয়লার উনুন, যাতে চা, ওমলেট ও রুটি সেঁকা হয়। বালতি এখন তিনটে। কাচের গ্লাস ও প্লেট দু’ ডজন করে।

নিতুর প্রথম কাজ সকালে এসে উনুন ধরানো, সাইকেল ভ্যানে বেকারি থেকে পাউরুটি দিয়ে গেলে সেগুলো চার টুকরো করা, চায়ের জল গরম করা ইত্যাদি। তার আগে অবশ্য গ্লাস, প্লেট, অ্যালুমিনিয়ামের মগ, সসপ্যান, চা তৈরির সরঞ্জাম, ঘুঁটে—কয়লা ইত্যাদি যেসব জিনিস রাত্রে বাড়ি ফেরার আগে অধীরের সাইকেল গ্যারাজের এককোণে রেখে দেয়, সেগুলো নিয়ে আসে। রাখার জন্য মাসে চল্লিশ টাকা ভাড়া দিতে হয়। এই অধীর নন্দীই নিতুকে এখানে খাবার বিক্রির জন্য বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে জুট মিলের ইউনিয়ন, থানার মেজোবাবু আর মিউনিসিপ্যালিটির স্থানীয় কমিশনারের সঙ্গে ব্যবস্থা করে। তবে সেজন্য সে শর্ত দিয়েছিল, ”যখন গ্যারাজে থাকব না, তখন নজর রাখবি চুরিটুরি যেন না যায়, আর ঝামেলাটামেলা হলে দৌড়ে আসবি। তুই না তুই না, শিবা যেন এসে দাঁড়ায়।”

শর্তের কথা শুনে শিবা ক্ষুব্ধ হয়ে নিতুকে বলেছিল, ”আমাকে ভেবেছে কী, গুণ্ডা? আমি গিয়ে মারামারি করব?”

”আহহ, এটা একটা মাথাগরম করার মতো কথা নাকি?” ভাইকে ঠাণ্ডা করার জন্য নিতু বলে। ”ওখানে পা রাখার মতো একটা সুযোগ প্রথমে দরকার। অধীরদা যা বলে, শুনে যাওয়া আর ঘাড় নাড়া। ঝামেলা যদি হয়ই, মিটমাট করে দিবি। মারপিটই করতে হবে এমন কোনও কথা আছে কী? মনে রাখিস আমাদেরও ওখানে ব্যবসা চালাতে হবে। মারপিট একদম নয়।”

নিতু গম্ভীর ও কড়া স্বরে শেষ বাক্যটি বলে দিল। শিবা মাথা নিচু করে শুনে বিড়বিড়িয়ে বলে, ”আমার সম্পর্কে কী যে ধারণা লোকের।”

”ওই যে সাধুকে ঘুসি মেরেছিলি, লোকে সেটাই মনে করে রেখে দিয়েছে,” নিতু বলেছিল।

”তারপর, সাধুরা যে আমায় মেরে ছ’ মাস বিছানায় শুইয়ে রাখল—সেটা আর লোকেরা মনে রাখল না।”

নিতু ম্লান হেসে বলেছিল, ”লোকেরা বীরত্বকেই মনে রাখতে চায়, কাপুরুষত্বকে নয়। একের সঙ্গে এক মুখোমুখি লড়াইটাই হল বীরের ধর্ম, কাজ। তুই সেটাই করেছিলি।”

শিবা তখন আড়চোখে তারাময়ীর দিকে তাকিয়ে দেখেছিল, মায়ের চোখ জ্বলজ্বল করছে বড় ছেলের কথা শুনে, আর চাহনি ধরে হালকা মেঘের মতো ছায়ারা ভেসে আসছে তার দিকে।

প্রতিদিন সকালে শিবার প্রথম কাজ, তারাময়ীর রাঁধা আলুর দমের অর্ধেকটারও বেশি একটা বিশাল ডেকচিতে ঘাড়ে নিয়ে এক মাইল হেঁটে সাতটার মধ্যে দোকানে হাজির হওয়া। যাওয়ার পথে ডিম ব্যবসায়ী সতু বাঁড়ুজ্যের দোকান থেকে থলিটা এক হাতে তুলে নেয়, যাতে থাকে পঞ্চাশটা ডিম। তারপর সে খালি ডেকচি নিয়ে দুপুরে ফিরে এসে আবার বাকি আলুর দমটা নিয়ে যায় সন্ধ্যার খদ্দেরদের জন্য।

নিতুর দোকানের আলুর দমের চাহিদা আছে, কেননা তারাময়ীর রান্নার হাতটি অসাধারণ। কিন্তু উনুন থেকে রান্না নামাবার পর প্রতিদিনই তিনি বুকে অতি ক্ষীণ একটা কাঁপুনি বোধ করেন এই ভেবে—ঠিকমতো হয়েছে তো?

আজও তিনি প্রতিদিনের মতো ডাকলেন, ”শিবা আয়।”

স্নান করে এসে শিবা ঘরে চুল আঁচড়াচ্ছিল। অস্ফুটে ”উঁউ” বলে এমন গলায়, যা তারাময়ীর কানে পৌঁছল না।

বাটিতে আলুর দমের ঝোল নিয়ে তিনি ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। ”শিবা ঘরে আছিস?” ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে চুল আঁচড়ানোয় ব্যস্ত শিবাকে দেখে বললেন, ”ঘরে ঢুকব না, হাত বাড়া, ধর তাড়াতাড়ি।”

বন্ধ হয়ে গেল চুল আঁচড়ানো। শিবার সারা দেহ শক্ত হয়ে গেল। ঠিক এই কথাগুলো, প্রায় এই কথাগুলোই ঠিক এইরকম স্বরেই তো মা বলেছিল… কত বছর আগে…কত বছর? মা তখন রাঁধুনির কাজ করত জমিদার মুখুজ্যেবাড়িতে।

ঝোলের বাটিটা হাতে নিয়ে শিবা তারাময়ীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। উৎকণ্ঠিত মুখ। ঠিক এইরকমই তখন দেখাত মাকে।

”খেয়ে বল, ঠিক হয়েছে কি না, নুন কম হয়েছে? ঝাল?”

”ঝোলে চুমুক দিয়ে কয়েক সেকেন্ড পর শিবা মাথা নেড়ে জানাল, ঠিক আছে।

তখনই কিন্তু শিবার মাথার মধ্যে সামান্য গোলমাল ঘটে গেল। আলুর দমের ডেকচিটা মাথায় নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে মুখুজ্যেবাড়ির বাগানের পাঁচিলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। পাঁচিল শেষ হওয়ার পর বাঁ দিকে দেবদাস পাঠক রোড, যেটা গিয়ে মিশেছে বি টি রোডে।

পাঁচিলে একটা জায়গা ভাঙা। শিবা ডেকচি মাথায় দাঁড়িয়ে পড়ল। মুখুজ্যেদের রান্নাঘরটা এই ভাঙা জায়গাটা দিয়ে দেখা যাচ্ছে। জানলাটায় তারের জাল লাগানো। আগে তো জাল ছিল না! শিবার মাথার মধ্যে শুরু হওয়া গোলমালটা রূপান্তরিত হল ঘূর্ণিঝড়ে। সাঁ—সাঁ করে দশটা বছর পিছিয়ে গিয়ে তার স্মৃতি আছড়ে পড়ল রান্নাঘরের ওই জানলাটার কাছে।

.

উনুনের ঠিক পেছনেই জানলাটা। জানলার বাইরেই আবর্জনার স্তূপ আর কাঁচা নর্দমা। সে দাঁড়িয়ে ছিল দেওয়াল ঘেঁষে। ওধারে লোহার ফটক। বাগানটা ঝোপঝাড়ে ভরা। একটা কাঁঠাল আর গোটা—তিনেক আমগাছ ছাড়া বাগান বলার মতো আর কোনও বড় গাছ নেই। পাঁচিলের ভাঙা জায়গাটা দিয়ে সে প্রতিদিন ঢুকত। রান্নাঘরের জানলার পাশে কাদা প্যাচপ্যাচে জমিতে নিঃসাড়ে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করত। তখন বারবার দু’ধারে তাকিয়ে দেখত কেউ তাকে দেখে ফেলল কি না। কোনও কোনওদিন আধঘণ্টাও দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে, যদি রান্নাঘরে গিন্নিমা কিংবা ভৃত্য হরিহর হাজির থাকত। যখন কাদায় পায়ের পাতা ডুবিয়ে কাঠের মতো দাঁড়িয়ে থেকে সে অপেক্ষা করত, রান্নাঘর থেকে তখন ভারী সুন্দর রান্নার গন্ধ ভেসে আসত। জিরে, পাঁচফোড়ন, গরম মশালা, কখনও—বা রসুন বা পেঁয়াজ। এইসব জিনিস দিয়ে রাঁধা খাবার তাদের বাড়িতে হত না।

গন্ধটা নাক দিয়ে শরীরের মধ্যে পাঠিয়ে সে নিশ্বাস বন্ধ করে রাখত। তখন সারা শরীরে একটা ঝিমঝমে ভাব তৈরি হত। বারবার ঢোক গিলে চেষ্টা করত গন্ধটাকে পাকস্থলিতে চালান করার। তখন পেট জুড়ে একটা ব্যথা ছড়িয়ে যেত। ফুটন্ত মাছের ঝোলের বা ডালের বগবগ শব্দও সে শুনতে পেয়েছে কোনও—কোনওদিন। একটা বড় থালা দিয়ে মা কড়াইয়ের মুখ ঢেকে দিলে শব্দটা বন্ধ হয়ে যেত, গন্ধটাও আর পাওয়া যেত না। এক—একদিন সে ভাবত, মাকে বলবে কড়াইটা ঢেকে না দিতে। ওই রান্নার শব্দ আর গন্ধর জন্যই তো সে সারাদিন জানলাটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত।

বিরাট কড়ায় আঠারোজনের রান্না হয়। মা নামাতে পারত না, হরিহরকে ডাকতে হত কড়া নামাবার জন্য। তখন সে কল্পনা করত, মুখুজ্যেবাড়ির ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার আগে দালানে সার দিয়ে খেতে বসেছে। গরম—গরম ভাত, ডাল, তরকারি, মাছের ঝোল। সবই তার মায়ের হাতে রাঁধা। ওই সারির মধ্যে রয়েছে রঞ্জুও। সেজোবাবুর ছেলে রঞ্জন, তারই বয়সী। ধবধবে ফরসা গায়ের রং। বি টি রোড থেকে স্কুলবাসে ওঠার জন্য সে হরিহরের সঙ্গে হেঁটে যেত। পিঠে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে রঞ্জুর হাঁটা দেখতে তার খুব ভাল লাগত।

রান্নাঘরের জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ওদের খাওয়ার দৃশ্য সে কল্পনায় দেখত। খেতে—খেতে রঞ্জুর মুখে তৃপ্তির ভাব ফুটে উঠেছে, এটাই সে ভেবে নিত। রঞ্জুর তৃপ্তিকে নিজের তৃপ্তি করে নেওয়ার জন্য সে মনে—মনে চেষ্টা করলেই তখন পাকস্থলিটা ঘুলিয়ে উঠে মুখে জল জমা হত । কিন্তু কান তার সজাগ থাকত একটা কথা শোনার জন্য, ”শিবা হাত বাড়া।”

জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে মায়ের হাতটা বেরিয়ে আসত। শালপাতা অথবা কাগজে মোড়া ভাত, ডাল, তরকারির একটা মণ্ড থাকত তার মধ্যে। সেটা হাতে নিয়েই বিদ্যুদ্বেগে সে জানলা থেকে সরে গিয়ে, ভাঙা পাঁচিল টপকে বাড়ির দিকে ছুটত। মণ্ডটা থেকে গরম ভাপ তালু বেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে যেত তখন।

দিলু আর নিলু ঘরের কাছাকাছিই অপেক্ষা করত। তাকে দেখামাত্রই ”মেজদা এসে গেছে” বলে ছুটে আসত। তাকে ঘিরে ওরা দাওয়ায় উবু হয়ে বসত। জাদুকর যেভাবে টুপির মধ্য থেকে খরগোশ বার করে সেইভাবে সে শালপাতা বা কাগজের মোড়কটা খুলত। ভাত, চচ্চচড়ি বা সিদ্ধ ডাল, এইরকম কিছুই বেরিয়ে আসত। দিলু বা নিলু, কেউ একজন, ”ই ই ই” বলে আওয়াজ করে উঠত।

কিন্তু একদিন তারা ধরে পড়ে গেল।

নিশ্চয় কেউ তাদের লক্ষ করেছিল। হাতেনাতে ধরার জন্য তক্কে—তক্কে ছিল। মা ”শিবা আছিস” বলে ডাকতেই সে জানলার সামনে এসে হাত বাড়ায়। মা শালপাতার মোড়কটা যখন হাতে দিয়েছে তখন সে দেখতে পায়, রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে গিন্নিমা তাকিয়ে রয়েছে।

সে ছুটে পালাতে যেতেই একেবারে হরিহরের মুখোমুখি। তার চুলের মুঠি ধরে হরিহর টেনে আনল বাড়ির মধ্যে। সে দেখতে পেল গিন্নিমার পা জড়িয়ে ধরে মা কী একটা কথা বলার চেষ্টা করছে। গিন্নিমাকে গালে হাত দিয়ে বলতে শুনেছিল, ”বলো কী! এগারো বছর মাত্র বয়স, দেখে তো মনে হয় ষোলো—সতেরো!”

”সত্যি বলছি মা, ও বাচ্চচা ছেলে, ওকে মারবেন না। দোষ আমারই, আমিই চুরি করে ওকে দিয়েছি। ওর কোনও দোষ নেই মা। পেটের জ্বালায় বাচ্চচা ছেলেগুলো ছটফটায়, মাথার ঠিক রাখতে পারিনি মা। ওদের উপোসি মুখ চোখ দিয়ে আর দেখতে পারি না।”

তখন সে মায়ের চোখ দুটো দেখেছিল। ভয়, নিদারণ একটা ভয় সেই চোখে। চাকরিটা চলে যাবে। ষোলো বছরের বড় ছেলে নিতু চার টাকা রোজ—এ কারখানায় কাজ করে। তার রোজগারের টাকায় পাঁচটা পেট চালানো মানে একবেলা দু’ মুঠো ভাতও নয়, হয়তো এইজন্যই ভয় কিংবা এগারো বছরের ছেলে চোরের মার খাবে বা পুলিশের হাতে যাবে, হয়তো সেইজন্যও।

শিবা তার জীবনের প্রথম ভয়কে দেখেছিল মার চোখে। তখন বয়স এগারো। সেই প্রথম শুনেছিল তার শরীরের আকারটি বড়, অন্তত পাঁচ—ছ’ বছর টপকিয়ে তার শরীর এগিয়ে রয়েছে। মায়ের সেই ভীত চাহনি একজোড়া গরম লোহার শিকের মতো সঙ্গে—সঙ্গে তার চেতনায় গেঁথে গেছল। তার যন্ত্রণা কখন যে নিঃসাড়ে শিরা—উপশিরা দিয়ে পেশীতে ছড়িয়ে গেছল, সে টের পায়নি। হরিহর একটা প্রচণ্ড থাপ্পড়ে তাকে যখন উঠোনে ফেলে দেয়, সে কোনও ব্যথা বোধ করেনি। তার সর্বাঙ্গ মায়ের চাহনি থেকে পাওয়া ভয় আর লজ্জায় অসাড় হয়ে ছিল। সে তখনই জেনে যায় ভয় একটা অদ্ভুত ব্যাপার। এর মধ্যে ডুবে থাকার সময় খুব জোরে আঘাত এলেও দেহ তা শুষে নেয়।

এর কিছুদিন পর বিয়েবাড়ির বাসি খাবার খেয়েছিল ওরা তিন ভাই। চাকর ফেলে দিচ্ছিল, শিবাই চেয়ে এনে, রেলপুকুরের ধারে লুকিয়ে ডেকে নিয়ে গিয়ে দিলু—নিলুকেও খেতে দেয়। সন্ধ্যায়। পরদিন সকালে ওদের দু’জনের ভেদবমি শুরু হতেই সে ভয়ে কথা বলতে পারেনি। দিলু—নিলু রাত্রে মারা যায় বিনা চিকিৎসায়। সে রক্ষা পেল কী করে, তাই নিয়ে অনেক ভেবেও কোনও কারণ খুঁজে পায়নি। কলেরাকেও তার শরীর শুষে নিয়েছিল।

.

সিনেমা চলতে—চলতে হঠাৎ ফিল্মের রিল ছিঁড়ে যাওয়ার মতো, অতীতে ফিরে গিয়ে পুরনো একটা ঘটনা দেখা বন্ধ হল ননীর ডাক শুনে।

”চাইরবার চিল্লালাম ‘ওস্তাদ ওস্তাদ’ কইরা, মনডা কি ডেচকির মদ্যে আলুর দমের সাথেই ঢাকনা দিয়া রাখলা?” ধীরে প্যাডেল করতে—করতে ননী শিবার পাশাপাশি সাইকেল রিকশাটাকে চালিয়ে যেতে—যেতে বলল।

শিবা ত্যারচা চোখে ননীর মুখটা একবার দেখে নিয়ে বলল, ”শুধু একটা আলু, ঝোল পাবি না।”

”এইডা কি একটা কথা হইল। এক মাইল পথ…না, না, এহান থিকা আধা মাইলই….কিনা একডা মাত্তর আলু, তাও ঝোল নয়!”

ডেকচি মাথায় শিবা দাঁড়িয়ে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে ননীর সাইকেল রিকশাও।

”তোর সঙ্গে কথাই ছিল মাইল পিছু দুটো আলু আর ঝোল। আর মাইল তো আমি হেঁটেই চলে এসেছি, বাকিটাও হেঁটে চলে যাব।” শিবা রাগত স্বরে বলল।

”হেই ওস্তাদ, একটু লেট কইরা ফ্যালাইচি, সেজন্য এভাবে ফাইন কইরো না। কাইল রাতে একটা খুচরা অ্যাসকিডেন্ট কইরা এমন মাইর খাইচি….ওঠো, ওঠো, যাইতে—যাইতে কমু।” সাইকেলের সিট থেকে নেমে ননী ব্যস্তভাবে শিবার মাথার ডেকচিতে হাত লাগাল। উচ্চতায় সে প্রায় শিবারই সমান, ছ’ ফুট। কিন্তু প্রস্থে, দু’জনে পাশাপাশি দাঁড়ালে মনে হবে বটগাছের পাশে সুপুরি গাছ।

ননী ঢ্যাঙা, লিকলিকে, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। পরনে একটা ঢলঢলে সবুজ গেঞ্জি, যার বুকে ইংরেজিতে হলুদ অক্ষরে লেখা ‘আই লাভ ইউ’। জিনস—এর প্যান্টটা দু’ বছর আগে শিবারই দেওয়া, হাঁটুর ওপর নীল কাপড়ের তাপ্পি, পায়ে হাওয়াই চটি, পেছনে ওলটানো চুল, যার প্রান্তভাগ পায়রার ছড়ানো লেজের মতো। ননী বয়সে শিবার থেকে এক বছরের ছোট। ওর বাবা রাধেশ্যাম রিকশা চালাত, হাঁপানির জন্য আর পারে না। বউ আর দুই মেয়ের সঙ্গে বাড়িতে বসে এখন ঠোঙা বানায়।

ননীর শরীর দেখে বোঝা যায় না তার মধ্যে কতটা ক্ষমতা, সহনশীলতা লুকনো আছে। দুশো কিলোগ্রাম ওজনের চালের বস্তার বা একটি সুপুষ্ট পরিবারের ভার, দেড় বা দুই মাইল সে রিকশায় চাপিয়ে সহজেই নিয়ে যায়। অকল্পনীয় তার কলিজার শক্তি। আর ঠিক ততটাই তার দুর্বলতা শিবা সম্পর্কে। যেদিন শিবা ঘুসি মেরে সাধুর চোয়াল ভেঙে দিয়েছিল, তার শাগরেদ দেবুর মুখ ফাটিয়ে দিয়েছিল, সেদিন ওই দু’জনের বাড়ি ফেরার মতো শরীরের জোর ছিল না। সাধু একটা রিকশা ডেকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল ইশারায়, চোয়াল নাড়াবার মতো অবস্থা তার ছিল না। রাধেশ্যাম পাগলের মতো চিৎকার করেছিল, ‘অহনো ভগমান আচে, বুঝলা আচে। দীন—দুঃখীর ডাকে অহনো সাড়া দ্যায়। আমার পোলাপানগুলোর সেই শুকনা মুখ—”

সাধু ও দেবুর প্রচণ্ড মার খাওয়া দেখে আনন্দে রাধেশ্যামের ভগবানের কাছে কৃতজ্ঞতা জানানোর কারণও ছিল। একবার সাধু তার রিকশায় চড়ে ভাড়া দেয়নি। না দেওয়াই তার রীতি। যেমন মিষ্টির দোকানে খেয়ে, লণ্ড্রিতে কাপড় কাচিয়ে বা হকারের কাছ থেকে ম্যাগাজিন নিয়ে টাকা না দেওয়াটাও তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। রাধেশ্যাম সেদিন ভাড়া না পেয়ে চিৎকার করে প্রতিবাদ করেছিল। তাইতে বহু লোকের সামনেই সাধুর ছেলেরা তার রিকাশার একটা চাকা খুলে নিয়ে যায়। কেউ বাধা দিতে এগিয়ে আসেনি, বরং রাধেশ্যাম যে চেঁচামেচি করে পাড়ার শান্তি বিপন্ন করল, এজন্য তারা খুবই ক্ষুব্ধ হয়। পনেরো টাকা জরিমানা দিয়ে সাতদিন পর সে চাকাটা ফেরত পায়, সেজন্য তাকে কর্জ করতে আর সুদে—আসলে ধার শুধতে দিয়ে হয় মোট পঁচিশ টাকা। সাতটা দিন তার আধপেটার সংসারকে সিকিপেটা থাকতে হয়েছিল।

শিবার হাতে সাধু আর দেবু বেদম মার খাওয়ার পর রিকশা চেয়েছিল। হেঁটে ফেরার মতো অবস্থা তাদের ছিল না। তখন রাধেশ্যামের গাল বেয়ে জল ঝরছিল আর বলছিল, ”সাক্ষাৎ শিবরে আইজ চক্ষে দ্যাখতাসি…” তখন ননী তার বাবার হাত ধরে শান্ত স্বরে বলেছিল, ”বাবা তুমি চুপ করো, এই দুডারে রিকশায় কইরা আমিই পৌঁছাইয়া দিমু।” তারপর সে আরও ঠাণ্ডা শক্ত গলায় বলেছিল, ”রিকশাডারে সোজা বনোয়ারির নাদার গর্তে লইয়া ফ্যালামু।” বনোয়ারি গোয়ালার আটটা গোরু—মোষের খাটালের কিনারে গভীর একটা গর্ত আছে, সেখানে গোবর জমানো হয়, দু’ হপ্তা অন্তর বিক্রির জন্য। ননী অবশ্য রিকশাটাকে সেই গর্তে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়নি, কারণ সাধু তার রিকশায় উঠতে অস্বীকার করেছিল।

.

আলুর দমের ডেকচিটা রিকশার পাদানিতে সাবধানে রেখে শিবা বলল, ”হয়েছিল কী? মার খেলি কেন?’

”কইতাচি।” নদী রিকশার সিট তুলে ঢাকনা লাগানো একটা প্লাস্টিকের কৌটো বার করে বলল, ”একডা না, তোমারে ওস্তাদ কই, তুমি দুইডাও দাও। ইজ্জত বাঁচনের ব্যাপার কিনা।”

শিবা প্রথমে একটা, পরে আর—একটা আলুর খণ্ড কৌটোয় রেখে আড়চোখে তাকাল। ননী তখন গভীর মনোযোগে টায়ারের হাওয়া পরীক্ষায় ব্যস্ত। উৎকণ্ঠায় ভুরু কোঁচকানো। শিবা তৃতীয় খণ্ডটি কৌটোয় রাখতেই ননীর ভুরু সমান হয়ে প্রায় উদাসীনতার পর্যায়ে চলে গেল। ”নাহ, হাওয়া ঠিকই—” বলতে—বলতে কৌটোয় ঢাকনা এঁটে সিটের নীচে রেখে দিল।

প্যাডেল করতে—করতে ননী বলল, ”বাসী রুটি দিয়া আলুর দম, বুঝলা ওস্তাদ, অ্যামন খাওয়া হগ্গের—”

”বুঝেছি। ডিম নিতে যাব, তাড়াতাড়ি চালা।…বল এবার, কেন মার খেলি?

”কাল সন্ধ্যায় ব্যালঘরিয়ায় গ্যাছিলাম একডা ফ্যামিলিরে লইয়া…।” এর পর ননী যা বলল তার সংক্ষিপ্তসার: লোডশেডিংয়ের জন্য সরু রাস্তায় কতটা কিনার দিয়ে গেলে নালায় পড়বে না তাই নিয়ে সে খুবই ভাবিত ছিল। ফলে রাস্তার ধারে রাখা স্কুটারটা সে দেখতে পায়নি। রিকশার চাকার ধাক্কায় স্কুটারটা জমিতে পড়ে যায় । ব্যস, হইহই করে কয়েকটা লোক ছুটে এসে তাকে পিটোতে শুরু করে। যাই হোক, চড়চাপাটি, লাথি—ঘুসি খাওয়ার পর ননী আবিষ্কার করল এবং এইটিই মোক্ষম আঘাত, তার সওয়ার ফ্যামিলিটি অন্ধকারে ইতিমধ্যে মিলিয়ে গেছে। ”আসল মারডা ওস্তাদ অরাই মাইরা গেল। ছয়—ছয়ডা ট্যাহা…।” ননী আফশোসে মাথা নাড়ল।

”অ্যাই, অ্যাই, দাঁড়া, দাঁড়া।”

ননী ব্রেক কষে মাথা ঘুরিয়ে দেখল শিবা রাস্তার ওধার দিয়ে হেঁটে যাওয়া, কালো সালোয়ার ও হলুদ কামিজ পরা, সাদা চন্নি গায়ে এক তরুণীর দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে। ”ননী চিনতে পাচ্ছিস ওকে?”

তীক্ষ্ন নজরে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ননী বলল, ”হেই মাইয়াডা না? ভবানী—সারের কোচিংয়ে আইয়া পড়ত!”

”হ্যাঁ। লালবাগান বক্সিং জিমন্যাশিয়ামেরই গায়ে একটা জিমন্যাস্টিক ক্লাবে ও প্র্যাক্টিস করত। লালবাগান পার্কের গেটের কাছে একদিন ওর সঙ্গে দেখা হতে বলেছিলুম, ”তুমি আর ভবানী—সারের কাছে পড়তে যাও না কেন?” বলেছিল, ‘ওটা গুণ্ডাদের জায়গা।’ আমি বললুম, ‘গুণ্ডারা ভীষণ মার খেয়ে প্রতিজ্ঞা করে গেছে ও পাড়ায় আর আসবে না।”

”ক্যারা মারচিল সেডা কি কইচিলা?”

”ধেত, নিজের ঢাক নিজে পেটায় নাকি, লোকে হাসবে।”

”পিডায়, পিডায়, তা না করলি অহনকার দিনে বড় হওন যায় না।”

ননী আবার প্যাডেল করতে শুরু করল।

”ও কিন্তু ভবানী—সারের কোচিংয়ে আর আসেনি। বোম্বাইয়ে ন্যাশনালে লড়তে গিয়ে আবার ওকে দেখেছিলুম। ভেবেছিলুম কোনও জিমন্যাস্টিক টুর্নামেন্টে বুঝি নামতে এসেছে। অ—ম্মা, দেখি স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলছে! খেলাটা ছিল বেঙ্গল—রাজস্থান। তারপর চৌপট্টিতে দেখলুম টিমের কয়েকটা মেয়ের সঙ্গে ভেলপুরি খেতে এসেছে। তখন ওকে আবার বলেছিলুম, কোচিংয়ে যাও না কেন, গুণ্ডার ভয় তো আর নেই। কিন্তু কথাটায় কোনও গা করল না, এড়িয়ে গেল।”

”জিমনাস্টিক ছাইড়্যা কিরকেট! এর পর সারের কোচিংয়েও যখন আর গ্যাল না তাইলে তো পড়াডাও ছাড়চে!”

”রোজারিওর সঙ্গে আমার ফাইনালের লড়াইটা দেখতে ওরা কয়েকজন গেছল।”

”তাই কও! বক্সিংয়ের ওরা বোঝেডা কী?”

”না বুঝুক, হারা—জেতাটা তো বোঝে। দুয়ো শুনতে—শুনতে ড্রেসিং রুমে ফিরে যাওয়ার সময় ওকে দেখেছিলুম, চোখে চোখ পড়তেই মুখটা ঘুরিয়ে নিয়েছিল।”

শিবার স্বরে বিষাদের ছোঁয়াটুকু নদীর কানে ঠেকল। সে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো নরম গলায় বলল, ”হাইর‌্যা গ্যালে না সবাই মুখ ফিরাইয়া লয়, এইডাই নিয়ম। দ্যাহনা জিতলা পরে কত না সংবর্ধনা, কত না পুরস্কার…।”

তখন শিবা মুখ ঘুরিয়ে পেছনের রাস্তা দেখছিল, ননীর কথাগুলো তার কানে গেল না। মেয়েটি হাঁটতে—হাঁটতে বাঁ দিকে জোনাকি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কস নামে স্টোভ ও হ্যারিকেন তৈরির কারখানা যাওয়ার রাস্তায় বেঁকে গেল। শিবা অবাক হয়ে ভাবল, এত সকালে মেয়েটি এই রাস্তায় কেন, এখানেই থাকে নাকি! কই এতদিনে একবারও তো তার চোখে পড়েনি? রিকশাটা তো ওর বেশি দূর দিয়ে যায়নি, একবার মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েও ছিল অথচ তাকে চিনতে পারল না! তার চেহারাটা তিন—চার বছরে কি খুব বদলে গেছে?

ব্রেক কষার ঝাঁকুনিতে শিবা সামনে তাকিয়ে দেখল ননীর চোখ তার মুখে আটকে রয়েছে। বুকের কাছে দুই মুঠি জড়ো করা।

”শিবা, তুই আবার শুরু কর, আবার তুই রিংয়ে নাম একবারটি।” ননীর কণ্ঠে মিনতি, চোখ দুটি ভিক্ষাপ্রার্থীর মতো, ”মায়ের কিরা, বক্সিংয়ের কিরা…তুই চ্যাম্পিয়ান হইবিই। আমার মন কইত্যাচে… কথাডা শোন। এইসব আলুর দম—টম বেচা বন্ধ কইর‌্যা তুই প্র্যাক্সিসে নাইমা পড়। যহন তুই প্র্যাক্সিস করবি, তোর হইয়া নিতুদার লগে আমি কাম করুম। রোজারিওর লগে হাইরাচিস, জেতা লড়াই হাইরাচিস, কি দুখ্য যে পাইচিলাম, পূরবো পল্লীর হগ্গলে…”

ননীর চোখে জলের আবরণ ছড়িয়ে রয়েছে। শিবার বুকের মধ্যে একটা ভয় চমকে উঠল। ননী যখন ‘ওস্তাদ’ না ডেকে শিবা, আর ‘তুমি’র বদলে তুই বলে, শিবা বুঝতে পারে আবেগে, উত্তেজনায় ননী তখন গভীরভাবে আন্তরিক, অন্তরের অন্তস্তল থেকে সে কথা বলছে। ওর মুখে ‘শিবা’ ডাকটা তার কাছে অত্যন্ত দামি, বুকের মধ্যে গরম লোহার শিকের মতো সেঁধিয়ে যায়। ওই ডাকে, অনেকটা মায়ের চোখে দেখা জীবনের প্রথম ভয়টাই তাকে পাইয়ে দেয়। সে জানে ননী অতি সরল, অতি সৎ। সব বিরোধিতা এদের কাছে নুয়ে পড়ে। মুখটা নামিয়ে শিবা বলল, ”চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

।। ৪।।

দেবদাস পাঠক রোডে বটকেষ্টর চায়ের দোকানে এক সময় শিবা কাজ করত। রাতে বাড়ি না ফিরে সে দোকানেই ঘুমোত। ভোরে উনুন ধরানো থেকে রাত প্রায় দশটা পর্যন্ত প্রধানত খদ্দেরদের চা দেওয়াই তার কাজ। অবশ্য, তারই ফাঁকে ওমলেট, টোস্ট আর ঘুগনিও সরবরাহ করতে হয়। দোকানে—দোকানে চা দিয়ে আসার জন্য পাঁচ আঙুলে পাঁচটা গ্লাস ধরে ঘণ্টায়—ঘণ্টায় তাকে বেরোতে হলেই ভবানী—সারের কোচিংয়ে একবার তখন উঁকি দিত।

যতীন্দ্রকিশোর হাই স্কুলে ক্লাস সেভেনে শিবা চার মাস পড়ার পর মাইনে বাকি পড়ায় নাম কাটা যায়। পূর্বপল্লীর শচীন বটকেষ্টর দোকানের রাঁধুনি। শিবাকে সে—ই কাজটা জুটিয়ে দেয়। দু’বেলা ভাত আর কুড়ি টাকা বেতন। প্রথমদিকে সে রাত্রে বাড়ি ফিরে যেত। কেউটে সাপের তাড়া খাওয়ার পর নিতুই বারণ করে বাড়ি না ফিরতে। মাসে একদিন যেত বেতনের টাকাটা দাদার হাতে দিয়ে আসার জন্য। দাদা দুটো টাকা তার হাতে দিয়ে বলত, ”তোর হাতখরচ।”

একটা টেবলে মৌরির বাটি আর খাতা নিয়ে বটকেষ্ট বসে থাকে সারাদিন, দুপুরে ঘণ্টাতিনেকের জন্য বাড়ি যায়। কোথায় ক’টা চা বা ওমলেট যাচ্ছে তাই দেখে আর খাতায় লেখে। কোনও কিছু দিতে দেরি হলে খদ্দেরদের আগে বটকেষ্টই তাড়া লাগায়—”শিবা, অ শিবা, আধঘণ্টা আগে যে ক্যাসেটের দোকান দুটো চা বলেছে” অথবা ”ডাক্তারবাবু যে মামলেট চাইল, কখন দিয়ে আসবি?” দু—তিন মিনিটকে বটকেষ্ট আধঘণ্টা বলে।

ভবানী—সারের সঙ্গে শিবার সম্পর্কটা ছিল একটু অন্যরকমের। শান্ত, নির্বিরোধ, গম্ভীর প্রকৃতির ভবানীচরণ মাইতি পঁচিশ বছর যতীন্দ্রকিশোরে অঙ্কের শিক্ষকতা করছেন। ছোটখাটো শীর্ণ চেহারা, মাথায় টাক, কাচের গ্লাসের তলার মতো চশমার লেন্স দুটি পুরু, চশমা ছাড়া প্রায় অন্ধ। খদ্দর ছাড়া পরেন না। হাঁটেন মিলিটারির মতো থুতনি তুলে, সটান দেহে। বয়স প্রায় পঞ্চাশ।

সকাল—সন্ধ্যায় কয়েকটি ছেলে ও একটি মেয়ে পড়তে আসে। ভবানী—সারের কোচিংয়ের খ্যাতি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়ানো। সিঁথি, বরানগর, বেলঘরিয়া থেকে পড়ুয়ারা আসে, কিন্তু তিনি দশটির বেশি নেন না। তার মধ্যে দু’জনকে পড়ান বিনা দক্ষিণায়, যেহেতু তারা গরিব এবং অঙ্কের মাথাটা দারুণ।

কোচিংয়ের একটি দেওয়ালে ব্ল্যাক—বোর্ড ঝোলানো। তার ওপরে স্বামী বিবেকানন্দর রঙিন একটি বাঁধানো ছবি। পড়ুয়ারা বসে মেঝেয় শতরঞ্চিতে। শিবা স্কুলে ভবানী—সারের কাছে কখনও পড়েনি। উনি শুধু উঁচু ক্লাসে অঙ্ক এবং প্রয়োজনে ইংরেজি পড়ান।

শিবা বুঝতে পারত না, এই লোকটি কেন তাকে আকর্ষণ করে। রাশভারী, কম কথা বলা, গম্ভীর, কিন্তু একটা ছেলেমানুষিও আছে। কোচিংঘরের পাশের দরজা দিয়ে তিন হাত গলিতে বেরিয়ে পেছনে গেলেই সারের সংসার, কোচিংঘর ও সংসারের মধ্যে কোনও দরজা—জানলা নেই, স্ত্রী সুপ্রভা শুধু সেখানে। একমাত্র ছেলেটি পিকনিক করতে গিয়ে পুকুরে ডুবে মারা গেছে। ভবানী—সার স্ত্রীকে ভয় পান। সুপ্রভা মুখরা এবং বাজে খরচ একদমই বরদাস্ত করেন না। তাঁর ধারণায়, সকাল—সন্ধ্যা এককাপ করে চা, ব্যস, এর বেশি খাওয়ার দরকার নেই। দু’ কাপের বেশি হলেই সেটা বাজে খরচের তালিকায় পড়ে, তবে অনেক কাকুতিমিনতির পর সারাদিনে তিন কাপ বরাদ্দ করেছেন। ভবানী—সার গঞ্জনাকে ভয় পান। অথচ চা তাঁর কাছে খুবই জরুরি পানীয়। আধঘণ্টা অন্তর গলাটা না ভেজাতে পারলে, অঙ্ক ব্যাপারটা তাঁর কাছে নীরস কিছু সংখ্যা ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।

একদিন শিবা চা দিতে ঢুকেছিল কোচিংঘরে। দরজায় দাঁড়িয়ে ভবানী—সার তখন কথা বলছিলেন স্ত্রীর সঙ্গে। পড়ুয়াদের জনাদুই সবেমাত্র এসেছে। শিবার হাতে চায়ের গ্লাস দেখে সুপ্রভা ভুরু কুঁচকে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলেন, ”কী ব্যাপার? চা খাচ্ছ?” ফ্যাকাসে মুখে ভবানী—সার মাথা নেড়ে বলে ওঠেন, ”চা খাব আমি! পাগল নাকি! শিবা কোচিংয়ে পড়তে চায়, আমি বলেছি চায়ের দোকানের কাজ ছাড়লে, স্কুলে ভর্তি হলে, তবেই পড়াব। কিন্তু কাজটা ছেড়ে দেওয়াও তো ওর পক্ষে সম্ভব নয়। এখানে—ওখানে দেওয়ার জন্য চা নিয়ে যাতায়াতের পথে রোজই একবার এসে ধরাধরি করে। যত বলি হবে না, স্কুলের ছাত্র ছাড়া পড়াই না, তবু শোনে না। এই দ্যাখো, সকালে একবার এসেছিল, আবার এখন এসেছে। উফফ কী যে নাছোড়বান্দা ছেলে। শিবা, বলেছি তো তোমাকে—এখন তুমি যাও, পরে ভেবে দেখব।”

শিবা প্রথমে হকচকিয়ে গেছল। কিন্তু ভবানী—সারের মতো লোক যখন এইভাবে ঝাড়া মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছেন, তখন নিশ্চয় কোনও কারণ আছে। তার প্রাথমিক অনুভূতি বলল—বিপদে পড়েছেন, এখনই সারকে সাপোর্ট কর।

সঙ্গে—সঙ্গে চায়ের গ্লাসসমেত হাত দুটো বুকের কাছে তুলে কাঁচুমাচু মুখে সে বলল, ”আপনি রোজই বলেন পরে ভেবে দেখব। কিন্তু কখনওই আমার কথা ভাবেন না।” তারপর একটু রাগ দেখিয়ে বলল, ”ঠিক আছে, আমি গরিব, আপনাকে মাইনে দিতে পারব না তাই আমাকে ভর্তি করতে চান না। ঠিক আছে, আর কখনও আপনাকে বলতে আসব না।” এই বলেই সে আর দাঁড়িয়ে থাকেনি।

আধঘণ্টা পর বটকেষ্টর দোকানের সামনে এসে ভবানী সার হাতছানি দিয়ে শিবাকে ডাকেন।

”তুমি যে এত বুদ্ধিমান, তা তো জানতাম না। খুব বাঁচান বাঁচিয়েছ। ব্যাপারটা কি জানো, পারিবারিক শান্তি বজায় রেখে তো চলতে হবে।” ভবানী—সার তারপর দৈনিক তিন কাপ বরাদ্দের কথা বলে শিবার কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন, ”কি করে একটু চা খাওয়া যায় বল তো?”

