শিনিগামি
উপক্রম:
উৎপল মল্লিক এককাপ চা শেষ করেছেন। কিন্তু, মন ভরেনি। তাঁর স্ত্রী উমা দেবী চা পানীয়টি খাসা বানাতে পারেন। তাই আর এককাপ পাবার আশায় হাঁক দিলেন,
— বলছি, শুনছ?
রান্নাঘরে উমা দেবী ডাকের অপেক্ষাই করছিলেন। তিনি স্বামীকে চেনেন ভালো করেই। ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবন পেরিয়ে আসার পর সেটাই স্বাভাবিক। তাই এককাপ মতো বেশি চা করেছিলেন তিনি আগে থেকেই। তবুও স্বামীর ডাকে রান্নাঘর থেকেই প্রশ্ন করলেন,
–কী হল?
–বলছি, আর এককাপ চা হবে?
–বোসো, দিচ্ছি।
উৎপলবাবুও জানেন যে, দ্বিতীয় কাপ চা তিনি পাবেনই। তবুও একই প্রশ্ন রোজ করেন।
সোফায় বসে টিভি-তে নিউজ দেখছিলেন তিনি। মান্টো সিং-এর কেসটাই দেখাচ্ছে। তিনি কয়েক দিন যাবৎ বেশ চিন্তিত। মান্টো সিং-এর কেসটা কোর্টে ওঠার ডেট যতই এগিয়ে আসছে, তাঁর টেনশন ততই বাড়ছে। যদিও চিন্তার কিছু নেই। পরশুই কোর্টের ডেট। এই কেসে উৎপল মল্লিকের গুরুত্ব কতটা সেটা প্রশাসন জানে বলেই তাঁর বাড়ির বাইরে দু-জন পুলিশ চব্বিশ ঘণ্টা পাহারায় রয়েছে।
ছেলে থাকে স্টেটসে। সেও চিন্তিত। বার বার ফোন করে দিনে।
তবে, পরশুর পর সব সমস্যা মিটে যাবে, সেটাও জানেন উৎপলবাবু। একবার কোর্টে উঠে সাক্ষী দিতে পারলেই মান্টো সিং-এর গরাদের পেছনে ঢোকা কেউ আটকাতে পারবে না।
তবুও, যতবারই টিভি-তে মান্টোর মুখ দেখা যায়, ততবারই অস্বস্তি হয় উৎপলবাবুর। মান্টোর ঠোঁটের ওই স্বভাবসিদ্ধ ক্রূর হাসি, ভ্রূ নাচিয়ে কথা বলা, কথা বলার আত্মবিশ্বাস। পুরোটাই কি মিথ্যে? মান্টোর তো এই সময়ে ভয়ে ও আশঙ্কায় চুপসে থাকার কথা! হতে পারে ওর পক্ষের উকিল নামকরা, কিন্তু অপরপক্ষের সরকারি আইনজীবীও কম যান না। তাহলে কীসের এত আত্মবিশ্বাস মান্টো সিং-এর?
হঠাৎ কেঁপে উঠলেন উৎপলবাবু। বন্ধ ঘরে কোথা থেকে যেন অনেকটা বরফ ঠান্ডা হাওয়া এসে ঢুকেছে। ঘরে হঠাৎ যেন কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরটা দেখলেন তিনি। নাহ্, কোনো পরিবর্তন চোখে তো পড়ল না। কিন্তু… কিন্তু ওটা কী?
উমা দেবী চায়ের কাপ হাতে ঘরে ঢুকে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন। দেখলেন তাঁর স্বামী উঠে দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন। যদিও তাঁর সামনে কিছুই দেখতে পেলেন না তিনি। কিন্তু, উৎপলবাবু কিছু একটা দেখতে পাচ্ছেন এবং ভয় পাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, অদৃশ্য বস্তুটার উদ্দেশে চিৎকার করে কথাও বলছেন, এটা কী? একী? না, না! আমায় ছেড়ে দাও! আমায় মেরো না!
স্ত্রীকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করলেন উৎপলবাবু,
— উমা! বাঁচাও! বাঁচাও আমায়!
পরমুহূর্তে বুকের বাঁ-দিক চেপে ধরে যন্ত্রণায় মেঝেতে ঢলে পড়লেন উৎপলবাবু। উমা দেবীর হাত থেকে চায়ের কাপ নীচে পড়ে ভেঙে গেল। তিনি ছুটে গেলেন স্বামীর কাছে। উৎপলবাবুর শরীরটা কয়েক বার ঝাঁকুনি দিয়ে স্থির হয়ে গেল। খোলা চোখ থেকে প্রাণের চিহ্ন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
১.
–ডাক্তার কী বলছে? আপনার স্বামীর মৃত্যুটা কীসে হয়েছিল?
উমা দেবীর চোখ ছলছল করে এসেছিল স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারটা আমায় বলতে গিয়ে। হাতের রুমাল দিয়ে চোখ মুছে তিনি উত্তর দিলেন,
— হার্ট অ্যাটাক। ডাক্তারের মতে একদম ন্যাচারাল ডেথ।
— পোস্টমর্টেম হয়নি?
— হয়েছিল। আমি জোর করায় এবং উকিলবাবুর সাহায্যে পোস্টমর্টেম করানো হয় ওঁর। কারণ আমি, পুলিশ, উকিলবাবু আমাদের সকলেরই সন্দেহ ছিল যে, আমার স্বামীর মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয়।
— পোস্টমর্টেমে কিছুই পাওয়া যায়নি?
উত্তরটা তাঁর পাশে বসা মহিলার ছেলে দিল।
— কিচ্ছু না। হঠাৎ হার্টফেল।
ছেলে উল্লাস মল্লিক বিদেশে ডাক্তারি পড়া শেষ করে সেখানেই প্র্যাকটিস শুরু করেছে সবে। মা-কে নিয়ে সে-ই আমার কাছে এসেছে।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। সামনের সোফায় বসা মহিলাকে কী বলা উচিত ভেবে পাচ্ছি না। ভদ্রমহিলা আমার এক পরিচিত ছাত্রর কী ধরনের যেন আত্মীয়া হন। সেই ছাত্রর মুখ থেকেই আমার কথা শুনে এসেছেন আমার কাছে। আমি বেশ বুঝতে পারছি যে, তিনি সন্দেহ করছেন যে, তাঁর স্বামীর মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয়। এতে অলৌকিক কিছু আছে, ষড়যন্ত্র আছে। কিন্তু, তাঁরই কথা থেকে স্পষ্ট যে, ভদ্রলোকের মৃত্যুটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
উমা দেবী বললেন,
— আমি জানি প্রফেসর, আপনি কী ভাবছেন। আপনি ভাবছেন আমি অকারণ আপনাকে বিরক্ত করতে এসেছি।
— আমি মোটেই সেইরকম কিছু ভাবছি না। আর, আমি আপনার থেকে বয়সে ছোটো, দয়া করে ‘প্রফেসর’ সম্বোধন করবেন না। অতীন্দ্র বলেই ডাকুন।
মহিলা কিছুটা স্বাভাবিক হলেন। বললেন,
–আর চার ঘণ্টা পরেই আমার মুম্বইয়ের ফ্লাইট। সেখান থেকে সোজা ইউ.এস.এ, ছেলের কাছে। আর দেশে ফেরা হবে না।
উমা দেবী আর তাঁর ছেলে উল্লাসকে ঘরের দরজা খোলার সময়েই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বড়ো ভাড়াগাড়ির পেছনে ও মাথায় উপচে পড়া লাগেজ দেখেই আমি ব্যাপারটা অনুমান করেছিলাম। সেটাই কনফার্ম করে মহিলা কথাগুলো বললেন,
— পুলিশ বা আমাদের অনেক সন্দেহ থাকলেও এই বিষয়ে আমাদের করার কিছু ছিল না। কিছুই প্রমাণ করা যায়নি। তাই শেষ রাস্তা হিসেবে আপনার কাছে এসেছি।
–আপনি আমার থেকে ঠিক কী সাহায্য আশা করেন?
— আমি চাই আপনি আমার স্বামীর মৃত্যুর বিষয়টা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করুন। আপনার কথা অনেক শুনেছি। তাই আজ বরাবরের মতো চলে যাওয়ার আগে আপনার দ্বারস্থ হয়েছি।
— আমি একজন কলেজের সাধারণ প্রফেসর এবং লেখক। এই বিষয়ে আমি কতটা কী করতে পারব আমার সত্যিই জানা নেই। আপনি কোনো প্রাইভেট গোয়েন্দার সাহায্য কেন নিচ্ছেন না?
মহিলা দৃঢ়ভাবে দু-দিকে মাথা নেড়ে বললেন,
— না। কোনো লাভ হবে না। কিছু করার হলে একমাত্র আপনিই করতে পারবেন।
–আপনার এরকম মনে হওয়ার কোনো বিশেষ কারণ আছে কি?
মহিলা উত্তর দিতে খানিকটা ইতস্তত করলেন। তারপর বললেন,
–আমি বিশ্বাস করি আমার স্বামীর আত্মা শান্তি পাননি। কারণ, তাঁর মৃত্যুর জন্যে দায়ী অপরাধীর সাজা হয়নি। আমি বার বার তাঁকে অনুভব করেছি নিজের আশপাশে। কালকে সন্ধ্যাবেলা আমি নিজের ঘরেই বসে ছিলাম। আজ চলে যাব, তাই মন খারাপ ছিল। বার বার ভাবছিলাম যে, কিছু কি উপায় নেই? কেউ কি নেই যে সাহায্য করতে পারে? তখনই একটা কাণ্ড হল।
— কী?
— বাবাই আসার সময়ে অনেকগুলো বই এনেছিল। সেগুলো টেবিলে রাখা ছিল। তার মধ্যে থেকে একটা বই মাটিতে পড়ল। বইটা কী ছিল, জানেন?
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অনুমান করলাম,
— আমার বই?
