ঈকপার মঠে
১.
–ঈকপা মঠে যেতে চান আপনারা?
অবাক হয়ে প্রশ্ন করল গাইড। আমি উত্তর দিলাম,
— হ্যাঁ। কেন? অসুবিধে আছে?
— না, অসুবিধে কিছু নেই। কিন্তু, হঠাৎ সেখানে কেন? মানে, ওখানে তো কেউ যায় না। ট্রেকিং রুট এই চোংতাম পয়েন্ট থেকে ডান দিকে। আর, ঈকপা মঠ পড়ে তিন কিলোমিটার বাঁ-দিকে।
— তাহলে তো কাছেই। পথ খুব দুর্গম?
–না। হাঁটা পথ। তবে, অর্ধেক রাস্তা চড়াই।
— বাহ্। ভালোই তো।
গাইড আরও একবার আমাদের মুখের দিকে চেয়ে বলল,
— কিন্তু, এই মঠের খবর আপনারা পেলেন কীভাবে? এটা তো এতই ছোটো একটা মঠ যে কোনো ম্যাপেও নেই।
আমি হেসে আমার পাশে ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে বসে থাকা স্মিথের দিকে ইঙ্গিত করে উত্তর দিলাম,
–আসলে কয়েক বছর আগে আমার এই বন্ধুর এক আত্মীয় এখানে এসেছিলেন। তখনও এইদিকে তেমন কোনো ফিক্সড রুট তৈরি হয়নি। তাই তিনি মঠে পৌঁছে গেছিলেন চলতে চলতে। তিনি এই মঠের প্রসিদ্ধ কাহিনি আমাদের বলেছিলেন। সেই থেকেই আমাদের ইন্টারেস্ট।
ভ্রূ কোঁচকাল আমাদের গাইড। জিজ্ঞেস করল,
— কাহিনি?
–হ্যাঁ। কেন আপনি জানেন না? আমি তো শুনেছি এখানকার লোকাল লোকমাত্রেই জানে মিথটা।
— হ্যাঁ। তা জানি।
এর বেশি কিছু নিজে থেকে বলল না লোকটা। বুঝলাম, বলতে চাইছে না। আমি বরাবরই দেখেছি কোনো জায়গার আদিবাসীরা তাদের বিশ্বাস বা সংস্কার নিয়ে খুব সেনসিটিভ হয়। বাইরের লোকের সামনে তা বলতে দ্বিধা করে। কারণও আছে। বেশিরভাগ বিদেশিই তাদের এই সংস্কারকে হেয় করে, তাদের অন্ধবিশ্বাসী বলে। অথচ ভেবে দেখতে গেলে, তারা নিজেরাও খুব একটা আলাদা নয়।
আমরা নিজেরাও কি অদ্ভুত নিয়ম মেনে পুজোর আচার করি না? তন্ত্রমন্ত্র কি আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়? পশ্চিমা সভ্যতায় দীক্ষিত বিশ্বের ত্রিশ পার সেন্ট মানুষ কি দু-হাজার বছর ধরে একটা প্রাচীন রোমান ‘টর্চার ডিভাইস’কে তাদের ধর্মের চিহ্ন বলে পুজো করে চলেছে না? তাই অন্যের ধর্মবিশ্বাসকে হেয় করাটা কারুরই সাজে না।
স্মিথ জিজ্ঞেস করল,
–কথাটা সত্যি?
গাইড উত্তর না দিয়ে স্টোভে নুডল বানাতে লাগল। ভান করল যেন কথাটা তার কানেই যায়নি। স্মিথ আমার দিকে তাকিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।
আমার বন্ধু ও সহপাঠী বেন স্মিথ থাকে লন্ডনে। সে আমারই মতো সেখানকার একটা ইউনিভার্সিটির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। আগের বছর স্মিথ আমায় ফোন করে এখানে ট্রেকিং-এ আসার প্রস্তাবটা দিয়েছিল। সে এখানে আসতে চায় এবং সঙ্গী হিসেবে আমাকে পেলে সে খুশি হবে।
জায়গাটা সিকিমের একটা অখ্যাত পাহাড়ি বৌদ্ধ মঠ। জায়গাটার সঠিক লোকেশন ইচ্ছাকৃতভাবেই আমি এখানে উহ্য রাখছি। জায়গাটার নাম আগে শুনিনি। গুগল করে দেখলাম পপুলার একটা টুরিস্ট স্পট থেকে বেশ কিছুটা ওপরে আসতে হয় ট্রেক করে পায়ে হাঁটা রাস্তায়। এই এক পুরোনো ঈকপার মঠ ছাড়া আশেপাশে আর কিছু দেখার নেই। তাই কয়েক জন শখের ট্রেকার ছাড়া, সেভাবে কেউ আসে না স্বাভাবিকভাবেই।
হঠাৎ এখানে আসতে চাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করায় স্মিথ ফোনে আমাকে জানায় তার প্রপিতামহ বা গ্রেট গ্র্যান্ডফাদারের লেখা একটা পুরোনো ডায়েরি সে কয়েক দিন আগেই খুঁজে পেয়েছে। তাতে তিনি লিখেছেন যে, ভারত-তিব্বত সীমানায় এই ঈকপা মঠে তিনি এসেছিলেন বহু বছর আগে। তিনি তাতে একটা বেশ ইন্টারেস্টিং মিথের কথা উল্লেখ করেছেন সেই লেখায়। সেই মিথের সত্যতা যাচাই করতেই স্মিথ আসতে চেয়েছিল এখানে। আমায় জানায় যে, আমি তার সফরসঙ্গী হতে রাজি হলেই সে টিকিট কেটে এসে পড়বে কলকাতা। ব্যাপারটা আমার মনেও কৌতূহল জাগিয়ে তুলেছিল। ওই যে আমি বলি, বিজ্ঞানীদের মূল স্বভাবটাই হল কৌতূহল। অতএব, আমি রাজি হয়ে গেলাম।
সে আমায় ফোন করেছিল গত বছর মে মাস নাগাদ। পরের মাসেই সে আসত। কিন্তু, তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়তে গত বছর তার আসা হয়নি। এই বছর ফেব্রুয়ারিতে স্মিথ একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তানের পিতা হয়েছে। ভিডিয়ো কলে বেশ কয়েক বার দেখেছি।
অবশেষে, এই বছরের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আমরা আমাদের অভিযান শুরু করতে পারলাম। এখনও অফ সিজন বলা চলে। এই বছর তুষারপাত শুরু হয়েছে আগে থেকেই। অতএব, সাধারণ ট্রেকিং পথটাও অনেকটা দুর্গম মনে হয়েছে আমার মতো সাধারণ মানুষের কাছে। এখানে আসা অবধি, যেহেতু ফোনে টাওয়ার নেই, তাই স্মিথ সবচেয়ে অস্থির হয়ে রয়েছে তার স্ত্রী আর শিশুপুত্রকে না দেখতে পেয়ে। বুঝতে পারছি, সে প্রচণ্ড মিস করছে তাদের। বার বার লক্ষ করেছি নিজের ওয়ালেটে রাখা স্ত্রী আর বাচ্চার ছবিটা বের করে দেখছে। আমার বড়োই মজা লাগছে সেই দৃশ্য দেখে। স্মিথের মতো একজন খ্যাপাটে বোহেমিয়ান একজন মানুষের মধ্যে এই পরিবর্তনটা আমার ভালো লাগছে।
আপাতত আমরা বসে আছি বরফ ঢাকা পাহাড়ের ওপর, টেন্টের ভেতর। বাইরে আবার হালকা তুষারপাত শুরু হয়েছে। তিনদিন ট্রেক করে তবে আমরা এখানে পৌঁছোতে পেরেছি। মঠ এখনও খানিকটা দূরে। কনকনে ঠান্ডা টেন্টের বাইরে। অ্যালুমিনিয়ামের মগে ধোঁয়া ওঠা কফিতে চুমুক দিচ্ছি আমরা
স্মিথ গাইড লোকটাকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, আমি তাকে ইশারায় চুপ করালাম। তার প্রশ্নের উত্তর লোকটা দেবে না। বিদেশিদের বিশ্বাস করবে না, সেটাই স্বাভাবিক। তার চেয়ে বরং আমি নিজেই কথা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমি বললাম,
–আহ্! খাসা হয়েছে কফিটা! দারুণ! নাহলে ঠান্ডায় জমে যেতাম পুরো।
গাইড হেসে বলল,
–ধন্যবাদ, স্যার।
–তোমাদের ট্রাভেল এজেন্সির কলকাতায় ব্রাঞ্চ আছে? তুমি কখনো কলকাতা গেছ?
–না স্যার, ব্রাঞ্চ নেই। তবে, আমাকে যেতে হয় মাঝে মাঝে। বউ বা বাবার চিকিৎসা করাতে।
— কোন হাসপাতালে?
নাম বলল লোকটা। আমি বললাম,
–আরে, ওখানে তো আমার পরিচিত একজন ডাক্তার আছে। খুব ভালোমানুষ। পরেরবার কখনো গেলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। আমার থেকে তার কনট্যাক্ট নিয়ে রাখো। গিয়ে আমার পরিচয় দেবে।
লোকটা দেখলাম বেশ খুশি হয়েছে। জিজ্ঞেস করল,
–আপনি কলকাতায় কী করেন, স্যার?
–আমি কলেজে পড়াই। ফিজিক্স
–আরে বাহ্। আপনি তো মাস্টারমশাই আছেন। আর, আপনার বন্ধু?
–সেও আমারই মতো কলেজের প্রফেসর। ট্রেকিং-এ উৎসাহ আছে দু- জনেরই। সিকিমের সৌন্দর্যর কথা অনেকবার আমার কাছে শুনে চলে এসেছে। এখান থেকে নেমে গোটা সিকিম ট্রিপ করার প্ল্যান আছে পনেরো দিন।
— তা, এত জায়গা থাকতে এখানে এলেন যে এত কষ্ট করে?
–ওই যে বললাম। মঠে যাব বলে। আমি বিজ্ঞান পড়ানোর পাশপাশি হিন্দু আর বৌদ্ধ ধর্ম নিয়েও পড়াশোনা করি। আমার লেখা বই আছে। ওই কারণেই তো এত পাহাড় ডিঙিয়ে এতদূর আশা ভাই। তা, বললে না তো? যে মিথ শুনেছি ঈকপার মঠকে নিয়ে, সেটা সত্যি?
গাইড জলে চামচ দিয়ে নুডল নাড়াতে নাড়াতে বলল,
–জানি না। বহুযুগ ধরে লোকের মুখে মুখে গল্প ছড়িয়ে রয়েছে। আমি এই মঠের গল্প আমার দাদাজির সময় থেকেই শুনে আসছি। আপনারা জানেন দেখেই আশ্চর্য হয়েছি। তবে সাহেব, এই পৃথিবীতে অনেক কিছু আছে আমাদের অজানা। অবিশ্বাস-বিশ্বাসের প্রশ্ন আসে না আমাদের মনে।
–সে যাই হোক। ব্যাপারটা কিন্তু খুব ইন্টারেস্টিং। ঈকপা মঠের গোপন কুঠুরিতে এক অপদেবতাকে বন্দি রাখা হয়েছে যুগ যুগ ধরে। এমন গল্পের খোঁজে কিন্তু আসাই যায় শত কষ্ট অতিক্রম করেও।
স্মিথ হঠাৎ বলেই ফেলল,
–তোমরা সত্যি বিশ্বাস কর এই গল্প?
–আমি জানি না, সাহেব। আমরা জানার চেষ্টা করি না।
স্মিথের কথায় রেগেছে একটু সেটা বুঝতে পেরেই আমি স্মিথের হাতে চিমটি কেটে আবারও তাকে চুপ করে যেতে বললাম। আমি কফিতে আর একচুমুক দিয়ে বললাম,
–আসলে কী জানো, সব মিথের আড়ালে কোনো বাস্তব ঘটনা থাকে যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অলৌকিকের প্রলেপ মেখে মিথের রূপ নেয়। হয়তো অনেক যুগ আগে সত্যিই কোনো সাংঘাতিক অপরাধীকে বন্দি করা হয়েছিল ঈকপা মঠে। সেই কাহিনিই বহুযুগ ধরে লোকমুখে ঘুরে-ফিরে অপদেবতা বন্দি থাকার গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুমি কী বলো? এমনটা হতেই পারে। তাই নয় কি? আমিও বিশ্বাস করি তোমারই মতো। অনেক কিছুই আমাদের অজানা আছে এই জাগতে। সেইজন্যেই তো এত উৎসাহ নিয়ে এই দুর্গম জায়গায় এসেছি। আচ্ছা, তুমি এরকম আর কোনো ঘটনা জানো নাকি মঠ নিয়ে?