শিবার পরামর্শে মতোই তিনি প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর কোচিংঘরের বাইরে এসে ডান হাতটা তুলে দাঁড়ান, যেভাবে ক্রিকেট আম্পায়াররা আউটের সঙ্কেত দেন। এইভাবে সঙ্কেতের অর্থ: অনর্থ হবে না, চা দিয়ে যাও। শিবাও এক ঘণ্টা অন্তর দোকান থেকে বেরিয়ে প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে তাকিয়ে দেখে, হাত তুলে কোনও লোক স্ত্রীকে ফাঁকি দিচ্ছেন কি না।

তখন হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা চলছিল। অঙ্ক পরীক্ষায় একটা গোলমাল হয়েছে যতীন্দ্রকিশোর স্কুলে। দোকানে চা খেতে আসা দুটি ছেলের কথা শিবা ভাসা—ভাসা শুনেছে। একতলায় পরীক্ষা ঘরের জানলা দিয়ে কয়েকটা সাদা খাতা পাচার হয়ে আবার ফিরে আসে উত্তরে ভরা হয়ে। স্কুলেরই এক শিক্ষক—ইনভিজিলেটর সেটা ধরে ফেলেন হাতেনাতে। এর পর কিছু লোক স্কুলে ঢুকে হেডমাস্টারকে শাসিয়ে গেছে, যদি কোনও পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে রিপোর্ট পাঠানো হয় তা হলে বোমা মেরে পরীক্ষা বন্ধ করে দেবে, সেই ইনভিজিলেটরেরও হাত ভেঙে দেবে।

কথাগুলো শুনেই শিবার মনে হয়েছিল, এরা যে শিক্ষকের কথা বলছে সে ভবানী—সার ছাড়া আর কেউ নয়। যতদিন সে স্কুলে পড়েছে, দেখেছে এবং শুনেছে কত ছেলে সারের হাত পা—য় ধরেছে অঙ্কে পাশ করিয়ে দেওয়ার জন্য। কিছু উনি আধ নম্বরও বাড়িয়ে কাউকে পাশ করাননি। দারুণ কড়া যেমন, তেমনই অসম্ভব ধৈর্যে ছেলেদের অঙ্ক বোঝান। কামাই করেন না, এক মিনিটও দেরি করেন না ক্লাসে ঢুকতে। ভবানী—সার সম্পর্কে স্কুলে নানা কথা শুনে ছমছমে একটা শ্রদ্ধা শিবার তৈরি হয়েই ছিল। তার মনে হত, উনি মুনিঋষির মতো কেউ। কিন্তু চা—এর প্রতি ওঁর দুর্বলতা থেকে শিবার কাছে উনি ভালোবাসার জন হয়ে যান।

সন্ধ্যাবেলায় ‘আউট’ সঙ্কেত দেখে শিবা চা দিতে গেছল। ভবানী—সার চায়ের গ্লাসটা হাতে নিয়ে বলেন, ”শিবা, একটু যে মুশকিল হয়ে গেছে।”

”কিসের মুশকিল, হাত ভেঙে দেবে বলেছে?” কথাটা শিবার মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তই বেরিয়ে এসেছিল। স্বরে ছিল উৎকণ্ঠা।

ভবানী—সার তাচ্ছিল্যতায় তাকিয়ে বলেন, ”ওটা কোনও ব্যাপারই নয়। ধরা পড়লে ওরকম ভয়—দেখানো কথা সবাই বলে।” পর মুহূর্তেই তাঁকে উদ্বিগ্ন দেখায়। ”আসলে ভেতরে বোধ হয় মনে হচ্ছে আঁচ পেয়েছে। কেউ বোধ হয় বলে দিয়েছে।”

”কিন্তু আমি তো সার খুব হুঁশিয়ার হয়েই সাপ্লাই করি।”

”তা অবশ্য করো, কিন্তু পারিবারিক শান্তি বলে একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে যার বিষয়ে তুমি এখনও কিছুই বোঝ না। এই শান্তিটা কিভাবে বজায় রাখা যায়, অর্থাৎ চা—এর সাপ্লাইটা—” ভবানী—সার শিবার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিলেন, একচুমুকে চা শেষ করে।

”ধরা পড়ে গেলে বলবেন শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছিল বলে আদা নিয়ে এককাপ—”

”আরে না, না, শরীর খারাপের অজুহাত একদম নয়। শরীর খারাপ হওয়াটা তো লজ্জার ব্যাপার। শিক্ষিত মানুষের শরীর খারাপ হবে, এটা কি একটা কথা হল! যারা লেখাপড়া শিখেছে তাদের অবশ্যই জানা উচিত শরীর কিভাবে কাজ করে, তাকে কিভাবে যত্ন করতে হয়, কি কি করা উচিত আর কি—কি খাওয়া উচিত নয়। এই থেকেই তো আসে ডিসিপ্লিন। বুঝলে শিবা, এই শরীরটাই হল মানুষের একমাত্র নিজস্ব সম্পদ, সবথেকে দুর্লভ সম্পদ। সম্পদ রক্ষা করতে জানলে সেটা ম্যাজম্যাজ করবে কেন? তোমার যে এমন দারুণ স্বাস্থ্য, তুমি যত্ন করো বলেই তো!”

শিবা বোকার মতো শুনে যাচ্ছিল, এইবার হেসে ফেলল।

”আমি আর কি যত্ন করব। দিনে একবেলা ভাত—ডাল আর রাতে রুটি—ঘ্যাঁট, তাও পেট ভরে নয়।”

ভবানী—সার অপ্রতিভ হয়ে টাকে হাত বুলোতে—বুলোতে বলেন, ”ওহ তাই বুঝি, পেট ভরে খেতে পাও না? সেটা অবশ্য একদিক দিয়ে ভালই, অতি ভোজনে—”

শিবা ততক্ষণে উশখুশ শুরু করেছে। বটকেষ্টর চিৎকার যে—কোনও মুহূর্তে বাতাস কাঁপিয়ে ভেসে এল বলে! ভবানী—সারকে চুপ না করালে ছাড়া পাওয়া যাবে না, তাই সে দুম করে বলল, ”আচ্ছা সার, হাত ভেঙে দেওয়ার কথা শুনে আপনি ভয় পেলেন না, তা হলে চা খাওয়ায় ভয় পাচ্ছেন কেন?”

প্রশ্নটায় প্রথমে থতমত হয়ে তারপর ভবানী—সার হেসে ওঠেন।

”ওটাতে আমি ন্যায়ের পক্ষে, কর্তব্যের পক্ষে তাই, আর এটাতে আমি কারচুপি করছি, মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছি—তাই। ন্যায়—অন্যায় মানুষমাত্রই করে, না হলে মানুষ তো দেবতা হয়ে যেত। তবে দুটোর মধ্যে ডিগ্রির তফাত রাখতে হয়। আমি ন্যায়ের ডিগ্রিটা, মানে মাত্রাটা, বেশি রাখতে চাই, এই আর কি।”

”যদি ছেলেদের খাওয়ানোর জন্য মা ভাত চুরি করে, তা হলে কি অন্যায়?”

”কার ভাত? ভাতের মালিক কে?”

”বড়লোক, খুব বড়লোকের ভাত।”

”চুরির জন্য তাদের কি কম পড়ে?”

”একটুও পড়ে না। এই অ্যাতোটুকু ভাত আর ডাল, কি তরকারি। এতে কি কম পড়ার কথা?” শিবা তার দুই মুঠো জোড়া দিয়ে পরিমাণটা দেখাল।

জোড়ামুঠোর দিকে তাকিয়ে ভবানী—সার কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিলেন। ”আমি তো কোনও অন্যায় দেখতে পাচ্ছি না। তবে চুরি ইজ চুরি সেটা কিন্তু—”

বটকেষ্টর চিৎকার ভেসে এল এবং শিবা বাকি কথা শোনার জন্য আর দাঁড়িয়ে থাকেনি। দোকানে ফেরামাত্রই বটকেষ্ট খিঁচিয়ে ওঠে।

”মাস্টারের কাছে অ্যাতক্ষণ কি অঙ্ক কষছিলি? খদ্দেরকে নিজে হাতে করে চা দেব বলে লোক রেখেছি? গ্যারেজে তিন কাপ চেয়ে গেছে, দৌড়ে নিয়ে আয় গে।”

মুখ নামিয়ে বটকেষ্ট গজগজ করে যাচ্ছে। শচীনকাকু চা বানাচ্ছে। শিবার চোখ তখন টেবলে বসা দুটো লোকের দিকে। ওদের একজনের নাম সে জানে। বিটি রোডের ওপারে, মিনিট দশেক হেঁটে গেলে মিলন পল্লী, সেখানে থাকে। ওর নাম সাধু, ভাল নাম সাধন।

ওর সম্পর্কে অনেক কাহিনী শিবা শুনেছে। সাধু আর তার দলবলকে কেন্দ্র করে বীভৎস, নির্মম নানান গল্প এই অঞ্চলের মানুষের মুখে শোনা যাবে। ভয়ের দ্বারা অতিরঞ্জিত হলেও অনেক ঘটনাই সত্যি। দয়া, মায়া, মমতার ছিটেফোঁটাও সাধুর অন্তরে নেই। অথচ কলেজে দু’ বছর পড়েছে, ছাত্র রাজনীতিতেও ছিল। ওয়েটলিফটার হওয়ার জন্য পরিশ্রম করে তাল—তাল পেশী সংগ্রহ করেছে। চলাফেরার সময় পেশীগুলো অজগরের মতো ওর শরীরে নড়াচড়া করে। ওর পাশব শরীরে সব থেকে বেমানান মুখটি। গ্রিক দেবতার মতো মুখের আদল, শিশুর মতো চাহনি। বেঁটেখাটো সাধুর ডান পা—টি জন্ম থেকেই একটু ছোট।

এই পাড়ায় সাধু বহুদিন আসেনি, তাই অনেকের চোখ তার দিকে। দোকানে যারা এক গ্লাস চা নিয়ে সারা সন্ধ্যা বসে থাকে, তারা উঠে চলে গেছে। রাস্তা দিয়ে যেতে—যেতে অনেকেই সাধুর দিকে একবার তাকিয়েই চলার বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেবদাস রোডে ছমছমে একটা ভাব।

সাধু আঙুল নেড়ে শিবাকে ডাকে, ”শুনে যা।”

ফ্যালফ্যাল চোখে শিবা শুধু তাকিয়ে থাকে। রোগাটে, লম্বা সাধুর সঙ্গীটি তিরিক্ষে করে বলল, ”অ্যাই ব্যাটা, শুনতে পাসনি নাকি?”

শিবা তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসে।

‘মাস্টারটাকে চা দিতে গেছলি?” সাধু শান্ত গলায় জানতে চায়।

”হ্যাঁ।”

”ঘরে এখন কে আছে?”

শিবা জবাব দেওয়ার আগেই বটকেষ্ট বলে ওঠে, ”কে আবার থাকবে, কয়েকটা ছেলে আর একটা মেয়ে…..ওরে শিবা যা যা দৌড়ে যা, গ্যারেজে চা দিয়ে আয়।”

আঙুলের ডগায় তিনটে গ্লাস ধরে শিবা বেরিয়ে গেল। গ্রেট বেঙ্গল অটো রিপেয়ারিং—এর হেড মেকানিক শ্রীকান্ত দাস ব্যাটারির খোলের ওপর বসে মোটরের চাকায় ব্রেক শু্য লাগাচ্ছে। গ্যারেজের মালিক দুর্লভ চক্রবর্তী আর ঘিয়ে রঙের প্যান্ট ও নীল টি—শার্ট পরা, কাঁচাপাকা চুলের কৃষ্ণকায় দোহরা গড়নের একটি লোক দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছে তার কাজ।

চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়েই শ্রীকান্ত বলল, ”অ্যাহহ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, যা গরম করে নিয়ে আয়।” দুর্লভও গ্লাসের চা ফেরত দিল। দু’ গ্লাস চা ফিরিয়ে এনে শিবা দেখল সাধু ও তার সঙ্গীটি নেই। তার বুকের মধ্যে কেন জানি ছ্যাঁত করে উঠল। ভবানী—সারের কোচিংয়ের দিকে তাকিয়ে রাস্তায় ওদের দেখতে পেল না। তা হলে ওরা গেল কোথায়?

চা আবার গরম করে গ্যারেজে পৌঁছে দিয়ে ফেরার সময় তার মনে হল কোচিংটা একবার দেখে এলে কেমন হয়।

তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মুহূর্তটি কখন এসেছিল, এই নিয়ে শিবা পরে যখনই ভেবেছে, ভাবতে—ভাবতে সে এই জায়গাটায়ই পৌঁছেছে। একবার দেখে আসার ইচ্ছাটা তার মনের মধ্যে তৈরি না হলে সেদিন কোচিংঘরের জানলায় এসে দাঁড়াত না। না দাঁড়ালে সে দেখতে পেত না সেই দৃশ্য।

।। ৫।।

”দুটো আলুর দম, রুটি।”

হুকুমের স্বরে কথাটা বলে লোক দুটি দু’ পা সরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করল। নিতু দুটো ডিশ ওদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজের কাজে মন দিল। শিবা বালতি থেকে জল নিয়ে এঁটো ডিশ ধুচ্ছিল। একবার মাত্র লোক দুটির মুখের দিকে তাকাল। নতুন খদ্দের, আগে কখনও এদের সে দেখেনি।

”সদর দরজাটা আটকে দিলে বেরোবার আর কোনও রাস্তা নেই। তার আগে টেলিফোন লাইনটা কেটে দেওয়া।”

”ঘেরাও কদ্দিন চলবে?”

”যদ্দিন না রিজাইন করবে। আরে বাবা, ইলেকট্রিসিটি বন্ধ, জলের লাইন বন্ধ, বাড়ি থেকে বেরনো বন্ধ। বউ আর একটা বাচ্চচা নিয়ে ক’দিন ঘরে বসে থাকবে? বাচ্চচাটাকে খাওয়াতে হবে না?”

”উদ্ধার করতে পুলিশ এলে, তখন?”

”আসবে না, ওসব ব্যবস্থা করা আছে।” এই বলে লোকটি ঝোল মাখানো পাউরুটি চিবোতে—চিবোতে বলল, ”ঝোলটা বেড়ে করেছে। আর—এক প্লেট খাব।”

”আমাকেও আর—একটা দিতে বল।”

শিবা কথাগুলো শুনল বটে, মাথামুণ্ডু কিছু বুঝল না। আলুর দমের প্রশংসা শুনলে তার ভালই লাগে। লোক দুটো কুলিমজুর ধরনের নয়, কথার উচ্চচারণ থেকেই শিবা সেটা বুঝতে পারল।

জুট মিলে রাতের শিফটে কাজ করতে যাওয়ার আগে চা খাচ্ছিল কয়েকজন। একজন নিতুকে বলল, ”জোনাকিতে লকআউটে হচ্ছে, শুনেছ নাকি?”

”না।”

নিতু তার দোকান ছাড়া আর কোনও ব্যাপারে মাথা ঘামায় না, কৌতূহলও দেখায় না। ভোর থেকে রাত, শুধু খেটে যাওয়া। ব্যবসাটা বড় করা ছাড়া তার জীবনে আর কোনও লক্ষ্য নেই। একসময় সে ছোটখাটো একটা কারখানায় কাজ করত। মজুরি আর বোনাস বৃদ্ধি সহ এগারো দফা দাবি নিয়ে যে ধর্মঘট হয়, সে তার অন্যতম নেতা ছিল। সাধুর ছেলেদের দিয়ে পিটিয়ে মালিক গোরাবাবু ধর্মঘট ভেঙে দেয়। ধর্মঘট নেতাদের বেশিরভাগই বণ্ডে সই করে কাজে ফিরে যায়। নিতু যায়নি। ‘শ্রমিক আন্দোলন’ কথাটা শুনলেই এখন তার ঠোঁট মুচড়ে ওঠে, বিদ্রূপে না ঘৃণায়, সেটা বলা শক্ত।

”আমার কানেও অমন একটা কথা এসেছে।” আর—একজন বলল, ”ছেলে বলছিল, ওর এক বন্ধুর কাকা ওখানে কাজ করে, তার কাছেই শুনেছে। মালিক কারখানাটা তুলে দিয়ে ওখানে ফ্ল্যাটবাড়ি বানাবে। কিন্তু ছোকরা ম্যানেজার নাকি বেঁকে বসেছে। বলছে, কারখানা তুলে দেওয়া চলবে না। কোয়ার্টার সে ছাড়বে না। রগড় জমেছে ভাল। ম্যানেজারের সঙ্গে মালিকের লড়াই বেধে গেছে।”

শুনতে—শুনতে দুপুরে সেই দুটো লোকের কথোপকথন শিবার মনে পড়ে গেল। তার ভ্রূ দুটো তখন একবার শুধু কুঁচকে উঠল। রাতে বাড়ি ফেরার সময় সে জোনাকির মোড়ে থমকে দাঁড়াল। প্রায় দুশো মিটার দূরে কারখানার উঁচু পাঁচিল আর টিনের চালার কিছুটা দেখা যাচ্ছে। ভেতরে কাঠের থাম্বায় ইলেকট্রিক বালব জ্বলছে। মানুষজন নেই। রাস্তার দু’ ধারে একতলা পাকা বাড়ি এবং মাটির বাড়ি। রাস্তায় আলো নেই।

দু’দিন পর সকালে শিবা ডেকচি ঘাড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ননীকে খুঁজল। দেখতে না পেয়ে হেঁটেই রওনা দিল। জোনাকির মোড়ের কাছে এসে ওপারের বাস স্টপে চোখ পড়তে তার চলা থেমে গেল।

সেই মেয়েটি, বোধ হয় বাসের জন্যই দাঁড়িয়ে। এত সকালে, এখানে। শিবা ইতস্তত করে, কৌতূহল আর না চাপতে পেরে রাস্তা পার হল।

”চিনতে পার?”

বড় ডেকচি ঘাড়ে বসানো একটি তরুণ হঠাৎ সামনে এসে হাসিমুখে কথাটা বলায় মেয়েটি প্রথমে থতমত হয়ে পড়ল। চোখ কুঁচকে চেনার চেষ্টা করতে—করতে অবশেষে মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। দুই মুঠো তুলে বলল, ”বক্সার না?”

শিবা মাথা কাত করল, ”দু’দিন আগেও তোমাকে দেখেছি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ। এখানেই থাক নাকি?”

”এখানে দিদি—জামাইবাবু থাকে। এই ভেতর দিকে জোনাকি নামে স্টোভ আর হ্যারিকেনের যে ফ্যাক্টরিটা আছে, দেখেছ কী, জামাইবাবু তার ম্যানজার। ওদের কোয়ার্টারটা ফ্যাক্টরির মধ্যেই একপাশে।”

”দেখিনি, তবে জানি ওই রাস্তাটার ভেতর দিকে একটা আছে।” শিবা ডেকচিটা ঘাড়—বদল করল।

”কী আছে এতে?”

”আলুর দম। দাদা একটা দোকান দিয়েছে ফিডার রোডের মোড়ে, খদ্দের সব পার্কিনস জুট মিলের। আমি সাহায্য করি দাদাকে। বাড়িতে মা তৈরি করে, এখন আমি নিয়ে যাচ্ছি।”

”তোমরা তো সেই ভবানী—সারের কোচিংয়ের কাছাকাছিই থাকো, না?”

”হ্যাঁ। তুমি তো আর পড়তে গেলে না।”

”নাহ। বাবা মারা গেলেন, একটু অসুবিধায় পড়ে গেলাম আমরা, খরচটরচ কমাতে হল।”

একটা শ্যামবাজারগামী বাস এসে দাঁড়াল। দুটো দরজায় যাত্রী ঝুলছে। শিবা বলল, ”সকালে বাসে খুব ভিড় হয়। আটটায় যাদের হাজিরা তারা এই সময়ই যায় তো।”

মেয়েটা হতাশ চোখে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, ”অসম্ভব। আমার দ্বারা হবে না। কলেজে যেতে আজও দেরি হবে।”

”এখান থেকে কলেজে যাবে! কোথায় কলেজ?”

”এখান থেকে প্রথমে যাব বাড়ি, পাইকপাড়ার মোড়ে। চান—খাওয়া সেরে সেখান থেকে মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজ।”

”দিদির বাড়িতে তা হলে বেড়াতে এসেছ?”

মেয়েটি হেসে ফেলল। ”দিদি সবে জনডিস থেকে উঠেছে, আবার ওর দু’ বছরের ছেলেটার হয়েছে জ্বর। জামাইবাবু তো ফ্যাক্টরির নানা গোলমাল নিয়ে সারাদিনই ওখানে। দেখাশোনা, সাহায্য করার জন্য নিজেদের একজন কারও তো থাকা দরকার, তাই আমি আসি, মাও আসে।”

আর—একটা বাস এল। এটাতে আরও ভিড়। মেয়েটা এবার ওঠার চেষ্টা করতে দরজার দিকে এগোল। সেই সময় শিবার নজরে এল খালি রিকশা নিয়ে ননী ফিডার রোডের দিকেই চলেছে, বোধ হয় তারই সন্ধানে। ‘হগ্গের দ্যাবতাদেরও জোটে না’ এমন খাদ্য ননী হারাতে রাজি নয়।

মেয়েটিকে হাত ধরে টেনে শিবা দাঁড় করাল। ”উঠো না, উঠো না, তোমার যাওয়ার ব্যবস্থা করছি…ননী।” শিবা চিৎকার করল, ”অ্যাই ননইই।”

মুখ ঘুরিয়ে দেখেই, ব্রেক কষে ননী হাত তুলল। রাস্তা পার হয়ে সে আসামাত্র শিবা বলল, ”একে এখুনি ডানলপে নিয়ে গিয়ে বাসে তুলে দে। তুমি এর রিকশায় চলে যাও। ডানলপ ব্রিজ থেকে বাস ছাড়ে, বসে যেতে পারবে। ননী ফুল স্পিডে যাবি,…অ্যাঁ।” শিবা হতভম্ব হয়ে তাকাল। বরাভয় দানের মতো ননী হাতটা বুকের কাছে রেখে পাঁচটা আঙুল নাড়াচ্ছে।

”বেশি নয়, পাঁচটা।” ননীর মুখে বুদ্ধের প্রশান্তি ও সৌম্যতা।

”না, না, রিকশা আমার দরকার নেই, পাঁচ টাকা দিয়ে এইটুকু পথ যাওয়ার কোনও মানে হয় না।” মেয়েটি শশব্যস্তে বলল।

”দাঁড়াও তুমি, ব্যাপারটা টাকার নয়।” এই বলে দ্রুতপায়ে শিবা রিকশার কাছে এল। ”পাঁচ কী রে, অ্যাঁ। চারটে দোব।”

”উঁহু, চারটার কাম নয়, পাঁচটা।”

”এইটুকু তো পথ।” শিবা গলা চেপে ধমকাল।

”দূরত্বটা তো বড় কথা নয়, দু’বার প্যাডেল মাইরলেই তো ডানলপ পৌচায়ে যামু। কামের গুরুত্বটাই হইল আসল কথা। হক্কালবেলায় বিউটিফুল একডা মাইয়ারে রিকশায় একা বসাইয়া বি টি রোড ধইরা যাওয়া….এতে কত যে রিকস, কত যে ডেঞ্জার, তা…তুমি বুঝবা না…না, না, পাঁচটাই।”

”ঠিক আছে।” দাঁতে দাঁত চেপে শিবা রাজি হল। হাতছানি দিয়ে সে মেয়েটিকে ডেকে এনে বলল, ”উঠে পড়ো। এর নাম ননী। আমার বন্ধু, উপকার করতে খুব ভালবাসে। সকালে প্রথম প্যাসেঞ্জারের কাছ থেকেও ভাড়া নেয় না, তাই না রে ননী? ঠিকমতো বাসের সিটে ওকে বসিয়ে দিবি।”

”দ্যাহো ওস্তাদ, পরশুও শুনচি, অহনও শুইনলাম, ‘ওকে, ওকে’ কইরা ওনাকে বইলত্যাচ, ক্যান, ওনার কি কোনও নাম নাই? হ্যাঁ দিদি, আপনার নামডা কি?”

”মিতা, পারমিতা দাস। তোমার নাম তো শুনলামই, আর তোমার নামটাও জানি।”

শিবা অবাক হয়ে বলল, ”জানো। কী করে?”

”বোম্বাইয়ে, মনে আছে, তোমার লড়াই দেখতে গেছলাম। গ্যালারি থেকে চিৎকার হচ্ছিল, ‘কীল শিবা, কীল কীল কীল, নকআউট শিবা, নকআউট।’ তুমি অবশ্য পারনি।”

মিতার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে—সঙ্গেই শিবার মুখ থেকে চোখ সরিয়ে ননী প্যাডেল শুরু করে দিল। সে দেখেছে, শিবার মুখটা যন্ত্রণায় আর লজ্জায় ফ্যাকাসে হয়ে আসছে।

.

তখন সন্ধ্যা নেমেছে। ফিডার রোডের মোড় জমজমাট। রাস্তায় সওদা রাখা ফেরিওলাদের চিৎকার, সাইকেল রিকশার ভেঁপু, আনাজপাতির বাজার থেকে হাঁকাহাকি, এরই মাঝে খিদে পাওয়া মানুষদের তাড়া। শিবা আর নিতুর দম ফেলার সময় নেই। তারই মধ্যে শিবা দেখতে পেল মিতাকে।

বিভ্রান্তের মতো ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে এধার—ওধার তাকাচ্ছে। দু’চোখে উদ্বেগ। শিবা হাত তুলল, যদি দেখতে পায়। পায়নি, তবে দাঁড়িয়ে থাকা এক চানামটরওলার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করছে। শিবা নিশ্চিত, তাকেই খুঁজছে, নয়তো এখানে ওর আসার আর কোনও কারণ তো থাকতে পারে না।

”এই যে, তোমাকেই খুঁজছি শিবা, ভীষণ বিপদে পড়ে গেছি। ননী বলেছিল, কোনও দরকার—টরকার হলে তোমাকে বলতে।” মিতা নিজেকে স্থির রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে, পারছে না। ”দিদি, জামাইবাবু, ওদের বাচ্চচাটা…।”

”কী হয়েছে?” শিবা হাত ধরে মিতাকে সরিয়ে আনল দোকানের সামনে থেকে। নিতু অবাক হয়ে দেখছে।

”কোয়ার্টারে ওদের আটকে রেখে দিয়েছে, ঘেরাও, ধর্মঘট, অবরোধ যাই বলো না কেন, স্রেফ বন্দি হয়ে আছে। টেলিফোন লাইন কেটে দিয়েছে। কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না, বেরোতেও না। বিকেলে এসে ঢুকতে গিয়ে ফ্যাক্টরির গেটেই ওরা আমায় আটকে দিল।”

”ওরা কারা?”

”যারা দুপুর থেকে ধর্মঘট শুরু করে গেটের সামনে বসে পড়েছে। আমার পক্ষে তো কাউকেই চেনা সম্ভব নয়। একজন আমার দিকে তেড়ে এসে বলল, মালিকের দালালকে তো বটেই, তার আত্মীয়স্বজনকেও ধোলাই দেওয়া হবে। ওখানেই শুনলাম, যতক্ষণ না জামাইবাবু রেজিগনেশন লেটারে সই করছে, ততক্ষণ কোয়ার্টারের মধ্যে ফ্যামিলি সমেত তাকে আটকে রাখা হবে, বাইরের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে। টেলিফোন, ইলেকট্রিক, জল, সব কিছুর কানেকশন কাট—অফ করে দেবে। রেশন, ওষুধ, দুধ এসব কিছুই পাবে না। খাবার জলটুকুও না। শিবা, তা হলে ওরা বাঁচবে কী করে, ওরা তো মরে যাবে।” মিতা দু’হাতের মুঠো ঝাঁকাল। তার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসার মতো অবস্থায়।

”আগে তুমি একটু শান্ত হয়ে দাঁড়াও দেখি। হাতের কাজ সেরে নিই।” শিবাকে বিচলিত দেখাল। দু’দিন আগে দুটো লোক খেতে—খেতে যা বলছিল, সেই কথাগুলোই তো ঘটেছে।

”এইসব শুনে কি কেউ শান্ত থাকতে পারে? আমি পেট্রল পাম্প থেকে কোয়ার্টারে টেলিফোন করি, লাইন ডেড। ভাবছি থানায় যাব।”

”যেতে পারো, কিন্তু কোনও কাজ হবে না। পুলিশ তোমার জামাইবাবুকে উদ্ধার করতে যাবে না, ব্যবস্থা করা আছে।”

”বলছ কী!”

শিবা জবাব না দিয়ে নিতুর কাছে এল। ”দাদা, এর নাম মিতা। ভবানী—সারের কোচিংয়ে পড়ত। ওর জামাইবাবু জোনাকির ম্যানেজার। আজ দুপর থেকে তাকে ফ্যামিলি সমেত কোয়ার্টারে আটকে রেখে ধর্মঘট শুরু করেছে। আমি একটু দেখে আসব ব্যাপারটা, তুমি ততক্ষণ চালিয়ে নিয়ো।”

”ধর্মঘট! তুই কী করবি ওখানে? ও তো আপনিই ভেঙে যাবে—তোকে আর ঝামেলায় জড়াতে হবে না।” নিতু বিরক্ত স্বরে ভাইকে বারণ করল।

”তবু একবার দেখে আসি। একটা দু’ বছরের ছেলে বন্দি থাকবে, দুধ পাবে না, জল পাবে না, তা কি হতে পারে।”

বসার টুলটা মিতার সামনে রেখে শিবা বলল, ”তুমি এখন বসে থাকো। জোনাকি থেকে আমি একবার ঘুরে আসি, কোয়ার্টারটা কোথায়?”

”গেট দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে একটা ফাঁকা জমির পরেই একতলা গোলাপি রঙের বাড়ি। বেরোবার একটাই দরজা। গেটের কাছ থেকে দেখা যায়। আমি দেখেছি গোটাকতক লোক কোয়ার্টারের সামনে হাত তুলে—তুলে স্লোগান দিচ্ছে।”

কিছুক্ষণ পরে শিবা ঢিলেঢালা ভঙ্গিতে হাঁটতে—হাঁটতে জোনাকির গেটের কাছে পৌঁছল। জনাপঁচিশ লোক সেখানে। গেটের সামনে চৌকি। তার পেছনে লাল শালুর কাপড়ে শ্রমিক ইউনিয়নের নাম লেখা। খুঁটিয়ে সে লোকগুলির মুখ দেখল, কিন্তু একজনকেও তার চেনা লাগল না। পরিবেশটা শান্ত, ধর্মঘট হলে যে চাঞ্চল্য বা উত্তেজনা থাকে, তার কিছুই নেই । পাঁচিলের গায়ে হাতে—লেখা কয়েকটা পোস্টার। অনেকেই ভাঁড়ে চা খাচ্ছে। দুটো বড় বালব থেকে আলো ছড়িয়ে রয়েছে।

শিবা গেট পর্যন্ত চলে গেল। কেউ তাকে লক্ষ করল না। লোহার চাদরের গেট, পাল্লা দুটো আধ—খোলা। কিছু ধর্মঘটী ভেতরেও রয়েছে। তীক্ষ্ন নজরে সে বাঁ দিকটায় চোখ পাঠাল। কাঠের থাম্বায় ফ্যাক্টরির ইলেকট্রিক আলো জ্বলছে। ফাঁকা জায়গায় বড়—বড় ঘাস, কিছু ভাঙা প্যাকিং বাক্সের কাঠ, টিনের স্ক্র্যাপ, তার পেছনে একতলা আবছা একটা বাড়ি। জানলাগুলো বন্ধ, সদর দরজাটাও। বাড়ির মধ্যে কোনও আলো জ্বলছে বলে তার মনে হল না। কয়েকটা লোক বন্ধ দরজার সামনে বসে শালপাতা থেকে কিছু খাচ্ছে। বাড়ির পেছন দিকে কী রয়েছে বোঝা গেল না। দেড় মানুষ সমান উঁচু পাঁচিল দিয়ে ফ্যাক্টরি এলাকাটা ঘেরা। পাঁচিলের ধারে গোটা পাঁচেক কৃষ্ণচূড়া গাছ।

”অ্যাই এখানে কি চাই, য়্যা? ভেতরে কী দেখছ?” চৌকিতে আধশোয়া একটি লোক চোখ কুঁচকে কর্কশ স্বরে বলল।

”ননীকে খুঁজছি।” শিবার নিরীহ মুখ থেকে ব্যস্ত স্বরে কথা বেরোল।

”কে ননী? কোথায় কাজ করে?”

কোথায় করে! শিবা ফাঁপরে পড়ল বটে, কিন্তু সঙ্গে—সঙ্গে একটা স্টোভকে সে মনে মনে দেখে নিল।

”বলেছিল রঙের কাজ করে। আলুর দম আর রুটির দাম পাব, মাসকাবারে দেবে বলেছিল। ধর্মঘট চললে তো আমার টাকা—হ্যাঁ দাদা কদ্দিন চলবে বলতে পারেন?” শিবার মুখে দুর্ভাবনা ছড়িয়ে পড়ল।

লোকটির চোখ এবার স্বাভাবিক হয়ে এল। ”কত টাকা খেয়েছে? দেখতে কেমন?”

”সাতাশ টাকার। দেখতে খুব রোগা, কালো, আমার মতোই লম্বা। একটা গেঞ্জি পরে, তার বুকে লেখা—’আই লাভ ইউ’।”

লোকটা খিকখিক করে হেসে উঠল। ”ভালবাসে যখন, ও টাকা মার যাবে না, দু’দিন পরে এসে খোঁজ নিয়ো।”

”তখন ফ্যাক্টরি খুলে যাবে?”

”তা আমি কী করে বলব। সবই নির্ভর করছে ওদের মরজির ওপর। দাবিগুলো মেনে নিলে আমরাও ধর্মঘট তুলে নেব।”

”দাবি নিয়ে কী কথা হচ্ছে তুলসীদা?” এগিয়ে এল এক গাঁট্টাগোট্টা অল্পবয়সী, বুকে পিন দিয়ে আঁটা কাগজের ব্যাজ। শিবার মনে হল, একে কোথায় যেন সে দেখেছে। মনে—মনে সে খোঁজাখুঁজি শুরু করল। ”আলো আজ বন্ধ হয়েছে, কাল জলও বন্ধ হবে। কার মরজির ওপর দাবি মেটানো হবে সেটা কি অন্য লোক ঠিক করে দেবে?” হাতের খেঁটোটা তক্তায় ঠুকে লোকটা কটমটিয়ে এবার শিবার দিকে তাকাল। ”আমরা ঠিক করে দেব।”

এবার শিবার নজরে পড়ল দু’হাত করে লম্বা কয়েকটা খেঁটো আর লোহার রড চৌকির পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা। দুটো লোক ফ্যাক্টরির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।

”একটা শতরঞ্চি কি মাদুর হবে তুলসীদা?”