–আজ্ঞে, হ্যাঁ! বিজ্ঞান ও তন্ত্র নিয়ে লেখা আপনার একটা প্রবন্ধ সমগ্ৰ। তখনই আপনার নামটা আমার মাথায় আসে। আপনার নাম শুনেছি অনেকবার। আমি তখনই বুঝি যে, আসলে ও আমায় ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ সম্ভবত একজন আশার আলোয় উদ্ভাসিত কোনো মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁকে ‘না’ বলা। অতএব, আমিও সহজ উপায় বেছে নিয়ে উত্তর দিলাম,
–বেশ। আমি দেখছি কী করতে পারি।
মহিলা যেন অনেকটা স্বস্তি পেলেন। বললেন,
–অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। এবার আমরা তবে উঠি।
মা ও ছেলে উঠে দাঁড়াল। আমি দরজা খুলে দিতে ছেলে মা-কে বলল,
— তুমি গাড়িতে গিয়ে বোসো। আমি আসছি।
আমি অনুমান করেছিলাম এইরকম কিছু একটা হবে। ছেলে নিশ্চয়ই মায়ের মনের শান্তির জন্যে আমার কাছে নিয়ে আসতে রাজি হয়েছে। যাওয়ার আগে আমার কাছে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়ে, মিছিমিছি সময় নষ্ট করার জন্যে ক্ষমা চেয়ে যাবে।
কিন্তু আমায় অবাক করে দিয়ে, মা চলে যেতেই উল্লাস মল্লিক ঠিক উলটো কথা বলল,
–আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন যে, মা আসলে বাবার শোকে বিহ্বল হয়ে আপনার কাছে এসেছে। কিন্তু আপনাকে জানাই, মা কিন্তু ভুল কিছু বলেনি। বাবার উপস্থিতি আমিও টের পেয়েছি। হ্যাঁ স্যার, আমি নিজে একজন বিজ্ঞানের সাধক ডাক্তার হয়েও কথাটা স্বীকার করতে আমার একটুও আপত্তি নেই। তা ছাড়া ‘ইনট্যুইশন’ বলে একটা ব্যাপার আছে জানেন তো, প্রফেসর? আমার মায়ের সেই জিনিসটা বরাবরই প্রবল। মায়ের যখন মনে হয়েছে যে, বাবার মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, তখন আমি ১০০ পার সেন্ট নিশ্চিত যে, বাবার মৃত্যুতে কিছু ‘ফাউল প্লে’ আছে।
আমি কিছু বলার আগেই ছেলেটি আবার বলল,
–আমি একজন প্রাইভেট গোয়েন্দা লাগিয়েছি ইতিমধ্যে। এই তার কনট্যাক্ট কার্ড আপনাকে দিয়ে গেলাম। আপনি চাইলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, ওর কাছ থেকে বিশদ জানতে পারেন। নিজের জন্যে খবর জোগাড় করতে চাইলেও ওঁকে বলবেন। আমি ওর পেমেন্ট করেই রেখেছি। আমি শুধু আপনাকে একটাই অনুরোধ করব যে, পুরো ব্যাপারটা মায়ের মনের ভুল বলে ধরে নেবেন না। বাকিটা আপনার বিবেচনা। থ্যাঙ্ক ইউ প্রফেসর ফর ইয়োর টাইম। নমস্কার।
ওদের গাড়িটা বেরিয়ে যাওয়া অবধি দরজায় দাঁড়িয়ে রইলাম। চলে যেতেই দরজা বন্ধ করে ভেতরে এসে বসে কার্ডের নামটা পড়লাম। প্রবীর দত্ত, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। সঙ্গে মোবাইল আর ই-মেল দেওয়া। নামটা পড়ে হাসি পেল। এটা কি লোকটির আসল নাম, না, প্রদোষ মিত্রর সঙ্গে মিলিয়ে নিজেই রেখেছে? ফোন করব নাকি একবার?
— কী রে, আজ ইউনিভার্সিটি যাবি না? বেলা হয়ে গেল তো?
ওপর থেকে মায়ের ডাকে দেওয়ালের ঘড়ির দিকে চোখ গেল। উরিব্বাস! সাড়ে আটটা বাজে! একঘণ্টার মধ্যে কলেজে ঢুকতে হবে। বড্ড দেরি হয়ে গেল।
কার্ডটা একটা পকেট ডায়েরির মধ্যে রেখে ওপরে ছুটলাম।
২.
পরের দু-দিন আর মনে ছিল না ব্যাপারটা। শনিবার ছুটির দিন, সকালে উঠে কী-একটা কারণে ছোটো ডায়েরিটা খুলতেই কার্ডটা বেরোল। খানিকক্ষণ ইতস্তত করেও কী মনে হওয়ায় সেল ফোনটা তুলে নম্বর ডায়াল করলাম।
ওদিক থেকে পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল,
— হ্যালো?
আমি কী বলব সেটা আগে ভেবে নেওয়া উচিত ছিল। মানে, হঠাৎ আমি কেন যোগাযোগ করছি, তাঁর ইনভেস্টিগেশনে আমার ভূমিকা কী, এগুলো লোকটাকে কীভাবে বুঝিয়ে বলব?
তবে, সেইসবের প্রয়োজন পড়ল না। পরিচয় দিতেই ওদিক থেকে প্রবীর দত্ত চিনতে পারলেন। উল্লাস মল্লিক আগেই আমার কথা বলে রেখেছিল। প্রবীরবাবু বললেন,
–আমি কি আসতে পারি একবার আপনার কাছে? কয়েকটা ব্যাপার আপনাকে দেখানো দরকার।
–চলে আসুন না আজকেই। আমি ফাঁকা আছি। আপনার সুবিধেমতো চলে আসুন।
— বেশ, তাহলে আজকে বিকেলের দিকে যাব।
৩.
সন্ধে ছ-টার সময় প্রবীর দত্ত এলেন। আমি মনে মনে অনেকটা ফেলুদা গোছের একটা চেহারা অনুমান করে বসে ছিলাম। আদতে দেখা গেল লোকটি ঠিক বিপরীত। ভদ্রলোক আমার চেয়ে বয়স্ক, টাকমাথা, নাকের নীচে মাছি গোঁফ, চোখে আমারই মতো একটা রিমলেস চশমা। ড্রয়িং রুমে এনে বসিয়ে কী খাবেন জানতে চাওয়ায় ভদ্রলোক জানালেন হাই সুগার তাঁর, তাই চিনি, দুধ ছাড়া লাল চা। ওপরে তাই বানাতে বলে প্রবীরবাবুর সামনে বসলাম। দু-এককথায় পরিচয়পর্ব হওয়ার পর আমি সোজাসুজি জানতে চাইলাম,
–আপনি বোধ হয় একটু অবাক হয়েছেন আপনার কেসে হঠাৎ আমার কী ভূমিকা। বিশ্বাস করুন, সম্ভবত কোনো ভূমিকাই নেই। কিন্তু, উমা ম্যাডাম অনুরোধ করলেন এমনভাবে যে, আপনার সঙ্গে একবার অন্তত কথা বলতেই হত।
প্রবীরবাবু আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
— আমি আপনার বিষয়ে একটু খোঁজখবর নিয়েছি। তাতে কয়েকটা অদ্ভুত জিনিস জানতে পেরেছি। বেশ কয়েক বার পুলিশকে বা সরকারকে আপনি কিছু কেসে সাহায্য করেছেন। কিন্তু, সেগুলোর ক্ষেত্রে আপনার ভূমিকা ঠিক কী, সে-ব্যাপারে ধোঁয়াশা রয়েছে। প্রথমে ভেবেছিলাম, আপনি বুঝি আমারই মতো গোয়েন্দা হয়তো।
আমি হেসে বললাম,
— বিশ্বাস করুন, একদমই তা নয়।
–সেটা বুঝতেই পেরেছি। একটু গভীরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি যে, আপনি নাকি পুলিশকে কিছু অলৌকিক ঘটনার সমাধানে সাহায্য করেছেন। আপনার নাকি বিশেষ কিছু ক্ষমতা আছে। অথচ, আপনি একজন বিজ্ঞানের অধ্যাপক। সত্যি বলতে আমি নিজেই কিছুটা কনফিউজড, প্রফেসর।
আমি হেসে উত্তর দিলাম,
–সবসময়ই যে অলৌকিক কিছুর সঙ্গে জড়িত ঘটনায় ডাক পড়েছে, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো লিপি পাঠ, চিহ্নর মানে উদ্ধার, বা, নকল ভেকধারী সাধু বা ভূত সব ক্ষেত্রেই আমি পুলিশকে সাহায্য করেছি।
প্রবীরবাবু কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
— বেশ। তবে বলুন, আপনার আমার থেকে কী জানার আছে।
চা এসে গেছে ইতিমধ্যে। তাই ভদ্রলোকের দিকে তাঁর লিকার চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে প্রশ্ন করলাম,
— প্রথমত উৎপল মল্লিকের মৃত্যুতে কি কোনো অস্বাভাবিকতা আছে? চায়ে চুমুক দিয়ে প্রবীরবাবু বললেন,
–নাহ্। কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। হার্টফেল করে মারা গেছেন। স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু …
— কিন্তু?
— কিন্তু, যখন পর পর অনেকগুলো স্বাভাবিক মৃত্যু একটা প্যাটার্ন মেনে হয়, তখন গোটা ব্যাপারটা অস্বাভাবিক ঠেকে বই কী।
–অনেকগুলো মৃত্যু? মানে?
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে হেলান দিয়ে বসলেন প্রবীরবাবু। বললেন,
–মান্টো সিং সম্বন্ধে কী জানেন?