খানিক চুপ থেকে লোকটা বলল,
–আমার ছোটোবেলায় একটা ঘটনা শুনেছিলাম। সেটা ঠিক অলৌকিক বা খুব ইন্টারেস্টিং কিছু নয়। তবে, ঈকপার মঠের সঙ্গে জড়িত বটে। শুনবেন?
আমরা আগ্রহ দেখিয়ে বললাম,
— নিশ্চয়ই!
— আমার ছোটোবেলার ঘটনা। আমাদের গ্রামের এক লোক একবার সন্ন্যাসী হতে মঠে এসেছিল। শোনা যায় যে, এই মঠে সন্ন্যাসী হতে গেলে লামারা খুব কঠিন একটা পরীক্ষা নেয়। যারা সফল হয়, একমাত্র তারাই এই মঠে সন্ন্যাসী হিসেবে যোগ দিতে পারে। না পারলে তাকে বহিষ্কার করা হয় মঠ থেকে। সেই কঠিন পরীক্ষা যে কী, তা জানি না। কিন্তু, আমাদের গ্রামের সেই লোকটা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। তাকে গ্রামে ফিরে যেতে বলে লামারা। লোকটা ফিরে এসেছিল বটে। কিন্তু, সবাই বলে মঠ থেকে ফিরে এসে লোকটা একদম বদলে গেছিল। বরাবরের শান্ত মানুষ হিসেবে পরিচিত লোকটা হঠাৎ যেন হিংস্র হয়ে যায় মঠ থেকে ফেরার পর। এর কারণ কেউ জানতে পারেনি। শুধু লোকটা একজনকে একবার বলেছিল যে, সে এই মঠের গোপন ঘরে বন্দি সেই শয়তানকে দেখেছিল।
আমরা চুপ করে শুনে যাচ্ছিলাম। বুঝলাম গল্প এখানেই শেষ নয়। সসপ্যান থেকে নুডল নামিয়ে তিনটে থালায় ভাগ করে দুটো থালা আমাদের দিকে বাড়িয়ে দিল গাইড। তৃতীয় থালা নিজে তুলে কিছুটা নুডল মুখে দিল। তারপর বলল,
–এর কয়েক দিন পর থেকেই আমাদের গ্রামে বাচ্চারা নিখোঁজ হতে শুরু করে। জঙ্গলে, গিরিপথে অনেক খোঁজ করা হয়। গ্রামের লোকজন আলাদা আলাদা দল বেঁধে খোঁজ করে অনেক, কিন্তু ফল হয় না। পর পর তিনটে বাচ্চা নিখোঁজ হওয়ার পর, একদিন কেউ একজন দেখতে পায় সেই লোকটাকে একটা বাচ্চার সঙ্গে। বিশেষভাবে নজর পড়ার কারণ ছিল। সেইসময়ে গ্রামে এসেছিল একদল বিদেশি, তাদের সঙ্গে ছিল একটা আট-দশ বছর বয়সি বাচ্চাছেলে। কেউ একজন এক সকালে সেই বিদেশি বাচ্চাটার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিল ওই লোকটাকে। সন্ধের পর সেই বাচ্চাটাও বাড়িতে না ফিরলে সকলের টনক নড়ে। বাচ্চাটার খোঁজ না পেয়ে বিদেশিরা পুলিশে খবর দেয়। পুলিশের সঙ্গে গ্রামের বাসিন্দারা আবারও খুঁজতে বের হয়। তখনই কেউ একজন বলে যে, অমুকের সঙ্গে বাচ্চাটাকে দেখা গেছে। অতএব, গ্রামের লোক খুঁজতে খুঁজতে সেই লোকটার বাড়িতে আসে।
তার বাড়ির সামনে গ্রামের লোকজন জড়ো হয়ে যায়। এদের মধ্যে আমার বাবাও ছিল। প্রথমে বার বার ডেকেও সাড়া দিল না সে। অথচ, বোঝা যাচ্ছিল সে ভেতরেই আছে। অবশেষে যখন লোকটা কিছুতেই দরজা খুলতে চাইল না, তখন সকলের সন্দেহ হল। জোর করে দরজা ভাঙা হল। ভাঙতেই পচা গন্ধ ঠেলে বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে। কিন্তু, বাড়ির ভেতরে তাদের জন্যে যে দৃশ্য অপেক্ষা করছিল, তা আরও বীভৎস!
বাড়ির একটা ঘরে ভরতি মৃতদেহ ঝুলে আছে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দেওয়ালের সঙ্গে। প্রত্যেককে অসম্ভব যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিল তিল করে এক- একজনকে হত্যা করেছে লোকটা। আগেরদিনের নিখোঁজ বাচ্চাটা তখনও জীবিত। কিন্তু, তার গায়ের মাংস জায়গায় জায়গায় কামড়ে খেয়েছে লোকটা। ঘরের একটা কোণে লোকটা নিজেও দাঁড়িয়ে আছে। বাবা বলে, কোনো মানুষের মুখ এতটা পৈশাচিক হতেই পারে না। ওই মুখ বাবা আজও দুঃস্বপ্নে দেখে।
হাতে ধরা নুডলের চামচ মাঝপথেই আটকে গেছে আমাদের। খাব কী? এই শুনে তো বিকেলের খাবারই উঠে আসতে চাইছে গলা দিয়ে। বেন জিজ্ঞেস করল,
— তারপর? লোকটাকে নিয়ে কী করল গ্রামের লোক?
— কিছু করার সুযোগ দেয়নি শয়তানটা। পচা গন্ধর মধ্যে খেয়াল করেনি কেউ। দরজা না খুলে লোকটা এতক্ষণ ধরে নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে তৈরিই ছিল। লোকজন তার কাছে যেতেই লোকটা গায়ে আগুন দেয়। কোনোভাবে ওই আধমরা বাচ্চাটাকে নিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল লোকেরা।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। গাইড লোকটাই বলল,
–খাবার খেয়ে নিন, সাহেব। খুব তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়ে যাবে কিন্তু।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
–অতএব, গ্রামের সকলের ধারণা, ওই মঠে গিয়েই এমন কিছু হয়েছিল যার ফলে একটা সাধারণ মানুষ ওরকম শয়তান হয়ে গেছিল। তাই তো?
— হ্যাঁ। বললাম না, শোনা যায় সে-লোকটা ঈকপার মঠের বন্দি ওই শয়তানকে দেখেছিল। আর, তাতেই সেই শয়তান তার ওপর ভর করে। সত্যি-মিথ্যে জানি না, প্রফেসর। এই গল্প বাবার মুখে শুনেছি অনেকবার। তবে, মঠ বড়ো সুন্দর। গেলে মন ভরে যাবে, এটুকু বলতে পারি। কাল নিজের চোখেই দেখবেন।
২.
যতদূর চোখ যায় শুধুই সাদা বরফ দেখা যাচ্ছে। না, আরও একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে বটে। ঈকপা মঠের চুড়োটা। বরফের ওপর আরও কিছুটা হাঁটলেই চোখে পড়বে পুরো মঠটা।
সেইদিকেই তাকিয়ে আছি আমি আর স্মিথ। চোখে পোলারয়েড কাচের চশমা ছাড়া বরফের দিকে চাইলে চোখ ঝলসে যাবে। এই লেদার, উলের এতগুলো পরতের জামাকাপড়ের আর সূর্যের রোদেও ঠান্ডা যেন হার মানছে না। বরফের ওপর পায়ের ছাপ রেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে চললাম তিনজনে।
পাহাড়ের ওপরের পাথর কেটে বানানো হয়েছে মঠটা। ছাদের ওপর পুরু বরফের আস্তরণ। দেখলেই আন্দাজ করা যায় এটা সুপ্রাচীন। এগোতেই চোখে পড়ল একজন সন্ন্যাসী বসে আছেন মেন গেটের বাইরেই। একমনে শুকনো কাঠ জড়ো করছেন। পরনে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর চিরপরিচিত লাল-হলুদ কাপড় গায়ে জড়ানো। এই প্রবল ঠান্ডায় লোকটি শুধুমাত্র ওই কাপড় জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখে তাঁর ঠান্ডা লাগছে বলে মনেও হল না।
আমাদের আসতে দেখে সন্ন্যাসী মুখ তুলে আমাদের দিকে একবার চাইলেন। হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালেন। গাইডটি তাঁর পরিচিত। তাকে দেখে তাঁদের ভাষায় কিছু বললেন এবং কিছুক্ষণ গাইড আর সন্ন্যাসীর মধ্যে কথোপকথন হল। ভাষা কিছুই বুঝলাম না। কিছুক্ষণ কথা বলে গাইড আমাদের দিকে ফিরে বলল,
–মঠ ভ্রমণ করতেই পারেন আপনারা। তবে, এখানে স্টে করতে চাইলে, হেড লামার সঙ্গে দেখা করে অনুমতি নিতে হবে।
— অবশ্যই। আমরা স্টে করতেই চাই কয়েক দিন। তুমি একটু কথা বলো ওদের সঙ্গে।
সন্ন্যাসী আমাদের পথ দেখিয়ে এগিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। একটু আলাদা পেয়ে আমি গাইডকে প্রশ্ন করলাম,
–ভাই। এখানে থাকা সেফ তো? কোনো বিপদের সম্ভাবনা আছে নাকি? গাইড জানাল কোনো বিপদ নেই। লামারা অতি সজ্জন ও শান্তিপ্রিয় মানুষ। শুনে বললাম,
–হ্যাঁ। স্মিথের সেই পূর্বপুরুষ এসেও এখানে থেকেছিলেন কয়েক দিন। তিনি জানিয়েছিলেন যে, এটা তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা এক্সপিরিয়েন্স।
পাথরের দেওয়ালের ভেতরে বেশ গরম। বাইরের চেয়ে অনেকটাই বেশি আরাম। গাইড আমাদের ছেড়ে ভেতরে চলে গেল হেড লামার সঙ্গে কথা বলতে। সেই সুযোগে আমরা দু-জন আশপাশ ঘুরতে শুরু করলাম। মঠের প্রাঙ্গণে প্রচুর রঙিন পতাকা উড়ছে হাওয়ায়। এই পতাকাগুলোর নিয়ম হচ্ছে যেন এই পতাকা কখনো থেমে না থাকে। যে কারণে এগুলো সবসময় অনেক উঁচুতে লাগানো হয়। যাতে সর্বক্ষণ হওয়ায় উড়তে থাকে।
স্মিথ উৎসুক দৃষ্টিতে চারিদিক দেখছে। আমায় প্রশ্ন করল,
–এই পতাকাগুলো কী, ব্যানার্জি? কোনো দেশের তো নয়, সব আলাদা আলাদা। হোয়াট ডু দে সিগনিফাই?
–এগুলো বুদ্ধিস্ট প্রার্থনার পতাকা। বলা হয়, এই পতাকার সংস্পর্শে এসে বাতাসে পজিটিভ এনার্জি সৃষ্টি হয়। ভালো করে দেখো, দু-ধরনের পতাকা দেখতে পাবে। ভার্টিকাল আর হরাইজন্টাল। ভার্টিকাল পতাকাকে বলা হয় ‘দার চো’ আর হরাইজন্টালগুলোর নাম ‘লুঙ্গ দার’। এগুলো পবিত্র বস্তু। তাই মাটিতে রাখার নিয়ম নেই।
–আর এগুলোর আলাদা আলাদা রঙেরও কোনো সিগনিফিকেন্স আছে, আই গেস?