”কেন, ঘুমোবি নাকি?” বুকে ব্যাজ আঁটা বলল। কথা বলার ভঙ্গিটা শিবাকে মনে পড়িয়ে দিল একে সে দেখেছে ছায়াবাণী সিনেমা হলের সামনে। লোকটা টিকিট কালোবাজারীদের সর্দার।

”ঘুমোব না তো কী! সারারাত জেগে বসে থাকার দরকার কি? সদর দরজাটায় তালা মেরে দিয়েছি, বেরোবার আর তো পথ নেই।”

”অ্যাই তোমার আর কি এখানে দরকার, যাও, যাও, কেটে পড়ো। ননীটনি বলে এখানে কেউ নেই।” তুলসীদা উঠে বসল।

অনিচ্ছুক পায়ে ফিরে যেতে—যেতে শিবা বলল, ”তা হলে কাল সকালে একবার আসব।”

”তাই এসো।”

সাইকেল রিকশায় বসে ছিল ননী। শিবাকে দেখে নেমে পড়ল।

”বুইজল্যা শুইনল্যা কী, ব্যাপারডা ক্যামন ঠ্যাকল?”

”বলছি। মিতা বাড়ি চলে গেছে?”

”হ। বাসে তুইল্যা দিয়ে কইয়া দিচি, দু’জনায় মিল্যা রাত্রে ভাবনাচিন্তা কইর‌্যা একডা উপায় বাইর করবই। কাইল হগ্গালে ভবানী—ছারের কোচিংয়ে যেন আসে।”

শিবা রিকশায় উঠে বসে বলল, ”চল, যেতে—যেতে বলছি। একটা প্ল্যান করতে হবে। ননী তুই এখানকার পথগুলো সব চিনিস? জোনাকির পেছন দিকে পাঁচিলের ধার দিয়ে রাস্তাটা কোথায় গেছে জানিস?”

”সব জানি না, তয় কিছু কিছু জানি।”

”দাঁড়া, দাঁড়া, এটা কিছু—কিছু জানলে হবে না, ভাল করে জানা চাই। এখুনি তুই একটা চক্কোর দিয়ে ঘুরে দেখে আয় তো, পেছন দিয়ে বি টি রোডে বেরোবার কোনও পথ আছে কি না। আমি ওদের সামনে দিয়ে এখন যাব না, তুই যা।”

”ওস্তাদ, তোমার মতলবডা কী?”

”বলছি। ভেতর থেকে কৃষ্ণচূড়া গাছের কোনও ডাল পাঁচিলের বাইরে বেরিয়ে আছে কি না দেখছি। গেটের সামনে দুটো বালব ছাড়া বাইরে সব অন্ধকার, তবু দেখবি রাস্তায় আলোটালো আছে কি না। যা, চট করে ঘুরে আয়, আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তারপর গ্যারেজে যাব, ওখানে মোটা—মোটা দড়ি দেখেছি একধারে পড়ে আছে। হাত পাঁচেক লম্বা একটা নিতে হবে। তারপর—”

।। ৬।।

জোনাকি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কস—এর পাঁচিল ঘেঁষে ননীর রিকশা যখন নিঃশব্দে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়াল, তখন রাত আড়াইটে। আরোহী শিবা। সিটের ওপর সে উঠে দাঁড়াতেই পাঁচিল ছাড়িয়ে প্রায় দু’ফুট ওপরে উঠে গেল তার মাথা। ফ্যাক্টরির পেছন দিকটা এই প্রথম সে দেখছে। দূরে জ্বলছে ইলেকট্রিক বাতি। আবছা আলো যতটা দেখা যায় তাইতে দেখল লম্বা—লম্বা ঘাস, ডোবার মতো একটা শুকনো গর্ত, প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে কোয়ার্টারটা। একতলা, নিচু ছাদ। তার মনে হল, ডান দিকের ঘরটাই শোওয়ার।

দুটো বড় জানলাই খোলা। নিশ্চয় গরম সহ্য করতে না পেরে খুলতে বাধ্য হয়েছে।

ছাদের পাঁচিল থেকে কার্নিসে নামাটা শক্ত নয়। তার দু’ হাত নীচেই জানলার ওপরে বেরিয়ে রয়েছে কংক্রিটের ছাঁচা। ওর ওপর নামতে গেলে একটু সাহায্য লাগবে। তারপর ছাঁচা থেকে মাটিতে, কাঁধে পা রেখে নেমে পড়তে পারবে। একটু মুশকিলে হবে দু’ বছরের বাচ্চচাটাকে নিয়ে।

ওটা কিছু নয়, এই ভেবে শিবার মাথাটা যখন হালকা হতে শুরু করেছে, তখনই টর্চের আলো অন্ধকার কেটে—কেটে ঘাসের ওপর খাঁড়ার কোপ দিল। শিবা চট করে নামিয়ে নিল মাথা। কোয়ার্টারের অপর দিকে কেউ একজন জেগে পাহারা দিচ্ছে, অন্ধকারে তাকে দেখা যাচ্ছে না। পাঁচিলের ওপর চোখ পর্যন্ত তুলে সে লক্ষ করতে লাগল লোকটা এখন কোথায়, ঘুরে বেড়াচ্ছে কি না, এই দিকে আসবে কি না।

এল না। কোনও সাড়াশব্দ বা টর্চের আলো আর পড়ল না। তা হলেও খানিকটা সময় দেওয়া দরকার, এখনই কাজে নামা ঠিক হবে না। শিবা রিকশার সিটের ওপর বসল।

”ক্যামন দ্যাখলা?” ননী ফিসফিসিয়ে বলল।

”একজন জেগে পাহারায় রয়েছে, টর্চ নিয়ে।”

”তা হলে তো ডেঞ্জার।”

”ডেঞ্জার আবার কী, একটু টাইম দিয়ে তারপর নামব। তুই কাছিটা ওদিকে ঝুলিয়ে রাখবি। মিতার দিদি, জানি না ধরে উঠতে পারবে কি না, মিতা হলে বিনা দড়িতেই একটা ভল্ট দিয়ে উঠে যাবে, জিমন্যাস্টিক করত তো!”

”ওর দিদিও তো মিতা, পুরা নাম মধুমিতা, পারমিতারই বড় বইন। তাইলে ভল্ট দিতি পারুম না ক্যান?”

”তোর বুদ্ধিশুদ্ধি কি শুধু রিকশার প্যাডেলেই ঘুরপাক খাবে, হ্যান্ডেল পর্যন্ত ওঠাতে পারিস না? দু’ বছরের একটা বাচ্চচার মা, সে কিনা ভল্ট খাবে?….জামাইবাবুর নাম উৎপল, সেটা মনে রাখবি।”

‘পদবিটা চাটুজ্জে না রায়, কি একডা যেন কইছিল মিতা?”

”চট্টরাজ। আর মিতাকে বাড়িতে ডাকে পারো বলে। দুই বোন মধু আর পারো। কিন্তু ওকে জিজ্ঞেস করেছিলি জামাইবাবুর ফিটনেস কেমন, দৌড়তে, লাফাতে পারে কিনা?”

”জিগাই নাই। তয় দুখ্যু কইরা কইছিল, মালিকের লগে আপস ক্যইল্লে আইজ আর দিদিরে এই হ্যানস্তায় পইড়তি হইত না।”

”লোকটা খুব জেদি, মনের ফিটনেসটা দারুণ!”

”কিন্তু সংসারের ব্যাপার—স্যাপারে একদম আনফিট। ওনার উচিত আছিল রিজাইন কইর‌্যা, টাহাকড়ি পকেটে পুইর‌্যা চইলা যাওয়া। কাম জানা, ল্যাহাপড়া জানা লোক, ওনার কি চাকরির অভাব হইব?”

”তার মানে! অন্যায়কে মেনে নিতে বলছিস? অধর্মকে তুই বলছিস মেনে নিতে? একটা এত বড় ফ্যাক্টরি, কত লোক এখানে কাজ করে! এটা তুলে দেওয়া কি অন্যায়, অধর্ম নয়?”

কথাটা বলেই শিবা বুকের মধ্যে একটা বিদ্যুৎচমক বোধ করল। মাথার মধ্যে আলোর ঝলকানি লাগল। তার মুখ দিয়ে ‘অন্যায়’ আর ‘অধর্ম’ শব্দ দুটো কী করে বেরোল? কে তুলে দিল তার মুখে? তার মাথার মধ্যে এই শব্দ দুটো বাসা বেঁধে রয়েছে কবে থেকে?

আবার একটা ঝলকানি।…শিবা দেখতে পেল জানলার একটা পাল্লা আধখোলা। ঘরের ভেতরে দেখা যাচ্ছে শুধু একটা কোণ। সে দেখতে পাচ্ছে পাঁচটি ছেলে ও একটি মেয়ে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে। তারা যেন কাঠের পুতুল, কেউ নড়ছে না, শুধু সামনে তাকিয়ে। প্রত্যেকের চোখে ভয়, মুখের চামড়ার নীচে রক্ত নেই।

শিবার কেন যে ইচ্ছে হল ভবানী—সারের কোচিংটা একবার ঘুরে দেখে আসার। বটকেষ্টর দোকানে সাধু আর তার সঙ্গীকে দেখতে না পেয়ে তার মনে যে ভয় ধরল, হয়তো তাই থেকেই কৌতূহলটা তৈরি হয়।

জানলা দিয়ে ছয়জনের দিকে হতভম্ব হয়ে সে যখন তাকিয়ে, তখন ঘরের আর—এক কোণে, ভেজানো পাল্লার পাশেই একটা কণ্ঠস্বর শুনল।

”যদি হাতটা ভেঙে দি?” মৃদু, শান্ত উচ্চচারণ। শিবার মনে হল, সাধুর গলা।

উত্তর দিল না কেউ।

”কথা নেই কেন মুখে? যদি ভেঙে দিই, তা হলে অঙ্ক কষাবেন কী করে?”

”বাঁ হাত দিয়ে।”

”ওরে বাবা! দেবু শুনলি, বাঁ হাত দিয়ে উনি—”

”বাঁ হাতটাও তা হলে ভেঙে দাও।”

”দরকার নেই ওসবের। শুনুন, পরীক্ষার ক’টা দিন আপনি স্কুলে যাবেন না। এই ঘরে বসে যত খুশি অঙ্ক কষুন, কিন্তু স্কুলে যাবেন না।”

”তার মানে অন্যায়ের কাছে আমাকে মাথা নোয়াতে হবে, অধর্ম আমাকে মেনে নিতে হবে।”

ভবানী—সারের গলা। অনুত্তেজিত, গম্ভীর অথচ কঠিন। শিবার সারা শরীর শক্ত হয়ে পড়ছে। পাঁচটি ছেলে ও একটি মেয়ে একই ভাবে দাঁড়িয়ে, তাকিয়ে।

”অতশত বুঝি না, মোট কথা, যা বললুম তাই করবেন। বাড়িতেই থাকবেন, পরীক্ষা হয়ে গেলে স্কুলে গিয়ে চুটিয়ে মাস্টারি করবেন। কাল আপনি তিনটে ছেলের ক্ষতি করতে গেছলেন, ওদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন, অবশ্য ম্যানেজ করে নিয়েছি।”

”আমি সত্যিই দুঃখিত যে, ওদের ক্ষতি করতে পারিনি। একটা কথা তুমি শুনে রাখো, হাতই ভাঙো আর পা—ই ভাঙো, অন্যায়কে আমি প্রশ্রয় দেব না। আমার হাতের চেয়েও বড় ব্যাপার এই ছেলেদের চরিত্র, তাদের মনুষ্যত্ব। সেটা আমাকে বাঁচাতেই হবে। এভাবে স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করলেও, জীবনের পরীক্ষার তো এরা বরাবরই ফেল করবে। ঘুণ ধরে ঝাঁঝরা হওয়া মানুষ, কি পরিবারের কি সমাজের কোনও বড় কাজের দায়িত্বই তো নিতে পারবে না, ভেঙে পড়ে যাবেই।”

”বড়—বড় কথা এখন শোনার সময় নেই, ওসব ক্লাসে কপচাবেন। পাশ করলে চাকরি জুটবে, খাইয়ে—পরিয়ে সংসার বাঁচাতে পারবে, এটাই বড় কথা।” সাধুর গলা থেকে এবার রাগ বেরিয়ে এল।

”না, না, পারবে না, এটা কোনও কাজের কথা নয়। মানুষ শুধু খেয়েই বাঁচে না। তার মন আছে, চেতনা আছে, আত্মা আছে।” ভবানী—সারের গলায় ব্যাকুলতা।

”সাধু, কথাবার্তা কি একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?” দেবুর ধৈর্য আর অপেক্ষা করতে পারছে না।

”থাম তুই, আমাকে আত্মা দেখাচ্ছে! আত্মা তা হলে তো আমারও আছে, বলুন, আছে তো?”

সাধু এক পা পিছিয়ে দাঁড়াতেই শিবা ওকে এবার দেখতে পেল, ডান হাতটা বুকে ঠেকানো। আত্মা বোধ হয় ওখানেই থাকে। সাধুর সুন্দর মুখটা কুঁকড়ে রয়েছে রাগে, চোখ জ্বলছে। বাঁ হাতের বেতের ব্যাটনটা দিয়ে সে সামনে দাঁড়ানো কাউকে খোঁচা মারল, বোধ হয় সারকেই।

”তা হলে আমারও আত্মা আছে, বলছি আছে। এই ছেলেগুলোরও আছে, দেখবেন?”

সাধু তালুর উলটো পিঠ দিয়ে একটি ছেলের গালে আঘাত করল। ”আঁ’ বলেই ছেলেটি গালে হাত দিয়ে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল। বিশ্বাস করতে পারছে না এভাবে মার খাবে! সংবিৎ ফিরে পেয়েই ছেলেটি খোলা দরজা দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে বেরিয়ে গেল। সাধু হাসতে শুরু করল।

”দেখলেন? ওর আত্মা বলল পালাও, তাই সটকান দিল।”

সাধু আর—একটি ছেলের সামনে দাঁড়াল। ডান হাতটা ধীরে—ধীরে তুলতে শুরু করতেই দু’ হাতে মুখ ঢেকে ছেলেটি ফুঁপিয়ে উঠল।

”এর আত্মা বলল কাঁদো, তাই না?” সাধু ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘরের কোণের দিকে তাকিয়ে হাসল। ”এই হচ্ছে আত্মা। শরীরের জন্যই আত্মা। এই এলাকার সব আত্মা সুযোগ—সুবিধে পাওয়ার জন্য, কাজ উদ্ধারের জন্য আমাকে তোয়াজ করে, ভয় পায়, হাতজোড় করে।” তারপর সে দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে চারটি ছেলে ও মেয়েটিকে মৃদু স্বরে বলল, ”বাড়ি যাও।”

মেঝে থেকে বই—খাতা কুড়িয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েই ওরা বি টি রোডের দিকে প্রায় ছুটতে শুরু করল, শুধু মেয়েটিই একবার দাঁড়িয়ে ইতস্তত করে পেছনে তাকায়।

জানলা দিয়ে দেখতে—দেখতে শিবার মনে হচ্ছিল, সে যেন হিন্দি সিনেমা দেখছে। পরদা থেকে একটা ভিলেন জ্যান্ত নেমে এসেছে তার চোখের সামনে। বটকেষ্টর চিৎকার ভেসে এল। চেঁচাক, এমন একটা সত্যিকারের সিনেমা ফেলে তার এখন যাওয়া সম্ভব নয়।

সাধু পা—পা এগিয়ে গেল ঘরের কোণের দিকে, মুখভরা হাসি।

”আমার আত্মা বলছে আপনার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করতে হবে, আপনার আত্মা বলছে হাত দুটো আস্ত রাখতে হবে। দুটোই সম্ভব। ঠিক বলেছি কি?”

জানলার কিনারে মুখ রেখে একচোখ দিয়ে শিবা ঘরের অন্য দিকটা দেখার চেষ্টা করল। ভবানী—সার ডান হাতটা বাড়িয়ে, মুখে পাতলা হাসি। চশমার পুরু কাচে ইলেকট্রিক আলো, বরফ কুচির ওপর রোদের মতো ঝকঝক করছে।

”হাত আমার দরকার নেই, তুমি এটা নিতে পারো, কিন্তু স্কুলে আমি যাবই।”

”যাবেনই।”

”হ্যাঁ।”

কোনও দ্বিধা নেই একফোঁটা শব্দটিতে। বাড়ানো হাতটা আর—একটু তুলে বিবেকানন্দর ছবিটির দিকে নিবদ্ধ করলেন।

”ওই মানুষটি একটি কথা বলেছেন।”

সাধু মুখ ঘুরিয়ে ছবিতে চোখ রাখল।

”বলেছেন, সত্যের জন্য সব কিছু ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোনও কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করা যায় না।” হাতটা নামিয়ে ভবানী—সার হেসে বললেন, ”পরীক্ষার ক’টা দিন আমি স্কুলে যাব। অন্যায় হচ্ছে দেখলে বাধা দেব।”

এবার সাধু এগিয়ে গেল। ভবানী—সারের ডান হাতের কবজি মুঠোয় ধরে চোয়াল শক্ত করল। সাধুর হাতের পেশিগুলো, আঙুল থেকে কাঁধ পর্যন্ত, ফুলে উঠে ডেলা বেঁধে গেল। সারের মুখের হাসিটা থমকে গিয়ে যন্ত্রণায় একবার কুঁকড়ে উঠল, তবে দু—তিন সেকেন্ডের জন্য। আবার হাসি ফুটল।

সাধুর মুখ টসটস করছে উত্তেজনায়, কপালে ঘাম ফুটছে। একদৃষ্টে সে সারের মুখের দিকে তাকিয়ে। হাতের পেশিগুলো আরও কঠিন হচ্ছে।

সারের মাথাটা এবার ধীরে—ধীরে সামনে ঝুঁকে পড়ছে। ঠোঁট দুটি ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। থরথর করতে—করতে তাঁর দেহ কুঁজো হয়ে গেল। ”আহহ, আহহ, আমি নুইব না, কিছুতেই না, ওহহ… পারবে না, আমাকে দিয়ে অন্যায়, অধর্ম—”

এর পর শিবা নিজেও জানে না কখন সে কোচিংঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। সাধু মুখ ফিরিয়ে তাকে শুধু দেখল মাত্র। তখন ভবানী—সারের কবজিটা তার মুঠোর মধ্যে ধরা।

শিবা বলল, ”ছেড়ে দাও সারকে।” বাঘের গর্জনের আদল ছিল তার স্বরে।

.

পাঁচিল থেকে একটা বেড়ালের মতো লাফিয়ে শিবা ঘাসের ওপর নামল। ফ্যাক্টরি ঘিরে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কোয়ার্টারের পেছনে অন্ধকার, সামনে আলো। এতে তার সুবিধেই হবে। গুঁড়ি মেরে সে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে অতি দ্রুত এগোল পেছনের জানলা লক্ষ্য করে।

জানলার নীচে উবু হয়ে বসে সে বোঝার চেষ্টা করল ঘরে কেউ জেগে আছে কি না। কোনও সাড়াশব্দ নেই। খোলা জানলার কাচে সে তিনটে টোকা দিল। সাড়া নেই। এবার একটু জোরেই টোকা দিয়ে সে ফিসফিসিয়ে ডাকল, ”উৎপলবাবু, উৎপলবাবু।”

”কে? কে?” সন্ত্রস্ত চাপা পুরুষ গলা।

”ভয় পাবেন না, জানলায় আসুন, আমি পারমিতার বন্ধু।” শিবা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে গলা নামিয়ে বলল।

একটা ছায়ামূর্তি সন্তর্পণে জানলার দিকে এগিয়ে এসে একটু দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল। ”কে? কে আপনি?”

”আমার নাম শিবা। মিতা, পারমিতা আমার বন্ধু। আপনাদের তিনজনকে কোয়ার্টার থেকে বার করে নিয়ে যেতে এসেছি।”

একটা সন্দিগ্ধ নীরবতা। কোনও উত্তর এল না। ঘরের মধ্যে চাপা গলায় দু’জনের কথা বলার শব্দ শোনা গেল। স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছে। শেষরাতে জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে কোনও অপরিচিত লোক যদি বলে, ”বার করে নিয়ে যেতে এসেছি” তা হলে চট করে তাকে বিশ্বাস করা শক্ত, উচিতও নয়।

”আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। ওরা আপনার টেলিফোন আর ইলেকট্রিক লাইন কেটে দিয়েছে, কাল থেকে কলের জলও পাবেন না। দরজায়ও তালা মেরে দিয়েছে। আপনাকে ওরা রিজাইন করতে বাধ্য করাবেই। আপনার ছেলে টুটু, যার হাম হয়েছে, তাকে বাঁচাবার কথা ভাবুন।” শিবা প্রায় মিনতির সুরে কথাগুলো বলল।

আবার ঘরের মধ্যে চাপা কথাবার্তা শোনা গেল। শিবা আবার বলল, ”মিতা ভবানী—সারের কোচিংয়ে পড়ত, আমি তার কাছাকাছিই থাকি। একদিন এক গুণ্ডা সারকে মারবার জন্য কোচিংঘরে ঢুকেছিল। তারপর থেকে ও আর পড়তে যায়নি।”

”হ্যাঁ, হ্যাঁ,” ঘরের মধ্যে নারীকণ্ঠে শোনা গেল, ”ঠিকই, পারো তারপর আর যায়নি। শিবা নামে একটা ছেলে গুণ্ডাটাকে নাকি—”

”দিদি, আমিই সেই শিবা। নির্ভাবনায় আপনারা আমার সঙ্গে আসতে পারেন।”

”তুমিই সেই বক্সার?” উৎপল জানতে চাইল।

‘হ্যাঁ বলতে গিয়ে শিবার জিভ আটতে গেল। বলল ”আগে ছিলাম। কিন্তু আপনারা আর দেরি করবেন না।”

”কীভাবে যাব? বাড়ির সামনে লোক, গেটেও লোক।”

”পেছনের পাঁচিল টপকে বেরিয়ে যাব। আপনারা ছাদ থেকে নামবেন। নিচু ছাদ, পা রাখারও জায়গা আছে। দিদিকে আর টুটুকে আমি নামিয়ে নেব। দরকারি জিনিস যা নেওয়ার, সঙ্গে নিন। একটা কাপড় নিন ছাদ থেকে ধরে নামবার জন্য। তাড়াতাড়ি করুন। পাঁচিলের বাইরে আমার বন্ধু ননী সাইকেল রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেরি করবেন না। একবার সামনের জানলা দিয়ে দেখে নিন তো লোকগুলো কী করছে।”

উৎপল আর মিনিটের মধ্যে ফিরে এসে বলল, ”দু’জন মাত্র চ্যাটাইয়ে শুয়ে রয়েছে, ছিল তো পাঁচ—ছ’জন!”

”সব দরজা—জানলা বন্ধ করে এবার ছাদে চলে যান। টুটু কি ঘুমোচ্ছে? দেখবেন যেন কেঁদে না ওঠে।”

টুটু কেঁদে ওঠেনি। ছাদের পাঁচিল ডিঙিয়ে কার্নিসে পা রেখে, পাকানো বেড কভারটা ধরে মধুমিতাই প্রথমে নামল জানলার ওপরের ছাঁচায়। শাড়ি পালটে সালোয়ার—কামিজ পরে নেওয়ায় তার সুবিধেই হয়েছে।

”দিদি, কাপড়টা শক্ত করে ধরে থেকে এবার বসুন, পা দুটো ঝুলিয়ে আমার কাঁধে রাখুন, না, না, লজ্জা করবেন না, তাড়াতাড়ি।” জমিতে দাঁড়িয়ে শিবা জরুরি তাড়া দিল।

কাঁধে দাঁড়ানো মধুমিতাকে নিয়ে শিবা ধীরে ধীরে উবু হয়ে বসল। মধুমিতা কাঁধ থেকে ছোট্ট লাফে জমিতে নামল। উৎপল বেডকভারটা ধরে আছে ছাদে। শিবা এবার ছাঁচার ওপর উঠে বলল ‘টুটুকে নামিয়ে দিন আমার হাতে।”

অসুস্থ, সদ্য ঘুমভাঙা বাচ্চচার অন্ধকারের মধ্যে এই ধরনের নাড়ানাড়ি পছন্দ হচ্ছে না। দু’ হাত ধরে তাকে ঝুলিয়ে দিতে সে ভয়ে কেঁদে উঠল শিবাকে জড়িয়ে ধরে।

”দিদি ধরুন।” টুটুকে সে দ্রুত নামিয়ে দিল মায়ের বাড়ানো হাতে। ”যেন না কাঁদে আর।”

উৎপল চট্টরাজ যুবক এবং মোটেই আনফিট নয়। বেডকভার টেনে ধরে থাকার জন্য ছাদে আর কেউ নেই। সেটা ছাদেই রেখে দিয়ে সে কার্নিস থেকে অবলীলায়ই ছাঁচায় দাঁড়ানো শিবার পিঠে পা দিয়ে নামল এবং বগলে একটা পলিথিনের ব্যাগ ঝুলিয়ে।

সবাই জমির ওপর। অন্ধকার থেকে ফ্যাক্টরির পাঁচিল পর্যন্ত যেতে, দূর থেকে আসা আলোয় আবছা হওয়া প্রায় কুড়ি মিটার জমি অতিক্রম করতে হবে। শিবা এগিয়ে গেল দু’ধারে তাকাতে—তাকাতে। পাঁচিলের ওপর ননীর মুন্ডুটা দেখতে পেয়ে সে হাত নাড়ল। ননী দু’ বাহু তুলে হাতছানি দিয়ে বোঝাল, বিপদ নেই, চলে এসো।

টুটুকে কোলে নিয়ে মধুমিতা দৌড়ল পাঁচিলে ঝোলানো কাছিটা লক্ষ্য করে। তার পেছনেই শিবা এবং উৎপল। বড়—বড় ঘাসের মধ্যে একটি ঢিপি, দেখে বোঝা যায় না। মধুমিতা হোঁচট খেয়ে টুটুকে নিয়েই ঘাসের ওপর পড়ল। ভয়ে এবং আঘাত পেয়ে টুটু এবার জোরেই কেঁদে উঠল। ওকে এক ঝটকায় কোলে উঠিয়ে শিবা ছুটে গেল পাঁচিলের দিকে।

”ননী একে তুলে নে।”

ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, শীর্ণ দুটি হাত টুটুকে তুলে নিয়েই মুহূর্তে পাঁচিলের ওপাশে অদৃশ্য হল। টুটুর কান্না বেড়ে তখন আরও উচ্চগ্রামে উঠছে।

”দিদি কাছিটা ধরুন, কাঁধে উঠুন।” শিবা উবু হয়ে বসেই দ্রুত নির্দেশ দিল। আর সেই সময়ই টর্চের আলো এসে পড়ল এবং চিৎকার শোনা গেল, ”কে ওখানে, কে?…আরে পালাচ্ছে, ওরে দৌড়ে আয়, ম্যানেজার পালাচ্ছে।”

মধুমিতাকে কাঁধে নিয়ে শিবা সোজা হয়ে দাঁড়াল। পাঁচিলের ওপর সে উঠে বসতেই ননীর অনুত্তেজিত গলা শোনা গেল, ”আমার হাতডা ধরেন…রিসকাডা পায়ের নিচেই, নাইম্যা পড়েন।”

চারটে লোক ছুটে আসছে। হাতে লাঠি আর রড। ওরা চিৎকার করছে, ”পালাচ্ছে, পালাচ্ছে, ধর, ধর, ধর,…পিটিয়ে লাশ ফেলে দেব।”

”দেখছেন কী হাঁ করে? উঠুন।” উবু হয়ে বসে, শিবা অধৈর্য স্বরে ধমক দিল।

”তুমি?”—ইতস্তত করল উৎপল।

”ধ্যাত তুমি, আগে নিজে বাঁচুন তো।”

কাছি আঁকড়ে উৎপল কাঁধে পা রেখে দাঁড়াতেই শিবা সোজা হয়ে উঠল। উৎপল চটপট ওধারে যখন নেমে যাচ্ছে ঠিক তখনই শিবার পিঠে প্রথম লাঠিটা পড়ল।

রিকশার সিট আর হ্যান্ডেল ধরে ননী তৈরিই ছিল। প্রায় পনেরো মিটার রিকশাটা নিয়ে দৌড়ে, লাফিয়ে উঠেই সে দেহটিকে খাড়া রেখে, সামনে ঝুঁকে, সিট থেকে পাছা তুলে প্রাণপণে প্যাডেল করতে শুরু করল।

শিবা যে ভেতরে রয়ে গেল।” উৎপল চাপাগলায় আর্তনাদ করে উঠল। ”পাঁচটা লোক, হাতে ডাণ্ডা!”

ননী গ্রাহ্য করল না কথাগুলো। জোনাকির পেছনের পাঁচিল ঘেঁষে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে মিনিটখানেক যাওয়ার পর তার প্যাডেল করার গতি বাড়ল।

”অহন চুপ থাহেন। শিবারে লইয়া আপনার ভাইববার দরকার নাই, নিজেদের কথাডা ভাবেন।”

এর পরই রিকশা প্রচণ্ড গতিতে বাঁ দিকে ঘুরে কলোনির ইট বাঁধানো সরু রাস্তায় ঢুকল। ঘুটঘুটে অন্ধকার, একতলা ছোট—ছোট বাড়িগুলোকে ভূতুড়ে মনে হয় যেন, ভাঙাচোরা রাস্তায় রিকশা ছোটার ধড়ধড় শব্দে ঘুম ভেঙে ছুটে আসা কুকুরের চিৎকার পেছনে রেখে রিকশাটা অন্তত সাত—আটবার পথ বদল করে ইলেকট্রিক আলো জ্বলা একটা পিচের রাস্তায় উঠল। আরোহীরা নির্বাক, টুটু কান্না বন্ধ করে মাকে জড়িয়ে। তাড়া করে তাদের ধরতে যাতে না পারে ননী সেইজন্যই অনেকটা ঘুরে এসেছে। এখান থেকে বিটি রোড আরও আধ মাইল।

”চালাইলাম ক্যামন, কন?”

ঢোক গিলে উৎপল বলল, ”দারুণ! ভাবাই যায় না তোমার পায়ে এত জোর আছে!”

প্যাডেল ঈষৎ মন্থর করে, মাথা ঘুরিয়ে ননী বলল, ”আমার পায়ের থাইক্যাও শিবার হাতের জোর বেশি। ও যদি বক্সিং ভুইল্যা না যায় তাইলে লোকগুলার কপালে আইজ দুঃখ আচে। মাইর যেমন খাইতে পারে তেমনি দিতেও পারে। মুস্কিলডা হইল কি, শিবার তো অহন কোনও প্র্যাকটিসই নাই!”

ক্ষীণ স্বরে অতঃপর মধুমিতা জানতে চাইল, ”আমরা এখন যাচ্ছি কোথায়?”

”ভবানী—সারের বাসায়। আপনার বুইনরে ওখানেই হগালে আইবার কইচি।”

এর পর ননী কুঁজো হয়ে হ্যান্ডেলের ওপর ঝুঁকে পা দুটোকে পিস্টনের মতো ওঠানামা করাতে শুরু করল।

।। ৭।।

লাঠিটা পিঠের ওপর আসছে, চোখের কোণ দিয়ে শিবা তা দেখেই পিঠের পেশিগুলো শক্ত করে ফেলেছিল। লাঠিটা পড়ার সঙ্গে—সঙ্গেই সে ঘুরে ডান হাত বাড়িয়ে মুঠোর মধ্যে সেটা পাওয়ার চেষ্টা করেও পেল না। একটা রড তার মাথা তাক করে চালিয়েছিল যে—লোকটি, সে খুবই নিশ্চিত ছিল সেটা শিবার খুলি দু’ ফাঁক করে দেবে। রড চালিয়েই সে ঝুঁকে পড়েছিল। শিবা একটা রাইট ক্রসকে মাঝপথে থামিয়ে দেওয়ার মতো বাঁ হাত তুলে রডটাকে পুরো বাহুর পেশির ওপর নেওয়ার সঙ্গেই ডান হাতে আপার কাট চালাল। দু’ পাটি দাঁতের মধ্যে প্রবল সঙ্ঘর্ষের এবং আঘাতজনিত যন্ত্রণা পাওয়ার শব্দ হল। লোকটা ছিটকে পড়েই থুতনি চেপে ধরল দু’ হাতে।

বহু দিন, বহু মাস পর শিবা হাড়ের সঙ্গে হাড়ের, হাড়ের সঙ্গে পেশির ধাক্কা লাগার শব্দটা পেল। তার ঘাড়ের রোম খাড়া হয়ে উঠেছে। একটা বাঘ যেন তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত শরীরটা চাটছে আর ক্রমশ সে নিজেই বাঘ হয়ে যাচ্ছে।

ঠিক এইরকম একটা বোধ সেদিন তাকে আচ্ছন্ন করেছিল। ”ছেড়ে দাও সারকে” বলার সময় মাথার মধ্যে গরগর করে উঠেছিল একটা খ্যাপা রাগ। দমকে—দমকে সেই রাগটা ফুলে উঠে তাকে ঠেলে দিয়েছিল ফেটে পড়ার জন্য। এগিয়ে গিয়ে সে সাধুর ঘাড় ধরে ধাক্কা দেয়। ওর সঙ্গী দেবুর হাতে একটা ছোরা তখন ঝলসে উঠেছে। ভবানী—সার কবজি ধরে উবু হয়ে, ছোরাটা সাপের ফণার মতো দোলাতে—দোলাতে দেবু এক পা—দু’ পা এগোল। শিবা একদৃষ্টে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে। এক পা—দু’ পা পিছিয়ে গিয়ে সে দেওয়ালে বাধা পেল। আর তার পিছু হটার উপায় নেই। ডাইনে দেওয়াল, বাঁয়ে খোলা দরজা। ছুটে বেরিয়ে যাওয়া যায়। পালাবে? তার মাথার মধ্যে একটা কথাই ঝনঝন করছে, ”বাঁচতে হবে, বাঁচতে হবে।”

বাঁচার প্রেরণা সবচেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখোমুখি হলে। সেদিনে ছিল দেবুর ছোরা, আর এখন তাকে ঘিরে রড আর লাঠি। ওদের উদ্দেশ্যটা একই—তাকে খুন করে ফেলা। সেদিনের মতোই, মাথা থেকে একটা সঙ্কেত তার স্নায়ুতন্ত্রী মারফত বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ল সারা শরীরে, ”শিবা, বাঁচা নিজেকে।”

দেবুর ছোরাটা তার তলপেট লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে—একটা রড উঁচু থেকে মাথায় নেমে আসছে—প্রায় দশ ইঞ্চি ঝকঝকে একটা ইস্পাতের ফলা—প্রায় দু’ হাত লম্বা কালো একটা লোহার রড—আসছে, আসছে, এক সেকেন্ডও লাগবে না দু’ মিটার বাতাস কেটে ছোরাটার এগিয়ে আসা।

সেদিনের মতোই শিবার এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় শুধু লাগল নেমে আসা রডের পথ থেকে নিজেকে বিঘতখানেক সরিয়ে নিতে। তার কাঁধ থেকে রডটা পিছলে জমিতে ঠোক্কর খেল আর মারার ঝোঁকে লোকটার মাথা নেমে গেল।

সেদিন বে—টাল দেবুর মুখটাও ঠিক এইভাবে তার দিকে এগিয়ে এসেছিল। স্নায়ুকেন্দ্র থেকে সঙ্কেত পৌঁছে গেল বাঁ হাতে—মারো। দেড় ফুট দূরে ছিল দেবুর বুক আর পেট। কনুইটা সামান্য পেছনে টেনে পলকে সে ওর পেট লক্ষ্য করে বাঁ হাতের মুঠোটাকে স্প্রিংয়ের মতো ছেড়ে দিয়েছিল।

রড হাতে লোকটা মাথা তোলামাত্র শিবা বাঁ হাতের হুকটা তার ডান চোয়াল রাখল। ‘আঁক’ শব্দটার পরই জমিতে একটা ভারী জিনিস পড়ার শব্দ হল। তারপরই শিবা দুই মুঠো মুখের কাছে ধরে তিন পা পিছিয়ে এসে নাচ শুরু করল যেভাবে বক্সিং রিংয়ে প্রতিপক্ষকে ঘিরে সে নাচত।

তিনটে লোক প্রথমে হকচকিয়ে গেল শিবায় এহেন কাণ্ড দেখে। তাদের একজন পাশ থেকে রড চালাল। শিবার বাহুর এক হাত দূর দিয়ে সেটা অর্ধচক্রাকারে বেরিয়ে গেল। দড়িতে স্কিপ করার মতো জমি থেকে সামান্য লাফিয়ে—লাফিয়ে শিবা সরে—সরে যাচ্ছে শরীরটা দুলিয়ে ক্রিকেট ব্যাট ধরে পুল করার ভঙ্গিতে, ওরা রড তুলে পা—পা এগিয়ে এল।

ডান দিকের লোকটা। শিবা বেছে নিল ওকেই। রড ধরা হাতটা বেশি নামিয়ে রাখার জন্য রডের মাথাটা জমির দিকে। ওটা তুলে নিয়ে পেছন দিকে টেনে তারপর সামনে চালাতে গেলে, অন্তত এক সেকেন্ড বেশি সময় খরচ হবে। ওই এক সেকেন্ডেই ফয়সলা হয়ে যাবে।

শিবা এক পা, দু’ পা, তিন পা এগোল নাচ না থামিয়ে। বাঁ দিকের লোকটা দাঁত চেপে একটা শব্দ করে হাতের রড তুলল। শিবা জানে দু’ হাত লম্বা কিছু দিয়ে জোরে আঘাত করতে হলে আঘাতের জিনিসটাকে অন্তত তিন থেকে আড়াই হাত দূরে থাকতে হবে। ওই তিন হাতের মধ্যে ঢুকে লোকটার শরীরের কাছে চলে যেতে পারলে—।

ভাবার সঙ্গে—সঙ্গেই শিবা ডান দিকের লোকটাকে যেন মারতে যাবে এমন একটা ভান দেখাতে, ডান দিকে শরীর হেলিয়েই ছোবল মারার মতো পলকে বাঁ দিকে সরে, তিন হাত গণ্ডির মধ্যে ঢুকেই লেফট হুক করল। ঠিক ডান কানের নীচে চোয়ালের গোড়ায়—ফ্রাঙ্ক গোমস বলেছিল, ‘ইউ হ্যাভ আ বিউটিফুল লেফট হুক’—ঘুসিটা জমে গেল।