–খুব সামান্য। খবরের কাগজে মাঝে মাঝে যা দেখি, ওই আর কি। আপনি বলুন।
–মান্টো সিং জীবন শুরু করে টিকিট ব্ল্যাকার হিসেবে। সেখান থেকে ছুটকো অপরাধ, মাছের ব্যাবসা। সেখান থেকে তার ব্যাবসা আর প্রতিপত্তি বেড়ে আজকে সে মস্তবড়ো ব্যাবসাদার। রিয়েল এস্টেট, মশলা, মাছ, বালি, কয়লা, ওষুধ সব কিছুতেই মান্টো সিং আছে। সঙ্গে বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতার কৃপা হস্ত তার মাথার ওপর। তবে, লোকটা একেবারে যাকে বাংলায় বলে ‘আকাট মুখ্যু’। পুরোপুরি অশিক্ষিত, অথচ ব্যাবসা বুদ্ধি ষোলো আনা। তিন ‘ম’-এ গভীর আসক্তি। ব্যাবসা যতটা না লোকসমক্ষে, তার বহুগুণ বেশি আয় তার দু-নম্বরি অসৎ উপায়ে। প্রস্টিটিউশন, জুয়া, বেআইনি মদ, বেআইনি কয়লা, সব কিছু।
ভালোই চলছিল মান্টোর। কিন্তু, মাঝে মাঝে কিছু কেসে ফেঁসে যেত। দু-বছর আগে দুটো বড়ো কেসে ফেঁসে যায় মান্টো। একটা মেয়েঘটিত কেস এবং দ্বিতীয়টা কয়লার কেস। মান্টোর বিরুদ্ধে একটি মেয়ে প্রথমবার সাহস করে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাল, রেপ এবং সেইসঙ্গে জোর করে তাকে লাইনে নামিয়েছিল মান্টো। সেইসঙ্গেই ঝাড়খণ্ডের একটা কোলিয়ারিতে দায়িত্ব নিয়ে আসা নতুন ম্যানেজার রুখে দাঁড়াল মান্টোর বিরুদ্ধে। দুটো কেসের চাপে মান্টোকে কিন্তু প্রায় বাগে ফেলেছিল পুলিশ। কিন্তু, তার আগেই পর পর দুটো অঘটন ঘটল।
— লেট মি গেস। সেই মেয়েটি এবং ওই কোলিয়ারির ম্যানেজার মারা গেল?
উত্তর না দিয়ে প্রবীরবাবু কাপ রেখে তাঁর কাঁধের চামড়ার ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। সেটা খুলে দেখলাম তাতে পেপার কাটিং এবং কিছু ডেথ সার্টিফিকেটের ফটোকপি আছে।
তিনি বললেন,
–এই দু-জন মারা গেল আচমকা হার্ট অ্যাটাকে। শুধু তাই নয়, ফাইলটা উলটে দেখুন, গত একবছরে মান্টোর সমস্ত বিজনেস রাইভাল, বা, যে তার বিরুদ্ধে একটাও কথা বলেছে তাদের একইভাবে মৃত্যু হয়েছে। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মৃত্যু। হার্টফেল। ঠিক যেভাবে আগের মাসে ড্রাগ কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্টের উৎপল মল্লিক মান্টোর ওষুধ কোম্পানির জাল ওষুধের কারবার ধরে ফেলার পরেই মারা যান, কোর্টে কেস ওঠার দু-দিন আগেই, ঠিক সেভাবেই বাকিরাও মারা গিয়েছে। এবার আপনিই বলুন প্রফেসর, ব্যাপারটা কি স্বাভাবিক?
আমি উত্তর না দিয়ে ফাইলের কাগজগুলো পড়তে লাগলাম। প্রবীরবাবু আবার বললেন,
–আপনি এই লিস্টে যাঁদের নাম দেখছেন, তাঁদের সবার না হলেও অনেকের পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। মৃত্যুর আগের মুহূর্তে এই লোকগুলো কী করছিল, জানতে চেয়েছি। প্রত্যেকেই জানিয়েছে যে, কিছু একটা দেখে ভয় পেয়েছিল এরা। যদিও সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত থাকা কেউই কিছু দেখতে পায়নি।
— ঠিক কী দেখেছিল, সেটা কি জানা যায়?
–না। কারণ, যারা দেখেছে তারা তার কয়েক সেকেন্ড বাদেই মারা গেছে। তবে, যেটুকু তারা মৃত্যুর আগে বলেছে, সেগুলো জুড়ে এইটুকু শুধু জানা গেছে যে, জিনিসটা কালো, ধোঁয়াটে এবং হাতে কিছু একটা থাকে। অস্ত্ৰ জাতীয় কিছু হতে পারে।
প্রবীর দত্ত লোকটিকে দেখতে বইয়ের গোয়েন্দাসুলভ না হলেও, লোকটি যে একজন চমৎকার গোয়েন্দা সেটা বেশ বুঝতে পারছি। তিনি যে এই বিষয়ে প্রচুর খেটেছেন এই ফাইলটাই তার প্রমাণ। আমি ফাইল রেখে বললাম,
–এর থেকে কিছুই বোঝা যায় না। এনিথিং এলস? আর কিছু?
খানিকটা ভেবে প্রবীরবাবু বললেন,
–উমম… দু-জনই নাকি বলেছিল যে, ওই কালো অদৃশ্য জিনিসটা হাত বাড়িয়ে কিছু একটা চাইছে। এটা থেকে কি আপনি এই বিষয়ে কিছু আলোকপাত করতে পারেন, প্রফেসর?
— কিছু না। নো আইডিয়া।
–হুম। অতএব, এবার আশা করি বুঝতে পারছেন, কেন আপনার ডাক পড়েছে এই কেসে?
–আপনি নিজে কি বিশ্বাস করেন? আপনি কি অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাসী?
–সত্যি বলতে, ছিলাম না এতদিন। কিন্তু, এই কেসটা আমার বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বাস করুন, অনেক তদন্ত করেও কোনো ব্যাখ্যা আমি দাঁড় করাতে পারিনি। খুবই অস্বাভাবিক পুরো বিষয়টা।
আমি কিছুটা ভেবে বললাম,
–প্রবীরবাবু, এই মান্টো লোকটার বিষয়ে খবর নিন। কোথায় যায়, কার সঙ্গে দেখা করে ইত্যাদি। বিশেষ করে এক বছর আগে, এই মৃত্যুগুলো শুরু হওয়ার আগে আগেই সে কী করছিল, সে-খবর জানা খুব প্রয়োজন।
বেশ। তাই করব। আজ তবে উঠি। কয়েক দিন বাদেই আপনাকে আবার কনট্যাক্ট করব। উইশ মি লাক, প্রফেসর।
৪.
দু-দিন পরেই আবার ফোন এল গোয়েন্দা প্রবীর দত্তর। এই দু-দিনেই বেশ কিছু তথ্য জোগাড় করে ফেলেছেন তিনি। জানালেন,
— আপনি যা খোঁজ নিতে বলেছিলেন সেই অনুযায়ী কিছু তথ্য পেয়েছি। মান্টো সিং একবছর আগে জাপান গেছিল। ঠিক কী কারণে গেছিল, সেটা কিন্তু রহস্য। সেখানে তার কোনো কাজকারবার আছে বলে তো জানা নেই। তবে, সেখান থেকে সে একটা ভারি অদ্ভুত জিনিস নিয়ে ফিরেছে। একটা মূর্তি।
— মূর্তি?
— হ্যাঁ। একটা অদ্ভুত জাপানি মূর্তি। সেটা সম্ভবত চোরাই জিনিস এবং অত্যন্ত দামি। কারণ, সেটা এনেই নাকি মান্টো একেবারে সিন্দুকে তুলে রেখেছে।
–ইস! মূর্তিটা যদি একবার দেখা যেত!
— আপনার মনে হচ্ছে যে, এই খুনগুলোর সঙ্গে ওই মূর্তির কিছু সম্পর্ক আছে?
–এটা আমার ইনট্যুইশন বলতে পারেন। সেগুলো কিন্তু সাধারণত সঠিক হয়। মূর্তিটার ব্যাপারে জানাটা খুব দরকারি বলেই মনে হচ্ছে আমার, প্রবীরবাবু। কোনো কি উপায় নেই?
ওইদিক থেকে বেশ কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না। বোধ হয় ভদ্রলোক কিছু ভাবছেন। তারপর বললেন,
— বেশ। আমি দেখছি কী করা যায়।
পরবর্তী কয়েক দিন আমি রিসার্চ করলাম অনেক। জাপানের সঙ্গে সম্পর্কিত মিথ অনেকটাই জানি, আরও খুঁজলাম। কিন্তু, জাপানের উপকথা, দেবতা, অপদেবতা ইত্যাদির সংখ্যা এতটাই বেশি যে, এর মধ্যে থেকে এভাবে অন্ধকারে ঢিল ছুড়ে কিছুই খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
জাপানের লোককথায় জলের অপদেবতা, পাহাড়ের অপদেবতা থেকে শুরু করে গাঁজানো সোয়াবিন— যেটাকে ওরা নাট্টো বলে— সেই ভূতও আছে। অতএব, আরও কিছু তথ্য না আসা অবধি কোনো কিছুই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
ঠিক দু-দিনের মাথায় গোয়েন্দা প্রবীর দত্তর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা ছবি এল। ছবির লোকটাকে মান্টো সিং বলে চিনতে পারছি। একটা ঘরের ভেতর, একটা আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। ছবিটা যে লুকিয়ে, জানলার বাইরে থেকে নেওয়া হয়েছে বুঝতে অসুবিধা হয় না। কাচের কারণে ফটোটা অস্পষ্ট। কিন্তু, আলমারির ভেতর একটা মূর্তি দেখা যাচ্ছে। সেটাও অস্পষ্ট। জুম করে আরও অস্পষ্ট হয়ে গেল সেটা।
একটা কালো মূর্তি। সেটার মুখ-চোখ বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু, মূর্তিটার হাতে ধরা বস্তুটা বেশ পরিচিত আমার। একটা বড়ো, বাঁকানো ফলা অস্ত্র। ডেথ সাইথ!