–একদম তাই। দেখো পাঁচটা রঙের পতাকা আছে এখানে। এক-একটা রং, এক-একটা ‘এলিমেন্ট’-এর প্রতীক। ওয়েস্টার্নদের যেমন চারটে এলিমেন্ট, আমাদের পাঁচটা। আমরা বলে থাকি পঞ্চ-মহাভূত। লাল রং অগ্নির প্রতীক, সবুজ হল জল, হলুদ হল পৃথিবী, নীল হল বায়ু। আর, সাদা পতাকা হল আকাশ বা ‘ইথার’। আবার একইভাবে, এই পাঁচটা রং পাঁচদিকেরও প্রতীক। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ এবং মধ্য বা সেন্টার।
— ওয়াও, গ্রেট। তুমি এত কিছু কীভাবে জানো?
হেসে উত্তর দিলাম,
–তুমি তো জানোই আমার এক্সট্রা হবির কথাটা। তাই এ বিষয়ে পড়াশোনা আছে।
— ইয়েস ইয়েস, তোমার তো ‘ফটোগ্রাফিক মেমারি!
— হ্যাঁ, সেই। এদিকে বাড়িতে দৈনন্দিন জিনিস ভুলে বসে থাকি। লোকের জন্মদিন, ছাত্রদের নাম মনে রাখতে হিমশিম অবস্থা হয় আমার!
হেসে উঠল স্মিথ। তখনই গাইড বেরিয়ে এসে বলল,
–হেড লামা অনুমতি দিয়েছেন, স্যার। আসুন, তিনি দেখা করতে চান আপনাদের সঙ্গে।
বড়ো প্রার্থনাকক্ষে বসে আছে অনেকজন ভিক্ষু। সামনে বড়ো তিনটে বুদ্ধমূর্তি বসানো উঁচু আসনে। স্মিথ কোনোদিন বুদ্ধমন্দিরে আসেনি। তাই তিনটে বুদ্ধমূর্তি
দেখে আমায় প্রশ্ন করল,
— তিনটে বুদ্ধমূর্তি কেন?
আমি চাপাস্বরে উত্তর দিলাম,
–মাঝের জন তোমার চেনা শাক্যমুনি বুদ্ধ। বাঁ-দিকের জন গুরু পদ্মসম্ভব, যিনি তিব্বতি ভাষায় গুরু রিনপোচে নামেও পরিচিত। গৌতম বুদ্ধর পরবর্তী জন্ম, অর্থাৎ ‘রিইনকারনেশন’! ইনি বুদ্ধর মৃত্যুর বারো বছর পর জন্ম নেন এবং তাঁর জন্মের কথা বুদ্ধ আগেই প্রেডিক্ট করে গেছিলেন। ইনি বজ্রযান বৌদ্ধধর্মর প্রবর্তক।
–আর ডান পাশের জন?
উত্তরটা আমি দেওয়ার আগেই আমাদের ঠিক পেছন থেকে একজন ইংরেজিতে বলে উঠলেন,
–গৌতম বুদ্ধর ডান পাশের জন বুদ্ধ অমিতায়ুস। দীর্ঘজীবনের প্রতীক। অমিত-আয়ু। দেখুন তাঁর হাতে ধরা রয়েছে অমৃতর পাত্র।
ঘুরে দেখলাম একজন অতি বৃদ্ধ মানুষ এসে দাঁড়িয়েছেন। আন্দাজ করলাম ইনিই ঈকপা মঠের প্রধান ভিক্ষু। উত্তরটা তিনি স্মিথকে দিলেও তাঁর নজর আমার দিকে। স্মিত হেসে পরিষ্কার ইংরেজিতে বললেন,
–তোমাদের আলোচনার মধ্যে ঢুকে পড়লাম বলে ক্ষমাপ্রার্থী। তবে, আমি নিশ্চিত তুমিও একই উত্তর দিতে। তুমি বিদ্যার সাধক। ‘দস না গনাস পা’। জ্ঞানই তোমার অস্ত্র। ভালো লাগল পরিচিত হতে পেরে।
তিব্বতি ভাষায় তিনি কিছু একটা বললেন। ‘ডাবু না পা’ কিছু একটা। ঠিক বুঝলাম না। এগিয়ে গিয়ে আমি আর স্মিথ বৃদ্ধকে প্রণাম করলাম। বৃদ্ধ হাসলেন আমাদের দিকে চেয়ে। ঝুঁকে পড়ার সময় আমার গলার তাবিজটা বেরিয়ে পড়েছিল। বৃদ্ধ লামা আমাদের উদ্দেশে হাতজোড় করে অভিবাদন জানানোর সময়ে সেটা তাঁর চোখে পড়ল। বৃদ্ধ হাত বাড়িয়ে আমার গলার তাবিজটা স্পর্শ করলেন। এবং, সেই হাত নিজের মাথায় ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। আশ্চর্য হলাম তাঁর এই কাজে। তিনি কি বুঝতে পেরেছেন নাকি যে, এটা সাধারণ তাবিজ নয়?
সন্ন্যাসীর বয়স নব্বই বা এক-শো তো হবেই। তার ওপরেও হতে পারে। মঠের ভেতরটা বাইরের চেয়ে গরম হলেও, শূন্যর কাছাকাছি তো বটেই। তবুও এখানে আমরা তিনজন বাদে কেউই গরম পোশাক পরে নেই। এমনকী বৃদ্ধ হেড লামাও না। ব্যাপারটা স্মিথকে অবাক করেছে বুঝতেই পারছি।
বৃদ্ধ ইশারায় আমাদের একপাশের দুটো আসনে বসতে ইশারা করলেন। আমরা বসতে বৃদ্ধ ভিক্ষু বললেন,
— আমরা এখন প্রার্থনা করব। তোমরা এখানে একটু অপেক্ষা করো।
হাতজোড় করে আমি আর স্মিথ দু-জনেই সম্মতি জানালাম। দুই ভিক্ষু দুটো বড়ো ট্রাম্পেট ধরনের লম্বা বাঁশিতে ফুঁ দিল। তারপর শুরু হল প্রার্থনা। নাভির থেকে ‘ওম’ উচ্চারণ করছে সকলে। একজন আবার একটা গোল বাটির মুখের চারধারে একটা ধাতুর ভারী কাঠিমতো জিনিস ঘুরিয়ে চলেছে। স্মিথ উৎসাহর সঙ্গে দেখে চলেছে সব। আমায় নীচুস্বরে প্রশ্ন করল,
― হোয়াট ইজ হি ডুইং?
আমিও নীচুস্বরে উত্তর দিলাম,
–দ্যাট’স আ বুদ্ধিস্ট প্রেইং টেকনিক। ওই বাটির মুখে কাঠিটা ঘোরানোর ফলে কম্পন সৃষ্টি হয়। শুনে দেখো চোখ বন্ধ করে, ঠিক ‘ওম’ শব্দের মতো মনে হবে।
— কিন্তু, এ এটা কেন করছে? অন্যদের মতো মুখে উচ্চারণ করলেই তো হয়।
–সম্ভবত এই ভিক্ষু মৌনব্রত নিয়েছেন। তাই।
–ওহ্। আর কী মন্ত্র বলছে এরা?
আমি বুঝলাম স্মিথের প্রশ্ন শেষ হবে না। বরাবরই কৌতূহলী সে নতুন যেকোনো বিষয় নিয়েই। তাই ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ওকে বললাম,
— নট নাও। পরে বলব। এখন চোখ বন্ধ করো। জাস্ট ফিল ইট, ব্রো! নিজের ভেতর এই কম্পন অনুভব করো।
নিজেও চোখ বন্ধ করে নিজের নাভিমূল থেকে ওম ধ্বনি তুলে আনলাম। সারাশরীরে সেই ধ্বনি গুঞ্জরিত হচ্ছে। আমি নিজেও ডিপ মেডিটেশনে প্রবেশ করছি ধীরে ধীরে।
৩.
ভিক্ষুরাই আমাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করল। বৃদ্ধ লামা বললেন, যতদিন খুশি থাকতে পারি এবং তার জন্যে কিছুই দিতে হবে না তাঁদের। যাওয়ার আগে ইচ্ছেমতো যা খুশি দানপাত্রে দিয়ে গেলেই হবে। এটাই নাকি এখানে নিয়ম। স্মিথ খুব খুশি। সে ভাবতেই পারে না যে, এই বরফ ঢাকা পাহাড়ের কোলে এরকম কোনো জায়গা থাকতে পারে পৃথিবীর বুকে। আমি তাকে জানালাম যে, পৃথিবীতে এর চেয়েও দুর্গম জায়গায় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের গুম্ফা আছে। গ্রিসের মেটিওরা মনাস্ট্রি, ভুটানের তাকসাং, বা, চীনের সাঞ্জি মনাস্ট্রি, এগুলোও এক-একটা অতি দুর্গম স্থানে অবস্থিত। বাকি দিনটা আমরা ঘুরে ঘুরে মনাস্ট্রিটা দেখলাম।
রাতে একই ঘরে আমাদের দু-জনের ঘুমোনোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুতে যাওয়ার সময় স্মিথ বলল,
— বন্ধু, এই কোনো ‘ইভিল’-এর এখানে বন্দি থাকার গল্পটা কিন্তু কালকে এক্সপ্লোর করতে হবে। ওই বুড়ো গ্রেট গ্র্যান্ডফাদারের লেখা পড়ে কিউরিয়াস হয়ে চলে এসেছি বটে, তবে ভেতর থেকে আমি এই গল্পটা বিশ্বাস করি না। তোমার কী মনে হয়?
আমি বালিশে মাথা রেখে বললাম,
–তুমি তো জানোই যে, আমার একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে অতিপ্রাকৃত কোনো কিছুকে অনুভব করার। কিন্তু, আমি সেরকম কিছু ফিল করতে পারছি না। তবে, এই ক্ষেত্রে এটাও সম্ভব যে, এই মঠের শুভ ‘ভাইব’স অশুভকে ঢেকে দিচ্ছে। আর, যদি ধরেও নিই যে, এখানে সেরকম কোনো রহস্য লুকিয়ে নেই, পুরো ব্যাপারটাই গুজব আর জনশ্রুতি, তবুও এখানে আসা সার্থক। দুর্গম পাহাড়ের বুকে এরকম একটা মঠে রাত্রিযাপন একটা দারুণ অভিজ্ঞতা বটে। বিশেষ করে তোমার জন্যে।
দাঁত বের করে হেসে উঠল স্মিথ,
–একদম তাই। তা ছাড়া, তোমার সঙ্গেও অনেক বছর পর দেখা হল। ঘুমোলাম। কাল এই ভিক্ষুদের থেকে এই বিষয়ে কথা বের করার চেষ্টা করব। আপাতত গুড নাইট।
–গুড নাইট।
***
সকালে আমি যখন উঠলাম, স্মিথ তখন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। তাকে বিরক্ত না করে আমি গায়ে একটা সোয়েটার আর একটা পুলোভার চড়িয়ে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। কিন্তু, বেরোনোর সময় লক্ষ করলাম ঘরের দরজা খোলা। আমার যতদূর মনে পড়ছে, আমি দরজা আটকে শুয়েছিলাম। বোধ হয় স্মিথ রাতে উঠেছিল।
আমি আর বেশি না ভেবে বাইরে বেরিয়ে এলাম বারান্দায়। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চারপাশে। মুগ্ধ হয়ে শুধু দেখছিলাম, এমন সময়ে পেছন থেকে কেউ ডাকল। ঘুরে দেখলাম এক ভিক্ষু দাঁড়িয়ে আছে। সে জানাল,
— প্রধান লামা আপনাকে ডাকছেন। দয়া করে প্রার্থনা কক্ষে যান।
আমার সঙ্গে লামার কী প্রয়োজন থাকতে পারে সেটা ভাবতে ভাবতে পৌঁছোলাম তাঁর ঘরে। আজ তিনি একা বসে আছেন বড়ো ঘরটায়। কিন্তু, মুখ গম্ভীর। তাতে আর কালকের হাসিটা নেই। আমায় দেখে বসতে বললেন তাঁর সামনে। আমি প্রণাম জানিয়ে বসতে তিনি বললেন,
–তোমরা এখানে থাকতে পারবে না। আজই এই মঠ ছেড়ে বিদায় নেবে তোমরা।
আমি একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম,
–কেন মহান? আমার অজান্তে কি কোনো ভুল হয়ে গেছে?