ঘুসির পরিণতিটা জানার জন্য শিবা চোখের কোণ দিয়েও তাকাল না। ঘুসিটা শেষ করার সঙ্গেই সে ডাইনে নজর ঘুরিয়েছে। ডান দিকের লোকটার রডের মাথা জমি থেকে উঠছে।

”হঅঅঅ…উউউ।” বিকট স্বরে সে এক ডাকাতে চিৎকার করেই লোকটার এক হাতের মধ্যে ছিলে—ছেঁড়া ধনুকের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াল। অবশ্যই হকচকিয়ে গেছল লোকটা এবং তারপরই কম্বিনেশন পাঞ্চ—এর ওয়ান—টু—থ্রি, ওয়ান—টু—থ্রি তার দুই চোয়ালকে ও সংবিৎকে অবশ করে দিল। টলতে—টলতে দু’ পা পিছিয়ে গিয়েই লোকটি উবু হয়ে বসল এবং কাত হয়ে জমিতে গড়িয়ে পড়ল।

তার হাত থেকে পড়ে যাওয়া রডটা তুলে নিয়ে শিবা অবশিষ্ট লোকটিকে চাপা গলায় বলল, ”এবার তোর পালা।”

দূর থেকে আসা ফ্যাক্টরির আলোয় চোখমুখের ভাব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু লোকটির ভঙ্গিতে ধরা পড়েছে, প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে।

”না, না, আমি না—” বলার সঙ্গেই লোকটা পেছন ফিরে অবিশ্বাস্য গতিতে দৌড়তে শুরু করল ”ডাকাত, ডাকাত” চিৎকার তুলে।

একটা হইচইয়ের শব্দ গেটের দিক থেকে উঠল। শিবা বুঝে গেল, দল বেঁধে এবার ওরা আসবে, আর এখানে থাকা নয়। সে ছুটে গেল পাঁচিলের কাছে। লাফিয়ে পাঁচিলের মাথা ধরে হিঁচড়ে নিজেকে তুলে একটা পা রেখে পাঁচিলে উঠে বসেই দেখতে পেল কিছু লোক ছুটে আসছে। ইটের বড় একটা খণ্ড শিবার হাতচারেক দূরে পাঁচিলের গায়ে এসে লাগাতেই টুক করে সে ওধারে লাফিয়ে যে রাস্তায় ননীর রিকশাটা গেছে, সেইদিকে ছুটতে শুরু করল। ভাঙা ইট, পাথরকুচি, গর্ত করা রাস্তা তার খালি পা—দুটিকে ব্যথায়, যন্ত্রণায় নাজেহাল করতে লাগল।

মিনিট কয়েক ছোটার পর তার মনে হল, কেউ আর তাড়া করে আসবে না। অন্ধকারে এভাবে ছোটা বা হেঁটে যাওয়াও বিপজ্জনক। তাকে চোর ভেবে যদি কেউ চেচিয়ে ওঠে, যদি কুকুরে তাড়া করে! পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলার ঘটনা তো এখন চারদিকেই ঘটছে।

একটা পুকুরের ধার দিয়ে যেতে—যেতে সে অসম্ভব ক্লান্তি বোধ করল। জল দেখে তার ইচ্ছা হল স্নান করে তাজা হয়ে নেওয়ার। অন্ধকারে সে আঘাটাতেই, গেঞ্জি খুলে জলে নেমে পড়ল। গলা পর্যন্ত শরীর ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। চার বছর সে এই ধরনের পরিশ্রম করেনি। এই ধরন বলতে, বক্সিং। প্রায় এক রাউন্ড সময় সে ব্যয় করেছে পাঁচটা লোকের সঙ্গে। সেইসঙ্গে উদ্বেগ, ভয় আর উত্তেজনার ধকল যোগ করলে—! পুকুর থেকে টলতে—টলতে সে উঠল। তার সারা দেহে পানা, দু’পায়ে পাঁক।

হাঁটু থেকে পায়ের নীচের দিক তার পাথরের মতো ভারী লাগছে। সে পা টেনে—টেনে কিছুটা হেঁটে আর পারল না। শরীরটা দুলছে, মাথার মধ্যে কামড়ে ধরছে যন্ত্রণা। ঠাণ্ডা জল শরীরটা জুড়িয়ে দেওয়ায় এখন তার শরীরে বিছিয়ে যাচ্ছে আলস্য।

রাস্তাটা ফাঁকা—ফাঁকা, বাড়িগুলো দূরে—দূরে। একটা ছোট মাঠের মতো, মাঝখানে ঝাঁকড়া ডালপালা নিয়ে একটা গাছ। শিবা এগিয়ে গেল গাছটার দিকে। গুঁড়িতে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসল। ভোরের হাওয়ায় শীত—শীত লাগছে। তার চোখের পাতা ভারী হয়ে উঠছে।

ঘুমিয়ে পড়লে চলবে না। শিবা জোরে মাথা ঝাঁকাল। ননী ওদের নিয়ে ঠিকমতো পৌঁছতে পেরেছে কি না কে জানে! সে আকাশের দিকে মুখ তুলল। গাঢ় অন্ধকারটায় এখন ছাই—ছাই রং ধরেছে। একটু পরেই ভোর হবে। একটা দিন থেকে আর—একটা দিন…জীবনের একটা সময় থেকে আর—একটা সময়…।

হঠাৎ শিবা সোজা হয়ে বসল। …আশ্চর্য, সবই তো ঠিকঠাক রয়েছে।…সেই ফুটওয়ার্ক, সেই হুক, আপার কাট, রাইট ক্রস! কিছুই তো সে ভোলেনি, কিছুই হারায়নি।

মনে পড়ছে জীবনের প্রথম ঘুসিটা! শিবা অবাক হয়ে আকাশে তাকাল। পাশে একটা দোতলা বাড়ির পাঁচিল। এটা বোধ হয় খেলার মাঠ। আবছাভাবে গোলপোস্ট দেখা যাচ্ছে। তার মনে পড়ল, দেবুর পেট লক্ষ্য করে প্রথম ঘুসি, তারপরই ডান হাতের মুঠো নীচের থেকে ওপরে উঠল থুতনিতে। দেবু দেওয়ালে ছিটকে গিয়ে খালি বস্তার মতো ঝরে পড়ল মেঝেয়। তিন—চার সেকেন্ডের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটে গেল।

তারপর একটা খ্যাপা গোরিলার মতো সাধু দু’ হাত ছড়িয়ে এগিয়ে এল। এক পা পিছিয়ে সরে যাওয়ার জন্য শিবা জলপোকার মতো নড়াচড়া করল ডাইনে—বাঁয়ে। সাধুর দুটো হাত হাতুড়ির মতো নেমে এল শিবার দুই কাঁধের দিকে। বিদ্যুৎগতিতে হাঁটু ভেঙে শরীরটা নামিয়ে নিয়ে আঘাতের ধাক্কাটা কমিয়ে নিতে—নিতেই সে পাশে সরে গেল। কিন্তু বাঁ কাঁধটা এড়াতে পারেনি সাধুর ডান মুঠোর আঘাতটা। অসাড় হয়ে গেল বাঁ কাঁধ।

সাধু আবার জোড়া মুঠো তুলেছে। ‘মারো’—সঙ্কেতটা ডান হাতে পৌঁছনো মাত্র ঘুসিটা বেরিয়ে এসে সাধুর বাঁ কানের নীচে চোয়ালে বসে গেল। সাধুর চোখদুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে বিস্ময়ে কিংবা আঘাতের ধাক্কায়। তোলা দুটো হাত ধীরে—ধীরে নেমে এল। তারপরই শিবার দুটো ঘুসি পাঁজরের দু’ধারে ‘ঢপ ঢপ’ শব্দ তুলল। দু’ হাতে বুক চেপে সাধু ধীরে—ধীরে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল।

তখন তার মাথার মধ্যে কিছু নেই, একদম খালি। শুধু সোঁ—সোঁ বাতাসের শব্দ। সে বুঝতেই পারছিল না দু’ মিনিটের মধ্যে কোচিংঘরের মধ্যে নিঃশব্দেই প্রায় কী ঘটে গেছে। …ভোররাতে গাছতলায় বসে সেদিনের মতো শিবা বুঝতে পারছে না, জোনাকি—ফ্যাক্টরি—পাঁচিলের ধারে, নিঃশব্দেই বলা যায়, সে কি ঘটাল!

সেদিন ছুটে এসেছিল অনেকে। প্রথমে বটকেষ্ট এসে ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে, কুঁজো হয়ে বসা ভবানী—সার, দেওয়ালে নেতিয়ে থাকা দেবু, হাতে ভর দিয়ে মেঝে থেকে ওঠার চেষ্টা করা সাধু, আর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা শিবাকে দেখে চিৎকার করে মাথা চাপড়ে বলেছিল, ”সব্বোনাশ হয়ে গেছে গো, এবার আমরা মারা পড়ব গো! আর আমাদের রক্ষে নেই। শিবা আমাদের সব্বোনাশ করেছে।”

”কী হল বটকেষ্ট, চ্যাঁচাচ্ছ কেন?”

”বটাদা, কীসের সব্বোনাশ?”

”বটুবাবু, কে মারা গেল?”

সবশেষে হাউহাউ করে উঠে সুপ্রভা বলেছিলেন, ”ওগো, আমি কোথায় যাব গো!”

 ঘরের মধ্যে অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখতে—দেখতে জমে ওঠা ভিড়ের মধ্যে কে ফিসফিস করে প্রথম বলেছিল, ”শিবা, আমাদের শিবা করেছে!”

”শিবা, চায়ের দোকানের ছেলেটা?”

সাধু কথা বলতে গিয়ে, ”আহহ” বলে গাল চেপে ধরল। তারপর ইশারায় জানাল, সাইকেল রিকশা চাই। ননী তখন বলেছিল, ”এই দুডারে রিকশা কইর‌্যা আমিই পৌঁছাইয়া দিমু।”

.

রিকশাটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে। শিবার মুখের ওপর ননীর ছায়া। চোখ পিটপিট করে দু’ধারে তাকিয়েই শিবা ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। গাছতলায় কখন সে ঘুমিয়ে পড়ল!

প্যান্ট থেকে ধুলো ঝাড়তে—ঝাড়তে বোকার মতো হেসে শিবা বলল, ”তুই। …ক’টা বাজে? …ইসস বেলা হয়ে গেছে, দাদা বসে আছে দোকানে আলুর দমের জন্য, আর আমি কিনা…তাড়াতাড়ি বাড়ি নিয়ে চল আমায়।”

শিবা প্রায় ছুটে গিয়েই রিকশায় বসল। তারপরই মনে পড়ায় উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ”ওদের ঠিকমতো নিয়ে গেছিস তো?”

প্যাডেল করতে—করতে ননী বলল, ”তর হারগোর ঠিক আচে তো?”

”যা বলছি তার জবাব দে।” শিবা ঝাঁঝিয়ে উঠল। ”ওরা কোথায় এখন?”

”বোধ হয় অহন কোয়ার্টারেই। পথেই ধরা পইরা গ্যালাম আন্ধারে ওত পাইত্যা কয়েকজন যে বইসা আছে, তা আর ক্যামন কইরা জানুম… আমারে কয়ডা চরচাপ্পর মাইরা কইল ভাগ, নয়তো খতম কইরা ফ্যালামু। এই বইলা অগো নামাইয়া লইয়া গেল।” ননী নিস্পৃহ স্বরে কথাগুলো যখন বলছে, শিবার অবস্থা তখন বজ্রাহতের মতো।

”এত কাণ্ড করে শেষে কিনা—”। দুঃখে, মর্মবেদনায়, হতাশায় শিবার স্বর আটকে গেল। মাথা নিচু করে সে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর চোখ থেকে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা জল ঝরল।

ব্রেক কষে রিকশাটা থেমে যেতেই শিবা মুখ তুলল। ননী হাসছে। কয়েক সেকেন্ড তার সময় লাগল হাসির অর্থটা বুঝে নিতে। তারপরই, ”ছুঁচো কোথাকার, ছারপোকা কোথাকার…।” হাত বাড়িয়ে শিবা ননীর চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল।

”আমারে মাইরা হাতে গন্ধ কইরলে তর হাতের থাইকা আলুর দম কিন্তু খামু না। আমি নিতুদার থাইকাই নিমু।”

”কোথায় ওরা?”

”অতক্ষণে ট্যাসকিতে ভবানী—সারের কোচিং হইতে পাইকপাড়ায় মিতাগো বাড়ি পৌঁচাইয়া, হন্দেশ, রসগোল্লা বইস্যা—বইস্যা সাঁটাইতেচে।”

”শিগগির চল, মা ডেকচি নিয়ে বাড়িতে বসে আছে।” শিবা ব্যস্ত হয়ে গেঞ্জিটা পরে নিল।

”অহন নয়ডা বাজে, ডেচকি লইয়া গিয়া নিতুদার সামনে দাঁড়াইয়া কইবিডা কী? আগে সেইডা মনে—মনে ঠিক কইরা ল।” তারপর রিকশা থেকে নেমে ননী শিবাকে নির্দেশ দিল, ”নাম।”

”কেন?”

”আগে নাম তো, তারপর কইত্যাচি।”

শিবা নামতেই, সিট তুলে যাত্রীদের সামনে ঝোলাবার পলিথিনের ময়লা চাদরটা বার করে ননী বলল, ”হাসপাতালে যেভাবে রুগিরা যায়, ত্যামন কইরা এডা আপাদমস্তক গায়—মাথায় জড়াইয়া সিটে কাত হইয়া শুইয়া থাক। অরা পথে ঘুরতাসে, যদি তরে একবার দেইখা চিইন্যা ফেইলতে পারে.. নে জড়া, জড়া, গায়ে জড়া।”

পলিথিনে মাথা—মুখ ঢেকে শিবা রিকশায় কাত হয়ে পড়ল, ননী হুডটা তুলে দিল। মিনিটদশেক চলার পর রিকশা থামল। শিবার মনে হল, এত তাড়াতাড়ি তো পূর্বপল্লীতে পৌঁছনোর কথা নয়! মুখের সামনে থেকে চাদরটা সামান্য সরিয়েই সে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল।

রিকশাটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। নিতুদা গ্লাসের ওপর গুঁড়ো চা দেওয়া ছাঁকনিটা ধরে গরম জল ঢালতে—ঢালতে তারই দিকে তাকিয়ে। সামনে আলুর দমের ডেকচিটা।

কী ব্যাপার, ডেকচিটা পৌঁছল কী করে!

”কেন লাফালাফি করতে যাস?” নিতু বিরক্ত স্বরে ধমকে উঠল। ”কী বললেন ডাক্তারবাবু, হাত—পা ভেঙেছে?”

বুঝতে না পেরে শিবা হকচকিয়ে তাকাল নদীর দিকে। ননী ব্যস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি বলল, ”কইলেন, বোধ হয় ভাঙে নাই। তবুও পনেরো ফুট উঁচা কার্নিস থাইক্যা লাফাইছে তো, একবার খালি হাড়ের একটা ছবি তুইলবার কইচে আর দুইহপ্তা পুরা রেস্ট। ত আমি কইলাম, ডাকতারবাবু শিবা যদি পুরা রেস্ট লয় তাইলে নিতুদা একা দোকানডা সামলাইব কী কইর‌্যা?…তহন অনেক ভাইব্যা তিনি কইলেন, ঠিক আচে একবেলা কাম কইরব আর বাকি দিনডায় রেস্ট লইব। বড় ডাকতার তো, নামের পর বিলাতি ডিগ্রিই ছয়—সাতটা! চিকিচ্ছার কায়দাই আলাদা। কোনও ওষুদপত্তর না, মলম—ইনজেকশান না, কইয়া দিলেন শুদ্দ রেস্ট।”

”কী দরকার ছিল তোর, অত রাত্তিরে জানলার ওপর থেকে বেড়াল—বাচ্চচা নামাতে যাওয়ার? …সারারাত আমি আর মা ভেবে মরি!” কাজের মধ্যেই নিতু গজগজ করতে লাগল। ”এখন চুপ করে বসে থাক এখানে। পায়ের রেস্ট মানে দাঁড়ানো উচিত নয়।”

”রিসকায় বইসা আছে, ওহানেই থাউক, আমি বরং অহন ওরে বাড়ি লইয়া যাই। তোমার লগে হগালে যে কথাডা হইল নিতুদা, মনে আছে তো?”

”মনে আছে মানে?” নিতু বিরক্ত হয়ে বলল, ”তুই বিকেলে এসে শিবার বদলে কাজ করবি আর আমি তোর সেই কাজ নেব?”

”আহা রাগ করো ক্যান। বিড়াল—বাচ্চচাটা নামাইতে আমিই তো অরে উসকাইয়া ছিলাম। দোষ তো আমারই। দুপুর থাইকা বিড়ালডা জানলার উপর। ডাকতারবাবুর মাইয়া কান্নাকাটি করতা আছিল। তাই দেইখা আমিই শিবারে খোঁচাইলাম, দ্যাখ নামাইয়া আনতে পারস কিনা। তয় একডা কথা নিতুদা, ডাকতারবাবু ভদ্দর লোকই, রাইতে তিনি শিবারে বাড়িতে রাইখা সেবাযত্ন করচ্যান। আমার মনের মইধ্যে একটা খচখচানি তহন থাইকাই কইরত্যাচে—ইয়ের জন্য দায়ী তো আমিই। শিবা তো সাদাসিদা মানুষ, তার ক্ষতি তো আমিই কইরাচি।…না না নিতুদা, অর আধা কাম আমিই করুম, তুমি না কইরো না।” চোখে জল এনে, গলা কাঁপিয়ে ননী ঝপ করে বসে নিতুর পা জড়িয়ে ধরল।

”অ্যাই, অ্যাই, এ কী হচ্ছে! ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুইই আদ্ধেক কাজ করবি।” নিতু আপ্লুত হয়ে ননীকে দু’ হাতে দাঁড় করাল। ”ডেকচিটা—আনা—নেওয়া শুধু এইটুকু করে দিস। তা হলেই হবে। তোকেও না, শিবাকেও না, কাউকেই আমার দরকার নেই। রিকশা চালানো বন্ধ করে লোকসান করবি, তাতে আমার মনেও তো খচখচানি শুরু হবে।”

শিবার কাছে পুরো ব্যাপারটাই হেঁয়ালির মতো প্রথমে ঠেকছিল। এইবার কুয়াশাটা যেন রহস্য থেকে কিছুটা কাটছে। ডেকচিটা সকালে বাড়ি থেকে ননীই তা হলে এনে দিয়েছে। রাতে বাড়িতে না ফেরার জন্য কোনও এক কাল্পনিক ডাক্তারের মেয়ের বেড়াল—বাচ্চচা পাড়া এবং পাড়তে গিয়ে পায়ে চোট আর সেজন্যই বাড়ি ফিরতে না পারা! কৃতজ্ঞ চোখে ননীর দিকে তাকিয়েই শিবার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। ননীর বরাভয় দানের পাঞ্জায় চারটে আঙুল উঠে রয়েছে। সারা মুখে নধর একটি হাসি ছড়ানো।

”দাদা, ননীর…ইয়ে,” শিবা ঠিক গুছিয়ে কথাটা বলতে পারছে না।

”আমার আবার কী!” ননী খুবই অবাক হয়ে শিবার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরই কিছু একটা মনে পড়ার মতো ভাব করে বলল, ”অ্যাঁযাঁঅঅ, হগালে আমি কী খামু তাই নিয়া তুই ভাবতাচস? আরে দূর পাগল, নিতুদারে এসব কওন লাগে না। চাইরডা আলু আর একডা পাউরুটি, এ তো নিতুদা আসামাত্রই দিব।”

”নিশ্চয় দেব। ননী, খাওয়ার ব্যাপারে তুই একদম নিশ্চিন্ত থাকবি।” নিতু শশব্যস্তে বলে উঠল। ”তুই চারটের সময় আসবি, আটটা পর্যন্ত থাকবি, ওই সময়টায়ই আমার একটু হেলপ দরকার হবে। সেজন্য তোকে পাঁচটাকা রোজ দেব।”

রিকশায় শিবাকে নিয়ে পূর্বপল্লীতে ফেরার সময় ননী বলল, ”তর ভাগ্যি ভাল অমন এক ভাই পাইচিস। খাঁটি মানুষ, লোক ঠকাইয়া পয়সা করে না।”

”খাঁটি মানুষ বলেই ঘেন্নায় ইউনিয়নবাজি থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তুই ওখানে পৌঁছলি কী করে?”

”কোথায়? যেহানে তুই ঘুমাইতেচিলি?”

এর পর ননী যা বলল তার সারাংশ: রিকশায় সে উৎপল, মধুমিতা এবং টুটুকে নিয়ে হুহু করে চালিয়ে ভোর হওয়ার আগেই পৌঁছে যায় ভবানী—সারের কোচিংয়ে। সার অপেক্ষা করছিলেন তাদের জন্য। কিন্তু শিবা ফিরে না আসায় তিনি খোঁজ করার জন্য বেরোতে যাচ্ছিলেন। ননীই তাঁকে আটকে রেখে ভোরের আলো ফুটতেই রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

প্রথমে সে যায় শিবার বাড়ি। নিতুদা তখন বেরিয়ে গেছে। তারাময়ী ওর কাছে শিবার হদিস জানতে চাইলে তখন বিড়াল নামানোর গল্পটা তার মাথায় আসে। তারপর সে আলুরদমের ডেকচিটা রিকশায় তুলে নিয়ে—”মা কালীর কিরা ডেচকির ঢাকনা খুলি নাই।”—নিতুর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বেরিয়ে প্রথমে ভবানী—সারের কোচিংয়ে এসে শুনল, মিতা এসেছিল। ওরা ট্যাক্সিতে পাইকপাড়ায় চলে গেছে। নিতুকেও সে গল্পটা বলে এবং শিবার জন্য একবেলা ছুটির ব্যবস্থা করে নেয়। তারপর সে শিবাকে খুঁজতে বেরিয়ে, বহু ঘোরাঘুরির পর আদর্শ সম্মেলনীর ফুটবল মাঠে তাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে।

”ওস্তাদ, একবেলা ছুটির ব্যবস্থা কেন কইরলাম কইতে পারো?” ননী গম্ভীর গলায় বলল দেবদাস পাঠক রোডে ঢোকার আগে রিকশাটা থামিয়ে।

উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই সে আবার বলল, ”ওস্তাদ, আইজই বিকালে লালবাগানে গিয়া প্র্যাকটিস শুরু কইর‌্যা দাও। নিতুদা বাইর হইলেই তুমিও বাইর হইবা। মায়েরে কইবা ডাক্তারের কাছে যাইতেচি। রোজ বিকালে প্র্যাকটিস করনের জইন্যই ছুটির এই ব্যবস্থাডা! নইলে আমি মিথ্যা কথা কইতাম না।”

মুখ ঘুরিয়ে শিবার চোখের দিকে তাকাল। জ্বলজ্বল করছে ননীর মুখ। চপল, পরিহাসপ্রবণ ভাবটা চোখে আর নেই। এই ননী যেন রিকশাওলা নয়, কুরুক্ষেত্রে অর্জুনের সারথি শ্রীকৃষ্ণ! ”শিবা তোরে ফিইরা আইতে হইব। বকসিং তোর রক্তে। চার—পাঁচডারে একসঙ্গে ফ্যালাইতে পারিস আর রিংয়ে উইঠ্যা একডারে ফ্যালাইতে পারবি না? ক শিবা ক, তুই আবার ফিরবি। আমাগো পোলা ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ান হইতে পারে নাই, আমাগো হেই লজ্জা মুইছ্যা দিবি।”

দু’ জোড়া চোখ পরস্পরের সঙ্গে প্রায় কুড়ি সেকেন্ড ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধে রত হল। অবশেষে একজোড়া চোখ পরাজয় মেনে দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে বলল, ”চেষ্টা করব।”

”চেষ্টা!” চিৎকার করে উঠল ননী। ”যারা জিততে চায় তারা কহনো ‘চেষ্টা’ কয় না, তারা কয় ‘জিতুম’। হ, চেষ্টা নয়, জিতুমই।”

”জিতুম।” শিবা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধীরকণ্ঠে, চোখে চোখ রেখে বলল, ”ননী আমি ফিরব, জিতব।”

শিবার মাথার থেকে সঙ্কেত তার সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ছে। মুঠি দুটো পাকিয়ে সে শূন্যে পর—পর কয়েকটা ঘুসি ছুড়ল।

ঠিক সেই সময় বি টি রোড দিয়ে দ্রুত ধাবমান একটা স্কুটার ব্রেক কষে মন্থর হল। হেলমেট পরা চালক পেছনে বসা লোকটিকে বলল, ”দেবু, ওটা কে রে? শিবা না? আবার বক্সিং শুরু করেছে নাকি?”

”কই, তেমন তো কিছু শুনিনি! আচ্ছা খবর নিচ্ছি।”

চালকের হাতটা ডান কানের নীচে চোয়ালে অজান্তেই যেন উঠে এল। চোয়ালটা কঠিন হল।

।। ৮।।

”আরে শিবা না! আয়, আয়…কত বছর পরে আবার তুই এলি। …থাক, থাক, ভালভাবে বেঁচে থাক। শরীরে আর কোনও ঝামেলা নেই তো?…সব শুনেছি আমি, গুণ্ডারা মেরে তোর কী অবস্থা যে করেছিল…।”

লালবাগান জিমন্যাশিয়ামের আঠারো বছরের সচিব আশ্চর্য ঘটক শিবার প্রণাম নিতে—নিতে কথাগুলো বললেন। সারা মুখে প্রসন্ন হাসি। প্রথম দিন শিবা যেমনটি দেখেছিল, আশ্চয্যদা আজও তেমনই বয়েছেন। মিশকালো বিরাট কাঠামো, একটু কুঁজো, চিবুকে ও ঘাড়ে দু’ থাক চর্বি। সাদা ধুতি, সাদা হাফ শার্ট, বাহুতে সোনার তাবিজ, চোখ দুটি আয়ত ও কোমল।

রিংয়ের ধারে লম্বা বেঞ্চটায় দু’জনে বসল। দু’ জোড়া ছেলে রিংয়ে স্পার করছে। দড়ি নিয়ে স্কিপ করছে একজন। রিং ঘিরে দুটি ছেলে ছুটছে শূন্যে ঘুসি ছুড়তে—ছুড়তে। অ্যাসবেসটসের চাল দেওয়া হলঘরটায় কড়িকাঠ থেকে ঝোলানো হেভি ব্যাগে ঘুসি মেরে যাচ্ছে একটা ছেলে। বালিভরা ব্যাগটা আকারে বছর সাত—আট বয়সী ছেলের মতো। একটি ছেলে সেটা দু’হাতে ধরে রয়েছে যাতে না দোলে।

সাধুর চোয়াল ভেঙে দেওয়ার কয়েকদিন পর শিবা প্রথম লালবাগান জিম—এ পা দিয়ে যা কিছু দেখেছিল, আজও ঠিক তাই দেখছে। তেলোহাঁড়ির মতো রবারের স্পিড ব্যাগে অনবরত ঘুসি মেরে চলেছে একজন। ওপরে—নীচে স্প্রিং দিয়ে টানা, তার মাঝখানে ব্যাগটা শূন্যে। ঘুসি খেয়ে বলটা ছিটকে গিয়েই পলকে ফিরে আসছে মুখের কাছে, সঙ্গে সঙ্গে আবার ঘুসি। অতি দ্রুত হাত চালাবার প্র্যাকটিস!

দেওয়ালে বিরাট আয়নাটার সামনে শ্যাডো করে যাচ্ছে দু’জন। নিজেদের প্রতিবিম্বের সঙ্গে একাকী লড়াই করে চলেছে তারা। ঘুসি চালাচ্ছে, ঘুসি কাটাচ্ছে, নেচে—নেচে সরে যাচ্ছে, হঠাৎ মাথাটা ডুব দেওয়ার মতো নামাচ্ছে, পেছনে হেলছে, পাশে কাত হচ্ছে।

বেঞ্চে বসে জানলা দিয়ে জিম—এর মধ্যে অনেকটা অংশ দেখা যায়। আশ্চয্যদা এইখান থেকে ভেতরে—বাইরে দু’ দিকেই নজর রাখেন। এটা শিবা টের পেয়েছিল প্রথম দিনেই। সেদিন অবাক হয়ে এখানকার ব্যাপারস্যাপার লক্ষ করতে—করতে রিংয়ের পেছনে ছ্যাঁচা বাঁশের ছ’ ফুট উঁচু বেড়ার ওধারে তার চোখ আটকে গেছল।

ওধারে একটা জিমন্যাসটিকস ক্লাব। সেখানে বিম—এর ওপর একটা মেয়ে দেহটাকে চাকার মতো ঘুরিয়ে ভল্ট দিচ্ছিল। কখনও তার দুটো পা শূন্যে উঠছে, কখনও—বা দু’ হাত ছড়িয়ে বিমের ওপর দিয়ে টলমল করে হাঁটতে গিয়ে নৌকো থেকে প্রতিমার বিসর্জনের মতো পড়ে যাচ্ছে। মেয়েটির মুখ চেনা—চেনা লাগছিল বলেই সে তাকিয়ে থেকেছিল। সেই সময় আশ্চয্যদা পেছন থেকে বলে উঠেছিল, ”ওদিকে কী দেখছ? এখানে কেউ আশপাশে তাকায় না। এটা ঘাম—রক্ত ঝরিয়ে সাধনার জায়গা।” কণ্ঠস্বরে বিদ্রূপ বা রুক্ষতা ছিল না। শিবা লজ্জা পেয়েছিল।

বিম—এ ভল্ট দেওয়ার প্র্যাকটিস করছিল যে—মেয়েটি, শিবা পরে তাকে চিনতে পেরেছিল। ভবানী—সারের কোচিংয়ে পড়তে আসে। তারপর এখন তো সে জানেই ওর নাম মিতা, পারমিতা দাস।

”আশ্চয্যদা, আমি আবার শুরু করব, রিংয়ে নামব।” গলা নামিয়ে শিবা প্রায় ফিসফিস করে বলল।

আশ্চর্য ঘটক ভালমতো শুনতে পেলেন না। মাথাটা কাত করে বললেন, ”কিছু বললি?”

”আমি আবার শুরু করব।”

”কী শুরু করবি?”

”বক্সিং।”

আশ্চর্য ঘটকের চোখ পৃথিবীর নবম বা দশম আশ্চর্যতম বস্তুটি দেখার মতো হয়ে উঠল। কী বলবেন, ভেবে পাচ্ছেন না।

”তুই…তুই আবার—।”

”পারব না? মাত্র তো চারটে বছর সরে আছি, আবার ফেরা যাবে না?” শিবা ব্যগ্র উৎকণ্ঠা নিয়ে আশ্চর্য ঘটকের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে রইল।

”ফেরা যায় না মানে! আলবাত ফেরা যায়। মহম্মদ আলি সাড়ে তিন বছর পর রিংয়ে ফিরে আরও দু’বার চ্যাম্পিয়ান হয়েছিল। তা হলে তুই কেন ফিরে আসতে পারবি না?”

”আলির সঙ্গে আমার কোনও তুলনাই হয় না। কী বিরাট ফাইটার! ওর কাছে আমি তো একটি পিঁপড়ে।”

”ঠিক কথাই, তুই আলি নোস কিন্তু তোর অপোনেন্টরাও তো কেউ ফ্রেজিয়ার, নর্টন বা ফোরম্যান হবে না। বড়—বড় ফাইটারদের মতো নিজেকে ভাব, তাদের সঙ্গে একই লাইনে নিজেকে দাঁড় করা, এটাকে ‘বামন হয়ে চাঁদ ধরা’ বলে হেসে উড়িয়ে দিসনি। এইরকম করে ভাবলে তবেই চেষ্টাটা আসে।” আশ্চর্য ঘটক থেমে গিয়ে হেসে উঠলেন। ”এই দ্যাখ লেকচার দিয়ে ফেলছি! কবে থেকে শুরু করবি?…তোর শরীর তো আগের থেকে অনেক বড় হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে জোরও বেড়েছে, লাইট ওয়েটে লড়েছিলি, এখন ওজন কত?”

”জানি না, ওজন নিইনি।”

”চল, চল, ঘরে চল, ওজনটা নিয়ে দেখি।”

শিবাকে নিয়ে তিনি হলঘরে এলেন। এরই কোণের দিকে ছোট্ট অফিসঘরটা। আশ্চর্য ঘটককে দেখে ছেলেরা জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে তাকাল। জরুরি কিছু বলার না থাকলে, যখন ট্রেনিংয়ে ছেলেরা ব্যস্ত থাকে তখন তিনি হলঘরে পা দেন না।

হেভি ব্যাগটার পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে আশ্চর্য ঘটক থেমে গিয়ে মুচকি হাসলেন। ব্যাগে হাত রেখে বললেন, ”মনে আছে তোর?”

শিবা লাজুক হাসল। ঘটনাটা মনে তো আছেই, চিরজীবনই তার মনে থাকবে।

.

তখন রাত প্রায় দশটা। জিম—এর হলঘরটা, ইলেকট্রিক খরচ বাঁচাবার জন্য অন্ধকার। শিবা একাই হেভি ব্যাগে ঘুসি মেরে চলেছে। বাইরে কয়েকজন প্রবীণ মেম্বারের সঙ্গে আশ্চর্য ঘটকও বেঞ্চে বসে গল্প করে যাচ্ছেন। ঢপ—ঢপ—ঢপ, ব্যাগে ঘুসি মারার শব্দটা ওদের কানে আসছিল।

একজন জানতে চাইল, ”অন্ধকারের মধ্যে কে ট্রেনিং করছে, আশ্চয্য?”

”গোমসের ছেলে, ডেডিকেটেড, শিবা নাম। গোমস এবার একে নিয়ে পড়েছে।” আশ্চর্য ঘটক বললেন।

”এই নিয়ে গোমস ক’টাকে ধরে আনল বল তো? একটাও তো ন্যাশনালের ফাইনালে পর্যন্ত উঠতে পারল না।….ওঠার জন্য খাটতে হয়, এটাই বাঙালি ছেলেরা পারে না। জোর চাই জোর, ঘুসির জোর।” এই বলে ভদ্রলোক বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। ঠিক তখনই হলঘরের দরজার কাছ থেকে শিবার ভীত সন্ত্রস্ত গলা শোনা গেল, ”আশ্চয্যদা, একবার আসবেন।”

আশ্চর্য ঘটক হলঘরে গেলেন, আলো জ্বাললেন এবং এক মিনিটের মধ্যেই ছিটকে বেরিয়ে এসে চেঁচিয়ে ডাকলেন, ”নোটনদা, নোটনদা, এক মিনিট, একটু এদিকে আসুন।’

কৌতূহল নিয়ে সবাই হলঘরে ঢুকলেন। এককোণে শিবা জড়োসড়ো, চুরির দায়ে ধরা পড়ার মতো মুখ। ওঁরা সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে কিছুই বুঝতে পারলেন না।

আশ্চর্য ঘটক আঙুল দিয়ে হেভি পাঞ্চিং ব্যাগটাকে দেখালেন। ক্যাম্বিসের খোলের মধ্যে বালি ভরা ব্যাগটা নিথর হয়ে ঝুলছে। তিনি এগিয়ে গিয়ে ব্যাগের একটা জায়গায় দুটো আঙুল ঢুকিয়ে দিতেই ঝুরঝুর করে মেঝেয় বালি পড়ল।

”অ্যা, ফেটে গেছে!” নোটনদা হাঁ করে শিবার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ”তুমি ফাটিয়েছ?”

সবাই ব্যাগটাকে তন্নতন্ন পরীক্ষা করলেন। কাপড়টা খুব পুরনো নয়। মাসছয়েক আগে ব্যাগটা করানো হয়েছে। সন্দেহ প্রকাশ করে তখন ওঁরা অনেক কথাই বলেন—কাপড়ের ওই জায়গাটা পচে গেছল, ছেঁড়াটেড়া ছিল, বাহাদুরি নেওয়ার জন্য ছেলেটা কিছু একটা দিয়ে খুঁচিয়ে গর্ত করে রেখেছিল।

শিবা কাঁদো—কাঁদো হয়ে বলল, ”আমি শুধু পাঞ্চ করে গেছি, আর কিছু করিনি।”

ওরা বেরিয়ে যাওয়ার পর শিবা চোখে জল নিয়ে বলে, ”আশ্চয্যদা, মাইনে পেলেই আমি নতুন ব্যাগ করিয়ে দেব, ইচ্ছে করে আমি ফাটাইনি।”

”তুই একটা বলদ! ইচ্ছে করে কি কেউ ঘুসি মেরে এই ব্যাগ ফাটাতে পারে?” তারপর ভাল্লুকের থাবার মতো বিশাল দুই তালুতে শিবাকে আঁকড়ে বুকে টেনে নিয়ে আশ্চর্য ঘটক বলেছিলেন, ”সামনেই হলধর টুর্নামেন্ট, তোকে নামাব।….চালিয়ে যা শিবা, চালিয়ে যা, যত ব্যাগ ফাটাতে চাস ফাটিয়ে যা।”

ওজন—যন্ত্রের কাঁটার দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য ঘটক ভ্রূ কোঁচকালেন। ”করেছিস কী, প্রায় বাহাত্তর কেজি!…লাইট মিডল। অবশ্য ট্রেনিং করতে—করতে শরীর ঝরবে, একাত্তরের নীচে ওয়েল্টারে এসে যাবি।”

খালি গায়ে শুধুমাত্র জাঙিয়া পরে শিবা ওজন দিতে যন্ত্রের ওপরে উঠেছিল। প্যান্ট আর টি—শার্টটা পরতে—পরতে বলল, ”গোমস—সার কখনও আসেন আশ্চয্যদা?”