মুখ থেকে কথাটা বেরিয়ে গেল,
–গ্রিম রিপার!
‘হ্যাঁ, এটা গ্রিম রিপারই বটে। বাংলায় যাদের আমরা বলি মৃত্যুদূত! জাপানি ভাষায় বলে শিনিগামি।
ততক্ষণে ফোন এসে গেছে প্রবীরবাবুর। বললেন,
–ছবিটা দেখলেন? অস্পষ্ট বটে, তবে সেটাও অনেক কষ্টে জোগাড় করেছি, মশাই।
— দেখলাম। যদি খুব ভুল না করে থাকি তবে ওটা শিনিগামির মূর্তি।
— কী গামি?
— শিনিগামি। ‘শিনি’ অর্থাৎ মৃত্যু, ‘গামি’ মানে গড। অর্থাৎ, ডেথ-গড়! এর উল্লেখ জাপানের বহু কাহিনি ও লোককথায় পাওয়া যায়। যদিও মূর্তিটা জাপানি বলে মনে হয় না।
— এই তো বললেন জাপানি মৃত্যু কী গামির মূর্তি। আবার বলছেন জাপানি নয়?
আমি কিছুটা বিরক্ত হয়েই বললাম,
–মূর্তিটা হয়তো জাপান থেকে কেনা, কিন্তু এই বড়ো বাঁকানো ‘সাইথ’ হাতের মৃত্যুদূতের চেহারা পাশ্চাত্যে বেশি প্রচলিত।
–সাইথটা কী?
মৃত্যুদূতদের হাতে ধারালো অস্ত্র থাকে প্রায় সব মিথোলজিতেই। সেটা তরবারিও হতে পারে, ছুরিও হতে পারে, আবার দণ্ডর মাথায় লাগানো বিশালাকৃতির ব্লেডও হতে পারে। এগুলোকে ‘ডেথ সাইথ’ বলে। পুরাণ অনুযায়ী এই দিয়েই মানুষের আত্মার সঙ্গে তার শরীরের সম্পর্ক ছিন্ন করে মৃত্যুদূত ‘রিপার’-রা। দে রিপ সোলস। সেই থেকেই ‘রিপার’ নাম।
— তাহলে এইটার সঙ্গে সম্পর্ক আছে বলছেন এই মৃত্যুগুলোর?
–আমার তাই মনে হয়। বোধ হয় আমরা ঠিক পথেই এগোচ্ছি প্রবীরবাবু। দুর্দান্ত গোয়েন্দা মশাই আপনি। এবার বলুন তো, এই ছবি পেলেন কীভাবে?
কিছুটা গর্বিত ভঙ্গিতেই উত্তর এল,
–আরে, সে অনেক হ্যাপা, প্রফেসর। মান্টোর বাড়ির কাছে একটা ইন্টারনেট জ্যামার লাগিয়ে দিয়েছিলাম গতকাল রাতে। আজকে গেলাম সেখানে নেট কোম্পানির লোক সেজে। ঘরে ঢুকলাম বটে, কিন্তু লাভ হল না। বেরিয়ে, অপটিকাল ফাইবার চেক করার নাম করে বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করতে লাগলাম সিকিউরিটির চোখ বাঁচিয়ে। কপাল ভালো, এই ছবিটা পেয়ে গেলাম।
তারপর জ্যামার খুলে ভেগে এলাম।
— খুব রিস্ক নিয়ে ফেলেছেন আপনি।
— এটাই তো আমার প্রফেশন।
ফোন রেখে দিলেন প্রবীর দত্ত। আমার কেন জানি না মনটা বিপদসংকেত দিল।
৫.
প্রবীর দত্তর সঙ্গে আবার দেখা হল একসপ্তাহ পরে। এর মধ্যে একদিন নিউ ওরলিয়েন্স থেকে উল্লাস এবং উমা দেবী ভিডিয়ো কল করেছিলেন। প্রবীরবাবুর মুখে শিনিগামি মূর্তির কথাটা শুনেছেন তাঁরা। সেই নিয়েই কিছুক্ষণ কথা হল। আমি যে বিষয়টা নিয়ে সময় দিচ্ছি সেইজন্যে আরও একবার ধন্যবাদ জানিয়ে কল ছাড়লেন তাঁরা।
এক সন্ধ্যাবেলা সবে ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে কফির কাপ নিয়ে বসেছি, তখনই বেল বাজল। এমনিতেই তিনটে ক্লাস ছিল আজ, তাই খুবই ক্লান্ত। বেল বাজায় খানিকটা বিরক্ত হয়েই উঠে গিয়ে দরজা খুললাম। দেখলাম প্রবীর দত্ত এসেছেন।
— আরে! আসুন, আসুন। ফোন করে এলেন না যে?
ভদ্রলোক কথাটা শুনতে পেলেন বলে মনে হল না। কেমন যেন উদ্ভ্রান্ত লাগছে মানুষটাকে। যদিও মাথায় টাক, তবুও কানের দু-পাশের অবশিষ্ট চুল বেশ পরিপাটি করে রাখেন দেখেছি আগের দিন। আজ সেগুলো উশকোখুশকো। অন্যমনস্ক এবং চিন্তিত মনে হল দেখে।
তাঁকে ভেতরে বসিয়ে রান্নাঘরে ওঁর জন্য এককাপ ব্ল্যাক কফি বলে এসে জানতে চাইলাম,
–কী হয়েছে, মশাই? কোনো সমস্যা?
ওপর-নীচে ঘাড় নাড়লেন ভদ্রলোক। বললেন,
–সেদিন আমি ধরা পড়ে গেছি মনে হয়।
–কী? কবে?
–সেদিন যে ছবি তুলে এনেছিলাম। মান্টো বোধ হয় কোনোভাবে আমায় চিনে ফেলেছে।
— সেকী!
–হ্যাঁ। আমার বাড়ি কাল লোক ঢুকেছিল দুপুরে। আমি তখন আমার আমহার্স্ট স্ট্রিটের অফিসে। ফিরে এসে দেখি, তালা ভাঙা।
— কিছু চুরি করেছে?
— নাহ্। কিচ্ছু না। কোনো জিনিসে হাতও দেয়নি।
— সেকী! তাহলে আপনার বাড়ি ঢুকল কেন?
–সেটাই তো বুঝতে পারছি না! কিচ্ছু চুরি যায়নি বাড়ি থেকে
— আপনি নিশ্চিত কোনো কিছু নেয়নি?
হ্যাঁ। সব ঠিক ছিল যেমন রেখে গেছিলাম বেরোনোর আগে। শুধু…
–শুধু?
–ও কিছু নয়।
— না, না। বলুন, বলুন।
একটু লজ্জা পেয়েই তিনি বললেন,
–তেমন কিছু না। আমার চিরুনিটা পাচ্ছি না।
— চিরুনি?
–মানে, সেদিনের পর থেকে আর পাইনি। ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ নয় জানি, আপনি হাস্যকর ভাবছেন। ওটা বোধ হয় আমিই কোথাও…। যদিও পরিষ্কার মনে পড়ছে, আয়নার সামনের তাকে রেখে গেছিলাম।
আমি কিন্তু ব্যাপারটা উড়িয়ে দিতে পারলাম না। আমার মন বলছে, এটা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।
এরপর আরও কিছুক্ষণ মান্টো সিংকে নিয়ে কথা হল আমাদের মধ্যে। আমি আশঙ্কা প্রকাশ করলাম যে, প্রবীরবাবুর বিপদ হতে পারে। তাতে তিনি বললেন,
— আমি সেই কারণেই ঠিক করেছি কয়েক দিনের জন্যে কলকাতার বাইরে যাব। পুরীতে আমার এক বন্ধুর একটা হলিডে হোম আছে। সেখানে কাটিয়ে আসি দিন পনেরো। কি বলেন?
–গুড আইডিয়া। শিনি-গামির কথা জানি না, কিন্তু মান্টো লোক লাগিয়ে যে আপনার ক্ষতির চেষ্টা করবে না তার গ্যারান্টি নেই। অতএব, কয়েক দিন দূরে থাকাই ভালো।
–হ্যাঁ। আজকে রাতেই ট্রেন। আপনিও সাবধানে থাকবেন। আজ তবে আসি। আবার ফিরে এসে দেখা হবে দিন পনেরো পর
প্রবীর দত্ত বেরিয়ে যাওয়ার পরেই আমার একটা অনুভূতি হল। খুব খারাপ একটা কথা মনে হল। আমার মনে হল, প্রবীর দত্তর সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।
আমার এই মনে হওয়াটা যে কতটা ঠিক ছিল সেদিন, তা ঠিক তার তিনদিন পরেই জানতে পারলাম।
৬.
তিনদিন পরের রাতে ঘুম ভেঙে গেল মোবাইলের শব্দে। ঘুম থেকে উঠে মোবাইলে সময় আর কলারের নাম দেখলাম। রাত একটা বেজে দুই। ফোন করছেন প্রবীর দত্ত।
ফোন তুলে ‘হ্যালো” বলার সুযোগ দিলেন না তিনি, ভয়ার্ত কণ্ঠে শুধু পরবর্তী কয়েক সেকেন্ড কথা বলে গেলেন,
— কালো ধোঁয়া ধোঁয়া একটা জিনিস। মুখ-চোখ নেই। হাতে একটা ধারালো, বাঁকা অস্ত্র। ও এসেছে! হাত বাড়িয়ে আমার থেকে কিছু চাইছে! না… না… ওটা আসছে!