ঘাড় নেড়ে বৃদ্ধ বললেন,
— না। তোমার জন্যে নয়। কিন্তু, তোমার বন্ধুর জন্যে এখানে থাকা বিপজ্জনক হতে পারে।
— স্মিথ? সে কী করেছে?
–সে কিছু করেনি। কিন্তু, শয়তান ঈকপা তাকে দিয়ে করিয়েছে। সে শয়তানের ফাঁদে পড়েছে।
— মানে?
–তোমার বন্ধুকে কাল রাতে মঠের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করতে দেখতে পায় এক সন্ন্যাসী। কাছে গিয়ে বুঝতে পারে যে, তোমার বন্ধু বেহুঁশ হয়ে চলে বেড়াচ্ছে। ভিক্ষু তখন অন্য সন্ন্যাসীদের ডাকে। আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, শয়তান ঈকপার ডাকে সে চলেছে। শয়তান তার মনের অন্ধকার দেখতে পেয়েছে। সে তাকে শিকার বানাবেই। আমরা কাল রাতে তাকে ধরাধরি করে তোমাদের ঘরে পৌঁছে দিয়ে এসেছি। কিন্তু, একবার যার ওপর ঈকপার নজর পড়েছে, তাকে এখানে রাখা বিপজ্জনক।
খবরটা শুনে অবাক হলাম। বললাম,
–দেখুন মহান ভিক্ষু, হতে পারে আমার বন্ধুর ‘সোমনামবুলিজম’ আছে। মানে, সে ঘুমের মধ্যে হাঁটে। সে ঘুম থেকে উঠলে আমি জিজ্ঞেস করব। কিন্তু, আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। ঈকপা কে? সে কেন ডাকবে স্মিথকে? আপনি আমায় দয়া করে সবটা খুলে বলুন।
বৃদ্ধ লামা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলেন। তারপর বললেন,
— ঈকপা এক শয়তানের নাম। একটা অদ্ভুত অপশক্তি যার স্বরূপ কেউ জানে না। সম্ভবত, তোমরা এ কাহিনি জেনেই এসেছ। তাই নয় কি?
মিথ্যে বলে লাভ নেই বুঝেই ঘাড় নেড়ে স্বীকার করলাম। বলেই দিলাম স্মিথের পূর্বপুরুষের ডায়েরির কথাটা। সব বলে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম,
–এই গল্প তাহলে সত্যি?
বৃদ্ধ ধীরকণ্ঠে বললেন,
–এই মঠ অতি সুপ্রাচীন। কয়েক হাজার বছর ধরে এক অপশক্তির থেকে পৃথিবীর মানুষদের রক্ষা করছে এই মঠ। এই মঠের গুপ্ত পাতালকুঠুরিতে এক শয়তান বাস করে। শয়তান ঈকপা। তাকে বাস্তবে কীরকম দেখতে, তা কেউ জানে না। কারণ, ঈকপার নিজস্ব কোনো রূপ নেই। সে সামনের জনের অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। নিজের শিকারের মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এবং তার হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা গোপন অন্ধকারকে টেনে বের করে আনে। সে অশুভ একটা অস্তিত্ব। চরম অশুভ একটা অস্তিত্ব যা সাধারণ মানুষকেও নিকৃষ্টতম শয়তানে পালটে দেয়। সে মানুষের হৃদয়ে নিজের হিংসা, ক্রোধ ঢেলে তাকে পাপের পথে টেনে আনে।
— ঈকপা কি কোনো জীব? প্রেত? নাকি, ডেমন?
–এর উত্তর আমারও জানা নেই। এই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সময়ে, এই জগতে মানুষ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তু ছাড়াও অনেক শুভ এবং অশুভ অস্তিত্বর জন্ম হয়েছিল। এরা প্রাচীন। মানবসভ্যতার চেয়েও প্রাচীন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই এখন আর নেই এই জগতে। কিন্তু, কিছু এরকম প্রাচীন অস্তিত্ব রয়ে গেছে আজও এই মাত্রায়। ঈকপা এমনই এক অস্তিত্বর নাম। সৃষ্টির আদি থেকেই এই দুষ্ট, মানুষকে দিয়ে পাপ করিয়ে এসেছে। এই অপদেবতাই সুযোগ বুঝে মানুষকে বানিয়ে ফেলে নির্মম, অত্যাচারী। এমনও বলা আছে যে, এই পৃথিবীর প্রতিটা নিকৃষ্টতম, নির্মম অত্যাচারী সৃষ্টিতে এই শয়তানের প্ররোচনা আছে।
–কিন্তু, কীভাবে? আমি তো শুনেছিলাম যে, এই শয়তান আপনাদের এখানে বন্দি।
–ঠিকই শুনেছিলে। কিন্তু, সে-বন্দি বলতে তুমি যা ভাবছ, তা নয়। বহুযুগ আগে এক মহাত্মা এই দুষ্ট অস্তিত্বটির মুখোমুখি হয়। এদের অন্ত নেই, তাই এর বিনাশ করতে তিনি পারেননি। কিন্তু, মহাত্মা ঈকপাকে সীমিত স্থানে আবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। এবং, সেইস্থানে গড়ে তুলেছিলেন এই মঠ। কিন্তু, এই মঠের অন্দরে সে বন্দি থেকেও বন্দি নয়। সে শিকার খুঁজে চলে। রোজকার ঈশ্বর বন্দনা, প্রার্থনা এবং মন্ত্রপাঠের ফলে তার ক্ষমতা ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়েছে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু, যদি এই মঠে কোনো মানুষ উপস্থিত হয়, যার হৃদয়ে অন্ধকার আছে, তবে সে তাকে শিকার বানানোর চেষ্টা করে। নিজের প্রভাব বিস্তার করে সেই মানুষের ওপর। দূষিত করে তার আত্মাকে। তার ক্ষতি করবে। তুমি কি জানো তোমার বিদেশি বন্ধুর মনে কী এমন ক্ষোভ বা ক্রোধ আছে যার ফলে ঈকপা জেগে উঠেছে?
— আমার কোনো ধারণাই নেই। বরং, আমি স্মিথকে যতদূর চিনি, সে একজন ভালোমানুষ। কিন্তু, আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন? আপনি কী বলতে চাইছেন তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়, মহান লামা। কীরকম ক্ষতি করবে সে আমার বন্ধুর? এই শয়তান কি স্মিথকে হত্যা করতে চাইছে? তার প্রাণ নিতে চায়?
আবার ‘না’ সূচক ঘাড় নাড়লেন বৃদ্ধ। বললেন,
–না। তুমি যেমন ভাবছ, ঈকপা তা নয়। এই শয়তান তার শিকারের প্রাণ নেয় না। সে শিকারকে বদলে দেয় নৃশংসতা, হিংসা ও ঘৃণাভরা এক শয়তানে।
— আমি আবার বুঝতে পারলাম না আপনার কথা
— ঈকপার সামনে যে মানুষ দাঁড়ায়, সে ঈকপাকে তার সবচেয়ে ঘৃণিত চরম শত্রুর রূপে প্রত্যক্ষ করে। তার সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তি দেখতে পায় যে, তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার সবচেয়ে ঘৃণার পাত্রটি। অসহায়, শেকলবন্দি অবস্থায়।
খুবই চমকে গেলাম কথাটা শুনে। যতই শুনছি, আমার কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হওয়ার চেয়ে বরং আরও গুলিয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম,
— শেকলবন্দি অবস্থায়?
— হ্যাঁ।
— কিন্তু, কেন? তাতে কী হয়?
ব্যাপারটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করো, প্রফেসর। ধরো তুমি কাউকে সারাজীবন ধরে তীব্র ঘৃণা করে এসেছ। সে তোমার কাছে অপরাধী এবং তাকে তুমি আজ অবধি সাজা দিতে পারোনি। আজীবন সেই ব্যক্তি থেকে গেছে তোমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু, তাকে তুমি সাজা দিতে চাও। আজীবন তার প্রতি ঘৃণা রেখে এসেছ মনে। হতাশ রাগ পুষে রেখেছ তার প্রতি। এবার সেই ব্যক্তিকে যদি হঠাৎই নিজের সামনে পাও, বন্দি এবং অসহায় অবস্থায়, তুমি কী করবে?
— তাকে হত্যা করবে? অর্থাৎ, ঈকপা মানুষকে দিয়ে হত্যা করায়!
— এতটা সহজ নয়। ঈকপা আরও বেশি সর্বনাশ করে মানুষের। ঈকপা শুধুই যে বন্দি হিসেবে দেখা দেয় তাইই নয়, তার সঙ্গে সেই ব্যক্তির হাতের কাছে সে তাকে বিকৃত ও নির্মম অত্যাচার করার সমস্ত উপকরণও সাজিয়ে রাখে। তাহলে? এইবার ঈকপার মানুষকে ‘কোরাপ্ট’ করার পদ্ধতিটা বুঝতে পেরে চমকে উঠলাম। — হা ঈশ্বর!
আমার কাঁধে হাত রেখে লামা বললেন,
— এইবার বুঝতে পারছ, ঈকপা কোন উপায়ে মানুষকে শয়তানে পরিবর্তন করে? নিজের ঘৃণার পাত্রটিকে এই অবস্থায় পেলে মানুষের মনের পাশবিক প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। সে হাতে তুলে নেয় একের পর এক অত্যাচারের সরঞ্জাম এবং অকথ্য অত্যাচার করতে থাকে সামনে বন্দি, শত্রুরূপী ঈকপাকে। কিন্তু, এই শয়তান যে অমর! তাই ঈকপা হাজার অত্যাচারেও মরে না, বরং উলটে অতীতের কথা মনে করিয়ে বারংবার আরও প্ররোচিত করে তার ওপর অত্যাচার করতে। উৎসাহিত করে আরও, আরও, আরও নৃশংস হতে মানুষকে! অত্যাচার একসময়ে মানবিকতার সীমা লঙ্ঘন করে যায়। আর, যে মানুষ একবার অত্যাচার করার এই সীমা অতিক্রম করে যায়, সে আর ফিরে আসে না। রক্ত দেখার এবং আর্তনাদ শোনার প্রবল নেশা তাকে পেয়ে বসে। আদিকাল থেকেই অত্যাচার করার মধ্যে মানুষের মন একধরনের নেশা খুঁজে পায় যা জগতের শ্রেষ্ঠ মদের চেয়েও প্রবল। একবার সে এর স্বাদ পেলে সে বারংবার এর স্বাদ পেতে চায়। এভাবেই নিজেকে অত্যাচারিত করে শয়তান ঈকপা এক সাধারণ নিরীহ মানুষকেও পরিবর্তিত করে এক নৃশংস, রক্তলোলুপ মানুষরূপী পিশাচে!
আমি কী বলব ভেবে পেলাম না। বৃদ্ধ লামা সভয়ে বুদ্ধমূর্তির দিকে চেয়ে প্রণাম করলেন। বললেন,
— নিজের শত্রুকেও ক্ষমা করার কথাই বলেছিলেন সিদ্ধার্থ। তাঁর দেখানো পথেই একমাত্র জয় করা যায় এই শয়তানকে।
বুদ্ধর দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করলাম আমিও। লামা বললেন,
— আমার সঙ্গে প্রার্থনা করতে আপত্তি নেই তো, প্রফেসর?
–না, মহান।
–তবে এসো, ত্রি রত্ন উচ্চারণ করো। আমার সঙ্গে বলো, ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি। ধর্মং শরণং গচ্ছামি। সংঘং শরণং গচ্ছামি।’
আমি চোখ বুজে বললাম,
–আমি বুদ্ধর শরণে সমর্পিত। আমি ধর্মর জন্যে সমর্পিত।আমি সংঘর নামে সমর্পিত।
–নিজের মনের পাপ বোধকে ত্যাগ দাও। যে মৃত্যুকে নিজের দাস বানাতে চেয়েছিল, তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ছিল। তার মৃত্যুর জন্যে তুমি দায়ী নও।
আবারও চমকে উঠলাম আমি। এই বৃদ্ধর কাছে কি কোনো কিছুই অজ্ঞাত নয়? আমি যে আজও শিনিগামির ঘটনায় মান্টো সিং-এর মৃত্যুর জন্যে নিজেকে দায়ী করি তা তিনি কীভাবে জানলেন? এই কথা আমি এতদিনে কাউকে বলিনি!