”গোমস?” আশ্চর্য ঘটক আমতা—আমতা করে বললেন, ”ও তো আর আসে না। বছর—দুই আগে ওর একমাত্র মেয়ে বিয়ে করে অস্ট্রেলিয়া চলে যাওয়ার পর থেকেই কীরকম যেন হয়ে গেল। দুনিয়ায় ওই মা—মরা মেয়েটি ছাড়া আর কেউ তো ছিল না। প্রাণ দিয়ে ভালবাসত। পুরনো মোটর কেনাবেচার ব্যবসাটা ছেড়ে দিল। হাতে যা টাকা ছিল তাই দিয়ে দিনরাত্তির মদ খেতে শুরু করল।….জিম—এ আসা বন্ধ করল। ফিরিয়ে আনার অনেক চেষ্টা আমরা করেছি। দু—তিনবার এসেওছিল; বুঁদ হয়ে বসে থাকত, হঠাৎ—হঠাৎ চিৎকার করে উঠত, ছেলেদের চড়—থাপ্পড়ও মারত। তারপর নিজেই আসা বন্ধ করে দিল।”

”সেই পার্ক সার্কাসের বাড়িতেই আছেন?”

”না রে, ওখান থেকে বাড়িওলা উঠিয়ে দিয়েছে। আর ভাড়া দিতে পারত না।”

ফ্র্যাঙ্ক গোমসের কথা শুনতে—শুনতে শিবা যেমন দুঃখ পেল তেমনই অসহায়ও বোধ করল। গোমসই তাকে বক্সিং শিখিয়েছে, তার প্রথম ও একমাত্র গুরু। এখন নতুন করে শুরু চাই।

”আমাদের এখানে ট্রেনার এখন কান্তি, কান্তি সরকার। তুই তো ওকে চিনিস।”

কান্তি নামটা শোনামাত্র শিবার মুখ হাজার বছরের পাথরের মূর্তির মতো ঘষা, ভাঙা, কর্কশ হয়ে উঠল। লোকটাকে সে হাড়ে—হাড়ে চেনে। ধূর্ত, শয়তান এবং অতি—অমায়িক। লালবাগান জিম—এরই বক্সার ছিল। গোমস যখন ইস্টার্ন রেলওয়ের কোচ ছিলেন তখন সেখানে ওকে চাকরি করে দেন। কান্তি এখন আর রিংয়ে নামে না।

শিবা মাথা নেড়ে বলল, ”কান্তিদাকে নয়, আমার চাই গোমস—সারকে। ওঁকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে বলে আপনার মনে হয়?”

”বলতে পারব না, তবে পাড়ার লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো হদিস মিলতে পারে।”

শিবা ঠিক করল হদিসই করবে। পার্ক সার্কাস ট্রাম ডিপোর পাশের রাস্তায় গোমস থাকতেন। পরদিন বিকেলে সে হাজির হল সেখানে। কাঠের পাল্লার ফটক দিয়ে ঢুকে দশ মিটার জমি পেরিয়ে চারধাপ সিঁড়ি। ঢাকা বারান্দা। এখানেই চেয়ার—টেবল নিয়ে বৈঠকখানা, পেছনে দুটো ঘর। এখন আর তা নেই। বারান্দার আধখানা কাঠের পার্টিশান দিয়ে জেরক্স মেশিন বসিয়ে ব্যবসা চলছে।

সেখানে মালিকের মতো হাবভাব দেখে লোকটিকে সে জিজ্ঞেস করল, ”এখানে ফ্র্যাঙ্ক গোমস নামে একজন থাকতেন, তিনি কোথায় গেছেন, বলতে পারেন কি?”

লোকটি জানাল সে মাত্র সাতমাস এখানে ভাড়া নিয়ে এসেছে। ভেতরের ঘরে কিসের একটা অফিস। শিবা উঁকি দিয়ে জনাচারেক লোককে দেখল। নিশ্চয় এখানে বাস করে না, সুতরাং কিছুই বলতে পারবে না গোমস সম্পর্কে। তবু একবার বলে দেখাই যাক না ভেবে সে একজনকে জিজ্ঞেস করল। তিনজন মাথা নাড়ল, শুধু চতুর্থজন পরামর্শ দিল—”গেটের সামনে পানের দোকানটায় জিজ্ঞেস করতে দেখতে পারেন।”

পানওয়ালা গোমসকে চেনে, কিন্তু কোথায় যে গেছে সেটা আর জানে না। ”কিছুই বলে যায়নি। রাতারাতি হাওয়া হয়ে গেল। তবে শুনেছি এধার—ওধারেই কোথাও আছে।”

ওদের কথা দাঁড়িয়ে শুনছিল মাঝবয়সী একজন। সে বলল, ”হপ্তাতিনেক আগে ট্রাম থেকে ওকে এলিয়ট রোডে দেখেছি। একটা বড় হোটেল আছে, তার সামনের গলিতে ঢুকল।”

এলিয়ট রোডে কীভাবে যাবে জেনে নিয়ে শিবা বাসে উঠল এবং কন্ডাক্টরের হাঁক শুনে ঠিক জায়গাতেই নামল। বড় হোটেল ওই একটিই, অতএব সেটিকে খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না। তার উলটোদিকের গলিটি এঁকেবেঁকে কত দূর ঢুকে গেছে কে জানে! দু’ ধারে ঘিঞ্জি পুরোনো বাড়ি, রাস্তায় প্রচুর আবর্জনা আর দোকান। এখানবার লোকেদের পোশাকআশাক দেখেই বোঝা যায় অঞ্চলটায় অভাবী মানুষই বেশি।

কাকে সে জিজ্ঞেস করবে ফ্র্যাঙ্ক গোমস নামে কাঁচাপাকা চুল, কুচকুচে কালো, ছিপছিপে গড়নের, বাংলা—হিন্দি বলা এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সাহেবকে কোথায় পাব?

সে একের পর এক দোকানদারদের জিজ্ঞেস করে—করে এগোতে থাকল। শোনামাত্রই তারা মাথা নেড়ে দিল, কেউ—কেউ কয়েক সেকেন্ড ভাবার চেষ্টাও করল। সন্ধ্যা নামছে। রাস্তার আলো, দোকানের আলো জ্বলল। কিন্তু গোমসের পাত্তা সে পাচ্ছে না। যত সে গলির মধ্যে ঢুকছে, বাড়ির চেহারাগুলো বদলে যাচ্ছে। টালির বা টিনের চালের কাঠের দোতলা বাড়ি, তবে একতলা বাড়ির সংখ্যাই বেশি। রাস্তার জলের কলে ভিড়। শিবা ঠিক করল আর সে এগোবে না।

ফিরে আসার জন্য ঘুরে হাঁটতে শুরু করেই ভাবল, শেষবার সে একজন কাউকে এবার জিজ্ঞেস করবে। বাড়ির দরজার পাশে রকে এক বৃদ্ধা চিনা, কোলে বাচ্চচা নিয়ে বসে। একেই বলা যাক, ঠিক করে শিবা এগিয়ে গেল।

শিবার কথাগুলোয় মন দিয়ে শুনে সেই চিনা আঙুল দিয়ে সামনের বাড়িটা দেখিয়ে বলল, ”ওহি কোঠিমে দেখো তো। ডাহিনা বহেলা কামরামে এক আদমি আয়া। তুম য্যায়সা বোলতা, ওহি মাফিকই হ্যায়। উয়ো লোক তো আভি বাহার গিয়া, থোড়া ওয়েট করো। আ যায়গা।”

শিবার কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে পায়চারি শুরু করল। গোমস—সার এইরকম একটা নোংরা বস্তিতে আছেন, এটা সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সে মনে—মনে বলল, যে লোকটার জন্য অপেক্ষা করছে সে যেই হোক গোমস সার যেন না হয়! ফিটফাট শৌখিন মানুষ এই দুর্গন্ধভরা পরিবেশে!

”এই ছোকরা।” বৃদ্ধ শিবাকে ডেকে আঙুল দিয়ে দেখাল। ”তুমারা আদমি আতা হ্যায়।”

শিবা তাকিয়ে রইল। চেক লুঙ্গি আর গেঞ্জিপরা, হাতে একটা কাগজের মোড়ক নিয়ে যে—লোকটা এগিয়ে আসছে সেই কি ফ্র্যাঙ্ক গোমস?

”গোমস—সার।”

গোমস থমকে ঘুরে দাঁড়ালেন। ”হু?”

”আমি শিবা।”

এবার গোমসের চমকে ওঠার পালা।

”শিবা! আই মিন শিবাজি আইচ?”

”হ্যাঁ সার।”

”তুমি তো মরে গেছ শুনেছি!”

”না সার, তবে প্রায় মরে গেছলুম।”

গোমস হঠাৎ দু’ হাতে শিবাকে জড়িয়ে ধরল। শিবা ওর মুখ থেকে যে—গন্ধটা পেল, জুট মিলের বহু মজুরের মুখে সে এই গন্ধ পেয়েছে।

”কাম, কাম টু মাই রুম। আমি একাই থাকি।”

ঘরটায় একটা চৌপায়া, চামড়ার একটা জীর্ণ সুটকেস, প্লাস্টিকের জল—রাখার জার। দুটো কাচের গ্লাস আর হ্যাঙ্গারে প্যান্ট আর বুশ শার্ট। তার পাশে দেওয়ালে আঁটা বিঘতখানেক লম্বা মাটির একটা মূর্তি—ক্রুসবিদ্ধ যিশু। বিছানা বলতে সুজনি আর ওয়াড়বিহীন চিটচিটে বালিশ। বালব থেকে নির্গত জন্ডিস রুগির মতো পাণ্ডুর আলোয় ঘরটাকে শ্রান্ত, অবসন্ন দেখাচ্ছে।

”সিট ডাউন।”

শিবা চৌপায়ায় বসল। তারপরই দাঁড়িয়ে উঠে উত্তেজিত স্বরে বলল, ”সার, এ কী দশা হয়েছে আপনার! কী করে হল? কেন হল? আপনি যে এখানে নেমে আসবেন, এ তো কল্পনাও করা যায় না। আপনাকে যেভাবে দেখেছি, তার সঙ্গে আজকের এই দেখা…।” তার চোখে জল এসে গেল।

”সিট ডাউন, সিট ডাউন…আপসেট হয়ে গেছ তুমি। আমার কথা শুনে তোমার কোনও লাভ হবে না, আই অ্যাম ফিনিশড। আমার জীবনে আর কিছু করার নেই, শুধু এই বডিটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া ছাড়া। ওয়েলেসলিতে একটা পুরনো ফার্নিচারের দোকানে কাজ করি, ছ’শো টাকা দেয়। এই ঘরটার ভাড়া দেড়শো। বাকি টাকায় এর থেকে স্টাইলে কি থাকা যায়?”

হাতের মোড়কটা খুলে গোমস শিবার সামনে ধরল। রুটি, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা আর শুকনো কয়েক টুকরো ভাজা মাংস। ”টেক।”

”না।”

”বিফ, তাই খাবে না?”

”তা নয়। খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে না।”

”কেন?”

”আপনি আমার সঙ্গে প্রথম যেদিন কথা বলেছিলেন, সেসব কথা কি আপনার মনে আছে?”

”প্রথম কবে বলেছি? আই কান্ট রিমেমবার।”

”দুর্লভ চক্রবর্তীর গ্যারাজ থেকে একটু দূরে একটা কোচিং, সেখান দিয়ে যেতে—যেতে আপনি কিছু একটা দেখেছিলেন।”

”ওহহ, ইয়েস, ইয়েস,…..ফ্যান্টাস্টিক! তুমি একটা মাসকিউলার গুণ্ডার জ—এ লেফট হুক ল্যান্ড করালে, তখন আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেটা দেখতে পেয়ে থেমে গেলাম। আই ওয়াজ স্টানড। তোমার কাছে গিয়ে বললাম—ইউ হ্যাভ আ বিউটিফুল লেফট হুক, টেরিবল, আ ডেডলি জেম অব আ পাঞ্চ, কতদিন ট্রেনিং করছ? যখন বললে জীবনে তুমি বক্সিং করোনি, নেভার ফট ইন দ্য রিং, তখন বললাম লালবাগানে এসো, আমি তোমাকে শেখাব, ট্রেনিং করাব।….ইয়েস শিবা, ভিভিডলি আমার মনে পড়ছে তোমার সেই মুখ, ফ্ল্যাবারগাস্টেড অ্যান্ট ইনোসেন্ট ফেস। আই লাইকড দ্যাট ফেস। বললে, তোমার বয়স ওনলি সেভেনটিন । শুনে আমি কী বলেছিলাম, মনে আছে?”

গোমসের কথাগুলো জড়িয়ে আসছে। রুটি ছিঁড়ে মুখে তুলতে দিয়ে যে থমকে বলল, ”খাবে না?”

”না।”

”ওয়েল।” মাংসের টুকরো মুখে ঢুকিয়ে গোমস শিবার দিকে তাকাল। ”কী বলেছিলাম সেদিন?”

হঠাৎ গলা চড়ে গেল গোমসের। ”হোয়াট আই সেইড অন দ্যাট ডে? আই সেইড—তুমি বড় আছ, স্ট্রং আছ, ফাস্ট আছ, কারেজিয়াস আছ। ভাল ফাইটার হবে।” গোমসের বসে যাওয়া দুটো গালের চামড়া টানটান হয়ে উঠেছে। কোটরের মধ্যে চোখের মণি দুটো জ্বলছে।

”তুমি কি ফাইটার হয়েছ?”

শিবার মাথা ঝুঁকে পড়ল।

”তুমি লালবাগান জিম—এ প্রথমে আসোনি। আমিই গিয়ে চা—এর দোকান থেকে তোমাকে ধরে দুর্লভের গ্যারাজে নিয়ে যাই। ওকে বলেছিলাম, দিস বয় উড বী আ ব্রিলিয়ান্ট ফাইটার। যদি আমার কাছ থেকে ফারদার কাজ চাও তা হলে একে চায়ের দোকান থেকে সরিয়ে এনে তোমার কাছে রাখো। বলেছিলাম, দারুণ জিনিস আছে এই ছেলেটার মধ্যে। দুর্লভ আমার রিকোয়েস্ট রেখেছিল, তোমাকে কাম দিয়েছিল। ঠিক কি না? বাট ইউ লেট মি ডাউন। রোজারিওর কাছে ফাইনালে হেরেছিলে, একটা ওল্ড ফাইটার…হোয়াট আ শ্যেম!”

শিবার মাথা আর—একটু ঝুঁকল।

”তুমি এখানে এসেছ কেন, হোয়াট ফর?” আচমকা গোমস বিরক্ত গলায় প্রশ্নটা করল। ”আই অ্যাম গ্র্যাজুয়ালি ফেডিং আউট ফ্রম লাইফ, একদিন এই ঘরেই লাশ পড়ে থাকবে। আমি চাই না চেনা কেউ এখানে এসে আমার খোঁজ করুক। ইউ মে গো নাউ।”

”সার, আমি আবার রিংয়ে নামতে চাই।”

”হোয়াট! সে ইট এগেইন!” গোমস প্রায় চিৎকার করে উঠল।

”আমি আবার শুরু করতে চাই, ফিরে আসতে চাই। আপনি আমাকে ফিরিয়ে আনুন।” শিবা অবলম্বন খোঁজার মতো করে দু’ হাত বাড়িয়ে দিল। গোমস তা দেখেও দেখল না।

”কাম ব্যাক? তুমি কাম ব্যাক করতে চাও? টেক সামওয়ান এলস অ্যাজ ইওর ট্রেনার। নট মি।….ইউ মে গো নাউ।”

”সার, এবার আমি কোনও ভুল করব না, চ্যাম্পিয়ান হবই।”

”ভেরি গুড, নাউ গেট আউট।” গোমসের তর্জনী দরজা দেখাল।

এর পর আর থাকা যায় না। শিবা উঠে দাঁড়িয়ে মন্থর ভাবে দরজায় পৌঁছে ঘুরে দাঁড়াল।

”সার, এই ঘরেই মরে পড়ে থাকবেন?”

গোমস রুটি চিবোতে ব্যস্ত, জবাব দিল না।

”আমাকে আপনি ভেসে উঠতে সাহায্য করবেন না।”

ভ্রূ তুলে গোমস একবার তাকাল।

”আপনি হেরে গিয়ে ডুবে মরতে চাইছেন।”

গোমস রুটি চিবনো বন্ধ করল।

”দ্যাটস মাই বিজনেস।”

”সার, একটা ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ানও আপনি তৈরি করতে পারেননি। সবাই বলে ফ্র্যাঙ্ক গোমস একটা জালি ট্রেনার। বক্সিং—এর কিচ্ছু জানে না, শুধু বড়—বড় কথাই বলে।”

”আই নো দ্যাট, আমিও শুনেছি।”

”একবার শেষ চেষ্টা করুন না সার…সবার মুখ বন্ধ করে দিয়ে তারপর যেখানে ইচ্ছে মরে পড়ে থাকুন। একটা নকআউট পাঞ্চ শেষবারের মতো দিয়ে যান।” শিবা দরজা থেকে ফিরে এসে গোমসের সামনে উবু হয়ে দুই মুঠি তুলে ধরল। ”এই দুটো আপনাকে ভাসিয়ে তুলবে সার…আপনি আমাকে শুধু তৈরি করে দিন।”

নীরবতা নেমে এল ঘরে। কেউ আর কথা বলছে না। গোমসের রুক্ষ কর্কশ মুখভাব ধীরে—ধীরে মোলায়েম হয়ে আসছে। সে মাথা নাড়ল ধীরে—ধীরে, অন্যমনস্কভাবে। মৃদু স্বরে বলল, ”ইউ আর টেমটিং মি। কিন্তু শিবা, লাইফে আমি একটা টোটাল ফেইলিওর…আমার সাকসেস দেখে খুশি হবে এমন কেউই আমার নেই।”

”কেন, আমি আছি, ননী আছে, আশ্চয্যদা আছে, সাগরমামি, পূর্বপল্লীর মানুষরা আছে।…আরও কত, কত লোক যে খুশি হবে! বেঙ্গল থেকে বক্সিং—এ একটা ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ান কত বছর যে বেরোয়নি!”

শিবার উদ্ভাসিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল গোমস। ঠোঁট দুটো কাঁপল। নাকের নীচে রুটির গুঁড়ো লেগে, আঙুল দিয়ে মুছল। চোখ তুলে পেরেক দিয়ে ক্রুসে বেঁধানো যিশুর দিকে তাকাল। তার মুখের ওপর দিয়ে করুণাঘন যন্ত্রণার ছায়া ভেসে গেল।

”তুমি বাইবেল পড়োনি, তাতে রেজারেকশন বলে একটা ব্যাপার আছে। ক্রাইস্টকে কবর দেওয়ার পর তিনি উঠে এসেছিলেন। এর একটা ডিপার মিনিং আছে। জীবন মরে পড়ে থাকে না, সে উঠে আসে।…শিবা, আমি জিম—এ যাব।”

তাঁর দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে থাকা শিবার মাথায় গোমসের হাত নেমে এল।

।। ৯।।

গোমস একদা বলেছিল বটে, ‘এই ছেলেটার মধ্যে দারুণ জিনিস আছে’, কিন্তু শুধু ‘জিনিস’ দিয়েই তো খেলোয়াড় তৈরি করা যায় না! ‘জিনিস’টাকে মারাত্মক করে তোলার জন্য সেটাকে নিয়ে কাজ করতে হয়। কাজ মানে পরিশ্রম। সেটাকেই ধ্যানজ্ঞান করে তোলা, অর্থাৎ তাতে সময় দেওয়া। এই সময় দেওয়াটাই শিবার কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠল।

সকালে ননী রিকশায় ডেকচি ও শিবাকে পৌছে দিত, যেহেতু শিবার পায়ের চোটটা বিশ্বাসযোগ্য করে নিতুর কাছে দাখিল করতে হত। দু—সপ্তাহ পর ননী ঘোষণা করে, ”ডাক্তারবাবু পরীক্ষা কইরা কইয়া দিচ্ছেন শিবা ফিট, অহন হাঁটতে—চলতে পারব আগের মতন।”

এবার বিপদে পড়ল শিবা। ফিট হয়ে যাওয়া মানে দু’বেলাই দাদার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো, সাহায্য করা। তা হলে লালবাগানে সে যাবে কখন? সে সমস্যা সমাধানের জন্য সাহায্য চাইল ননীর।

”আর আমি মিথ্যা কইতে পারুন না।” ননী ঝাঁঝিয়ে উঠল। ”তুই অন্য লোক দ্যাখ এবার। তোর জইন্য এত মিথ্যা কথা কইচি যে, তিন—চারডা নরক লাগব আমারে শাস্তি দিতে…তুই কালা সাহেবরে দিয়া কওয়া না, মনে তো হয় নিতুদারে বোঝাইতে পাইরব।”

গোমসকে ননী ‘কালাসাহেব’ বলে, অবশ্য সামনাসামনি নয়। শিবা বিব্রত মুখে বলল, ”সারের অবস্থা তো বলেছি তোকে। বিনি পয়সায় ওঁর কাছ থেকে ট্রেনিং নিতে আমার লজ্জা করে, নিজেকে বড় সুবিধাবাদী মনে হয়।”

”মনে হওয়া তো উচিতই। আমি যে কষ্ট কইর‌্যা রিসকা চালানো শিকচি, সে কি লোককে মাগনায় রিসকায় চড়াইয়া ঘুরামু বইল্যা।”

”সারের জন্য কিছু একটা করা দরকার। অন্তত ভাল একটা জায়গায় রাখা, ভাল একটু খাওয়ার ব্যবস্থা করা…টাকাপয়সার থেকেও এটা জরুরি।”

”তারও আগে তর নিজের কথাটা তুই ভাইব্যা দ্যাখ। নিতুদারে বুঝাইয়া—সুঝাইয়া আলুর দমের হাত হইতে নিজেরে কিভাবে রক্ষা কইরবি, আগে সেইডা ঠিক কর। একসময় আমিই তোরে কইছিলাম, তুই যখন প্র্যাকটিস করবি তোর লইয়া নিতুদার লগে আমি কাম করুম। একবার তো কইতে গেলামও, দ্যাখলাম নিতুদা ব্যাপারডা অ্যাকদমই পসন্দ করতাচে না। রিসকা ফ্যালাইয়া চা—রুটি—আলুর দম পরের হইয়্যা বেচুম ক্যান? এ—কথার তো জবাব দিতে পাইরল্যাম না। কালা সাহেবরে দিয়া না হইলে অন্য কাউরে দিয়া কওয়া না, তুই নিজেই ক না!”

”ওরে বাবা! আমার দ্বারা বলাটলা হবে না। আমি তো জানি, কি কষ্ট করে দিনরাত খেটে, একাই দোকানটা দাঁড় করিয়েছে। দোকানে যাব না, এটা বলার মতো পাপ আর হয় না! আরও দুটো খাবার দোকান রয়েছে তাদের সঙ্গে কম্পিট করে বিক্রি বাড়ছে, এই সময়ই দাদার আরও বেশি করে হেল্পার দরকার। এখন যদি বক্সিংয়ের জন্য—।”

শিবা চমকে উঠল ননীর মুখের দিকে তাকিয়ে। মেদ মাংসহীন শীর্ণ মুখটা কঠিন হয়ে উঠেছে। ওর চোখ থেকে একটা হলকা বেরিয়ে এল। শিবার বুকের মধ্যে পর—পর কে যেন ঘুসি মেরে যাচ্ছে। ঢপ, ঢপ, ঢপ শব্দগুলো কলজের না ঘুসির, সে বুঝতে পারছে না। ননীর মুখে কী একটা যেন ফুটে উঠেছে!

কী কথা! শিবার মনে হল ননী যেন মনে—মনে বলছে, এই বক্সিংয়ের জন্যই তুই একদিন দাদাকে, মাকে, আমাকে, পূর্বপল্লীর সব মানুষকে ত্যাগ করে চলে গেছলি গোরাবাবুর কাছে। যেখানে পেট ভরে ভাল খাওয়া, ভাল জামা—জুতো, ভাল বিছানা, এইসবের লোভে তুই সোনার বকলেস পরে কুকুর হয়ে গেছিলিস। গোরাবাবুর কারখানার নিতুদারা ধর্মঘট করেছিল। সেই ধর্মঘট গোরাবাবু সাধুর দলবলকে দিয়ে পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তুই কিনা সেই লোকটারই আশ্রয়ে গিয়েছিলি! বক্সিংয়ের নাম করেই, তুই বেইমানি করেছিলি আমাদের সঙ্গে।

”অহন বক্সিংয়ের জইন্য,—এই বইল্যা চুপ কইরা গেলি ক্যান? ক, কী কইতে চাস, ক?”

”ননী তুই…তোরা এখনও কি সেসব কথা মনে রেখেছিস?”

”অহন আমি রিসকা লইয়া বাইরমু, আজেবাজে কথা শোনার মতো সময় নাই। তুই কালাসাহেবরে দিয়াই নিতুদারে কওয়া।” ননী একটু বেশিই ব্যস্ততা দেখিয়ে চলে গেল।

শিবা বুঝল, হঠাৎ পুরনো ব্যাপারটা উঠে আসায় ননী অস্বস্তিতে প্রায় পালিয়েই গেল।

কিন্তু সে পালাতে পারছে না।

.

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য চ্যাম্পিয়ানশিপের ফাইনালে শিবা উঠেছিল পর—পর দুটো লড়াইয়ে নক আউট করে। প্রথমটায় এক মিনিট, পরেরটায় কুড়ি সেকেন্ড সময় তার লেগেছিল। বক্সিং মহলে সাড়া পড়ে গেছল। সেবার শিবা ছাড়া আর কেউ নক আউটে একটা লড়াইও জিততে পারেনি। বলাবলির বিষয় হয়ে উঠেছিল তার ক্ষিপ্রতা আর ঘুসির জোর।

ফাইনালে রিংয়ে উঠে লড়াইয়ের আগে নিজের কর্নারে দাঁড়িয়ে শিবা দর্শকদের দিকে চোখ বোলাতে—বোলাতে দেখেছিল সাধুকে। অবাক হয়ে গেছল। টকটকে ফরসা গায়ের রং, ধুতি—পাঞ্জাবি পরা, সরু সোনালি ফ্রেমের চশমা চোখে দেওয়া, মাথার চুল পাতলা একটি লোকের পেছনে বসে সাধু, সামনে ঝুঁকে লোকটিকে কিছু বলছে আর তার দিকে তাকাচ্ছে। ঠোঁটে হাসি খেলছে।

প্রথম রাউন্ডেই সুনীল বেরাকে নক আউট করে শিবা বাংলার লাইট ওয়েট চ্যাম্পিয়ান হয়। রিং থেকে নেমে আসতেই বুকে জড়িয়ে ধরে আশ্চর্য ঘটক বলেছিল, ”এভাবে প্রত্যেকটা খেলায় নক আউট, আমি কখনও দেখিনি রে। লালাবাগানের ইজ্জত বাড়িয়ে দিলি।” ফ্র্যাঙ্ক গোমস বলেছিল, ”ঘোটক, তোমাকে যা বলেছিলাম এবার তা মিলিয়ে নাও। ঝুটা কি সাচ্চচা, আমি ঠিক চিনতে পারি।” তারপর শিবাকে বলেছিল, ”আই অ্যাম রিয়্যালি প্রাউড টুডে। এবার হার্ড ট্রেনিং ন্যাশনালসের জন্য।”

এরই মিনিটপাঁচেক পর এক অচেনা শীর্ণকায় প্রৌঢ় তার কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, ”তোমার সঙ্গে গোরাবাবু একটু কথা বলতে চান, একবার বাইরে আসবে?”

”কে গোরাবাবু?” শিবা জিজ্ঞেস করে।

”গোরাচাঁদ সেন। খেলাধুলোর একজন বড় পেট্রন, অনেক ক্লাবকে টাকা দেন। খুব বড় ব্যবসায়ী, কারখানা আছে তিনটে। তোমার লড়াই ওঁর খুব ভাল লেগেছে তাই কথা বলতে চান।”

গোরাবাবুর সঙ্গে শিবার সেই প্রথম সাক্ষাৎ। তাকে একশো টাকার নোট দিয়ে গোরাবাবু বলেছিল, ”পুরস্কার।” তারপর ”কাজ করবে? তোমার বক্সিংয়ের ক্ষতি হতে পারে এমন কোনও কাজ নয়। সামান্যই। আমার বাড়িতে থাকবে, খাবে, মাইনেও দেব। এবার তোমার ভাল খাওয়াদাওয়া দরকার, মোটর গ্যারাজে পড়ে থেকে কি ওপরে উঠতে পারবে? এসো আমার বাড়িতে।” গোরাবাবু নাম—ঠিকানা লেখা কার্ড দিয়েছিল শিবাকে।

শিবার মনে হয়েছিল জীবনটাকে বদলে নেওয়ার একটা সুযোগ তার কাছে এসেছে। এটাকে সে ছাড়বে না। তখন নিতুদের কারখানায় ধর্মঘটের এগারো দিন চলছে। সেই ধর্মঘট ভাঙতে সাধু আর তার দলের ছেলেরা এসেছিল। শিবা খালি হাতেই লোহার চেন আর ছুরির সামনে দাঁড়িয়ে গুণ্ডাদের পালটা মার দেয়।

ঠিক তখনই সেই লোকটার আবির্ভাব হল, যে তাকে বলেছিল, গোরাবাবু তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান। ধর্মঘটীদের মধ্যে ছিল শক্তি দাস। সে ফিসফিস করে একজনকে তখন বলে, ”এটা তো মালিকের সুকতোলা প্রিয় হালদার, এখানে যে!”

প্রিয় হালদার ক্ষুব্ধ স্বরে তখন বলেছিল, ”তুমি এখানে কী করছ শিবাজি! বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ান কিনা মাস্তানি করছে? সকালে এদিকেই আমরা এসেছিলুম, খবর পেলুম তোমায় নাকি গুণ্ডারা ঘিরে ধরে মারছে! শুনেই তো গোরাবাবু ছুটে এসেছেন, গাড়িতে তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন। চলো, চলো…এ কি তোমার হাতে কনুইয়ে কাটাছোঁড়া কেন? ভেঙেটেঙে গেলে চিরকালের মতো বক্সিংই যে শেষ হয়ে যাবে।”

এই বলে প্রিয় হালদার তাকে টেনে নিয়ে যায়। তখন হাত তুলে শিবা, নিতু আর শক্তি দাসকে জানিয়েছিল, সে এখনই আসছে। ওরা বিভ্রান্ত মুখে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে—থাকতে মুখটা কঠিন করে ফেলে।

কিন্তু শিবা আর আসেনি।

এখনও শিবা সেই স্মৃতি থেকে পালাতে পারছে না। সেদিন গোরাবাবুর মোটরে প্রিয় হালদার তুলে নিয়ে যাওয়ার পরই সাধুর দল ফিরে এসে মিনিট তিনেকের মধ্যেই ধর্মঘটীদের মেরে হটিয়ে দেয়, নিতু ও শক্তি দাসকে হাসপাতালে যেতে হয়। এসব কথা কয়েকদিন পর গ্যারাজে ফিরে এসে শিবা জানতে পেরেছিল। দুর্লভ চক্রবর্তী বলেছিল, ”নিজের দাদাকে গুণ্ডাদের হাতে ফেলে দিয়ে পালাবি, এটা আমরা কেউ ভাবতে পারিনি। ধর্মঘট ভেঙে গেছে, ওদের আর চাকরি হয়নি। এইসব জামা—জুতো পরার লোভেই পালালি?”

”আমি পালিয়েছি?” শিবা চিৎকার করে ছুটে গেছল বাড়িতে। প্লাস্টারে হাত—বুক মোড়া নিতু তাকে দেখে বলেছিল ”আয়, বোস।” শিবা বলেছিল, ”জানতুম না গোরাবাবুই তোমাদের কারখানার মালিক, বিশ্বাস করো দাদা।” নিতু ঘাড়টা নাড়তে গিয়ে যন্ত্রণায় কাতরে উঠে বলেছিল, ”আমি কিছু মনে করিনি।”

সেই সময়ই মা চিৎকার করে বলে উঠেছিল, ”বেরো, বেরো, বেইমান।” একটা অন্ধ রাগ হঠাৎই শিবাকে তখন আচ্ছন্ন করে দেয়। সেও পালটা চেঁচিয়ে ওঠে, ”কিসের বেইমানি? গুণ্ডা ঠেকাবার দায় আমার হাতে যাবে কেন? আমি কি ধর্মঘট করতে বলেছি?…আমারও জীবন আছে, সেটা কেউ দেখতে আসবে না? নিজেকে নিজেই দেখতে হবে।…সবাই বড় হতে চায়, সেজন্য যে পথই খোলা পাব সেই পথে আমি যাব।”

এর পরে সে দরজার পাল্লায় একটা ঘুসি বসায়। তাতে পাল্লাটা ফেটে গেছল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে হনহনিয়ে যখন সে বটকেষ্টর দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন শচীনকাকু ডেকে একটা মোড়ক তার হাতে দিয়ে বলে ”ননী তোর জন্য রেখে গেছে।”

শিবা সেটাকে খুলতেই বেরোয় বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ান হওয়ার মেডেল, সার্টিফিকেট আর বেস্ট বক্সার হওয়ার ট্রোফি। এক টুকরো কাগজও ছিল। তাতে বড়—বড় অক্ষরে লেখা, ”শাবাশ ফাইটার। এবার পাবি সোনার বকলেস।”

কাগজটা মুঠোয় চটকে শিবা নিজেকে বলেছিল, হ্যাঁ, সোনার বকলেসই পরব।

কিন্তু এর পরও দাদা, ননী, শক্তিমামা, সাগরমামি, আশ্চর্যদা,…সবাই তাকে আপন করে কাছে টেনে নিয়েছে। ওরা হয়তো ভুলে যাওয়ার ভান করছে, কিন্তু সে তো ভুলতে পারছে না। দাদাকে দোকানে একা ফেলে রেখে বক্সিংয়ে আবার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা সে বলবে কোন মুখে! তার প্রধান সহায় ননী। কিন্তু সে স্পষ্টই জানিয়ে দিল, অন্য কাউকে দিয়ে বলাও।

গোমস—সারকে বললেই রাজি হয়ে যাবেন, কিন্তু দাদা কি ওঁর কথা শুনবে? তবু একবার চেষ্টা করে দেখা যাক, এই ভেবে শিবা লালবাগান জিম—এ যাওয়ার জন্য যখন বাসস্টপে দাঁড়িয়ে, একটা স্কুটার তখন তাকে দেখেই থেমে পড়ল।

হাত নেড়ে সাধু তাকে ডাকছে। ভ্রূ কুঁচকে শিবা স্কুটারের দিকে এগিয়ে গেল।

”আবার বক্সিং শুরু করেছিস?”

”হ্যাঁ।”

”হলধর বর্ধন টুর্নামেন্টে নামছিস?”

”কে বলল?”

”আমি সব খবরই রাখি। গোমস তোকে ট্রেনিং করাচ্ছে, কর, ভাল করে কর। কোনও সরঞ্জামের, কি জিনিসপত্রের যদি দরকার হয় আমাকে বলিস…না, না, আগে যা হয়ে গেছে তা হয়েই গেছে, সেসব কথা আমি মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছি। গোরাবাবুর সঙ্গেও আমার আর কোনও সম্পর্ক নেই। ঠিক করেছি, আমি নিজেই এবার বেটিং অর্গানাইজ করব।” সাধু হেলমেটটা মাথা থেকে নামিয়ে পেটের পর চেপে ধরে রয়েছে। এবার সেটায় হাত বোলাতে লাগল।

”কী অর্গানাইজ করবে?” শিবা ভ্রূ কুঁচকে সন্দিগ্ধ গলায় বলল।

”গোরাবাবু যা করত, সেটাই। বেটিং করে লোকটা কয়েক লাখ কামিয়েছে। কিন্তু তোর ওপর বাজি ধরে যে চোটটা পেল..যাকগে ওসব কথা—।”

”যাকগে কেন?” দাঁত চেপে বলার সঙ্গে—সঙ্গে শিবা হাত মুঠো করল।

”ন্যাশনালের ফাইনালে রোজারিওর মতো বুড়োর হাতে মার খেলাম, তারপর ইনভিটেশন টুর্নামেন্টেও ওর হাতে ফার্স্ট রাউন্ডেই নক আউট হলাম। কেন? লড়াইয়ের আগে ড্রেসিংরুমে কান্তিদা কমলালেবু এনে বলল, গোমস পাঠিয়ে দিয়েছে। গোমসের নাম শুনে চোখ বুজে সেই কমলা আমি খেলাম, আর তারপরই সব ঝাপসা দেখতে লাগলাম, শরীর ঝিমিয়ে পড়ল। কান্তিদাকে বিষাক্ত কমলা দিয়ে কে পাঠিয়েছিল?”

”টাকা কামাবার জন্য রোজারিওর ওপর বেট করে, কিন্তু কাজটা আমি করিনি। হ্যাঁ, তুই ঠিকই ধরেছিস, ইঞ্জেকশন করে ওষুধ ঢোকানো কমলা কান্তির হাত দিয়ে আমিই পাঠিয়েছিলাম।” স্বচ্ছ চোখে, সরল ভঙ্গিতে সাধু খুবই সাদামাঠা গলায় তার দুষ্কর্মের কথাটা জানাল। ”আমি শুধু শোধ নিতে চেয়েছিলাম।” সাধুর বাঁ হাতটা তার বাঁ চোয়ালের কাছাকাছি উঠে এসেই নেমে গেল। এক চিলতে হাসি শুধু তার ঠোঁটে লেগে রইল।

”তা এখন হঠাৎ কী মনে করে? জিনিসপত্তর দেব, ভাল করে ট্রেনিং কর…ব্যাপারটা কী?”