ফোন ছেড়ে দৌড়োনোর শব্দ এল। কিছু একটা উলটে পড়ল। একটা আতঙ্ক মাখা চিৎকার। তারপরেই সব চুপ।
প্রায় একইসঙ্গে বাড়ির সামনের কালীমন্দির থেকে ঘণ্টার শব্দ ভেসে এল। আজ বৈশাখী অমাবস্যা।
আমি কিছুক্ষণ ফোন হাতে হতবুদ্ধি হয়ে বসে থাকলাম। কী ঘটল একটু আগে বোঝার চেষ্টা করছি। আর, যতই বুঝতে পারছি, ততই পরিষ্কার হচ্ছে যে, একটু আগে ফোনে যে মানুষটার সঙ্গে কথা বললাম, সে আর কোনোদিন কথা বলবে না।
আমি তাও বার কয়েক ফোন বাজালাম, ফোন কেটে। রিং হয়ে গেল।
আমি বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালাম। ঘণ্টা-কাঁসর ধ্বনি বাড়ছে মন্দিরের দিক থেকে। আমার মাথায় জট পাকিয়ে গেছে। প্রচণ্ড নিরুপায় লাগছে নিজেকে। আর, বার বার নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে। কারণ, আমারই কথায় প্রবীরবাবু গিয়েছিলেন মান্টো সিং-এর বাড়িতে গোয়েন্দাগিরি করতে। আর, তাতেই ওঁর বিপদ হল। প্রাণ দিয়ে মূল্য চোকালেন তিনি। আমি এখনও অবধি কোনোভাবেই তাঁকে সাহায্য করতে পারিনি। অথচ, তিনি মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও আমাকে ফোন করে তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করলেন। নিজের ওপর এতটা হতাশা আমার কোনোদিন জাগেনি বোধ হয়।
আমি জানি একটি লোক একের পর এক খুন করে চলেছে একটা অতিপ্রাকৃত শক্তির সাহায্যে। অথচ, আমি জানি না কীভাবে তাকে আটকানো যায়! কী করব আমি? পুলিশের কাছে গিয়ে কোনো লাভ নেই। কারণ, আগের সবক-টা মৃত্যুর মতোই প্রবীরবাবুর মৃত্যুটাও হার্ট অ্যাটাকেই হয়েছে, আমি জানি। এটাকে কোনোভাবেই খুন প্রমাণ করা যাবে না।
না, না। মাথা ঠান্ডা করতে হবে। হার মেনে নিলে চলবে না।
বারান্দায় বসে পড়লাম পদ্মাসনে। চোখ বন্ধ করে ফোকাস করার চেষ্টা করলাম মন্দির থেকে ভেসে আসা মন্ত্রর শব্দে।
একটু চেষ্টা করতে মন কিছুটা শান্ত হল। উঠে গিয়ে মোবাইল খুলে ক্যালেন্ডার দেখলাম। একটা সন্দেহ মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন ছিল।
তারপর নিজের কর্তব্য স্থির করলাম। প্রবীরবাবুর মৃতদেহ এই মুহূর্তে পুরীর কোনো এক হলিডে হোমে পড়ে আছে। তার ব্যবস্থা করা দরকার।
ফোনের কনট্যাক্ট খুঁজে আমার পরিচিত এক কলকাতা পুলিশকর্তাকে কল করলাম। প্রথমেই এতরাতে বিরক্ত করার জন্যে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে তাঁকে জানালাম যে, আমার পরিচিত একজন পুরীর কোনো এক হলিডে হোমে, আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতেই মারা গেছেন। তিনি যেন ওড়িশা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানালেন, তিনি দেখছেন ব্যাপারটা। ফোন রাখার আগে আরও একটা জিনিস বলব বলে মনে করেই রেখেছিলাম,
— আরও একটা রিকোয়েস্ট আছে।
৭.
–তোর সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছে।
পরের দিনের লেকচারের জন্যে একটু পড়াশোনা নিয়ে বসেছিলাম। মায়ের কথা শুনে বইয়ের নির্দিষ্ট পেজে পেন রেখে বই বন্ধ করতে করতে
প্রশ্ন করলাম,
— কে এসেছে?
–কে জানে। মিস্টার সিংহ নাম বলল। কেমন একটা অদ্ভুত দেখতে লোকটাকে।
–অদ্ভুত?
–হ্যাঁ। কেমন একটা যেন। চেনা চেনা লাগছে মুখটা, কিন্তু মনে করতে পারছি না।
আমি নীচে নামতে শুরু করলাম। পেছন থেকে মা বলল শুনলাম,
— চা পাঠাচ্ছি। তোর জন্যে করব?
–না।
বৈঠকে ঢুকে দেখলাম একজন লোক আমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে টাঙানো মা দুর্গার ফ্রেম করা বড়ো মূর্তিটা দেখছেন। আমি যে ঢুকেছি, তা তিনি টের পাননি। তাই বললাম,
— হ্যালো।
লোকটি ঘুরলেন আমার দিকে, আর সঙ্গেসঙ্গেই আমি পাথরের মতো স্থির হয়ে গেলাম।
–হ্যালো, প্রফেসর সাহাব। আপনার অনেক নাম শুনলাম, চেনা- পরিচিতদের কাছে। ভাবলাম, একবার দেখা করে যাই। মাইসেল্ফ মান্টো সিং। চেনেন নিশ্চয়ই?
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কী করা উচিত ভাবার চেষ্টা করছি। এই সাপটা এখানে এল কেন? বোকা সেজে যাব? কিছুই না জানার ভান করব? নাকি, সরাসরি কথা বলব?
মান্টো এগিয়ে এসে হাত মেলানোর জন্যে নিজের ডান হাত বাড়িয়ে দিল। এটা কেউ করলে হাত বাড়িয়ে দেওয়াই আমার অভ্যাস। তাই নিজে থেকেই হাত এগিয়ে গেল। মান্টো দৃঢ়ভাবে হাত চেপে ঝাঁকুনি দিল।
সঙ্গেসঙ্গেই একটা মৃদু যন্ত্রণা টের পেলাম হাতে। পিঁপড়ে কামড়ানোর মতো। মান্টো হাত ছেড়ে জিভ কেটে বলল,
— আরে, সরি সরি! হাতটা কেটে গেল নাকি?
আমি হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম হাতের তালুতে ছোট্ট একটা রক্তবিন্দু দেখা যাচ্ছে।
মান্টো সেটা দেখে আরও একবার লজ্জায় গলে গিয়ে বলল,
–মাফ করবেন, প্রফেসর সাব। হাতের নতুন আংটিটা ধার হয়ে আছে। তাতেই লাগল। রুকিয়ে, অভি পোছ দেতে হ্যায়।
মান্টো হাতে দস্তানা পরে আছে। দস্তানার ওপর আংটি। লোকটার মতলব কী? ইচ্ছে করে হাতে ধারালো আংটি পরে এসেছে আমি নিশ্চিত। কিন্তু, গ্লাভস কেন?
মান্টো তার পকেট থেকে একটা নতুন, ফটফটে সাদা রুমাল বের করে দ্রুত আমার হাতের থেকে রক্ত মুছে দিল। বাধা দেওয়ার আগেই কাজটা সে করল।
— যাহ্। রুমালটা খারাব হয়ে গেল। কোই বাত নাহি— কোই বাত নাহি! লোকটা খোলা বাইরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকল,
–নরেন্দ্র!
নরেন্দ্র লোকটা দরজাতেই দাঁড়িয়ে ছিল বোধ হয়। কারণ, সঙ্গেসঙ্গেই সামনে এসে দাঁড়াল। এ বোধ হয় মান্টোর বডিগার্ড। সাদা রুমালটা সে এই লোকটির হাতে দিয়ে বলল,
— ফেক দেনা।
তারপর নিজেই দরজা বন্ধ করে আমার দিকে ঘুরে কান-এঁটো-করা হাসি হাসল। আমার মনে হল ঠিক যেন একটা হায়না তার শিকার, কোনো পা ভাঙা হরিণকে দেখে হাসছে। একটু আগের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো গুলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু, আমার মন বলছে আমি মারাত্মক একটা ভুল করে ফেলেছি। কিন্তু, কী ভুল?
মান্টো আমার আমন্ত্রণের অপেক্ষা না করেই নিজে বড়ো সোফাটায় বসল। তারপর ঠিক যেন তার ঘরে আমি অতিথি, এমন ভঙ্গিতে ছোটো কেদারাটার দিকে ইঙ্গিত করে বলল,
–বসুন, প্রফেসর।
আমি বসলাম। এইবার ভালো করে মান্টো সিংকে দেখার সুযোগ হল। লোকটিকে দেখে অদ্ভুত লাগার কারণগুলো এইবার বুঝতে পারলাম।
প্রথমত, লোকটি মাথা বাদে সারাশরীর ঢাকা পোশাক পরে আছে। ঘরে পায়ের জুতো খুলেও ঢোকেনি। দ্বিতীয়ত, লোকটির সারামুখে চুলের লেশমাত্র নেই। মাথা, গাল এমনকী ভুরুজোড়াও মসৃণ করে কামানো। মান্টো সিংকে কয়েক বছর আগে টিভিতে দেখেছি, তখন তো বড়ো চুল, গোঁফ ছিল, মনে পড়ছে।
–প্রফেসর সাহেব!
–হুঁহ?
চিন্তায় ব্যাঘাত পড়ল মান্টোর কথায়। বলল,
— শুনেছি আপনি অনেক পড়াশোনা করেছেন। দুটো পিএইচ.ডি. না মাস্টার্স কী সব আছে।
লোকটির মুখে হাসি লেগেই আছে। অথচ, চোখে কুটিল, নিষ্ঠুর দৃষ্টি। বলে চলেছে,
–আমি মশাই একেবারে অনপড় গাঁওয়ার। বলতে পারেন আমি আপনার একদম উলটো। এই যেমন, আমি শুনেছি আপনি বিশ্বাস করেন ‘জ্ঞান হল আসল শক্তি’। আমি মানি না। আমি মনে করি, টাকা আর ক্ষমতাই হল আসল শক্তি।
লোকটা একাই কথা বলে যাচ্ছিল এতক্ষণ। চুপ করল। মুখের ভাব পরিবর্তন হল। প্রসঙ্গ পালটে প্রশ্ন করল,
–প্রবীর দত্তকে চিনতেন?