চোখ আমার এখনও বন্ধ। টের পেলাম বৃদ্ধ আমার মাথায় হাত রেখেছেন। অনেকদিন পর শান্তি পেলাম যেন। বললাম,
–ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার চিন্তা নেই। আমরা আজকেই চলে যাব মঠ ছেড়ে।
উত্তরে তিনি কিছু একটা বলতে গিয়েও যেন বললেন না।
৪.
আমি দ্রুত গিয়ে স্মিথ আর আমাদের গাইডকে তৈরি হয়ে নিতে বললাম। কারণ জানতে চাইলে বললাম যে, আমরা যত দ্রুত সম্ভব এই মনাস্ট্রি ছেড়ে চলে যাব। স্মিথ যেভাবে অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে চাইল তাতে স্পষ্ট বুঝলাম যে, তার রাতের ঘটনা কিছুই মনে নেই। স্মিথকে শুধু বললাম পথে সব বুঝিয়ে বলব, কিন্তু এই মুহূর্তে যেন সে আমার কথা মেনে নেয়। অন্যথায় বড়ো বিপদ আসতে চলেছে।
স্মিথ শুধু একবার বলল,
–কিন্তু, ওই ডেমনের গল্পটা? ওটার ব্যাপারে যে কিছুই জানা গেল না, ব্যানার্জি।
–আমি জেনেছি। তোমায় সব বলব পরে। কিন্তু, এখন নয়। নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নাও, ব্রাদার। উই আর লিভিং দিস মনাস্ট্রি, অ্যাস্যাপ!
কথামতো আমরা একঘণ্টার মধ্যেই রওনা দিলাম। মঠ থেকে যখন হাঁটা শুরু করেছিলাম, তখন আবহাওয়া বেশ ভালো ছিল। কিন্তু বেশি না, মাত্র দেড় কিলোমিটার পথ এগোনোর পরেই হঠাৎ যেন রোদ্দুর ঝিমিয়ে গেল। কী ঘটছে বোঝার আগেই দেখলাম আমাদের মাথার ওপর কালো মেঘ ঢেকে ফেলেছে। মেঘের বুক চিরে ঘন ঘন খেলা করছে বিদ্যুৎ। গাইডের মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম তার মুখ থমথমে।
স্মিথ ঘাবড়ে গেছে। গাইডকে প্রশ্ন করল,
— কতক্ষণ সময় আছে আমাদের হাতে?
–স্যার, আর পনেরো-বিশ মিনিটের মধ্যে প্রবল ঝড় আসবে। আমাদের হাতে চংথাম পয়েন্ট অবধি পৌঁছোনোর সময় নেই। আমাদের ফিরে যেতে হবে স্যার মঠে। নাহলে খোলা আকাশে এই ঝড়ের মধ্যে পড়ব।
আমি জোর দিয়ে বললাম,
–অসম্ভব। আমরা ফিরতে পারি না মঠে।
–স্যার, আপনি কেন জেদ করছেন? আপনার কোনো ধারণাই নেই যে, এই পাহাড়ের ওপর ঝড় কতটা ভয়ংকর হতে পারে। খোলা আকাশে এর খপ্পরে পড়লে কেউ বাঁচাতে পারবে না। আমাদের নিয়ারেস্ট সেফ পয়েন্ট হচ্ছে ঈকপা মঠ। সেখানে গেলেই আমরা একমাত্র প্রাণে বাঁচব।
ঈকপার নাম শুনেই আমার মনে অশনিসংকেত দেখা দিল। এই হঠাৎ ঝড় কি তবে ঈকপার কারসাজি?
স্মিথ চেঁচিয়ে উঠল,
— হোয়াট’স রং উইথ ইউ, ব্যানার্জি? পাগল হলে নাকি? এই একটু আগে আচমকা আমাদের তাড়া দিয়ে বের করে আনলে মনাস্ট্রি থেকে। আর, এখন সামনে এগোলে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ফিরতে চাইছ না! আর ইউ গোয়িং ক্রেজি?
কী উত্তর দেব ভেবে পেলাম না। আমি কী করে ওকে বোঝাই যে, ওরই জন্যে ঘোর বিপদ অপেক্ষা করে রয়েছে মঠে। আমি তাও ফিরে যেতে ইতস্তত করছি দেখে কিছুটা রেগে গিয়েই স্মিথ বলল,
–আই এম গোয়িং ব্যাক। গাইড, চলো। অতীন্দ্রও আমাদের সঙ্গেই আসছে। ইয়েস, ব্রাদার। তুমি পাগল হয়ে গেলেও, আমি হইনি। তোমাকে নিয়েই আমরা ফিরব। প্রয়োজনে জোর করে ধরে নিয়ে যাব। আই অ্যাম নট লিভিং ইউ বিহাইন্ড টু ডাই।
তখনই তীব্র কান ফাটানো শব্দে বাজ পড়ল একটা পাহাড়ের চুড়োয়। এতক্ষণে শনশন হাওয়া উঠতে শুরু করেছে পাহাড়ে। কালদূতের মতো ঘন কালো মেঘটা আরও কাছাকাছি চলে এসেছে আসন্ন প্রলয়ের ইঙ্গিত নিয়ে। গাইড আরও একবার বলল,
–স্যার, দয়া করে চলুন। ঝড়ের প্রকোপ বাড়লে যেকোনো সময় ‘অ্যাভ্যাল্যাঞ্চ’ নেমে আসে বরফঢাকা পর্বতের ঢাল বেয়ে। আমরা শেরপারা নিজের সাথিদের ছেড়ে পালাই না। এটা আমাদের ধর্ম না। যদি আপনি নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার জেদ করেন, তবে আমাকেও আপনার সঙ্গেই মৃত্যুর মুখে যেতে হবে। প্লিজ, স্যার। বোঝার চেষ্টা করুন।
এরপর আর কথা চলে না। অগত্যা আমাদের সামনে চলা থামিয়ে আবারও মঠের পথ ধরতে হল। আমি শুধু একবার প্রশ্ন করলাম গাইডকে
— পাহাড়ে দ্রুত আবহাওয়া পরিবর্তন হয় জানি। কিন্তু, এরকম হঠাৎ হওয়াটা কি স্বাভাবিক?
–পাহাড়ে হঠাৎই আবহাওয়া পালটে যায় ঠিকই। কিন্তু… কিন্তু সত্যি বলতে আমি এত বছরে কোনোদিন এরকম হতে দেখিনি। ঠিক যেন…
— ঠিক যেন?
–ঠিক যেন কেউ চাইছে না যাতে আমরা এগোতে পারি। তাকিয়ে দেখুন, ওই কালো মেঘটা যেন আমাদের তাড়া করে মঠের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
বুঝলাম আমার অনুমানই ঠিক। কিছুটা পথ যেতেই আবারও দূরে মঠের চুড়োটা দেখা দিল। ঈকপা আমাদের ডাকছে!
যে অশুভ অনুভূতিটা এতক্ষণ আমার হয়নি, সেটা এবার হওয়া শুরু হল।
৫.
দূর থেকে আমাদের আসতে দেখেই ভিক্ষুরা মঠের দরজা খুলে রেখেছিল আমাদের জন্যে। ভিক্ষুরা আকাশের অবস্থা দেখে অনুমান করতেই পেরেছিল যে, আমরা বেশিদূর যেতে পারব না। ফিরে আসতেই হবে আবার। তাই মঠে ঢোকার পর কেউই কিছু বলল না। আমরা আমাদের নির্দিষ্ট ঘরের দিকেই এগিয়ে গেলাম। শুধু যাওয়ার সময়ে বৃদ্ধ লামার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হতেই তিনি একবার আফশোসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। বুঝতে পারলাম, তিনি আন্দাজ করেছিলেন এরকমই কিছু একটা হবে। আমাদের ফিরে আসতেই হবে নিয়তির অমোঘ টানে। সেটাই বলতে গিয়েও তিনি তখন বলেননি।
স্মিথকে ঘরে পাঠিয়ে ফিরে এলাম বৃদ্ধ লামার কাছে। বাইরে প্রবলবেগে ঝড় চলছে। ভেতরেও তার শব্দ কানে আসছে। আমি লামাকে বললাম,
— ঝড় থামলেই আমরা আবার রওনা দেব।
আধবোজা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ উত্তর দিলেন,
— এ ঝড় থামবে না। রাতের জন্যে প্রস্তুত হও।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। তারপর বললাম,
— ঈকপার থেকে কি কোনো মানুষ বাঁচতে পারে না? আমার মনেও তো সাধারণ মানুষের মতো ক্ষোভ, ক্রোধ সবই আছে। আমি তো আপনাদের মতো সন্ন্যাসী নই। কিন্তু, আমায় তো সে আকৃষ্ট করছে না। তবে?
–হয় তোমায় রক্ষা করেছে কোনো অপার শুভশক্তি। তোমার গলার ওই রক্ষাকবচের মাধ্যমে। অথবা, তোমার জীবনে তীব্র ঘৃণা করার মতো কেউ নেই। তা ছাড়া, ঈকপার ক্ষমতা কমেছে। সে সাধারণ মানুষদের ওপর বেশিদূর থেকে প্রভাব ফেলতে পারে না। সেই কারণেই আজকাল সাধারণ মানুষদের মঠে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। বহু বছর হল ঈকপা কাউকে ডাকেনি। শেষবার সেই অনেক বছর আগে।
কিছুক্ষণ থেমে তিনি আবার বললেন,
–নিজের মনের ক্রোধ, ঈর্ষা, ঘৃণা সব কিছুকে যে ত্যাগ দিতে পারে, যে নিজের অন্তরের শান্তি খুঁজে পায়, তার ওপর এই অপদেবতার কোনো প্রভাব থাকে না। যেমন, আমরা। এই মঠের সন্ন্যাসীরা।
সম্ভাবনাটা অনেকক্ষণ থেকেই মাথায় ঘুরছিল। এইবার বলেই ফেললাম,
–তার মানে এই মঠের ভিক্ষু হওয়ার আগে যা পরীক্ষার কথা শোনা যায়… সেটা…
–হ্যাঁ। তুমি বুদ্ধিমান প্রফেসর। ঠিকই অনুমান করেছ। আমাদের এখানে ভিক্ষু হতে গেলে সর্বপ্রথম নিজের অন্তরের সমস্ত দ্বেষ ত্যাগ দিতে হয়। এই মঠে সে-ই সন্ন্যাসী হতে পারে, যে নিজের চরম শত্রুকেও ক্ষমা করতে সক্ষম। যে ঈকপার সামনে দাঁড়িয়েও বলতে পারে, ‘তোমায় ক্ষমা করলাম। বুদ্ধ তোমায় শাস্তি দিন!’ হৃদয়ে সামান্যতম হিংসা প্রবৃত্তি থাকলেই ঈকপা তোমার সেই দ্বেষকে পরিচালিত করতে তোমার শত্রুর রূপ ধরবে। আমাদের এই মঠে ভিক্ষু হতে গেলে তাদের পরীক্ষা দিতে হয়। কিন্তু, পরীক্ষার শেষ এবং সবচেয়ে কঠিন ধাপটা হল, ঈকপার মুখোমুখি হতে হয় সন্ন্যাসীকে। ঈকপার ঘরে তাকে ঢুকিয়ে দেয়া হয় একদিনের জন্যে। নিজের অন্তরের ক্ষোভ এবং হিংসাকে নিজের বশে এনে যদি সেই ব্যক্তি ঈকপাকে আঘাত না করে থাকতে পারে, শয়তানের হাজার উসকানির পরেও যদি নিজের ক্রোধকে সংযমে রাখতে পারে, তাকেই সন্ন্যাসী হিসেবে স্থান দেয়া হয় এখানে।
–আর, যদি সেই মানুষ তা করতে অসফল হয়? তবে?
মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন বৃদ্ধ। বললেন,
— বহু বছর আগে এমন একটা ভুল আমি করেছিলাম। একজন সন্ন্যাসী হতে চেয়ে নীচের সমতলের গ্রাম থেকে এসেছিল এই মঠে। আমি ভেবেছিলাম, সে তৈরি। তাই তাকে পাঠিয়েছিলাম ঈকপার কক্ষে। ভুল যখন বুঝেছিলাম, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছিল।
আমার মনে পড়ে গেল পরশু রাতে আমাদের গাইডের শোনানো গল্পটা। তবু জিজ্ঞেস করলাম,
–তারপর?
— তার জীবনে শোকের জায়গা ছিল তার স্ত্রী। স্ত্রী তাকে পরিত্যাগ করে অন্য প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়েছিল। ঈকপা তার সামনে আসে তার স্ত্রীর প্রেমিকের রূপে। বার বার স্ত্রীর সঙ্গে নিজের অন্তরঙ্গতা এবং তার নপুংসকতার উল্লেখ করে তাকে উত্তেজিত করে তোলে। হার মানে সেই লোকটি।
চোখ বুজে কিছুক্ষণ বসে থাকলেন বৃদ্ধ। মনে হল কোনো দৃশ্য ওঁর স্মৃতিতে হানা দিয়ে কাঁপিয়ে দিচ্ছে তাঁকে। বৃদ্ধ চোখ খুলে বললেন,
–আমরা যখন ঈকপার কক্ষে ঢুকি, ততক্ষণে শেকলবন্দি ঈকপাকে সে প্রায় একটা বীভৎস মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছে। দুটো চোখে গরম শলাকা ঢুকিয়ে দিয়েছে, শরীরের জায়গায় জায়গায় জ্বালিয়ে দিয়েছে, ক্ষতবিক্ষত শরীর। কামড়ে কাঁধের কাছের মাংস ছিঁড়ে নিয়েছে। ঈকপা তখনও তাকে আরও রাগিয়ে চলেছে। ক্রমাগত তাকে অপমান করে চলেছে স্ত্রীর নাম করে।
আমরা তাকে বের করে আনি। ফিরে যেতে বলি তাকে গ্রামে। সে ফিরে যায়। কিন্তু, যা সর্বনাশ হওয়ার, তা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। একমাসের মধ্যেই সে ধরা পড়ে গ্রামের একটা বাচ্চাকে বেঁধে অত্যাচার করতে গিয়ে। জানা যায়, লোকটা ইতিমধ্যে বেশ কয়েক জনকে অত্যাচার করে খুন করে ফেলে। একবার কেউ মনুষ্যত্বর সীমারেখা লঙ্ঘন করে গেলে, সে আর ফিরে আসে না। আর কোনোদিন সে ফিরে যায় না তার আগের অবস্থায়!
কিছুক্ষণ দু-জনেই চুপ করে বসে থাকলাম। স্মিথ ঢুকল। আমায় ওভাবে বসে থাকতে দেখে প্রশ্ন করল,
–হোয়াট হ্যাপেন্ড?
আমি কিছু বললাম না। স্মিথ আবার বলল,
–ও মাই গড। ইউ আর ফ্রিকিং মি আউট! তোমার রকমসকম দেখে আমার সত্যি ভয় লাগছে। কী হয়েছে বলবে কি?
আমি উঠে দাঁড়ালাম। বৃদ্ধ লামা আমায় আস্তে আস্তে বললেন,
–বন্ধুর মনের অন্ধকারের উৎস খুঁজে বের করো। অন্ধকার যত লুকিয়ে গভীরে রেখে দেবে, ততই তা বাড়ে। অন্ধকার গোপনে শেকড় বিস্তার করে। খোঁজো সেই অন্ধকারময় অতীত।
৬.
স্মিথ বিছানায় বসে আছে আর আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আর ভাবছি যে, আমার কী করা উচিত। কায়দা করে ঘুরিয়ে ওর ভেতর থেকে কথা বের করার চেষ্টা করব? নাকি, সরাসরি প্রশ্ন করব? সরাসরি প্রশ্ন করলে হতে পারে স্মিথ আরও বেশি গুটিয়ে যাবে। কিন্তু, স্মিথকে অনেকদিন হল চিনি। এটুকু বিশ্বাস ওকে করাই উচিত আমার।
ভেবে দেখলাম যে, স্মিথকে সব ঘটনা খোলাখুলিই বলব। আমি বেশ বুঝতে পারছি যে, স্মিথের অতীতে কোনো ঘটনা আছে যা সে গোপন রেখেছে। আমি সত্যি কথা সোজাসুজি বললে আশা রাখি সেও আমার ওপর বিশ্বাস রাখবে এবং তার অতীতের সেই ঘটনা আমাকে বলবে।
আমি তার পাশে বসে বললাম,
— শোনো, ব্রাদার। আমি তোমায় এখন যা বলতে চলেছি আমি চাই সেগুলো তুমি খুব মন দিয়ে শুনবে। ইট’স ইম্পর্ট্যান্ট। তোমার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এর ওপর।
–হোয়াট’স গোইং অন, ম্যান? তুমি এরকম হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে গেলে কেন সকাল থেকে? মঠে ফিরতে চাইছিলে না কেন?
— কারণ আছে। তোমাকে আমি এই মঠে ফিরিয়ে আনতে চাইছিলাম না কিছুতেই।
–জানি কারণ আছে। আমি তোমায় চিনি। তুমি আমার পরিচিত সবচেয়ে বুদ্ধিমান আর লজিকাল মানুষদের মধ্যে একজন। কারণ ছাড়া তুমি ওরকম অদ্ভুত ‘বিহেভ’ করতে না। কী হয়েছে আমায় বলো।
— স্মিথ। তুমি ই.এস.পি. কী জিনিস জানো?
— এক্সট্রা সেন্সরি পারসেপশন।
–হ্যাঁ। কিছু কিছু মানুষ তাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের বাইরেও অনেক কিছু অনুভব করতে পারে, বা, অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করতে পারে যা সাধারণ মানুষের ইন্দ্রিয়ের অতীত। জেনে রাখো, আমারও সেরকমই কিছু একটা আছে। ব্যাপারটা ঠিক কীভাবে কাজ করে তা আমিও সঠিক জানি না। শুধু বলতে পারি যে, আমার সঙ্গে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে যা ব্যাখ্যাতীত। অনেক অল্প বয়স থেকেই আমি অনুভব করতে পারতাম নিজের আশেপাশে এমন কিছু অস্তিত্বকে যা পঞ্চইন্দ্রিয়ে অধরা। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও মেটাফিজিক্স ইত্যাদির ওপর আমার ঝোঁক সেই কারণেই ছিল ছোটো থেকেই। পরবর্তীতে একটা ঘটনায় সেই ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। সেকথা এখন বলার সময় নয়। কিন্তু, শুধু জেনে রাখো যে আমি অশুভ, অপার্থিব অস্তিত্বকে অনুভব করতে পারি। আমার অবচেতন মনের ভেতর থেকে একধরনের বিপদসংকেত পাই, যখনই সেরকম কোনো অস্তিত্বর মুখোমুখি হই। যেমন, আমি এখন সেরকমই একটা কিছু তীব্রভাবে অনুভব করছি।
— মানে?
— স্মিথ। এই মঠে কী আছে, তা আমি জানি। তোমায় আমি সব খুলে বলব, কিন্তু তোমাকে আমায় বিশ্বাস করতে হবে।
–ওকে। ইট’স আ লট টু টেক ইন। কিন্তু, আমি তোমাকে চিনি। তাই আমি বিশ্বাস করি।
আমি স্মিথের মুখোমুখি বসে তাকে আজকে সকালে প্রধান লামার সঙ্গে আমার কথোপকথন পুরোটা খুলে বললাম। স্মিথ সব কিছু শুনল। তার চোখে- মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে বলল,
— তুমি নিশ্চিত যে, এগুলো সত্যি?
–হ্যাঁ।
–হুমম।
— তুমি যদি আমায় কিছু বলতে চাও তো এটাই সঠিক সময়। নাও ইজ দ্য পারফেক্ট টাইম টু সে। তুমি কথা গোপন করে গেলে তোমারই বিপদ আসন্ন, বন্ধু।
স্মিথের ঠোঁট সামান্য কাঁপল। একমুহূর্তের জন্যে যেন কিছু একটা বলতে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই আমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল,
–আমি জানি না তুমি কীসের কথা বলছ।
আমি শুধুই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম। আমি স্মিথের কাঁধে হাত রাখলাম,
— তুমি আমার পুরোনো বন্ধু। যদি কোনো অপরাধ তুমি অতীতে করে থাকো, তবে আমায় নির্দ্বিধায় বলতে পারো। আই প্রমিস দ্যাট আই ওন্ট জাজ ইউ।
–আমি কোনো অপরাধ করিনি, ব্যানার্জি! ইউ আর রং! তুমি ভুল!
–তবে কাল রাতে কেন তুমি মঠের মধ্যে ঘুরছিলে একা? কী খুঁজছিলে, স্মিথ? কেন এসেছ এখানে?
স্মিথ কোনো উত্তর না দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকল। আমি হতাশ ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালাম। বেশ বুঝতে পারছি স্মিথ কিছু একটা চেপে যাচ্ছে। সম্ভবত ও বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যেই এখানে এসেছে। আমাকে ও সম্পূর্ণ সত্যি বলেনি। বললাম,
–বেশ। কিন্তু, আজ রাতে তোমায় আমি এই ঘর থেকে বেরোতে দেব না। তুমি আমার বন্ধু। তাই তুমি নিজের সর্বনাশ করতে চাইলেও আমি তা হতে দেব না।
রাত গভীর হচ্ছে ধীরে ধীরে। বাইরের ঝড়ের প্রকোপ কমলেও, এখনও হাওয়া বইছে জোর। স্মিথের মধ্যে কোনো পরিবর্তন লক্ষ করছি না আপাতত তবে, আমার সঙ্গে ও কথা বলছে না আর তারপর থেকে। আমি স্মিথকে চোখের আড়াল হতে দিচ্ছি না। সারারাত আজ প্রয়োজনে জেগে ওকে পাহারা দেব। এমনকী, আমি বাইরে গেলেও আমাদের ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে যাচ্ছি।
রাত তিনটে নাগাদ একবার বাইরে গেছিলাম বাথরুমে। স্মিথ দেখলাম নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। বাথরুম থেকে টানা বারান্দা ধরে ঘরে ফিরছিলাম, হঠাৎই মনে হল কেমন যেন গা শিরশির করে উঠল। কাঁটা দিল গায়ে। এবং, আমার অনুভূতিগুলো সজাগ হয়ে উঠল। কেউ যেন মনের ভেতর থেকে বলে দিল ‘বিপদ’।
কিন্তু, কীভাবে? আমি তো আসার সময়ে স্মিথকে ঘরে আটকে এসেছি। তবে?
দৌড়ে ফিরলাম আমাদের ঘরের কাছে। বাড়তি সতর্কতা হিসেবে আমাদের ঘরের বাইরে দু-জন ভিক্ষুকে প্রধান লামা প্রহরায় থাকতে বলেছেন আজকের রাতের জন্যে। তারা দেখলাম ঠিকই বসে আছে নিজেদের জায়গায়। আমায় দেখে তারা হাসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
–আমার বিদেশি বন্ধু কোথাও বেরোয়নি তো?