”এবারের ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ানশিপে তুই হবি আমার বাজির ঘোড়া। তোকে জিততে হবে, চ্যাম্পিয়ান হতে হবে।”

”অদ্ভুত তো! গোরাবাবুর হুকুমে সেদিন রিং থেকে কতকগুলো লোক সোজা আমাকে তুলে ওর বাড়িতে নিয়ে গেছল। আমার শরীরে তখন একফোঁটা শক্তিও ছিল না। সেখানে একটা ঘরে দুটো লোক দু’দিক থেকে আমায় চেপে ধরেছিল, আর একজন আমায় হেভিব্যাগ বানিয়ে পাঞ্চ করে গেছল। পাঞ্চিং শুরু করার আগে সে বলেছিল, ”চোয়ালের কথা আমার মনে আছে। আমার গায়ে হাত তোলার সাহস আজ পর্যন্ত কেউ দেখায়নি। তুই এখনও সে বেঁচে আছিস এটাই আশ্চয্যের।”…সেই লোকটার বাজির ঘোড়া এখন আমি! আমি তা হলে এখনও বেঁচে আছি! মার খেতে—খেতে সেদিন অজ্ঞান হয়ে গেছলাম। ভোরবেলায় বি.টি. রোডের ধারে একটা নালায় আমাকে পড়ে থাকতে দেখে রিকশাওয়ালা তুলে নিয়ে হাসপাতালে দিয়ে আসে। বিছানায় উঠে বসতে চার মাস লেগেছিল আর এই আঙুলটা সিধে হল না।” শিবা বাঁ হাতের তর্জনীটা সাধুর চোখের সামনে তুলে ধরল।

সাধুর ঠোঁট থেকে হাসিটা কিন্তু মুছল না। বাঁকা তর্জনীটা আলতো করে দু’ আঙুলে ধরে বলল, ”অপারেশন করে ঠিক করে নে, আমি খরচ দেব।…তোর মাথা গরম হয়ে উঠছে, এখন তোর সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। পরে বলব’খন।” সাধু হেলমেটটা পরে স্কুটারে স্টার্ট দেওয়ার জন্য কিকার—এ লাথি দিল। ক্লাচ দিয়ে স্কুটারটাকে সাত—আট মিটার চালিয়েই থামিয়ে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে সাধু বলল, ”জোনাকির ঘটনাটা শোনামাত্রই বুঝে গেছলাম কাজটা কার। পাঁচটা রডের সঙ্গে খালি হাতে একজনই লড়তে পারে। ওরা কিন্তু আমার ছেলে নয়। আর—একটা জিনিসও বুঝে গেছি, আগের শিবা আবার ফিরে এসেছে।….চলি, আবার পরে কথা হবে।”

সাধুর বিলীয়মান পিঠ থেকে চোখ সরিয়ে শিবা দেখল বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা তার দিকে তাকিয়ে। তাদের চোখে চাপা সমীহ আর ভয়।

।। ১০।।

ট্র্যাফিক জ্যামের জন্য চিড়িয়ার মোড় পার হয়েই বাসটা দাঁড়িয়ে গেল। টালা ব্রিজের ওপরও যানবাহন জমে রয়েছে, হয়তো শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় পর্যন্তও এই অবস্থা। এই জট কখন ছাড়াবে, সেজন্য বসে থেকে সময় নষ্ট না করে শিবা বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করল।

কিছুটা এগোতেই তার চোখে পড়ল উৎপল চট্টরাজকে, দুটো বাসের মাঝে এক হাত ফাঁক দিয়ে গলে রাস্তার ওপারে যাওয়ার জন্য দোনামনা করছে।

”উৎপলবাবু, উৎপলবাবু।” শিবা হাত তুলে চিৎকার করল। উৎপল মুখ ফিরিয়ে তাকাল।

শিবা ছুটে এসে বলল, ”এভাবে কখনও পার হবেন না।”

”বড্ড তাড়া রয়েছে…তোমার খবর কী? তারপর তো আর দেখা হল না।” উৎপলকে কিছুটা অপ্রতিভ দেখাল।

”খবর তো আপনিই দেবেন। জোনাকির গোলমাল কি মিটেছে? দিদি, টুটু এরা কোথায়?”

”ধর্মঘটের ব্যাপারটা তার পরের দিনই, আমাকে আর জব্দ করতে চান পেরে ওরা তুলে নেয়। ভাল কথা, সেদিন ওদের চারজনকে হাসপাতালে পাঠাতে হয়, দু’জন অ্যাডমিটেড হয়েছিল। ওরা রটায় আমি নাকি সাত—আটজন গুণ্ডা এনে ওদের পিটিয়েছি।” উৎপল হো—হো করে হেসে উঠল। শিবা হাসল না।

”তা হলে আর গোলমাল নেই?”

”গোলমালের থেকেও বেশি, এখন সমস্যার পাহাড় জমে গেছে। রাস্তায় এভাবে দাঁড়িয়ে অত কথা তো বলা যায় না, সংক্ষেপে বললে, আসল যে ইউনিয়ন, তারা এখন ঠিক করেছে সমবায় ভিত্তিতে কারখানা তারাই চালাবে, এই নিয়ে এখন কথাবার্তা চলছে। মালিক গোরাচাঁদ সেন লেবারদের প্রডিভেন্ট ফান্ডের টাকা, ই এস—আই এর টাকা গায়েব করেছে, নানান দেনা চারধারে, টেলিফোনের টাকা দেয়নি, বিদ্যুতের সত্তর হাজার টাকা বাকি, ট্যাক্স বাকি; ম্যানেজমেন্টের মোট প্রায় ষাট লক্ষ টাকা দেনা। বলছে এসব শোধ দিয়ে তবেই সমবায় হবে। এদিকে লকআউট করার অজুহাত বানাতে নিজেদের লোক দিয়ে সাজানো ধর্মঘট বাধাতে চেয়েছিল আমাকে তাড়াবার ইস্যু তুলে। সেটা ভেস্তে গেছে, ঠিকমতো বললে, তোমারই জন্য।”

শিবার মুখে রক্ত ছুটে এল। প্রশংসা অবশ্যই তার ভাল লাগে, অস্বস্তিও হয়।

”আপনিই তা হলে ওদের পথের কাঁটা?”

”অন্যতম, একমাত্র কাঁটা নই। ব্যাপারটা কী জানো, এতগুলো পরিবারকে পথে বসিয়ে রাজনীতি করা লোকেদের আর প্রোমোটারের সাপোর্টে কারখানা তুলে দিয়ে বাড়ি তৈরি করে বিক্রি করাটা—”

”আমি এসব রাজনীতি—টিতি একদম বুঝি না, বোঝার দরকারও নেই। নিরীহ, সৎ মানুষ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করা উচিত, শুধু এইটুকুই বুঝি। এখন যাচ্ছেন কোথায়?”

”কোয়ার্টারে। এখন আমি একাই ওখানে থাকি। আবার কবে কী ঝামেলা বাধে তার ঠিক নেই, তাই ওদের আর নিয়ে যাইনি।”

”আমার একটা উপকার করবেন?” শিবার মুখে এবং স্বরে মিনতি ফুটে উঠল।

”অবশ্যই করব, যদি সাধ্যের মধ্যে হয়। তুমি যা করেছ আমাদের জন্য তো—।” শিবা তাকে থামিয়ে দিল।

”ওসব কথা থাক। আপনার কোয়ার্টারে একজনকে থাকতে দেবেন? আমার ট্রেনার, বয়স্ক লোক, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, তিন কুলে কেউ নেই, একা মানুষ। ওঁকে যদি থাকতে দেন, তা হলে আমার খুব উপকার হয়। আমি আবার ন্যাশনালে নামব, গোমস—সারের কাছেই ট্রেনিং করছি। ওঁর খাওয়াদাওয়ার জন্য আপনাকে কিছু করতে হবে না, শুধু থাকতে দেওয়া।” শিবা প্রায় এক নিশ্বাসে বলে গেল কম্বিনেশন পাঞ্চ করার মতো দ্রুতগতিতে।

”আরে, এ আর এমন কী, সঙ্গে একজন থাকলে, তার ওপর আবার বক্সিং ট্রেনার, তো আমার বরং সুবিধাই হয়। আর খাওয়াদাওয়া তো আমার সঙ্গেই—।”

তিন—চার মিনিট পর শিবাকে দেখা গেল যে প্রায় ছুটে চলেছে লালবাগান জিম—এর দিকে।

.

তিনদিন পর ফ্র্যাঙ্ক গোমস ননীর রিকশা থেকে নিতুর দোকানের সামনে নামল।

”সাহেব আপনার লগে দেখা কইরতে চায়, তাই লইয়া আইলাম।”

সাহেব শুনেই নিতু অস্বস্তিতে পড়ল। তবে রংটা ঘোর কালো, এটাই যা ভরসা। বাংলাটাংলা বলতে যদি নাও পারে নিশ্চয় বুঝতে ঠিকই পারবে। সে ফিসফিস করে ননীকে বলল, ”কে? আমার কাছে কেন?”

”গোমস—সার! শিবারে উনি তো বক্সিংয়ের অন্দিহন্দি সব চিনাইছেন, শিখাইছেন। এনারে টেরনার করো, বক্সিংয়ের মাস্টারমশয়! টেরনার ছাড়া কেউ চ্যাম্পিয়ান হইতে পারে না।”

”তা আমার কাছে কেন?”

”গুড আফটারনুন।” গোমস এগিয়ে এসে হাত বাড়াল। ওদের কথোপকথন সে শুনেছে। নিতু বিমূঢ়ভাবে গোমসের বাড়ানো হাতটা ধরতেই ঝাঁকুনি খেল। ”ফ্র্যাঙ্ক গোমস।..আপনিই শিবাজির দাদা নেতাজি?”

”হ, নিতুদা।” ননী আগ বাড়িয়ে বলল।

”আপনার নাম শুনেছি, তবে এই প্রথম চোখে দেখছি।” নিতু সতর্ক ভঙ্গিতে বলল।

”শিবাকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছুটি দেওয়ার জন্য রিকোয়েস্ট নিয়ে আমি এসেছি।”

নিতু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সাহেব বাংলাটা এত ভাল বলে যে, বাঙালি বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

”কী জন্য ছুটি?” নিতু এবার বিভ্রান্ত।

”শিবা কামব্যাক করবে বক্সিংয়ে। আবার রিং—এ নামবে, আবার লড়বে। এজন্য ট্রেনিং করতে হবে, হার্ড ট্রেনিং।”

শুনতে শুনতে নিতুর মুখ গম্ভীর হতে লাগল। ”ট্রেনিং করবে তাই দোকান দেখতে পারবে না, তাই তো?”

গোমস কিঞ্চিৎ স্মার্টনেস হারাল নিতু সরাসরি এই প্রসঙ্গে আসায়। এ যেন রাউন্ড শুরুর বেল বাজার সঙ্গে—সঙ্গে মুখে প্রতিপক্ষর একটা জ্যাব!

”দোকান আর ট্রেনিং দুটো একসঙ্গে চালালে খুবই টায়ার্ড হয়ে যাবে। তাই বলছি, ডিসেম্বরে ন্যাশনালস পর্যন্ত ওকে যদি আপনি ছেড়ে দেন।”

”হগ্গালে ডেচকি লইয়া আসার কামডা অবইশ্য শিবা চালাইয়া যাইব, ওডা তো ওর টেরনিংয়ের মদ্যেই পড়ত্যাসে।”

”তুই থাম।” নিতু ধমক দিল। ননী গুটিয়ে গিয়ে পিছু হটে রিকশায় উঠল। ”আমি অহন যাই” বলেই প্যাডেল করতে শুরু করল।

”কিছুদিন আগে শিবা পায়ে বড়রকমের চোট পেয়েছে, এখন আর ওকে বক্সিং করতে দেওয়ায় আমার মত নেই। তা ছাড়া এই বক্সিং থেকেই তো ওর জীবনে বিপদ এসেছিল। গুণ্ডারা ওকে যা মার মেরেছিল। তা তো আমি ভুলতে পারব না।” থমথমে মুখে নিতু কথাগুলো বলে খদ্দেরে মনোযোগ দিল।

গোমস কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, নিতুর হাত খালি হতে বলল, ”শিবার চোট এখন কমপ্লিটলি কিওরড। ডাক্তার ও.কে. করে দিয়েছে। আর গুণ্ডারা যে—জন্য মেরেছিল সেসব কারণ এখন আর নেই।…বক্সিং এমনই একটা খেলা, বেইটাররা এতে হেভি বেট করে। গোরাচাঁদের বক্সার ছিল শিবা। তখন আমার ট্রেনিংয়ে ছিল না। ও ইমম্যাচুওর ছিল তাই জানত না কত রকমের বদমাইশি করে হারিয়ে দেওয়া হয়। বহু টাকা হেরে রাগে গুণ্ডা দিয়ে গোরাচাঁদ ওকে পিটিয়েছিল। শিবার পেট্রন এখন শিবা নিজেই।” গোমস দুই মুঠিতে তুলে নিল নিতুর দুই হাত। ”আমার রিকোয়েস্ট নিতুদা…তুমি রাখো, জাস্ট ওয়ান্স, একবার। এবার আমিই ওকে গাইড করব। এটা শুধু তোমার ভাইয়েরই নয়, আমারও কামব্যাক হবে।”

আপনি থেকে তুমি, তার ওপর নিতুদা! কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল নিতুর মাথাটা। সে আমতা—আমতা করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই গোমস বললেন, ”ও যদি ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ান হয়, মোস্ট প্রোবাবলি হবে, তা হলে সেটা একটা রিভেঞ্জ নেওয়া হবে। তা ছাড়া ওর সামনে অনেক ওপেনিং আসবে…চাকরি মিলবে, ইন্ডিয়া টিমে আসবে, নানান দেশ ঘুরবে…এশিয়ান গেমস, ওলিম্পিকস,…ফ্যামিলির মান বাড়বে।”

নিতুর বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। পৃথিবীতে না হোক, এশিয়ার মধ্যেও যদি শিবা সেরা হতে পারে, তা হলে দেশের কোটি—কোটি মানুষ ওর নাম জানবে। কলকাতার উত্তরে লাখ—লাখ মানুষ গর্ব করে বলবে, ”চেনো না! এখানকারই ছেলে শিবাজি আইচ, পূর্বপল্লী কলোনিতে থাকে। জানো না, ওর বাবা দয়াল আইচ ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। স্বাধীনতার পরও তিনি সংগ্রাম থামাননি। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের জন্য আমৃত্যু লড়াই করেছেন।…তাঁর ছেলে লড়াইয়ে নামবে না তো কে নামবে?…শিবার দাদা নিতু, চা, রুটি, আলুর দম বেচে, সেও তো লড়াই করে…দারুণ একটা ফ্যামিলি…।”

”শিবার বড় হওয়ার লড়াই আমার জন্য আটকাবে, তা কখনও হতে পারে!…বংশের মুখোজ্জ্বল করবে, সবাই বড় মুখ করে বলবে, ‘শিবা আমাদের ছেলে, নিতুর ভাই’… আমি দাদা হয়ে বাধা দেব! শুধু একটাই অনুরোধ, আপনি ওকে একটু দেখবেন।” নিতু হাত বাড়িয়ে ফ্র্যাঙ্ক গোমসের দুটো হাত ধরল।

সেদিন রাতে দুই ভাই পাশাপাশি শুয়ে। কারও ঘুম আসছে না। এক সময় নিতু বলল, ”সাহেবকে দিয়ে বলাবার কী দরকার ছিল, তুই নিজেই তো আমায় বলতে পারতিস। আমি আপত্তি করব, এই ধারণাটা তোর হল কী করে?”

”আমার অনেক অপরাধ জমা আছে।” বালিশে মুখ চেপে শিবা বলল।

”কী অপরাধ?”

”তোমাদের ফেলে আমি চলে গেছলুম সোনার বকলেস পরতে।”

নিতুর হাত শিবার গলায় ঠেকল। শান্ত গলায় নিতু বলল, ”বকলেসটা নেই, কোনও দাগও নেই।…তোকে ট্রেনিং ছাড়া আর কিছু ভাবতে হবে না। দরকার হলে আমি লোক রেখে দোকান চালাব।”

শিবার মনে হচ্ছে একটা ভারী পাথর তার বুক থেকে নেমে যাচ্ছে। হালকা হওয়ার আনন্দে তার চোখ থেকে জল গড়াল।

.

হলধর বর্ধন বক্সিং টুর্নামেন্ট শুরুর আগের রাতে শিবা ঘুমোতে পারল না। বিকট একটা স্বপ্নের মতো, চার বছর পেরিয়ে অতীত থেকে একটা চিৎকার আসছে। সেটা আবার ভারী পাথরটা তার বুকে তুলে দিচ্ছে। সেই রাতের প্রতিটি কথা, ঘটনা তার স্পষ্ট মনে আছে। এতদিন ভুলে থেকেছে কিন্তু এখন সেগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই।

ঠিক চার বছর আগে এই হলধর টুর্নামেন্টেই, হেভি ব্যাগ ফাটানোর ভীতিকর খ্যাতি নিয়ে রিং—এ নেমে সে জীবনের প্রথম লড়াই হেরে গেছল, ই সি পি সি—র সুনীল বেরার কাছে, পয়েন্টে।

ইস্ট ক্যালকাটা ফিজিক্যাল কালচারের ছেলেরা লড়াইয়ের ফল ঘোষণার পর শিবার উদ্দেশে চিৎকার করছিল, ‘বলো হরি হরি বোল…বলো হরি হরিবোল।’ আর শিবা ভিড়ের মধ্যে ঢুকে মিশে যেতে—যেতে ভেবেছিল এখন এখান থেকে পালাতে হবে।

প্রায় পালিয়েই শিবা ফিরে এসেছিল দুর্লভ চক্রবর্তীর গ্যারাজে। তখন সে গ্যারাজেই বাস করত। একটা মোটরের চালে চিত হয়ে শুয়ে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বক্সিং আর চলবে না।

ননী তখনই গ্যারাজে ঢুকেছিল। শিবা তাকে বলেছিল বক্সিং ছেড়ে দেবে।

”সেই ভাল। ফাইট করা তর দ্বারা অইব না। ফাইটার অইন্য ধাতুতে গড়া হয়।”

”কী ধাতু?”

”কী ধাতু তা অবইশ্য জানি না, তয় ঘটিবাটি থালা গেলাসের ধাতু নয়। এডা হইত্যাছে মনের ধাতু। কোচিংঘরে স্বামিজির ছবিটা দ্যাখছস? চোক্ষু দিয়া যেন আগুন বাইরয়।”

শোনামাত্র শিবার কানে বেজেছিল, ”নুইব না, আমি নুইব না।”

এর পর মোটরের চাল থেকে লাফ দিয়ে নেমে সে অন্ধকার গ্যারাজের কোণ থেকে বালিভর্তি চটের বস্তাটা, যেটাকে হেভিব্যাগ বানিয়ে সে প্র্যাকটিস করে, টেনে আনে। বস্তার মুখ বাঁধা দড়িটা, মোটরের এঞ্জিন তোলার কপিকলে লাগিয়ে টান দিয়ে সেটা জমি থেকে তুলল। কপিকলের লোহার চেনটা বাঁশের সঙ্গে জড়িয়ে দিল।

”আয় ননী, হেলপ কর। বস্তাটা দুলিয়ে ছুড়ে দে আমার দিকে।”

ননী বস্তাটাকে দু’ হাতে দোলাতে লাগল। সেটা শিবার বুকে, পেটে আঘাত করে ফিরে এলেই ননী আবার ধাক্কা দিয়ে পাঠিয়ে দেয়। মিনিট কয়েক পর শিবা বসে পড়েছিল বুকে হাত দিয়ে। হাঁ করে শ্বাস টানছিল। বস্তার ধাক্কায় কলজে নিংড়ে বাতাস বেরিয়ে গেছে।

”এ কী! এর মদ্যেই টেরনিং হইয়্যা গ্যাল? এতেই তুই ফাইটার হবি? ওঠ ওঠ…” কথাটা বলেই ননী ডান পা দিয়ে শিবার পিঠে লাথি মেরেছিল। ”লজ্জা করে না তর? হাজার লোকের চোক্ষের সাইমনে মাইর খাইয়া আলি, লজ্জা করে না?” আবার সে লাথি কষাল।

প্রথমটিতে শিবা চমকে উঠে শুধু তাকিয়ে থেকেছিল অবাক হয়ে। অন্ধকারে ননীর মুখটা দেখা যাচ্ছিল না। ননী যে এমন দুঃসাহসিক কাণ্ড করতে পারে, এটা সে বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না। দ্বিতীয় লাথিতে সে রাগে লাফিয়ে উঠে ননীর চুল ধরে ঝাঁকাতে থাকে।

”তোর সাহস তো বড় কম নয়? পা—টা যদি এবার ভেঙে দি!”

”গায়ে জোর আছে, তা ভাঙতে পারস, কিন্তু আইজকার লজ্জাটা কি তাতে ভাঙব?”

তখন শিবার মনে হয়েছিল, সে যেন সাধু, আর ননী যেন ভবানী—সার। সাধুর মতোই তার মুখ দিয়ে কথাগুলো বেরিয়ে এসেছে—পা—টা যদি এবার ভেঙে দি!

”কাল অনেকেই জিগাইব, শিবা জিতছে তো?”

”মানুষমাত্রেই হারে। আমিও হেরেছি।”

এখন এই মধ্যরাত্রে চিত হয়ে জেগে থাকা শিবা দুঃস্বপ্ন থেকে নিজেকে ফিরিয়ে আনতে গোমস—সারের সেদিনের কথাগুলোর প্রতিটি শব্দ স্মরণ করতে লাগল— ”জীবনের প্রথম ফাইট তুমি হেরেছ। ঠিক আছে। হার কাকে বলে না জানলে জিত কাকে বলে জানা যায় না। এটাই শিক্ষা, এটাই এডুকেশন। শিক্ষা নিতে পারলে বড় হবে।”

”শিবা এই কথাটা জেনে রাখ, চ্যাম্পিয়ান জিম—এ তৈরি হয় না, তৈরি হয় তাদের ভেতরের, একেবারে ভেতরের জিনিস থেকে। সেটা হল ইচ্ছা, একটা খোয়াব। মনের মধ্যে এটা না থাকলে কেউ বড় হয়ে উঠতে পারবে না।…আর চাই মনের জোর, ‘উইল’। স্কিলের থেকেও স্ট্রং হতে হবে ইচ্ছা, যাকে বলে উইল। তুমি দেখবে, অনেকে হারে তার থেকেও কমতি—স্কিলের অপোনেন্টের কাছে। কেন? মনের জোরের, উইলের কমতি থাকে বলে?”

”তুমি প্রথমেই একটা ঘুসি খেয়ে মাথা গরম করে ফেলেছিলে। তাতে তোমার বুদ্ধি গুলিয়ে গেছল। মাথার মধ্যে গোলমাল হতেই তোমার বুদ্ধি খারাপ পথে চলে গেল। তখন তুমি শর্টকাটে, নক আউট করে লড়াই জেতার কথা ভেবেছিলে। কিন্তু তুমি অপোনেন্টকে মেপে নাওনি, জানতে চেষ্টা করোনি তার ক্ষমতা কত, তার গলদ কোথায়। ফাইটারস আর ডিসকভারারস, তারা খুঁজে বার করে। তারা নিজেদেরও তখন ডিসকভার করে, নিজেদের ভালমন্দও তখন জানতে পারে।…একটা কথা মনে রেখো, রিং—এর মধ্যে কীভাবে ফাইট করবে এটা বাইরে থেকে তোমার ট্রেনার বলে দিতে পারে না। তোমাকে নিজে সেটা ঠিক করে নিতে হবে। এজন্য তোমার বুদ্ধি, মন তৈরি করতে হবে।…সবার আগে চাই জেতার ইচ্ছা, ডিজায়ার।”

এক মাস পর স্টেট চ্যাম্পিয়ানশিপে প্রথম রাউন্ডেই শিবা নক আউট করেছিল সুনীল বেরাকে। রিং থেকে নেমে এসে বলেছিল, ”সার, আমার ভেতরে ইচ্ছেটা হয়েছে কি?”

.

”হ্যাঁ সার, আবার আমার জেতার ইচ্ছে হয়েছে বলেই আমি ফিরে আসতে চাইছি।” —শিবা নিজেকে কথাটা বলে অনেক হালকা হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন সে ফিরে—আসার প্রথম লড়াইটা পয়েন্টে জিতল। সাধারণ, মামুলি লড়াই। সারের চার বছর আগের কথাগুলো মাথায় রেখে সে লড়েছিল। বোম্বাইয়ে ন্যাশানালসের সাড়ে তিন বছর পর এই প্রথম রিংয়ে ওঠা। ভয় করেনি, কিন্তু অনিশ্চিত একটা বোধ তাকে আড়ষ্ট করে রেখেছিল। লড়তে হবে গোল্ডেন গ্লাভসের শওকত হক নামে একজনের সঙ্গে। অনেক বক্সারই প্রতিপক্ষ সম্পর্কে আগাম খোঁজখবর নিয়ে থাকে, গোমস—সার বলে দিয়েছিলেন, ”এসবের দরকার নেই। এটা একটা মাইনর টুর্নামেন্ট, ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ানশিপ নয়।”

”ড্রেসিংরুমেই সে হককে প্রথম দেখে। প্রথম তাকিয়েই শিবার মনে হয়েছিল, হক ভয় পেয়েছে। হয়তো শুনেছে শিবাজি আইচ নক আউটের মাস্টার, পাঞ্চের জোর দারুণ। হক দেওয়ালের দিকে মুখ করে বসে। শিবা স্বস্তি বোধ করল। সুনীল বেরার সঙ্গে লড়ার আগে সে—ও এইভাবে বসে ছিল। হক নিশ্চয় তাকে নক আউটের চেষ্টা করবে।

রিংয়ে ওঠার আগে গোমস—সার তার সঙ্গে একটা কথাও বলেনি। কোনও উপদেশও দেয়নি। ক্লাবেরই প্রাক্তন বক্সার অনিমেষ তার সেকেন্ডস। সাহায্য করেছে কোমরে লাল রিবন আর গ্লাভস পরিয়ে লেস বেঁধে দিয়ে, মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে মাউথপিস। শিবার কর্নারে তোয়ালে, জলের বোতল আর বসার টুল নিয়ে অনিমেষ, তার পাশে গোমস। রিংয়ে উঠে মাসল আলগা করার জন্য হালকাভাবে লাফাতে—লাফাতে শিবা বাঁশের গ্যালারির দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় সাধুকে, তার পাশে দেবু।

চোখাচোখি হতেই সাধু শূন্যে ডান হাতে—বাঁ হাতে দুটো ক্রস চালিয়ে, মাথাটা কাত করে চোখ বুজিয়ে জিভ বার করল। শিবা বুঝল, সাধু কী বলতে চায়—নক আউট কর। সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

রিংয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে রেফারি হাত নেড়ে দু’জনকে ডাকতেই হক এগিয়ে এসেছিল দম—দেওয়া পুতুলের মতো যান্ত্রিকভাবে। কোমরে সবুজ রিবন। শিবা ওর চোখ দেখে আন্দাজ করল, কীভাবে লড়বে হক সেটা ঠিক করেই রেখেছে, নড়চড় হবে না তার কৌশলের।

”তোমরা দু’জনেই নিশ্চয় রুলস জানো।” রেফারি তাদের প্রথামাফিক বক্তৃতাটা দিয়েছিল। ”যখন বলব ব্রেক, দু’জনেই তখন এক পা পিছিয়ে যাবে, তার মধ্যে ঘুসি চালাবে না। পিছিয়ে গিয়ে তারপর আবার বক্স করবে।… নো হিটিং বিলো দ্য বেল্ট। কিডনি পাঞ্চ…কোমরের পেছন দিকে কিংবা র‌্যাবিট পাঞ্চ…ঘাড়ের পেছনে, একদম করবে না। যখন স্টপ বলব থেমে যাবে, যখন বক্স বলব লড়াই শুরু করবে। পরিচ্ছন্নভাবে লড়বে…গুড, ক্লিন স্পোর্টসম্যান ফাইট।”

হকের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। ও কি ভাবছে, শিবা তা জানে। সেও প্রথমবার ভেবে রেখেছিল—মেরে শুইয়ে ফেলব। টাইমকিপারের ঘণ্টা বাজল। রেফারি দু’হাত নেড়ে রিংয়ের মাঝে দু’জনকে আসতে বলল।

”বক্স।”

হক গ্লাভসজোড়া মুখের সামনে রেখে তেড়ে এল। শিবা প্রথম জ্যাবটা থেকে মুখ পাশে সরিয়ে নিয়ে এক পা পিছিয়ে এসেই জ্যাব করল হকের কপালে।

শিবা ঘুরছে হককে ঘিরে। সারের কথাটা মনে রেখে, ”ডান্স, ডান্স, ডান্স…ঘুরে—ঘুরে নাচো। ও এগিয়ে আসবে তোমাকে রোপ—এ নিয়ে কর্নার করতে। তুমি জ্যাব করেই সরে সাও। লোকে বলবে প্যালাচ্ছে, তাতে কান দিয়ো না।…তুমি পয়েন্ট তুলে নাও…ওকে টায়ার্ড করে দাও ঘুষি মারতে দিয়ে। এক একটা পাঞ্চ—এ দম বেরিয়ে যাবে।…ভেতরে এসে কম্বিনেশন চালিয়েই আবার সরে যাও।”

শিবা তাই করল প্রথম রাউন্ডে। নিজের কর্নারে টুলে বসে হক হাঁফাচ্ছে, বুক ওঠানামা করছে হাপরের মতো। গ্যালারিতে সাধু আর দেবু একই সঙ্গে লেফট—রাইট ক্রস চালিয়ে জানাচ্ছে—নক আউট কর। গোমস—সার তার দিকে তাকাচ্ছে না, কথা বলছে আশ্চয্যদার সঙ্গে। ননীকে সে আসতে বারণ করেছে, তাই আসেনি। আত্মীয়—বন্ধু কারও মুখই সে এখানে দেখতে চায়নি। অন্তত প্রথম দিনে নয়।

টুল নিয়ে অনিমেষ দড়ির ফাঁক দিয়ে গলে রিংয়ে ঢুকেছে। শিবা টুলে বসতেই সে হাঁটু ভেঙে চেয়ারের মতো হয়ে ওর দুটো পা নিজের ঊরুর ওপর তুলে নিল। চার বছর আগে শিবা লজ্জায় পা নামিয়ে নিয়েছিল। অনিমেষ ধমকে উঠে বলেছিল, ”রাখ।” কিন্তু এখন সে পা দুটো রেখেই দিল। মুখে জল ছিটিয়ে তোয়ালে দিয়ে শিবার হাত—মুখ মুছিয়ে দিতে—দিতে অনিমেষ বলল, ”ভাল লড়ছিস। এবার একটু কাছে যা, ইন ফাইটিংয়ে আর…জ্যাব করার সময় ওর ব্যালান্স থাকছে না।”

”দেখেছি। নক আউট করে দিতে পারতুম।”

”করলি না কেন?”

শিবা হাসল শুধু। দরকার কী, এটা তো একটা মাইনর টুর্নামেন্ট! সাড়া জাগিয়ে ফিরে আসার থেকে নিঃশব্দে এগনোই ভাল।

ঘণ্টা বাজল। এক মিনিটের ইন্টারভ্যাল শেষ।

”নক আউট শিবা, নক আউট, নক আউট।” গ্যালারি থেকে দেবু বিকট স্বরে চিৎকার করে তাকে তাতিয়ে তুলতে চাইছে। শিবা ফিরেও তাকাল না। ‘নক আউট শিবা’ ইমেজটা সাধুর দরকার তাকে নিয়ে ব্যবসার বা বোটিং করার জন্য। চেঁচাক ওরা, চেঁচাক।

দ্বিতীয় রাউন্ডে হক একটামাত্র জবর পাঞ্চ শিবার পাঁজরে বসাতে পারল। বিনিময়ে তাকে বহু পয়েন্ট দিতে হল। তাকে পাক দিয়ে শিবার ঘুরে—ঘুরে দূরে যাওয়া ও কাছে আসা, আচমকা লেফট—রাইট কম্বিনেশন হককে শুধু দিশেহারাই নয়, ভয়ও পাইয়ে দিল। সে এই ধরনের স্ট্র্যাটেজির সামনে কখনও পড়েনি। এমন বিদ্যুৎ—গতির নড়াচড়াও সে কখনও দেখেনি।

তৃতীয় রাউন্ডে পুনরাবৃত্তি হল প্রথম দুটির। তবে তার একটা রাইট ক্রস হককে ক্যানভাসে ফেলে দেয়। রেফারি আট পর্যন্ত গুনতেই সে উঠে দাঁড়ায়। শিবা তখন হাঁফ ছেড়ে স্বস্তি বোধ করেছিল। বাকি সময়টুকু হক পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। ঘটনা বলতে শুধু এইটুকুই । দ্বিতীয় রাউন্ডেই শিবা বুঝে গিয়েছিল সে লড়াইটা জিতেই গেছে। হক এমন কেউ নয় যে, তার কাছে জিতে নাচানাচি করতে হবে।

রেফারি তার হাতটা তুলে বিজয়ী ঘোষণা করার এবং হককে জড়িয়ে ধরে তাকে সাবাশ জানাবার পর শিবা রিং থেকে নেমে এসে উদ্ভাসিত মুখে ফ্র্যাঙ্ক গোমসের সামনে দাঁড়ায়।

”সার, কিছু কি বলবেন?”

”নিশ্চয় বলব। কাল সাড়ে ছ’টায় তোমার নেক্সট বাউট সাম টি. মিত্রার সঙ্গে। এখন সোজা ঘর যাও, অ্যান্ড রিল্যাকস। কাল মর্নিং—এ রোড রানিং নয়, ওনালি ফ্রি হ্যান্ডস অ্যান্ড রেস্ট।…গুড নাইট।”

লালবাগান জিম থেকে বেরিয়ে বাসস্টপের দিকে যাওয়ার সময় শিবা দেখল স্কুটারে বসে রয়েছে দেবু এবং সাধু। হাতছানি দিয়ে সাধু ডাকল।

”তুই তো আমাকে ডোবাবি। এটা কি একটা লড়াই হল। তোর কাছ থেকে এমন মিনমিনে ব্যাপার আমি আশা করিনি।”

”কী আশা করেছিলেন?” শিবা ‘ছিলে’ বলতে গিয়ে ‘ছিলেন’ বলল। সাধু বয়সে বড় এবং নিজের এলাকায় মান্যগণ্যও বটে।

”নক আউট, নক আউট! আবার কি?” সাধু চেঁচিয়ে উঠল।

”জেতাটাই আমার লক্ষ্য, যেভাবেই হোক।” শান্ত গলা শিবার।

”শিবা ঠিকই বলেছে।” পিলিয়নে বসা দেবু বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ল। ”স্টেপ বাই স্টেপ ফর্মে ফিরতে হয়। এক লাফে মগডালে ওঠা যায় না।”

”তা হলে ন্যাশনালসের ফাইনালে তুই ফার্স্ট রাউন্ডেই নক আউট করবি?…বল করবি?” সাধু ব্যাকুলতা আর অনুরোধের মাঝামাঝি একটা স্বরে বলল। হঠাৎ ঝুঁকে ফিসফিস করল। ”বাজি ধরব…জিতলে তোর টেন পারসেন্ট, অনেক টাকা!”

কয়েক সেকেন্ড সাধুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে শিবা হাঁটতে শুরু করল। বাসস্টপ ছাড়িয়েও সে হেঁটে চলল। পাশ দিয়ে স্কুটারটা চলে যাওয়ার সময় দেবু বলে গেল, ”মনে রাখিস, টেন পারসেন্ট।”

দেবদাস পাঠক রোডের মোডের স্ট্যান্ডে তিনটি রিকশা দাঁড়িয়ে। তৃতীয়ে ননী। শিবাকে দেখে সে বলল, ”আয়, বয়, পৌঁছায়ে দিমু।”

শিবা রিকশায় উঠল। ননী প্যাডেল শুরু করে বলল, ”টায়ার্ড?”

”হ্যাঁ।”

ননী পকেট থেকে একটা পেয়ারা বার করে হাতটা পেছনে বাড়িয়ে বলল, ”ধর।”

পেয়ারাটা নিয়ে শিবা বলল, ”কোথায় পেলি?”

”এক প্যাসেঞ্জার রিসকা থাইক্যা লামবার সময় থলিডা একবার ধইরতে দিচিল। পিয়ারায় খুব ভিটামিন….কাল তর লড়াই আছে না?”

”হুঁ।”

ভবানী—সারের কোচিংঘরের দরজা বন্ধ। রিকশা থামিয়ে শিবা নামল। জানলায় উঁকি দিয়ে দেখল ভবানী—সার হুমড়ি দিয়ে বসে একটা খাতায় অঙ্ক কষছেন। শিবা কথা বলে ব্যাঘাত করল না। তবে দেওয়ালে একটা নতুন লেখা চোখে পড়ল। কিছুই বুঝতে পারল না, যেহেতু সেটা ইংরেজিতে।

”সারের কোচিংয়ে আবার নাকি ভিড় হচ্ছে?” শিবা জানতে চাইল।

”হ। দশ—পনেরোজনরে ফিরাইয়া দ্যাছেন। মুখুজ্যেবাড়ির রঞ্জু আমারে ধরচিল তার ভাইপোডারে সারের কোচিংয়ে ভর্তি করাইবার জইন্য। গিয়া কইলাম সাররে। এক কথায় লইয়া লইলেন।”

”তুই বলতেই সার নিয়ে নিলেন!”

”ক্যান, রিসকা চালাই বইল্যা কি আমার মানসম্মান কম নাহি? সার রোজ আমারে ডাইক্যা তর কথা জিগায়, খবর লয়। তা আমি যদি এহন একডা রিকোয়েস্ট ওনারে করি, রাইখবেন না? রঞ্জুর দাদা কাঠের ফারনিচার কাইরখানা কইরতাচে ওনাদের বাগানের জমিতে, সেজ ভাইডারে ওহানে ফিট কইরা দিবার কতা ভাইবত্যাচি।”

ননী কিন্তু সারাক্ষণে একবারও জিজ্ঞেস করল না, আজকের লড়াইয়ের ফল কী হল!