লোকটা তাহলে সোজাসুজি কথা বলতে চায়। বেশ, তবে তাই হোক। উত্তর দিলাম,
–হ্যাঁ।
–সে মারা গেছে, নিশ্চয়ই শুনেছেন? পুরী না দিঘা কোথাকার কোন এক জায়গায়। আমি চুপ রইলাম। লোকটি আবার বলল,
— আমার ওপর ও জাসুসি করছিল। ওই উৎপল মল্লিকের বিধবাটা আমার পেছনে একে লাগিয়েছিল। তা, কী ফায়দা হল?
আমার দিকে তাকিয়ে আবার হেসে বলল,
— শুনলাম এই লোকটি নাকি কয়েক বার আপনার সঙ্গেও দেখা করেছে।
— হ্যাঁ।
— আমার ঘরে মিথ্যে বলে ঢুকে কিছু ফটো নিয়েছিল। সেগুলো আপনি দেখেছেন?
— কিছু নয়। একটাই। দেখেছি।
— তা কী দেখেছেন?
— আপনার সিন্দুকের মূর্তিটা।
ও, তা কী বুঝলেন দেখে? শুনলাম ওই জাসুসের ফোনটা আপনি জোগাড় করেছেন নিজের পুলিশ বন্ধুকে ধরে। তা, জানেন ওটা কীসের মূর্তি?
–মৃত্যুদূত, যাদের পাশ্চাত্য বলে গ্রিম রিপার, ইসলামে বলে আজরাইল, আর যে দেশ থেকে আপনি ওটা এনেছেন সেই দেশের ভাষায় শিনিগামি
মান্টো সিং-এর চোখে আগুন জ্বলে উঠেছিল একমুহূর্তের জন্যে। যদিও মুখে হাসি লেগেই আছে। বলল,
— ব্যস, এইটুকু? নাকি, আরও কিছু?
— বাকিটা অনুমান করতে পারি। মূর্তিটার মাধ্যমে আপনি একটি রিপার, অর্থাৎ, শিনিগামিকে বশ করতে পেরেছেন। এই মূর্তিটা সম্ভবত বহু প্রাচীন, কোনো অতি শক্তিশালী তান্ত্রিকের সৃষ্টি। কোনোভাবে সেটা আপনার হাতে এসেছে। রিপারকে দিয়ে আপনি আপনার শত্রুদের সহজেই সরিয়ে দিতে পারছেন। অথচ, মৃত্যু হচ্ছে হার্ট অ্যাটাকে। ন্যাচারাল ডেথ।
–বেশ। আর?
–কিন্তু, মৃত্যুদূতটি সক্রিয় হয়ে ওঠে শুধুমাত্র অমাবস্যা রাতে। কারণ, খুঁজে দেখলাম সবক-টা মৃত্যুর তারিখে অমাবস্যা ছিল।
এইবার মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়ে একটা হিংস্র ভাব ফুটে উঠল মান্টো সিং-এর। বলল,
— প্রমাণ করতে পারবেন এইসব?
–অস্বীকার তাহলে করছেন না আপনি আমার কথাগুলো।
— আর কী জানেন?
— আর কিছু জানলেও আপনাকে বলতে চাইছি না।
— তার মানে এর বেশি কিছু আপনি জানেন না। জানতে চান?
আমি উত্তর দিলাম না। মান্টো নিজেই বলল,
— ওই কালো পাথরের মূর্তিটার পূজা করার নিয়ম খুব সহজ। রোজ একবার করে জপ করতে হয় একটা মন্ত্র। তবে, ওটার ব্যবহার আরও সহজ। মূর্তিটার ডান হাত সামনের দিকে বাড়ানো আছে। আমায় শুধু অমাবস-এর রাত মে, ওটার হাতে আমার শত্রুর চুল, নখ, দাঁত বা রক্ত তুলে দিতে হয়। ব্যস! বাকি কাজ ওই মৃত্যুদেবতা নিজেই করে নেয়।
আমার মুখে বোধ হয় ভয়ের একটা রেখা ফুটে উঠেছিল, সেটা দেখেই মান্টো বলল,
–ঠিকই ধরেছেন, প্রফেসর। আপনি বুদ্ধিমান মানুষ। আপনার রক্তমাখা রুমালটা আপাতত আমার কাছেই থাকবে। অন্তত আরও ছ-দিন থাকবে।
আমার বুঝতে অসুবিধে হল না মান্টো কীসের কথা বলছে। আর ছ-দিন বাদেই আবার অমাবস্যা! প্রবীরবাবুর চিরুনি চুরি যাওয়ার কারণটাও স্পষ্ট। চুল!
প্রবীরবাবুর চুল ব্যবহার করেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। ঠিক যেভাবে আমার রক্ত ব্যবহার করে ছ-দিন বাদে আমাকে হত্যা করা হবে!
মা চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকল ঠিক সেই মুহূর্তে। তাঁকে দেখেই মান্টো হাতজোড় করে বিগলিত হাসি হেসে বলল,
— নমস্তে, মাইজি!
মা শুকনো হেসে সেন্টার টেবিলে চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। মান্টো উৎসাহের সঙ্গে কাপ তুলে তাতে চুমুক দিয়ে একটা তৃপ্তির শব্দ করে বলল,
— বাহ্! বঢ়িয়া চা-য় হয়েছে, মাইজি।
মায়ের নজর পড়েছে আমার মুখের দিকে। মা বলল,
— কী রে? তোর শরীর খারাপ নাকি? এরকম লাগছে কেন তোর মুখটা?
আমি কষ্ট করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললাম,
— কিছু না। ভেতরে যাও
মান্টো বলল,
— আপনার চা খেয়েই বুঝতে পারছি আপনার রান্না খুব ভালো। প্রফেসর সাহেব খুব লাকি। আপনি ওঁকে আগামী কয়েক দিন ভালো ভালো খানা খাওয়ান মাইজি। ক্যা পতা, কল হো না হো।
কথার ইঙ্গিত মা বুঝতে না পেরে আরও একবার শুকনো হেসে ভেতরে চলে গেল। তৃপ্তির সঙ্গে গোটা কাপের চা শেষ করল মান্টো সিং। কাপ নামিয়ে রেখে আরও দু-বার ‘বঢ়িয়া’ বলে আমার দিকে ঘুরে বলল,
–আপনার সঙ্গে আমার শত্রুতা নেই। যদিও ইস্কুল থেকেই আমার এই টিচারদের সহ্য হয় না। তাই তো পড়াশোনা করিনি আর স্কুলে গিয়ে। এই মাস্টার প্রফেসরদের মধ্যে না, একটা সবজান্তা ভাব থাকে। একদম সহ্য হয় না! আসলে, এরা হল এই দেশের সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় পাবলিক। এরা না থাকলেও দেশ দিব্যি চলত। এই তো আমি, পড়াশোনা জানি না, তাতে আমার কোনো ক্ষতি হয়েছে? আমি হলাম কিং!
আমার এই মুহূর্তে লোকটাকে একটা ঘুসি মারতে ইচ্ছে করছে।
মান্টো বলল,
— যো ভি হো, যা বলছিলাম, আপনার সঙ্গে আমার কোনো দুশমনি নেই। তাই আপনাকে শেষ মওকা দিচ্ছি, প্রফেসর। যা জানেন, তা ভুলে যান। আমার ব্যাপারে আপনি আর নাক গলাবেন না। ওই ফোন আমাকে দিয়ে দেবেন। ব্যস, তাহলে আপনাকে আমি ছেড়ে দেব।
মান্টোর নামিয়ে রাখা ফাঁকা চায়ের কাপটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মন শাস্ত করতে কোনো একটা প্যাটার্নের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। কাপের চায়ের তলানি একটা অদ্ভুত নকশা তৈরি করেছে কাপের তলায়। অনেকটা একটা টেডি বিয়ারের মতো লাগছে। মন কিছুটা শান্ত হল। এরপর কিছুক্ষণ মান্টোর দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম,
— মান্টো সিং, অপরাধীদের ধরা আমার কাজ না। কিন্তু, যখন কেউ আমার থেকে সাহায্য চান, তখন তাঁকে শেষ অবধি সাহায্য করাটা আমার অভ্যাস। বা, বলতে পারো, আমার প্রতিজ্ঞা। তাই পিছিয়ে আমি আসব না, মান্টো। তা ছাড়া, আমার কী মনে হয় জানো? তুমি আজ নয়তো কাল ঠিকই আমায় খুন করবে। কারণ, নিজের গোপন কথা ফাঁস করে দিয়ে তুমি আমায় বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখবে না। তুমি নিজে খুবই প্যারানয়েড একজন মানুষ। যে কারণে তুমি নিজের শরীর ঢেকে রাখো, চুল, ভ্রূ পর্যন্ত কামিয়ে রেখেছ। কারণ, তুমি ভয় পাও যে, অন্য কেউ একই উপায়ে তোমার চুল, নখ ব্যবহার করে হয়তো তোমায় খুন করার চেষ্টা করবে। আসলে, অসম্ভব শক্তিশালী অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তাকে বশ করতে চাইলে এইরকমই হয়। মানুষ তার মস্তিষ্কের সুস্থতা হারায়। ভয় তাদের চিরসঙ্গী হয়।
মুখে হিংস্র ভাব ফুটে উঠল মান্টো সিং-এর। উঠে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— নিজের জীবনের শেষ কয়েকটা দিন ভালোভাবে কাটিয়ে নাও তবে, প্রফেসর। এরপর লোকটা বাড়ি থেকে সোজা বেরিয়ে গেল। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আওয়াজ পেলাম।
আমি এখনও বসেই আছি। মান্টোর চায়ের ফাঁকা কাপের তলানির নকশার টেডি বিয়ার দেখছি। মনের ভয়টা কেটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
মন বলছে, এই রহস্যের কোনো একটা দিক এখনও উন্মোচিত হওয়া বাকি আছে।
৮.