–না। দরজা তো আপনি বাইরে থেকে বন্ধ করেই গেছেন।
তাকিয়ে দেখলাম, ঠিকই, দরজা যেমন বাইরে থেকে লাগিয়ে গেছিলাম, তেমনই আছে। তাহলে কি আমি অকারণেই চিন্তিত হলাম? ভুল করলাম? কিন্তু, আমার এতদিনের অভিজ্ঞতা বলছে আমার অনুভূতি কখনো ভুল হয়নি আজ অবধি।
দ্রুত দরজা খুললাম। আর, খুলতেই হিমেল ঠান্ডা বাতাস এসে কাঁপিয়ে দিল আমাকে। দেখলাম ঘরের গরাদহীন জানলাটা খোলা। ওটা থেকেই বরফ কুচি মেশানো ঠান্ডা বাতাস হু-হু করে ঢুকছে ভেতরে। আর, স্মিথ ঘরে নেই! ছুটে গিয়ে জানলার নীচে উঁকি দিতেই নীচে বরফের ওপর পায়ের ছাপ চোখে পড়ল। এই এতটা উচ্চতা থেকে নীচে ঝাঁপ দিয়েছে। পুরু তুষারের পরত থাকায় সে চোট পায়নি। এই অসম্ভব ঠান্ডায়, খালি পায়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে স্মিথ। পায়ের ছাপ মঠেরই অন্যদিকে চলে গেছে।
বেরিয়ে এসে একজন ভিক্ষুকে শিগগির প্রধান লামাকে খবর দিতে বললাম। অন্যজনকে বললাম আমায় নীচের কালকুঠুরিতে নিয়ে যেতে। আমি নিশ্চিত ঘুরপথে স্মিথ সেখানেই গেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি এবং সঙ্গে একদল ভিক্ষু পাতালঘরের দরজার সামনে পৌঁছোলাম। দেখলাম এই পাতালঘরের দরজাটা বিশেষ কায়দায় লুকোনো। সাধারণত পথ জানা না থাকলে এটা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। অথচ, মেঝেতে ভেজা পায়ের ছাপ দেখেই বুঝতে পারছি স্মিথ একেবারে সঠিক পথ ধরেই এই দরজা অবধি পৌঁছেছে। ঠিক যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে নিয়ে এসেছে পথ দেখিয়ে।
দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। এই বিশাল ভারী দরজা সবাই মিলে জোর লাগালেও খোলা যাবে না। ভেতর থেকে মৃদু কথার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কী কথা বলছে তা শোনা না গেলেও ভেতরের দুটো কণ্ঠর একজন যে স্মিথ, সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই।
কিছুক্ষণ বাদেই বৃদ্ধ লামা প্রধান এলেন। আমায় বললেন,
–অন্য একটা দরজা আছে। আশা করি, সেটাও ভেতর থেকে বন্ধ করেনি। কিন্তু, তুমি বাইরে থাকো। কারণ, তুমি সন্ন্যাসী নও। এতক্ষণ তুমি তার প্রভাবে না পড়লেও, ভেতরে প্রবেশ করলে তোমার ওপরেও ঈকপার প্রভাব পড়বে। তাই তুমি এখানেই অপেক্ষা করো।
আমি প্রতিবাদ করে বললাম,
–তা হয় না। স্মিথ আমার বন্ধু। এই মুহূর্তে তাকে যদি কেউ ঘোর পাপ করা থেকে বাঁচাতে পারে, সে আমি। আপনি চিন্তা করবেন না। আমার রক্ষকবচ আছে।
নিজের অজান্তেই আমার হাত গলার তাবিজে চলে গেছিল। বৃদ্ধ সেদিকে দেখে মৃদু ঘাড় নেড়ে বললেন,
— বেশ, তবে তাই হোক। হয়তো এটাই বুদ্ধর ইচ্ছা। হয়তো তুমিই পারবে অঘটন ঘটা থেকে আজ নিজের বন্ধুকে রক্ষা করতে। এসো আমাদের সঙ্গে।
ঘুরে অন্যদিকে ঘরের দ্বিতীয় একটা দরজা দেখা গেল। তালা খুলে ঠেলা দিতেই এই দরজাটা খুলে গেল। দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করলাম আমরা।
দু-পা এগোতেই ভেতর থেকে স্মিথের আদেশের সুর ভেসে এল,
— এগোবে না! কেউ আর এক পা-ও এগোবে না!
মাত্র কয়েকটা প্রদীপের হালকা আলোয় দেখতে পেলাম স্মিথকে। এই মুহূর্তে তার সামনে একটা অবয়ব লোহার শেকলে বন্দি অবস্থায় দাঁড়িয়ে। লোকটিকে দেখে মনে হল এখানকার লোকালদেরই কেউ। মংগোলয়েড চেহারা, টানা টানা ছোটো চোখ। লোকটি তার দিকে চেয়ে হাসছে। যেন বন্দি থেকেও সে মজা পাচ্ছে। আশ্চর্য! কে এই লোকটা? এ-ই কি বহুরূপী শয়তান ঈকপা? কিন্তু, তাহলে সে এই রূপে কেন দেখা দিল স্মিথকে?
স্মিথের হাতে একটা ধারালো ছুরি। আর সামনে আরও অনেক অস্ত্র এবং অত্যাচারের সরঞ্জাম। স্মিথ ছুরিটা ধরে আছে লোকটার গলায়। কিছুটা চিরেও গেছে গলা। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
আমি হাত তুলে ওকে থামতে বললাম,
— স্মিথ! কী করছ তুমি? কে এই লোকটা?
— কেউ না! ইট’স নান অব ইয়োর বিজনেস! বেরিয়ে যাও তোমরা!
–স্মিথ! বন্ধু! দাঁড়াও। এটা কে, স্মিথ? বলো আমায়।
স্মিথ হিসহিসে গলায় বলল,
–অনেক বছর আগে যে লোকটা এই মঠে সন্ন্যাসী হতে আসে। কিন্তু, শেষ পরীক্ষায় সে এই শয়তানের সামনে এসে হেরে যায়। সে পরিণত হয় একটা আস্ত ডেভিলে! সে সমতলের গ্রামে ফিরে গিয়ে বাচ্চাদের অপহরণ করে অত্যাচার করতে শুরু করে। দুর্ভাগ্যক্রমে সেইসময়েই ওই গ্রামে ক্যাথলিক মিশনের অংশ হয়ে সেখানে এসেছিলেন আমার ঠাকুরদা আর তাঁর সঙ্গে ছিল তাঁর বারো বছর বয়সি ছেলে। আমার বাবা! এই লোকটা! হ্যাঁ, এই লোকটা আমার বাবাকে কিডন্যাপ করে। অকথ্য অত্যাচার চালায় তার ওপর! যে শেষ বিদেশি ছেলেটিকে, এই জানোয়ারটার অকথ্য অত্যাচারের পরেও জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল, সে আমার বাবা ছিল!
আমি এবং অন্যরা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। তার মানে স্মিথের সামনে এই মুহূর্তে ঈকপা যে ব্যক্তির রূপ ধরেছে সে আর কেউ নয়, সেই সন্ন্যাসী, যে পরবর্তীকালে এক স্যাডিস্ট হত্যাকারীতে পরিণত হয়েছিল!
স্মিথ আবার বলতে শুরু করে,
–আমার বাবা এরপর দেশে ফিরে যায়। স্বাভাবিক জীবনযাপন করার আশায়। কিন্তু, বাবা কোনোদিন সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আমি দেখেছি বাবাকে রাতের পর রাত দুঃস্বপ্ন দেখে চেঁচিয়ে উঠতে। একা একা নিজের ঘরে কাঁদতে। আমি দেখেছি বাবার শরীরের সেই ভয়ংকর ক্ষতগুলো। শিউরে উঠেছি আর মনে মনে ঘৃণা করেছি সেই অজানা অত্যাচারীকে।
শেষজীবনে, মৃত্যুর আগে বাবা আমায় সব ঘটনা বলে যায়। আমি সারাজীবন যে ব্যক্তিকে ঘৃণা করেছি তার খোঁজ শুরু করি। পুরোনো খবরের কাগজে ছবি পাই। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম এই ভারতেই একটা অ্যাসাইলামে সে আজও জীবিত। আগুনে পুড়ে তার মৃত্যু হয়নি। সারাশরীর পুড়ে গেলেও সে বেঁচে গেছিল সেদিন!
প্রধান লামা বললেন,
— তোমার বাবার সঙ্গে যেটা হয়েছে সেটা অন্যায়। কিন্তু, তুমি এ কী করছ?
এক পা এগোতেই চেঁচিয়ে উঠল স্মিথ,
— এগোবে না! এগোলে আমি নিজের গলায় ছুরি চালাব।
থেমে গেল এগোতে থাকা ভিক্ষুরা। তখনই বন্দি লোকটা হিসহিসে গলায় বলল,
–তোর বাপকে আমি এভাবেই বেঁধে উলটো ঝুলিয়েছিলাম। লোহার আংটায় কয়লা গরম করে সারাশরীরে ছ্যাঁকা দিয়েছিলাম। তার কচি নরম, গরম শরীরটাকে আমি বার বার…
কথা শেষ করার আগেই জোরে তার মুখে আঘাত করল স্মিথ। রাগে আর ঘৃণায় কাঁপছে স্মিথের শরীর।
স্মিথ বলল,
–আমি অ্যাসাইলামে গিয়ে দেখা করি তার সঙ্গে। সে একটা বদ্ধ উন্মাদ। কিন্তু, সে আমায় সত্যি ঘটনাটা বলেছিল। আমায় জানিয়েছিল এই মঠের বন্দি ডেমনের কথা। সব শুনে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, আসল অপরাধী তো এই মঠে আছে! সব কিছুর জন্যে দায়ী আসলে এই শয়তান! তাকে আমাকে শেষ করতেই হবে। এটাই আমার বাবার জীবন নষ্ট করার প্রতিশোধ!
রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সামনে বাঁধা লোকটির মুখ থেকে। বিশ্বাসই হয় না যে, এ আসলে মানুষ নয়। সে এক বহুরূপী শয়তান ঈকপা! ঈকপা আবারও হেসে বলল,
— হ্যাঁ! আমি, আমি! আমিই দায়ী! ঠিক বলেছিস। আমিই তোর বাবার সঙ্গে সব করেছি। এই আমার চেহারার লোকটা সব করলেও, আসলে আমিই তাকে দিয়ে করিয়েছি সব। তার মাধ্যমে আমিই তো সব করেছি! কী কী করেছিলাম, শোন! তোর বাবার হাতের একটা একটা করে নখ আমি একটা চিমটে দিয়ে টেনে টেনে উপড়ে ফেলেছিলাম!
স্মিথ ছুরিটা তোলে কোপ মারার জন্যে। আমি চিৎকার করে উঠি,
–স্মিথ! স্টপ!
— নো। আই মাস্ট কিল হিম! আই মাস্ট কিল হিম!
–বাট ইউ কান্ট। তুমি একে খুন করতে পারবে না, স্মিথ। দেখো তোমার সামনের মূর্তিটাকে। তার চেহারা মানুষের মতো হলেও সে মানুষ নয়। এটা মানুষ নয়! ইট’স আ ডেমন, স্মিথ! ইট’স পিয়োর ইভিল। সে তোমাকেও নিজেরই মতো একটা শয়তানে পরিণত করবে!
কাঁপছে স্মিথ। আমার কথা বোধ হয় কানে ঢুকেছে। আমি আবারও বললাম,
–স্মিথ, মাই ব্রাদার! আমার কথা শোনো। তুমি তো এই লোকটাকেই অ্যাসাইলামে দেখেছ। পুড়ে সে আজীবন চরম যন্ত্রণায় কাটিয়েছে। তাই না? তবেই ভাবো। তাহলে তোমার সামনে এই লোকটা কে? স্মিথ! প্লিজ, একটু ভাবো! রাগে অন্ধ হয়ে যেয়ো না। এই শয়তান তোমাকে দুর্বল করতে, আরও রাগিয়ে দিতে চাইছে। তোমার অত্যাচারী বাবার রূপ ধরে আছে সেই কারণেই। এ তোমাকে দিয়ে অপরাধ করাতে চায়। এ চায় যেন তুমি তাকে বার বার হত্যা করো! অত্যাচার করো! হত্যা করতে না পেরে ফ্রাস্ট্রেটেড হও। এবং, রাগে, দুঃখে আরও অত্যাচার করো।
ঈকপা আবার বলছে,
–তোর বাপের পিঠের দাগটা মনে আছে? কীসের ওই দাগটা সেটা এতদিন ভেবে এসেছিস, না? আয়, আজকে আমি সেটা তোকে বলে দিচ্ছি! ওটা চামড়া তোলার দাগ! ওর পিঠের চামড়া আমি ছুরি দিয়ে একটু একটু করে…
আমি চিৎকার করে উঠলাম,
–স্মিথ! তুমি যদি একবারের জন্যেও তোমার হাতের ছুরিটা চালাও। তাহলেই এই শয়তান জিতে যাবে। ইভিল জিতে যাবে, বন্ধু। ওকে জিততে দিয়ো না। ওকে হারাও! লড়াই করো নিজের সঙ্গে। তুমি ওকে যতবার আঘাত করবে, তত ক্ষতবিক্ষত হয়ে উঠবে তোমার আত্মা। তোমার মন থেকে ততই মিটে যেতে থাকবে মনুষ্যত্ব।
কাঁপছে স্মিথ। আমি ওর অন্তর অবধি পৌঁছোতে পেরেছি। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে আমার বন্ধুর। কাঁপা ঠোঁটে প্রশ্ন করল,
— আমি… আমি তবে কী করব? আমি সারাজীবন ক্ষোভ নিয়ে কাটিয়েছি। আমি কী করব?