পরদিন শিবা কাঁকুড়গাছি ব্যায়াম সমিতির তুষার মিত্রকে নিয়ে তিন রাউন্ড ছেলেখেলা করল। ছেলেটি মাসতিনেক হল বক্সিং শুরু করেছে। বহু পয়েন্টের ব্যবধানে শিবা জিতল। তার পরের দিন ফাইনালে শিবা যাকে পেল, রাস্তায় মারামারি করায় তার নাম হয়েছে, একটা ‘হবু সাধু’, ই সি পি সি এ—র গৌতম নাগ। প্রথম রাউন্ডে নকআউটে জিতেছে। ওর লড়াইয়ের কায়দাটা হল, বুনো শুয়োরের মতো ঘোঁত—ঘোঁত করে তেড়ে যাওয়া, রাইট সুইং আর লেফট সুইং, বাটারফ্লাই সাঁতার কাটার মতো দু’হাতে দু’ পাশ দিয়ে ঘুসি চালায়, তবে পাঞ্চে জোর আছে। নড়াচড়ায় অত্যন্ত মন্থর।

বিদ্যুৎ—গতিতে সরে—সরে শিবা জ্যাব করে গেল বাঁ হাতে। এত দ্রুত সে ঘুরছিল যে, গৌতম বুঝে উঠতে পারছিল না কোনদিক থেকে লেফট হুক আর জ্যাবগুলো তার দিকে আসবে, মাথায় লাগবে রাইট ক্রস। অন্তত ছ’বার শিবা নিখুঁতভাবে নকআউট পাঞ্চ বসাতে গৌতমের চোয়াল পেয়েছিল। বসায়নি। শিবা বক্সিং লড়াই সম্পর্কে চমৎকার একটা শিক্ষা দিয়ে গৌতমকে বুঝিয়ে দিল রাস্তার মাস্তানি আর রিংয়ের মাস্তানি এক জিনিস নয়। ঘাম, রক্ত, পরিশ্রম, বুদ্ধি আর শৃঙ্খলাপরায়ণতা—এতগুলো জিনিস এবং সবার ওপরে ট্যালেন্ট, চ্যাম্পিয়ান হয়ে ওঠার জন্য দরকার হয়।

রিং থেকে নেমে আসতেই গোমস তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ”কেমন লাগছে? খুশি?”

শিবা মাথাটা দু’পাশে নাড়িয়ে বলেছিল, ”বেঙ্গল বক্সিংয়ের খুবই শোচনীয় দশা সার। বেড়াল আর নেংটি ইঁদুরের সঙ্গে খেলে কি খুশি হওয়া যায়!”

”টাইগার আর লায়ন এ—দেশে কোথায় পাবে, ইন্ডিয়ান বক্সিংয়েই নেই! তবে ন্যাশনালসে ডোবারমান কি আলসেশিয়ান তুমি পাবে।…রেডি থেকো।”

।। ১১।।

জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে হবে ন্যাশনাল বক্সিং চ্যাম্পিয়ানশিপস।

বাংলা দলে শিবা মিডলওয়েটে নির্বাচিত। আশ্চর্য ঘটক বলেছিল, ট্রেনিং করতে—করতে শরীর ঝরবে। বাহাত্তর কেজি—র শরীরটা একাত্তর কিলোগ্রামের নীচে নেমে এসে তাকে ওয়েল্টার করে দেবে। কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক গোমস সেটা হতে দেয়নি। বরং গত এক মাসে বাহাত্তরকে নিয়ে গেলেন সাড়ে চুয়াত্তরে, অর্থাৎ মিডল বিভাগে।

পুষ্টিকর খাদ্য, ট্রেনিং আর বিশ্রাম ওজন বাড়াতে সাহায্য করেছে শিবাকে। দু—তিনজন অবশ্য আপত্তি জানিয়ে বলেছিল, কম ওজন বিভাগে শিবাকে নামালে ফল ভাল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। গোমস বলেছিল, ন্যাচারাল গ্রোথ যা হওয়ার হোক। তাকে জোর করে বন্ধ করলে শরীর উইক হয়ে পড়বে।

শিবা আবার লড়তে নামবে, এ—কথা পূর্বপল্লীর সবাই জেনে গেছে। কাজটা শারীরিক এবং পরিশ্রমের, সুতরাং তার শরীরের যত্ন নেওয়া দরকার, এই ধারণাটাই তাদের ব্যস্ত করে তুলল। যে যেমন পারে খাদ্যদ্রব্য পাঠিয়ে দেয়; যার অধিকাংশই কোনও খেলোয়াড়ের খাওয়া উচিত নয়। শিবা সে—সবই ফিরিয়ে দিয়ে জানিয়েছিল, যদি চাম্পিয়ান হতে পারি তা হলে সবার ঘরে একদিন করে গিয়ে খেয়ে আসব।

বিশেষ উৎসাহ শক্তি দাসের, রোজই একবার খোঁজ নিয়ে যায় শিবার। সুযোগ পেলেই চেনা পরিচিতদের সে জানিয়ে দেয়, ”শিবা তো আর বক্সিং করবে না বলেই প্রতিজ্ঞা করেছিল। রোজ ওর পেছনে লেগে—লেগে তবেই না চাগিয়ে তুললাম ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ান হওয়ার সাধটা।”

শচীনকাকু আবার দিয়ে যাচ্ছে সেদ্ধ ডিম। বটকেষ্টর দোকানের যাবতীয় রান্না সে করে চলেছে গত কুড়ি বছর ধরে। শিবা যখন চার বছর আগে লালবাগানে যাতায়াত শুরু করে বক্সার হওয়ার জন্য, তখন শচীন তাকে রোজ দু’বেলা দুটো সেদ্ধ ডিম দিত, অবশ্যই বটকেষ্টর অগোচরে। ডিম দেওয়া সে বন্ধ করেছিল শিবা যখন গোরাবাবুর বাড়িতে গিয়ে ওঠে। সাধুদের হাতে প্রবল মার খেয়ে শিবা হাসপাতালে যখন অর্ধমৃত অবস্থায়, অন্যদের সঙ্গে তাকে দেখতে গিয়ে শচীন একটা সেদ্ধ ডিম সঙ্গে নিয়ে গেছল। সাগরমামি তাকে ধমকে বলেছিল, ”খাবে কী, চিবিয়ে কিছু খাবার ক্ষমতা কী ওর আছে?” শচীন এখন আবার শিবাকে সেদ্ধ ডিম দিতে শুরু করেছে, গায়ে জোর বাড়াবার জন্য।

লালবাগান জিম—এ শিবা চার থেকে ছ’ ঘণ্টা ট্রেনিং করে। গোমস—সার সারাক্ষণই তার সঙ্গে। একটা মিনিটও তারা নষ্ট করে না। একদিন মিতা আর তার দিদি এসেছিল। তারা হলঘরের মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছিল, আশ্চর্য ঘটক তাদের আটকায়। ”এখানে মেয়েদের ঢোকা বারণ।…. আপনারা কাকে চান?” শিবার সঙ্গে দেখা করতে চায় শুনে আশ্চর্য ঘটক মাথা নেড়ে বলেছিল, ”দেখা হবে না। ওর ট্রেনারের কড়া হুকুম, ট্রেনিং চলার সময় কোনওরকম ডিস্ট্র্যাকশন যেন না হয়। আপনারা রাত আটটার পর আসবেন।” দুটি মেয়ে দেখা করতে এসেছিল—এই খবর, বলা বাহুল্য, শিবার কানে আর পৌঁছয়নি।

অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে কান্তি প্রায়ই সন্ধ্যায় এসে আশ্চর্য ঘটক এবং অন্যান্যদের সঙ্গে কথা বলে আর লক্ষ করে শিবার ট্রেনিং। ওয়েলেসলির পুরনো ফার্নিচারের দোকানের কাজ সেরে ফ্র্যাঙ্ক গোমস জিম—এ আসে সন্ধ্যার পর। সে আবার সঙ্গে—সঙ্গেই কান্তি জিম থেকে বেরিয়ে পড়ে।

একদিন হেভি ব্যাগে শিবার ঘুসিমারা দেখতে—দেখতে কান্তি বলল, ”জীবনের প্রথম ঘুসিটা তুই আমার কাছে খেয়েছিলি, এই জায়গাতেই, মনে আছে?”

খুব ভালভাবেই শিবার মনে আছে। কিন্তু সে কান্তির কথায় কান না দিয়ে পাঞ্চ করে যেতে লাগল।

”এখন ভাবলে হাসি পায়। সেদিন তুই যদি পালটা একটা ঝাড়তিস তা হলে ভাঙা চোয়াল নিয়ে আমাকে জীবন কাটাতে হত।”

শিবা ঘুসি চালানো বন্ধ করল। ”কান্তিদা, আপনার চোয়াল জোড়া লেগে যেত, সাধুর তো জোড়া লেগে গেছে!”

”সাধুকে তো আস্তে মেরেছিলি, আমাকে কি আর আস্তে মারতিস?”

”বোধ হয়, না।” কথাটা বলে শিবা হলঘরের দরজার দিকে এগোল, বাইরে খোলা বাতাসে জিরিয়ে নেওয়ার জন্য।

এই দরজা দিয়ে হলঘরে প্রথমদিন ঢুকে সে কান্তির সামনেই পড়েছিল। ”কী রে, তোকে আগে কখনও তো দেখিনি?”

”আমাকে আসতে বলেছিল।”

”কে, গোমস নিশ্চয়?”

শিবা মাথা কাত করে।

”কখনও লড়েছিস?”

”না।”

”ঘুসি মেরেছিস কখনও?”

”না।”

”বক্সিং শিখতে এসেছিস, তাই তো?”

”হ্যাঁ।”

”শিখতে গেলে প্রথমেই কী করে ঘুসি হজম করতে হয় তার ট্রেনিং নিতে হয়।” কান্তি দু’ হাতে গ্লাভস পরে হাত দুটো শিবার মুখের কাছে ধরে বলেছিল, ”কী বল তো?”

”ঘুসি।”

”বাহ, তুই তো জানিস দেখছি। এটা এবার তোকে হজম করতে হবে।”

বলার সঙ্গে—সঙ্গেই শিবার ডান পাঁজরে সে ঘুসি মারল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার চোখের সামনে যাবতীয় বস্তু কালো হয়ে যায়। শ্বাস নিতে গিয়ে বুকে তীক্ষ্ন যন্ত্রণা বোধ করে। এর পর আবার ঘুসি বাম পাঁজরে। তারপরে দু’ হাতে কান্তি চারটে ঘুসি মারল বুকে আর পেটে। শিবা উবু হয়ে বসে পড়ে বুক চেপে ধরে।

”এবার তুই বাইরে গিয়ে বাঁ দিকে যাবি। ওখানে রিংয়ের পাশে একটা বুড়োকে দেখবি বেঞ্চিতে বসে আছে। নাম আশ্চয্যদা। এখানকার সেক্রেটারি। তাকে গিয়ে বলবি কান্তি সরকার আশীর্বাদ করে দিয়েছে, এবার আমি বক্সিং শিখব।” এই বলে কান্তি খিকখিক করে হেসে যেতে থাকে।

অকারণে মানুষকে আঘাত করে, যন্ত্রণায় কষ্ট পাওয়া মুখ দেখে কেউ যে আনন্দে হেসে উঠতে পারে এমন লোক সাধুর পর শিবা দ্বিতীয়বার দেখল কান্তি সরকারকে।

”আমার ওপর তুই রেগে আছিস জানি।”

শিবা বর্তমানে ফিরে এল কথাগুলো শুনে। কান্তি হলঘর থেকে বেরিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

”কিন্তু তুই বিশ্বাস কর, কমলালেবুতে যে ওষুধ দেওয়া আছে তা আমি জানতাম না। সাধু বলল, শিবাকে দিয়ে বলবি গুড উইশ জানিয়ে গোমস পাঠিয়ে দিয়েছে, লড়াইয়ের আগে যেন খায়। তা হলে এনার্জি দেবে, স্ট্যামিনা দেবে।….খোসা ছাড়িয়ে টিফিনকৌটোয় ভরে আমিই তোকে দিয়ে এসেছি।” কান্তির গলা ধরে এল। শিবার কাঁধে সে হাত রাখল।

”এসব কথা এখন, এত বছর পর কেন?” কান্তির হাতটা রূঢ়ভাবে শিবা কাঁধ থেকে ফেলে দিল।

”তুই আমাকে সারাজীবন ভুল বুঝে থাকবি।…তোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা, সাধনা দেখে আমার বুকের মধ্যে কী যে হচ্ছে। শিবা তুই বড় হয়ে ওঠ, ভগবানের কাছে রোজ প্রার্থনা করি তুই বড় হ, আবার আগের মতো নক আউটের পর নক আউট করে রিং কাঁপিয়ে দে। দূর থেকে আমি দেখব আর চোখের জল মুছব।”

”নক আউট!”

”হ্যাঁ। তোর কাছে এটা খুব সামান্য চাওয়া। ট্রেনিংয়ে তোকে যেরকম দেখছি তাতে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি প্রত্যেকটা লড়াই তুই নক আউটে জিততে পারবি।”

”শিবা ওয়ার্ক আউট কি শেষ হয়ে গেছে?” আশ্চর্য ঘটকের গলা ভেসে এল।

”না, আশ্চয্যদা।” শিবা একটু বেশি ব্যস্ত হয়ে হল—এ ঢুকে গেল। রাজ্য চ্যাম্পিয়ানশিপটাই ছিল নির্বাচনী ট্রায়াল। হলধর টুর্নামেন্টে যাদের সঙ্গে লড়েছিল, ট্রায়ালে সে তাদেরই পেল; উপরন্তু নতুন একজন, হাওড়ার সমীর সাঁতরাকে। ওর সঙ্গে লড়াইয়ের দ্বিতীয় রাউন্ডে শিবার নতুন একটা অভিজ্ঞতা হয়। সাঁতরার একটা রাইট ক্রস থেকে মুখ সরালেও গ্লাভসটা তার বাম ভ্রূ ঘষে বেরিয়ে যায়। ভ্রূ—র ওপরের চামড়া ফেটে রক্ত চুঁইতে থাকে চোখের ওপর। সে দেখতে পাচ্ছিল না বাঁ চোখে।

একটা চোখে ঝাপসা, অন্যটায় পরিষ্কার দেখা জীবনে এই প্রথম। হয়তো বিস্মিত হয়েই সে পাঁচ—ছ’ সেকেন্ড বিহ্বল হয়ে থমকে গেছল।

”শিবা!”

রিংয়ের বাইরে থেকে ফ্র্যাঙ্ক গোমসের তীক্ষ্ন চিৎকারে তার সংবিৎ ফিরে আসে। অস্বস্তিকর একচোখো দৃষ্টি নিয়ে সে সাঁতরার ঘুসির এলাকার বাইরে চক্রাকারে ঘুরতে শুরু করে। সাঁতরা যতই এগোয়, ততই সে সরে—সরে যায়। রাউন্ড—শেষের ঘণ্টা না বাজা পর্যন্ত সে বাঁ চোখের পাতা বন্ধ করে রাখে। ডাক্তার রক্ত পড়া বন্ধ করে স্টিকিং প্লাস্টার লাগিয়ে দেন। তৃতীয় রাউন্ডে শিবা পরিষ্কার চোখে সাঁতরাকে মারতে শুরুকরে। তবে মনের মধ্যে একটা খচখচানি শুরু হওয়ায় মুখটা বাঁ দিকে সামান্য ঘুরিয়ে রেখেছিল যাতে কাটা জায়গাটায় আঘাত না লাগে।

শিবা পয়েন্টেই জিতেছিল। ড্রেসিংরুমে যখন সে চুল আঁচড়াচ্ছে, কান্তি তখন তার পাশে এসে দাঁড়াল।

”চোখ নিয়ে তোর খুব অসুবিধে হচ্ছিল।”

”কে বলল হচ্ছিল!”

হাসি খেলে গেল কান্তির চোখে। আমিও একটু—আধটু বক্সিং করেছি যে, চোখে কিছু পড়লে তখন কী হয় আমি জানি। ইনজুরিটা তাড়াতাড়ি সারা, আর তো মাত্র হপ্তাতিনেক সময় আছে।”

কান্তি সরে গেল গোমসকে আসতে দেখে।

”ঘর যাবে তো, চলো।” গোমস কথাটা বলে ভ্রূ তুলল। ”কান্তি তোমায় কী বলছিল?”

”চোখ নিয়ে…।”

”শিবা।” গম্ভীর হয়ে গেল গোমস। ”আজ যদি একটু ভাল ফাইটারের সামনে পড়তে যার মগজ আছে, যে অপোনেন্টকে কিনলি অবজার্ভ করে, চোখের ওপর থেকে চোখ সরায় না, হু ইজ অ্যান অপারচুনিস্ট, সামান্য দু’ সেকেন্ডের সুযোগকেই যে কাজে লাগায় এমন কেউ আজ থাকলে তোমায় নক আউট করে দিত। ইউ আর ভেরি—ভেরি লাকি।”

শুনতে—শুনতে ফ্যাকাসে হয়ে গেছল শিবার মুখ। ক্ষীণ স্বরে বলল, ”কখন করত?”

”ফোর—ফাইভ সেকেন্ডস তুমি নিজেকে আনগার্ডেড রেখেছিলে। ইনাফ টাইম টু নক ইউ আউট; ইনাফ, ইনাফ…রিমেম্বার হোয়েন আই শাউটেড? রিমেম্বার রোজারিও?”

শিবার মনে হল, তাকে অজ্ঞান করে অপারেশন টেবিলে তোলার জন্য ইঞ্জেকশন দেওয়া হল। ফ্যালফ্যাল করে সে গোমসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল অপলকে।

”চলো ট্যাক্সি ধরব, ইনজুরি নিয়ে বাসে ফেরা চলবে না।”

ট্যাক্সিতে শিবা নিজেকে সিটে এগিয়ে দিয়ে চোখ বুজল। সাড়ে তিন বছর…কিন্তু এখনও তার স্পষ্ট সব কথা, সব ঘটনা মনে আছে। সাড়ে তিন বছর আগে বোম্বাইয়ে, ন্যাশনালসের ওয়েল্টার ওয়েট ফাইনাল…রিমেম্বার রোজারিও। হ্যাঁ, সে কখনও ভুলবে না সেই হারের কথা…কিন্তু কেন সে হেরেছিল! নক আউট করেছিল তিনজনকে, ফার্স্ট রাউন্ডেই, ফাইনালে সে ফেভারিট…ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে লোক ভেঙে পড়েছিল নক আউট দেখার জন্য।

শিবা কাতরে উঠল। চিবুক তুলে হাঁ করে ট্যাক্সির চালের দিকে তাকাল। পাশে বসা গোমস আলতোভাবে শিবার কপালে আঙুল ছুঁইয়ে কোমল গলায় বলল, ”পেইন হচ্ছে?”

”হ্যাঁ।”

”পেইন কিলার ক্যাপসুল খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।”

শিবা মনে—মনে বলল, ঠিক হবে না। তাকে সাড়ে তিন বছর আগে ফিরে গিয়ে স্মৃতির মধ্যে ডুব দিতে হবে। প্রতিটি মানুষ, তাদের কথা, চাহনি, চলাফেরা, হাসি, চিৎকার…সব তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে মনের মধ্যে।…রিমেম্বার, রিমেম্বার রোজারিও।

চোখ বন্ধ করল শিবা। তিন বছর আগে বোম্বাইয়ে, মেরিন ড্রাইভ ধরে হাঁটতে—হাঁটতে চৌপট্টিতে…সে আর সুনীল বেরা। মেলার মতো ভিড়। ভেলপুরি, আলু—মটর, আইসক্রিম, পাওভাজি, যা দেখছিল তাই কিনে খাচ্ছিল। বালি আর কাদা মাড়িয়ে সে সাগরের জলের স্বাদ কেমন জানার জন্য আরব সাগরের দিকে যাচ্ছিল। তখন দেখতে পায় সুনীল কথা বলছে রোজারিওর সঙ্গে। ওর পাশে দাঁড়িয়ে ছয়—সাত বছরের একটি ছেলে আর স্কার্ট—ব্লাউজ পরা শ্যামবর্ণা এক মহিলা।

সুনীল তাকে হাতছানি দিয়ে চেঁচিয়ে ডাকল।

তারপর…

।। ১২।।

সে এগিয়ে যেতেই রোজারিও হাত বাড়িয়ে দিল। কুণ্ঠিতভাবে সে হাত মেলাল।

”বেরা ওয়াজ জাস্ট টেলিং মি অ্যাবাউট ইউ। হাম তো রিটায়ার করনেওয়ালা বুঢঢা হ্যায়। বেরাসে শুনা তুমহারা পাঞ্চ বহত জবরদস্ত হ্যায়। তো দেখো বাবা, হামকো জারা আস্তে সে হিট করো! হাম মর যায়গা তো মেরা বিবি—বাচ্চচাকো কউন দেখেগা।” রোজারিও এই বলে হো—হো করে হেসে ওঠে।

লোকটাকে তার ভাল লেগে গেল। সে বলে ফেলল, ”হাম তো আপনার কাছ সে শিখে গা।”

”কেয়া শিখে গা?”

সে ভেবে পাচ্ছিল না এবার কী বলবে! রোজারিওর মুখের হাসিটা আস্তে—আস্তে মিলিয়ে গেল। ধীর শান্ত স্বরে বলল, ”তো শুনো, নেভার শেক হ্যান্ড উইথ অ্যান অপোনেন্ট আনটিল ইউ হ্যাভ হুইপড হিম। জিতনে কা আগে অপোনেন্ট কা সাথ কভি হ্যান্ডশেক না করো।”

”হ্যান্ডশেক আপ তো আভি কিয়া। শিবা তো আপকা অপোনেন্ট হ্যায়।” সুনীল বলল।

”দেখো, হাম অপোনেন্টকো হেট করতা। উই ফাইট, লেকিন ডিপ ইন আওয়ার মাইন্ড উই ডু নট রিয়্যালি হেট। হাম মনমে হেট বানাতা, মনমে অপোনেন্টকো খারাপি দুশমন বানাকে অ্যাটাক করতা।”

তার পাশেই দাঁড়িয়ে রোজারিওর ছেলেটি। একদৃষ্টে বেলুনওলার হাতে ধরা বিশাল—বিশাল বেলুনগুলোর দিকে জুলজুল চোখে তাকিয়ে।

সে ঝুঁকে বলল, ”খোকা, বেলুন নেবে?”

ছেলেটি লজ্জা পেয়ে মায়ের দিকে সরে গেল হাত ধরে ছেলেটিকে সে বেলুনের দিকে টেনে নিয়ে দশ টাকার দুটো বেলুন কিনে ওর হাতে দিতেই খুশিতে ঝকমক করে উঠল ওর মুখ। হাসিতে টোল পড়ল গালে।

”কী নাম তোমার, নাম কেয়া?”

”নীল, নীল রোজারিও।”

নীল! ধক করে উঠল বুকের মধ্যে। ছোট ভাই নিলু, অনেকটা এই বয়সেই মারা গেছে।

”আচ্ছা শিবা, থ্যাঙ্ক ইউ ফর দ্য বেলুনস। হামকো আভি তো কোলাবা যানে পড়ে গা, এক ফ্রেন্ড কা হাউস মে।…ইয়ে মেরা লাস্ট অ্যান্ড ফিফটিনথ ন্যাশনাল। পাপ্পা ক্যায়সা ফাইটার, নীল আপনা আঁখো সে দেখে গা। ইস লিয়েই হাম উনকো বোম্বাই লে আয়া, ইটস নীলস লাস্ট চান্স টু উইটনেস হিজ ফাদার ইন দ্য রিং।”

যাওয়ার সময় নীল বলল, ”থ্যাঙ্ক য়ু আঙ্কল।” যেতে—যেতে মুখ ফেরাল, হাত নাড়ল। সেও হাত নাড়ল।

”ছেলেটা বেশ। আমার এইরকম একটা ভাই ছিল।” তার কথার কোনও জবাব সুনীল দিল না।

”কী বলল বলো তো হ্যান্ডশেক করা নিয়ে?” সে জিজ্ঞেস করেছিল সুনীলকে।

”বলল, অপোনেন্টকে মারার জন্য আমরা মনের মধ্যে একটা ঘৃণা তৈরি করি, আসলে কিন্তু অন্তরে আমরা কাউকে ঘেন্না করি না।”

”মনের মধ্যে ঘেন্না বানিয়ে লড়তে হবে, জিততে হবে। কেন, ওটা ছাড়া এমনই কি জেতা যায় না?”

সুনীল বলেছিল, সে জানে না।

প্রথম লড়াইয়ের আগে ড্রেসিংরুমে কাঁচাপাকা চুল ভরা, মাথা, ঘাড়েগর্দানে, বেঁটে একটা লোক এসে বলল, ”আই আমি বেহরাম মিস্ত্রি।”

প্রিয় হালদারের কাছে নামটা সে শুনেছে। গোরাবাবুর সঙ্গে এই লোকটা আর এক পাঞ্জাবি মিলে নাকি অল ইন্ডিয়া টুর্নামেন্ট করবে। বেহরাম বলল, ”গোরাচাঁদ টেলেক্সমে ভেজা, তুম বহত ফাস্ট অউর হার্ড হিটার বক্সার! তুমহারা পর উইনকা দর আহমেদাবাদ অউর বোম্বাইমে তিন—এক, কানপুরমে পাঁচ—এক। ফার্স রাউন্ড নক আউট করো, এক হাজার রুপৈয়া ইনাম মিলেগা।”

রিং গেমে দু’ মিনিটের মধ্যে দিল্লির অরুণকুমারকে নক আউট করেছিল। স্টেডিয়ামের দর্শকদের উন্মত্ত চিৎকার তার ভাল লাগছিল। ওরা চায়, ঘুসি মেরে একটা লোকের লুটিয়ে পড়া দেখতে। যে দেখাতে পারে তাকে ওরা ভালবাসবে। সে ভালবাসা চায়। গোরাবাবুর আশ্রয়ে নিঃসঙ্গ জীবনটা ভরাবার জন্য এই চিৎকার তার দরকার। বেহরাম হাজার টাকা দিয়েছিল।

পরের লড়াই রেলওয়েজের মার্টিনের সঙ্গে। আবার বেহরাম বলল, ”ফার্স্ট রাউন্ড নক আউট করো…হাজারই মিলেগা।”

ফার্স্ট রাউন্ডেই সে মার্টিনকে ফেলে দিয়ে কানের পরদা ফাটানো চিৎকার শুনেছিল। রিং থেকে নামতেই অনেকে ছুটে আসে পাগলের মতো, তাকে স্পর্শ করার জন্য। বেহরাম হাজার টাকা দিয়েছিল।

সেমিফাইনাল ছিল সার্ভিসেসের শ্যামবাহাদুরের সঙ্গে। ইতস্তত করে, বেহরাম বলেছিল, ”ফার্স্ট রাউন্ড নক আউট হোগা?” দু’বার হয়েছে, তৃতীয়বারও কি তা সম্ভব?

”চেষ্টা করেগা।”

”দো হাজার।”

দু’ হাজার টাকাও সে জিতে নিল। রিং থেকে কারা যেন তাকে কাঁধে তুলে ড্রেসিংরুমে নিয়ে গেছল। তখন যা কিছু দেখছিল, যা কিছু শুনছিল, সবই অবাস্তব, অলীক বলে তার কাছে মনে হচ্ছিল। চায়ের দোকানের শিবা ব্রেবোর্নকে কাঁপিয়ে ”শিবাজি…শিবাজি” চিৎকারে যেন ছত্রপতি শিবাজিরই মর্যাদা পাচ্ছে। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না।

তার ফাইনালে ওঠার খবর পেয়ে কলকাতা থেকে প্লেনে উড়ে এল গোরাবাবু। তাকে হোটেলে ডেকে এনে বলল, ”এই ফাইনালে তোমাকে নিয়ে বেটিং হচ্ছে, হাজার—হাজার টাকার বাজি! আমারও অনেক টাকা এতে রয়েছে। ফার্স্ট রাউন্ড নক আউট, ফোর্থ টাইম…কী মনে হচ্ছে? লড়তে হবে রেলের রোজারিওর সঙ্গে, ওর লড়াই দেখে নিয়েছ?”

”রোজারিও বুড়ো হয়ে গেছে, আমার থেকে অনেক স্লো, পাঞ্চেও জোর নেই, দমও নেই।”

”লোকটা কিন্তু পাঁকাল মাছের মতো পিছল, শেয়ালের মতো ধূর্ত।” গোরাবাবু হুঁশিয়ার গলায় বলল।

”দেখা আছে সব।” সে একটু তেতে উঠল তার সামর্থ্যের ওপর গোরাবাবুর দ্বিধা দেখে। সব জারিজুরি ভেঙে দেবে চোয়ালে একটা লেফট হুক বসিয়ে।”

”বেহরাম আমার পার্টনার হলেও ওকে আমি বিশ্বাস করি না। গোপনে হয়তো ও বাজি ধরবে রোজারিওর ওপর, তাই চাইবে ফেভারিটকে হারিয়ে আপসেট ঘটাতে। তোমাকে কিছু খেতে—টেতে দিলে খাবে না, জলও নয়। নিজে সঙ্গে করে ফ্লাস্কে জল নিয়ে যাবে। মনে রেখো, অনেক টাকা ধরেছি তোমার ওপর …ফার্স্ট রাউন্ড।”

কিন্তু সে জানত না রোজারিওর বউ ও ছেলে রিংয়ের ধারে বসবে। ছেলে একবার অন্তত বাবাকে লড়তে দেখুক, এটাই রোজারিওর ইচ্ছে। রিংয়ে উঠেই তার চোখে পড়ল নীল, তার দিকে তাকিয়ে। বড়—বড় দুটি চোখে বিস্ময়, সারল্য, কৌতূহল। চোখাচোখি হতেই নীল হাত নাড়ল। সে পারল না। হাত তুলতে গিয়ে মনে হল বগলটা জং—ধরা কবজার মতো।

তখন সে ভেবেছিল, হেট দরকার, হেট। রোজারিওকে ঘেন্না। নয়তো সে লড়তে পারবে না। মনের ভেতর একটা গনগনে আক্রোশ এখন চাই। এই জং—ধরা কবজাটায় ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করছে, এটাকে হেট দিয়ে ঘষে—ঘষে সচল করে তুলতে হবে।

কিন্তু রোজারিওকে খারাপ মানুষ ভাবার মতো ওর সম্পর্কে তো কিছুই সে জানে না। যতটুকু ওকে দেখেছে, বেশ ভালই লেগেছে। হাসিখুশি, ভদ্র, আমুদে। রিংয়ে শ্যাডো করতে—করতে নজর আবার নীলের ওপর গিয়ে পড়ল। তখন সে নিজের ওপর রেগে উঠে ভাবল, কেন ওকে নীলু মনে হল! কেন ওকে বেলুন কিনে দিতে গেলুম!

রোজারিও রিংয়ে উঠতেই নীল দাঁড়িয়ে উঠল। এগিয়ে এল রিংয়ের ধারে। উবু হয়ে বসে রোজারিও রোপ—এর ফাঁক দিয়ে মাথা গলিয়ে নীলের কপালে চুমু দিল। গলা জড়িয়ে নীল বাবার দুই গালে চুমু দিল। দেখতে—দেখতে তার বুকের মধ্যে একটা ধস নামল। একদম নির্জন ফাঁকা হয়ে গেল বুকের মধ্যে। তার কোনও আপনজন এখানে নেই। কলকাতা হলে ননী নিশ্চয়ই থাকত। ননী আর থাকবে না। কেউ তার চারপাশে আর নেই—মা, দাদা, ভবানী—সার, সাগরমামি, শচীনকাকু, আশ্চয্যদা, গোমস—সারও।

প্রথম রাউন্ড শুরুর ঘণ্টা বাজতেই রোজারিওর দিকে সে তেড়ে গেল। কয়েকটা জ্যাব আর স্ট্রেট লেফট দিয়েই তার মনে হল লোকটার ফুটওয়ার্ক অসম্ভব ভাল। শরীর থেকে ঘুসি ঝেড়ে ফেলার কায়দাটা জানে। জানুক। তার বাঁ হাতের চৌহদ্দি থেকে রোজারিওকে বেরোতে দেবে না। ফার্স্ট রাউন্ডে ফেলে দিতে হলে ওকে টেনে আনতে হবে কিংবা এগোতে হবে।

শেয়ালের মতো ধূর্ত! চিন্তার হদিস পেয়ে গেছে নিশ্চয়। দূরে—দূরে ঘুরছে, ইনফাইটিংয়ে একেবারেই আসতে চাইছে না।

সে এগোল। রিংটাকে আড়াআড়ি কেটে এগোতে—এগোতে সে রোজারিওকে কর্নারে যখন নিয়ে যাচ্ছে, প্রায় আট হাজার দর্শক তখন নকআউটের গন্ধ পেয়ে বীভৎস চিৎকার করল, ”কিল, কিল, কিল।”

তার লেফট হুকটা তৈরি হয়ে ওঠার আগেই রোজারিও দ্রুত এগিয়ে এসে জড়াজড়ি করে ফেলল। তার গলা জড়িয়ে ধরেছে ওর ডান হাত, বাঁ হাত কোমর। এই অবস্থায় ঘুসি মারা যায় পেটে বা বগলে, তাও খুব জোরে নয়। কয়েকটা বোবা ঘুসি সে চালাল, রোজারিওকে ঠেলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু ও ছাড়ছে না।

”ব্রেক।” রেফারি বিচ্ছিন্ন হয়ে দু’জনকে সরে যেতে হুকুম দিল।

পিছোতে গিয়ে তার ডান পা অতি সামান্য পিছলে গেল। পলকের জন্য সে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়েছে আর সঙ্গে—সঙ্গে ঠিক কানের ওপর রোজারিওর রাইট সুইংটা এসে পড়ল এবং সেটাকে অনুসরণ করে বাঁ হাতের সোজা একটা পাঞ্চ।

ক্যানভাসের ওপর তার পড়ার শব্দটা ব্রেবোর্নের নর্থ স্ট্যান্ডের চালে ধাক্কা খেয়ে নেমে এল দর্শকদের ওপর। তারা হতবাক। দ্রুতই সে উঠে পড়ে, কিন্তু মনের জোরে যেন কিছুটা তুলে নিয়ে গেল ওই দুটো পাঞ্চ। সেই জায়গায় ঢুকে এল ভয়। আর সেই ভয়ের তাড়সেই সে বুনো শুয়োরের মতো এগোল।

মুখে দুটো জ্যাব পড়ল, পাঁজরে সোজা একটা। রোজারিওর পাঞ্চে জোর নেই, সে কোনওরকম ব্যথা টের পেল না, তখন সে খুঁজছে বাঁ হাতের পাল্লার মধ্যে ওই বুড়োটাকে পেতে। পেয়েও গেল। লেফট হুকের সঙ্গে—সঙ্গে ডান হাতেও একটা।

পড়ে গেল রোজারিও। রক্ত বেরিয়ে আসছে নাক দিয়ে। কয়েক হাজার কণ্ঠের চিৎকার একসঙ্গে বেরিয়ে বোমার মতো ফাটল। ওরা যা চাইছিল তা পেয়েছে।

”পাপ্পা…পাপ্পা।”

একটা ভীত কচি কণ্ঠস্বর। ছোট্ট ফোঁপানি।

”পাপপা…ওহহ।”

ক্যানভসে উপুড় হয়ে থাকা রোজারিও ধীরে—ধীরে মুখ তুলল। দু’ হাতে ভর দিয়ে নিজেকে তুলে তাকাল যেদিক থেকে ডাকটা আসছে। তারপরই ওর দু’ চোখে ঠিকরে উঠল, দুর্দমনীয় জেদ আর ইচ্ছা।

সে তাকিয়ে দেখছিল রোজারিওকে। লোকটা মানুষ না অন্য কিছু। ওই দুটো ঘুসি খাওয়ার পরও উঠে দাঁড়াচ্ছে।

”ফাইভ…সিক্স…”

”পাপ্পা প্লিইজ গেট আপ।”

রোজারিও ছেলের দিকে মুখটা দেখাল। গালের পেশি দুমড়ে গেল। টপটপ রক্ত থুতনি বেয়ে সাদা গেঞ্জিতে ঝরছে। বিড়—বিড় করে কিছু বলল।

”এইট…নাইন…”

শেষ শক্তিটুকু নিংড়ে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে রোজারিও উঠে দাঁড়াল। মুখ ফিরিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসল। একবারও পা কাঁপল না। চোখ বন্ধ করল না, টলে উঠল না।

কর্নার থেকে সে এগোল আবার ওকে মারার জন্য। রোজারিও মুখের সামনে দু’ হাতের গার্ড রেখে পিছিয়ে গেল। আর তখনই প্রথম রাউন্ড—শেষের ঘণ্টা পড়ল।

বিভ্রান্ত চোখে সে রোজারিওর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল, এত জোর লোকটা পেল কোথা থেকে? তিনটে নক আউট এই পাঞ্চেই হয়েছে, অথচ উঠে দাঁড়াল! কিসের জোরে? গেঞ্জির বুকের কাছটা রক্তে লাল। চোখ দুটো জ্বলজ্বলে। নিজের কর্নারে গিয়ে রোজারিও টুলে বসল।

”পাপ্পা ইউ আর আ ফাইটার…পাপ্পা ইউ আর আ ফাইটার…পাপ্পা…”

রোজারিওর একটা চোখের চারপাশ ফুলে উঠেছে। অন্য চোখে অদ্ভুত একটা হাসি। ভীষণ মজাদার এই লড়াইটা, তাই না রে, এমন একটা ভাব করে সে ছেলের দিকে তাকিয়ে। ডান হাতের গ্লাভসটা তুলে নাড়ল। ওর জীবনের সবচেয়ে দামি স্বপ্নটা সার্থক হয়েছে।

‘ফার্স্ট রাউন্ড নক আউট হল না। কীরকম একটা বিষণ্ণতা তার মধ্যে ছেয়ে আসছে। হাত, পা, মুখ, তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিতে—দিতে সুনীল ঝড়ের মতো নির্দেশ, উপদেশ দিয়ে কথা বলে যাচ্ছে। কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না।

অন্য কর্নারের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ সে ভবানী—সারকে দেখতে পেল। মাথাটা ঝোঁকানো, ঠোঁট দুটো সামান্য খোলা… আমি নুইব না, নুইব না! সে নিজেকে তখন জিজ্ঞেস করল, আমি তা হলে সাধু হয়ে গেছি? এখন শিবাকে চাই…কোথায় সে?