বাড়ির বাইরের কলিং বেলটা বাজালাম, কিন্তু সেটা বাজল বলে তো মনে হল না। তাই একবার ডাক দিলাম,
–পণ্ডিতমশাই।
গলার আওয়াজ বেশি তুললাম না। জানি, তার প্রয়োজন নেই। কাশীনাথ পণ্ডিত শুনতে পাবেন ঠিকই।
— প্রফেসর? এসো, এসো। দরজা খোলাই আছে।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। বরাবরের মতোই ন্যূনতম আসবাব দিয়ে সাজানো একটা ঘর। এককোণে খাট, দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার, দুটো মোড়া। এককোনায় ঠাকুরঘর, শিবলিঙ্গ, ধূপ। পাশের দরজা দিয়ে রান্নাঘর আর বাথরুমে যাওয়া যায়। রান্নাঘর থেকে শব্দ আসছে, মানে কাশীনাথ পণ্ডিত ওখানেই আছেন।
আমি একটা চেয়ারে বসলাম। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, বৃদ্ধ খানিক পরেই বেরিয়ে এলেন। চোখে কালো চশমা, কারণ তিনি জন্মান্ধ। কিন্তু, ভদ্রলোক অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতার পরিচয় পূর্বেই অনেকবার পেয়েছি।
–বলো প্রফেসর, কেমন আছ?
উঠে দাঁড়িয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। কাশীনাথের সামনে এলে আমার মধ্যে প্রথমেই একটা অপরাধবোধ আসে, কারণ এই লোকটিকে আমি প্ৰথম সাক্ষাতে ভণ্ড বলে সন্দেহ করেছিলাম। যদিও তার কারণও আছে, আধ্যাত্মিক ক্ষমতাধর বলে দাবি করা মানুষদের মধ্যে, আমার দেখা পঁচানব্বই শতাংশই ভণ্ড
— সংকট নিয়ে এসেছি, পণ্ডিতমশাই।
— হা হা! হ্যাঁ, তা ছাড়া আর তোমার সাক্ষাৎ পাই কোথায়, প্রফেসর। তা, বলো কীসের সংকট? কার সংকট?
— জীবনসংকট পণ্ডিতমশাই এবং এইবার সেটা অন্য কারুর নয়, আমার নিজের।
নড়বড়ে খাটটার ওপর কাশীনাথ বসলেন, আমি একটা চেয়ার টেনে তাঁর মুখোমুখি বসলাম। আমি উমা দেবী আর তাঁর ছেলের আমার বাড়িতে আসা থেকে নিয়ে গতকাল সন্ধেবেলা মান্টো সিং-এর আগমন অবধি পুরো ঘটনা খুলে বললাম। সব শুনে কিছুক্ষণ কোনো কথা বললেন না কাশীনাথ পণ্ডিত। তারপর আমায় বললেন,
— অপশক্তিকে প্রতিহত করা যায়। কিন্তু, স্বয়ং মৃত্যুকে প্রতিহত করার কোনো উপায় আছে কি? তবে, ওই মূর্তিটা পেলে নিশ্চয়ই একটা কোনো উপায় হত। সেটা কি পাওয়া সম্ভব?
আমি দু-দিকে ঘাড় নেড়ে বললাম,
— অসম্ভব। আমি নিশ্চিত মান্টো ওর বাড়ির সিকিউরিটি দ্বিগুণ করেছে ইতিমধ্যে।
— তাহলে? আমার মনে হচ্ছে তোমার কোনো পরিকল্পনা আছে।
— ঠিক পরিকল্পনা না। একটা ইনট্যুইশন বলতে পারেন।
আমি পকেট থেকে জিপ ব্যাগে মোড়া সেল ফোনটা বের করলাম। বললাম,
–এটা প্রবীরবাবুর ফোন। মান্টো খবর পেয়েছে যে, আমি এই ফোনটা জোগাড় করেছি পুলিশের সাহায্যে। ও ভেবেছে এতে জরুরি কোনো তথ্য বা ছবি আছে। সেটা ও ভুল ভেবেছে। এটাকে সঙ্গে আনার কারণ অন্য, যেটা মান্টোর পক্ষে জানা সম্ভব নয়।
ফোনটা বের করে আমি কাশীনাথের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম,
ফোনটা আমি আপনার জন্যেই এনেছি। মৃত্যুর মুহূর্তে প্রবীরবাবুর হাতে এই ফোনটা ছিল। আপনার ক্ষমতার যেটুকু পরিচয় আমি পেয়েছি, তাতে অনুমান করতে পারি যে, এটার স্পর্শে আপনি তার মৃত্যুর মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করতে পারবেন।
মৃদু হেসে হাত পেতে ফোনটা নিলেন বৃদ্ধ। বাঁ-হাতের তালুতে ফোনটা রেখে ডান হাত দিয়ে চেপে ধরলেন সেটাকে। পরবর্তী কয়েক মিনিট চুপচাপ বসে থাকলেন। আমি অপেক্ষা করলাম ততক্ষণ।
তারপর মুঠো আলগা করে তিনি বললেন,
–দেখলাম।
আমি উদ্গ্রীব হয়ে প্রশ্ন করলাম,
— কী দেখলেন?
–বলার চেয়ে দেখানো সহজ হবে।
–মানে?
উত্তর না দিয়ে, বাঁ-হাতে আবার ফোন চেপে ধরে ডান হাতের তর্জনী আমার দু-চোখের মধ্যে ছোঁয়ালেন। আমায় নির্দেশের ভঙ্গিতে বললেন,
–চোখ বন্ধ করো। মন একাগ্র করো।
চোখ বুজে মাত্র কয়েক সেকেন্ড কনসেন্ট্রেট করার সঙ্গেসঙ্গেই কিছু দৃশ্য ভেসে উঠল। ঠিক যেন আমি স্বপ্ন দেখছি। তবে, সম্পূর্ণ সচেতন অবস্থায় দেখছি।
একটা অচেনা ঘর। আলো জ্বলছে। একটা খাট, টেবিল ল্যাম্প, একটা ট্রলি সুটকেস, কিছু জামাকাপড় ছড়িয়ে আছে। বুঝলাম, আমি প্রবীরবাবুর চোখ দিয়ে তাঁর জীবনের শেষ কয়েকটা মুহূর্ত দেখছি।
হঠাৎ ঘরের এককোণে অন্ধকার জমাট বাঁধা শুরু করল। একটা রূপ নিচ্ছে অন্ধকার। এই মুহূর্তেই আমায় ফোন করেছিলেন তিনি।
একটা কালো মূর্তি ফুটে উঠেছে। মুখ, শরীর ঢাকা অন্ধকারের চাদরে। সেটার শরীরের আবরণ যেন অন্ধকার দিয়েই তৈরি। দীর্ঘ, শীর্ণ দুটো হাত দেখা যাচ্ছে। একহাতে একটা লম্বা কালো লাঠি, যার একদিকের মাথাটা বেঁকে গিয়ে তরবারির মতো হয়েছে। গ্রিম রিপারের ডেথ সাইথ!
মূর্তিটা তার অন্য হাতটা বাড়িয়ে ধরল সামনে। কিছু একটা চাওয়ার ভঙ্গিতে। হাত পেতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল সেই মৃত্যুদূত। তার পরেই দু-হাতে চেপে ধরল হাতের অস্ত্রটা। পরমুহূর্তে ধেয়ে এল আমার দিকে।
কপাল থেকে কাশীনাথ পণ্ডিতের আঙুল সরে গেল অনুভব করতে পারলাম। দৃশ্য মিলিয়ে গেছে। আমিও চোখ খুললাম। টের পেলাম কপালে ঘাম জমেছে। চশমা খুলে রুমাল দিয়ে ঘাম মুছলাম। প্রশ্ন করলাম,
–ও কী চাইছিল হাত বাড়িয়ে?
— বিনিময়।
–মানে? কীসের বিনিময়?
— প্রাণের বিনিময় একটা জিনিসই চাওয়ার থাকতে পারে, প্রাণ।
–মানে? আমি বুঝতে পারছি না।
–একজন মৃত্যুদূত প্রচণ্ড শক্তিশালী একটা সত্তা। তাকে বশ কীভাবে বা কে করেছে আমার জানা নেই, তবে কখনোই তাকে সম্পূর্ণ বশ করা যায় না। যেহেতু তার সামনের ব্যক্তির মৃত্যু স্বাভাবিক নিয়মে হচ্ছে না, তাই এই মৃত্যুদূতটি তার শিকারকে বাঁচার শেষ সুযোগ দেয়। তার সামনের ব্যক্তির প্রাণের বিনিময়ে অন্য কারুর প্রাণ চায়। যদি শেষমুহূর্তে অন্য কোনো ব্যক্তির প্রাণ তুলে দেওয়া যায়, তবে সেই ব্যক্তিকে ছেড়ে সে দ্বিতীয় মানুষের প্রাণ হরণ করতে যাবে। বেঁচে যাবে প্রথমজন।
ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করতে আমার বেশ কিছুটা সময় লাগল। যে কথাটা ভাবছিলাম সেটাই মুখ ফুটে বলে ফেললেন কাশীনাথ পণ্ডিত,
–তোমায় বাঁচতে হলে এই মৃত্যুদূতের হাতে তোমায় তুলে দিতে হবে অন্য কারুর প্রাণ। তোমার জীবনের মূল্য অন্য কারুর মৃত্যু। কীভাবে সেই বিনিময় হবে তার উপায় নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছ?
হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছিলাম উপায়টা। অন্য কোনো ব্যক্তির চুল, দাঁত বা রক্ত তুলে দিলেই শিনিগামি তার সামনের শিকারকে ছেড়ে অন্যজনের প্রাণ হরণ করতে চলে যাবে। এইবার বুঝতে পারছি মান্টো সিং-এর প্যারানোইয়ার আসল কারণ। কেন সে নিজের শরীরের চুল রাখেনি, শরীর ঢেকে রাখে। হয়তো দাঁতগুলোও তার নকল। আসল দাঁত তুলে ফেলেছে অনেক আগেই।
— কী করবে তুমি, প্রফেসর?
চিন্তায় ছেদ পড়ল বৃদ্ধর কথায়। প্রশ্ন করলেন,
— নিজের প্রাণ বাঁচাতে অন্যকে বলি দেবে?
৯.
আমার ঘরের বড়ো দেওয়াল ঘড়িতে এখন বাজে ১০.২৬। আর ঠিক ছ-মিনিট, মানে, রাত ১০.৩২-এ অমাবস্যা লাগছে। গত তিনটে দিনের মানসিক টানাপোড়েন আমায় যতটা ক্লান্ত করেছে, ততটা আমি আগে কোনোদিন হইনি। প্রতি মুহূর্তে, প্রতিটা কাজের মধ্যে আমার মাথায় শুধু একটাই প্রশ্ন এসেছে — ‘কী করব আমি?”
নিজেকে বাঁচানোর উপায়টা বেশ সহজ, কিন্তু তার জন্যে আমায় জেনেশুনে অন্য কাউকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে হবে। পরোক্ষভাবে আমিই হব সেই ব্যক্তির হত্যাকারী। মনকে শক্ত করে ডিসিশন নিতে আমায় প্রবল মানসিক দ্বন্দ্বর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে গত কয়েক দিন।
আমি ক্লান্ত। নিজের ঘরের খাটে বসে আমার ঘুম পাচ্ছে। ইচ্ছে করছে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়তে। আসুক মৃত্যু, নিয়ে যাক আমায় নিঃশব্দে। কিন্তু না, আমায় জাগতে হবে। একটা পরীক্ষা করতে হবে। এক্সপেরিমেন্ট! আমার মতো একজন বিজ্ঞানীর জীবন জুড়েই তো এক্সপেরিমেন্ট। কিন্তু, যদি এই এক্সপেরিমেন্টে আজ আমি সফল না হই, যদি আমার হাইপোথিসিস ভুল হয়, তবে এটাই আমার জীবনের শেষ পরীক্ষা। এবং, আজকের এই মুহূর্তগুলো আমার জীবনের শেষ কয়েকটা মুহূর্ত হতে চলেছে।
সময় হয়েছে। সম্ভবত এখন ওই লোকটা তার আলমারি থেকে ওই শিনিগামির মূর্তিটা বের করে তার ক্রিয়া শুরু করেছে। সেটা কী ক্রিয়া বা কতক্ষণ সময় লাগে, তা আমি জানি না। তবে, একটু বাদেই সেই মূর্তিটার হাতে তুলে দেওয়া হবে আমার কয়েক ফোঁটা রক্ত লাগা একটা রুমাল। মূর্তির মাধ্যমে বন্দি এক শক্তিশালী মৃত্যুদূত খুঁজে নেবে সেই ব্যক্তিকে যার শরীরে বইছে সেই রক্ত।
হ্যাঁ, অনুভব করতে পারছি পরিবর্তনটা। সে এসেছে। চোখ ঘুরিয়ে তাকে খোঁজার চেষ্টা করলাম, দেখতেও পেলাম। দেওয়াল ঘড়িটার ঠিক নীচেই একরাশ কালো ধোঁয়া একটা অবয়ব ধারণ করছে। একটা দীর্ঘ, ভয়ংকর অবয়ব। আগে থেকে ধারণা না থাকলে খুবই ভয় পেতাম তাকে দেখে।
ডান হাত দিয়ে চেপে ধরলাম আমার গলার তাবিজটা। যদিও জানি এটা এই মুহূর্তে আমাকে রক্ষা করতে পারবে না। অশুভ থেকে আমাকে এই কবচ রক্ষা করে। মৃত্যু শুভ-অশুভর ঊর্ধ্বে। মৃত্যু চূড়ান্ত, চিরন্তন, অটল।
শিনিগামি পূর্ণ অবয়ব ধারণ করেছে। সে কি আমায় দেখছে ওই অন্ধকার ঢাকা মুখের ভেতর থেকে? একহাতে সেই বিশাল অস্ত্রটা। আমার দিকে অন্য হাতটা সে বাড়িয়ে দিল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। টেবিলের ওপর রাখা জিনিসটা তুলে নিলাম। তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতে সেটা রাখলাম।
এরপর অপেক্ষা। সেটা হাতে নিয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ড হয়তো সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু, সেই কয়েক সেকেন্ড বোধ হয় আমার জীবনের দীর্ঘতম সময়। নিজের হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছি। অপেক্ষা করছি। সে কি গ্রহণ করবে আমার উৎসর্গ? নাকি, এক্ষুনি তার অন্য হাতে ধরা অস্ত্রটা নেমে আসবে আমার ওপর! ছিন্ন করবে আমার জীবনসূত্র?
কয়েক মুহূর্ত, দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত স্থির থাকার পর দেখলাম তার হাতের মুঠো বন্ধ হচ্ছে। তারপর আরও কয়েকটা মুহূর্ত। এবং, আমার চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেল সেই অবয়ব।
আমার খেয়াল হল যে, আমি বহুক্ষণ হল শ্বাস নিইনি। তাই এইবার একটা দীর্ঘ শান্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এল ভেতর থেকে।
খুব ক্লান্ত লাগছে। স্বয়ং মৃত্যুকে সামনে দেখার সুযোগ কতজনের হয়েছে আমি জানি না। প্রার্থনা করি, কাউকে যেন দেখতে না হয়। কিন্তু, এখনও একটা কাজ বাকি আছে।
মান্টো সিং নিজের একটা কার্ড দিয়ে গেছিল, উইথ পার্সোনাল ফোন নম্বর। সে আশা করেছিল মৃত্যুভয়ে আমি নিশ্চয়ই তার কাছে প্রাণভিক্ষা করব। মোবাইল তুলে তার নম্বরে কল করলাম। কয়েক বার রিং হওয়ার পর ওদিক থেকে মান্টোর গলা পেলাম,
— হ্যালো?
— মান্টো সিং। আমি অতীন্দ্র ব্যানার্জি বলছি।
ওদিক থেকে কোনো উত্তর এল না। আমার উত্তরের প্রয়োজনও নেই। বললাম,
— আমার গলা পেয়ে অবাক হয়েছ, আমি জানি। কারণ, এতক্ষণে তোমার হিসেবমতো হার্ট অ্যাটাকে আমার মারা যাওয়ার কথা। কিন্তু, সেটা হচ্ছে না। যাকগে, সময় কম, তাই আমার কথাগুলো বলে ফেলি।
তুমি সেদিন আমার বাড়ি এসে গর্বের সঙ্গে নিজের অশিক্ষিত হওয়ার বড়াই করেছ। শিক্ষা ও জ্ঞানকে তুচ্ছ করেছ। তুমি চাণক্যর নাম বোধ হয় শোনোনি? তিনি একজন প্রাচীন শিক্ষক ছিলেন। তিনি বলতেন যে, শিক্ষা মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু এবং সঠিক ব্যবহারে তা পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র। তুমি ওভারকনফিডেন্ট হয়ে আমায় এ তথ্য নিজেই দিয়েছ যে, তোমার কাছের মূর্তিটার হাতে মানুষের দাঁত, চুল, নখ বা রক্ত দিলে তার মৃত্যু ঘটে। তোমার পেটে বিদ্যা থাকলে বুঝতে পারতে আসলে এই কয়েকটা বস্তুর মধ্যে মানুষকে ইউনিকলি আইডেন্টিফাই করার মতো একটা পদার্থ থাকে। ডি.এন.এ.। সেটা কী, তা বুঝিয়ে সময় নষ্ট করব না। কারণ, তোমার মতো মূর্খর পক্ষে তা বোঝা সম্ভব না। আর, সময়ও নেই।
কিন্তু, ডি.এন.এ. আরও অনেক কিছুতেই মেলে। যেমন, মানুষের থুথুতে। সেদিন তোমার গল্প শুনেই বুঝতে পেরেছিলাম ডি.এন.এ.-র বিষয়টা। আসলে, প্রাচীন তন্ত্র আর বিজ্ঞানকে মানুষ যতটা ভিন্ন ভাবে, বাস্তবে ততটা নয়। আর তাই, তুমি যে কাপে আমার বাড়ি এসে চা খেয়েছিলে, সেটা সেভাবেই তুলে রেখেছিলাম। তাতে তোমার থুথু ছেড়ে গেছিলে তুমি নিজেই। তখনও জানতাম না, ঠিক কী কাজে লাগবে। তবে, আমার ইনট্যুইশন ব্যাপারটা বরাবরই খুব শক্তিশালী।
আমি আশা করি, যেহেতু এই মুহূর্তে শিনিগামির মূর্তির উপাসক তুমি, তাই তোমার মৃত্যুর সঙ্গেই গ্রিম রিপারটি মুক্তি পাবে। ওই অশুভ মূর্তির ক্ষমতা শেষ হবে। গুড নাইট, মান্টো সিং।
শেষ কথাগুলো মান্টো শুনেছে কি না, নিশ্চিত নই। কারণ, ওদিকে ফোন হাত থেকে পড়ে গেছিল মনে হয়। মান্টোর চিৎকার শুনলাম,
— না! না! মুঝে নহী!
সঙ্গে দৌড়ে পালানোর শব্দ এবং ভারী একটা দেহ মাটিতে পড়ার শব্দ।
আমি ফোন কেটে দিলাম। উমা দেবীর ছেলের মোবাইলে একটা হোয়াটসঅ্যাপ করলাম, “আপনার বাবার এবং প্রবীরবাবুর আত্মার শান্তি হোক। প্লিজ, চেক দ্য বেঙ্গলি নিউজপেপার ডে আফটার টুমরো।”
ফোন রেখে ঘুমোতে গেলাম। বড্ড ক্লান্ত আজকে আমি।