–লেট ইট গো, মাই ফ্রেন্ড। জাস্ট লেট ইট গো। তোমার বাবার ওপর যে অপরাধ করেছে, তাকে তুমি নিজেই দেখেছ অ্যাসাইলামে। উন্মাদ! উপেক্ষিত। একা। সারাশরীর জ্বলে পুড়ছে। সে তার পাপের সাজা পেয়েছে। আজ তুমি যদি একবার শুরু করো, একবার যদি অত্যাচারীর পথে পা বাড়াও, তবে দেয়ার ইজ নো কামিং ব্যাক ফ্রম ইট। তুমিও ঠিক সেই লোকটার মতোই হয়ে যাবে যাকে তুমি সারাজীবন ঘৃণা করে এসেছ। আজ এই মুহূর্তে যদি তোমার বাবা এখানে উপস্থিত থাকতেন, তিনি কি তোমায় এইভাবে দেখলে খুশি হতেন?
ঈকপা আবার বলে উঠল,
–তোর বাবার শরীরে আমার কামড়ের দাগ দেখেছিস না? ওগুলো আমি…
স্মিথ আবারও উত্ত্যক্ত হয়ে উঠছে। সে ছুরি থেকে হাত সরাচ্ছে না দেখে আমি আমার শেষ অস্ত্রটা প্রয়োগ করলাম,
— স্মিথ! নিজের ছেলের কথা ভাবো! দেখো স্মিথ! এই ছবিটা দেখো!
ঘর থেকে আসার সময় আমি স্মিথের ওয়ালেটটা নিয়ে এসেছিলাম। সেটা থেকে তার স্ত্রী-শিশুপুত্রর হাসিমুখ ছবিটা বের করে তুলে ধরলাম প্রদীপের আলোয়।
–দেখো, স্মিথ। দেখো, এদিকে! তোমার স্ত্রী জোসেফিন! তার হাসিমুখটা মনে করো। তোমার ছোট্ট শিশুর নিষ্পাপ মুখটা মনে করো, স্মিথ। তোমার কি মনে হয় না যে, এই জীবনে এইটুকুই যথেষ্ট? পৃথিবীর সব ক্রোধ, জিঘাংসা, প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে এই অনুভূতি, স্মিথ। ভালোবাসা! পৃথিবীর সব অন্ধকার মুহূর্তে ক্ষীণ করে দিতে পারে এই ভালোবাসা! নিজের মনকে প্রশ্ন করো স্মিথ, তোমার প্রতিশোধ কি তোমার শিশুর হাসির চেয়েও বেশি মূল্যবান?
স্মিথের হাত কাঁপছে। সে তাকিয়ে আছে আমার হাতে ধরা ছবিটার দিকে। তার চোখ দিয়ে নেমে আসছে অশ্রুধারা।
— স্মিথ। আজকে যদি তুমি এই কাজ করো, কোনোদিন কি নিজের স্ত্রী- সন্তানের কাছে দাঁড়াতে পারবে একজন মানুষ হিসেবে? মনের সব অন্ধকার ত্যাগ দাও, স্মিথ। সবার ওপর ভালোবাসা সত্য।
লামারা একসুরে ‘বুদ্ধং শরণং…’ মন্ত্র জপ শুরু করেছে। শান্তি নেমে আসছে ধীরে ধীরে। শান্তি নেমে আসছে ঘরের মধ্যে।
স্মিথের হাত ঝুলে পড়ল। ধীরে ধীরে খসে পড়ল ছুরিটা। আর, পড়তেই ধুলো হয়ে সেটা মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। সামনে সাজানো সরঞ্জামগুলোও চোখের সামনে উধাও হয়ে গেল। মিলিয়ে গেল ধুলো হয়ে।
আমি এগিয়ে গেলাম স্মিথের দিকে। জড়িয়ে ধরে সরিয়ে আনলাম তাকে। আমার হাত থেকে ছবিটা নিয়ে মাটিতে বসে পড়ল। বার বার ছবিতে চুমু খেতে খেতে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল আমার বন্ধু।
স্মিথকে সরিয়ে আনার সময়ে একমুহূর্তের জন্যে আমার চোখ পড়ল ঈকপার দিকে। ঈকপার রূপে পরিবর্তন হচ্ছে। বদলে যাচ্ছে তার চেহারা। সে আবার রূপ ধরছে… কিন্তু একী! এ যে আমি! ঈকপা আমার রূপ ধরছে। হুবহু আমার রূপ। শুধু চশমার আড়াল থেকে ধূর্ত, লোলুপ দুটো চোখ আমার পরিচিত। ঠোঁটের কোণে মৃদু ব্যঙ্গাত্মক হাসি।
বৃদ্ধ লামা আর অন্য ভিক্ষুরা আমাদের ধরে সেইমুহূর্তে বের করে আনল পাতালঘর থেকে। দরজায় ছিটকিনি দিয়ে দরজা বন্ধ করে দ্রুত তালা দিল তাতে।
৭.
পরের দিন সকাল। ঝলমলে রোদ উঠেছে বাইরে। আমরা বেরোনোর জন্য প্রস্তুত। প্রার্থনা কক্ষে প্রার্থনা চলছে। একইসঙ্গে সব সন্ন্যাসী মন্ত্রপাঠ করছে। স্মিথ, আমি এবং গাইড প্রার্থনা কক্ষের একধারে দাঁড়িয়ে আছি। প্রার্থনা শেষ হলে প্রধান লামার অনুমতি নিয়ে ফেরার পথ ধরব বলে
চাপাগলায় স্মিথের কানে কানে বললাম,
— তুমি সেদিন জানতে চাইছিলে না যে, এরা কী মন্ত্ৰ বলছে?
–ইয়েস।
–বুদ্ধিস্টদের মূলমন্ত্র। ‘ওম্ মণিপদ্মে হুম্’। ‘ওম্’ ইঙ্গিত করে আমাদের শরীর, হৃদয় ও মস্তিষ্ক। ‘মণি’ মানে জুয়েল যা জ্ঞান বা জ্যোতি বোঝায়। ‘পদ্মে’ মানে পদ্মফুল যা বিকশিত হওয়ার প্রতীক। কারণ, অপবিত্র নোংরা স্থানে এই ফুল ফোটে। ‘হুম্’ অর্থাৎ আমি বা স্বয়ং। এই মন্ত্র ঈশ্বরের কাছে নিবেদন করে যে আমার মন, মস্তিষ্ক ও হৃদয়কে জ্ঞান ও পবিত্রতার প্রকাশে আলোকিত করো। বিকশিত করো। শুদ্ধ করো। দূর করো আমার অন্তরের সব অশুদ্ধতা।
চোখ বন্ধ করে স্মিথ হাঁটুর ওপর ভর করে বসে পড়ল। হাতজোড় করে মাথা নত করে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসল। আমার মনে হল ও কাঁদছে।
প্রার্থনা শেষ হতে আমাদের দিকে হাসিমুখে এগিয়ে এলেন প্রধান লামা। বুদ্ধর নামে আশীর্বাদ করে বিদায় দিলেন আমাদের। বেরোনোর আগে একা পেয়ে, কাল রাত থেকে যে প্রশ্নটা আমার মনে খচখচ করছে সেটা করলাম,
–মহান, আমি যখন ঈকপার সামনে ছিলাম, তখন আমিও একজনকে দেখেছি।
–কাকে দেখতে পেয়েছ, প্রফেসর?
–আমি নিজেকে দেখতে পেয়েছি। ঈকপা আমারই রূপ নিয়ে আমাকে দেখা দিয়েছে। এর মানে কী?
খানিক ভেবে বৃদ্ধ উত্তর দিলেন,
–এর মানে আমিও তোমায় স্পষ্ট বলতে পারব না। হয়তো ভবিষ্যতে এর উত্তর তুমি পাবে। বা, হয়তো এর অর্থ তুমি নিজেই নিজের শত্রু। কারণ, তুমি একজন ‘দবুস না গনাস পা’।
— এই নামে আপনি আগেও আমায় সম্বোধন করেছেন। এর অর্থ কী? বৃদ্ধ পাশে রাখা একটা কাগজ-কলম টেনে তিব্বতি লিপিতে লিখলেন :
‘དབུས་ན་གནས་པ’
তিব্বতি লিপি আমি পড়তে পারি। অক্ষরগুলো সহজ, অনেকটা আমাদের পরিচিত বাংলা ও হিন্দি হরফের সঙ্গে মিল আছে। আমি পড়লাম,
–দবুস না গনাস পা। এর অর্থ কী?
–এর আক্ষরিক অর্থ ‘যে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে’। ঠিক যেমন তুমি। দুটো জগৎ, এই স্থূল জগৎ ও এক অন্ধকার, অপার্থিব জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছ তুমি। একবার যদি অন্ধকারের দিকে পাল্লা ভারী হয়ে যায়, তবে আর ফিরে আসতে পারবে না। তাই আগামীতে তোমাকে সাবধানে পা ফেলতে হবে। তোমার এই ক্ষমতা খুব কম মানুষকে প্রকৃতি দেয়। প্রলোভনের ফাঁদে বহু ‘দবুস না গনাস পা’ অন্ধকারের কাছে নিজের আত্মা বিসর্জন দিয়েছে। কারণ, অন্ধকারের দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকলে…
— অন্ধকারও তোমার দিকে ফিরে চাইবে।
তাঁর কথাটা নিজেই শেষ করলাম। আবারও আশ্চর্য হলাম। এই সাবধানবাণী যে আমার পূর্বপরিচিত।
প্রধান লামা হেসে বললেন,
–নিকট ভবিষ্যতে তুমি এক ভয়ংকর অপশক্তির মুখোমুখি হতে চলেছ, প্রফেসর। শুধু শুভশক্তির ওপর বিশ্বাস রাখো। যে পরমাত্মা এতদূর পথ নিয়ে এসেছে, সে-ই বাকিটা পথ নিয়ে যাবে। যাও প্রফেসর। তোমার বন্ধু বাইরে অপেক্ষা করছে। বিদায়।
ঈকপার মঠ থেকে বিদায় নিলাম আমরা। বেরোনোর আগে দেখলাম সোনালি রঙের পাথরের বুদ্ধমূর্তি এখনও আমাদের দিকে মায়াময় দৃষ্টিতে দেখছেন। তাঁর ঠোঁটে হাসি। হাত তুলে অভয় মুদ্রায় যেন আশ্বস্ত করছেন তিনি আমাদের।
.
References:
1. তিব্বতি মন্দিরের পতাকার বিষয়ে তথ্যসূত্র: indiatimes.com/ lifestyle/self/8-things-you-should-know-about-tibetan-prayer-flags-before-hanging-them-up
2. বৌদ্ধমন্দিরের তিন বুদ্ধের বিষয়ে তথ্যসূত্র: namdroling.net/Portal/Page/The-Three-Great-Statues-inside-the-Golden-Temple
3. বৌদ্ধমঠের সম্বন্ধে তথ্যসূত্র: timesofindia.indiatimes.com/travel/destinations/5-most-inaccessible-monasteries-in-the-world/gs40368352.cms
3. তিব্বতি মন্ত্রর তথ্যসূত্র: shambhala.com/snowlion-articles/ om-mani-padme-hum-dalai-lama/