”পাপ্পা কাম অন…ফাইট।”

তার বুকটা কেঁপে উঠল। মনের গভীরে সে অসহায়ের মতো শিবাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। রোজারিওর মুখটা ভবানী—সারের মতো কেন?…রোজারিও পয়েন্ট তুলে নিচ্ছে তাকে হিট করে করে।

”শিবাজি, নক হিম আউট, কাম অন শিবাজি।”

চিৎকারগুলো আর তার মধ্যে উত্তেজনা আনছে না। সে আর মারতে চায় না, মার খেতে চায়। দ্বিতীয় রাউন্ড—শেষে সে টুলে বসে দু’ হাতে মুখ ঢাকল।

”শিবাজি ইজ আ চিট…ফেক হ্যায়, নকলি হ্যায়।”

বলুক, ওরা বলুক। তোয়ালে নেড়ে সুনীল বাতাস করছে। আর কোনও উপদেশ—নির্দেশ দিচ্ছে না। বোধ হয় বুঝে গেছে লড়াই শেষ, তৃতীয় রাউন্ডও দ্বিতীয়টার মতো হবে।

গোমস—সার বহুবার বলেছিল, চ্যাম্পিয়ান তৈরি হয় তাদের ভেতরের, একেবারে ভেতরের জিনিস থেকে…সেটা হল ইচ্ছা, মনের জোর, যাকে বলে উইল। রোজারিওর ইচ্ছা ছেলের সামনে বীর হবে। বীরের ছবিটা চিরকাল নীলের মনে জ্বলজ্বলে হয়ে থাকুক। এই ইচ্ছা নিয়েই রিংয়ে উঠেছে।

সে কারও জন্য ছবি আঁকতে চায় না। তার কোনও ইচ্ছা নেই, তার কোন নিজের লোক নেই। ভবনী—সার হারেনি। রোজারিও হারবে না বুঝে গিয়েই সে তৃতীয় রাউন্ডের জন্য উঠে দাঁড়ায়।

লড়াই শেষে রেফারি তার হাতটা তুলে ধরেনি।

”আর হউ অ্যাশ্লিপ…শিবা?”

গোমসের আলতো নাড়ায় শিবা খাড়া হয়ে বসল। ট্যাক্সি দেবদাস পাঠক রোডের মোড়ে দাঁড়িয়ে।

”পেইন হচ্ছে?”

”না। একদম সেরে গেছে।” ট্যাক্সি থেকে নামার পর শিবা বলল, ”কালই আমি জিমে যাব সার। আসবেন?”

”ইয়েস, অফকোর্স যাব।”

।। ১৩ ।।

নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে জাতীয় বক্সিং চ্যাম্পিয়ানশিপস শুরুর আগের দিন লালবাগান জিম থেকে একটু দূরে স্কুটারে বসে সাধু কথা বলছিল পাশে দাঁড়ানো কান্তির সঙ্গে।

”বলছ কী কান্তি, ছ’—ছ’টা লড়াই কোনওক্রমে যে জিতল তাকে বলছ কিনা দারুণ ফর্মে আছে? শিবা তো এখন পয়েন্টের বক্সার!”

”সবার তা—ই মনে হবে কিন্তু আমি তো ওর ট্রেনিং দেখছি, একটু—আধটু বস্কিং যা বুঝি, তাতে বলতে পারি ও এখন দারুণ শ্যেপ—এ আছে। কাদের সঙ্গে ওকে লড়তে হবে তা অবশ্য জানি না, ড্র—টাই বক্সিংয়ে খুব ইম্পর্ট্যান্ট ব্যাপার, তবে ফাইনালে সার্ভিসেসের রঙ্গরাজন উঠছেই। সিওল কাপে ব্রোঞ্জ গতবছর, এবার ম্যানিলায় মেয়রস কাপে গোল্ড পেয়েছে।”

”জানি। শুনেছি দারুণ জোরে মারে, কিন্তু স্লো। ম্যানিলায় দুটো নক আউট করে ফাইনালে একটা মঙ্গোলিয়ানের কাছে জিতেছে, বাইশ—সাত পয়েন্টে, বোম্বাই থেকে খবর আমি আনিয়েছি। ওর এগেনস্টে শিবার কোনও চান্সই নেই। আমি ওর ওপর টাকা ফেলতে রাজি নই।”

”অত জোর দিয়ে বোলো না সাধু…শিবা ওর ফর্ম লুকিয়ে রেখেছে, ওই ব্যাটা গোমসের এটা চালাকি। যদি ওর ওপর বাজি নাই ধরো তবু, ‘সাবধানের মার নেই’ পলিসি নাও। যদি শিবা ফাইনালে ওঠে, তা হলে ওকে নক আউটের ব্যবস্থা করে রাখো।” ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে কান্তি বলল।

”কীভাবে?” সাধুও ঝুঁকে পড়ল।

”ব্যবস্থা হয়ে যাবে…কী দেবে সেইটে বলো।”

”পাঁচশো।”

” উঁহুঁ।”

”এক হাজার।”

”তুমি কামাবে পঁচিশ—পঞ্চাশ, আর আমি মাত্র এক!”

”আরে, ওকে তো এমনিতেই রঙ্গরাজন নক আউট করবে, ব্যবস্থা করার কোনও দরকার নেই।”

”নেই তো নেই। পরে কিন্তু আমার কাছে ছুটে এসে ‘বাঁচাও কান্তি, ডুবে গেলুম’ বলে হাত চেপে ধোরো না।”

কান্তি হাঁটতে শুরু করল। স্কুটারে স্টার্ট দিয়ে সাধু কান্তির পাশাপাশি চালাতে—চালাতে বলল, ”তুমি ঠিক বলছ, শিবা ফর্ম লুকিয়ে রেখেছে?”

”একশো ভাগ শিওর আমি।”

”ও ফাইনালে যাবে?”

”যাবেই।”

”ঠিক আছে, কত চাও?”

”পাঁচ।”

”অ্যাঁ!” সাধু অবাক হয়েই গম্ভীর হয়ে গেল। শুধু বলল, ”ঠিক আছে।”

”আমি লোকাল অফিশিয়াল হয়েছি, বাইরের টিমগুলোকে লড়াইয়ের সময় দেখভাল করার দায়িত্ব আমার। স্টেডিয়ামে তুমি আমার ধারেকাছে আসবে না কিন্তু।”

.

শিবার প্রথম লড়াই হরিয়ানার সতীশ শর্মার সঙ্গে।

স্টেডিয়ামের ভি আই পি এনক্লোজারের সামনে এরেনা—র মাঝামাঝি, রিং তৈরি করা হয়েছে, গ্যালারিতে পাঁচশো দর্শকও হয়নি। বক্সিং বছর তিরিশ—পঁয়ত্রিশ আগেও কলকাতায় জনপ্রিয় ছিল, যেমন ছিল কুস্তি। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান ছেলেরাও বক্সিং লড়ত। ভারতের ওলিম্পিকস দলে কলকাতার বক্সার বা কুস্তিগিররাও নির্বাচন পেত। কিন্তু বক্সিং, রিং বা কুস্তির আখড়া পশ্চিমবাংলায় এখন আর দেখাই যায় না। কয়েকটি মাত্র টিমটিম করে জ্বলছে। ক্রিকেট আর ফুটবল নিয়েই এখন মাতামাতি। গায়ের জোরের খেলায় বা যে—খেলায় সংবাদ মাধ্যমগুলোর ঢাকে কাঠি পড়ে না, বাঙালি ছেলেরা সেই খেলায় আর মাতে না।

কলকাতায় জাতীয় বক্সিং প্রতিযোগিতার প্রথম দিনে দর্শক যৎসামান্য হওয়ায় কেউই আশ্চর্য বোধ করেনি। পঞ্চম লড়াইটি ছিল মিডল ওয়েটের। শিবার কর্নারম্যান ফ্র্যাঙ্ক গোমস আর আগেরবারের মতোই সুনীল বেরা এবং অনিমেষ। রিংয়ে ঢুকে দু’ হাতে দড়ি ধরে শিবা নিজেকে ঝাঁকাচ্ছিল, পেশিগুলো আলগা করার জন্য। গোমস বিপরীত কর্নারের দিকে তাকিয়ে শিবাকে বলল, ”টেক ইট ইজি…মাথায় রক্ত চড়িয়ে দেবে না…মনে রেখো ফাইটারস আর ডিসকভারারস, ওর ফল্টগুলো বার করো।”

শিবা পাঁচ—ছ’টি ত্রুটি শর্মার মধ্যে বার করেছিল প্রথম রাউন্ডেই।

”কী মনে হচ্ছে?” শিবার মুখ থেকে মাউথপিসটা বার করে গোমস জিজ্ঞেস করল।

”টার্নিং খুব স্লো…দু’ হাতে জ্যাব নেই…ইনফাইটিংয়ে আসতে চায় না।”

গোমস শুধু মুচকি হাসল। সুনীল বরফজলের স্পঞ্জ শিবার ঘাড়ে—গলায় ঘষতে—ঘষতে বলল, ”দে না শেষ করে।” গোমস ঠোঁটে আঙুল রেখে সুনীলকে চুপ থাকতে ইশারা করল।

দ্বিতীয় রাউন্ডে সে শর্মার খুব কাছে গিয়ে ওয়ান—টু—থ্রি কম্বিনেশন পাঞ্চ মুখে চালিয়েই পিছিয়ে এল। শর্মা পায়ে—পায়ে এগোচ্ছে, শিবা দড়ির দিকে সরে এল। এবার বাগে পেয়েছি ভেবে নিয়ে শর্মা বিশাল একটা ডান হাতের ক্রস শিবার মাথার দিকে চালাবার জন্য শরীরের সব ভার ডান পায়ের ওপর রেখে নিজেকে প্রায় ছুড়ে দিল। বিদ্যুৎগতিতে শিবা সরে গিয়ে শর্মাকে দড়ির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে দিয়ে পয়েন্ট তুলে নিল দুটো জ্যাব করে। তৃতীয় পাঞ্চটি দিতে যাচ্ছিল একটা আপার কাট, যেটা হয়তো নক আউট পাঞ্চই হত।

”নো ও ও ও ।”

শিবা সংবিৎ ফিরে পাওয়া চোখে নিজের কর্নারের দিকে একবার তাকাল। গোমস হাত তুলে রয়েছে। তার কাছাকাছি দাঁড়ানো একটি ব্যাজপরা লোকের ঠোঁটে তখন হাসি খেলে গেল এবং তারপরই ঠোঁট কামড়ে ধরল। লোকটি কান্তি।

রেফারি তুলে ধরল শিবারই হাত। তেইশ—দুই পয়েন্টে সে জিতেছে। স্টেডিয়ামের পশ্চিম দিকে এনক্লোজার থেকে তখন একটি গলা সারা এরেনায় প্রতিধ্বনিত হল, ”ওস্তাই—দ।”

শিবা তাকাল। হাত তুলে নাড়ল। ননীর পাশে সে উৎপল চট্টরাজকেও দেখতে পেল। আশ্চর্য ঘটক বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ”ভাল লড়েছিস।”

দ্বিতীয় লড়াই রেলওয়েজের মকরন্দ সুলেকরের সঙ্গে। ছিপছিপে লম্বা এই মরাঠির ঘুসি পৌঁছনোর দূরত্বটা শিবার থেকে বেশি এবং বুদ্ধিমান বক্সার। গতবারের রানার্স। ম্যানিলায়ও ভারতীয় দলে ছিল।

শিবা হুঁশিয়ার হয়েই প্রথম রাউন্ডটায় শুধু দূরে—দূরে চক্কর দিল। দ্বিতীয় রাউন্ডে সুলেকর কৌশল বদলে আক্রমণে এগিয়ে এল। শিবার মনে হল, নিশ্চয় তার প্রথম দিনের লড়াইয়ের ধরন দেখেছে সুলেকরের কোচ। তাই কায়দাটা বদল করল। তাকেও এবার বদলাতে হবে, চমকে দিতে হবে। সেও পালটা তেড়ে গেল।

সুলেকরের মুখোমুখি হয়ে দু’ হাত বৃত্তের মধ্যে ঢুকে এসে পর—পর জ্যাব এবং রাইট ও লেফট হুক করে শিবা ওকে বিস্ময়ে ফেলে দিয়েই পিছিয়ে এল। কিন্তু সে যে তারপরও আবার তেড়ে আসবে, সুলেকর সেটা বোধ হয় ভাবতে পারেনি। ওকে ধাতস্থ হতে সময় না দিয়েই সে এক—দুই, এক—দুই—তিন কম্বিনেশন পাঞ্চ চালিয়ে গেল। সুলেকরের তখন আত্মরক্ষা ছাড়া আর কোনও চিন্তা ছিল না এই রাউন্ডে।

মানসিক ভারসাম্য এক মিনিটের বিরতিতেই সুলেকর গুছিয়ে নিয়ে তৃতীয় রাউন্ড শুরু করল। কেন সে নিজের বিভাগে ভারতের অন্যতম সেরা, এবার সে শিবাকে তা বুঝিয়ে দিতে শুরু করল। তবে মাথায়, পেটে বুকে ঘুসি খেয়েও কিন্তু শিবা তার আগ্রাসী লড়াই থেকে হটল না। পঁচাত্তর ভাগ ঘুসি সে এড়িয়ে এল শুধু তার দ্রুতগতিতে। নিজেকে ঘুসি থেকে সরিয়ে নেওয়ার এবং ঠিক জায়গায় ঘুসি পৌঁছে দেওয়ার পাল্লাদারিতে শিবা টেক্কা দিল।

শিবা জিতল আট—পাঁচ। তুমুল উল্লাসধ্বনি ছাপিয়ে শোনা গেল। একটা গলা, ”চালাইয়া যাও ওস্তাদ…কাইল আমমো ফ্রি রিসকা চালাইমু, পয়সা নিমু না।”

উৎপল চট্টরাজ আজও হাজির। শিবা দেখল তার পাশে মিতা। সে গ্লাভস পরা হাত দুটো জোরে—জোরে নাড়ল মিতার হাতনাড়া দেখে। এই মিতাই বোম্বাইয়ে চৌপট্টিতে বলেছিল, ”বক্সিং বিশ্রি, খালি ঘুসি মারা, মুখ ফাটিয়ে দেওয়া।” কিন্তু ব্যাপারটা যে শুধুই তা নয় সেটা হয়তো আজ সে বোঝাতে পেরেছে। স্কিল, গায়ের জোর, বুদ্ধি, মার নেওয়ার ক্ষমতা…সবই তো সে আজ দেখাল।

দেখল ফ্র্যাঙ্ক গোমসও, মিতাকে। রাত্রে জোনাকির কোয়ার্টারে সে উৎপলকে জিজ্ঞেস করল, ”আজ আপনার পাশে গ্রিন শালোয়ার—কামিজ—পরা একটা মেয়ে ছিল, চেনেন তাকে?”

”চিনব না কেন! ও তো আমার শ্যালী, মিতা, পারমিতা!”

”ফাইনালের দিন ও যেন শিবার বাউট দেখতে আসে, কাউন্ডলি আপনি কি সেটা দেখবেন?…আই উইল টেক নো চান্সেস। মিস্টার চট্টরাজ, অ্যাড্রিনালিন বলে একটা রস বডিতে তৈরি হয় যদি ইমোশনালি কেউ এক্সাইটেড হয়। এই রসটা একস্ট্রা পাওয়ার দেয়, রোখ বাড়ায়, পুশ করে অলআউট যাওয়ার জন্য। ফাইনালে ওটা আমার দরকার।…সেদিন নিতুকে আসতে হবে, একজন টিচারকে শিবা রেসপেক্ট করে, ননীকে বলে তাকেও আনাব। রিংয়ে ওঠার আগে পর্যন্ত ওর মেন্টাল বিল্ট আপে কোনও গলদ আমি রাখতে চাই না। চার্জড হয়ে রিংয়ে উঠবে ইমোশনটা সঙ্গে নিয়ে। আর সেটাই…।”

”সেটাইটা কী?”

”শিবার ফিরে আসা…আমারও কামব্যাক, উইথা ব্যাঙ্গ…আ নক আউট আই ওয়ান্ট ফর দ্য রেজারেকশন।”

সব ওয়েট বিভাগের মধ্যে শুধু মিডল ওয়েটের ফাইনালেই বাংলার একজন। হঠাৎ যেন হুঁশ ফিরল কলকাতার। দর্শক পাঁচ হাজার ছাপিয়ে গেছে।

ড্রেসিংরুম থেকে শিবা বেরোতেই যে পারছে তার পিঠ চাপড়াচ্ছে। প্রত্যেকের মুখে একটাই কথা। জিততে হবে। বাংলার মান রাখতে হবে।

আশ্চর্য ঘটক শুধু বলল, ”তুই জিতলে বক্সিংয়ের দিকে বাঙালিরা তবু একটু তাকাবে।”

ফ্র্যাঙ্ক গোমসই শুধু অনুত্তেজিত। মুখে সামান্য হাসিও লেগে আছে।

কান্তি সরকার খুবই ব্যস্ত। সার্ভিসেসের ড্রেসিংরুমে বারবার যাতায়াত করছে তত্ত্বাবধানের কাজে। শিবাকে রিংয়ের দিকে যেতে দেখে সে ছুটে এল। ওর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, ”সাবধান, তোকে ফার্স্ট রাউন্ডেই নক আউট পাঞ্চ মারার প্ল্যান করেছে, রঙ্গার কোচকে আমি বলতে শুনলাম!”

গোমস শিবার সামনে হাঁটছিল। ঝটতি সে ঘুরে রাগী চোখে কান্তির দিকে তাকাল। কান্তি দাঁড়িয়ে গেল এবং দু’ পা পিছোল।

”ওর কথাগুলো মাথা থেকে বার করে দাও…খুব হার্মফুল এখন এসব কথা… কনসেনট্রেট!” গোমস কথাগুলো বলল যখন শিবা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে রিংয়ে উঠছিল।

প্রথমেই একটা বিশাল চিৎকারে তাকে অভ্যর্থনা জানাল দর্শকরা। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে বোম্বাইয়ে ব্রেবোর্নের মতোই লাগল শিবার কানে। হঠাৎ একটা নাড়া পড়ল তার মাথার মধ্যে। সেদিনও ছিল ফাইনাল!…রোজারিওর কাছে সে হেরেছিল…ছেলের সামনে ‘বীর’ হওয়ার জন্য বুড়ো বক্সার লড়েছিল।

”ওস্তাইদ, এধারে তাকাও…আমরা আইসাচি।”

শিবার গ্লাভসের ফিতেটা আর—একবার শক্ত করে বেঁধে দিচ্ছিল সুনীল। মুখ ঘুরিয়ে শিবা তাকাল। দেখতে পেল ননীকে। তার পাশে শক্তি দাস আর তার বউ সাগরমামি,…টাক, চশমা, ভবানী—সার। …উৎপল…টকটকে শাড়িপরা মিতা! তার দিদি, কোলে টুটুও!…শচীনকাকু!…দুর্লভ চক্রবর্তী, গ্যারাজ তা হলে বন্ধ রেখেছে।…দাদা কই?…ওই তো, সবাই হাত নাড়ছে, দাদা নাড়ছে না।

শিবা হাসল। দাদার স্বভাবটা সে জানে। ধীর, ঠাণ্ডা, সহজে বিচলিত হয় না। এই মুহূর্তেও হচ্ছে না।

রঙ্গরাজন রিংয়ে উঠল। হাততালি পড়ল। দু’হাত তুলে মাথা ঝুঁকিয়ে সে অভিবাদন জানাল। তার কর্নারে কয়েকজনের সঙ্গে কান্তিও রয়েছে।

রিংয়ের মাঝে দু’জনকে ডেকে রেফারি যখন বাঁধা গত আউড়ে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছিল, রঙ্গা তখন ঠাণ্ডা চোখে শিবার মুখের দিকে তাকিয়ে। খুনির মতো চাহনি। শিবার বুকের মধ্যে সিরসির করে উঠল। এইটেই হচ্ছে পরস্পরের বুকের পাটা মেপে নেওয়ার, অন্যের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত। সার বলে দিয়েছে, খবর্দার চোখ সরাবে না, পালটা তুমিও চোখ রাঙাবে।…শিবার চোখ জ্বলে উঠল।

ঘণ্টা পড়ল।

দু’জনে পরস্পরের দিকে দ্রুত এগিয়ে এসেই পাঁচ হাত ব্যবধান রেখে থমকে গেল। দু’জনেই কয়েক পা পিছলো। তারপর শিবা আবার এগোল। রঙ্গাও এগিয়ে গেল। এবার দু’জনে চক্কর দিয়ে ঘুরতে লাগল। মুখের কাছে গ্লাভস, এগোব—এগোব ভাব দেখিয়ে, শিবা কুঁজো হয়ে দুলছে। রঙ্গার একটা সোজা ঘুসি শিবার মুখে পৌঁছবার আগেই সে মাথা সরিয়ে পালটা একটা সোজা বিদ্যুৎগতিতে বসিয়ে দিল রঙ্গার কপালের মাঝখানে। চিৎকার উঠল দর্শকদের, শিবা প্রথম ঘুসিটা মেরেছে।

রঙ্গা নাড়া খেয়ে তেতে উঠল। শিবার কাছে পৌঁছে কম্বিনেশন মারতে গিয়ে হাত আটকে গেল শিবার হাতে। রঙ্গা বাঁ হাতে শিবার গলা জড়িয়ে চাপ দিয়ে মাথাটা হেঁট করিয়ে ডান হাতে ছোট দু—তিনটে আপার কাট মুখে—কপালে মারল। রেফারি এসে ওদের ছাড়িয়ে দিল। তারপর আবার দূরত্ব রেখে চক্কর দিতে—দিতে হঠাৎ এগিয়ে আসার ভান দু’জনেই করতে লাগল। যেন দু’জনের হাতেই বন্দুক, কে প্রথম গুলিটা ছুড়বে! ছুড়ে যদি ফসকায় তা হলে অন্যজন শেষ করে দেবে। যদি ঘুসি ছুড়ে না লাগাতে পারো আর অন্যজন যদি তৈরি থাকে, তা হলে ঘুসি খেতে হবেই।

এই সময়ই শিবার চোখ দুটো জ্বালা করে উঠল। বাঁ হাতের গ্লাভস দিয়ে সে চোখ রগড়াল।..কয়েক সেকেন্ড পর জ্বলুনিটা বাড়ল। আবার সে গ্লাভস দিয়ে চোখ রগড়াল। তার মনে হল চোখের পাতা ফুলে উঠে ঢেকে দিচ্ছে তার দৃষ্টি।

রঙ্গা এগিয়ে আসছে। পর—পর দুটো জ্যাব শিবার মুখে পড়ল। বাহুর ওপর আর বুকে আরও দুটো। টলে গিয়ে শিবা পেছনে হটে গেল…তার চোখ জ্বলছে, পাতা দুটো ভারী লাগছে,..তার হাত চলছে কিন্তু রঙ্গার শরীরে লাগছে না।

কী হল চোখে। শিবা ভারী হয়ে যাওয়া চোখ টানটান করে দেখতে পেল রঙ্গা যেন অবাক হয়ে লক্ষ করল তার অবস্থাটা। তার চোখেও বিভ্রান্তি। সেটা কাটিয়ে উঠেই সে শিবার দিকে এগোল এবং এক—দুই কম্বিনেশনের সঙ্গে—সঙ্গেই প্রচণ্ড একটা লেফট হুকে শিবার মুখ ঘুরিয়ে দিল।

শিবা প্রথমে আছড়ে পড়ল দড়ির ওপর। দু’ হাতে দড়ি ধরা অবস্থাতেই ধীরে—ধীরে ক্যানভাসের দিকে নামতে লাগল তার দেহ। সারা স্টেডিয়াম স্তব্ধ, বিমূঢ়। এখন তার কানে এল।

”ওস্তাইদ…এ কী অইল!”

ক্যানভাসের ওপর উপুড় হয়ে পড়ার সঙ্গে—সঙ্গে রেফারির গোনা শুরু হল, ”ওয়ান…টু…”

”শিবা রে…” মেয়েগলায় একটা ফোঁপানি উঠল।

রোজারিও…তুমি উঠেছিলে, তা হলে আমিও পারব না কেন?

”সিক্স…সেভেন…”

বহু দূর থেকে ক্ষীণ কচি গলায় কে যেন বলছে ”পাপপা, গেট…আপ।” শিবা মুখ তুলে দেখল রঙ্গা তার কর্নারে দাঁড়িয়ে, তার পায়ের কাছে রিংয়ের বাইরে কয়েকটি মুখ, তার মধ্যে রয়েছে কান্তিও।

”শিবা উঠে পড়।”

দাদার গলা। রাগী, বিরক্ত স্বর। ভোরে সবার আগে ঘুম থেকে উঠে সে ধাক্কা দিয়ে বলে…

শিবা উঠে দাঁড়াল। ঘণ্টা পড়ল রাউন্ড—শেষের।

দড়ি গলে রিংয়ে উঠে এল গোমস, সুনীল, অনিমেষ।

”কী হয়েছে চোখে?” শিবাকে টুলে বসিয়ে দিয়ে উদ্বিগ্ন গোমস জানতে চাইল।

”জানি না সার। কীরকম জ্বালা করছে, চোখ মেলে তাকাতে পারছি না।” অসহায় কাতর স্বরে শিবা বলল।

ওর দুটো চোখের পাতা তুলে গোমস তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে পরীক্ষা করল। জলে ভরে গিয়ে লাল হয়ে উঠেছে চোখ দুটো। আঙুলটা বাঁ চোখের চারপাশে বুলিয়ে গোমস নিজের চোখে লাগাল। চোখ কোঁচকাল।

”ইটস বার্নিং।…কোনও শয়তানি ব্যাপার আছে।” বলেই আঙুলটার দিকে অবাক হয়ে তাকাল। জ্বালা করছে। ”সুনীল, তুমি ওর চোখের ওপর আঙুল বোলাও তো।”

সুনীল স্পঞ্জটা অনিমেষকে দিয়ে ডান তর্জনীটা শিবার দুই ভ্রু আর চোখের পাতায় বোলাল। জ্বালা করে উঠতেই বলল, ”সার, এ তো বিছুটির রস!’

বারবার জলের ঝাপটা দিল সুনীল। কয়েকবার তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিলে চোখ আর কপাল।

”এখনও কি জ্বালা করছে?” গোমস উৎকণ্ঠিত।

”করছে।”

”গো নাউ শিবা, ডান্স…রঙ্গার রিচ—এর বাইরে থেকে মুভ করো….স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম হিম।” গোমস মাউথপিসটা শিবার মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে ওকে তুলে দিল।

দ্বিতীয় রাউন্ড এবং অবিশ্বাস্য হল শিবা। চোখে ভাল করে দেখতে পাচ্ছে না। রঙ্গার ঘুসির পাল্লার বাইরে থাকার জন্য সে চক্কর দিচ্ছে, দুই পা তাকে ঘূর্ণির মতো ঘোরাচ্ছে রঙ্গাকে ঘিরে। কাছাকাছি হয়ে এলে বাঁ হাতে রঙ্গাকে ঘুসি পাঠিয়েই পিছিয়ে যাচ্ছে। সারা স্টেডিয়াম তাজ্জব। শ্বাসরোধ করে তারা অপূর্ব একটা মানুষের আত্মরক্ষার লড়াই দেখে যাচ্ছে।

সে এটুকু বুঝেছে, রঙ্গাকে কাছে আসতে দেওয়া মানেই লড়াই খতম। ওর একটা জ্যাব, একটা হুক যদি আবার মুখে কি মাথায় পড়ে তা হলে সে আর দাঁড়াতে পারবে না।…ডান্স, ডান্স…স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম হিম…রঙ্গার রিচ—এর বাইরে থাকতে হবে…সবাই হাসছে, হাসুক। লড়াইয়ের ওরা কী বোঝে! ওরা জানে কি তার চোখের অবস্থা?

রঙ্গা এগিয়ে এসে শিবাকে দড়ির ধারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। চোখের পাতা টেনে তুলে রেখে শিবা শুধু একটা কালো আবছা আকাররূপে রঙ্গাকে দেখছে। জলে ভাসা চাহনির মধ্য দিয়ে সে দু’জনের মধ্যের দূরত্বটা হিসেব করে জলপোকার মতো সরে—সরে যাচ্ছে। রঙ্গার মন্থর স্টাইল কিছুতেই ওকে বাগে আনতে পারছে না, যদি—বা সে কাছে পৌঁছচ্ছে, শিবার বাঁ হাতের জ্যাব তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার সময় আদায় করে নিচ্ছে।

এবার হতাশ আর বিরক্ত হয়ে উঠল রঙ্গা। সে শুনেছে শিবাজি একজন বিপজ্জনক ফাইটার। তাকে বলা হয়েছিল এবং স্বচক্ষে এখানে দেখেছেও—পাঞ্চ করে অসম্ভব ফাস্ট…দুর্দান্ত ওয়ান—টু কম্বিনেশন, জ্যাবের সঙ্গে—সঙ্গে মারাত্মক স্ট্রেট লেফট…আর ওই ফুটওয়ার্ক, স্পিড…কিন্তু এইরকম এক ফাইটার পালিয়ে—পালিয়ে লড়বে, রঙ্গা তা ভাবেনি। ওর চোখ দেখে তার মনে হচ্ছে, কিছু একটা হয়েছে! চোখ পিটপিট করেই জোর করে পাতা খুলে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রঙ্গার মনে হল, শিবাজি যেন ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে না।

তা হলে এখনই তো মার দেওয়ার সুযোগ। কিন্তু শিবা এমন ক্ষিপ্রতায় তার পাঞ্চগুলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে, দূরে সরে যাচ্ছে যে, তাকে সুযোগ দিতে দিচ্ছে না। রেগে উঠে রঙ্গা দর্শকদের দিকে তাকিয়ে ডান হাত তুলে শিবাকে দেখাল। ভাবখানা—দেখছেন তো, এর সঙ্গে কী লড়ব!

গ্যালারিতে দর্শকদের মধ্যে হাসির রোল উঠল। রঙ্গা একবার ভ্যাংচাবার জন্য শিবার ফুটওয়ার্ক নকল করে দেখাল এবং এগিয়ে গিয়ে একটা সুইং ডান হাতে, আর বাঁ হাতে সোজা একটা। দুটোই সে ফসকাল। আবার সে এগোল, তবে হতাশভাবে এবং দুটো হাত নামিয়ে। এই প্রথম সে কনসেনট্রেশন নষ্ট করল। হুঁশিয়ার থাকার চেষ্টা না করে, মুখের সামনে প্রহরীর মতো সজাগ দুই হাতের মুঠি তুলে না রেখে দেখাতে চাইল, সে শিবাকে ধর্তব্যের বাইরে গণ্য করছে। প্রতিপক্ষকে উপহাসের পাত্র বানাতে গিয়ে সে নিজেকে ঢিলে করে দিল।

চোখের পাতা টান করে তুলে শিবা শুধু দেখতে পেল রঙ্গা তার থেকে ফুটপাঁচেক দূরে এসে গেছে, মুখের গার্ড নামানো।

তখনই বুকের মধ্যে কে যেন বিশাল চিৎকার করে বলে উঠল, ”বহু পয়েন্টে হেরে তো গেছিসই…শিবা এই তোর শেষ সুযোগ—মার।”

রঙ্গা পিছিয়ে যাওয়ার বা হাত দুটো মুখের সামনে তোলারও সময় পেল না। রেফারি পরে বলেছিলেন, তিনি ঠিকমতো দেখে উঠতে পারেননি শিবার লেফট হুকটাকে। এত সুইফট, এক পা এগিয়ে এসে, এত ফাস্ট পাঞ্চ তিনি কখনও দেখেননি।

মুখের থেকে সামান্য তাচ্ছিল্যের রেশটুকু মুছে নেওয়ার সময়ও রঙ্গা পায়নি। ‘মার’, এই নির্দেশটা মাথা থেকে শিবার হাতে পৌঁছনো এবং নির্দেশ অনুযায়ী কাজটা এমন গতিতে ঘটল, যেটা রকেটের গতি মাপার যন্ত্রে ছাড়া ধরা সম্ভব নয়। কথাটায় বাড়াবাড়ি রয়েছে, কিন্তু শিবার এই ঘুসিটাও তো তাই—ই। সে তার সারা দেহ নিংড়ে ক্ষমতার শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত বার করে লেফট হুকটা চালিয়েছিল। আকাশে যেন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল এবং তিন—চার সেকেন্ড পর রঙ্গা ক্যানভাসে পড়ল বজ্রাহতের মতো।

রেফারির দশ গোনার পরও সে ওঠেনি।

.

”শিবাজি যখন ঘুসিটা মারলে তখন তুমি কী ভাবছিলে?”

”শিবাজি, এই মুহূর্তে তোমার কেমন লাগছে?”

”শিবাজি, কত বছর বয়স থেকে বক্সিং করছ? কেন তুমি বক্সিংয়ে এলে?”

”কার কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েছ?”

”তোমার বাড়িতে কে—কে আছেন? তুমি কতদূর পড়াশোনা করেছ? এখনও কি লেখাপড়া করো?”

ড্রেসিংরুমে হতভম্ব চোখে শিবা প্রশ্নকর্তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে। ওরা সাংবাদিক। শিবার গলায় ঝুলছে তিনরঙা রিবনে বাঁধা একটা মেডেল।

”অ্যাত কথা আর অহন জিগাইবেন না, অর অহন একা থাকন দরকার।” উদ্বিগ্ন অভিভাবকের উৎকণ্ঠা ননীর গলায়। কীভাবে যেন ম্যানেজ করে সে ড্রেসিংরুমে ঢুকে পড়েছে। ”যা জিগাইবার আমারে জিগান, সব হিসটিরি আমি কইয়া দিমু…তয় আইজ নয়, সময় কইরা রিসকা স্ট্যান্ডে একদিন আসেন…শিবা উঠ—উঠ, তরে লইয়া যাইবার জইন্য হগ্গলে গেটে খাড়ায়ে আচে।”

.

তখন মাঝরাত্রি। ননীর রিকশাটা পূর্বপল্লীকে চতুর্থবার চক্কর দিয়ে দেবদাস পাঠক রোড, বি. টি. রোড দিয়ে মিলনপল্লীতে সাধুর বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে আবার ফিরে আসছে। এই রিকশা চালাচ্ছে শিবা, পেছনের সিটে বসে ননী।

”পাগলের মতো চোখ কইর‌্যা সাধু কইতাচিল, শিবা ঘুসিটা তো রঙ্গারে মারে নাই, আমারেই আর একবার মাইরলঅ। …অর বহু টাহা নাকি লোকসান অইচে।…জনে—জনে খোঁজ লইত্যাচিল কান্তিরে দ্যাখচ? কান্তিরে দ্যাখচ?”

মাথা নিচু করে ধীর গতিতে শিবা প্যাডেল করে যেতে লাগল। কোনও মন্তব্য করল না।

”হ্যা রে শিবা, কাগজের লোকগুলান আইব তো?”

”জানি না, আমি তো ফুটবল—ক্রিকেট খেলি না।”

একটু পরে সে বলল, ”যদি আসে, তা হলে তুই কী বলবি?”

”পরথমে কইমু, আমার এই পা দুইডা দ্যাহেন, ভাল কইর‌্যা দ্যাহেন। এই দিয়া চাইর বচ্চচর আগে একদিন শিবারে আমি লাথথি মাইরচিলাম। পা দুইডারে শিবা ভাইঙা দিতে পারত…দেয় নাই।” বলার সঙ্গে—সঙ্গে ননী তার দুই পা শিবার কাঁধের ওপর তুলে দিল।

”এবার যদি পা দুটো ভেঙে দি!”

”ভাঙ, ভাঙ…আমার সারা শরিলের হারগোর তুই ভাইঙা দে। আমার মইদ্যে অহন কী যে হইত্যাচে তরে আমি বোঝাইতে পারুম না।”

মধ্যরাত্রে, নির্জন পথে, রিকশায় বসে ননীর চোখ দিয়ে টপটপ জল পড়তে লাগল। শিবা রিকশা চালানো বন্ধ করে পেছনে তাকাল।

”শেষ কবে আমি কেঁদেছি জানিস? হাসপাতালে যখন তোদের সবাইকে আমার বেডের পাশে দেখলুম। মনে হল আমি যেন আবার জন্মাচ্ছি। তখন মনে—মনে বলেছিলুম, আমি ফিরব, আবার রিংয়ে উঠব।”

শিবার ঘাড় থেকে ননী পা নামাল। দু’জনের যেন বলার মতো আর কথা নেই, তারা চুপ করে বসে থাকল। একসময় ননী বলল, ”তর নবজনম অইল।”

”হ্যাঁ।”

”তইলে কানতাচস না ক্যান? মায়ের প্যাট থেকে পইড়াই ত বাচ্চচারা—”

হঠাৎ দু’ হাত তুলে শূন্যে ঘুসি ছুড়ে, বিশাল অট্টহাসিতে নিশুত রাত, শূন্য পথ, জনবসতি এবং অন্ধকার ভরিয়ে দিয়ে শিবা হেসে উঠল। তারপর রিকশা থেকে নেমে সে ছুটতে শুরু করল।

সঙ্গে—সঙ্গে সাইকেল রিকশাটা তার পেছনে বনবনিয়ে ধাওয়া করল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *